জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

এই সাত বৎসরে, চিত্তাও জেনে গেছেন যে পদ্মচিত্তের বীর্যগুণ নেই, আর হুতা, মিতা তথা স্ফীতাও জেনে গেছেন যে, করিমুণ্ডের বীর্যগুণ নেই। চিত্তা সেই বিষয়ে চিন্তিত নন, কারণ তাঁর কাছে পদ্মচিত্ত তাঁর প্রাণপ্রিয় সখা, আর তাই তাঁর সান্নিধ্যই যথেষ্ট চিত্তার কাছে আনন্দে দিবসযাপনের জন্য। কিন্তু হুতা, মিতা, স্ফীতা অত্যন্ত ক্লিষ্ট ও বিরক্ত হয়ে উঠলেন, তাঁদের স্বামীর এই সত্য জেনে।

তাই তাঁরা সেই কথা জানালেন তাঁদের শ্বশুরমশাই অর্থাৎ চন্দনকে। চন্দন সেই কথা জেনে অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে গেলে, তাঁর ভরসার স্থান, কন্যাসমা পুত্রবধূ, চিত্তার কাছে গিয়ে খেদোক্তি করলে, চিত্তা তাঁকে সেই সমস্ত কথা জানান, যা তিনি তাঁর স্বামীর থেকে জেনেছেন, আর তাঁর স্বামী মাতা জগদ্ধাত্রীর থেকে জেনেছেন। সেই কথা শুনে, চন্দন আরো অধিক ব্যথিত হয়ে উঠলেন।

প্রথমত এই কারণে তিনি ব্যথিত ও চিন্তিত হয়ে উঠলেন যে, তাঁর দুই পুত্রেরই বীর্যগুণ নেই, অর্থাৎ তাঁর বংশরক্ষা এক প্রশ্নচিহ্নের মধ্যে স্থিত। আর দ্বিতীয়ত এই কারণে তিনি ব্যথিত কারণ, তাঁর নিজের ভুলের কারণে, তাঁর রাজবংশ আজ অবলুপ্তির পথে স্থিত, আর তার থেকেও বড় কথা, তাঁর সমস্ত প্রজা আজ অনাথ হবার মুখে পতিত। ব্যথিত তিনি রাজ্যের তিজোরির চিন্তা করেও, কারণ ৭ বছরের খরা আর করিমুণ্ডের বিবাহে বিপুল খরচের কারণে আজ রাজভাঁড়ার শূন্যপ্রায়।

সমস্ত কিছু মিলিয়ে, তিনি অতিশয় ভাবান্বিত হয়ে গিয়ে জ্বরাগ্রস্ত হতে থাকলে, শ্বশুরের শরীরস্বাস্থ নিয়ে চিন্তিত দেবী চিত্তা মহারাজ চন্দনকে বললেন, “বাবা, আপনি একবার মাতা জগদ্ধাত্রীর কাছে গিয়ে এই বিষয়ে আলাপ কেন করছেন না! … তিনি অবশ্যই কনো সমাধান বাতলে দেবেন আপনার সমস্ত সমস্যার। তিনি আমাদের কুলদেবী, তিনি আমাদের আরাধ্যা, আর তাঁর প্রতি নিষ্ঠা আমাদের সর্বদাই অক্ষুণ্ণ। তাই একবার তাঁর কাছে গিয়ে এই বিষয়ে আলাপ করে নিচ্ছেন না কেন”।

দেবী চিত্তার কথাতে সম্মত হলেও, চন্দনের পক্ষে আর জগদ্ধাত্রীতটে যাওয়া হলো না, কারণ সেই রাত্রেই হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন চন্দন, এবং শয্যাশায়ী হলেন। মাত্র সাত দিনের মাথায়, তিনি দেহত্যাগ করলেন, সমস্ত দুশ্চিন্তা ধারণ করেই। এটিই তাঁর কর্মফল ছিল, তাই তিনি তাঁর সমস্যার সমাধান সম্ভব না সম্ভব নয়, তা না জেনেই, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে দেহত্যাগ করলেন।

পিতার মৃত্যুতে পদ্মচিত্ত মনমরা হয়ে যাবেন, সেটিই স্বাভাবিক, কিন্তু তাঁর মাথায় রয়েছে খরার কবল থেকে প্রজাকে কি ভাবে বাঁচানো যায়, সেই চিন্তা, আর তার থেকেও বড় চিন্তা, রাজ্যের ভাঁড়ারের এই অবস্থায় জগদ্ধাত্রী আরাধনা কি করে সম্ভব হবে, সেই নিয়ে। পুত্রীসমান হবার কারণে, দেবী চিত্তাও শ্বশুরের মৃত্যুতে শোকাহত, কিন্তু আরো বড় কথা এই যে, করিমুণ্ড এই প্রথম শোকাহত হলেন। পিতার মৃত্যু তাঁকে যেন সামান্য দায়িত্বশীল করে তুলল।

কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ্যে, দেবী হুতা, মিতা ও স্ফীতা যেন উগ্র হয়ে উঠলেন। স্বামীর থেকে বীর্যলাভ করেন না, তাই বিরক্ত তাঁরা। সেই দুর্ভাগ্যের প্রতিকার তাঁরা তাঁদের শ্বশুর, মহারাজ চন্দনের থেকে চেয়েছিলেন। এবার কার থেকে তাঁরা এর প্রতিকার চাইবেন! … তবে কি, পদ্মচিত্তের কাছে এঁর প্রতিকার চাইবেন তাঁরা! … মহারাজ চন্দনের অভাবে, তিনিই তো চন্দনের নগরের অধিপতি। কিন্তু তিনি যে সর্বাম্বা ভগিনী চিত্তার স্বামী। তাঁর সাথে সন্ধি করতে যাওয়া কি সঠিক হবে!

এই সমস্ত দ্বন্ধের মধ্যেই হুতা, মিতা ও স্ফীতা পতিত থাকলেও, চিত্তার চিন্তা কি ভাবে জগদ্ধাত্রী আরাধনা সম্ভব করা যেতে পারে, সেই নিয়ে। মাতা সর্বাম্বার কাছে চাইলেই, তিনি সমস্ত কিছু ভরিয়ে দেবেন, কিন্তু তাতে তাঁর স্বামী, শ্বশুর ও কুলদেবীর মান হানি হবে। তাই দেবী চিত্তা অতিশয় ভাবান্বিত হয়ে, অবশেষে মহারাজ মানসের কাছে উপস্থিত হয়ে, নিজের বিবাহের চিহ্নটুকু সুরক্ষিত করে, বিবাহের ও বাল্যকালের সমস্ত গহনা বিক্রয় করে ধান, জাব ও ধন নিয়ে এলেন।

ধান প্রদান করলেন প্রজাকে, জাব প্রদান করলেন গোপালকদের, আর ধন দিয়ে জগদ্ধাত্রী আরাধনা শুরু করলেন। দেবী চিত্তাকে এইরূপ গহনাবিহীন দেখে, বারংবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিলেন পদ্মচিত্ত, কিন্তু সাহস করে কিছু প্রশ্ন করতে পারেন নি। কিন্তু যখন জগদ্ধাত্রী আরাধনার জন্য ধন প্রদান করতে গেলেন তিনি তাঁর স্বামীর কাছে, তখন পদ্মচিত্ত আর প্রশ্ন না করে থাকতে পারলেন না।

তিনি প্রশ্ন করলেন, “দেবী, রাজ্যের ভাঁড়ার শূন্য, রাজ্য ধান ও জাব শূন্য। তার পরেও আপনি আমাকে জগদ্ধাত্রী আরাধনার ধন প্রদান করছেন, প্রজাকে ধান প্রদান করেছেন, আর গোপালকদের জাব প্রদান করেছেন, আর আপনার অঙ্গ গহনাশূন্য। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে সম্বন্ধ কি দেবী!”

দেবী চিত্তা মাথা নত করে বললেন, “নাথ, আপনার থেকে সম্মতি না নিয়েই আমি একটি কাজ করেছি। জানি আপনার থেকে সম্মতি চাইলে, আপনি কিছুতেই সহমত হতেন না। কিন্তু আপনি রাজ্যের মহারাজ, আর আমি তাদের মহারানী। রাজারাণীর নিজস্ব জীবন বলে কিছু থাকতে পারেনা, কারণ তাঁরা সমস্ত রাজ্যের মাতাপিতা। তাই মাতা হয়ে, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে, আমি নিজের সমস্ত গহনা বিক্রয় করে, মহারাজ মানসের থেকে ধান, জাব ও ধন নিয়ে এসেছি। নাথ, এ আমাদের অগ্নিপরীক্ষার সময়। তাই সেই পরীক্ষা থেকে পিছুপা হতে পারিনি”।

পদ্মচিত্ত কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে থেকে বললেন, “কিন্তু তুমি চাইলে তো মহারাজ মানসের থেকে ঋণ করেও, এই সমস্ত কিছু আনতে পারতে। পরে আমরা তা পরিশোধ করে দিতাম! তিনি তো তোমার মাতুল, আপনজন। তাহলে …!”

দেবী চিত্তা মাথানত করেই বললেন, “নাথ, খরার অবস্থা এখনো কাটেনি। এমন অবস্থায় সেই ঋণ কবে শোধ করতে পারবো, তার কনো ইয়ত্তা করাই সম্ভব নয়। এমন অবস্থায় ঋণ গ্রহণ করা, আর সঠিক সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারার কলঙ্ক, এই চন্দননগর রাজ্যের উপর বর্তাতো, আপনার উপর বর্তাতো, আর আমাদের কুলদেবী মাতা জগদ্ধাত্রীর উপর বর্তাতো। তাঁর পুত্রী হয়ে, আপনার স্ত্রী হয়ে, আর এই রাজ্যের মাতা হয়ে, তা কি করে করতে পারি আমি নাথ!”

মহারাজ পদ্মচিত্ত মিষ্ট হাস্যে বললেন, “ধন্য এই রাজ্য যে, তা তোমাকে তাঁদের মাতা করে পেয়েছে। ধন্য এই হতভাগ্য পদ্মচিত্ত যে তোমাকে তাঁর ভার্যা করে লাভ করেছে। ধন্য স্বয়ং মাতা জগদ্ধাত্রীও যে তিনি তোমাকে তাঁর কন্যা করে পেয়েছেন। … দেবী আজ আমি সত্যই অত্যন্ত গর্বিত তোমাকে নিয়ে। … তোমার দেয় ধন দ্বারা আমি যথারম্বরে মাতা জগদ্ধাত্রীর আরাধনা অনুষ্ঠিত করবো। তবে তোমার দেয় অর্ধেক ধনই আমি মাতার আরাধনাতে ব্যবহার করবো দেবী। যদি, এই বৎসর খরা কেটেও যায়, প্রজা কর প্রদানের অবস্থায় থাকবেন না। তাই পরবর্তী বৎসরে মাতার আরাধনার অর্থ আমি সঞ্চিত করে রাখতে চাই। এতে মাতার আরাধনাও অব্যাহত থাকবে, আর প্রজার উপরও করের বোঝা চাপবেনা”।

দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “দেখলেন তো নাথ, প্রজার জনক আপনি স্বয়ং। আপনার সঙ্গ লাভ করেই, তো আমি প্রজার মাতা হয়ে ওঠার প্রেরণা পেয়েছি। … নাথ, আপনিই আমার গুরু। তাই যতই শিষ্যাকে কৃতিত্ব প্রদান করুন, কৃতিত্ব আপনারই সমস্ত কিছুতে। আপনার প্রেরণা লাভ করেই, আজ আমি এত বড় একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছি। … যাই হোক, এবার আপনি মাতার আরাধনার চিন্তা করুন। … এই আয়োজন অত্যন্ত আবশ্যক। হুতা, মিতা ও স্ফীতা যেই পরিমাণে আপনাদের দুই ভ্রাতার নপংসুকতা প্রচারের জন্য হাঁসফাঁস করছে, তা একমাত্র এই আড়ম্বরপূর্ণ মাতার আরাধনার দ্বারাই খণ্ডন করা সম্ভব”।

মহারাজ পদ্মচিত্ত ম্লানহাস্য হেসে বললেন, “কিন্তু দেবী, একদিন না একদিন তো প্রজারা জানবেনই সেই সত্য, তাই না!”

দেবী চিত্তা মাথা আন্দোলিত করে বললেন, “নাথ, প্রজা জানবেন, আপনারা দুই ভ্রাতা বীর্যগুণ ধরেন না, তাতে কনো অসুবিধা নেই। কিন্তু আমি হুতা, মিতা, স্ফীতাকে চিনি দেব। তাঁরা বীর্যগুণ লাভ না করে, অতিশয় কাতর, কারণ তাঁরা অত্যন্ত অধিক পরিমাণে কামাতুর। এই কাতরতা তাঁদেরকে শীঘ্রই তাই করাবে, যা এক রাজঘরানার স্ত্রীর থেকে অত্যন্ত অরুচিকর এবং অশোভনীয়। ভাবতে পারছেন নাথ, এই উচ্চ বংশের সাথে সাখ্যাত মাতা জগদ্ধাত্রীর নাম জরিয়ে আছে।

তাই প্রজা এই পরিবারের প্রতিটি স্ত্রীকে মাতা জ্ঞান করে। সেই স্ত্রীরা যদি পরপুরুষের সাথে কামসম্বন্ধে লিপ্ত হন, তাহলে তা মাতা জগদ্ধাত্রীর সম্মানের কি অবস্থা করবে!” মাথা আনদলিত করে, “না নাথ, এই আনন্দ উৎসব অত্যন্ত আবশ্যক ছিল। না হলে, হুতা, মিতা, স্ফীতার পরপুরুষপ্রতি আবিষ্ট হওয়াকে কনো ভাবেই রোধ করা যেত না”।

চিন্তিত ভাবে পদ্মচিত্ত বললেন, “কিন্তু, জগদ্ধাত্রী আরাধনা তো আর সমগ্র বৎসর চলবে না। তারপর তো তাঁরা সেই কর্মে লিপ্ত হবেনই, যেই কর্মে তাঁরা আজ লিপ্ত হতে চাইছেন!”

দেবী চিত্তা ব্যকুল হয়ে বললেন, “নাথ, এত ত্যাগ করে মাতার আরাধনা করছি আমরা। মাতা কি একটি বরদান দেবেন না, তার জন্য! … আমি তাঁর কাছে প্রার্থনা করবো, তিনি যেন একটি বরদান দেন আমাকে”।

পদ্মচিত্ত ব্যকুল হয়ে বললেন, “আর সেই বরদান রূপে তুমি কি চাইবে দেবী?”

দেবী চিত্তা বললেন, “হুতা, মিতা ও স্ফীতা যেন মাতা হতে পারে, এই বরদান চাইবো। নাহলে যে, তাঁদের কামুকতা স্বয়ং মাতার নামেই লাঞ্ছন ছড়াবে। … দেবেন না মা, এই বরদান!”

পদ্মচিত্ত স্ত্রীকে বক্ষে স্থাপন করে আলিঙ্গন করে হাস্যবেশে বললেন, “যার দাবি এমন নিঃস্বার্থ, তাঁর দাবি কি করে মা না মেনে থাকতে পারেন! … নিশ্চয়ই তিনি তোমার কথা শুনবেন। তুমি দেখে নিও”।

অতিধুমধাম করে মাতা জগদ্ধাত্রীর আরাধনা করলেন পদ্মচিত্ত সেই হেমন্তের মধ্যগগনে। আর সেই সম্পূর্ণ চারিদিবসের আরাধনার কালে, দেবী চিত্তা রইলেন পূর্ণ উপবাসে। দেবী চিত্তার শরীরস্বাস্থ নিয়ে সদাই উদ্বিগ্ন থাকলেন পদ্মচিত্ত, আর বাকি সকলে উৎসবের আনন্দে মেতে উঠে খরা, রাজা চন্দনের মৃত্যু, সন্তানলাভ না হবার বেদনা, সমস্ত কিছু ভুলে থাকলেন।

নবমী তিথির রাত্রে, যখন সকলে নিদ্রা গেছেন, আর একাকী উপবাসী দেবী চিত্তা মাতা জগদ্ধাত্রীর মূর্তির সম্মুখে একটি থামে মাথা ও শরীর এলিয়ে, অশ্রুপাত করছেন, তখন দেবী জগদ্ধাত্রী নিজের বিগ্রহমূর্তি থেকে নির্গত হয়ে, আনমনা দেবী চিত্তার সম্মুখে এসে উপস্থাপন করলেন। দেবী চিত্তার সেই দিকে হুঁশ নেই। তিনি কেবল আপনমনে বলে চলেছেন, “মা, তোমার মানকে রক্ষা করতে কি পারবো না আমি!”

দেবী জগদ্ধাত্রী এবার চিত্তার মস্তক ও পৃষ্ঠে স্নেহহস্ত রেখে বললেন, “চিত্তা!”

দেবী চিত্তা সেই কণ্ঠস্বরে, সেই স্পর্শে যেন নবজীবন ফিরে পেলেন। আনন্দ চিত্তে তিনি বলে উঠলেন, “তুমি এসেছ মা! … মা, দেখো না …!”

দেবী জগদ্ধাত্রী মিষ্ট হেসে বললেন, “সমস্ত কিছু জানি আমি পুত্রী। কিন্তু সেই সমস্ত কিছুর জন্য আমি তোর কাছে আসিনি মা। … আমি তো তোকে আমার বক্ষমাঝে স্থাপন করে আদর করতে এসেছি। … দিবারাত্র শুধু তুই আমার মানসম্মান নিয়েই ভেবে গেলি! … একটিবারের জন্যও তোর এটা মনে এলো না যে, তুই স্বয়ং নিঃসন্তান!”

দেবী চিত্তা মাতা জগদ্ধাত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি নিঃসন্তান কি করে মা! … এত এত প্রজা রয়েছে আমার! তাঁরা কি আমার সন্তান নয়!”

মাতা জগদ্ধাত্রী হাস্যপ্রদান করে বললেন, “পুত্রী, আমি তোকে একটি কানে কানে মন্ত্র দিচ্ছি। সেই মন্ত্র উচ্চারণ করার কালে, তোর মানসিকতা যেমন থাকবে, ঠিক তেমন সন্তান প্রদান করবো আমি তোকে”।

দেবী চিত্তা ব্যকুল হয়ে বললেন, “আর এই মন্ত্র কি শুধু আমারই জন্য মা! … হুতা, মিতা স্ফীতা কি সেই বরদানি মন্ত্র ধারণ করতে পারবেনা! … যদি আমি তাঁদেরকে সেই মন্ত্র প্রদান করি, তাহলেও কি তাঁরা মা হতে পারবেনা!”

মাতা জগদ্ধাত্রী হেসে বললেন, “যে স্বার্থপর নয়, তাকে যতই স্বার্থসুখ প্রদান করো, সে নিঃস্বার্থপরই থাকে। … পারবে রে পাগল মেয়ে। তবে, আমার কথা শোন। আমাকে স্নেহ করিস তো! আমার সম্মানের চিন্তা করিস তো! … তাই আমার সম্মান অর্থে, তোকে দেওয়া বরদানের ফল আগে তুই গ্রহণ করিস, তারপর কারুকে প্রদান করিস। নাহলে তো তা আমার দেওয়া বরদনাএর অপমান হবে, তাই না! আসলে বরদান তো আমি তোকে দিলাম, তাদের তো নয়। তাই আগে তুই ফল গ্রহণ করে, তারপর তাদেরকে দিবি তা”।

এতো বলে, দেবী জগদ্ধাত্রী নিজের বিগ্রহে প্রত্যাবর্তন করতে গেলে, দেবী চিত্তা মাতার আঁচল ধরে রইলেন। তাই দেবী জগদ্ধাত্রী তাঁর দিকে ফিরে তাকিয়ে মিষ্ট হেসে বললেন, “কিছু বলবি আর!”

দেবী চিত্তা আবদারের সুরে বললেন, “মা, গর্ভে তোমার দেয় সন্তান থাকলে, তোমাকে অনুভব করতে পারবো!”

মাতা জগদ্ধাত্রী নেত্রী অশ্রু ধরে, দেবী চিত্তার কাছে পুনরায় উপবেশন করে বললেন, “মা মানলে, সর্বক্ষণ পাবি, গর্ভবতী হলেও পাবি, না হলেও পাবি। আর কেবল কুলদেবী বলে দূরে সরিয়ে রাখলে, কখনোই পাবিনা। … সিদ্ধান্ত তোর চিত্তা”।

চিত্তা এবার মাতার আঁচল ছেড়ে দিলেন, নিজের নেত্র বন্ধ করে, নিজের রোমে রোমে মাতা জগদ্ধাত্রীকে অনুভব করলেন, এবং মাতার আদেশ নিয়ে চিন্তা করলেন। বিচার করতে থাকলেন, সত্যই তিনি মা। সত্যই তিনি অন্তরের শুদ্ধতাকেই দেখেন। নাহলে তিনি তাঁকে এই বরদানে ভূষিত করতেন! বরদান তো তিনি হুতা, মিতা, স্ফীতার জন্য চাইছিলেন। তারপরেও মাতা তাঁকে এই বরদান প্রদান করলেন! … এমন বিচার করে মাতার দেয় মন্ত্র উচ্চারণ করলে, তিনি অনুভব করলেন নিজের অন্তরে ভ্রূণ ধারণের। আনন্দে বিভোর হয়ে গেলেন, ভ্রূণ ধারণ করে।

কিন্তু পরমুহুরতে বিচার করলেন, “একি অন্যায় করে ফেললাম আমি! … আমার সন্তানের উপর যতটা আমার অধিকার আছে, ততটা অধিকার আমার স্বামীরও আছে। আমি তাঁকে একটিবারও জানালাম না পর্যন্ত, এবং বিবেকহীনের মত সন্তান ধারণ করে ফেললাম!”

এমন বিচার করে, তিনি দৌড়ে গেলেন পদ্মচিত্তের কাছে, আর হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “নাথ!”

চিত্তাকে এই ভাবে হাঁপাতে দেখে, ব্যকুল হয়ে উঠে পদ্মচিত্ত হয়ে বললেন, “কি হয়েছে দেবী! তোমাকে এমন উদ্বিগ্ন কেন লাগছে! তোমার শরীর ঠিক আছে! আজ চার দিবস হয়ে গেল, তুমি একটি অন্নের দানাও গ্রহণ করোনি। এসো আমি তোমাকে আহার করিয়ে দিই”।

দেবী চিত্তা ম্লান মুখে বললেন, “আমি একটি অপরাধ করে ফেলেছি নাথ। তাই সেই অপরাধকে সংশোধন করতে দৌড়ে এসেছি আপনার কাছে”।

পদ্মচিত্ত ব্যকুল হয়ে বললেন, “অপরাধ! না দেবী, তুমি অপরাধ করতেই পারো না। কিছু ভুলত্রুটি হতেই পারে। আমরা মানুষ। ভুল করা আমাদের অধিকার, আর ভুল থেকে শেখা আমাদের ধর্ম। … শান্ত হও তুমি। এখানে শান্ত হয়ে বসো প্রথমে”।

দেবী চিত্তা পালঙ্কে উপবেশন করে হাফ ছেড়ে বললেন, “নাথ, মাতা এসেছিলেন। বরদান প্রদান করেছেন। একটি মন্ত্র দিয়েছেন, আর বলেছেন যে, যেই মানসিকতা নিয়ে সেই মন্ত্র উচ্চারণ করা হবে, সেই মানসিকতার সন্তান জন্ম নেবে”।

পদ্মচিত্ত হাস্যবদনে বললেন, “এ তো ভারি ভালো সংবাদ। কিন্তু এতে ভুল বা অপরাধ কোথায় দেবী?”

দেবী চিত্তা মাথানত করে বললেন, “আমি এই বরদানি মন্ত্র প্রথম হুতা, মিতা, স্ফীতাকে দিতে চাইলে, মা বলেন, তাঁর সম্মানার্থে, এই মন্ত্র যেন আমিই প্রথম উচ্চারণ করে জ্যেষ্ঠ সন্তান আমি ধারণ করি। তাই আমি সেই মন্ত্র উচ্চারণ করে ফেলেছি। মন্ত্র উচ্চারণ করে ভ্রূণের অনুভূতি হতে, আমার বোধ জন্মায় যে, আপনাকে না জানিয়েই আমি সন্তান ধারণ করে ফেলে অপরাধ করে ফেলেছি!”

দেবী চিত্তার দুই স্কন্ধ ধারণ করে, আনন্দহাস্য প্রদান করে, পদ্মচিত্ত বললেন, “এর অর্থ আমাদের প্রথম সন্তান হতে চলেছে অত্যন্ত বিচারশীল, তাই তো তোমার মধ্যে বিচারের ভাব প্রত্যক্ষ হয়েছে। … তবে দেবী তুমি কনো অপরাধ করো নি। তুমি অপরাধ করতেই পারো না। আমি বিশ্বাস করি তোমাকে দেবী। … এবার একটি কাজ করো। হুতা, মিতা আর স্ফীতার কাছে যাও, আর তাদেরকে বলো, মাতা জগদ্ধাত্রী তোমাকে ও তাঁদেরকে নিঃসন্তান অবস্থা থেকে উন্নীত হবার একটি মার্গ বলেছেন। সেই মার্গ কেমন, কতটা কঠিন বা সহজ, তা তুমি প্রথমে নিজে পরখ করে নিয়ে, তাঁদেরকেও তা বলে দেবে। … তাই তাঁরা যেন উচাটন না হন। … যাও চিত্তা, তাঁদেরকে এই কথা বলে, তাঁদের অন্তরের অগ্নিকে শান্ত করে এসো”।

চিত্তা আনন্দের সাথে বললেন, “ঠিক আছে নাথ”। এই বলে ধরমরিয়ে উঠতে গেলে, পদ্মচিত্ত দেবীর স্কন্ধ ধরে পুনরায় আকর্ষণ করে, দেবী চিত্তাকে নিকটে এনে বললেন, “দেবী=, এখন থেকে আর তুমি একা নও। তোমার গর্ভে ভ্রূণ রয়েছে। তাই ধীরেসুস্থে চালচলন করো। … তাঁকে সুরক্ষিত রাখতে হবে তো!”

দেবী চিত্তা আনন্দিত নেত্রে, পদ্মচিত্তকে প্রাণভরে আলিঙ্গন করে বললেন, “নাথ, আপনাকে আমি আরো অনেকদিন নিকটে পেতে চাই। আরো অন্য অন্য ভাবে, বিচিত্র উপায়ে, আপনাকে কাছে পেতে চাই”।

দেবী চিত্তার এই কথাতে, এবং তাঁর লব্ধ বরদানের কথা স্মরণ করে, পদ্মচিত্তের মাতা জগদ্ধাত্রী তাঁর কাছে যেই আবদার করেছিলেন, তার স্মরণ করলেন আর মৃদু হেসে বললেন, “বেশ তো, তাই যদি তোমার প্রাণ চায়, তবে মা জগদ্ধাত্রী তোমার সেই চাওয়াও পূর্ণ করবেন। শুদ্ধ হৃদয়ে, নিস্বার্থপর ভাবে চাওয়া সমস্ত মাঙ্গ তিনি পুড়ন করেন। উপবাস করে অবস্থান করতে হয়না। তিনি তো কুলদেবী কম, বিশ্বেশ্বরী কম, মা অধিক। তাই না!”

এবার দেবী চিত্তা, হুতাদের সেইমত কথা বলতে গেলেন, যেমনটা পদ্মচিত্ত তাঁকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। দেবী চিত্তা তাঁদেরকে শত্রু মানেন কিনা, সেই বিষয়ে নিশ্চিত না হলেও, তাঁরা যে দেবী হুতাকে নিজেদের শত্রু মানেন, সেই বিষয়ে কনো সন্দেহ ছিলনা, হুতাদের। তাই শত্রু দ্বারে এসে দণ্ডায়মান হয়েছেন, তাই ঈষৎ সতর্ক হয়ে গেলেন তাঁরা। তাও দেবী মিতা, রাজ্যের মহারানী দ্বারে এসেছেন, এবং তাঁদের বড়জা দ্বারে এসেছেন বলে, সৌজন্যতা প্রদর্শন করে এগিয়ে গিয়ে, তাঁকে দ্বার দেশ দিয়ে প্রবেশ করালে, অন্তরে এসে দেবী চিত্তা, দেবী হুতা, মিতা ও স্ফীতাকে এক জ্যেষ্ঠ ভগিনীর আলিঙ্গন প্রদান করলেন।

সেই আলিঙ্গন বড়ই মধুর ছিল, সেই নিয়ে হুতা, মিতা ও স্ফীতারও সন্দেহ ছিলনা, কারণ সেই আলিঙ্গন তাঁদেরকে এক অনাবিল শান্তি ও সুখ প্রদান করে। অতঃপরে দেবী চিত্তা তাঁর ভগিনীদের উদ্দেশ্যে বললেন, “আমি জানি, হে করিপত্নীরা, স্বামীর থেকে সন্তান লাভ না করে, তোমরা অত্যন্ত ব্যথিত। কিন্তু বিশ্বাস করো আমার কথনকে, আমাদের কুলদেবী, আমাদের আরাধ্যা মাতা জগদ্ধাত্রী, আমাদের সকলকে মাতা হবার সুবর্ণ সুযোগ প্রদান করেছেন”।

হুতা সেই কথাতে ভ্রুকুঞ্চিত করলে, উপবেশন অবস্থা থেকে উন্নীত হয়ে, হুতার নিকটে গিয়ে, নিজের স্নেহ হস্ত, হুতার বস্ত্রমুক্ত পৃষ্ঠে অর্পণ করলে, এক অনাবিল আনন্দের স্রোত হুতার সমগ্র দেহে চাঞ্চল্য সঞ্চার করলে, সে নিজের উত্তেজনা ও অবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে উঠলো, অন্তত কিছু কালের জন্য। সেই বিশ্বাসকে প্রত্যক্ষ করে, দেবী চিত্তা স্নেহের সুরে বললেন, “হুতা, মাতা জগদ্ধাত্রী আমার সম্মুখে প্রত্যক্ষ হয়ে এসে একটি মন্ত্র প্রদান করেছেন, এবং বলেছেন সেই মন্ত্র উচ্চারণ করলে, আমাদের গর্ভে একটি করে সন্তান আসবে।

তাঁর নির্দেশ ও অনুরোধেই এই মন্ত্র প্রথম আমি উচ্চারণ করি এবং আমি তৎক্ষণাৎ ভ্রূণের প্রবেশ ও আবেশ অনুভব করি। তাই তোমাদের কাছে এসেছি, তোমাদের স্ত্রীদেহ গ্রহণ করাকে সার্থক করার উপায় সঙ্গে নিয়ে। আমার থেকে মন্ত্র ধারণ করো, এবং সন্তানের জননী হয়ে ওঠো, করিপত্নীরা”।

দেবী স্ফীতা প্রশ্ন করলেন, “আমরা কি অনন্ত সন্তানের জননী হতে পারবো এই বরদানের জোরে? নাকি যতসংখ্যক সন্তানের জননী হতে পারবো, তা সীমিত?”

চিত্তা হেসে বললেন, “স্ফীতা, না তো মাতা আমাকে সেই সংখ্যার ব্যাপারে কিছু ইঙ্গিত করেছেন, আর না আমি সেই বিষয়ে কনো প্রশ্ন করেছি তাঁকে। আর বোন, আমি যে অনুমান করার কর্মে পূর্ণ ভাবেই অজ্ঞ। তাই এই ক্ষেত্রে, আমার অনুমানকে ভরসা না করাই উচিত কর্ম হবে”।

দেবী মিতা এবার আগ্রহী হয়ে বললেন, “তবে দাও, সেই মন্ত্র দাও আমাদেরকে”।

দেবী চিত্তা মৃদু হেসে বললেন, “দরজা বন্ধ করো, আর দরজার নিকট থেকে দাসীদের সরে যেতে বলো। মাতা জগদ্ধাত্রীর থেকে অনুমতি নিয়েছিলাম যে, এই মন্ত্র যেন তোমাদের বলতে পারি। তাই তোমরা শ্রবণ করলে তো কনো প্রকারে বরদানের অপমান হবেনা। কিন্তু অন্য কনো মনুষ্য শুনলে, বরদানের সামর্থ্য অক্ষুণ্ণ থাকবে কিনা, মাতা সেই বিষয়ে কিছু বলেন নি আমাকে”।

হুতা বললেন, “এই কক্ষে তো মনুষ্য ছাড়াও অন্যজীব রয়েছে!”

দেবী চিত্তা মৃদু হেসে কথার সমর্থন করে বললেন, “মন্ত্র শ্রবণ করলেই বুঝে যাবে যে, কেবল মনুষ্যের জন্যই এই মন্ত্র। তাই অন্য কনো জীব তা শ্রবণ করেও কনো প্রকার ফল লাভ করবেনা”।

এরপর দেবী মিতা ও স্ফীতা, সমস্ত দাসীদের অপসারণ করিয়ে, কক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে, চিত্তার সম্মুখে উপবেশন করলে, চিত্তা তাঁদেরকে সেই মন্ত্র বলে ও তাঁদেরকে তা দায়িত্ব নিয়ে কণ্ঠস্থও করিয়ে দেয়, এবং অতঃপরে কক্ষ থেকে নির্গত হয়ে চলে যান।

মন্ত্র লাভ করে তিন ভগিনী যৎপরনাস্তি আনন্দিত হয়ে উঠলে, দেবী স্ফীতা বলে উঠলেন, “দিদিকে প্রণাম করে কৃতজ্ঞতা পর্যন্ত প্রদান করলাম না আমরা! … কি দরকার ছিল তাঁর আমাদের জন্য এমন করার! নিজের জন্যই তো সীমিত করে রাখতে পারতেন তিনি এই সম্পূর্ণ বরদান! … তিনি আমাদের যে এই দান করলেন, তাঁর জন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা তো ব্যক্ত করা উচিত ছিল, কি বলো তোমরা?”

হুতা ও মিতা, স্ফীতার এই কথাতে উগ্রহাস্য প্রদান করলে, হুতা বললেন, “কি জানিস তো স্ফীতা! শত্রু যদি প্রতিদ্বন্ধি হারিয়ে ফেলে, তাহলে বড়ই ব্যথিত হয়। ওর সন্তান হবে, আর আমাদের হবেনা, তাহলে যে ওর সন্তানরা কারুকে শত্রু করে পাবেই না। … নিজেকে দেখে তো বোঝ। আমরা কখনো নিজেদের স্বার্থ চিন্তা না করে কনো কাজ করেছি! তাহলে! সবার স্বভাবই আমাদের স্বভাব। আমরা যেমন, সকলেই তেমন। চিত্তাও তাই আমাদের মত স্বার্থপরই, আর স্বার্থ চিন্তা করেই যা করেছে, তা করেছে। … তাই প্রণাম করার, সুর করে দিদি বলে ডাকার কনো প্রয়োজন নেই”।

পুনরায় হুতা বললেন, “সবাই চিত্তাদের পক্ষে। দেখলে মাতা জগদ্ধাত্রীর কৃত্য! চিত্তাকে বলে প্রথম মন্ত্র উচ্চারণ ওকে দিয়ে করালেন, যাতে জ্যেষ্ঠ সন্তান ওর হয়, আর ভাবিকালের রাজা হয় সে। … আমিও আজই মন্ত্র জপ করবো। চিত্তা কামাতুর নয়, তাই ওর দেহের যৌনব্যবস্থা অতটা সাবলীল নয়, যতটা আমাদের। তাই আমিও একই দিনে মন্ত্র জপ করলে, নিশ্চিত ভাবে আমার সন্তানই জ্যেষ্ঠ সন্তান হবে। আমার সন্তানই রাজসিংহাসনে উপবেশন করবে, চিত্তার নয়”।

এই বলে হুতা চলে গেলেন মন্ত্র জপে, আর বেশ কিছুক্ষণের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে এসে আনন্দের সাথে বললেন, “মন্ত্র উচ্চারণ সঠিক করেছি আমি। ভ্রূণের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করেছি। সর্পের ন্যায় শীতল সেই উর্জ্জা আমার গর্ভে বেড়ে উঠছে এক্ষণে”।

হুতার দেখাদেখি, একে একে সকলে সেই মন্ত্র পর্যায়ক্রমে উচ্চারণ করে গর্ভবতী হলেন, তবে একাকজনের একাক মানসিক অবস্থা থাকে সেই মন্ত্র উচ্চারণের কালে। মিতা কখনো সকলের প্রতি দ্বেষ ভরে মন্ত্র উচ্চারণ করেন, তো কখনো গোপনে গোপনে অধিক সন্তানের মাতা হবার বাসনা ধারণ করে মন্ত্র উচ্চারণ করেন। আবার হুতা প্রথমত ঈর্ষাপ্রবণ হয়েই মন্ত্র উচ্চারণ করলেও, পরবর্তীতে রাজসিংহাসনের প্রতি অসম্ভব মোহধারণ করে, আবার কখনো অত্যন্ত কামাতুর হয়ে, আবার কখনো প্রচণ্ড ভাবে ক্রোধে মন্ত্র উচ্চারণ করলেন।

আর সন্দেহবাতিক স্ফীতা, কখনো সমস্ত কিছু দৃষ্টি রাখার মানসিকতা নিয়ে, তো কখনো দিদিদের অস্ফুট কণ্ঠস্বর শ্রবণের মানসিকতা নিয়ে, আবার কখনো তাঁর সন্তানকে নষ্ট করার জন্য আহারে কি মেশানো হয়েছে, তার স্বাদ গ্রহণ করার অছিলায় বা ঘ্রাণ নেবার অছিলায় মন্ত্র জপ করলেন, আর একে একে তাঁরা বিভিন্ন সন্তানের জননী হয়ে উঠতে শুরু করলেন।

তবে এই সমস্ত কিছুর মধ্যেও, জ্যেষ্ঠ সন্তানের মাতা হলেন দেবী চিত্তাই, কারণ করিমুণ্ডের জ্যেষ্ঠ সন্তান, করিন্দ্র চিত্তার জ্যেষ্ঠ সন্তান, চিত্তার জ্যেষ্ঠসন্তান, ছন্দচিতের থেকে ১০ দিবসের কনিষ্ঠ হয়। চিত্তা ও পদ্মচিত্তের জীবনকে ছন্দপ্রদানকারী ছন্দচিৎ হলেও, তাঁদেরকে তাল প্রদানকারী হলেন, তাঁদের দ্বিতীয় পুত্র, চিত্তাল, আর তাঁদের জীবনে এক নবসুর এনে দেয়, বিশেষ করে চিত্তার জীবনকে। তাই তাঁর নাম হয় সুরচিৎ।

চিত্তালের জন্মের আগে, করিমুণ্ডের আরো বেশ কিছু যে সন্তান জন্ম নেয়, তাঁদের মধ্যে ছিল মিতার থেকে জাত মিত্রারি, স্ফীতার থেকে জাত চাক্ষুষ এবং হুতার থেকে জাত করাভ। চিত্তাল ও সুরচিৎ-এর মধ্যে করিমুণ্ডের আরো ৭টি সন্তান জন্ম নেয়, যাদের মধ্যে মিতার থেকে জাত মিতেশ ও মিতান ছিলেন যমজ সন্তান এবং মিতাম্বর ছিলেন আরো একটি সন্তান, হুতার থেকে জাত করিসিজ ও করিঞ্জল তথা স্ফীতার থেকে জাত যমজ সন্তান, করিঘ্রাণ ও করিস্না।

সুরচিৎ চিত্তার কনিষ্ঠতম সন্তান, কিন্তু করিমুণ্ডের তারপরেও আরো ৯টি সন্তান হয়। তাদের মধ্যে হুতার থেকে জাত করিক্কাম ও করশ থাকে, মিতার থেকে জাত দুই জোরা যমজ সন্তান, রুদ্রকরি-করঙ্ক তথা গুপ্তকরি ও করিকুল থাকে, এবং স্ফীতার থেকে জাত এক জোরা যমজ সন্তান, করিধ্বজ ও ময়ঙ্করই থাকে তো এক পৃথকভাবে জাত সন্তান, শ্রুতকরি থাকে।

সব মিলিয়ে, হুতার হয় ৬ সন্তান, যারা বয়ঃক্রমে হলেন করিন্দ্র, করাভ, করিসিজ, করিঞ্জল, করিক্কাম ও করশ; মিতার থেকে জাত হয় ৮ সন্তান, যারা বয়ঃক্রমে হলেন, মিত্রারি, মিতেশ, মিতান, মিতাম্বর, রুদ্রকরি, করঙ্ক, গুপ্তকরি ও করিকুল; এবং স্ফীতার থেকে জাত হয় ৬ সন্তান, যারা বয়ঃক্রমে হলেন চাক্ষুষ, করিঘ্রাণ, করিস্না, শ্রুতকরি, করিধ্বজ ও মনকরি। আর এঁদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ হলেন করিন্দ্র, এবং কনিষ্ঠতম হলেন করশ।

তবে এই সমস্ত সন্তানের জন্মের মধ্যে, চন্দননগর এক বিশাল সম্পদ হারিয়ে ফেলে। সুরচিৎকে গর্ভে ধারণ করা অবস্থায়, চন্দননগর তাঁদের প্রাণপ্রিয় পিতা তথা মহারাজ পদ্মচিত্তকে হারিয়ে ফেলেন। মাতা জগদ্ধাত্রীর কথন অনুসারে, তিনি দেবী চিত্তারই গর্ভে জন্ম নেন, অর্থাৎ বলাই বাহুল্য যে সুরচিৎই হলেন, পদ্মচিত্তের পরবর্তী জন্ম।

তবে, পদ্মচিত্তকে হারিয়ে, যিনি বিমর্ষ হয়ে পরেন, তিনি হলেন দেবী চিত্তা। সিংহাসনে আঢ়ুর হন করিমুণ্ড। তবে তিনিও পিতাতুল্য জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে হারিয়ে ব্যথিত কম নন। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে যারা আনন্দিত হয়েছিলেন, তাঁরা হলেন হুতা, মিতা ও স্ফীতা, কারণ তাঁদের স্বপ্ন পুড়ন হয়, অর্থাৎ তাঁদের পতি সিংহাসনে আঢ়ুর হন। সমস্ত রাজপুত্রদের মধ্যে ছন্দচিৎ জ্যেষ্ঠ, তাই ভাবিকালে সে-ই সিংহাসনে স্থিত হবে, এমন সন্দেহ করে, তাঁরা দেবী চিত্তাকে তাঁর সন্তানসহ শূন্যপুরে ফিরিয়ে দিতে ব্যকুল ছিলেন, কিন্তু মহারাজ করিমুণ্ড সেই সিদ্ধান্তে মতদান করতে পারেন নি।

মহারাজের কর্তব্য, প্রজার প্রিয়তা, এবং জ্যেষ্ঠভ্রাতার প্রতি সম্মান, এই তিন তাঁকে প্রতিরোধ করে, দেবী চিত্তাকে বিতাড়িত করতে। কিন্তু এরফলে, তাঁদের পুত্ররা রাজসিংহাসনের থেকে বিচ্যুত হতে পারে, তেমন সন্দেহ করে, হুতা, মিতা ও স্ফীতা, তাঁদের কুটিল ভ্রাতা, বীর্যের স্মরনাপন্ন হন।

বীর্য সমস্ত কথন শুনে বিরূপ মন্তব্য করে বললেন, “আমার প্রিয় ভগিনীরা, দেবী চিত্তা ও তাঁর পুত্রদের বিতাড়িত তো করতে হবে, তবে সেই বিতারনের সঠিক সময় এখনো আসে নি। এখনই যদি তাঁদের বিতাড়িত করা হয়, তবে রাজ্যের প্রজারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে দেবে। কিছুদিন করিমুণ্ডকে রাজার বেশে থাকতে দাও, প্রজার মন তাঁকেই রাজা বলে মেনে নিক। তখন রাজপুত্রদের বিতাড়িত করে, তোমার পুত্রদের সিংহাসনপ্রাপ্তিকে নিশ্চয় করে নেওয়া যাবে। … আমি শীঘ্রই যাবো তোমাদের রাজ্যে। তারপূর্বে খানিক রাজপুত্রদের স্বভাবকে একটু নিরীক্ষণ করে নিতে চাই”।

দেবী মিতা বললেন, “এই নিরীক্ষণের কারণ কি? যদি তাঁদেরকে আমরা বিতাড়িতই করে দিই, তাহলে তাঁদের চরিত্র জেনেই বা কি হবে?”

বীর্য ক্রুর হাস্য হেসে বললেন, “ভগিনী আমার! রাজনীতি তুমি একদমই বোঝোনা। প্রতিপক্ষ কে, ভুলে যেও না। স্বয়ং সর্বাম্বা আমাদের প্রতিপক্ষ। আমাদের প্রয়োজন এক বিশাল সাম্রাজ্যের। প্রয়োজন জনপ্রিয়তার। তবেই আমরা সর্বাম্বাকে কোণঠাসা করে দিতে পারবো। … তাই কেবল চন্দননগরের সিংহাসন দখল করার কথা ভাবলে কি আর চলবে! … না ভগিনী, আমাদের আরো বিস্তীর্ণ রাজছেত্র আবশ্যক। আর তা পেতে গেলে, রাজ্যের আরো বিস্তার প্রয়োজন।

উত্তরের কাতাছেত্রতে রাজা ভৃগুসেন আমার বন্ধু। তাঁর বরদান আছে ১৬ কন্যা লাভের। কিন্তু তাঁর পছন্দ মেদিনীছেত্রের ৪ ঘৃতকন্যাকে। আর মেদিনীছেত্র মাতা সর্বাম্বা দ্বারা সুরক্ষিত। শর্তানুসারে, যদি মাতার প্রতি নিষ্ঠাবান কনো সেনা হয়, তবেই মেদিনীরাজাকে পরাস্ত করা সম্ভব। মালদরাজ্যের রাজা নিষ্ঠাবান তাই তাঁর সখা, আর রক্ষকও। কারণ ইনার কাছে বরদান আছে যে, যদি তাঁর থেকেও অধিক মাতৃপ্রেমী কেউ না উপস্থিত হয় যুদ্ধে, তাহলে স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা তাঁর হয়ে যুদ্ধ করবে। আর এই মালদ রাজ্যের রাজা, নিষ্ঠাবানের ভগিনী, দেবী শৃঙ্খলাকে আমি বিবাহ করতে চাই, কারণ ইনারও ৪ কন্যা সন্তানের বরদান আছে মাতার।

বুঝতে পারছো ভগিনী! একবার যদি মালদরাজ্যকে পরাস্ত করা যেতে পারে, তাহলে দেবী শৃঙ্খলাকে আমি বিবাহ করে নিয়ে মালদরাজ্যকে অধিকার করে নিতে পারবো। মালদ রাজ্য অধিকার করে নিলে, আর মেদিনীরাজ্য সাহায্য লাভ করবেনা, তখন তাঁর বিরুদ্ধে এক সেই মাতার প্রতি নিষ্ঠাবান সেনা, যা মালদরাজ্যকে অধিকার করে দেবে আমাকে, তারাই মেদিনীরাজ্যকে আমাদের অধীনে এনে দেবে, আর ঘৃতকুমারীদের আমার সখা, ভৃগুসেনের পত্নী করে তুলে, তিনটি রাজ্যের অধিকারী হয়ে যাবো আমরা, কাতারাজ্য, মালদরাজ্য তথা মেদিনীরাজ্য।

এই তিনরাজ্যে থাকবে কেবলই ২০ কন্যা, যাদের বিবাহ আমি তোমাদের ২০ পুত্রের সাথে দেব। অর্থাৎ তোমার পুত্ররা হয়ে উঠবে এই সম্পূর্ণ ভঙ্গের অধিপতি। আর এই চন্দননগরকে অধিকার করা তো কনো ব্যাপারই না। এর মূলধন হলো মাতা জগদ্ধাত্রীর আরাধনা। একবার সেই আরাধনা বন্ধ করে দিতে পারলে, এই রাজ্য স্বতঃই দখল হয়ে যাবে তোমার পুত্রদের দ্বারা। তাই ভগিনী, বিস্তৃত রাজ্যের দর্শন করো ভগিনীরা, কেবল চন্দননগরের সিংহাসনের দিকে তাকিয়ে বসে থেকো না”।

দেবী হুতা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু ভ্রাতা, সেই নিষ্ঠাবান মাতৃসেবক সেনাকে পাবে কোথায় তুমি!”

কুটিল বীর্য কুটিল হাস্য হেসে বললেন, “দেবী চিত্তা ও প্রয়াত পদ্মচিত্তের মত নিষ্ঠাবান দম্পতির সন্তানরা কেমন হবে, তার অনুমান করতেই পারছি। কেবলই সময়ের অপেক্ষা, তাঁদেরকে নিরীক্ষণ করে বেছে নেওয়া। তারপর আমি স্বয়ং এসে, তাদেরকে ও তোমার পুত্রদেরকে অস্ত্রশিক্ষায় পারদর্শী করে তুলে, নিষ্ঠাবানকে পরাস্ত করার সেনা রূপে তাঁদেরকে স্থাপন করে নেব। তাই করিমুণ্ড যা করেছে, তাকে সাধুবাদ জানাও, কারণ চিত্তাপুত্রদের আমার খুব দরকার”।

স্ফীতা প্রশ্ন করলেন, “আর যদি মহারাজ করিমুণ্ড আপনার সঙ্গ না দিতে চান!”

কুটিলতার পূজারি, বীর্য কুৎসিত একটি হাস্য প্রদান করে বললেন, “আমি তাঁর শ্যালক হই। শ্যালকের বিবাহ হোক, তিনি চাইবেন না, এও কি হতে পারে!”

হুতা বললেন, “তুমি কি করে নিশ্চিত হলে যে চিত্তার ছেলেরাই সেই সেনা হবে!”

বীর্য বক্র হেসে বললেন, “অনুমান মাত্র, তোমার পুত্ররাও হতে পারে। সকলেরই তো জন্ম মাতা জগদ্ধাত্রীর আশীর্বাদী মন্ত্রতেই হয়েছে। যে কেউ হতে পারে, এই ২৩ জনের মধ্যে। তাই সকলের উপরই নজর রাখবো”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28