১৫.২। দৃষ্টান্তপুর পর্ব
যোজনা অনুসারে এবার চিত্তাপুত্ররা এবং তাঁদের মিত্ররাজারা ক্রীড়া করতে শুরু করলেন। এবং ধীরে ধীরে চন্দননগরকে রাজধানী করে, এক দৃষ্টান্ত নির্মাণ করলেন প্রজার সম্মুখে। তাই রাজ্যের নাম দিয়েছিলেন তাঁরা দৃষ্টান্তপুর। এরই মধ্যে সুর ছন্দকে এসে বললেন, “মহারাজ, আমাদের উচিত আমাদের রাজধানীকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া। … বিচার করে দেখুন, আমরা যেমন ছায়াপুরে যাত্রা করে, তাঁকে ধ্বংস করে এসেছি, তেমন করিন্দ্রেরও কেউ এসে আমাদের রাজধানীকে ধ্বংস করার প্রয়াস করতে পারে।
সেই কারণে, আমাদের প্রকৃত রাজধানীকে চন্দননগর রেখেই, আমাদের সক্রিয়রাজধানীকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। এতে করে, আমাদের প্রিয় চন্দননগর, আমাদের মাতা জগদ্ধাত্রী, সকলে আক্রমণের থেকে মুক্ত থাকবেন। এ ব্যাপারে, আপনার মতামত কি?”
ছন্দের কাছে সেই প্রস্তাব বাস্তবিক লাগলে, অন্য রাজাদের কাছেও তা বাস্তবিকই হয়ে ওঠে। তাই সকলে প্রশ্ন করলেন, “কোথায় স্থাপিত হবে সেই নতুন রাজধানী? আর কিই বা বিশেষত্ব থাকবে, সেই রাজধানীতে?”
ছন্দ সুরকে বললেন, “বল সুর, তোমার অভিপ্রায় কি, সেই ব্যাপারে সকলকে বলো”।
সুর অভয় লাভ করে বললেন, “রাজা বর্ধিষ্ণুর রাজ্যের ঠিক সীমানায় রয়েছে দামোদর নদ, যা আমাদের ভাগীরথীর সাথে সংযুক্ত প্রাকৃতিক ভাবেই। … বড় শহর স্থাপন করতে গেলে, জলপ্রবাহ যেমন প্রয়োজন তেমন জলনিকাশি ব্যবস্থাও। তাই এই দামোদরের বিস্তর উপত্যকাকে আমরা আমাদের রাজধানী রূপে স্থাপন করতে পারি। এই স্থান এমনই স্থানে যে, এঁর পশ্চিমে রয়েছে মালদ রাজ্য অর্থাৎ রাজা কুর্নিশের রাজ্য; এঁর উত্তরে রয়েছে রাজা বর্ধিষ্ণুর বর্ধমান রাজ্য, আর উত্তরপূর্বে রয়েছে মুর্শিদরাজ্য, অর্থাৎ মাতা সর্বাম্বার স্বপ্নরাজ্য।
এই তিন বড় রাজ্য আমাদের রাজধানীর আশেপাশে হবার কারণে একটি বিশাল সুবিধা আমরা লাভ করবো। আমাদেরকে কেবল আমাদের রাজধানীকেই উন্নত করে, তাতে জনবসতি বৃদ্ধি করতে হবেনা। কনো একটি স্থানে জনবসতি অতিকায় হয়ে গেলে, সেখানে যেমন প্রকৃতির উপর চাপবৃদ্ধি হয়, তেমন মানুষের মধ্যেও প্রতিযোগিতার স্পৃহা বৃদ্ধি পায়, আর তার কারণে শুরু হয় বৈরী ও সম্পর্কের হানাহানি, এবং মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতার ভাব প্রকট হয়ে ওঠে।
তাই আমরা রাজধানী, অর্থাৎ সম্পূর্ণ কার্যাবলীর মূলক্ষেত্রকে ভিড়ে ভারাক্রান্ত না করে, বর্ধমানে, মুর্শিদে তথা মালদে একটি একটি করে রাজধানীর নির্মাণ করবো। আরো বিস্তারে বলতে হলে, প্রতিটি রাজ্যে আমরা একটি করে রাজধানী স্থাপিত করবো। নদিয়াদেও, আর সুন্দরবনেও। আর এই প্রতিটি রাজধানীশহরকে আমরা বিশেষ ভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দ্বারা পরিপুন্ন করবো।
আর সাথে সাথে, এই সমস্ত শহর নিজেদের মধ্যে যুক্ত থাকবে, এক রাজ্যের পণ্য অন্য রাজ্যে সরবরাহ করার জন্য। … মানে ধরে নিন, বর্ধমান রাজ্যের যাবতীয় পণ্য, যা সেখানের মানুষের জন্য অতিরিক্ত হবে, তা সরবরাহ হবে বর্ধমানের রাজধানীতে, আর তা রাজা বর্ধিষ্ণু সেই অন্য উৎপন্নকারীদেরকে যথার্থ মূল্যে প্রদান করে ক্রয় করবেন।
একই ভাবে রাজা কুর্নিশও নিজের রাজ্যের ক্ষেত্রে করবেন, মুর্শিদ রাজ্য, নদিয়াদ রাজ্য, সুন্দরবন, রাজশাহী তথা চন্দননগর তেমনই করবে। এরপর, এক রাজ্য দ্বিতীয় সমস্ত রাজ্যের রাজধানীতে তা পৌঁছে দেবেন, মূল্যের বিনিময়ে। আর সেই রাজ্য সেই সমস্ত পণ্যকে ক্রয় করার জন্য উন্মুক্ত করবেন তাঁর রাজ্যের সমস্ত প্রজার উদ্দেশ্যে। এই পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের স্থান হবে রাজধানী। আর বাকি সমস্ত রাজ্য হবে সেই সমস্ত পণ্য উৎপন্ন করার ক্ষেত্র।
এবার রাজা ছন্দ ও তাঁর মন্ত্রক অর্থাৎ আপনারা সকলে মিলে নির্ধারণ করতে থাকবেন যে সেই পণ্য সমূহের মূল্য কি হওয়া উচিত, অর্থাৎ রাজা কোন মূল্যে সেই পণ্য ক্রয় করবেন, কোন মূল্যে তা অন্যরাজ্যকে বিক্রয় করবেন, আর সেই রাজ্য কোন মূল্যে প্রজাকে তা বিক্রয় করবেন।
অর্থাৎ, রাজধানী শহরগুলিতে কনো কিছুর উৎপাদন হবেনা, হবে কেবল তাঁদের লেনদেন বা বাণিজ্য। এর মানে এই যে, কাল যদি কেউ এসে আমাদের কনো একটি রাজ্যের রাজধানীকে ধ্বংসও করে দেয়, তাতে আমাদের কিছু এসে যাবেনা, কারণ আমাদের মূল উৎপাদনক্ষেত্র সুরক্ষিতই থাকবে। …
রাজধানীতে রাজপরিবারের অট্টালিকা থাকবে, থাকবে রাজ্যের বাকি অঞ্চল থেকে পণ্য নিয়ে আসা মানুষের বিশ্রাম ও রাত্রি ব্যপ্ত করার আলয়, থাকবে অন্য সমস্ত রাজ্যের পর্যটকদের জন্য বিশ্রাম কক্ষসমূহ, থাকবে সেই রাজ্যের বিশেষ আহারাদি বিক্রয় করার প্রতিষ্ঠান, থাকবে বস্ত্র ক্রয় বিক্রয়, আসবাব ক্রয় বিক্রয়, এবং পুস্তক ক্রয় বিক্রয়ের ছেত্র। অর্থাৎ এই রাজধানি শহরগুলি কৃষকদের স্থান হবেনা, শ্রমিকদের স্থান হবেনা। তাঁরা নিজেদের গ্রামে, প্রকৃতির দ্বারা সিঞ্চিত, এবং প্রকৃতি দ্বারা সৃজিত অপূর্ব বাতাবরণেই নিবাস করবেন।
রাজধানীতে নিবাস করবেন পাঠকরা, শিক্ষকরা, চিকিৎসকরা, পশারীরা, এবং রাজা ও সেনারা। মহারাজ, এই দুই শ্রেণির জীবনযাপন সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়, কারণ এঁদের দুইএর ধারা ঠিক ভিন্ন। প্রকৃতির সাথে সকলেই যুক্ত আমরা, গ্রামে নিবাসকারীরাও, আর শহরে নিবাসকারীরাও। কিন্তু গ্রামে নিবাসকারীরা প্রকৃতিতে মেতে থাকেন, প্রকৃতি তাঁদের কাছে মিত্র, তাঁদের কাছে বধূসমান। কিন্তু শহরে নিবাসকারীদের কাছে সেই প্রকৃতিই হয় গুরু, শিক্ষক, চিকিৎসক, এবং মার্গদর্শক।
গ্রামের মানুষ প্রকৃতিকে চেনেন অধিক, কারণ তাঁরা সেই প্রকৃতির কোলেই নিবাস করেন। শহরের মানুষ প্রকৃতিকে চিনতে শেখেনই সেই গ্রামের সরল মানুষদের থেকে। কিন্তু তা চেনার পর, শহরবাসী প্রকৃতির থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন, যা গ্রামবাসী লাভ করতে পারেন না। আর তা লাভ করার পর, সেই শিক্ষা সকলের মধ্যে বিতরণ করে, সকলকে উন্নত করেন।
অর্থাৎ মহারাজ, আমার বক্তব্য এই যে, আমাদের এমন একটি রাজ্য নির্মাণ করতে হবে, যেখানে সকলে সকলকে উন্নত করার জন্য, বা সকলে মিলে সম্যক রাজ্যকে উন্নত করার জন্য কিছু না কিছু অবদান প্রদান করছেন। যেখানে গ্রামের মানুষ তাঁদের কায়িক পরিশ্রম দ্বারা সম্পূর্ণ রাজ্যের প্রকৃতিকে সেবা করে, শহরের মানুষকে সেই প্রকৃতিকে চেনাবেন, সেখানে শহরের মানুষ সেই শিক্ষা গ্রহণ করে, তাকে বিদ্যারূপে ধারণ করে, সকল প্রজাকে প্রকৃতির সত্যতার বিবরণ দেবেন, আর তারই সাথে গ্রামের মানুষের দ্বারা উৎপাদিত পণ্য, ভাস্কর্য, সামগ্রী তথা বস্ত্রকে সর্বত্র বিলিয়ে দিয়ে, সকলের কাছে রাজ্যের সমস্ত প্রকৃতিকে, সমস্ত উৎপাদনকে, সমস্ত উর্বরতাকে বণ্টন করে ফিরবেন।
আমার এই কথার অর্থ এই যে, কেউ এমন থাকবেন না রাজ্যে, যিনি মনে করবেন যে তাঁর অধীনে সমস্ত কিছু অবস্থান করছে। এমন পরিস্থিতি স্থাপন হোক রাজ্যে, যেখানে এই ধারণা সকলের মধ্যে থাকবে যে, আমার অধিকারে যদি কেউ থাকে, আমিও কারুর অধিকারে রয়েছি। আর এই অনুভব কেবল প্রজার জন্যই নয়, রাজার জন্যও থাকবে।
সকলে সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবেন যে, তাঁর অবদানের কারণে তিনি সুস্থস্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম। সকলে সকলের নিয়ন্ত্রণে থাকবেন। অর্থাৎ সকলে পরাধীন, কিন্তু কেউ রাজার কাছে পরাধীন নন, সকল প্রজা অন্য প্রজার কাছে, আর মূলত প্রকৃতির কাছে পরাধীন, অথচ সে নিজের কর্মটি সঠিক ভাবে করলে, সে স্বাধীন কারণ সে নিজের অবদান প্রদান করে দিয়েছেন”।
রাজা ছন্দ প্রথমে তথা সকলে পরবর্তীতে সুরের প্রশংসা করে উঠে বললেন, “অদ্ভুত এই ব্যবস্থা। কেউ উৎপাদন করে স্বতন্ত্র। আবার অন্যেরা সেই উৎপাদন বিতরণ করে বেড়িয়ে পরাধীন। সকলের মধ্যে সুন্দর ও সুচারু ভাবে ধনবণ্টন, সকলের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা, সকলকে বিদ্যালয়ে প্রেরণ করে সময়ের শিক্ষা প্রদান করা, প্রকৃতির শিক্ষা প্রদান করা, আর সকলকে আমন্ত্রণ করা যে তাঁরা যদি চায়, তবে শহরে এসে, এই শিক্ষাতে, এই চিকিৎসাতে, এই কর্মপদ্ধতির নিঃসংশয়ে অংশ নিতে পারেন। সাধু সাধু”।
তাল বললেন, “অর্থবণ্টনের ব্যাপারে জানলাম, নেপথ্যে শিক্ষা বিস্তারের কথাও জানলাম, যদি ধরে নিই যে প্রতিটি গ্রামে একটি করে বিদ্যালয় থাকবে, আর সেই বিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্রছাত্রীরা শহরে এসে উচ্চবিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে অধিক জ্ঞান অর্জনের সুবিধা পাবেন। আর সেই উচ্চবিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্ররা, এই দৃষ্টান্তপুর প্রধান রাজধানীর মধ্যে স্থাপিত মহাবিদ্যালয়ে এসে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবেন। বিদ্যালয়ে কেবল পাঠ্য শিক্ষাই নয়, সাথে সাথে সংস্কৃতি, অর্থাৎ সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্র, তথা নাট্য ও ক্রীড়ারও প্রশিক্ষণ থাকবে, তবে বিচার ব্যবস্থা বা সুরক্ষার কি হবে?”
উত্তরে সুর বললেন, “বিচারকের ভূমিকাতে প্রতিটি রাজ্যের মহারাজই অন্তিম বিচারক হবেন। তবে তাঁর মনোনীত ব্যক্তিরা বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারকের ভুমিয়ায় অবতীর্ণ হবেন। তবে এই সুবিধাও প্রদান করতে হবে রাজাকে যাতে যার উপর বিচার হচ্ছে, তাঁর যদি বিচার মনোমত না হয়, তাহলে তিনি রাজার কাছে বিচারের রায় পরিবর্তনের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আর তারপরেও যদি তাঁর রায় পছন্দ না হয়, তবে মহারাজের কাছেও বিচারের আবেদন করতে পারবে। তবে সেই আবেদন করার একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রাখতে হবে।
রাজা এবং মহারাজ নির্দিষ্ট একটি সময়ক্ষণ নির্ধারণ করে দেবেন, যেখানে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র সেই বিচারের আবেদনকারী তাঁর সম্মুখে এসে, তাঁকে সমস্ত কিছুর বিবরণ প্রদান করবেন। যদি প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে রাজা যিনি সেই প্রজাকে বিচারের রায় প্রদান করেছেন, বা মহারাজ রাজার থেকে সেই বিচারের বৃত্তান্ত জানার প্রয়াস করবেন। তারপরেও যদি তাঁর মনে হয় যে, রায় অসমাপ্ত, তবেই তিনি পুনরায় বিচার করবেন। তবে বিচারের শীর্ষে থাকবেন রাজা ও মহারাজ, তাঁদের মনোনীত কেউ নন, কারণ বিচারকের উপর বেতন বা অসুরক্ষা, ইত্যাদির ন্যায় চাপ থাকতে পারেনা।
আর দ্বিতীয়কথা, বিচারকের সম্মুখে দুইজনই থাকবেন, এক যিনি আবেদন করেছেন, আর দ্বিতীয় যার বিরুদ্ধে আবেদন করেছেন। অন্য কনো তৃতীয়পক্ষ উপস্থিত থাকবেন না, অর্থাৎ এই দুই মক্কেলের সালিসি করার জন্য কেউ উপস্থিত থাকবেন না বিচারকের এজলাসে।
যদি এমন হয় যে, যিনি আবেদন করেছেন, তিনি কনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আবেদন করেন নি, বা কার বিরুদ্ধে আবেদন করতে হবে তিনি জানেন না, তাহলে বিচারকের কাজ হবে সেই ব্যক্তি, সংগঠন বা সংগঠনের মাথাকে সনাক্ত করা, এবং তাঁকে বিচারের এজলাস পর্যন্ত ডেকে আনা।
আর সেই ক্ষেত্রে, সেনা কাজে নিযুক্ত হবেন এবং তাঁদেরকে বিচারকের নির্দেশ অনুসারে কর্ম করতে হবে, আর তাতে যদি কেউ বাঁধা প্রদান করেন, তিনিও বিচারকের দণ্ডের অধিকারী থাকবেন। … আর এছাড়া, যেকোনো বিষয়ে অন্তিম যেই বিচারের রায় হবে, তা সমস্যার সাথে নথিভুক্ত হবে আইন রূপে, এবং তাকে একটি কালনির্ভর আইন মানা হবে, যার পরিবর্তন কাল ও পরিস্থিতির সাথে সাথে হতে থাকবে।
এবার প্রশ্ন এই যে, যিনি বিচারের কামনা করছেন, তিনি বিচারকের কাছে আবেদন করবেন কি করে? তিনি সরাসরি বিচারকের কাছে আবেদন করতে পারেন এবং নিজের বক্তব্য রাখতে পারেন, যাকে বিচারক বয়ানে পরিবর্তিত করবেন, এবং যদি সেই বয়ানকে পরীক্ষণ করে দেখেন যে সেই আবেদনকারীর বয়ান বিচারের প্রয়োজন, তাহলে বিচারসভা স্থাপন করবেন। আর যদি তিনি বিচারের প্রয়োজন না মনে করেন, আর আবেদনকারীর তাও মনে হয় যে বিচারের আবশ্যকতা রয়েছে, তাহলে তিনি সেই একই বয়ান ধারণ করে রাজার কাছে উপস্থিত হতে পারেন।
এছাড়া, বিচারকের কাছে আবেদন করতে পারেন স্বয়ং সেনা, যাদের কাজ হবে প্রজার রক্ষণাবেক্ষণ করা। যখন কনো তস্করকে বা অন্য কনো অপরাধীকে সেনা গ্রেফতার করবেন, তাঁকে বিচারকের কাছে পেশ করবেন তিনি। তবে বিচারক নিজেও এবং প্রজাও এই সেনার বিরুদ্ধে বিচার মামলা দায়ের করতে পারেন যদি সেনা থাকতেও তস্করি বা অপরাধ হয়ে থাকে। অর্থাৎ কথা এই যে, সেনার কাজ তস্করি বা অপরাধের তদন্ত করা নয়, তাদের কাজ তস্করি বা অপরাধ হতে না দেওয়া।
গৃহমধ্যে কি অশান্তি হচ্ছে, তার উপর সেনার অধিকার নেই, কিন্তু সেনা থাকতেও যদি পথে কনো প্রজার সাথে তস্করি হয়ে থাকে, বা কারুর সাথে পথঘাটে অপরাধ হয়ে থাকে, বা কনো চক্র সাধারণ মানুষের জীবনযাপনকে ব্যহত করতে থাকে, তাহলে সেনা অবশ্যই গাফিলতির দায়ে দোষী, এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিচার হতেই পারে, যা প্রজাও দায়ের করতে পারেন আবার বিচারক নিজেও দায়ের করতে পারেন। তবে বিচারক যদি দায়ের করেন সেই মামলা, তবে তার বিচার করবেন রাজা, আর রাজা দায়ের করলে তার বিচার করবেন মহারাজ, আর মহারাজ বা মহারানী যদি সেই মামলা দায়ের করেন, তবে তার বিচার করবেন, যিনি সেই মামলা রজ্জু করেছেন, তিনি ব্যতীত সম্পূর্ণ মন্ত্রীমণ্ডল, যার উপদেষ্টা হবেন মহারাজ বা মহারানী, অর্থাৎ যিনি মামলা দায়ের করেন নি, তিনি।
এছাড়া, সেনার কাজ আরো একটি হবে আর তা হলো ছায়াপুরের থেকে দৃষ্টান্তপুরে যেই যেই প্রজাদের আগমন হবে, তাঁদের নামে হুলিয়া জারি করে রাখা অন্তর্বর্তী সেনার কাছে, যাতে করে সেই ব্যক্তির উপর অন্তর্বর্তী সেনা নজরদারী রাখে এটা জানার জন্য যে সে গুপ্তচর না সাধারণ প্রজা। আর তা ছাড়া, ছায়াপুরের থেকে দৃষ্টান্তপুরকে রক্ষা করার দায়ও তাদের। অর্থাৎ দৃষ্টান্তপুরের বিরুদ্ধে কি কি ষড়যন্ত্র হচ্ছে, বা কিভাবে দৃষ্টান্তপুরকে আক্রমণের জাল বেছাচ্ছে ছায়াপুর, তার সংবাদ আনায়ন করা, এবং যুদ্ধের জন্য সেনাবলকে প্রস্তুত করা।
প্রজাকে এমন সুখ, শান্তি ও স্বতন্ত্রতা প্রদান করতে হবে আমাদেরকে যে, সেই বার্তা ছায়াপুরের প্রজাদের কাছে পৌছাতে, তারা স্বয়ং চলে আসে ছায়াপুর ছেড়ে দৃষ্টান্তপুরে। এমন হতে থাকলে, এক না এক সময়ে দৃষ্টান্তপুরের অধিবাসী সংখ্যা অধিক হয়ে যাবে, আর ছায়াপুরের প্রজাসংখ্যা হ্রাস পাবে। আমাদের উপার্জন হবে পণ্যের সরবরাহ করার থেকে, অর্থাৎ প্রজার থেকে আমরা কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু কর গ্রহণ করবো না। অন্যদিকে ছায়াপুর প্রজার করের কারণেই বৃত্তবান। তাই তাঁদের প্রজাসংখ্যা হ্রাস পেলে, তাঁদের উপার্জনও হ্রাস পাবে। আর তাই তখন তারা আক্রমণের জন্য হন্যে হয়ে উঠে, তারা দৃষ্টান্তপুরকে আক্রমণ করবেই।
রাজারা, আপনাদের সকলের কাছে আমি সেনাবল প্রস্তুত করে রেখেছি। তাদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখবেন। যদি কখনো ছায়াপুর আক্রমণ করে দৃষ্টান্তপুরকে, তাহলে আমাদের সকল রাজ্যের সকল সেনা তাঁদেরকে ঠিক যেই ভাবে একটি কীটের ছয় পা তার শিকারের শরীরকে আঁকড়ে ধরে, তেমন করে আপনাদের সেনারাও ছায়াপুরের সেনাকে আঁকড়ে ধরে, তার বিনাশ করে দেবে”।
সুরের এই মহাযোজনাকে সকলে সমর্থন করে, ঠিক তেমন তেমন করলেন যেমন যেমন তিনি বলেছেন। আর সঠিক অনুমান ছিল সুরের, কারণ এই দৃষ্টান্তপুর স্থাপনের মাত্র পাঁচবছরের মধ্যে, ছায়াপুর থেকে প্রায় আরো ১০ লক্ষ প্রজা ফিরে চলে আসেন দৃষ্টান্তপুরে।
তবে সে তো সবে শুরু। প্রতিবছর প্রজারা অধিক অধিক ভাবে দৃষ্টান্তপুরে আসা শুরু করলে পরের ৫ বৎসরে, ছায়াপুরের লোকসংখ্যা ঠিক তেমন হয়ে রইল, যেমনটা সেই কাল থেকে ঠিক ১০ বৎসর পূর্বে, যখন দৃষ্টান্তপুরের রচনা হয়নি, তখন চিত্তাপুত্রদের সাথে ছিল।
প্রায় সমস্ত জম্বুদেশের মানুষের আস্থা আজ পুনরায় চিত্তাপুত্ররা, তাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন করিন্দ্র, আর ক্রোধে অগ্নিসম হয়ে উঠে বললেন, “এই চিত্তাপুত্ররা যখন যখন সম্মুখে আসে, তখন তখন আমাদের বিপত্তি ডেকে নিয়ে আসে। পূর্বে সমস্ত জম্বুদেশকে নিজেদের অধীনে নিয়ে এসেছিলে রাজনীতি দ্বারা, আর এবার প্রজার বিশ্বাসের জায়গা হয়ে উঠে, সকলকে নিজের কাছে টেনে নিলো। … এই জম্বুদেশ আমাদের, শুধু মাত্র আমাদের।
আমাদের পূর্বজ ছিলেন দেবী মোহিনী, যিনি এই রাষ্ট্রের অধীশ্বরী ছিলেন, যাকে চক্রান্ত করে পরাস্ত করেছিলেন মেধা। তাঁরও পূর্বজ ছিলেন আত্ম, মহারাজ পরমাত্ম, ভগবান পরমাত্ম। তাঁকে নির্মম ভাবে হত্যা করেছিলেন সর্বাম্বা। আজ আমরা জগদ্ধাত্রীর থেকে পরাস্ত হয়ে দূরে সরে এসেছিলাম আর আমাদের রাজ্যকে অধিকার করে নিয়েছিলাম পুনরায়। তো পুনরায় জগদ্ধাত্রীর সন্তান, ওই চিত্তারা, ওই আদিবাসীরা আমাদের থেকে আমাদের রাজ্য ছিনিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে, আর যেহেতু আমাদের থেকে তারা অধিক বলবান, তাই আমরা কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু করতে পারছিনা!”
বীর্য মাথা নত করে বললেন, “সত্য তো ভাগ্নে এই যে, এই রাষ্ট্র আমাদের কনো কালেই ছিলনা। পূর্বে এই রাজ্য কেবল জম্বু ছিলনা, ছিল গৌড়। সেখানে মার্কণ্ড এসে তন্ত্রশক্তি প্রদান করে, এই স্থানকে সুরক্ষিত করে যায়, এখানের আদিবাসীদের সুরক্ষিত করে যান আমাদের থেকে অর্থাৎ বৈদিকদের থেকে। কিন্তু তারপরেও এঁরা নিজেদের মধ্যেই নিজেরা ছিলেন। তাই বৈদিকরা এঁদের দিকে তাকায়নি। তার আরো একটি কারণ এখানে প্রকৃতির বাড়বাড়ন্ত, আর তাঁরই স্থাপিত ঘন জঙ্গল।
পরে, মগধের উত্থান হয় গৌতম বুদ্ধের ও মহাবীরের হাত ধরে। বৈদিকদের লুকিয়ে পরতে হয়েছিল তাঁদের সময়কালে। পরে বৈদিকরা চাণক্যকে প্রেরণ করে মগধকে ছিনিয়ে নেবার প্রয়াস করলে কিছুটা সফলও হয় মগধকে গৌড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে। অন্যদিকে গৌড় রাজ্য থেকে উত্থান হয় বাল্মীকি আর ব্যাসের। বৈদিকদের উৎখাত করে ফেলার মত প্রয়াস ছিল তাঁদের। তাই বৈদিকরা উঠে পরে লেগে, তাঁদের রামায়ণ ও জয়া গীতকে বিকৃত করে, তাদেরকে নিজেদের গ্রন্থ করে নেয়।
কিন্তু বিপদের আশঙ্কা অনুভব করে বৈদিকরা উৎকল ভূমিকে ছিনিয়ে নেয় এরপর বৈদিকরা, আর তাদের আদিবাসীদের বৈদিক ধর্মে ধর্মান্তর করে করে, সেই স্থানকে ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু এইকালেই ব্যাস স্পষ্ট কল্কি পুরাণের মাধ্যমে অশোকের উত্থানকে লিপিবদ্ধ করে গেছিল, তা বৈদিকরা অনুভবও করতে পারেনি। এই অশোকের উত্থানের ফলে, মগধের পুনরায় উত্থান হয়, আর বৈদিকদের অবস্থান মগধ তথা উৎকলে দৈন্য করে দেয় অশোক।
অশোকের ভয়ে, বৈদিকরা সম্পূর্ণ আর্যখণ্ড ত্যাগ করে উত্তরখণ্ডে চলে যায় এবং আত্মগোপন করে থাকে। তারপর অশোকের মৃত্যুর পরেও দক্ষিণে পল্লভদের উত্থান হওয়াতে, সেখানে অধিকার স্থাপন করতে পারেনি বৈদিকরা, কিন্তু বাকি আর্যখণ্ডকে উদ্ধার করে নিতে শুরু করে। অশোকের স্থাপিত সমস্ত বৌদ্ধশিলাকে শিবলিঙ্গ বা নারায়ণশিলা রূপে পূজা করে করে, বৈদিকরা সেই মঠাদিদের মন্দিরে পরিবর্তিত করে নেয়। মগধ ও উৎকলকেও অধিকার করে নেয়।
আর পরে শিবাজীকে দিয়ে মারাঠাদের উত্থান করিয়ে, পল্লভদেরও উৎখাত করে দক্ষিণকেও অধিকারে নেয়। কিন্তু তারপরেও ব্যতীত থেকে যায় এই জম্বুদেশ। প্রাচীন এই জম্বুদেশ অবস্থান করছে সহস্র লক্ষ বৎসরব্যাপী। এখানের অধিবাসীরা এই দেশের আদিবাসী, প্রকৃতির সন্তান। বাহুবলে নয়, অনুভবের বল এঁদের, আর তাই এঁরা দৈহিক ভাবে নয়, বাস্তবিক ভাবে মহাশক্তিধর।
আর্যরা কেবল বৈদিক ধর্মকে আধার করেই জগতে ব্যপ্ত নয় ভাগ্নে। আর্যরা এই দেশে বৈদিক, তো পশ্চিমে ইহুদি, আর তাই সমস্ত জগতকে অধিকার করে বসে রয়েছে এই আর্যরাই। কিন্তু তারপরেও, এই ছোট্ট আদিবাসী অঞ্চল, যা সমস্ত মানবযোনির আদিমতম স্থান, যার আয়ু সমস্ত উপস্থিত ও সাগরতলে তলিয়ে যাওয়া দেশের মধ্যে সর্বাধিক, সেই জম্বুদেশকে কিছুতেই আর্যরা অধিকার করতে পারছেনা।
তাই বৈদিকরা তপস্যা করে, স্বয়ং পরমাত্মকে অবতাররূপে ধরণীতে আগত করান, যিনি সমানে নিজের বিস্তার করতে থাকেন, ত্রিগুণ, ছায়াদেবী, তথা রিপুপাশ ও আবেগগণরূপে, কিন্তু সেখানেও বাঁধা। … একদিকে যখন পরমাত্ম স্বয়ং অবতারিত হলেন, তখন পরমসত্য, যিনি এই আদিবাসীদের আরাধ্যাও, সেই ব্রহ্মময়ী পরাশূন্যও মানবযোনিতে সম্ভব সর্বোত্তম কলাবিস্তার, অর্থাৎ ৯৬ কলা রূপে আবির্ভূতা হলেন। তাঁর ধারক হলেন যিনি, প্রথম জীবনে তাঁর নাম হয় রাম, আর পরাশক্তির নাম হয় সীতা। তবে পরে রাম যখন নিজেকে ম্নিজের আরাধ্যার মধ্যে লীন করে দেন, তখন পরাপ্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া রামের নাম হয় ব্রহ্মসনাতন, আর পূর্ণ পরাপ্রকৃতির নাম হয় মাতা সর্মাম্বা।
আর তিনি এসে, পরমাত্মের অবতারকেই উৎখাত করে দিলেন এবং পুনরায় জম্বুদেশের রক্ষা করলেন। তবে এবারে তাঁর গতিবিধি ভালো নয় ভাগ্নে। … এতাবৎ কাল তিনি কেবল জম্বুদেশকে সুরক্ষিত করে নেবার দিকেই মনযোগী ছিলেন, কিন্তু এবার তিনি আত্মকে হত্যা করার কালে স্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করে দেন যে আর তিনি আত্মকে বিস্তৃত হতে দেবেন না, আর তিনি আত্মের পূজা হতে দেবেন না।
ভাগ্নে, প্রথমে আমরা সকলে সেই কথাকে এমনি কথার কথাই ধরে ছিলাম যে উত্তেজনা বশে তিনি এইসমস্ত কথা বলছেন। কিন্তু কৃতান্তিক ধর্মস্থাপনের পরে, বেশ বুঝতে পারি যে, তাঁর কথন কেবল কথন নয়, তিনি সত্যই এবার নিজের সন্তানদের রক্ষা করতে বিস্তারের মার্গ ধারণ করছেন। … কৃতান্তিক ধর্মের বিস্তার ক্রমশ আত্মের সমস্ত স্থাপিত অধিকার কেড়ে নেবে, আত্মের থেকে সকলের বিশ্বাস কেড়ে নেবে, আত্মকে নির্বল করে দেবে।
তাই চিত্তাপুত্র, যাদের মাধ্যমে কৃতান্তিকের বিস্তার করার প্রয়াস স্বয়ং সর্বাম্বার ছিল, তাঁদের হত্যা করতে বলেছিলাম তোমাকে। কিন্তু তাঁদের হত্যা সম্ভব হয়নি। তাঁদের হত্যা হয়ে গেছে মেনে, সর্বাম্বার দেহত্যাগকে ঘিরে ধরে নিয়েছিলাম যে, সর্বম্বার সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু যেইক্ষণে চিত্তাপুত্ররা প্রত্যাবর্তন করলো, বেশ বুঝতে পেলাম যে সর্বাম্বা যে নিজের দেহত্যাগ করেছেন, তা কেবলই এক লীলা, যেই লীলার পরবর্তী অংশ যে কি, তার ধারণা আমি এখনও পর্যন্ত করে উঠতে পারিনি।
কিন্তু কথা এই যে, না তো জম্বুদেশকে তিনি আমাদের অর্থাৎ বৈদিকদের দ্বারা, পরমাত্মের দ্বারা কব্জা করে নিতে দেবেন, আর না তিনি কৃতান্তিক ধর্মের বিস্তারকে খণ্ডিত হতে দেবেন। … ভাগ্নে, তাই এখন আশা ছেড়ে দাও। এখন আর কিছুই করা যাবেনা। পথ ছেড়ে দাও, এই কৃতান্তিকদের”।
করিন্দ্র মাথা নেড়ে বললেন, “না না, এমন ভাবে পিছিয়ে আসা আর্যদের স্বভাব নয়। … মামা, ভেবে দেখুন, নিমাই রূপেও ব্রহ্মময়ীর বাহক এসেছিলেন আর বৈষ্ণবকুলের বিস্তার করেছিলেন। কি করেছিলাম তখন আমরা! আমরা তাঁদের সাথে ভিড়ে মিশে গেছিলাম, আর তাদেরকেই আজ কলুষিত করে দিয়েছি। একই কীর্তি আমরা রামকৃষ্ণ সেবকদের সাথেও করেছি। আর একই কীর্তি আমরা এখনও করতে পারি! কৃতান্তিকদের ভেক ধরে আমরা সেখানে প্রবেশ করে যাই, তারপর তাকে কলুষিত করে দেব। কি মামা, এটা তো করতেই পারি! সরাসরি যখন কাজ হচ্ছেনা, তখন …!”
বীর্য মাথা নেড়ে বললেন, “তুমি এখনও বুঝতে পারো নি ভাগ্নে। বাকি ধর্ম আর কৃতান্তিক ধর্মের মধ্যে এক বিস্তর বৈষম্য বিদ্যমান। … যেখানে সমস্ত ধর্ম নিজের নিজের অনুগামীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করাতে মনযোগী, আর তার দিকে মনোযোগ দেবার জন্য, সহস্র রীতিরেওয়াজ আর আচারঅনুষ্ঠান স্থাপিত করে তাদের পালনে তারা সুরক্ষিত থাকবে, এই প্রচার করে, সেখানে কৃতান্তিক ধর্ম সম্পূর্ণ বিরূপ কথা বলে।
অনুগামীর সংখ্যা নিয়ে এই ধর্ম চিন্তিতই নয়। আচার অনুষ্ঠান, রীতি রেওয়াজে এই ধর্ম বিশ্বাসীই নয়। এই ধর্ম কেবলই সত্য জ্ঞানে, এবং পূর্ণ নিষ্ঠাতে বিশ্বাসী। তাই এই ধর্ম সত্য নিয়ে প্রশ্ন করার পূর্ণ অধিকার দেয়। এই ধর্ম সত্যশিক্ষা, সত্য সম্বন্ধে ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও ধারণা বৃদ্ধির দিকে অধিক মনযোগী। অন্ধের মত কনো কিছুকে মেনে নেওয়া, এমনকি এঁর নিজের কথাকেও মেনে নেওয়াতে সে ঘোর অবিশ্বাসী।
অর্থাৎ বুঝতে পারছো, এই ধর্ম অনুগামীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে নয়, এই ধর্ম শিক্ষিত, সত্যপ্রেরণায় রত, এবং নিষ্ঠাবান অনুগামীতে বিশ্বাসী। তাই এই ধর্মের অন্তরে এঁর ভিড় বাড়াতে কেউ প্রবেশ করতে চাইলে, তার প্রতি এই ধর্ম উদাসীন। যে কেউ এর দ্বারে গেলেই সে কৃতান্তিক হতে পারেনা। যখন তিনি সত্যজ্ঞান আহরণ করে করে, সত্যজ্ঞানী ও সত্যপ্রেমী হয়ে যান, তিনিই একমাত্র এই ধর্মের অনুগামী। … কিছুকি বুঝতে পারছো ভাগ্নে!
যেমন ধরো বৈষ্ণব। যারা বৈষ্ণব ধর্মের জ্ঞাতা, যারা প্রচারক, আর যারা সেই প্রচার কথার শ্রোতা, সকলেই বৈষ্ণব, কৃতান্তিক ধর্মের ক্ষেত্রে তেমনটা নয়ই। এখানে কৃতান্তিক প্রচারক তিনিই হতে সক্ষম যিনি কৃতান্ত জ্ঞাতা। আর একমাত্র কৃতান্ত জ্ঞাতারাই এই ধর্মের অনুগামী, অন্যরা নন। না তিনি যিনি এই ধর্ম না জেনেও প্রচারক, না তিনি যিনি এই ধর্মের প্রচারকথার শ্রোতা। … অর্থাৎ এই ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হওয়া কঠিন নয়, অতি সহজ, কিন্তু বৈদিকদের জন্য তা অসাধ্য।
বৈষ্ণব ধর্মের কিচ্ছু না জেনেও, বৈদিকরা তার অনুগামী হয়ে গিয়ে বৈষ্ণব হয়ে যাবার ভেক ধরেছিলেন। তন্ত্রের কিচ্ছু না জেনেও, কেবল আচার অনুষ্ঠান করে করে, বৈদিকরা তার অনুগামী হয়ে যাবার নাট্য করেছিলেন। কিন্তু এখানে সেই সুবিধা নেই। এখানে এই কৃতান্তিক ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হতে গেলে, সত্য অর্থে কৃতান্ত জ্ঞাতা হয়ে উঠতে হবে, আর কৃতান্তজ্ঞাতা হয়ে ওঠার জন্য যেই মেধার প্রয়োজন, তা সম্পূর্ণ বৈদিক কুলের মধ্যে একটি ব্যক্তির মধ্যেও নেই, কারণ বৈদিকরা মেধার জন্মই হতে দেয়না। জন্ম হবার আগেই, বৈদিকরা কল্পনাকে মেধা নামে প্রচারিত করে দেয়। অর্থাৎ কৃতান্তিক ধর্মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব”।
করিন্দ্র উত্তেজিত হয়ে উঠে বললেন, “বেশ মামা, তাহলে চলো আক্রমণ করে দিই চিত্তাদের। আমাদের সেনা বল ওদের থেকে অনেক অনেক ভাবে বিপুল। আর আমরাও তো দুর্বল নই। চিত্তাপুত্রদের কিচ্ছু করতে পারবো না মানছি, কিন্তু ওদের সমস্ত সামন্তদের তো হত্যা করে দিতে সক্ষম আমরা। তাই না! ওদের বিস্তারকে স্তব্ধ করে দেবার সামর্থ্য তো আমাদের আছে। … তাই সেটুকু তো আমরা করি!
নাহলে আমরা যার অনুগামী, সেই পরমাত্মকে কি মুখ দেখাবো মামা! … কি বলবো মামা তাকে? আমরা প্রয়াসও করিনি! … প্রয়াস করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা অধিক শ্রেয়, কিন্তু প্রয়াস না করার কলঙ্ক মাথায় নেওয়া … না না, ছি ছি! এই কলঙ্ক মাথায় নিতে পারবো না মামা!”
বীর্য বললেন, “নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সেই পথে যাওয়ার কিই বা অর্থ ভাগ্নে! … শান্ত হও। শান্ত করো নিজেকে”।
করিন্দ্র বললেন, “মামা, আমরা যা করছি, তা তো সমস্ত আর্যকুলের হয়েই করছি। তাই ইহুদিদের আর বাকি বৈদিকদের থেকে সাহায্য পেতে পারিনা আমরা!”
বীর্য বললেন, “ভাগ্নে, পরমাত্ম এখানে অবতরণ করেছিল সামগ্রিক বেশে, অন্যত্র নয়। … তাঁর পরিবারের অংশ আমরা। আর আমাদের একাকজনের যা বল, তা দ্বারা আমরা সমস্ত ইহুদি ও বৈদিকদের একাকী সামনা করতে সক্ষম। তাই তাঁদেরকে টেনে আনার মানে এই যে, চিত্তাপুত্রদের, সর্বাম্বাকে সাহায্য করা। সর্বাম্বা তো এটাই চায় যে, সম্যক আর্যকুল বিপন্ন হয়ে যাক।
এই চিত্তাপুত্রদের সম্মুখে সেই সমস্ত আর্যকুলকে নিয়ে এসে, তাঁদেরকে দিয়ে গণহত্যা করিয়ে, কেন আর্যকুলেরই নাশ ঘটাতে চাইছো ভাগ্নে। এই সমস্ত আর্যকুল একাকী তোমার ও তোমার ভ্রাতাদের সামনা করার সামর্থ্য ধরেনা। আর তোমরা চিত্তাপুত্রদের সামনে করতে পারো না। তাহলে বুঝতে পারছো, এঁদেরকে চিত্তাপুত্রদের সামনে রাখার অর্থ কি? সে যে আত্মঘাতী হামলা ভাগ্নে!”
পিছন থেকে দেবী হুতা, মিতা ও স্ফীতা এগিয়ে আসলে, দেবী মিতা বললেন, “আমাদের পুত্ররা কনো চিত্তাপুত্রদের সামনা করতে পারেনা, এতো মিথ্যা বচন। তারা সুর ও তালের সামনা করতে পারেনা, কিন্তু ছন্দ তাদের সামনে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু নয়। মায়াবিদ্যায় বনবিবিরা শ্রেষ্ঠ নাকি শৃঙ্খলা ঘৃতকুমারীরা শ্রেষ্ঠ, তা এখনো অঘোষিত”।
দেবী হুতা এবার বললেন, “আর আমরা বলছি পুত্র, তুমি শান্তিদূত প্রেরণ করো দৃষ্টান্তপুরে। … হ্যাঁ পুত্র, যুদ্ধের সূচনা করো”।
বীর্য বললেন, “কেন নিজের পুত্রদের এমন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিচ্ছ হুতা! … এর অর্থ কি?”
হুতা হেসে বললেন, “আজ ১০ বৎসর হয়ে গেছে, দৃষ্টান্তপুর সমানে নিজেদের উত্থান করে গেছে, আর ছায়াপুর সমানে নিজের জম্বুদেশের উপর অধিকার থেকে মুক্ত হতে থেকেছে। … এই সময়কালে কি আমরা তিন ভগিনী তোমার, পায়ের উপর পা রেখে বসেছিলাম ভ্রাতা!”
দেবী স্ফীতা সম্মুখে এসে বললেন, “না ভ্রাতা, আমরা সমস্ত জীবের ইচ্ছা, সমস্ত জীবের চিন্তা ও সমস্ত জীবের কল্পনাকে একত্রিত করে ফেলেছি এই সময়কালে। … সমস্ত জীবের ইচ্ছাকে একত্রিত করে, ব্রহ্মাস্ত্র পূর্ব থেকেই নির্মিত ছিল। সমস্ত জীবের চিন্তাকে একত্রিত করে নারায়ণাস্ত্র আগে থেকেই ছিল। সমস্ত জীবের কল্পনাকে একত্রিত করে পাশুপতও পূর্ব থেকেই ছিল।
কিন্তু এই তিনমোক্ষমবাণকে একত্রিত করে এক মোক্ষম বাণ নির্মাণ করেছি আমরা। … এই বাণের একটিই নিয়ম, আর তা হলো, সম্মুখে স্থিত যেকোনো একটি রেখার সমস্ত কিছুকে সে বন্দী করে নেবে, ততক্ষণ যতক্ষণ এর সামর্থ্য বিদ্যমান। … তাই পুত্ররা, এঁদেরকে এমন ভাবে তোমাদের নিক্ষেপ করতে হবে, যাতে করে সুর ও তাল একত্রে এঁর মধ্যে আবদ্ধ হতে পারে”।
দেবী হুতা পুনরায় বললেন, “আর তারজন্য তোমাদেরকে রণক্ষেত্রে উত্তীর্ণ হতে হবে। … হ্যাঁ, হয়তো সেই অবস্থায় যুদ্ধকে নিয়ে যাবার জন্য, তোমাদের অসংখ্য বলি দিতে হবে। হয়তো আমাদেরকেও আমাদের কিছু সন্তান হারাতে হবে। কিন্তু একবার যদি সুরতালছন্দকে একটি সরলরেখায় আনতে পারো, তাহলে এই বাণ তোমাদের সমস্ত স্বপ্নকে পুড়ন করে দেবে। সমস্ত বৈদিকদের, সমসত আর্যদের স্বপ্ন পুড়ন করা সম্ভব হবে”।
দেবী মিতা খলহাস্য হেসে বললেন, “এক মহাকৃপাণ ব্যতীত, আর কনো অস্ত্র, স্বয়ং প্রকৃতিও এই বাণকে খণ্ডন করতে পারবেনা। … আর সর্বাম্বা দেহত্যাগ করার কারণে আর কারুর কাছে সেই মহাকৃপাণ উপস্থিত নেই। অর্থাৎ এই ত্রিদেবাস্ত্রকে খণ্ডন করার সামর্থ্য না তো সুরের আছে, না তালের আছে, আর না ছন্দের আছে, আর না তাঁদের মিলিত শক্তির আছে”।
দেভি স্ফীতা পুনরায় বললেন, “তবে ওই যে বললাম, যাই হয়ে যাক, এই ত্রিদেবাস্ত্রকে ততক্ষণ নিক্ষেপ করা যাবেনা, যতক্ষণ না চিত্তাপুত্রদের একরেখায় নিয়ে আসতে পারবে। … একবার এই বাণ নিক্ষিপ্ত হয়ে গেলে এবং তার থেকে যদি চিত্তাপুত্ররা মুক্ত হয়ে যায়, তাহলে আর তোমাদের কাছে দ্বিতীয় কনো মার্গ নেই জীবিত থাকার। তাই অত্যন্ত গহন ভাবে সতর্ক হয়ে এই বাণ ধারণ করো পুত্র”।
করিন্দ্র সেই অস্ত্র দেখে, আনন্দে প্রফুল্লিত হয়ে, বললেন, “মাতা এই অস্ত্র ভণ্ডকে প্রদান করো। সে-ই এই অস্ত্র চালনার জন্য সঠিক ব্যক্তি”।
দেবী হুতা সেই অস্ত্র ভণ্ডকে প্রেরণ করে অন্তরমহলে প্রত্যাবর্তন করে গেলে, ভণ্ড বললেন, “মিত্র, এই একটি অস্ত্রের ভরসায় আমরা সম্পূর্ণ যুদ্ধ করতে অবতীর্ণ হতে চলেছি। তাই আমরা এমন কনো সম্ভাবনা রাখতেই পারিনা যে, এই অস্ত্রকে ভ্রান্তভাবে প্রয়োগ করবো বা, প্রয়োগ করতে পরাবোই না। … মিত্র, আমাদের যথার্থ একটি যুক্তি নির্ধারণ করতে হবে, এই অস্ত্রকে সঠিক ভাবে প্রয়োগ করার জন্য”।
শৃঙ্খলাপুত্রীরা সম্মুখে এসে বললেন, “আমরা একটি উপায় করতে পারি। … কিন্তু, সেই উপায় স্থাপিত করার কালে বেশ কিছু ব্যাপারকে স্থির করতে হবে আপনাদেরকে”।
করিন্দ্র উত্তেজিত হয়ে বললেন, “কি ব্যাপার, আমাদের স্পষ্ট করে বলুন দেবীরা”।
শৃঙ্খলাপুত্রীরা বললেন, “নাথ, আপনাদের সকল ২০টি ভ্রাতাকে পূর্বে মৃত্যুবরণ করতে হবে চিত্তাপুত্রদের হাতে। … আর আপনাদের দেহকে সুরক্ষিত, অর্থাৎ ক্ষতমুক্ত রূপে অবস্থান করাতে হবে। অতঃপরে, আমরা আপনাদের সকল ২০টি ভ্রাতার ভৌতিক দেহের, এবং আত্মিক বলকে একত্রিত করে, একটি দানবীয় দেহ প্রদান করতে পারি। এই দানবীয় দেহ এতটাই বৃহৎ হবে যে, সমস্ত চিত্তাপুত্রকে নিজের করতলে স্থাপন করে দিতে পারবেন। আর তখন ভণ্ড তাঁদের উদ্দেশ্যে এই ত্রিদেবাস্ত্র প্রয়োগ করতে পারবে, এবং তাঁদের কে অনন্তকাল পর্যন্ত বন্দী করে রাখতে পারবে”।
ভণ্ড প্রশ্ন করলেন, “আর মিত্রদের কি হবে তারপর?”
ঘৃতকুমারীরা সম্মুখে এসে বললেন, “আমরা পুনরায় তাঁর সেই দৈত্যাকার দেহকে ২০টি খণ্ডে বিভক্ত করে, পুনরায় ২০টি করিপুত্র করে দিতে সক্ষম। সেই ক্ষেত্রে, তাঁরা পূর্বের থেকেও অধিক বলশালী হয়ে যাবেন, কারণ ভৌতিক বলের সাথে আত্মিক বলও তাঁদের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে”।
ভণ্ড বললেন, “মিত্র, তোমাদের এতে সহমত আছে?”
করিন্দ্র ক্রুর হাস্য হেসে বললেন, “আমার তোমার উপর, আমার ভ্রাতাদের উপর, দেবী শৃঙ্খলাপুত্রীদের উপর ও ঘৃতকুমারীদের উপর পূর্ণ আস্থা আছে। … তবে, আমাদেরকে সুন্দর ভাবে যোজনা স্থির করতে হবে, যাতে করে, কিছুতেই চিত্তাপুত্ররা আমাদের যোজনার আন্দাজ না পেতে পারে”।
ভণ্ড হেসে বললেন, “প্রথমে আমাদের সমস্ত মিত্ররাজাদের হত্যা করাও, তাদেরকে চিত্তাপুত্রদের সামনে ফেলে। অতঃপরে সহজ যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে মৃত্যু লাভ করো তোমরা। প্রয়াস করো সুরের হাতে মৃত্যু লাভ করতে, কারণ তালের হাতে মৃত্যু লাভ করতে গেলে, তোমাদের দেহ অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাদবাকি, আমি ও মামাশ্রী, নাট্য করেই হোক, আর বলের জোরেই হোক, তোমাদের দেহদের সুরক্ষিত করে রাখবো। আর তারপর তো দেবী শৃঙ্খলা ও ঘৃতকুমারীদের যোজনা রয়েছেই”।
