৮। আলাপ অধ্যায়
দেবী শ্রীমতী বলা শুরু করলেন তাঁর অমৃত কথা, “মা, মাতা সর্বাম্বা যখন আত্মকে দমন করতে ব্যস্ত, সেই কালে দেবী সমর্পিতা অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন, আর সেই একই কালে যখন দেবী মোহিনীর মৃত্যু হয়, তখন তাঁর মৃত্যুর কালেই তিনি চারটি যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, যারা হলেন দেবী হুতা, দেবী মিতা, দেবী স্ফীতা ও একটি পুত্রসন্তান, বীর্য। এই চার মোহিনীসন্তানদের মাতা সর্বাম্বা মানসের কাছে প্রদান করেন, এমন মানস তাঁদেরকে বড় করে তোলেন। আর অন্যদিকে, সমর্পিতা যখন দেবী সর্বম্বার অন্তরে অন্তর্হিত হন, সেই কালে তাঁর থেকে জাত অসমবয়সী ভগিনী চিত্তাকে মাতা সর্বাম্বা স্বয়ং লালনপালন করেন।
আর সেই সমকালেই, যখন মাতা সর্বাম্বা মাতৃকা, মহামাতৃকা তথা পরামাতৃকা বেশ ধারণ করছিলেন, সেই কালেই জগদ্ধাত্রী নদীর তীরে আরো এক অনবদ্য লীলার সূত্রপাত হয়। ব্রহ্মদিবসের অবসানকাল তথা ব্রহ্মরাত্রির সূচনার কালে, ভক্তের অভাবে, ব্যথিত মহানদী জগদ্ধাত্রী নিজকুলেই অবস্থান করতেন মনমরা হয়ে। তেমনই একদিন, মহারাজ ফরাসের নব্যপরিণত যুবক পুত্র, চন্দন নদীকুলে উপস্থিত হয়েছিলেন।
৮.১। শোভাযাত্রা পর্ব
পরিবারে তখন অত্যন্ত অরাজগতা! মহারাজ ফরাসের ভ্রাতা, বিলিত তাঁরই বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাঁর সমস্ত সম্পদ লুণ্ঠন করেছেন। পুনরায় বিলিত জগদ্ধাত্রী উপকুল ত্যাগ করে চলে গেলে, তাঁর ভ্রাতা, ফরাস, রাজত্ব নির্মাণের কাজে ব্যস্ত। সপ্ত গ্রাম থেকে লব্ধ তাঁর সপ্তস্ত্রী, কিন্তু তাঁদের একজনও সন্তানের জন্ম দিতে সক্ষম নন। অবশেষে, দেবী জগদ্ধাত্রীর করুণালাভ করে, সপ্তস্ত্রী একটিই সন্তানের বিবিধ অঙ্গ ধারণ করে, সেই টুকরোদের জগদ্ধাত্রী নদীর ধারায় প্লাবিত করলে, চন্দন নামক একটিই রাজপুত্র জন্ম নেয়, মাতা জগদ্ধাত্রীর কৃপায়।
কিন্তু সেই রাজপুত্র চন্দন আজ অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। রাজ্যের একটি স্ত্রীকেও তাঁর বিবাহের উপযুক্ত মনে হয়না, অথচ তাঁর মাতারা ও মৃত্যুশয্যায় শায়িত পিতার মনস্কাম এই যে তাঁর বিবাহ অতিশীঘ্র হোক। বিবাহে তাঁর অনীহা নেই, কিন্তু উপযুক্ত পাত্রী লাভ করছেন না, অথচ পিতার স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। সেই নিয়ে অত্যন্ত ব্যথিত চন্দন জগদ্ধাত্রী উপকুলে উপস্থিত হলে, তাঁর প্রথম দৃষ্টিই স্থাপিত হয় দেবী জগদ্ধাত্রীর প্রতি।
স্বর্ণহরিদ্রা গাত্রবর্ণ, দীর্ঘাঙ্গি তনু, বাৎসল্যপরিপূর্ণা স্তনযুগল, গম্ভীর নাভি যুক্তা, বিস্ফারক নয়নী, শূর্পনাসিকাযুক্তা, নিমিত্ত ওষ্ঠসম্মিলিতা দেবী জগদ্ধাত্রীর প্রকৃত পরিচয় না জেনেই, এই মেনে নিয়ে যে তিনিই তাঁর কাঙ্ক্ষিত পত্নী, এক দৃষ্টিতে চন্দন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। রাজপুত্র তিনি; তাঁর বিবাহ অনুগ্রহ শ্রবণের জন্য রাজ্যের সকল স্ত্রীরা সর্বদাই লালায়িত। তাই কুণ্ঠাহীন ভাবে, চন্দন দেবী জগদ্ধাত্রীর নিকটে গিয়ে বললেন, “দেবী, আমি এই ফরাসরাজ্যের একমাত্র রাজপুত্র, চন্দন, আপনাকে বিবাহ করতে স্বেচ্ছায় আগ্রহী”।
দেবী জগদ্ধাত্রী নিজের বিস্ফারিত নয়নের দৃষ্টি চন্দনের দিকে সুতীক্ষ্ণ ভাবে স্থাপিত করে, এক মৃদু হাস্য প্রদান করে বললেন, “কারুকে বিবাহের প্রস্তাব প্রদানের আগে, কাকে সেই প্রস্তাব প্রদান করছেন, তা তো জেনে নিতেন রাজপুত্র!”
রাজপুত্র চন্দন অত্যন্ত কামাতুর ভাবে বললেন, “দেবী, আমার পিতা মৃত্যুশয্যায় শায়িত। তাঁর অন্তিম ইচ্ছা, তিনি আমার বিবাহ দেখে যেতে চান। আর আমি আমার বিবাহযোগ্যা কনো স্ত্রীর সন্ধানই করতে পারছিলাম না। আপনাকে দেখা মাত্রই আমার সেই দ্বন্ধ মুহূর্তের মধ্যে মুছে গেছে। আমার উত্তরাধিকার কেউ হবে, তা আপনারই সন্তান হবে, এই আমার নিশ্চয়। তাই, আপনাকেই আমার পত্নী হতে হবে”।
দেবী জগদ্ধাত্রী হেসে বললেন, “আর যদি আমি সম্মত না হই!”
রাজপুত্র চন্দন নিজ কামাতুরতাকে পস্রয়দান করে, উগ্রতার বেশ ধারণ করে বললেন, “তাহলে আপনাকে এই রাজ্যের আশেপাশেও অবস্থানের অনুমতি আমি প্রদান করবো না, তা আপনি যেই হন না কেন!”
দেবী জগদ্ধাত্রী হেসে বললেন, “বেশ, তোমার কথা মত, আমিই তোমার স্ত্রী হবো। তবে আমার একটি শর্ত আছে রাজপুত্র। যদি তুমি সেই শর্ত মানতে সম্মত হও, তাহলে আমি তোমার ভার্যা হতে প্রস্তুত”।
কামাতুরতার ফলে উগ্র ও অতিআত্মবিশ্বাসী চন্দন হুংকারের সাথে বলে উঠলেন, “আপনার মত পরমাসুন্দরীকে প্রেয়সী ও পত্নী করে লাভ করার জন্য যদি আমাকে কনো শর্তে রাজি হতে হয়, তবে আমি সেই শর্তাবলি না শুনেই তাতে সম্মত। আপনি এবার অনায়সে আপনার শর্তের কথা বলতে পারেন, কারণ আপনার শর্ত যাই হোক না কেন, আগামীদিনের মহারাজ ও বর্তমানের যুবরাজ, এই চন্দন তার মান্যতা রাখবে”।
দেবী জগদ্ধাত্রী ব্যাঙ্গাত্মক হাস্য প্রদান করে বললেন, “যুবরাজ, আপনি অঙ্গিকার করেছেন যে আপনার উত্তরাধিকার আমারই সন্তান হবে, আর তাদের পিতা আপনিই হবেন। তাই আমি তোমার ভার্যা হতে প্রস্তুত, তবে আমি তোমাকে দুটি উত্তরাধিকার সন্তান প্রদান করার পর, তোমাকে ও সেই সন্তানদেরকেও ত্যাগ করে চলে যাবো, এই আমার শর্ত”।
এমন কথনে হতচকিত হয়ে গেলেন চন্দন, কিন্তু নিজের বচনে বন্দী তিনি স্বয়ং। তাই না বাঁধা দিতে পারলেন সেই শর্তে আর না তাঁর কামাতুরতা দেবী জগদ্ধাত্রীকে বিবাহ করা থেকে পিছুপা হতে দিল। দ্বন্ধসহই তিনি ভাষ্যে কনো প্রকার দ্বন্ধ প্রদর্শন না করে, সেই শর্তাবলি ধারণ করে, দেবী জগদ্ধাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজপুরে প্রত্যাবর্তন করলেন।
সপ্তমাতাকে সংবাদ প্রেরণ করলেন যে তিনি বিবাহযোগ্যা স্ত্রী লাভ করেছেন, এবং তাঁকে আনায়ন করেছেন, ও রাজমাতাদের অপেক্ষা করছেন, তাঁরা এসে সেই কন্যাকে বরণ করে ঘরে তুলবেন বলে। সংবাদ লাভ করে, আনন্দিত চিত্তে, সপ্তদেবী উপস্থিত হলেন চন্দনের কক্ষ সম্মুখে। তাঁরা উপস্থিত হয়েছেন জেনে, তাঁদেরকে অন্তরে প্রবেশ করিয়ে, চন্দন তাঁদের উপস্থাপন করিয়ে, দেবী জগদ্ধাত্রীকে তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত করিয়ে বললেন, “মাতা, এই স্ত্রীই আপনাদের পুত্রবধূ”।
পালঙ্কে উপস্থাপন করা সপ্তদেবী যেই ক্ষণে জগদ্ধাত্রীকে দর্শন করলেন, সেই মুহূর্তে নিজেদের স্থান থেকে গাত্রোত্থান করে, প্রথমে উঠে দাঁড়ালেন। কিছু মুহূর্ত তাঁরা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দণ্ডায়মান রইলেন, অতঃপরে তাঁরা সকলে একত্রে দেবী জগদ্ধাত্রীর চরণে পতিত হবার প্রয়াস করলে, দেবী জগদ্ধাত্রী দুই কদম পিছনে সরে গিয়ে, মৃদুস্বরে বললেন, “যেই কয়দিন আমি তোমাদের পুত্রবধূ হয়ে অবস্থান করবো, সেই কয়দিন তোমরা আমাকে প্রণাম করতে পারো না … সেই কিয়তদিন তোমরা আমার মাতা!”
সপ্তদেবী একত্রে বললেন, “কন্যাকে মা বলা যেতে পারে, কিন্তু মা, মাকে কন্যা কি করে বলা যেতে পারে!” চন্দনের দিকে তাকিয়ে তাঁর মাতারা এবার তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, “ইনাকে পত্নী রূপে অঙ্গিকার করার পূর্বে, একবার ইনার পরিচয় জানার প্রয়াস কি করেছিলে পুত্র!”
দেবী জগদ্ধাত্রী মৃদু হেসে বললেন, “না দেবীরা, আমি তাকে সেই বিষয়ে সতর্কও করেছিলাম, কিন্তু কামাতুরতার কারণে অহমিকায় মত্ত হয়ে তিনি হৃদয়কে কর্মকরা বন্ধ করিয়ে, মস্তিষ্কপ্রেমী হয়ে উঠেছিলেন। তাই তিনি না তো আমাকে আমার পরিচয় বলতে দিয়েছেন, আর না তিনি নিজে আমার পরিচয় জানতে চেয়েছেন”।
চন্দন এবার বেশ বুঝতে পারলেন যে, তিনি এমন কারুকে নিয়ে এসেছেন, যাকে স্ত্রী করে লাভ করার অধিকার তাঁর নেই। কিন্তু কামাতুরতা তখনও তাঁর শীরোস্থিত, জগদ্ধাত্রীর অপার রূপ যেন তাঁর সর্বাঙ্গকে ও বিশেষ ভাবে তাঁর মস্তিষ্ককে বশ করে নিয়েছে কামাতুরতার আচ্ছাদনে। তাই তিনি কনো ভাবেই এই স্ত্রীর সাথে বিবাহ করা থেকে নিজেকে বিরত করতে রাজি নন। তাই তিনি এখনও প্রশ্ন করলেন না দেবী জগদ্ধাত্রীর প্রকৃত পরিচয়।
তবে এবার তাঁকে জানতেই হলো দেবীর প্রকৃত পরিচয়, কারণ তাঁর সপ্তমাতা একত্রে তাঁর বিবরণ প্রদান করলেন তাঁর উদ্দেশ্যে। তাঁরা বললেন, “পুত্র, ইনি হলেন দেবী জগদ্ধাত্রী, যিনি নদী রূপে আমাদের রাজ্যকে সিঞ্চন করেন, এবং আমাদের জীবিত রাখেন। পুত্র, এক অর্থে, ইনি আমাদের সকলের জননী, কারণ ইনিই আমাদেরকে জীবিত রেখেছেন, আর দ্বিতীয় অর্থে, তিনি তোমার স্বয়ংএর জন্মদাত্রী জননী। কেন? কারণ যখন আমরা সপ্তমাতা সন্তান ধারণে ব্যর্থ হয়েছিলাম, তখন আমরা ইনার কাছে উপস্থিত হয়ে সন্তানের ভিক্ষা চেয়েছিলাম।
তখন তিনি আমাদেরকে নিজের বারিধারা প্রদান করে আমাদের তৃষ্ণা মিটিয়েছিলেন, আর সেই বারিধারার কারণে আমরা একই শিশুর সপ্ত অঙ্গকে জন্ম দিই। হ্যাঁ পুত্র, তোমার জন্ম তোমার পিতার বীর্যে নয়, মা জগদ্ধাত্রীর বারিধারার কারণে হয়। এরপরেও, আমরা সেই সপ্তখণ্ডকে নিয়ে কি করতাম, তাই মাতার কাছে উপনীত হতে, মাতা সেই সপ্ত অঙ্গকে একত্রে ধারণ করে, তোমাকে এক পূর্ণাঙ্গ পুরুষসন্তান রূপে স্থাপন করেন। তাই সার্বিক ভাবে, ইনি তোমার মাতা। পুত্র হয়ে নিজের মাতাকে কি ভাবে বিবাহ করতে পারো পুত্র!”
কামাতুরতার কারণে মদে আচ্ছন্ন চন্দন এই কথা শুনে অন্তর থেকে বিচূর্ণ হয়ে গেলেও, তাঁর কামাতুরতা তখনও তাঁর মস্তিষ্ককে জাগ্রত ও হৃদয়কে তরান্বিত করে রেখে দিয়েছিল। তাই তিনি বললেন, “মাতারা, আপনাদের কথন অনুসারে, আমি এমন কিছু কর্ম করে ফেলেছি, যাকে অপকর্মই বলা চলে। কিন্তু মাতারা, এরপরেও আমি বলবো, এক্ষণে আমি বাধ্য তাঁকে বিবাহ করতে, কারণ সে আমার সম্মুখে বিবাহের জন্য শর্ত স্থাপিত রেখেছিলেন, আর আমি সেই শর্তাবলিকে মান্যতা প্রদান করার বচন প্রদান করে দিয়েছি। আমি এই রাজ্যের আগামী রাজা। সেই রাজাই যদি নিজের বচন থেকে অপসারিত হয়ে যায়, তাহলে প্রজা যে অধঃপতনে পতিত হবে। তাই আমি তাঁকে বিবাহ করতে বাধ্য।
আর দ্বিতীয় কথা এই যে, ইনাকে বিবাহ করার সিদ্ধান্তে আমি অনুতপ্তও নই। ভূমি, নদী এবং ঈশ্বর সেই মাতা, যারা একাধারে মাতা, প্রেমিকা ও দুহিতাও। ভূমি নিজের গর্ভে বীজ ধারণ করে বৃক্ষকে জন্ম দিয়ে তাঁর জননী, আবার সেই বৃক্ষেরই বীজ ধারণ করে, তাঁর পত্নী। একই ভাবে, নদীও নিজের গর্ভেই মৎস্যের জন্ম দিয়ে তাঁদের জননী, আবার সেই মৎস্যদেরই অণ্ড ধারণ করে, তাঁদের পত্নী। আর ঈশ্বর! তিনি তো সকল স্ত্রী। তাই মাতাও তিনি, ভগিনীও তিনি, প্রেমিকাও তিনি, আবার দুহিতাও তিনি। তাই মাতারা, আমি ইনাকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিন্দুমাত্রও অনুতপ্ত নই”।
সপ্তমাতা চিন্তিত হয়ে বললেন, “কিন্তু পুত্র, নিজের জননীকে বিবাহ করার কর্মফল যে বিক্ষিপ্ত হতে পারে! এমনও হতে পারে যে, তোমার কুলই বিনষ্ট হয়ে যাবে, তোমার এই অপকর্মের কারণে!”
চন্দন মৃদুহাস্যে বললেন, “না মাতা, এই চন্দনের অপকর্মের কারণে তা হলেও হতে পারতো, কিন্তু যেকালে স্বয়ং দেবী জগদ্ধাত্রী এই রাজ্যের রক্ষক, সেই কালে এই রাজ্য বিনষ্ট হবেনা, তা সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত। হ্যাঁ হতে পারে, এর ভাবিকালে এমন কিছু বিক্ষিপ্ততা অবস্থান করবে, যা সহজাত নয়, তবে এঁর বিনাশ হবেনা, এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। নিজের প্রতি আস্থার কারণে আমি এই কথা বলছিনা মাতারা, বরং দেবী জগদ্ধাত্রীর যেই পরিচয় আমি লাভ করেছি, তাঁর প্রতি আমার এই আস্থা।
হ্যাঁ, সঠিকই বলেছেন আপনারা। আমার কর্মের কর্মফল আমাকে লাভ করতেই হবে। আর তা যে সুখদ হবেনা, তা আমি বেশ বুঝতে পারছি। তবে, আপনারা যখন দেবী জগদ্ধাত্রীর প্রকৃত পরিচয় প্রদান করলেন আমাকে, তখন আমার তাঁর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস অধিক হয়ে গেছে। আমি জানতাম না যে তিনি আমার জননী, কিন্তু তিনি জানতেন আমি তাঁর সন্তান। আমি কামাতুরতায় মদমত্ত হয়ে গেছিলাম, কিন্তু তিনি তা হননি। এরপরেও, তিনি নিজের সন্তানের কামাতুরতাকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্তে উপনীত হন, নিজসন্তানের অন্তরে থাকা বিষকে স্বয়ং গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
হ্যাঁ মাতারা, আমি তাঁর প্রতি অভিভূত। তাঁর বাৎসল্যে আমি এক্ষণে কামাতুরতায় গ্রস্ত নই, বরং তাঁর প্রতি প্রেম অনুভব করছি। তাঁর প্রতি অপার সম্মান অনুভব করছি। জানি তিনি আমার কাছে সীমিত সময় থাকবেন, কিন্তু আমার প্রাণ আমাকে বলছে, এই সামান্য কিছুদিন তাঁর সাথে সময় কাটাতে পেরে আমি ধন্য কারণ তাঁর প্রেম অনির্বচনীয়। আমার হৃদয় আজ বলছে, যার অপার রূপসৌন্দর্যও তাঁর প্রেমের কাছে অতিনগণ্য, তাঁর প্রেমকে তাচ্ছিল্যের সাথে লাভ করেও সে ধন্য।
জানি মাতারা, আমার কর্মের কর্মফল হবে, আর আমাকে তা ভোগ করতেও হবে। তবে এইক্ষণে আমার সেই কর্মফলের প্রতি না তো ভীতি জন্ম নিচ্ছে, আর না দুশ্চিন্তা। আমার এই ক্ষণে কেবলই জগতের শ্রেষ্ঠ প্রেমিকার প্রেম লাভ করার জন্য প্রাণ ব্যাকুল হচ্ছে। আমি জানি, আমার কর্মের জন্য আমার অনুতপ্ত হওয়াই শোভনীয়, কিন্তু বাস্তব এই যে, যাকে মা করে লাভ করেও পাইনি, তাঁকে প্রেয়সী করে লাভ করতে পেরে, আমার এমন মনে হচ্ছে যেন আমার সমস্ত জনম ধন্য হয়ে যেতে চলেছে, এই কিয়তদিবস তাঁর সঙ্গ লাভ করে”।
সপ্তমাতা চিন্তিত হয়ে বললেন, “বেশ পুত্র, একটি বচন আমাদেরকেও দাও তাহলে। তোমার বিরোধিতা আমরা করবো না, কিন্তু তুমিও দেবী জগদ্ধাত্রীর প্রকৃত পরিচয় তোমার পিতাকে প্রদান করবেনা, কারণ তোমার পিতা তোমার জন্মের ইতিবৃত্ত স্বয়ংও জানেন না। তিনি এও জানেন না যে, তোমার জন্ম তাঁর বীর্যে নয়, মা জগদ্ধাত্রীর আশীর্বাদে লব্ধ হয়েছে। তাঁর প্রতি আমরা কখনোই বিরূপ ছিলাম না। আর তাঁকে উপেক্ষাও আমরা কখনো করিনি। কিন্তু আমাদের এই কর্ম এই বৃদ্ধ অবস্থায় তিনি জানলে, তিনি এমনই মেনে দেহত্যাগ করবেন যে আমরা তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি।
পুত্র আমাদের তাই বচন দাও যে, তোমার পিতাকে জগদ্ধাত্রীর প্রকৃত পরিচয় জানতে দেবেনা। আমরা চাইনা যে দেহত্যাগ করার কালে তিনি হৃদয়ে বেদনা নিয়ে যাত্রা করুন। আমরা চাই তিনি আনন্দের সাথে দেহত্যাগ করুন, যাতে করে পরের দেহে তিনি অত্যন্ত প্রফুল্লচিত্ত ও হৃদয়বাণ হয়ে জাত হন। দাও আমাদেরকে এই বচন পুত্র”।
চন্দন সেই প্রতিশ্রুতি প্রদান করলে, দেবী জগদ্ধাত্রী ও চন্দনের বিবাহ হয়। বিবাহের কিছুদিনের মধ্যেই মহারাজের মৃত্যু হতে, চন্দন সেই রাজ্যের মহারাজ হয়ে ওঠেন। তারও কিছুকালের মধ্যে, সপ্তমাতা দেবী জগদ্ধাত্রীর কাছে এসে বলেন, “মাতা, পুত্রের কর্মের কারণে কায়মনবাক্যে যাকে মাতা জেনেছি, তাঁর কাছে পৌত্রের জন্মদাত্রীবেশে আবদার করতে আমাদের দ্বিধা হচ্ছে। কৃপা করো আমাদের উপর। আমাদেরকে কন্যা জেনেই, তোমার মধ্যে ধারণ করে নাও। আমরা আর দেহী রূপে থাকতে অনিচ্ছুক”।
মাতা জগদ্ধাত্রী তাই সপ্তমাতাকে নিজের মধ্যে স্থান দিলে, স্বয়ং দেবী জগদ্ধাত্রীই চন্দনের নগরে রাজমাতা হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে, বিবাহের প্রথমার্ধে চন্দন দেবী জগদ্ধাত্রীর প্রতি প্রেমাঞ্জলি প্রদান করতে থাকার ফলে, তাঁর প্রথম পুত্র জগদ্ধাত্রীরূপ হন, যার নাম তিনি রাখেন পদ্মচিত্ত। কিন্তু অতঃপরে, তাঁর কামাতুর স্বভাব সম্মুখে এসেই যায়, আর তার ফলে, দ্বিতীয় সন্তানের জন্মক্ষেত্রে, চন্দন অত্যন্ত কামাতুর হয়ে ওঠেন, এবং তাই সেই কামমত্ততা থেকে জাত দ্বিতীয়সন্তানের নাম তিনি রাখেন করিমুণ্ড।
পদ্মচিত্ত ও করিমুন্ডকে জন্ম দেবার পর, দেবী জগদ্ধাত্রীর বিদায়ের ঘড়ি আসন্ন। এই দীর্ঘ ৭ বৎসর দেবীর সান্নিধ্য লাভ করে, আপ্লুত ও আনন্দিত চন্দন। তাই চন্দন দেবীর সম্মুখে এসে বললেন, “দেবী, আমার স্মরণ আছে আমার বচন আর আপনার শর্ত। তাই আমি জানি যে, এবার আপনার বিদায়ের পালা। কিন্তু দেবী, আমি আজ এই বলতে চাই যে, যা কিছু আপনি আমাকে প্রদান করেছেন, যেই প্রেম আপনি প্রদান করেছেন আমাকে, আমার কামাতুরতাকে কি ভাবে আপনি এক জননীর মত করেই সহ্য করে গেছেন, তার কারণে আমি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে ব্যকুল আপনার প্রতি।
তাই দেবী, আমি একটি প্রথা শুরু করতে চাই এই চন্দনের নগরে। আজ আমি স্বয়ং আপনাকে বিসর্জন দেব, কিন্তু সেই বিসর্জনের পূর্বে, আপনাকে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা উপহার স্বরূপ প্রদান করতে চাই। এই ৭ বছর আপনার সঙ্গ লাভ করে, আমি এটুকু তো জেনে গেছি যে, আপনি কেবল নদী নন। নদীরূপ ধারণ করে আপনি তো কেবল আমাদের উপর প্রেমবর্ষণ করেন। প্রকৃতপক্ষে আপনিই যে মাতা সর্বাম্বার এক মহাপ্রকাশ, এবং স্বয়ং জগজ্জননী পরমেশ্বরী, সেই সত্য আমার কাছে আর গোপন নয়।
তাই মাতা, আপনার এই বিসর্জন শোভাযাত্রাকে আমি এই চন্দন নগরের ঐতিহ্য করে যেতে চাই, যাতে বছরের পর বছর, এই নগরের অধিবাসীরা আজকের এই দিনটি স্মরণ রেখে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে আপনার বিসর্জন অনুষ্ঠান করে। মাতা, বিলাপ নয় এটি। বরং ধন্যবাদ জ্ঞাপন বলতে পারেন। এই ৭টি বছর আপনি কেবল আমার সঙ্গিনী হয়ে ছিলেন না, বরং সমস্ত নগরবাসীর হৃদয়ের জননী হয়ে ছিলেন। তাই সকলের তরফ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ এই ৭টি বছর আমাদের এই অপার স্নেহ প্রদান করার জন্য।
তাই মাতা, অনুমতি প্রদান করুন আর বচন প্রদান করুন যে, আপনি এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা গ্রহণ করবেন, আর প্রতিবছর এই দিবসে নগরবাসীকে এই শোভাযাত্রার ভার বহন করার সামর্থ্য ও সদ্ভাব প্রদান করতে থাকবেন। মা, তোমার আমাদের জীবনে আগমন ও সময় জ্ঞাপনকে আমরা সর্বকাল এক উৎসব রূপে স্মরণ করতে চাই। অনুমতি দাও হে জগন্মাতা, আর আমি তোমার উপর যে আমার কামাতুরতা দ্বারা অত্যাচার করেছি এই কয় বছর, তাকে ক্ষমা করে দাও, সন্তান জ্ঞানে”।
দেবী জগদ্ধাত্রী হাস্যমুখে বললেন, “আজ তুমি পতি বেশে নয়, পুত্র বেশে সম্মুখে উপস্থিত। তাই পুত্র বলেই সম্বোধন করছি চন্দন তোমাকে। পুত্র, তুমি কিছু কর্ম করেছ, যার বিরূপ কর্মফলও হবে, আর তা তোমাকে গ্রহণ করতেই হবে। তুমি স্বয়ংও সেই বিষয়ে জানো, আর আমি এও জানি যে, তা জেনেও তুমি নিজের কর্ম থেকে চ্যুত হওনি, কারণ তুমি আমার সঙ্গ পেতে চেয়েছিলে, আর তোমার নগরবাসীকে আমার সঙ্গ প্রদান করতে চেয়েছিলে।
পুত্র, যদি মাতাকে পত্নীবেশে লাভ করে, তাঁকে কামগন্ধে ভূষিত করা অপকর্ম হয়, আর তার কর্মফল তোমাকে গ্রহণ করতে হয়, তবে মাতাকে হৃদাসনে স্থান দেওয়াও একটি কর্ম, আর তারও কর্মফল অবশ্যই এক প্রাপ্তি। তাই পুত্র, সেই কর্মের কর্মফলস্বরূপ, আমি তোমাকে দুটি প্রতিশ্রুতি প্রদান করছি। আমার প্রথম প্রতিশ্রুতি এই যে, তোমার বংশকে আমি কখনোই বিলুপ্ত হতে দেবনা। প্রয়োজনে আমি আমার স্বরূপ, অর্থাৎ সর্বাম্বা বেশেও যুক্ত হবো, তোমার বংশকে সঠিক মার্গ প্রদান করে রক্ষা করতে।
আর দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি এই যে, যতকাল তোমার নগরবাসী এই জগদ্ধাত্রীকে নিজের ঐকান্তিক আপন মাতা, কন্যা বা প্রেয়সী জ্ঞানে নিজেদের হৃদয়ের কন্দরে রাখবেন, ততকাল আমি তাঁদের এই নগরে এই বিসর্জন শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হতে দেব, অতি বর্ণাঢ্য ভাবে। হ্যাঁ, এতে বহুপ্রকার বাঁধা আসবে, কিন্তু আমি প্রতিশ্রুতি প্রদান করছি তোমাকে চন্দন, তোমার নগরবাসীরা যদি আমাকে দেবী জ্ঞান না করে, আপন প্রিয়জন জ্ঞান করতে থাকেন, তাহলে আমি তাঁদেরকে সর্বদা সেই শক্তি প্রদান করবো যার দ্বারা তাঁরা শোভাযাত্রার বিরুদ্ধে যতপ্রকার বাঁধা উপস্থিত হয়, তার বিরোধ করতে পারে, এবং আমার বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করতে পারে”।
চন্দনের নেত্রে অশ্রু। সে গদগদ হয়ে দেবী জগদ্ধাত্রীর সম্মুখে উপস্থাপন করে বললেন, “কামাতুর হয়েছি তোমার অপার রূপের প্রতি। তাই নিজেকে আজ ঘৃণা করতে ইচ্ছা করছে মা। জগজ্জননী তুমি, তা উপলব্ধি করেও, একটিবারও তোমার কমলপুষ্পের ন্যায় চরণের সেবা করিনি। তাই নিজেকে আজ ধিক্কার দিতে ইচ্ছা করছে মা। মা, আজ বলতে ইচ্ছা করছে আমার নগরবাসীকে যে, তোমাদের মহারাজ মহান নয়। মহান তো মা জগদ্ধাত্রী, যিনি জগজ্জননী হয়েও, নদী বেশে তোমাদের সর্বদা সেবা করে ফেরেন, যিনি মাতা হয়েও পুত্রের কামাতুরতার বিষ অনায়সে গ্রহণ করেন।
তাই মা, আজ তোমাকে সাধারণ বেশে নগরপরিভ্রমণ করাতে মন চাইছে না। ইচ্ছা হচ্ছে, তোমাকে বিশাল বেশে স্থাপন করি, আর স্বকণ্ঠে সকলকে বলি, এই দেখো তোমাদের আরাধ্যা, এই দেখো তোমাদের জননী, এই দেখো তোমাদের প্রিয়তমা, তোমাদের সর্বকালের জননী, সর্বকালের দুহিতা। ইনি তোমাদের মধ্যে ছিলেন, প্রকৃতঅর্থে তিনি পরমেশ্বরী, ব্রহ্মময়ী জগদ্ধাত্রী মাতা। … আজ মা, খুব ইচ্ছা করছে যে, নিজের নগরের সকলের মুখে কেবলই তোমার নাম শুনতে, আর ইচ্ছা হচ্ছে যেন আমার নাম কেউ বলতে কেউ না নেয়”।
মাতা জগদ্ধাত্রী হাস্যবেশে, বিশালকায় রূপ ধারণ করলে, চারদিন ব্যাপী, সমস্ত নগরবাসী তাঁকে নিজেদের মাতা, নিজেদের কন্যা, নিজেদের হৃদয় জ্ঞানে আরাধনা করে, পরম যতনে, তাঁকে নিজেদের স্কন্ধে ধারণ করে, আলোক, পুষ্প ও সুমিষ্ট ধ্বনির সাহায্যে শোভাযাত্রার বেশে ভ্রমণ করিয়ে, চোখের জলে তাঁর বিসর্জন দিলেন, এবং সকলে “জয় মা জগদ্ধাত্রী! আসছে বছর আবার হবে!” এই উচ্চারণের উচ্ছ্বাসে গৃহে ফিরলেন পরের বছর পুনরায় মায়ের আরাধনা ও শোভাযাত্রা করবেন, এই প্রতিশ্রুতি হৃদয়ে ধারণ করে।
