৮.২। বিবাহভিযান পর্ব
বছর বছর জগদ্ধাত্রী আরাধনা হতে থাকলো, অনুষ্ঠিত হতে থাকলো বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। আর এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই পদ্মচিত্ত ও করিমুণ্ড যুবক হয়ে উঠলো। চারিত্রিক ভাবে দুই ভ্রাতা যেন দুই বিপরীত মেরু। একদিকে পদ্মচিত্ত কোমল স্বভাবের। সর্বক্ষণ প্রজার মধ্যেই থাকেন, প্রজার সুখদুঃখ, সুবিধা অসুবিধা নিয়েই তাঁর ভাবনা চিন্তা। পিতার সম্মুখে তখনই আসেন তিনি, যখন প্রজার জন্য তাঁর কিছু চাইবার থাকে। নচেৎ পিতার সাথে পদ্মচিত্তের সাখ্যাত হয়না বললেই সঠিক বলা চলে।
রাজপুরের আহার সে অত্যন্ত কম করে, কারণ অধিক সময়ে সে প্রজার আঙ্গনেই আহার করে। গভীর রাত্রে নিজকক্ষে গমন করেন এবং খুব প্রভাতে নিদ্রা ত্যাগ করে চলে যান। তরবারি চালনে সে অত্যন্ত নিপুণ। একই ভাবে সে ধনুক ও তীরে সাবলীল। লক্ষ্যভেদ এবং গতি, এই দুইতেই সে পারঙ্গম। তবে যুদ্ধ করতে তাঁর রুচিও নেই, অভিরুচিও নেই। কিন্তু যখন প্রজার বিপদ ঘনিয়ে আসে, সে সেনা ছাড়া, একাকীই যুদ্ধ করে, প্রজাকে সুরক্ষিত করে চলে আসে।
নারীসঙ্গতেও তাঁর অভিরুচি নেই। অন্যযুবকদের সাথে ক্রীড়ায় মত্ত থাকতে, সঙ্গীত শ্রবণ করতে, তথা তানপুরার সহযোগিতায় সঙ্গীত সাধন করতে, তাঁর আকর্ষণ সকলের জ্ঞাত। স্ত্রীপুরুষ সকলের কাছেই তিনি যুবরাজ কম, বিশ্বস্ত ভ্রাতা অধিক। আর তাঁর এই স্বভাব ঠিক করিমুণ্ডের বিপরীত। করিমুণ্ড স্ত্রীসম্ভোগে বিশেষ অভিরুচি রাখে।
প্রজা তাঁর কাছে দাসসম, সুন্দরী বামারা তাঁর থেকে দূরত্ব রেখে চলে, কারণ করির দৃষ্টি সর্বদাই তাঁদের সম্ভোগের দিকে থাকে। উপার্জনকারীরাও দূরত্ব স্থাপন করে চলেন তাঁর থেকে, কারণ যখন খুশী করিমুণ্ড তাঁদের থেকে রাজপুত্রের অধিকার স্থাপন করে ধনাদি বাটপারি করে নেন। সঙ্গীতে তাঁর মন নেই, আর ক্রীড়ার ময়দানে তিনি যান, কেবলই তিনিই শ্রেষ্ঠ সেই বোধ সকলকে করাতে।
মহাবলশালী তিনি সর্বদা মুগুর ভাজেন। মুগুরের যুদ্ধে তাঁর জুরি মেলা ভার। যুদ্ধ তার অতি প্রিয় কর্ম, এবং যুদ্ধ করে, শত্রুর হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার করা তাঁর একটি নেশা ও পেশার মধ্যে পরে। দুই ভ্রাতাই যুদ্ধে অসম্ভব শক্তিশালী, আর তাই রণাঙ্গনে এই দুই ভ্রাতার একজনকে দেখলেও শত্রু চম্পট দেন। তবে দুই ভ্রাতার যুদ্ধে রত হবার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেখানে পদ্মচিত্তের কাছে যুদ্ধ হলো প্রজার সুরক্ষা নিশ্চয় করার জন্য আবশ্যক কর্ম, সেখানে করিমুণ্ডের কাছে যুদ্ধ মানে বাহুবল প্রদর্শনের ক্ষেত্র এবং আধিপত্য স্থাপনের, যশ অর্জনের ক্ষেত্র।
পদ্মচিত্তেরর স্বভাব অতি মনোরম, এবং তাঁর মনস্তত্ব দেখে, মহারাজ চন্দন তাঁকেই পরবর্তী রাজা রূপে গণ্য করেন। কিন্তু তিনি চিন্তিত থাকেন করিমুণ্ডকে নিয়ে। করিমুণ্ড যেই ভাবে জীবনের পথে অগ্রসর, সেই পথে অগ্রসর হতে থাকলে, রাজা রূপে সে তো যথার্থ নয়ই, মহামন্ত্রী বা সেনাপতি হলেও, রাজ্যের জন্য বড় বিপদ। সেই দেখে, রাজা চন্দন নিশ্চিত করেন যে, যতশীঘ্র সম্ভব করিমুণ্ডের বিবাহ স্থির করবেন। এক বিবাহই তাঁকে পসমিত ও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।
তাই করিমুণ্ডের বিবাহ সংক্রান্ত আলাপচারিতা করা শুরু করলেন মহারাজ চন্দন তাঁর মন্ত্রীমণ্ডলের সাথে। সেই থেকে প্রজা সংবাদ লাভ করে, একদিন দলবেঁধে মহারাজের দরবারে সামিল হয়ে বললেন, “মহারাজ, মানছি, আপনি আপনার কনিষ্ঠপুত্রকে সুপথে চালিত করার উদ্দেশ্যে তাঁর বিবাহদানের প্রয়াস করছেন, কিন্তু একবার বিচার করে দেখুন। বিবাহিত পুরুষই রাজার আসনে উপস্থাপনের যোগ্য। আর যদি একবার করিমুণ্ডের বিবাহ হয়ে যায়, সে কি আর তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে রাজসিংহাসন প্রদান করতে সচেষ্ট থাকবে! তাই মহারাজ, কৃপা করে, পূর্বে আপনার জ্যেষ্ঠপুত্র পদ্মচিত্তের বিবাহ নিশ্চিত করুন”।
জমায়েতদের মধ্যে স্ত্রী সংগঠন বললেন, “মহারাজ, মন্দকে সুন্দর করার প্রয়াস অবশ্যই করা উচিত। কিন্তু সুন্দরকে প্রথমে সুরক্ষিত করে নেওয়া অত্যন্ত আবশ্যক। বদগুণকে পরিবর্তিত করার পূর্বে, সৎগুণকে সুরক্ষিত ও বলবান করে নেওয়া অধিক আবশ্যক। মহারাজ, অপরাধ মার্জনা করবেন, কিন্তু এটিই সত্য যে করিমুণ্ড হলেন রাজবংশের বদগুণ, আর পদ্মচিত্ত হলেন সৎগুণ। তাই, কৃপা করে প্রথম সৎগুণকে সুরক্ষিত ও বলবান করে নিন, অতঃপরে বদগুণের উপর ক্রিয়া করবেন”।
প্রজার ভাবও স্পষ্ট, আর তাঁদের কথনও সত্য। তাই, মহারাজ চন্দন সেই বিষয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলেন। কিন্তু ভাবনা চিন্তা করতে গিয়ে, তিনি অধিক চিন্তিত হয়ে গেলেন, তাঁর অতিপ্রিয়, সুদর্শন, সুচরিত্রের অধিকারী, প্রজাপ্রেমী, অজস্র সৎগুণের অধিকারী, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, পদ্মচিত্তের বিবাহ দেবেন, তো কার সাথে দেবেন! এমন সুপাত্রী তো তাঁর সন্ধানে একটিও নেই। না আছেন এমন কনো গুণশ্রী যুবতির সন্ধান, আর না এমন কনো সুচরিত্রা রাজকন্যার সন্ধান। তাই তিনি পুত্রবধূ নির্বাচনে দ্বন্ধে পতিত হয়ে গেলে, দেবী জগদ্ধাত্রীর নিকট যাত্রা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
গহননিশিতে, যখন সমস্ত প্রজা শয়নে গেছেন, একাকী রাজপুত্র পদ্মচিত্ত সমস্ত রাজ্যকে একবার পরিভ্রমণ করে আসেন স্বয়ং এটি দেখার জন্য যে সমস্ত প্রজা আহার করে, সুখনিদ্রায় রত হয়েছেন। সেই সময়ের অপেক্ষা করলেন রাজা চন্দন। পুত্র পদ্মচিত্ত রাজপ্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করলে, যৎসামান্য আহারাদি করে নিদ্রা গেলে, তিনি নির্গত হলেন দেবী জগদ্ধাত্রীর উদ্দেশ্যে।
সেখানে উপস্থিত হয়ে, তিনি দেবী জগদ্ধাত্রীর কাছে নিবেদন করে বললেন, “হে দেবী, হে মাতা, হে জগজ্জননী, আজ তোমার পুত্রের বিবাহ নিয়ে আমি বড়ই দ্বন্ধে পতিত হয়েছি। তুমি কথা দিয়েছিলে মা, এই রাজ্যকে তুমি সর্বদা সুখদান করবে। আর তোমার আমার জ্যেষ্ঠপুত্রই সেই সুখদানের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তাই সে যাতে সেই সুখদান করতে পারে প্রজাকে, তার জন্য তাঁকে উর্বর করে তুলতে হবে, আর এক ভার্যাই পুরুষকে উর্বর করে তুলতে পারেন। … তাই কৃপা করো মা, আর কৃপা করে আমাকে মার্গ বলে দাও।
আমি যে, আমার পদ্মচিত্তের সাথে বিবাহযোগ্যা একটি স্ত্রীরও স্মরণ করতে পারছি না। দয়া করো মা। জানি সকলেই তোমার সন্তান, কিন্তু সে তো তোমার গর্ভজাত সন্তান। তুমি তাঁর সর্বভাবেই জননী। তাই মা, তোমার সন্তানের জীবনমঙ্গলের পথ সুগম করে দাও, কৃপা করো মা। বড় দিশাহারা হয়ে তোমার কাছে এসেছি দেবী। আশাহত করো না আমাকে”।
দেবী জগদ্ধাত্রী, নদীতট থেকে উদিত হয়ে সম্মুখে এগিয়ে আসলে, বিভোর হয়ে মহারাজ চন্দন তাঁকে দেখতে থাকলে, দেবী জগদ্ধাত্রী নিকটে এসে প্রশ্ন করলেন, “কি ব্যাপার মহারাজ, এমন বিস্ফারিত নয়নে দেখছেন যে বড়! যেন আপনি আমাকে এর পূর্বে কখনো দেখেন নি!”
মহারাজ চন্দন বললেন, “মহারাজ কেন বলছো দেবী! … তোমার মুখ থেকে এই মহারাজ শব্দ শুনে যেন মনে হয় আমাকে তুমি অপমান ও ব্যঙ্গ করছো। তুমি মাতা, জগন্মাতা। আর তোমার সন্তান। হ্যাঁ, প্রথম দৃষ্টি তোমার প্রতি কামাতুর ভাবে স্থাপন করার জন্য আমি আজও লজ্জিত বোধ করি। কিন্তু না দেবী, এবার তোমার অপার সৌন্দর্য দেখছিলাম। কতকাল পর তোমার সেই অপার সৌন্দর্যকে চাক্ষুষ করলাম। জগদ্ধাত্রী বন্দনার কালে তোমাকে অতিসুন্দর বেশে দেখি। কিন্তু যখন বাস্তবে তোমাকে দেখি, তখন যেন সেই রূপও ম্লান হয়ে যায়। মনে হয় যেন শুধুই দেখতে থাকি”।
দেবী জগদ্ধাত্রী হাস্য প্রদান করে বললেন, “তা আমাকে দেখার জন্য এত রাত্রে, সমস্ত প্রজা শয়ন যাবার পর এলেন, নাকি অন্য কনো কারণ আছে আমাকে এই গভীর নিশিতে আবাহন করার অন্তরালে!”
মহারাজ চন্দন বললেন, “কারণ তো আছে দেবী। বড়ই দ্বন্ধে আছি। তবে দিবসে, যত প্রভাতেই আসি না কেন, মাঝিরা আমার পূর্বে চলে আসতো। আর দেবী, তোমার সাথে ৭ বছর থেকে যা বুঝেছি, তা এই যে তুমি সমস্ত চমৎকার, সমস্ত দিব্যতার অধিকারিণী হলেও, সরল, সাদাসিধে, এবং কেবল মাতা হয়েই বিরাজ করা পছন্দ করো। তাই অন্য কারুর নজরে তোমার এই প্রকট হওয়া প্রত্যক্ষ হলে, তুমি হয়তো বিব্রত বোধ করতে, কারণ তাঁদের দৃষ্টিতে তা চমৎকারই হতো। সেই কারণে এই নিশিকে বেছে নিয়েছি”।
দেবী জগদ্ধাত্রী হেসে বললেন, “মহারাজ, আপনি তো দেখছি, এখনও নিজেকে আমার প্রেমেই আবদ্ধ রেখেছেন!”
মহারাজ চন্দন হেসে বললেন, “দেবী, একবার যে আপনার প্রেমের রঙে নিজেকে চুবিয়ে নেয়, সে যা আর জন্মজন্মান্তরেও সেই রং থেকে মুক্ত হতে পারে না, আর সত্য বলতে সে চায়ও না সেই রং তাঁর থেকে চলে যাক। … জানেন তো সবই। প্রেম আমরা আর করতে পারি কোথায়! প্রেমের উৎসই তো স্বয়ং আপনি। তাও নিজেকে অন্তরালে রেখে আমাদের শ্রেয় দেওয়াতেই আপনার আনন্দ। জানি তা। … কিন্তু সত্য বলছি, যখন সেই কথা আপনি স্বয়ং বলেন, বড় লজ্জা লাগে, আর মনে হয় কি নির্লজ্জ আমি! স্বয়ং প্রেম যিনি, তাঁর থেকে অসভ্যের মত শ্রবণ করছি, কত বড় প্রেমী আমি!”
দেবী জগদ্ধাত্রী হেসে বললেন, “হয়েছে হয়েছে, এবার বলুন তো, কিসের জন্য এখানে আপনার এই নিশিতে সকলের দৃষ্টির অগোচরে আগমন!”
মহারাজ চন্দন বিনম্র ভাবে বললেন, “দেবী, আপনার জ্যেষ্ঠ পুত্র, পদ্মচিত্ত। অত্যন্ত কোমল স্বভাবের হয়েছে সে। প্রজা অন্তপ্রাণ, এবং প্রজারও অত্যন্ত বিশ্বাসের পাত্র সে। ভাবীকালের উপযুক্ত রাজা রূপে আমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তাঁর মহারানী রূপে কারুকে সনাক্ত করতে পারছিনা। তাই কৃপা করুন দেবী। রাজ্যের প্রজার স্বার্থ সুরক্ষিত করা যতটা মহারাজের হাতে থাকে, তার থেকেও অধিক থাকে মহারানীর হাতে। মহারানীই তিনি, যিনি প্রজার অত্যন্ত হৃদয়ের নিকটের ব্যক্তি হন, এবং যেই কথা তাঁরা রাজাকেও বলতে পারেন না, সেই কথা মহারানীর কাছে নিবেদন করেন। তাই দেবী, সেই উপযুক্ত স্ত্রীর সন্ধান প্রদান করুন, আর এই যেই বংশকে আপনি সুরক্ষিত রাখার বচন প্রদান করেছেন, তাকে সুরক্ষিত করুন”।
মাতা জগদ্ধাত্রী প্রফুল্লচিত্তে বললেন, “মহারাজ, পূর্ববঙ্গের দিকে আপনাকে যাত্রা করতে হবে, এর উদ্দেশ্যে। সেখানে শূন্যরাজ্যে অবস্থান করছেন, সাখ্যাত মাতা সর্বাম্বা। তাঁরই ভগিনী, দেবী সমর্পিতার কন্যা, চিত্তাকে তিনি কন্যাস্নেহে বড় করে তুলেছেন। পদ্মচিত্ত ও এই চন্দনকুল তথা চন্দননগরের জন্য, তাঁর থেকে অধিক শ্রেয় কনো স্ত্রী সম্ভব নয় মহারানী পদের জন্য। তবে হ্যাঁ, স্মরণ রাখবেন, আপনি মাতা সর্বাম্বার কাছে যাচ্ছেন।
আমি যার এক প্রকাশ মাত্র, সেই পূর্ণ ব্রহ্মস্বরূপ তিনি। তাই তাঁর কাছে যাত্রা করার আগে, নিজেকে নির্মল করে যাবেন। তাঁর লীলার সম্মুখীন আপনাকে হতেই হবে, বিশেষ করে তখন যখন আপনার মধ্যে কনো প্রকার বিকৃতি অবস্থান করবে। তাই হয় সমস্ত প্রকার বিকৃতিকে মুছে যান সেখানে, নয়তো তাঁর লীলার সম্মুখীন হয়ে সেই বিকৃতির ভান করে আসুন”।
মহারাজ চন্দন, তাঁর পুত্রের পত্নীর বেশে সাখ্যাত মাতা সর্বাম্বার ভগিনীকে লাভ করবেন, তা ভেবেই আনন্দিত হয়ে ওঠেন। দেবী জগদ্ধাত্রীর থেকে বিদায় কামনা করে, তিনি পরের দিন প্রভাতেই শূন্যপুরে, মাতা সর্বাম্বার কাছে যাত্রা করলেন।
কিন্তু যাত্রা করলে কি হবে! শূন্যপুরে পৌঁছে, কিছু খুঁজেই পেলেন না মহারাজ চন্দন। না পেলেন মাতা সর্বাম্বার দেখা, আর না তাঁর রাজপুরের। অনেকক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরে যখন কিছুই দেখতে পেলেন না, হতাশ হয়ে তিনি প্রত্যাবর্তন করলেন নিজরাজ্যে। সারাদিন অশান্তিতেই বিরাজ করার শেষে, গভীর নিশিতে তিনি পুনরায় জগদ্ধাত্রী তটে যাত্রা করলেন, এবং মাতা জগদ্ধাত্রীর দর্শন কামনা করলেন।
মাতা জগদ্ধাত্রী পুনরায় আগত হলে, করজোড়ে মহারাজ চন্দন বললেন, “দেবী, মাতা সর্বাম্বার লীলার যে কিছুই বোধগম্য হলো না আমার! আমি সেখানে গেলাম কিন্তু না তাঁর রাজপুরের দেখা পেলাম, আর না তাঁর!”
দেবী জগদ্ধাত্রী সেই কথা শুনে শিশুর ন্যায় হাসতে থাকলে, মহারাজ চন্দন আরো অধিক বিব্রত বোধ করতে থাকলেন। সেই দৃশ্য দেখে, দেবী জগদ্ধাত্রী বললেন, “আপনি একা গেছিলেন, না কি পদ্মচিত্তকে নিয়ে গেছিলেন!”
মহারাজ চন্দন বললেন, “আমি একাই গেছিলাম, পুত্রের পিতা আমি। আমিই তো কথা পারবো, কন্যাকে প্রথম দেখা দেখবো। আমার পছন্দ হলে, তবেই না …”
দেবী জগদ্ধাত্রী পুনরায় হেসে বললেন, “এখানেই তো আপনাদের সাথে মাতা সর্বাম্বার ভেদ। তিনি সহজ নেত্রে সমস্ত কিছুকে দেখেন, আর আপনারা বিকৃত নেত্রে। বিবাহ করবে পদ্মচিত্ত, আর কন্যা পছন্দ করবেন আপনি একাকী! তা কেমন করে হয়! … পদ্মচিত্তকে সঙ্গে নিয়ে যান মহারাজ। পুত্র তাঁর বধূকে পছন্দ করবেন, এবং বধূ তাঁর পতিকে। এবং পিতা পুত্রের ও পুত্রবধূর পছন্দকে গ্রহণ অথবা বর্জন করবেন। এই হলো মাতা সর্বাম্বার ধারা।
তাঁর নেত্রে যতটা অধিকার পুত্রের বা পুত্রের অবিভাবকের আছে বধূকে পছন্দ করার, তার থেকেও অধিক অধিকার আছে কন্যার তাঁর পতি ও শ্বশুরঘর পছন্দ করার, কারণ সে-ই এঁদের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাই তাঁকে যতক্ষণ না সেই অধিকার প্রদান করবেন, ততক্ষণ মাতা সর্বাম্বার দর্শন আপনি পাবেন না, আর আশা করি দেবী চিত্তারও দর্শন আপনি পাবেন না”।
দেবী জগদ্ধাত্রীর থেকে বিদায় গ্রহণ করে, পরবর্তী দিবসে, সঙ্গে করে পদ্মচিত্তকে নিয়ে মহারাজ চন্দন শূন্যপুরে গেলে, সেখানের রাজপুরকে প্রথমবারের জন্য প্রত্যক্ষ করতে পারলেন। মনে মনে, দেবী জগদ্ধাত্রীকে মার্গদর্শনের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে, পুত্রকে নিয়ে সেখানে প্রবেশ করলে, মাতা সর্বাম্বা প্রথম কক্ষে প্রবেশ করে সাখ্যাত করলেন চন্দন ও চন্দনপুত্রের সাথে।
মাতা সর্বাম্বার অভাবনীয় রূপ প্রত্যক্ষ করে, পিতাপুত্র উভয়ই বাক্যহারাই কেবল নয়, স্পন্দনহীনা হয়ে গেলেন। শুভ্র বদন ও তন, তার থেকে লালাভ বিকিরণ যেন সম্পূর্ণ কক্ষকেই এক দিব্য আলোক প্রদান করছিল। আর তাঁরই মধ্যে চন্দনগন্ধা মাতা সর্বাম্বা তাঁর অসম্ভব রূপডালি সহ অবস্থান করছেন। বেশ কিছুক্ষণ নিজের স্পন্দনকেও অনুভব না করতে পারার পর, যখন অবশেষে একটিবারের জন্য হৃদপিণ্ডের স্পন্দন অনুভব করলেন পদ্মচিত্ত, তখন মাতা সর্বাম্বার চরণস্পর্শ করতে সে উঠে গেলে, মাতা সর্বাম্বা তাঁর স্কন্ধ আকর্ষণ করে উন্নত করলে, মহারাজ চন্দনও প্রণাম করতে গেলেন তাঁকে।
মাতা সর্বাম্বা হাস্য বেশে বললেন, “মহারাজ হয়ে প্রণাম কি করেন রাজন! তাছাড়াও আপনি এখানে আপনার পুত্রের জন্য বধূ গ্রহণ করতে এসেছেন, তাই আপনি তো আমার সম্বন্ধী!”
মহারাজ চন্দন বিস্মিতচিত্তেই বললেন, “মাতা, জল পবিত্র হোক বা অপবিত্র, এক পিপাসুর কাছে সেই সমস্ত কিছু পরবর্তী বিচার্য বিষয়। প্রথম সে তাঁর পিপাসার সমাপন করে। … তেমনই মাতা, সম্বন্ধী হবার অনুমতি আপনি প্রদান করুন বা না করুন, আমার পুত্র ও আপনার ভগিনী একে অপরকে স্বীকার করুক বা না করুক, আপনার চরণস্পর্শ করার সৌভাগ্য থেকে নিজেকে কিভাবে বঞ্চিত করি!”
সেই কথাতে মাতা সর্বাম্বা চরণবন্দনার অনুমতি প্রদান করলে, চন্দন প্রণাম করে দক্ষিণ পার্শে দণ্ডায়মান থাকলে, মাতা সর্বাম্বা তাঁর ভগিনীকে তাঁর নাম ধরে ডাকলেন। দেবী চিত্তা সেই ডাকে সারা দিয়ে সেখানে উপস্থিত হলে, পিতাপুত্র উভয়ই দেখলেন, যেন দেবী চিত্তা মাতা সর্বাম্বারই অনুকরণীয় অবস্থা। কেবলই মাতা সর্বাম্বার দিব্যতা তাঁর মধ্যে প্রকাশিত নয়, বাকি সমস্তভাবেই যেন তাঁর রূপ, অঙ্গবর্ণ মাতা সর্বাম্বার অনুকরণীয় প্রকাশ।
সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ কক্ষে, মাতা সর্বাম্বা বললেন, “পুত্র পদ্মচিত্ত, তুমি তো কিছু বললে না, আমার ভগিনীকে তোমার পছন্দ না পছন্দ নয়!”
পদ্মচিত্ত বিনম্র হাস্য প্রদান করে বললেন, “মা, তোমার রূপগন্ধের আভাস রয়েছে দেবী চিত্তার মধ্যে। আর তা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে তিনি তোমারই অনুকরণীয় প্রকাশ। তোমাকে লাভ করার উপায় হলো সাধনা। অর্থাৎ তোমার প্রকাশকে লাভ করার উপায়ও হলো সাধনা। আর মা, সাধনা সাধকের কর্মগুণ হলেও, সাধনায় সিদ্ধ হবেন না হবেননা, তা কেবলই তাঁর আরাধ্যার অভিরুচি হয়। তেমনই দেবী চিত্তাকে অপছন্দ বলার অধিকার আমার নেই, স্পর্ধাও আমার নেই। তিনি যারই ভার্যা হন, সৌভাগ্যবতী দেবী চিত্তা নন, সৌভাগ্যবান সেই পুরুষ যিনি তাঁকে ভার্যা রূপে লাভ করবেন। তাই মা, আমি কি করে বলতে পারি, এই সৌভাগ্য আমার পছন্দ না অপছন্দ! সৌভাগ্য যে সকলেরই কাম্য হয় মা। …
বলবেন তিনি। সাধকের সাধনায় তৃপ্ত কিনা, তা যে আরাধ্যারই বলার অধিকার থাকে, তাই না মা! আর দেবী চিত্তার মধ্যে কেবলই আমার আরাধ্যা, অর্থাৎ তোমাকে দেখতে পাচ্ছি মা। তাই এই সম্বন্ধের নির্ণায়ক না আমিও হতে পারি, আর না আমার পিতা। এর নির্ণায়ক কেবলই আপনি ও আপনার ভগিনী হবেন”।
মাতা সর্বাম্বা স্বয়ং নির্ণয় না নিয়ে, দেবী চিত্তার দিকে তাকালে, দেবী চিত্তা বক্তব্য স্থাপনের অধিকার লাভ করে বললেন, “যেই রাজপুত্র নিশ্চিত ভাবে জানেন যে তিনি ভাবিকালের রাজা, আর তা জেনেও নিজের অধিকারকে সীমিত করে রেখে দিতে কুণ্ঠিত নন, তাঁর ভার্যা হতে পারাকে আমি আমার সৌভাগ্য মনে করি। তাঁর এই নম্রতা, তাঁর এই নিজ অধিকার সীমাবদ্ধকরনের প্রতি আমার অতিশয় সম্মান জন্ম নিচ্ছে”।
মহারাজ চন্দন হেসে বললেন, “যার মাতাসুলভ ভগিনী স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা, তাঁর থেকে এমন উচ্চ আদর্শ লাভ করা যাবে, সেটিই তো স্বাভাবিক। সত্য বলতে মাতা, আমার এই পুত্র অত্যন্ত কোমলস্বভাবের। নিজঅপেক্ষা প্রজাকে অধিক স্নেহ করেন। নিজের সর্বস্ব লুটিয়ে জগদ্ধাত্রী আরাধনা করাকে নিজের ধর্ম জ্ঞান করে। তাঁর ভার্যারূপে আমি কারুকেই সনাক্ত করতে পারছিলাম না। আসলে সে নিজের খেয়াল রাখতে পারেনা, তাই যে এই পিতা সেই কন্যার আচল সন্ধান করছিল, যে আমার এই পুত্রকে আপনজন জ্ঞানে আগলে রাখবে। … মা, মাতা জগদ্ধাত্রীর মার্গদর্শনেই আমি আপনার ভগিনীর কথা জেনেছি। তাই সত্য বলতে, একটিই ভাব নিয়ে এসেছিলাম, যদি আপনি সম্মত থাকেন, এবং আপনার ভগিনী, তাহলে তাঁকে নিজের পুত্রবধূ করে ঘরে তুলবো”।
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “যেখানে বধূ সম্মত, এবং বধূকে গ্রহণ করার পতি সম্মত, সেখানে আমার অসম্মত হবার তো কনো সম্ভাবনাই নেই। … নিঃশর্তে নিয়ে যাও রাজন আমার ভগিনীকে, আর তাঁকে নিজের পুত্রবধূ করে অবস্থান করাও। তোমার কর্ম সম্পন্ন হলে, আমি তোমার রাজ্যে উপস্থাপন করে, বর ও বধূকে আশীর্বাদ করে আসবো। মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য অন্দরমহলে আসো, আমি আমার ভগিনীকে বধূর বেশে সাজিয়ে নিয়ে আসছি”।
পদ্মচিত্ত বললেন, “আর দেবী চিত্তা! তিনি আহার করবেন না! … এতখানি পথ অতিক্রম করতে হবে, তিনি অনাহারে থাকবেন!”
মহারাজ চন্দন বাঁধা দিয়ে বললেন, “এটিই রীতি পুত্র, বধূকে উপবাস করেই পতিঘরে যেতে হয়”।
পদ্মচিত্ত পুনরায় মাতা সর্বাম্বার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মা, ফুলের মত মানুষ করেছেন আপনি আপনার ভগিনীকে। তাঁর বড় কষ্ট হবে মা। একবার যদি বিচার করে দেখতেন!”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “যথার্থ রাজা তুমি পুত্র। যার কাছে রীতিরেওয়াজের আগে জনকল্যাণ, তিনিই তো প্রকৃত রাজা। … অবশ্যই আহার করিয়ে দেব পুত্র, তোমার ভার্যাকে। তোমরা অন্তঃপুরে এসো, মধ্যাহ্নভোজন করে নাও”।
মধ্যাহ্নভোজন করার কালে, মহারাজ চন্দ্র তিন কন্যাকে দেখে প্রশ্ন করলেন, “ইনাদের পরিচয় কি?” মানস সম্মুখে এসে বললেন, “মহারাজ, ইনারা হলেন মোহিনীর কন্যা, হুতা, মিতা ও স্ফীতা। মাতার অভাবে, এঁদেরকে আমিই মানুষ করেছি”।
এই তিনকন্যা, এবং তাঁদের কামুকী আচরণ প্রত্যক্ষ করে, এঁদেরকে করিমুণ্ডের পত্নী করার বাসনা হৃদয়ে নিয়ে, পুত্র ও পুত্রবধূকে সঙ্গে নিয়ে চন্দনপুরে প্রত্যাবর্তন করে, সেখানে পুত্র ও পুত্রবধূর বিবাহের বিশাল আয়োজন সম্পন্ন করে, বিবাহদান করলেন।
বিবাহ উপরান্তের নিশিকালে, রাজপুত্র পদ্মচিত্ত তাঁর ভার্যা, দেবী চিত্তার উদ্দেশ্যে বললেন, “দেবী, মাতা সর্বাম্বা পূর্ণব্রহ্ম, তাঁরই প্রকাশ, আমাদের এই স্থানের কুলদেবী। তিনি নদী বেশে প্রবাহিতা হয়ে আমাদের এই রাজ্যকে সুরক্ষিত ও উর্বর করতে থাকেন। চলুন দেবী, আমরা সংসার জীবন শুরু করার আগে, তাঁর থেকে আশীর্বাদ ও মার্গদর্শন গ্রহণ করে আসি”।
দেবী চিত্তা, সেই কথনে সম্মত হলে, গভীর রাত্রে, নব্যদম্পতি জগদ্ধাত্রী তটে উপস্থিত হলেন, এবং মাতা জগদ্ধাত্রীকে আবাহন করলেন। দীর্ঘক্ষণব্যাপী মাতা জগদ্ধাত্রীকে আবাহন করলেও, মাতা উদিত না হলে, পদ্মচিত্ত বেদনায় রোদন করে ফেলে বললেন, “মা, জানি তুমি জগন্মাতা, তাই সকলের জননী, কিন্তু আমি শুনেছি যে, তুমি আমার গর্ভধারিণী জননীও। শুনেছি বলেই কিনা জানিনা, আমি সর্বদা তোমার অঙ্গের গন্ধ লাভের জন্য ব্যকুল থাকি, সর্বদা তোমার রূপ দর্শনের জন্য লালায়িত থাকি। হ্যাঁ, আমি তোমার তটে কখনো আসিনা, কারণ আমি সর্বদা তোমার গর্ভজাত পুত্র রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত থাকি। অন্তরে অন্তরে সর্বক্ষণ বলতে থাকি যে, যেদিন আমি তোমার গর্ভজাত বলার অবস্থায় উন্নীত হতে পারবো, সেদিন অবশ্যই তোমার কাছে এসে তোমার দর্শন ভিক্ষা চাইবো।
মা, আজ মাতা সর্বাম্বার ভগিনী আমাকে স্বামী রূপে গ্রহণ করে, আমাকে সেই যোগ্যতা প্রদান করে দিয়েছেন, তাই বড় আশা করে এসেছিলাম যে, তোমাকে প্রথমবারের মত দেখবো, প্রথমবার তোমাকে আলিঙ্গন করবো, প্রথমবার তোমার অঙ্গগন্ধকে সাখ্যাত করবো, প্রথমবার তোমার সন্তান আমি, সেই গর্ব করবো। কিন্তু মা, তুমি দর্শন দিলে না! কেন মা! এতকাল তোমার কাছে আসিনি, সেই উদ্দেশ্যে তুমি অভিমান করেছ! মা …”
এতকথার পরেও জগদ্ধাত্রী যেন সম্পূর্ণ ভাবে নীরব। নদীর স্বাভাবিক হিল্লোলও আজ উপস্থিত নেই। যেন তিনি তাঁর অস্তিত্বের সংকেত প্রদান করতেও নারাজ আজ। দেবী চিত্তা স্বামীর হৃদয়ের বেদনাকে অনুভব করে বললেন, “মাতা, আমি চিত্তা, দেবী সমর্পিতার কন্যা, ব্রহ্মময়ী মাতা সর্বাম্বার ভগিনী এবং মাতা জগদ্ধাত্রীপুত্র পদ্মচিত্তের ভার্যা। … মাতা, মাতাকে দেখতে না পারার বেদনা কেমন হয়, তা আমি জেনেও জানিনা। আমার জননী দেবী সমর্পিতা হলেও, আমার পালিতা মাতা আমার জ্যেষ্ঠা, দেবী সর্বম্বা, যার মাতৃত্ব সম্বন্ধে আর কিই বা বলি আপনাকে।
তিনি তো মাতা, সকলের মাতা, সকলের অম্বা তিনি, সাখ্যাত সর্বাম্বা। তাই মাতা, মাতাহারা হবার ভান কখনোই অনুভব করিনি আমি, বরং অন্তরে অন্তরে কখনো কখনো নির্লজ্জের মত মাতাহারা হবার জন্য কালকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেছি, ভাগ্যিস আমার জননী নেই, যদি থাকতেন তাহলে মা সর্বাম্বা কি আমাকে এতটা নিকটে ঘেষতে দিতেন! … কিন্তু মাতা, আপনি তো নাথের জননী ও আরাধ্যা একই সাথে, আর তিনি একটিবারও আপনাকে দর্শন করতে না পেরে, পাল সেজে, জগদ্ধাত্রী মূর্তি নির্মাণ করে করে, আপনাকে কল্পনা করে ফেরেন।
তাঁর বেদনার ইয়ত্তা করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি জানেন আপনি তাঁর মাতা, কিন্তু এও জানেন যে আপনি তাঁর আরাধ্যা। তাই মাতা জেনেও, সন্তানের মত আপনার কাছে এসে দর্শনের কামনা করেন নি। বরং আরাধ্যা জেনে, নিজেকে আপনার দর্শন লাভের উপযুক্ত করার প্রয়াস করে গেছেন। এটিই কি তাঁর অপরাধ মাতা!”
উত্তর এলো চিত্তার প্রশ্নের, তবে যেই কণ্ঠস্বর থেকে সেই উত্তর এলো, তা চিত্তার অতিপরিচিত। মাতা সর্বাম্বার কণ্ঠস্বর তা। উত্তর এলো, “হ্যাঁ পুত্রী, সেটিই হলো অপরাধ”।
মাতা সর্বাম্বাকে সম্মুখে লাভ করে, আনন্দে আপ্লুত পদ্মচিত্ত, সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন তাঁকে। তাই তাঁর স্কন্ধ আকর্ষণ করে, মাতা সর্বাম্বা পদ্মচিত্তকে উন্নীত করে, তাঁকে আলিঙ্গনসুখ প্রদান করে বললেন, “পুত্র, হতে পারে জগদ্ধাত্রী ঈশ্বরী, হতে পারে তিনি জগদম্বা। কিন্তু পুত্র, ঈশ্বরত্ব কখনোই মাতৃত্বের থেকে অধিক প্রিয় নয়। … পুত্র, জগদ্ধাত্রী আমারই প্রকাশ, তাই আমারই ভাব বহন করে সে। আর আমার ভাব এই যে, আমাকে ঈশ্বর জ্ঞানে আরাধনা করলে, আমার সেখানে উপস্থিত হবার মানসিকতাও থাকেনা।
কিন্তু হ্যাঁ, যখন আমাকে কেউ নিজের মা জ্ঞানে আবাহন করে, আমি ব্যকুল হয়ে উঠি তাঁর কাছে যাবার জন্য। যেই মা ডাকের মধ্যে বিন্দুবিসর্গ অভিনয় থাকেনা, বিন্দুবিসর্গ এই ধারণা থাকেনা যে যাকে মা বলছি তিনি ঈশ্বর, যখন সেই আবাহনের একটিই ভাব থাকে যে আমি তাঁর মা, তখন আর আমি নিজেকে সামলে রাখতে পারিনা। … হ্যাঁ জানি, আমার সেই সন্তানের সামর্থ্য নেই যে আমাকে সে প্রত্যক্ষ করে। তাই সর্বভাবে আমি তাঁকে সেই যোগ্যতা অর্জন করাই যাতে সে আমাকে প্রত্যক্ষ করতে পারে, আর অতঃপরে তাঁর সম্মুখে উদিত হতে আমার সাগ্রহ থাকে।
পুত্র, যখন সেই উদয়ের পর, আমার সেই সন্তান, আমার সমস্ত ঈশ্বরত্ব ভুলে গিয়ে, আমার সমস্ত সত্যতা ভুলে গিয়ে, কেবলই নিজেকে সন্তান আর আমাকে মা জ্ঞানে আলিঙ্গনের জন্য ব্যকুল হয়ে ছুটে আসে, তখনই, হ্যাঁ একমাত্র তখনই, এই মিথ্যা সৃষ্টি থাকাকে আমি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি, কারণ আমি আমার সন্তানের আলিঙ্গনসুখ লাভ করি।
পুত্র, ভক্ত আলিঙ্গনে আমি কখনোই লালায়িত নই, কারণ আমার নামকীর্তন হোক বা না হোক, তা নিয়ে আমি বিন্দু বিসর্গও চিন্তিত নই। আমি যে মা, আর তাই শুধুই আমার সন্তানকে ফিরে পেতে চাই। জগদ্ধাত্রী আমারই প্রকাশ, তাই আমারই ভাব তাঁর মধ্যে প্রবাহিত। আর তাই সেও অত্যন্ত ব্যথিত, কারণ তাঁর পুত্র তাঁর কাছেই থাকে সর্বক্ষণ, কিন্তু একটিবারের জন্যও সে মাতার কাছে আসে না।
তিনি ব্যথিত কারণ, তাঁর আপন পুত্র তাঁকে মাতা কম আর ঈশ্বরী অধিক মানে। তিনি তো ঈশ্বরী বলে নিজেকে দাবিও করেন না। একটিবারও এসে বলেন না যে, তিনি অমুক, তিনি তমুক, তাই তাঁর আরাধনা করা হোক। তিনি তো শুধুই চান যে, তাঁর সন্তানরা তাঁদের মাকে ফিরে পাবার আনন্দে আত্মহারা হয়ে মহানন্দে মিলন উৎসবে যুক্ত হোক।
পুত্র, তিনি ঈশ্বরী, পরমেশ্বরী, জগজ্জননী, কিন্তু সর্বপ্রথম তিনি মা। মাতৃত্বই তাঁর কাছে প্রিয়, সন্তানই তাঁর কাছে প্রিয়, ভক্ত নয়। … তাঁর তো ভক্ত চাইই না, তাঁর তো সন্তান চাই, কারণ তাঁরা যে তাঁর নিজের সন্তান। … না তাঁর ভক্ত চাই, না চাই ভক্তি। না চাই রীতি, না চাই কনো আচার বিচার। সন্তানের কাছে মা কি কখনো আচার বিচারের অপেক্ষা করে! যে মাতার ক্রোড়ে স্থিত হয়ে নিশ্চিন্তে মলত্যাগ করে, সেই তো সন্তান! যে মাতার ক্রোড়ে স্থিত হয়ে নিশ্চিন্তে আহার করে, নিশ্চিন্তে শয়ন করে, সেই তো সন্তান!
তাহলে কেন আচার বিচার, রীতি রশমের দিকে মন পুত্র! … কেন, এই করতে হয়, সেই করতে হয়! এমন করতে হয়, তেমন করতে হয়! এই মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়, সেই কথা বলতে হয়! … মা তিনি তোমার! সমস্ত কিছু বলতে পারো। পারো না! … মা তিনি তোমার, সমস্ত অবস্থায় তাঁকে স্পর্শ করতে পারো। পারো না! মা তিনি তোমার, মায়ের কাছে বাঁধা কি করে থাকতে পারে পুত্র! …
মায়ের সাথে সাখ্যাত করার জন্য যোগ্যতার কি প্রয়োজন! … যখন কনো যোগ্যতা থাকেনা সন্তানের, তখনও যিনি সন্তানকে আগলে রাখেন, তিনিই তো মা। যখন সন্তান সঠিক করে চিনতেও শেখে নি, তখনও যিনি সন্তানকে ধারণ করে থাকেন, তিনিই তো মা। তাহলে মায়ের কাছে এই সংকোচ কেন পুত্র! তোমার সংকোচ যে বলে দিচ্ছে যে, মা কম, আর ঈশ্বরী অধিক মানো তুমি তাঁকে। আর এখানেই তাঁর আপত্তি। তিনি যে ঈশ্বরী হতেই চাননা, কেবল ও কেবলই মা হতে চান। তাই তো তাঁকে পরমেশ্বরী কম বলা হয়, আর জগজ্জননী অধিক বলা হয়। তাই নয় কি!”
সমস্ত কথা শুনতে শুনতেই পদ্মচিত্তের কপোল অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়েছিল। মাতা সর্বাম্বার কথন সমাপ্ত হলে, পদ্মচিত্ত ভূমিতে শুকনো বস্ত্রের ন্যায় লুটিয়ে পরলে, তাঁর ভার্যা, দেবী চিত্তা তাঁকে সাহস জোগাতে, তাঁর কাছে এসে তাঁর স্কন্ধ আকর্ষণ করলেন। পদ্মচিত্ত, দেবী চিত্তার করে নিজের কর স্থাপন করে, দণ্ডায়মান চিত্তার চরণ আকর্ষণ করে শিশুর ন্যায় ক্রন্দন করে উঠে বলতে থাকলেন, “আমি এই জগতের শ্রেষ্ঠ অপরাধী দেবী, শ্রেষ্ঠ অপরাধী!”
দেবী চিত্তা স্বামীর পাশে ভূমিতে বসে তাঁকে আলিঙ্গন প্রদান করে বললেন, “না না স্বামী, আপনি পবিত্র। অত্যন্ত পবিত্র। তা না হলে, আমার জ্যেষ্ঠা এতগুলি কথা তো কারুকে শ্রবণ করান না। আপনি পবিত্র বলেই তো তিনি আপনাকে সেই কথা শ্রবণ করালেন!”
ব্যকুল স্বরে, পদ্মচিত্ত বললেন, “না দেবী না… শিশুর হৃদয় কোমল হয়, কিন্তু শিশুর হৃদয়ের থেকেও যার হৃদয় কোমল হয়, তিনি হলেন মাতা, যার থেকে শিশু নিজের কোমল হৃদয় লাভ করে। দেবী, আমি তো অত্যন্ত ভাগ্যবান, শ্রেষ্ঠ ভাগ্যবান। জগতের সমস্ত সন্তান মাতা সর্বাম্বারই সন্তান, মা জগদ্ধাত্রীরই সন্তান। কিন্তু তাঁদের দেহদানের দায়িত্ব তিনি তাঁর কনো অন্য সন্তানকে প্রদান করে, তাঁদেরকে মাতৃত্ব ও পিতৃত্ব সুখ প্রদান করেন।
কিন্তু আমি! আমি তো সকলের মত প্রকৃত অর্থে জগদ্ধাত্রীর সন্তান, কিন্তু তার সাথে সাথে আমার দেহদানও তিনিই করেছেন। তাই আমার তো তাঁকে মাতা জ্ঞান করার মধ্যে কনো প্রকার দ্বন্ধই থাকা উচিত ছিলনা! … যদি আমার, যার দেহটিও তিনি দান করেছেন, তারও দ্বন্ধ থাকে তাঁকে মাতা করে মানার, আর আগ্রহ থাকে ঈশ্বরী করে মানার, তবে তাঁর বাকি সন্তানদের থেকে কিই বা অপেক্ষা করা যেতে পারে, বলুন আপনি! … তাঁদের তো দেহদান করেছেন, তাঁদের জনকজননী, তাই তাঁরা স্বভাবতই এমনই ভেবে থাকেন যে, মা জগদ্ধাত্রী তাঁদের ঈশ্বরী, তাঁদের মাতা নন।
আত্মে বদ্ধ তাঁরা। তাই স্বভাবতই দেহসর্বস্ব মনোভাব তাঁদের, আর তাই দেহদান যারা করেছেন, তাঁদেরকেই জনকজননী জ্ঞান করেন তাঁরা। আর তাই জগদ্ধাত্রী তাঁদের কাছে ঈশ্বরী হয়েই থাকেন। যখন তাঁরা অনুভব করতে সক্ষম হন যে, তাঁরা দেহ নয়, তাঁরা তো সেই চেতনা, যেই চেতনার জন্ম কেবল ও কেবল মা জগদ্ধাত্রীই দিতে পারেন, তখনই তাঁরা অনুভব করেন যে তাঁদের প্রকৃত জননী হলেন জগজ্জননী মা সর্বাম্বা, ও তাঁর জগতকর্ম সম্পাদ্যপ্রকাশ, দেবী জগদ্ধাত্রী।
কিন্তু আমার ক্ষেত্রে! আমার ক্ষেত্রে তো তেমন হবার কথা নয় দেবী! … আমার তো দেহটিও তিনিই দিয়েছেন। তারপরেও আমি … ছি ছি … ঘৃণা হচ্ছে নিজের উপর। নিজের প্রাণপ্রিয় মা-কে এমন ভাবে বেদনা দিতে পারলাম আমি! … আজ মনে হচ্ছে, আমার সমস্ত জগদ্ধাত্রী আরাধনা কেবলই নাট্য ছিল। আজ মনে হচ্ছে আমি একজন ভণ্ড। দিবারাত্র জগজ্জননী জগজ্জননী, জগদম্বা জগদম্বা বলে ফিরি, অথচ এই সামান্য বোধও আমার নেই যে, তিনি পরমেশ্বরী হবার অভিরুচিও রাখেন না, তিনি যে শুধুই মা!”
পদ্মচিত্ত খেয়াল করেন নি, কখন দেবী চিত্তা তাঁর পাশ থেকে সরে গেছেন। তিনি শুধু এই বোধই রেখে সমস্ত কথা বলে চলেছিলেন যে, তিনি দেবী চিত্তাকে বেষ্টন করে বিলাপ করছেন। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ এমন বিলাপ করার পর, যখন অবিরাম ভাবে রজনীগন্ধার গন্ধ পেতে থাকলেন তিনি, যখন গোলাপি আভা নিজের অঙ্গে পতিত হতে দেখতে পেলেন, তখন তাঁর হুঁশ ফিরে এলো, আর সম্মুখে তাকিয়ে দেখলেন, চিত্তা নয়, তাঁকে বেষ্টন করে রয়েছেন, মা জগদ্ধাত্রী।
প্রতিক্রিয়া শূন্যভাবে, বেশ কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে পদ্মচিত্ত মাতার দিকে তাকিয়ে থেকে, ভাবের আবেশে বলতে থাকলেন, “মা, তোমাকে তো এক্কেবারেই মাতা সর্বাম্বার ন্যায় দেখতে! কেবল তিনি শুভ্র ও গোলাপি আভা যুক্ত, আর তুমি হরিদ্রাবর্ণা, সূর্যাস্তের আভা যুক্ত!”
দেবী জগদ্ধাত্রী হেসে বললেন, “তা তো হবই বাবা! আমি যেমন তোমার মা, তিনি যে আমার মা! … তাঁরই প্রকাশ আমি। তিনি পূর্ণ, আর আমি তাঁর জগত ধারণের প্রকাশ অংশরূপ”।
আর কনো কথা নয়, পদ্মচিত্ত ছোট্ট শিশুর ন্যায়, নিজের সম্পূর্ণ অবয়বকে মাতা জগদ্ধাত্রীর বক্ষে অর্পণ করে দিলে, দুইবাহু দ্বারা মাতা জগদ্ধাত্রী তাঁকে আলিঙ্গন করে, নিরন্তর স্নেহপ্রদান করতে থাকলে, দেবী চিত্তা এবার মাতার কাছে উপনীত হয়ে, তাঁর চরণস্পর্শ করে বললেন, “আমার শ্বশ্রূমাতাকে প্রণাম, আমার শ্বশুরগৃহের কুলদেবীকে প্রণাম, আমার মাতাতুল্যা ভগিনী, তথা ব্রহ্মময়ী জগজ্জননীর জগতধারিকা জগদ্ধাত্রীকে প্রণাম মা”।
মাতা জগদ্ধাত্রী, চিত্তার থুতনিতে স্নেহস্পর্শ প্রদান করে, সেই হস্ত নিজওষ্ঠে স্থাপিত করে চুম্বন করে, আশীর্বাদ প্রদান করে বললেন, “পুত্রী, আমাদের পুনরায় দেখা হবে, তবে তা শীঘ্র হবেনা। তুমি যেই যেই শব্দপ্রয়োগে আমাকে সম্বোধন করলে, সেই সমস্ত শব্দকে প্রমাণ করতে হবে তোমাকে। সেই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হবার পরেই আমাদের পুনরায় সাখ্যাত হবে”।
মাতা সর্বাম্বা সেই কথাতে মৃদুহাসলে, এবার দেবী জগদ্ধাত্রী মাতা সর্বাম্বার চরণ বন্দনা করে বললেন, “মাতা, মার্গদর্শন করুন আমাকে”।
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “জগদ্ধাত্রী, তুমি আমারই প্রকাশরূপ, তাই আমার মার্গদর্শন তো তোমার হৃদয়ে সদাই অঙ্কিত থাকে। আমি এক্ষণে আমার কন্যাকে বাসায় নিয়ে গিয়ে, তাঁকে তাঁর পতির সাথে সঙ্গমের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করছি। তুমি তোমার পুত্রকে তোমার পতির কর্ম ও কর্মফলের ব্যাখ্যা প্রদান করে, তার মার্গদর্শন করো”।
মাতা জগদ্ধাত্রী নতমস্তকে “যথাজ্ঞা” বললে, দেবী চিত্তাকে সঙ্গে নিয়ে, দেবী সর্বম্বা প্রাসাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করলেন। তাঁরা উভয়ে দৃষ্টির অগোচর হয়ে গেলে, মাতা জগদ্ধাত্রী পদ্মচিত্তের উদ্দেশ্যে বললেন, “পুত্র, তোমার পিতা, মহারাজ চন্দনের একটি কৃত্যের ফলে তাঁর সন্তানদের মধ্যে একটি অপূর্ণতা প্রকট হয়েছে, আর সাথে সাথে, তোমার পূর্বজন্মের কর্মের ফলের কারণে সেই কর্মফল তুমি বহন করছো। … পুত্র, এবার সময় হয়েছে যে তুমি সেই বিষয়ে জানো। বলো, তুমি কোন বিষয়ে প্রথম জানতে চাও”।
বিনম্র পদ্মচিত্ত বললেন, “মা, পিতার কর্মের ফল পিতা বিনা কেউ ভোগ করতে পারবেন না, কারণ কেউ অন্য কারুর কর্মফল ভোগ করেন না। হ্যাঁ তাঁর কর্মফল ও আমার কর্মফল সমদিশা লাভের কারণে, আমি তাঁর পুত্র হয়ে জন্ম নিয়েছি। তাই এটি সঠিক নয় যে, আমি তাঁর কর্মের ফল ভোগ করছি। তার কর্মের ফল তিনিই ভোগ করছেন, আর আমি আমার কর্মের ফল ভোগ করছি। যেহেতু আমাদের দুইজনেরই কর্মফল একই আঙ্গনে স্থিত, সেই হেতুই আমি তাঁর সন্তান। তাই পিতার কর্ম ও সেই কর্মের ফল সম্বন্ধে আমি নিজের কর্ম ও কর্মফল জানার পরই জানতে আগ্রহী”।
পুত্রের প্রকৃতজ্ঞান নেত্র উন্মেলিত থাকার কারণে গর্বিত মাতা জগদ্ধাত্রী আনন্দের সাথে বললেন, “পুত্র, পূর্ব জন্মে তুমি ও তোমার ভ্রাতা ছিলে পতি ও পত্নী, যেখানে তুমি ছিলে পতি ও তোমার ভ্রাতা ছিলেন পত্নী। পুত্র, তুমি ছিলে সন্ন্যাসী স্বভাবের, আর তোমার হৃদয় আমাতেই আবিষ্ট থাকতো। তাই এই জন্মে আমিই তোমার জননী। কিন্তু পুত্র, তোমার রূপে আকৃষ্ট ছিলেন তোমার ভ্রাতা, যিনি সেই জন্মে তোমার স্ত্রী হয়েছিলেন, কেবলই তোমার রূপকে সম্ভোগ করার উদ্দেশ্য নিয়ে।
তবে তাঁর কামনা কেবল তোমাকে সম্ভোগ করা পর্যন্তই সীমিত ছিল, সন্তানের জননী হবার ইচ্ছা তাঁর ছিলনা। তাই তোমাকে সম্ভোগ করে করে, সে যতবারই সন্তানকে ধারণ করে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে, ততবারই আমার নাম করে, সে সেই সন্তানকে জঠরেই নিহত করে দেয়। আর তুমি সন্ন্যাসী স্বভাবের হবার কারণে, না তো সেই কর্মের সম্বন্ধে কনোদিন জানতে চেয়ছ, না জানতে পেরেছ, আর না জানার প্রয়াস করেছ।
পুত্র, তোমার ভ্রাতা আমার উদ্দেশ্যে সন্তান প্রদান করে দেবার জন্য, সে এই জন্মে আমার পুত্র। কিন্তু তোমরা উভয়েই আমার বহু সন্তানকে নিহত করার অপরাধে, এই জন্মে বীর্যগুণহীন নপুংসক। অর্থাৎ তোমাদের বীর্যে সন্তানের জন্ম হবেনা কনো ভাবেই। … এই ছিল, তোমাদের কর্মের ফল, যার কারণে তোমরা উভয়েই এইজন্মে নপুংসক। তোমার ভ্রাতা এই বিষয়ে জানেন, কারণ কামনাবাসনায় তিনি এবারও আবদ্ধ আর তাই মৈথুনক্রিয়ার ফলে তিনি এই সত্য জানেন নিজের ব্যাপারে। কিন্তু পুত্র, তুমি মৈথুনক্রিয়াতে কখনোই যুক্ত হওনি, তাই তোমার এই সত্য জানা ছিলনা। তাই আমি তোমাকে আজ এই সত্য বললাম”।
পদ্মচিত্ত মাথা নত করে বললেন, “সঠিক বলেছ মা। দোষী তো আমি অবশ্যই। সেই সন্তানদের মৃত্যু অনুষ্ঠানের কারিগর যতই আমার বর্তমান জন্মের ভ্রাতা, ও পূর্বজন্মের পত্নী করুক, আমার ভূমিকা যথাযথ ছিল সেই মৃত্যু অনুষ্ঠানে। অংশ বা দায় গ্রহণ না করে হত্যার কারণ হয়ে থাকা, হত্যা করার থেকেও অধিক অপরাধের। তাই আমার কর্মফল যথোচিত মা। … তুমি দুঃখ পেওনা। আমার সাথে কনো অন্যায় হয়নি। আমি আমার কর্মের যথাযথ ফল লাভ করেছি। তবে দুটি বিষয়ে বলার আছে মা এখানে”।
মাতা জগদ্ধাত্রী বললেন, “নিঃসঙ্কোচে বলো পুত্র”।
পদ্মচিত্ত মৃদুহেসে বললেন, “মা, তুমি আমার পিতাকে কথা দিয়েছিলে যে, তুমি এই বংশকে রক্ষা করবে। তাই আমি নিশ্চিত যে, আমার বীর্যগুণ না থাকলেও, আমি তোমার কৃপায় পিতা হতে পারবো। … মা, তুমি দেবী চিত্তাকে তোমার ও তাঁর পুনরায় সাখ্যাত হবার প্রসঙ্গে যা বলেছিলে, আমি তা শ্রবণ করেছি। আর এক্ষণে তোমার কথার সাথে মিলিয়ে আমি এই বুঝতে পারছি যে, তাঁকে কঠিন তপস্যা করতে হবে, তাঁর শ্বশ্রূমাতার উদ্দেশ্যে, তাঁর শ্বশ্রূঘরের কুলদেবীর কাছে, সন্তানপ্রাপ্তির জন্য। …
কিন্তু মা, আমি আমার কর্মের ফলকে যেইভাবে দেখছি, সেই অনুসারে এই দাঁড়ায় যে, আমি পিতৃসুখ লাভের জন্য অযোগ্য, কারণ সেই পিতৃসুখ লাভের প্রতি আমি উদাসীন থেকেই তোমার সন্তানদের হত্যার কারণ হয়েছিলাম। অর্থাৎ এই যে মা, আমার সন্তান তো তোমার কৃপায় লব্ধ হবে, কিন্তু আমি পিতৃত্বসুখ লাভ করার অধিকারী নই। অর্থাৎ সন্তানের জন্ম হয়েছে জেনেই, আমার মৃত্যু নিশ্চিত”।
মাতা জগদ্ধাত্রীর নেত্রের কোনে অশ্রু। তিনি ব্যকুল হয়ে বললেন, “তোমার কষ্ট হচ্ছে না পুত্র!”
পদ্মচিত্ত মৃদু হেসে, নিজের জননীর দুই কপোলকে নিজের দুই করে স্থাপিত করে বললেন, “না মা, আমার তো আনন্দ হচ্ছে। আনন্দ হচ্ছে এই অনুভব করে যে, সমস্ত কর্ম ও কর্মফলের হিসাব এই জন্মে সমাপ্ত হতে চলেছে আমার। অর্থাৎ আমি পুনরায় শুদ্ধ হতে চলেছি। … তোমার সন্তান হয়ে কলঙ্কময় হয়ে থাকার অর্থ, সেই কলঙ্ক আমার অঙ্গে কম লাগবে, আর তোমার অঙ্গে অধিক লাগবে। তাই মা, আমি অত্যন্ত অনুতপ্ত তোমাকে কালিমালিপ্ত করে। সেই কালিমা লেপনের অন্ত হতে চলেছে জেনে, আমার অত্যন্ত আনন্দ হচ্ছে মা। আমার মা কলঙ্কমুক্ত হবে। আমার মা, যিনি সার্বিক ভাবে পবিত্র, পূর্ণশুদ্ধ, তাঁর থেকে কলঙ্কের অবসান হবে। এটি বিচার করেই আমি আপ্লুত”।
মাতা জগদ্ধাত্রী স্নেহের অশ্রুকে নিজের নেত্র থেকে কপোলে পতিত করে গদগদ হয়ে বললেন, “আমার একটি আবদার আছে পুত্র, তুমি কি তা পুড়ন করবে!”
পদ্মচিত্ত আনন্দিত হয়ে বললেন, “এমন বলো না মা, আদেশ বলো। আমার মা আমার কাছে অনুরোধ করতে পারে না। আমি এতটা অহংকারী হতে পারবো না যে আমার মা, জগতের মা, আমার কাছে অনুরোধ করবে। আদেশ দাও মা”।
মাতা জগদ্ধাত্রী অশ্রুসম্বরণ করে বললেন, “পুত্র, সেই কথা বলার পূর্বে আমি তোমার পিতার একটি কৃত্য, আর তাঁর কর্মের কর্মফল সম্বন্ধেও বলে রাখি তোমাকে। পুত্র, তোমার পিতাও একই ভাবে তোমাদের ন্যায়ই আমার গর্ভজাত, কিন্তু তা সত্ত্বেও সে আমার প্রতি বীর্য অর্পণে ব্যকুল থাকে। সন্তানের আবদার থেকে মুখ ফেরানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমি তাঁর সেই আবদার মেটাই। আর সেই আবদার মেটানোর ফলেই, তাঁর বীর্য ও আমার গর্ভগুণে তোমাদের দুই ভ্রাতার জন্ম হয়।
পুত্র, সন্তান হয়েও মাতার প্রতি কামাতুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করার কারণে, তোমার পিতার দুই সন্তানই নপংসুক হয়, অর্থাৎ তাঁদের বীর্যগুণ থাকেনা। আর যেহেতু তোমরাও কর্মফল স্বরূপ সন্তানজন্মদানের গুণ থেকে বিচ্যুত, তাই তোমরাই তাঁর সন্তান হয়ে জন্মগ্রহণ করেছ, যেখানে তাঁর কর্মফল ও তোমাদের কর্মফল একাকার হয়ে যায়, এবং কেউ বিনা কর্মে কর্মফল ভোগ করে না”।
পদ্মচিত্ত হাস্যমুখে বললেন, “কিন্তু পিতা আপনার সাথে মাত্র ৭ বছর সহবাস করেই, নিজের এই ভ্রান্তিতে লজ্জিত হয়ে যান, এবং আপনার প্রতি সম্মান, প্রেম, ও কৃতজ্ঞতার থেকে আপনার নগরজুরে আরাধনার প্রচলন করেন। … মা, তিনি ভুল অবশ্যই করেছেন, কিন্তু তিনি মন্দব্যক্তি নন। হৃদয়বাণ তিনি, স্নেহশীল তিনি, আর আপনার ব্যাপারে আমি যা কিছু জেনেছি, তা তাঁর থেকেই জেনেছি। তিনি আপনাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। জানি আপনি কারুর প্রতিই রুষ্ট থাকেন না। তাও আমার পিতা তিনি, তাই পৃথক করে বলছি মা, তাঁর ভুলকে ক্ষমা করে দিন। আর মা, কৃপা করো এবার। তোমার যেই মনস্কামের কথা বলেছিলে, তা আমাকে ব্যক্ত করো। সন্তান হয়ে মায়ের মনস্কাম পূর্ণ করতে পারা, তা যে সন্তানের হৃদয়ে কতটা প্রশান্তি দেয়, তা তো তুমি জানো মা। তাই কৃপা করে ব্যক্ত করো আমাকে, আদেশ দাও আমাকে”।
মাতা জগদ্ধাত্রী বললেন, “পুত্র, আমি তোমাকে পুনরায় সন্তান করে লাভ করতে চাই। তাই তোমারই কনিষ্ঠ সন্তান, যে তোমার পত্নীর গর্ভে থাকার কালেই তুমি দেহত্যাগ করবে, সেই সন্তান বেশে পুনরায় আমার সন্তান হয়ে আসবে!” নিজের আঁচল ছড়িয়ে, মাতা জগদ্ধাত্রী পুনরায় বললেন, “পুত্র, এই মা তাঁর মাতৃত্বপূর্ণ আঁচল ছড়িয়ে, ভিক্ষা চাইছে তাঁর সন্তানের কাছে। সে কি পুনরায় আমার সন্তান হয়ে আসবে। জানি, তাঁর সমস্ত হিসাব এই জন্মেই সমাপ্ত হয়ে গেছে। ফলে সে এই জন্মেই মোক্ষের অধিকারী। কিন্তু তাও পুত্র, তোমাকে পুনরায় সন্তান করে লাভ করার ইচ্ছা কি পূর্ণ করা যায় এই মায়ের! এই মা কথা দিচ্ছে, স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা নিশ্চয় করবে যে, সে সেই দেহে মোক্ষ অর্জন করবেই”।
পদ্মচিত্ত এবার অশ্রুপূর্ণ নয়নে বললেন, “ছি ছি মা, জগন্মাতা ভিক্ষা চাইবেন কেন! … না মা, না। … এ কি করলে মা! … তুমি আদেশ দিলে, আরো সহস্র জনম গ্রহণ করতে পারি মা। তোমার সুখের জন্য সহস্রবার তোমার সন্তান হয়ে জন্ম নিতে আগ্রহী তোমার এই সন্তান। না মা, এই ভিক্ষাঝুলি প্রদর্শন করো না। তুমি যতই মা হও, তুমি ভুলতে পারো না যে তুমি জগদ্ধাত্রী, পরমেশ্বরীর জগতধারণের প্রকাশ তুমি”।
মাতা জগদ্ধাত্রী হেসে বললেন, “কি করে পুত্র! কি করে স্মরণ রাখি যে আমি ঈশ্বরী! মাতা হবার আনন্দই যে এমন! মাতা হবার আনন্দে যে আমি উন্মাদিনী। সেই উন্মাদনাকে উপেক্ষা করে আমি কি কর এস্মরন রাখবো যে আমি ঈশ্বরী! কি করে স্মরণ রাখবো যে, ব্রহ্মময়ী, পরব্রহ্মস্বরূপা মাতা সর্বাম্বার অভিন্ন প্রকাশ আমি। স্মরণ থাকেনা পুত্র। মাতৃত্বের আস্বাদনের পর, এতটাই উন্মাদনা হৃদয়ে জাগ্রত হয় যে, সমস্ত ধ্যানজ্ঞান হারিয়ে যায়। আমি ঈশ্বরী না পরমেশ্বরী না ব্রহ্ম স্বয়ং, সেই বোধও চলে যায় পুত্র। প্রেম যে এমনই চমৎকারী পুত্র”।
ক্রন্দনে ফেটে পড়ে, পুনঃপুন আলিঙ্গন করে, পদ্মচিত্ত বললেন, “যিনি স্বয়ং সর্বেসর্বা হয়েও, সেই স্মৃতি ত্যাগ করে দেন প্রেমের কারণে, সেই উন্মাদিনীর এই পূর্ণশিশুর ন্যায় আচরণসুলভ আঁচল ছড়িয়ে ভিক্ষা করাকে আমি না তো স্বয়ং কখনো ভুলবো, আর না তোমার কনো সন্তানকে ভুলতে দেবো মা। আজ থেকে যেই জগদ্ধাত্রী মূর্তি নির্মাণ হবে এই চন্দন নগরে, তাঁর আঁচল সর্বদা উন্মুক্ত থাকবে, তাঁর বাহনের পুচ্ছের সাথে সংলগ্ন থেকে তা থাকবে উন্মুক্ত।
তোমার বিশালতার কারণে, এই মূর্তিকে বিশালাকায় করা হয়। তোমার শুভ্র ও স্বর্ণময় আভার কারণে, ইনাকে সর্বদা শুভ্র বা স্বর্ণের বিশালা আভাতে সুসজ্জিত করা হয়। তোমার প্রিয়পুষ্পের কারণে, ইনাকে সর্বদা রজনীগন্ধা পুষ্পে সুসজ্জিত করা হয়। তুমি আমার পিতার জীবনে এসে তাঁকে বর্ণাঢ্য করেছ বলে, তোমার বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত করা হয়। তুমি হৃদয় থেকে উৎপন্ন হয়ে, হৃদয়ে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করো বলে, বিসর্জনের কালে তোমার মুখ নদীমুখি হয় সর্বদা। সেই সমস্ত কিছুর সাথে সাথে, আজ আরো একটি প্রথা যুক্ত হলো যে, তোমার আঁচল সদা প্রসারিত থাকবে”।
মাতা জগদ্ধাত্রী হাস্যবেশে বললেন, “দেবী চিত্তার কনিষ্ঠ পুত্র হয়ে তুমি পুনরায় জন্ম নেবে পুত্র। স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা তোমাকে সন্তানস্নেহে আলিঙ্গন করে রাখবেন। এই প্রতিশ্রুতি দিলাম আমি তোমাকে। এবার তুমি প্রত্যাবর্তন করো, আর ক্রমাগত তোমার স্ত্রীকে প্রেরণা প্রদান করো যেন সে তাঁর কুলদেবীর তপস্যা করে, সন্তানলাভ করে”।
পদ্মচিত্ত “যথাজ্ঞা” বলে পুনরায় মাতা জগদ্ধাত্রীর চরণবন্দনে করে, একেক করে তিনতিনবার ফিরে ফিরে, তাঁকে আলিঙ্গন করে, সেখান থেকে প্রস্থান করলেন ও দেবী চিত্তার কাছে উপস্থিত হলেন।
দেবী চিত্তার দেখা পদ্মচিত্তই প্রথম পুরুষ, যিনি সম্ভোগ ক্রিয়ার প্রতি উদাসীন, অথচ হৃদয়বান। এঁর আগে তিনি মানসকে দেখেছেন, যিনি মাতা সর্বাম্বার কাছে মাঝে মধ্যে সময় নির্গত করে আসতেন, যিনি একজন প্রৌঢ় হলেও ভদ্রপুরুষ। বাকি যতজন পুরুষকে দেখেছেন তিনি, হয় তাঁরা সম্ভোগসুখ লাভের জন্য বিনত, আর যদি সম্ভোগসুখ প্রাপ্তির ক্ষেত্র না হয়, তাহলে তাঁর চরম ভাবে হৃদয়হীন। তাই পদ্মচিত্তের প্রতি দেবী চিত্তার সম্মান ও স্নেহ প্রতিদিন বৃদ্ধি পেতে থাকে, এবং খুব শীঘ্রই তাঁকে নিজের অত্যন্ত আপনজন জ্ঞান করতে থাকেন।
অন্যদিকে মহারাজ চন্দন, এই সমস্ত কিছু যা মা জগদ্ধাত্রী ও চিত্তদম্পতির মধ্যে ঘটেছে, তা সম্বন্ধে অজ্ঞান থেকেই, নিজের কনিষ্ঠ পুত্র, করিমুণ্ডের বিবাহের চিন্তা করতে থাকেন। মোহিনীপুত্রী, হুতা, মিতা, ও স্ফীতার রূপ ও কামাতুরতাতে তিনি প্রভাবিত। করিমুণ্ড তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, পদ্মচিত্তের মত নন। তাঁর স্বভাব অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক ও কামাতুরতায় তিনি ব্যকুল। কামভাব, ও স্ত্রীদের প্রতি কামাকর্ষণ তাঁর প্রবল। তাই একটি পত্নীতে তাঁকে স্থিতু করে রাখা সম্ভব নয়, তা মহারাজ চন্দন জানেন।
সেই উদ্দেশ্যেই তিনি যখন হুতা, মিতা ও স্ফীতা, এই তিন কামাতুর কন্যাকে একত্রে দেখেন, তখনই মনস্থির করে নেন যে, এঁদেরকে করিমুণ্ডের পত্নী করে আনবেন। এঁদের কামুকীতা এবং দেহসৌন্দর্য করিমুণ্ডকে গৃহবন্দী করে দেবে, আর তাই তাঁর কারণে প্রজাস্ত্রীদের মধ্যে যেই আতঙ্ক বিরাজ করে, তার নাশ হবে।
এই সমস্ত কথাকে হৃদয়ে ধারণ করে, দেবী জগদ্ধাত্রীর সাখ্যাত করে, করিমুণ্ডের বিবাহপ্রস্তাব এই তিন কন্যার সাথে দেবার কথা ব্যক্ত করলে, মাতা জগদ্ধাত্রী বলেন, “চন্দন, আরো একবার বিচার করে নাও। পুত্র যেমন, সেই অনুসারে পত্নী প্রদান না করে, যদি পুত্রের চারিত্রিক উন্নতি সাধন করতে পারে, এমন পত্নী প্রদান করতে তাকে, তাহলে অধিক শ্রেয় হতো না!”
মহারাজ চন্দন বললেন, “উচিত কথন আপনার দেবী, কিন্তু বিচার করে দেখুন, সেই কন্যা যাকে করিমুণ্ডকে হৃদয়বাণ করার জন্য নিয়ে আসতাম, সেই কন্যাকে কি পরিমাণ যাতনা সহ্য করতে হতো! আর এর পরেও, করি যেই প্রবৃত্তির, তাতে কিছু লাভ হতো কিনা, তা নিয়ে আমার বেশ সন্দেহ আছে। … দেবী, মাঝখান থেকে সেই কন্যার জীবনটি নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়ে যেত, তাই নয় কি!”
দেবী জগদ্ধাত্রী উত্তরে বললেন, “কথন তোমার সার্বিক ভাবে সত্য, আর আমি তোমার কথনে সম্মতও। কিন্তু চন্দন, হুতা, মিতা ও স্ফীতা সাধারণ কন্যা নয়, মোহিনীকন্যা তাঁরা। আর মোহিনীর স্বভাব তো তুমি জানো। কেবল কামুকী নয় সে, সঙ্গে সঙ্গে সে ভীষণ ভাবে জটিল ও কুটিল। তাঁদের আনায়ন করে এই চন্দনপুরের সকলের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলার ব্যবস্থা করছো নাতো!”
মহারাজ চন্দন চিন্তিত হয়ে বলেন, “তাহলে আপনি কি বলছেন দেবী! … এই বিবাহ প্রস্তাব নিয়ে অগ্রসর হবো না! … বেশ, তাহলে আপনিই আমার মার্গদর্শন করুন, কে এমন আছে যে আমার এই করিমুণ্ড পুত্রের কামবাসনাকে শান্ত করতে পারে! দেবী তাঁর কামনা আর বাসনার কারণে আমার রাজ্যের স্ত্রীরা তটস্থ। সন্ধ্যার পর তাঁরা পথে বার হয়না। করির ছায়া দেখলেও, সেই পথে স্ত্রীরা আসেনা। … দেবী, তাঁকে যে পত্নীমাধ্যমে সেই কামবাসনার তৃপ্তির ব্যবস্থা না করি, তাহলে যে আমার রাজ্যের প্রজাস্ত্রীদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে যাচ্ছে!”
দেবী জগদ্ধাত্রী হেসে বললেন, “না চন্দন, তোমার কথন উচিত। হুতা, মিতা ও স্ফীতার থেকে অধিক কামুকী স্ত্রী এইক্ষণে ধরাধামে নেই। আর তোমার মন্তব্যও উন্নত। পুত্রের কল্যাণচিন্তা করতে গিয়ে, প্রজার অমঙ্গল হয়ে যেতে পারে, তা তোমাকে অধিক ভাবাচ্ছে। তাই চন্দন, তুমি তোমার বিচার করা পথেই চলো। তোমার মন্তব্য প্রজাকল্যাণ যখন, তখন যদি কিছু অনিষ্ট হয়ও, মাতা সর্বাম্বা নিশ্চয়ই তার প্রতিকার করবেন। … তাই এগিয়ে যাও চন্দন”।
চন্দন ধন্যবাদ অর্পণ করে, মানসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন, তাঁর পালিত তিন কন্যাকে পুত্রবধূ বেশে গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু সেখানেও এক অন্য কাণ্ড। মাতা জগদ্ধাত্রীর দ্বারা স্নেহমণ্ডিত ক্ষেত্র চন্দনের নগর, আর তারই মধ্যে রাজপুরের রাজপুত্র করিমুণ্ড। তাই সম্বন্ধ তো অতি শ্রেয়। তাও মানস চন্দনকে সতর্ক করে বলেন যে, হুতা, মিতা ও স্ফীতা মাত্রা অতিরিক্ত ভাবে কামুকী। উত্তরে, চন্দনও করিমুণ্ডের সমস্বভাব বললে, আর কনো দ্বন্ধ থাকেনা।
কিন্তু বাঁধ সারেন তিন রাজকন্যা, হুতা, মিতা ও স্ফীতা। বহুপুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা তিন কামুকী কন্যার বক্তব্য, তাঁরা একটি পুরুষে আবদ্ধ হয়ে থাকবেন না। তাই তাঁরা এই বিবাহ করবেন না। তবে সেই কথা মানস পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে, তাঁদের ভ্রাতা, বীর্যের কানে উপস্থিত হয়। তাই ভগিনীদের সাথে সাখ্যাত করতে, তিন ছুটে আসেন রাজপুরে।
সাখ্যাত করে, বীর্য ভগিনীদের উদ্দেশ্যে বললেন, “এ কি শুনছি ভগিনীরা! … এহেন বিচারও কি করে আনতে পারো নিজেদের মনে!”
দেবী হুতা বিদ্রোহী হয়ে বললেন, “কেন? কেন পারিনা! … একটিই পুরুষের উপর আমরা তিন ভগিনী আমাদের দেহজ্বালা মেটাতে সক্ষম নই। … একটি পুরুষে আমাদের একাকীরই ক্ষুধা শান্ত হয়না, তা একটি পুরুষে তিনজনের ক্ষুধা শান্ত করা কি ভাবে সম্ভব!”
বীর্য নিজের চোয়াল শক্ত করে নিয়ে বললেন, “বড় হয়ে যাও এবার। আর তোমরা ছোট্টটি নেই। … রাজরাণী হয়ে থাকলে, কামাতুরতার সৌখিনতা মেটানোর জন্য তোমরা একাধিক বলশালী পুরুষ পাবে, তার জন্য পতির কি প্রয়োজন! … কিন্তু বিচার করে দেখো, সর্বাম্বার ভগিনী, চিত্তা সেখানে ইতিমধ্যেই স্ত্রী হয়ে গেছেন। বুঝতে পারছো কিছু! সর্বাম্বার রাজ্যবিস্তারের কর্ম চলছে সেই দিকে। যদি তাকে শক্ত হাতে না ধরো, তাহলে আমরা যেমন পূর্বেও কোণঠাসা হয়ে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার পথে গেছিলাম, তেমনই পুনরায় হবো”।
মিতা এবার প্রতিবাদী হয়ে বললেন, “কিন্তু ভ্রাতা, করিমুণ্ড জ্যেষ্ঠ নয়, কনিষ্ঠ পুত্র। আর যতদূর আমাদের কাছে খবর আছে, সেই অনুসারে প্রজার কাছেও পদ্মচিত্ত অধিক প্রিয়। তাই আমরা যদি করিমুণ্ডকে বিবাহ করিও, তাও রাজরানি কি করে হতে পারবো!”
ক্রুর হাস্য প্রদান করে বীর্য বললেন, “আমার প্রিয় ভগিনী, প্রজার রায় অনুসারে রাজ্যস্থাপনের চিন্তা, আত্ম বংশজরা কবে থেকে ধারণ করতে শুরু করলো! নাকি মানসের দ্বারা পালিত হয়ে, নিজেদের বংশ স্বভাব সম্বন্ধে স্মৃতিলুপ্ত হয়েছে তোমাদের! … যাও সেখানে বিবাহ করে। আমি সঠিক সময়ে সেখানে উপস্থিত হবো, আর রাজশক্তি সর্বস্ব স্থান থেকে ছিনিয়ে নিয়ে, তোমাদের হাতে অর্পণ করে দেব। … সর্বাম্বার রাজ্যবিস্তারের কর্মসূচিকে অগ্রসর হতে দিও না ভগিনীরা। তা হতে দিলে, আমরা একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো”।
স্ফীতা পুনরায় বিদ্রোহী হয়ে উঠে বললেন, “আর আমাদের কামাতুরতার কি কনো মূল্য নেই!”
বিরক্তিসুলভ মস্তিষ্ক আন্দোলিত করে বীর্য বললেন, “নেশার পরিবর্তন করো ভগিনীরা। কামাতুরতার নেশা কতকাল ধরে রাখবে? যৌবন তোমাদের আর কিছু বৎসরের মধ্যেই সমাপ্ত হয়ে যাবে। তারপর কি অবশিষ্ট থাকবে এই নেশার সামগ্রী রূপে! এই নেশার দ্রব্য সেবন করারই সামর্থ্য অবশিষ্ট থাকবেনা তোমাদের মধ্যে। তখন কি ভাবে সেই নেশা করবে!… তাই বলছি, এবার সময় এসেছে, নেশার পরিবর্তন করো। কামাতুরতাকে এবার সাম্রাজ্যদখলের, সত্ত্বাদখলের নেশাতে পরিবর্তিত করো। এই নেশা জীবনের অন্তিম কাল পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে ভগিনীরা। তাই সেই নেশার সেবন শুরু করো এবার”।
এবার তিন ভগিনী একত্রে বললেন, “কিন্তু ভ্রাতা, আমরা একাকী এই কাজ করতে পারবো না। চিরকাল কামাতুরতার নেশা করার জন্য, এই রাজনীতি, জটিলতা, এই সবের দিকে তাকাইনি আমরা। তাই …”
বীর্য ক্রুরহাস্য হেসে বললেন, “আমি সঠিক সময়ে, অতি কৌশলে তোমাদের রাজ্যে প্রবেশ করে যাবো। তারপর যেমন যেমন বলবো, তেমন তেমন করবে। … সর্বাম্বাকে কিছুতেই রাজ্যবিস্তার করতে দেওয়া যাবেনা। এই বিবাহের মাধ্যমে, আমরা আমাদের প্রথম রাজত্ব নির্মাণ করবো। … এই রাজ্যের মাধ্যমেই সর্বাম্বা রাজ্যবিস্তারের চিন্তা করছে। তাই তো চিত্তাকে সেখানে পুত্রবধূ করে পাঠিয়েছে। তাই ভগিনীরা, সেখানেই তোমরা যাও। একই সঙ্গে তাহলে সর্বাম্বার রাজ্যবিস্তারকেও বন্ধ করা যাবে, আর আমাদের রাজ্যকেও বিস্তৃত করা যাবে”।
এই ভাবে বীর্য, তাঁর তিন ভগিনীকে বিবাহের জন্য প্রস্তুত করলে, তাঁরা বিবাহতে সহমত হন, আর তাই মানস বিবাহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, বিবাহ দিন স্থির করলেন চন্দনের সাথে মিলে। নির্দিষ্ট দিনে, বিবাহ অনুষ্ঠিত হলো ধুমধাম করে, যাতে চন্দন বেহিসাবি খরচ করে, সমস্ত সোনাদানা লাগিয়ে দিলেন।
তাঁর ধারণা ছিল যে, সেই সমস্ত স্বর্ণরজত তিনি আবারও আয় করে নিতে পারবেন, কিন্তু পরস্পর ৭ বৎসর খরা হওয়াতে, তেজারতিতে ও ভাঁড়ারেও খরা দেখা দেওয়া শুরু করলে, জগদ্ধাত্রী আরাধনা বন্ধ হবার অবস্থায় উপনীত হয়ে যায় চন্দনের নগরে।
