জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

যোজনা অনুসার, জয়াবিজয়া তাঁদের যাত্রায় নির্গত হলেন। তাঁদের সঙ্গে রইল ১০টি পংরাজ্যের যোদ্ধা, যারা যুদ্ধে অত্যন্ত পারদর্শী এবং সাথে সাথে জয়াবিজয়ার প্রতি স্নেহশীলও। সহিষ্ণু রাজ্যে গমন করতে, রাজা সহিষ্ণুর থেকে আরো ১০ যুদ্ধপটু সেনা নিযুক্ত হলেন জয়াবিজয়ার সাথে। আর এই ২০ সেনা মিলে, জয়াবিজয়াকে গঙ্গার তট পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন।

বিশাল গঙ্গাকে কোনাকুনি অতিক্রম করতে হবে ডিঙ্গি ধারণ করে। তবেই রাজশাহীর তীরবর্তী অঞ্চলে পৌছাতে পারবে জয়াবিজয়া। সেই তীরে অবস্থান করছে সুর, তাঁর আদরের ভাইঝিদের সাথে সাখ্যাতে যিনি লালায়িত। তাই সেনা সকল লেগে পরলেন, শক্তপোক্ত ডিঙ্গি নির্মাণের কাজে।

তাঁরা, বিশেষ করে সহিষ্ণু সেনারা এই পরিস্থিতির সম্বন্ধে পূর্ণ ভাবে ওয়াকিবহল ও পটু। আর তাই তাঁরাই এই কর্মে মুখ্যভূমিকা নিলেন, আর পংসেনারা তাঁদের সঙ্গ দিলেন। কিন্তু যেই বিষয়ে তাঁরা ওয়াকিবহল ছিলেন না, তা হলো কোচি রাজ্যের হস্তক্ষেপ।

কোচি রাজ্যে সেই সময়ে অবস্থান করছিলেন ভণ্ড, যিনি করিন্দ্র ও সমূহরা ছায়াপুর স্থাপন ও বিস্তারে থাকাকালীন এক অন্য কর্মে নিজেকে নিবিষ্ট করে নিয়েছিলেন। বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে, ভণ্ড সুন্দরী যুবতীদের সন্ধান করতেন। প্রথমে তাঁদের সম্ভোগ করতেন স্বয়ং, আর অতঃপরে তাঁদেরকে করিন্দ্রের কাছে হস্তান্তর করতেন। করিন্দ্র এঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সুন্দরীদের নিজের কাছে রাখতেন।

যাদের অঙ্গগন্ধ তাঁর পছন্দ হতো না, রূপ পছন্দ হলেও, তাঁদেরকে বিক্রয় করে দিতেন ধনের পরিবর্তে তাঁরই মিত্র রাজ্যের রাজেন্যবর্গের কাছে, আর যাদের রূপ নিজের কাছে মনোলোভা লাগতো না, অথচ তাঁদের অঙ্গগন্ধ পছন্দ হতো, তাঁদেরকে নিজের ভ্রাতাদের কাছে দান করতেন, আর এই ভাবে সমস্ত জম্বুদেশের সমস্ত সুন্দরীদের সম্ভোগ করে ফিরতেন করিন্দ্র ও তাঁর পলটন।

সেই কাজেই নিয়জিত ছিলেন ভণ্ড আর সেই কাজে সেই কালে অবস্থান করছিলেন তিনি কোচিরাজ্যে। যেইকালে জয়াবিজয়া গঙ্গাতটে স্থিত হয়ে তাঁদের শ্রীমায়ের সাথে মিলনের ক্ষণকে নিয়ে আলোচনা করছিলেন, সেই কালে ভণ্ডও নিজের এক ছোট্ট টুকরি সেনা নিয়ে, মালদরাজ্যে যাচ্ছিলেন, সেখানের সুন্দরী বামাদের হরণ করে, সম্ভোগ করে, বিক্রয় করার মনসা নিয়ে। তাই পথে তাঁর এই দুই সুন্দরী সদ্যপরিণীতা যুবতী, জয়াবিজয়ার সাথে সাখ্যাত হয়।

জয়া সেই কালে বিজয়ার উদ্দেশ্যে বলছিলেন, “সেই ছোট্ট বয়সে যখন মায়ের থেকে আর দিদার থেকে শ্রীমায়ের কথা শুনেছি, সেদিন থেকে মনে সাধ, তাঁর ক্রোড়ে মাথা রেখে নিদ্রা যাবো, তাঁকে আলিঙ্গন করে, তাঁর অঙ্গের অদ্ভুত সিউলিফুলের গন্ধ সেবন করতে করতে তাতে বিভোর হয়ে যাবো। … জানিস বিজয়া, রাত্রের দিকে তাঁর অঙ্গ থেকে নাকি রজনীগন্ধার সুগন্ধ পরিবেশিত হয়। ভাবতে পারছিস বিজয়া, তিনি কতটা পবিত্র হলে, এমন হতে পারেন!”

বিজয়া হেসে বললেন, “আমি কাকাশ্রী সুরের কথাও শুনেছি। পুরুষ দেহধারি অথচ তাঁর অঙ্গে লেশমাত্র পুরুষালি গন্ধ নেই। মহাবলবান, এবং ভয়ানক যোদ্ধা, অথচ তাঁর অঙ্গ স্ত্রীদের ন্যায় কোমল। আহা, ভাবো দিদি, শ্রীমায়ের ও কাকাশ্রীর মিলন হলে, তাঁদের সন্তান কি পরিমাণই না সুন্দর হতেন, তাই না!”

জয়া উত্তরে বললেন, “কি বলতো বিজয়া, মানুষে মানুষে সঙ্গম হয়, মিলন হয়, কিন্তু পুষ্পদের মধ্যে মিলনের জন্য ভ্রমরের প্রয়োজন, প্রজাপতির প্রয়োজন। আসলে তাঁরা এতটাই পবিত্র যে, তাঁদের মধ্যে যৌনভাবনাই আসতে পারেনা। হতো জানিস, যদি আমি বা তুই না থাকতাম, বা আমাদের পিতারা না থাকতেন। মানে, যদি নিরুপায় হতেন তাঁরা, বংশধর প্রদান করা তাঁদের কর্তব্য হতো, তবেই তাঁদের যৌনমিলন হতো। নয়তো, তাঁরা যেই ধারার পবিত্রতা ধারণ করেন, তাঁদের কাছে যৌনমিলন অত্যন্ত পীড়ার বিষয় হয়ে যায়, জানিস!”

বিজয়া বললেন, “আচ্ছা দিদি, তুমি বিবাহ করবেনা কনো পুরুষকে?”

জয়া হেসে বললেন, “সে তো শ্রীমাই সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি যদি আমাকে তাঁর থেকে ঈষৎ দূরে সরিয়ে রাখতে চান, তাহলে নিশ্চয়ই বিবাহ দেবেন। আমি কি তাঁর ন্যায় পবিত্র যে, আমার মধ্যে যৌনভাবনার লেশও থাকবে না! … যদি আমাকে প্রশ্ন করিস, তাহলে আমি তো তাঁর গন্ধেই মেতে থাকতে চাই। মাঝে মাঝে তো ইচ্ছা হয়, আমি আমার রূপ পালটেনি, যাতে আমাকে যারা ইতিমধ্যে চেনে, তাঁরা কেউ আর চিনতে না পারুক। আর সেই নতুন রূপ নিয়ে, রাজকন্যার বেশ ত্যাগ করে, চিরকালের জন্য শ্রীমায়ের দাসী হয়ে যাই। সর্বক্ষণ তাঁরই সেবা করি।

আসলে ভয় হয় জানিস, স্বামী কে হবে! তাঁর কৃতান্তিকদের প্রতি কেমন দৃষ্টি থাকবে! আর তাঁর যৌনক্ষুধা কতটা থাকবে! এই সমস্ত নিয়ে ভাবলেই ভয়ে আমার দেহ হিম হয়ে যায়। … তাঁর যৌনক্ষুধা এমন হবে না তো যে, তাঁর যৌনক্ষুধার নিবারণ করতে গিয়ে, আমিও অপবিত্র হয়ে উঠে, শ্রীমায়ের সেবা করা থেকে চ্যুত হয়ে যাবো! সেই প্রকার অপবিত্র হয়ে উঠলে, কি ভাবে তাঁর শ্রীঅঙ্গকে স্পর্শ করবো বলতো! … তাঁকে কি ভাবে অপবিত্র করে দেব!”

বিজয়া বললেন, “জানো দিদি, আমার মা বলেন, মানে তিনি তো শ্রীমাকে শিশুকাল থেকে দেখভাল করেছেন, তাই তিনি বলেন, শ্রীমায়ের নাকি পবিত্র-অপবিত্রের কনো বিচার নেই। … রাজা নিষ্ঠাবানের রাজশাহী রাজ্যের একদাম অন্তে একটি কুটির ছিল। সেখানে একটি বেশ্যা বাস করতেন। রাজা নিষ্ঠাবান সেই বেশ্যাকে থাকতে দিয়েছিলেন, কারণ তাঁর উপস্থিতির কারণে যেই পুরুষদের অন্তরে যৌনক্ষুধা কুমিরের মত হিংস্ররূপ ধারণ করে থাকতো, তাঁদের থেকে তাঁদের পত্নীদের এই বেশ্যাই সুরক্ষিত করতো।

মা বলেন, একবার যখন শ্রীমা যুবতী হয়েছিলেন, তিনি তখন এই বেশ্যা, দেবী গোধূলির কাছে থেকে, তাঁর সাথে সারাদিন থাকার বায়না করেন। সেই কারণে, দেবী গোধূলি, সেদিনকে তাঁর দ্বার বন্ধ করে রেখেছিলেন যাতে কনো পুরুষ সেদিন তাঁর কাছে প্রবেশ না করতে পারে, আর সারাদিন হরেক রকম আহার ব্যঞ্জন প্রস্তুত করে শ্রীমাকে আহার করিয়েছিলেন। মায়ের থেকে শুনেছি, শ্রীমা নাকি নিজের হাতে একটি গ্রাসও গ্রহণ করেননি সেদিন। প্রতিটি গ্রাস দেবী গোধূলির থেকে গ্রহণ করেছিলেন”।

জয়া বিস্মিত হয়ে বললেন, “এত পতিতার প্রতি এমন স্নেহ কেন?”

বিজয়া বললেন, “মা এই একই প্রশ্ন শ্রীমাকে করেছিলেন, এই ঘটনার পরে। উত্তরে শ্রীমা মাকে বলেছিলেন, সেই স্ত্রীকে এক মাতার চার ভ্রাতা বিবাহ করেছিলেন, যখন তিনি কিশোরী ছিলেন। মাতা সর্বাম্বার একটি মূর্তি থাকতো তাঁর কাছে। সেই মূর্তি নিয়ে তিনি অবস্থান করলে, স্বামীরা তাঁর উপর ক্রোধিত হতেন। অতঃপরে চারস্বামীই যখন তাঁর সুন্দরীতনুকে একপ্রকার ভক্ষণ করা শুরু করেন, তখন থেকে দেবী গোধূলি কেবলই সেই মূর্তিকে দেখতেন, আর স্পর্শ করতেন না, কারণ এই চার স্বামীর তাঁকে আহার করে করে নিজেদের ক্ষুধা শান্ত করার কারণে, তাঁর নিজের মধ্যেও যেই যৌনমিলনের প্রতি আসক্তি এসে গেছিল, তার কারণে তিনি নিজের দৃষ্টিতেই নিজে পতিতা হয়ে গেছিলেন।

একদিন তাঁর স্বামীরা আর তাঁকে আকর্ষণীয় অবুভব করেনা। সাথে সাথে সে কিছুতেই গর্ভবতীও হচ্ছিল না। তাই তাঁর স্বামীরা তাঁকে ত্যাগ দিয়ে দেয়। … কিন্তু তাঁর শাশুড়িমায়ের তাঁর প্রতি দয়া হয়। তাই সেই অট্টালিকা পুত্রবধূর নামে লিখে দিয়ে, পুত্রদের অন্য একটি অট্টালিকা নির্মাণ করে, সেখানে প্রেরণ করে দেন। … কিন্তু এরপরেও, কিশোরী গোধূলি প্রায় নিত্য কাম-পিষ্ট হয়ে হয়ে কামগন্ধের প্রতি তাঁর নেশা জন্ম নেয়। আর তখন রাজা নিষ্ঠাবান সেই রাজশাহীর রাজা রূপে অধিষ্ঠান করেছিলেন। তাই মহারাজের কাছে তিনি গিয়ে নিজের সমস্যা বলেন।

মহারাজকে তিনি বলেন যে, তাঁর এই চার স্বামী তাঁকে কেবল দৈহিক ভাবে নয়, তাঁর অন্তরমনকেও যৌননেশায় আবৃত করার মাধ্যম হয়েছেন, আর তাই তিনি আজ অন্তরমন থেকে পতিতা। … তাঁর জন্য কি বিধান। রাজা নিষ্ঠাবান সেই স্ত্রী, দেবী গোধূলির মধ্যে এক পবিত্রাস্ত্রীকে দেখেন, যিনি স্বকন্ঠে ঘোষণা করতে কুণ্ঠিত নন যে তিনি পতিতা, তবে তাঁর সাধারণ সমাজে থাকা উচিত নয়, কারণ তিনি এতটাই যৌননেশায় আক্রান্ত যে, সাধারণ সমাজে তিনি থাকলে, সেখানের মানুষের স্বভাব নষ্ট হয়ে যাবে।

এমন সরল অকপট মানসিকতা দেখে, এবং পরিস্থিতির শিকার রূপে দেবী গোধূলিকে দেখে, রাজা নিষ্ঠাবান কিছুতেই তাঁকে রাজ্যের থেকে মুক্ত করে, তাঁকে রাজ্যছাড়া করতে চাননি। সেই স্ত্রীর প্রতি রাজা নিষ্ঠাবানের করুণা জাগে, এবং তাই তিনি বিধান দেন যে, তিনি বেশ্যা হয়ে তাঁরই রাজ্যে নিবাস করবেন, আর যেই যেই পুরুষরা নিজেদের যৌনজ্বালায় অস্থির, তাঁদেরকে তিনি ততদিন যৌনসুখ প্রদান করে করে, তাঁদের স্ত্রীদেরকে স্বামীদের এই যৌননিপীড়ন থেকে মুক্ত করবেন, যতদিন তিনি এই কর্ম থেকে মুক্ত হতে না চান।

দিদি, শ্রীমা আমার মাকে বলেছিলেন, অন্তর থেকে সম্পূর্ণ ভাবে পবিত্র এই স্ত্রী, পূর্ণ ভাবে মাতা সর্বাম্বার প্রতি সমর্পিতা, তাই তিনি কিছুতেই একটিবারের জন্যও মাতার মূর্তিকে হাত লাগাননি, নিজেকে পতিতা জ্ঞান করে। তাই তিনি তাঁর কাছে একটিদিন থাকতে গেছিলেন, তাঁকে বলতে যে তিনি পতিতা নন। তিনি উদার, তিনি একজন স্নেহশীলা জননীকে আঁকড়ে ধরে রয়েছেন নিজের হৃদয়ে। মাতা সর্বাম্বা তাঁর মাতা নন, তাঁর পবিত্র ভাবনার কন্যা হয়ে বিরাজ করতে চান।

জানো দিদি, এই ঘটনার কিছুদিন পর পর্যন্ত দেবী গোধূলি নিজের কক্ষে কনো পুরুষকে প্রবেশ করতে দেন নি। অতঃপরে তিনি মহারাজের কাছে এসে বলেন, “মহারাজ, আমি বৃথাই নিজেকে পতিতা ভেবে ভেবে, নিজেকে সত্যই পতিতা করে দিয়েছিলাম। আমার শ্রী আমার কাছে এসে, আমাকে স্পর্শ করে, আমাকে বলে দিয়ে গেছে যে আমি পবিত্রই ছিলাম, কারণ আমার অন্তরমন মাতা সর্বাম্বাতে গত ছিল। … মহারাজ, আর আমি নিজের এই রূপকে সহ্য করতে পারছিনা। …

অসহ্য লাগছে এই রূপ আমার কাছে। … ঘৃণা হচ্ছে নিজেকে যে, নিজেকে পতিতা জ্ঞান করে করে, আমি আমার মাতার মূর্তিকে এতকাল স্পর্শ পর্যন্ত করলাম না! … তিনি শুকিয়ে রইলেন !… মহারাজ নিয়তি সঠিক করেছে আমাকে গর্ভধারিণী না করে, আমি তো মা হবার যোগ্যই নই। … নিজে পতিতা হই আর না হই, নিজের কন্যাকে স্পর্শ করবো না আমি! … নিজের কন্যাকে অভুক্ত রাখবো আমি! কেমন মা আমি! … না মহারাজ, এবার আমাকে অনুমিতি প্রদান করুন, আমি এই দেহকে বিশ্রী দণ্ড প্রদান করে ত্যাগ করতে চাই। যেই অপরাধ আমি আমার কন্যার সাথে করেছি, তার বোধ হৃদয়ে ধারণ করে নিজেকে মৃত্যু দিতে চাই মহারাজ”।

জানো দিদি, মহারাজ নিষ্ঠাবান এই ঘটনাতে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি আমাদের শ্রীমায়ের কাছে গিয়ে ক্রন্দন করে দেবী গোধূলিকে উদ্ধার করার উপায় জানতে চেয়েছিলেন। সেই রাত্রে শ্রীমা পুনরায় গেছিলেন দেবী গোধূলির কাছে। পরের দিন তাঁর শবদেহ লাভ করে সকলে, আর সেই শব দেহের থেকে দেবী শ্রীকে সরিয়ে নিয়ে আসেন। কারণ রাত্রে, দেবী শ্রীকে নিজের ক্রোড়ে স্থাপন করে, তাঁর মস্তককে স্নেহ করতে করতেই, তিনি দেহত্যাগ করেন। আমাদের শ্রীমা তাঁকে নির্মম ভাবে নিজের হত্যা করতে দেননি, বরং এক কন্যাকে স্নেহ করতে করতেই তাঁকে দেহত্যাগ করান”।

দেবী জয়া আনন্দিত হয়ে সেই কথা শুনে, নেত্রের অশ্রু মুছে হেসে বললেন, “আমাদের শ্রীমা কেমন দেখলি! তিনি কখনোই পবিত্র নন, যিনি নিজেকে পবিত্র রূপে ধরে রাখতে ব্যস্ত থাকেন, যেমন আমি। পবিত্র আমাদের শ্রীমা, যিনি অন্যের অন্তরে লুকিয়ে থাকা পবিত্রতাকে উন্মুক্ত করেন। সেই কারণেই তো তিনি শ্রীমা”।

এত পর্যন্ত কথা বলার পর, একটি বিশাল মৎস্য ধরার জাল জয়া ও বিজয়াকে বন্দী করে নেয়। সেই দেখে, পং ও ভ্রমরীপ্রদেশের সেনারা আক্রমণ করতে এলে, সরাসরি বাণে মূর্ছা প্রদান করেন তাঁদেরকে ভণ্ড, এবং দুই রাজকন্যাকে, তাঁদের প্রকৃত পরিচয় না জেনেই, উঠিয়ে নিয়ে যায়।

জালের মধ্যে থেকেই যুদ্ধকৌশল জানা দুই রাজকন্যা আপ্রাণ প্রয়াস করেন নিজেদের মুক্ত করতে। তাই তাঁদের ছটফটানি দেখে, ভণ্ড আরো একটি বাণে, তাঁদেরকে মূর্ছাপ্রদান করে, উঠিয়ে নিয়ে যাবার আদেশ দেন সেনাকে।

যখন জয়াবিজয়ার জ্ঞান ফিরে আসে পুনরায়, তখন তাঁরা দেখেন যে, তিনটি বৃক্ষে, তাঁদের হস্তকে বেঁধে, পাশাপাশি রাখা রয়েছে। আরো নিরীক্ষণ করে দেখতে দেখে, তাঁদের অঙ্গে কেবলই একটি বস্ত্র রয়েছে, অর্থাৎ শাড়ীর নিম্নে ধারণ করা ঊর্ধ্বাঙ্গের জামার প্রায় অনেকটাই ছিন্ন, যা কেবলই একটি হস্তটানের অপেক্ষায় রয়েছে, তাঁদের অঙ্গ থেকে খসে যাবার জন্য।

সম্মুখে তাকিয়ে দেখলেন, এক প্রাপ্তবয়স্ক বলবান পুরুষ দণ্ডায়মান হয়ে নিজের সঙ্গীদের সাথে সুরাপান করছেন। দুই রাজকন্যার সংজ্ঞা ফিরে আসার সংবাদ লাভ করে, তাঁদের দিকে ফিরে তাকিয়ে একটি খলহাস্য প্রদান করে, সেই বলবান পুরুষ বললেন, “কে বলতো তোমরা! … এমন মসৃণ ত্বক, এমন কোমল হস্তচরণ, আর এমন সুন্দর স্বর্ণ রজতের মত অঙ্গের বর্ণ, তার সাথে এমন সুন্দর রূপ। … দেখে মনে হয় যেন কনো রাজকন্যা!”

সুরার পাত্র হাতে ধরে, ঈষৎ টলমল করতে করতে জয়াবিজয়ার সম্মুখে এসে সেই বলবান পুরুষ পুনরায় বললেন, “তোমাদের অঙ্গেও কনো দুর্গন্ধ নেই। এত ধস্তাধস্তিতেও তেমন দুর্গন্ধ ছরালো না, তাই মনে হলো যেন তোমরা কনো রাজকন্যা নয়তো!”

নেশার ঘোরেই বিদ্রূপের হাস্য হেসে পুনরায় বলল সে, “তবে রাজকন্যা হলেই বা কি এসে যায়! … আচ্ছা একটা কথা বলো আমাকে, কচিন্দ্র কেউ হয়না তো তোমাদের! … না মানে তাঁরই রাজ্যের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে ছিলে তো তোমরা, তাই প্রশ্ন করে নিচ্ছি একবার আরকি। … আসলে কি বলোতো! সে আমাদের মিত্র রাজা তো। তাঁর কন্যাদের কিছু হয়ে গেলে না একটা বিশাল ব্যাপার হয়ে যাবে। … তাই মামনিরা একটু মুখ ফসকে বলে ফেলো দেখি… তোমরা কচিন্দ্রের কেউ হওনা তো!”

জয়া মুখ গম্ভীর করে থাকলেও, বিজয়া উত্তেজনার বশে বলে ফেললেন, “ওই ধূর্ত রাজা কচিন্দ্রকে সম্মুখে পেলে, ওর ছাতি চিড়ে লহু দ্বারা রঙ্গোলী উৎসব করবো আমরা”।

ভণ্ড সেই কথাতে মুখবিকৃত করে হেসে উঠে বললেন, “বাস বাস, আর কিছু জানার নেই মামনিরা। … এই কোথায় কে আছিস, এই মামনিদের ভালো করে আহার করিয়ে দে। নেশার ঘোর কাটলে, এঁদেরকে সম্ভোগ করে বেশ সুখ লাভ হবে। তারপর এঁদেরকে সম্রাটের হাতে তুলে দেব। স্থির বিশ্বাস, এমন রূপসীদের সম্রাট নিজের কাছেই রাখবে, নিত্যরমণসঙ্গিনী করে। … ওরে ওই মেয়ে, … তোদের তো ভাগ্য খুলে গেল, এমন রূপ পেয়ে। এবার থেকে, তোরা সম্রাটের শয্যাসঙ্গিনী হয়ে থাকবি। বুঝতে পারছিস! যতদিন যৌবন আছে, ততদিন ধনেধান্যে ভরে থাকবি। সম্রাট খুব দয়ালু। তোদের যৌবন চলে গেলেও তারিয়ে দেবেনা। বরং ভালো রাজকীয় খাবার, সুরা, আর প্রাসাদে রেখে দেবে”।

সেনার উদ্দেশ্যে বললেন ভণ্ড, “এই … এঁদেরকে ভালো করে আহার করা বুঝলি। … সম্ভোগ করার সময়ে যেন, আমার দেহভারে মূর্ছা না যায়, দেখিস”।

এতবলে সেখান থেকে প্রস্থান করলো ভণ্ড, আর সেনা তাঁদের কাছে আসার প্রয়াস করলে, জয়া ও বিজয়া আপ্রাণ প্রয়াস করতে থাকে, নিজেদের হস্তবন্ধন ছাড়ানোর, কিন্তু কিছুতেই তা করতে পারেন না। … সেনা সমানে তাঁদের কাছে আসতে থাকে, আর নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করতে থাকে, “সম্ভোগ তো করতে পারবো না এই দুই সুন্দরীকে, কিন্তু আহার করানোর কালে, একটু অঙ্গে অঙ্গে মর্দন তো নিশ্চিত ভাবেই করতে পারবো। তাতেই যা সুখ পাবো, তাই দিয়েই আমাদের হয়ে যাবে”।

সেনার মুখে এমন অর্বাচীন মন্তব্য শুনে, তটস্থ দুই রাজকন্যা বারংবার নিজেদের হস্তবন্ধন খোলার প্রয়াস করতে থাকে, কিন্তু ব্যর্থই হয়। এরই মধ্যে তাঁদের যেন মনে হয় সেনা আর তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছেনা। এক স্থানে দাঁড়িয়ে গেছে। আর তাঁদের হস্তবন্ধনও যেন আপনাআপনি খুলে যাচ্ছে। কি হচ্ছে বুঝতে না পেরে, বামপার্শ্বে ও ডানপার্শ্বে তাকালে, জয়াবিজয়া এক অপরূপা সুন্দরী শ্বেত বর্ণা, গোলাপি আভাযুক্তা অতি সাধারণ বস্ত্রধারি বিবাহিতা স্ত্রীকে দেখলেন, যিনি তাঁদের হস্ত বন্ধন খুলে দিচ্ছেন।

হতচকিত হয়ে গেলেন জয়াবিজয়া। এই জনমানবশূন্য অঞ্চলে, এমন রূপসী স্ত্রী কোথা থেকে এলেন! … কে এই দিব্যরূপধারিণী স্ত্রী! … সম্মুখে তাঁর এমন সশস্ত্র সেনা থাকতেও, তিনি এমন অনায়স বন্ধন খুলছেন কি করে! … ইনার কি কনো ভয় লাগছে না! … কেন ইনি নিজের প্রাণকে সঙ্কটে স্থাপিত করেছেন! … কে এই সুন্দরী স্ত্রী? তাঁরা কি এঁর আগে ইনাকে দেখেছেন! … না, ইনি তো অপরিচিত কেউ? না ইনি পংরাজ্যের কেউ, আর না ভ্রমরীপ্রদেশের কেউ। তাহলে ইনি এমন বেপরোয়া হয়ে আমাদের হস্তবন্ধন খুলছেন কেন?  ইনার রূপ তো অদ্বিতিয়ম। ইনার যৌবনও। ইনার রূপ দেখার পর তো, সেনা আমাদের দিকে তাকাতেই পারছেনা। যেন ইনার রূপেই মজে গেছে। অর্থাৎ ইনি নিজের প্রাণ ও সম্মান সঙ্কটের মধ্যে স্থাপিত করে দিয়েছেন! কিন্তু কেন?

সেনা কিছুক্ষণ সেই স্ত্রীর রূপে এমনই বিভোর হয়ে গেলেন যে, কি করছেন সেই স্ত্রী, আর কি হচ্ছে সেই স্থানে, তা ভুলেই গেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই যখন তাঁদের হুঁশ ফিরে আসে, তখন তাঁরা দেখেন যে সেই অপরূপা স্ত্রী এই দুই কন্যার হস্তবন্ধন প্রায় খুলেই দিয়েছেন। তাই এবার তাঁরা আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করে সেই স্ত্রীর দিকে ধেয়ে আসেন। কিন্তু জয়াবিজয়া দেখলেন যে, তাঁরা এই আগ্রাসনে ভয়ার্ত হলেও, সেই স্ত্রীর মধ্যে সেনার এমন আগ্রাসন দেখে লেশমাত্রও ভয় কাজ করছেনা।

চমকিত হলেন তাঁরা, কিন্তু সেই চমিক্ত হবার মধ্যেই, তাঁদের হস্ত বন্ধনমুক্ত হয়ে গেছে। কি করনীয় তাঁদের, কিচ্ছু বুঝতে পারলেন না, কারণ তাঁদের সম্মুখে যা হয়ে গেল, তা তাঁদের কাছে এক অত্যাশ্চর্য অবর্ণনীয় ঘটনা। তাঁরা দেখলেন, সেই অপরূপা স্ত্রী আগ্রাসী সেনার উদ্দেশ্যে একটি ভয়ানক জোরে ভূমিতে পদাঘাত করলেন, আর তা করা মাত্রই, সমস্ত সেনা যেন উড়ন্ত পক্ষীর মত উড়ে গিয়ে, কয়েক দশক হাত দূরে পতিত হলো।

সেই পদাঘাতের জেরে, জয়া ও বিজয়াও শূন্যে উন্নীত হয়, কিন্তু সেই স্ত্রী তাঁদের দুইজনের কটিদেশকে আকর্ষণ করে, ভূমিতে স্থাপিত করলেন। সেই স্ত্রী যখন তাঁদের উলঙ্গ কটিদেশের তনুত্বককে স্পর্শ করলেন, দেবী জয়া ও বিজয়া যেন এক অনাবিল সুখে নিমগ্ন হয়ে গেলেন সেই হস্ত স্পর্শে, এবং পরমসুখে নিজেদের নেত্র বন্ধ করে নিলেন।

নেত্র যখন উন্মোচিত হলো, তখন দেখলেন সেনা ভূমিতে শায়িত। আর সেই অপরূপা স্ত্রী তাঁদের দুইজনের মধ্যে স্থিতা। নিজেদের অন্তরে তাঁরা উভয়েই বিচার করলেন, কে এই স্ত্রী, যার স্পর্শমাত্র অনাবিল অকায়িক সুখ অনুভব হলো তাঁদের। নিশ্চিত ভাবে ইনি কনো দিব্যস্ত্রী হবেন, নয়তো কনো সাধিকা। … সেই কারণেই, আগ্রাসী সেনার সম্মুখে দাঁড়িয়েও তাঁর কনো ভয়ডর নেই ।

কিন্তু সেই বিচারও অধিকক্ষণ চলতে পারলো না, কারণ সেনা পুনরায় উঠে দাঁড়িয়ে আগ্রাসী হওয়া শুরু করেছে। … সংখ্যাতে প্রায় ১০ সেনা, কিন্তু সেই অপরূপা স্ত্রীর এবারের কীর্তি জয়াবিজয়াকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করলো যে, হয় এই সাধিকা কনো সিদ্ধস্ত্রী, নয় তিনি কনো ভয়ানক যোদ্ধা। … আগ্রাসী সেই স্ত্রী সম্পূর্ণ গোলাপি বর্ণের হয়ে উঠলেন উত্তেজনার বসে। আর যতই তাঁর আগ্রাসন আসতে শুরু করলো, ততই তাঁর শ্রীঅঙ্গ থেকে অসংখ্য সুগন্ধি ফুলের সুবাস বাতাসে মিশে যেতে শুরু করলে, সেই গন্ধে জয়াবিজয়া বিভোর হয়ে গেলেন।

আর তাঁরা দেখলেন, সেই স্ত্রী ভয়ানক গতি ধারণ করে, সেই সেনার দিকে অগ্রসর হলেন। পরের মুহূর্তে কি হলো, জয়াবিজয়া দুইজনেই কিচ্ছু দেখতে পেলেন না। শুধু দেখলেন একটি আলর রেখার সমষ্টি, যার মধ্যে সেই স্ত্রীর পরিধানে থাকা লাল শাড়ী ছিল, তাঁর অঙ্গের গোলাপি বর্ণ ছিল, আর তাঁর অঙ্গে থাকা সামান্য কিছু স্বর্ণের গহনা ছিল, তা সেনাদের আশেপাশে ঘোরাফেরা করলো।

আর যখন সেই আলোকতরঙ্গের নাচন স্তব্ধ হলো, তখন জয়াবিজয়া দেখলেন, সমস্ত সেনার মৃতদেহ ভূমিতে বিছিয়ে রয়েছে, আর সেই স্ত্রী এবার স্তব্ধ হতে, তাঁকে আর আলোকের ছটা লাগছে না, এক অভূতপূর্ব সুন্দরী স্ত্রী দেখাচ্ছে।

আপ্লুত হবেন নাকি বিভোর হয়ে যাবেন, জয়াবিজয়ার বাহ্যমন তো বাদই দেওয়া যায়, তাঁদের অন্তরমন ও চেতনাও সেই ব্যাপারে দ্বন্ধে পতিত হয়ে গেলে, সেই স্থানে মদ্যপ ভণ্ডের আগমন ঘটে, তাই জয়াবিজয়ার দৃষ্টি সেই দিকে চলে যায়। জয়াবিজয়ার দৃষ্টিকে অনুসরণ করে, সেই পরমা সুন্দরী স্ত্রী ভণ্ডের দিকে একটিবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন মাত্র।

ভণ্ড সেনাকে মৃত অবস্থায় দেখে, দুইবার সজোরে নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে নেশা কাটিয়ে, দৌড়ে গেলেন নিজের ধনুশ সন্ধান করতে, কিন্তু সেই স্ত্রীর গতির সম্মুখে, ভণ্ডের গতি যেন অতিম্লান। সেই স্ত্রী অত্যন্ত গতিশীল ভাবে সেই পুনরায় আলোকরূপ ধারণ করে, ভণ্ডের পিছনে গিয়ে, দৌড়ে যাওয়া ভণ্ডের চরণ ধরে তাঁকে প্রথমে ভূমিতে পতিত করলেন, অতঃপরে তাঁর দেহকে বেশ কয়েকবার শূন্যে ঘূর্ণন করিয়ে, অবশেষে গঙ্গার জলে তাঁকে ফেলে দিলেন।

সঙ্কট কেটে গেছে জয়াবিজয়ার। কিন্তু বিস্ময় তাঁদের কাটেনি, বরং তা সঙ্কটের থেকেও অধিক বলনিয়ে তাঁদের মনচেতনাকে বেষ্টন করে রেখে দিয়েছে। বিভোর হওয়ার ভাব, আপ্লুত হওয়ার ভাব, এবং অসম্ভব কৃতজ্ঞতা ধারণ করে ধন্যবাদ প্রদান করতে জয়াবিজয়া গেলেন তাঁর কাছে। …

কিন্তু সম্মুখে উপস্থিত হয়ে, সেই দেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে, নিঃশব্দে ক্রন্দন করে, জয়া সেই স্ত্রীকে নিজের স্বামীকে আলিঙ্গন করার মত আলিঙ্গন করে বলে উঠলেন, “কাকিমনি! … তুমি কোথায় চলে গেছিলে! … মাবাবা ছাড়া এতটা অনাথ লাগতো কিনা জানিনা, কিন্তু তোমায় ছাড়া সম্পূর্ণ অনাথ লাগছিল নিজেকে!”

বিজয়া নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না, জয়ার মুখ থেকে সে কি শুনছে! ইনিই কি দেবী শ্রী, তাঁর শ্রীমা! … তাঁদের সংকট আসতে, তিনি ঠিক উদিত হয়ে তাঁদেরকে রক্ষা করলেন! … ইনি কি শ্রিমা, না শুধুই মা! … কেন তাঁর আজ ইনাকে শ্রীমা বলতে মনই চাইছে না! শুধুই মা বলতে ইচ্ছা করছে! … সেতো অনাথ নয়! তাঁর তো জননী আছে, যাকে সে মা বলে ডেকেওছে অনন্তবার। কিন্তু তারপরেও কেন আজ তাঁর মনে হচ্ছে যে, যেন তিনি কতকাল নিজের মাকে দেখেননি, নিজের মাকে মা বলে ডাকেননি!

কম্পমান গলাতে নিজের অজ্ঞাতেই বিজয়া থরথর কম্পমান হয়ে অযাচিত ভাবে ক্রন্দন করতে করতে বললেন, “মা! … তুমি কোথায় চলে গেছিলে! … তোমাকে ছাড়া আমরা সকলে অনাথ হয়ে গেছিলাম!”

জয়া বললেন, “এবার ফিরে চলো আমাদের সাথে। আমরা তো তোমাকে খুঁজতেই এসেছিলাম। তোমাকে পেয়ে গেছি, আর যাত্রা করার কিই বা মানে!”

দেবী শ্রী হাস্যমুখে বললেন, “পুত্রীরা, যাত্রা করার সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারি, গন্তব্য কি হবে সেই যাত্রার, তার অনুমান কি করা সম্ভব? তাই এমন কেন ধারণা রাখছো যে তোমরা যেটিকে নিজেদের যাত্রার গন্তব্য ভাবছো, সেটিই তোমাদের যাত্রার গন্তব্য! … এসো পুত্রী, আমরা যাত্রা করি। আমার বিশ্বাস যে তোমাদের যাত্রার গন্তব্য অনেকটাই ভিন্ন, যেমনটা তোমরা ভেবোছো তার থেকে অনেকটাই আলাদা। চলো আমার সাথে চলো। অনেকের সাথে আলাপ করানোর আছে তোমাদের”।

দেবী বিজয়া বললেন, “রাজশাহী রাজ্যে, আমাদের কাকাশ্রী, মহান সুরচিৎ অপেক্ষা করছেন আমাদের জন্য। … আপনার অভাবে, তিনি বিভিন্ন রাজ্যে ভ্রমণ করে করে কেবল সেনা প্রইস্খন করছেন আর কৃতান্তিক ধর্মের গীত গেয়ে যাচ্ছেন। একটি স্থানেও, একটি দিনের জন্যও তিনি স্থিত হননি, এই ধারণা রেখে যে আপনিও সুখেশান্তিতে বিরাজ করছেন না নিশ্চয়ই। … তাই মা, আগে তাঁর কাছে গেলে হতো না! … তিনি আপনাকে দেখে, কি ভাবে প্রতিক্রিয়া দেবেন, আমাদের অনুমানও নেই সেই বিষয়ে। আপনি তাঁর কাছে যে ঠিক কি, তারও অনুমান নেই আমাদের কাছে। তবে এটুকু জানি যে, আমাদের পিতারা আমাদের মাতাদের যেই দৃষ্টিতে দেখেন, আমাদের কাকাশ্রীর দৃষ্টি সম্পূর্ণ ভিন্ন”।

দেবী শ্রী মিষ্ট হেসে বললেন, “তোমরা সঠিক বলেছ। তিনি আমার দৃষ্টির অপেক্ষায় খরস্রোতা নদীর ন্যায় বয়ে চলেছেন নিরন্তর, যেন ব্যাকুল ভাবে সাগরের সন্ধান করছে সেই নদী। … এই সাগরও নদীকে ধারণ করার জন্য ব্যকুল। কিন্তু পুত্রী, এখনও তার উচিত সময় আসেনি। উচিত সময়ের আগে কনো কিছুই সম্ভব নয়। তোমার কাকাকে আমি খালিহাতে মিলতে পারিনা। তাঁর প্রতিও আমার কিছু কর্তব্য আছে। তাই এখন আমার কর্তব্য পালনের সময়। … আর তিনিও আমার সাথে খালি হাতে মিলতে রাজি নন।

সেই কারণেই তো তিনি সেনানির্মাণ করছেন। তবে কেবল সেনা নির্মাণ নয়, তাঁর আরো কিছু বোধ ধারণ করা বাকি আছে। সেই বোধ যখন তাঁর জেগে যাবে, তখনই তিনি আমার পালন করা কর্তব্যকে অনুভব করবেন, আর তখনই তিনি আমার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে আমার পালন করা কর্তব্য কে গ্রহণ করবেন। পুত্রী, মিলন, তাও আবার যিনি তোমাকে নিজের থেকেও অধিক প্রেম করেন, তার থেকে আনন্দের যে কিচ্ছু হয়না। তবে কি জানো তো?

যিনি তোমাকেই নিজের সমস্ত কিছু জ্ঞান করেন, তাঁর কাছে সেই সময়েই গিয়ে মিলিত হতে হয়, যেই সময়ে তিনি তোমাকে অধিকক্ষণ লাভ করতে পারবেন। নাহলে যে তাঁকে বেদনাদেওয়াই হয়ে যায়, কারণ সেই মিলন যে অসময়ের মিলন, অর্থাৎ সেই মিলনের কিছুক্ষণের মধ্যেই যে বিচ্ছেদের বেদনা অপেক্ষা করছে। … তাই পুত্রী, তাঁকে তাঁর কর্তব্য ও বোধ জাগরণ করতে দাও, আর আমাকেও আমার কর্তব্য পালন করে নিতে দাও। তারপর না হয় আমাদের মিলন হবে, তখন আমরা অধিকক্ষণ একে অপরের কাছে মিলিত থাকতে পারবো। কর্তব্যের টানে আমাদের বিচ্ছেদের দ্বারস্থ হতে হবেনা”।

জয়া গদগদ হয়ে বললেন, “আবেগ আমাদের প্রায়শই সময়ের পূর্বে কনো কিছুকে ঘটমান করে দেবার জন্য প্ররোচিত করে, আর যেকোনো কিছু সময়ের পূর্বে হওয়া মানেই, তা অসফল হবে। অর্থাৎ সমস্ত অসফলতার অন্তরালে থাকে এই আবেগ নামক মানুষের মহাশত্রু, যাদের নেতৃত্ব প্রদান করে রিপু পাশ ও ইন্দ্রিয়রা, অর্থাৎ মহারাজ করিমুণ্ডের ২০ পুত্ররা। তাই আবেগ থেকে সর্বদা মুক্ত থাকতে হয়, তবেই শুদ্ধভাবকে অনুভব করা যায়। সঙ্গমের পরিবর্তে মিলনের পবিত্রতাকে অনুভব করা যায়। আর বাবা বলেন, এই শিক্ষা তিনি কাকাশ্রীর থেকে লাভ করেছেন। … আজ একই শিক্ষা, আমরা তোমার থেকে লাভ করলাম মা। … তাই কেন যেন মনে হচ্ছে, তুমি ও কাকা, একে অপরের থেকে আলাদাই নয়। যেন তোমরা একই ব্যক্তিত্ব, দুই ভিন্ন শরীরে অবস্থান করছো। তোমাদের সমস্ত কিছুই এক, একাকার”।

দেবী শ্রী বললেন, “তোমাদের ডিঙ্গিকে তোমাদের সেনারা প্রস্তুত করে রেখে দিয়েছে। তাঁরা মূর্ছা থেকে উন্নীত হয়ে, তোমাদের সন্ধান করতে নির্গত হয়েছে। তোমাদের না পেয়ে, তাঁরা ফিরে গিয়ে, তোমাদের সাথে যা হয়েছে তা তোমাদের পিতাদের গিয়ে বললে, তাঁরাও তোমাদের সন্ধান করতে এখানে এসে যাবেন। আমাদের তারপূর্বে, সেই ডিঙ্গি ধারণ করে যাত্রা করা উচিত পুত্রী। নয়তো আমাদের যাত্রাতে বিঘ্ন আসতে পারে। … তাই এবার পথ চলা যাক!”

জয়াবিজয়া মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বললেন, “তোমার চরণ যেখানে যেখানে পরবে, সেইটিই আমাদের যাত্রার মার্গ মা। তুমি আমাদের যেখানে নিয়ে যাবে, সেখানেই আমরা যেতে সর্বদা প্রস্তুত থাকবো মা। … চলো, তুমি আগে আগে, আর আমরা তোমার পিছু পিছু”।

দেবী শ্রী এবার নিজের আলক্তিত চরণে অগ্রসর হলে, পাদুকা ছাড়া দেবী জয়া ও বিজয়ার পথ চলতে অত্যন্ত অসুবিধা হয়। সেই দেখে, দেবী শ্রী সেই স্থানে তাঁদেরকে নিয়ে এলেন যেই স্থান থেকে তাঁদের অপহরণ হয়েছিল। তাঁদের পাদুকাজোরা সেই স্থানেই ইতস্তত ছড়ানো ছিল। সেই দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়ে জয়াবিজয়া পাদুকা ধারণ করলেন প্রথমে। তারপরে তারা তাকিয়ে দেখলেন তাঁদের মা, দেবী শ্রীর চরণের দিকে। এবং দেখলেন যে, তিনি তাঁর চরণে কনোরূপ পাদুকা ধারণ করে নেই। তাই জয়াবিজয়া নিজেদের পাদুকা প্রত্যাখ্যান করেই অগ্রসর হলেন দেবী শ্রীর পশ্চাতে।

জলের মধ্যে অবতরণ করে, কটিদেশ পর্যন্ত জলে নিমগ্ন হয়ে, দেবী শ্রী সেনাদের নির্মিত ডিঙ্গিকে ডাঙায় টেনে আনলে, জয়াবিজয়া তাতে উপবেশন করলেন, এবং সিক্তবস্ত্রধারি দেবী শ্রী নৌকার দাড় টানতে লাগলেন। লগি টেনে ডিঙ্গিকে মালদরাজ্যের সেই কিনারায় স্থাপিত করলেন, যেই কিনারাতে মালদরাহ্যের কনো সেনাই মজুদ থাকেনা, কারণ তা হলো বেশ্যাদের স্নানের ঘাট।

দেবী শ্রীর রূপে আকৃষ্ট হয়ে, স্নানরতা বেশ্যামণ্ডলী তাঁর কাছে এসে প্রশ্ন করলেন, “কে গা তুমি! … তোমার রূপের বাহার দেখলে যে, আমাদের আর কনো বাবুই জুইটবে না! কোন দেশে তোমার বাস গা!”

দেবী শ্রী হাস্যমুখে বললেন, “যেই বাণিজ্যে তোমরা নিযুক্ত, আশা করা যেতে পারে যে, রাজার প্রতি নিষ্ঠা কেবলই লোকদেখানি হবে তোমাদের। সেই বিশ্বাসেই বললাম, আমি সুরপত্নী, দেবী চিত্তাবধূ ও নিষ্ঠাবানপুত্রী সর্বশ্রী, আর এঁরা দুইজন আমার কন্যা”।

এমন কথা শুনে, উপস্থিত বেশ্যামণ্ডলী নতজানু হয়ে উপনীত হয়ে বললেন, “দেবী, আপনি এখানে! … আপনি জীবিত আছেন! … কি সৌভাগ্য আমাদের! … কিন্তু দেবী, আমরা রাজার প্রতি নিষ্ঠাবান না হলেও, আমাদের মালকিন রাজার প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। তাই তাঁর কর্ণে যদি এই সংবাদ যায়, আপনাদের সমূহ বিপদ হবে। আপনি এক কাজ করুন বরং। আপনারা তিনজনও স্নান করে নিন। যদি অভয় দেন, তাহলে একটি আবদার, এই পতিতাদের আপনার অঙ্গস্পর্শ করে, আপনাকে স্নান করানোর অনুমতি প্রদান করুন। তারপর আমাদের ভিড়েই আপনাকে রাজ্যের সীমান্তের দিকে আমাদের আস্তানা, সেখান পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে, সেখানে রাজা কুর্নিশের রাজ্যের একটি কোন স্থাপিত, সেই বনে আপনাদের প্রবেশ করিয়ে দেব। রাজা কুর্নিশের রাজ্যে স্ত্রীরা সুরক্ষিত। তাই সেখানে আপনাদের কনো প্রকার অসুবিধা হবেনা”।

দেবী শ্রী সেই প্রস্তাবে প্রফুল্লতার সাথে রাজি হলে, জয়াবিজয়া দেখলেন, বেশ্যাগণ অত্যন্ত হরষের সাথে দেবী শ্রীকে স্নান করালেন। কেউ তাঁকে পিছন থেকে বেষ্টন করে ধরলেন, কেউ তাঁকে সম্মুখে থেকে আবার কেউ তাঁকে তাঁর দুই পার্শ্ব থেকে। আপ্লুত হলেন সমস্ত বেশ্যারা, আর কতটা আপ্লুত হলেন তাঁরা, তা ব্যক্তও করলেন যখন তাঁদেরকে কুর্নিশের রাজ্যের বনের পথ দেখালেন।

এক বেশ্যা সম্মুখে এসে বললেন, “দেবী, আমরা পুরুষদের কামসুখ বিতরণ করে ফিরি, বলতে পারেন আমরা স্বয়ংও কামসুখের নেশা করি। করিন্দ্রের চিহ্নিত জ্ঞানীরা বলে, দৈহিক ভাবে শ্রেষ্ঠ সম্ভব সুখলাভই হলো কামসুখ। কিন্তু দেবী, আপনাকে আলিঙ্গন করাতে আমাদের অঙ্গে অঙ্গে যেই পুলক অনুভূত হয়েছে, এই সুখের ভাগ দেওয়া সম্ভব কিনা জানিনা, তবে আমরা অত্যন্ত স্বার্থপর। তাই এই সুখের ভাগ আমরা কারুকে দেবনা। নিজেদের অন্তরে পরমপ্রাপ্তি জ্ঞানে, এই সুখকে গচ্ছিত রেখে দেব”।

পুনরায় নতজানু হয়ে তাঁরা বললেন, “দেবী, হয়তো আর কনোদিনও সাখ্যাত পাবো না আমরা। আর সত্য বলতে এই পতিতারা যে আপনার সাখ্যাত লাভ করেছে, এটাই জানিনা কোন জন্মে কি সুকর্ম করেছিলাম তার ফল। … কিন্তু দেবী, আপনার পবিত্রতাকে অঙ্গে অঙ্গে আস্বাদন করেছি। কেউ কতটা পবিত্র হলে, তবে এই পতিতাদের শতপুরুষের কামনার গন্ধে লিপ্ত অঙ্গকে প্রাণভরে আলিঙ্গন করতে দেয়। … ধন্য আপনি দেবী, ধন্য আপনার পবিত্রতা। আপনি প্রমাণ করে দিলেন আমাদের কাছে যে, পবিত্রতা অঙ্গে থাকেনা, পবিত্রতা বিরাজ করে চেতনার অন্দরে। যার চেতনা শুদ্ধ, তিনি সর্বক্ষেত্রে, সর্বক্ষণ, সর্বআলিঙ্গনেই শুদ্ধ থাকেন”।

জয়া বিজয়ার থেকে দেবী নলিনীর মুখ থেকে শ্রবণ করা বেশ্যা গোধূলির কাহিনী শুনেছিলেন। আজ নিজের চক্ষে তাঁদের মাকে দেখলেন। সত্যই যেন তিনি পূর্ণ ভাবে পবিত্র। এমন ভাবেই তিনি পবিত্র যে, তাঁর কনো সময়ে নিজের পবিত্রতা হারিয়ে ফেলার ভয়ও নেই। তাই তিনি অনায়াস সকলের সাথে মিলিত হতে পারেন, সকলকে আলিঙ্গন করতে পারেন, সকল কিছু আহার করতে পারেন, সকল স্থানে নিবাস করতে পারেন।

বনের পথে চলতে চলতে বিজয়া তাঁর মাকে অনেক প্রশ্ন করছিলেন, কিন্তু দেবী জয়া নিজের আপন মনে অনেক কিছু ভেবে চলছিলেন। তিনি ভাবছিলেন, স্বয়ং ব্রহ্মময়ী সকলের অন্তরে নিবাস করেন, বেশ্যারও সাধুরও, সাদ্বিরও আবার নৃপতি, মন্ত্রী তথা তস্করেরও। আর তাঁদের মা-ও ঠিক তেমনই। সর্বত্র তিনি বিরাজ করতে পারেন, সর্ব আহার তিনি গ্রহণ করতে পারেন। যেন তাঁর মা-ই হলেন সাখ্যাত ব্রহ্মময়ী এমন বোধ আসা শুরু হয়েছিল জয়ার অন্তরে, ঠিক তখনই তাঁদের পথ অবরোধ করে ১৫টি মানুষ দাঁড়িয়ে পরলেন।

পরনে তাঁদের লাল বস্ত্র। সংখ্যায় তাঁরা ১৫। এঁদের মধ্যে ১০জন তাঁদেরই বয়সের বালিকা, আর ৫জন তাঁদেরই বয়সের বা সামান্য অধিক বয়স হবে, তেমন বালক। রক্তচক্ষু তাঁরা, হস্তে একটি করে দণ্ড। কেশ তাঁদের অগুছালো, আর অঙ্গ তাঁদের স্নান না করে করে মলিন। বিজয়ার মনে হলো বিপদ তাঁদের পিছু ছাড়ছে না, ভণ্ডের বিপদ থেকে উদ্ধার হলেন তাঁরা তো নূতন বিপদ এসে উপস্থিত হয়েছে।

তাই পায়ে পায়ে সে পিছিয়ে এসে তাঁর দিদি, দেবী জয়ার কাছে এসে উপনীত হলেন। কিন্তু দেবী শ্রীর আচরণ ভিন্ন। তিনি কিন্তু এক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক নন। তিনি মৃদুছন্দে জয়াবিজয়ার দিকে বারে বারে তাঁর আলক্তিত চরণ প্রদর্শন করে করে এগিয়ে গেলেন সেই ১৫টি বালকবালিকার দিকে। যখন তিনি সকলের অতি নিকটে চলে গেলেন, জয়াবিজয়া দেখলেন, সেই ১৫টি বালকবালিকা একত্রে দেবী শ্রীর সম্মুখে নতজানু হয়ে উপবেশন করে, বালিকারা দেবী শ্রীর চরণ কে আঁকড়ে ধরে, এবং বালকরা তাঁর শাড়ীর আঁচল ধারণ করে, শিশুর মত অজরধারায় ক্রন্দন করতে শুরু করেছেন।

জয়াবিজয়ার ভ্রমমুক্তি হলো। এঁরা শত্রু নয়। এঁরা বিক্ষিপ্ত কিন্তু দেবী শ্রীকে তাঁরা আপন জ্ঞান করেন। তাই এবার তাঁরা এগিয়ে গেলেন ১৫টি বালকবালিকার দিকে। নিকটে যেতে, তাঁরা দেখলেন, দেবী শ্রীও ভূমিতে বসে পরলেন, আর তিনি তাঁর উন্নীত স্তনদেশকে সম্মুখে রেখে, নিজের দুই বাহুকে প্রসারিত করে, মৃদুছন্দে নিজের মস্তক আন্দুলিত করে সকলকে যেন তাঁর বাহুপাশে আবদ্ধ হবার নিমন্ত্রণ প্রদান করলেন।

আর যেমনই তিনি এমন করলেন, সকলে বালকবালিকা দেবীশ্রীকে প্রাণপণে আলিঙ্গন করলেন পূর্ণভাবে, অঙ্গাঙ্গী ভাবে, ঠিক যেন দেবী শ্রী তাঁদের নিজেদের মা। আচরণও তাঁদের অনুরূপ। কিন্তু তাঁদের কথার মাথামুণ্ডু কিচ্ছু বুঝতে পারলেন না বিজয়া। তাঁরা ক্রন্দনের অশ্রুতে প্রায় শ্রীর সম্পূর্ণ বক্ষাঞ্চলকে অতিক্রম করে তাঁর উদরদেশ ও পৃষ্ঠদেশকে সিক্ত করে দিয়েছে, কিন্তু শ্রীর সেইদিকে কনো দৃষ্টি নেই।

তাঁরা এবার বললেন, “মা! … আর কত কর্মফল আছে আমাদের! … পিশাচ ছিলাম, তখন তুমি আমাদেরকে মূলাধার থেকে মুক্ত করেছিলে। তোমার স্পর্শ বিনা প্রগল ছিলাম, তুমি এসে আমাদের স্তনদান করে ক্ষুধা থেকে নিভৃত করে তিনদিনের মধ্যে বাল অবস্থায় উন্নীত করেছিলে। … এই সমস্ত কিছুকে কেন উপকার রূপে জ্ঞান করতে বলছো মা! … আমরা কি তোমার সন্তান হয়ে তোমার সাথে সর্বক্ষণ থেকে তোমাকে স্নেহ করতে পারিনা! … আমাদের কর্মফল কি সেই অনুমতি আমাদের দেয়না!”

বিজয়া দেখলেন এই কথা শুনে জয়া দুই কদম পিছিয়ে গেলেন, যেন বিভোর হয়ে। কিন্তু সে নিজে এই কথোপকথনের কিচ্ছু বুঝতে পাচ্ছেন না। তাই বিজয়া পিছিয়ে গিয়ে নিজের দিদির হস্তকে নিজের বাহুতে ধারণ করে বললেন, “কি হলো দিদি! … তুমি এমন হকচকিয়ে গেলে কেন?”

জয়া বললেন, “মাতা সর্বাম্বা দেহ ত্যাগ করেন নি, তিনি কেবল দেহপরিবর্তন করেছেন, ঠিক যেমন তিনি দেবী মেধার দেহ পরিবর্তন করে প্রেমার দেহ ধারণ করেছিলেন, তেমনই তিনি এবার সর্বাম্বার তনু ত্যাগ করে সর্বশ্রীর দেহ গ্রহণ করেছেন। … বিজয়া, আমাদের কাকিমাকে আমরা এমনি এমনি মা বলে সম্বোধন করার আগ্রহ অনুভব করছি না। তিনি সত্য অর্থেই আমাদের মা। কারণ তিনিই সাখ্যাত ব্রহ্মময়ী”।

বিজয়া চমকিত হয়ে বললেন, “কি বলছো দিদি এইসমস্ত কিছু? কি আধারে বলছো এই সমস্ত কথা?”

জয়া বললেন, “এই ১৫টি বালকবালিকার কথা শুনেছিস তুই! … ঠিক করে স্মরণ কর, কি বলল ওরা। চিনতে পারছিস ওরা কারা!”

বিজয়া চমকিত হয়ে বললেন, “তুমি চেন এদেরকে? কে এঁরা?”

জয়া উত্তরে বললেন, “চিনতাম না, তবে এখন চিনে গেছি।… মনে পরে, আমাদের মায়েরা এক অদ্ভুত কথার বিবরণ দিয়েছিলেন, যেখানে ১৫টি তন্ত্রসন্তানকে কনো এক দিব্যস্ত্রী নিজের স্তন পান করিয়েছিলেন তিন রাত্রি, আর তার ফলে তাঁরা বাল অবস্থায় স্থিত হয়ে গেছিলেন, এঁরা সেই ১৫টি তন্ত্রসন্তান, আর যার স্তন পান করেছিল তাঁরা, তিনি অন্য কেউ নন, আমাদের শ্রীমা”।

বিজয়া অবাক হয়ে বললেন, “এই কথা অবশ্যইপ্রমান করে যে আমাদের শ্রীমা দিব্য, তার পরিচয় তো আমরা এর আগেও পেয়েছি। এ আর নতুন কথা কি?”

জয়া মাথা নেড়ে বললেন, “তুই এখনো বুঝতে পারছিস না বিজয়া। … আমাদের কাকিমার তো সন্তানই হয়নি, তাহলে তাঁর স্তনে দুগ্ধ এলো কি করে? তাও এমন পরিমাণ দুগ্ধ যে, ১৫টি শিশুকে তিন রাত্রেই সমানে দুগ্ধ পান করিয়ে করিয়ে তাঁদেরকে বাল অবস্থায় উন্নত করে দেবেন?!”

বিজয়া এবার চমকিত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ তাই তো! … এই কথা তো বিচার করে দেখিনি। এর অর্থ আমাদের কাকিমা সাধারণ কেউ কিছুতেই নন। তিনি নির্ঘাত কনো দেবী। কিন্তু তিনিই যে মাতা ব্রহ্মময়ী সর্বাম্বা, সেই ব্যাপারে তুমি নিশ্চয় হচ্ছ কিভাবে দিদি!”

জয়া বিভোর চিত্তে দেবী শ্রীকে দেখতে দেখতেই বললেন, “কারণ এঁরা যে ১৫টি তন্ত্রসন্তান, সেটি এঁদের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। … এঁদের কথিত কথাকে আরো একবার নিরীক্ষণ কর বিজয়া। … মা, আমাদের আর কত কর্মফল বাকি। মূলাধার থেকে আমাদের পিশাচ অবস্থা থেকে মুক্ত করার পরে… বুঝতে পারছিস বিজয়া, এঁরা কারা? একবার আমাদের দিদার মুখ থেকে শ্রবণ করা মাতা সর্বাম্বার কীর্তিকে স্মরণ কর বিজয়া। কি বলেছিলেন তিনি?”

বিজয়া নিজের স্মৃতিতে জোর দিয়ে বললেন, “১৫টি পিশাচকে মাতা সর্বাম্বা মুক্ত করেছিলেন মৃত্যুর জ্ঞান প্রদান করে, দেবী বীরশ্রী রূপে। এঁরা তাঁরা! … এঁরা শ্রীমা কে মা বলছেন মানে! … শ্রীমা আমাদের … স্বয়ং ব্রহ্মময়ী মাতা সর্বাম্বা!”

জয়া এবার অশ্রুধারণ করে বিজয়ার দিকে তাকালে, দেখলেন বিজয়া ব্রহ্মময়ীর সান্নিধ্য লাভ করার আনন্দে, তাঁকে সনাক্ত না করতে পারার বেদনায়, আর তাঁকে মা বলে ডাকতে পারার সৌভাগ্যের কারণে কম্পিত হয়ে ক্রন্দনে রত হয়েছে। সেই দেখে জয়া তাঁর কাছে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সান্ত্বনা প্রদান করে বললেন, “বুঝতে পারছি, আমারও হচ্ছে। আবেগ না ভাব জানিনা। মনে হচ্ছে সমস্ত পরিচয় ত্যাগ করে, সমস্ত কুণ্ঠা ত্যাগ করে, প্রাণপণে গিয়ে মাকে জরিয়ে ধরে বলি, তোমার ব্যাথা লাগলেও আর তোমাকে ছাড়বো না। … কিন্তু একবার বিচার করে দেখ বিজয়া, আমাদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাদের প্রাণ নিয়ে শ্রীমা সেদিন পলায়ন করেছিলেন। অর্থাৎ আমাদের ভ্রাতাদের সাথে দেখা হওয়াও বাকি আছে। … মা ঠিকই বলেছিলেন, যাত্রা করবো এটিই আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল, যাত্রার গন্তব্য আমাদের এখনও অজানা”।

নিজেদের ভাবকে সংযত করে রেখে, এবার তাঁরা তাঁদের শ্রীমায়ের কাছে অন্তরে আর কনোরূপ বাঁধাবৈষম্যকে ধারণ না করে উপস্থিত হলে, শুনলেন তাঁকে তন্ত্রসন্তানদের উদ্দেশ্যে বলতে, “কিন্তু বাছারা, তোমাদের এই হাল কেন? তোমাদের পিতারা কোথায়? তাঁরা সকলে সাধু, তাঁরা নিশ্চয়ই তোমাদের ত্যাগ দেন নি!”

এক বালিকা, নাম সুধা বললেন, “মা, জানো তো সবই, তাও যখন আমাদের বলতে বলছো, তখন বলি। মা, করিন্দ্র এখানে এসেছিল আর আমাদের পিতাদের হত্যা করেছে। … হত্যা আমাদেরও করার প্রয়াস করেছিল, কিন্তু আমাদের উপর তরবারি দ্বারা প্রহার করলে, আমাদের উপর যেন কনো প্রভাবই পরে না তাঁদের অস্ত্রের। … প্রথমে তো আমরা ভেবছিলাম, আমরা বোধহয় এখনও পিশাচই আছি, তাই আমাদের উপর অস্ত্রের কনোরূপ প্রভাব পরছেনা”।

অন্য এক বালিকা, নাম সাদ্বি, বললেন, “মা, তখন আমাদের স্মরণ পরলো, তুমি অযথা কিচ্ছু করো না। আমাদেরকে তুমি স্তনপান করিয়েইছিলে, এই তরবারির আঘাত থেকে বাঁচার জন্য। তোমার স্তনপান করেছি আমরা, কনো অস্ত্র আমাদের কিভাবে আঘাত করতে পারে!”

এক বালক, নাম শুদ্ধ বললেন, “মা, আমাদের সম্পূর্ণ জীবনই তো তোমার। … তোমার স্নেহলাভেই আমরা পিশাচ থেকে মুক্ত। তোমার প্রদত্ত জ্ঞানের কারণেই আমরা সাধুসন্তান। তোমার প্রদান করা স্তনদুগ্ধের কারণেই আমরা আজ অক্ষত। … মা, আমাদের গ্রহণ করো। … আর আমাদের দূরে সরিয়ে রেখো না। তুমি যা বলবে, যেমন বলবে, আমরা তাই করবো, তেমন ভাবে থাকবো। … শুধু আমাদের আর ছেড়ে যেওনা!”

দেবী শ্রী হাস্যমুখে বললেন, “চলো বাছারা। আগে সুবর্ণরেখার জলে তোমাদের স্নান করাই। … কি অবস্থা করেছ নিজেদের! অঙ্গ মলিন হয়ে গেছে, কেশ জট পাকিয়ে গেছে। … চলো আগে স্নান করাই তোমাদের। তারপরে, আমি তোমাদের নিয়ে আমার সাথে যাত্রা করবো। কথা দিচ্ছি বাবারা, আর কখনো তোমাদের ছেড়ে দেব না। … এই দেখো, তোমাদের সাথে তো আমার কন্যাদের আলাপই করানো হয়নি? … এই হলো সম্রাট ছন্দ ও দেবী পদ্মিনীজাত কন্যা জয়া, আর এই হলো ভ্রাতা তাল ও আমার মাতাসমান দেবী নলিনীর কন্যা বিজয়া। … আর এই দেখো জয়াবিজয়া, এঁরা হলেন তোমাদের ভ্রাতা ও ভগিনী”।

দেবী জয়া হেসে বললেন, “আমরা বুঝে গেছি মা, এই ত্রিভুবনের সকলেই আমাদের ভ্রাতা ও ভগিনী। আর কনো ভেদ নেই আমাদের চোখে। আর কনো দ্বন্ধ নেই আমাদের মনে”।

দেবী শ্রী সমস্তই জানেন, কে কি শুনেছেন, কে কি বিচার করেছেন আর কে কি উপলব্ধি করেছেন। তাই কনো কথা না বলে, কেবলই একটি মিষ্ট হাসি হেসে বললেন, “চলো পুত্রীরা। এঁদেরকে স্নান করিয়ে দিতে আমাকে সাহায্য করবে চলো। আমি বরং ছেলেগুলোকে স্নান করিয়ে দিই। তোমরা তোমাদের ভগিনীদের স্নান করিয়ে দেবে চলো। তারপরেও আমাদের বিস্তর যাত্রা পরে আছে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28