জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

গণ্ড ও হস্তি অতি উচ্চস্বরে হেসে উঠলে, গণ্ড বললেন, “ওহ করিন্দ্র! … ওরে সেই রাজা রে, যে অত্যন্ত নির্বল বলে ছল করে চিত্তাপুত্রদের থেকে রাজ্য ছিনিয়ে নিয়ে সম্রাট হয়েছে”।

হস্তি বললেন, “ভ্রাতা গণ্ড, চলো এঁদেরকে আমরা হত্যা করে দিই। তাহলে আমরা এবার সমস্ত জম্বুদেশের সম্রাট হয়ে যাবো”।

এত কথা বলে, মুষ্টি ধারণ করে আঘাত করতে এলে, ভণ্ড নিজের ধনুর্বাণ নিয়ে চকিতের মধ্যে, একটি খাঁচা নির্মাণ করে, সেই খাঁচার মধ্যে গণ্ডহস্তিকে বন্দী করে দিলেন। বন্দী হয়ে অসহায়ের মত খাঁচার দণ্ড ভাঙার প্রয়াস করলে, ভণ্ড বললেন, “চিত্তাপুত্রদের পরাজিত করতে পারিনি মানে এই নয় যে তোমাদের থেকেও দুর্বল আমরা। তোমাদের চিত্তাপুত্রদের শক্তি সম্বন্ধে কনো আন্দাজ আছে! … একবার সুর যদি অস্ত্র ধারণ করে, আর তাল যদি মুশল ধারণ করে, তাহলে তাদেরকে কেউ পরাজিত করতে পারবেনা”।

করঙ্ক উপহাসের সুরে বললেন এবার, “আর হে বুদ্ধিহীন দৈত্য, তোমাদের কাছে এই খবর আছে যে, সেই চিত্তাপুত্ররা এক্ষণে নিরস্ত্র হয়ে রাজা সহিষ্ণুর বনাঞ্চলে রয়েছে, আর রাজা সহিষ্ণুর সাথে তারা মিত্রতা করছে! … ভেবে দেখো, এই মিত্রতার পর যখন তারা অস্ত্র ধারণ করবে, আর যখন রাজা সহিষ্ণু বলবে যে তোমরা তার শত্রু, তখন তোমাদের কি হাল করবে তারা!”

করিন্দ্র এবার হেসে বললেন, “এসেছিলাম তোমাদের সাহায্য করবো বলে। … তোমরা বলশালী, নিরস্ত্র চিত্তাপুত্রদের হত্যা করার সামর্থ্য ধরো। একবার তাদের হত্যা করে দিলে, আর রাজা সহিষ্ণু তোমার কিচ্ছু করতে পারবেনা। … আমরা তো তোমাদের এই কথাও দিতে এসেছিলাম যে, সহিষ্ণুর হত্যা করে, তার রাজ্য আমরা তোমাদের দুই ভাইকে সঁপে দেব। কিন্তু না, তোমরা সত্যই বুদ্ধিহীন”।

হন্তদন্ত হয়ে গণ্ড বললেন, “সম্রাট, আমাদের ক্ষমা করে দিন, আমাদের দয়া করে মুক্ত করে দিন। আমরা এখনি যাচ্ছি সহিষ্ণুর বনে আর চিত্তাপুত্রদের মৃত্যু দিয়ে, তাদের শবদেহ নিয়ে আপনাদের কাছে আসছি। আমাদের মুক্ত করে দিন কৃপা করে!”

করিন্দ্র ভণ্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দাও এঁদেরকে মুক্ত করে দাও মিত্র, এঁরা চিত্তাপুত্রদের হত্যা করে আসলে, এঁদেরকে ভ্রমরীপ্রদেশের রাজা করে দেব”।

এতবললে, ভণ্ড একটি বাণে কারামুক্ত করলে, গণ্ড ও হস্তি প্রবল গতি ধারণ করে, ভূমিকে কাপিয়ে কাপিয়ে প্রস্থান করলেন সহিষ্ণুর বনাঞ্চলে।

অন্যদিকে ভ্রমরীপ্রদেশের বনে আগমনের অন্তরালে বেশ কিছু ঘটনা হয়ে গেছিল, যার সংবাদ ভণ্ড গ্রহণ করেনি, কারণ তা ছিল তার কাছে অপ্রয়োজনীয়। চন্দননগর থেকে নির্গত হয়ে, চিত্তাপুত্ররা তাঁদের পত্নী ও মাতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম উপবেশন করেন বর্ধমান অঞ্চলের একটি বনাঞ্চলে, যার নাম ছিল ত্রিবেণীবন। জগদ্ধাত্রী ও সরস্বতী নদীর সঙ্গমস্থল সেখান থেকে অতিনিকটে, বা বলা চলে বনের একটি প্রান্তই হলো সেই নদীর সঙ্গমস্থল। তাই বনের সেইদিকটা ছিল পুণ্যসন্ধানী পাপাত্মদের গমনাগমন স্থল।

সেই পাপাচারীরা স্নানের বলে পুণ্যলাভ করার অন্ধবিশ্বাস ধারণ করে যাতায়াত করার জন্য, ভণ্ড তান্ত্রিকগণ তাঁদের অন্ধবিশ্বাসকে ব্যবহার করে লুণ্ঠন করার জন্য সেখানে প্রায়শই অবস্থান করতেন। জগদ্ধাত্রী নদীর তীর ধরে ধরে সেই স্থানে উপস্থিত হলে, ছন্দ ও তাল ভণ্ড তান্ত্রিকদের এমন আচরণে ক্ষিপ্ত হলে, সুর তাঁদেরকে শান্ত করে বললেন, “ভ্রাতা, মুদ্রার একটি দিকই কেন দেখছো তোমরা! সেই অন্ধবিশ্বাসীদেরও তো দেখো, যারা আচার অনুষ্ঠান, রীতি রেওয়াজের নামে শতশত দুরাচার করে, ত্রিবেণী সঙ্গমে এসে, স্নান করে নিজেদেরকে পুণ্য করার আজব অজ্ঞানতা ধারণ করে রয়েছেন!

যদি নিজের দোষ ঢাকতে কেউ, নিজের অট্টালিকার পিছনে কারুকে কবর দিয়ে দেয়, তাহলে চিলশকুনের আগমন তো হয়েই যাবে। তাই না! এখানেও তো ঠিক তেমন। অত্যাচার করছেন কারুর উপর, নির্ধন করছেন কারুকে, দরিদ্র করে দিচ্ছেন কারুকে, আর সঙ্গমে এসে সেই মক্কেলরা মনে করছে পুণ্যবাণ হয়ে যাবেন। যদি মক্কেলই এমন মূর্খ হন, তাহলে এমন চিলশকুন তো তাঁদেরকে আহার করতে এসে যাবেন, সেটিই তো স্বাভাবিক।

আরো গভীরে প্রবেশ করে দেখুন ভ্রাতা। এই যে এঁরা পাপাচারী, তাদের বেশিরভাগই এই দুরাচার করছেন, সেই ধূর্ত শৃগালদের কারণে, যারা সমাজে উপস্থাপন করে বিধান দিতে থাকেন, এর এই অধিকার আছে, তার সেই অধিকার নেই, বিধবাকে এমন করতে হবে, বিধবা এমন করতে পারবেনা, এত দান করতে হবে, সেই দান প্রদান করার জন্য কারুকে লুণ্ঠন করতে হলেও কনো আপত্তি নেই। … এই সমস্ত তাঁদের বিধানে করার পর, যখন তাঁদের আজ্ঞাবাহকদের মধ্যে বিবেকের দংশন আসে, তখন তাঁদেরকে এই শৃগালরাই বিধান দেন যে, পুণ্যস্নান করে এসো, সমস্ত অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।

আর যখন তাঁরা এমন করতে আসেন এই সঙ্গম স্থানে বা অন্যত্র, তখন তাঁদেরকে লুণ্ঠন করার জন্য এই চিলশকুনরা উপস্থিত থাকেন। আসলে ভ্রাতা, এ এক বৈদিকদের বাণিজ্যপ্রথা। এঁরা এমনই ব্যবস্থায়ন করে রেখেছে যাতে একটি ব্যক্তিকে ভিন্ন ভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি লুণ্ঠন করতে থাকেন। প্রথমে তাঁকে দিরাচারি করে দেন শৃগালরূপীরা, পরে তাঁদের বিবেকদংশন জন্ম নেয়, আর অজ্ঞানী মূর্খ সেই অন্ধবিশ্বাসী বৈদিক সমর্থকদের বিধান দেন যে তীর্থে যাত্রা করে দান করে, পাপস্খলন করে আসতে। আর সেখানে এই চিলশকুনরা অপেক্ষা করে তাঁদের হাড়মাস চিবিয়ে খাবার জন্য”।

তাল বললেন, “সুর, তোমার কথা শুনে এমন বোধ হচ্ছে যে, যাদেরকে তুমি অন্ধবিশ্বাসী বলছো, তাঁদের কনো দোষ নেই। তাঁরা যে অন্ধবিশ্বাসী, আর সেই অন্ধবিশ্বাসকেই জ্ঞান মেনে মেনে, নিজেদের অজ্ঞানী করে রেখে দিয়েছে, এই দায় কি তাদের নয়?”

সুর বললেন, “দায় তাঁরা এড়িয়ে যেতে পারেনা, কিন্তু ভ্রাতা, এই বৈদিক শৃগাল আর চিলশকুনরা এঁদেরকে এক অদ্ভুত জাঁতাকলে আবদ্ধ করে রেখে দিয়েছেন। … হয় এঁরা ভীত, নয় এঁরা তটস্থ। … বৈদিক আচার নিয়ে প্রশ্ন করার স্পর্ধা দেখানোর জন্য, এঁরা বেশ কিছু জাতিকে বেদ ও পুরাণ পাঠ থেকেই বহিষ্কার করে দিয়ে বুঝিয়ে রেখেছেন যে, যেন স্বয়ং ঈশ্বরই তাঁদের উপর রুষ্ট।

এই ভাবে তাঁদেরকে ভয় দেখিয়ে রেখেছে যে, আর কেউ ধর্মস্খলনের ভয়ে, বেদপুরাণের কথনের বিষয়ে, তাতে লিপিবদ্ধ রীতি আচারের উপর প্রশ্ন করার স্পর্ধাও দেখান না। আর এই ভাবে, এই বৈদিক শৃগালরা এই মানুষগুলিকে আবদ্ধ করে রেখে দিয়েছে অজ্ঞানতার মধ্যে, আর এঁদেরকে এই বুঝিয়ে চলেছে সর্বক্ষণ যে, এই রীতিরেওয়াজ, এই আচারঅনুষ্ঠানের বিধিসমূহ জানাই হলো জ্ঞান। কি কর্মকে পুণ্য বলে বেদশাস্ত্র, আর কাকে পাপ বলে বেদশাস্ত্র, তা জানাই হলো জ্ঞান। আর এই ভাবে এই শৃগালরা, অজ্ঞানতাকেই জ্ঞান রূপে স্থাপিত করে রেখে দিয়েছে এই শৃগালরা।

ভ্রাতা, এই প্রথা সর্বত্র বিরাজমান থাকলেও, এই ভূখণ্ডের আদিমতম ছেত্র, অর্থাৎ এই জম্বুদেশে এই প্রথা বিরাজমান ছিলনা। এই ভূমি মহর্ষি মার্কণ্ডের মার্গদর্শনের ফলে পাবনভূমি, মহর্ষি কপিলের চরণস্পর্শ লাভে পাবন এখানের ধুলারজ, গৌতম বুদ্ধের স্নেহে সজলা এই ভূমি। এখানে এমন কনো প্রথা পূর্বে স্থাপিত ছিলনা, যেমনটা জম্বুদেশের বাইরে, আর্য-অধিষ্ঠিত স্থানে অবস্থান করে চিরকাল। এখানে এই প্রথার স্থাপনা করেন দেবী মোহিনী, তাঁর পিতাদের এবং রাজা আত্মের প্রভাবে।

মাতা মেধা, মোহিনীর রাজ্যস্থাপনকে স্থগিত করলেও, মাতা সর্বাম্বা আত্মের ও তাঁর কুলের দমন করলেও, যেই কুপ্রভাব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে গেছিল, তা সম্পূর্ণ ভাবে বিনষ্ট হয়নি যে, তা এই ক্ষেত্রগুলিকে দর্শন করলেই জানা যায়”।

ছন্দ চিন্তিত হয়ে বললেন, “এই যে আমরা রাজ্যচ্যুত হলাম, আর করিন্দ্র সম্রাট হয়ে উপস্থাপন করলো, এই করিন্দ্রের পৃষ্ঠপোষক যারা, তাঁরা দেবী মোহিনীরই বংশধর ও প্রেরণাউদ্ভূত। অর্থাৎ বুঝতে পারছো, এই অন্ধবিশ্বাস কি পরিমাণে বৃদ্ধি পেতে চলেছে সম্পূর্ণ জম্বুদেশে! এর নিরাময় তো অসম্ভবপ্রায় হয়ে যাবে এবার! পূর্বে একটি স্থানে ছায়াপুর ব্যপ্ত ছিল, তারই প্রতিফলন যদি এমন হয়, তবে এবার তো সে সম্রাট, সম্পূর্ণ জম্বুদেশে তাঁর রাজত্ব। কি হাল হতে চলেছে এই দেশের, তার কথা চিন্তা করেই আমার হাতপা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে”।

দেবী পদ্মিনী বললেন, “নাথ, আপনিই এই রাজ্যের সম্রাট। তাই এর নিরাময়ও আপনাকেই করতে হবে। তাই চিন্তা না করে, এই অন্ধবিশ্বাসকে সমাপ্ত করে জ্ঞানের আলোক স্থাপনের উপায় নির্মাণ করুন”।

নিরুপায় ছন্দ এবার সুরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে, সুর বললেন, “ভ্রাতা, অজ্ঞানতার অন্ধবিশ্বাসের কারণ সন্ধান অতি আবশ্যক। এই অন্ধত্বের বিস্তার হলো কেন? এই অন্ধত্ব্বের বিস্তার হবার কারণ যদি সন্ধান করা হয়, তবে একটিই কারণ আমার নজরে আসছে, আর তা হলো জিজ্ঞাসাকে স্তব্ধ করে দেওয়া। বৈদিকরা জিজ্ঞাসাকে কি আচার করা উচিত, কি অনুষ্ঠান করা উচিত, কি রীতি অনুসরণ করা উচিত, কিসে পাপ, কিসে পুণ্য, এতেই আবদ্ধ করে রেখে দিয়েছে। আর এর ফলে তাত্বিক গোলযোগ যদি কিছু থাকে, তা নিয়ে চর্চাই করা হয়না; যা মীমাংসা নয়, তাকে মীমাংসা রূপে স্থিত করে রাখা হলেও, তা নিয়ে জিজ্ঞাসার স্থান নেই, অবকাশও নেই।

আমার মনে হয়, সেই কারণেই মাতা সর্বাম্বা, পূর্বের অবতার সমূহের মত এই বৈদিক ধারাকে উন্নত করার প্রয়াসও করেননি। বরং তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে বৈদিক ধর্মের পরিবারে জন্মগ্রহণ করা, তিনিই অন্তিম অবতার, যেমন মহম্মদ ইসলামের ক্ষেত্রে বলে দিয়েছিলেন, তেমন ভাবেই। আর সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবতারগ্রহণের এক নূতন স্থান নির্মাণ করে গেছেন, কৃতান্তিক রূপে। আমার মনে হয়, এই অন্ধবিশ্বাস এমনই শেকড় গজিয়েছে যে, মাতা সর্বাম্বা বাধ্য হয়েই এক নূতন ধর্মের রচনা করে গেছেন।

কারণ দেখুন ভ্রাতা, সেই ধর্মের মূল কথাই হলো জিজ্ঞাসা। শিক্ষার্থী জিজ্ঞাসা করবেন, আর শিক্ষককে তাঁর জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে হবে। অর্থাৎ, অন্ধত্বকে এই ধর্ম থেকে প্রথমেই নিষ্কাসিত করে দিয়েছেন মাতা। … ভ্রাতা, আমার মনে হয়, আমাদের শীঘ্র এই অজ্ঞাতবাস সমাপ্ত করে এসে, এই জম্বুদেশের শাসনের ভার গ্রহণ করা উচিত। আর সেই ভার গ্রহণ করে, আমাদের কৃতান্তিক ধর্মের প্রসার করা উচিত”।

দেবী সর্বশ্রী অত্যন্ত স্বল্পভাষী। তাঁর কণ্ঠস্বর এক বালিকার মতন। তাঁর কথাবলার ধরনও অনুরূপ। তবুও তিনি প্রশ্ন করলেন এই ক্ষেত্রে, “প্রসারের অর্থ কি? জোর করে যেমন বৈদিকরা মানুষের উপর এক ধর্ম আরোপ করে দিয়েছিলেন, তেমন ভাবেই কৃতান্তিককে স্থাপিত করে দেওয়া?”

সুর বললেন, “না না, তেমন করা উচিত হবেনা। তেমন করাও তো ব্যক্তিস্বাধীনতাকে হনন করা হয়ে যাবে! মাতা সর্বাম্বা এই ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সর্বস্তরে জোর দিয়েছিলেন। রাজা চন্দ্রনাথ ও সূর্যনাথ নিজেদের বিস্তার চাইতে, তিনি তাঁদেরকে বিস্তার করতে দিয়েছিলেন। আত্ম নিজেকে বিস্তার করার জন্য ব্রহ্মময়ীকে পথ থেকে সরিয়ে দিতে চাইলে, মাতা বিষগ্রহণ করে পথ থেকে সরে যান। সর্বক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতাকে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তাই জোর করে কারুর উপির কিছু চাপিয়ে দেওয়ার অর্থ তো মাতারই অপমান করা। কিন্তু বিকল্প কি দেবী?”

স্বামীর থেকে কথা বলার অনুমতি পেলে, দেবী শ্রী, নিজের বালিকাসুলভ স্বভাব নিয়েই বললেন, “নাথ, কনো ভারী অসুখ হলে, অবশ্যই ওষধি প্রদান করে সেই অসুখ থেকে অসুস্থকে মুক্ত করা হয়। কিন্তু তাতেই কি সেই অসুস্থ ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন? না নাথ, তাঁকে সমানে পুষ্টিকর আহার প্রদান করে যেতে হয়, যার থেকে সে নিজের হাড়িয়ে যাওয়া পুষ্টি ফিরে পেয়ে, পুনরায় পূর্ববৎ সুস্থতা লাভ করতে পারেন, তাই না! … তাই এমন কেন ভাবছেন যে, কেবল সম্রাট রূপে মহারাজ ছন্দ উপবেশন করলেই এই অসুস্থতা দূর হয়ে যাবে। হ্যাঁ, অসুখের থেকে নিরাময় অবশ্যই হবে তাতে। কিন্তু দুর্বলতার ভান!”

সুর বুঝলেন যে দেবী শ্রী এমন কিছুর ইঙ্গিত করছেন ভাবিকালের প্রেক্ষাপটে, যার ধারণা তাঁরা বর্তমানে দাঁড়িয়ে করতে পারছেন না। তাই তিনি বললেন, “দেবী নব্যধারার জন্য আমরা মনুষ্য বহুতর চিন্তন করি। কিন্তু সত্য বলতে, আমাদের সমস্ত নব্যধারার মধ্যে থাকে একটি শীঘ্র ফল লাভ করার মানসিকতা। এর কারণও আছে যথাযথ। আসলে আমরা মনুষ্যরা, যতই পুনর্জন্মকে সত্য মানি, জীবন কিন্তু আমাদের এই একটি দেহের অস্তিত্বকেই মানি।

আর তাই, সর্বক্ষণ আমাদের চিন্তা এই থাকে যে, এই দেহেতেই কর্ম করে, কর্মের ফল দেখে যাবো। আর এটিই হলো আমাদের এই শীঘ্র ফল লাভ করার বাসনা বা কামনা। দেবী আপনি যেই অসুস্থতা থেকে মুক্তির উপায় বললেন, তা শুনে আমার মনে হলো এই যে, তা শীঘ্র ফলদাতা নয়। অর্থাৎ এঁর ফল অতি ধীরে লাভ হতে থাকবে, তবে তা হবে অত্যন্ত নিখুঁত। সত্য বলতে কি জানেন দেবী, এমন কিছুর স্থাপনা বা স্থাপনার পরিকল্পনা তিনিই করতে সক্ষম, যিনি কালজয়ী, অর্থাৎ যিনি একটি দেহকে জীবনজ্ঞান করেন না।

তাঁর পক্ষেই এমন কনো কিছু করা, বা তার পরিকল্পনা করা সম্ভব, ঠিক যেমন মাতা সর্বাম্বা কৃতান্তিক ধর্ম স্থাপন করে গেছেন। তবে আমি আপনার কথাতে সহমত যে, কেবল রাজ্যস্থাপন করলেই কৃতান্তিক ধর্মের প্রকৃত প্রসার সম্ভব নয়। কৃতান্তিক ধর্মের মূলবক্তব্যই হলো নিঃশর্ত প্রেমদান। বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে ধারণ করে, জিজ্ঞাসা, বিশ্বাস, স্নেহ, মমতা ও সমর্পণই এই ধর্মের মূলধারা। আর তাই প্রয়োজন সমাজধারা, অর্থনীতি থেকে মুক্ত, রাজনীতি থেকে মুক্ত, একটি সামান্য প্রতিষ্ঠান, যা স্বনির্ভর হবে, যা কনো কিছুর দ্বারা পরিচালিত হবেনা কৃতান্তিক ধর্ম ব্যতীত, অর্থাৎ প্রেম ব্যতীত। …

তবে কি জানেন তো দেবী, এমন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য প্রয়োজন নিষ্ঠাবান সদস্যসমূহ, অর্থাৎ আমাদের মত ব্যক্তিদ্বারা তা স্থাপিত হবেনা। আমরা তো রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত। তাই সমাজগঠন, অর্থনীতি গঠন, এই মনিয়েই আমরা উলমালা সর্বক্ষণ। আমাদের নিষ্ঠা যথার্থ নয় এর জন্য। … এই প্রতিষ্ঠানকে রাজ্য, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে স্থাপিত রাখা অত্যন্ত আবশ্যক। কারণ এই প্রতিষ্ঠানকে আমরা সমাজের পাঠ প্রদান করবো না, বরং এঁই প্রতিষ্ঠান আমাদেরকে, অর্থাৎ রাজকর্তাদের সমাজচেতনা প্রদান করবে।

এঁরা রাজপরিবারকে প্রদান করবে যথার্থ অর্থনীতির জ্ঞান, যাতে করে অর্থবণ্টন সমাজে চলমান থাকে, সাবলীল থাকে অথচ প্রজার মন কখনোই ধনসর্বস্ব না হতে পারে। অর্থনীতি, সমাজনীতি, প্রজাপালন নীতির জ্ঞান তাঁরা আমদেরকে প্রদান করবে, আর আমরা তাঁর সেই নীতিকে অনুভব করে, বিস্তর রাজ্যে তার ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কি সুবিধা অসুবিধা হবে, তার বিচার পর্যালোচনা করে, তাকে রাজ্যস্তরে স্থাপন করবো।

কিন্তু দেবী, এই বিশ্বাস কাকে অর্পণ করা যেতে পারে! … মাতা সর্বাম্বা ছিলেন সেই বিশ্বাসের আধার। তিনি এমন কিছু নির্মাণ করে গেলে, তাঁকে ভরসা করতে পারতাম, বিশ্বাস করতে পারতাম। মাতা চিত্তাও যদি তা করতেন, তাহলে ভরসার জায়গা থাকতো। … কিন্তু তিনি অন্যভূমিকায় স্থিতা। তাই এমন প্রতিষ্ঠান লাভ হবার সম্ভবনা অতি ক্ষীণ দেবী, অতি ক্ষীণ”।

দেবী শ্রী হাস্যমুখে বললেন, “চিন্তা কেন করেন নাথ! অভিপ্রায় যখন সর্বজনের কল্যাণ হয়, প্রয়াস যখন সর্বজনকে জ্ঞানমুখরিত করে স্বতন্ত্রতা প্রদান করার ন্যায় উন্নত ভাবধারা হয়, তখন উপায় কিছু না কিছু হয়েই যায়। মাতা দেহ ত্যাগ করেছেন, মাতার অস্তিত্ব তো আর মিটে যায়নি! … এই প্রকৃতি থাকতে, এই কাল থাকতে, আমাদের অন্তরে অহংমুক্ত আমিত্বমুক্ত আত্মমুক্ত চেতনা বিরাজমান থাকলে, মাতা কি করে বিদায় গ্রহণ করলেন!

নাথ, এই প্রকৃতির ঔরস ধারণ করেই তো এক পুরুষের মধ্যে বীর্যগুণ জন্ম নেয়, তাই না! এই প্রকৃতির থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে করেই, তো এক স্ত্রীর গর্ভে অণ্ড জন্ম নেয়, তাই না! … অর্থাৎ কেবলকি সমস্ত সদ্যজাতদের চেতনা! না তো, তাঁদের দেহেরও প্রকৃত জননী তো এই প্রকৃতিই। জননী তো কেবলই প্রকৃতির দেয় পুষ্টিকে ভারসাম্যতা প্রদান করে, শিশুর দেহগঠনকে ধারণ করেন মাত্র। জন্মদাত্রী তো তিনি কখনোই নন। সর্বক্ষেত্রেই জননী আমাদের ব্রহ্মময়ী স্বয়ং।

কালনিয়ন্তা নিয়তি অর্থাৎ মহাকালী তিনি। তিনি কালকে নিয়ন্ত্রিত করেন বলেই তো স্ত্রীপুরুষের সঙ্গম হয় বা মিলন হয়। সঙ্গমের থেকে অজ্ঞানীর জন্ম হয়, আর মিলনের থেকে জ্ঞানীর জন্ম হয়। বিচার করে দেখুন নাথ, এই যে সঙ্গম অর্থাৎ সম্ভোগের মানসিকতা সহ যৌনমিলন, বা মিলন অর্থাৎ স্নেহদানের মানসিকতা সহ যৌনমিলন, কার কারণে এমন ভেদ সৃষ্টি হয়? চেতনার কারণে। আমাদের জগতকে দেখা, প্রকৃতিকে দেখা, কালকে অনুভব করার ধারা অনুসারে আমাদের অন্তরে চেতনা জাগ্রত হয় বা সুপ্ত থাকে।

জাগ্রত চেতনা আমাদেরকে স্নেহদানে রুচিশীল করে তোলে, আর সুপ্ত চেতনা আমাদেরকে সঙ্গমে রুচিশীল করে তোলে। আর এই চেতনাকে প্রবাহিত করে কে? স্বয়ং নিয়তি অর্থাৎ মহাকালী, যিনি আমাদের মানসিকতার প্রসার অনুসারে কালকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন সর্বক্ষণ। আর কালের এই নিয়ন্ত্রন আর চেতনার এমন প্রসারের কারণে প্রবাহিত হন কে? স্বয়ং প্রকৃতিই প্রবাহিত হন নিজের পুষ্টিগুণসহ।

অর্থাৎ, কে আমাদের জননী নাথ? আমাদের সকলের জননী তো তিনিই, মাতা সর্বাম্বাই, ব্রহ্মময়ী মাতাই। তাহলে এমন কেন ভাবছেন যে, একমাত্র মাতা সর্বাম্বাই কিছু করতে পারলে করতেন? সমস্ত জীব যে তাঁরই পুষ্টিকে ধারণ করে জন্ম নিয়েছেন! সমস্ত জীব যে তাঁরই প্রদত্ত পুষ্টিকে দুগ্ধরূপে মাতার স্তন থেকে পান করেছেন! প্রতিটি জীবই যে তাঁরই দ্বারা পরিচালিত, কারণ তিনি কালী রূপে কালকে আমাদের মানসিকতা অনুসারে সর্বক্ষণ সঞ্চালনা করে চলেন। প্রতিটি জীবই যে নিজেদের অন্তরে তাঁরই বিকাশ, অর্থাৎ চেতনার বিকাশ অনুসারেই মানসিকতা ধারণ করে উপস্থাপন করছেন।

অর্থাৎ, তিনি যদি চান এমন কনো প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে, তা তো তিনি যেকোনো কারুকে দিয়েই করাতে সক্ষম, তাই না! যার মধ্যে তিনি যথার্থ চেতনার বিকাশ করাতে সক্ষম হবেন, যার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি সমর্পণ জাগ্রত করতে পারবেন, আর যিনিই কালীকে নিজের গুরুরূপে ধারণ করতে পারবেন, এবং কালের থেকে শিক্ষা গ্রহণে সক্ষম হবেন, মাতা সর্বাম্বার সেই সন্তানই তো অনায়সে এমন প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকর্তা হতে পারেন। পারেন না!”

শ্রী অত্যন্ত স্বল্পভাষী, তিনি কেবলই তাঁর মিষ্ট হাস্য দেন বিভিন্ন কথাতে। এই প্রথম তিনি এতক্ষণ বিস্তারিত ভাবে কথা বললেন, সকলের সম্মুখে। নিভৃতে সুরের সম্মুখে কথা বললেও, সকলের সম্মুখে এতক্ষণ বিস্তারিত কথা তিনি প্রায় বলেননা বললেই সঠিক হবে। তাই সকলে একটু সন্দিহান হয়ে শ্রীর দিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন, আর তাঁর অসাধারণ দর্শনজ্ঞান দেখে অবিভুত হলেন সকলে।

তবে সুরের ভাব অন্য। সে খুব ভালো করে জানে, দেবী শ্রীর অন্তরের ভাব কেমন। উদার, নরম, স্নেহের উত্তাপে উত্তপ্ত, প্রকাণ্ড শক্তিশালী চেতনা তাঁর, এই বিষয়ে সুরের কনোরূপ দ্বন্ধ নেই। তাই সে শ্রীর সমস্ত কথনকে অন্তরে অনুধাবন করে, কেবলই এক মিষ্ট হাস্য প্রদান করলেন মাত্র।

ক্রমে, চিত্তাপুত্ররা বনের অন্তরে প্রবেশ করতে থাকলে, তাঁরা দেখলেন যে বনের অভ্যন্তর তন্ত্রসাধকদের দ্বারা সুরক্ষিত। কিন্তু সেখানে পৌছাতে এক বিষম অবস্থার সম্মুখীন হলেন ছন্দ, যার সত্য বলতে কনো নিরাময়ই ছিলনা তাঁর কাছে। বনের অভ্যন্তরে অবস্থান করে সকলে জানতে পারেন যে, সেখানে নয় নয় করে, দোষ থেকে ১৫ শিশু রয়েছেন, যাদের জননীরা তাঁদের পরিত্যাগ করে, কপট তান্ত্রিকদের ধনবৈভব দর্শন করে, তাঁদের সাথে পলায়ন করেছেন ধনের সুখ ভোগ করার জন্য।

শিশু মানে, তাঁরা অত্যন্তই শিশু, অর্থাৎ দুগ্ধপোষ্য শিশু; তাঁদের মাতার স্তন পান করার বয়স, কিন্তু তাঁদের মাতারাই উপস্থিত নেই তাঁদের স্তনদান করার জন্য। সেই কারণে, ক্ষুধার্ত শিশুরা ক্ষুধার জ্বালায় তারস্বরে চিৎকার করছেন, আর তার ফলে তন্ত্রসাধকরা নিজেদের সাধনাতে মনোনিয়োগই করতে সক্ষম হচ্ছেন না।

ছন্দ ও সকলে কি ভাবে এই সমস্যাস সমাধান করবেন, তা বুঝতে না পারায়, একপ্রকার পলায়ন করলেন সেখান থেকে, পাছে তন্ত্রসাধকদের অভিশাপের পাত্র না হতে হয় তাঁদেরকে। সুর একবার প্রয়াস করেছিলেন নিজের দৈবশক্তির বলে গোদুগ্ধ আনয়ন করে, কিন্তু শিশুরা সেই দুগ্ধ পান করলেন না। তাই সমস্যাস সমাধান হলো না, আর তা দেখে ছন্দ বললেন, “ভ্রাতা, এখান থেকে বনের আরো অন্তরে আমাদের প্রবেশ করে যাওয়া উচিত। নাহলে আমরা সম্রাট হয়েও তাঁদের সমস্যার সমাধান করছিনা দেখে, আমাদেরকে অভিশাপে সিক্ত করবেন এই সাধকগণ”।

এমন বিচার করে রাত্রের অন্ধকারে বনের অভ্যন্তরে চলে গেলেন সকলে। কিন্তু সেই পনেরো শিশুর ক্রন্দনকে তাঁরা কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারলেন না। প্রায় দশ যোজন দূর চলে গেলেন তাঁরা, কিন্তু ক্রন্দনের শব্দ তাঁরা ঠিকই শুনতে পেলেন। তবে তা অধিকদিনের ঘটনা হলোনা। পরবর্তী রাত্রি থেকে আর কেউ সেই ক্রন্দন শুনতে পেলেন না। আরো একটি সপ্তাহ এমন যেতে, একদিন সাহস করে ছন্দ সেই শিশুদের কুশলসংবাদ জানতে সাধকদের নিকট যেতে, সকল সাধক ছন্দকে প্রণাম জ্ঞাপন করে গদগদ চিত্তে দণ্ডায়মান রইলেন।

খানিক ভয়ে ভয়েই ছন্দ শিশুদের ব্যাপারে জানতে চাইলে, এক সাধক সম্মুখে এসে বললেন, “সম্রাট প্রশ্ন করে আমাদের বিব্রত করতে চাইছেন, নাকি যেই কর্ম আপনি করেছেন, তার শ্রেয় আপনাকে প্রদান করিনি বলে, তার শ্রেয়বচন নিজের কর্ণে শ্রবণের ইচ্ছা রাখছেন?”

এই কথন শুনে চমকিত হয়ে গেলে, এক অন্য সাধক সম্মুখে এসে বললেন, “নাথ, আপনাকে যে কি বোলে ধন্যবাদ অর্পণ করবো, তা আমাদের সত্যই অজানা। … এই দেখুন সম্রাট, ১৫ শিশুকে”। … ছন্দ দেখলেন, ১৫ শিশুই বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে গেছেন, যাদের মধ্যে ১০টি বালিকা ও ৫টি বালক।

সেই দৃশ্য দেখিয়ে সাধক বললেন, “মহারাজ, রাত্রে আপনারই প্রেরিত কনো এক ডাকিনীই হবেন, যিনি গোপনে এসে, এই সমস্ত শিশুকে নিজের স্তনপ্রদান করতেন। তাঁর রূপগড়নকে প্রত্যক্ষ তো আমরা করিনি, কারণ মাসন্তানের মধ্যে আমরা প্রবেশ করার অনধিকার প্রয়াস করিনি। তবে তাঁর ছায়া দেখে যা বুঝেছি মহারাজ, তিনি আপনাদের স্ত্রীদের মধ্যেই কেউ একজন হবেন। রাজঘরনার পত্নীদের ন্যায় তাঁর দেহগড়ন এবং মাতৃত্বে পরিপূর্ণ তাঁর দেহকোমলতা।

তবে মহারাজ, রাজঘরনার হলেও, তাঁর চিত্ত ও চেতনা যেন সাখ্যাত জগন্মাতার ন্যায়। নাহলে একাধারে ১৫ শিশুকে তিনি স্তনপান করান! … একটি ক্ষুধার্ত শিশুকে স্তনপান করাতে গিয়ে, একটি নারী রক্তশূন্যতার সম্মুখীন হয়ে যান। সেই স্থানে একাধারে, নিয়মিত ৩ দিন ব্যাপী ১৫ শিশুকে স্তনদান! … জানিনা সেই মহীয়সী কেন নেপথ্যে স্থিত রইলেন মহারাজ, তবে তিনি যেই হন, আমাদের শতনিবেদিত প্রণাম সেই জননীর চরণে।

১৫ শিশুকে স্তনদানের অর্থ, তিনি নিজের তনুর সমস্ত লহুই প্রায় দুগ্ধ রূপে পান করিয়ে দিয়েছেন শিশুদের। … নাথ, জানিনা সেই স্ত্রী কে। তবে এটুকু আমরা নিশ্চিত যে, সেই স্ত্রী কনো দিব্যস্ত্রী তো নিশ্চয়ই। কারণ আপনার সম্মুখে প্রত্যক্ষ মহারাজ। ৩ রাত্রি তাঁর স্তন পান করে, এই ১৫টি শিশু নিজেদের শৈশব ত্যাগ করে, বাল্য অবস্থায় স্থিত হয়ে গেছেন। অর্থাৎ মহারাজ, সেই জননী কেবল নিজের লহুরপদান করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি দায়িত্ব নিয়ে এই সমস্ত শিশুকে স্তনপান করার বয়স থেকে মমতাগুণে উন্নত করে দিয়েছেন।

তাই অলিখিত ভাবেই, সেই স্ত্রী, এই ১৫টি শিশুর জননী হয়ে গেছেন। হ্যাঁ মহারাজ, আমরা নিশ্চিত যে, ভবিষ্যতে যদি কখনো সেই জননীকে জগতের সম্মুখে জননী রূপে স্থাপিত করতে হয়, তবে এই ১৫ তন্ত্রসন্তান তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে, নিশ্চিত ভাবে তাঁকে নিজেদের জননী রূপে আখ্যা প্রদান করবেন। হয়তো সেই ভাবিকালেরই সূচনা করে গেলেন সেই জননী। এই ১৫ তন্ত্রসন্তানকে চিরতরে নিজের সন্তানরূপে প্রতিষ্ঠা করে গেলেন সেই স্ত্রী।

হতে পারে নাথ যে, সেই স্ত্রী কে তা আমরা জানিনা। কিন্তু এই তন্ত্রসন্তানগণ তাঁর স্তন পান করে বহুকালের ক্ষুধা থেকে মুক্ত হয়েছে। তাই তাঁরা কিছুতেই সেই স্ত্রীর অঙ্গসুবাস ভুলবে না। আপনি দেখবেন, নিশ্চিত ভাবে তাঁরা একদিন সেই জননীকে খুঁজে বার করবেন। আপনি মিলিয়ে নেবেন আমাদের কথাকে”।

সন্দিহান হয়ে উঠলেন ছন্দ এই সমস্ত কথা শুনে। অন্তরে অন্তরে বিচার করতে থাকলেন, “কে এই দিব্যস্ত্রী? কে এই জননী? এ যেন মাতা সর্বাম্বা স্বয়ং! না হলে এতো করুণা কার থাকতে পারে যে, তিনি নিজের সমস্ত লহুকে দুগ্ধ রূপে পান করাবেন! … না না শুধু করুণাময়ী নন তিনি। দিব্য তো বটেই, নাহলে তিন দিবস স্তনপান করিয়ে সদ্যজাত শিশুদের কেউ বাল্য অবস্থায় কি করে নিয়ে যেতে পারে? … দিব্যতা নাকি মায়া? … তবে কি দেবী পদ্মিনী!”

দেবী পদ্মিনীর কাছে ছন্দ উপস্থিত হতে, দেবী পদ্মিনী প্রফুল্লিত নয়নে ছন্দকে আলিঙ্গন করে বললেন, “নাথ, একটি সুখবর আছে। আমি জননী হতে চলেছি। নলিনীও আপনার ভ্রাতা তালের বীর্যধারণ করে অন্তঃসত্ত্বা আর আমিও”।

ছন্দ এক ভেবে এসেছিলেন আর যেন অন্য কিছু শুনছেন। সমস্ত কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে তাঁর অন্তরে। তাই হতাশায় একটি প্রস্তরের উপর বসে পরলে, দেবী পদ্মিনী ব্যকুল হয়ে ছন্দের চরণের কাছে উপনীত হয়ে বসে বললেন, “আপনি আনন্দিত নন, এই সমাচারে?”

ছন্দ দ্বন্ধে পতিত হয়ে বললেন, “না না, এমন নয় দেবী। এই সমাচার অত্যন্ত আনন্দদায়ক, কিন্তু আমি একটি অন্য বিচারে চিন্তিত হয়ে রয়েছি”।

দেবী পদ্মিনী হেসে বললেন, “আমাদের সন্তানরা রাজগরিমা পাবেনা বলে চিন্তিত আপনি নাথ! … চিন্তার কি আছে? সাখ্যাত প্রকৃতির মধ্যে স্থিত হয়ে তাঁরা বড় হয়ে উঠবে, এর থেকে আনন্দের আর কিই বা থাকতে পারে?”

ছন্দ মাথা নেড়ে বললেন, “না দেবী! এই বিষয় নিয়েও আমি চিন্তিত নই। আপনি জানেন কি, তন্ত্রসাধকদের ১৫টি শিশু! তাঁদের কনো রাজঘরনার স্ত্রী তিনরাত্রি সমানে স্তনপান করিয়ে, তাদেরকে বালঅবস্থায় উন্নীত করে দিয়েছে”।

দেবী পদ্মিনী এই কথাতে আচম্বিত হয়ে উঠে বললেন, “কি বলছেন নাথ! একটি স্ত্রী একাকী ১৫ সন্তানকে স্তনপান করিয়েছেন! মহারাজ, সেই স্ত্রী তো নির্ঘাত অসুস্থ হয়ে গেছেন। তাঁর দেহ লহুশূন্যতার শিকার হয়ে মৃতপ্রায় হয়ে উঠেছে নিশ্চিত ভাবে। … আর তিনদিন স্তন পান করিয়ে বাল অবস্থায় উন্নীত করিয়ে দিয়েছেন! সেই স্ত্রী তো নির্ঘাত কনো দেবী। স্বয়ং প্রকৃতি, বা স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা!”

ছন্দ প্রশ্ন করলেন, “দেবী, এই কথা শুনে, আমার প্রথম আপনার আর দেবী নলিনীর কথা মাথায় আসে। এ আপনাদের করা মায়া নয়তো!”

দেবী পদ্মিনী নেত্র বন্ধ করে বিরক্তির সুরে বললেন, “আপনি কি বলছেন নাথ! শিশুর কাছে মায়া চলে না। মায়ায় গ্রস্ত তিনিই হন, যার মধ্যে চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা বিরাজ করে। সদ্যজাত শিশু এই তিনের থেকে মুক্ত। তাঁর উপর মায়া ক্রিয়াশীলই হবেনা। আর রইল কথা মায়ার, নাথ, কনো মায়া শিশুর ক্ষুধা শান্ত করতে সক্ষম নয়। নিশ্চিত ভাবে কেউ তাঁদের স্তন প্রদান করেছেন, আর যিনি তা করেছেন, তিনি অত্যন্ত নিঃস্বার্থ স্নেহশিলা এক জননী, আর একই সাথে তিনি কনো দিব্যস্ত্রী।

আর তার থেকেও বড় কথা এই যে, আমরা অর্থাৎ আপনাদের তিন ঘরণী তো জননীই হইনি! তাহলে আমাদের স্তনে দুগ্ধ আসবে কি উপায়ে? … আমাদের মধ্যে যদি কারুর স্তনে দুগ্ধ থেকে থাকে সামান্য, তা হলো মাতা চিত্তার। তবে তাও সম্ভব নয়, কারন এতকাল আগে তিনি আপনাদের দুগ্ধ প্রদান করা স্তব্ধ করেছেন যে, দুগ্ধ নির্মাণ প্রক্রিয়া তাঁর মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেছে”।

ছন্দের কাছে তাল এসেছিলেন নলিনীকে সঙ্গে নিয়ে, নলিনীর অন্তঃসত্ত্বা হবার সংবাদ প্রদান করার জন্য। আর সুর তাঁর জননী দেবী চিত্তা ও পত্নী, দেবী শ্রীকে নিয়ে সেখানে এসেছিলেন ছন্দকে উত্তেজিত হয়ে থাকতে শুনে। তাঁরা সমস্ত কিছু এসে শুনলে, সকলেই চিন্তিত হয়ে উঠলেন যে কে এই স্তনদান করেছেন শিশুদের। দেবী চিত্তা বললেন, “আমার তো আর দুগ্ধ নির্মাণই হয়না। … আর হলেও, ১৫ শিশুকে স্তনদানের সামর্থ্য আমার কখনোই ছিলনা। বুঝতে পারছো পুত্র, ১৫ শিশুকে একাধারে স্তনদান করে তাঁদের সম্পূর্ণ ক্ষুধা নিবৃত করার অর্থ, সেই স্ত্রী নিজের তনুর প্রতি কতটা নির্মম, আর তাঁর মাতৃত্ব কতখানি প্রখর। … সত্য বলছি পুত্র, আমি এমন মাতৃত্ব কেবল ও কেবল আমার দিদির মধ্যে দেখেছি, আর কনো দ্বিতীয় স্ত্রীর মধ্যে তা দেখিনি”।

নলিনী বললেন, “ভ্রাতা, আমার মনে হয়, অন্য কারুর আত্মত্যাগের সুনাম আমরা ভোগ করছি এখানে থেকে। আমাদের মধ্যে কেউ এই কাজ করতে সক্ষম নন, কারণ আমাদের কারুর স্তনে দুগ্ধ উপস্থিতই নেই। এর অর্থ, নিশ্চিত ভাবে এমন কেউ এই কৃত্য করেছেন যিনি আমাদের মধ্যে কেউ নন। কিন্তু রাজঘরনার স্ত্রীরূপে আমরা অবস্থান করার কারণে সেই শ্রেয় আমাদের প্রদান করা হচ্ছে, আর যিনি প্রকৃত জননী, তাঁর উদারতাকে অদেখা করা হচ্ছে।

ভ্রাতা, আমার মনে হয়, এমন নির্মমতা আমাদের শোভা পায়না। অন্যের প্রাপ্য সুনাম আমরা কি করে অধিগ্রহণ করে নিতে পারি! … এতো অন্যায়, তাই না! … তাই আমার মনে হয়, আমাদের এখান থেকে অন্যত্র চলে যাওয়াই উচিত হবে”।

ছন্দ বললেন, “উচিত বলেছ তুমি নলিনী”। … হেসে বললেন পুনরায়, “তোমরা যারা আমকে বেষ্টন করে থাকো অনুক্ষণ, তাঁরা এতটাই পবিত্র যে, তোমাদের পবিত্রতা আমাকে সমানে পবিত্র করতে থাকে। … যাই হোক, এবার আমাদের এখান থেকে প্রস্থান করা উচিত”।

দেবী চিত্তা বললেন, “পুত্র, আমার মনে হয়, আমাদের এবার অনধিকৃত জম্বুদেশে প্রস্থান করা উচিত। … জম্বুদেশের যেই অংশকে তোমরা অধিকার করেছ ইতিমধ্যে, সেখানের সকলে তোমাদেরকে চেনে। … তাই এখানে অজ্ঞাতবাস তো করা সম্ভবই নয়। … তাই আমাদেরকে এবার জম্বুদেশের যেই স্থান অনধিকৃত, সেই স্থানে প্রবেশ করতে হবে। তাই চলো, মালদ রাজ্য ত্যাগ করে, গঙ্গানদী অতিক্রম করে, আমরা আরো উত্তরে চলে যাই”।

এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে, চিত্তাপুত্ররা ভ্রমরীপ্রদেশে গমন করে, সেখানের বনে নিবাস করলেও, সেখানের রাজা, সহিষ্ণু তাঁদের গমনের সংবাদ লাভ করে, তাঁদের সাথে সাখ্যাত করতে চলে আসেন। এবং তাঁদের প্রণাম করে বলেন, “অজ্ঞাতবাসে আপনারা তো এখনো প্রবেশ করেননি। তাহলে এই অধমকে একটি বার্তা তো প্রদান করতে পারতেন সম্রাট। আমি সহর্ষ উপস্থিত হতাম আপনাদের সেবায়”।

ছন্দ নিজেদের উদ্দেশ্যে উপনীত হতে পারেন নি, তা অনুভব করে বললেন, “আপনি আমাদের চেনেন?”

রাজা সহিষ্ণু হেসে বললেন, “আপনাদের পরিচিতি যদি কোথাও না থাকে, তা হলো, আমার ঊর্ধ্বের রাজ্য, পংরাজ্যে। সমতলে আপনাদেরকে জানেন না, এমন কেই বা আছে প্রভু! … হ্যাঁ আপনাদের কভু চাক্ষুষ করিনি, সেই কথা সঠিক। তবে আপনাদের বিশেষত্ব সম্বন্ধে পংরাজ্য ব্যতীতো সকল রাজ্যই জানেন। তাই আপনাদের এখানে আগমন হতেই, আমার কাছে আমার ব্যাধপ্রজারা বার্তা প্রদান করেন যে , এক মহাবলশালী পুরুষ তাঁর দুই ভ্রাতাকে সঙ্গে নিয়ে, দুই অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে, একটি প্রৌঢ়া সুন্দরীস্ত্রী এবং একটি যুবতী অপরিসীম সুন্দরী স্ত্রীর সঙ্গে বনবাসী বেশে প্রবেশ করেছেন আমাদের রাজ্যের বনে।

আপনাদের ব্যাখ্যা শুনেই আমি নিশ্চিত হয়ে যাই যে, তাঁরা আপনারা ব্যতীত অন্য কেউ নন। সেই প্রবল বলশালী ব্যক্তি রাজপুত্র চিত্তাল ব্যতীত কেউ নন। বৃহৎব্যঘ্র নিহন্তা ব্যতীত এমন বৃহৎ আকারের পুরুষ আর দ্বিতীয় যারা আছেন, তারা সুপুরুষ দেখতে নন, বরং তারা চার দানব, গণ্ড, হস্তি, গজ ও চমরী। এঁদের দুইজনের বাস আমার রাজ্যে, আর দুইজনের বাস পংরাজ্যে। … অর্থাৎ সেই সুপুরুষ বিশাল মানব একমাত্র চিত্তাল হতে পারেন।

আর তাই দুই ভ্রাতা হলেন সম্রাট ছন্দ, এবং মহাপ্রতাপী সুর। দুই অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী হয়তো দেবী পদ্মিনী ও দেবী নলিনী হবেন, কারণ তাঁদের অনেককাল বিবাহ হয়ে গেছে। প্রৌঢ়া সুন্দরী স্ত্রী, অবশ্যই মাতা চিত্তা হবেন, আর পরমাসুন্দরী যুবতী নারী অবশ্যই রাজানিষ্ঠাবান কন্যা, সুরস্ত্রী দেবী সর্বশ্রী হবেন। তেমন অনুমান নিয়েই, আপনাদের সাথে সাখ্যাত করতে চলে আসি মহারাজ”।

ছন্দ হেসে বললেন, “এর অর্থ আপনি বলছেন, পংরাজ্যই হবে আমাদের অজ্ঞাতবাসের শ্রেষ্ঠ স্থান, কারণ সেখানে আমাদেরকে কেউ চেনেন না!”

রাজা সহিষ্ণু উত্তরে বললেন, “নিশ্চিত ভাবে সম্রাট। পং রাজ্য এখনো পর্যন্ত জম্বু দেশের থেকে বিচ্ছিন্ন এক রাজ্য। আর সেখানে রাজা সামন্তের দুই শ্যালক আছেন, গজ ও চমরী, যারা রাজপুত্র চিত্তালের ন্যায়ই বিশাল বপুর অধিকারী, আর সেখানের স্ত্রীদের অঙ্গবর্ণও প্রায়শই দেবী সর্বস্ত্রী ও দেবী চিত্তার ন্যায়। অর্থাৎ সেখানে আপনাদেরকে বিশেষ বলে মান্যতা প্রদানের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম, যদিও দেবী সর্বশ্রীর অদ্ভুত রূপ সকলের মনকাড়বে, এটাই স্বাভাবিক”।

ছন্দ প্রশ্ন করলেন, “তা কি বেশে সেখানে অবস্থান করার পরামর্শ আপনি দেন!”

রাজা সহিষ্ণু বললেন, “সম্রাট ছন্দ, আপনারা পাণ্ডবদের কৌশলই অবলম্বন করতে পারেন। … নিজেদেরকে চিত্তাপুত্রদের সেবকরূপে পরিচয় প্রদান করতে পারেন অতি সহজেই। আপনাদের ব্যাপারে অধিক তাঁরা জানেন না, তাই সনাক্ত তো করতে পারবেন না আপনাদেরকে। অর্থাৎ আপনারা যদি বলেন যে, সম্রাট ছন্দ আপনি মহারাজ ছন্দের পরামর্শদাতা ছিলেন, তাল রাজা চিত্তালের বাল্যসখা ছিলেন, সুর রাজপুত্র সুরচিতের সারথি ছিলেন, দেবী চিত্তা ও অন্য স্ত্রীরা মহারানীদের সেবিকা ছিলেন, তাহলে সহজেই তাঁরা বিশ্বাস করে নেবেন সেই কথা। তবে দেবী শ্রীর অসাধারণ রূপ তাঁকে কতটা দাসী রূপে গৃহীত করবে, তা নিয়ে আমার সংশয় আছে”।

মহারাজ ছন্দ হেসে বললেন, “আপনি যখন এতটা সমাধান করেই দিয়েছেন আমাদের সমস্যার, তখন বাকি এইটুকু অংশের সমাধান আমরা নিশ্চিত ভাবেই করে নিতে পারবো আশা করি। … তবে মহারাজ একটি নিবেদন আপনার কাছে। এখনো ৩ মাস সময় আছে আমাদের অজ্ঞাতবাসের। সেই তিন মাস কি আপনার রাজ্যের বনে আমরা অবস্থান করতে পারি!”

রাজা সহিষ্ণু হেসে বললেন, “নিশ্চিন্তে মহারাজ। তবে একটিই কথা, আমার রাজ্যে দুই রাক্ষস নিবাস করে, যারা আমাকে শত্রু মানে। তাই আমার শরণার্থী জেনে, আপনাদের উপরেও তাঁরা আক্রমণ করতে পারেন। আর তাঁরা হলেন গণ্ড ও হস্তি। তাই তাদের থেকে একটু সতর্ক থাকবেন, ব্যাস আর কিছু বলার নেই। … আর হ্যাঁ, আমাকে অবকাশ প্রদান করবেন যাতে আপনাদের সপ্তান্তে এসে সাখ্যাত করে যেতে পারি আর সেবার বস্তু প্রদান করতে পারি”।

ছন্দ আনন্দচিত্তে রাজা সহিষ্ণুকে বিদায় দিলেও, তারণ জানা ছিলনা যে করিন্দ্রদের কাছেও তাঁদের এই বনে উপবেশনের সমাচার আছে, আর তাঁরা তাঁদের বড় ক্ষতি সাধন করার উপায় রূপে গণ্ড ও হস্তিকে ইতিমধ্যেই প্রেরণ করে দিয়েছেন, আর রাজা সহিষ্ণুর রাজ্যকে দ্বিখণ্ডিত করার ষড়যন্ত্র করেছেন। তবে শীঘ্রই সেই সত্য উন্মোচিত হবার ছিল, কারণ গণ্ড ও হস্তি ইতিমধ্যেই চিত্তাপুত্রদের নাশ করার মনসা নিয়ে বনের উদ্দেশ্যে গমন করেছিলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28