১৫.৩। যুদ্ধসূচনা পর্ব
করিন্দ্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বললেন, “সংশয় অন্য জায়গায়। এই চিত্তাপুত্র ভাইরা একে অপরের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। আর চিত্তাল আমাদের মৃত্যু প্রদান করবে, এমন অঙ্গিকার করে রেখে দিয়েছে। তাহলে কি সুরের সম্মুখে উপস্থিত হলে, সে আমাদের হত্যা করবে!… না মিত্র, তুমি এই ভ্রাতাদের চেন না, এরা কিছুতেই একে অপরের বিরোধিতা করেনা। কিছুতেই একজন অন্যজনের প্রতিজ্ঞা ভাঙবে না”।
ঘৃতকুমারীরা এর উত্তরে বললেন, “সুরের বাণের আঘাতে মৃত্যু অধিক ক্ষতিকর হতে পারে, চিত্তালের আঘাতের থেকে। তাই সুরের হাতে মৃত্যুর থেকে তালের হাতে মৃত্যু অধিক সঠিক হবে। এতে আপনাদের দেহসকল সুরক্ষিত থাকবে”।
করাভ সম্মুখে এসে বললেন, “কিন্তু তাল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। সে আমাদের সহজ হত্যা করে শান্ত হবেনা। যদি সহজে আমাদের হত্যা করা সম্ভব হয়ে যায়, তাহলে সে আমাদের হাড়গোড় ভেঙে নিজের ক্রোধ প্রকাশ করতে পারে”।
বীর্যপত্নী দেবী শৃঙ্খলা সম্মুখে এসে বললেন, “তোমরা চিন্তা করো না। তালের সাথেই যুদ্ধ করো তোমরা। আমি আমার মায়ার বলে, পুনরায় পূর্বতন চেহারা প্রত্যাবর্তন করে দেব তোমাদের। … আর হ্যাঁ, যদি এমন যোজনা রাখো যে, সমস্ত মিত্ররাজাদের পূর্বে হত্যা করাবে, তাহলে চিত্তাপুত্র সুর সন্দেহ করবে। সে সমস্ত কিছু অনুভব করে নেয়, তাই তার কাছে এই ভেদ খুলে যাওয়া খুব কঠিন হবেনা যে তোমাদের অন্য কনো যোজনা আছে। আর একবার সে যদি আমাদের যোজনা জানতে পেরে যায়, তাহলে সে তোমাদের দেহসমস্তকে ধ্বংস করে দেবে। তখন আর আমার কিছু করার থাকবেনা”।
দেবী মিতা সম্মুখে এসে বললেন, “কথা সঠিক বলেছে দেবী শৃঙ্খলা। তোমাদেরকে তোমাদের যোজনা ব্যক্ত করা যাবেনা। … যুদ্ধ জয় করার যোজনাই করো। তোমরাও জানো যে যতই যুদ্ধ জয় করার যোজনা করো না কেন, সুরতাল থাকতে, তোমাদের কনো যোজনা কাজ করবে না। তাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় আমরা যুদ্ধকে এমনিই নিয়ে যেতে পারবো। কিন্তু যদি একবার আমাদের যোজনা তাঁদের জানা হয়ে যায়, তাহলে আর আমাদের কিচ্ছু করার থাকবেনা”।
করিন্দ্র মাথা নেড়ে বললেন, “উচিত কথা। … কিন্তু এবার প্রসঙ্গ এই যে, যুদ্ধের বার্তা কে নিয়ে যাবে চিত্তাদের কাছে!”
বীর্য সম্মুখে এসে বললেন, “আমি যাবো। জানি চিত্তাপুত্ররা রাজদূতের উপর আক্রমণ করবেনা। তাও সম্ভাবনার চিন্তা করে রাখা মন্দ কিছু নয়। আমি তাঁদের গুরু। তাই কনো ভাবেই তাঁরা আমার উপর আক্রমণ করবেনা, যতক্ষণ না আমি যুদ্ধে রত হবো। … তাই আমিই যাবো দূত হয়ে। আর ভাগ্নে, একটি বিষয়ে তোমরা বিচার করলেনা সম্যক যুদ্ধনীতি আলোচনাতে। আর তা হলো ভণ্ড। ভাগ্নে, ভণ্ডের কাছেই সেই শেল অর্থাৎ ত্রিদেবাস্ত্র বিদ্যমান। তাই তাঁকে সুরক্ষিত রাখা আমাদের একান্ত কাম্য হতে হবে। … সুর সর্বক্ষণ চাইবে, তাঁর সম্মুখে এসে, তাঁর নিধন করার। তাই তাঁকে সুরক্ষিত রাখার যোজনা করো”।
করিন্দ্র মাথা নেড়ে বললেন, “সঠিক বলেছেন মামা। ভণ্ড, তুমি এবং রাজা ভৃগু প্রথমে আমাদের সাথে যুদ্ধে যাত্রা করবেন না। … এর কারণ আছে। কারণ এই যে, চিত্তাপুত্ররা নিশ্চিত ভাবেই, নিজেদের সমস্ত মিত্ররাজাদের যুদ্ধে সম্মুখে রাখবেনা। বরং তাঁরা আমাদেরকে ব্যূহে স্থাপিত করবে, তাঁদেরকে বিভিন্ন দিক দিয়ে আক্রমণ করিয়ে। …
তাই আমরাও প্রথমে আপনাদের তিনজনকে না নিয়ে যুদ্ধে যাবো। এবং একবার যখন চিত্তাদের সমস্ত মিত্ররাজা রাজরা যুদ্ধে বতিরন হয়ে যাবেন, তখন আপনারা আক্রমণ করবেন এবং সেই মিত্ররাজাদের নিধন অনুষ্ঠানের রচনা করবেন। এতে করে, আপনারা সুরক্ষিতও থাকবেন, আর মিত্র ভণ্ড এবং তাঁর ত্রিদেবাস্ত্র”।
এত নিশ্চয় করে, যুদ্ধে জয় সুনিশ্চিত, এই ধারণা রেখে, বীর্য দৃষ্টান্তপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। সেখানে রওনা দিয়ে, তিনি প্রথম রাজদরবারেই উপস্থিত হয়ে মহারাজকে প্রণাম করলে, চিত্তাপুত্ররা তাঁদের গুরুদেবের চরণবন্দনা করলেন। অতঃপরে বীর্য বললেন, “মহারাজ, আজ এই মোহিনীপুত্র ছায়াপুরের রাজদূত হয়ে দৃষ্টান্তপুরের মহারাজের সম্মুখে স্থিত। যদি অনুমতি ও অভয় দান করেন, তবে মহারাজ করিন্দ্রের আপনার উদ্দেশ্যে বার্তার বাখান করা শুরু করবো”।
মহারাজ ছন্দ অনুমতি প্রদান করলে, বীর্য অদ্ভুত ভঙ্গিমায়, সম্পূর্ণ রাজসভার প্রস্থকে পদচারণ করে করে, নিজের কথনকে রসিয়ে রসিয়ে বললেন, “মহারাজ, যেমন আপনারা জানেন, আপনারা যখন অজ্ঞাতবাসে যাত্রা করেছিলেন, তখন মহারাজ করিন্দ্রই সম্পূর্ণ জম্বুদেশের সম্রাট ছিলেন। … হ্যাঁ আপনারা বলবেন যে, আপনাদেরকে এই শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, আপনারা অজ্ঞাতবাস সঠিক ভাবে পালন করে প্রত্যাবর্তন করলে, আপনার সাম্রাজ্য আপনাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
কিন্তু মহারাজ, অজ্ঞাতবাস তো আপনারা পালনই করেন নি। আপনাদের ভ্রাতা সুর আপনাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে ভ্রমণ করে বেড়িয়েছেন। আর অন্যদিকে আপনারা নিজেদের পরিচয় সহই পংরাজ্যে বিরাজমান ছিলেন।
আমরা সংবাদ কি করে পেলাম! … মহারাজ মহাবলশালী গজ ও চামরীর নিধনবার্তাই যথেষ্ট ছিল এটি জানার জন্য যে আপনারা কোথায় অবস্থান করছেন। আমাদের মিত্র, মহারাজ কচিন্দ্রকে আমরা তাই সংবাদ আনতে গুপ্তচর প্রেরণ করতে বললে, তিনি আমাদের এই সংবাদ এনে দেন যে, আপনারা সেখানে নিজেদের পরিচয় সহই নিবাস করছেন। …
কথামত আমাদের আপনাদের কাছে গিয়ে, আপনাদের অজ্ঞাতবাসকে ভঙ্গ করে, পুনরায় অজ্ঞাতবাসে প্রেরণ করা উচিত ছিল। কিন্তু তা আমরা আর করার প্রয়োজনই বোধ করিনি। কেন? কারণ আপনারা তো শর্তের পালন করেনই নি। না ঠিক আছে, শত্রুকে দেওয়া বচনের পালন করবেনই বা কেন! … ঠিকই করেছেন। কিন্তু যেকালে আপনারা শর্তের পালন করলেন না, সেকালে আমাদের শর্ত পালন করার কনো আবশ্যকতাই নেই, এই ছিল সম্রাট করিন্দ্রের মীমাংসা ও সিদ্ধান্ত।
তাই, তিনিও আপনাদের প্রত্যাবর্তনে আপনাদেরকে সাম্রাজ্য ফিরিয়ে দেননি। নাহলে তো তাঁর যোজনা এই ছিল যে, আপনারা যেখানেই থাকুননা কেন, অজ্ঞাতবাসের উপরান্তে, আপনাদের খুঁজে বার করে, আপনাদেরকে আপনাদের সাম্রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়া। …
যাইহোক, এরপরে আপনারা ছায়াপুরকে ধ্বংস করার অপরাধে লিপ্ত হয়ে রাজদ্রোহ করেছেন, এবং কেবলমাত্র আপনারা বলবান, তাই নিজেদেরকে সেখান থেকে মুক্ত করে এনেছেন। তাও বেশ করেছেন। সম্রাট করিন্দ্র, আপনাদেরকে নিজের ভ্রাতাজ্ঞানে, আপনাদেরকে দণ্ড দিতে আগ্রহী ছিলেন না। এরপরে, আপনারা সম্রাট করিন্দ্রকে সম্রাট থেকে রাজা করে দেবার ধৃষ্টতাও করলেন! … নিজেরা তাঁর থেকে অর্ধেক রাজত্ব, তাঁকে না বলেই ছিনিয়ে নিলেন!
মহারাজ করিন্দ্র আপনাদের একের পর এক ভ্রান্তিকে ক্ষমা করেছেন, কিন্তু এই ভ্রান্তিকে ক্ষমা করতে অক্ষম। যদি আপনারা তাঁর কাছে আপনাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে, তাঁর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া রাজ্য তাঁর কাছে ফিরিয়ে দেন, তিনি আপনাদেরকে ভ্রাতাজ্ঞানে ক্ষমা করে দিতে প্রস্তুত। আর যদি তা না করেন, তিনি নিজের রাজত্ব ফিরিয়ে কি করে নিতে হয়, তা জানেন। সেই ক্ষেত্রে, বিশাল করিন্দ্রসেনার সম্মুখীন হবার জন্য প্রস্তুত থাকবেন।
মহারাজ করিন্দ্রের সেনাশিবিরে যেমন মিত্ররাজ্যসমূহ, অর্থাৎ মহারাজ ভৃগুসেনের, মহারাজ বীর্যের অর্থাৎ আমার, মহারাজ অর্ধেন্দুর, মহারাজ কচিন্দ্রের তথা মহারাজ ভণ্ডের সেনা থাকবে, তেমনই থাকবে উত্তরের বৈদিক সেনা এবং দক্ষিণের ভয়ঙ্কর বৈদিক সেনা। অর্থাৎ এই যুদ্ধে আপনাদের পরাজয় নিশ্চিত। কারণ আপনাদের ও আপনাদের মিত্রদের সেনা বল যদি করিন্দ্রের ও মিত্ররাজ্যদের সেনাবলের সমানও হয়, উত্তরের ও দক্ষিণের বৈদিক সেনা, আপনাদের সেনাবলের ত্রিগুণ করে দেবে মহারাজ করিন্দ্রের সেনাবলকে। তারই সঙ্গে রয়েছে, ভণ্ড, করিন্দ্র ও তাঁর ১৯টি ভ্রাতা, ও আরো সমস্ত মিত্র রাজ্যদের রাজাদের মত ভয়ানক যোদ্ধাসমূহ।
তাই যুদ্ধ হলে, আপনাদের পরাজয় নিশ্চিত। তাও যেহেতু আপনারা মহারাজ করিন্দ্রের ভ্রাতা, তাই ভ্রাতৃপ্রেম থেকে তিনি এই বার্তা প্রদান করেছেন যে, আপনারা যদি তাঁর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া রাজ্যকে ফিরিয়ে দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেন, তাহলে তিনি বিনা শর্তে আপনাদের ক্ষমা প্রদান করবেন। আপনারা আপনাদের সিদ্ধান্ত বিচার করে, পরে দূত প্রেরণ করেও বলতে পারেন, স্বয়ং আপনারা মহারাজ করিন্দ্রের কাছে গিয়ে রাজ্য অর্পণ করে ক্ষমাপ্রার্থনাও করতে পারেন, আর যদি উচিত বোধ করেন, তাহলে আমার মাধ্যমেও আপনারা মহারাজ করিন্দ্রকে তাঁর বার্তার প্রত্যুত্তর প্রেরণ করতে পারেন”।
মহারাজ ছন্দ বললেন, “অনুমতি প্রদান করবেন গুরুবর, আমার ভ্রাতা সুর, শীঘ্রই আপনাকে আমাদের বার্তা প্রদান করবে, যা কৃপা করে আপনি মহারাজ করিন্দ্রকে বলে দেবেন”।
ঈষৎ সলাপরামর্শ করার শেষে, সুর উঠে বললেন, “গুরুবর তথা মহারাজ এবং বর্তমানে রাজদূতকে প্রণাম করি। যখন করিন্দ্রকে আপনিই বার্তা প্রদান করার কথা বললেন, তাহলে এই বার্তা প্রদান করে দেবেন, সম্রাট ছন্দের থেকে, যা আমি এক্ষণে বাখান করছি। … প্রথম কথা এই যে, করিন্দ্রকে তিনি না তো মহারাজ আখ্যা দিতে পারছেন আর না সম্রাট। জম্বুদেশের এখনো এতটা দুর্দিন আসেনি যে, একজন প্রতারককে তার সম্রাট বলে গণ্য করতে হবে বা অংশরাজ্যের মহারাজ বলে গণ্য করতে হবে।
কৃপা করে তাঁকে এই কথা বলে স্মরণ করিয়ে দেবেন যে, সে ও তাঁর মিত্রসকলে কতটা নির্লজ্জ যে এক বৃদ্ধাস্ত্রীকে হনন করে নিয়ে গিয়ে, সম্রাটের থেকে সাম্রাজ্য তস্করি করে, নিজেকে সম্রাট আখ্যা দেন। আরো বলবেন তাঁকে যে, তাঁর এই গর্হিত অপরাধ, যার দণ্ড কেবলমাত্র মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, তা তাকে প্রদান করেন নি সম্রাট ছন্দ, একমাত্র সে তাঁর ভ্রাতা বলেই।
যেই রাজ্যকে সেই তস্কর অধিকার করে থেকে, তার মহারাজ রূপে নিজেকে ঘোষণা করে থাকে, সেই রাজ্যও তার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়নি, এবং তাঁকে রাজত্ব করতে দেওয়া হয়েছে, সেই একই কারণে। তিনি সম্রাটের আপন ভ্রাতা বলে। তবে তাঁকে বলে দেবেন কৃপা করে যে, এবার যদি সে আবার তস্করের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে যুদ্ধ করতে আগ্রহী হয়, এবার আর তাঁকে ক্ষমা করা হবেনা।
বলে দেবান তাঁকে যে, না তো সম্রাট ছন্দ আর না তাঁর মিত্ররা কেউই তস্করদের সাথে যুদ্ধে রত হতে আগ্রহী নন। যদি তাঁরা আগ্রহী হন কিছুতে, তা হলো সেই তস্করদের দণ্ড প্রদান করতে। … তাই যদি সে যুদ্ধ করার দুঃসাহসও দেখায়, সে যেন প্রস্তুত হয়ে আসে যে, সে অর্থাৎ তস্কর স্বয়ং এবং সেই তস্করের সমস্ত সাক্রেদদের সাথে সম্রাট যুদ্ধ করবেন না, বরং তাঁদেরকে সম্রাট তাঁদের কর্মের দণ্ড প্রদান করবেন।
তাই যদি যুদ্ধের মানসিকতা নিয়ে এখানে আসার প্রয়াসও করে করিন্দ্র, সে যেন প্রস্তুত থাকে যে, কনো প্রকার যুদ্ধ নিয়ম পালন করা হবেনা সম্রাটের থেকে, কারণ যোদ্ধার সাথে যুদ্ধ করা হয়, অপরাধীকে দণ্ড দেওয়া হয়, আর যাকে দণ্ড দেওয়া হয়, তার বীরত্বও কেবলই দণ্ড থেকে পলায়নের উপায় হয়, আর সম্রাট ছন্দ যতক্ষণ তাঁর দুই পার্শে তাঁর দুই ভ্রাতা সুরতালকে ধারণ করবেন, ততক্ষণ কনো অপরাধী পলায়ন করতে পারবেনা।
অর্থাৎ সহজ কথা এই যে, যুদ্ধ করিন্দ্র করতে আসবে, কিন্তু আমরা যুদ্ধ করবো না, তাই যুদ্ধনিয়মের পালনও করবো না। সরাসরি দণ্ড প্রদান করবো, মৃত্যুদণ্ড। যদি অপরাধী ধূর্ত হয়, তবে ছল করে হলেও, সেই অপরাধীকে বন্দী করতে হয়, এমনই রাজনীতির রায়। আর তাই, যেকোনো প্রকার ছল করতে, এবং সমস্ত যুদ্ধ নিয়মের ঊর্ধ্বে উত্তীর্ণ হতে, আমরা প্রস্তুত। যুদ্ধের জন্য এখানে অবতীর্ণ হলে, স্বয়ং নিয়তিও তাঁকে দণ্ড না দিয়ে, মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে, এখান থেকে প্রত্যাবর্তন করতে দেবেনা। মহারাজ করিমুণ্ড এখানে উপস্থিত। তাই তাঁর সম্মুখে আমাদের এই কথা বলতে লজ্জা করছে, কিন্তু বাস্তব এই যে, যদি করিন্দ্র এখানে আক্রমণ করে, তবে মহারাজ করিমুণ্ডকে নির্বংশ হতে হবে”।
বীর্য সমস্ত কথা, নিজের কথিত কথা আর সুরের কথিত কথার বিবরণ প্রদান করলেন করিন্দ্রের সম্মুখে গিয়ে, এবং আরো বললেন, “ভাগ্নে, যেই শব্দকে ব্যাস উচ্চারণ করে বলেন নি, সেই শব্দকে নিজমুখে উচ্চারণ করে বলেও দিল সুর। এই একই কীর্তি, পাণ্ডবরাও করেছিলেন কৃষ্ণের নেতৃত্বে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে। কিন্তু যেহেতু তা কৃষ্ণের যোজনা, তাই ব্যাস সেই বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেন নি।
কিন্তু করেছিলেন তিনি একই। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করেছিলেন কৌরব, কিন্তু কৃষ্ণ পাণ্ডবদের যুদ্ধ করতে দেন নি। যেই ফাল্গুন, একাকী কৌরববংশকে ধ্বংস করার সামর্থ্য ধরে, তাকে আত্মীয়তার বোধ জাগরিত করে কৃষ্ণ প্রথমেই দুর্বল করে দিয়েছিল। ইন্দ্রলোকে গমন করে যেই সমূহ দিব্যঅস্ত্র ধারণ করে নভদকবচদের পরাস্ত করে এসেছিল বিভাতস্যু, সেই অস্ত্র ব্যবহার করাকেই নিষিদ্ধ করে দিলেন কৃষ্ণ।
কেন এমন কীর্তি তাঁর? কারণ কৃষ্ণ চায়নি যে, এক নিমেষে কৌরবদের নাশ হোক, কারণ কৌরবরা যুদ্ধে আগ্রহী হয়ে কুরুক্ষেত্রে এলেও, কৃষ্ণ তাঁদের সাথে যুদ্ধে রত হতে আগ্রহী ছিলেন না। তাই তিনি নিজে অস্ত্র ধারণও করেননি। সারথি বেশে মার্গদর্শক হয়ে থেকে, নিশ্চয় করেছেন যাতে প্রতিটি কৌরব নিজের কর্মের উচিত কর্মফল স্বরূপ দণ্ড লাভ করে।
কিন্তু ভাগ্নে, সেই একই কথাকে আমি আজ সুরের মুখে শুনে এলাম। সে স্পষ্ট বলে দিল যে, তারা যুদ্ধ করবেনা, তারা দণ্ড দেবে তস্কর ও তস্করের মিত্রদের। … তাই ভাগ্নে, পুনরায় বিচার করে নাও, এই যুদ্ধে রত হবে তো?”
ক্ষিপ্ত করিন্দ্র গর্জন করে উঠলেন, “যার এই যুদ্ধে ভয় লাগছে, সে এই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করা থেকে নিজেকে সহর্ষে প্রতিহত করতে পারেন। আমি অভয় দিচ্ছি, সে তৎপশ্চাতেও আমার মিত্রই থাকবে”।
করিন্দ্র এমন হুংকার ছাড়লে, সকল মিত্র রাজাগণ সগর্ভে বললেন, “না মহারাজ, আমরা আপনার সাথে আছি, আর আমরা এই যুদ্ধে রত হতে নিজের থেকে ইচ্ছুক”।
করিন্দ্র এবার হুংকার ছেড়ে বললেন, “করাভ! করঙ্ক! মনকরি!”
করাভ উপস্থিত হলে, করিন্দ্র বললেন, “করাভ, তুমি স্বয়ং উত্তরে রাজা বল্লালের কাছে যাও আর তাঁকে গিয়ে বলো, জম্বুদেশে বৈদিক ধর্ম স্থাপনের এই অন্তিম সুযোগ। যদি তিনি আগ্রহী হন এই বিষয়ে, যেন তাঁর শ্রেষ্ঠ সেনাবল নিয়ে উপস্থিত থাকেন এই অভিযানে।… করঙ্ক, তুমি একই বার্তা দক্ষিণে দ্রাবিড় বৈদিকপ্রধান, প্রভাস আল্লুকে বলো। আর মনকরি, এই একই বার্তা পশ্চিমে বৈষ্ণকুল প্রধান, শ্রীবাস্তব বৈষ্ণকে গিয়ে বলো। আর খালি হাতে ফিরবে না, তাঁদেরকে সঙ্গে নিয়ে ফিরবে।
এবার আমিও তো দেখি, সুর কতবর ধনুর্ধর, তাল কত বলবান! শ্রেষ্ঠতম বৈদিকসেনাকে এঁদের সমনে রাখবো। ধুলোয় মিশিয়ে দেবে সকল বৈদিক শক্তি মিলে, ওই তুচ্ছ কৃতান্তিক শক্তিকে। করাভ, করঙ্ক এবং মনকরি নিজেদের উদ্দেশ্যে নির্গত হলে, ৩ লক্ষ সেনা মতায়ন করলেন করিন্দ্র, এবং এই সেনার সেনাপ্রধান রূপে নিযুক্ত করলেন তিনজনকে, যাদের একাকজনের অধীনে রাখলেন এক লক্ষ করে সেনা, এবং নিজের ৫টি ভ্রাতাকে। সেনাপতি হলেন কচিন্দ্র, অর্ধেন্দু ও অম্বরিশ।
অন্যদিকে, ১০ দিবসের মধ্যে করাভ, করঙ্ক এবং মনকরি নিজেদের সাথে বল্লাল ও ৩ লক্ষ্য সেনাকে আনলেন, প্রভাস আল্লু ও ৪ লক্ষ সেনা আনলেন, এবং শ্রীবাস্তব বৈষ্ণ ও ৫ লক্ষ সেনাকে নিয়ে এলেন।
সেনপতিদের অধীনে ৩ লক্ষ সেনাকে ও নিজের সমস্ত ভ্রাতাদের প্রথম আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করে রাখলে, বল্লভ সেনাকে নিযুক্ত করলেন রাজা ভৃগুর অধীনে। অল্লু সেনাকে নিযুক্ত করলেন বীর্যের অধীনে, এবং বৈষ্ণসেনাকে নিযুক্ত করলেন ভণ্ডের অধীনে।
অন্যপক্ষে চিত্তাপুত্রদের কাছে সর্বসাকুল্যে থাকে তিন লক্ষ সেনা, কিন্তু তাঁদের মহারথীরা শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। একটি শিবিরের সেনাপতি হলেন বৃদ্ধ কিন্তু মহাযোদ্ধা মানস। অন্য একটি সেনার প্রধান করলেন মহারাজ নিষ্ঠাবানকে। এবং রাজা বর্ধিষ্ণুকে তৃতীয় এক লক্ষ সেনার সেনাপতিত্ব করার ভূমিকায় স্থাপিত করলেন। রাজা বর্ধিষ্ণুকে সুর নিজের পার্শে রাখলেন, এবং সামন্তকে রাখলেন তালের পাশে, এবং তাঁরা উভয় ভ্রাতা রইলেন তাঁদের ভ্রাতা, ছন্দের উভয় পাশে।
দেবী পদ্মিনী হলেন মহারাজ ছন্দের সারথি, দেবী নলিনী হলেন তালের সারথি, এবং রাজা তামরস হলেন সুরের সারথি। এবং রাজা সহিষ্ণু এই সকলের সম্মুখে থেকে, এঁদের দিশানিয়ন্ত্রক তথা সংবাদ প্রদত্তা হয়ে রইলেন। বিভিন্ন প্রজার থেকেই সমস্ত সংবাদ পেলেন চিত্তারা যে, করিন্দ্রের সাথে রয়েছে বিপুল সেনাবল। উত্তরের বল্লভ ৩ লক্ষ সেনা নিয়ে যোগ দিয়েছেন তাঁদের সাথে, দক্ষিণের আল্লু ৪ লক্ষ সেনা নিয়ে যোগ দিয়েছেন তাঁদের সাথে, এবং শ্রীবাস্তব যোগ দিয়েছেন ৫ লক্ষ সেনা নিয়ে।
এই বার্তা শুনে সুর তালের উদ্দেশ্যে বললেন, “ভ্রাতা, যতক্ষণ না সমস্ত সেনার নিধন করছি, ততক্ষণ রথ ত্যাগ করে ভূমিতে নেমে যুদ্ধ করবে না। করিন্দ্রের উদ্দেশ্য থাকবে, ভ্রাতা ছন্দকে বন্দী করে নেবার। তাই তাঁকে কখনোই একা ছাড়া যাবেনা”।
তাল বললেন, “আর পূর্বের মত যদি তারা আবার মাতাকে বন্দী করার প্রয়াস করে!”
সুর বললেন, “সঠিক বলেছ। চলো মাতার কাছে চলো। তাঁর অনুমতি নিয়ে, একটি কাজ করে আসি চলো”।
সুরতাল এবার দেবী চিত্তা ও করিমুণ্ডের সম্মুখে গেলে, বৃদ্ধা দেবী চিত্তা বললেন, “করিন্দ্র কি আক্রমণ করে দিয়েছে? তোমরা কি যুদ্ধক্ষেত্রে যাত্রা করার জন্য আশীর্বাদ গ্রহণ করতে এসেছ পুত্র?”
সুর বললেন, “না মাতা, সুত্র অনুসারে, তারা পাঁচ ভাগের এক ভাগ নিয়েই আপাতত আক্রমণ করছে। পরবর্তী চার ভাগ সেনাকে তাঁরা তিন দিশা থেকে আনছে, এবং পরে নিজেদের শিবিরের জোর বাড়াতে চলেছে। আমরাও প্রস্তুত তাদের কৃতকর্মের দণ্ড প্রদান করার জন্য, কিন্তু দুটি কর্ম আমাদের বাকি থেকে গেছে। তাদের মধ্যে একটি হলো, মাতা সর্বাম্বা ও জগদ্ধাত্রীর আশীর্বাদ গ্রহণ, আর দ্বিতীয়টি হলো, আপনার ও মহারাজ করির সুরক্ষা নিশ্চয় করা।
মাতা, পূর্বে তারা আমাদের সাথে ছল করে, আপনাকে বন্দী করে আমাদেরকে রাজ্যছাড়া করেছিল। এবারে আর সেই সুযোগ দিতে চাইনা মাতা। তাই যদি আপনারা অনুমতি প্রদান করেন, তবে আমি এই রাজপুরকে একটি পাশের মধ্যে আবদ্ধ করে যেতে চাই, যাতে কেউ এঁর মধ্য থেকে বাইরে যেতে না পারে, আর কেউ এঁর মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে। মাতা, আপনারা সুরক্ষিত থাকলে, আর ব্রহ্মময়ীর আশীর্বাদ আমাদের সাথে থাকলে, আমাদেরকে এই যুদ্ধে আর কেউ পরাস্ত করতে পারবেনা”।
দেবী চিত্তা কিন্তু কিন্তু করলে, করিমুণ্ড বললেন, “সঠিক বিচার পুত্র। প্রথমেই তারা আমাদের আক্রমণ করবেনা, যেহেতু বিশাল সেনা নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে। কিন্তু যদি দেখে যে তাদের সমস্ত যোজনা পরাস্ত হচ্ছে, তাহলে তারা আমাদের মধ্যে যেকোনো একজনকে বন্দী করে, তোমাদেরকে ছল দ্বারা পরাস্ত করার প্রয়াস করতে পারে। … স্মরণ রাখবে পুত্র, এই যুদ্ধ কেবল দুই রাজার নয়, দুই ভ্রাতার নয়, দুই পক্ষের নয়, ভালমন্দেরও নয়।
শ্রীবাস্তব, আল্লু ও বল্লভ এই যুদ্ধে নিযুক্ত হয়ে গেছে, এর অর্থ এই যে এই যুদ্ধ এখন বৈদিক বনাম কৃতান্তিকদের যুদ্ধ। তাই এই যুদ্ধে তোমরা পরাস্ত হতে পারো না। জয়লাভ তোমাদের করতেই হবে এই যুদ্ধে। তাই আমাদেরকে সুরক্ষিত করে দাও, আর নিশ্চিন্তে নিজেদের যুদ্ধে নিজেদের মন নিবিষ্ট করে যুদ্ধ জয় করো”।
অভয় লাভ করলে, সুর এক কঠিন কবচ দ্বারা সমস্ত দৃষ্টান্তপুরের রাজপুরকে ঘিরে দিলেন, যাকে কনো অস্ত্র তো আছেই, কনো মায়াও ভেদ করতে না পারে, এমনকি তাঁরা তিন ভ্রাতা স্বয়ংও তা ভেদ করতে পারবেনা যতক্ষণ না তাঁরা এই কবচকে অপসারিত করছে।
এমন সমস্ত কিছু করে, এবার সুরতাল ও ছন্দ একত্রে জগদ্ধাত্রীতটে যাত্রা করে, তাঁর আরাধনা করলে, মাতা জগদ্ধাত্রী আলোকবেশে উদিত হয়ে বললেন, “পুত্ররা, বলো কি বরদান কামনা করো?”
উত্তরে সুর বললেন, “ মা, তোমার অজ্ঞাত কিই বা আছে। তুমি তো জানোই যে, আমরা একটি ভয়ানক যুদ্ধে রত হতে চলেছি, যার উদ্দেশ্য হলো কৃতান্তিকরক্ষা। … মাতা, আমাদের এই আশীর্বাদ প্রদান করুন যেন আমরা এই যুদ্ধে জয়লাভ করে কৃতান্তিক ধর্মকে সুরক্ষিত করতে পারি”।
মাতা জগদ্ধাত্রী হেসে বললেন, “পুত্র, যিনি স্বয়ং কৃতান্তিকদের আরাধ্যা, আমি তাঁর একটি অংশপ্রকাশ মাত্র। তবে ব্রহ্মময়ীর অংশ হয়না। ঠিক যেমন রান্নাঘরে থাকলেও মাতা মা’ই হন, বস্ত্রধৌত করলেও মাতা মা’ই থাকেন, তেমনই ব্রহ্মময়ী যেই রূপেই থাকুন না কেন, তিনিই অবস্থান করেন। তাই আমি তোমাদের অভয়দান প্রদান করছি পুত্ররা, তোমরা এই যুদ্ধে জয়ী হয়ে কৃতান্তিক ধর্মকে সুরক্ষিত করতে সক্ষম হবে। প্রয়োজন এলে, আমি স্বয়ং তোমাদের রক্ষা করবো, আর তোমাদেরকে যুদ্ধে জয়ী করাবো।
কিন্তু পুত্র, একটি বিষয়ে আমি তোমাদের বলতে চাই। সত্যই যদি কৃতান্তিক ধর্মের বিস্তার হয়ে থাকতো না পুত্র, তাহলে এই যে এত সেনাকে প্রবেশ করালো করিন্দ্র, বা করিন্দ্র স্বয়ংও যুদ্ধে আগ্রাসী হয়ে উঠেছে, তেমনটা কিচ্ছু করতে পারতো না সে। প্রতিটি কৃতান্তিক ব্রহ্মময়ীর একাকরূপ, আর ব্রহ্মময়ীর সাথে যুদ্ধ করার সামর্থ্য তো কারুরই নেই, আর সাহস! আর বোধ করি পরমাত্মেরও সেই সাহস অবশিষ্ট নেই।
তাই পুত্ররা, যুদ্ধের উপরান্তে বিচার করো একবার যে, কেন করিন্দ্রদের সম্মুখে ব্রহ্মময়ী স্বয়ং অর্থাৎ কৃতান্তিকরা নেই। নাহলে কিন্তু তোমাদের এই যুদ্ধ জয়ও অহেতুক হয়ে যাবে। বৈদিকরা সেই তোমাদের থেকে রাজ্য ছিনিয়েই নেবে”।
এত বলা হলে, মাতা জগদ্ধাত্রী নিজের উর্জ্জাসম্বরণ করে নিলেন, এবং সকল চিত্তাপুত্র একে অপরের মুখ দেখে চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন একেঅপরকে যে তাঁরা কনো না কনো স্থানে কিছু ভুল করেছেন, আর মাতা জগদ্ধাত্রী তাঁদের সেই ভুলের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে চাইলেন।
কিন্তু মাতাও স্বয়ং বলে গেলেন যে এই বিষয়ে যুদ্ধ পশ্চাতে বিচার করতে। তাই এক্ষণে যুদ্ধে মনোনিয়োগ করা উচিত। তাই সকলে যুদ্ধের সাজে সজ্জ হতে গেলেও, সুর সামান্য মনমরা ছিলেন। তাল তাঁর কাছে এগিয়ে গেলে, সুর কেবল একটিই কথা বললেন, “দেবী শ্রীর শ্রীমুখটা দেখে রনক্ষেত্রে যেতে পারলে, কত ভালো হতো না ভ্রাতা!”
তাল বললেন, “আমাদের কন্যারা নির্গত হয়েছে শ্রীকে নিয়ে আসতে। হয়তো তাঁরা খুঁজে পেয়েও গেছে শ্রীকে। যুদ্ধের সংবাদ তাঁদেরকে আমাদের অবস্থান বলে দেবে। … দেখো সে নিশ্চয়ই ফিরে আসবে আবার”।
সুর ঈষৎ হেসে বললেন, “সে নিশ্চিতই সেই কাজ করছে, যার কথা মাতা জগদ্ধাত্রী বললেন। মার্গ নির্মাণ না হলে, তিনি মার্গের ঘোষণা করেন না। তিনি মার্গের বিচার করতে বললেন। এর নিশ্চিত অর্থ এই যে, সেই মার্গ নির্মিত হয়ে গেছে, তাই বিচার করে তাকে ধারণ করতে হবে”।
আর একটি কথাও না বলে উঠে চলে গিয়ে রথে উপস্থিত হলে, তাল দেখলেন একটি পরিণত মানুষকে, এক অজানা সুরকে। এক নজরে যেন মনে হলো, সুর কেবলই রণক্ষেত্রের যোদ্ধা নয়। তার সম্পূর্ণ জীবনটাই একটি যুদ্ধ।
এই পরিপক্ক সুরকে আরো নিবিষ্ট হয়ে যিনি দেখলেন, তিনি হলেন মানস। বৃদ্ধ মানস দেখলেন আর শিখলেন যে, জীবন স্বয়ং যতক্ষণ না এক যুদ্ধ হয়ে উঠবে, ততক্ষণ সে ব্রহ্মময়ীকে লাভ করতে পারবেনা। … সুরের সম্পূর্ণ জীবনই একটি যুদ্ধ। সে যুদ্ধ করে গেছে সকলের সাথে, নিজের সাথে। তাঁর মাতা অত্যন্ত মহীয়সী। তাঁর প্রিয়সন্তান সুর। সেই মায়ের নিকট গেলেই সে পাবে অনন্ত জাগতিক শান্তি। কিন্তু সুর তাতে শান্ত নয়। সে সেই সুখ ত্যাগ করে, জন্মজন্মান্তরের জননীর সন্ধানে যুদ্ধ করতে থাকলো।
তাঁর প্রতিভা অসামান্য। সেই প্রতিভার জেরে, সে স্বয়ং একটি রাজ্য নির্মাণ করে ফেলতে পারতো। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন কৃতান্তিক জগত, কারণ সেই জগতেই তাঁর জন্মজন্মের জননী নিশ্চিন্তে চরণ স্থাপন করতে পারবে। সুর জানে, তাঁর পত্নী কে। কিন্তু সসীম রূপে অসীমকে লাভ করে তৃপ্ত নয় সে। সে অসীমকে অসীম ভাবেই পেতে চায়, আর তার কাছে লীন হতে চায়। তাই সেই অসীম যাতে অনন্ত কালব্যাপী এই জম্বুদেশে বিরাজমান হতে পারে, সেই কারণে সে সর্বক্ষণ প্রয়াসরত।
এই সমস্ত কিছু দেখে, মানস সুরের কাছে গিয়ে সুরকে প্রশ্ন করলেন, “যুদ্ধে যাত্রা করার আগে, তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারি সুর?”
সুর বিনম্র হয়ে বললেন, “নিশ্চিত ভাবে। বলুন, কি জানতে ইচ্ছুক আপনি!”
মানস প্রশ্ন করলেন, “তুমি জানো, সর্বমুখে স্বয়ং ব্রহ্মময়ীই কথা বলেন। প্রকৃতি তিনি স্বয়ং, নিয়তি তিনি স্বয়ং, আর তাঁদের কথনকে অনুধাবন করার চেতনাও তিনি। তাদের অনুসরণ করে করে, তুমি তাঁর সন্ধানও পেয়েছ, যার কথা তুমি আর চিত্তাই জানো, বাকি সকলে এখনো জানার অবকাশ পায়নি। … এরপরেও তুমি সমানে কিসের কারণে যুদ্ধ করে চলেছ? তুমিও বুঝতে পারছো, আমি এই ভৌতিক যুদ্ধের কথা বলছি না। এই যুদ্ধকে জয় সে’ই করতে সক্ষম যে নিজের অন্তরের যুদ্ধকে জয় করেছে। সেই অন্তরের যুদ্ধ কেন সর্বক্ষণ করে চলেছ!”
উত্তরে ঈষৎ হেসে সুর বললেন, “হে মহারাজ মানস, কথা তো তিনি সমস্ত শব্দ, সমস্ত স্পন্দন দিয়েই বলেন, কিন্তু কার কথা বলেন তিনি! আপনি তো তাঁকে চেনেন। তিনি নিজের কথা কখনো বলেছেন আজ পর্যন্ত! … আমি তাঁর কথা শ্রবণের জন্য এই যুদ্ধে রত। আর এখন তাঁর কথা শ্রবণ করার জন্যই এই যুদ্ধে রত হতে চলেছি। আসুন, যুদ্ধে অবতীর্ণ হই”।
মানস হেসে বললেন, “তোমাদের সামর্থ্যের কাছে করিন্দ্ররা খরকুটোর মতে ভেসে যাবে, তা তো তুমি জানোই, তাও এই যুদ্ধকে এত গুরুত্ব কেন প্রদান করছো?”
সুর পুনরায় হেসে বললেন, “সেই কথা তো করিন্দ্রও জানে, তাই না! … তারপরেও সে স্বেচ্ছায় যুদ্ধ করতে এসেছে মানে, এমন কনো যোজনা এঁদের কাছে আছে, যার দ্বারা সে আমাদেরকে পরাস্ত করতে সক্ষম। তা না হলে সেই এই যুদ্ধ করতে আসতোই না”।
মানস এই কথাতে বিচলিত হয়ে উঠে বললেন, “তাহলে সেই ভেদ তুমি জানার প্রয়াস কেন করছো না!”
সুর হেসে বললেন, “কৃতান্তিক ধর্মকে রক্ষা করার যুদ্ধের কথা বলছেন, অথচ এখনো কর্তাভাবকে ধারণ করে থাকতে বলছেন?… মহারাজ, আমরা সকলেই সেই কর্তার কথা বলা তোতাপাখি, কেউ কর্তা নই। আমাদের মাধ্যম দিয়ে তিনি এক্ষণে যেই কথা বলতে চলেছেন, সেই কথা শ্রবণ করার দিকেই আমার মন। করিন্দ্রের যোজনাও তাঁরই কথন, আর সেই যোজনার সম্মুখীন হওয়ার উপায়ও তাঁরই যোজনা। … করিন্দ্র সেই যোজনাকে নিজের কর্তাভাব দ্বারা নিজস্ব যোজনা ভাবতে পারে। আমরা কি করে সেই যোজনা জানার প্রয়াস করে, বা সেই যোজনার উত্তর সন্ধান করে, নিজেদেরকে কর্তা জ্ঞান করতে পারি?”
মানস সেই কথা শুনে হেসে বললেন, “এক্ষণে আমি তোমার থেকে যা শুনলাম, তাও কি তাঁরই কথা!”
সুর হেসে উত্তরে বললেন, “সমস্ত শব্দ তাঁর অধীনে স্থিত, তাই কথা তো তাঁরই, কিন্তু তা আমার আপনার কথা, তাঁর নিজের কথা নয়। তাঁর নিজের কথা শ্রবণ করার জন্যই আমি যুদ্ধে রত থাকি সর্বক্ষণ, এখনো তাতেই রত আমি”।
মানস যেন এক নিজের মধ্যে অন্য প্রকার অনুভতি লক্ষ্য করলো। যেই নিজেকে লীন করে দেবার ভাব তিনি প্রত্যক্ষ করেন নি বলে, তিনি এখনও পৃথক অস্তিত্ব ধারণ করে রয়েছেন, সেই অস্তিত্ব লীন করার প্রেরণা যেন তিনি লক্ষ্য করলেন। কিন্তু সেই লীন হবার ভাব সম্মুখে আসতে, মানস যেন মূর্ছাপ্রায় হয়ে যেতে থাকলো। তাই সে বুঝে গেল যে, তাঁর বয়স হয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ায় বাল, কৈশোর বা যৌবনে চলমান হওয়া আবশ্যক, তবেই অন্তিম গন্তব্য পর্যন্ত উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয়। এমন বিচার করে, বর্তমানে অর্থাৎ যুদ্ধে তাঁরা মনোনিয়োগ করলেন।
অন্যদিকে দৃষ্টান্তপুরের অতি নিকটে করিন্দ্রের মিত্রসহ তাঁর সেনারা এসে গেছেন। আর দূরবীক্ষণ দ্বারা সুর, তাল ও ছন্দরা দেখলেন, অদূরে তিনটি দিশা থেকে বল্লাল, আল্লু এবং শ্রীবাস্তব সেনা আসছে। পরিস্থিতি অনুভব করে, এবং মিত্রদের তথা মহারাজ ছন্দের সম্মুখে বিপদের ধারণা রেখে, সুর সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “আপনারা যে যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, সেখান থেকে একচুলও নড়বেন না। … রথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, আপনারা কেবল রথী ও মহারথীদের আক্রমণ করে যান ধনুর্বাণ সহকারে।
স্মরণ রাখবেন, আমরা এখানে দণ্ড দিতে উপস্থিত। তাই যুদ্ধনিয়ম পালনের কনো আবশ্যকতা নেই। করিন্দ্রের রথী মহারথীরা তাই প্রয়াস করবে আপনাদেরকে ভূমিতে উত্তরণ করানোর জন্য। … তাঁরা মুশল, তরবারি ধারণ করে যুদ্ধ করতে উদ্যত হবেন। কিন্তু আপনারা রথে স্থিত হয়ে ধনুর্বাণই ব্যবহার করে যাবেন। এঁদের ১৫ লক্ষ সেনা। তাই আপনারা বা সেনা যদি অগ্রসর হন, তাহলে এঁই বিশাল সেনা আপনাদেরকে পিষ্ট করে দেবে। তাই রথ ত্যাগ করে, না আপনারা যাবেন, আর না সেনাকে এগোতে দেবেন”।
যেমন যেমন সুর বলেছিল, তেমনই দেখলো সকলে। গদা তরবারি ধারণ করে যুদ্ধে রত হবার প্রয়াস করলো করিন্দ্রের পক্ষ। ধনুর্বাণে জর্জরিত করতে থাকলো ভূমিতে উত্তীর্ণ করিন্দ্রের রথী ও মহারথীদের। উত্তরে করিন্দ্রপক্ষ অস্রব্য গালি প্রদান করে, যুদ্ধনীতির পাঠ প্রদান করতে সচেষ্ট হলেন করিন্দ্র পক্ষ। তাঁরা বলতে থাকলেন, “একই অস্ত্রে যুদ্ধ হওয়া আবশ্যক। শত্রুর অস্ত্রে শত্রুকে পরাস্ত করাতেই বীরত্ব স্থাপিত হয়”।
উত্তরে চিত্তাপক্ষ হাস্য প্রদান করে বলতে থাকলেন, “যুদ্ধ করতে তোমরা এসেছ, আমরা নই। আমরা তোমাদের দণ্ড দিতে এসেছি, বীরত্ব প্রমাণ করতে আসিনি। নিজেদের প্রাণ প্রিয় তো, বৃথা বাক্যব্যায় না করে যুদ্ধ করো”। আর এমন বলে পুনরায় ধনুর্বাণ দ্বারা আক্রমণ করতে থাকলেন করিন্দ্রের রথী ও মহারথীদের”।
