জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

করাভ, মনকরি সহ আরো ৫ ভ্রাতার সাথে যুদ্ধজাহাজে করে করিন্দ্র চন্দননগরের দখল নিতে আসছিলেন সেই কালে। ভণ্ডের মূর্ছা ত্যাগ হতে, সে কাতা রাজ্যে এসেছিল মিত্রের সাখ্যাত করে সমস্ত কথার বিবরণ দিতে। অন্যদিকে করিন্দ্রের জাহাজ সমূহ তখন অর্ধেন্দুকে দান করা শ্রীরাম অঞ্চলের সম্মুখ দিয়ে যাত্রা করবে বলে, অর্ধেন্দু নিজের সম্রাটের সম্মানার্থে একটি খানাপিনার আয়োজনে মত্ত ছিলেন।

কথামত করিন্দ্র ও তাঁর ভ্রাতারা শ্রীরামে এসে, ঈষৎ আহারাদি বিশ্রাম করে পুনরায় যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে চন্দননগর দখল করতে যাত্রা করবেন। কিন্তু এরই মধ্যে তন্ত্রপুত্রদের প্রেরণ করা প্রাকৃতিক বাণ, যা আর তন্ত্র শক্তি ছিলনা, মাতা শ্রীর স্নেহদুগ্ধ পানে যা কৃতান্ত শক্তি ধারণ করে ফেলেছিল, তা সকলের অতর্কিতে ধেয়ে এলো শ্রীরাম অঞ্চলের ভাগীরথীর বক্ষে।

আর তা সেখানে স্থাপিত হওয়া মাত্রই এক অসম্ভব তরঙ্গের সঞ্চার হলো ভাগীরথীর দুই কুলে, আর সমস্ত ভাগীরথীর জলধারা শ্রীরাম অঞ্চলে প্রবাহিত হওয়া শুরু করে দিল, এবং ভাগীরথীর গতিকে সম্পূর্ণ ভাবে খণ্ডিত করে, শ্রীরাম থেকে কাতা হয়ে সমস্ত সাগর পর্যন্ত স্থানকে জলশূন্য করে দিল।

এমন কীর্তির ফলে, প্রথম যেই স্থানের ব্যক্তিরা পলায়ন করা শুরু করলেন, তাঁরা হলেন অর্ধেন্দু সমর্থক সমস্ত প্রজা, এবং নদিয়াদ রাজ্য থেকে অধিকার করে নেওয়া বনাঞ্চলের সমস্ত সদস্যরা, যারা বৈদিক আচরণে নিজেদেরকে উন্নত মনে করছিলেন। … সমস্ত ভাগীরথীর জল তাঁদের সমস্ত ভিটামাটি ছিনিয়ে নিয়ে তাঁদের সকলকে উদ্বাস্তু করে দেওয়া শুরু করলে, ভাগীরথীর জলের গতির কারণে, বহুপ্রাণী নিজেদের প্রাণ ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।

বলা চলে যে, কিছু মানুষই নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়ে পলায়ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাও তাঁরা এই সংশয় নিয়েই পলায়ন করছিলেন যে, আর কতক্ষণ তাঁরা এই ভাবে পলায়ন করতে পারবেন! … রাজা অর্ধেন্দুও এই বিষম পরিস্থিতি কি ভাবে এলো, কেনই বা এলো, কি ভাবে তার থেকে নিজের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব, এই সমস্ত কিছু নিয়ে কনো কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

তাঁর কাছে বেশ কয়েকবার তাঁর মন্ত্রীরা এসে বললেন, “মহারাজ প্রজা সঙ্কটে স্থাপিত হয়ে গেছে। প্রকৃতি সকলের উপর রুষ্ট হয়ে গেছে”। সেই কথাতে বিরক্ত হয়ে উঠে অর্ধেন্দু মুখবিকৃত করে  বললেন, “প্রজা সঙ্কটে… ! আরে প্রজা সঙ্কটে তো আমি কি করবো! … আমি নিজে এখানে সঙ্কটে রয়েছি, প্রজা সঙ্কটে। … মরে যাক সমস্ত প্রজা, আমার প্রাণ বাঁচানোতে মন দাও, নাহলে সকলের চাকুরী খেয়ে নেব আমি। প্রজা প্রজা… ওই চন্দননগর আর চিত্তার পুত্ররা কি যে মাথায় ভুত ঢুকিয়ে দিয়েছে কে জানে! নিজে মরলেও প্রজার চিন্তা করতে হবে। … যাচ্ছেতাই। … আমার প্রাণ রক্ষা করো। ডিঙ্গি আনো বড় বড়, আমাকে আমার সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে তাতে তুলে দাও, আর কাতা রাজ্যে নিয়ে চলো আমাকে”।

কিন্তু কাতা রাজ্যে কি নিয়ে যাবে? কাতা রাজ্যের নিজেরও তো এমনই অবস্থা। সমস্ত কাতারাজ্যকে ভাগীরথী নষ্ট করে দেবার ছন্দে রয়েছে। কাতা রাজ্যের প্রজারাও প্রাণ নিয়ে পলায়ন করতে করতে বলতে থাকলেন, “আগে করিন্দ্র এখানে বসবাস করতো সমস্ত পরিবার নিয়ে। সে এখানে থাকলে কি আর এমন হাল হতো আমাদের! জানি আমাদের জন্য সে কিছুই করতো না। কিন্তু নিজের পরিবারকে বাঁচাবার প্রয়াস তো করতো, তাতেই আমাদের প্রাণ বেঁচে যেত”।

অন্য কিছু প্রজা বললেন, “এই ধারণা রেখে রেখে আজ আমাদের এই দশা। যে রাজা কেবল নিজের জন্য বাঁচে, সে নিজেকে বাঁচাবে বলেই যা কিছু কীর্তি করে, তাকে আশ্রয় করে থাকা তো যায়, কারণ সে নিজের পরিবারকে বাঁচাবার কালে আমরা প্রজারাও বেঁচে যাবো, কিন্তু সেই বাঁচার কনো নিশ্চয়তা নেই। চন্দননগরকে দেখো, সেখানের প্রজা জানেন যে রাজা নিজের মরে গেলেও তাঁদের প্রাণ রক্ষা করবে। বারবার বলেছিলাম, সেখানে চলে চলো। শুনলে না!”

অন্য এক স্ত্রী প্রজা বললেন তাঁর স্বামীকে, “বৈদিক ধর্ম অনেক প্রাচীন, তাই কেন নবীন ধর্মে যাত্রা করবো! হলো তোমার প্রবীণ ধর্মের গুণগান! না সেই ধর্ম তোমার রক্ষা করলো, আর না সেই ধর্মের রক্ষকরা তোমার দিকে ফিরে তাকালো। … আরে, সাখ্যাত জগজ্জননীর স্থাপিত ধর্ম, সে নবীন কেন সদ্যজাত হলেও তাতে বিশ্বাস রাখা উচিত। কতবার বললাম, কথা কানেই নেয় না। … হে ঈশ্বর আমার প্রাণ নিয়ে নাও, আর কৃপা করে তোমার স্থাপিত ধর্মেই আমাকে পুনর্জন্ম দিও, এমন পামর ব্যক্তির স্ত্রী হবার থেকে আজন্ম অবিবাহিত থাকবো তাও ভালো”।

এমন দৃশ্য দেখে, চন্দনগরে যাত্রাকারী করিন্দ্রের সাথে সাখ্যাতে অভিলাষী ভণ্ড কিচ্ছু বুঝতে পারলেন না যে কি হচ্ছে! … সে একাধিক বাণ নিক্ষেপ করলো জলনিয়ন্ত্রণ করার জন্য, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিলনা। শেষে ভাগীরথীর গতি তাঁর ছোট্টডিঙ্গিতে সহস্র ছিদ্র করে দিতে শুরু করলে, সমস্ত বাণ সে নিজের ডিঙ্গির ছিদ্রবন্ধ করতেই লাগিয়ে দিয়ে, হতাশ হয়ে সেই ডিঙ্গিতেই বসে রইলেন।

অন্যদিকে এই সমস্ত কি হচ্ছে, তা বুঝতেই পারলেন না করিন্দ্র, উপরন্তু তাঁর সমস্ত যুদ্ধজাহাজ ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। তাঁর ভাসমান জাহাজের নিচ থেকে সমস্ত জল শোষিত হয়ে গেলে, নদীর নিম্নতলে আকস্মিক ভাবে তাঁর জাহাজ সমূহ ভেঙে পরাতে সমস্ত জাহাজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সঙ্গে যতগুলি যুদ্ধজাহাজ ছিল, সেই সমস্ত অর্থাৎ ৭টি জাহাজ ভর্তি করে সমস্ত উপস্থিত গোলাবারুদ নিয়ে যাত্রা করছিল সে। এবার সমস্ত কিছু নষ্ট হবার যোগার।

জাহাজ ভেঙে পরাতে, নিজের সাথে নিয়ে আসা ৩ সহস্র সেনার মধ্যে প্রায় এক সহস্র সেনা প্রাণ হারিয়েছে। করিন্দ্র ও তাঁর ভ্রাতারাও আহত হয়েছে। এরই মধ্যে করিন্দ্রের আদেশ এসেছে বাকি বেঁচে থাকা ২ সহস্র সেনার উদ্দেশ্যে যে, তাঁদের সমস্ত গোলাবারুদকে সুরক্ষিত করতে হবে। তাই সমস্ত সেনা, যারা জীবিত, তাঁরা নিজেদের সহচারী সেনাদের দেহ উদ্ধার করা ত্যাগ করে, গোলাবারুদকে উদ্ধার করতে মনোনিয়োগ করেছে।

এরই মধ্যে তন্ত্রপুত্রদের উদ্দেশ্যে দেবী শ্রী বললেন, “পুত্ররা, তোমরা কি ভাগীরথীকে পুনরায় নিজের গতিতে ফিরিয়ে আনতে পারবে? যদি পারো তবে তাই করো। করিন্দ্রের সমস্ত অস্ত্র এখন জাহাজ ভেঙে নদীতলে পতিত। এখন যদি ভাগীরথীর জল পুনরায় প্লাবিত হয় নিজের গতিতে, তাহলে সমস্ত গোলাবারুদকে সে ধুয়ে নিয়ে সাগরে লয় করে দেবে, আর তাদের সমস্ত রসায়নকে বিনষ্ট করে দেবে”।

তন্ত্রপুত্ররা করজোড়ে মাতা শ্রীর সম্মুখে এসে বললেন, “না মা, আমাদের কাছে বল তো আছে, কিন্তু কৌশল নেই এই কাজ করার। কৃপা কর মা। এই কাজ তুমিই করে দাও। … আমরা এমন কাজ তো করে দিয়েছি, তবে এতে নিশ্চিত ভাবে অনেক সাধারণ মানুষ ও অন্য জীবের প্রাণ সঙ্কটে এসে গেছে। … এক করিন্দ্রকে জব্দ করতে গিয়ে, তাঁদেরকে এমন দুর্দশাগ্রস্ত করে ফেলেছি। … কৃপা করে পূর্ববৎ করে দাও মা সমস্ত কিছু”।

দেবী শ্রী এবার গম্ভীর হয়ে নিজের চক্ষুকে নিমগ্ন করলেন, আর তাঁর সন্তান সকলে দেখলেন, ভাগীরথী ধীরে ধীরে দুই পাশ থেকে মধ্যবর্তী স্থানে, যেখানে তাঁর নিজস্ব প্রবাহধারার চিহ্ন স্থাপিত, সেখানে ফিরে এলেন। অর্ধেন্দুর অঞ্চল থেকে জল নেমে গেল। প্রচুর প্রাণহানি হয়েছে, সমস্ত বাড়িঘর নষ্ট হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট ভাগীরথীর বয়ে  নিয়ে আসা মাটিতে আবরিত হয়ে গেছে। অর্ধেন্দুর ডিঙ্গি, তাঁর নিচের স্থান জলশূন্য হতে কিছুটা আচমকাই ভূমিতে পতিত হয়ে গিয়ে ভেঙে যায়। আর অর্ধেন্দু নিজের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে, এই আনন্দে সেই ডিঙ্গির উপরই উপবেশন করে প্রগলের ন্যায় হাসতে থাকলেন।

এই একই অবস্থা ভণ্ডেরও। তবে সে নিজের হাস্য সংযত করে, ডিঙ্গিকে সঠিক রাখার জন্য ব্যবহৃত নিজের সমস্ত বাণকে উদ্ধার করতে ব্যস্ত। অন্যদিকে করিন্দ্রের প্রাণ এবার সঙ্কটে স্থাপিত হয়ে যায়। আচমকা ভাগীরথীর জলস্ফীতি হলে, সেনা কিছু বোঝার আগেই, তাঁদেরকে আর তাঁদের একত্রিত সমস্ত গোলাবারুদকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায় ভাগীরথী।

সমস্ত কিছু খুইয়ে, জলের মধ্যে হাঁকপাঁক করতে থাকলেন করিন্দ্র ও তাঁর ভ্রাতারা। কেউ ভেঙে যাওয়া জাহাজেরই কনো না কনো কাঠের টুকরো নিয়ে, অনেক অনেক জলপান করে, যাহোক তাহোক ভাবে ভেসে রইলেন জলে। সেই সংবাদ রাজা অর্ধেন্দু আর ভণ্ডও পেয়েছে। তাই তাঁদের সম্রাট, তাঁদের নেতাকে বাঁচাতে অনেক অনেক ছোটো ছোটো ডিঙ্গি নিয়ে যাত্রা করে, সকলকে উদ্ধার করে আনলেন অর্ধেন্দু ও ভণ্ড।

দাসদাসীদের দিয়ে তাঁদের উদরের জল নিষ্কাসিত করে, ওষধি আদিদ্বারা সেবাসুস্রসা করে, করিন্দ্র ও সকলভ্রাতাদের সুস্থ করলে, এবার শুরু হয় তাঁদের জল্পনা। কি হিয়েছিল? এ কি কনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নাকি কারুর কীর্তি!

ভণ্ড বললেন, “না মিত্র, এ প্রাকৃতিক ঘটনাই হবে, কারণ আমার কাছে যতটা সংবাদ আছে, সেই অনুসারে, সুর ও শ্রী বাকি চিত্তাপরিবারের থেকে বিচ্যুত। আর সুর বিভিন্ন স্থানে স্থানে সৈন্যনির্মাণ করে বেড়াচ্ছে, এবং নৃপতিদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। আমি সেই সংবাদ লাভ করে, সেখানে সেখানে যাত্রা করেছি, যেখানে যেখানে সৈন্যনির্মাণ হচ্ছে, কিন্তু একটি স্থানেও সুরকে দেখতে পাইনি যে তাকে পুনরায় অজ্ঞাতবাসে প্রেরণ করবো।

ইদানীংকালে রাজশাহীতে সৈন্যনির্মাণের কাজ চলছে। অর্থাৎ সুর সেখানেই আছে নিশ্চিত ভাবে। যদিও আমি সেখানে যাত্রা করেও সুরকে নিরীক্ষণ করতে পারিনি, তবে তার কারণ সেখানের সেনা তাঁকে গোপন করে রেখে দিয়েছিল। অন্যদিকে দুটি সুন্দরী যুবতী, যাদের দেখে মনে হয়েছিল কনো রাজকন্যা, তাঁদেরকে বন্দী করেছিলাম, তোমার সম্ভোগের কারণে তোমার কাছে তাদের প্রেরণ করবো বলে, কিন্তু সেখানে এক স্ত্রী আকস্মিক ভাবে উদিত হয়ে তাণ্ডব করে সেই দুই কন্যাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। যখন সে আমাকে মূর্ছিত করে, গঙ্গার জলে ফেলে দিয়েছিল, তখন আমি তাঁকে দেখেছি। সে শ্রী ব্যতীত কেউ নয়।

অর্থাৎ মিত্র, সুর বা শ্রী, এঁরা দুইজনেই এখন উত্তর জম্বুদেশে বিরাজ করছে। তাঁরা এখানে নেই। আর তুমিই ভেবে দেখো মিত্র, যদি তাঁদের একজনও এখানে বিরাজ করতো, তাহলে কি আমরা সক্ষম হতাম চন্দননগরের দুর্গকে ধ্বংস করতে! … অর্থাৎ, যদি কনো মানুষেরই কাজ হয়, তবে নিশ্চিত ভাবে চিত্তাপরিবারের কারুর কাজ নয় এটি। সমস্ত তান্ত্রিকদের আমরা হত্যা করে দিয়েছি, তাই কনো তান্ত্রিকও এই কাজ করতে পারবেনা। অর্থাৎ একমাত্র যা পরে রইল, তা হলো প্রকৃতি। তাই নিশ্চিত ভাবে এটি কনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ”।

বীর্যও বললেন, “ভণ্ড সঠিক বলছে, চিত্তাপুত্ররা এমন কনো কাজ করতোও না, যা সাধারণ মানুষকে বিব্রত করতো, বা তাঁদের প্রাণ নিতো। এ নিশ্চিত ভাবে প্রকৃতির কীর্তি। … তবে কথা সেটি নয়। কথা এই যে আমাদের সমস্ত গোলাবারুদ আর সমস্ত জাহাজ নষ্ট হয়ে গেল, কিন্তু চন্দননগরকে বশ করে, সেখান থেকে জগদ্ধাত্রী আরাধনা বন্ধ করা গেল না।

ভাগ্নে, আমার মনে হয়, আমাদের জগদ্ধাত্রী আরাধনা বন্ধ করার দিকে দৃষ্টি না দেওয়াই সঠিক হবে। যখন যখন সেইদিকে নজর দিয়েছি, এমনই বিরল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদের। জগদ্ধাত্রী আরাধনাকে স্বয়ং প্রকৃতি সুরক্ষা প্রদান করছে, তাই আমরা কিছুতেই সফল হচ্ছিনা।

ভাগ্নে, ভেবে দেখো, সর্বাম্বা বেঁচে থাকাকালীন আমরা কিচ্ছু করতে পারিনি, কারণ তিনি তো পরাপ্রকৃতি। অর্থাৎ প্রকৃতির সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমরা অত্যন্ত সামান্য। আমাদের মধ্যে আত্ম জীবিত নেই যে সে প্রকৃতির বিরোধ করবে। পরাজিত হলেও, প্রকৃতির বিরোধ করার সাহস একমাত্র তাঁরই ছিল। তাই ভাগ্নে, প্রকৃতির বিরোধ করা থেকে আমাদের বিরত হওয়া উচিত।

আর আরো একটি কথা। চিত্তাপুত্রদের অজ্ঞাতবাসের সময়সীমা সমাপ্ত হয়ে গেছে। তাই নিশ্চিত ভাবে তারা ছায়াপুরে যাত্রা করবে। ভাগ্নে, বাকি জায়গায় প্রকৃতির সাথে আমরা জিততে পারবো না ঠিকই, কিন্তু ছায়াপুরে প্রকৃতি আমাদের উপর জয়লাভ করতে পারবেনা। তাই আমাদের নিজেদের গড়ে চলে যাওয়া উচিত। এমন করে আমরা প্রকৃতির প্রকোপ থেকেও সুরক্ষিত হয়ে যাবো, আর সাথে সাথে চিত্তাপুত্রদের অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে, তাঁদেরকে আমাদের শৃঙ্খলা অনুসারে গ্রেফতার করে, সাজা দিয়েও, আমাদের শত্রুর নাশ করতে পারবো”।

এমন সিদ্ধান্ত নিলে করিন্দ্র সহ সকলে ছায়াপুরে প্রত্যাবর্তন করলেন। অন্যদিকে চন্দননগরের অবস্থাও দৈন্য। দুর্গের নাশ হতে, শত শত প্রজা আহত ও হত। শত শত পরিবার তাঁদের জননী হারিয়েছে তো শতশত পরিবার তাঁদের জনক হারিয়েছে। তাই শ্রীপুত্রদ্বয় জয় ও বিজয়, যারা এতক্ষণ অন্ধরাজা করিমুণ্ড ও আমাত্য সুধামার সাথে হাতে হাত লাগিয়ে প্রজার সেবা করছিলেন, তাঁদের সাথে তন্ত্রসন্তান ও জয়াবিজয়াও হাত লাগালেন।

অন্যদিকে চন্দননগরের এমন সংবাদ শ্রবণ করে, অজ্ঞাতবাসের সময়কাল সমাপ্ত হয়ে যাওয়া চিত্তাপুত্ররা ও তাঁদের জননী দেবী চিত্তা উদ্বিগ্ন হয়ে, তাঁদের সম্পূর্ণ পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে চন্দননগর যাত্রা করলেন, প্রজার সেবা করার জন্য। পথে তাঁদের সাখ্যাত হয় সুরের সাথে। সুরকে সম্মুখে দেখে আপ্লুত দেবী চিত্তা ও ছন্দতাল তাঁকে বারংবার আলিঙ্গন করলে, সুর বললেন, “ভ্রাতা ছন্দ, তুমি বৌদিদের আর মাকে নিয়ে চন্দননগর যাত্রা করো। সেখানে নিশ্চিত ভাবে মাতা ও বৌদিদের প্রয়োজন অধিক, কারণ শত শত দুখী পরিবারের পাশে তাঁদেরকেই দাঁড়াতে হবে।

আর আমাকে তথা ভ্রাতা তালকে অনুমতি দাও, ছায়াপুরে যাত্রা করার। শুনেছি অত্যন্ত মায়াবী স্থান এই ছায়াপুর, যেখানে স্বয়ং প্রকৃতিও প্রবেশ করতে পারেনা। তাই সেখানের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে হবে, যাতে আমরা করিন্দ্রের সম্মুখে গিয়ে, আমাদের সাম্রাজ্য ফিরে পাই। আমরা আমাদের কাজ সমাপ্ত করে, চন্দননগরেই প্রত্যাবর্তন করবো। তোমরা তাই সেখানেই প্রস্থান করে মহারাজ করিমুণ্ডের সংরক্ষণে বিরাজ করো, আর চন্দননগরকে করিন্দ্রের কবল থেকে রক্ষা করো”।

ছন্দ তাঁর মাতা, পত্নী ও দেবী নলিনীকে নিয়ে সেদিকেই যাত্রা করতে থাকলেন, আর তাল তথা সুর যাত্রা করলেন ছায়াপুরে। অন্যদিকে, দেবী শ্রী ও তাঁর সন্তানদের সেবায় অনেকে সুস্থ হয়ে উঠলে, দেবী শ্রী এবার জয়াবিজয়াকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হলেন জয়বিজয়ের সম্মুখে।

অষ্টাদশ বৎসরের এই দুই যুবক, দেবী জয়াবিজয়া কে দেখে যেন আচম্বিত হয়ে গেলেন। সেই আচম্বিত হয়ে যাওয়াকে জয়াবিজয়াও লক্ষ্য করলে, দেবী শ্রী হাস্যমুখে বললেন, “বাছারা, অনুমান করতে পারো, এই দুই কন্যা কারা!”

জয় সম্মুখে এগিয়ে এসে বললেন, “আমরা কি এঁদেরকে চিনি মা? মানে আমাদের কি এঁদেরকে চেনার কথা? … না, আমার তো স্মরণ আসছেনা, আমি এঁদেরকে এর পূর্বে দেখেছি কিনা, তবুও এঁদেরকে খুব চেনা চেনা লাগছে। এই ভ্রমের কারণ কি মা?”

এই একই প্রশ্ন জয়াবিজয়ার মধ্যেও ক্রীড়া করছিল, তাই দেবী শ্রী হাস্যমুখে বললেন, “পুত্ররা, এঁরা তোমাদের সহোদরা। জয়, তোমার মাতা দেবী পদ্মিনীর কন্যা হলেন জয়া। বিচার করে দেখো, তিনি তোমাকে কতটাই না চোখে হারিয়েছেন, তাই তোমার নাম স্মরণ রেখে, তোমার ভগিনীর নাম রেখেছেন জয়া। আর একই ভাব দেবী নলিনীরও। তিনিও তাঁর কন্যার নাম, বিজয়, তোমার সাথে মিলিয়ে রেখেছেন বিজয়া”।

দেবী জয়া সম্মুখে এসে বললেন, “আমার মায়ের সংশয় ছিল যে, ভ্রাতারা তোমরা জীবিত আছো কিনা, কিন্তু কাকিমা নলিনীদেবীর কনো সংশয় ছিলনা। তিনি বারংবার বলতেন, শ্রী নিজে কোলে করে নিয়ে গেছে তাঁদেরকে। কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু হতে দেবেনা তাঁদের। … কি যে আনন্দ হচ্ছে ভ্রাতা, তোমাদের জীবিত আর সুস্থ দেখে, ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না”।

দেবী বিজয়া বললেন, “আজ আমাদের জননীদের কথা বড় মনে পরছে। তাঁরা প্রতিদিন অন্তত একটিবার তোমাদের নাম নিতেন নিজেদের রসনায়, আর বেদনাগ্রস্ত হতেন। আমার জননী নিশ্চিত ছিলেন যে তোমরা জীবিত। তাই প্রতি বছর তোমাদের জন্মদিনের দিন, একটি সুস্বাদু আহারব্যঞ্জন প্রস্তুত করে জানালার কাছে রেখে, তোমাকে তা আহার করানোর কল্পনা করতেন”।

জেঠিমা তাঁকে বলতেন এই পাগলামির কি মানে? তার উত্তরে আমার জননী, শ্রীমায়ের উদ্দেশ্যে বলতেন, শ্রীকে তুমি চেননা দিদি। যাকে একবার সে বক্ষে ধারণ করে, তার ক্ষতিসাধন করে, এমন কারুর সাধ্যি নেই। স্বয়ং যমও তাঁকে ডরায়। জ্বরাসুর তাঁর নাম শুনলে পিছনের বাতায়ন দিয়ে পালায়। তাই আমাদের পুত্র সুরক্ষিত আছে। তিনি বলতেন, এটি আমার বিশ্বাস নয়, আমি নিশ্চিত, আমাদের পুত্ররা সুরক্ষিত আছে। আমার কাছে আমার পুত্র থাকলেও, আমি এতটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম না, যতটা নিশ্চিন্ত আমি এখন, কারণ আমার সন্তান শ্রীর কাছে আছে।

শ্রীমাকে আমরা কখনো দেখিনি। কিন্তু মায়ের এমন কথন শুনে শুনে আমাদের মনে শ্রীমায়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাস জাগে, আর আমাদের হৃদয় তাঁর দর্শন লাভের জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠে। … ভ্রাতারা, মা সত্যই বলেছিলেন, যাত্রা করার সিদ্ধান্ত আমাদের হয়, যাত্রার গন্তব্য আমরা নির্ধারণ করিনা। এই যাত্রার ফলে যে তোমাদের লাভ করবো, তা যে আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি!”

জয় ও বিজয় আনন্দের সাথে তাঁদের ভগিনীদের আলিঙ্গন প্রদান করে বললেন, “জানো ভগিনী, এখানে সেখানে আমি অনেক জননী দেখেছি, কিন্তু আমাদের মায়ের মত এমন নিশ্চিন্ত মা আমরা কখনো দেখিনি। সকল মায়েদের দেখেছি, যদি তাঁরা কনো সন্তানকে জন্ম না দিয়ে পালন করেন কেবল, তিনি ডরান যে তাঁর সন্তান যেন তাঁর প্রকৃত জননীর সন্ধান না পায় কখনো।

কিন্তু আমাদের জননী! … তিনি একটিবারের জন্যও আমাদের ভুলতে দেন নি যে, আমরা মাতা পদ্মিনী ও নলিনীর পুত্র, সম্রাট ছন্দ ও মহাবলি তালের পুত্র। … তিনি সর্বক্ষণ বলে গেছেন আমাদের, অজ্ঞাতবাসের কারণে তাঁরা তোমাদের সন্ধান করতে আসতে পারছেনা। অজ্ঞাতবাস সমাপ্ত হলে, তাঁরা তোমাদের সন্ধানে নিশ্চয়ই আসবেন”।

দেবী জয়া হেসে বললেন, “হবেনা কেন দাদা! … যিনি জানেন যে, সন্তান যার গর্ভ থেকেই, যার বীর্য থেকেই জন্ম নিক, সেই সন্তান আসলে তাঁরই, তিনি কেন সংশয়ে থাকবেন! আমাদের মায়ের দিব্যতা তোমরা প্রত্যক্ষ করো নি ভ্রাতারা? তাঁকে সনাক্ত করো নি!”

বিজয় হেসে বললেন, “মা দিব্য হোক বা আসুরিক হোক, তাতে কি এসে যায় ভগিনী! … সন্তানের কাছে মা কেবল মা হন। তিনি দেবী হলেও মা, তিনি অসুর হলেও মা। তিনি স্বয়ং ঈশ্বরী হলেও, তিনি কেবল মা হয়েই থাকেন”।

দেবী শ্রী এবার ভ্রাতাভগিনীর মধ্যে প্রবেশ করে বললেন, “পুত্ররা, এবার এঁদের সাথে সাখ্যাত করো। এঁরা হলেন তন্ত্রসন্তান”। এই বলে কক্ষের বাইরে চলে গেলেন তিনি।

সুনীল সম্মুখে এসে বললেন, “ভ্রাতারা, মা আমাদেরকে তিন রাত্রি সমানে নিজের স্তনপান করিয়ে বাল অবস্থায় উন্নীত করেছিলেন”।

সকল তন্ত্রসন্তানের সাথে আনন্দের সাথে সাখ্যাত করলে, বিজয় বললেন, “আমাদেরকে মাতা অন্য ভাবে বড় করেছেন, আর তোমাদের মাতা অন্য ভাবে। তোমাদের সাথে কি হয়েছে, তা আমাদের তো জানা হয়ে ওঠেনি, কারণ আমাদের মা নিজের মুখে নিজের দিব্যতার ব্যাখ্যা কখনো করবেন না। তাই তোমাদের সাথেও কি দিব্যতা তিনি প্রদর্শন করেছিলেন, তাও ব্যখ্যা করেন নি। তবে একটি কথা আমাদের বলে এসেছেন মা”।

দেবী সুধা সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “কি সেই কথা ভ্রাতা!”

জয় বললেন, “এই কথা যে, আমাদের দুই ভ্রাতাকে পরবর্তীতে সম্রাটের আসনে স্থিত হয়ে এবং আমাত্যের আসনে স্থিত হয়ে জম্বুদেশকে শাসন করতে হবে। আর একটি স্থানে একটি সংগঠন নির্মিত করবেন তাঁরই কিছু সন্তানরা, যারা সত্যের বিস্তার করবেন। … আজ তোমাদেরকে দেখে, আমাদের কাছে সেই ধারণা স্পষ্ট হয়ে গেল। তোমরা হলে সেই সংগঠনের আধিকারিক”।

দেবী সাধ্বী সম্মুখে এসে বললেন, “না ভ্রাতা, আমরা সেই সংগঠনের আধিকারিক নই, কর্মী। আধিকারিক হবেন দেবী জয়া ও বিজয়া। তাঁরাই এই সংগঠনের নাম দিয়েছেন শ্রীপুর, মায়েরই নামে। আর তাঁরাই হবেন এই সংগঠনের আধিকারিক”।

দেবী জয়া সম্মুখে এসে বললেন, “ভ্রাতা, আমাদের অনুমতি দাও কৃপা করে। সাম্রাজ্যের বিষয়ে আমরা নিয়জিত নই। … সেই ছোটো থেকে শ্রিমায়ের কথা শুনে শুনে, তাঁর সাথে লেপটে পরে থাকার স্বপ্ন দেখেছি আমরা। তাঁর ভাবনাকে প্রসারিত করার স্বপ্ন দেখেছি আমরা। তাই, আমাদেরকে তাঁর সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকতে দাও, যেখানে কনো ধর্মের প্রচার হবেনা, বরং সকল ধর্মের সারকথার বিবরণ দেওয়া হবে। সেখানে কৃতান্তিকেরও প্রচার হবেনা, বরং সত্য কি, তার বিবরণ প্রদান করে, জনগণের মধ্যে সত্যকে ধারণ করার সচেতনতার বিস্তার করা হবে”।

দেবী বিজয়া অন্যদিকে পদচারণ করে নিজের মনে মনেই উচ্চকণ্ঠে বলতে থাকলেন, “সেই প্রতিষ্ঠানের থেকে সত্য জেনে জেনে, যদি জনমানবের মনে হয়, তাঁরা কৃতান্তিক ধর্মের মধ্যেই সেই সকল সত্য লাভ করছেন, আর তাই স্বেচ্ছায় কৃতান্তিক হয়ে উঠতে আগ্রহী হন, তাতে কনো অসুবিধা নেই, কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান কখনোই জোর দেবেনা, কৃতান্তিক হয়ে ওঠার”।

বিজয় প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু বিজয়া, এমন ভাবনার আধার কি?”

বিজয়া হেসে বললেন, “আধার কি, তা এক কথায় বলতে হলে, তিনি হলেন মা। তিনিই সমস্ত কিছুর আধার। তবে বিস্তারে জানতে চাইলে, এই কথাই বলবো ভ্রাতা যে, সমস্ত সময়ে কনো না কনো ধর্ম উন্নীত হয় যখন, তখন সে ধর্মান্তর, আর নিজের সংখ্যাবৃদ্ধির দিকেই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। আর এর ফলে যা হয়, তা এই যে, সেই ধর্মের ধ্বজার অভ্যন্তরে অনেক মানুষই তো এসে যান, কিন্তু তাঁদের অন্তরে সত্যের বোধ জন্মই নেয়না। উপরন্তু তাঁদের মধ্যে সেই ধর্মের সাথে সংযুক্ত রীতিরেওয়াজ, আচার অনুষ্ঠানই থেকে যায়। আর ক্রমশ এমন হয়ে ওঠে যে, সেই রীতিরেওয়াজ আর আচার অনুষ্ঠান পালন করলেই তাঁরা ধার্মিক হয়ে গেলেন”।

জয়া বললেন, “ভ্রাতা, আর এই করে করে, সত্যের সন্ধানই তো মানুষ লাভ করছে না! … বিভিন্ন উপায়ে তাঁরা সেই অসত্যেই বিরাজ করতে থাকছে। কখনো একটি ধর্মের ধ্বজার অভ্যন্তরে থেকে, তো কখনো অন্য ধর্মের ধ্বজার অভ্যন্তরে থেকে, তাঁরা সত্য থেকে সেই একই ভাবে বিচ্ছিন থেকেই যাচ্ছে। … কি লাভ এমন ধর্মের অস্তিত্বের ভ্রাতা, যদি তা মানুষকে সত্যের সাথে পরিচিতই করতে না পারে!

কি লাভ এমন ধর্মের উত্থানের, যা কেবল বলে যে অমুককে পূজা করো মুক্তি লাভ করবে, অমুককে সম্মান করো মুক্তি লাভ করবে? মুক্তি লাভ যে করছেন না কেউ, তার কারণ তো অসত্যে নিবাস। সত্যই মুক্তি, তাই সত্য জ্ঞানই মুক্তি। যিনিই সত্যজ্ঞান ধারণ করতে সক্ষম, তিনিই মুক্তি লাভ করেন, তিনিই মোক্ষলাভ করেন। এই স্বতঃস্ফূর্ত পথই যখন অবরুদ্ধ থেকে যাচ্ছে, তখন কি লাভ ধর্মের উত্থাপনের। সেতো কেবল ধর্মের নাম করে করে, একটি পুনরায় অহংকার বিস্তারের সংগঠন হয়ে যাচ্ছে ভ্রাতা!”

বিজয়া নিজের মনেই হেসে বললেন, “তাই মায়ের সান্নিধ্যে এসে, তাঁর অপার প্রেম দেখে, আমাদের এই অনুভব জেগেছে যে, ধর্ম প্রচার নয়, সত্যপ্রচার আবশ্যক। সত্যজ্ঞানীর কাছে যদি বলার মত এমন কিছু না থাকে যে আমি অমুক ধর্মের অনুগামী, তাও তিনি মোক্ষলাভের অধিকারী, কারণ সত্যজ্ঞান আহরণ করে তিনি মোক্ষকামী। … তাই ভ্রাতা, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে ধর্মের প্রচার নয়, আমাদের কৃতান্তিক ধর্মের আস্থা ও কর্মসূচিই এই হবে যে, সত্যের বিস্তার করা।

সমস্ত মানুষকে সত্যের আভাস দেওয়া, সমস্ত মানুষের অন্তরে সত্যের প্রতি প্রেম জাগ্রত করা। সেই সত্য জাগ্রত হলে, তাঁরা কৃতান্তিক হন, বৈদিক হন, ইসলাম হন, ঈসাই হন, খ্রিস্ট হন, বৌদ্ধ হন, জৈন হন বা শিখ হন, বা কনো ধর্মের ধ্বজা ধারণই না করে থাকেন, সে তাঁদের ব্যক্তিগত স্বতন্ত্রতা। কারণ তখন তিনি কনো ধ্বজা না ধারণ করলেও জ্ঞানী, আর যেকোনো ধর্মের ধ্বজা ধারণ করলেও জ্ঞানী। …

ভ্রাতা, জ্ঞানী সকল অবস্থাতেই জ্ঞানী। জ্ঞানী যেকোনো ধর্মের ছত্রছায়ায় থাকলেও তিনি জ্ঞানী। জ্ঞানী যেকোনো দেশের কেতন ধারণ করে থাকলেও তিনি জ্ঞানী। আর জ্ঞানী যেই ধর্মই ধারণ করে থাকুন, যেই দেশের কেতনই ধারণ করে রাখুন, যেই অবস্থাতেই থাকুন, তিনি সকল ভেদভাবের থেকে মুক্ত, সকল দুঃখ থেকে মুক্ত, সকল বেদনা থেকে মুক্ত, সকল অহং থেকে মুক্ত, সকল ভয় থেকে মুক্ত, সকল ভ্রম থেকে মুক্ত হয়ে মোক্ষকামী।

তাই ভ্রাতা, আমরা নিশ্চয় করেছি যে, মাতা শ্রীকে মধ্যমণি করে, আমরা কৃতান্তিক ধর্মের উদ্দেশ্য কখনোই ধর্মের বিস্তারকে রাখবো না, বরং জ্ঞানী নির্মাণের দিকে আমাদের দৃষ্টি থাকবে। ভ্রমের নাশ করার দিকে আমাদের দৃষ্টি থাকবে, সকলকে সকল ভয়, শঙ্কা, আশঙ্কা, আসক্তি  এবং কর্তা বোধের থেকে মুক্ত করাই আমাদের উদ্দেশ্য হবে। কৃতান্তিকের অর্থই তো তাই, তাই না ভ্রাতা! কর্তা ভাবের থেকে মুক্ত, অর্থাৎ অহংকারের থেকে মুক্ত”।

জয় হেসে বললেন, “সাধু সাধু। অদ্ভুত দিব্য অন্যভুতি দিলে ভগিনী তোমার ভ্রাতাদের। নিজের কনিষ্ঠ ভগিনী যখন ভ্রাতার কাছে এক আদর্শ মানব হয়ে ওঠে; নিজের সন্তান যখন একজন আদর্শ হয়ে ওঠেন, নিজের স্ত্রী যখন একজন আদর্শ হয়ে ওঠেন, তখন সেই ভ্রাতার, সেই পিতামাতার, সেই পতির যে কতটা দিব্য অনুভব হয়, তার অনুভব দিলে আমাদেরকে তোমরা।…

সত্যই বলেছ জয়া, শুধুই সাম্রাজ্য স্থাপন করলে, মানুষের মনের মধ্যে যেই অন্ধকার ছেয়ে রয়েছে, এই নিজনিজ ধর্মের প্রচারকেই সর্বস্ব জ্ঞান করা ব্যক্তিদের বিস্তারের কারণে, তা কখনই দূর হবেনা। সকলেই ভয়ে ভয়ে দিন কাটান, এই বুঝি পাপ হয়ে গেল, এই বুঝি নরকবাস হয়ে গেল। এমন ভয়ে ভয়ে দিন কাটালে কি আর কর্মের ফল থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়? জীবনের সত্য উন্মোচন করা যায়? … সঠিক বলেছ তোমরা।

প্রথম মানুষের মনের অন্ধকার মেটাতে হবে। তাঁদেরকে সত্য দেখতে হবে। তাঁরা যতক্ষণ স্বর্গ-নরক, পাপ-পুণ্য, আমার ধর্ম- তার ধর্ম, আমার লিঙ্গ – তার লিঙ্গ, আমার দেশের অধিবাসী – অন্য দেশের অধিবাসী, এই সমস্ত ভ্রমেই আবদ্ধ থাকবে, তখন সত্য দেখতে পাবে কি করে?

সকলেই তো পাপের থেকে বাঁচতে চাইবে, আর তাই কর্মফল থেকে বাঁচার প্রয়াস করবে। যেই কর্মফলই তাঁদেরকে সত্য শিক্ষা প্রদান করবে, সেই কর্মফল থেকেই যদি পলায়ন করে মানুষ, তাহলে সত্যের অনুভূতি হবে কি করে? … উচিত বিচারই শুধু নয়, অসম্ভব উন্নত বিচার। না তোমাদেরকে এর শ্রেয় দেবনা। কারণটা তোমরাও জানো।

তোমরাও জানো যে, এই উন্নত বিচার তোমাদের নয়। আমাদের সকলের মায়ের কারণে তোমাদের মধ্যে এমন উন্নত বিচার সংগঠিত হয়েছে। তাই তোমাদেরকে এর শ্রেয় দেবনা। শুধু এটুকু বলবো, পূর্ণ ভাবে সমর্পণ করতে হবে তোমাদেরকে। হয়তো তিনি তাও শিখিয়ে দেবেন তোমাদেরকে। … তাই বাচালের মত, নিজেকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রূপে স্থাপিত করে আমি তোমাদের থেকে বড়, আমার অভিজ্ঞতা অধিক, এই ভান করবো না। … মা-ই সব, তিনিই সব”।

বিজয় এবার বললেন, “তবে তোমাদের এই প্রতিষ্ঠানকে এমন উন্নত ভাব স্থাপন করার জন্য অনেক অনেক স্বতন্ত্রতার আবশ্যকতা হবে। আর তাই আমাকে ও ভ্রাতাকে সম্রাটের আসনে স্থিত হতেই হবে। সেই আসনে স্থিত হয়ে আমরা তোমাদেরকে সেই স্বতন্ত্রতা দিতে পারবো, আর তোমরাও সাবলীল ভাবে তোমাদের কাজ করতে পারবে। তবে আমার মনের মধ্যে একটি দ্বন্ধ উৎপন্ন হয়েছে। দ্বন্ধটি তন্ত্রসন্তানদের উদ্দেশ্যে। … আচ্ছা, তোমরা বয়সে, আমার তো মনে হয় সামর্থ্যেও, আর অনুভবেও জয়াবিজয়ার থেকে উন্নত। তারপরেও নিজেদের কর্মী করে রেখে তাঁদেরকে আধিকারিক রূপে স্থাপিত করার প্রেরণা কেন এলো তোমাদের মধ্যে?”

উত্তরটি দিলেন তন্ত্রপুত্র, সঙ্গী। তিনি বললেন, “ভ্রাতা, দেহের বয়স, সে তো এক ভ্রম মাত্র। আধিকারিক তাঁর হওয়া উচিত, যার অনুভব অধিক। আর দেবী জয়াবিজয়ার অনুভব সামর্থ্য অপার। যদি মায়ের পর, এমন কনো চরিত্রের সন্ধান করতে হয় আমাদেরকে, যার অধীনে স্থিত হয়ে কর্ম করলে আমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারি যে আমরা ঈশ্বরের ইচ্ছামতই চলছি, তারা হলেন দেবী জয়াবিজয়া”।

দেবী শুদ্ধা বললেন, “দিদিদের মেধা বা নিষ্ঠার কথাই কেবল বলবো না। হয়তো, কেউ কেউ আমাদের মধ্যেই এমন বলবেন যে তাঁদের কি নিষ্ঠার অভাব আছে! বা মেধার অভাব আছে? … তাই সেই বিষয়ে বলবো না, তবে দিদিদের জনহিতের চিন্তা আকর্ষণীয়। ঠিক যেমন করে মা নিজের চিন্তা না করে, কেবলই নিজের সন্তানদের হিতের চিন্তা করেন। দিদিরাও ঠিক তেমনই ভাবে, একটিবারও কৃতান্তিক ধর্মের বিস্তারের চিন্তা করলেন না, বরং মানুষের সত্যযাত্রার চিন্তা করলেন। … এর থেকে, ভ্রাতা আমরা এই অনুভব করেছি যে, মাতার পর তিনিই থাকতে পারেন যিনি মাতার ন্যায় অর্থাৎ মাতার মতন হন। আর দিদিরা হলেন আমাদের দেখা সেই মাতার মতন। তাই আমরা তাঁর অধীনে স্থিত হয়ে, সমস্ত কর্ম করতে চাই”।

জয় হেসে বললেন, “সাধু সাধু। … মায়ের থেকে তাহলে চলো অনুমতি গ্রহণ করে চলো আমরা শ্রীপুর স্থাপনের ভূমির সন্ধান করি আর শ্রীপুর স্থাপিত করি”।

দেবী শ্রী সেই ক্ষণেই কক্ষে প্রবেশ করলে, বিজয় বললেন, “মা, শ্রীপুর প্রতিষ্ঠান জয়াবিজয়ার হবে, কিন্তু তোমার পুত্র বলে, তাঁদের ভ্রাতা বলে, আর এই সকল তন্ত্রসন্তানের স্নেহের মিত্র বলে, তাঁদের সাথে মিলে শ্রীপুর স্থাপন তো আমরাও করতে পারি, তাই না?”

দেবী শ্রী বললেন, “বেশ তাই হবে। কাল প্রভাতে বরং আমরা এখান থেকে নির্গত হবো সেই স্থানের সন্ধানে। ঠিক আছে? এই কয়দিন অত্যন্ত পরিশ্রম হয়েছে সকলের। তাই আজ রাত্রিটা একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও। কাল প্রভাতে উঠেই আমরা যাত্রা করবো”।

মাতা জগদ্ধাত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি মতন তন্ত্রকন্যারা সকলে একই স্থানের স্বপ্ন দেখলেন সেই রাত্রে, আর নিজেদের মধ্যে সেই নিয়ে আলোচনা করে নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে শ্রীপুরের ক্ষেত্রে কেমন দেখতে হবে। তাই পরের দিন প্রভাতে সকলে নিদ্রা ত্যাগ করে, দেবী শ্রীকে মধ্যমণি করে নির্গত হয়ে গেলেন শ্রীপুরের সন্ধানে।

সত্য বলতে কে বলতে পারে, ব্রহ্মময়ীর লীলা ঠিক কি রূপ। না করিমুণ্ড জানতেন শ্রীর প্রকৃত পরিচয়, জয়বিজয়ের প্রকৃত পরিচয়, আর না তিনি সেই কথা তাই বলতে পারলেন সেখানে পরের দিন আগত চিত্তাপরিবারকে। অথচ চিত্তাপরিবার চন্দননগরে উপস্থিত হলেন ঠিক যেই কালে, তার ঠিক এক প্রহর পূর্বেই শ্রী তাঁর সন্তানদের নিয়ে শ্রীপুরের ভূমির সন্ধানে নির্গত হয়ে গেলেন। অর্থাৎ পিতা পুত্রের মিলন তখনও হলোনা। শ্রীর সাথে সাখ্যাত তখনও হলো না কারুর।

বিজয়া সেই কারণেই বলেন, ব্রহ্মময়ীর মায়া রচনা করার ধারাই ভিন্ন। তিনি বলে কয়ে চমৎকার করেন না। তাঁর সাধারণ কীর্তিই চমৎকার হয়ে থাকে। সেই চমৎকারের কারণেই তো সেইদিনই একটি প্রহর আগে দক্ষিণে দিকে যাত্রা করলেন শ্রী ও শ্রীসন্তানরা, আর এক প্রহর পরেই সেই চন্দননগরেই উত্তর দিক থেকে আগত হলেন চিত্তাপরিবার।

সঠিক সময়ের আগে কনো কিছুই অনুষ্ঠিত হয়না। তাই যেমন সঠিক সময়ের আগে চিত্তাপরিবারের সাথে শ্রীর সাখ্যাতও হলোনা, তেমনই সঠিক সময়ের পূর্বে শ্রীপুরের উপযুক্ত ভূমির সন্ধান পেলেন না শ্রীসন্তানরা। অবশেষে যখন এক প্রখর গ্রীষ্মের দুপুরে একটি রুক্ষ উন্নত ভূমিতে স্থাপিত হলেন সকলে, তখন ক্লান্ত দেহে সকলে দেবী শ্রীর ক্রোড়কে আঁকড়ে ধরে নিদ্রায় রত হলেন।

আর সকলে যখন নিদ্রায় রত, এমনই সময়ে দেবী সায়নি নিদ্রাভঙ্গ করে বলে উঠলেন, “ওঠো সকলে ওঠো। আমার কাছে সেই স্থানের দৃশ্য আবার দৃশ্যমান হলো, যেই স্থানে শ্রীপুর স্থাপিত হবে। সেই স্থানের রূপ এই স্থানের মত নয়, কিন্তু গঠন ও ভৌগলিক অবস্থান অনুরূপ এই স্থানের মতন। হয়তো গ্রীষ্মের প্রখর তাপের জন্য আমাদের দেখা স্থান আর এই স্থান মিলছে না”।

উত্তেজিত হয়ে ওঠা দেবী লাবণী ও সুগন্ধা বলে উঠলেন, “দিদি, একটি কাজ করলে হয়তো? মাতা জগদ্ধাত্রী আমাদের আঁচলে নিজের নদীধারাকে স্থাপিত রেখেছিলেন। একবার সেই জলধারা নিকড়ে এই স্থানে পতিত করে দেখলে হয় তো?”

দেবী শুদ্ধা বললেন, “ধুত, এই গরমে, সমস্ত জল শুকিয়ে গেছে। সেই বস্ত্র কি এখন আর সিক্ত আছে!”

দেবী জয়া বললেন, “মাতার উপর সংশয় না করে, একবার ভগিনীদের কথা শুনেই দেখো না শুদ্ধা। হতেও তো পারে যে, মায়ের জানাই ছিল যে, এই স্থানে আমরা যখন উপনীত হবো তখন তা রুক্ষ হয়ে থাকবে আর আমরা তা সনাক্ত করতে পারবো না। আর সেই উদ্দেশ্যেই তিনি নিজেকে তোমাদের আঁচলে স্থাপিত করে তোমাদের আঁচলকে সিক্ত করে দিয়েছিলেন!”

জয়ার কথা শুনে দেবী সুধা নিজের আঁচলকে নেকড়াতে, সকল হতবম্ব হয়ে দেখলেন যে শুকনো খটখটে কাপর থেকে কত অধিক পরিমাণ জল ভূমিতে স্থাপিত হলো। আর সাথে সাথে এও দেখলেন সকলে যে, সেই জলে সিক্ত হতেই, এই স্থান সেই রূপ ধারণ করতে শুরু করে দিয়েছে, যেই রূপকে তাঁরা তাঁদের স্বপ্নে দেখেছিলেন। নিশ্চিত হয়ে গেলেন সকলে যে এই স্থানই সেই স্থান। আর তাই সকলে এবার নিজের আঁচলকে নেকড়াতে, মাতা জগদ্ধাত্রীর দেয় জলধারা সেই সমস্ত স্থানকে রিক্ত থেকে সিক্ত ও সবুজে পরিপূর্ণ করে দিল।

আনন্দতে প্রফুল্লিত হয়ে, সকলে সকলকে আলিঙ্গনসুখ প্রদান করে, প্রবল উদ্যমে এবার সেই স্থানে নির্মাণ করা শুরু করলেন শ্রীপুর, আর মাত্র তিন মাসের পরিশ্রমে, সেই স্থানকে উর্বর করে তুললেন তাঁরা। যেমন তাতে এই প্রতিষ্ঠানের সকল সদস্যের উদরপূর্তির জন্য ধানের ক্ষেত রাখলেন, তেমনই প্রয়োজনীয় সবজীর আর চাষের পশুপক্ষী তথা মৎস্যের চাষেরও, এবং ওষধি তরুরও।

ক্ষেত, ফলের বাগান ও মৎস্যচাষের ক্ষেত্রকে শ্রীপুরের পশ্চাতে স্থাপিত করে, শ্রীপুরের ঠিক মধ্যস্থলে রাখলেন ফুলের ও ওষধির বৃক্ষরাজিদের আর তাকে ঘিরে নির্মাণ করলেন একটি দ্বিতল গোলাকার অট্টালিকা। সেই অট্টালিকার সম্মুখে একটি বিশালাকার দালান, ও দ্বিতলে সেই দালানের উপরে স্থাপিত হলো বিশাল বারন্দা। পশ্চিমদিকের অট্টালিকাকে পুরুষদের নিবাসস্থান রূপে স্থাপিত করে, পূর্ব দিককে স্ত্রীদের নিবাসস্থান রূপে স্থাপন করলেন।

দক্ষিণদিককে শ্রীমায়ের অবস্থান চিহ্নিত করে, তাঁর কক্ষের সম্মুখে বিশাল বারন্দাকে শিক্ষাগ্রহণের এবং উপাসনার স্থান রূপে চিহ্নিত করলেন, আর উত্তরদিক যা সম্মুখেরও দিক, তাকে চিহ্নিত করলেন ক্রীড়াদির জন্য। এবং এই সমস্ত নির্মাণ সমাপ্ত হলে, তাতে নিবাস করেই তাঁরা সত্যশিক্ষার বিস্তার করা শুরু করলেন, নিকটতম নদিয়াদ রাজ্যে, দূরবর্তী মুর্শিদ রাজ্যে এবং তাকে বিস্তৃত করতেই থাকলেন সমানে। আর এমন করার ফলে শ্রীপুর ও কৃতান্তিক বিখ্যাত হতে থাকে সম্পূর্ণ জম্বুদেশে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28