১৪.২। চন্দনদুর্গ পর্ব
তন্ত্রস্ত্রীদের সাথে জলক্রীড়া করতে জয়াবিজয়া অত্যন্ত আনন্দিত হতে থাকলে, তন্ত্রস্ত্রীরাও তাঁদের ভগিনীদের সঙ্গে আনন্দ লাভ করতে থাকলেন। কিন্তু জয়াবিজয়ার ভাব যেন বড়ই অদ্ভুত। তাঁদের সর্বক্ষণ মনোযোগ পরে থাকে, তাঁদের শ্রীমায়ের উপর। তাই তাঁরা সুধা, শুদ্ধা, সাধ্বী, সাথি, শৃঙ্গার, সায়নি, সুগন্ধা, শ্রুতি, স্ত্রুতি, লাবণীর সাথে জলক্রীড়া করে আনন্দ উপভোগ করাকালীনও দেখতে থাকেন যে, তাঁদের শ্রীমা কেমন যেন এক সন্তানসর্বস্ব মাতা।
সঙ্গী, শুভ, সুনীল, শোভন ও শীর্ষ, এই পাঞ্চ তন্ত্রপুত্ররা সকলেই ষোড়শ বৎসরের হয়ে গেছেন, তাঁদের ভগিনীদের মতই। অর্থাৎ তাঁরা কিশোর হলেও, আর সম্পূর্ণ ভাবে কিশোর তো তাঁরা নেই, যৌবনের বোধ তাঁদের জন্ম নেওয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু না এই পরিণত বয়সের বোধ, তাঁদের আছে, আর না তাঁদের জননীর আছে। মাতা শ্রী যেন শিশু বালককে স্নান করিয়ে দেবার মত করেই তাঁর এই পরিণত পুত্রদের স্নান করিয়ে দিচ্ছেন।
আর মাতার এমন বালসেবার মধ্যে বিরাজ করা শুদ্ধ মাতৃত্ব আর পূর্ণপবিত্রতাকে তাঁর পুত্ররা যেন প্রত্যক্ষ করছেন, আর বিভোর হয়ে যাচ্ছেন। যখন যখন তাঁদের অঙ্গে মাতার শ্রীঅঙ্গের বা শ্রীহস্তের স্পর্শ লাগছে, তাঁরা অপার আনন্দে শিহরিত হয়ে উঠছে, রোমাঞ্চে যেন সমাধিপ্রায় অনুভব লাভ করছে। সেই শিহরনের কালে, রোমাঞ্চের কালে নেত্র বন্ধ হয়ে গেলেও, তাঁরা যেন অত্যন্ত তৎপর নিজেদের নেত্রকে উন্মোচিত করতে, কারণ নেত্র বন্ধ থাকলে যে, তাঁদের জননীর মুখমণ্ডলের অদ্ভুত স্নেহশীল নিষ্ঠায় জর্জরিত মাতৃত্বকে দেখে আপ্লুত হতে পারছেন না।
রোমাঞ্চের কারণে নেত্র বন্ধ করা, আর মাতৃত্বকে উপভোগ করার লোভে ধরমর করে নেত্র উন্মেলিত করা, এই দুইয়ের দ্বন্ধে থাকা তন্ত্রপুত্রদের কীর্তি যেন জয়াবিজয়াকে অত্যন্ত পুলকিত করতে থাকলো। আর আরো পুলকিত করতে থাকলো, এই দুইয়ের কারণে এক অদ্ভুত বাল্য আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠছে যেন তন্ত্রপুত্ররা, আর সেই আনন্দে খিল খিল করে হেসে উঠে, তাঁদের জননীর আনন্দকে পঞ্চগুণ বৃদ্ধি প্রদান করছে। এই ভাবে তাঁরা সকলে সেই স্নানপর্বের আনন্দ লাভ করতে থাকলো। কিন্তু এরই মধ্যে, মাতা শ্রী যেন আকস্মিক থেমে গেলেন। যেন তিনি কিছু জিনিসকে প্রত্যক্ষ করলেন, আর তা প্রত্যক্ষ করে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
তাঁর এই স্তব্ধ হয়ে যাওয়াকে তন্ত্রকন্যারা দেখেননি, তাঁরা জলক্রীড়াতে মত্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁদের নজর সেদিকে গেল, যখন তন্ত্রপুত্ররা আবেগতাড়িত হয়ে প্রশ্ন করলেন, “কি হয়েছে মা! … কিছু কি হয়েছে? আমরা কি কিছু অপরাধ করে ফেলেছি? … চুপ করে থেকো না মা, বলো না!”
দেবী শ্রী নিজের চোয়াল শক্ত করে নিয়ে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, “চলো পুত্ররা, আমাদের এবার দ্রুত প্রস্থান করতে হবে। অন্যত্রে আমার সন্তানরা অত্যন্ত পীড়ায় রয়েছে। … (কন্যাদের দিকে তাকিয়ে) কন্যারা, তোমাদের স্নান হয়েছে! … জয়াবিজয়া, প্রস্তুত হও মা। … শীঘ্র আমাদের প্রস্থান করতে হবে”।
শুভ বললেন, “মা, সুধা আর সাধ্বী প্রথম তোমার স্তনপান করেছে, তিনরাত্রিই। তাই তাঁদের কাছে অস্বাভাবিক বল আছে। আর আমরা সকলেই তোমার স্তন পান করেছি, তাই সকলের অধিক গতি লাভ করেছি। যদি অনুমতি দাও মা, তাহলে সুধা আর সাধ্বী দেবী জয়াবিজয়াকে পৃষ্ঠে ধারণ করলে, আমরা তোমার পশ্চাতে অতিদ্রুত যাত্রা করতে সক্ষম। তোমার স্তনঅমৃতের কৃপাতে আমরা, ৫ দিবসের যাত্রাকে ৩ দিবসে অতিক্রম করতে সক্ষম”।
শুভর কথাতে সকলে সমর্থন করলে, দেবী শ্রী গম্ভীর হয়েই বললেন, “বেশ তাই হোক। … তোমরা দ্রুত বস্ত্রধারণ করে নাও। আমরা শীঘ্রই নির্গত হবো। … পথে যেই বৃক্ষতরু ও পশুরা আমাদের কাছে এসে নিজেদের আহার রূপে সমর্পণ করবে, আমরা তা গ্রহণ করে নেব। এখন চলো”।
তন্ত্রসন্তানরা সকলে তাঁদের পূর্বে ধারণ করা বস্ত্র ধারণ করলে, তাঁদের জননী তাঁদের সকলের কাছে একে একে গমন করে নিজের অতিকোমল হস্ত সেই বস্ত্রে বুলিয়ে দিলে, জয়াবিজয়া দেখলেন, সেই বস্ত্র যেন নতুনের মত চকচক করতে শুরু করলো। …
আর এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে তাঁরা অনুভব করলো যে, তাঁদের মাতা, সকলের মাতা, মাতা সর্বাম্বা, দেবী সর্বশ্রী ব্রহ্মময়ী সত্যই কতখানি পৃথক আত্মের থেকে। আত্ম স্বয়ং বা তাঁর ত্রিগুণ অর্থাৎ ত্রিদেব সামান্য চমৎকার করলেও, ঢাকঢোল কাঁসারঘণ্টা শঙ্খশিঙ্গাতে সর্বত্র আওয়াজ করে, লোক একত্রিত করে, নিজেদের চমৎকারের বাখান করে ফেরে। আর সাখ্যাত ব্রহ্মময়ীর যেন নিজেরও হুঁশ নেই যে তিনি চমৎকার করছেন। তিনি তো চমৎকার করছেনই না। তিনি শুধুই মা। আর মা তাঁর সন্তানদের প্রেম করছেন, কিন্তু সেই প্রেম যে জগতের দৃষ্টিতে চমৎকার, তার বোধও যেন সেই মাতার নেই, যিনি নিজের মাতৃত্বের নেশাতে চূর হয়ে রয়েছেন!
এই একই দৃশ্য তাঁরা পথেও দেখলেন। যখন যখন যেই বৃক্ষ থেকে ফল তাঁর নিকটে পরে, তাঁর আহারের বস্তু হয়ে সমর্পণ করলেন, যখন যেই পশু বা পক্ষী সকলের আহার রূপে নিজেকে অর্পণ করলেন মায়ের কাছে, মা সেই সকল বৃক্ষকে, সেই সকল পশুকে প্রাণপণে আলিঙ্গন করে, নিজের বক্ষে সঞ্চিত অনন্ত মাতৃত্বপ্রেম প্রদান করলেন, অতঃপরে তন্ত্রসন্তানদের বললেন, তাঁদের উপর আকস্মিক হিংসা প্রদান করে, সেই তৃণকে বা সেই পশুকে বা সেই পক্ষীকে সর্বাধিক কম সম্ভব পীড়া প্রদান করে, তাঁরা যে নিজেদের প্রাণ অর্পণ করেছেন তোমাদের প্রাণ রক্ষার্থে, তা স্মরণ রেখে, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে আহার করতে।
এই দৃশ্য দেখতে দেখতে আর নিজেকে আটকাতে না পেরে, জয়া প্রশ্ন করেই ফেললেন দেবী শ্রীকে, “মা, প্রতিবার তোমাকে আহার করতে হয় যখন, তোমাকে তোমারই কনো না কনো সন্তানকে ভক্ষণ করতে হয়, আর প্রতিবার তুমি অত্যন্ত পীড়া অনুভব করো, কিন্তু প্রকৃতির নির্ধারিত এই নিয়মকে তুমি অনুক্ষণ পালন করে চলো। … মা, এই অদ্ভুত প্রক্রিয়ার নির্মাণই বা কেন করেছেন প্রকৃতি? প্রকৃতি, সে তো স্বয়ং তুমিই! তুমি এমন নিয়ম নির্মাণ করেছই বা কেন, যার কারণে তোমাকে অসীম পীড়ার অনুভব করতে হয়?”
দেবী শ্রী মিষ্ট ও ম্লান হাস্য প্রদান করে বললেন, “পুত্রী, প্রাণমাত্রই আত্মের নির্মাণ। আমি তো তাঁদের অন্তরে কেবল চেতনা হয়ে বিরাজ করি, আর তাঁদের ভূতদের প্রেরণারূপে অবস্থান করি। … আত্ম মানেই নশ্বরতা, আর তাই তাঁর সমস্ত সৃষ্টই নশ্বর। এই বৃক্ষ, এই তৃণ, এই পশু, এই পক্ষী, সমস্ত কিছুই নশ্বর। তবে নশ্বর কি? নশ্বর তাঁদের তনু, তাঁদের অন্তরে স্থিত চেতনা, যাকে রুহ বলো, তা নয়। সেই চেতনা বা রুহ তো স্বয়ং ঈশ্বর। সেই চেতনা বা রুহের নাশ নেই। দেহের নাশের সাথে তাঁদের কনো সম্পর্কও নেই।
তাই প্রথমকথা প্রাণনাশের কারণে আমার সন্তানদের, অর্থাৎ সেই চেতনা বা রুহদের কনো প্রকার ক্ষতি সাধন হয়না। ক্ষতিসাধিত হয় আত্মের, কারণ আত্ম স্বয়ং নশ্বর, আর তাই তাঁর নির্মিত সমস্ত কিছুই নশ্বর, আর তাই তাঁর নির্মিত নশ্বর ব্রহ্মাণ্ড অর্থাৎ জীব, উদ্ভিদের দেহের নাশ হয়। তবে, তুমি বলবে, আমি আত্মের নাশে বা আত্মের ব্রহ্মাণ্ডের নাশে আনন্দিত না হয়ে বেদনাক্রান্ত কেন হই, তাই তো?
পুত্রী, আত্মের স্বভাবই আসক্তির বিস্তার করা। আর তাই, আত্মের এই স্বভাবের কারণে, আমার সমস্ত সন্তানই ভুলে রয়েছে যে সে চেতনা অর্থাৎ রুহ, এবং সে স্বরূপে ঈশ্বর, এবং তাঁর নাশ সম্ভবই নয়। আত্মের বিস্তৃত আসক্তির কারণে, তারা নিজেদেরকে আত্মের পরিচয়, অর্থাৎ দেহের পরিচয় এবং আত্মের অধিকার করা পরিচয় অর্থাৎ পঞ্চভূতের পরিচয়কেই স্মরণ রাখে। আর তাই তাঁদের অর্থাৎ তাঁদের এই দেহের এবং পঞ্চভূতের সামঞ্জস্ব্যের যখন যখন বিনাশ করা হয়, তখন তখন আমার সন্তানরাও আসক্তির বশে এসে ভয়ার্ত হয়ে ওঠে যে তাঁদেরও বিনাশ হয়ে গেল।
আমার সন্তানরা আসক্তির বশে এসে ভয়ার্ত হয়ে থাকে যে তাঁদের নাশ হয়ে গেল, সেই কারণেই আমার পীড়া পুত্রী। আর আমি তাঁদেরকে বক্ষে ধারণ করে এই কথাই বলি যে, হে আমার পুত্ররা পুত্রীরা, তোমাদের তো নাশ সম্ভবই নয়, কারণ তোমরা তো আমিই, তোমরা তো আমি স্বয়ং, আর আমি স্বয়ং তো ঈশ্বর, অর্থাৎ অক্ষয়। তাই আসক্তি ত্যাগ করো তোমার এই দেহের প্রতি আর ভয়শূন্য হও। নাশ হবে তোমার আসক্তির, তোমার মোহের, তোমার ভ্রমের অর্থাৎ তোমার এই যে ভ্রম যে তোমার এই দেহই তোমার ব্রহ্মাণ্ড, সেই কল্পনার। তোমার নাশ সম্ভব নয়, তাই নির্ভয় হও।
আর যদি বলো প্রকৃতি কেন এই নির্মম নিয়ম নির্মাণ করেছেন, তাহলে তার উত্তর এই যে, এই নিয়ম নির্মিত না করলে, আমার সন্তানরা উদ্ভিদের রূপে, মৎস্য, কীট রূপে, জীব পক্ষী রূপে অবস্থান করে করে, নিজের দেহকেই যে নিজে ভেবে বসে থেকে ভ্রমিত, সেই ভ্রমই অক্ষয় হয়ে যেত, এই নিয়মের অভাবে।
এই নিয়মের কারণে, নিষ্ঠুর ভাবে তাঁদের এই ভ্রমের অর্থাৎ দেহের হত্যা করা হয়। অত্যন্ত প্রবল হিংসা ধারণ করে করে, তাঁদের এই ভ্রম অর্থাৎ তারা যে সেই দেহ, সেই ভ্রমের নাশ করা হয়, তা সে উদ্ভিদ হোক, জীব হোক, মৎস্য হোক বা পক্ষী কীট হোক। আর এই নাশের ফলে, আত্ম যে তাঁদেরকে প্রবল ভাবে ভ্রমিত করে রেখে দেহের প্রতি আসক্ত করে রাখে, সেই আসক্তির নাশ হয়।
তুমি বলবে, এই নাশের ফলে কি তার আসক্তি চিরতরে চলে যায়! না যায়না, কিন্তু তা দৃঢ় ভাবে তাঁদের অন্তরে বসেও যেতে পারেনা, অর্থাৎ তাঁদেরকে নিজেদের আত্মপরিচয় যে তাঁরা আত্ম নয়, তাঁরা দেহ নয়, তাঁরা ভূত নয়, তাঁরা রুহ বা চেতনা, সেই দিকে অগ্রসর করানো সম্ভব হয়। যদি এই আসক্তি আর ভ্রম যে তাঁরা সেই দেহ, সেই আত্ম, সেই ভূতসমূহ, তা একবার তাঁদের চেতনার অন্তরে দৃঢ় ভাবে বসে যেত, তাহলে আর কিছুতেই তাঁদের এই ভ্রম থেকে মুক্ত করা সম্ভব হতো না।
তাই প্রকৃতি এই নিয়ম করেছে যে, বারবার আত্ম এই ভ্রমের রচনা করবে আমার সন্তানদের উপর, চেতনার উপর, রুহর উপর, বারবার তাঁদের দেহের ও আত্মের নাশ করা হবে, ততক্ষণ যতক্ষণ না কনো দেহে থেকে তাঁরা নিজেরা উপলব্ধি করে নিতে পারেন যে তাঁরা দেহ নন, আত্ম নন, ভূত নন, ভাব নন, তাঁরা হলেন ঈশ্বর, তাঁরা হলেন চেতনা, তাঁরা হলেন রুহ, তাঁরা হলেন স্বয়ং আমি। … তখন আর প্রকৃতির এই নিয়ম প্রযোজ্য নয় কেন? কারণ তখন তো সেই জীব স্বয়ংই নিজের ভ্রমরূপ নারকোলের খোল ছাড়িয়ে ফেলে, কেবল শাঁসটুকু হয়ে যায়। তখন আর কনো ভ্রম তাঁকে স্পর্শও করতে পারেনা। সে মুক্ত, সে ঈশ্বর, সে আমি হয়ে যায়, আর তাই সে তখন আমাতেই লীন হয়ে যায়”।
বিজয়া বললেন, “অর্থাৎ আত্মের বিস্তার করা ভ্রম যাতে দৃঢ় ভাবে অন্তরে স্থিত না হয়ে যায়, তাই প্রকৃতি এই নিয়ম নির্ধারণ করেছে! আর আসক্তি এমনই জেদি হয় যে তা কিছুতেই বিনষ্ট হবার নয়। তাই প্রবল হিংসার সাথে এই হত্যালীলা করতে হয়, এবং কনো জীবকে উদ্ভিদকে বা যেকোনো প্রাণকে তাঁর ভ্রমরূপ দেহ থেকে সাময়িক ভাবে মুক্ত করা হয়। কিন্তু মা, আমাকে একটি কথা বলো, সেই জীবদের কি, যারা হিংসা করেন না, যেমন গরু, অজ, ইত্যাদি!”
দেবী শ্রী হাস্য ও আশ্চর্য হয়ে যাবার ভান করে বললেন, “হিংসা করে না! কাকে তাহলে হিংসা বলো তুমি বিজয়া! … সিংহ, ব্যঘ্র এঁরা একটি জীবকে হত্যা করে নিজের আহারের উদ্দেশ্যে, কিন্তু গরু, অজ! এঁরা তো লক্ষ লক্ষ প্রাণের হত্যা না করলে, এঁদের উদরপূর্তি হয়না! … প্রতিটি তৃণ একটি করে প্রাণ। প্রতিটি ঘাস একটি করে প্রাণ। … একটি ঘাসের আহার করলে কি গরু নিজের প্রাণ রক্ষা করতে পারবে? একটি ঘাসের প্রাণ নিলে কি অজের প্রাণ রক্ষা হবে?
হবেনা তো! তাই তাঁদেরকে প্রতিদিবস শতশত প্রাণ হনন করতে হয়। ভয়ানক স্তরের হিংসা করতে হয়, তবেই তাঁরা নিজেরা জীবিত থাকতে সক্ষম হয়। পুত্রী, গরু অজের থেকেও অধিক হিংস্র হতে হয় তৃণকে, ভূমিকে বিনষ্ট করে, তাকে চিড়ে, তাঁর অন্তর থেকে নিজের ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য জল উত্তোলন করতে হয় তাঁকে। অর্থাৎ পুত্রী, তোমার এই বিচার যথার্থ নয়, কারণ তুমি কেবলই কিছু প্রাণীকেই প্রাণধারণের আখ্যা প্রদান করছো। কিন্তু পুত্রী, প্রাণ তো সকলেই ধারণ করছেন!
যেই পঞ্চভূতকে ধারণ করে করে প্রাণের অনুভব করছো, তাঁদের প্রাণকেই অদেখা করে দিচ্ছ! তাঁদের যদি প্রাণ না থাকতো, তাহলে কি তাঁকে গ্রহণ করে তুমি প্রাণ লাভ করতে! … তৃণদেরও তুমি প্রাণহীন বানিয়ে দিচ্ছ! … পুত্রী, প্রতিটি ধরিত্রীর কণার নিজস্ব আমিত্ব ধারণ করে থেকে প্রাণধারণ করে রয়েছে। প্রতিটি তৃণ, প্রতিটি গুল্ম, প্রতিটি ঘাস নিজের আত্ম ধারণ করে থেকে প্রাণী। আর যেখানেই ভিন্ন আত্ম, সেখানেই ভিন্ন চেতনা।
আসলে চেতনা তোমার আর আমার বা কারুর পৃথক নয়। এক ও অখণ্ড চেতনা অবস্থান করে। যিনিই চেতনা, তিনিই প্রকৃতি আর তিনিই কালনিয়ন্তা নিয়তি, আর তিনিই ব্রহ্মময়ী, আর স্বভাববশতই তিনি একম, তিনি অখণ্ড, তিনি অব্যাক্ত, তিনি অচিন্ত্য। কিন্তু আত্মরূপ ভ্রম যেখানে যেখানে স্থাপিত হয়, সেখানে সেখানে আমিত্বের ভ্রম জন্ম নেয়, আর তা তা নিজের চেতনাকে ভিন্ন ও বিচ্ছিন্ন অনুভব করে, নিজেকে ভিন্ন একটি প্রাণী জ্ঞান করে।
তাই তুমি প্রাণীর নাম দিতে কারুকে কুণ্ঠিত কেন? আর যদি কুণ্ঠিতই না থাকো, তাহলে তৃণের, ঘাসের প্রাণকে কেন অদেখা করছো? সত্যে উপনীত হও, আর তাঁদেরকেও প্রাণী বলেই জ্ঞান করো। অতপরে দেখবে, গরু, অজ, রাসভ, হস্তি, এঁদের সকলকে শ্রেষ্ঠ হিংস্র জীবরূপে গণ্য করবে তুমি। … বিচার করে দেখো পুত্রী আমার কথাকে। তুমি যেই থাল থেকে অন্ন গ্রহণ করছো, সম্পূর্ণ থালের সমস্ত অন্ন মিলে কি একটি প্রাণ? না তো? প্রতিটি ধানের বৃক্ষ একটি একটি করে প্রাণ, আর তোমার অন্নের থালে, কত কত এমন ধানের বৃক্ষের থেকে উৎপাটিত ধানের শিশ থেকে নির্মিত অন্ন অবস্থান করছে, আর তুমি সেই প্রাণগুলিকে ধ্বংস করে করে, নিজের উদরপূর্তি করছো। এরপরেও বলছো, আমি তো কেবল অন্ন গ্রহণ করেছি, তাই আমি অহিংস! … পুত্রী, এতো সর্বোত্তম মিথ্যাচারন ব্যতীত কিছুই নয়।
তবে কি হিংসা করবে না! … হিংসা করতেই হবে পুত্রী। নিজের উদরপূর্তি করতে হলে হিংসা করতেই হবে। এবার কথা হলো, যত সামান্য প্রাণকে হত্যা করে, তুমি আহার গ্রহণ করবে, ততই তোমাকে অহিংস দেখাবে। কিন্তু সেই দেখনাই তো শুধুই একটি ভ্রম মাত্র, তাই না! … একটি মানুষ পায়ের চাপে একশত পিপীলিকার হত্যা করলেন। তাঁকে কি অত্যন্ত ভয়ানক পরিশ্রম করতে হলো? নাকি তাঁকে নিজের দন্তনখ বিকশিত করে হিংসা প্রদর্শন করতে হলো সেই কাজ করতে?
কিন্তু সেই একই ব্যক্তি যদি একটি সারমেয়কে হত্যা করতেন, তাঁকে বিকট ভাবে দন্তনখ প্রদর্শন করে হিংস্র রূপ দেখাতেই হতো। … আর এই দন্তনখ বিকশিত হওয়াতে তোমরা ভ্রমিত হয়ে বলছো যে, প্রথমটি হিংসা নয়, আর দ্বিতীয়টি হিংসা। … পুত্রী, যখন তোমার থেকে অতিশয় দুর্বল কারুকে তুমি হত্যা করো, তখন তোমাকে বাহ্যিক ভাবে দেখে অহিংসই মনে হয়, কিন্তু তুমি একাধিক এবং লক্ষাধিক প্রাণের হত্যা করছো, অতি নির্মম ভাবে, ঠিক যেমন মনুষ্য অন্ন গ্রহণ করার কালে করে, ঠিক যেমন গরু বা অজ বা রসভ বা হস্তি যেমন করে।
কিন্তু যখন দেখো একটি জীব দন্তনখ বিকশিত করে অত্যন্ত পরিশ্রম করে একটি জীবকে হত্যা করছে, তখন তোমরা তাঁকে হিংস্র আখ্যা দিয়ে দাও, যেমন ব্যঘ্রকে, সিংহকে, এবং মানুষ, ভল্লুকও এই তালিকাতে পরে। … কিন্তু পুত্রী, এই দ্বিতীয় জন, যাকে তুমি হিংস্র বললে, সে তো একটি প্রাণের হত্যা করলেন, আর যাকে তুমি হিংস্র বললে না, অহিংস বললে, সে তো লক্ষাধিক প্রাণের হত্যা করছে। তা কি দেখতে পাচ্ছ না তুমি!
(ঈষৎ হেসে মাথা নেড়ে) পুত্রী, ভূমি কুপিয়ে জল নিষ্কাসন করে তা আহার করো, তৃণ ঘাস আহার করো, অন্ন আহার করো আর মৎস্য বা মাস আহার করো, হিংসা তোমাকে করতেই হবে। যেই নশ্বর দেহকে ভাস্মর জ্ঞান করে তাঁকেই আমি জ্ঞানে ভ্রমিত হয়ে বসে আছো, সেই ভ্রমকে জীবিত রাখতে হলে, তোমাকে হিংসা করতেই হবে, কারণ যাকে তুমি ভোজন করছো, তোমার হিংসার মাধ্যমে তাঁর সেই ভ্রমের প্রতি আসক্তিকে আঘাত করে তবেই তোমার উদরপূর্তি হবে, এমনই প্রকৃতির বিধান।
তাই পুত্রী, আহার লাভের জন্য প্রাণহনন, তা তৃণের হোক, পশু বা পক্ষী বা মৎস্যের হোক, তা ভ্রূণ অর্থাৎ অণ্ডের হোক, তা জননীর দেহের লহু অর্থাৎ দুগ্ধই হোক, বা তা ভূমিকর্ষণ করে ভূমিকে ধ্বংস করে জলই গ্রহণ করা হোক, তাকে কখনোই হিংসা বলেন না জ্ঞানীগণ। এঁদেরকে কেবল ও কেবল মূর্খরাই হিংসা বলে থাকে। জ্ঞানীরা হিংসা তাকে বলেন যখন তোমার উদর পরিপূর্ণ রয়েছে, উদরপূর্তির জন্য কনো প্রাণের বিনাশ করার প্রয়োজনই নেই, তাও তুমি প্রাণের হত্যা করছো।
অর্থাৎ যখন তুমি কেবলই বিশাল অট্টালিকা নির্মাণের জন্য বৃক্ষ উৎপাটন করছো, যখন তুমি কেবলই কিছু ধাতু প্রাপ্তির লোভে ভূমিকে খনন করে ভূমিকে হত্যা করছো, যখন তুমি কেবলই কিছু বস্ত্র লাভের উদ্দেশ্যে একটি জীবকে হত্যা করে তার চামরা নিয়ে নিচ্ছ, তা হলো হিংসা। …
পুত্রী তোমরা যেখানে বড় হয়ে উঠেছ, সেখানে বস্ত্র নির্মাণের জন্য চামরীর পশম নেওয়া হয়, কিন্তু কখনো কি দেখেছ যে, এক জীবিত চামরীকে হত্যা করে সেই পশম নেওয়া হচ্ছে! … না পুত্রী, যদি তেমন করা হতো, তা হতো হিংসা, কারণ প্রকৃতি আহার গ্রহণের জন্য হিংসাকে ধারণ করার অনুমতি দেন, অহেতুক তিনি নিজের সন্তানদের কেবলই অন্য সন্তানের বিলাসিতার উদ্দেশ্যে হত্যা করার অনুমতি প্রদান করেন না। তাই পুত্রী লক্ষ্য করে দেখবে, ধাতুলাভের লোভে করা অতি খননের পরিণাম কি হয়? ভূমিধস।
অট্টালিকা নির্মাণের জন্য অতি বৃক্ষখণ্ডনের পরিণাম কি হয়? অত্যন্ত অধিক ভাবে মশকের জন্ম হয়, এবং প্রকৃতির বাতাবরণ ও তার ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে যায়। … কিন্তু কখনো দেখেছ, একটি ব্যঘ্র বা সিংহ বা কুমির আহার করার পর শিকার করার প্রয়াসও করে! … না, কখনোই দেখবে না তা। একটি ব্যঘ্রের যদি উদর পরিপূর্ণ থাকে, বা একটি সিংহের বা একটি কুমিরের, তখন তাঁর সামনে যদি একটি হিরণ এসে বসেও থাকে, ব্যঘ্র বা সিংহ বা কুমির সেই হরিণের দিকে ফিরেও তাকায় না।
কেন? তাঁরা তো হিংস্র। তারপরেও তাঁরা সেইদিকে তাকায়না কেন? কারণ তাঁরা প্রকৃতির জীব। প্রকৃতিই তাঁদের মা, আর তাই তাঁরা প্রকৃতির নিয়ম জানে। তারা জানে উদরপূর্তির উদ্দেশ্যে করা হিংসা হিংসা নয়, কিন্তু অন্য সমস্ত কারণে করা হিংসা হলো হিংসা। … মানুষও তেমনই জীব পুত্রী, তাই নয়কি? মানুষ নিজের কাছে অজকে রাখে, পক্ষীকে রাখে, গরুকে রাখে, শূকরকে রাখে। মানুষ কি তাঁদেরকে হত্যা করে দেয়! নাকি সেই জীবরা মানুষ তাঁদের হত্যা করে দেবে এই ভয়ে মানুষের থেকে দূরে সরে যায়!
না পুত্রী, এই প্রকৃতির নিয়ম সকল প্রকৃতির সন্তানরা জানেন। যেমন তা গরু, অজও জানে, তেমন তা ব্যঘ্র, কুমিরও জানে, তেমনই শালিক, চড়ুই জানে আবার তেমনই ঈগল সেন জানে, আবার তেমনই তৃণরাও জানে আর মানুষও জানে। কিন্তু মানুষ তা জানার পরেও, আত্মের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, কনোটিকে হিংসা বলে আর কনোটিকে হিংসা বলেনা, আর এই ভাবে স্বেচ্ছাচারিতা করে ভ্রম ও বৈষম্যের নির্মাণ করে”।
জয়া বললেন, “মা, এই যে আত্ম ও আত্মের দ্বারা প্রভাবিত মনুষ্যেরা এই ভ্রমের বিস্তার করে করে, সকলকে তৃণভোজী করে তুলতে চায়, আর প্রকৃতি মানুষকে যে উভয়ভোজী করেছে, তার বিরোধ করে প্রকৃতির অপমান করায়, এতে আত্মের মানে পরমাত্মের লাভ কি? শুধুই কি প্রকৃতির অপমান করানোতেই তাঁর লাভ, নাকি এঁর অন্য কনো উপযোগিতাও আছে পরমাত্মের কাছে, যার ভান তাঁর দ্বারা প্রভাবিত ব্যক্তিদের, যেমন বৈদিকদেরও নেই?”
দেবী শ্রী দ্রুততার সাথে পথ অতিক্রম করতে করতেই বললেন, “জটিল প্রশ্ন, তাই উত্তরও জটিলই হবে পুত্রী। এর উত্তর আমি প্রদান করছি তোমাদেরকে। তবে সেই উত্তরকে অনুধাবন করতে হলে, তোমাদের মনঃসংযোগ স্থাপন করে শ্রবণ করতে হবে, কারণ উত্তর বড়ই জটিল। … পুত্রী, আমরা কেবল আহার করার কালে পুষ্টিই গ্রহণ করিনা, সঙ্গে সঙ্গে যা আহার করছি, তার মধ্যে যেই চরিত্র আমাদের মধ্যে নেই, তাও গ্রহণ করি। যেমন ধরো কনো মনুষ্য যদি অজ আহার করে, সে অজের থেকে পুষ্টি অবশ্যই লাভ করবে, কিন্তু তার সাথে সাথে সেই সেই চরিত্র ধারণ করবে অজের থেকে, যা তাঁর মধ্যে উপস্থিত নেই।
কি এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যা মানুষের নেই অথচ অজের আছে! অজ অহেতুক লড়াই করে, আর সেই লড়াই লড়াইও হয়না, তা হয় লোকদেখানি লড়াই, যা প্রকৃত অর্থে হয় ক্রীড়া। আর কি বৈশিষ্ট্য! অজ অত্যন্ত দুর্বল নয়, কিন্তু তার আচরণ এমন হয় যেন সে অত্যন্ত দুর্বল। অর্থাৎ মনুষ্য যখন অজের মাস নিত্য আহার করবে, তখন সে এমন লোকদেখানি লড়াইকে ধারণ করে নেবে, আবার দুর্বল না হলেও, নিজেকে দুর্বল রূপে প্রদর্শন করার নাট্য প্রদর্শন করা শুরু করে দেবে।
তেমনই গরুর মধ্যে বৈশিষ্ট্য এই যে সে জাবর কাটে, অর্থাৎ আহার গ্রহণ করার কালে সে তা ভক্ষণ করেনা, বরং তা কেবলই সঞ্চয় করে, আর পরে তাকে উদরে নিয়ে যায় চর্বণ করে। যেই মনুষ্য এই গরুর মাস নিত্য গ্রহণ করে, তারাও এইরূপই করতে থাকে, আর তাই তাঁদের মধ্যে কলার বিস্তার অতিসহজে হয়। কেন? কারণ কলার বিস্তার করতে হলে, সম্যক ধারণাকে আগে অন্তরে গ্রহণ করে নিতে হয়, যাদের মধ্যে অধিকাংশই জল, সামান্যই দুধ। আর পরে সেই থেকে জলকে নিঃসৃত করে দিয়ে কেবল দুধ গ্রহণ করতে হয়। অর্থাৎ, যদি সম্পূর্ণ জল ও দুধ মিশ্রিত দুধকে গ্রহণ না করো, তাহলে কিছু না কিছু দুধ অবশিষ্ট থেকেই যাবে, আর তখন কলার রচনা সঠিক ভাবে হতে পারেনা। কিন্তু গরুর মাস নিত্য আহার করার কারণে, এই বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে এসে যায়, আর তাই তারা শ্রেয় কলাবিদ হতে সক্ষম হন, অতি সহজে।
ঠিক তেমনই মোরগকে দেখো। অত্যন্ত সক্রিয় সে, এবং অত্যন্ত প্রাণবন্ত সে, এবং কঠোর পরিশ্রমী। একই ধারা মৎস্যের মধ্যেও। তাই তাদেরকে নিত্য আহার করার কালে সেই অক্লান্ত পরিশ্রম করার মানসিকতা, দু-দন্ড বিশ্রাম করার মানসিকতাও থাকেনা। …
অপর দিকে, তৃণদের দেখো। জীবকুল সর্বাধিক পরিশ্রম কি কারণে করেন? সংগ্রাম করার জন্য। কি জন্য তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংগ্রাম করে? এলাকা দখল বা এলাকা সুরক্ষিত করতে, যৌনতার আস্বাদ গ্রহণ করতে, এবং আহার গ্রহণ করতে। … কিন্তু তৃণদের দেখো, তাঁদের আহার লাভ করতে হয় ভূমির খনিজ থেকে, যা তাঁদের কাছে পরিশ্রমের কাজ হলেও, সংগ্রামের কাজ নয়, অর্থাৎ হয় সেই সামর্থ্য তার থাকবে নয় থাকবেনা। তাঁদের যৌন আকাঙ্ক্ষা সুতীব্র ভাবে থাকলেও, তার কনো বহিঃপ্রকাশ করা তাঁদের পক্ষে সম্ভবই নয়, তাই সেই বিষয়ে থাকে চরম বেদনা।
আর তাঁদেরকে সুতীব্র ভাবে এলাকা দখল করতে হয়, কারণ অজস্র বৃক্ষের যোনি অবস্থান করে, আর সকলে সকলের জমিকে অধিগ্রহণ করে নিতে চায়। তাই দেখো, যারা তৃণভোজী, তাঁদের সকলের মধ্যে এই এলাকা দখলের সংগ্রাম চূড়ান্ত ভাবে থাকে। তার সাথে থাকে যেই যৌন আকাঙ্ক্ষার পুড়ন করা তৃণদের সামর্থ্যের বাইরে বলে তাই নিয়ে তাঁদের তীব্র বেদনা, সেই যৌনতার বেদনা নিরাময়ের জন্য সমস্ত তৃণভোজীরা সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত। এমনকি তুমি দেখবে, তৃণভোজী বৈদিকরা অত্যন্ত অধিক ভাবে কামাতুর হন।
তাঁদের মধ্যে এতটাই সম্ভোগস্পৃহা থাকে যে, যার প্রতি তাঁরা সম্ভোগের দৃষ্টি রাখছেন, তিনি তাঁদের কন্যাতুল্যা নাকি মাতৃতুল্যা, সেই বোধও থাকেনা। আর আহারের প্রতি তাঁদের থাকে উদাসীনতা। … ফলত কি হয়? ফলস্বরূপ এই হয় যে, এই তৃণভোজীরা অত্যন্ত অলস হন, কেবল জমিদখল, অধিকার স্থাপনে মত্ত থাকেন, আর যৌনস্পৃহাতে দুশ্চরিত্র হতে থাকেন। বৈদিকদের দিকে তাকালেই, এই তিন দৃশ্য তোমাদের সম্মুখে সজল হয়ে উঠবে।
এবার তোমার প্রশ্নে আসি যে, কেন আত্ম এমন করে? শুধুই কি প্রকৃতির উপর জয়লাভই তার বাসনা নাকি অন্য কিছুও তার সাথে যুক্ত? … পুত্রী, এঁর উত্তর এই যে, আত্মের অর্থাৎ পরমাত্মের স্বভাব হলো এই যে সে নিজেকে ভগবান রূপে স্থাপিত করতে চায়, আর তার ধারণা তাঁর বশে সকলে থাকলে, তবেই সে ভগবান রূপে পূজিত হবে। আর তাই এই তৃণভোজের ভ্রম স্থাপন করে সে সকলের মধ্যে।
আলস্য, যৌনতার প্রতি অনিয়ন্ত্রণ, এবং আমিত্ব অর্থাৎ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, এই তিনই একটি মানুষের অন্তরে আমিত্বকে চরমে উন্নীত করে। অন্যদিকে, এই তিন বৃদ্ধি পাবার কারণে, কলার বিস্তার হ্রাস পায় অন্তরে, যদি না মাদক সেবন করেন পর্যাপ্ত পরিমাণে সেই ব্যক্তি। আর কলা যদি প্রসারিত হয়, তাহলে মানুষ ভেদভাব থেকে মুক্ত হয়ে, সত্যের সন্ধানী হয়ে ওঠে, যুক্তিবাদী হয়ে ওঠে, এবং জিজ্ঞাসার রচনা করে, তার উত্তর সন্ধান করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আর তেমন করলেই, পরমাত্ম জানে যে, তার সত্য সকলের সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়ে যাবে।
আর তাই সে কলার বিরোধী, যা মাসাহার বা মৎস্য আহারের সাথে সুতীব্র ভাবে বৃদ্ধি পায়। তাই সে সার্বিক ভাবে মাসাহার ও মৎস্যাহারকে বিরোধ করে, আর শাকাহারকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করতে চায়, যা মানুষের মধ্যে আত্মবোধকে চরমে উন্নীত করে, তাঁদেরকে আত্মের ভ্রমে আবদ্ধ করে। অর্থাৎ কেবল প্রকৃতির উপর জয়লাভের উদ্দেশ্যে নয়, সমস্ত মনুষ্যকে নিজের অধীনে রেখে, তাঁদের থেকে নিজের পূজা গ্রহণ করার লোভে, পরমাত্ম এই শাকাহের বিস্তার করতে চায়, যা পাচন করা অত্যন্ত কঠিন। আর সেই একই উদ্দেশ্যে মাসাহারের বিরোধ করে, কারণ মাসাহারের কারণে বিচারবুদ্ধির, জিজ্ঞাসার, অনুশীলনের, সত্যসন্ধানের এবং কলানিষ্ঠার বৃদ্ধি হয়, যাদের বৃদ্ধি হলে, পরমাত্ম নিজের প্রতিষ্ঠা, নিজের ভগবান হবার ভ্রমকে স্থাপন করা থেকে বিরত হয়ে যাবে”।
জয়া এবার বললেন, “এতো সার্বিক ভাবে ষড়যন্ত্র মা! … কিন্তু মা, এই সমস্ত জ্ঞান জীবের কাছে কোথায়? … পিতারা সর্বক্ষণ কৃতান্তিক সাম্রাজ্য স্থাপনের কথা বলেন। ঠিক আছে, আমার তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু মা, মানুষজনদের উপর যেমন করে বৈদিকধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তেমন করেই কৃতান্তিক চাপিয়ে দেওয়া তো সঠিক নয়। এর থেকে শ্রেয়, মানুষের মধ্যে সত্যজ্ঞানের বীজ অঙ্কুরিত করে, সেই বীজ থেকে বৃক্ষ স্থাপন করে, তাঁদেরকে উন্নত করে তোলা। একবার উন্নত হয়ে গেলে, সেই উন্নতভাবধারা যখন তাঁরা দেখবেন যে কৃতান্তিক ধর্মে বিরাজ করছে, তখন তারা স্বাভাবিক ভাবেই কৃতান্তিক ধর্ম ধারণ করবে।
অর্থাৎ মা, আমার ধারণা এই যে, একটি নির্দিষ্ট স্থান হওয়া উচিত, যার উদ্দেশ্যে কৃতান্তিকের প্রচার নয়, যার উদ্দেশ্য কৃতান্তিক স্থাপন নয়, যার উদ্দেশ্যে কেবল ও কেবল সত্যজ্ঞানের বিস্তার হবে। মানুষকে সত্য জ্ঞান দ্বারা সচেতন করাই হবে সেই প্রতিষ্ঠানের একমাত্র লক্ষ্য। সত্যের পবিত্রতায় তাঁদেরকে শুদ্ধ করে তোলাই হবে সেই প্রতিষ্ঠানের একমাত্র লক্ষ্য। এমন করা যায় না মা!”
দেবী শ্রী মিষ্ট হেসে বললেন, “বেশ তো, তুমি আছো বিজয়া রয়েছে, আমার আরো দুটি পুত্র আছে, আর এই খানে তো আরো আমার ১৫টি সন্তান রয়েছে। সকলে মিলে সেই প্রতিষ্ঠান করো না, বড়ই উত্তম প্রস্তাব তা”।
দেবী শুদ্ধা বললেন, “কি নাম হবে এই প্রতিষ্ঠানের মা?”
জয়া উত্তরে বললেন, “আমাদের মায়ের নামেই সেই ধাম হবে। আমাদের মা, শ্রী, তাই সেই ধাম হবে শ্রীপুর। … মানুষের মনের অজ্ঞানতা দূর করে, তাঁদের অন্তরে সত্যের আলোক স্থাপনই তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হবে। তাতে কৃতান্তিক ধর্ম স্থাপিত হলে খুবই ভালো, আর যদি তা না হয়ে সেই জ্ঞানী মানুষরা মিলে আরো কনো অন্য ধর্ম নির্মাণ করে, তারই স্থাপনা করে, তাতেই বা অসুবিধা কি? সত্য জ্ঞানের প্রয়োজন, আমাদের মাকে চেনার প্রয়োজন। প্রকৃতিকে, নিয়তিকে চেনা, গ্রহণ করার প্রয়োজন। তা সেই সমস্ত প্রয়োজন মিটিয়ে কেউ যদি কৃতান্তিক ছাড়া অন্য কনো নামকরণ করতে ইচ্ছুক হয়, তাতেও তো আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয়, তাই না!”
সকলে একত্রে বলে উঠলেন, “বড়ই উচ্চ বিচার। হ্যাঁ ঠিকই তো, নামে কিই বা এসে যায়, সত্যজ্ঞানই সব, আমাদের মাকে ঠিক ঠিক ভাবে জানা ও চেনাই সব। এর অতিরিক্ত তো কিছুরই প্রয়োজন নেই, তাই না!”
দেবী শ্রী একটি কথাও বললেন না, কেবলই মুচকি হাসলেন এই সকল কথাতে, কারণ এই কর্মকাণ্ডই তো তাঁর এই লীলার উদ্দেশ্যে ছিল, আর সেই উদ্দেশ্যই পূর্ণ হতে চলেছে। এবার সম্মুখে সকলে তাকিয়ে ধুয়া ধুয়া দেখলে, বললেন, “মা, সম্মুখে দেখো, ধুয়া উঠছে কি বিস্তর ভাবে! … কি হয়েছে সেখানে?”
দেবী শ্রী বললেন, “পুত্ররা, সম্মুখের শহরটির নাম চন্দননগর। আর এই যে ধুয়া দেখছো, তার কারণ হলো, করিন্দ্র আক্রমণ করে চন্দননগরের গরিমা, গর্ব, তথা সুরক্ষাকবচ, তাদের দুর্গকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আর আরো বড় কথা এই যে, এক্ষণে তাঁর বিশাল সেনা জাহাজে চেপে কাতা রাজ্য থেকে এদিকে রওনা দিয়েছে, চন্দননগরকে লুণ্ঠন করে সর্বস্বান্ত করবে বলে”।
তন্ত্রসন্তানরা এবার একত্রে বললেন, “মা, তুমি আমাদের তোমার স্তনপান করিয়ে, অনন্ত শক্তি প্রদান করেছ। সেই শক্তি থাকতে, এই বর্বরদের এই অদ্ভুতদিব্য শহরের নাশ করতে দেবনা। এই শহর তোমার শহর। তুমি এখানে জগদ্ধাত্রী নামে নিবাস করো, আর তাতেই তাঁদের আপত্তি। … তাঁদের যুদ্ধ জাহাজ জগদ্ধাত্রীর এই কিনারা পর্যন্ত উপস্থিত হতে পারবেনা। আজ জগদ্ধাত্রী নদী, এই চন্দননগর শহরেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। প্রয়োজনে এই নদীর নাম পরিবর্তিত হয়ে যাক, কিন্তু এই জগদ্ধাত্রীনগরে কিছুতেই আত্মের বাহিনী উপস্থিত হতে পারবেনা। … মা আমাদের আদেশ দাও, আর অনুমতি দাও, এর প্রতিকার করি আমরা”।
দেবী জয়া বললেন, “কিন্তু জগদ্ধাত্রী নদীর কনো ক্ষতি করো না, ভ্রাতারা! … তিনি যে সাখ্যাত আমাদের মা। সাখ্যাত আমাদের শ্রীমা তিনি”।
সুনীল বললেন, “নিশ্চিন্তে থাকো ভগিনী। মাতা জগদ্ধাত্রীকে আমরা কিছুতেই কলুষিত হতে দেবনা। আমাদের প্রাণ থাকতে তা কিছুতেই হবেনা”।
এবার দেবী শ্রী অনুমতি প্রদান করলে, তন্ত্র কন্যারা নিজেদের পৃষ্ঠ থেকে জয়াবিজয়াকে অবতরণ করিয়ে এগিয়ে গিয়ে, নদীউপকুলে স্থিত হয়ে, মাতা জগদ্ধাত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন, “মা, আমাদের ভ্রাতারা ভাগীরথীর জল শুকিয়ে দিতে চলেছে। কৃপা করে, তুমি আমাদের আচলে অবস্থান করো। মা, তুমি অনন্ত, অসীম। তুমি যদি কৃপা ও করুণা করো, তবেই তোমাকে কনো স্থানে আবদ্ধ করা সম্ভব। তাই মা, কৃপা করো তোমার এই কন্যাদের প্রতি। তাঁদের আঁচলকে সিক্ত করে, তুমি অবস্থান করো, আর আমাদের ভ্রাতাদের অনুমতি দাও, ভাগীরথীর জলকে আটকে রেখে, করিন্দ্রদের জাহাজকে অগ্রসর হওয়া থেকে অবরুদ্ধ করতে”।
মাতা জগদ্ধাত্রী এবার সকলের সম্মুখে তাঁর বিশালাকায় তনুধারণ করে উদিত হলে, দুর্গনাশে সহস্র আহত চন্দননগর বাসী, যাদের শ্রীপুত্র জয় ও বিজয় রাজা করিমুণ্ডের সাথে মিলিত হয়ে সেবা করছিলেন, তাঁরা অসুস্থ শরীরে কনোক্রমে উঠে বসে, মাতার অভূতপূর্ব শ্রীমুখ দর্শন করে, পুনঃপুন প্রণাম করে করে, তাঁর ছবিকে নিজেদের হৃদয়ে ধারণ করে রাখার আপ্রাণ প্রয়াস করলেন।
সেই দেখে আপ্লুত মাতা জগদ্ধাত্রী তৃপ্ত হয়ে বললেন, “তোমাদের সকলের স্নেহ লাভ করে আমি যতটা না জননী বেশে তৃপ্ত, তার থেকে অধিক কন্যাবেশে তৃপ্ত। তাই আমি তোমাদের সকলকে বরদান প্রদান করছি। যারা যারা এই চন্দননগর ভূমিকে প্রাণদিয়ে প্রেম করবে, তাদেরকে মোক্ষলাভ পর্যন্ত অন্যত্র কনো স্থানে জন্ম নিতে হবেনা। আর তারা সর্বদাই আমার এই মুখছবিকে হৃদয়ে ধারণ করে করে, আমার আরাধনা করবে, আর যখন তাঁদের এই ভক্তি চরমে উন্নীত হবে, আমি তাঁদের এই শহরে আমার সর্বোত্তম রূপ প্রকাশিত করবো, যাকে সকলে রাণীমা নামে অবিহিত করবে।
যবে আমার এই রাণীমা রূপ প্রকাশিত হবে, সেদিন থেকে আমার সেইরূপই হয়ে উঠবে সমস্ত চন্দননগরের রক্ষক আর সকলের স্নেহের জননী। সেদিন থেকে আমার সেই রাণীমা মূর্তিই হয়ে উঠবে, সকল চন্দননগরবাসীর হৃদয়ের মা, হৃদয়ের কন্যা, হৃদয়ের প্রেম”।
এবার তন্ত্রকন্যাদের দিকে তাকিয়ে মাতা জগদ্ধাত্রী বললেন, “আমি তোমাদের অঞ্চলেই স্থাপিত হলাম পুত্রী আজ থেকে। আর এবার থেকে আমাকে আর কেউ নদী নামে চিনবেনা। আর আমি তোমাদের আঁচলে থেকে, তোমাদের সাথেই যাত্রা করবো। তাই তোমরা যেখানে তোমাদের এই আঁচল স্থাপন করবে, সেখানেই অবস্থান করবো, আর সেটিই হবে তোমাদের শ্রীপুরের ভূমি”।
তন্ত্রকন্যারা করজোড়ে প্রশ্ন করলেন, “মা, তোমার অনন্ত কৃপা মা। আর একটু সাহায্য করে দাও আমাদেরকে। কৃপা করে এটি বলে দাও যে, আমাদের এই অঞ্চল কোনস্থানে স্থাপিত করবো?”
মাতা জগদ্ধাত্রী হাস্যমুখে বললেন, “আজ রাত্রে তোমরা নিদ্রাতে থাকার কালে, আমি তোমাদের সেই স্থানের চিত্র প্রদর্শন করবো। তোমাদের মাতা, আমারও মাতা, দেবী শ্রীর সাথে ভ্রমণ করবে এরপর, যতক্ষণ না সেই স্থানকে দেখতে পাবে ততক্ষণ। সেই স্থান যখন দেখতে পেয়ে যাবে, সেখানেই তোমাদের শ্রীপুর স্থাপিত করবে। সেটিই হবে, দেবী শ্রীর ক্ষেত্র, আর সেই স্থানই হবে তাঁর লীলার উৎসস্থল এবং তাঁর লীলার অন্তের ক্ষেত্র”।
এত বলে, মাতা জগদ্ধাত্রী তন্ত্রকন্যাদের ক্রোরের আঁচলে স্থাপিত হয়ে তাঁদের আঁচলকে পূর্ণ ভাবে সিক্ত করে তুললে, তন্ত্রপুত্ররা, একটি একটি করে কুশ ধারণ করে, নিজেদের পূর্ণ একাগ্রতা সেই কুশে স্থাপিত করে, নিক্ষেপ করলেন তাঁদেরকে কাতা রাজ্যের দিশাতে, অর্থাৎ সাগরদ্বিপের দিকে।
