জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

চিত্তাদের সকলে অতি স্বচ্ছন্দের সাথে বিনা কনো চিন্তা রেখে, রণসাজে সেজে রণক্ষেত্রের দিকে যাত্রা করলেন, কিন্তু রণক্ষেত্র সম্পূর্ণ রিক্ত। কেউ নেই সেখানে। বিস্ময় তখনও বিরাজমান সুরের মধ্যে যে ভণ্ড তাঁকে আক্রমণ কেন করলো না! কেন সে করিন্দ্রদের দেহ অপসরণ করাতেই একমাত্র সচেতন ছিল! কি যোজনা চলছে করিন্দ্র শিবিরে!

উত্তর পেয়ে গেল সকলে কিছুক্ষণের মধ্যেই, যখন এক বিশাল ছায়া তাঁদের থেকে সূর্যকে প্রায় লুকিয়েই দিল। ক্রমে সেই ছায়া যার, তারই পায়ের শব্দে চিত্তাপুত্ররা একে অপরের কণ্ঠস্বরও শুনতে পেলো না। আর আরো খানিক পরে, সেই ছায়া যার, তার ভূমিতে পদক্ষেপের জেরে ভূমি স্বয়ং থরথর কম্পমান হয়ে উঠলে, কারুর পক্ষেই আর নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না।

ক্রমশ সেই ছায়ার পিছনে থাকা কায়া সম্মুখে এসে যেতে, আর ছায়ার দিকে চিত্তাপুত্রদের মন যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। বিস্ময়সূচক গুঞ্জন সকলের অন্তরে জাগলো, কে এই দানব! কি ভাবে এঁর উৎপত্তি হলো? যদি এমন দানব করিন্দ্রদের সংগ্রহে থাকে, তাহলে করিন্দ্র তাঁকে পূর্বে কেন প্রেরণ করলো না!

দেবী পদ্মিনী ও নলিনী এই দানবের রহস্য ভেদ করে ফেলেছেন, তাঁর রক্তিম নেত্রের দিকে তাকিয়েই, কিন্তু এই দানবের পদচারণের শব্দ ব্যতীত কেউ অন্য কিছু শুনতে অক্ষম, তাই বনবিবিরা তা ব্যক্তই করতে পারলেন না। বরং তাঁরা উপায় সন্ধান করতে থাকলেন যে, কি ভাবে এই মায়াদৈত্যের থেকে সকলকে সুরক্ষিত করতে পারবেন। কিন্তু অনেক বিচার করেও কনো মার্গ পেলেন না তাঁরা।

তাল সেই দানব দেখে ঘাবড়ে গেছেন, কারণ সেই দানবের আকার প্রায় তাঁর ১০ গুণ। এরপূর্বে নিজের থেকে দ্বিগুণ আকারের দানবকে সে পরাজিত করেছে, কিন্তু এক ১০গুণ আকারের দানবের সম্মুখে কিই বা করতে পারে সে!

সুর প্রথমে খানিক বিচার করলো যে, কি করা যেতে পারে। পরমুহূর্তে সে নিজের দেহকে শূন্যে নিক্ষিপ্ত করে, প্রবল বলের সাথে ভূমিতে আঘাত করে, যেই ভুচাপ তিনি প্রদান করলেন, তাকে মুষ্ট্যাঘাত দ্বারা দিশা প্রদান করতে, সেই দানবের চরণের কাছের স্থানের ভূমি অপসারিত হলো আর সেই দানব তাতে পরে গেল।

কিন্তু সেই দানবের আকার এতটাই বিশাল যে, কেবলই জানু পর্যন্ত ভূমিতে প্রবেশ করেছিল তার, আর অনায়সেই সে হস্তের ও বাহুর বল প্রয়োগ করে, সেই ভূমি থেকে নিজের জানুকে মুক্ত করে। কনো উপায় কাজ করছেনা দেখে, সুর এবার সরাসরি কালখড়গ নিক্ষেপ করলেন সেই দানবের দিকে। সেই দানব সেই খড়গকে বাম হস্তে ধারণ করে, উচ্চৈঃস্বরে হাস্য প্রদান করে বললেন, “যার মৃত্যু হয়ে গেছে, তাকে কালখড়গ দিয়ে হত্যা করবি!”

সেই কণ্ঠস্বর এমনই ভয়ঙ্কর যে সকলে নিজেদের কানে চাপা দিয়ে দিলেন। সুর সেই কথন শুনেছে আর শুনে সে নিজের অন্তরে চলা সমস্ত দ্বন্ধের অঙ্ক মিলিয়ে নিয়েছে। করিন্দ্রদের দেহকে এই কারণে অক্ষত বা সামান্য বিক্ষত অবস্থাতে অপসারণের প্রয়াস করছিল ভণ্ড। শৃঙ্খলা ঘৃতকুমারীদের মায়ার বলে, সমস্ত করিন্দ্র ভ্রাতার দেহমিলিয়ে এই বিশালাকায় দৈত্য, যা মৃত হয়েও জীবিত, তার গঠন করা হয়েছে।

অর্থাৎ এই জন্তু না তো জীবিত, আর না মৃত; না তো ভুত, না বর্তমান আর না ভবিষ্যৎ। এর অর্থ এই যে, এ আসলে একটি কল্পনা, যার অন্তরে কনো ইচ্ছাকে স্থাপন করা হয়েছে আর সেই ইচ্ছাকে পুড়ন করাই এঁর একমাত্র চিন্তা। কিন্তু সেই কল্পনা, ইচ্ছা বা চিন্তাকে একটি স্থানেই স্থাপিত করে দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ তাকে বিস্তৃত হতে দেওয়া হয়নি। তাই এই জন্তু আকার তো লাভ করেছে, কিন্তু কনো প্রকার স্বতন্ত্রতা না থাকার কারণে, যেই ইচ্ছাস্থাপিত করে তাঁকে দেহপ্রদান করা হয়েছে, তা পুড়ন হলেই এঁর নাশ হয়ে যাবে।

আর যেহেতু কেবলই একটি কল্পনা এটি, তাই এঁর কালের খাতায় কনো উল্লেখই নেই, আর তাই কালখড়গ এঁর নাশ করতে ব্যর্থ। একমাত্র এঁর যা ইচ্ছা, তা পুড়ন হলে এঁর নাশ হবে, নয় সেই ইচ্ছা পুড়ন হবার কনো সম্ভাবনা না থাকলে, এঁর নাশ হবে। কিন্তু এঁর অন্তরে স্থাপিত করা ইচ্ছা ঠিক কি? অবশ্যই আমাদের হত্যা, কিন্তু কি ভাবে! এ তো এক কল্পনা, সে যদি আমাদের আহারও করে নেয়, তারপরেও তো আমরা জীবিতই থাকবো, কারণ এঁর অন্তরে তো কনো প্রকার জৈবিক ধারাপাত নেই।

অর্থাৎ যেহেতু এঁর দেহগঠন অসম্পন্ন করে রেখে এঁকে কালের থেকে সুরক্ষিত করা হয়েছে, সেহেতু এঁর অন্তরে তো কল্পনা, চিন্তা বা ইচ্ছার স্বতন্ত্র প্রবাহ নেই, আর তা যখন নেই তখন এঁর সেই স্থাপিত ইচ্ছা ব্যতীত কনো কিছু করার ক্ষমতাই নেই! … অর্থাৎ এঁর দেহের বাইরে যা, দেহের অন্তরেও তাই। তাহলে তো সে যদি আমাদের আহারও করে, তারপরেও তো কনো জ্বারন বিজারণ হবেনা। অর্থাৎ আমাদের মৃত্যুও হবেনা। তাহলে একে নির্মাণ করার অন্তরালে যোজনা কি সকলের?

এমন যখন বিচার করছেন সুর, তখন সেই দৈত্য নিচু হয়ে একটি হস্ত তাঁদের দিকে অগ্রসর করলেন, তাঁদেরকে মুষ্টিবদ্ধ করার জন্য। সেই দেখে তাল একটি বিশাল লম্ফ দিয়ে দৈত্যের হস্তের একটি অঙ্গুলি আকর্ষণ করে তাকে ভাঙার প্রয়াস করলো, কিন্তু অঙ্গুলি ধারণই করতে পারলো না। সেই দেখে সুর বললেন, “ভ্রাতা, বৃথা প্রয়াস। এই দৈত্য একটি কল্পনা মাত্র। এঁকে বোঝানো হয়েছে যে সে আমাদের হত্যা করতে সক্ষম, কিন্তু সে আমাদের হত্যা করতে সক্ষম নয়, কারণ সে নিছকই একটি কল্পনা”।

তাল বললেন, “তাহলে উপায় কি? এই দৈত্যকে সামনে রাখা হয়েছে কেন, যদি সে আমাদের হত্যা করতেই না পারে!”

সুর চিন্তিত হয়ে মাথা নাড়িয়ে বললেন, “যোজনা একটা তো আছে, কিন্তু সেটা কি বুঝতে পারা যাচ্ছেনা! … আমার বিশ্বাস, এই দৈত্যও জানেনা যে সেই যোজনা কি। অর্থাৎ দৈত্যের আকার ধারণ করার আগে জানলেও, বর্তমানে সে কিচ্ছু জানেনা। বর্তমানে সে এটুকু জানে যে, তাকে আমাদের ধরতে হবে, আর তাই সে সেটুকুই করবে”।

তাল বললেন, “তাহলে আমাদের করনীয় কি?”

সুর উত্তরে বললেন, “একে বিভ্রান্ত করা। এমন ভাবে একে বিভ্রান্ত করা, যাতে করে, এ ভুলেই যায় যে কি উদ্দেশ্যে তার নির্মাণ করা হয়েছে, আর একবার একে বিভ্রান্ত করে দিতে পারলে, এঁর নাশ স্বতঃই হয়ে যাবে”।

অন্যদিকে, সেই দৈত্য, করিদানব, যে এতক্ষণ সুরের দিকে হস্ত প্রসারিত করেছে, সে তালের দিকে হস্ত প্রসারিত করেছে। সেই দেখে সুর দেবী নলিনীর উদ্দেশ্যে বললেন, “বৌদি, ভ্রাতার কায়াকে অদৃশ্য করে দাও”।

দেবী নলিনী বললেন, “একটি বাণ নিক্ষেপ করো সূর্যের উদ্দেশ্যে, সেই বাণকে দিশা প্রদান করলে, আলোর বিভ্রান্তি নাথের অঙ্গে পরলে, তবেই নাথ অদৃশ্য দেখাবেন”।

সুর তেমন করলে, কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলে দেখলেন তাল অদৃশ্য হয়ে গেলেন। করিদানব তালের অদৃশ্য হয়ে যাওয়াতে হতচকিত ও বিভ্রান্ত অনুভব করে, বারংবার ভূমিতে পদাঘাত করে নিজের হতাশা ব্যক্ত করলে, বেশ কিছুবার তালের দেহ দৃশ্যমান হলো, কিন্তু ভূমিকম্পন স্থির হতে, পুনরায় তা অদৃশ্যই হয়ে থাকলো।

ঘৃতকুমারীরা বেশ বুঝেছেন, মায়ার রচনা করা হয়েছে করিদানবকে বিভ্রান্ত করার জন্য। তাই তাল অদৃশ্য হয়েছে আর তাল হলেন নলিনীর পতি। অর্থাৎ এই মায়া নির্ঘাত সে’ই করেছে। এমন বিচার করে ঘৃতকুমারীরা দেবী নলিনীকে হত্যা করার জন্য বাণ নিক্ষেপ করলে, দেবী পদ্মিনী তা দেখে, সরাসরি তাঁর স্বামী, ছন্দের হস্ত থেকে বাণ ও ধনুক ধারণ করে, মোক্ষম গতি সহ বাণ নিক্ষেপ করলেন ঘৃতকুমারীদের উদ্দেশ্যে।

সেই বাণ নিক্ষেপ দেখে, সুর আরো একটি বাণ সেই বাণের পশ্চাতে নিক্ষেপ করে, সেই একটি বাণকে ৬৪টি বাণে পরিণত করে দিলে, সেই ৬৪টির মধ্যে ১৬টি বাণ দ্বিগুণ বেগ সহ ঘৃতকুমারীদের বাণকে নিষ্ফল করে, বাকি ৪৮টি বাণ ঘৃতকুমারীদের সর্বাঙ্গে নিক্ষিপ্ত হলে, প্রবল বেদনার সাথে ঘৃতকুমারীরা ভূপতিত হলেন। সেই দেখে, তাঁদের জননীরা তাঁদের সহায়তা করতে এলে, এবার দেবী নলিনী প্রকাণ্ড বাণ নিক্ষেপ করলেন, এবং ঘৃতকুমারীদের জননীদের প্রাণ নিয়ে নিলেন।

এই দৃশ্য দেখে দেবী শৃঙ্খলা ও তাঁর কন্যারা অগ্রসর হলে, এবার দেবী পদ্মিনী ও নলিনী একাধারে বাণের বর্ষণ করলে, তাঁরা বাণের বৃষ্টিতে যেন সম্পূর্ণ ভাবে লহু সিক্ত হয়ে উঠলেন। এরই মধ্যে সুর নির্দেশ দিলেন, “বৌদি, শত্রুকে আঘাত সহ্য করার সময় দিতে নেই। আঘাত সহ্য হয়ে গেলে সে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে”।

সেই কথন শুনে দেবী পদ্মিনী পুনরায় বাণ নিক্ষেপ করতে থাকলে, যতক্ষণ না শৃঙ্খলাকন্যারা ধনুর্বাণ নিজেদের হাতে তুললেন, ততক্ষণে দেবী শৃঙ্খলার হৃদয় ভেদ করে দিল, দেবী পদ্মিনীর বাণ। তাঁর শব দেহ ভূমিতে লুটিয়ে পরলে, তাঁর চার কন্যা তাঁর দেহকে ভূমিতে পতিত হবার আগেই ধরে, তাঁর প্রাণ যাতে সম্পূর্ণ নিঃশেষ না হয়, তার প্রয়াস করলেন, এবং সেবা করে তাঁকে জীবিত করার প্রয়াস করলেন।

সেই দেখে সুর পুনরায় বললেন, “আমরা এখানে যুদ্ধ করতে নয়, দণ্ড প্রদান করতে এসেছি বৌদি। তাই সম্মুখে যারা দণ্ডায়মান, তাঁদেরকে যোদ্ধার সম্মান দিয়ে, তাঁদের অপরাধকে লঘু করে দেখার অপরাধ করছেন আপনারা। যোদ্ধা নিরস্ত্র কারুর উপর অস্ত্র প্রয়োগ করেনা, কিন্তু দণ্ডদাতা করে। দণ্ড প্রদান করুন তাঁদেরকে, যাদের কারণে আপনাদের স্বামীরা বনবাসী হয়েছিলেন, যাদের কারণে আপনারা আপনাদের পুত্রদের হারিয়েছেন, যারা আপনাদের সন্তানকে জন্ম দেবার পূর্বেই হত্যা করার প্রয়াস করেছিলেন। যোদ্ধা নয়, নিজেদের অন্তরের পত্নী ও মাতাকে স্মরণ করার সময় এটি”।

এই কথা শুনে উগ্র হয়ে উঠে দেবী পদ্মিনী ও দেবী নলিনী এবার একাধিক বাণ নিক্ষেপ করলে, সেই বাণে লহুস্নাত করে শৃঙ্খলাকন্যাদের হত্যা করলেন। সেই দেখে, ঘৃতকুমারী কন্যারাও তাঁদের মাতার দেহান্ত হবার শোক কাটিয়ে উঠে সরাসরি সুরের উদ্দেশ্যে বাণ নিক্ষেপ করলে, সুর সরাসরি বাণ নিক্ষেপ করে তাঁদের অস্ত্রসমূহকে বিনষ্ট করে দিলেন, অতঃপরে বললেন, “দণ্ড দেবার সময় হলেও, একটি পুরুষ একটি স্ত্রীকে কখনোই হত্যা করতে পারেনা, কারণ পুরুষের কাছে নারীদেহের পীড়া, বেদনা ও মর্যাদার বোধ থাকেনা। … আপনারা বাণ নিক্ষেপ করেছিলেন, তাই আমি তাকে খণ্ডন করেছি, কিন্তু আপনাদের মৃত্যু আমার বৌদিদের হাতেই হবে”।

সেই কথা শুনে ১৬ ঘৃতকুমারী কন্যা একাধারে ধনুর্বাণ ধারণ করে দেবী পদ্মিনী তথা দেবী নলিনীকে আক্রমণ করতে গেলে, সুর বললেন, “একজন ঢাল নির্মাণ করুন, অন্যজন ঊর্ধ্বে বাণ নিক্ষেপ করে বাণের বর্ষণ করুন”। দেবী পদ্মিনী সেই কথা অনুসারে প্রস্তরের পর প্রস্তরকে ঢাল রূপে নিক্ষেপ করতে থাকলেন নিজের বাণের সাহায্যে, তো দেবী নলিনী বাণের জাল নির্মাণ করে, ঘৃতকুমারী কন্যাদের বিদ্ধ করতে শুরু করলে, দেবী মিতা এবার দেবী হুতার কাছে এসে বললেন, “দিদি, ঘৃতকুমারী কন্যাদের কিছু হয়ে গেলে, আমরা আর আমাদের পুত্রদের ফিরে পাবো না। … কিছু করো!”

দেবী হুতা এবার হুংকার ছেড়ে করিদানবকে বললেন, “করি তুমি দেখছো কি, ছন্দকে আহার করো”।

ছন্দের দিকে এবার করিদানব হাত বাড়ালে, সুর আবারও একটি বাণ নিক্ষেপ করলেন যাকে দেবী পদ্মিনী দিশা প্রদান করে, ছন্দকে অদৃশ্যস্বরূপ করে দেবে। কিন্তু এবার ভণ্ড সুরের নিক্ষেপ করা বাণকে খণ্ডন করে দিলে, সুর ও দেবী পদ্মিনীর যোজনা সম্পন্ন হয়না। আর ছন্দের নিকটে হস্ত চলে আসে করিদানবের। সুর সেই দেখে একাধারে সহস্র বাণ নিক্ষেপ করলেন করিদানবের হস্তের উদ্দেশ্যে, কিন্তু করিদানব যে কেবলই এক কল্পনা, তাই কনো বাণই তাঁকে আঘাত করলো না, ছন্দকে সে মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।

সেই দেখে, আর সহ্য করতে না পেরে, তাল নিজের অবস্থান ত্যাগ করে, পুনরায় দৃশ্যমান হয়ে উঠে, করিদানবের পাদুকার কাছে গিয়ে, তাকে ভূমিতে পতিত করার প্রয়াস করলেন, তো অন্যদিকে দেবী হুতা, মিতা ও স্ফীতা আহত ঘৃতকুমারী কন্যাদের সেবা করতে গেলেন, যাতে তাঁরা সুস্থ থাকেন ও পরে তাঁদের পুত্রদের ফিরিয়ে আনেন।

তাল নিজের আচ্ছাদন ত্যাগ করে এগিয়ে তো গেলেন, করিদানবের পাদুকাকে নিজের বলশালী হস্ত দ্বারা আকর্ষণ করারও প্রয়াস করলেন, কিন্তু কিছুতেই তাঁর চরণকে স্পর্শ করতে পারলেন না। সুর এদিক থেকে চিৎকার করে বললেন, “ভ্রাতা, ফিরে এসো, এই দানব একটি কল্পনা, যথার্থ নয়। একে স্পর্শ করা যায়না, কেবল এই আমাদের স্পর্শ করতে সক্ষম, আমরা তাকে নই”।

তাল সেই কথা শুনে দ্রুততার সাথে ফিরে আসার প্রয়াস করলে, করিদানব এবার তাঁকে মুষ্টিবদ্ধ করার প্রয়াস করে। তাই সুর এবার তিনটি বাণ নিক্ষেপ করেন পরস্পর, তিনটি বাণেরই উদ্দেশ্য হয়, একটি করে দর্পণ স্থাপনের, যাতে যেই ধরিত্রীর তাপকে দূরে থাকা সূর্যরূপ দর্পণ প্রতিফলিত করে তাপের প্রকাশ আনে, সেই একই ক্রিয়া নিকটে হয়, আর তাই উষ্ণতা ভয়ানক হয়ে যেতে পারে।

তিনটি বাণ নিক্ষেপ করার কারণ এই যে, সুর জানেন ভণ্ডের গতি কিরূপ। ভণ্ড তাঁর বাণকে বিনষ্ট করার জন্য প্রয়াস করবেই, তবে তার গতি দুটি বাণকে নিষ্ক্রিয় করতে পারলেও, তৃতীয়বাণকে তার গতি নিষ্ক্রিয় করার সামর্থ্য দেবেনা।  যেমন সুর ধারণা রেখেছিল, তেমনই হলো। ভণ্ড এক এক করে দুটি সুরের বাণকে নিষ্ক্রিয় করে, কিন্তু তিনটি বাণের মধ্যস্থিত বাণকে নিষ্ক্রিয় করতে পারলোনা ভণ্ড। আর তাই এক বিশাল দর্পণ সম্মুখে স্থিত করে দিতে সক্ষম হয়ে, ধরিত্রীর সমস্ত তাপকে প্রতিফলিত করলেন সুর।

সেই তাপ সমস্ত মল্লার ভূমিকে জ্বালিয়ে দিতে শুরু করলে, সেই প্রবল উষ্ণতার অনুভব সকলেই করলেন, এমনকি করিদানবও। যতই কল্পনা হোক, সেই কল্পনার ভিত্তি এই ধরিত্রীই হয়। তাই পার্থিব বাতাবরণের পরিবর্তন কল্পনাকে প্রতিসারিত করতে সর্বদাই সক্ষম। সেই বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে, সুর এই কৃত্য করাতে, করিদানব নিজের চরণ উত্তপ্ত মল্লারদেশের বালুকারাশিতে রাখতেই পারলেন না।

সেই দেখে সুর পুনরায় পরস্পর পাঁচটি বাণ নিক্ষেপ করলেন, যাদের ৩টিকে ভণ্ড খণ্ডন করতে পারলেও, দুটিকে খণ্ডন করতে পারেনা সে, আর সেই দুই বাণ করিদানবের পদতলের ভূমিতে প্রকাণ্ড ভাবে আঘাত করতে, ভূমিথেকে সমানে অগ্নিবর্ষা হতে শুরু করে, আর করিদানবকে অতিষ্ঠ করে দেয় তা।

এইভাবে, করিদানবকে নিজের উদ্দেশ্যতে কিছুতেই সফল হতে দিচ্ছিলেন না সুর। তবে সুরের তথা সকলের সম্পূর্ণ মনোযোগ তখন করিদানবের দিকে। সেই সুযোগ নিয়ে, ভণ্ড সেই স্থান থেকে প্রস্থান করে একটি প্রস্তরের আড়ালে গিয়ে, একটি বাণ নিক্ষেপ করলেন গগনের দিকে, যা একটি বিশেষ প্রকারের বায়ুদ্বারা সমস্ত স্থানকে ভরিয়ে দিলে, দেবী হুতা, মিতা, স্ফীতা সহ সমস্ত ঘৃতকুমারী কন্যা, তথা দেবী পদ্মিনী নলিনী ও সকল চিত্তামিত্ররা মূর্ছা গেলেন।

আর যখন সকলের মূর্ছা ত্যাগ হলো, তখন সকলে দেখলেন, সুর, তাল আর ছন্দকে একটি সমান্তরাল রেখায় স্থিত করে, করিদানব তাঁদেরকে ভক্ষণ করার জন্য উদগ্রীব, আর ভণ্ডকে দেখলেন একটি বিশাল আকারের বাণকে নিজের ধনুকে স্থিত করে রেখেছেন, যাকে তিনি তাক করে রেখেছেন চিত্তাপুত্রদের দিকে।

সমস্ত কিছু ভণ্ডের কীর্তি, সেই অনুভব করে, দেবী হুতা, মিতা ও স্ফীতা আনন্দিত হয়ে বললেন, “নিক্ষেপ করো ভণ্ড, ত্রিদেবাস্ত্র নিক্ষেপ করে, চিত্তাপুত্রদের হত্যা করো”।

দেবী পদ্মিনী ও নলিনী সেই কথা শুনে ব্যকুল হয়ে উঠে, একের পর এক অস্ত্র নিক্ষেপ করা শুরু করলেন ভণ্ডের উদ্দেশ্যে। তারই সাথে সমস্ত চিত্তামিত্ররাও একই প্রয়াস করলেন। কিন্তু সেই দেখে ঘৃতকুমারীকন্যারাও সকলকে নিরস্ত্র করে ভণ্ডকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়াস করলে, এবার দেবী পদ্মিনী ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে একটি মোক্ষম বাণ নিক্ষেপ করলেন ঘৃতকুমারীদের উদ্দেশ্যে, আর তা হলো সুর তাঁকে উপহারে একটি কালাগ্নি বাণ দিয়েছিলেন, সেই বাণ। অমোঘ সেই অস্ত্র ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্ততার সাথে ঘৃতকুমারীদের সম্মুখে এসে, তাঁদের সম্পূর্ণ ভস্মে পরিণত করে দেওয়া শুরু করলে, দেবী হুতা, মিতা ও স্ফীতা আর্তনাদ করে উঠলেন, “এবার আমাদের পুত্রদের কে ফিরিয়ে আনবে, হা বিধাতা! … করি হত্যা করো চিত্তাপুত্রদের। নাশ করে দাও তাঁদের… ভণ্ড, কিসের অপেক্ষা করছো, নিক্ষেপ করো ত্রিদেবাস্ত্র আর বধ করো ওই চিত্তাপুত্রদের। আমার পুত্ররা যখন আর ফিরবে না, তখন এঁরাও আর ধরিত্রীতে থাকবেনা”।

এই বলে তাঁরা স্বয়ং মুশল ধারণ করে দেবী পদ্মিনী ও নলিনীকে আক্রমণ করতে এলে, ভণ্ড সেই অমোঘ বাণ নিক্ষেপ করে দিলেন। সেই দেখে দেবী পদ্মিনী ও নলিনী জানুর উপর ভর দিয়ে পতিত হয়ে গিয়ে, উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করে উঠলে, চোখের নিমেষে কি যে হয়ে গেল, তার সম্বন্ধে কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারলো না। … একটি ভয়ানক অন্ধকার, একটা ভয়াবহ শূন্যতা যেন কালের থেকেও ভয়ঙ্কর গতি ধারণ করে কোথা থেকে ছুটে এলো আর তা ত্রিদেবাস্ত্রকে ত্রিখন্দিত করে, ভস্ম করে দিয়ে, করিদানবের মুণ্ডছেদ করে, হুতা, মিতা ও স্ফীতাকেও ধরাশায়ী করে অন্তিম নিশ্বাস ত্যাগ করার দিকে প্রেরিত করে দিল।

সুউচ্চ স্থান থেকে পতিত হয়ে সুর, তাল ও ছন্দ যতসামান্যই চোট পেয়েছিলেন, আর স্বামীদের ফিরে পেয়ে, ছুটে গলেনে তাঁদের পত্নীরা, তাঁদের পতিদের আলিঙ্গন করতে। আর কি হয়ে গেল, তা অনুভব করতে না পেরে, ভণ্ড জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে, দুই যুবকের হুংকার সকলের নজর তাদের দিকে দৃষ্টি নিয়ে গেল।

দুই বলবান সুন্দর দেখতে যুবক, শুভ্রবস্ত্র পরিধান করে, দণ্ডায়মান। একজনের হস্তে একটি ধনুর্বাণ, তো অন্যজনের হস্তে তাঁর নিজের আকারের সমান একটি খড়গ ধারণ করে আছেন, যার দিকে ঠিক করে কেউ তাকাতেও পারছেন না, তাঁর থেকে যেই পরিমাণ আলোক নিশ্বসিত হচ্ছে, তার জন্য। ধনুর্বাণধারি ঊর্ধ্বে বাণ নিক্ষেপ করে, সুরের স্থাপিত দর্পণকে চূর্ণ করে, মোল্লারাজ্যের তাপমান কমিয়ে আনলে, সুর তাঁদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “কে তোমরা? আমার বাণের প্রভাবকে নষ্ট করতে পারে যেই যুবক, সে তো সামান্য কেউ হতে পারেনা!… কি তোমাদের পরিচিয়, আর এই মহাখড়গই বা কি? এমন কনো অস্ত্রের কথা আমাদের তো জানা ছিলনা!”

খড়গধারি যুবক মৃদুহাস্য প্রদান করে বললেন, “আমার নাম জয়, আর এই আমার ভ্রাতা বিজয়। আমি জন্ম গ্রহণ করেছি সম্রাট ছন্দের ঔরস থেকে এবং মাতা পদ্মিনীর গর্ভ থেকে, আর বিজয় জন্মগ্রহণ করেছে মহাবলশালী তালের ঔরস থেকে এবং মাতা নলিনীর গর্ভ থেকে। আর আমাদের বড় করেছেন যিনি, তিনি হলেন মাতা শ্রী। তিনিই আমাদের মাতা সর্বাম্বার অস্ত্র, পরমাশূন্য চিহ্নিত এই মহাকৃপাণ প্রদান করেন আর বলেন, ‘তোমার পিতারা সঙ্কটে আছেন, একমাত্র এই মহাকৃপাণই তাঁদের শত্রুর নাশ করে, তাঁদের সুরক্ষিত করতে সক্ষম। তাই এই অস্ত্র ধারণ করে এই স্থানে আমাদের প্রেরণ করেছেন”।

এই কথন শুনে আপ্লুত দেবী পদ্মিনী ও নলিনী দৌড়ে আসতে থাকলেন তাঁদের পুত্রদের আলিঙ্গন করার জন্য, আর ভণ্ড সেই মাতাদের হত্যা করার জন্য বাণ নিক্ষেপ করলেন। সুর সেই দেখে বাণ নিক্ষেপ করে, ভণ্ডের সেই বাণের নাশ করে, পরস্পর বাণে ভণ্ডকে জেরবার করে দিয়ে, তার হস্ত থেকে ধনুক ফেলে দিয়ে, তাঁর ছাতির কবচকে ধ্বংস করে দিয়ে, পরবর্তী বাণে তাঁর ছাতিকে সম্পূর্ণ ভাবে চিড়ে দিলেন, আর সত্য বলতে, ভণ্ড ঠিক করে দাঁড়াতেও পারলো না সুরের সম্মুখে। যেন কিছু বোঝার আগেই সুর তাঁর সম্যক বিনাশ করে দিলেন।

সমস্ত বৈদিক আক্রমণ সমাপ্ত হলো সেই কালের মত। করিকুলের নাশ হলো সম্যক ভাবে, তাঁদের সমস্ত মিত্র, শাখা, প্রশাখা, মায়া, ধূর্ততা, সমস্ত কিছু সহ। সকল চিত্তামিত্রদের মধ্যে উল্লাস প্রসারিত হলো। আর অন্যদিকে, দেবী পদ্মিনী ও দেবী নলিনী সম্মুখে এসে, তাঁদের পুত্রদের সর্বাঙ্গ স্পর্শ করে, নিজেদের বিস্ময়কে ধারণ করলেন।

দেবী নলিনীর স্থির বিশ্বাস ছিল, তাঁদের পুত্রদের কিচ্ছু হতে দেবেনা শ্রী। … আর তাই সত্য প্রমাণিত হলো। মাতা পুত্রদের মধ্যে অনেক বার্তালাপ হলে, জয় বিজয়ের পিতারাও পুত্রদের আলিঙ্গন করে মহানন্দ লাভ করলেন। এমন যখন বার্তালাপ চলছে, তখন সুর সেখানে উপস্থিত হয়ে কুণ্ঠিত হয়ে বললেন, “তোমাদের মাতা শ্রী কেমন আছেন! … কোথায় আছেন? আর আমাদের কন্যারা, জয়া আর বিজয়া?”

জয়বিজয় এবার নিজেদের স্থান থেকে চ্যুত করে, নতজানু হয়ে সুরকে প্রণাম করে বললেন, “আমাদের ভগিনীরা মাতা শ্রীর সাথেই অঙ্গাঙ্গী ভাবে বিরাজ করছে। আর মাতা শ্রীকে কেন্দ্র করে তাঁরা একটি আশ্রম স্থাপন করে, তাতে নিবাস করছেন। চলুন আপনারা সকলে, মাতার সাথে সকলকে মিলিয়ে দিই”।

ছন্দ বললেন, “পুত্র, আগে আমাদের রজাধানি দৃষ্টান্তপুরে ফিরতে হবে। সেখানে আমাদের জন্য, আমাদের  মুখ চেয়ে সমস্ত প্রজা অপেক্ষা করছে। তাঁদেরকে সুসংবাদ প্রদান করে, রাজসিংহাসনে স্থাপিত হয়ে, প্রথমে সম্পূর্ণ জম্বুদেশের মানুষের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে হবে, তবেই আমরা আমাদের কর্তব্যভার থেকে মুক্ত হয়ে, শ্রীর কাছে যাত্রা করতে পারবো।

জানি শ্রীর কারণেই আজ আমরা জীবিত। তাঁর কাছে সেই বিষয়ে কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করা সর্বাধিক প্রয়োজন। কিন্তু এক সম্রাটের কাছে রাজ্য ও প্রজার থেকে ঊর্ধ্বে সে তো স্বয়ংও নয়। তাই যেখানে স্বয়ংই নেই, সেখানে স্বয়ংএর কৃতজ্ঞতাও নেই। … তাই আগে পুত্র, সেই কর্তব্য পালন করি। অতঃপরে শ্রীর কাছে গিয়ে, আমাদের কুলবধুকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো আমাদের কাছে”।

জয় বললেন, “সাখ্যাত করে আসতে পারেন পিতা, তবে তিনি আর ফিরবেন না রাজপুরে, আর হয়তো জয়া বিজয়াও ফিরবে না, তাঁদের মাকে ছেড়ে। … এমনই আমাদের ধারণা হয়েছে তাঁর সাথে এতকাল থেকে। সত্য বলতে তিনিই আমাদের জননী, কারণ তিনিই আমাদেরকে লালন করেছেন, পালন করেছেন, আর সত্য বলতে একটি সময়ের জন্যও নিজের অধিকার বিস্তার করেন নি আমাদের উপর। সর্বদা আমাদের প্রকৃত জনকজননীর ব্যাপারে স্মরণ করাতে থেকেছেন আমাদেরকে, আর বলে গেছেন যে এই রাজ্যের আমাদেরকে প্রয়োজন। তবে তাঁর আর এই রাজপুরে প্রত্যাবর্তনের কনো ভাবনা নেই, এমনই আমাদের মনে হয়ছে। এই রাজপুরের ব্যাপারে, তিনি সম্পূর্ণ ভাবে উদাসীন”।

সুর বললেন, “কি অপরাধ করে ফেলেছি আমরা পুত্র, যার জন্য সে আমাদের উপর ক্ষিপ্ত!”

জয় বললেন, “তাত, তিনি ক্ষিপ্ত কিনা, তা বলতে পারবো না। তবে হ্যাঁ, পিতার বিষয়ে আমরা যতবার প্রশ্ন করেছি, ততবার তিনি আমাদের যাতে পিতার প্রতি সম্মান নষ্ট না হয়, তার জন্য বিশেষ প্রয়াস করতেন তিনি। আমরা যতটা চিনি তাঁকে, সেই অনুসারে তিনি তখনই কনো কারুকে সম্মান প্রদান করার অধিক প্রয়াস করেন, যখন তিনি এমন কিছু কাজ করেন যা সম্মানহানির”।

বিজয় বললেন, “আমরা বহুবার প্রয়াস করেছি তাঁর থেকে সেই কথা জানার। তিনি একটিই কথা বলেছেন আমাদেরকে যে, তিনি তোমাদের জ্যেষ্ঠ। আর জ্যেষ্ঠের ভুলত্রুটি নিয়ে বিচার করলে, তাঁর প্রতি সম্মানহানি হয়। তাই সেই কর্ম থেকে বিরত থাকো। আরো বলতেন তিনি, মানুষ মাত্রই ভুল হয়, তোমাদের জ্যেষ্ঠও করেছেন, কিন্তু মানুষের সর্বাধিক বড় গুণ হলো, নিজের করা ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, আর তিনি তা করেছেন। অর্থাৎ মানুষ হিসাবে তিনি সত্যই সম্মানীয়”।

ছন্দ সম্মুখে এসে বললেন, “হ্যাঁ ভুল নয়, আমি অপরাধ করেছি। শত্রুকে দেওয়া বচনকে মান্যতা প্রদানের অপরাধ করেছি। সেই একই শত্রুকে বিশ্বাস করে, তাঁদের শত্রুতার কথা ভুলে গিয়ে, তাঁরা আমাদের জননীকে নিয়ে কি অরুচিকর মানসিকতা রাখতো, তা ভুলে গিয়ে, তাঁদেরকে কেবল ভ্রাতা জ্ঞানে, তাঁদের কাছে নিজেদের অন্তঃসত্ত্বা পত্নীদের দায়িত্ব অর্পণ করে, তাঁদের, তোমাদের আর শ্রী তথা মাতার জীবনকে সঙ্কটের মধ্যে স্থাপিত করেছি আমি।

জ্ঞানী তিনি নন, হৃদয়বান তিনি নন যিনি নিজের ধারণাকে মান্যতা প্রদান করেন। শত্রুর শত্রুবেশকে না দেখে, তাদের ভ্রাতারূপে দেখা, এটি হৃদয়বানের পরিচয় নয়, এটি অহংকারের প্রতীক। এইটি এই পরিচয় প্রদান করে যে, যথার্থকে মান্যতা প্রদান না করে, নিজের ধারণাকেই, আত্মের ধারণাকেই সত্য জ্ঞান করা। যেখানেই আত্মের বিস্তার, সেখানেই অহংকার। আর তাই আমার সেই সিদ্ধান্ত ছিল অহংকারময় সিদ্ধান্ত। আর অহংকারময় সিদ্ধান্ত কখনো ভুল হতে পারেনা, তা অপরাধ হয়।

জ্ঞানী তো আমি নয়ই, কারণ জ্ঞানী কনো ধারণা রাখেন না। তিনি কেবল যথার্থকে স্বীকার করেন, আর ভ্রমকে ত্যাগ করেন। কিন্তু আমি! … আমি তো ভ্রমকেই স্বীকার করেছি আর যথার্থকে ত্যাগ করেছি। … আমি অপরাধী পুত্র। জানি তিনি সর্বপ্রকার প্রয়াস করেছেন যাতে এই সমস্ত কথা তোমাদের না বলতে হয়, কারণ এই সমস্ত কথা শুনলে, তোমাদের হয়তো তোমাদের পিতাকে আলিঙ্গন করার ইচ্ছাও চলে যেত। আমি অজ্ঞানী, কিন্তু সে তো নয়।…

সে তো স্বয়ং মাতৃরূপা। … পুত্রের হৃদয়ে পিতার প্রতি বিষ তিনি কি করে স্থাপন করতে পারেন! তিনি যে প্রকৃত হৃদয়বতী। … কি আর বলবো তোমাদের মাতার ব্যাপারে। সেদিন তিনি ছিলেন বলেই, তোমরা জন্ম নিতে পেরেছিলে; সেদিন তিনি ছিলেন বলেই আমরা আমাদের মাতাকে সুরক্ষিত পেয়েছি; সেদিন তিনি ছিলেন বলেই আমরা আমাদের পত্নীদের ফিরে পেয়েছি; আর সেদিন তিনি ছিলেন বলেই, আজ আমরা তোমাদের পুনরায় ফিরে পাচ্ছি”।

বিজয় হেসে বললেন, “শুধু আমরা নই জ্যেষ্ঠতাত, শ্রীমাতার সন্ধান করতে নির্গত হওয়া আমাদের ভগিনী, দেবী জয়া ও বিজয়াকেও অপহরণ করেছিল ভণ্ড। তাদের আসল পরিচয় না জেনেই, তাদেরকে করিন্দ্রের কাছে বিক্রয় করে দিয়ে, করিন্দ্রের সম্ভোগের পাত্রী করতে সচেষ্ট হয়েছিল এই নরাধম। সেদিনও মাতা শ্রীই তাঁদের সম্মুখে এসে, ভণ্ডকে গঙ্গায় নিক্ষেপ করে, আমাদের ভগিনীকে সুরক্ষিত এবং নিস্কলঙ্কিত রূপে ফিরিয়ে আনেন”।

জয় বললেন, “শুধু এই নয় পিতা, ভগিনীদের যখন সুরক্ষিত করতে গেছিলেন, তখন করিন্দ্র চন্দননগর দুর্গকে বিনষ্ট করে দেয়। অতঃপরে তিনি সেই ১৫ তন্ত্রসন্তানদের নিয়ে আসেন, যাদের ক্ষুধা না মেটাতে পারার কারণে আপনারা অভিশপ্ত হয়ে যেতে পারেন, এমন ধারণা করে তাঁদের ত্যাগ দিয়ে এগিয়ে গেছিলেন। মনে পরছে পিতা, সেই ১৫ তন্ত্রসন্তানদের কথা, যাদেরকে কেউ তিন রাত্রি স্তনদান করে, বাল অবস্থায় স্থিত করে দিয়েছিলেন!”

ছন্দ বললেন, “হ্যাঁ মনে আছে। আজও নিজেকে অপরাধী মনে হয় সেই কারণে! কিচ্ছু করতে পারিনি তাঁদের জন্য!”

বিজয় হেসে বললেন, “জ্যেষ্ঠপিতা, আপনি করেন নি, কিন্তু মাতা শ্রী করেছিলেন। তিনিই তো সেই স্তনদাত্রী ছিলেন। আর তাঁদের জননীও। আর তাই তো তাঁরা তাঁদের জননীর সাথে পুনর্মিলিত হয়ে, চন্দননগরে এসে, করিন্দ্রের যুদ্ধতরীকে নাশ করে চন্দননগরকে সুরক্ষিত করেছিলেন”।

দেবী পদ্মিনী উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “কিন্তু তা কি করে হয়! শ্রী তো নিজে জননী হয়ই নি! যে নিজে জননী হয়নি, তার স্তনযুগল দুগ্ধ কিভাবে প্রদান করতে পারে!”

সুর এবার মিষ্ট হাস্যে বললেন, “জগন্মাতার স্তন কি ভাবে দুগ্ধ রহিত থাকতে পারে!”

সুরের এই কথাতে তাল ও ছন্দ বিস্মিত হয়ে উঠলে, সুর পুনরায় বললেন, “এখানে মহারাজ নিষ্ঠাবান বিরাজমান। তাঁকেই প্রশ্ন করে নিন। আমার বিশ্বাস, তিনি জানেন খুব ভালো করে যে মাতা সর্বাম্বাই তাঁর পুত্রী হয়ে এসেছিলেন”।

সেই কথাতে, এই কথা গোপন করার অপরাধ বোধের কারণে, মহারাজ নিষ্ঠাবান মাথা নিচু করে নিলে, সুর আবারও বললেন, “দেবী নলিনী তাঁকে মাতৃস্নেহে লালনপালন করেছেন, তিনিও নিশ্চিত ভাবেই তাঁর সত্য ধারণা তো করেইছেন। আর আমার বিশ্বাস যে, সেই কারণেই তিনি দৃঢ় বিশ্বাস রাখতেন যে, না শ্রীর কিছু হতে পারে, আর না তাঁদের পুত্রদের, কারণ তিনি তো জানেন, জগন্মাতার কোলের থেকে সুরক্ষিত স্থান কনো সন্তানের জন্য হতে পারেনা”।

দেবী নলিনীর দিকে এবার সকলে তাকালে, তিনিও নিজের মাথা নিচু করে নিলেন। তাই সুর আবার বললেন, “আর আমার স্থির বিশ্বাস যে, নিজের মাতাসমান জ্যেষ্ঠাভগিনীকে প্রথমদেখা মাত্রই, আমাদের জননী, দেবী চিত্তা তাঁর সত্য জেনে গেছিলেন”।

ঈষৎ হাস্য হেসে, সুর আবার বললেন, “সেদিন যখন তন্ত্রসন্তানদের ক্রন্দন রাত্রে থেমে যায়, আর আমি পাশে শ্রীকে দেখতে পাইনা, তখনই আমি জানি যে, দয়াময়ীর হৃদয় কেঁপে উঠেছে সেই ক্রন্দন শুনে আর তিনি তাঁদের ক্রন্দন থামাতে গেছেন। আর পরে যখন দেখি যে তিন দিবস তাঁদেরকে কেউ স্তনপান করিয়ে বাল অবস্থায় উন্নীত করে দিয়েছে, তখন নিশ্চিত হয়ে যাই যে এই কৃত্য অন্য কারুর নয় শ্রীর”।

সুর আবারও বললেন, “ভ্রাতা, আপনার শত্রুকে দেওয়া বচনের মান রাখা নিয়ে আমি সব সময়েই দ্বন্ধে ছিলাম, কিন্তু যেদিন দেখলাম যে শ্রী বৌদিদের প্রসব করিয়ে, তাঁদের দুই পুত্রদের নিয়ে অন্তর্হিত হয়েছেন, সেদিন নিশ্চিত হই যে, শ্রীও আপনার এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেনা। আর যাতে আমার আরাধ্যের সমর্থন নেই, তাতে আমি সমর্থন কি করে প্রদান করতে পারি! তাই আমিও আপনাদের ত্যাগ দিয়ে চলে যাই”।

ঈষৎ জোরে শ্বাস গ্রহণ করে, সুর পুনরায় বললেন, “ভ্রাতা, তবে আমি আমার আরাধ্যাকে যতটা চিনি, তাঁর মানসম্মানের বোধ নেই। যদি উচিত মার্গ হয়, তবে যতই অসম্মানিত হন না কেন তিনি, কিছুতেই তিনি মার্গ থেকে সরে যান না। তবে তিনি যে মার্গ থেকে সরে গেছেন আর জয়বিজয় যেমন বলল, তিনি রাজপুরে প্রত্যাবর্তন করবেন না, এর অর্থ নিশ্চয়ই এমন কিছু দিক আছে, যেই দিকে আমাদের দৃষ্টি যায়নি। আর সেই দিশাতেই তিনি ক্রিয়ারত। তবে সেই বিষয়ে আলোকপাত বা দৃষ্টিপাত তিনি স্বয়ংই করতে পারবেন আমাদেরকে। তাই ভ্রাতা, পূর্বের সমস্ত কার্যাবলী সম্পন্ন করে নিন, তারপর তাঁর কাছে যাত্রা করেই সমস্ত সত্যের সন্ধান লাভ করবো আমরা”।

এত বলে, সকলকে নিয়ে রাজপুরের নিকটে যাত্রা করলে, সুর সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে ধনুর্বাণ ধারণ করে একটি বাণ নিক্ষেপ করতে, রাজপুরকে যেই কবচে তিনি আবদ্ধ করে গেছিলেন, সেই কবচের ভেদ করলেন। দেবী চিত্তা ও করিমুণ্ড নিকটেই অবস্থান করছিলেন। এই কবচভেদের শব্দে তাঁরা আলোড়িত হয়ে সম্মুখে এগিয়ে এলে, ছন্দ সরাসরি করিমুণ্ডের নিকট গিয়ে বললেন, “জ্যেষ্ঠতাত, আমাকে ক্ষমা করবেন। আমরা সকলে মিলে আপনার সমস্ত পত্নীপুত্র সহ, সমস্ত কুলকে নাশ করে এসেছি। আমরা আপনার কাছে অপরাধী”।

করিমুণ্ড খানিকটা বিমর্ষতা আর খানিকটা কৃতজ্ঞতাকে একত্রে ধারণ করে বললেন, “না পুত্র, এমন কেন বলছো যে, আমার কুলের নাশ হয়েছে! তোমরা কি আমার কুলের বাইরে অবস্থান করো!… দুষ্টের নাশ করেছ তোমরা, আর আমার কুল সুকুশল আছে, কারণ তোমরা সকলে সুকুশল আছো। তাই, এমন কথা মনেও এনো না। আমার ভ্রাতা সর্বদাই আমার কাছে এক দিব্যব্যক্তিত্বের ন্যায় ছিলেন, যদিও আমি তাঁর নখের যোগ্যও ছিলাম না। আমার বৌদি সাখ্যাত দেবী, দেবতুল্য নন তিনি।

ভ্রাতা হবার মত এমন কনো কাজ আমি করিনি, কিন্তু তিনি তো দেবী। তাই তেমন কাজ না করলেও, তিনি আমাকে ভ্রাতা জ্ঞান করে গেছেন। আর পুত্র, তোমরা। তোমরা তো কখনোই পিতার থেকে কম সম্মান আমাকে দাওনি, আর না আমাকে কনোদিন তাচ্ছিল্য করেছ। তাহলে, আমার কুলক্ষয়ের প্রশ্ন উঠছে কি ভাবে! তোমরাই তো আমার কুল। তোমরা সকুশল মানে আমার কুলও মাতা জগদ্ধাত্রীর কৃপায় সযত্নে পালিত। যাও পুত্র, তোমাদের মাতার সাথে সাখ্যাত করো, এবং পরবর্তী কর্তব্য পালন করো”।

দেবী চিত্তার সম্মুখে গিয়ে এবার সমস্ত তাঁর পুত্র ও পুত্রবধূ নজানু হয়ে প্রণাম করলে, দুই নবযুবককে প্রণাম করতে দেখে, দেবী চিত্তা বললেন, “এঁরা কারা পুত্র? এঁদেরকে তোমাদের মতই দেখতে … কিন্তু!”

ছন্দ বললেন, “মা, এঁরা আমাদেরই পুত্র, জয় ও বিজয়। শ্রী এঁদেরকে এত বড় করেছে, আর আমাদের বিপদের সময়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে, আমাদের সাম্রাজ্যের সাথে এবং রাজকর্মের সাথে যুক্ত থাকার জন্য প্রেরণ করেছে”।

দেবী চিত্তা সেই কথা শুনে চঞ্চল হয়ে উঠে বললেন, “শ্রী কোথায়? … কোথায় আছে আমার শ্রী? তাঁর সাথে সাখ্যাত করেছ তোমরা? … আর আমার দিদিভাইরা! তাঁরাও কি তাঁর সাথেই আছে?”

দেবী পদ্মিনী বললেন, “হ্যাঁ মা, জয়াবিজয়া শ্রীর সাথেই আছে। আর মনে হয়, তাঁরা এখন থেকে তাঁর সাথেই থাকবে। … পুত্রদের থেকে আমরা বিয়োগ সহন করেছি, তাই পুত্রদেরকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিলো সে, আর কন্যাদের কাছে রেখে মানুষ করেছি, তাই আমাদের থেকে সে তাঁদের নিয়ে নিয়েছে”।

দেবী চিত্তা বিরক্ত ও চঞ্চল হয়ে উঠে বললেন, “দিয়ে দিয়েছে, নিয়ে নিয়েছে, ফিরিয়ে দিয়েছে, এসব আবার কেমন ধারার কথা! … শ্রী আমাদের মেয়ে, আমার পুত্রবধূ সে। আমার সুরের হৃদয় সে। … আমাদের ছেড়ে সে কোথায় পরে থাকবে! … আমাকে  নিয়ে চলো তার কাছে। যদি সে আমাদের উপর অভিমান করে থাকে, আমি নিজে গিয়ে তাঁর চরণ ছুঁয়ে ক্ষমা চেয়ে, তাঁর অভিমান ভাঙিয়ে ফিরিয়ে আনবো। সুর তাঁকে, আর সেও সুরকে তো সঠিক ভাবে পেলই না! … দেখনা, আমার সুর কেমন মনমরা থাকে সবসময়ে! … সে তো বাপ হতেও পারেনি এখনো! সেই সুযোগটাও তোমরা তাকে আর তার পত্নীকে দাও নি, তোমাদের এই রাজনীতির চক্করে।

আমাকে শ্রীর কাছে নিয়ে চলো পুত্ররা। তোমরা যদি তাঁর অভিমান ভাঙ্গাতে না পারো, তাহলে আমি তাঁর অভিমান ভাঙাবো। এখনই চলো, এখনই আমাকে নিয়ে চলো”।

ছন্দ বললেন, “হ্যাঁ মা, আমাদের এখানে কিছু কাজ আছে। জম্বুদেশ সাম্রাজ্যের সিংহাসনে উপনীত হয়ে, রাজধানী ঘোষণা করে, প্রজাকে নির্দেশনা দিয়ে, তাঁদের সাথে দুই রাজপুত্রের আলাপ করিয়ে দিয়েই আমরা সকলে সেখানে যাবো। শ্রীর কাছে আমরা সকলেই অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আমাদের স্ত্রীদের তথা তোমার প্রাণ রক্ষা করা থেকে, আমাদের পুত্র ও কন্যাদের প্রাণ রক্ষা ও তাঁদের রক্ষণাবেক্ষণ করা, সমস্ত কিছুর জন্যও বটেই, সাথে সাথে, আজ তো সে আমাদের প্রাণও রক্ষা করেছে। তাই সব ভাবে তাঁর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আর সেই কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করে, তাকে ফিরিয়ে আনতে আমরা শীঘ্রই যাবো। কেবল রাজকার্যটি সমাপ্ত করে নিতে দাও”।

দেবী চিত্তার থেকে ও করিমুণ্ডের থেকে অনুমতি গ্রহণ করলে, দেবী চিত্তা ও করিমুণ্ড মিলে ছন্দকে রাজমুকুট প্রদান করে, এবং দেবী পদ্মিনীকে মহারানীর মুকুট প্রদান করলে, তাঁরাও দেবী চিত্তাকে রাজমাতার সম্মানে সম্মানিত করলেন এবং অতঃপরে তাঁদের পুত্রদ্বয়, অর্থাৎ জয়বিজয়ের সাথে আলাপ করালেন এবং সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “হে জম্বুদেশের প্রাণপ্রিয় অধিবাসী, যেই মায়া ও ছায়া আপনাদের সকলের জীবনকে যান্ত্রিক ও অহংকারে আবদ্ধ করতে উদ্যত হয়েছিলেন, তাঁদের বিনাশ হয়েছে কালের নিয়মে, ও মাতা ব্রহ্মময়ীর আশীর্বাদে।

আপনাদের অভিপ্রায় অনুসারেই, আজ আমরা আপনাদের রক্ষক রূপে স্থিত। আমাদের শাসন কেমন হবে, সেই বিষয়ে আপারা সকলে আগে থেকেই জানেন, কারণ আমরা ছায়াপুর থাকতেই দৃষ্টান্তপুরের শাসনব্যবস্থা লাগু করে দিয়েছিলাম। … সেই মতই আমরা আপনাদের রক্ষা করবো, আপনাদের উপার্জন, সমাজ, সংস্কৃতি, তথা শিক্ষা ও মূল্যবোধকে রক্ষা করবো। আশা করি সেই অনুমতি আপনারা আমাদের প্রদান করবেন!”

প্রজা সকলে একত্রে চিৎকার করে প্রত্যুত্তরে বললেন, “হ্যাঁ মহারাজ, আমরা বরাবরই আপনার পাশে ছিলাম, আর সব সময়েই থাকবো। যেমন আপনি আমাদের রক্ষা করবেন, আমাদের মূল্যবোধ, সমাজচিন্তা, অর্থভাবনা, সমস্ত কিছুকে রক্ষা করবেন, তেমনই আমরাও আপনার সমস্ত কিছুকে রক্ষা করবো। আপনার মান, সম্মান, পরিচয়, খ্যাতি, আপনার বংশের সম্মান, সমস্ত কিছুর রক্ষক আজ থেকে আমরা”।

সম্রাট ছন্দ বললেন, “অসংখ্য ধন্যবাদ সকল মায়েদের, পিতাদের, সন্তানদের, ভ্রাতাদের ও ভগিনীদের, আমাদের উপর আস্থা রাখার জন্য। এবার আমাদের অনুমতি প্রদান করুন। আমরা সপরিবারে কোথাও যাত্রা করতে ইচ্ছুক। সেই বিহারের অন্তকাল থেকে, এই সিংহাসনে স্থাপিত থেকে, যেমন আপনাদেরকে বচন দিয়েছি, তেমন ভাবেই রক্ষণ করবো”।

প্রজার সাথে আলাপ সেরে, এবার সকলে দেবী শ্রীর কাছে যাবার জন্য ব্যকুল হয়ে উঠলে, জয়বিজয় তাঁদেরকে রাস্তা চিনিয়ে, সাত দিবস যাত্রা করিয়ে শ্রীপুরে উপস্থিত করলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28