১৬.৩। শ্রীপ্রসার পর্ব
সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখলেন, একটি সম্পূর্ণ রাজ্য যেন সেখানে উপস্থিত। পূজাদির জন্য যা যা পুষ্পলাগে, সেই সমস্ত পুষ্পশোভিত একটি বাগিচা যুক্ত একটি গোলাকার ত্রিতল অট্টালিকা। আর বাগিচার সম্মুখ থেকে প্রসারিত একটি সুউচ্চ প্রাচীর, যার কারণে তার সম্মুখেদাঁড়িয়েও দ্বিতলের কাণ্ডকীর্তি দ্রষ্টব্য হয়না।
সুর ও সকল চিত্তাপরিবার অট্টালিকাতে প্রবেশ করার পূর্বে, সম্পূর্ণ শ্রীপুরের দর্শন করার আগ্রহ প্রকাশ করলে, জয়বিজয় সকলকে নিয়ে ফুলবাগিচা থেকে নির্গত হয়ে, অট্টালিকার বাম পার্শের পুরুষদের স্নানের সরোবরের ধার ঘেঁসে চিত্তাপরিবারকে নিয়ে গেলেন অট্টালিকার পশ্চাৎ অঞ্চলে। সেখানে গিয়ে সকলে দেখলেন ধানের খেত, গমের খেত, ও তাদেরকে বেষ্টন করে রয়েছে আখ উৎপাদন, আলু পেয়াজ ও যাবতীয় সবজী উৎপাদনের ক্ষেত্র, আর তাদের ঠিক মাঝে উপস্থিত একটি মৎস্যচাষের ও হংসপরিব্যাজনের সরবর।
আরো দক্ষিণে ভেড়া, গরু, ছাগ তথা মুরগির চাষ হয়, তারই সাথে তুলার চাষ হয়, যার থেকে বস্ত্র নির্মাণ হয়। সেই সমস্ত কিছু দেখিয়ে আরো দক্ষিণে পশ্চাতের প্রাচিরের কাছে নিয়ে গেলে, সকলে দেখলেন বিভিন্ন ফলের বৃক্ষ। গ্রীষ্মের দুপুর, তাই আম, জাম, জামরুল, লিচু, সমস্ত কিছু সুশোভিত। জয় বিজয় আরো দেখালেন, বেড়ফলের বৃক্ষ, অমৃতফলের বৃক্ষ, বেলগাছ, বিভিন্ন প্রকার লেবু, ও তার সাথে তমাল ও নারিকেল বৃক্ষ, এবং একদম পিছনে সরষের ক্ষেত, যার থেকে তৈল নির্মাণ করা হয়, যা আহারাদিতেও ব্যবহার হয় আবার রাত্রে শ্রীপুরকে প্রজ্বলিত রাখতেও।
সমস্ত কিছু দেখে ছন্দ প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু এই ক্ষেত্রের মধ্যেই সমস্ত কিছুর অবস্থান কেন?”
বিজয় বললেন, “সম্রাট, এই শ্রীপুর নির্মাণের সম্পূর্ণ ভাবনা জয়া ও বিজয়ার। এতে সর্বসাকুল্যে ১৫টি পুরুষ ও ১৮টি স্ত্রী নিবাস করেন। এঁদের মধ্যে ১০টি তন্ত্রপুত্র ও তাঁদেরকে সদ্য ১০ কৃতান্তিকের সাথে বিবাহ দিয়েছেন মাতা শ্রী। আর রয়েছেন ৫টি তন্ত্রকন্যা ও তাঁদের ৫ কৃতান্তিক পতি। আর তার সাথে বিরাজমান জয়া বিজয়া ও মাতা শ্রী। আমরা যখন এতে নিবাস করতাম তখন এতে ৩৫ জন নিবাস করতেন, আর আজকে ৩৩ জন।
এই ১৫টি পুরুষ ক্ষেতের দেখভাল করেন, মৎস্য ও গবাদি উৎপন্ন করেন এবং ফুল ফলের চাষ করেন। স্ত্রীরা, সমস্ত পুরুষদের আনায়ন করা ফুল, ফল, দুগ্ধ, মাস, মৎস্যকে ধৌত ও সাফাই করেন, আহারের যোগ্য করে তোলার জন্য। আর সাথে সাথে ধানের থেকে অন্ন, গমের থেকে আটা, আখের থেকে মিষ্টরস, এই সমস্ত নির্মাণ করেন। সঙ্গে ভেড়ার পশম থেকে চাদর,তুলা থেকে বস্ত্র ইত্যাদি নির্মাণ করেন।
জয়াবিজয়ার অনুসারে, শ্রীপুরের অধিবাসীরা সম্পূর্ণ ভাবে স্বতন্ত্র থাকবেন। কারুর উপর নির্ভরশীল থাকবেনা তারা। তাই পুরুষ ও স্ত্রীরা প্রভাতের ক্ষণ থেকে পরিশ্রম করা শুরু করেন, এবং যতক্ষণ না রৌদ্র ঠিক ভাবে প্রখর হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত এই সমস্ত কর্ম করেন। এই অট্টালিকার নিম্নতলে, এই সমস্ত কর্ম করা হয়। দ্বিতলে রয়েছে রন্ধন ও আহারের স্থান, আর সেখানেই রয়েছে উপাসনার স্থান। আর তারই সাথে মাতা শ্রীর ও জয়াবিজয়ার অবস্থানের কক্ষ। উপাসনার কক্ষেই আমরা সকলে দ্বিপ্রহরে অবস্থান করে কৃতান্ত চর্চা করি, মাতা শ্রীর থেকে বহুবিধ উপলব্ধি ও অনুভব ধারণ করি।
এরপর সন্ধ্যায় সকলে ত্রিতলে চলে যান, যেখানে ৩০টি কক্ষ আছে নিবাসের জন্য, আর যার মাত্র ১৫টিই এক্ষণে পূর্ণ, কারণ ১৫টি দম্পতি সেখানে নিবাস করেন। এই সন্ধ্যা কাল থেকে রাত্রির কাল পর্যন্ত সকলে নিজের নিজের মত করে, যেই অনুভব শ্রীমায়ের থেকে দ্বিপ্রহরে লাভ করেন, তাকে লিপিবদ্ধ করেন। কেউ কাব্য ছলে, তো কেউ চিত্রের রূপে, তো কেউ অন্যের কাব্যকে সঙ্গীতে পরিবর্তিত করে, কেউ গল্প রচনা করে, তো কেউ সেই গল্প, সঙ্গীত ও চিত্রকে একত্রিত করে নাট্য রচনা করে।
আর সেই কর্মের বিরাম আসে, যখন রাত্রের আহার প্রস্তুত হয়, এবং সকলে এসে আহার গ্রহণ করে, সাধন করে নিদ্রা যায়। … এই হলো এখানের কৃতান্তিক সভা, সম্রাট। করিন্দ্র-শাসনের কারণে আমরা বিস্তৃত হতে পারিনি এবং বিভিন্ন স্থানে, সেই সঙ্গীত, নাট্য ইত্যাদি পরিবেশন করে করে, কৃতান্তিক ধর্মের সচেতনতার বিস্তার করতে পারিনি। তবে মাতা শ্রী নিশ্চিত, যখন আপনি সম্রাট হয়ে উপস্থাপন করবেন, তখন তাঁর সন্তানদের আপনি নিশ্চিতই বিস্তারের অনুমতি প্রদান করবেন। আর তখনই কৃতান্তিক ধর্মের যথার্থ বিস্তার হবে”।
ছন্দ বললেন, “এই কর্ম কি রাজপুরে স্থিত হয়ে করা যায়না! … কোথায় পাবো এখন শ্রীকে? চলো আমি তাঁর সাথেই কথা বলবো এই বিষয়ে”।
জয় বিজয় বললেন, “মাতা এখন উপাসনার কক্ষে স্থিত হয়ে উপদেশ দান করছেন। আসুন আমার সাথে সম্রাট। আমরা আপনাদের সেই স্থানে নিয়ে যাচ্ছি”। এত বলে, দক্ষিণে স্ত্রীদের স্নান করার সরোবরের পাশ দিয়ে সম্মুখে এসে দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলেন জয় বিজয়, এবং সকলকে অন্তরে প্রবেশ করালেন। সমস্ত কাজের স্থানকে নিরীক্ষণ করলেন সকলে সেই অট্টালিকার নিম্নতোলে। অতঃপরে, সকলকে দ্বিতলে উপাসনা কক্ষের সমক্ষে নিয়ে গেলেন জয়বিজয়।
সকলে যখন সেখানে উপস্থিত হলেন তখন সকলে একদেখায় দেবী শ্রীকে দেখে মনে করলেন যেন, তাঁর চারিপাশে সমস্ত মহাভাব, পঞ্চভাব ও ভূতদের সমারোহ করে সাখ্যাত মা সর্বাম্বা উপস্থাপন করছেন । দেবী শ্রী সকলকে দেখতে পেয়ে, সকল কৃতান্তিকদের উদ্দেশ্যে বললেন, “সম্রাটকে প্রণাম করে, যে যার নিজের কক্ষে যাও। রাত্রে আহারের কালে তোমাদের সাথে পুনরায় সাখ্যাত হবে”।
শ্রীর কথা মত, সকলে সম্রাট, দেবী চিত্তা ও সকলকে প্রণাম জানিয়ে ত্রিতলে চলে গেলে, এবার জয়বিজয় সকলকে সেই উপাসনা কক্ষেই দেবী শ্রীর কাছে নিয়ে গেলেন। দেবী শ্রী তাঁদের দেখে, নিজের আসন ত্যাগ করে, দেবী চিত্তাকে, সম্রাট ছন্দকে, জ্যেষ্ঠ তালকে, তাঁদের পত্নীদেরকে এবং অন্তে পতি সুরকে প্রণাম করতে প্রস্তুত হলে, দেবী নলিনী তাঁকে প্রাণভরে আলিঙ্গন করলেন, এবং সুর তাঁর স্কন্ধে হাত রেখে কেবল বললেন, “খুঁজে ছিলাম তোমায় শ্রী। কিন্তু খুঁজতে গিয়ে বুঝে ছিলাম, তুমি ধরা না দিলে তোমাকে খুঁজে পায়, কার সাধ্যি। তাই প্রত্যক্ষ ভাবে খোজা বন্ধ করে, স্থানে স্থানে গিয়ে যোদ্ধা নির্মাণ করতাম, আর সর্বক্ষণ আমার দুই নয়ন সর্বদিকে ঘুরতো, যদি তোমার একটি ঝলক কখনো দেখে ফেলি, সেই উদ্দেশ্যে”।
শ্রী হেসে বললেন, “স্বামী, আপনি সমস্ত কিছুই জানেন, তাই নাট্য না করেই বলছি, পতিরূপে স্থাপিত করা একটি পরীক্ষণ ছিল আপনার জন্য। … কিন্তু আপনি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে, প্রমাণ করে দিলেন যে, সন্তান সর্বদা সন্তানই থাকে। তাই স্বামী, আপনাকে এবার সন্তান বেশে আসতে হবে। কেউ অপেক্ষা করছে আপনার সাথে মিলিত হয়ে যাত্রা করবেন বলে। … তা, আপনি কবে তাঁর সাথে কবে যুক্ত হবেন!”
সুর হেসে বললেন, “যবে তুমি চাইবে শ্রী। আমি সর্বদা সর্বকিছুর জন্য প্রস্তুত। তুমি যেই অবস্থায় আমাকে স্থাপিত করবে, আমি সেই অবস্থাতে সহর্ষে অবস্থান করতে সদাগ্রহী”।
শ্রী হেসে বললেন, “জ্যেষ্ঠভ্রাতা এক্ষণে সম্রাট হয়েছেন। তাঁর এখন আপনাকে প্রয়োজন, কারণ রাজ্যস্থাপনের সর্বাধিক অভিজ্ঞতা ও অনুভব আপনার আছে। তাই, আপনার অভিজ্ঞতা দ্বারা তাঁকে সাহায্য করে, অতঃপরে তাঁর সাথে গিয়ে মিলিত হবেন”।
সুর ব্যকুল হয়ে বললেন, “আর শ্রী তোমার সাথে!”
শ্রী মিষ্ট হেসে বললেন, “অন্তিম গন্তব্য”।
সুর নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন যেন সেই কথা শুনে। কিন্তু যিনি উচাটন তিনি হলেন সম্রাট ছন্দ ও দেবী চিত্তা। তাঁরা তাঁদের পুত্রবধূকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান। তাই সম্রাট বললেন, “শ্রী, তুমি এখানে কেন অবস্থান করছো! … আমাদের সাথে আমাদের রাজপুরে চলো। তোমার স্থান সেটি। এই গ্রাম্য এলাকায়া কেন শ্রী!”
শ্রী হেসে বললেন, “সম্রাট বললে আপনি হয়তো বিব্রত বোধ করবেন, তাই জ্যেষ্ঠভ্রাতাই বলছি। ভ্রাতা, আপনার সাম্রাজ্যের কতখানি স্থান জুরে আপনার রাজপুর?”
ছন্দ ব্যকুল হয়েই বললেন, “সামান্যই স্থানে। কিন্তু তার সাথে আমার প্রস্তাবের কি সম্পর্ক?”
শ্রী পুনরায় হাস্যমুখে বললেন, “আপনি আপনার রাজপুরে স্থাপিত থেকে, সত্য বিস্তারের জন্য আবাহন তো করবেন, কিন্তু সত্য বিস্তার হবে কোথায়? রাজপুরে না কি সাম্রাজ্যে?”
ছন্দ বললেন, “অবশ্যই সাম্রাজ্যে”।
শ্রী পুনরায় হাস্য প্রদান করে বললেন, “আর সেই সাম্রাজ্যের সর্বত্র এমনই পরিবেশ যেমনটা পরিবেশ জয়াবিজয়া এই শ্রীপুরে স্থাপন করেছে, তাই না?”
ছন্দ কিছু বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকলে, শ্রী পুনরায় বললেন, “সম্রাট, কৃতান্তিক হলো সত্যধর্ম, আর তার বিস্তার করতে হলে, কৃতান্তিক নয়, সত্যের বিস্তার আবশ্যক। তাই না!”
ছন্দ পুনরায় চুপ করে থাকলে, শ্রী আবারও বললেন, “যখন রাজপুর থেকে কেউ যাত্রা করে সত্যের কথা বলতে যাবেন, তখন প্রজা কি বলবেন জানেন? … বলবেন, থাকেন তো ইনারা রাজপুরে, আমাদের জীবনযাপন সম্বন্ধে কি জানেন তিনি!”
পুনরায় হাস্য প্রদান করে শ্রী বললেন, “তাই মহারাজ, এই শ্রীপুরে স্থাপিত থাকা ব্যক্তিই যদি সত্যবিস্তারের উদ্দেশ্যে আপনার রাজ্যে রাজ্যে ভ্রমণ করেন, তবেই প্রজা মানবেন যে, ‘না, ইনি যখন, ইনারা যখন বলছেন, তখন এটিই সত্য, কারণ ইনারা তো আমাদের মতকরেই জীবনযাপন করেন’। … মহারাজ, জানি সত্য শুনে মেনে নেবার ব্যাপারই নয়। সত্যকে শুনতে হয়, বিচার করতে হয়, বিচারের কালে অসংখ্য জিজ্ঞাসা করতে হয়, অবশেষে তাকে অনুভব করতে হয়। আর যখন সেই অনুভব সঠিক সঠিক ভাবে সত্যের সাথে মিলে যায়, তখন সত্য সম্যক সম্মুখে উপস্থিত হয়।
কিন্তু মহারাজ, জিজ্ঞাসা, বিচার, অনুভব, এই সমস্ত কিছুতো অনেক পরের কথা, প্রথম তো সত্যের কথন শুনতে হবে প্রজাকে। যদি আপনি রাজপুর থেকে এসে সত্যের কথন বলছেন জেনে, প্রজা সেই কথা শ্রবণই না করেন, তবে অনুভব করা পর্যন্ত সমস্ত কিছুর প্রসার হবে কি করে? আর যদি তা না হয়, তবে সত্যের বিস্তার হবেই বা কি করে! আর যদি সত্যের বিস্তার না হয়, আপনারা নিজেরাই রাজ্যের দিকে দিকে ভ্রমণ করে দেখেছেনই তো, অসত্যের বিকাশ সর্বত্র।
অন্ধবিশ্বাসের বিস্তার করার জন্য দিকে দিকে বিভিন্ন ধূর্ত অবস্থান করছেন, যারা প্রজার অন্তরে অন্ধবিশ্বাস স্থাপন করে করে তাঁদেরকে সত্য থেকে বিচ্যুত করে লুণ্ঠন করতে চান। দেখেছেন না? … এবার বলুন, আপনার রাজ্যশাসনের পন্থা কৃতান্তিক অনুসারে হবে, কিন্তু আপনার প্রজা যদি অন্ধবিশ্বাসী হন, যদি মনে জিজ্ঞাসা না ধারণ করেন, যদি বিচার না করেন, যদি হৃদয় দিয়ে অনুভব না করে, মস্তিষ্ক দ্বারা সন্দেহ করেন, যদি আত্ম থেকে মুক্ত হয়ে অনুভব না করে, আত্মের দ্বারা মণ্ডিত হয়ে আবেগে ভাসে, তাহলে কি কৃতান্তিকের বিস্তার বাস্তবে হলো?”
শ্রী পুনরায় বললেন, “বিচার করে দেখুন মহারাজ, পূর্বেও বহুল ধর্মের বিস্তার হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কি তার বিস্তার হয়েছে? না হয়নি। কেবলই কিছু রীতিরেওয়াজ, আচার অনুষ্ঠান স্থাপন করে, ধর্মান্তর করে করে, সেই আচার অনুষ্ঠান, সেই রীতি রেওয়াজ তাদের উপর অর্পণ করে দেওয়া হয়েছে, যাদের বহন করলেই, তাঁদেরকে সেই ধর্মের অনুগামী রূপে চিহ্নিত করে, ধর্মের নাম করে দলাদলি করা হয়েছে। … আপনি কি তারই পুনপ্রচার কামনা করেন মহারাজ?
কিন্তু যেই পথে আপনি চলমান হতে চাইছেন, তা তো সেই পথই, পূর্বেরই পুনপ্রচার। তাই নয় কি? কৃতান্তিকের বাস্তবিক বিস্তার অনুগামী সংখ্যার বৃদ্ধি নয়, ব্যক্তিকে সত্য সম্বন্ধে সচেতন করাতে। তাই মহারাজ, আমাদের প্রয়োজন সত্যের বিস্তারের। স্থানে স্থানে গিয়ে আমার ছেলেমেয়েরা যখন সত্যের বিস্তার করবে। প্রজা যখন তাঁদেরকে হাজারও প্রশ্ন করবে, আর তাঁরা যখন সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে করে, প্রজার মনের অন্ধকারের সমাপ্তি করে করে, তাঁদেরকে অন্ধবিশ্বাস থেকে উদ্ধার করে করে, তাঁদের আত্মকেন্দ্রিক আবেগদের থেকে মুক্ত করে, ভাবের অনুভব করাতে থাকবে, তাই তো কৃতান্তিক ধর্মের মূলকর্মধারা, তাই না মহারাজ?”
সম্রাট ছন্দ বললেন, “কিন্তু শ্রী, পুত্রী আমার… এই বিচ্ছিন্ন স্থান কেন? প্রচার তো তোমার ছেলেমেয়রা করবে। তাঁরা এখানে থাকুক। তুমি তো আমাদের সাথে রাজপুরে চলে যেতেই পারো? পারো না? … আর ঠিক আছে, কুটিরে নিবাস করবে না তোমার ছেলেমেয়েরা! তা রাজপুরের আশেপাশেই তো কুটির নির্মাণ করে থাকতে পারে, তোমার ছেলেমেয়েরা। এতদূরে এই সমস্ত গ্রাম্য পরিবেশে কেন?”
শ্রী হেসে বললেন, “মহারাজ, মাতা চিত্তা তো তাঁর ভ্রাতা সমান দেওর, রাজা করিমুণ্ডের কাছেই থেকে যেতে পারতেন। তিনি আপনাদের সাথে বনে বনে, পংরাজ্যে নিবাস করলেন কেন? … মহারাজ, যেখানে সন্তানের নিবাস, সেখানেই মায়ের নিবাস। মা আর সন্তান যে অবিচ্ছিন্ন মহারাজ। আমার ছেলেমেয়েরা এখানে থাকবে, খেতে কাজ করবে, সমস্ত কাজ করবে, তা রান্না কখন করবে? আহার কি করবে? … সন্তান যদি মায়ের দেহের গন্ধ না লাভ করতে পারে দিনের শেষে, তাহলে যে তারা বাহ্যিক ভাবে না মানলেও, আন্তরিক ভাবে নিজেদের অনাথই মনে করা শুরু করেন।
মহারাজ, আমার ছেলেমেয়রা দিনরাত্র পরিশ্রম করে। প্রভাতে খেতে কাজ করে, স্ত্রীরা সেই খেতের সামগ্রী থেকে ব্যবহারিক বস্তু নির্মাণ করতে থাকে। আর আমি, তাঁদের মা, আর আমার এই দুই পুত্রী, জয়াবিজয়া মিলে তাঁদের জন্য রন্ধন করি। আমরা সকলে মিলে একটি পরিবার মহারাজ। …
আর রইল কথা কুটিরের, রাজপুর থেকে সাহায্য লাভ করে সাধন ও ইত্যাদি কর্ম করা, মহারাজ, আপনার অবর্তমানে জয়বিজয় হবে সম্রাট। তাঁরা তাঁদের মাতাকে বা এই সমস্ত ভ্রাতাভগিনীকে অপার স্নেহ করবে। কিন্তু তাঁদের পুত্ররা যখন সম্রাট হবে, এমন কনো নিশ্চয়তা আছে যে তাঁরাও এই ভাবে কৃতান্তিক প্রচারকদের সহায়তা করবেন?
(ঈষৎ হেসে) নেই মহারাজ। তাই প্রয়োজন স্বনির্ভরতা। এটি একটি তপোবন মহারাজ, আর তপোবনের উপর কারুর কনো অধিকার থাকেনা। না রাজার, না সম্রাটের আর না ঈশ্বরবিনা কারুর। তাই তাঁদেরকে স্বতন্ত্র হতেই হবে, তবেই এক তপোবন নিজের মত চালিত হতে থাকে। বিচার করে দেখুন মহারাজ, শ্রেষ্ঠতম ধর্ম যা এই ধরাধামে স্থাপিত হয়েছে, তারা কারা? বৌদ্ধ ও ইসলাম। কিন্তু মহারাজ পুনরায় দেখুন, রাজা ও রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকার জন্য বৌদ্ধ ভিক্ষা ও সন্ন্যাসকে ধারণ করতে, কি হলো?
তাঁদের যথার্থ অনুগামীর সংখ্যা কমতে থাকলো, আর ক্রমে এমন হয়ে গেল যে, রাজার দেওয়া ভিক্ষা সামগ্রীকেই তাঁরা গ্রহণ করতে থাকলো, আর তাই ক্রমে রাজনীতি তাঁদের উপর প্রভাব বিস্তার করেই ফেলল। ইসলাম প্রথম থেকে শাসকসেবার প্রতি আবিষ্ট ছিল, আর তাই সর্বক্ষণই রাজনীতি দ্বারা পরিচালিত। মহারাজ, রাজনীতিতে যেমন প্রজাসেনার ভাব থাকে, তেমন রাজসিংহাসনকে সুরক্ষিত করা, আগ্রাসনের থেকে মুক্ত থাকা, এবং প্রজাকে অন্য রাজ্যের বিস্তারের থেকে বিমুখ করা, সমস্ত কিছুই থাকে।
আর সেই কারণে প্রায়শই রাজনীতিকে অসত্যের হাত ধরতে হয়। কিন্তু যেই ধর্ম এই রাজনীতি নির্ভর, তাকেও তো তাহলে অসত্যের হাত ধরতে হয়। আর যখন ধর্ম অসত্যের হাত ধরে নেয়, তখন কি আর তা ধর্ম থাকে? না মহারাজ, আর থাকেনা বলেই, গৌতম বুদ্ধ বলে দিলেন, বৌদ্ধধর্মে তাঁর পরে আর কেউ অবতরণ করবেনা, মহম্মদ বলে দিলেন, আর কেউ নবী হয়ে ইসলামকে শিক্ষা প্রদান করবেন না।
বুঝতে পারছেন মহারাজ, যদি কৃতান্তিক ধর্মকেও রাজনীতির আবরণে আবদ্ধ রাখেন, তবে এরও পরিণাম সেইরূপই হবে। আর যদি সেই পরিণাম লাভ করার জন্যই কৃতান্তিকের রচনা করা হয়, তবে তো এর রচনা হওয়ার থেকে না হওয়াই ভালো ছিল। কমসেকম মানুষের কাছে তো এই বার্তা এসে পৌঁছাতো না যে, ঈশ্বর তাঁদের উপর এখনও আশাবাদী। এখনও ব্রহ্মময়ী বিশ্বাস করেন যে তাঁদের পক্ষে সত্যলাভ সম্ভব। কৃতান্তিক ধর্ম নির্মাণ মানুষের কাছে এই বার্তাই প্রদান করেছে মহারাজ যে, ব্রহ্মময়ী এখনও তাঁর সন্তানদের বিশ্বাস করছেন, এখনও তিনি মানেন যে তাঁর সন্তানরা সত্যলাভ করতে সক্ষম, আর তাই তিনি নূতন মার্গ দেখাতে এই ধর্মের রচনা করেছেন।
কিন্তু এই ধর্মকেও যদি রাজনীতির কাছে আশ্রিত করে রাখতে হয়, তবে এই ধর্মের রচনার কারণই বা কি? এরও তো পরিণাম তাই হবে, যা ইসলাম বা বৌদ্ধের সাথে হয়েছে। আর সাথে সাথে এও বিচার করুন মহারাজ, এই ধর্মের চারিপাশে বৈদিক ধর্ম ঘিরে রয়েছে, যা নামেই ধর্ম, প্রকৃত অর্থতে অধর্ম, কারণ তা আত্মের বিস্তার করে, সত্যের নয়। তাহলেই বলুন মহারাজ, যাকে বিপদ প্রথম থেকেই ঘিরে রয়েছে, তাকে যদি রাজনীতির কাছে পরাধীন করে রাখা হয়, তাহলে এঁর ভবিষ্যৎ কি?
কাল যদি বৈদিকদের দ্বারা কনো জম্বুদেশের সম্রাট প্রভাবিত হয়ে যান, তাহলে তো সেই সমস্ত সুবিধা থেকে কৃতান্তিকদের বঞ্চিত করে দেবেন, যা আজ আপনি প্রদান করবেন। তখন এই কৃতান্তিকদের কি হবে, আর এই কৃতান্তিক ধর্মের কি হবে? তাই মহারাজ, এঁর স্বতন্ত্র থাকা অত্যন্ত আবশ্যক”।
সুর এবার এগিয়ে এসে বললেন, “শ্রী সঠিক বলছে ভ্রাতা। আমি বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে করে দেখেছি, কি ভাবে অন্ধবিশ্বাসের বিস্তার করা হচ্ছে নেপথ্যে। সম্রাট হয়ে, আমরা প্রজাকে স্বনির্ভর করতে পারি, আমরা প্রজাকে সুশিক্ষার স্থান করে দিতে পারি, প্রজার অর্থনীতিকে সুরক্ষিত ও উন্নত করতে পারি, প্রজাকে রাজনীতি থেকে সুরক্ষা প্রদান করে তাঁদেরকে সুন্দর সমাজ গঠন করার প্রেরণা দিতে পারি, কিন্তু তাঁদের অন্ধবিশ্বাস দূরীকরণের সামর্থ্য কখনোই এক রাজার বা তাঁর রাজ্যচালনার পদ্ধতির অন্তর্গত নয়, হ্যাঁ অন্ধবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে পারে এক রাজা, কিন্তু নিরাময় করতে পারেন না।
অর্থাৎ ভ্রাতা, প্রজার মধ্যে সত্যের প্রজ্ঞা কিছুতেই জাগ্রত হবেনা, আর তা না হলে, আশেপাশের বৈদিক প্রভাব সহজেই তাঁদেরকে আত্মপ্রেমী করে তুলে আবেগসর্বস্ব করে রেখে দেবে। কখনোই তাঁরা আত্মভাব থেকে মুক্ত হয়ে উঠতে পারবেনা, আর কখনোই তারা ঈশ্বরভাবে সত্যপ্রেমী হয়ে উঠতে পারবেনা। যদি তা নাই পারে, তাহলে এমন একটি মহান ধর্মের অন্যস্থানের কারণ কি? মাতা সর্বাম্বার এমন পরিশ্রমের কি গুরুত্ব থেকে যায় তাহলে?”
ছন্দ চিন্তিত হয়ে বললেন, “কিন্তু সুর, আমার কারণে তুমি আর শ্রী তো ঠিক করে সংসার করতেও পারলে না কনোদিনও!”
সুর হেসে বললেন, “জয়বিজয় আমাদেরও পুত্র, জয়াবিজয়া আমাদেরও কন্যা। আর রইল কথা যৌনসুখের। ভ্রাতা জানিনা, এর পূর্বে কত কত দেহ ধারণ করেছি, তবে নিশ্চিত ভাবে অনেক দেহের জীবনকে নিশ্চয়ই এই যৌনতার আশ্রয় লাভে বিনষ্ট করেছি। এই জন্মে যদি মাতা সর্বাম্বার সেবা করার সামান্যও সুযোগ লাভ করে, সেই সেবাকর্মে নিজেদের নিয়জিত করতে পারি, এর থেকে বড় প্রাপ্তি কি হতে পারে ভ্রাতা? না সংসার এর থেকে বড়প্রাপ্তি, আর না নিজের ঔরসে সন্তানলাভ এর থেকে বড় প্রাপ্তি।
হ্যাঁ যদি যথার্থ কৃতান্তিক বা যথার্থ সম্রাট না উপস্থিত থাকতো, তাহলে আমি বিশ্বাস করি, শ্রী স্বয়ং আমাকে সন্তানপ্রদান করার জন্য উৎসাহী করতো। কিন্তু সম্রাটের আসনে স্থিত হবার জন্য জয়বিজয় আছে, আর কৃতান্তিক রূপে উন্নতি করার জন্য জয়াবিজয়া আছে। তাই আমাদের নিজস্ব ঔরস বা গর্ভজাত সন্তানের কনো প্রয়োজন নেই। তাই আমি শ্রীর এই উন্নত কর্মধারাকে কুর্নিশ করে, তাঁকে পূর্ণ স্বতন্ত্রতা প্রদান করতে চাই।
সে বরাবরই আমার গর্ব ছিল, আর আজ সে যা করেছে বা করতে চলেছে, তাতে আমি শুধু গর্বিত নই, আমার তো ইচ্ছা হচ্ছে, তাকে জননী মেনে আলিঙ্গন করার, আর বলার, মা কখনো তোমার চরণে আমাকেও আশ্রয় প্রদান করে, আমাকে শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্যশালী করে তুলো”।
ছন্দ এবার বললেন, “আমাদের দুই কন্যা, জয়াবিজয়াকে অন্তত আমাদের সাথে প্রস্থান করার অনুমতি প্রদান করো শ্রী”।
শ্রী হেসে বললেন, “আদেশ দিতে পারবো না তাঁদের, কারণ তাঁরা স্বেচ্ছায় আমার কাছে এসেছে, তবে অনুমতি তাঁদের জন্য পূর্ব থেকেই রয়েছে। … তাঁরা আপনাদের অঙ্গজাত সন্তান। তাঁদের উপর আমি কি রূপে অধিকার স্থাপন করি সম্রাট!”
জয়া এগিয়ে এসে বললেন, “পিতা, কৃতান্তিক রাজ্য, তাই কৃতান্তিকই এখানে অন্তিম কথা বলবে আশা করি। আর কৃতান্তিক এই কথা বলে যে, এক অষ্টাদশ বৎসরের উর্ধ্বের যুবক বা যুবতী স্বেচ্ছায় যদি কারুকে নিজের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার দেন, তবেই অন্যকেউ তাঁর জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর যদি তাঁরা তা না করেন, তাহলে তাঁর জীবনের সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার একমাত্র তাঁর নিজের। পিতা, আমি আর বিজয়া দুইজনেই অষ্টাদশ বৎসরের ঊর্ধ্বে আমাদের তনুর বয়স নিয়ে অবস্থান করছি, আর তাই আমরা নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বতন্ত্র। আর সেই স্বতন্ত্রতার ব্যবহার করে, আমরা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে আমরা অন্তিমক্ষণ পর্যন্ত শ্রীমায়ের সাথে থাকবো।
দেবী বিজয়া দেবী নলিনীর কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “মা, বরাবর তুমি শ্রীমায়ের প্রেমের বাখান করতে, আর চোখের জল ফেলতে। তুমি এও দাবি করতে যে, সে তোমার প্রথম সন্তান। … মা তোমার প্রেম তো আমি একটি বয়স পর্যন্ত পেয়েছি, আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা বরং তা পাননি। … তাই মা, অনুমতি দাও আমাকে যাতে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, যিনি শ্রীমায়ের প্রেম লাভ করে বড় হয়েছেন, তিনি রাজ্যের প্রয়োজনে শ্রীমাকে ছেড়ে চলে যাবার পর, তাঁর খালিস্থানকে আমি পূর্ণ করি!”
দেবী নলিনী হেসে বললেন, “একবার যে শ্রীর প্রেম অন্বেষণ করেছে, তাঁর আর কারই বা প্রেমে মন বসবে পুত্রী! এই সত্য আমার থেকে ভালো আর কেই বা জানে। সেই ক্ষুদে বয়স থেকে শ্রীকে আঁকড়ে ধরে আছি আমি। সকলে বলে সে আমার থেকে মাতৃত্ব লাভ করেছে। কিন্তু কে যে কার থেকে মাতৃত্ব লাভ করেছে, তা আমার থেকে ভালো আর কেই বা জানে পুত্রী! … না তোমার ভ্রাতার আমার কাছে মন টিকবে, আর না তোমার। …
হ্যাঁ তোমার ভ্রাতার কাছে রাজকার্য থাকবে, তাই সে ব্যস্ত হয়ে যাবে। সেই দিক দিয়ে সে একপ্রকার থাকবে, কিন্তু আমার স্থির বিশ্বাস, সে ও জয়ও নিশ্চিত ভাবে সময়ে সময়ে শ্রীর কাছে এসে, তাঁর কোলে মাথা রেখে একদিন নিদ্রালাভ করে যাবে। যে একবার শ্রীর কোলে মাথা রেখেছে, তার কাছে না তো জননীর কোল প্রিয় হয়, না পত্নীর কোল আর না সন্তানের কোল। তাই আমি কি করে তোমার উপর জোর খাটাবো।
রাজ্যের প্রয়োজনে আমাকে শ্রীর কোল ত্যাগ করে থাকতে হবে, এতে আমারই বেদনার শেষ নেই। সেই কোল আমার কন্যা লাভ করবে, এর থেকে আনন্দের কিই বা হতে পারে। আমার পূর্ণ অনুমতি আছে পুত্রী। আমি আর দিদি রাজ্যের প্রতি কর্তব্য পালন করবো, আর শ্রী মানবতার প্রতি। তোমার ভ্রাতা রাজ্যের সেবা করবে, আর তুমি শ্রীর কাছে থেকে মানবতার সেবা করো”।
দেবী শ্রীর কাছে এগিয়ে গিয়ে দেবী নলিনী বললেন, “শ্রী, আমার একটিই অনুরোধ। রাজপুরে থাকতে থাকতে জানি অভ্যাস হয়ে যাবে। তাই হয়তো মাঝে মাঝে নয়, আলেকালেই, তোর কথা খুব মনে পরবে। আমাকে তখন একটু এসে, তোর পাশে বিছনা পেতে শুতে দিবি মা!”
দেবী শ্রী নলিনীকে আলিঙ্গন করে বললেন, “মা বলেই তোমাকে ছোটো থেকে মেনেছি। আর মা কি করে অনুরধ করতে পারে? মা তো কেবল আদেশ দেবে। … শুধু তুমিই বা কেন, তোমরা সকলে আমার পরিবার। তোমাদের যখন মন হবে যে রাজকার্যের থেকে একটু বিরত থেকে, একটু আনন্দে দিন কাটাব, তোমরা স্বতঃই এখানে চলে এসে, তোমাদের এই কন্যার কাছে সময় কাটিয়ে যাবে। … আমি জানি … আপনাদের সকলের কাছে, আমি কন্যাই। তাই এই কন্যার কাছে আসতে কখনো কুণ্ঠিত থাকবেন না কৃপা করে”।
শ্রী এবার ছন্দের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহারাজ, আপনার কাছে একটিই অনুরোধ, আমাকে ও আমার এই সন্তানদের কৃতান্তিক কর্ম করার জন্য রাজ্যের সমস্ত স্থানে যাবার অনুমতি প্রদান করুন। আমরা দিকে দিকে প্রসারিত হয়ে, রাজ্যের অধিবাসীদের মধ্যে সত্যবোধ ও সত্যপ্রেমের বিস্তার করতে চাই”।
ছন্দ এগিয়ে এসে, শ্রীর মস্তকে হাত রেখে বললেন, “আমাদের সকলকে তো তোমার কাছে এসে, রাজকার্য থেকে মুক্ত থেকে নিবাস করার অধিকার প্রদান করলে শ্রী, কিন্তু আমার এই ভাইটার কি হবে? সুরকে আমি তোমার সংসর্গে থাকার থেকে আনন্দে কখনো থাকতে দেখিনি শ্রী। তাঁর কি হবে?”
শ্রী হেসে বললেন, “উনি কনো কাজেই কখনো বিরক্ত হননা। উনার কনো বিশ্রামের প্রয়োজন নেই। সত্য বলতে উনি কাজের থেকে বিরত থাকলেই সর্বাধিক বিরক্ত হন। … আপনি তো জানেনই তা ভ্রাতা। তাই উনি রাজকাজ থেকে বিরত থাকবেন, বা থাকতে চাইবেন, এই চিন্তা না করাই শ্রেয়। সেবাই তাঁর কাছে পরমধর্ম। সেবাই তাঁর কাছে সর্বাধিক আনন্দ। আর যা আনন্দ তাঁর, সেই আনন্দলাভের জন্য তাঁকে আরো কিছু যাত্রা করতে হবে মহারাজ। …
মহারাজ, আপনিও জানেন, আপনাদের সকলের সাথে থাকলেও, তাঁর যাত্রাপথ আপনাদের থেকে ভিন্ন। তাই তাঁকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। তিনি তো তাঁর সম্পূর্ণ জীবন, সম্পূর্ণ যাত্রাপথই আমার কাছে উৎসর্গ করে রেখেছেন। তাই তাঁর সমস্ত ভার আমার। তিনি তো আমাকে ছাড়া কারুকে সেই ভার দেবেননা, তাও নিশ্চয় করে রেখেছেন। তাই তাঁর সমস্ত ভার তো আমাকে নিতেই হবে। তাঁকে নিয়ে চিন্তা করবেন না, তবে হ্যাঁ, একটি কথা নিশ্চয়ই বলবো মহারাজ, তাঁকে বিনা আপনারা, ক্ষমা করবেন আমার ধৃষ্টতাকে, কিন্তু সত্য এটিই যে, যা কিছু আপনারা, তার কারণ উনি, কেবল উনিই। তাই তাঁকে বিনা, আপনাদের একপাও চলা উচিত নয়”।
শ্রীর এই কথনের মধ্যে যে কতবড় নির্দেশ ছিল, তা ছন্দ বোঝেনি। বুঝে ছিলেন দেবী চিত্তা ও দেবী নলিনী। তাই শ্রীপুর থেকে প্রস্থানের পর পাঁচ বৎসর ব্যাপী শাসন করার পর, যখন সুর একদিন ভাগীরথীর তটে এসে উপস্থিত হয়ে, শ্রীর কথা ভাবতে ভাবতে ক্রন্দন করতে করতে দেহত্যাগ করলেন, তখন দেবী চিত্তা ও দেবী নলিনী একত্রে এসে ছন্দের উদ্দেশ্যে বললেন, “পুত্র, যাকে বিনা আমাদের এক পাও চলার সামর্থ্য নেই, সে নিজদেহ ত্যাগ করে দিয়েছে। এরপরেও কি তোমার এই সিংহাসনে উপস্থাপনের ইচ্ছা অবশিষ্ট আছে পুত্র!”
ছন্দ মাতার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে বললেন, “মাতা, চলুন আমরা তাহলে এবারে বনবাসে যাই। … বিভিন্ন তীর্থ দর্শন করে করে, আমরাও নিজেদের দেহ ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হই”।
ছন্দের এই কথনের শেষে, তাঁরা সকলে জয়কে সম্রাট রূপে এবং বিজয়কে আমাত্য রূপে স্থাপিত করে, সম্পূর্ণ জম্বুদেশকে তাঁদের কাছে অর্পণ করে, রাজ্য ত্যাগ করে চলে গেলে, জয় ও বিজয় রাজ্যচালনা করতে থাকলেন, এবং সঙ্গে সঙ্গে চন্দননগরের ঐতিহ্য, তথা সেখানের কুলদেবী মাতা জগদ্ধাত্রীর আরাধনা করাতে থাকলেন, আর তারই সাথে সাথে মাঝে মধ্যে শ্রীপুরে, দেবী শ্রীর কাছে সময়ে সময়ে উপস্থাপন করে করে, তাঁর থেকে যেমন আদেশ ও নির্দেশ নিয়ে আসতেন, তেমনই তাঁর কোলে মাথা রেখে শুয়ে নিজেদের চেতনাকে তৃপ্ত করে আসতেন।
আরো বেশ কিছু বছর যেতে, শ্রীর হস্তক্ষেপেই, জয় ও বিজয়ের বিবাহ হয়, এবং তাঁদেরও পুত্রকন্যা হলে, সকলে একত্রিত হয়ে রাজ্যচালনা করতে থাকেন।
এমন চলতে থাকলে, শ্রীর একসময়ে বোধ হয় যেন, কৃতান্তিক ধর্মের বিস্তারকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যাওয়া আবশ্যক। আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি এমন কনো চেতনার ভূমিষ্ঠ হবার ইঙ্গিত পান, যিনি এই অন্য মাত্রায় কৃতান্তিক ধর্মেকে নিয়ে যেতে পারেন। তাই একদিন নিজের সমস্ত সন্তানদের কাছে ডেকে বললেন, “পুত্ররা, পুত্রীরা, আমাকে একটি কথা বলো, কৃতান্তিক ধর্মের সার কথা কি?”
উত্তরে কেউ বললেন, “সত্য জ্ঞান”, তো কেউ বললেন, “সত্য বোধ”। জয়া বললেন, “মা, অনিয়ন্ত্রিত প্রেমই কৃতান্তিক ধর্মের মূল কথা। যিনি প্রেমে নিজের উপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ত্যাগ করেছেন, তিনিই প্রকৃত কৃতান্তিক”।
দেবী শ্রী হেসে প্রশ্ন করলেন, “তা তোমরা তো আজ ত্রিশ থেকে ৬০ হয়ে গেছ, তাই তোমাদের ৬০এর মধ্যে এমন কে রয়েছে যে, সেই প্রকার প্রেম করতে সক্ষম?”
সকলে চুপ করে থাকলে, বিজয়া বললেন, “কেউ নেই মা, আমাদের মধ্যে এমন একজনও নেই। আর সত্য বলতে তার কনো উদাহরণও আমাদের কাছে নেই”।
শ্রী হেসে বললেন, “তাহলে যাও তোমরা। সমস্ত জম্বুদেশ থেকে এমন একটি প্রেমীকে নিয়ে এসো। … আমার বয়স হচ্ছে। সময় ঘনিয়ে আসছে আমারও দেহত্যাগ করার। তাই আমি শ্রীপুরের যোগ্য উত্তরাধিকারের সন্ধান করছি। আর তোমাদের থেকে শ্রেয় সেই উত্তরাধিকারকে কেই বা সন্ধান করতে পারে। … সেহেতু তোমরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে যাও, পালা করে করে, যাতে সেই প্রেমী অর্থাৎ উত্তরাধিকারকে সনাক্ত করে, এখানে নিয়ে এসে, তাঁকে উত্তরাধিকার রূপে স্থাপিত করতে পারো”।
জয়াবিজয়া একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে, চোখে চোখে ঈসারা করলেন, “নিশ্চয় মা কনো নতুন লীলার রচনা করতে চলেছেন আর আমাদেরকে সেই লীলা প্রত্যক্ষ করার আহ্বান জানাচ্ছেন”।
এমন সকলেই নিজের নিজের মত ধারণা রেখে, পালা করে করে দিকে দিকে ছড়িয়ে পরলেন, যাতে সব সময়ে শ্রীপুরের ৩০ পরিবারের মধ্যে ৭-৮টি পরিবার থাকে, শ্রীমায়ের সেবা করার জন্য।
জয়াবিজয়া যাত্রা করতে করতে নিশ্চিত হলেন যে, জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ডের সমাপ্তি হলো এখানেই, তবে এবার শুরু হলো মাতা শ্রীর লীলাকাণ্ড, অর্থাৎ সর্বশ্রী কাণ্ড। এটিই কৃতান্ত কথার অন্তিম অধ্যায় হয়তো, কারণ মাতার সমস্ত কিছুর করা হয়ে গেছে, এবং এবার তিনি মানবিয় হাতে সমস্ত কিছু অর্পণের চিন্তা করছেন।
বিজয়া সেই কথার সমর্থন করে বললেন, “সত্য বচন দিদি। মা জম্বুদেশ থেকে বৈদিকদের বিতাড়িত করে, জম্বুদেশকে আত্মের বিস্তার থেকে রক্ষা করেছেন, কৃতান্তিক ধর্মের স্থাপনা করেছেন, সত্যজ্ঞানের প্রতি মানুষকে আবাহন করেছেন। কিন্তু এতক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত কিছুই ছিল ঐশ্বরিক কর্মকাণ্ড, এবার তিনি মানবিয় কর্মকাণ্ডের সন্ধান করতে আমাদেরকে প্রেরণ করছেন। অর্থাৎ এবার তাঁর অবতারলীলার সমাপনের সময় হয়ে এসেছে। তাই তিনি এটি নিশ্চয় করতে চাইছেন যে, তিনি যেই ধর্মবিপ্লবের রচনা করলেন অবতার বেশে, তা মানবীয় হাত ধরেও প্রবাহিত হোক, আর কৃতান্তিক ধর্ম বহুকাল ব্যাপী মানবতার সেবা করে করে, তাঁদেরকে সত্যকামী ও সত্যগামী করে তুলুক”।
জয়া উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ বিজয়া, সঠিক বলেছ, আমি নিশ্চিত, এবার কৃতান্ত তাঁর চরম ও অনন্যস্তরে উন্নীত হয়েছে, আর তাই এই সর্বশ্রী কাণ্ডে আমরা উপনীত হচ্ছি”।
