১২.৩। সাম্রাজ্য পর্ব
করিন্দ্রের নামে সমস্ত ভ্রাতা, সকল অনুগামী জয়ঘোষ করতে লাগলেন অনুক্ষণ। করিন্দ্র সকলকে থামিয়ে বললেন, “ভ্রাতারা, মাতারা, মামা, মামী এবং সমস্ত বন্ধুগণ, এটি উল্লাসের সময় নয়। এখন আমরা কেবল জম্বুদেশকে দখল করেছি, এর উপর অধিকার স্থাপন আমাদের এখনও বাকি। আর সেই কর্মে আমাদের বেশ জমিয়ে আলোচনা করা আবশ্যক।
মামা, এর পূর্বেও ছায়াপুর স্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু সেই ছায়াপুরকে ধরে রাখা যায়নি। এই বিষয়ে আমি বিশেষ বিশ্লেষণ করেছি, আর সেই বিশ্লেষণ থেকে আমি যা পেয়েছিলাম, তা এই যে, ছায়াপুর স্থাপনের কালে একটি ভ্রান্তি করা হয়েছিল, আর তা এই যে, যারা ছায়াপুরকে বিনষ্ট করে দিতে পারেন, অর্থাৎ মানস ও তাঁর পরিবার, তাঁদেরকে কেন্দ্র করেই সেই পুরের রচনা হয়েছিল।
মামা, অগ্নিকে মধ্যে স্থাপিত রেখে, যতই ধরিত্রীর বাহার নির্মিত করা হোক, সেই অগ্নি এক না একদিন বাইরে প্রকাশিত হবেই, আর যেদিন তা হবে, সেদিন সমস্ত বাহার বিনষ্ট হয়ে যাবে, যাকে তোমরা বলো আগ্নেয়গিরি। তাই সেই বিশ্লেষণ করে, আমার প্রথম লক্ষ্যই ছিল, অগ্নিকে এবার প্রথম নির্গত করে দিতে হবে। তাই আমি চিত্তাপুত্র ও চিত্তাপরিবারকে প্রথমে নিষ্কাসনে প্রেরণ করি।
হ্যাঁ, দেবী সর্বশ্রীর রূপ অতি মনোলোভা। কিন্তু তাঁর রূপের প্রতি আকর্ষণই আমাদের কাল হতো। তাই তাঁকে লাভ করার আশা আমি নিজের অন্তর থেকে ত্যাগ করেছি। এই লোভের কারণে, কৌরবরা সমস্ত কিছু হারিয়েছিল এক কালে। আর তাই সেই ভ্রান্তি আমি দ্বিতীয়বার করতে রাজি নই। … সর্বশ্রী কি ভাবে জন্ম নিয়েছে আমরা কেউ জানিনা, বড় হয়েছে সে নিষ্ঠাবানের কাছে, আর পত্নী হয়েছে সে চিত্তাপুত্র সুরের, অর্থাৎ তিনি যে সেই অগ্নির একটি শিখা, সেই সম্বন্ধে কনো সন্দেহ নেই। আর তাই, নির্বিচারে তাকে ত্যাগ দিয়েছি আমি, তাঁর প্রতি কামনাকে হত্যা করেছি আমি।
অর্থাৎ, ছায়াপুর নষ্ট হবার অন্তরালে যে বিবিধ কারণ বর্তমান, তার একটি কারণ অর্থাৎ অগ্নিকে অন্তরে ধারণ করার প্রক্রিয়া, তার থেকে মুক্ত করেছি এবারের ছায়পুরকে। কিন্তু এবার আমাদের বাকি কারণগুলির চর্চা করতে হবে, কারণ এবার আর ছায়াপুরের নাশ হতে দেওয়া যাবেনা।
মামা, ভালো করে তাকিয়ে দেখো সমস্ত মানবসভ্যতাকে। সমস্ত দেশ, সমস্ত মহাদেশ এই ছায়াপুরকে ধারণ করেই অবস্থান করছে। কিন্তু এই একটি জম্বুদেশে আমরা তা স্থাপিত করতে পারছিনা। এর কারণ কি? অতি অদ্ভুত ভাবে, এই জম্বুদেশ কনো দেশের সাথে, কনো মহাদেশের সাথে যুদ্ধ না করেও, কি ভাবে নিজেকে এই ছায়ার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারছে? কেন এখানে আত্মের আরাধনা প্রাধান্য পাচ্ছেনা! …
ভেবে দেখো মামা, এখানেও ছায়ার সঙ্গী নির্মিত হচ্ছেন, কিন্তু যারা যারা নির্মিত হচ্ছেন, তাঁরা এই জম্বুদেশের থেকে দূরে চলে যাচ্ছেন। হ্যাঁ প্রসিদ্ধ তাঁরা জম্বুদেশের অধিবাসী বলেই, কিন্তু তাও জম্বুদেশে তাঁরা থাকেন না। অর্থাৎ জম্বুদেশ কিছুতেই এই ছায়ার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেনা। … মামা, এই জম্বুদেশের কারণে, ছায়া বিস্তৃত হয়েও বিস্তৃত হতে পারছেনা।
পরমাত্মের নির্দেশ তো তুমি জানো মামা। তাঁর একটিই নির্দেশ, এই মানবযোনির নাশ। পরানিয়তির চালে পরাস্ত ও অপদস্ত হয়ে, এই মানবযোনিকে নির্মাণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই মানবযোনি চেতনার সেই প্রান্ত ধারণ করে নিতে সক্ষম, যেই প্রান্ত ধারণ করে নেওয়া মাত্রই, তাঁরা সত্যের সন্ধান লাভ করতে পারে, আর পরমাত্মের অধিকারছেত্র থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিতে সক্ষম, অর্থাৎ সহজ ভাবে বলতে গেলে, এই একটিই যোনি, যা নিজেদের জন্মমৃত্যুর চক্র থেকে চিরতরে মুক্ত করে নিতে সক্ষম।
আর তাই পরমাত্মের সরাসরি আদেশ যে, এই যোনিকে নাশের কিনারায় নিয়ে আসতে হবে। সেই কিনারায় উপস্থিত হলে, হয় তাঁরা সম্পূর্ণ ভাবে জন্মমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হবার চেতনা ত্যাগ করে দেবেন, নয় তাঁরা অবলুপ্ত হয়ে যাবেন। এই মূলধারাকে ধারণ করেই, একাধিক ধর্ম স্থাপিত করেছে পরমাত্ম, কিন্তু প্রতিটি ধর্মের মধ্যেই এই চেতনার বিস্তার ঘটে গেছে।
সর্বাধিক ভাবে সেই চেতনা প্রকাশিত ও বিকশিত ছিল বৌদ্ধদের মধ্যে, আর তাই বৈদিক ধর্মের বিস্তার করেছিল পরমাত্ম, এই মোক্ষচেতনা অর্থাৎ জন্মমৃত্যুর থেকে মুক্তির চেতনা থেকে সকলকে অপসারিত করতে। পরমাত্ম নিজের ত্রিগুণকে ত্রিদেবরূপে স্থাপিত করে, বৌদ্ধচেতনার নাশ করেছিল, এবং সকলকে ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার মধ্যে নিবদ্ধ করেছিল। সম্যক মানবযোনিকে সেই চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা গ্রাস করে নিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তারপরেও এই জম্বুদেশ কেন ব্যতি থেকে যাচ্ছে! কি এর কারণ? এই জম্বুদেশের মানুষদের বশ করা সম্ভব হয়ে গেলে, আর এই মানবযোনিকে বিনষ্ট হতে হয়না। তারা জন্মমৃত্যুর চক্রের মধ্যে বশ হয়ে থেকে, জীবিত থাকতে সক্ষম।
কিন্তু এই দেশের মানুষদের কিছুতেই সম্পূর্ণ ভাবে চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার মধ্যে বশীকরণ করা সম্ভব হচ্ছেনা। কিছুতেই সম্পূর্ণ ভাবে এঁদেরকে পরমাত্মের দ্বারা বশীকরণ সম্ভব হচ্ছেনা, কিছুতেই এঁদেরকে সম্পূর্ণ ভাবে আত্মসর্বস্ব করা সম্ভব হচ্ছেনা। কিন্তু এমন কেন মামা! … ছায়াপুর নির্মিত হলো, এঁদেরকে বশ করার জন্য, কিন্তু তাও কেন এঁরা বশ হলেন না!”
বীর্য উত্তরে বললেন, “প্রকৃতির কৃপার কারণে ভাগ্নে। পূর্বে, এই জম্বুদেশ গৌড় ছিল, পশ্চিমে তা উৎকল পর্যন্ত ব্যপ্ত ছিল, উত্তরপশ্চিমে তা ব্যপ্ত ছিল এলার রাজ্য পর্যন্ত। তখন সেই এলার রাজ্যে মাতা মার্কণ্ড হয়ে অবতরণ করে, উৎকলে মাতা বাল্মীকি রূপে ও ব্যাস রূপে অবতরণ করে, মোক্ষচেতনার বিস্তার এমন ভাবে করে দিয়েছিলেন যে, কিছুতেই আত্মতত্ত্ব এখানে পূর্ণ ভাবে স্থাপিত হতে পারতো না।
পরবর্তী কালে গৌড়কে আর্যরা অর্থাৎ বৈদিকরা ভঙ্গ করে দেয়, এবং তখন এঁর নাম হয় ভঙ্গ। সেই ভঙ্গতেও মাতা নিমাই ও গদাধর হয়ে জন্ম গ্রহণ করে, এঁদের মধ্যে মোক্ষচেতনা স্থাপন করেছেন। … এই স্থান তন্ত্রের স্থান ভাগ্নে। এখানে প্রকৃতির আরাধনা হয়, নিয়তির আরাধনা হয়, চেতনার আরাধনা হয়। আর তাই মাতা এই একটি স্থানকেই জীবিত রেখে দিয়েছেন, যেখানে আত্ম নিজের বিষদন্ত স্থাপন করতে পারছেনা সম্পূর্ণ ভাবে। আর এখনও মাতা ব্রহ্মসনাতন বেশে অবতীর্ণ হয়ে, এই দেশে পুনরায় মোক্ষচেতনা প্রকাশ করলেন, সর্বাম্বা বেশে”।
ভৃগুপত্নী ঘৃতকুমারী বললেন, “পুত্র, তুমি এই ক্রীড়ার একটি দিক দেখতে পাচ্ছ, দ্বিতীয়দিক দেখতে পাচ্ছ না। আমরা ঘৃতকুমারীরা প্রকৃতি নিয়ে মায়াপ্রদর্শন করি। তাই এই প্রকৃতি সম্বন্ধে আমাদের ধারণা আছে। আর সেই ধারণা অনুসারে, তুমি যে ভাবছো, মানবযোনি যদি আত্মসর্বস্ব হয়ে যায় সম্পূর্ণ ভাবে, তাহলে সুরক্ষিত হয়ে যাবে, সেই ধারণা সম্পূর্ণ ভাবে নিরাধার। পুত্র, প্রকৃতি বা ঈশ্বর কনো যোনি বা কনো কিছুর নির্মাণ তো করেন না, সমস্ত কিছুর নির্মাতা তো পরমাত্মই, কিন্তু তা অস্তিত্বে বিরাজ করে কারণ প্রকৃতি সেই সৃষ্টের অন্তরে চেতনা রূপে বিরাজ করে বলেই। আর তাই, যেকনো একটি যোনি ততক্ষণই অবস্থান করে, যতক্ষণ প্রকৃতি সেই যোনির অস্তিত্বকে মান্যতা প্রদান করেন।
যেই ক্ষণে, প্রকৃতি সেই যোনির অস্তিত্বকে মান্যতা প্রদান করা বন্ধ করে দেন, সেই ক্ষণে সেই যোনির নাশ হয়ে যায়। তেমনই, এই মানবযোনির অস্তিত্ব পরমাত্মের মান্যতার কারণে টিকে নেই, টিকে রয়েছে প্রকৃতির মান্যতার কারণে। আর প্রকৃতির মান্যতা এই যোনির উপর টিকেই রয়েছে এই জম্বুদেশের কারণে। পুত্র, যেদিন এই জম্বুদেশের মানুষদের প্রকৃতিবিরোধী করে তুলে, চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনাতে সম্পূর্ণ ভাবে বশীভূত করে দিয়ে আত্মসর্বস্ব করে তুলতে সক্ষম হবে পরমাত্ম, যেমনটা এই দেশ ব্যতীত সমস্ত বিশ্বের মানবযোনিকে স্থাপিত করে রেখেছে পরমাত্ম, সেদিন আর এই যোনি সুরক্ষিত থাকবেনা, সেদিন প্রকৃতি স্বয়ং এই যোনিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।
অর্থাৎ পুত্র, এই যোনির ভাগ্য নিয়ন্তা এক ও একমাত্র এই জম্বুদেশ। তুমি যাকে বলছো, এই যোনিকে পরমাত্মের অধীনে প্রেরণ করে দিতে পারলে, একে সুরক্ষিত করে দেওয়া সম্ভব হবে, বাস্তব ঠিক তার বিপরীত। এই যোনিকে সম্পূর্ণ ভাবে যদি পরমাত্মের অধীনে স্থিত করে দিতে সক্ষম হও, সেইদিন, সেইরাত্রিই হবে এই যোনির অন্তিম দিবস, অন্তিম রাত্রি, কারণ সেই রাত্রেই কালরাত্রিবেশে পরাপ্রকৃতি এই যোনিকে ব্রহ্মাণ্ডের মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে”।
করিন্দ্র এই কথা শুনে ভাবিত হয়ে গিয়ে, বললেন, “তাহলে আমাদের কি করা উচিত হে শ্রদ্ধেয় ঘৃতকুমারীগণ! আমাদেরকি তাহলে চিত্তাপুত্রদের সঙ্গ দেওয়া উচিত!”
ঘৃতকুমারীগণ বললেন, “না পুত্র, আমরা পরমাত্মের পূজারি, বৈদিক আমরা। আর আমাদের আরাধ্য, আমাদের শাস্ত্র, আমাদের ধর্ম এই বলে যে, আমাদের তাই করা উচিত, যা আমাদের আরাধ্যের নির্দেশ। আর আমাদের আরাধ্যের নির্দেশ হলো, এই যোনিকে সম্পূর্ণ ভাবে পরমাত্মের পূজারি করে তোলা উচিত, সম্পূর্ণ ভাবে আত্মসর্বস্ব করে তুলে ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার কাছে বশীভূত করে তোলা উচিত। তাতে যদি এই যোনির নাশও অনুষ্ঠিত হয়, তবে তাই সই। তবে, সেই পথে চলার পথে, আমরা যদি এমন ধারণা রাখি যে, এমন করলে এই যোনি সুরক্ষিত হয়ে যাবে, তাহলে আমরা ভ্রান্ত পথে চলছি”।
করিন্দ্র হাস্য প্রদান করে বললেন, “কিন্তু দেবী, এই কথা আমরা না মানলেও, যদি জম্বুদেশের প্রজাকে সেই কথা বিশ্বাস করাই, তাহলে? তাহলে তো তাঁরা সত্যের পথ ত্যাগ করে, আমাদের সাথে যুক্ত হবে, এবং চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনায় সিক্ত হয়ে আত্মের আরাধনা শুরু করে, জন্মমৃত্যু চক্রে চিরতরে বদ্ধ হয়ে যাবে, তাই না!”
দেবী হুতা বললেন, “উত্তম, অতি উত্তম। … কিন্তু পুত্র, এই প্রয়াস তো আমাদের মাতা, দেবী মোহিনী করেছিলেন। তিনি ব্যর্থ হলেন কেন? শুধুই কি অগ্নিকে অন্তরে ধারণ করে এই প্রয়াস করার জন্য, তিনি ব্যর্থ হলেন?”
করিন্দ্র বললেন, “আমার তা মনে হয়না। আমার মনে হয়, আরো একটি ভ্রান্তি ছিল, তাঁর কর্মের মধ্যে। … আমার মনে হয়, সম্পূর্ণ জম্বুদেশকে ছায়াপুর নির্মিত করার প্রয়াস, এটি একটি বড় ভ্রান্তি। বরং আমাদের একটি রাজধানী করা উচিত, যা হবে ছায়াপুর। আর সেই রাজধানী ক্রমশ সম্পূর্ণ জম্বুদেশে নিজেদের আদর্শ বিস্তারিত করবে। … ভেবে দেখুন সকলে। ছায়াপুর স্থাপিত হলো একটি ক্ষুদ্র স্থানে, ধরুন এই মল্লার দেশের একটি স্থানে। আর সেই স্থানের মানুষ ক্রমশ বিত্তবান হয়ে উঠবেন। ধনসর্বস্ব হয়ে, বিত্তবান ও খ্যাতনামা হয়ে উঠলে, তাদের দ্বারা সকলে প্রভাবিত হবেন, আর তেমনটা হতে থাকলে, ক্রমে ক্রমে সম্পূর্ণ জম্বুদেশ আমাদের অধীনে চলে আসবে।
আসল কথাটা আমার বোঝার প্রয়াস করুন। প্রকৃতির কর্ম করার পদ্ধতিটা একটু দেখুন। প্রকৃতি একবারে বা রাতারাতি সমস্ত কিছুকে পরিবর্তিত করার প্রয়াস করেন না। তিনি একটি বীজ অর্পণ করে দেন, আর সকলের দৃষ্টির আড়ালে, সেই বীজকে ধারণ করা ভূমিকে জল দ্বারা সিঞ্চন করতে থাকেন। আর সেই সিঞ্চন একদিন একটি বিশাল মহীরুহ নির্মাণ করে দেয়। তেমনই, আমরাও একটি বীজ অর্পণ করবো, একটি ক্ষুদ্র রাজধানী, আর তাতে সেই সমস্ত কিছু রাখবো, যা দেবী মোহিনী স্থাপিত করেছিলেন ছায়াপুরে।
সেই স্থানের ব্যক্তিরা বিত্তবান হবেন, আত্মসর্বস্ব হবেন, ধনী হয়ে উঠবেন, আর আমরা তাঁদেরকে খ্যাতি প্রদান করতে থাকবো তারা ধনী বলে। আমাদের প্রসার করা অজ্ঞানতাই ধারণ করবে তাঁরা, কিন্তু তাঁদেরকে আমরা জ্ঞানী বলে বিখ্যাত করতে থাকবো। আর এর ফলে সকল জম্বুদেশের অধিবাসী তাঁদেরকে অনুসরণ করবে, আর তাদেরকে অনুসরণ করার অর্থই হলো, ধনসর্বস্ব, আত্মসর্বস্ব, চিন্তাসর্বস্ব, ইচ্ছাসর্বস্ব এবং কল্পনাচরবস্ব হয়ে ওঠা, ঠিক যেমন সমস্ত মানবযোনি হয়ে রয়েছে।
আর তেমনটা হয়ে গেলেই, সমগ্র জম্বুদেশও পরমাত্মের অধীনে চলে আসবে। এরপর পরাপ্রকৃতি এই যোনির নাশ করুক আর না করুক, তা আমাদের দেখার বিষয় নয়, আমরা আমাদের আরাধ্যকে তুষ্ট করে দিয়েছি, আমরা আমাদের ধর্ম, বৈদিক ধর্মকে স্থাপিত করে দিয়েছি”।
করিন্দ্রের এই কথনে সকলে এক সুরে বলে উঠলেন, “উত্তম, অতি উত্তম। তেমনই করা হোক তাহলে”।
বীর্য প্রশ্ন করলেন, “তাহলে আমাদের কর্মসূচি ঠিক কি হবে ভাগ্নে?”
করিন্দ্র উত্তরে বললেন, “প্রথম কাজ হবে আমাদের চিত্তাপুত্রদের বন্ধুরাজ্যগুলিকে ভেঙে দেওয়া। এতে তাঁরা দুর্বল হয়ে যাবে। … সেই উদ্দেশ্যে মল্লার রাজ্যকে আমরা চার ভাগে বিচ্ছিন্ন করবো। একটি রাজ্য কুর্নিশকে প্রদান করবো, যার নাম হবে পুরুরাজ্য; একটি রাজ্যের নাম হবে বঙ্ক, কারণ তা হবে বাঁকা। আর এই রাজ্যকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেব, যার উত্তর দিক রাজ্য হবে শঙ্করের আর দক্ষিণদিক রাজ্য হবে অম্বরিশের। আর ঠিক এই দুই রাজ্যের মধ্যে স্থাপিত থাকবে মায়ারাজ্য ছায়াপুর।
অগ্রপশ্চাতে এই দুই রাজ্য ছায়াপুরকে সুরক্ষা প্রদান করবে, আর তাদের ঠিক মাঝে বিরাজ করবে ছায়াপুর, যা হবে এক সম্পূর্ণ মায়ারাজ্য। সেখানে তাই হবে যা আমরা নিশ্চয় করবো। সেখানে তাই জ্ঞান রূপে বিরচিত হবে, যাকে আমরা জ্ঞান বলবো। তাই সেখানে পৃথিবী সূর্যের চারিপাশে ভ্রমণ করে, তাই জ্ঞান হবে; পৃথিবী ছাড়াও অন্যত্র প্রাণ আছে, তাই জ্ঞান হবে; সূর্যের থেকে পৃথিবী তাপ পায়, তাই হবে জ্ঞান; শক্তিকে গতিদ্বারা প্রকাশিত করা যায়, তাই হবে সেখানে জ্ঞান।
আর সেই সমস্ত জ্ঞানকে ধারণ করে, নির্মিত হবে যন্ত্র। সেই যন্ত্রই জন্ম দেবে মানবদের; সেই যন্ত্রই আহার প্রস্তুত করবে মানুষের, সেই যন্ত্রশিক্ষাতে শিক্ষিত হওয়া ব্যক্তিই জ্ঞানী রূপে চিহ্নিত হবে। সেই যন্ত্রই চিকিৎসা করবে, আর সেই চিকিৎসা শাস্ত্রে যিনি শিক্ষিত, তিনিই হবেন পণ্ডিত। সেই যন্ত্রই সমস্ত জগতের সংবাদ প্রদান করবে, আর সেই সংবাদই হবে প্রকৃতি সংবাদ, আর সেই সংবাদকে জানা ব্যক্তিকেই সচেতন রূপে গণ্য করা হবে।
মাতা মোহিনীর মত করেই, এই যন্ত্রের, এই মিথ্যাচারনের শিক্ষাকেই বিস্তার করা যাদের কর্ম হবে, তাঁরা হবেন সেখানের উন্নত পেশাদার অর্থাৎ শিক্ষক। এই যন্ত্রের নির্মাতারাই হবেন শ্রেষ্ঠ পেশাদার, এই যন্ত্রচালক ও যন্ত্রবিকলতা নির্ণায়ক ও চিকিৎসক হবেন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত। এঁদের নিয়ে যারা বাণিজ্য করে করে, সর্বদিকে এঁদের প্রসারিত করবে, তাঁরাই হবেন বণিক ও শ্রেষ্ঠ বিত্তবাণ। এঁদের নিয়েই চলচিত্র হবে, আর যারা তা করবেন, তাঁরাই হবেন শ্রেষ্ঠ বিনোদন প্রদানকারী, এবং জ্ঞানীমানি ব্যক্তিত্ব। আর তাই ক্রমে, এই প্রকৃতি সম্বন্ধে মিথ্যা শিক্ষাপ্রদান করাই হবে সেখানের মানুষের শ্রেষ্ঠ রুচি, কল্পনার জগত নির্মাণের যন্ত্র নিয়ে যারা সর্বক্ষণ মত্ত থাকবেন, তাঁরাই হবেন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী।
এই মায়ার রাজ্যে, প্রকৃতির কনো অস্তিত্ব থাকবেনা। কেবল ও কেবল প্রকৃতির থেকেই ছিনিয়ে নেওয়া ধাতু আর ধাতুনির্মিত বস্তুপদার্থই হবে সেখানের একমাত্র সম্বল। প্রকৃতির কনো শক্তি সেখানে কনো ক্রিয়া করবেনা। অর্থাৎ চিত্তাপুত্ররা সেখানে উপস্থিত হলে, পথ হাড়িয়ে ফেলবেন, কারণ তারা তো প্রকৃতির দেখানো মার্গেই চলতে সক্ষম, যন্ত্রের মায়া তাঁদেরকে মায়াবদ্ধ করে দেবে।
আর এই মায়ারাজ্যের নাম, জৌলুশ, সেখানের অধিবাসীদের বাড়বাড়ন্ত, সেখানের মানুষদের জ্ঞানী রূপে আখ্যাদান, সম্পূর্ণ জম্বুদেশের মানুষদের আকৃষ্ট করবে, এবং ক্রমে তাঁরাও এই সমস্ত যন্ত্র, যন্ত্রবিদ্যা, প্রকৃতিবিমুখতা, মিথ্যা ভৌতিক শিক্ষা, ইত্যাদির মধ্যে নিজেদের বিলীন করতে থাকবে। যন্ত্র মানেই চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনা। প্রকৃতিবিরোধ মানেই চিন্তা, ইচ্ছা, কল্পনা। আর তাই সমস্ত জম্বুদেশের মানুষ হয়ে উঠবে প্রকৃতিবিরোধী অর্থাৎ আত্মসর্বস্ব।
আত্মসর্বস্ব না হলে যে চলবে না তখন। অন্য কেউ তো যন্ত্র ধারণ করে শ্রেয় বিলাসিতা পূর্ণ জীবনযাপন করবেন। তাই তাঁর থেকে শ্রেয় জীবনযাপন করতে, যন্ত্র ধারণ করতেই হবে, মিথ্যা শিক্ষায় ভূষিত হতেই হবে। আর তা হতে হলে যে ধনের প্রয়োজন, কারণ ধন ছাড়া যে না মিলবে আহার, না মিলবে বস্ত্র, আর না মিলবে যন্ত্র, যন্ত্র শিক্ষা বা প্রকৃতিবিরোধী শিক্ষা। আর ধন উপার্জন করতে যাবার অর্থই হলো আত্মসর্বস্ব হয়ে ওঠা, অন্যকে ঠকানো, অন্যকে পথে বসানো, অন্যের থেকে মিষ্ট ভাষা প্রয়োগ করে সমস্ত ধন লুণ্ঠন।
আর এই ভাবে সম্পূর্ণ জম্বুদেশ হয়ে উঠবে ধনসর্বস্ব, আত্মসর্বস্ব, যন্ত্রসর্বস্ব, মিথ্যাসর্বস্ব, কল্পনাসর্বস্ব অর্থাৎ পরাপ্রকৃতির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আর মামা, তা করতে, আমাদের আরো কিছু কাজ করতে হবে। বর্ধমানকে ভেঙে একটি অংশ নির্মাণ করতে হবে, যার প্রধান হয়ে নিবাস করবে অর্ধেন্দু। নদিয়াদকে ভেঙে নির্মাণ করতে হবে পরগনা, আর তার মাথায় স্থাপিত হবেন রাজা ভৃগুসেন। সুন্দরবনের মধ্যে সাগরদ্বীপ ভিন্ন রাজ্য হবে, যার রাজা হবে ভণ্ড। আর চিত্তাপুত্রদের অনুসরণ করতে হবে। তারা যেখানে যেখানে যাবে, সেখানেও এমন করে রাজ্যকে ভেঙে ভেঙে একটি করে আমাদের উপনিবেশ স্থাপিত করতে হবে।
আসল কথা এই যে একমাত্র ছায়াপুর বিরাজ করলে, সম্পূর্ণ ছায়াপুরে ছায়ার প্রসার হতে বহু সময় লেগে যাবে। তাই আমাদের বিভিন্ন এমন কেন্দ্র প্রয়োজন, যাদের মাধ্যমে ছায়াপুরের মায়া সেখানে সহজে প্রসারিত হতে পারে, আর ফলে সেই জম্বুদেশের অঞ্চলেও ছায়ার প্রসার শীঘ্র হতে পারে”।
সর্বজনে হিল্লোল তুললেন, “অতি উত্তম, অতীব উত্তম!”
তবে করিন্দ্রের কথা সমাপ্ত হয়নি। তাই সে বলল, “আরো একটি কাজ করা আবশ্যক। চন্দননগর দুর্গ অজেয়। চিত্তাপুত্ররা সেখানে থাকলে, এই দুর্গকে কিছুতেই ভেদ করা সম্ভব নয়। এখন তাঁরা এখানে নেই, তাই এই দুর্গকে তছনছ করে দিতে হবে। আর অতঃপরে, চন্দনগরকে হামলা করে, সম্পূর্ণ শহরকে বিনষ্ট করে দিতে হবে, নাহলে সমস্ত জম্বুদেশ পরমাত্মের কবলে চলে গেলেও, এই চন্দননগরে জগদ্ধাত্রীর আরাধনার কারণে কিছুতেই পরমাত্ম শাসন গ্রহণ করবে না। তাই জগদ্ধাত্রী আরাধনা বন্ধ করতেই হবে সেখানে”।
বীর্য বললেন, “সঠিক কথা, কিন্তু এক্ষণে নয় ভাগ্নে। চিত্তাপুত্ররা এখনো বহুদূরে যায়নি। তাই চন্দননগর দুর্গে আক্রমণ হয়েছে শুনলে, তাঁরা ফিরে চলে আসবে, আর তখন আমাদের সমস্ত যোজনা ভেস্তে যাবে। তাই ভাগ্নে, আগে সমস্ত রাজ্য ভেঙে দাও, আর সেই ভগ্নাংশে ছায়াপুরের প্রভাব স্থাপিত রাখার ব্যবস্থা করো। আর সঙ্গে সঙ্গে ছায়াপুরকে সমৃদ্ধ করে তুলে, অতি মজবুত করে তলো যাতে কাল যদি চিত্তাপুত্ররা এখানে প্রবেশও করে, তাহলেও যেন মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়ে পথ হাড়িয়ে তোমার কাছে ধরা দিতে বাধ্য হয়।
এই সমস্ত করতে করতে, চিত্তাপুত্ররা নিশ্চিত ভাবে উত্তরের দিকে চলে যাবে, কারণ দক্ষিণের জম্বুদেশের অধিবাসীরা তাঁদের সকলকে দেখেই সনাক্ত করে নেবে, তাই অজ্ঞাতবাস দক্ষিণ জম্বুদেশে তো সম্ভব নয়। উত্তরের রাজ্যগুলিতে তাই চিত্তাপুত্রদের ধরিয়ে দেবার বার্তা ও পুরস্কার প্রদান করবে, যেমন দেবী স্ফীতা ও মিতা বলেছিলেন। তবে তাও এখন নয়।
স্মরণ করে দেখো শর্ত কি ছিল? যখন অজ্ঞাতবাসের ভেদ ধরা পড়ে যাবে, তখন থেকে পুনরায় তাঁদের অজ্ঞাতবাস শুরু হবে। তাই যতটা পারবে শেষের দিকে তাদের অজ্ঞাতবাসকে উন্মোচন করবে। তাহলে তাদের অজ্ঞাতবাস দ্বিগুণ হয়ে যাবে, আর তুমি আরো সময় পেয়ে যাবে সম্পূর্ণ জম্বুদেশকে ছায়াপুরের অধীনে আনতে। এই সমস্ত কিছুর মধ্যকালে চন্দননগরকে আক্রমণ করে করায়ত্ত করো। তখন চিত্তাপুত্ররা উত্তরের জম্বুদেশে বিরাজ করবে।
সেই দেশ এই স্থানের থেকে সম্পূর্ণ ভাবে বিচ্ছিন্ন কারণ, সেই স্থানকে দক্ষিণ জম্বুদেশ কখনো অধিকারই করেনি। আর তাই সেখানে স্থিত থাকা কালীন জম্বুদেশের কনো বার্তাই চিত্তাপুত্ররা লাভ করবেনা। তখন অনায়সে চন্দননগর দখল করে নেবে ভাগ্নে”।
সকলে সেই কথা শুনে বললেন, “উত্তম, অতি উত্তম যোজনা!”
সভা সেখানেই ভঙ্গ হলো, কারণ আগামীদিনে করনীয় কি, তা সমস্ত নির্ধারণ করা হয়ে গেছিল সেই সভায়। আর তাই সেই সভার কথানুসারে, প্রথমেই বর্ধিষ্ণুর থেকে হাওড়া নামক অঞ্চল থেকে সুন্দরবনের অঞ্চল ছিনিয়ে নিলেন করিন্দ্র, আর সেই অঞ্চল প্রদান করলেন অর্ধেন্দুকে, আর সেই অঞ্চল হলো ছায়াপুরের বিস্তার করার প্রথম ক্ষেত্র।
এরপরে, কুর্নিশের থেকে তিন ভাগের দুই ভাগ রাজ্য ছিনিয়ে নিলেন করিন্দ্র, আর সেই দুই ভাগকে উত্তর ও দক্ষিণে বক্রভাবে ভেঙে, একটি প্রদান করলেন শঙ্করকে আর অন্যটি অম্বরিশকে, আর ঠিক তার মাঝের স্থানকে সুরক্ষিত করে নিলেন ছায়াপুররূপে।
একই ভাবে, সুন্দরবনের মধ্যে সাগরদ্বীপে স্থাপিত করলেন মহাবলশালী ভণ্ডকে, যিনি সদাসর্বদা বৈদিকদের ত্রিদেব অর্থাৎ আত্মের ত্রিগুণ, সত্ত্ব, রজ ও তমের আরাধনা করতে থাকলেন, যাতে তাঁরা তাঁকে পাশুপত, নারায়ণাস্ত্র ও ব্রহ্মাস্ত্রকে একত্রে ধারণ করে ব্যবহার করার অনুমতি প্রদান করেন। আর রত থাকলেন তিনি যমের আরাধনা করতে, যার থেকে সুরের কালবাণ ধারণ করার কামনা রাখলেন।
একই ভাবে নদিয়াদরাজ্যকে, এবং মুর্শিদরাজ্যকেও ভেঙে রাজা ভৃগুকে এবং বীর্যকে স্থাপন করলেন করিন্দ্র, যাতে ছায়াপুরের বিস্তার সর্বত্র হতে পারে। সেই সমস্ত কিছু সম্পন্ন হয়ে গেলে, যখন করিন্দ্র সংবাদ লাভ করলেন যে বনবাস পালন করার কালে চিত্তাপুত্ররা মালদরাজ্যের উত্তরে ভ্রমরীপ্রদেশে যাত্রা করেছে। তখন সেখানেও উপস্থিত হলেন তিনি। সেখানে গিয়ে জানলেন যে, সেখানের অধিপতি, রাজা সহিষ্ণু চিত্তাপুত্রদের সেবাতে নিয়জিত হয়েছেন, তখন তাঁরই ভ্রাতা, সাম্রাজ্য লোভী কচিন্দ্রকে নিজের সাথে যুক্ত করে, কুচ নামক একটি অঞ্চল স্থাপন করালেন এবং ছায়াপুর বিস্তারের আরো একটি ক্ষেত্রে স্থাপিত করে রেখে দিলেন সেখানে।
আর সেই সমস্ত কিছু সম্পন্ন হলে, যখন করিন্দ্র দেখলেন যে ছায়াপুর বিস্তারের ছেত্র সে জম্বুদেশের সর্বত্র করে ফেলেছে, তখন ছায়াপুর নির্মাণের দিকে নজর দিলেন। যোজনা অনুসারে সমস্ত কিছু করার পূর্বে, করিন্দ্র একটি অন্য কর্মে হাত দিলে, বীর্য ও তাঁর ভ্রাতারা তাঁকে প্রশ্ন করলেন, “আমাদের যোজনা অনুসারে এই সমস্ত কিছু তো ছিলনা করিন্দ্র! তাহলে এই সমস্ত কি করছো?”
করিন্দ্র উত্তরে বললেন, “মামা, পূর্বের ছায়াপুরে একটি গলদ ছিল, বলো তো কি?”
বীর্য বুঝে উঠতে না পারলে, করিন্দ্র এবার একটু হেসে বললেন, “মামা, মেধা আমাদের মাতা মোহিনী পর্যন্ত পৌছতে পারলো কি করে? … কেন রাজপুরে প্রবেশের মুহূর্তে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো না! … কেন শিখা ও বেগবতী রাজপুরের সংবাদ মেধাকে গিয়ে দিতে পারলো? কেন তাঁরা এই কর্ম করতে গেলে গ্রেপ্তার হলো না! কেন তাঁদের বিচার হলো না?”
বীর্য সমস্ত কথা শুনে বললেন, “এর অর্থ ভাগ্নে, তুমি এক অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার কথা বলছো, যা সার্বিক ভাবে ছায়াপুরকে সমস্ত বিদ্রোহ ঘনীভূত হবার আগেই তা রোধ করে দেবে!”
করিন্দ্র হেসে বললেন, “সঠিক মামা, সঠিক। বিদ্রোহকে দানা বাঁধতে দেওয়াই যাবেনা। কালকে হতেই পারে, চিত্তাপুত্রদের সঙ্গীদের কেউ এসে বিদ্রোহ করে দেবে। বুঝতে পারছো মামা! বিদ্রোহ করে তারা আমাদের পরাস্ত করতে পারবেনা ঠিকই। কিন্তু এই বিদ্রোহ করার কালে, আমরা যেই প্রজাদের বশ করে রেখেছি, তাঁদের মধ্যে একটি ধারণা প্রবেশ করিয়ে দেবে যে, যা হচ্ছে তার মধ্যে কোথাও কনো ভ্রম বিস্তার হচ্ছে। সমস্ত কিছু ভেস্তে যাবে। তাই মামা, সাবধানের মার নেই। সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে বিদ্রোহ দানাই বাঁধতে না পারে”।
বীর্য এবার কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন, “উত্তম ভাবনা, কিন্তু সেই ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে কি করতে চাইছো ভাগ্নে?”
করিন্দ্র উত্তরে একটি বক্র হাস্য হেসে বললেন, “তিনটি ব্যবস্থা একসঙ্গে স্থাপন করতে হবে। প্রথমটি বাইরে থেকে যারা প্রবেশ করার প্রয়াস করবে, তাদেরকে বন্দী করার জন্য সেনাশিবির। পরবর্তীতে যারা অন্দরে প্রবেশ করেছেন, বা অন্দরে নিবাস করছেন, তাদের মধ্যে বিদ্রোহীদের বন্দী করার সিপাহী শিবির। আর তৃতীয়টি হলো সেই বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড দেবার জন্য বা কারাবাস দেবার জন্য বিচারকমণ্ডলী।
মামা, এই তিনটি একসাথে হলে, কাল যদি চিত্তাপুত্ররাও প্রবেশ করতে চায়, তাহলেও তারা আমাদের কাছে পৌছাতে পারবেনা। তারা আমাদের কাছে পৌঁছানোর আগে, এই তিন শিবিরের সম্মুখীন হবে, যারা তাদেরকে বিচার করে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেবে”।
বীর্য প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বললেন, “অসাধারণ ভাগ্নে, অসাধারণ! … এই নাহলে মোহিনীরক্তের অধিকারী তুমি!”
করিন্দ্র বললেন, “হ্যাঁ মামা, মাতা মোহিনী যেই যেই ভ্রান্তি করেছিলেন, সেই একটি ভ্রান্তিও আমি রাখতে চাইনা। কাল চিত্তাপুত্ররা যদি এসেও যায় রাজ্যে, তাও এই ছায়াপুরের মায়া তারা ভেদ করতে পারবেনা, আর আমাদের কাছে পৌছাতেই পারবেনা। মায়া ভেদ করা তো অনেক পরের কথা, এই তিন শিবির তাঁদেরকে ধরে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দেবে। রাজ্যের আইন এঁদেরকে বেঁধে দেবে। বুঝতে পারছো মামা, না কনো যুদ্ধ, না কনো খণ্ডযুদ্ধ। বিনা যুদ্ধে শত্রুর নাশ হয়ে যাবে।
আর যদি ধরেও নিই যে চিত্তাপুত্ররা অত্যন্ত বলশালী আর তাঁদের পত্নীদের কারণে মায়া করতেও সক্ষম, তাই সেনাশিবির আর বিচারশিবির থেকে অযাচিত ভাবে মুক্ত হয়ে গেল তাঁরা, তারপরেও তারা ছায়াপুরের মায়াতে পথ হাড়িয়ে ফেলবে, আর তখন এই সিপাহীশিবির তাঁদেরকে অতর্কিত আক্রমণ করে করে হত্যা করে দেবে। অর্থাৎ মামা, তাদের এত বল সমস্ত বৃথা। সেই বল দ্বারা তারা কিচ্ছু করতে পারবেনা”।
ভণ্ড বললেন, “কিন্তু মিত্র, এইমুহূর্তে তাঁরা ভ্রমরীপ্রদেশের বনে রয়েছে, এমনই সংবাদ আছে আমার কাছে। সেখানে নিত্য যাতায়াত করে রাজা সহিষ্ণু, আর এও সমাচার আছে যে দেবী পদ্মিনী ও নলিনী, উভয়েই অন্তঃসত্ত্বা। একবার চিন্তা করো মিত্র, চিত্তাপুত্ররা নিরস্ত্র, আর তাঁদের পত্নীরা, যারা তাঁদের মায়া প্রদান করে, তাঁরা অন্তঃসত্ত্বা। এটিই শ্রেষ্ঠ সময় মিত্র, চিত্তাপুত্রদের থেকে তাঁদের মায়ার উৎস, অর্থাৎ তিন পত্নীকে ছিনিয়ে নেওয়ার। যদি তা করতে পারি আমরা, তাহলে বুঝতে পারছো, চিত্তাপুত্রদের আমরা অতি সহজে ঘৃতকুমারী কন্যা ও শৃঙ্খলা কন্যাদের মায়ার দ্বারাও পরাজিত করে দিতে পারবো!”
করিন্দ্র হেসে বললেন, “মিত্র ভণ্ড, তোমার এখনো চিত্তাপুত্রদের বল সম্বন্ধে ধারণা জন্মায় নি। তাদের যুদ্ধ জয় করার জন্য অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, কারণ স্বয়ং প্রকৃতিই তাঁদের অস্ত্র”।
ভণ্ড মাথা নেড়ে বললেন, “আহা, আমরা তাঁদের আক্রমণ থোরাই করবো! আক্রমণ তো করবে দুই দৈত্য ভ্রাতা, গণ্ড ও হস্তি, যারা কচিন্দ্রের দুই শত্রু। … আমরা তো তাদের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীদের হরণ করে ঈষৎ সম্ভোগ করে, জীবন থেকে মুক্ত করে দেব, আর এই ভাবে চিত্তাপুত্রদের মায়াবী শক্তি হরণ করে নেব”।
কৌতূহলী করিন্দ্র প্রশ্ন করলেন, “তোমার যোজনা বিস্তারে বলো তো মিত্র। আমার মনে হচ্ছে, তোমার কাছে এবার বেশ মজবুত যোজনা রয়েছে”।
ভণ্ড বললেন, “মিত্র, রাজা কচিন্দ্রের দুই শত্রু আছে গণ্ড ও হস্তি। এঁরা দুইটিই দানব। তবে এঁরা সরাসরি কচিন্দ্রের শত্রু নয়। এঁদের সাথে আমাদের সাখ্যাত করতে হবে, আর এঁদেরকে বলতে হবে যে, এঁদের মূল শত্রু, অর্থাৎ কচিন্দ্রের ভ্রাতা, সহিষ্ণু অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠছে, কারণ চিত্তাপুত্ররা তাঁর সাথে মিত্রতা করছে। এদেরকে আমরা উস্কানি দিতে পারি এই বলে যে, তাঁরা পারে চিত্তাপুত্রদের মৃত্যু দিতে। আর এই বলে তাঁদের চিত্তাপুত্রদের সাথে যুদ্ধ করতে প্রেরণ করতে পারি।
যেহেতু কচিন্দ্র সহিষ্ণুর ভাই, তাই কচিন্দ্রকেও এঁরা শত্রু মানে আর তার ক্ষতি করতে চায়। তুমিও নিশ্চিত যে, চিত্তাপুত্রদের সাথে যুদ্ধ করতে গেলে গণ্ড ও হস্তির হত্যা হবে। আর তা হলেই কচিন্দ্র ভয়মুক্ত হয়ে গিয়ে আমাদের সাথে মিত্রতা করবে, আর আমরা তাকে কোচ ছেত্রের রাজা করে দেব তাকে, আর ছায়াপুরকে এই কোচের মাধ্যমে বিস্তৃতও করতে পারবো।
অন্যদিকে, যখন চিত্তাপুত্ররা এই দুই রাক্ষসের সাথে যুদ্ধ করবে, তখন আমরা আক্রমণ করবো তাঁদের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীদের আর তাঁদের জননীকে। হরণ করে নিয়ে চলে এসে, তাঁদের প্রথমে সম্ভোগ করবো। অতঃপরে তাঁদেরকে হত্যা করলে, চিত্তাপুত্রদের মায়ারও নাশ হয়ে যাবে, আর সর্বাম্বার পরবর্তী প্রজন্মও”।
করিন্দ্র, বীর্য সহ সকলে বলে উঠলেন, “অতি সুন্দর, অতি অদ্ভুত তোমার যোজনা ভণ্ড। … চলো তবে, আমরা তেমনই করি”।
করিন্দ্র এবার করাভ, মিত্রারি আর মনকরিকে ডাকলেন আর বললেন, “শোনো করাভ, তোমার বুদ্ধি অতি কুটিল, তাই আমি তোমাকে একটি দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি। যতক্ষণে আমরা চিত্তাপুত্রদের পত্নীদের ও কুলকে নাশ করে না ফিরছি, ততক্ষণে তুমি এই বিচারব্যবস্থার নির্মাণ করে ফেল। স্মরণ রেখো যেন কনো বিদ্রোহী পার না পায়, কনো বিদ্রোহী যেন সংগঠন না গড়তে পারে। কেউ যেন ছায়াপুরের মায়ার ভেদ করার প্রয়াস না করে, তাদের কারাদণ্ড নিশ্চিত করো। আমি ফিরে আসার মধ্যে এই বিচারব্যবস্থার নির্মাণ করে ফেলো।
মিত্রারি, তোমার যুদ্ধকৌশল অত্যন্ত নিপুণ। তাই আমি তোমাকে দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি যাতে আমি ফিরে আসার পূর্বে তোমার সেনাশিবির নির্মাণ হয়ে যায়। সেনা শিবিরের কর্মভার প্রদান করে, তাদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা শুরু করে দাও। স্মরণ রেখো, তাঁদেরকে সম্মুখীন হতে হবে চিত্তাপুত্রদের। তাই তাঁদের আঘাত প্রদানের প্রশিক্ষণ দেবার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁদের প্রহার সহ্য করার সামর্থ্য। সেই অনুসারে এঁদেরকে প্রস্তুত করো।
আর মনকরি, তুমি অত্যন্ত বিচক্ষণ। গুপ্ত আক্রমণে, গুপ্ত যোজনা ভেদ করতে, গুপ্ত ভাবে কারুকে আক্রমণ করতে তুমি ওস্তাদ। তাই তোমাকে আমি দায়িত্ব প্রদান করে গেলাম, সিপাহী শিবির নির্মাণ করে নাও, আর তাকে বিচারব্যবস্থা অর্থাৎ করাভের সাথে সংযুক্ত করে নাও। স্মরণ রাখবে, যেন কনো ভাবে কনো বিদ্রোহী তোমার জাল ভেদ করতে না পারে”।
এবার করিসিজ, মিতাম্বর আর চাক্ষুষকে ডেকে বললেন, “তোমরা মাতা হুতা, মিতা ও স্ফীতার সাথে মিলে, সেই শিক্ষা ব্যবস্থার নির্মাণ করো, যা ছায়াপুরের অভেদ্য অঙ্গ হবে। মাতারা তোমাদের দেবী মোহিনীর প্রদত্ত শিক্ষানীতি, শিক্ষার বিষয় ও শিক্ষার পদ্ধতি সম্বন্ধে বলতে থাকবেন, আর তোমাদেরকে এই সম্পূর্ণ শিক্ষাবয়স্থার নির্মাণ করে ফেলতে হবে যতক্ষণ না আমরা ফিরে আসছি ভ্রমরীপ্রদেশ থেকে”।
করিঞ্জলকে ডেকে বললেন এবার করিন্দ্র, “করিঞ্জল, আমি তোমাকে ইতিমধ্যেই মিথ্যা মহাকাশ অভিযানের শিবির নির্মাণ করার সমস্ত প্রণালী ব্যখ্যা করেছি। তুমি তোমার সাথে মিতেশ ও মিতানকে নিয়ে মামা বীর্যের সাথে উপবেশন করে, সেই মায়ার নির্মাণ করে ফেল। অত্যন্ত দ্রুততা করো। পত্নীদের হাড়িয়ে, হতেও পারে চিত্তাপুত্ররা প্রগল সিংহ হয়ে উঠবে”।
করশ তুমি রুদ্রকরি আর করঙ্ককে সঙ্গে নিয়ে আমার আর ভণ্ডের সাথে ভ্রমরীপ্রদেশ চলো। আর করিক্কাম, তুমি বাকি সমস্ত ভ্রাতাদের নিয়ে, যন্ত্রমায়ার নির্মাণ করে ফেল। সমস্ত তত্ত্ব ও তথ্য এই ব্যাপারে আমি গুপ্তকরিকে বলে রেখেছি। তার কাছে সমস্ত মায়ার একটি ছোট্ট অনুকরণও আছে। তাই তাকে সঙ্গে নিয়ে, বাকি ভ্রাতাদের নিয়ে, সেই মায়াকে শীঘ্র নির্মাণ করো। আমি গুরুত্বপূর্ণ কর্ম সেরে শীঘ্রই ফিরতে চলেছি। তার মধ্যে সকলের সমস্ত কাজ হয়ে যাওয়া চাই”।
অর্ধেন্দু, শঙ্কর আর অম্বরিস, তোমরা তোমাদের রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করো, আর যেমন শিখিয়ে রেখেছি, সেই অনুসারে পরিকাঠামো নির্মাণ করো, যাতে ছায়াপুর সহজেই বিস্তার লাভ করতে পারে তোমাদের রাজ্যে। শিক্ষাক্ষত্রে, বাণিজ্য ক্ষেত্র, তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে, আর মায়াবিদ্যা নিয়ে চাকুরীর ক্ষেত্র সমস্ত কিছু নির্মাণ করে ফেল। আমি ফিরে এসে, ছায়াপুরের সমস্ত ব্যাবস্থার নিরীক্ষণ করে নিয়ে, তাকে তোমাদের রাজ্যের সাথে সংযুক্ত করে দেব। তাই দ্রুততা করো”।
এবার ভণ্ডের উদ্দেশ্যে বললেন, “গণ্ড আর হস্তির সাথে আমাদের কি ভাবে সাখ্যাত হবে মিত্র?”
ভণ্ড বললেন, “তার জন্য আমাদের প্রথমে কচিন্দ্রের কাছে যেতে হবে। সে জানে এই দুই রাক্ষস যেই গুহাতে নিবাস করে, তার ঠিকানা”।
করিন্দ্র তাই ভণ্ড, করশ, রুদ্রকরি এবং করঙ্ককে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন কচিন্দ্রের নিকটে। সম্রাট আসছেন জেনে, অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করে, কচিন্দ্র স্বয়ং গেলেন সম্রাটকে সম্বর্ধনা প্রদান করতে। করিন্দ্র অভ্যর্থনাতে তৃপ্ত হলে, কচিন্দ্র বললেন, “আদেশ করুন সম্রাট। আমি প্রফুল্লিত ও আচম্বিতও। প্রফুল্লিত এই কারণে যে স্বয়ং সম্রাট আমার দ্বারে এসেছেন। আর আচম্বিত যে, ভ্রমরীপ্রদেশের নৃপতি, রাজা সহিষ্ণুর কাছে না গিয়ে, আপনারা আমার কাছে এলেন!”
ভণ্ডকে চোখের ইশারায় নির্দেশ দিলে, ভণ্ড বললেন, “মহারাজ কচিন্দ্র, আমরা তো আপনার কাছেই এসেছি, আপনার সাহায্য করতে, আর পরিবর্তে কিছু সাহায্য নিতে”।
কচিন্দ্র লজ্জিত হয়ে বললেন, “হে মহাবীর ভণ্ড, আমাকে মহারাজ আখ্যা দিয়ে আমার দুর্ভাগ্যকে কেন চিহ্নিত করছেন?”
ভণ্ড হেসে বললেন, “আপনাকে মহারাজ করবো বলেই তো এসেছি এখানে। … আপনার ভ্রাতার ভ্রমরীপ্রদেশকে দুইটুকরো করে, আপনাকে কোচিছেত্রের রাজা করে যাবো বলেই তো আমাদের এখানে আগমন। আপনাকে সেই কথা শুনিয়ে, আমরা আপনার ভ্রাতার কাছে যাচ্ছি, তাঁর রাজ্যকে দ্বিখণ্ডিত করার নির্দেশ তাঁকে প্রদান করতে। … আপনি সম্মত তো?”
কচিন্দ্র গদগদ হয়ে বললেন, “রাজি! আমি বেজায় খুশী। … হ্যাঁ বলুন, কি করতে পারি আপনাদের জন্য। এই উপকারের পরিবর্তে কি করার নির্দেশ দেন আমাকে?”
ভণ্ড হেসে বললেন, “আরো একটি উপকার করার আছে আপনার। … শুনেছি আপনার ভ্রাতার দুই মহাশত্রু আছে, গণ্ড ও হস্তি। আর যেহেতু আপনার ভ্রাতার শত্রু, তাই আপনাকেও তারা শত্রু মানে?”
কচিন্দ্র গলা নামিয়ে বললেন, “সঠিকই জানেন। তারা এতটাই বলশালী যে, আমরা কেউ তাদের সামনা করতে পারিনা। আমি অনেকবার তার সম্মুখে যাবার প্রয়াস করেছি, আর বলার প্রয়াস করেছি যে, আমি আমার ভ্রাতার সাথে নেই। আমার সাথে সে মিত্রতা করতেই পারে। কিন্তু সে আমাকে নিজের গুহার কাছে দেখলেই, আমার উপর এমন ভাবে আক্রমণ করে যে আমি পলায়ন করতে বাধ্য হই”।
ভণ্ড হেসে বললেন, “আমাদের তাঁদের কাছে নিয়ে চলুন মহারাজ। তাঁদের নিদান আমরা নিয়ে এসেছি সঙ্গে করে”।
কচিন্দ্র বললেন, “নিদান! কিরূপ নিদান প্রভু!”
ভণ্ড মৃদু হেসে বললেন, “সহিষ্ণুর বনাঞ্চলে চিত্তাপুত্ররা এসে অবস্থান করছে। তাদের কথা তো জানেনই আপনি। তাদের বলের সম্মুখে এই গণ্ডহস্তি অতি তুচ্ছ। তাই এবার গণ্ডহস্তিকে উত্তেজিত করে, তাদের কাছে নিয়ে গিয়ে উপস্থিত করতে হবে। চিত্তাপুত্ররা তাদের হত্যা করে দিলে, আপনার এই নবরাজ্য কোচি গণ্ডহস্তির থেকেও মুক্ত হয়ে যাবে। … কি মহারাজ খুশী তো? যদি খুশী হন, তাহলে আমাদেরকে গণ্ডহস্তির গুহা দেখিয়ে দিন কেবল। এটিই আপনার তরফ থেকে আমাদের জন্য করা উপকার হবে”।
কচিন্দ্র বললেন, “না না মহারাজ, এতো আমারই হিত করছেন আপনারা। বেশ আপনাদের যখন আমার থেকে নিজের থেকে কিছু চাইবার নেই, তখন আমি আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি মহারাজ। এই কোচিরাজ্যের রাজা তো আমিই হয়ে বিরাজ করবো, কিন্তু এখানে শাসন চলবে সম্রাট করিন্দ্রের। এই আমার নিশ্চয়”।
ভণ্ড হাস্যমুখে বললেন, “যেমন আপনার ইচ্ছা মহারাজ। আপনার বৃহৎ হৃদয়, তাই এমন উদার সিদ্ধান্ত। আমাদের কনো আপত্তি নেই, কারুর দায়িত্ব গ্রহণ করাতে। রাজা হয়ে আপনিই উপবেশন করবেন, বাকি আমরা ফেরার পথে আপনার রাজ্যকে সাজিয়ে যাবো, যাতে করে সম্রাটের শাসনপন্থা সেখানে সহজের লাগু হতে পারে। আপাতত, আমাদের নিয়ে চলুন গণ্ডহস্তির কাছে”।
কচিন্দ্র তাঁদেরকে উত্তরে নিয়ে গিয়ে সেই গুহা দেখিয়ে দিলে, করিন্দ্র বললেন, “করশ রুদ্রকরি তোমরা মহারাজের সাথে এখানেই বিরাজ করো। আমি করঙ্ক আর ভণ্ড গুহার অন্তরে যাচ্ছি”।
অন্ধকার ঘুটঘুটে গুহার কাছে যেতেই, বিশাল শব্দ আর কম্পন লক্ষ্য করে থমকে গেলেন করিন্দ্র, করঙ্ক ও ভণ্ড। এমন সময়ে এক বিশাল সিংযুক্ত আর একজন বিশাল শুণ্ড যুক্ত প্রায় ৩ গজের দুই দৈত্য সম্মুখে এসে বিশাল শব্দ করে বললেন, “কে তোমরা! … এখানে কি চাই!”
করিন্দ্র বললেন, “আমি এই সম্পূর্ণ জম্বুদেশের সম্রাট, করিন্দ্র। আর এঁরা আমার ভ্রাতা ও মিত্র”।
