জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

বনাঞ্চলে যখন গণ্ড ও হস্তি উপস্থিত হলেন, তখন অন্তঃসত্ত্বা দেবী পদ্মিনী ও নলিনী শুইয়ে ছিলেন আর দেবী শ্রী তাঁদের সেবা করছিলেন। অন্যদিকে ছন্দ শুয়ে ছিলেন, আর তাল ও সুর দুইজনে ছন্দের সম্মুখে বসে, তিন ভ্রাতা মিলে গল্প করছিলেন। ভূমির কম্পনকে প্রথম অনুভব করেন সুর। সেই শব্দ ও কম্পনে চঞ্চল হয়ে উঠলে, তালও সতর্ক হয়ে গেল।

ছন্দ কিছু বুঝে না পেলে, সুর ভূমিতে কর্ণস্থাপিত করে অনুভব করে বললেন, “ভ্রাতা উত্তর দিক থেকে আসছে চার পদ, যা সময়ে সময়ে আট পদ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ উত্তর দিক থেকে দুইজন আসছে, যারা দুই পদেও চলেন, আবার চারপদেও। ভ্রাতা ছন্দ, আপনি স্ত্রীদের আর মাতাকে নিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে যান। আমি আর ভ্রাতা তাল, এই দানবদুটিকে দেখে নিচ্ছি”।

তালেরও একই রায় থাকলে, ছন্দ অন্তঃসত্ত্বা দেবী পদ্মিনী ও নলিনীকে সঙ্গে নিয়ে, শ্রী ও দেবী চিত্তাকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেলেন। চোখের আড়াল হতে, চিত্তাল ও সুরচিৎ ভূমিতে অধিক কম্পন অনুভব করলে, এবার সুর মহাবিক্রমে ভূমিতে একটি পদাঘাত করলে, ভূমি থরথর করে কেঁপে ওঠে, আর কিছুক্ষণের মধ্যে দুটি বিশাল আওয়াজ বলে দেয় যে, যেই দুই দানব আসছিল এইদিকে, তাঁরা ভূমি থেকে উৎপাটিত হয়ে, সামান্য দূরে ভূপতিত হন।

এর কিছুক্ষণের মধ্যে ভূমির উপর শব্দের তেজ বেড়ে গেলে, সুর ও তাল বুঝে যান যে, ভূপতিত হত্যে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে দুই দানব, আর তারা দ্রুতপদে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে। এমন অনুভব করলে, সুর ও তাল উভয়েই প্রস্তুত থাকে দুই দানবের সম্মুখীন হতে, তো কিছুক্ষণের মধ্যেই হস্তি ও গণ্ড সম্মুখে উপস্থিত হয়। শুণ্ডযুক্ত দানবই যে হস্তি, আর সিং যুক্ত দানবই যে গণ্ড, তা বুঝে নিতে কষ্ট হয়না সুর ও তালের।

এরপড়ে শুরু হয় ভয়ানক যুদ্ধ। বিশালাকায় ও প্রবল বলশালী হস্তিগণ্ড নিজেদের বল দ্বারা আক্রমণ সাধার প্রয়াস করলে, অসামান্য কৌশলে ভূষিত সুরতাল নিজেদের তনুকে কখনো শূন্যে, তো কখনো জানুকে ভূমিতে স্থাপিত করে, এঁদের বলপ্রহার থেকে বাঁচতে থাকেন। সময়ে সময়ে, ফাঁক পেলেই, সুর ভূমিতে পদাঘাত করে হস্তিগণ্ডকে ভূপতিত করে দেন, তো তাল বৃক্ষ উৎপাটন করে এঁদের দিকে নিক্ষেপ করে, এঁদেরকে ব্যথিত করতে থাকে।

কিন্তু বারংবার ভূপতিত হলেও, আর বারংবার ব্যথিত হলেও, হস্তিগণ্ড নিজেদের বল থেকে ও দম থেকে বিচ্যুত হয়না। তাই এই যুদ্ধ ক্রমশ এক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করা শুরু করে। এরই মধ্যে উত্তেজিত হতে শুরু করলে, সুরতালের তাণ্ডব শুরু হয়। প্রচণ্ড গতিধর সুর, সময়ে সময়ে একটি একটি বৃক্ষডালকে ধারণ করে বিদ্যুতের বেগে তা প্রেরণ করলে, সেই বিদ্যুতের দ্বারা কখনো হস্তি আক্রান্ত হয় তো কখনো গণ্ড। সেই আক্রান্ত হওয়া সামান্য বেদনার হতো না।

যার যেই অঙ্গে সেই বিদ্যুৎ আঘাত করতো, সেই অঙ্গক্ষেত্র যেন জ্বলে বিনষ্ট হয়ে যাবার যোগার হতো। তালও ঠিক এই সময়গুলিরই অপেক্ষা করতো। যেইমুহূর্তে হস্তির কনো অঙ্গে সুরের প্রেরণ করা বিদ্যুৎ আক্রান্ত করে, তাকে বেদনায় কাতর করে দিতো, অমনি তাল একটি নিকটবর্তী বৃক্ষডালকে ধারণ করে, সরাসরি হস্তির মুণ্ডে পদাঘাত করতেন।

একই কীর্তি গনদের সাথেও হতে থাকতো, কিন্তু এই দুই দানব অতীব শক্তিশালী। তাই এই ভাবে এই দুই দানবের অষ্টপাদুকেকে বিকল করে দিতে, প্রায় ৪ দিবস সময় লেগে গেল সুরতালের। আর এই সময়কালের মধ্যে, সুরতালের অজ্ঞাতে, দক্ষিণ বনাঞ্চলেও মহাতাণ্ডব চলতে থাকে।

যোজনা অনুসারে, করিন্দ্র, ভণ্ড, করশ, করঙ্ক তথা রুদ্রকরি একত্রে আক্রমণ করে দেন দক্ষিণাঞ্চলে। ছন্দের অন্ধভ্রাতৃবিশ্বাসই কাল হলো তাঁর জন্য। তিনি মনে করে বসেন যে, দুই দানব আক্রমণ করেছে, তাই অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীদের সুরক্ষার্থে উপস্থিত হয়েছে তাঁর ভ্রাতারা। আর তাই অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীদের তাঁদের কাছে সুরক্ষিত করার প্রয়াস করেন।

কিন্তু ছন্দ এখনো করিন্দ্রদের শত্রু মানতে না পারলেও, স্বভাব, আচরণ ও মানসিকতা অনুসারে করিন্দ্র সম্যক ভাবে ছন্দদের শত্রু জ্ঞান করেন, তা ছন্দ যেন মেনেও মানেন না, নিজের অন্ধত্বের কারণে। তাই তাঁর এই আচরণের ফলে, যেমন যোজনা ছিল করিন্দ্র ও তাঁর ভ্রাতাবন্ধুর, তা ফলিভুত করা অতি সহজ হয়ে যায়। অন্তঃসত্ত্বা দেবী পদ্মিনী ও নলিনীকে জোর করে রথে তুলে নিতে করিন্দ্র ও ভণ্ডকে বলপ্রয়োগ তো নয়, সহানুভূতির নাট্য করতে হলো কেবল। দেবী চিত্তাকেও সহানুভূতি সহ করশ রথে তুলে নিলে, করঙ্ক যখন দেবী শ্রীকে রথে তুলতে গেলেন, ততক্ষণে কার্যসিদ্ধি হয়ে গেছে, এই অনুভবে, করিন্দ্র, ভণ্ড ও করশ দ্রুততার সাথে রথ চালিয়ে দক্ষিণ দিকে পলায়নের প্রয়াস করে।

সেই দেখে দেবী শ্রী একটি হুংকার ছাড়লেন ছন্দের উদ্দেশ্যে, “জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, আপনি তস্করের হাতে দিদিদের ছেড়ে দিয়েছেন। দেখুন তাঁরা দিদিদের ও মাতাকে নিয়ে পলায়ন করছেন”।

ছন্দ কিছু মুহূর্তের জন্য হতবম্ব হয়ে যায়, তাঁর কি করনীয় সেই ব্যাপারে। কিন্তু দেবী শ্রী করঙ্ক ও রুদ্রকরিকে কিছু বুঝে ওঠার সময় দিলেন না। পার্শ্ববর্তী বৃক্ষে নিজের দক্ষিণ চরণ স্থাপন করে, রথে বামচরণ স্থাপন করে, দক্ষিণ চরণ দ্বারা একটি মহাশক্তিশালী পদাঘাত দ্বারা দেবী শ্রী করঙ্ক ও রুদ্রকরিকে রথ থেকে ভূমিতে পতিত করে, অতিদ্রুততার সাথে রথ চালিয়ে করিন্দ্রদের পশ্চাৎধাবন করেন তিনি।

দেবী শ্রীর পশ্চাৎধাবনের প্রয়াস করা রুদ্রকরি ও করঙ্ককে এবার আঘাত করা আবশ্যক হয়ে গেছে, এমন অনুভব করে, ছন্দ উড়ন্ত ভাবে দুই করিন্দ্রভ্রাতার পশ্চাতে পদাঘাত করলে, তাঁরা ভূপতিত হন, ছন্দের সাথেই। ছন্দের বলের সাথে ওয়াকিবহল রুদ্রকরি ও করঙ্ক বিচার করে নেন যে, বলে বা সম্যক যুদ্ধে তারা ছন্দের সাথে পেরে উঠবেন না। তাই এবার দক্ষিণ দিকে পলায়ন না করে, পূর্ব দিকে দুই ভ্রাতা পলায়নের প্রয়াস করেন আর ছন্দ তাঁদের পিছু নেয়।

ধরা না দেবার মানসিকতা নিয়ে, বহুদূর চলে যেতে থাকে করঙ্ক ও রুদ্রকরি, কিন্তু ছন্দ এবার নিজের কর্মের প্রতি গ্লানি সংগ্রহ করেই কিছুতেই তাঁদের পশ্চাৎধাবন বন্ধ করেনা। ফলে, তিন রাত্রি দৌড়াতে থাকেন ছন্দ দুই করিন্দ্রভ্রাতার পশ্চাতে, আর তেমন করতে থাকলে, দুই ভ্রাতা মালদ রাজ্য ও ভ্রমরীপ্রদেশের সীমানায় এসে, গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বাঁচে।

আর ছন্দ তখন অনুভব করে যে, এই দুই ভ্রাতার পশ্চাৎধাবন করতে করতে সে নিজের পরিবারের থেকে বহু দূরে চলে এসেছেন। তাই এবার সে নিজেরই চরণচিহ্ন দেখে দেখে, সেই স্থানে প্রত্যাবর্তনের প্রয়াস করেন যেখান থেকে তিনি এই দুই করিন্দ্রভ্রাতার পশ্চাৎধাবন করেছিলেন। কিন্তু নিজের অবস্থানে ফিরে আসতে তাঁর আরো ৫ দিবস সময় লেগে যায়।

যখন তিনি ফিরে আসেন, তখন তিনি দেখেন যে সুরতাল ও দেবী চিত্তা দেবী পদ্মিনী ও নলিনীর সেবা করছেন। আর সকলে ভূমিতে উদাস ভাবে উপস্থাপন করছেন। আসলে ছন্দের সেই স্থানে উপস্থিত হবার অন্তরালে যেই ৮ দিন ছিল, তাতে বহুবিধ কাণ্ড হয়ে গেছে এই ভ্রমরীপ্রদেশের বনাঞ্চলে। সুর ও তাল মিলে গণ্ডহস্তিকে হত্যা করে, সম্পূর্ণ ভ্রমরীপ্রদেশকে সুরক্ষিত করে দিয়েছিল। সেতো একটি দিক মাত্র এই সমস্ত কিছুর।

তবে সেই যুদ্ধে, হস্তিগণ্ডের প্রবল বিক্রমের কারণে সুরতাল অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে তাঁদেরকে বরদান প্রদান করেন যে, এই প্রদেশে চিরকাল তাঁরা হস্তি ও গণ্ডরূপ পশু হয়ে বিচরণ করবে, আর তাদেরকে এই প্রদেশের সম্পদ জ্ঞান করে, রক্ষা করা হবে।

কিন্তু অন্যদিকে, দেবী শ্রী রথে করে করিন্দ্রদের পশ্চাৎধাবনের কালে বেশ কিছু দুঃসাহসিক ক্রিয়া করেন, তার কথাই দেবী চিত্তা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, “শ্রীর জন্য আমরা সকলে সুরক্ষিত আজকে। তীব্রবেগে রথ চালিয়ে সে যখন করিন্দ্রদের নিকটে এসে যায়, তখনও আমরা বুঝতে পারিনি, আমাদেরকে নিয়ে ওরা কি ঠিক কি করতে চলেছে। কিন্তু শ্রীকে দেখে যখন ভণ্ড বাণ নিক্ষেপ করলো তাঁর দিকে, তখন বুঝলাম এঁরা আমাদের অপহরণ করতে চাইছে।

শ্রী অত্যন্ত দ্রুতগামী আর ভয়ানক যোদ্ধা, তা আমাদের আগে জানা ছিলনা। বাণের উত্তর সে বাণের মাধ্যমে না দিয়ে, রথকে চলমান রেখে, একটি পার্শ্ববর্তী বৃক্ষকে ধারণ করে, তার ডাল বেয়েবেয়ে সে ভণ্ডের রথের কাছে চলে আসে, যেই রথে নলিনী অবস্থান করছিল। পদ্মিনী, নলিনী উভয়েই অন্তঃসত্ত্বা, তাই তাঁদের বিরোধ করার সামর্থ্য ছিলনা। 

অন্যদিকে শ্রীকে বাণে বিদ্ধ করার ভণ্ড সমস্ত প্রয়াস করে, কিন্তু দ্রুতগামী শ্রীর অবস্থানই সঠিক ভাবে নিরীক্ষণ করতে পারছিলনা ভণ্ড। যেই ডাল ধরে ঝুলন্ত অবস্থায় শ্রীকে সে দেখে বাণ নিক্ষেপ করে, যতক্ষণে সেই বাণ শ্রীর নিকটে পৌছায়, তার মধ্যে শ্রী প্রায় ১০টি আরো ডাল বেয়ে বেয়ে ভণ্ডের নিকটে আসতে শুরু করে। এমন করে করে অত্যন্ত নিকটে এসে গেলে, একটি লম্ফ দিয়ে, শ্রী ভণ্ডের মস্তকের পিছন দিকে পদাঘাত করলে, রথ থেকে ছিটকে ভূমিতে পড়ে যায় ভণ্ড।

এরপরে রথের ঘটকের লাগাম ধরে তাঁকে শান্ত করে, নলিনীকে রথের মধ্যেই স্থিত রাখলে, পশ্চাৎধাবিত ভণ্ডের উদ্দেশ্যে, তাঁরই রথে স্থিত একটি মুশলকে কি অসামান্য গতিদ্বারা নিক্ষেপ করলো শ্রী যে, ভণ্ড বুঝেও পেলো না যে কখন সেই মুশল তাঁর নিকটে পৌঁছে তাঁর মস্তকে আঘাত এনে, তাঁকে মূর্ছিত করে দিল। এই ভাবে ভণ্ডের থেকে নলিনীকে সুরক্ষিত করা হয়ে গেলে, ভণ্ডের রথ থেকে একটি অশিকে নিজের মুখের মধ্যে ধারণ করে, পুনরায় ডাল ধরে ধরে সে এবার করশের রথের কাছে আসে।

করশও তাঁকে বিদ্ধ করার জন্য বাণ নিক্ষেপ করে, কিন্তু অদ্ভুত কৌশলে শ্রী নিজের মুখে ধারণ করা অশি দ্বারা সেই বাণদের একদিকে নিষ্ফল করতে থাকে, তো অন্যদিকে নিজের দ্রুতগামী গতির মাধ্যমে ডালের পর ডাল ধরে ধরে করশের নিকট এসে যায়।

করশ পলায়নের উদ্দেশ্যে, প্রবল গতি ধারণ করেছিল, আর তাই করিন্দ্রের রথকে পিছনে ফেলে, সে এগিয়ে আসে, আর শ্রী এরপরের মুহূর্তে ডালে ঝুলতে ঝুলতেই, নিজের অশির মাধ্যমে করশের সারথিকে হত্যা করে, তার রথকে সাময়িক সময়ের জন্য স্তব্ধ করে দেয়।

করশ এবার রথের রশি নিজের হাতে ধরলে, রথের ঘটককে অগ্রে এগতেই দেয়না শ্রী, কারণ সে রথের সম্মুখে এসে, ঘটকদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে যেন বশীকরণ করে দেয় ঘটকগুলিকে। ইতস্তত করশ ধনুর্বাণ ধারণ করে শ্রীকে বিদ্ধ করতে আগ্রহী হলে, শ্রী অদ্ভুত দেহভঙ্গি ধারণ করে, নিজের মস্তকসহ সমস্ত দেহকে তিনবার শূন্যে, এবং তিনবার ভূমির দিকে আন্দোলিত করে, পদাঘাতের মাধ্যমে ধনুকে বাণ স্থাপন করতে উদগ্রীব করশের বক্ষে এমনই বেগে পদাঘাত করে, যে রথ থেকে প্রায় ৩৫ গজ দূরে স্খলিত হয় করশের দেহ।

আমাকে রথের মধ্যেই স্থাপিত রেখে মুখে ধারণ করা অশিদ্বারা অশ্বের সাথে রথের বন্ধনকে মুক্ত করে দিলে, আমাকে রথেই স্থিত রেখে দেয় শ্রী। যখন সে এমন করছে, তখন করিন্দ্র এক ভীষণ বাণ নিক্ষেপ করে শ্রীর উদ্দেশ্যে। কিন্তু উগ্র শ্রীর ততক্ষণে সর্বাঙ্গ গোলাপি হয়ে গেছে। অদ্ভুত সুগন্ধ নিঃসৃত হচ্ছিল তাঁর সর্বাঙ্গ থেকে, ঠিক যেমনটা আমার দিদিরও হতো স্বেদ বিকশিত হলে।

উগ্রমেজাজে করিন্দ্রের নিক্ষেপ করা বাণকে বামহস্তে ধারণ করে নিলে, শ্রী এবার নিজের মুখে ধারণ করা অশিকে নিক্ষেপ করে, করিন্দ্রের রথ থেকে ঘটকের লাগামকে ছিন্ন করে দেয়। আর এর ফলে, করিন্দ্র রথের গতির কারণেই, আকস্মিক থেমে যাওয়া রথের থেকে সম্মুখে প্রবল গতিতে ভূপতিত হয়। নিরস্ত্র ভাবে পতিত করিন্দ্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই, শ্রী করিন্দ্রেরই নিক্ষেপ করা বাণ, যাকে বামহস্তে ধারণ করে রেখেছিল শ্রী, তাকে প্রচণ্ড গতির সাথে নিক্ষেপ করলে, করিন্দ্রের একটি হস্তকে সেই বাণ দ্বারা বিদ্ধ করে তাকে ভূমির সাথে আটকে রেখে দেয়।

প্রবল পীড়ার মধ্যে করিন্দ্র নিজের বিদ্ধ ও রক্তাক্ত হস্তকে ভূমি ও বাণের থেকে মুক্ত করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলে, শ্রী তিন লম্ফে উপস্থিত হয় করিন্দ্রে রথ থেকে ভূমিতে পতিত হয়ে যাওয়া পদ্মিনীর কাছে। আমিও সাধারণ গতিতে তাঁর কাছে উপস্থিত হই, আর দেখি পদ্মিনী যেই চাপ ধারণ করেছে, তাতে তার প্রসব বেদনার উত্থান হয়েছে।

শ্রীর কাছে এত বল কি করে এলো জানিনা। কিন্তু সে পদ্মিনীকে নিজের দুই বাহুতে ধারণ করে উঠিয়ে নিয়ে গেল এবার যেখানে নলিনী অবস্থান করছিল। সেখানে উপস্থিত হতে আমরা দেখি যে নলিনীরও প্রসব বেদনা আরম্ভ হয়েছে। আর তাই আমি ও শ্রী এবার প্রবল তৎপরতার সাথে তাঁদের প্রসব করাই, এবং তাঁদের গর্ভ থেকে দুটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়।

ঠিক করে নাতিদের মুখও আমি দেখতে পাইনি তখনও, ঠিক করে পুত্রদের মুখ তাঁদের জননীরাও দেখতে পাইনি তখনও, এমন সময়ে করশ, করিন্দ্র, ভণ্ড, রুদ্রকরি এবং করঙ্ক আহত অবস্থায় বিক্ষিপ্ত ভাবে আমাদের দিকে অগ্রসর হয়। শ্রী আমার উদ্দেশ্যে বলে, “মা, দিদিরা পীড়ায় আছে। কনো না কনো ভাবে, কনো একটি বড় শালগাছের কোটরে দিদিদের নিয়ে লুকিয়ে থাকো। আমি দিদিদের সন্তানদের সুরক্ষার চিন্তা করছি”।

এতবলে শ্রী দুই সদ্যজাত পুত্রদের নিয়ে ভণ্ডের রথে আঢ়ুর হয়ে, প্রবল বেগে রথ চালাতে থাকলে, আমরা দেখলাম, আহত সিংহের মত করিন্দ্র এবং তাঁর সমস্ত দলবল শ্রীর পিছনে পশ্চাৎধাবন করে”। … ক্রন্দন করে উঠে বলে উঠলেন দেবী চিত্তা, “পুত্র, ৬ দিবস হয়ে গেছে, না শ্রী ফিরেছে, আর না আমার পৌত্ররা। … এখন আমি কি করি পুত্র!”

দেবী পদ্মিনী বললেন, “যদি শ্রী সুরক্ষিত থাকে, তাহলে আমাদের পুত্ররাও সুরক্ষিত আছে। শ্রী প্রাণ থাকতে আমাদের পুত্রদের কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু হতে দেবেনা”।

সেবী নলিনী বললেন, “একাকী শ্রী হলে, আমি শ্রীকে নিয়েও চিন্তিত থাকতাম না। এটুকু বুঝেগেছি আমরা শ্রীকে দেখে যে, যুদ্ধ বা রণবল বা কৌশলে, করিন্দ্ররা সকলে মিলেও শ্রীর কাছে নিতান্ত শিশু। তবে চিন্তার বিষয় একটিই, শ্রী একাকী ছিলনা। তার দুই ক্রোড়ে আমাদের দুই সন্তান ছিল”।

উগ্রস্বরে তাল বলে উঠলো, “এর অর্থ, এই দুই রাক্ষসকে করিন্দ্রই পাঠিয়েছিল, যাতে আমরা দুই ভ্রাতা এই দুই রাক্ষসকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আর সে আমাদের স্ত্রীদের ও মাতাকে অপহরণ করতে পারে”। উগ্রস্বরে পুনরায় বলে উঠলো সে, “ভ্রাতা, কনো প্রয়োজন নেই অজ্ঞাতবাসের। এখনই আক্রমণ করে, করিন্দ্রদের হত্যা করবো আমরা। … তুমি খালি আদেশ দাও ভ্রাতা”।

ছন্দ বিমর্ষ হয়ে ভূমিতে পতিত হয়ে গিয়ে বললেন, “আমি ভেবেছিলাম, আমার ভ্রাতারা আমাদের এই বিপদের কালে আমাদের স্ত্রীদের রক্ষা করতে উপস্থিত হয়েছিল এখানে। … এই ভেবে আমি অনায়সে আমাদের পত্নীদের ও মাতাকে তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। … আজ যদি শ্রী না থাকতো, তাহলে আমাদের পত্নীরা কিছুতেই রক্ষা পেতো না”।

তাল উগ্রস্বরে বলে উঠলেন, “তোমার এই অহেতুক উদারতার কারণেই আমাদের আজ এই দুর্দশা ভ্রাতা। … কেন তুমি এখনো মানতে পারলে না যে, করিন্দ্র আমাদেরকে ওর নিজের শত্রু জ্ঞান করে, আর আমাদের ক্ষতিসাধন করাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। মাতাকে অপহরণ করে নিয়ে আমাদের রাজ্যছাড়া করার চিন্তা করলো, তা দেখেও তোমার জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত হলো না! … সেদিনেই বলেছিলাম, আমাদের আদেশ দাও, সম্পূর্ণ করিন্দ্রকুলকে সেইদিনে, সেইখানেই বিনষ্ট করে দিতাম”।

নলিনী পীড়ার মধ্যেই সোজা হয়ে বসে একটি তরুতে পৃষ্ঠ নিবেদন করে মাথা নেড়ে বললেন, “পারতেন না নাথ। … ঘৃতকুমারী আর শৃঙ্খলাকন্যারা সেখানে উপস্থিত ছিল। তারা মায়া রচনা করলে, আমরা কিছুতেই সামলাতে পারতেন না। সুর এর মধ্যে একটি কথাও না বলে, সরাসরি হন্তদন্ত হয়ে একদিকে যাত্রা করতে গেলে, ছন্দ বললেন, “কোথায় যাচ্ছ অনুজ!”

সুর মাথা নেড়ে উগ্রস্বরে বললেন, “এই ভাবে হাতের উপর হাত রেখে, আমি বসে বসে বিলাপ করতে পারবো না। … আমি চললাম শ্রীর সন্ধান করতে। এই বনের উত্তরদিকে পং, পূর্ব দিকে কোচি, পশ্চিম দিকে মগধ, আর দক্ষিণ দিকে গঙ্গা ও তারপশ্চাতে মালদ রাজ্য, যাকে করিন্দ্ররা অধিকার করে রেখে দিয়েছে। শ্রী দক্ষিণ দিকেই গেছে, অর্থাৎ গঙ্গার দিকেই। আমাকে যেতেই হবে, শ্রীর আমাকে প্রয়োজন। একাকী দুই সন্তানকে নিয়ে সে অসহায় হয়ে যাবে”।

ছন্দ তাঁকে বাঁধা দিয়ে বললেন, “কিন্তু অনুজ! আমাদের অজ্ঞাতবাস, আমাদের দেওয়া বচন!”

সুর উগ্র ভাবে বললেন, “আপনি পড়ে থাকুন আপনার বচন নিয়ে। শ্রীকে উদ্ধার করা আমার ধর্ম ও কর্তব্য। আমি আমার কর্তব্যের টানে যাত্রা করলাম”।

তালও উগ্র ভাবে বললেন, “হ্যাঁ আমারও যাওয়া উচিত শ্রীর সন্ধানে”।

সুর উত্তরে বললেন, “না ভ্রাতা, বৌদিরা এখন পীড়িত। তাঁদের সাথে আমার নয়তো তোমার, যেকোনো একজনের থাকা প্রয়োজন। করিন্দ্র যেই স্তরের ধূর্ত, কে বলতে পারে, তার তৃতীয় কনো অভিসন্ধিও আছে কিনা! … তাই ভ্রাতা, তুমি এখানেই বৌদিদের আর মাতার কাছে থাকো”।

ছন্দ বিনীত ভাবে বললেন, “কিন্তু সুর, এক সম্রাট যদি তাঁর বচনের মানই রাখতে না পারে, তাহলে প্রজা তাঁকে বিশ্বাস কি করে করবে!”

সুর উদ্ধত হয়ে এবার খানিক নিকটে এসে বললেন, “বচন মিত্রকে দিতে হয়, আর মানও সেই বচনের রাখতে হয়। শত্রুকে না বচন দিতে হয়, আর না সেই বচনকে কনো মান দিতে হয়। আপনি তাঁদের শত্রু মানেন না হয়তো, যতই তাঁরা আপনার মাতা তথা স্ত্রীকে অপহরণের প্রয়াস করুক। আমি তাঁদেরকে শত্রু মানি, আর তাই শত্রুকে দেওয়া কনো বচনের মান আমি রাখতে পারবো না। … শ্রী আমার কাছে অনেক অনেক অধিক মূল্যবান, আপনার শত্রুকে দেওয়া বচনের থেকে। তাই আমি শ্রীর সন্ধানে চললাম। আপনি আপনার বচন নিয়ে বসে থাকুন”।

তালের উদ্দেশ্যে সুর বললেন, “বচনের মান তোমার কাছেও নেই জানি ভ্রাতা তাল। তাও বৌদিদের আর মাতার সুরক্ষার জন্য তুমি সঙ্গে থেকো তাঁদের”।

সুর চলে যাবার পর তিন মাসের বনবাসের অধ্যায় সমাপ্ত হয়ে গেল, কিন্তু না সুর ফিরে এলো, না ফিরে এলেন শ্রী আর না পদ্মিনী ও নলিনী পুত্ররা। ছন্দ রইল দন্ধে আর নিজের দেওয়া বচনের মান ধরে। সেই দেখে দেবী পদ্মিনী, যিনি পুনরায় গর্ভবতী হয়েছেন, তিনি বললেন, “আপনার কাছে ভ্রাতা কে? নিজের মায়ের পেটের ভাই, যে সর্বক্ষণ আপনার হিত চেয়ে থাকেন, যার আদর্শ গর্ব করার মত, সেই সুর, নাকি অত্যাচারী নিষ্ঠুর আর দুরাচারী করিন্দ্র! …

যদি সুরই আপনার ভ্রাতা হয়, তবে তাকে একাকী ছেড়ে দিলেন কি করে! … তাঁর ঘরণী আপনার কেউ নয়! তাঁর ঘরণীর প্রতি আপনার কনো কর্তব্য নেই! … এক দুরাচারীকে দেওয়া বচন আর নিজের কন্যাসম ভ্রাতার পত্নী, এঁদের মধ্যে আপনি দুরাচারীকেই বেছে নিলেন!”

ছন্দ মাথা নেড়ে বললেন, “দেবী তুমি বুঝতে পারছো না, এক সম্রাটের বচনই শেষ কথা। এক সম্রাট নিজের বচনের থেকে কিছুতেই সরে আসতে পারেনা, যতই সেই বচনের মান রক্ষা করার জন্য, তাকে সর্বস্ব খোয়াতে হোক। তবেই প্রজা এক সম্রাটকে বিশ্বাস করতে পারেন, অন্যথা সম্রাটকে কিভাবে বিশ্বাস করবেন!”

দেবী পদ্মিনী পুনরায় বললেন, “একবার প্রজার স্থানে নিজেকে স্থাপন করে দেখুন তো মহারাজ। এক ব্যক্তি দুরাচারীকে একটি বচন দিলেন সেই দুরাচারীর ছলের কারণে। আর সেই বচনের মান রাখার জন্য সর্বস্ব কিছু করছেন। … একবার প্রজার স্থানে নিজেকে বসিয়ে দেখুন, সেই ব্যক্তিকে প্রজা কখনো বিশ্বাস করতে পারবে! কখনো ভরসা করতে পারবে!… কাল তো এই ব্যক্তিকে আরো এক দুরাচারী এসে ছল করে বচন নিয়ে নেবে, আর তার ফলস্বরূপ কি হবে? প্রজাকে অনাথ করে সে আবারও চলে যাবে, বচনের মান রাখার জন্য।

আপনার মনে হয়, প্রজা এমন ব্যক্তিকে ভরসা করে! … অসম্ভব নাথ, অসম্ভব। প্রজা তাঁকে ভরসা করেন যিনি দুরাচারীর সাথে দুরাচার করে হলেও প্রজার সাথে থাকেন, আর মিত্রকে দেওয়া বচনের সর্বদা মান রাখেন, কারণ সে মিত্র আর সেই মিত্রের কারণেই তাঁর প্রজা সুরক্ষিত থাকবে। মহারাজ, এক সম্রাটের কর্তব্য সর্বদা প্রজার মান রক্ষা করা, নিজের বচনের মান রক্ষা করা নয়। … আপনি যেই বচন দিয়েছেন, তাতে প্রজার মান রক্ষিত হয়েছে! … না মহারাজ, প্রজাকে আপনি এক দুরাচারীর অত্যাচারের সম্মুখে রেখে চলে এসেছেন, নিজেকে ধার্মিক প্রমাণ করার জন্য।

এক সম্রাট এতটা স্বার্থান্বেষী কি করে হতে পারে নাথ! … প্রজার হিতের থেকে অধিক মান সম্রাট কি কারুকে দিতে পারেন! তাহলে আপনি এই বচনের মান কেন রাখছেন? প্রজাকে অনাথ করে কি ভাবে আপনি আসতে পারলেন? তা কি এক সম্রাটের লক্ষণ! … নিরপেক্ষ বিচার করে বলুন, এই কি সম্রাটের লক্ষণ!”

ছন্দ শিশুর মত ক্রন্দন করে উঠে বললেন, “আমি কি করবো দেবী! … আমি কি ভুলের পর ভুল করে যাচ্ছি? … শ্রী আমাদের সকলের কন্যার ন্যায় ছিল। তাকে হারালাম আমি, আমার প্রাণের থেকেও প্রিয় ভ্রাতা সুরকে হারালাম, আমাদের সন্তানকে হারালাম। … আমি আর কিছু বুঝতে পারছিনা পদ্মা! … কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা!”

পদ্মিনী শান্ত হয়ে বললেন, “নাথ, একাকী সিদ্ধান্ত নেওয়া বন্ধ করে দিন। … সুর সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে পারদর্শী কারণ সে সকল সময়ে প্রকৃতির ও সময়ের মার্গদর্শন অনুসারে সিদ্ধান্ত নেয়। আজ সে সম্মুখে নেই। চলুন আমার সাথে। মাতা চিত্তা একজন বিচক্ষণ মহীয়সী। আপনার ভ্রাতা, তাল সর্বক্ষণ অঙ্গাঙ্গী ভাবে সুরের সাথে থাকতো, তাই তাঁর বিচারের মধ্যেও সুরের প্রভাব প্রত্যক্ষ। আর নলিনীর বিচারক্ষমতার প্রতি আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে। চলুন সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিই, আমাদের পরবর্তী করনীয় ঠিক কি?”

রাজা সহিষ্ণুকে সঙ্গে নিয়ে, সকলে মিলিত ভাবে উপস্থাপন করলে, তাল বললেন, “আমি বৌদির সাথে একমত ভ্রাতা যে, এই বচনের মান রাখার কনো প্রয়োজন নেই। আর আমার মনে হয়, এবার আমাদের আমাদের পরবর্তী যোজনা স্থির করা অতি আবশ্যক। সুরের ব্যাপারে আমি বলতে পারি, সে ছদ্মবেশে বিভিন্ন রাজ্য প্রদক্ষিণ করে বেড়াচ্ছে। সুরের বিশ্বস্ত সেনপক্ষীর মাধ্যমে আমাদের মধ্যে খবরচালাচালি হয়েছে। সে এখনো শ্রীকে খুঁজে পায়নি।

নলিনী আমাকে যা বলেছে, সেই অনুসারে তাঁর ও দেবী পদ্মিনীর সন্তানরা সাধারণ সন্তান নয়। তাঁদের বয়োবৃদ্ধিও স্বাভাবিক হবেনা। অর্থাৎ এই তিন মাসে তাঁরা প্রায় চার মাসের শিশু হয়ে গেছে, যদি তাঁরা জীবিত থাকে। আর জীবিত থাকার সম্ভাবনাই অধিক, কারণ যা খবর পেয়েছি, সেই অনুসারে মহারাজ সহিষ্ণুর থেকে অর্ধেক রাজ্য ছিনিয়ে নেওয়া তাঁর ভ্রাতা কচিন্দ্রের কাছে করিন্দ্ররা বিধ্বস্ত অবস্থায় ফিরে যায়, এবং হতাশ হয়ে বলে যে, না তাঁরা আমাদের স্ত্রীদের হরণ করতে পারে আর না আমাদের সন্তানদের নাগাল পায়।

এর অর্থ, শ্রী আমাদের সন্তানদের সুরক্ষিত রেখে, কোথাও না কোথাও পলায়ন করেছে, আর নিশ্চিত ভাবে আমাদের সন্তানদের সে লালনপালন করছে। … ভ্রাতা, অন্যদিকে, আমাদের সমস্ত মিত্রদের রাজ্য অর্থাৎ রাজা নিষ্ঠাবানের রাজ্য, রাজা বর্ধিষ্ণুর রাজ্য, রাজা কুর্নিশের রাজ্য, রাজা সহিষ্ণুর রাজ্য থেকে অংশ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, আর ছায়াপুর নামে এক রাজ্যকে স্থাপন করতে উলমালা করিন্দ্র, যার প্রতিষ্ঠার বিস্তার এই ছিনিয়ে নেওয়া রাজ্যদের দিয়ে করবে সে।

ভ্রাতা, এই সমস্ত কিছু মাথায় রেখে আমার মনে হয়, আমাদের পুংরাজ্যে গমন করা উচিত। ছদ্মবেশে নয় বরং নিজেদের পরিচয় নিয়েই। সেই রাজ্যের দুই শক্তিধর সর্প হলো গজ ও চমরী। তাঁরা সেখানের রাজা সামন্তকে অত্যন্ত বিরক্ত করে, আর সেই রাজ্য সম্বন্ধে করিন্দ্রের কনো আন্দাজ নেই। অর্থাৎ আমরা যদি সেই রাজ্যে প্রবেশ করে, এই গজ ও চমরীর থেকে রাজা সামন্তকে উদ্ধার করতে পারি, তাহলে আমরা আরো এক মিত্ররাজ্য লাভ করবো”।

দেবী নলিনী বললেন, “মহারাজ, পংরাজ্যের সাথে যেহেতু করিন্দ্রের কনো সম্বন্ধ নেই, তাই সেই রাজ্যে আমরা সুরক্ষিত থাকতে পারবো। আমি ও দিদি, উভয়ই অন্তঃসত্ত্বা, আর শীঘ্রই আমরা আমাদের সন্তানদের জন্মও দেব। মহারাজ, যতক্ষণ না আমাদের সন্তানরা সামান্য অন্তত বড় হচ্ছে, আমরা সংঘাতে যেতে পারবো না। আগামী ১২ বছর আমাদের অজ্ঞাতবাসে থাকার কথা। সেই সময়কাল আমরা যদি আমাদের নিজেদের পরিচয় নিয়েই পংরাজ্যে অবস্থান করি, তাহলে আমাদের সন্তানদের বয়স প্রায় ১৬ হয়ে যাবে। সেই সময়ে, আমরা আমাদের মিত্র রাজাদের সাথে সংলাপে রত থেকে, প্রস্তুত হয়ে যাব”।

তাল পুনরায় বললেন, “সুরের থেকে যা সংবাদ লাভ করেছি আমি, সেই অনুসারে এইমুহূর্তে ছায়াপুর নির্মাণে করিন্দ্র সম্পূর্ণ ভাবে ব্যস্ত। আর সুর যা বলেছে আমাকে, সেই অনুসারে, সে শ্রীর সন্ধান করার সাথে সাথে, সমস্ত মিত্ররাজ্যের মধ্যে স্থিত হয়ে, শ্রেষ্ঠ অক্ষয়সেনা নির্মাণ করে ফিরছে। তার কথন অনুসারে, নিষ্ঠাবানের রাজ্য, তামরসের রাজ্য, কুর্নিশের রাজ্য, তথা বর্ধিষ্ণুর রাজ্য মিলয়ে ৪ লক্ষ সেনার নির্মাণ করবে, যারা পদাতিক হবে, অশ্বারোহী হবে, এবং গজের উপরে স্থিত হয়েও যুদ্ধ করবে।

হস্তিকে যেই বরদান প্রদান করেছিলাম, সেই বরদানের কারণে কৃতজ্ঞ হস্তি এক সহস্র হস্তিরূপ প্রদান করেছে সুরকে, তাঁদেরকে যুদ্ধে রত করার জন্য। এদেরই সাথে রাজা বর্ধিষ্ণুকে, রাজা নিষ্ঠাবানকে, রাজা তামরসকে, এবং রাজা কুর্নিশকে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী করছে সুর। আর এই সমস্ত কর্ম তাঁর সমাপন হতে ১২ বৎসর সময় লাগবে। অর্থাৎ ভ্রাতা, আমরা যদি পং রাজ্যে গমন করে, গজ ও চমরীকে করায়ত্ত করে মনিয়ে সেখানে ১২ বৎসর অপেক্ষা করে রাজা সামন্তকে এবং সহিষ্ণুকে যুদ্ধে পারদর্শী করে তুলতে পারি, তাহলে আমাদের সন্তানরাও ষোড়শ বড়শিয় হয়ে উঠবে এবং তাঁরাও যুদ্ধে পারদর্শী হয়ে উঠবে”।

ছন্দ সমস্ত কিছু শুনে বললেন, “বেশ তাহলে তাই করা হোক। চলুন রাজা সহিষ্ণু, আমরা তাহলে পংরাজ্যে গমন করি। সেই রাজ্যকে গজ ও চমরীর থেকে মুক্ত করে, মিত্ররাজ্যরূপে তাঁকে ধারণ করি। অতঃপরে, সেখানে নিবাস করে, আপনাকে ও রাজা সামন্তকে তাল যুদ্ধে পারদর্শী করে তুলবে”।

সহিষ্ণু বললেন, “যথা আজ্ঞা মহারাজ। সম্রাট রূপে আমরা আপনাকেই দেখতে চাই, আর সেই কারণে আমরা যুদ্ধকৌশল শিখে যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত”।

ছন্দ এবার তালের উদ্দেশ্যে বললেন, “সুরকে পত্র প্রেরণ করো তোমার বৃকসেন দ্বারা আর তাকে বলো, আমরা তার অপেক্ষা করছি। সে তার কর্মসূচি সম্পন্ন করে, পরবর্তী কর্মসূচি কি হবে তা আমাদের যেন বলে। আর তাঁকে বলো, আমি আমার বচন রাখতে আর আগ্রহী নই, আর আমার বচনের মান রাখার ক্রিয়ার জন্য সে আমার উপর যে ক্ষিপ্ত ছিল, তা যথার্থ ছিল। আমি সেই কারণে লজ্জিত, আর তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থীও। আর তাকে বলো, শ্রীর কনো সন্ধান পেলে আমাদের যেন সে জানায়। আর সাথে সাথে, আমাদের কর্মসূচি কি, তাও সংক্ষেপে তাকে বলে দিও”।

তাল বললেন, “আমি আজই পত্র প্রেরণ করছি তার উদ্দেশ্যে। এইক্ষণে সে রাজশাহী রাজ্যে বিরাজ করছে, আর সে সেখানে রাজা নিষ্ঠাবানকে ও তাঁর সেনাকে প্রস্তুত করছে। আর হ্যাঁ, তার কথন এই যে, ছায়াপুর আগামী দিনে করিন্দ্রের দুর্গ হতে চলেছে। তাই সেনা নির্মাণ সমাপ্ত হলে, সে ছায়াপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। এই কর্ম সম্পাদিত করতে দেরি আছে, প্রায় ১০ বৎসর পড়ে সেই কার্য করতে হবে। আর তারপূর্বে আমাকে ছায়াপুরের সম্মুখে উপস্থিত থাকতে বলেছে, কারণ আমরা একত্রে ছায়াপুরে প্রবেশ করে দেখবো, ছায়াপুরের মধ্যে কি মায়া সঞ্চিত আছে, যার নির্মাণ করলে করিন্দ্র মনে করছে, সে অজেয় হয়ে যাবে”।

ছন্দ বললেন, “বেশ, যত শীঘ্র সম্ভব, সুরের সাথে নিরন্তর সংযোগ স্থাপন করো। আর তার মধ্যে চলো, পুংরাজ্যে গমন করে, আমরা নিজেদের পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চয় করি। আর কিছু বিষয় নিয়ে কি সংশয় আছে তাল! … না আমি শ্রীর বিষয়ে বলছিনা। … এই বিষয় নিয়ে উদাসীন তো থাকা সম্ভবই নয়। কিন্তু নিরুপায় লাগে সর্বক্ষণ, যখনই এই বিষয় নিয়ে বিচার করি।

নিজের নির্বুদ্ধিতাও দেখতে পাই, নিজের অনুভবহীনতাকে দেখতে পাই। যারা বারবার আমার পরিবারের ক্ষতিসাধন করতে চেয়েছে, কি করে আমি তাঁদেরকে বিশ্বাস করলাম, আমি আজ তা বিচার করে লজ্জিত, রীতিমত লজ্জিত। কিন্তু শ্রীকে ফিরে পেতে চাই আমি। জানি আমার থেকে তোমার ও নলিনীর তাঁকে ফিরে পাওয়া নিয়ে চিন্তা অধিক, কারণ শ্রী আমার কন্যার ন্যায় হলেও, তোমরা তাঁকে লালনপালন করেছ, সুরক্ষা প্রদান করেছ, তাই সে তোমাদের কন্যার ন্যায় নয়, কন্যাই।

তবুও, আমি সুরের কথা চিন্তা করে, অধিক চিন্তিত। সে শ্রীকে বিশ্বাস করে। এতটা বিশ্বাস আমি তাঁকে কনো মানুষকে করতে দেখিনি। স্বয়ং আমাদের মাতা, দেবী চিত্তাকেও সে এতটা বিশ্বাস করেনা, যতটা শ্রীকে করে। না আমি তার কারণ জানি, আর না তার কারণ বুঝি। কিন্তু আমার ভাইটা তাঁর বিশ্বাসের আধারকে হারিয়ে ফেলে, নিশ্চিত ভাবে অত্যন্ত বেদনাগ্রস্ত আমি বেশ বুঝতে পারছি।

আমি সুরকে চিনি। সে যখন যখন বেদনাগ্রস্ত হয়, তখন তখন অধিক অধিক সময় নিয়জিত করে কর্ম করার জন্য। আজকেও তাল, তোমার মুখ থেকে তার কর্ম উদ্যম শুনে বেশ বুঝতে পারছি যে সে কতটা বেদনায় আক্রান্ত। আর বড় দাদা হয়ে আমি আমার প্রিয় ভাইটির পাশেও নেই তার এই বেদনার সময়ে। … বুঝে পাইনা মা (দেবী চিত্তার উদ্দেশ্যে) দিবারাত্র সে জগজ্জননীর জন্য ব্যকুল। তারপরেও তাকে এত বেদনা কেন সহ্য করতে হয়!”

দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “শ্রীকে নিয়ে চিন্তা করো না। তুমি হয়তো রাজনীতির মধ্যে ডুবে থাকার জন্য, কাকে বিশ্বাস করবে আর কাকে করবেনা সেই দ্বন্ধে ডুবে থাকার জন্য শ্রীর মধ্যে বিরাজ করা ব্যক্তিত্বটি দেখতে পাওনি, কিন্তু সেই ব্যক্তিত্বকে চেনার শক্তি আমার না থাকলেও, সেই ব্যক্তিত্ব আমার কাছে এতটাই আপন যে, আমি ভাগ্যক্রমে সেই ব্যক্তিত্বের দর্শন পেয়েছি। … আর আমার বিশ্বাস যে সুরও নিশ্চয়ই তা পেয়েছে, কারণ আমার আকর্ষণ তাঁর প্রতি যদি মানসিক হয়, সুরের আকর্ষণ তাঁর প্রতি চেতনার আধার।

তাই শ্রীকে নিয়ে আমি নিশ্চিত যে সুরও চিন্তিত নয়। হ্যাঁ, শ্রীর সান্নিধ্য লাভ না করে, সে হয়তো ব্যথিত, সে হয়তো তাদের উপর ক্ষিপ্ত, যাদের কারণে শ্রী তাঁর থেকে আলাদা হয়েছে। কিন্তু কি জানো তো পুত্র, হৃদয়কে সমর্পণ করে যদি অন্য জীবকেও প্রেম করো, তাহলেও বহু পরীক্ষা দিতে হয় তাঁকে। না না সেই পরীক্ষা সেই ব্যক্তি দেয়না। সেই ব্যক্তি সেই পরীক্ষা দেবার মাধ্যম হয়ে কষ্ট ও দুশ্চিন্তা ভোগ করে মাত্র। সেই পরীক্ষা তো দেয় তাঁর প্রেম।

আর যখন সেই প্রেম স্বয়ং ব্রহ্মময়ীর প্রতি জ্ঞাপিত হয়, তখন সেই পরীক্ষা অত্যন্ত ভয়ানক হয়ে ওঠে। ঠিক যেমন এক প্রেমিক যখন এক প্রেমিকার কাছে দাবি করে যে সে তাঁর হৃদয় দিয়ে তাঁকে প্রেম করে, তখন প্রেমিকা সেই প্রেমিককে বিভিন্ন বিকট অবস্থার মধ্যে স্থাপিত করে প্রমাণ চায় যে ঠিক কতটা প্রেম করে সে তাঁকে, তেমনই ব্রহ্মময়ীর কাছেও যিনি দাবি করে বসেন যে তাঁকে অত্যন্ত প্রেম করেন সে, ব্রহ্মময়ী তাঁকে বিকট অবস্থার মধ্যে স্থাপিত করে দেন, পরীক্ষা করার জন্য যে তাঁর প্রেম কতটা নিষ্কলঙ্ক।

পুত্র, একাধারে সেই পরীক্ষা সেই প্রেমীর চরিত্র নির্মাণ করে, তো সেই প্রেমীর মধ্যে মেধার বিস্তার করে, আবার তারই সঙ্গে সেই প্রেমীর প্রেম কতটা কলঙ্কমুক্ত তা জগতের সম্মুখে স্থাপিতও করেন ব্রহ্মময়ী, কারণ সমস্ত কিছুর অন্ত্র তিনি তো মা। সত্য কারের মা, প্রকৃত জননী আমাদের সকলের। তাই প্রেমের পরীক্ষা তিনি নিলেও, জীবরূপ প্রেমিকার ন্যায় তা এই উদ্দেশ্যে হয়না যে, এই প্রেমীর কাছে আমি কতটা সুরক্ষিত।

তিনি জগজ্জননী, তাই কার প্রেমের গভীরতা কতখানি, তা তিনি প্রথম থেকেই জানেন। সেই প্রেমী নিজেকে প্রেমী রূপে চিহ্নিত করার আগে থেকে ব্রহ্মময়ী জানেন যে তিনি কতটা প্রেম নিবেদন করে উপস্থাপন করছেন। তাই তাঁর নিজের জানার কিচ্ছু নেই। কিন্তু পুত্র, সত্যলাভ করতে গেলে সত্যে উপনীত হতে হয়। ঈশ্বরকে প্রেম করে লাভ করতে গেলে, স্বয়ংকে ঈশ্বর হয়ে উঠতে হয়। ঈশ্বর নশ্বর হয়ে অবতরণ করেন মার্গদর্শনের হেতু, প্রেম দান বা প্রেম লাভের হেতু নয়।

তাই প্রেম যদি করা হয়, তবে সেই নশ্বররূপী ঈশ্বর মাধ্যম হতে পারেন, কিন্তু প্রেম তো সেই ঈশ্বরীকেই, সেই নিরাকারাকেই, সেই নির্বিকার, অব্যাক্ত অচিন্ত্য ব্রহ্মময়ীকেই করতে হয়। তাই এই পরীক্ষায়, প্রেমীর পরীক্ষা বিস্তর হয়। প্রেমীকে অজস্র পরীক্ষা দিতে হয়, না না, সে যে কতটা প্রেম করে তা বোঝাতে নয়। যিনি ব্রহ্মময়ীকে প্রেম করেছেন, সেই প্রেমীও স্পষ্ট ভাবেই জানেন যে, তিনি কতটা প্রেম করেন, সেই ব্যাপারে তিনি নিজে কম জানেন, আর ব্রহ্মময়ী অধিক জানেন।

তাই তিনিও জানেন যে এই পরীক্ষা তাঁর প্রেমের পরীক্ষা নয়, বরং এটি কনো পরীক্ষাই নয়। এটি হলো তাঁকে নশ্বরের সীমারেখা থেকে উন্নত করে ঈশ্বর করে তোলার কর্মযজ্ঞ, কারণ এই কর্মযজ্ঞ না হলে যে সে ঈশ্বর হয়ে উঠতে পারবেনা, আর সে যদি ঈশ্বর না হয়ে উঠতে পারে, তবে যে ঈশ্বরের সাথে তাঁর মিলন অসম্ভব, কারণ নশ্বর থেকে ঈশ্বর তাঁকে হতে হবে তবেই মিলন হবে, ঈশ্বর থেকে তিনি নশ্বর হলে, কেবলই যে সাখ্যাত হবে তাঁদের, মিলন হবেনা।

তাই আমাদের নেত্রে যা প্রেমের পরীক্ষা, এক প্রেমীর কাছে তা পরীক্ষা নয়, বরং তা হলো প্রশিক্ষণ, তা হলো অনুশীলন, আর তা হলো অনুশাসন ও নিরন্তর করে চলা অভ্যাস। লেশ মাত্রও আসক্তি থাকলে, ব্রহ্মময়ী তাঁকে মিলনের পাত্র রূপে গ্রহণ করবে না। লেশ মাত্রও আত্মবোধ থাকলে, জগজ্জননী তাঁর প্রেমকে গ্রহণ করবেন না। সামান্যতম অজ্ঞানতা বিরাজ করলেও, সে মিলনের পাত্র হতে পারেনা। যদি লেশ মাত্রও আমিত্ব বিরাজ করে, সামান্য তম ভাবেও নিজেকে কর্তা জ্ঞান করা থাকে, তাহলে তিনি আর মিলনের পাত্র হবেন না।

প্রেমীকে প্রথম ব্রহ্মময়ী এই সত্য সম্বন্ধে সচেতন করেন বহুকালের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে, যাকে আমরা দেখে মনে করি সেই প্রেমীর প্রেমের পরীক্ষা। যখন সেই প্রেমী এই সমস্ত তত্ত্বকে ব্রহ্মময়ীর প্রদত্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপলব্ধি করে ফেলে, তখন থেকে শুরু হয় অনুশীলন ও অনুশাসন পর্ব। সেই অনুশাসন ও অনুশীলন পর্বে রত করতে আমি আমার দিদিকে অর্থাৎ মাতা সর্বাম্বাকে দেখেছি। সেখানে তিনি স্বয়িং কনো না কনো ভাবে উপস্থিত হয়ে প্রথম প্রেমীকে এই বিশ্বাস প্রদান করেন যে, তিনি তাঁর প্রেম স্বীকার করতে প্রস্তুত হচ্ছেন, আর তাঁকেও সেই প্রেম প্রদানের জন্য প্রস্তুত হতে হবে এবার।

একবার যখন প্রেমী মাতার সেই কথাকে অনুধাবন করে ফেলতেন, তখন তিনি পুনরায় নিজেকে সংযত করে নিতেন, আর প্রেমীর মধ্যে উপস্থিত হতো হতাশা, নিজের প্রেমকে হারিয়ে ফেলার হতাশা। সেই হতাশাকে দমন প্রেমীকে নিজেকেই করতে হয়। আর তা দমিত করে ফেলতে পারলে, সে এবার অনুভব করে যে, এবার সময় এসেছে নিজের সমস্ত ধারণা, আবেগ, ইত্যাদি সমূহকে ত্যাগ করার, কারণ এই প্রেমপ্রাপ্তি সামান্য মিলন নয়, এই মিলন মানে যে সমাধি, এই মিলন মানে যে মোক্ষ।

তাই প্রেমিকা হলেও, ব্রহ্মময়ী হলেন জননী। সর্বস্ব কিছু হলেও, তিনি হলেন জননী। অর্থাৎ, যা আবশ্যক তা হলো পবিত্রতা। সমস্ত প্রকার যৌনভাব থেকে, সমস্ত প্রকার সাংসারিক সম্বন্ধের আবেগ থেকে, সমস্ত প্রকার সামাজিক ধারণা থেকে, সমস্ত প্রকার চাওয়া পাওয়ার হিসাব থেকে মুক্ত হয়ে, কেবলই দেবার প্রয়াস, এটিই পবিত্রতা। আর তা অনুভব করে এবার প্রেমী হয়ে ওঠেন দাতা। নিজের সামান্য কর্তাভাবকে ত্যাগ করে, পূর্ণতা ভাবে কৃতান্তকে গ্রহণ করে কৃতান্তিক হয়ে উঠে, তিনি এবার নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে নিয়জিত করেন নিজের আরাধ্যের কাছে, নিজের প্রেমের কাছে, ব্রহ্মময়ীর কাছে।

আর সে ব্রহ্মময়ীর কনো কথাতে বিচার করেনা। যদি তাঁর নির্দেশের অর্থ অনুভব করতে না পারে, তখন সে বলে, যদি অনুভব আগে দেবার হতো, ব্রহ্মময়ী মা আগেই তা দিয়ে দিতেন। কর্ম করতে করতে যথার্থ অনুভব আসবে, তাই তিনি আগেভাগে অনুভব দিলেন না। অর্থাৎ সমস্ত ক্ষেত্রে, তাঁর প্রেম, বিশ্বজননী এমন হয়ে ওঠেন যে, তিনি ভুল করেও ভুল করতে সক্ষম নন।

আর এই ভাবে সম্পূর্ণ ভাবে ব্রহ্মময়ীকে একমাত্র কর্তা জ্ঞান করে, এবং নিজেকে তাঁর আশীর্বাদধন্য মাধ্যম জ্ঞান করে, তাঁর সমস্ত নিবেদনকেও আদেশ জ্ঞান করে, কর্ম করতে থাকেন এবং কৃতান্তের অনুশীলন করে করে, নিজেকে অনুসাসিত করতে করতে কৃতান্তিক করে ফেলেন, তবেই তিনি ব্রহ্মময়ীর মিলনের পাত্র হন, ঠিক যেমন আমাদের সকলের মাতা, দেবী মেধা হয়েছিলেন।

পুত্র ছন্দ, আমার পুত্র আমার থেকেও অধিক ব্রহ্মময়ীকে বিশ্বাস করেন, তাতে আমার বেদনা হবার কনো স্থানই নেই, কারণ তা তো আমার কাছে অত্যন্ত গর্বের, কারণ আমার পুত্র একটি বারের জন্যও, লেশমাত্র ভাবেও অসত্যকে স্বীকার করেনি। কেবল মাত্র নিজের দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে সত্যে। তাই পুত্র, তোমার ভ্রাতার অবস্থাতে চিন্তিত থেকো না। তাঁর জীবন কেবল্ক তাঁর জীবন নয়। তাঁর সম্পূর্ণ জীবন এক পরীক্ষা, তাঁর সম্পূর্ণ জীবন এক অনুশীলন, এক অনুশাসন, নশ্বর থেকে ঈশ্বর হয়ে উঠে ঈশ্বরের সাথে মিলনে আবদ্ধ হয়ে মোক্ষলাভই তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য, আর সেই উদ্দেশ্যের নির্মাতা স্বয়ং ব্রহ্মময়ী, সে স্বয়ং নয়।

তাই পুত্র, সুর ও শ্রীর জন্য তোমার স্নেহ সঠিক, কিন্তু তাঁদের জন্য তোমার দুশ্চিন্তা অযৌক্তিক, কারণ তাঁরা উভয়েই এক দিব্যজীবনযাপন করছে, সামান্য মনুষ্য হয়ে জন্ম নিয়েও। এই কারণে তাঁকে পুত্র করে ও শ্রীকে পুত্রবধূ করে লাভ করে, আমি ধন্য বোধ করি, নিজেকে রত্নগর্ভা বোধ করি, আর তোমাকেও বলবো, তাঁকে ভ্রাতা ও কন্যাসোম ভ্রাতার পত্নী করে লাভ করে গর্ববোধ করা শুরু করে দাও, নাহলে যখন সত্য অর্থে গর্ব করার সময় আসবে, তখন হতচকিত হয়ে যাবে তাঁদের দিব্যতার কারণে, আর তাঁদেরকে আলিঙ্গন করে দিব্যসুখ লাভ করা থেকে বঞ্চিত করে দেবে নিজেকে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28