১৫। পুরাপুর অধ্যায়
তাল ও সুর ছায়াপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রারত থাকলে, সুর তালের উদ্দেশ্যে বললেন, “ভ্রাতা, আজ আমরা ছায়াপুরকে প্রত্যক্ষ করতে চলেছি, যা আমার কাছে এক বিস্ময়”।
তাল ব্যঙ্গের হাস্য হেসে বললেন, “করিন্দ্র আর বিস্ময়! … এ কি কথা বলছো সুর!”
সুর মাথা নেড়ে, ওষ্ঠদেশকে নিম্নে মুদ্রিত করে বললেন, “অবিশ্বাস্য হলেও সত্য ভ্রাতা। কি ভাবে নির্মাণ করেছে, তা তো আমার জানা নেই, কিন্তু সম্পূর্ণ জম্বুদেশে এই ছায়াপুরের চর্চা রয়েছে। এখানে নাকি প্রকৃতিও প্রবেশ করতে পারেনা। অর্থাৎ নিশ্চিত রূপে তাঁরই ভূতদের নিয়ে গড়া এই রাজ্য, কিন্তু প্রত্যক্ষ অবস্থায় তিনি নাকি এই রাজ্যে নিবাসই করেন না। অর্থাৎ এই রাজ্যের আপাদমস্তক নাকি অপ্রাকৃতিক, আর সম্পূর্ণটাই মায়াবী”।
তাল বললেন, “বলো কি হে?”
সুর বললেন, “শুধুই কি এই ভ্রাতা, আরো এক বিশেষ কারণে আমি একাকী এই রাজ্যে প্রবেশ করার সাহসই কুলিয়ে উঠতে পারিনি!”
তাল এবার বিস্ফারিত নয়নে সুরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি সাহস কুলিয়ে উঠতে পারো নি! কেন? তোমার সাহসের অভাব করে, এমন সাহস কার অনুজ!”
১৫.১। ছায়াপুর পর্ব
সুর বললেন, “সাহসের অভাব এই কারণে হয়নি যে, আমার কনো অহিত করে দেবে। কিন্তু আসল কথা হলো আমার বিস্ময়। এই রাজ্য এমনই বিস্ময়কর যে, এই রাজ্যের বিস্ময় প্রজাদেরকে এই বোধ করাতে শুরু করে দিয়েছে যে করিন্দ্র নিশ্চিত ভাবে ভগবানের আশীর্বাদপ্রাপ্ত, নাহলে সে এমন রাজ্য করতে পারে কি উপায়ে। আর তাই আমার অত্যন্ত প্রবল জিজ্ঞাসা এই যে, কি এমন বিস্ময়কর আছে এই রাজ্যে”।
তাল বললেন, “তা জানতে কুণ্ঠা কিসের। চলো, আমরা এক্ষণে সেই রাজ্যে প্রবেশ করে, সেই রাজ্যের বিস্ময়কর হবার কারণের সন্ধান করে আসছি”।
সুর উত্তরে মাথা নেড়ে বললেন, “সেই খানেই তো সমস্যা ভ্রাতা। এই রাজ্যে এবং শুধু এই রাজ্যে নয়, সর্বত্র জম্বুদেশে করিন্দ্র একটি ব্যবস্থার নির্মাণ করেছে, যা একটি সেন পক্ষীর মত। অন্তরে বাইরে, সেনের ডানার মতকরে সেনা নিয়োগ করেছে সে, যাতে বাইরে থেকে কেউ অনুপ্রবেশ করতে গেলে তাকে বন্দী করা যায় এবং যিনি বিদ্রোহ করবেন তাঁকে ধরে আনা যায়। সঙ্গে সঙ্গে একটি সেনের ওষ্ঠ নির্মাণ করেছে যাতে সেই বিদ্রোহীকে বা অনুপ্রবেশকারীকে ঠুকরে শেষ করে দেওয়া যায়, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে নিজের রাজ্যকে আর রাজ্যব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করে রাখা যায়”।
তাল বললেন, “তাতে আমাদের কি চিন্তা অনুজ। … আমরা না চাইলে, না আমাদেরকে বন্দী করতে পারবে, আর না আমাদেরকে মৃত্যু দিতে পারবে করিন্দ্র বা করিন্দ্রের কনো ব্যবস্থা। … কিন্তু এই চক্রান্ত বড় ভয়ঙ্কর। অনেক প্রজার প্রাণ নিয়েছে নিশ্চয়ই, এই যন্ত্রমাধ্যমে!”
সুর মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, প্রজাকে করিন্দ্র প্রথম ভয় পাইয়েছে এই যন্ত্র দ্বারাই। অতঃপরে এই মায়াবী রাজ্যের মায়া দ্বারা বিভোর করে দিয়েছে, আর এই সমস্ত কিছুদিয়ে কখনো বলের দ্বারা, আর কখনো মায়ার দ্বারা প্রজাকে পরাধীন করে রেখে দিয়েছে। … অদ্ভুত এক কৌশল ভ্রাতা। প্রজা পরাধীন, অথচ তাঁদের এই বোধটিও নেই যে তাঁরা পরাধীন। প্রথম দিকে এই বোধ ছিল, যখন এই বিচারব্যবস্থা বা সেনার নির্মাণ ও প্রয়োগ হয়েছিল, কিন্তু পরে পরে, সেই সেনা ও বিচার ব্যবস্থাকে যখন প্রজার কাছেও তুলে ধরা হলো, তখন প্রজা মনে করতে শুরু করলো যে তাঁদের হিতই সাধিত হয়েছে। আর তারই সাথে এই মায়ারাজ্য তাঁদেরকে মনে করাতে থাকলো যে এই করিন্দ্র নিশ্চিত ভাবে ঈশ্বরপ্রদত্ত নাহলে এমন কর্ম কি করে করতে পারলো সে!”
তাল এবার ঈষৎ দ্বন্ধে স্থাপিত হয়ে বললেন, “না না, সত্যই তো, বিচার ব্যবস্থা যদি প্রজার হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে খারাপ কি?”
সুর বিকৃত হাস্য হেসে বললেন, “এ নিছকই একটি ভ্রমবিস্তার ভ্রাতা। … বলতে গেলে তো প্রজাও সেনার কাছে গিয়ে, সিপাহির কাছে গিয়ে, বিচারকের কাছে গিয়ে, নিজেদের অস্বস্তি, নিজেদের দুশ্চিন্তা, নিজেদের সাথে হওয়া যাওয়া অন্যায়ের বিচার চাইতে পারে। কিন্তু করিন্দ্রের মায়া অত্যন্ত সাবলীল ভ্রাতা। করিন্দ্র সরকারের ও করিন্দ্র সরকার যাদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করা সমস্ত আর্জি কেবল নথি হয়েই থেকে যায়।
সেই নিয়ে লোকদেখানি বিচারও হয়, কিন্তু সেই বিচারের কনো রায় আসেনা। অনন্তকাল ব্যাপী সেই সমস্ত বিচারকাম্য বিষয় অমীমাংসিত হয়েই থেকে যায়। একই ভাবে, সেনার কাছে বা সিপাহির কাছে প্রজার করা অভিযোগ নেওয়া তো হয়, কিন্তু কেবলই সেই অভিযোগকে নথি করে রেখে দেওয়া হয়, তা নিয়ে কনো চর্চাও করা হয়না।
আরো মজার কথা কি জানো ভ্রাতা, এই একই সেনা, এই একই সিপাহী, এই একই সেনা, আর এই একই বিচার ব্যবস্থাকে সরকারি কর্মশালা রূপেও ব্যবহার করে করিন্দ্র। অর্থাৎ ঠিক যেমন প্রজা রাজার বিরোধী আবেদন করতে পারে এঁদের মাধ্যমে, তেমনই রাজা বা সরকারও প্রজার বিরুদ্ধে আবেদন করতে পারে এঁদের মাধ্যমে। আর যখন সরকার প্রজার বিরুদ্ধে আবেদন করে, তখন এই সেনা, এই সিপাহী, এই বিচারালয়ই, যারা প্রজার আবেদনে সামান্যও প্রতিক্রিয়া দেখায় না, বা কেবলই লোকদেখানো প্রতিক্রিয়া দেখায়, ছেলেভোলানোর মত, তারা সরকারের ক্ষেত্রে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ বুঝতে পারছো ভ্রাতা, এ কেমন ধারার মায়া! একই ব্যবস্থাকে সরকারও প্রজার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে সক্ষম, আবার প্রজাও সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে সক্ষম। কিন্তু তাকে ব্যবহার করতে পারে কেবলই সরকার। অদ্ভুত না এই প্রতারণা!”
তাল বললেন, “বিকট সমস্যা। কিন্তু প্রজা এতে ভুলছে কি করে? প্রজার তো এই নিয়ে বিদ্রোহ করা উচিত। তাই না!”
সুর হেসে বললেন, “প্রজা এখনো এই ভেদ উপলব্ধি করতে পারেনি, কারণ প্রজা এই ব্যবস্থার বাইরে নির্গত হয়ে এই ব্যবস্থাকে দেখতে সক্ষম হয়নি। আর তুমিও জানো ভ্রাতা, ব্যবস্থার মধ্যে স্থিত হয়ে ব্যবস্থাকে দেখলে, তাকে সমস্যা মনে হয়, তাকে চক্রান্ত মনে হয়না। ঠিক যেমন দেহের ক্ষেত্রেও, আমি দেহী, এটা মানলে যেমন দেহের মধ্যে হওয়া অরাজগতাকে আমরা সমস্যা জ্ঞান করি, কিন্তু আমি দেহী নয় মানলে, সেই একি অরাজগতাকে আমরা আত্মের চক্রান্ত রূপে দেখতে পাই। এও তেমন”।
তাল মাথা নেড়ে বললেন, “আর প্রজা এই ব্যবস্থাকেই সমস্ত কিছু মেনে বসে রয়েছে কারণ এই ছায়াপুরের মায়াবী শহর তাঁদেরকে বিভোর করে দিয়েছে। এই তো!… কিন্তু তোমার সাহসের অভাব হচ্ছে কেন, এই শহর দেখার, তা আমার কাছে এখনো পরিষ্কার হলো না। তোমাকে প্রতিরোধ করে এমন কার সামর্থ্য!”
সুর উত্তরে বললেন, “ভ্রাতা যুদ্ধ করলে কি আর রণক্ষেত্র কেমন তা দেখার অবকাশ থাকে! … যদি যুদ্ধই করতে হয়, তবে তো আর এই ছায়াপুরের মায়াকে নিরীক্ষণই করতে পারবো না। … কিন্তু আমি এই মায়াকে নিরীক্ষণ করতে চাই ভ্রাতা। কারণ যদি এই মায়াকে নিরীক্ষণ করতে না পারি, তাহলে আমরা প্রজার কাছে আর কনোদিনও পৌছাতে পারবো না। করিন্দ্র এই মায়ারাজ্য দ্বারা প্রজাকে ভুলিয়ে রেখে দিয়েছে, আর প্রজা এই মায়ার ফলে, তাঁর চক্রান্তকেই তাঁদের কাছে প্রদত্ত বিচারব্যবস্থা রূপে গ্রহণ করে বসে রয়েছে, যা সমস্যা জর্জরিত তা তো উপলব্ধি করতে পারছে, কিন্তু তা যে এক চক্রান্ত, তা অনুভবও করতে পারছে না”।
তাল উত্তরে বললেন, “বুঝতে পেরেছি। তোমার কথা হলো, তুমি এই মায়াকে নিরীক্ষণ করতে চাও, আর বুঝতে চাও যে প্রজা ঠিক কিসের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় পরাধীন হয়ে রয়েছে। তাই তো?”
সুর বললেন, “হ্যাঁ ভ্রাতা, ঠিক তাই। যতক্ষণ না জানা যাচ্ছে যে প্রজা কেন এই পরাধীনতাকে পরাধীনতা মানছে না, ততক্ষণ এই পরাধীনতাকে খণ্ডন করাও সম্ভব নয়, আর তাদেরকে উদ্ধার করাও সম্ভব নয়। কিন্তু যদি ছায়াপুরকে নিরীক্ষণই করতে না পারা যায়, তাহলে কি করে এই মায়ার ভেদ জানা সম্ভব হবে?”
তাল বললেন, “তুমি বলেছিলে আমাকে যে জম্বুদেশ একটি বিকট সমস্যার মধ্যে পরে রয়েছে, যার নিরময়ের সন্ধান করতে গেলে, মায়াবী পদ্ধতি আবশ্যক। সেই কথা আমি দেবী নলিনীকে বলতে, তিনি আমাকে একটি মায়াবিদ্যা প্রদান করেছেন, যার মাধ্যমে আমি যেকোনো আমার আকৃতির অন্যরূপ ধরতে সক্ষম। … এবার বলো, এই দিয়ে কিছু কি করা সম্ভব!”
সুর খানিক বিচার করে বললেন, “সম্ভব ভ্রাতা। … সম্ভব। তোমার আকৃতির অন্য দেহ মানে আমার মনে একটি প্রাণীর কথাই আসছে। হস্তি। যদি এক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা হস্তি হয়ে যাও তুমি, তাহলে আমি তোমার মাথায় চড়া মাহুত হয়ে যাবো। আর সাথে সাথে হস্তিকে নিদ্রাসক্ত করে দেওয়ার জন্য যেই যেই স্থানে বাণ নিক্ষেপ করা যায়, সেই সেই স্থানে আমি তোমাকে বর্ম পরিয়ে দেব। … এরপর, তুমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, তোমার মাহুত, অর্থাৎ আমাকে নিয়ে ছায়াপুরে প্রবেশ করে যাবে।
তোমার মাথায় স্থিত হয়ে আমি বলতে থাকবো। যত অধিক এই হস্তিকে বিরক্ত করবে, তত অধিক তাণ্ডব করবে সে। তাই নিরস্ত হও। আর সেই বলতে বলতে, আমরা দুইজনে এই শহর আর তার মায়াকে নিরীক্ষণ করে নেব”।
তাল বললেন, “নিরীক্ষণ তো করে নিলাম। এরপর যদি ওরা আমার পায়ে শিকল পরিয়ে তোমাকে আর আমাকে বিচারের কাঠগড়াতে তুলে দেয়!”
সুর আশ্বস্ত হয়ে বললেন, “একবার নিরীক্ষণ করা হয়ে গেলে, তখন যুদ্ধ করতে আর কিসের আপত্তি ভ্রাতা! … করিন্দ্র নিজের কীর্তিকে জাহির করে, প্রজার মনে মায়ার বিস্তার করার জন্য সংবাদ মাধ্যমের রচনা করেছে। সেই সংবাদমাধ্যমে এই বিচারব্যবস্থার গুণগান করতে থাকে সে। অর্থাৎ ভ্রাতা, আমরা অন্তে ধরা দেব, আর প্রজার কাছে এই সংবাদ মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেব যে আমরা প্রত্যাবর্তন করেছি, আর এও বিচারালয়ে দাঁড়িয়ে বলবো যে, আমরা এই হস্তি মাহুত রূপ ধরেইছিলাম, প্রজাকে যেই ভাবে মায়ায় পরাধীন করা হয়, তা জানার জন্য”।
তাল হেসে বললেন, “অতি উত্তম অনুজ। এতে করে প্রজার কাছে প্রথমবার তাঁদের পরাধীনতার বার্তা চলে যাবে, আর একটি আহ্বানও পৌঁছে যাবে যে, নিজেরা যে পরাধীন, তাকে ভালো করে অবলোকন করো। … এরপর না হয়, এই মায়ার থেকে মুক্ত করবার পরিকল্পনা করা যাবে ভ্রাতা ছন্দের সাথে ও অন্য মিত্ররাজাদের সাথে মিলে। … বেশ তাহলে, আমি বিশালাকায় হস্তিবেশ ধারণ করছি, দেবী নলিনীর প্রদত্ত মায়াবিদ্যা ধারণ করে”।
সুর বললেন, “দাঁড়াও ভ্রাতা। তুমি একবার হস্তি হয়ে গেলে, আর তুমি মানবিক শব্দের অর্থ বুঝতে পারবেনা। তাই আগেই আমাকে বলে দাও যে, এই মায়ার নাশ কি ভাবে সম্ভব। কারণ অন্তে তোমাকে হস্তিরূপ থেকে প্রত্যাবর্তনও তো করাতে হবে”।
তাল বললেন, “একটি প্রকৃতির বস্তুর মধ্যদেশকে মুখগহ্বরে ধারণ করে যেই পশুর স্মরণ করবো, সেই পশু হয়ে যাবো আমি। … আর সেই বস্তুকে যদি কেউ খণ্ডন করে দেয়, তাহলে আমি আবার নিজের রূপে প্রত্যাবর্তন করবো। এই হলো সেই মায়ার শর্ত”।
সুর বললেন, “বেশ ভ্রাতা। তাহলে (একটি কুশ উঠিয়ে) এই কুশটি ধারণ করে তুমি হস্তি হয়ে যাও। আর এই কুশকে আমি আমার কাছে রেখে দিলাম। যখন তোমাকে প্রত্যাবর্তন করানোর হবে, তখন এই কুশকে আমি ছিন্ন করে দেব”।
এই কথন অনুসারেই একটি কুশের মধ্যস্থলকে মুখে ধারণ করে, হস্তির স্মরণ করতে, তাল একটি বিশালাকায় মদ্দা হস্তিরূপ ধারণ করলেন। অতঃপরে, সেই কুশকে নিজের কাছে প্রথমে গচ্ছিত করলেন সুর। অতঃপরে নিজের বাণদ্বারা সেই হস্তিরূপ তালকে একটি কবচে আবদ্ধ করলেন যাতে তাঁকে কনো বাণ দ্বারা অজ্ঞান করে দেওয়া সম্ভব না হয়। এবং অন্তে নিজেকে মাহুতের বেশে আবিষ্ট করে, স্থাপন করলেন হস্তির পৃষ্ঠে।
সুর পৃষ্ঠে স্থাপিত হয়ে, তালের কর্ণের কাছে নিজের ওষ্ঠ নিয়ে গিয়ে বললেন, “এবার মত্ত হয়ে দক্ষিণপশ্চিমে ধাবিত হও। এখান থেকে ছায়াপুরের শৃঙ্গ দেখা যাচ্ছে দেখ, সেইদিকে উন্মত্ত হয়ে দৌড় লাগাও”।
হস্তিরূপ তাল একবার মস্তক উঁচু করে ছায়াপুরের শৃঙ্গকে দেখলেন। তারপর গতিবৃদ্ধি করে প্রকাণ্ড দৌড় লাগালেন সেই উদ্দেশ্যে।
ছায়াপুরের প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি সেই মত্ত হস্তি পৌঁছালে, সেনা তৎপর হয়ে উঠলো সেই হস্তিকে বন্দী করার জন্য, কিন্তু প্রবল বলশালী হস্তিরূপ তাল বহু সেনাকে পদপিষ্ট করে হত্যা করে দিলেন। সম্মুখে যেই সেনা এলেন, তাঁকে নিজের বিশালাকায় শুণ্ড ব্যবহার করে পেঁচিয়ে প্রাণ নিয়ে নিলেন। আর হস্তির পিঠে বসে থাকা মাহুতবেশে সুর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে থাকলেন, “সম্মুখ থেকে সরে যান। নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এই হস্তি। সম্মুখে যে আসবে, তাকে পিষ্ট করে দেবে”।
এমন কীর্তি করলে, সেনা কিছুতেই হস্তিকে ছায়াপুরে প্রবেশ করা থেকে রোধ করতে পারলেন না। সেই সংবাদ যেমন করিন্দ্রের কাছে পৌঁছল, তেমন করিন্দ্রেরই নির্মিত সংবাদমাধ্যম সমস্ত জম্বুদেশের প্রজার কাছে সেই বার্তা পৌঁছে দিতে থাকলো। সকলের মধ্যে একটি সারা পরে গেল যে, “অজেয় ছায়াপুরকে একটি মত্ত হস্তি জয় করে নিলো!” …
এর উত্তরে কেউ বললেন, “তাহলে আর কেমন অজেয় পুর এই ছায়াপুর!” তো অন্যেরা বললেন, “এই ছায়াপুরের ধারাতেই সমস্ত জম্বুদেশকে সাজাতে চাইছিলেন সম্রাট করিন্দ্র। কি পরে থাকতো এর সুরক্ষা!” তো কেউ বলতে থাকলো, “আহা রে! সরকার হিমসিম খাচ্ছে, এই মত্ত হস্তিকে নিয়ে!” আবার কেউ কেউ এমনও বলতে থাকলো, “খুব তো বলতো, প্রকৃতিও প্রবেশ করতে পারবেনা! তা প্রবেশ করলো তো প্রকৃতি!”
অন্যদিকে ছায়াপুরে তখন হুলুস্থুল কাণ্ড। সেনা, সিপাহী সকলে মিলেও সেই হস্তিকে কিছুতেই বাগে আনতে পারেনা। রাজ্যে উপস্থিত সকল পশুর সংজ্ঞা ছিনিয়ে নেওয়া ওষধির সমাহার সমাপ্ত হয়ে গেছে। সুরের প্রদান করা বর্মের কারণে, কনো ওষধি হস্তির অঙ্গকে স্পর্শও করতে পারলো না। … অবশেষে করিন্দ্রের থেকে বার্তা পৌছায় সেনা ও সিপাহির কাছে যে, মাহুতের কথা শুনে হস্তিকে আঘাত না করার চেষ্টা করতে, উপরন্তু হস্তির চরণে শিকল পরিয়ে তাকে বন্দী করতে।
কিন্তু সেখানেও হস্তির বেগের কারণে সকলে নাজেহাল হতে থাকলো। অন্যদিকে সুর ও তাল সম্পূর্ণ ছায়াপুরের পরিদর্শন করতে থাকলো, তাঁদের এই ভ্রমণের সাথে সাথে। সত্যই মায়াবী এই রাজ্য। এখানে একটিও তৃণ নেই, কিন্তু তৃণের মত দেখতে আর অনুভূতিও তৃণের মত এমন অনেক বৃক্ষরাজি রয়েছে। বেশ কিছু সেই বৃক্ষের পাতাকে তাল শুণ্ডের মাধ্যমে ছিনিয়ে নিয়ে সুরের হাতে দিলে, সুর পরখ করে দেখলেন যে, প্রকৃত বৃক্ষকে ওষধি প্রদান করে করে, প্রকৃত বৃক্ষের সমস্ত গুনাগুণ নষ্ট করে, এক অপ্রাকৃতিক বৃক্ষসারীর জন্ম দিয়েছে করিন্দ্র, আর তাই দিয়েই সমস্ত ছায়াপুর পরিব্যপ্ত।
অর্থাৎ সেই বৃক্ষ, তরুকে দেখতে এমনকি অনুভবেও তা প্রকৃতির বৃক্ষ, কিন্তু তা প্রকৃতির বৃক্ষ বা তরু নয়, তা সম্পূর্ণ ভাবে অপ্রাকৃতিক। … একই ব্যাপার অনুধাবন করার জন্য, হস্তিকে নিয়ে প্রবেশ করলো সুর ধানের খেতে, বা অন্য ফসল বা সবজী চাষের খেতে। আর সেখানের সামগ্রীদেরও পরীক্ষণ করে একই বিষয় দেখলেন। সমস্ত কিছু দেখে সুর বিস্মিত হয়ে বললেন, “এত ভয়ানক ধোঁকা! … দেখতে ও অনুভবেও এই সমস্ত বৃক্ষ, তরু সমস্ত কিছুই প্রাকৃতিক, কিন্তু ওষধি দ্বারা প্রকৃতিকে বিনষ্ট করে, এই সমস্ত ধান, তরু, সবজী, ফুল, বৃক্ষ, সমস্তই মায়া, এঁদের মধ্যে প্রকৃতির লেশমাত্রও নেই! অর্থাৎ প্রজার কাছে কনো পুষ্টিই পৌছায় না।”
শেষে হস্তিরূপ তাল যখন চাষের মৃত্তিকা খানিক তুলে নিয়ে হস্তি যেমন মৃত্তিকা অঙ্গে মাখে তেমনই করে, সেই মৃত্তিকাকে হাতে নিয়ে পরীক্ষণ করে সুর দেখে বললেন, “এই মৃত্তিকাও তো মৃত্তিকা নয়! … এও তো ওষধি মিশ্রিত ধাতবগুণমুক্ত একপ্রকার মায়াবী মৃত্তিকা! … এই কারণেই এঁরা বলে, প্রকৃতি এখানে প্রবেশও করতে পারেনা! … কি অতীব ভয়ানক! এর অর্থ, প্রজাকে এই সমস্ত ওষধি মিশ্রিত বৃক্ষ থেকে আহার প্রদান করে করে, তাঁদের মেধাশক্তিকে সম্পূর্ণ ভাবে বশ করে রেখে দিয়ে, তাঁদের কল্পনাকেই মেধা করে রেখে দিয়েছে করিন্দ্র!”
সেই কথনকে পরীক্ষণ করে দেখার জন্য যখন সুর ও তাল মাহুত ও হস্তি বেশে শহরাঞ্চলে প্রবেশ করলেন, তখন দেখলেন, তাঁদের অনুমানই সঠিক। সকল মানুষ এখানে কল্পনাকেই মেধা বলে থাকেন। যিনি শ্রেষ্ঠ কল্পনাবিদ, তাঁকেই শ্রেষ্ঠ মেধাবী বলা হয়, আর তিনি শ্রেষ্ঠ বেতনের চাকুরী করেন, বা শ্রেষ্ঠ বেতনের চাকুরীজীবীদের চাকুরী প্রদান করে বণিক সেজে উপস্থিত!
এই কল্পনার শিক্ষা প্রদানই শিক্ষকের কর্ম, আর সেটিই তাঁর পেশা। এই কল্পনার নির্মিত ওষধি, কল্পনার মিশ্রিত যন্ত্র নির্মাণই শ্রেষ্ঠ পেশা। আর এই কল্পনার বলেই রোগের বাখান করাকে এখানে বৈদ্য বলা হয়, আর সেই বাখান করে করে দেহের মধ্যে যন্ত্র স্থাপন করা আর দেহকে ওষধির বশে স্থাপিত রেখে দেওয়াই এখানে চিকিৎসা, আর সেটি সেবা তো নয়ই, শুধুই পেশা।
আরো নিরীক্ষণ করলেন সুর ও তাল, এবং আরো বিস্মিত হলেন। তাঁরা দেখলেন, “যন্ত্রই এই রাজ্যে শেষ কথা বলে। যন্ত্রবিদ্যাকেই এইরাজ্যে বিদ্যা রূপে পূজা করা হয়। আর এখানে এই প্রচার চলে যে, ভিন গ্রহ আছে, যেখানে এঁদের নিত্য যাতায়াত, আর তাদের থেকেই এই সমস্ত বিদ্যা তাঁরা শিখে এসেছেন। … এঁরা এমন প্রচার করেন যে, মানব নাকি নিকৃষ্ট যোনি, আর যেই ভিন গ্রহের যোনির থেকে তাঁরা এই সমস্ত যন্ত্রবিদ্যা শিখে এসেছেন, তাঁরাই শ্রেষ্ঠ।
আর সেই সাথে সাথে, এই সমস্ত কিছুকে প্রতিস্থাপন করার জন্য, একটি বিশালাকায় চিত্রনাট্যালয় উপস্থিত। যেখানে বেশ কিছু যন্ত্রকে নিয়ে নিত্য এমন চিত্রনাট্য নির্মাণ করা হয় যেন সেই সমস্ত যন্ত্র সেই মহাকাশে যাত্রা করে ফিরছে, যেই মহাকাশে একটি বলতে একটি ধাতুও নিজের উপাদানগুণকে ধরে রাখতে ব্যর্থ। আর সেই সমস্ত চিত্রনাট্য সকল প্রজার কাছে সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে, এবং বোঝানো হচ্ছে যে, এই করিন্দ্ররা, অর্থাৎ এই সমস্ত মায়ারাজ্য নির্মাতারা স্বয়ং ভগবান।
আরো নিরীক্ষণ করে দেখলেন সুর ও তাল। তাঁরা দেখলেন যে, এই যন্ত্রবিদ্যার বিস্তারের ফলস্বরূপ, প্রজাকে নিজে নিজে কিচ্ছু করতে হয়না। যন্ত্রের মাধ্যমেই এই সমস্ত মায়াবী বৃক্ষরোপণও করা যায়, আর বড়ও করা যায়, আর ফলনও সংগ্রহ করা যায়, আর বিনষ্টও করা যায়। যন্ত্রের মাধ্যমেই সমস্ত মায়াকে নিয়ে সমস্ত কীর্তি রচনা করা যায়, আর প্রজা সেই সমস্ত কীর্তিকেই কীর্তি বলছেন।
কাঠের আসবাবে কাঠ থাকেনা, থাকে যন্ত্রের দ্বারা নির্মিত মায়াকাষ্ঠ, আর তাই দিয়েই সমস্ত আসবাব নির্মিত হচ্ছে। ধাতুও মায়াবী, আর সেই মায়াবী মিশ্র ধাতুদ্বারা বস্তু নির্মাণ হচ্ছে, আসবাব নির্মাণ হচ্ছে, আর তাকেই প্রজা প্রকৃত আসবাব মনে করছে। সঙ্গে সঙ্গে দেখলেন সুরতাল যে, এখানে ধন বলে কিছুই নেই। ধন এখানে সম্পূর্ণ ভাবে মায়াবী, সম্পূর্ণ ভাবে এক সংখ্যার খেলা, যেই সংখ্যা দ্বারা সমস্ত সময়ে কারুকে দরিদ্র প্রতিপন্ন করা হচ্ছে তো কারুকে ধনী।
সম্পূর্ণ ভাবে সম্পূর্ণ রাজ্য মায়াবী, আর এখানে কেবল ও কেবল মায়া ও ভ্রমেরই রাজত্ব। এখানের সমস্ত পেশা মায়াবী, সমস্ত ধাতু মায়াবী, সমস্ত বৃক্ষ তরু মায়াবী, সমস্ত মৃত্তিকা মায়াবী, এমনকি এখানের বাতাবরণ বা আবহাওয়াও মায়াবী, আর তা সমস্ত যন্ত্রচালিত। শাসক যখন যেখানে চাইবেন, সেখানে রৌদ্র হবে, বর্ষণ হবে, ঘূর্ণাবর্ত হবে, নিম্নচাপ হবে, প্লাবন হবে। নদীর গতিপথও এখানে যন্ত্রচালিত। যন্ত্রের বাঁধ দ্বারা নদীর গতিকে নির্ধারণ করা হয়, আর সেই নিরিখেই সমস্ত জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
সমস্ত কিছু এখানে মায়াবী, আর এই মায়াবী সমস্ত কিছুই বাস্তব, এই বিশ্বাস প্রজার মধ্যে বিস্তারিত করার কারণে, প্রজা এই মায়ার জগতকেই সত্য মানে এখানে, আর তাই স্বেচ্ছায় তাঁরা এখানে পরাধীন। অর্থাৎ স্বাধীন ভাবে পরাধীন তাঁরা। তাই এই মায়াবী সংখ্যার মায়াকেই ধন মেনে নিয়ে, এখানে প্রজারা সেই মায়াসংখ্যা নিজেদের কাছে অধিক স্থাপিত করতে ব্যস্ত।
আর এই ব্যস্ততার দ্বারা সেই সংখ্যার বৃদ্ধি তখনই হবে যখন যন্ত্রবিদ্যার সাথে বা যন্ত্রব্যবহারের সাথে নিজেকে সংযুক্ত করতে সক্ষম হবে প্রজা। তাই যন্ত্রদ্বারা চালিত চিকিৎসাকেই পেশা ধারণ করে প্রজা বৈদ্য হয়ে আছেন; যন্ত্র নির্মাণকেই শিল্পকলা জ্ঞানে ধারণ করে প্রজা এখানে শিল্পীর পেশায় নিবদ্ধ; যন্ত্রদ্বারা কৃষিকর্ম সম্ভব, তাই যন্ত্রদ্বারা কর্ষণ কর্ম করেই এখানের প্রজা কৃষক; যন্ত্রদ্বারা চিত্রনাট্য চালিয়ে নিজেকে ভগবান স্থাপিত করে রেখেছে করিন্দ্র, সেই কর্মেই সর্বাধিক সংখ্যাতত্ত্ব অর্থাৎ ধনলাভ সম্ভব, তাই সেই পেশাতেই আবদ্ধ প্রজা।
যিনি সর্বাধিক ভাবে এই সংখ্যার পরিমাণ প্রদর্শন করতে পারবেন, তিনিই এই রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম সম্মানীয় ব্যক্তি, আর যার সম্মান যত কম, তাঁর অবস্থা এই সমাজে ততই দৈন্য। তাই সকল প্রজা এই সংখ্যার বৃদ্ধি করতে তৎপর। আর সেই তৎপরতার কারণে, সকলে সকলকে পিছনে ফেলে দিতে, সকলে সকলের জন্য প্রতারক। সকলে সকলকে প্রতারণা করছেন এখানে, কারণ সকলেই মানেন যে তাঁর এই বৃহৎ সংখ্যার প্রয়োজন, আর সেই সংখ্যা নিজের কাছে অধিক রাখতে গেলে, অন্যের থেকে সেই সংখ্যা ছিনিয়ে নিতে হবে।
তাই সকলেই সকলকে ধনী করে দেবার স্বপ্ন দেখায় এখানে, আর সেই স্বপ্ন দেখিয়ে দেখিয়ে, অন্যের সংখ্যা কমান, আর নিজের সংখ্যার বৃদ্ধি করেন। সেই স্বপ্ন দেখানর ভূমিকায় সকলে সকলকে প্রতারণা করছেন, আর এঁর শীর্ষে রয়েছেন সরকার স্বয়ং, যার নিকটবর্তী প্রতিযোগী হলেন বণিক। আর এই প্রতারণার মধ্যে যারা নভিস, তাঁরা হলেন চাকুরীজীবী, আর যারা কিছুতেই এই প্রতারণাকে নিজেদের অধিকারে আনতে পারছেন না, তাঁরা দরিদ্র। কিন্তু সকলেই এই একই প্রতিযোগিতায় রত, আর তাই সকলে সকলকে ঈর্ষা করেন, সকলে সকলকে হিংসা করেন।
এই সমস্ত কিছুর মধ্যে রস রূপে রয়েছে যৌনতা। কিন্তু প্রতিযোগী মানসিকতা সেখানেও একই ভাবে বিদ্যমান। তাই প্রতিটি পুরুষ প্রতিটি স্ত্রীকে সম্ভোগ করতে উদগ্রীব। সেই সম্ভোগের অন্তরালে যেমন যৌনরস বর্তমান তেমন, অন্যকে দরিদ্র করে দিয়ে নিজেকে ধনি করার প্রতিযোগিতাও সামিল। তাই পুরুষ এখানে অন্যের পত্নীকে সম্ভোগ করার চিন্তা করতেও দ্বিধা করেনা, বরং অতি উৎসাহী, কারণ এমন করতে পারলে সেই প্রতিযোগী পুরুষ যার পত্নীকে তিনি সম্ভোগ করছেন, তাঁকে প্রতিযোগিতায় পিছনে ফেলে দেওয়া যাবে।
আর এই একই মানসিকতা স্ত্রীদের মধ্যেও বর্তমান। স্ত্রীরাও চান যে সমস্ত পুরুষ তাঁর অধীনে থাকুন, অন্যের পতিও, কারণ তাতেই তাঁর যৌনসন্তুষ্টি, আর তার থেকেও অধিক, এমন কীর্তির ফলে, তাঁর প্রতিযোগী দুর্বল হবেন, আর তিনি অধিক ধনি হতে থাকবেন। যার কাছে যত অধিক পুরুষ ও ধনসংখ্যা, সেই স্ত্রীই ধনীতম, আর তাঁরই সমাজে সর্বাধিক মর্যাদা। যার কাছে অধিক স্ত্রী ও ধনসংখ্যা, সেই পুরুষই ধনীতম, আর তাঁরই মর্যাদা সর্বাধিক সমাজে।
আর এমন নয় যে পুরুষ পুরুষদের মধ্যে ধনী হতে, এবং স্ত্রী স্ত্রীদের মধ্যে ধনী হতে আগ্রহী। এই প্রতিযোগিতা, পুরুষ ও স্ত্রীদের মধ্যেও বিদ্যমান। আর তাই সেই ধনী পুরুষ ও ধনী স্ত্রীরাও যৌনরসে সর্বদা আবদ্ধ, আর সেই যৌনরসাবদ্ধতার মধ্যেও থাকে প্রতিযোগিতা, অর্থাৎ পুরুষ স্ত্রীটিকে অধিক সম্ভোগ করলেন, নাকি স্ত্রীটি পুরুষটিকে।
অদ্ভুত এই মায়াবী রাজ্য দেখে, স্তম্ভিত হতে থাকলেন সুর ও তাল। তাঁরা বিস্মিত এই দেখে যে, এখানে একটি শিশুর জন্মও যান্ত্রিক ভাবেই হয়। সমস্ত কিছু এখানে যন্ত্র। প্রকৃতির সত্যই এখানে কনো স্থান নেই। না আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণে, না জন্মমৃত্যু নির্ধারণে, না খেতখামারিতে না কনো স্থানে। এখানে সকলে সকলের শত্রু, অথচ সকলে সকলকে আশ্বাস প্রদান করতে ব্যস্ত যে, সে তাঁর মিত্র। … এই ভয়ানক দৃশ্য দেখে, আর সহ্য করতে না পেরে, সুর উত্তেজিত হয়ে বলে ফেললেন যে, “আমি মোহিনী নির্মিত ছায়াপুরের মায়ার কথা কেবল শুনেছি দেখিনি, কিন্তু করিন্দ্র নির্মিত এই ছায়াপুরের মায়া দেখে বেশ বুঝতে পারছি যে, সেই মায়াপুর কেমন মায়াপুর ছিল!”
সুরের এই কথন করিন্দ্রের সিপাহীরা শ্রবণ করেছেন, আর যেমন সুরতাল অর্থাৎ হস্তিমাহুতের সমস্ত সমাচার প্রদান করছিলেন করিন্দ্রকে, তেমনই এই শব্দাবলীও প্রদান করতে, করিন্দ্র নিজের চোয়াল শক্ত করে বললেন, “হস্তির গতি কম হয়েছে। এই আদর্শ সময়, হস্তির চরণে শিকল স্থাপন করার। … এঁরা সামান্য কেউ নয়। মায়ারূপ ধারণ করা তাল ও মাহুত বেশে হয় ছন্দ নয় সুর। … বন্দী করো এখনই তাঁদেরকে। বিচারালয়ে স্থাপন করে, মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়ে, হত্যা করো এঁদেরকে”।
ভণ্ড বললেন, “তুমি এত নিশ্চিত হচ্ছ কি করে মিত্র?”
করিন্দ্র হুংকার ছেড়ে বললেন, “এই কথা চিত্তাপুত্র ছাড়া কারুর হতেই পারেনা। আর একমাত্র তাঁদের পক্ষেই একে মায়ারাজ্য বলে চিহ্নিত করা সম্ভব। এঁরা জেনে গেছে, তাই প্রজার কাছে সেই কথা বিস্তার করা এমন কিছু কঠিন নয়। তাই এঁদেরকে শীঘ্র মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে হবে”।
বীর্য বললেন, “কিন্তু তাল এই হস্তিরূপ কি ভাবে ধারণ করলো?”
শৃঙ্খলাকন্যা বললেন, “পিতা, চিত্তালের পত্নী নলিনী ও তাঁর দিদি, দেবী পদ্মিনীকে সকলে বনবিবি বলেন। তাঁরা অত্যন্ত মায়াবী। তাঁদের মায়াবিদ্যার ফল এই হস্তিরূপ। … স্বামী ঠিকই বলছেন, এঁদেরকে মৃত্যু দণ্ড প্রদান করার ব্যবস্থা আমরা প্রস্তুত করে রেখেছি। তার সুবাদে আমরা এঁদেরকে হত্যা করে, শত্রুমুক্ত হয়ে যেতে পারবো অনায়সে”।
এমন নির্দেশ দিলে, সমস্ত প্রয়াস হয় সিপাহীদের হস্তির চরণে শিকল স্থাপনের। আর প্রায় তিনদিনের প্রয়াসের পর সক্ষম হলে, সুর সরাসরি কুশটিকে ছিন্ন করে দেয়, আর হস্তিরূপ ত্যাগ করে, তাল নিজের বাস্তবিকরূপে ফিরে আসে। সেই দৃশ্য দেখে প্রজাসকলে হতচকিত হলে, এবার শুরু হয় সুরতালের তাণ্ডব। সাতদিবসের হয় সেই তাণ্ডব, যাতে প্রায় সমস্ত ছায়াপুরের সমস্ত মায়াবৃক্ষকে মায়াভূমি থেকে উৎপাটিত করে দেয় তাঁরা। সমস্ত মায়া অট্টালিকাকে চূর্ণ করে দিয়ে, তাতে অগ্নি সংযোগ করে দেয় তাঁরা। আর প্রায় সমস্ত সিপাহীকে একাকী তাল, আর সমস্ত সেনাকে একাকী সুর মৃত্যু প্রদান করে দেয়। অবশেষে, নিজেরাই বিচারকের এজলাসে উপস্থিত হয়ে গেলে, তাঁরা দেখে নেন যে, সংবাদকর্তারা সরাসরি প্রজাদের তাদেরকে দেখাচ্ছে আর তাদের ভাষ্য শোনাচ্ছে।
এটিই তাঁরা চাইছিলেন, আর এটির জন্যই তাঁরা বিচারকের এজলাসে প্রবেশ করেছিলেন। তাই এবার সুর বললেন, “মহামান্য বিচারক, প্রথম কথা, আমরা আপনাদের প্রজা নই, তাই আপনাদের নির্মিত নিয়মাবলী আমাদের উপর প্রযোজ্য নয়। তাই এমন মনে করবেন না যে আপনার আমাদেরকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করার অধিকারও আছে, বা আমরা আপনার দেওয়া রায়কে গ্রহণ করবো। … আমরা এখানে এসেছি কিছু কথা বলতে।
আর সেই কথা হলো এই যে, আমরা অবাক হয়ে গেছি এই মায়ারাজ্য দেখে। হ্যাঁ সম্পূর্ণ ভাবে মায়ারাজ্য এটি। এখানে সমস্ত কিছুই মায়া। মৃত্তিকা থেকে আরম্ভ করে প্রতিটি বৃক্ষ, প্রীতিটি তরু এখানে মায়া। চিকিৎসা থেকে আরম্ভ করে সমস্ত ওষধি এখানে মায়া। ধন থেকে আরম্ভ করে সম্পত্তি ও সম্পত্তির অধিকারের নথি পর্যন্ত সমস্ত কিছুই মায়া।
এমনকি এই যে বিচারকের এজলাসে দাঁড়িয়ে রয়েছি এক্ষণে, তাও মায়া। বিচার করে দেখুন প্রজারা। এই বিচারকের এজলাসে, আপনারাও সরকারের বিরুদ্ধে আবেদন করতে পারেন, আর সরকারও আপনাদের বিরুদ্ধে। সরকারের সমস্ত করা আবেদনকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এখানে, আর তার পক্ষে রায় দেওয়া হয়। কিন্তু আপনাদের কনো একটি আবেদনকে আজ পর্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে! … না হয়নি। এই মায়াবী বিচারকের এজলাস নির্মিতই হয়েছে, এই মায়ারাজ্যের মায়ার বিরোধিতা যে বা যারা করবেন, তাঁদেরকে মৃত্যুদণ্ড, কারাদণ্ড প্রদান করে এঁর বিরোধ বন্ধ করে দেবার জন্য।
আমরা চিত্তাপুত্র, সুরতাল। আজ থেকে ১৩ বৎসর আগে, নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্র করে, আমাদের থেকে এই রাজ্যের শাসন অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আজ আমারা এখানে উপস্থিত এটিই বলতে যে, আমাদেরকে যেই নির্বাসনে প্রেরণ করা হয়েছিল, সেই নির্বাসনের সময়কাল সমাপ্ত হয়েছে। সেই সময়কালের মধ্যে অনেক মায়ার বিস্তার করেছে করিন্দ্র, আর আপনাদেরকে সমস্ত মায়ার মধ্যে এমন ভাবে পরাধীন করে রেখেছে যাকে আপনারা নিজেরাই পরাধীনতা মানেন না।
এখন আমরা এসে গেছি আবার। আর এসে এই কথার ঘোষণা করে গেলাম যে, আর এই মায়ার বিস্তার চলবে না। মায়ার রাজধানী, এই ছায়াপুরকে আমরা আপাতত ধ্বংস করে গেলাম। জানি করিন্দ্র আবারও এই মায়ারাজ্যকে নির্মাণ করবে। … কিন্তু এই আপেক্ষিক ধ্বংসের মাধ্যমে তাকে এই বার্তা দিয়ে গেলাম, এই প্রজারা তাঁর কাছে প্রজা, তাঁর কাছে নিজেকে সম্রাট আসনে স্থিত রাখার মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু আমাদের কাছে এঁরা আমাদের সন্তান। আর আমরা থাকতে আমাদের সন্তানকে না তো আমরা পরাধীন হয়ে থাকতে দেব, আর না মায়াতে আবদ্ধ থাকতে দেব।
এই ঘোষণা করে গেলাম এই ধ্বংসলীলার মাধ্যমে যে, শীঘ্রই আমরা যথার্থ সাম্রাজ্যকে আবারও স্থাপন করবো, আর সেই যথার্থ সাম্রাজ্যে আপনাদের সকলকে নিমন্ত্রণ রইল। সেখানে কনো মায়া থাকবেনা। সমস্ত কিছুই সেখানে প্রাকৃতিক নয়, প্রকৃত প্রাকৃতিক থাকবে। … তাই আপনারা, যারা আমাদের কাছে সন্তানবত, সেই প্রজার কাছে এই বার্তা প্রদান করে গেলাম যে, আমাদের নির্মিত সেই প্রকৃত ও মায়ামুক্ত রাজ্যে আসা শুরু করুন এই মায়ারাজ্য কে ত্যাগ করে।
এখানে বিচার হয়না, হয় ষড়যন্ত্র। এখানে বৃক্ষ নেই, নেই ওষধি ও মায়ামৃত্তিকা নির্মিত যন্ত্র। এখানে ধন নেই, আছে কিছু মায়াবী সংখ্যার জাদু। যারা যথার্থকে মূল্য না দিয়ে, মায়াকেই সত্য মেনে ও জেনে, এই ছায়াপুরেই থাকতে চান, তাঁরা থাকুন এখানে আর বাকিরা আমাদের সাথে আসুন। আমরা যথার্থ রাজ্য নির্মাণ করতে চলেছি। আর যারা এখানে এখনো থাকার চিন্তা করছেন, করিন্দ্রের মায়াতে আবদ্ধ হয়ে, তাদের উদ্দেশ্যে বলি, দেবী মেধা অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তাই ছায়াপুরের নাশ করেননি, কেবলই দেবী মোহিনীর নাশ করেছিলেন। আমরা কিন্তু দেবী নই, মানুষ। তাই আমাদের এই সামর্থ্য নেই যে কে দোষী আর কে নির্দোষ সেই বিচার করবো।
তাই আমরা ছায়াপুরকে সমস্ত প্রজাসহ বিনষ্ট করে তাদেরকে আজন্ম পিশাচরূপে স্থিত করে দেব, এই আমাদের অঙ্গিকার। … তাই যদি আপনারা পিশাচ হয়ে থাকতে প্রস্তুত থাকেন, তাহলে এখানে থাকুন। আমরা আপনাদের পুনরায় সুস্থ জীবনপ্রদান করতে উৎসাহী ও তৎপর। … সমস্ত সেনা ও সিপাহীর নাশ করে দিয়েছি। আর যদি আপনারা আমাদের সাথে যাত্রা করার কালে করিন্দ্র আপনাদের বাঁধা দেয়, তাহলে স্বয়ং করিন্দ্রকে তাঁর সিংহাসনে স্থিত করে সেই সিংহাসনকেই চিতা সাজিয়ে দহন করে দেব। করিন্দ্রও জানে যে, আমরা তা করতে সক্ষম।
তাই ভীত হবার কনো কারণ নেই করিন্দ্রের কারণে। যদি মায়ারাজ্যে স্থিত থাকতে চান, এখানেই থাকুন আর করুণ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকুন, কারণ আমরা স্বয়ং সেই করুণ মৃত্যু আপনাদের উপহার দেব। আর যদি মায়ার থেকে মুক্ত হতে চান, তাহলে আমদের সংরক্ষণ আপনাদের সাথে এইমুহূর্ত থেকে উপস্থিত থাকবে”।
এত বলে, সুর ও তাল বীরদর্পে বিচারকের এজলাস থেকে নেমে চলে এলে, তাঁদের বলা কথা সম্যক জম্বুদেশ শ্রবণ করে ফেলে, আর তাই সকলে তৎপর হয়ে ওঠে চিত্তাপুত্রদের সাথে যুক্ত হতে। … তাই সংবাদ মাধ্যম প্রশ্ন করলেন, “আপনাদের সাথে যদি যুক্ত হতে হয়, তাহলে কোথায় সকলে জমায়েত হবে?” উত্তরে সুর বলেন, “চন্দননগরে”।
বিচারক অনেক হাঁকাহাঁকি করলেন সেনা ও সিপাহীকে। সেই শুনে তাল হেসে বিদ্রূপের সাথে বলে উঠলেন, “একটাও আর বেঁচে নেই। … তোর মায়াসেনাকে সুর, আর তোর মায়াসিপাহীকে আমি চিবিয়ে ভক্ষণ করে নিয়েছি”।
এমন বলার পর সুর ও তাল যাত্রা করলে, সুর ও তালের সাথে সাথে কিছু প্রজা যাত্রা করলেন, কিন্তু অধিক প্রজা রয়েই গেলেন। এবং যখন চন্দননগরে পৌঁছালেন সুর ও তাল, তখন দেখলেন, সর্বসাকুল্যে সমস্ত জম্বুদেশ থেকে, তাঁদের শত্রুরাজ্য থেকে দশ সহস্র প্রজার আগমন ঘটেছে, যা সমস্ত জনবসতির মাত্র ১০ শতাংশ।
সেই দেখে, চিন্তান্বিত সুর ছন্দের উদ্দেশ্যে বললেন, “ভ্রাতা! … মায়ার বিস্তারের কারণে প্রজার মধ্য থেকে যথার্থতা কি, তার ভানই হারিয়ে গেছে। … তাই তো দেখুন না মাত্র ১০ শতাংশ প্রজাই উপস্থিত হয়েছে শত্রুরাজ্য থেকে। বাকিরা এখনও মনে করছে যে মায়াই যথার্থ। এখানে আমাদের কি করনীয় ভ্রাতা!”
সেই কথা শুনে কুর্নিশ বললেন, “হে মহামান্য সুর, হে সম্রাট ছন্দ, চলুন আমরা করিন্দ্রকে আক্রমণ করে দিই। আমাদের কাছে যথেষ্ট সেনাবল আছে আর সঙ্গে আপনারা আছেন। করিন্দ্রকে আমরা পরাস্ত করে, তাঁদেরকে তাঁদের করা ষড়যন্ত্রের উত্তর পদান তো আমরা করতেই পারি, তাই না!”
ছন্দ এই কথাতে বিব্রত বোধ করলে, সুর ছন্দের মুখের দিকে তাকিয়ে, পুনরায় সকল রাজাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহারাজ কুর্নিশ, আমরা সাধারণ প্রজা নই, সম্রাট ও সাম্রাজ্যের অধীশ্বর। আমরা নিজের স্বার্থের জন্য, নিজস্ব অধিকারের জন্য, নিজেদের সাথে হওয়া অন্যায় বা ষড়যন্ত্রের প্রতিকার রূপে যুদ্ধ করতে পারিনা। আমাদেরকে আমাদের অনুগামীরা ধর্মের প্রতীক জ্ঞান করেন। বুঝতে পারছেন, আমরা যদি ধর্মের প্রতীক হয়ে, এহেন নিজস্বার্থের জন্য যুদ্ধ করি, তাহলে তাঁদের কাছে কি বার্তা যাবে! …
এই বার্তা যাবে যে, নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্যই ঈশ্বর কারুকে বলবান করেন। নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্য যুদ্ধ করাই হলো ধর্ম। … বিচার করে দেখুন মহারাজ কুর্নিশ। অধিকতর জনমত এখন কিরিন্দ্রের সাথে যুক্ত। হ্যাঁ, মায়ায় আবদ্ধ, কিন্তু তাঁরা যুক্ত করিন্দ্রের সাথে। … অর্থাৎ, কি দাঁড়ায়! … অধিকাংশ প্রজা তাঁদেরকেই সঠিক জ্ঞান করে, মায়াকেই যথার্থ জ্ঞান করে।
মহারাজ কুর্নিশ, এমন অবস্থায় আমরা যুদ্ধ করতে যাবার অর্থ এই যে, সম্রাট হয়ে আমাদের কাছে জনগণের মতামতের কনো দাম নেই, কনো কদর নেই। … আমরা স্বেচ্ছাচারী। আমরা নিজেকেই নিজেরা শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করি। তাহলে আপনিই বলুন, আমাদের আর অসুরদের মধ্যে ভেদ কি থেকে গেল! …
তাই এখন নয়। প্রথম আমাদের জনমত গঠন করতে হবে। যখন এই জম্বুদেশের সমস্ত জনমানব আমাদেরকে সমর্থন করবে, মায়ার থেকে যথার্থতে আগমন করতে চাইবে, তখন করিন্দ্র স্বতঃই আমাদেরকে আক্রমণ করবে, আর তখন আমরা যুদ্ধে রত হতে পারবো। … বিচার করে দেখুন মহারাজ, আমরা করিন্দ্রের রাজ্যকে ধুলায় মিশিয়ে দিলাম, তারপরেও সে বা তার একটিও মিত্র সামনে এলো না। কেন?
কারণ সে জানে যে, জনমত তাঁর সাথে আছে। অর্থাৎ তাঁর এখন কিচ্ছু করার প্রয়োজন নেই। বরং আমরা যদি কিছু করি, তাহলে আমরাই খলনায়ক হয়ে যাবো, আর সে হয়ে যাবে নায়ক। … অর্থাৎ মহারাজ কুর্নিশ, আমাদেরকে যথার্থতার বিস্তার করতে হবে। তবেই প্রজা আমাদের সাথে এসে যুক্ত হবে করিন্দ্রকে ত্যাগ দিয়ে। আর ততই করিন্দ্র অসুরক্ষিত হয়ে যাবে, আর নিজের নায়কত্ব হারাবার ভয়ে সে আক্রমণ করবে আমাদেরকে।
কেন বারংবার রামচন্দ্রকেই আক্রমণ করতে হবে? কেন বারংবার পাণ্ডবপক্ষকেই আক্রমণ করতে হবে? না এবার হিসাব ভিন্ন হবে। এবার পাণ্ডব আক্রমণ করবেনা, রাম আক্রমণ করবেনা। এবার রাবণ করবে আক্রমণ, কৌরব করবে আক্রমণ। প্রতিবার রাম আক্রমণ করে, পাণ্ডব আক্রমণ করে, আর তারা জনমানসের কাছে খলনায়ক হয়ে যায়, আর জনমানব তাঁদেরকে প্রত্যখ্যান করে, রাবণের এবং কৌরবদের গুণগ্রাহী হয়ে ওঠে।
না, এবার সেই হিসাব চলবে না। এবার রাবণ আক্রমণ করবে, কৌরব আক্রমণ করবে। তাদেরকে আক্রমণ করতে বাধ্য করা হবে। … আমাদের কাছে কিছু রাজ্য আছে। চলুন সেখানে এমন এক শাসন ধারার নির্মাণ করা যাক, যার কারণে প্রজার মধ্যে চেতনা জাগ্রত হবে, আর প্রজা করিন্দ্রকে ত্যাগ দিয়ে আমাদের কাছে এসে উপস্থিত হবে।
করিন্দ্র যখন জনমত হারাবে, তখন স্বতঃই আমাদেরকে আক্রমণ করতে চাইবে, আর সেদিন প্রজার সুরক্ষার উদ্দেশ্যে আমরা যুদ্ধে রত হবো। নিজস্ব স্বার্থপূর্তির জন্য, এক সম্রাট যুদ্ধে রত হতে পারেন না। সম্রাটের নিজস্ব স্বার্থ, নিজস্ব মান, নিজস্ব সম্মান বলে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু হয়না। প্রজার স্বার্থই তাঁর স্বার্থ, প্রজার মানই তাঁর মান, প্রজার সম্মানই তাঁর সম্মান।
আজ রাবণ প্রজার জন্য যুদ্ধ করার, আর রাম নিজের স্বার্থ, নিজের পত্নীকে উদ্ধার করার জন্য যুদ্ধ করার ফলে, মানুষের কাছে রাবণ শ্রেয়। আজ পাণ্ডবরা নিজের মানরক্ষার জন্য যুদ্ধ করার ফলে, আর কৌরবরা নিজের রাজ্যকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যুদ্ধ করার ফলে, যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে যাবার পরেও তাঁরা মানুষের কাছে নায়ক। …
মহারাজ, মানুষ তাঁদের নায়ককে অনুসরণ করেন, নায়কের মত হতে চান। আমাদের উদ্দেশ্য যুদ্ধে জয়লাভ নয়, আমাদের সম্মান ফিরে পাওয়া নয়, আমাদের শাসন স্থাপনও নয়। আমাদের উদ্দেশ্যে প্রজাকে যথার্থ নায়ক প্রদান করা, যাকে অনুসরণ করে তাঁরা উন্নত হতে পারেন। … তাই আমাদেরকে এবার নজর দিতেই হবে, নিজেদেরকে নায়করূপে স্থাপন করাতে। কারণ আমরা প্রজার উন্নতি চাই, তাঁদেরকে এমন গড়তে চাই যাতে তাঁদেরকে শাসন করার প্রয়োজনই না থাকে। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের শাসন করে করে, যথার্থতার পথে উন্নত করতে পারেন”।
উপস্থিত সকল প্রজা সুরের সেই কথাতে করতালি প্রদান করলেন, এবং রাজারাও। … সঙ্গে ছন্দও তাঁর ভ্রাতাকে আলিঙ্গন করে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “আমার এই ভ্রাতা, হতে পারে আমার অনুজ, কিন্তু সর্বকালই সে আমার প্রেরণা ছিল, আমার মার্গদর্শক ছিল। আজও সে আমার মার্গদর্শকের আসনে স্থিত। … যথার্থ বলেছে সে, এক সম্রাট কখনোই নিজের স্বার্থ নিয়ে চিন্তিত থাকতে পারে না। তাঁর একটিই স্বার্থ হওয়া উচিত, প্রজার কল্যাণ আর প্রজার উত্থান। … তাই এবার আমরা একটি বিকল্প রাজ্য নির্মাণ করবো, যাতে প্রজার কাছে নির্ধারণ করার সামগ্রী থাকে যে, এই রাজ্যে থাকবে তাঁরা নাকি সেই রাজ্যে”।
