জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

রাজপুত্ররা সকলেই একাক বিচিত্র চরিত্রের হতে থাকলেন, যতই তাঁদের বয়োবৃদ্ধি হতে থাকলো। একদিকে পূর্ণভাবে নিষ্ঠাবান হলেন ছন্দচিৎ, ঠিক তাঁর প্রয়াত পিতার মতন, তো অন্যদিকে করিন্দ্র ভয়ানক উগ্র হয়ে উঠতে থাকলেন, যা তাঁর মাতাদের চরিত্র হলেও, তাকে লুকিয়ে রাখেন, তাঁদের ভ্রাতা বীর্যের কথন অনুসারে। ছন্দচিৎ হয়ে উঠলেন, মহাবলশালী চিত্তাল ও সুরচিৎ-এর পিতা সমান ভ্রাতা, যিনি সর্বক্ষণ প্রয়াত পদ্মচিত্তের স্থান নিতে থাকলেন, তাঁর ভ্রাতাদের কাছে।

অন্যদিকে, করিন্দ্র তাঁর সকল ভ্রাতা, অর্থাৎ করিমুণ্ডের পুত্রদের নেতা হয়ে উঠলেন। উগ্রতা, লোভ, হিংসা এবং মদভাব করিন্দ্র এবং তাঁর ভ্রাতাদের সর্বক্ষণ প্রজার থেকে সর্বস্ব লুণ্ঠনের চিন্তায় মত্ত রাখলো। যেই বৎসর ছন্দচিতের জন্ম হয়, সেই বছরেই খরা কেটে যায় চন্দননগর থেকে, আর খরা কাটার পর থেকে ধনধান্যে ভরে ওঠে চন্দননগর। কিন্তু প্রজার সুখের দিন ততদিনই ছিল, যতদিন না সুরচিৎ জন্ম নেয়।

সুরচিৎ জন্ম নেবার আগেই মহারাজ পদ্মচিত্তের দেহাবসান হয়। আর তার ফলে রাজরানী দেবী চিত্তাও নিজেকে গুটিয়ে নেন, আর তখন থেকে দুর্ভগ শুরু হয় প্রজার। মহারাজ করিমুণ্ড অত্যাচারী না হলেও, প্রজার হিতাহিতের প্রতি তিনি সর্বক্ষণ উদাসীন, আর তাঁর পত্নীরা তো মানব শরীর না পেয়ে রাক্ষসের শরীর পেলে, প্রজাদের ধরে ধরে ভক্ষণই করে নিতেন, এমন মানসিকতা রাখেন।

ফলে প্রজা সমানে কোণঠাসা হতে থাকে। আর রাজপুত্রদের যতই বয়স বারে, ততই তাঁদের জীবন ভয়াবহ হয়ে যেতে শুরু করে, কারণ করিমুণ্ডের পত্নীরা রাক্ষস শরীরে না থাকার জন্য, যেই অত্যাচার করতে পারেন না, তাঁর পুত্ররা মানব শরীরেই সেই অত্যাচারের মানসিকতা স্পষ্ট করে দেন।

করিন্দ্র বিশাল আকারের এবং প্রবল বলবান তাঁর কিশোর অবস্থা থেকেই। আর একই ভাবে, তাঁর ভ্রাতারাও সেই পরিমাণ বলশালী। করিন্দ্রের কোলের ভ্রাতা, করাভ বলশালী হবার সাথে সাথে ভ্রাতার ছায়ার মত সর্বক্ষণ তাঁর সাথে থাকেন, আর তাঁর কাছে করিন্দ্রের বচন যেন স্বয়ং পরমেশ্বরের বচন। মিতাপুত্র মিত্রারির স্বভাব আরো বৈচিত্র্যপূর্ণ। সে সর্বক্ষণ কারুর সাথে নয় কারুর সাথে মিত্রতা করে, আর পরক্ষণে তাঁর পৃষ্ঠে ছুরিকাঘাত করে। স্ফীতাপুত্র, চাক্ষুষ এঁদের কাছে সমস্ত তথ্য প্রদান করার কাজ করে।

কোন প্রজা কবে কি ফলন করিয়েছে, কে অধিক দুগ্ধ উত্তোলন করেছে, কে সবে বিবাহ করেছে। এই সমস্ত কিছুর তথ্য প্রদান করাই তাঁর কাজ। ছন্দচিৎ ও চিত্তালের মাঝের এই চার করিপুত্ররা ক্রমশ অত্যন্ত ভয়াল হয়ে উঠলেন প্রজার কাছে। তাঁরা যেন প্রজার সুখ বরদাস্তই করতে পারেনা। যার ক্ষেতে যা কিছু ফলন হয়েছে, তা এঁদের চাই। অর্ধেক তাঁরা সকল ভ্রাতারা মিলে ভক্ষণ করে, আর বাকি অর্ধেক তাঁরা জগদ্ধাত্রী নদীতটে ফেলে দিয়ে নষ্ট করে, তাও প্রজাকে সেই ফলনের, সেই পরিশ্রমের সুখভোগ করতে দেয় না।

সেই সংবাদ রাজা করিমুণ্ডের কাছেও আসে। কিন্তু সে এই সমস্ত কৃত্যকে পুত্রদের ছেলেমানুষি বলে উড়িয়ে দেয়, আর তাই এসবের কোনাও প্রতিকার করেন না। তাই যতই রাজপুত্রদের বয়োবৃদ্ধি হয়, ততই প্রজার আশ্বাস ও আশা স্থাপিত হয় ছন্দচিতের প্রতি। ছন্দচিৎই জ্যেষ্ঠ, রাজপুত্রদের মধ্যে। আর ভাবিকালে সে-ই হবে মহারাজ। তাঁর স্বভাব বড়ই মধুর, ঠিক তাঁর পিতার মত। আর তাই প্রজা বুক বেঁধে থাকেন যে, একনা একদিন ছন্দচিৎ রাজা হবেন, আর সেদিন তাদের সুদিন ফিরবে।

বলবান ছন্দচিৎও, কিন্তু তাঁর বলের প্রতি কনো দৃষ্টি নেই। ঠিক যেন তাঁর পিতা! সর্বক্ষণ প্রজার কাছে গিয়ে গিয়ে, কার হেঁসেলে আহার আছে, কার হেসেলে আহার করার কিছু নেই। কার চিকিৎসা প্রয়োজন, কার ঘরে পোয়াতি মহিলা আছেন তার অধিক যত্ন নেওয়া, এই তাঁর নিত্যকর্ম।

সাথে সাথে তিনি তাঁর বিধবা মাতারও যত্ন রাখেন যথাযথ ভাবে। তবে ঠিক যেমন রাজা পদ্মচিত্তের কাছে প্রজা ও পরিবারের মধ্যে কনো ভেদ থাকতো না, ছন্দচিতেরও স্বভাব অবিকল সেইপ্রকার। আর তাঁর মাতা, অর্থাৎ দেবী চিত্তারও তো প্রজা অন্তপ্রাণ। তাই তিনি তাঁর পুত্রকে বাঁধা তো দিতেনই না, বরং ছন্দচিতের কর্মে তিনি তৃপ্ত হয়ে, তাঁকে আরো ইন্ধন প্রদান করতে সেই কর্মে, যেই কর্ম সর্বক্ষণ ছন্দ করতে থাকে।

ছন্দ নামেই ধীরে ধীরে তিনি প্রজার কাছে, তাঁর মাতার কাছে এবং সর্বত্র পরিচিত হতে থাকলেন। আসলে পরানের কাছের মানুষকে, কেউই বৃহৎ নামে ডাকা পছন্দ করেন না। তাঁকে ছোট্টনাম প্রদান করে, কাছেই রাখতে পছন্দ করেন সকলে। তাই ছন্দচিৎ হয়ে উঠলেন ছন্দ।

তবে এমন নয় যে, ছন্দের প্রভাবে করিন্দ্রদের অত্যাচার কিছু কম হলো। কিন্তু হ্যাঁ, যেখানে যেখানে ছন্দ থাকতেন, সেই স্থানকে করিন্দ্র ও তাঁর ভ্রাতারা এড়িয়ে চলাই পছন্দ করতেন। আর তার কারণ ছন্দ নয়, বরং তাঁর দুই ভ্রাতা, তাল ও সুর। প্রজা, চিত্তালকেও, তাঁর পিতার নাম থেকে মুক্ত করে, তাল বলে ডাকতেন; আর সুরচিৎকেও সুর ভলে ডাকতেন, এবং তাঁদেরকে একত্রে সুরতালছন্দ বলেই ডাকতেন।

ছন্দের এই দুই কনিষ্ঠ ভ্রাতা, অর্থাৎ তাল ও সুরকে ভয়ানক ভাবে ভয় পেতেন করিন্দ্র ও তাঁর সকল ভ্রাতা। এঁদের মধ্যে সুর আত্মভোলা। সর্বক্ষণ মাতা জগদ্ধাত্রীকে নিয়েই তাঁর চিন্তা। কিন্তু তাঁকে ভয় পাবার কারণ তাঁর অসামান্য যুদ্ধ কৌশল। বিনা অস্ত্রে রণাঙ্গনে যাত্রা করাই তাঁর একমাত্র রণকৌশল। শত্রু তাঁকে আঘাত করার জন্য অস্ত্র প্রেরণ করবেন। আর প্রবল একাগ্রতা তথা প্রবল গতিধর সুর, সেই অস্ত্রকেই নিজের অস্ত্র করে নিয়ে, যখন প্রবল একাগ্রতা ধারণ করে, এবং প্রবল গতি ধারণ করে, সেই অস্ত্রই প্রেরণ করে শত্রুকে, তখন শত্রুর নাশ অবস্যাম্ভাবি ছিল।

তাঁর এই মেধার সম্মুখীন হবার সামর্থ্য সত্য অর্থে কারুর ছিলনা, স্বয়ং করিমুণ্ডেরও নয়। তবে সুর যে সেই মেধা নিয়ে মদাচ্ছন্ন, তা একদমই নয়, কারণ তাঁর ধ্যানজ্ঞান মাতা জগদ্ধাত্রী। তবে হ্যাঁ, মাতা জগদ্ধাত্রীর থেকে যদি কেউ তাঁকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস করেন, তখনই তিনি এমন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেন। আর সেই বিচ্ছিন্নকারীকে তিনি সনাক্ত করতেন কি করে?

যে বা যারা তাঁর মনের শান্তি কে নষ্ট করতে চাইতেন, সে স্বতঃই তাঁর শত্রু হয়ে যেত। তাঁর নিষ্ঠাবান ভ্রাতা ও শিশুসুলভ মহাবলশালী ভ্রাতা, ছন্দ ও তালকে বিরক্ত করলে, তাঁর মাতা দেবী চিত্তাকে কেউ বিরক্ত করলেই, তাঁর শান্তিভগ্ন হতো, আর শান্তি ভগ্ন হলেই তার মন মাতা জগদ্ধাত্রীর থেকে অপসারিত হতো। আর একবার তাঁর মন মাতা জগদ্ধাত্রীর থেকে বিচ্ছিন্ন হলেই, যার উদ্যোগে এমন হয়েছে, সে স্বতঃই তাঁর শত্রু হয়ে যায়।

এর থেকে মুক্ত তাঁর ভ্রাতা তালও ছিল না, কারণ তালও তাঁর আদরের কনিষ্ঠ ভ্রাতা অনেকক্ষণ শান্ত থাকলে, তাঁকে কেবলই বিরক্ত করে তোলার জন্য, তাঁর শান্তি ভগ্ন করার কর্ম করতো। তাল প্রকাণ্ড বলশালী। তাঁর বল এমনই যে সমস্ত করিন্দ্র ভ্রাতাদের একত্রে তিনি একাকীই ভূপতিত করে দিতেন। তাই সুরের প্রাথমিক আঘাত তাঁর কাছে তেমন কিছু মনে হতো না। তবে কনিষ্ঠ ভ্রাতার এই মাতা জগদ্ধাত্রীর প্রতি প্রেম, আর সেই প্রেমকে আঘাত করলেই, তাঁর প্রত্যাঘাতকে সে অতিশয় স্নেহ করতো, আর তাই অধিকক্ষণ শান্ত থাকলেই, সুরকে সে বিরক্ত করতো।

শত্রু তিনি নয়, তাই আঘাত তো তিনি করতেন না, তবে কনিষ্ঠ ভ্রাতা উত্তেজিত হয়ে, তাঁকে যে কিলচর মারতো, তাতে সে কনিষ্ঠ ভ্রাতার অঙ্গের স্পর্শ পেত, আর সেই স্পর্শই তাঁর সবথেকে প্রিয় স্পর্শ। তাই অধিকক্ষণ সেই স্পর্শ না পেলেই, সে তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুরকে বিরক্ত করা শুরু করতো। শেষে যখন সুরের আঘাতে তাঁর কিছু হতো না, তখন সুর কেঁদে উঠতো, আর তাল তাঁকে বক্ষের মাঝে জরিয়ে ধরে স্নেহ করতো, এই আলিঙ্গনই তালের কাছে সর্বাধিক প্রিয়।

মধ্যা কথা এই যে, তাল তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে অতিশয় স্নেহ করতো। তাঁর কাছে তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতার মাতা জগদ্ধাত্রীর প্রতি স্নেহ অতিশয় গর্বের বিষয়, আর তাঁর কাছে তাঁর কনিষ্ঠভ্রাতার স্পর্শ হলো জগতের শ্রেষ্ঠ পবিত্র স্পর্শ, যেই স্পর্শের জন্য সে সর্বদা কাতর থাকতো।

সুরের আঘাতে তাল আহত না হয়ে পুলকিত হলেও, সেই আঘাত করিন্দ্র ও তাঁর ভ্রাতাদের জন্য ঘাতক হতো। বেশ কয়েকবার এমন হয়েছে যে, ছন্দ প্রজার সেবা করছে দেখে, আর প্রজার থেকে লুণ্ঠন করতে পারছেনা বলে, করিন্দ্রের কিছু ভ্রাতা ছন্দকে বিরক্ত করতে যায়। তাতে সুরের শান্তিভগ্ন হয়, আর তাই প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতার সাথে ধেয়ে আসে করিন্দ্রভ্রাতাদের প্রতি। তাঁর ক্ষিপ্রতা দেখে, পলায়নের কালে, একটি পাটকেল তুলে আঘাত করে, সুরকে দূরে ঠেলে দিতে চায় তাঁরা। কিন্তু সেই পাটকেলকে নিজের বাহুদ্বারা ধরে নিয়ে, এতটাই গতিদ্বারা প্রেরণ করে সুর যে করিন্দ্রের সেই ভ্রাতা সেই পাটকেলের আঘাতে মূর্ছাই চলে যায়।

তাই সুরকে আর বিশেষ করে সুরের মেধাকে, অর্থাৎ প্রবল একাগ্রতা এবং প্রবল গতিকে সমস্ত করিন্দ্রভ্রাতা এবং স্বয়ং করিন্দ্রও ভয় করে চলতো। আর তারই সাথে ছিল, তালের ভহাবহতা। প্রকাণ্ড দেহধারী তালের বল অতিকায়। একই সঙ্গে সে করিন্দ্র সহ তাঁর আরো বেশ কিছুভ্রাতাকে বাহুবলে শূন্যে তুলে প্রায় দশ হাত দূরে ছুড়ে ফেলে দেবার সামর্থ্য ধরে। আর শুধু তাই নয়। কেবল বিশাল দেহই নেই তাঁর। সেই দেহ ও দেহাঙ্গকে বিভিন্ন দিশায় আন্দোলিত করার যথাযথ সাবলীলতাও তাঁর ছিল।

আর তাঁর বল এমনই যে সে নিজের দশদিশায় ছড়িয়ে থাকা, যেকোনো কারুকে তারই অবস্থা থেকে তুলে নিতে পারতেন শূন্যে। তাই তালকে ভয়ানক ভাবে সকলে ভয় করতেন। ইতিমধ্যেই বহুবার বহু করিন্দ্র ভ্রাতার হাড়গোড় ভেঙেছে সে এবং প্রায় সকলেই তার হাতে প্রহৃত হয়ে, আহত হয়েছে কখনো না কখনো। সেই কারণে তাঁর থেকে সকলে সতর্ক থাকেন।

এই তাল ও সুরের কারণে, প্রজার যেটুকু শান্তি, কারণ যদি কনো প্রজার কাছে এঁরা তিনজন থাকেন, তাহলে সেই তল্লাটে করিন্দ্র ও তাঁর ভ্রাতারা তো কিছুতেই আসবেন না। আর সেই সংবাদ কি করে পায় যে, কোথায় সুরতালছন্দ রয়েছে? সেই সংবাদদাতার কাজ করে স্ফীতা পুত্ররা। ভাবগতিক পরিদর্শন করে, সুরতালছন্দের অবস্থানের অনুমান লাগায় মনকরি, আর তাঁর অনুমানকে সাফল্যমণ্ডিত করে চাক্ষুষের দৃষ্টি, করিঘ্রাণের ঘ্রাণশক্তি, করিস্না শ্রুতকরি ও করিধ্বজ।

আর সেই সংবাদ অনুসারে, মিতাপুত্ররা সেই স্থান থেকে দূরে কনো স্থানের প্রজার গৃহকে চিহ্নিত করে লুণ্ঠনের জন্য, আর হুতাপুত্ররা তাঁর কাছে গমন করে তাঁকে লুণ্ঠন করতো। এই ভাবেই ক্রমশ প্রজার জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠছিল, আর সকলের আশাভরসা হয়ে উঠছিলেন সুরতালছন্দ। সকলে আশা করে বসে থাকেন, কবে ছন্দ যুবা হবে, আর যুবরাজ হয়ে সে অবস্থান করে, ভাবিকালে মহারাজ হয়ে তাঁদের রক্ষণ করবে।

প্রজার এই সমস্ত কথা, এই সমস্ত মনোভাবের সংবাদ রাজা করিমুণ্ডও লাভ করেন, আর তাঁর পত্নীরাও। পত্নীরা সেই সংবাদ শ্রবণ করে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন এই ভেবে যে, সেই দিন কখনোই আসবেনা, কারণ তাদের ভ্রাতা বীর্য সেই দিন আসতে দেবেনা। আর অন্যদিকে, মহারাজ করিমুণ্ড সেই সংবাদ সমূহ লাভ করে অত্যন্ত চিন্তিত থাকেন যে, তাঁর পুত্ররা ক্রমশ প্রজার কাছে চক্ষুশূল হয়ে উঠছে, আর চিত্তাপুত্ররা সমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, অর্থাৎ যুবরাজ হবার দাবিদার এবং মহারাজ হবার দাবিদার তাঁরাই হয়ে উঠছে।

মহারাজ করিমুণ্ডের এমন দুশ্চিন্তার কারণ কেবলই যে ছন্দের প্রজা ও মা জগদ্ধাত্রীর প্রতি নিষ্ঠা, তালের মহাবল ও ভ্রাতা তথা মাতা জগদ্ধাত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা, আর সুরের অসম্ভব মেধা, একাগ্রতা ও গতি, তা নয়। তাঁর মূল ভীতির কারণ সুরের ভাব। সুরের ভাব কেবলই করিমুণ্ডকে বিচলিত করতো, তাও নয়। সেই ভাব তো হুতাদের মনের সন্দেহের রচনা করতো। তাঁদেরও মনে হতো, বীর্য পারবে তো সুরকে বিভ্রান্ত করতে! সুরকে বিভ্রান্ত না করতে পারলে, কনো ভাবেই ছন্দপতন সম্ভব নয়, আর ছন্দপতন না হলে, ছন্দের রাজসিংহাসনে স্থাপিত হওয়া কেবলই সময়ের অপেক্ষা।

সুরের ভাবের বিষয়ে এতটাই ভাবিত থাকতো হুতা ও তাঁর ভগিনীরা যে, প্রায়শই তাঁরা বীর্যকে সুরের ব্যাপারে প্রশ্ন করতো আর বলতে থাকতো, সুরের কিছু একটা গতি করো ভ্রাতা। ভগিনীদের উদ্বেগ অহেতুক নয়, তাই বীর্য তাঁদের কথাকে উড়িয়ে দিতেন না, কিন্তু মনে মনে আনন্দিত হতেন এই ভেবে, যেই সুরেরই জন্য তো তিনি অপেক্ষা করছিলেন, কারণ এক সুরই সক্ষম নিষ্ঠাবানকে পরাজিত করতে। তবুও, তাঁর মনের কন্দরে, যেখানে তাঁর আত্ম বিরাজ করতো, সেখানে একটি ভয় বীর্যের মধ্যে কাজ করতো। সুরের মেধা, সুরের একাগ্রতা, সুরের গতি, সত্যই ভাবনা সৃষ্টি করার কারণ, কিন্তু সুরের ভাব, সেটিই সর্বাধিক ভাবনা উদ্বেগের হেতু।

মা জগদ্ধাত্রীর প্রতি সুরের ভাব অত্যদ্ভুত, আর অভাবনীয়। এককথায় বলা যেতে পারে, সেই ভাবের কারণেই তাঁর একাগ্রতা, তাঁর মেধা আর তাঁর গতি। সামান্য অবস্থায়, সুর একটি শিশুর থেকে অধিক কিছুই নয়। এক শিশু সে, যে তাঁর মাতাতে সর্বদা নিমগ্ন। সর্বদা সে মাতার সন্ধান করে ফিরছে, সর্বদা তাঁর মাতাকে একঝলক দেখবে বলে হাপিত্যেশ করে বসে রয়েছে।

সমস্যার রচনা হয় তখন যখন সেই শিশুকে তাঁর মাতার থেকে সরিয়ে আনার প্রয়াস হয়। মন তাঁর সদাশান্ত, আর সেই শান্ত মন সর্বদা তাঁর জননীকে খুঁজে চলেছে। প্রকৃতির মধ্যে তাঁর মাতা রয়েছেন, জননীর থেকে তা জেনেছে শিশুমনা সুর। তাই সর্বদা প্রকৃতিকে দেখতে থাকে, প্রকৃতির গতিবিধির উপর তাঁর নজর। তাঁর মাতাই তাঁর গুরু, এমন বোধ জেগেছে সুরের মধ্যে প্রকৃতিকে নিরীক্ষণ করতে করতে।

গরু আহার গ্রহণ করার কালে, কেবল ঘাস খেয়ে নেয়, চর্বণ করেনা। চর্বণ করে পরবর্তী সময়ে, আর তখন যা গ্রহণযোগ্য নয়, তাকে মুখ থেকে গ্যাঁজলা বার করে, মূত্র দিয়ে আর বিষ্ঠাদিয়ে মুক্ত করে দেয়। এই থেকে সুর জেনেছে জ্ঞান কি করে আহরণ করতে হয়। সে শিখেছে যে, জ্ঞান আহরণ করার কালে, যা সম্মুখে আসছে, তা গ্রহন করার কালে কনো বিচার করতে নেই, কনো কিছুকে ত্যাগ করতে নেই। সমস্ত কিছু গ্রহণ করে নিতে হয়। পরবর্তীতে, তার বিচার করতে হয়, আর তখন যা গ্রহণযোগ্য নয়, তাকে গ্যাঁজলা, মূত্র ও বিষ্ঠার মত ত্যাগ করে দিতে হয়।

একই ভাবে জগদ্ধাত্রী নদীতটে বসে বসে, নদীর গতিধারাকে পর্যবেক্ষণ করে শিখেছে, সর্বক্ষণ প্রবাহিত হয়ে যেতে হয়, তবেই গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। জননী চিত্তাদেবীকে সুর প্রশ্ন করেছে, এই নদীর গন্তব্য কি? উত্তর পেয়েছে সাগর। তাই সুর শিক্ষা নিয়েছে যে, সর্বক্ষণ প্রবাহিত হলে তবেই গন্তব্য লাভ হয়, এমনকি গন্তব্য লাভ হয়ে গেলেও সেই পরিশ্রম, সেই প্রবাহধারাতে কনো প্রকার খামতি আনতে নেই। সেই কালে, নিজের লাভ করা গন্তব্যকেই সকলের গন্তব্য করে দেবার পরিশ্রম করতে হয়।

এইপ্রকারে, গরুর থেকে, গাধার থেকে, পক্ষীদের থেকে, কীট, প্রজাপতি, পতঙ্গ, ভুজঙ্গ, নদী, আকাশ, সমস্ত কিছু থেকে সে শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকে সর্বক্ষণ, আর তাই প্রকৃতি তাঁর কাছে গুরু হয়ে অবস্থান করেছেন। পুত্রের এমন মেধা দেখে, আপ্লুত হয়ে তাঁর জননী, চিত্তাদেবী পুত্রকে এও শিখিয়েছেন যে সময় হলেন এই প্রকৃতিরই আরো এক সূক্ষ্মরূপ। যেই শিক্ষা প্রকৃতির থেকে সে নিচ্ছে, তা সে নিতে পারছে কারণ সময় প্রবাহিত হচ্ছে।

তাই সুর, প্রকৃতির সাথে সাথে সময়ের থেকেও শিক্ষা নিতে শিখেছে। সময়ের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার কালে সে শিখেছে, প্রকৃতিকে নিরীক্ষণ করাই হলো কর্ম আর কর্মের ক্ষেত্রে, ক্রিয়া হলো কর্মের অর্ধ অধোভাগ। সেই কর্মেরই অধঃনিম্নভাগ হলো কর্মফল। আর এই কর্ম এবং কর্মফল মিলেই কর্মকে সম্পন্ন করে। আর সময় হলো, এই কর্ম করা এবং কর্মফল লাভ করার অন্তরায়ের ক্ষণ। অর্থাৎ সময়ের নির্মাতা হলো কর্ম, আর সময়ের চক্রকে সম্পন্ন করে কর্মফল।

আর এই কর্ম এবং কর্মফল, তথা তাঁদের মধ্যে বিরাজ করা সময়ই নির্মাণ করে অভিজ্ঞতা, আর এই অভিজ্ঞতাকেই বিচার করে, তার সার গ্রহণ করা হলে, সৃষ্ট হয় জ্ঞান। অভাবনীয় তাঁর অর্থ নিষ্কাসন, তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতা, ছন্দকে সর্বদাই গর্বিত করে, আর সাথে সাথে তালকেও। তাঁদের নেত্রে, তাঁদের ভ্রাতা অত্যন্ত বিশেষ, আর সম্পূর্ণ ভাবে সত্যকামী।

দেবী চিত্তাও বিশ্বাস করেন যে মাতা জগদ্ধাত্রীর সমস্ত জন্ম দেওয়া সন্তানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সন্তান হলেন তাঁর আদরের সুর। মুখে না বললেও, অন্তরে অন্তরে সুরকে স্বয়ং তাঁর জননী, দেবী চিত্তা প্রণাম করতেন, আর সেই প্রণাম সুরের উদ্দেশ্যে নয়, করতেন মাতা জগদ্ধাত্রীর উদ্দেশ্যে, কারণ তাঁর ধারণা মাতা জগদ্ধাত্রী যেন সাখ্যাত প্রকট হয়েছেন সুর রূপে।

যদি তাই না হতো, তাহলে এই সামান্য কিশোর বয়সে তাঁর এত মেধা কি করে জন্ম নিতে পারে! যেই সত্য তাঁরা এত বয়কালে এসেও উদ্ধার করতে পারেনি, এই শিশু কেমন করে তা অনায়সে উদ্ধার করে নিতে পারে! আসল কথা এই যে, প্রগলের মত সুর মাতা জগদ্ধাত্রীর সন্ধান করে ফেরেন। তাঁর অন্তরে বিশ্বাসও ছিল যে মাতা জগদ্ধাত্রীই তাঁর জন্ম জন্মান্তরের মাতা, আর সেই ধারণাকে সত্য বলে সনাক্ত করে দিয়েছেন তাঁরই জননী।

দেবী চিত্তাকে প্রশ্ন করেছেন বহুবার যে মাতা জগদ্ধাত্রীর সাথে আমাদের প্রকৃত সম্বন্ধ কি। আর প্রতিবারই সুরের প্রশ্নের উত্তরে দেবী চিত্তা বলেছেন, তিনিই আসল মাতা আমাদের সকলের, তোমার আমার সকলের প্রকৃত জননী তিনিই। বাকি জননীরা কেবলই পুষ্টিধারণ করে সন্তানের দেহপ্রদান করেন, কিন্তু সেই দেহের প্রাণ, সেই দেহের উর্জ্জা, সেই দেহের চেতনা, সমস্ত কিছুই মাতা জগদ্ধাত্রীর সন্তান, তাই সকলে প্রকৃত অর্থে মাতা জগদ্ধাত্রীরই সন্তান।

আর সেই সত্য জানার পর থেকে, প্রগলের মত সুর মাতা জগদ্ধাত্রীর সন্ধান করে ফেরেন। তাঁর জননী তাঁর কাছে জগতের শ্রেষ্ঠ জননী কারণ, এমন কনো জননী সম্ভব যে সন্তানের উপর নিজের অধিকার স্থাপন না করে অনায়সে বলতে পারেন যে, তোমার ও সকলের প্রকৃত জননী হলেন অন্যকেউ। এমন কোন মাতা সম্ভব যে নিজের মমতার অধিকার ত্যাগ করে দেন, অনায়সে! তাই তাঁর জননী জগতের শ্রেষ্ঠ জননী, এই সুরের ধারণা।

আর তারই সাথে, তাঁর এই অনাবিল সন্ধানকে কুর্নিশ জানিয়ে, সর্বদা তাঁকে তাঁর এই সন্ধানের জন্য স্নেহ করে যাওয়া তাঁর দুই ভ্রাতারা হলেন, সুরের কাছে জগতের শ্রেষ্ঠ দুই ভ্রাতা। আর তাই তাঁদের প্রতি সে অত্যন্ত যত্নবান। সুরের কাছে, তাঁর জননী ও তাঁর ভ্রাতারা মাতা জগদ্ধাত্রীরই একাকরূপ। যাতে করে সে নিজের মাতার সন্ধান করার কালে, তাঁকে সুরক্ষিত থাকার জন্য চিন্তিত না হতে হয়, সেই কারণে মাতা জগদ্ধাত্রীই তাঁর জননী ও তাঁর ভ্রাতা হয়ে প্রকৃষ্ট হয়েছেন, এই সুরের ধারণা। আর তাই, এই তিনের প্রতি তিনি সর্বদা ততটাই যত্নবান, যতটা মা জগদ্ধাত্রীর প্রতি।

তাই এই তিনের প্রতি কুদৃষ্টি প্রদানের সামর্থ্য কারুর নেই। যে বা যারা এই তিনের উপর কুদৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন, সুরের কাছে সেই কুদৃষ্টি স্বয়ং মা জগদ্ধাত্রীর প্রতি নিক্ষেপ করা, আর তাই সেই ব্যক্তির সাথে তাঁর জাগতিক যেই সম্পর্কই থাকুক না কেন, তিনি স্বতঃই তাঁর শত্রু হয়ে ওঠেন। সেই কারনেও, করি, করির পত্নী, তথা করির পুত্ররা কেউ, এঁদের উপর নজর দেওয়ার সাহস করতো না।

ভীত তারা সুরের প্রতিও, কিন্তু তার থেকেও অধিক ভয় তাদের মা জগদ্ধাত্রীকে। সুর যেন সাখ্যাত মা জগদ্ধাত্রীর নয়নের মণি। তাঁর যদি কনো প্রকার ক্ষতি হয়, যেন সাখ্যাত মা জগদ্ধাত্রী স্বয়ং এসে উৎখাত করে দেবেন সেই ক্ষতিসাধকদেরকে। এইটিও বীর্য, করিমুণ্ড এবং করিন্দ্রদের সকলের এক বিশেষ ভীতির কারণ। অন্যদিকে, সুরের সেই সমস্ত কনো দিকে নজর দেবার সময় নেই।

মা জগদ্ধাত্রী তাঁর মা, সকলের মা, কিন্তু সকলে কেবল মা জগদ্ধাত্রীর কাছে, নিজেদের আবদার রাখতেই ব্যস্ত। কেন কেউ মায়ের আবদার জানার প্রয়াস করেনা! কেন কেউ মায়ের কথা শ্রবণ করার প্রয়াস করেনা! কেন সকলে নিজের কথা মাকে শোনানোর জন্য ব্যকুল। সকলে যদি মাকে নিজের কথাই শোনাবে, তাহলে মায়ের কথা কে শুনবে? কেউ যদি মায়ের কথা নাই শোনে, তাহলে মা কাকে নিজের কথা শোনাবেন! যদি কারুকে মা নিজের কথা বলতে না পারেন, তাহলে কতটা বেদনার মধ্যে তিনি বিরাজ করছেন!

এই ভাব নিয়ে, সুর মাতা জগদ্ধাত্রীর দর্শন কামনা করতে শুরু করে। দিবারাত্র তাঁর একটিই স্বপ্ন, সে মাতা জগদ্ধাত্রীর সাথে সাখ্যাত করবে, আর একটিও নিজের কথা বলবেনা, কেবলই মায়ের কথা শুনবে, আর সেই কথানুসারে ক্রিয়া করে করে, মাতাকে আনন্দ দেবে, মাতার বেদনা দূর করবে।

শিশু অবস্থায় সকলেই ভাবতো, শিশুর ছেলেমানুষি। কিন্তু বাল্যকাল ছেড়ে কিশোর অবস্থাতেও এই ভাব থাকলে, আর ক্রমশ প্রকট হলে, সকলের কাছে সুর হয়ে ওঠে এক বিশেষ বালক। সকলের এই ধারণা জন্ম নেয় যে, বিশেষ সম্বন্ধ এই বালকের সাথে মাতা জগদ্ধাত্রীর। নাহলে যেই ঈশ্বরীর কাছে সকলে নিজেদের মনের বেদনা বলে, সেই বেদনা থেকে মুক্তির কামনা করে, এই বালক সেই ঈশ্বরীর বেদনার নিরাময়ের চিন্তা করছে! নিশ্চিত ভাবে গহন সম্বন্ধ সুর ও মাতা জগদ্ধাত্রীর।

প্রকৃত সন্তান সে, কারণ এক প্রকৃত সন্তানই তো মাতার বেদনার নিরাময় করার জন্য ব্যকুল থাকে। সুরও ঠিক তেমন, তাই নিশ্চিত ভাবে সুর মাতা জগদ্ধাত্রীর কনো বিশেষ পুত্র। বিশেষ কিছু কারণেই সে জগতে এসেছে, মা জগদ্ধাত্রীর কোলে এসেছে সে নিজের মাতার বেদনার নিরাময় করবে বলে। তাই তো তাঁর নিজের কনো চিন্তাই নেই। আহার পেল না পেলনা, নিদ্রা গেলো না গেলো না, চোট পেল না পেলনা, চোট সেরে উঠলো না উঠলো না, কনো দিকে তার কনো খেয়াল নেই। দিবারাত্র কেবলই মাতা আর মাতা।

সুরের একটিই ভাবনা, মাতার বেদনা জানতে হলে, মাতার কাছে পৌছাতে হবে। তাঁর দর্শন পেয়ে, তাঁর সামনে বসে, তাঁর কথা শুনতে হবে। কিন্তু সম্মুখে পৌঁছাবে কি করে সে? জননীর থেকে শুনেছে সে, তিনি সকলের মাতা। মা তো সন্তানের বেদনাতেই কাতর। মা তো সন্তানের জন্যই সর্বদা চিন্তিত। মা তো সন্তানের সাথে সর্বসময়েই যুক্ত। তাই সুরের ধারণা এই জন্মেছে যে, সকল প্রজার সাথে সর্বদা লেপটে থাকতে হবে, কারণ প্রজার সাথে লেপটে থাকলে, তবেই মাতা তাঁদের সাথে যেই যেই ভাবে যুক্ত, তা সে জানতে পারবে।

আর তা জানতে পারলে, মাতার সাথে কি ভাবে যুক্ত হওয়া যায়, তা জানা সম্ভব হবে তার পক্ষে। সাথে সাথে, জননীর থেকে সে জেনেছে, কলার কথা। কলা এমনই এক সৃষ্টি, যার মধ্যে নিমগ্ন হলে, হৃদয়ে স্বয়ং মাতাকে অনুভব করা যায়। তাই কলা শাস্ত্রের চর্চা শুরু করেছে সে। সঙ্গীত, বাদ্য, নাট্য, নৃত্য, ক্রীড়া, চিত্রাঙ্কন, সমস্ত কলাকে ধারণ করে করে, মাতাকে অনুভব করা শুরু করেছে সে।

ক্রমশ এমন হয়ে যাচ্ছে সুর যে, যেকোনো শব্দ বা বাক্য বা যাকিছু সে শ্রবণ করে, বা যা কিছু সে দেখে, সমস্তকিছুকে একনিমেষের মধ্যে অনুভব করে নেয়। আর সেই অনুভব এমনই একাগ্রতা ও গতির সাথে সম্পন্ন করে সে যে, একটি জগতের কোনায় দাঁড়িয়ে, সে ক্রমশ সম্যক জগতকে দেখতে শুরু করে দেয়।

প্রকৃতি তাঁর গুরু, আর সে প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ শিষ্য, আর তাই প্রকৃতির বলা সমস্ত কথা যেন সে সর্বদা সহজাত ভাবেই শ্রবণ করছে, অনুধাবন করছে। কাল যেন তাঁর প্রিয়মিত্র, আর সে তাই কালের সমস্ত ক্রিয়াকে মুখে বলা কথার মত শ্রবণ করতে পারছে আর অনুধাবন করতে পারছে। প্রজা, জীব, তথা সকলকে নিরীক্ষণ করে করে, সমস্ত কারুর মনস্তত্ত্ব যেন তাঁর অঙ্গুলিতে সংখ্যা গণনার মত হয়ে গেছে। তাই তার থেকে কনো মানুষের, কনো জীবের, কনো উদ্ভিদের কনো কথাই যেন লুক্কায়িত নয়।

তার বক্তব্যই তো এই। প্রতিটি জীব যদি মাতার সন্তান হয়, তাহলে তাকে প্রতিটি জীবের কথা অনুভব করে নিতে হবে। যে মাতার সন্তানকে অনুভব করতে পারেনা, সে মাতাকে কি ভাবে অনুভব করবে! মা যে সর্বদা সন্তান অন্তই প্রাণ। সন্তানকে না জানলে, মাতাকে জানা যে অসম্ভব। এমন অকুতোভয় মানসিকতা, প্রচণ্ড পরিশ্রম, এবং সুতীব্র একাগ্রতা ও গতি সম্পন্ন মেধা, ক্রমশ সুরকে শ্রেষ্ঠ করে তুলতে শুরু করে দিলো। সকলে তাঁকে শ্রেষ্ঠ বলাও শুরু করে দিল। সেই শ্রেষ্ঠ মানা ও বলার তালিকাতে তাঁর মাতা, তাঁর ভ্রাতারাও সামিল রয়েছে। কিন্তু তাতেও তার কিছু এসে যায়না।

অতিরিক্ত ভাবে তাঁকে শ্রেষ্ঠ বলা হলে, প্রতিবাদ করে সে বলে, “সামনে আমি রয়েছি, তাই আমাকে শ্রেষ্ঠ মেনে নিচ্ছ তোমরা। একবার তোমরা তোমাদের সকলের জননীর দিকে তাকিয়ে দেখো। যখন আমরা কিচ্ছু নই, যখন আমাদের মধ্যে কনো কিছুর কনো সম্ভাবনা নেই, তখনও যিনি আমাদের উপর বিশ্বাস অর্পণ করে রাখেন, তিনি হলেন আমাদের মা, মাতা জগদ্ধাত্রী। যাকে আমরা কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু দেব না, শুধুই তাঁর থেকে নিজেদের বেদনার অন্তের দাবি করবো, তা জেনেও যিনি অনাবিল প্রেম করে, স্নেহ করে, মমতার বলে আমাদের সিঞ্চন করে চলেছেন, তিনি হলেন আমাদের মা।

তাঁর প্রেমকে তোমরা কি দেখতে পাও না! তাঁর স্নেহকে, তাঁর বিশ্বাসকে, তাঁর নিষ্ঠাকে, তাঁর দিবারাত্র পরিশ্রমকে তোমরা কি দেখতে পাওনা! … তোমরা তাঁর দেখানো মার্গদর্শনকে উপেক্ষা করবে জেনেও, তিনি প্রকৃতি, সময় বেশে নিরন্তর শিক্ষা প্রদান করেই চলেইছেন, সেটাকি তোমরা দেখতে পাওনা! … যদি দেখতে পাও তা, তাহলে আমাকে শ্রেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ কেন বলে চলেছ? কেন আমাকে বারংবার শ্রেষ্ঠ বলে বলে, যিনি প্রকৃত অর্থে শ্রেষ্ঠ, তাঁকে তিরস্কার করে চলেছ? কেন তাঁর শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করে, তাঁকে দিবারাত্র অপমান করে চলেছ? কেন?

তিনি দিবারাত্র তোমাদের জন্য পরিশ্রম করে চলেছেন, দিবারাত্র প্রকৃতি বেশে তোমাদেরকে মার্গ দেখিয়ে চলেছেন, সময় হয়ে প্রবাহিত হয়ে তোমাদেরকে লক্ষ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে মরিয়া তিনি, সেই সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করবে বলে, তাঁকে শ্রেষ্ঠ না বলে আমাকে শ্রেষ্ঠ বলে চলেছ?”

সময়ে সময়ে আরো বলতো সে। সে বলতো, “কাকে তোমরা ভক্তি বলো, আমি বুঝিনা বাপু! … দিবারাত্র নিজের সুখচিন্তা করে করে, কেঁদে কেঁদে, তাঁর দ্বারে পরে থেকে নিজের বেদনার অন্ত করার আবেদন করে, ফলফুলাদি চরানো কে তোমরা ভক্তি বলো? কি ভাবে তাকে ভক্তি বলো? সে তো আত্মসুখে নিমগ্ন থাকার এক অভিনব উপায়। আত্মসুখ সর্বস্বতাকে তোমরা ভক্তি বলো? … কে জানে বাপু? তোমাদের ব্যক্ত করা ব্যাখ্যাগুলি আমার কাছে কেমন যেন অবান্তর লাগে।

এই বিশ্বাস করা যে তোমাদের মনস্কামকে তিনি নিশ্চয় পুড়ন করবে, একে তোমরা বিশ্বাস বলো? যেই বিশ্বাসের মধ্যে রন্ধে রন্ধে অবিশ্বাস ধারণ করে রেখেছ যে, তোমাদের মনস্কাম পুড়ন না হলে, তিনি তোমাদের স্নেহ করেন না, সেই অবিশ্বাসপূর্ণ বিশ্বাসকে তোমরা কি ভাবে বিশ্বাস বলো? কই তিনি তো আমাদের এই ভাবে বিশ্বাস করেন না! তিনি তো এই বলেন না যে, তাঁর নামসঙ্কীর্তন করলে তবেই আমরা তাঁর সন্তান! তিনি তো বলেন সকলেই তাঁর সন্তান। বাধ্যও, অবাধ্যও। ভদ্রও, অভদ্রও।

আত্মসুখসর্বস্বতা ভক্তি বলো, অবিশ্বাসকে বিশ্বাস বলো, আর দিবারাত্র কামনা করাকে প্রেম বলো। তোমাদের ব্যাখ্যা সমূহ সঠিক নয়। স্বার্থপূর্তির আঁশটে দুর্গন্ধ রয়েছে তোমাদের ব্যাখ্যা সমূহের মধ্যে। তিনি প্রকৃতি হয়ে বলছেন, শাকসবজি, মাসমৎস্য দুইই হজম করার সামর্থ্য দিলাম তোদের, এই দুইয়ের থেকেই পুষ্টি নিয়ে জীবন অতিবাহিত করবি তোরা। তিনি বলছেন, গরু যখন ঘাস খায়, তখনই হাজার হাজার তৃণপ্রাণকে সে হত্যা করে, আর এটিই প্রকৃতির নিয়ম যে, কারুকে জীবিত থাকতে গেলে, কারুকে মরতে হবে। এটির মাধ্যমে প্রকৃতি এই বলতে থাকে সর্বক্ষণ যে, দেহ নশ্বর, তাই দেহের প্রতি নয়, দেহের অন্তরে বিরাজ করা চেতনার প্রতি দায়িত্ববাণ হও, কারণ এই চেতনাই তোমাদেরকে একদিন আমার সাথে সাখ্যাত করাবে। কই তোমরা সেই কথা শুনতে পাওনা।

নিজেদের আত্মের নিশ্চয় করা অপ্রাকৃতিক কর্মকলাপকেই সত্য মানার অহংকারকে তোমরা জ্ঞান বলো! স্পষ্ট ভাবে প্রকৃতির দ্বারা ব্যক্ত কথাকে উপেক্ষা করাকে তোমরা জ্ঞান বলো! আর এই দাবি করো যে এই জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তোমাদেরকে জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত করবেন তোমাদের জননী, মাতা জগদ্ধাত্রী!

একবার বিচার করেও দেখেছ কি তোমরা? তোমরা জীবন মৃত্যুর চক্রে পতিত, তার কারণ কি? তার কারণ তোমাদের আত্ম ভাব। তোমারও ভিন্ন অস্তিত্ব আছে, বা তা সম্ভব, এই ধারণার কারণেই তোমরা জীবনমৃত্যুর চক্রে পতিত। আর দিবারাত্র সেই আত্মভাবকেই তুষ্ট করে ফিরছো। নিজেকে প্রকৃতির কাছে, সময়ের কাছে সমর্পণ না করে, দিবারাত্র কেবল নিজেদের আত্মের সৃষ্টকরা ভেদভাবকেই স্বীকৃত দিয়ে যাচ্ছ। নশ্বর বস্তুদের ঈশ্বরের সম্মান দিচ্ছ। যার জন্ম আছে মৃত্যু আছে, তাকে ঈশ্বর বলে দিচ্ছ। আর এই ভাবে নিজেদের আত্মকে সর্বদা প্রকাশ করে রেখে, তাকেই ধারণ করে থাকছো। আর তার পরেও ধারণা রাখছো যে, মাতা জগদ্ধাত্রী তোমাদের জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত করবেন!  …

কি করে, এমন অবান্তর ধারণাও রাখতে পারো তোমরা! … হ্যাঁ মোক্ষদা একা তিনিই, কিন্তু সাথে সাথে মাও একাকী তিনিই। সন্তানের যাতে মন বসে রয়েছে, তার থেকে তাঁকে অপসারিত হতে সর্বদা প্রেরণা করবেন মাতা, যদি তা অহিতকর হয়, আর তিনি তা করেনও। দিবারাত্র প্রকৃতি ও সময় বেশে তিনি আমাদেরকে আত্মচিন্তা ত্যাগ করার প্রেরণা দিতেই থাকেন। কিন্তু যদি আমরা সেই আত্মচিন্তাতেই নিজেদের আনন্দ ধারনা করে রেখে দিয়ে, তাতেই মশগুল থাকি, এক মা কখনো জোর করে সন্তানকে সেখানে থেকে তুলে নিয়ে যাবেন!

এক মায়ের কাছে, তাঁর সন্তানের আনন্দই একমাত্র কাম্য হয়। যদি তোমাদের আনন্দই হয় নিজেদের নিয়ে নিজেরা উলমালা থাকাতে। যদি তোমাদের আনন্দই হয় নিজেদের আত্মকে সর্বেসর্বা মনে করাতে। যদি তোমাদের আনন্দের রেশই থাকে, আমার কি হবে, আমি কি পেলাম, আমার থেকে কি গেল, আমাকে কি দিতে হবে, কি করলে আমি জায়গা পাবো, কি না করলে আমাকে থাকতে দেওয়া হবে, অর্থাৎ সর্বক্ষণ আমি, আমি আর আমি, সর্বক্ষণ আত্ম আত্ম আর আত্ম, সর্বক্ষণ অহম অহম আর অহম, তাহলে সেই অহম থেকে মাতা তোমাদের টেনে নিয়ে চলে যাবেন!

মা তিনি। তোমরা যাতে আনন্দ পাও, তাতেই রাখবেন তিনি তোমাদেরকে। যদি সেই আনন্দলাভ একদিন তোমাকে বিনষ্ট করে দেয়, তাও তিনি তোমাকে তাতেই রাখবেন। তোমরা তো নিজেদের জ্ঞানী বলো। তারপরেও, অর্থাৎ এই সমস্ত কিছু জেনেও, আর এই জেনেও যে, এই আত্মত্যাগ না হলে, এই অহমত্যাগ না হলে, এই আমিত্ব ত্যাগ না হলে, কিছুতেই তোমাদের জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি হবেনা, কারণ এই জীবনমৃত্যুর চক্র তোমাদের এই আত্ম, এই আমিত্ব আর এই অহমের বেষ্টনই মাত্র, কি করে তোমরা কল্পনাও করো যে, তোমাদেরকে জন্মমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত করা হবে!”

এই ভাবে, সুর ক্রমশ সমস্ত প্রজাকে আত্মকেন্দ্রিক ভাব থেকে মুক্ত করতে থাকলে, করিমুণ্ডের ও করিন্দ্রদের অত্যন্ত বিপাকে পরতে হয়। যদি প্রজা আত্মকেন্দ্রিক না হয়, তাহলে তাঁরা লোভে পা দেবেন না। লোভে পা না দিলে, অলসতার সন্ধান করবেনা। অলসতার সন্ধান না করলে, বিলাসিতা, কামনাবাসনা ইত্যাদির প্রতি উদাসীন থাকবেন। এঁদের প্রতি উদাসীন থাকলে, বিনোদনের প্রতি প্রজা আকৃষ্ট না হয়ে, কলাকে জীবনজ্ঞান লাভের মাধ্যমরূপে দেখবে। আর এই সমস্ত কিছু হলে, সেই সমস্ত কিছু যা প্রজার উপর চাপিয়ে দিয়ে, যা প্রজার অলসতা লাভের ইচ্ছাকে উস্কানি দিয়ে, এক প্রজাকে অন্য প্রজার প্রতি ঈর্ষা করিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করিয়ে, সেই সমস্ত কিছুতে করস্থাপন করে, প্রজার থেকে যেই লুণ্ঠন প্রক্রিয়া চলতে থাকে, তা করা অসম্ভব হতে শুরু করলো।

আর এই সমস্ত কিছুর উপর যিনি পূর্ণভাবে দৃষ্টি রেখেছিলেন, তিনি হলেন বীর্য। সুরের অসম্ভব মেধা ও পবিত্রতা, ছন্দের পূর্ণ নিষ্ঠা এবং প্রজাপ্রেম, তথা তালের ভ্রাতাদের প্রতি ও মাতার প্রতি প্রেম ও প্রবল বল তাঁকে একদিকে খুশীও করতে থাকলো যে, এবার মালদরাজ্যের নৃপতি, নিষ্ঠাবানকে পরাজয় করা সহজেই সম্ভব হবে, তেমন একদিকে চিন্তিতও হতে থাকলেন যে, এই ভাব, এই নিষ্ঠা, এই প্রেরণা যদি সর্বদিশাতে প্রসারিত হয়, তবে সম্পূর্ণ ভঙ্গের একছত্র অধিপতি রূপে ছন্দকে বেছে নেবে মানুষ, তা তো কেবলই সময়ের অপেক্ষা। এমন বিচার করেই, সে এবার চন্দননগরে পদার্পণের সময় হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, রওনা দিলেন, তাঁর ভগিনীদের শ্বশুরালয়ে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28