১৩.৩। পুংরাজ্য পর্ব
ছন্দ তাঁর মাতার কথাতে আশ্বস্ত হলে, রাজা সহিষ্ণু তাঁদেরকে তাঁদের অন্তঃসত্ত্বা দুই পত্নী ও মাতা সহ নিয়ে গেলেন পংরাজ্যে। অদ্ভুত সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এই পংরাজ্য। পর্বতের শিখর পেরিয়ে, দুই পর্বতের মধ্যবর্তী সবুজে ঢাকা সেই স্থানে যাবার সময়ে, অদ্ভুত কিছু দৃশ্য দেখে, ছন্দ ও তাঁর পরিবার সম্পূর্ণ ভাবে ভাষাশূন্য হয়ে যেতে থাকলেন। পর্বতের শান্ত নির্জন বন ধারণ করে যখন তাঁরা পর্বতে উঠতে শুরু করলেন, তখন দেখলেন খরস্রোতা নদীটিও যেন প্রকৃতির রঙে রঙ্গিন হয়ে সবুজ বর্ণ ধারণ করেছে।
আর সেই সবুজ নদীটি যেমন যেমন আঁকাবাঁকা পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছেন, তাঁরাও সেই পথেই চলছেন, কিন্তু সমানে নদীর থেকে নিজেদের উচ্চতায় দূরত্ব অধিক করতে করতে এগিয়ে চলেছেন। পাথরের অঙ্গঘেঁষা বনের মধ্যে একাধিক সুন্দর দেখতে পুষ্প শোভিত, যাদের অধিকাংশই মানব দেহের বিভিন্ন রোগের নিরাময়ের উপাদান। প্রকৃতির এই সমস্ত কিছুর সম্বন্ধে সুরের জ্ঞান থাকে, তবে এক্ষণে সে ছন্দদের সাথে নেই। তবে পদ্মিনী ও নলিনীরও এই বিষয়ে অগাধ ধারণা।
তাই তাঁরা সেই সমূহ অনেক পুষ্প উৎপাটন করে করে নিজেদের সাথে রাখতে থাকলেন, আর বললেন, তা তাঁদের পড়ে কাজে আসবে। পর্বতের উচ্চতায় উন্নীত হবার আগে সকলেই জলপান করে নিয়েছিলেন, কারণ উচ্চতায় উঠে গেলে জলপানের জল পাওয়া কঠিন হবে। পিপাসার টান তাও সম্মুখে এসে যায় তাঁদের। তবে পর্বতের শিখরে উন্নীত হবার সময়ে অঙ্গে যখন বলাহকের আদুরে স্পর্শ অনুভব করতে থাকলেন সকলে, সেই স্পর্শ যেন তাঁদের সমস্ত পিপাসা, ক্ষুধা তথা শ্রমকে ভুলিয়ে দিতে থাকলো।
পর্বত আরোহণের শেষে, যখন তাঁরা পর্বতের শীর্ষে উন্নীত হলেন, তখন দেখা পেলেন পংরাজ্যের। সুন্দর, অতি সুন্দর সেই রাজ্য, যেখানে বাড়িঘর সমস্তই একটির থেকে একটি বেশ দূরত্বে স্থিত। অর্থাৎ সেখানে বসাবাসকারীর সংখ্যা কম, তবে সহিষ্ণুর কথা অনুসারে, এরা একাকজন ভয়ানক যোদ্ধা। যেমনি তাঁদের গতি, তেমনি তাঁদের দক্ষতা ও দম। তবে একটি সমস্যা আছে, আর তা হলো রাজা সামন্ত, যিনি পং রাজ্যের অধিরাজ, তাঁর দুই শ্যালক গজ ও চমরী বৈদিকদের দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত, কারণ তাঁরা আত্মপূজারিও নন, আত্মপ্রেমী।
এই দুই শ্যালকদের দ্বারাই রাজা পরিচালিত, কারণ এঁরা এতটাই শক্তিশালী যে, এঁদের কথন না শুনে চললে, রাজা সামন্ত যেকোনো সময়ে সিংহাসন হারিয়ে ফেলবেন, আর একবার যদি এই দুই শ্যালক সিংহাসনে স্থিত হয়, তবে প্রজার মধ্যে একটি স্ত্রীও নিজেদের মানকে নিজের পতির জন্য সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম থাকবেনা। তাই একপ্রকারে রাজা সামন্ত বাধ্য হয়েই বৈদিকদের অনুগামী।
তবে রাজা অত্যন্ত দয়াবান, এবং অনুভবি, এবং যতদূর তাঁর সাথে আলাপ হয়েছে রাজা সহিষ্ণুর, সেই অনুসারে তিনি অন্তরে অন্তরে মাতা সর্বাম্বার প্রতি অনুরাগীও। কিন্তু তা সম্যকে বলার সাহস তাঁর নেই, বিশেষত প্রজাস্বার্থের চিন্তা করেই।
রাজা সহিষ্ণুর এমন কথন শুনে ছন্দ বেশ অনুভবি হলেন, আর তাল অন্তরে অন্তরে হিসাব কষলেন যে, এই দুই শ্যালকের থেকে রাজাকে মুক্ত করলে, সহজেই তাঁকে বন্ধুরাজ্য রূপে স্থিত করা সম্ভব হবে। এমন বিচার করেই যখন পর্বত থেকে নিচে অবতরণ করতে শুরু করলেন সকলে, তখন দেবী পদ্মিনী ও নলিনীকে শক্ত ভাবে ধরে থাকতে হয়, কারণ তাঁরা অন্তঃসত্ত্বা হবার কারণে কিছুতেই এই পাহাড়ে অবতরণ করার সময়ে নিজের দেহভার সঠিক রাখতে পারছিলেন না।
সেই দেখে, তাল নিজের পত্নী, দেবী নলিনীকে নিজের স্কন্ধে ধারণ করে নেন, আর দেবী চিত্তা শক্ত ভাবে দেবী পদ্মিনীকে ধরে থাকেন, যাতে কনো বিপদ না হয়। আর এই ভাবে যখন রাজা সহিষ্ণুর সাথে সকলে পংরাজ্যে গমন করলেন, তখন রাজ্যের দ্বারে স্বয়ং রাজা সামন্ত অপেক্ষা করছিলেন, কারণ তাঁর কাছে রাজা সহিষ্ণুর আগমনবার্তা ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছিল।
রাজা সহিষ্ণুই পরিচয় করিয়ে দেন দেবী চিত্তা ও তাঁর পুত্র তথা পুত্রবধূদের সাথে। সেই শুনে, রাজা সামন্ত বললেন, “আমি আপনাদের দেখিনি তো ঠিকই, তবে আপনাদের ব্যাপারে অনেক কিছু শুনেছি। আপনাদের সুব্যবহার এবং সুশাসনের কথাও অনেক শুনেছি আমার প্রজাদের থেকে, যারা এখানের বিখ্যাত লেবুফল সংগ্রহ করে নিম্নতলে বাণিজ্য করতে যাত্রা করে। তাই নিশ্চিন্তে থাকুন, আপনারা যতদিন খুশী আমার রাজ্যে থাকতে পারেন। এখানে আপনাদের কনো প্রকার অসুবিধা হবেনা”।
রাজ্যে প্রবেশ করে আতিথেয়তা প্রদান করে, রাজা সামন্ত বললেন, “আচ্ছা, শুনেছি আপনাদের ঘনিষ্ঠ মাতা সর্বাম্বা নাকি বৈদিকদের ঈশ্বর, মহারাজ আত্মকে হত্যা করেছিলেন!”
ছন্দ হেসে বললেন, “মহারাজ, দুটি কথা বলতে পারি, যদি অভয় দেন। … প্রথম কথা এই যে, ঈশ্বর কখনো বৈদিক, বৈদান্তিক, ইসলাম, কৃতান্তিক, কারুর ক্ষেত্রে আলাদা হতে পারেনা, কারণ একাধিক কেউ ঈশ্বর হতেই পারেন না। … আপনি তো জ্ঞানী। তাই আশা করি আমার কথার অর্থ যথার্থ ভাবে অনুধাবন করতে পারবেন মহারাজ। তাই বলি, আচ্ছা মহারাজ, আপনিই বলুন ঈশ্বরের অতিসাধারণ গুণ কি? … এই না যে সে অনন্ত, সে অসীম!”
মহারাজ সামন্ত সেই কথাতে সায় দিলে, ছন্দ পুনরায় বললেন, “তাহলেই বলুন, যদি একাধিক ঈশ্বর হন, তবে একজনের সীমা তো অন্যজন, একজনের অন্ত তো অন্যজনের উপস্থিতিই। তাহলে একাধিক ঈশ্বর কি করে হতে পারে। আর যদি হন, তাহলে ঈশ্বর কি ভাবে অনন্ত বা অসীম হতে পারেন! … অর্থাৎ মহারাজ ঈশ্বর একাধিক কখনোই নেই, আর না তা ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে ভিন্ন। ঈশ্বর এক ও অভিন্ন। হ্যাঁ তাঁকে কেউ প্রত্যক্ষ করেছে, যেমন বৌদ্ধ ও কৃতান্তিক; তাঁকে কেউ নিকটতম ভাবে ধারণা করেছে, যেমন ইসলাম; তাঁকে কেউ বিচার করে ধারণা করেছে, যেমন উপনিষদ বা বেদান্ত; আবার তাঁকে কেউ কেউ কেবলই কল্পনা করেছে, যেমন বেদ।
আর সেই কারণেই, তাঁকে সকলে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করেছে। যে প্রত্যক্ষ করেছে তাঁকে, সে বলেছে তিনি নিরাকার, নির্বিকার, মহাশূন্য, কিন্তু তাঁরই চেতনাকে আত্মনামক ভ্রম দখলকরে অধিকার দ্বারা বেঁধে রাখার প্রয়াস করে বলে, তাঁদেরকে মুক্ত করতে তিনি প্রকৃতি, কালী বা নিয়তি এবং চেতনাবেশে বিকারে ও আকারে অবস্থান করেন, যেমন কৃতান্তিক ও বৌদ্ধ।
যে তাঁকে প্রত্যক্ষ করেনি, অথচ তাঁকে অনুভব করেছে, যেমন ইসলাম, সে বলেছে তিনি নিরাকার, কিন্তু তিনিই কর্তা, তিনি বিনা দ্বিতীয় কনো কর্তা হয়ই না। যিনি তাঁকে অনুভবও করেন নি, কিন্তু অনন্ত বিচার করে করে তাঁকে শ্রেষ্ঠ সম্ভব অনুভব করেছেন, যেমন উপনিষদ বা বেদান্ত, তাঁরা বলেছে তিনি সম্পূর্ণ ভাবে শূন্য আর বাকি সমস্ত কিছুই মিথ্যা বা ভ্রম। আবার যে তাঁকে অনুভবও করেননি, প্রত্যক্ষও করেন নি, আবার বিচার দ্বারা ধারণাও করেন নি, তিনি ঈশ্বরকে সনাক্ত করতেও সক্ষম হননা, তিনি যেই আত্মসর্বস্ব হয়ে বিরাজমান, সেই আত্মকেই অতিকায় ধারণ করে নিয়ে, তাকেই পরমেশ্বর জ্ঞান করে, তাকে ঈশ্বর জ্ঞান করে অবস্থান করেন।
অর্থাৎ মহারাজ, ঈশ্বর তো দুই কখনোই নন। তিনি শূন্যস্বরূপ ব্রহ্মই কেবল, যার কনো দুই নেই। আর তিনিই তাঁর চেতনাকে আঁকড়ে ধরে, যেই ভ্রম অর্থাৎ আত্মবোধ ছিনিয়ে নেবার প্রয়াস করে নিজেকে ঈশ্বররূপে স্থাপন করতে চান, তাঁর থেকে সমস্ত চেতনাকে মুক্ত করতে ব্রহ্মময়ী বেশে, প্রকৃতি, কালনিয়ন্তা বা কালী বা নিয়তি।
আর দ্বিতীয় কথা মহারাজ, আপনি বৈদিক ধারা অনুসারে, তাঁর নাম উচ্চারণ করছেন ঈশ্বর, আর অন্যদিকে বলছেন তাঁর হত্যা করা হয়েছে! … হে মহারাজ, ঈশ্বর যে অক্ষয়, তাঁর কি হত্যা সম্ভব! … তিনি স্বেচ্ছায় দেহধারণ করেন জীবকে মার্গ প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যে, আর স্বেচ্ছায় সেই দেহ ত্যাগও করেন। তাঁর হত্যা কেউ কি করে করতে সক্ষম! যদি কেউ সক্ষম হন তাঁর হত্যা করতে, তিনি ঈশ্বর কি করে হতে পারেন? তিনি তো নশ্বর!
মহারাজ, মাতা সর্বাম্বা এই কারণেই আত্মের হত্যা করেছিলেন, কারণ তিনি তাঁর সমস্ত সন্তানদের বলতে চেয়েছিলেন যে, যেই আত্মকে তাঁরা সকলে ঈশ্বর জ্ঞান করে বসে রয়েছেন, সে ঈশ্বর কখনোই নয়, সে নশ্বর, আর তাই তো তার হত্যা সম্ভব হলো। অর্থাৎ বুঝতে পারছেন, এক অদ্ভুত ভ্রমের আবেশ নির্মাণ করে রেখেছিল বৈদিকরা, আর সেই আবেশকে বিনষ্ট করার জন্যই, সেই ভ্রমের কারাগারকে ভেদ করার জন্যই ব্রহ্মময়ী মাতা সর্বাম্বার দেহধারণ করে এসে, তাঁর কৃতান্ত লীলা প্রদর্শন করলেন।
আর এর থেকেও বড় একটি প্রসঙ্গ আমার কাছে উপস্থিত মহারাজ। এই পাহাড়ের অঞ্চল যে সর্বকালেই বৌদ্ধদের দর্শনদ্বারা উদ্ভূত ছিল। আজ তাঁদের মুখে এই বৈদিক আর্যদের ন্যায় আত্মকথা শুনে কেমন যেন নিজের কর্ণকেই অবিশ্বাস হচ্ছে! … মনে হচ্ছে যেন এর অন্তরালে এক বিকট রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। কি সেই রহস্য মহারাজ!”
মহারাজ সামন্ত সেই কথাতে একটু অপ্রস্তুত হয়ে উঠলে, নিজের অপ্রস্তুতি ঈষৎ সামলে নিয়ে বললেন, “আপনারা অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসেছেন। বিশ্রাম করে নিন একটু, তারপর না হয় পদব্রজে রাজ্য দর্শন করার সময়ে এই বিষয়ে কথা বলা যাবে!”
ছন্দও বুঝতে পারলেন মহারাজ সামন্তের সঙ্কট কি নিয়ে। তাই সেই বিষয়ে কথা না বাড়িয়ে পরিবার নিয়ে অন্দরমহলে চলে গেলেন। অন্যদিকে, গজ চিত্তাপুত্রদের আগমনের সংবাদ গিয়ে দিলেন চামরীকে, আর পরামর্শ করার উদ্দেশ্যে বললেন, “এখানে চিত্তাপুত্ররা কি করে এলো! ওই কৃতান্তিকদের এখানে আসা, এতো অশুভ সংকেত। … আমাদের বৈদিক আচার কি তবে বন্ধ হয়ে যাবে!”
চমরী বললেন, “যখন বৌদ্ধ আচার অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে পেরেছি আমরা, এই কৃতান্তিকদের তো কনো আচারঅনুষ্ঠানই নেই। এঁদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা কি এমন কঠিন কাজ! … তবে তোমার বিবরণ অনুসারে সুর আর তাঁর ওই সুন্দরী পত্নী আসে নি, তাই না!”
গজ বললেন, “ওদের সঙ্গে দুজন অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আছেন। তাঁদের মত সুন্দরীও তো এই রাজ্যে দ্বিতীয় নেই ভ্রাতা! … বেশ কিছুদিন থাকবে এখানে বোধ হয়। তারাও দুজন, আমরাও দুজন। জমে যাবে বেশ ব্যাপারটা। সন্তান জন্ম দিয়ে দিলে, তারপর তো আমরা তাদেরকে নিয়েই নেবো”।
চমরী বললেন, “ওদের সাথে তাল আছে না! বিশালাকায় চেহারার কেউ নেই ওদের সাথে?”
গজ উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ বেশ বিশাল চেহারার। আর বলশালীও দেখে মনে হলো!”
চমরী মাথা নাড়িয়ে বললেন, “আমাদের ভ্রাতা, বৃহৎব্যঘ্রকে হত্যা করেছে ওই বলশালী। প্রথম ওকে শেষ করতে হবে। সে জীবিত থাকতে, বৃহৎব্যঘ্রের লোভ যেই দুই স্ত্রীর উপর ছিল, পদ্মিনী আর নলিনী, তাঁদেরকে আমরা ছুতেও পারবো না। ওই দুই স্ত্রীদের আমাদের লাগবেই লাগবে। আমাদের ভ্রাতা, বৃহৎব্যঘ্রকে ওই দুই স্ত্রী জম্বুদ্বীপে টেনে নিয়ে গিয়ে, এই চিত্তালের হাতে তার হত্যা করিয়েছিল। তাই এই চিত্তালের হত্যা করে, ওই দুই স্ত্রীকে সম্ভোগ না করতে পারলে, আমাদের ভ্রাতার আত্ম শান্তি পাবেনা”।
গজ বললেন, “কিন্তু হত্যা করবো বললেই তো আর করা যায়না! … ওই বলশালীকে হত্যা করবো কি করে?”
চামরী বিজ্ঞের মত মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, “ওর একটি মেধাবী ভাই আছে, সুর। ভয়ানক বলশালী আর প্রবল মেধা ও গতিশীল। সে যখন সঙ্গে নেই, খুব একটা কঠিন হবেনা চিত্তালকে হত্যা করা। পাহাড়ের জায়গা, সে অয়াকিবহল নয় এই স্থান সম্বন্ধে আর আমাদের এই স্থানের সমস্ত কিছু জানেনা। তাই কনো স্থান যেখানে চোরা খাই আছে, সেখানে পথ আছে বলে এগিয়ে দিলেই হলো। সরাসরি পাহাড় থেকে নিচে। নিশ্চিত মৃত্যু। … লরাই করতেই হবেনা আমাদেরকে”।
গজ বললেন, “উপায় তো খাসা বলেছ ভ্রাতা, কিন্তু সে আমাদের কথা শুনবে কেন?”
চামরী বিদ্রূপের হাস্য হেসে বললেন, “মিত্রতা করতে হবে। তিন বলশালীর অঙ্গাঙ্গী মিত্র হওয়া কনো বড় ব্যাপার না। বলশালীরা আহার প্রিয় হয়েই থাকে। আমরাও আহার প্রিয়, নিশ্চিত ভাবে চিত্তালও আহার প্রিয়ই হবে। তাই আহারকে মাধ্যম করে বন্ধুত্ব করে নিয়ে, একবার সে আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে উঠতে পারলে, আর কি! সামান্য পংএর বিখ্যাত সুরার সাথে এখানের বিখ্যাত তাম্বূলপত্রের রস মিশিয়ে দিলে, সব কিছু এক দেখবে। তখন খাইকেও পথ দেখবে সে, আর সরাসরি খাইয়ের নিচে!”
গজ মজা ও বিদ্রূপের ভাবকে একত্রিত করে উচ্চকণ্ঠে হাস্য হেসে উঠে বললেন, “ভ্রাতা, যোজনা নির্মাণে তুমি সিদ্ধহস্ত। চলো তাহলে আজ বৈকালেই বন্ধুত্ব সেরে ফেলি। … অন্তসত্বা এখন স্ত্রীরা। তাই সময় তো আছেই। যতক্ষণ না তারা সন্তানের জন্ম দিচ্ছে, ততক্ষণ বৃহৎব্যঘ্রের হয়ে সম্ভোগ তো করতে পারবো না তাদেরকে। তাই সেই সময়কালে আমাদের মিত্রতাকে পাকাপোক্ত করে নেওয়া যাবে। কি বলো!”
চামরী হেসে বললেন, “গজ, তোমার নিজের বুদ্ধি তো নেই। কিন্তু আমার ষড়যন্ত্রকে কি ভাবে তুমি বুঝে ফেলো বলো তো?”
গজ হেসে বললেন, “ভ্রাতা, দুই প্রকার বুদ্ধি হয়, একটি হয় রচয়িতার বুদ্ধি, যা তোমার আছে। আর আরেকটা হলো রচনা কে অনুভব করার বুদ্ধি, যা আমার আছে”।
চামরী মাথা ও ভ্রু নাচিয়ে বললেন, “ভেবে দেখো গজ। এই চিত্তাল হলো তোমার মত। তার ভাই, সুর যা রচনা করে দেয়, সে তা অনুভব করে নিতে পারে। কিন্তু সুর একাধারে দুই প্রকারই বুদ্ধি ধরে, এমনই শুনেছি। একদিকে সে রচনার বুদ্ধিও ধরে, আবার অন্যদিকে রচনা অনুভব করার বুদ্ধিও ধরে। সে যদি এখানে থাকতো, ভেবে দেখো আমাদের কাজ কতটা কঠিন হতো!”
গজ বললেন, “আচ্ছা ভ্রাতা, তাহলে আমরা কি সম্রাট করিন্দ্রকে এঁদের ব্যাপারে কিচ্ছু বলবো না!”
চামরী বিটকেল একটি হাসি হেসে বললেন, “এখন কিচ্ছু বলবো না। … আগে চিত্তালকে হত্যা করি, তারপর তার শবদেহ নিয়ে চলে যাবো করিন্দ্রের কাছে। আর তার চিরশত্রুর শবদেহ দেখিয়ে, রাজা সহিষ্ণুর রাজ্য আর মালদ রাজ্য দাবি করে নিয়ে আসবো। আমরা দুই ভ্রাতা দুই রাজ্যে রাজত্ব করবো, আর সঙ্গে রাখবো আমাদের সহস্র সন্তানকে যারা জন্ম দেবে, বৃহৎব্যঘ্রের প্রেমিকাদ্বয়, পদ্মিনী আর নলিনী”।
গজ পুনরায় মজা ও বিদ্রূপের ভাষা এক করে অট্টহাস্য প্রদান করলে, এবার তার সাথে চামরীও সুর মেলালেন, এবং নিজেদের যোজনাকে স্থির করে নিলেন।
অন্যদিকে, বিশ্রাম পর্বের সমাপ্তি হলে, রাজা সহিষ্ণু, রাজা সামন্ত ও ছন্দ বিহারে নির্গত হলেন, এবং সমস্ত পংরাজ্যকে ভ্রমণ করতে থাকলেন। সেনা শিবির দেখলেন সকলে, আরাধনার স্থল দেখলেন, যাতে স্পষ্ট ভাবে বৌদ্ধ সংস্কৃতির চিহ্ন থাকলেও, তাতে বর্তমানে বৈদিক আচার অনুষ্ঠান চলে। সেই দেখে, ছন্দ পুনরায় পূর্বের বিষয়ের উত্থান করলেন, আর বললেন, “মহারাজ সামন্ত, আপনাদের এই আরাধনার স্থানটিকে দেখে কনো ভাবেই বৈদিক বা আর্যদের পূজার স্থান মনে হচ্ছেনা, বরং তা অতি প্রাচীন বৌদ্ধ সংস্কৃতির ছাপ প্রত্যক্ষ করছে। একি আমার ভ্রম, নাকি এর মধ্যে কনো সত্যতা আছে!”
রাজা সামন্ত মিষ্ট হাস্য হেসে বললেন, “আমার পিতার পিতা এই পংরাজ্যকে স্থাপন করেছিলেন, তবে তিনি ছিলেন বিধর্ব রাজ্যের অধিবাসী, এবং সেখানে তৎকালীন রাজবংশের একটি রাজপুত্র। তিনি এই স্থানে এসেছিলেন, এখানের বিশেষত্ব অর্থাৎ যেই কমলা রঙের লেবু দেখতে পান, তার সন্ধানে। আসলে এখানের আদিবাসীদের থেকে, এই বিশেষ ধরনের মিষ্ট লেবু বিধর্বে যাত্রা করতো প্রায়শই। তারই জনপ্রিয়তা রাজপুত্র মহেন্দ্রকে এখানে টেনে আনে।
তবে তিনি এখানে এসে দেখেন যে, একটি বিচ্ছিন গ্রামে, বেশ কিছু অতিপ্রতিভাবান পুরুষ এবং তাঁদের ঘরণী হয়ে বেশ কিছু অতিপরিশ্রমী স্ত্রীরা নিবাস করছেন, এবং তাঁদের কাছে বলতে গেলে কিছুই নেই। প্রচণ্ড শীতল আবহাওয়ার থেকে জীবিত থাকার উদ্দেশ্যে, মৃত চমরীর পশমকে ধৌত করে, রৌদ্রে শুকিয়ে, তাকে বেশ কিছু ভাগে বিচ্ছিন্ন করে অঙ্গে ধারণ করতেন এঁরা। নিবাস বলতে পাহাড়ের গুহা, আর চারিদিকে এই কমলালেবুর বৃক্ষ।
সেই দেখে, তিনি এই স্থানেই থেকে যান, এবং এখানের অধিবাসীদের কুটির নির্মাণ করে তাতে থাকতে শেখান, ক্ষেত করতে শেখান, বস্ত্র পরিধান করতে শেখান, এবং বৌদ্ধধারা, যেমন আপনি জানেনই রাজা সহিষ্ণু যে, বিধর্বের হাজার হাজার বৎসরের পুরাতন ধর্ম বোধ তা, তা দ্বারা, সকলকে সংসার করতে, শিক্ষা অর্জন করতে, প্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপন করতে, ইত্যাদি শেখান।
সম্রাট ছন্দ, এখানের মানুষ কখনোই কারুর উপকার ভোলেন না, এটিই তাঁদের চরিত্রের সরলতা। আর তাই তাঁরা রাজপুত্র মহেন্দ্রকে এখানের রাজা রূপে বরণ করে, তাঁকে এখানের শাসক করে দেন। পরবর্তী সময়ে, গ্রামবাসীরা পং নামে একটি যুবতীর সাথে রাজা মহেন্দ্রকে বিবাহ করার আগ্রহ করেন, এবং তাঁদের রাজপুত্র প্রদান করে, শাসকের ভূমিকায় তাঁর বংশকেই স্থিত রাখার অনুরোধ করেন।
উন্নত ভাবনার কারণে, দেবী পংকে বিবাহ করেন মহারাজ মহেন্দ্র। এখানের সমস্ত স্ত্রীরাই অত্যন্ত পরিশ্রমী আর দেবী পংও তেমন ছিলেন। আর তারই সাথে দেবী পং ছিলেন, এই স্থানের একজন আদিবাসী যিনি এই স্থানকে নিজের জননীর ন্যায় স্নেহ করতেন। রাজা মহেন্দ্র এই স্থানকে উৎকৃষ্ট করেছেন, আর এখানের মানুষদের উন্নত করেছেন, তাই তিনি অন্তরমন থেকে রাজা মহেন্দ্রের প্রতি স্নেহশিলা ছিলেন, আর তাই তাঁর অপার স্নেহ ও সম্মান রাজা মহেন্দ্রকে এতটাই প্রভাবিত করে যে তিনি এই রাজ্যের নামকরণই করে দেন পং রাজ্য।
আসলে, এই নামকরণের অন্তরালেও কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা আছে। দেবী পং ও রাজা মহেন্দ্রের সঙ্গম প্রায় হতই না। রাজা মহেন্দ্র ছিলেন একজন সংসারে নিবাসী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বলতে পারেন, আর তিনি দেবী পংএর কাছে ছিলেন তাঁর আরাধ্যের মত সম্মানীয় ব্যক্তি। তাই তাঁরা একে অপরকে সেবা যত্ন তথা অপার প্রেম করলেও, তাঁদের মধ্যে যৌন সম্বন্ধ হতই না।
প্রজার অনূরোধের কারণেই একপ্রকার তাঁদের যৌনমিলন হয়, এবং তাঁদের থেকে একটি পুত্রসন্তান হয়, যার নাম পরে মহারাজ মহেন্দ্র রেখেছিলেন শ্রীমান। পরে রেখেছিলেন এমন বলার কারণ এই যে, তাঁর পুত্রকে জন্ম দেবার কালেই দেবী পং দেহত্যাগ করেন। আর তাই মহারাজ মহেন্দ্র, পুত্রের নাম শ্রীমান ও রাজ্যের নাম পংরাজ্য একই দিবসে, একই ঘোষণায় করেন, আর সেই থেকেই এই রাজ্যের নাম পং রাজ্য।
এই পুত্রকে রাজা মহেন্দ্র একাকীই বড় করেন, এবং সিংহাসনে যুবরাজরূপে স্থাপিত করেন। তবে তাঁর বিবাহদানের আগেই রাজা মহেন্দ্র দেহত্যাগ করেন। বৌদ্ধ ধারা অনুসারেই এখানে নিয়ম স্থাপন করেছিলেন মহারাজ মহেন্দ্র যে, তিনিই রাজা হতে সক্ষম যিনি বিবাহিত। যেমন সম্রাট ছন্দ আপনি বৌদ্ধ ধারা জানেন যে, প্রজা রাজার কাছে মনের কথা বলতে পারেন না, তাই রাণীর কাছেই তাঁরা গিয়ে মনের কথা বলেন। তাই প্রজা যাতে মনের কথা বলতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই বৌদ্ধ ধারার নিয়ম যে, অবিবাহিত বা পত্নীর সাথে সহবাস যিনি করেন না, তিনি রাজা হতে পারেন না।
কিন্তু পং রাজ্যের প্রজার শ্রীমানকেই রাজা রূপে লাভ করার কামনা। তাই গ্রামবাসী, এখানের সর্বাধিক সুন্দরী স্ত্রী, দেবী সুমিতার সাথে বিবাহ দান করেন যুবরাজ শ্রীমানের, এবং শ্রীমান হয়ে ওঠেন পংরাজ্যের দ্বিতীয় রাজা। এই সময়ে, পংরাজ্যের বিস্তারের গাঁথা বিস্তর ভাবে প্রসারিত হলে, সেই খবর অনেক স্থানেই প্রচারিত হয়। উত্তরপূর্ব পারস্য অঞ্চলে আব্রামের উত্থান বহুপূর্বেই হয়ে গেছিল, আর তাঁর উত্থানের সাথে সাথে সেখানের দুরাচারী আত্মপূজারিদের রাজ্য থেকে বহিষ্কারও করে দিয়েছিলেন বহু পূর্বেই, মানে রাজা মহেন্দ্রের জন্মেরও তিন প্রজন্ম আগে।
রাজা মহেন্দ্র যখন শাসন করছেন এই পংরাজ্যে, তখন বারংবার আব্রামের গোষ্ঠী সিন্ধুনদের উপকুলে উদ্বাস্তু রূপে বসবাস করা এই পারশ্য দেশের দুরাচারী, যারা নিজেদেরকে আর্য অর্থাৎ দিব্যতা পরিপূর্ণ এমন পারসিক নাম ধারণ করে অবস্থান করছিলেন, তাঁদেরকে আক্রমণ করে হত্যা করার প্রয়াস করলে, তাঁরা হিমালয়ের সুউচ্চ স্থানে এসে বসবাস শুরু করেন, বৌদ্ধদের সংরক্ষণে।
আব্রাম গোষ্ঠীর বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রতি অগাধ আস্থা থাকার কারণে, তাঁরা যাদেরকে আশ্রয় দিয়েছেন, তাদেরকে আর বিরক্ত করা বন্ধ করে দেন। অন্যদিকে আর্যদের স্বাভাবিক স্বভাবই দুরাচার করা, কারণ তাঁরা যে আত্মপ্রেমী, এবং আত্মপূজারি। তাই এবার তাঁদের দুরাচারের শিকার হন, বৌদ্ধরা। বৌদ্ধদের থেকে বৌদ্ধ ভাষা শিখে, তাঁদেরই গ্রন্থসমূহ থেকে বেদ নির্মাণ করে, প্রচার করা শুরু করে দেয় তাঁরা যে বেদ হলো পরমাত্মের প্রদত্ত গ্রন্থ আর তাঁরাই এই দেশে প্রথম থেকে অবস্থান করছে।
এমন প্রচার করে, প্রথম বৌদ্ধ ক্ষত্রিয়দেরকে নিজেদের ছলে আবদ্ধ করে, তাঁদের ভরসায়, সিন্ধুর উপকুল থেকে পারসিকদের তারিয়ে, তাদের সকলের কাছে যা যা নথি ছিল, তাঁদের পারসিক হবার, সেই সমূহ চিহ্নকে জ্বালিয়ে এবং প্রকৃতির থেকে অবলুপ্ত করে, নিজেদেরকে সর্বেসর্বা রূপে স্থাপন করা শুরু করলো, এবং বেদকেই সমস্তকিছুর উৎস এমন প্রচার করে, এবং বৌদ্ধধর্মের উত্থান তাঁদের এই বেদের থেকে হয়েছে, এমন মিথ্যা প্রচার করে করে, প্রায় সমস্ত দেশকে হরণ করে নেয় তাঁরা, এবং সেই দেশের নামকরন করেন, আর্যবর্ত্য।
কিন্তু তাঁরা এত শক্তিশালী হয়েও, জম্বুদেশের কাছে অত্যন্ত দুর্বল। ঈশ্বরের নিজের ভূমি এই জম্বুদেশ। তাতে সর্বদাই প্রকৃতির আরাধনা হয়, প্রকৃতি সেখানে তাঁদের জননী, তাঁদের আপন মাতা। তাঁর এই গুণের কারণে, মার্কণ্ড এতটাই প্রভাবিত হন যে, তিনি তন্ত্রের স্থাপনা করেন জম্বুদেশে। আর তাই আত্মের পূজা, যাকে বেদের মহিমায় সিক্ত করে পরতমাত্ম নামকরণ করেছিলেন আর্যপুত্ররা, তাঁর কনো প্রকার গ্রহণযোগ্যতা ছিলনা এই জম্বুদেশে। আর তাই জম্বুদেশকে কিছুতেই অধিকার করতে পারছিলেন না বৈদিকরা।
এখানে ঘনজঙ্গলের কারণে, আর কপিল মুনির মহাপ্রতাপের কারণে, এবং তন্ত্রসাধকদের মহাতেজের কারণে, এই বৈদিকদের দ্বারা প্রভাসিত ক্ষত্রিয়রাও এই দেশে পদার্পণ করতে ভয় পেতেন। তাই আর্যপুত্ররা এই জম্বুদেশের, যার তখন নাম ছিল গৌড়, তার সীমানা পর্যন্তই বিরাজ করতো। রাজা মহেন্দ্রের যখন বয়স হয়েছে, সেই কালে এই গৌড়েই মহামুনি বাল্মীকির উত্থান হয়, এবং মহামুনি ব্যাসের উত্থান হয়, এবং তাঁদের কৃত্য সম্যক বেদকেও ঢেকে ফেলার সামর্থ্য প্রকাশ করে।
তাই, বৈদিকরা এঁদের রচনাকে বিস্তর ভাবে বিকৃত করে, নিজেদের আরাধনা করা, পরমাত্মের ত্রিগুণ অর্থাৎ সত্ত্ব, রজ ও তমরূপী, ত্রিদেবকে এই দুই গ্রন্থে স্থাপিত করে করে, তাঁদেরকে বিকৃত করে করে, গৌড়ের উৎকল ভূমিকে ক্রমশ ছিনিয়ে নিতে শুরু করে, এবং একই সঙ্গে সেই প্রয়াস করেন মগধের ক্ষেত্রেও, যেখানে গৌতমের কর্মকাণ্ড বিস্তারিত হয়ে বৈদিকদের হাত থেকে এই স্থানকে প্রায় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
রাজা মহেন্দ্রের দেহান্ত হলে, যেই সময়ের মধ্যে রাজা শ্রীমান নিজের আধিপত্য বিস্তার করলেন, তার আগেই মগধকে এবং উৎকলকে ছিনিয়ে নেন বৈদিকরা এবং নিজেদের আর্যবর্ত্য রাজ্যের অংশরূপে তাঁদেরকে চিহ্নিত করা শুরু করে দেয়। কিন্তু গৌড়ের বাকি অংশ, অর্থাৎ এই জম্বুদেশকে তাঁরা কিছুতেই অধিকার করতে পারেনা। আর সেই কারণে, এই জম্বুদেশের পূর্বে যেই মনিপুর অঞ্চল ও প্রয়াগজ্যোতিষ উপস্থিত, তাদেরকেও অধিকার করতে ব্যর্থ হয় তাঁরা।
তাই এবার রাজা শ্রীমানের কাছে তাঁরা উপস্থিত হয়ে যুদ্ধ করেন ক্ষত্রিয়বল দ্বারা, কারণ এই অঞ্চলে বন ততটা ঘন নয়, যতটা জম্বুদেশের বাকি অঞ্চলে স্থিত। সেই যুদ্ধে পংরাজ্যে প্রচুর প্রাণহানি হয়, এবং এখান থেকে একটি অংশকে বৈদিকরা ছিনিয়েও নিয়ে যায়, যা পুনরায় রাজা শ্রীমান অধিকার করে নিয়েছিলেন পরবর্তী শাসনকালে। কিন্তু সেই কালে ছিনিয়ে নেওয়া সেই অংশকে মাধ্যম করে, জম্বুদেশের নিম্নতলে অত্যাচারী বৈদিকরা এখানের ঘন অরণ্যের কারণে প্রবেশ করতে না পারলেও, তাঁরা চলে যান পূর্বে, এবং অরুণাচল, মনিপুর তথা প্রাগকে জয় করে আসেন।
এবং রাজা শ্রীমানকে বাধ্য করার প্রয়াস করেন যে তিনি আরো একটি বিবাহ করেন যিনি হবেন আর্য অর্থাৎ বৈদিক ধর্মের। রাজা শ্রীমান কিছুতেই তাঁর পত্নী, দেবী সুমিতা ব্যতীত দ্বিতীয়স্ত্রীকে গ্রহণ না করলে, বৈদিকরা একটি ভিন্ন চাল চালেন।
তাঁরা রাজা শ্রীমানের থেকে যেই স্থান ছিনিয়ে নিয়ে পূর্বে গমন করেছিলেন, সেই স্থানকে ফিরিয়ে দিতে আগ্রহী হলেন, তবে তার পরিবর্তে একটি প্রতিশ্রুতি আদায় করলেন যে, তাঁর পুত্রের পত্নী হবেন বৈদিক। যদি তা না হয়, তবে যেই স্থানকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, সেই স্থানের সাথে সাথে সম্পূর্ণ পংরাজ্যকে তাঁরা অধিকার করে নেবেন।
সম্রাট, এই দেবী সুমিতা এবং রাজা শ্রীমানের একমাত্র পুত্র হলাম আমি, সামন্ত। আর আমাকে বিবাহ দেওয়া হয়, দেবী বিশাখার সাথে, যিনি একজন বৈদিক। তাঁরই দুই ভ্রাতা, গজ ও চামরী, আর তাঁরা সর্বক্ষণ আমাকে শাসন করে যায়। অত্যন্ত বলশালী তাঁরা, তাই আমিও কিচ্ছু করতে পারিনা। কর্ম করার মধ্যে একটিই কাজ করেছি যে, বাকি জম্বুদেশের সাথে সম্বন্ধ ছিন্ন করে রেখেছি, যাতে এঁদের অপবিত্রতার আঁচ বাকি জম্বুদেশ, যা সম্পূর্ণ ভাবে পবিত্র, তার উপর না পরে।
তবুও দেখুন সম্রাট, আত্মের বিকাশ হয়েই যায়, আর বৈদিক ধারার বিস্তার জম্বুদেশেও করা শুরু করে দেয় সে, তাঁর বিশাল কুলবাহিনীদ্বারা, যার কারণে আজ আপনিও সাম্রাজ্যচ্যুত। মহারাজ হাত জোর করে নিবেদন করছি, আপনাদের বলের বহু কথা শুনেছি। কৃপা করে এই গজ ও চামরীকে জীবন থেকে মুক্ত করে, এই রাজ্যকে সুরক্ষিত করে নিন। আমি কথা দিচ্ছি সম্রাট, যতদিন না আপনি পুনরায় ফিরে গিয়ে সাম্রাজ্য ভার গ্রহণ করছেন, ততদিন আমার অতিথি হয়েই থাকবেন। আর সঙ্গে সঙ্গে এও কথা দিচ্ছি যে, যদি করিন্দ্র আপনার সাম্রাজ্য ফিরিয়ে না দেয়, আর আপনি তাঁর সাথে যুদ্ধে যাবার নিশ্চয় করেন, আমি সম্পূর্ণ সেনাবলের সাথে, সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবো, এবং আমৃত্যু যুদ্ধ করবো”।
ছন্দ হেসে বললেন, “চিন্তা করবেন না, নিশ্চিত ভাবে তারাও আমাদের শত্রুই জ্ঞান করবে, আর তাই অবশ্যই তালকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করবে তারা, কারণ তালের বলকে দেখে তাঁরা অবশ্যই অসুরক্ষার ভান করবে। আর তালের দিকে যে বক্রদৃষ্টি দেবে, তার নিধন কেবলই সময়ের অপেক্ষা। সে তাল, আবার সে-ই কাল। … তাই নিশ্চিন্তে থাকুন মহারাজ।
ছন্দের থেকে তাল ইতিমধ্যেই মহারাজ সামন্তের বার্তা লাভ করেছিলেন। আর তারই সাথে আহারকে কেন্দ্র করে, গজ ও চামরীর সখ্যতা, এই দুইকে মিলিয়ে দেখে নিতে তালের কনো অসুবিধা হয়না। সঙ্গে সঙ্গে সুরাপান, আর সুরাপানের পর নেশার মধ্যে দেবী পদ্মিনী ও নলিনীকে নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য, তা শুনে তাল নিশ্চিত হয়ে যায় যে, এই দুই দানব অপেক্ষা করছে দেবী পদ্মিনী ও দেবী নলিনীর সন্তান জন্ম দেবার। তারপরেই তাঁকে হত্যা করে, এই দুই দেবীকে হরণ করার ভাবনায় রয়েছে তারা।
সুরার নেশা করিয়ে করিয়ে তাল আরো জানতে পারে যে, বৃহৎব্যঘ্র ছিলেন দেবী সুরভি, যিনি এই দুই দানব ও দেবী বিশাখার মাতা, তাঁর ভগিনী দুন্ধুভির পুত্র, অর্থাৎ এঁদের একপ্রকার ভ্রাতা, আর তাই বৃহৎব্যঘ্রের কামনার উদ্বেগ যেই দুই কন্যাকে দেখে হতো, দেবী পদ্মিনী ও দেবী নলিনী, তাঁদেরকে সম্ভোগ করাতে ও তাঁর হত্যা করাতেই প্রতিশোধ পূর্ণ হবে।
সঙ্গে সঙ্গে, যতই প্রসবের সময় এগিয়ে আসতে থাকলো দেবী পদ্মিনী ও নলিনীর, ততই তাল এই পং দেশের মিশুকে মানুষদের সাথে মিশে মিশে অনেক তথ্য একত্রিত করেছেন। সেই তথ্যের মধ্যে একটি হলো সুরার সাথে এখানের তাম্বূল মিশ্রিত করে পান করলে, সম্মুখের ব্যক্তির আর কনো হুঁশ থাকে না।
তাই যেদিনকে দেবী পদ্মিনী ও নলিনীর প্রসববেদনা জাগে, সেদিনই সুরার সাথে তাম্বূল মিশ্রিত করে, তাল আলাদা আলাদা করে গজকে এবং চামরীকে প্রদান করে, এবং চামরীর কাছে গজের কণ্ঠে কথা বলে, এবং গজের কাছে চামরীর কণ্ঠস্বরে কথা বলে, দুইজনকেই খাইয়ের মধ্যে ফেলে দেন, এবং বিনা অঙ্গস্পর্শকরে, এঁদের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
পরের দিবসে যখন ছন্দ ও তাল দেবী পদ্মিনী ও নলিনীর থেকে সদ্যজাত দুইকন্যার নামকরণ করেন জয়া ও বিজয়া, এবং তাল নিজের পত্নীর এবং নিজের বৌদির প্রাণকে নিঃসংশয় করে ফেলেন, তখন দেবী বিশাখা সংবাদ লাভ করেন যে, তাঁর দুই ভ্রাতা গজ ও চামরী পূর্বের দিন সুরা পান করে, নেশায় চূর হয়ে, খাইতে পরে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে।
শোকে তিনি মর্মাহত হন, তো দেবী নলিনীর সমস্ত কিছুতে তালের হস্তক্ষেপ সহজেই বুঝে নিলে, তাল তাঁকে ও দেবী পদ্মিনীকে তথা ছন্দ ও মহারাজ সামন্তকে সমস্ত বিবরণ প্রদান করেন, এই দুই দানবের। বৃহৎব্যঘ্র যে গজ ও চামরীর ভ্রাতা হয়, সেই তথ্য সঠিক এই বার্তা স্বয়ং রাজা সামন্তই প্রদান করেন। আর দেবী নলিনী তথা দেবী পদ্মিনীর প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছন্দ ও দেবী পদ্মিনী বারংবার তালের প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করতে থাকেন।
অন্যদিকে রাজা সামন্ত আনন্দিত হয়ে, চিত্তাপুত্রদের ততদিন থাকার অনুমতি প্রদান করলেন, যতদিন তাঁরা এখানে থাকতে চান। এবং তাঁদের এই স্থানে অবস্থান সম্পূর্ণ জম্বুদেশের থেকে গুপ্তই থাকলো। অন্যদিকে দেবী বিশাখা নিজের ভ্রাতাদের মৃত্যুর শোকে মর্মাহত হয়ে গেলে, সপ্তম দিনে প্রাণ ত্যাগ করে ফেলেন, এবং পংরাজ্যের ললাট থেকে বৈদিকদের সমস্ত নিপীড়ন সেই কালের মত সম্পূর্ণ ভাবে দ্রবীভূত হয়ে যায়।
রাজা সামন্ত নিষ্ঠাবান শিষ্য হয়ে ছন্দের থেকে রাজনীতি তথা কৃতান্তিক ধর্মের শিক্ষা গ্রহণ করেন। তো ছন্দ তালের পুত্রীরা, অর্থাৎ জয়া বিজয়াও ক্রমশ বড়ো হতে থাকেন এবং কৃতান্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে থাকেন, তথা রাজা চন্দনের কুল এবং জম্বুদেশের অতীত, বর্তমান তথা ভূগোল সম্বন্ধে জ্ঞান ধারণ করা শুরু করেন।
এই সমস্ত কিছুর মধ্যে, আরো ১২ বৎসর চলে গেলে, দেবী জয়া ও দেবী বিজয়া ষোড়শ বৎসরের দুই কন্যা হয়ে ওঠেন, যার সমস্ত শ্রেয় দেবী পস্মিনি ও নলিনীরই মায়াবিদ্যাকে দেওয়া সঠিক হবে। আর তাই তাঁরা এবার একদিন তাঁদের মাতাদের সম্মুখে এসে দাবি করলেন, “মাতা, আপনারা নির্গত হতে পারছেন না, বচনের কারণে, বা রাজনীতির কৌশলের কারণে। কিন্তু আমরা তো কনো কিছুতে আবদ্ধ নই। আমাদেরকে অনুমতি দিন মাতা, আমরা যাত্রা করি আর মাতা শ্রীকে খুঁজে আনি”।
দেবী পদ্মিনী ও দেবী নলিনী কুণ্ঠিত হলে, বৃদ্ধা দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “মেয়েরা যখন বলছে, তখন তাঁদের যেতে দাও। … কে কাকে খুঁজে বার করে আনবে, সে তো সময়ই বলবে। তবে নবউদ্যমে অবরোধ সৃষ্টি করো না পুত্রীরা”।
ছন্দও কন্যাদের এই আবদারে চিন্তিত হয়ে গেলে, তাল বললেন, “ভ্রাতা, আপনি চিন্তা করবেন না। জয়াবিজয়া জম্বুদেশের মানচিত্রকে অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে জানে। আর আমি তাঁদের মার্গ বলে দিচ্ছি, যেই পথে তাঁরা রাজা সহিষ্ণুর রাজ্য হয়ে, গঙ্গা পার হয়ে, পদ্মার তীর বরাবর যাত্রা করে রাজশাহীতে উপস্থিত হতে পারবে।
ভ্রাতা সুর সেখানেই বিরাজ করছে। সমস্ত সেনা নির্মাণ হয়ে গেছে তার। কেবল রাজা নিষ্ঠাবাণের সেনাকে সে প্রস্তুত করছে। তাঁকে আমি বার্তা দিয়ে দিচ্ছি, সে রাজশাহীর সীমানায় এসে, জয়াবিজয়াকে গ্রহণ করে নিয়ে যাবে”।
ছন্দ সেই কথাতে সমর্থ হলেও রাজা সামন্ত বললেন, “মহারাজ আমার একটি নিবেদন আছে। আপনারা রাজনীতির কুশলে বাঁধা, আমি তো আর সেই বন্ধে আবদ্ধ নেই। রাজকুমারীরা আমারও কন্যাসমা। তাই তাঁদের সুরক্ষার চিন্তা করা আমার ও রাজা সহিষ্ণুরও অধিকার আছে। আমি এখান থেকে জয়াবিজয়ার সাথে একটুকরি সেনা প্রেরণ করছি, আর রাজা সহিষ্ণু নিজের রাজ্য থেকে একটুকরি সেনা নিয়োগ করে, জয়াবিজয়াকে সুরক্ষিত রাখবে, যতক্ষণ না রাজপুত্র সুরের নিকটে তাঁরা পৌঁছে না যাচ্ছেন। এই অনুমতি আমাকে প্রদান করুন সম্রাট”।
সকলে এই বিষয়ে নিশ্চিত হলে, দেবী পদ্মিনী ও দেবী নলিনী প্রস্তুত করলেন তাঁদের কন্যাদের, এবং জয়াবিজয়া দেবী চিত্তা তথা সকলের চরণধুলা গ্রহণ করে, তাঁরা অন্তরে অন্তরে যাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন, সেই দেবী শ্রীর সাথে সাখ্যাত করার মনোবাঞ্ছা সঙ্গে নিয়ে, রাজা সামন্তের একটুকরি সেনার সাথে নির্গত হলেন দেবী শ্রীর সন্ধানে, বা তারও পূর্বে, তাঁদের পিতাদের অত্যন্ত আদরের ভ্রাতা, তাঁদের তাত, সুরের সাথে সাখ্যাত করতে।
