জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

চিত্তাপুত্ররা সস্ত্রীক যখন উপস্থিত হলেন চন্দননগরে, তখন সকল প্রজা তাঁদের প্রিয় রাজপুত্রদের দেখার জন্য হাতে বরমাল্য এবং আরতির সামগ্রী নিয়ে উপস্থিত রইলেন। এবং তাঁদের সকলের সম্মুখে উপস্থিত রইলেন, স্বয়ং মহারাজ করিমুণ্ড, যাকে বেষ্টন করে, তাঁর সহায়িকা রূপে অবস্থান করলেন আমাত্য সুধামা এবং তাঁর অতিপ্রিয় ভ্রাতাপত্নী, দেবী চিত্তা।

সস্ত্রীক চিত্তাপুত্ররা সেখানে আবির্ভূত হলে, সকলের মুখে একটিই বক্তব্য, তাঁদের বপুতে প্রাণ ফিরে এলো এটা জেনে যে তাঁদের প্রিয় চিত্তাপুত্ররা আজও জীবিত। কেউ কেউ বললেন, “বেঁচে থাকাই দায় হয়ে উঠেছিল, এই সংবাদ পেয়ে যে চিত্তাপুত্ররা আর নেই এই ইহজগতে। … আজ সেই বপুর ধমনিরা পুনরায় লহুসঞ্চারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে”।

মহারাজ করিমুণ্ড স্বয়ং চিত্তাপুত্রদের আলিঙ্গনসুখ প্রদান করে বললেন, “আমি যে কতটা আনন্দিত তোমাদের পুনরায় একসাথে অনুভব করতে পেরে, তা ভাষায় বোঝাতে পারবো না”। … পুত্রবধূদের আশীর্বাদ প্রদান করে মহারাজ করিমুণ্ড বললেন, “আমার হৃদয়ের তিন টুকরো এই তিন চিত্তাপুত্র, আর তোমরা সেই তিনটুকরোর প্রাণরক্ষক। নিজেদের কর্তব্য নিষ্ঠা সহকারে পালন করো। আর তা পালন করার শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা তোমাদের নিজেদের শাশুড়িমা, দেবী চিত্তা। স্বামীকে কি ভাবে কামনারহিত স্নেহ প্রদান করতে হয়, তা তাঁর থেকে অধিক শ্রেয় কেউ জানেন না। তাই তাঁকে নিজেদের গুরু জ্ঞান করে, তাঁর ছত্রছায়াতে নিবাসরত থেকো পুত্রীরা”।

এরপর দেবী চিত্তার কাছে তাঁর পুত্ররা এবং পুত্রবধূরা উপস্থিত হলে, ছন্দ ও তালকে একত্রে আনন্দের সাথে নিজের কোমল বাহুদ্বারা বেষ্টন করে আনন্দে অশ্রু বিসর্জন করতে থাকলেন দেবী চিত্তা, আর বললেন, “কত বছর তোমাদের দেখি নি পুত্ররা। … শেষ যখন দেখেছিলাম তোমাদের তখন তোমরা কিশোরের অন্তিম অবস্থায় ছিলে, আর আজ তোমরা পূর্ণ যুবক। সময়ের কি অদ্ভুত লীলা! যেই কালে পুত্রদের মধ্যে সর্বাধিক পরিবর্তন এসে তাঁদের চরিত্র নির্মাণ করে, তোমাদের মাতা সেই কালেই তোমাদের সাথে থাকতে পারলো না। নিরুপায় ছিলাম পুত্ররা, ক্ষমা করে দিও জননীকে”।

ছন্দ ও তাল একটি কথা না বলে, কেবলই মাতার কোমল বাহুতে নিজেদের অর্পণ করে সুখলাভ করলেন। অতঃপরে দেবী পদ্মিনী ও নলিনী দেবী চিত্তার সম্মুখে এলে, দেবী চিত্তা তাঁদের মুখচুম্বন করে বললেন, “তোমাদেরও কতকাল পর দেখলাম। সংবাদ পেয়েছিলাম তোমাদের মাতার দেহান্ত হয়েছে, ইচ্ছাও হয়েছিল তোমাদের কাছে যাই আর বলি, তোমাদের জননীর দেহান্ত হয়নি এখনো, দেখো মহাকালী তোমাদের সম্মুখে আরো এক জননী প্রদান করে গেছেন। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও, তা করা যেতনা, কারণ পুত্র ও পুত্রবধূদের পরিচয় সেইকালে গুপ্ত রাখাই ছিল সময়ের নির্দেশ”।

দেবী পদ্মিনী ও দেবী নলিনী হাস্যমুখে বললেন, “মাতা, আপনাদের পুত্রদের মাধ্যমে আমরা সর্বদাই আপনার আশীর্বাদ অনুভব করেছি। আর সত্য বলছি মাতা, এক মনুষ্যের যেই কালে সর্বাধিক চরিত্র পরিণত হয়, সেই কালে আমরা ও আপনার পুত্ররা একে অপরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ থাকতে পেরে, আমরা তাঁদের স্ত্রী কম, সখী অধিক হয়ে উঠেছি, আর তেমন হওয়াতে আমাদের আগামী দিনের সম্পর্ককে অতি সহজ করে দিয়েছেন মহাকালী”।

দেবী পদ্মিনী হেসে বললেন, “নাথকে তাঁর ভ্রাতাদের ও মাতাদের দর্শন লাভ না করতে পারার কারণে স্নেহক্রন্দন করতে দেখেছি, দুশ্চিন্তা করতে দেখেছি, আবার এও বলতে শুনেছি যে, তাঁদের ভ্রাতা সুরের কাছে তাঁদের জননী আছেন, তাই জননীর কনো চিন্তা নেই। সুরের থেকে অধিক সুরক্ষা প্রদানের সামর্থ্য তো এক ব্রহ্মময়ী মাতারই আছে। … তাই মাতা, এই কয় বছরে স্নেহ, বিশ্বাস, আর আত্মীয়তা কি হয়, তা জেনেছি, বুঝেছি আর শিখেছি”।

এবার মাতা চিত্তা স্বয়ং এগিয়ে গেলেন, তাঁর পুত্র সুরের উদ্দেশ্যে, এবং তাঁর বামপার্শে অবস্থান করা নব্যবিবাহিতা, দেবী শ্রীর উদ্দেশ্যে। নবদম্পতি নতজানু হয়ে জননীকে প্রণাম করলে, দেবী চিত্তা তাঁদের স্কন্ধ আকর্ষণ করে উনি করে সুরের উদ্দেশ্যে বললেন, “পুত্র, জন্মদাত্রী জননী প্রায় সকলের কাছেই প্রথম জননী হন, আর বিবাহিতা পত্নী হন দ্বিতীয় জননী। … কিন্তু পুত্র, তোমার ক্ষেত্রে, তোমার জন্মদাত্রী জননী হলেন তোমার দ্বিতীয় জননী, কারণ তোমার কাছে এই জ্ঞান স্পষ্ট যে, এই জন্মদাত্রী তোমাকে দেহদান করেছেন, আর জগন্মাতা স্বয়ং তোমাকে চেতনা দান করে তোমার প্রথমা জননী। কিন্তু পুত্র, এই তৃতীয়া জননী অত্যন্ত বিশেষ হন। ইনি তোমাকে না চেতনা দান করেন, আর না দেহদান করেন। ইনি তোমাকে চরিত্র দান করে তোমার জননী। তাই এই মাতার প্রতি যত্নশীল হয়ে থেকো।

প্রতিটি জননীই তাঁর সন্তানদের কিছু না কিছু দান করেন, আর সেই দান করার কালে, নিজের চিন্তা করা ভুলে যান। তা জগন্মাতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, জন্মদাত্রীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য আর ভার্যার ক্ষেত্রেও। তাই পুত্র, নিজের এই তৃতীয় জননীর দেখভাল করো, কারণ খুব স্বভাবতই সে নিজের চিন্তা করা ভুলে যাবে, তোমাকে চেতনা প্রদান করতে করতে।

আসল কথা এই পুত্র যে, চেতনা প্রদান করতে, জগন্মাতাকে জন্মের পূর্বে যা সময় লাগে, তার থেকেও অধিক সময় লাগে জন্মের পর সেই দানকে অব্যহত রাখতে। এক জননীর দেহদান হয় ৯ মাসের, এবং সংস্কার দান হয় ৯ বছরের। কিন্তু এক স্ত্রীরূপ জননী, যিনি তাঁর স্বামীকে চরিত্র দান করেন, তাঁর দান প্রায় ১২ বৎসরের হয়। এই দ্বাদশ বৎসরের সময়কাল হয় নিরবচ্ছিন্ন, আর তাই সেই কালে স্ত্রীর দায়িত্ব অত্যন্ত অধিক হবার কারণে, সে নিজের জন্য উদাসীন হয়ে যায়। তাই পুত্র, এই সময়কালে স্ত্রীর যত্ন বিশেষ করে রেখো”।

অবশেষে দেবী শ্রীর কাছে উপস্থিত হয়ে তাঁর মুখমণ্ডলকে নিজের দুই কোমলকরতলে স্থাপিত করে দীর্ঘক্ষণ ব্যাপী সেই মুখশ্রীকে নিজের বিভিন্ন দৃষ্টিদ্বারা নিরীক্ষণ করতে থাকলেন দেবী চিত্তা। দীর্ঘক্ষণ এমন নিরীক্ষণ করার শেষে, দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “ও বুঝেছি। … এই ছিল তোমার লীলা! এর অর্থ তো এই দাঁড়ায় যে কাহানী বেশ বৃহৎ! কারণ তোমার লীলার তো এই সবে শুরু।

অনেকের তোমাকে সন্তান রূপে লাভ করার লালসা ছিল, অনেকের তোমাকে প্রত্যক্ষরূপে শত্রু করে না পাবার বেদনা ছিল, কারুর তোমাকে আপন জননী বেশে লাভ করার উপাসনা ছিল। পূর্বরূপে সেই সমস্ত করা সম্ভব হচ্ছিলনা, তাই নতুন রূপ ধারণ করে এলে! … বেশ, এই তোমার লীলার শুরু তাহলে। তাই আশীর্বাদ দেবার পরিবর্তে, তোমার থেকে একটি আশীর্বাদ কামনা করছি আজ। তোমার সম্পূর্ণ লীলা দেখার সামর্থ্য প্রদান করো। পূর্বের লীলা আমার শ্রবণের প্রিয়কথা ছিল মাত্র। এবারের লীলা প্রত্যক্ষ করার আবেদন রইল”।

এতবলার পর, শ্রীকে বক্ষমাঝে বেষ্টন করে, আনন্দে দেবী চিত্তা অশ্রুপাত করলে, সমস্ত পুত্রবধূকে রাজগৃহে প্রবেশ করার জন্য মহারাজ করিমুণ্ড আবেদন করলেন। সেই কালে, দেবী হুতা, মিতা ও স্ফীতা সম্মুখে দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, “এর অনুমতি আমরা তো প্রদান করবো, আপনি এই অনুমতি প্রদান করার কে হন রাজা করিমুণ্ড! … আর আমরা এই অনুমতি তাঁদেরকে প্রদান করবো না, যারা প্রজার সাথে ছল করেছেন”।

প্রজার একাংশ এর উত্তরে বললেন, “ছলনার উত্তর প্রদান ছলদ্বারাই করতে হয়, উদারতা দিয়ে নয়। তাই যাকে প্রজার সাথে ছল বলছেন আপনারা, তা আদপে প্রজার সাথে করা ছল নয়, তা আপনাদের ছলনার প্রত্যুত্তরে করা ছল”।

রাজা করিমুণ্ড এবার কঠিন হয়ে বললেন, “হে বীর্যভগিনীরা, আপনাদের করা ছলের কথা সমস্ত প্রজাও যেমন জানেন, তেমন আমিও জানি। আর তাই আমি, মহারাজ করিমুণ্ড আপনাদেরকে এই রাজ্য থেকে নিষ্কাসিত করছি, আজ এক্ষণে। দেবী চিত্তা হবেন এই রাজ্যের রাজমাতা, আর ছন্দ হলো প্রজার পছন্দের ব্যক্তি। তাই সে হবে এই রাজ্যের মহারাজ, এবং তাঁর ভার্যা, বনবিবি দেবী পদ্মিনী হবেন এই রাজ্যের মহারানী। … তাই আপনারা এখন আসতে পারেন এই রাজ্য থেকে। আর যদি ভিক্ষুকের মত থাকতে রাজি থাকেন, তবে আমার তাতে আপত্তি নেই। তবে আমার খুব সন্দেহ যে, একটি প্রজাও আপনাদের ভিক্ষাদান না দিয়ে, আপনাদেরকে মৃত্যুর কোলে যেতে বাধ্য করবে সেই ক্ষেত্রে”।

অপমানিত হয়ে দেবী হুতা, মিতা ও স্ফীতা রাজ্যত্যাগ করে, পুত্রের কাছে কাতা রাজ্যে চলে গেলেন। আর এবার ছন্দচিৎকে রাজসিংহাসনে উপবিষ্ট করে, মহারাজ করিমুণ্ড তাঁকে রাজা রূপে স্থাপিত করলেন, এবং তাঁর ভার্যা, দেবী পদ্মিনীকে মহারানীর আসনে বিরাজমান করলেন।

মাতাদের অপমান, বীর্যসাম্রাজ্য থেকে চন্দননগরের মুক্তি, এবং পরমশত্রু চিত্তাপুত্রদের সিংহাসনগ্রহণ, এই তিন মিলে অত্যন্ত ক্ষিপ্ত করিন্দ্র হুংকার ছেড়ে বললেন, “মামা, আমি এখনই চন্দননগরকে আক্রমণ করবো। বলে তাল আমাকে পরাস্ত করতে পারবেনা, সঙ্গে আমার আছেন আপনি আর আমার ১৯ ভ্রাতা এবং ভৃগুসেন। মায়ায় পদ্মিনী ও নলিনীকে পরাস্ত করার সামর্থ্য ধরে আমাদের ভার্যারা, অর্থাৎ ঘৃতকুমারীরা এবং শৃঙ্খলাকন্যারা। এমনকি আর তো আমরা সুরকেও ডরাই না, কারণ আমাদের সাথে আছে ভণ্ড। … তাই এক্ষণে আক্রমণ করে, চন্দননগরকে নিজের অধিকারে স্থাপিত করতে চাই”।

করিন্দ্রের এই কথনে তাঁর ভ্রাতারা, ভ্রাতাদের ভার্যারা, এমনকি ভৃগুসেন ও ভণ্ডও উজ্জীবিত হলে, বীর্য বললেন, “পুত্র, চিত্তাপুত্রদের সাথে যুদ্ধের অর্থ, উভয় শিবিরে ভয়ানক ক্ষয়ক্ষতি। তাই যতটা সম্ভব এই যুদ্ধকে এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। হয়তো চিত্তাপুত্রদের থেকে চন্দননগরকে ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হবে তুমি, কিন্তু পরিবর্তে এমনই আঘাতপ্রাপ্ত তুমি স্বয়ং হবে যে, হতে পারে তৃতীয় কেউ মাঝের থেকে উদিত হয়ে, তোমাদের উভয়ের থেকে রাজ্য ছিনিয়ে নিয়ে চলে যাবে। তাই পুত্র, সরাসরি যুদ্ধের চিন্তা এখনই করো না। যতক্ষণ না নিজের ধনবলকে চিত্তাপুত্রদের থেকে শতগুণ অধিক করে ফেলতে পাচ্ছ, ততক্ষণ এই যুদ্ধের চিন্তাও করো না।

তবেই যেই ক্ষয়ক্ষতি হবে তোমাদের উভয়ের, তাতে তোমার কিচ্ছু হবেনা, কারণ তোমার থাকবে বিপুল ধন, আর চিত্তাপুত্ররা অস্থির হয়ে যাবে কারণ সেই যুদ্ধের কারণে, তাদের হবে প্রকাণ্ড ক্ষতি। … তাই ভাগ্নে, প্রথম নিজের ধনভাণ্ডারকে উন্নত করার চিন্তা করো”।

ভৃগুসেন সম্মতি দিয়ে দমিত হয়ে বললেন, “মিত্র সঠিক কথা বলছে। পদ্মিনী নলিনী যুক্ত হওয়াতে, দক্ষিণ উপকুল ও সুন্দরবনের যাবতীয় সম্পদ চিত্তাপুত্রদের হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে নিষ্ঠাবান নিজের রাজশাহীকে ধনেধান্যে বিপুল করে তুলেছে। একাধারে সে প্রায় সম্পূর্ণ জম্বুদেশের সমস্ত মানুষের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ মানুষের উদরপূর্তির মত মৎস্য ও ধান উৎপাদন করে।

শুনেছি, মহারাজ মানস চিত্তাপুত্রদের কাছে গমন করে, রাজা ছন্দের কাছে আবেদন করে, শূন্যপুর অর্থাৎ মুর্শিদরাজ্যকেও তাঁর কাছে অর্পণ করেছেন, যার সিংহাসনে সুরচিৎকে অর্পণ করেছেন মহারাজ ছন্দ। এই মুর্শিদরাজ্য একাকী সমর্থ অর্ধেক জম্বুদেশবাসীকে বস্ত্র প্রদান করতে। অর্থাৎ বিভিন্ন দিক থেকে ধনভাণ্ডার উন্নত চিত্তাপুত্রদের”।

মনকরি বললেন, “এর অর্থ তো, ইতিমধ্যেই তাঁরা তিন রাজ্যের অধিপতি হয়ে উঠেছে! … সাথে রয়েছে চন্দননগর। আমাদের কাছে আছে কাতা, মেদিনী আর মালদ। এরপর যদি আরো কিছু করে তাঁরা, তাহলে তো জম্বুদেশের প্রজা ছন্দকেই সম্রাট জ্ঞান করে নেবে! … তখন তো আমাদের অবস্থা তেমন হয়ে যাবে, যেমন অবস্থায় আমরা চিত্তাপুত্রদের দেখতে চেয়েছিলাম!”

করাভ বললেন, “সুন্দরের সেনা, মুর্শিদের সেনা, আর রাজশাহীর সেনা, এঁরা তিনজনেই অত্যন্ত বলশালী সেনা, সাথে রয়েছে চিত্তাপুত্রদের বল, বনবিবির মায়া, আর তাঁদের বিপুল ধনভাণ্ডারের কারণে অপরিসীম অস্ত্রসস্ত্র ও যুদ্ধকবচ। অর্থাৎ ভ্রাতা, চিত্তাপুত্ররা কনো ভাবেই দুর্বল নয়। … এমত অবস্থায় কি করা যায়!”

মিতারি বললেন, “আচ্ছা ভ্রাতা, আমরা যদি মিত্রতার প্রস্তাব নিয়ে ওদের কাছে যাই, তাহলে ছন্দ দয়াবান, সে আমাদের মিত্রতার প্রস্তাবকে গ্রহণ করে নেবে। সে রাজনীতিতে পটু হলেও, বলে নয়, তাই সে যুদ্ধ এড়াতে এই মিত্রতার প্রস্তাব গ্রহণ করে নেবেই। তখন আমরা সমস্ত জম্বুদেশের রাজা হয়ে যাবো। তারপর যদি প্রতারণা করে, চিত্তাপুত্রদের নিষ্কাসনে পাঠিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সমস্ত জম্বুদেশ আমাদের হয়ে যাবে”।

বীর্য বললেন, “প্রস্তাব ভুল নয়, তবে এখনো সঠিক সময় আসেনি এর। ভাগ্নে, এই সমস্ত কিছুর মধ্যে, আমরা একজনকে ভুলে যাচ্ছি, আর তিনি হলেন মহারাজ ধনেশ। মহাবলশালী সে, এমনকি তালের থেকেও অধিক শক্তিধর সে। তারই সাথে সে মল্লার রাজ্যের অধিপতি। আর তাঁর স্থির দৃষ্টি নদিয়াদ রাজ্যের উপর”।

ভৃগুসেন বললেন, “কিন্তু নদিয়াদ রাজ্য পর্যন্ত পৌঁছাবার একটিই উপায়, আর তা হলো মুর্শিদরাজ্য অতিক্রম করে। কিন্তু মাতা সর্বাম্বার রাজ্য হবার দরুন, তা তো অতিক্রম করা যেতে পারেনা। এখন তো সেখানের অধিপতি স্বয়ং সুর। … তাহলে!”

বীর্য বললেন, “আরো একটি পথ আছে সেখানে যাবার, আর তা হলো ভাগীরথীর অপর দিক অর্থাৎ কাতা, যা আমাদের রাজধানী। আমাদের এইদিক থেকে ভাগীরথী লঙ্ঘন না করেই আমরা নদিয়াদ পৌছাতে পারি। পথে পড়ে বিস্তীর্ণ জঙ্গল ও জলাভূমি। সেই স্থানের আদিবাসীদের অধিকারে এনে, আমরা সহজেই যেতে পারি নদিয়াদে। … একবার নদিয়াদ অধিকার করে নিতে পারলে, আমরা সহজেই রাজা ধনেশের সাথে সন্ধি করতে পারবো। আর সেইক্ষেত্রে, আমাদের শক্তিবৃদ্ধি হবেই, কারণ মল্লার রাজ্যের কাছে রয়েছে বিপুল সংখ্যক মল্লযোদ্ধা”।

ভণ্ড বললেন, “কিন্তু সেই সমস্ত কিছুর জন্য আমরা প্রচুর সময় পেয়ে যাবো, যদি চিত্তাপুত্রদের তার আগে দরিদ্র করে দেওয়া যায়। … আমার বিশ্বাস, জগদ্ধাত্রী আরাধনার পূর্বে, তারা কিচ্ছু এমন করবে না। সমস্ত ধন সঞ্চিত করে রেখে, এবারে তাঁরা মহাধুমধাম করে জগদ্ধাত্রী আরাধনা করার চিন্তা করছে। তাই জগদ্ধাত্রী আরাধনার পূর্বেই যদি আমরা তাদের আক্রমণ করে বিপুল ধনক্ষয় করাই, তাহলে জগদ্ধাত্রী আরাধনা সঠিক ভাবে না করতে পেরে, এমনিতেই তাঁরা মানসিক ভাবে ভেঙে পরবে, আর সেটিই হবে আমাদের কাছে শ্রেষ্ঠ সময়, আমাদের রাজ্য বিস্তার করার জন্য”।

করিন্দ্র বললেন, “উচিত প্রস্তাব। তাহলে আমরা এক্ষণে আক্রমণ করার সংকল্প গ্রহণ করে, দুর্গাপূজা করি। অতঃপরে অতর্কিত আক্রমণে জেরবার করে দেব চিত্তাপুত্রদের”।

একদিকে যখন এমন যোজনা করছিলেন করিপুত্ররা, অন্যদিকে বিকল্প চিন্তা করছিলেন চিত্তাপুত্ররাও। দেবী সর্বশ্রী মুর্শিদরাজ্যের অধীশ্বর, মহারাজ সুরচিৎকে বললেন, “মহারাজ, এবার আমাদের রাজ্য বিস্তারের চিন্তা করা উচিত। … মল্লার রাজ্যের রাজা ধনেশ তাঁর প্রজাদের উপর যৎপরনাস্তি উপদ্রব করেন, নিজের বিশাল বলের সাহায্যে। তাই তাঁদেরকে এই দুর্গাপূজার কালে শ্রেষ্ঠ উপহার দেওয়া উচিত, তাঁদের রাজাকে অপসারিত করে, সেই রাজারই কনিষ্ঠ পুত্র, মহাবলবান কুর্নিশকে রাজার আসনে স্থিত করে।

কুর্নিশ অত্যন্ত নিষ্ঠাবান এবং দয়াবান ব্যক্তি, যার সর্বক্ষণ প্রজার প্রতি সচেতনতা থাকে। প্রজাকে যতটা তাঁর পিতা ও ভ্রাতাদের অত্যাচার থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়, তা তাঁর কারণেই সম্ভব হয়। নয়তো তাঁর পিতা, এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ দুই পুত্র, শঙ্কর ও অম্বরিস সর্বক্ষণ লুণ্ঠন করাতেই মনযোগী। তাই হে রাজা সুর, মহারাজ ছন্দের সাথে কথা বলে, এই রাজ্যকে অধিকার করে আসুন”।

এমন যোজনা সঙ্গে নিয়ে, সপত্নীক সুর রাজা ছন্দের দরবারে উপস্থিত হলে, রাজা ছন্দ সমস্ত কিছু শুনে বললেন, “ধনেশের রাজ্য যতটা আভ্যন্তরীণ ভাবে শক্তিশালী, তার থেকেও অধিক তা বাহ্যিক ভাবে সুরক্ষিত। যারা বাহ্য সুরক্ষা প্রদান করে থাকেন, সেই সেনার কনোত্রুটি নেই, তাঁদের রাজার অত্যাচারী মানসিকতায় তাঁদের কনো হাত নেই। তাই তাঁদেরকে হত্যা করে রাজ্যে প্রবেশ করতে হলে, তা তাঁদের প্রতি করা অন্যায় হবে। সেই ক্ষেত্রে, একটি যোজনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

রাজা ধনেশের নদিয়াদ রাজ্যের উপর বরাবর নজর রয়েছে। এই নদিয়াদ রাজ্যকে এক বনরক্ষক অঙ্গিরস রক্ষা করে। সে নাকি নিজেকে শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর রূপে ঘোষণা করে, আর সমস্ত সেখানের প্রজাকে বশীকরণ করে রেখে দেয়। এই নদিয়াদ রাজ্য মুর্শিদ রাজ্যের ঠিক দক্ষিণ দিকে। তাই সহজেই সেখানে আক্রমণ করে, তা অধিকার করে নাও। একবার তা অধিকার করা হয়ে গেলে, সুর তুমি তালকে সঙ্গে নিয়ে ধনেশের রাজ্যে যাত্রা করবে, আর রাজা ধনেশকে এই নদিয়াদ রাজ্য উপঢৌকন রূপে দেবার কথা বলবে।

ঠিক দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিনে যাবে সেখানে, কারণ ধনেশ এই নদিয়াদ রাজ্য অধিকারের জন্য প্রতিবছর দুর্গাষষ্ঠী থেকে দুর্গাদশমী পর্যন্ত উপবাসে থাকেন, তাই দুর্বল থাকেন। সেইকালে তাঁর সম্মুখে গিয়ে শর্ত রাখবে যে, যদি সে চিত্তালকে পরাস্ত করতে পারে, তবেই নদিয়াদ তাঁকে প্রদান করবে। উপবাসী দুর্বলদেহী ধনেশকে হত্যা করে, তাঁর পুত্র কুর্নিশকে সিংহাসনে আঢ়ুর করে, একাধারে নদিয়াদ ও মল্লার, দুইকেই অধিকার করে নেবে, এবং উন্নতির বীজ স্থাপন করে আসবে তাতে। স্মরণ রাখবে দুর্গা আরাধনার মধ্যেই এই কর্ম করতে হবে তোমাদেরকে, কারণ আমার বিশ্বাস, ঠিক তারপর পর এই একি কৃত্য বীর্য করাবেন তাঁর ভাগ্নেদের দিয়ে”।

নিপুণ রাজনৈতিক জ্ঞান ছন্দের। আর সেই বুদ্ধিতেই সুর গেলেন নদিয়াদ অধিকার করতে। দেবী শ্রী তাঁর সারথি হয়ে সেখানে গেলে, ছল ও খল অঙ্গিরস দেবী শ্রীর রূপের প্রতি কামনাকৃষ্ট হয়ে, তাঁকে আক্রমণ করতে এলে, ক্ষিপ্ত সুর, সহস্র বাণকে অতি তীব্রতায় বর্ষণ করলে, অঙ্গিরস অত্যন্ত আহত হন, এবং ক্ষিপ্তও। তাই সে এবার অধিক শক্তিধরে বাণ নিক্ষেপ করতে গেলে, সামান্য বাণ দ্বারা সুর অঙ্গিরসের ধনুশকে চার খণ্ডে বিভক্ত করে দেয়।

ক্ষিপ্ত অঙ্গিরস এবার একের পর এক অস্ত্র নিক্ষেপের প্রয়াস করলে, প্রথমে সুর তাঁর অস্ত্রদের খণ্ডিত করে। কিন্তু যখন দেখেন সুর যে, অঙ্গিরস থামার নাম নিচ্ছেনা, তখন একটি বাণ নিক্ষেপ করে অঙ্গিরসের প্রেরিত মুশলকে ভেদ করে, অঙ্গিরসের ললাটের ঠিক মধ্যস্থলকে বিদ্ধ করে দিলে, অঙ্গিরসের থেকে নদিয়াদ রাজ্য মুক্ত হয়। অঙ্গিরসের দেহ ভূমিতে পতিত হলে, অঙ্গিরসের ভ্রাতা তামরস সম্মুখে এসে প্রণাম করলেন সুরের উদ্দেশ্যে ও দেবী শ্রীর উদ্দেশ্যে, এবং বললেন, “হে চিত্তাপুত্র সুর, আপনাকে সহস্র ধন্যবাদ, আমাদেরকে অহংকারী অঙ্গিরসের থেকে মুক্ত করার জন্য। … হে বীরেশ, আমাকে আদেশ দিন, আমি কি ভাবে আপনার সেবা করতে পারি!”

সুর বললেন, “আমাকে প্রথমে নদিয়াদ রাজ্যের সীমারেখা সম্বন্ধে সচেতন করো তামরস”।

তামরস বললেন, “মহাশয়, এই নদিয়াদরাজ্যের উত্তর সীমা হলো মুর্শিদরাজ্য, আর দক্ষিণ সীমা হলো কাতা রাজ্য। পূর্বে এর সীমা হলো ভাগীরথী, আর পশ্চিমে এঁর সীমারেখা হলো রাজশাহী রাজ্য। … সম্পূর্ণ ভাবে জঙ্গলে আবিষ্ট রাখতেন এই রাজ্যকে আমার ভ্রাতা, অঙ্গিরস। জঙ্গল হয়ে থাকার কারণে, এই রাজ্যে উন্নতি নেই বললেই চলে, তবে এই একই কারণে, এই রাজ্য অজেয় হয়েও আছে, নয়তো কাতা রাজ্য কবেই এই রাজ্যকে অধিকার করে নিতেন”।

সুর বললেন, “বেশ এক কাজ করো তামরস। এই রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্তকে ঘনঅরণ্যে আচ্ছন্ন করো, যাতে কাতা রাজ্যের থেকে সুরক্ষিত থাকো তোমরা। বন্যপশুদেরও সেই জঙ্গলে স্থাপিত করো, যাতে তোমার সীমারেখা সুরক্ষিত থাকে। আর তোমার রাজ্যের অন্তরে মৎস্য চাষ করো এবং ফলের চাষ করো, যাতে এর বনভূমি বিনষ্ট না হয়ে যায়”।

এই ভাবে নদিয়াদ রাজ্য চিত্তাপুত্ররা তাঁদের আগেই অধিকার করে নিলে, ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে করিন্দ্র। তবে এই তো তাঁর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠা শুরু, কারণ সে যখন দুর্গাপূজাতে মত্ত থাকবে, সেই কালের মধ্যে যে মল্লার রাজ্যকেও অধিকারে এনে, চিত্তাপুত্ররা অজেয় হয়ে যেতে চলেছিল, তার আন্দাজও ছিলনা করিপুত্রদের।

যোজনা অনুসারে, দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে, নদিয়াদরাজ্যকে উপঢৌকন রূপে প্রদান করার প্রসঙ্গ স্থাপিত করে, সরাসরি উপবাসরত রাজা ধনেশের দরবারে উপনীত হন সুরতাল। রাজা ধনেশ আনন্দচিত্ত হয়ে সম্মুখে উপবেশন করেন, এই অনাশাপ্রদ নবসন্ধিকে আলিঙ্গন করার উদ্দেশ্যে। ঠিক তখনই সুর বললেন, “মহারাজ ধনেশ, বিনা পরিশ্রমে কাঙ্ক্ষিত কিছু লাভ করলে, সেই বহুমূল্য সম্পদকে অধিকদিন গচ্ছিত রাখা যায়না, এমনই আমরা জেনেছি বয়োজ্যেষ্ঠদের থেকে।

তাই মহারাজ, আপনার কাঙ্ক্ষিত সম্পদ, নদিয়াদ রাজ্য আপনি আমাদের থেকে গ্রহণ করুন, আমার ভ্রাতা তালকে মল্লযুদ্ধে স্বয়ং আপনি পরাস্ত করে। আপনারা দুইজনেই অত্যন্ত বলশালী, তবে কে আপনাদের মধ্যে অধিক বলবান, সেই নিয়ে অনেকেরই দ্বন্ধ আছে। সেই দ্বন্ধ মিটিয়ে, আপনাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলবানই এই রাজ্যকে গ্রহণ করুন, এমন সেখানের বর্তমান নরেশ, তামরসের অনুরোধ”।

মহারাজ ধনেশ এই প্রস্তাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে বললেন, “এই কথা যদি পূর্বে তোমরা আমার কাছে বার্তা রূপে প্রেরণ করতে, তাহলে তোমাদের এই স্থানে উপবেশন করতে হলে, সহস্র সেনাকে নিধন করে তবেই পৌছাতে হতো। তা যাতে না করতে হয়, সেই কারণে এমন ছল করলে! ছল তাও আবার চিত্তাপুত্রদের দ্বারা!”

সুর হাস্যমুখে বললেন, “মহারাজ আপনি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। তাই আপনার কাছে রাজনৈতিক চালচলন অত্যন্ত সহজ রূপেই প্রত্যক্ষ হয়। তবে মহারাজ, আপনি ভেবেছিলেন, আমরা চিত্তাপুত্র, যাদেরকে নিষ্ঠাবান রূপেই সকলে চেনেন। আর নিষ্ঠাবান মানেই, আপনারা ধরে নেন যে, তারা গবাদিপশুর ন্যায় আচরণযুক্ত, অতি দুর্বলচিত্তের ব্যক্তি হবেন। সেই কারণে আপনি ভাবতেও পারেননি যে, আমরা এমন করে আপনার সম্মুখে উপস্থিত হবো।

সেই ক্ষেত্রে, মহারাজ, আপনার কিছু বিষয়ে জেনে রাখা আবশ্যক। আমরা হলাম কৃতান্তিক ধর্মের অনুগামী। আর কৃতান্ত ধর্ম আমাদের এটি কখনোই শেখায়নি যে, ধনলোভী, প্রজা অত্যাচারী, প্রজার উপর করের বোঝা চাপিয়ে, প্রজাকে লুণ্ঠন করা দুরাচারীর কাছে নিষ্ঠাবান হতে। বরং কৃতান্তিক ধর্ম আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে যে, একমাত্র সত্যপ্রেমী, প্রকৃতিপূজারি, নিয়তি উপাসক, সমর্পিত প্রাণদের কাছেই সরল আর সহজ হতে। আর সাথে সাথে এই শিক্ষাও দিয়েছে যে, বাকি সকলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অধিক পরিমাণে জটিল হতে, কারণ জটিলকে জটিলতা দ্বারাই পরিমিত করতে হয়, আর জটিল পরিমিত হলে, তবেই সরল নিজের সরলতাকে ধারণ করতে সক্ষম হয়।

রাজা ধনেশ, কৃতান্তিক আমাদের এই ধরণীর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে বলে দেখিয়েছে যে, এই ধরণীকে দেখে শেখো, এর অন্তরে রয়েছে নমনীয়তা, নরম গলিত ধাতু। কিন্তু সেই ধাতু যাতে নরম থাকতে পারে, সরল থাকতে পারে, তারকারণে সর্বক্ষণ ধরণী সেই তরল ধাতুর নিম্নে অগ্নি সঞ্চারিত রাখেন, আর বাহ্যে প্রস্তর ধারণ করে রাখেন। এই দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করে কৃতান্তিক আমাদেরকে এই শিক্ষা দেয় হে, সহজ ও সরলকে রক্ষা করার জন্য, অন্তরে প্রকাণ্ড তেজ ধারণ করে রাখতে হয়, এবং সকল দুষ্টের দমন করতে থাকতে হয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে বাহ্যে অত্যন্ত কঠিন থাকতে হয়।

আপনি কৃতান্তিক নন, সেই কারণে আপনার কাছে এই দর্শন অজ্ঞাত। আর সেই কারণে, আপনি আমাদেরকেও ভ্রান্তবিচার করেছেন। আর তার পরিণাম স্বরূপ, আমরা আপনার সম্মুখে আজ স্থিত। পূর্ণ প্রস্তর হয়ে, অন্তরে অগ্নি ধারণ করে, আজ আমরা আপনার সম্মুখে স্থিত, এবং আপনাকে সম্যক মল্লযুদ্ধে আবাহন করে, আপনার বিনাশ করে, সরলতাকে স্থাপন করতে উদ্যত। যদি সামর্থ্য থাকে, তাহলে মল্ল যুদ্ধে আমার ভ্রাতাকে পরাস্ত করে, আমাদের সমস্ত রাজ্যকে গ্রহণ করে সম্রাট হয়ে যান, আর না থাকলে সমর্পণ করুন আপনার রাজ্য”।

ক্ষিপ্ত ধনেশ গর্জন করে উঠলেন, “মল্ল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও তাল। আজ আমি সমস্ত প্রজার সম্মুখে, তোমার ছাতি চিড়ে, সকলকে দেখিয়ে দেব যে কেন এই ধনেশকে শ্রেষ্ঠ বলবান বলা হয়, আর অতঃপরে শর্ত মত আমিই হবে সম্রাট, এই জম্বুদেশের”।

সুর সেই কথাতে হাস্যপ্রদান করে বাহবা প্রদান করলে, তাল মল্লযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। সত্যই হয়তো উপবাস না করা থাকলে, তালের পক্ষে যুদ্ধে ধনেশের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকাও অসম্ভব হতো। কারণ কেবল বল নয়, কারণ হলো ধনেশের আক্রামনাত্মক প্রহার। তার প্রতি প্রহার ঘাতক হয়, অর্থাৎ রণক্ষেত্রে তাঁর মানসিকতা এক্কেবারে সুরের মতন। কারণ সুরের মানসিকতাও ঠিক অনুরূপ। সে যুদ্ধ করতে অপছন্দই করে, কিন্তু একবার যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলে, তাঁর প্রীতিটি প্রহার হয় ঘাতক, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত।

সুরের এই মানসিকতা সম্বন্ধে তাল পরিচিত। তাই ধনেশের এই স্বভাবকে সনাক্ত করে নিতে তাঁর অধিক দেরি হয়না। ধনেশ পরিশ্রান্ত, তিনদিবস ব্যাপী নির্জলা উপবাসে তিনি রত। তাই ঈষৎ দুর্বলও। সেই হেতু, প্রথম একটি প্রহর তাল কেবলই ধনেশের প্রহার থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রেখেই সময় কাটালেন। তালের মস্তক লক্ষ্য করে মুষ্ট্যাঘাত যখন বাতাসেই ক্ষান্ত হয়, তালের উদরকে লক্ষ্য করে পদাঘাত যখন শূন্যকেই প্রহার করে, তখন অধিক অধিক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ধনেশ। আর তাই পরের প্রহারে সে অধিক বল মুতায়ন করে, অধিক উর্জ্জা স্থাপন করে।

যখন সেই প্রহার সমূহও ব্যর্থ হতে শুরু করলো, আর এই ভাবে একটি সম্পূর্ণ প্রহর চলে গেল, তখন রাজা ধনেশ ক্লান্তির বশে দুই জানুতে কর স্থাপন করে, দেহকে মুদ্রিত করে, প্রকাণ্ড জোর শ্বাস গ্রহণ করতে থাকলেন, কিন্তু একজনের উর্জ্জা, বল, সমস্ত কিছু সম্পূর্ণ ভাবে সঞ্চিত তখনও, আর তিনি হলেন তাল। নিজের দেহকে শূন্যে উত্তলিত করে, সম্মুখে আগিয়ে নিয়ে গিয়ে, একটি পদাঘাত করলেন এবার তাল। যারা তাঁর এই বিশাল তনুকে এমন উড়ন্ত চাকির মত সম্মুখে এগিয়ে যেতে দেখলেন, তাঁদের সেই দৃশ্য দেখে মনে হলো যেন, প্রকাণ্ড তুফানের কারণে, একটি বিশালাকায় পাথর গতিমান হয়ে শূন্যে উরে গেল।

সেই পদাঘাত তাল করলেন ধনেশের উরুতে। ধনেশ তালের চরণ নিজের কর দ্বারা ধরেও ছিলেন, কিন্তু নিজের দেশের সীমিত উর্জা, আর তালের প্রবল গতি ও ভার, দুইকে তিনি কিছুতেই সাম্যতা প্রদান করতে পারলেন না। পরিণাম বশত, সেই পদাঘাতে, ধনেশের দেহ প্রায় ৬ হস্ত পিছনে ছিটকে পড়ে গেল। এই যুদ্ধ দর্শনকারী প্রজারা প্রবল আনন্দের সাথে করতালি দিতে থাকলেন এই দৃশ্য দেখে। এতাবৎ কাল পর্যন্ত, না তো কেউ ধনেশকে এমন শর্ত প্রদান করেছেন, আর না কেউ তাঁকে এমন প্রহার করেছেন।

ধনেশের উর্জ্জাক্ষয় হয়েছে, আর এই পদাঘাতে তাঁর আঘাতও বিস্তর লেগেছে। সেই কথা তাল জানেন। তাই, সে ক্ষণিকের জন্যও অপেক্ষা না করে, সরাসরি পুনরায় আঘাত করতে, তীব্র বেগে দৌড়ে গিয়ে, একটি সজোরে মুষ্ট্যাঘাত করলেন ধনেশের মুখে। সেই প্রহার অত্যন্ত প্রবল ছিল। এতটাই প্রবল ছিল তা যে, ধনেশের মুখ সেই প্রহারের ফলে বিকৃত হয়ে গেল, এবং স্থান স্থান থেকে লহু নির্গত হতে শুরু করলো। তাল ক্ষণিকের জন্যও নিজের আঘাত থেকে মুক্ত হবার সুযোগ দিলেন না ধনেশকে। মুহূর্তের মধ্যে নিজের তনুকে সুউচ্চে স্থাপিত করে, প্রবল লম্ফ প্রদান করে, নিজের চরণকে প্রকাণ্ড ভাবে স্থাপন করলেন ধনেশের ছাতিতে।

সেই প্রহারের ফলে, ধনেশের মুখ থেকে লহুবমন হতে শুরু করলে, ক্ষিপ্র তাল এবার ধনেশের চরণকে নিজের কর ও বাহুর মধ্যে আবিষ্ট করে, এক এক করে উনবিংশবার তাঁর দেহকে শূন্যে উত্তোলন করলেন, আর তাঁর মস্তককে ভূমিতে আছরে ফেললেন। এমন করার পর, শিথিল হয়ে গেল ধনেশের শরীর। আনন্দের হিল্লোল উঠলো প্রজার মধ্যে। তাল সুরের দিকে তাকাতে, সুর মাথা নেড়ে, নিজের মস্তককে সজোরে একটি দিকে ঘূর্ণন করে কি করনীয়, তার ইঙ্গিত দিলে, এবার তাল, ধনেশের প্রায় থেঁতলে যাওয়া মস্তককে নিজের দুই বিশাল করতলে ধারণ করে, প্রবল ভাবে ঘূর্ণন করলে, সকলে একটিই শব্দ শুনলেন, “আ!” কিন্তু সেই ধ্বনি ছিল ধনেশের প্রাণত্যাগের ধ্বনি, তাই এই একটি অক্ষরের শব্দ সকলকে বাধ্য করলেন কানে চাপা দিতে।

জম্বুদেশের আরো এক দানব দমিত হলো। এক এক করে, বৃহৎবৃক্ষ, অঙ্গিরস তথা ধনেশ, তিন দৈত্যের থেকে মুক্ত হয়ে উঠলো জম্বুদেশ। প্রজার মধ্যে আনন্দের সীমা নেই। শঙ্কর এবং অম্বরিশ জানেন, কুর্নিশ হবেন এই দেশের রাজা। পূর্ব থেকেই কুর্নিশ কৃতান্তিক অনুগামী। তাই তাঁদেরকে শীঘ্রই রাজ্য থেকে নিষ্কাসিত করবেন। তাই আশ্রয় গ্রহণ করার অভিসন্ধি নিয়ে, তাঁরা চলে গেলেন কাতা রাজ্যে এবং করিন্দ্রের কাছে সমস্ত কথার বিবরণ দিয়ে, তাঁর স্মরণ নিলেন।

অন্যদিকে কুর্নিশকে রাজসিংহাসনে উপনীত করে, তাঁকে রাজা নিষ্ঠাবানের কাছে নিবেদিত করে, একত্রে নদিয়াদ তথা মল্লার রাজ্য অধিগ্রহণ করে নিয়ে সুরতাল ফিরে এলেন নিজেদের রাজ্যে। তাঁদের আবির্ভাবের কিছু দিনের মধ্যেই, সেখানে উপস্থিত হলেন ভাগীরথীর অন্য উপকুল অর্থাৎ জগদ্ধাত্রী নদীর সমস্ত উপকুল কে জয় করে আসা রাজা বর্ধিষ্ণু, যার রাজধানী বর্ধমানে। তিনি মহারাজ ছন্দের সম্মুখে এসে, তাঁকে প্রণাম জানিয়ে যা বললেন, তাতে চন্দননগরে শুরু হলো এক নবসমাগম।

তিনি বললেন, “মহারাজ ছন্দ, আপনার রাজত্ব এবং আপনার প্রজাপালনের পটুতার বাখান শুনে শুনে, আমার একটি ধারণা জন্ম নিয়েছে, আর তা হলো এই যে কৃতান্তিক ধর্মের মাহাত্ম। স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা দ্বারা স্থপিত এই নবীনধর্ম সম্বন্ধে আপত্তিজনক কেবল একটিই কথা ছিল, আর তা ছিল এর নবীনতা। কিন্তু মহারাজ ধর্মের অর্থ ধারণ করা, সত্যকে ধারণ করা, হৃদয় দ্বারা ধারণ করা। তাই পুরাতন ধর্মের ধ্বজা ধরে থাকা আমি, এই রাজা বর্ধিষ্ণু এতাবৎকাল অজ্ঞানতা বশতই মুখ ফিরিয়ে ছিলাম এই মহান ধর্ম থেকে।

মহারাজ ধর্মের মহানতা তাঁর নবীনতা বা প্রবীণতাতে থাকেনা, থাকে তাঁর ধারণ শক্তিতে। থাকে তার ধারণপদ্ধতিতে। সত্যকে ধারণ করার জন্য, যাকে ধারণ করা হচ্ছে, তাকে সত্য হতে হয়। কেবল প্রাচীন বলে যাকে আঁকড়ে ধরে ছিলাম, তা তো সত্যকে ধারণ করার কথাই বলেনা, বলে এই মিথ্যা আত্মবোধকে আঁকড়ে ধরে থাকার কথা। মিথ্যা এই আত্মবোধ, সেই কারণেই তো তাঁকে ধারণ করার জন্য শুদ্ধতার নয়, পবিত্রতার নয়, আবশ্যকতা থাকে সহস্র নিয়মের, আচারের, শৃঙ্খলার, রীতির, রেওয়াজের।

যা সত্য, তাকে ধারণ করার জন্য কেবলই প্রয়োজন সামান্য বিচারের, বিবেকের আর সমর্পণের। সেখানে কনো প্রকার নিয়মের পরাধীনতার কাছে বশীকরণ আবশ্যকই নয়, কনো প্রকার রীতির কাছে মাথা নত করে শর্তাবলি ধারণ করার কনো আবশ্যকতাই থাকেনা। এই করবো, সেই করবো না, এই আহার করবো, সেই আহার করবো না, এই বস্ত্র ধারণ করবো, সেই বস্ত্র ধারণ করবো না, এই আচরণ করবো, সেই আচরণ করবো না, মহারাজ, এতো কেবলই পরাধীনতা, সঙ্কীর্ণতা!

পরাধীনতা মস্তিষ্ককে শোভা পায়, দেহকে শোভা পায়, কিন্তু ধর্মের ক্ষেত্রে তো সত্যকে হৃদয় ধারণ করে। এতশত পরাধীনতা হৃদয়কে যে শ্বাস গ্রহণ করতেও দেয়না, ধারণ কি করতে দেবে। … কিন্তু মহারাজ, এতাবৎ কাল আমি সেই সমস্ত কিছুর থেকে অজ্ঞ ছিলাম, কৃতান্তিক রাজ্য বা রাজার মানসিকতাকে প্রত্যক্ষ করতে পারিনি বলেই হয়তো। কিন্তু আজ একে প্রত্যক্ষ করেছি, আর তা করে দেখেছি যে, এখানে পরাধীনতা বলে কিচ্ছু নেই। কেবলই আছে স্বতন্ত্রতা।

না আছে এখানে চিন্তার পরাধীনতা, না ইচ্ছার আর না কল্পনার। কনো যোজনা করার নেই এখানে, প্রকৃতি যা সম্মুখে নিয়ে আসবে, তাই আহার, তাই বস্ত্র, তাই আচার, তাই অনুষ্ঠান। প্রকৃতির নির্দেশ শ্রবণের জন্য, দর্শনের জন্য কেবলই প্রয়োজন, পবিত্রতা। চরিত্রের পবিত্রতা, কামনার প্রতি অপ্রিয়তা, পুত্র থেকে পিতা, পতি থেকে দেওর, সকলকে সন্তানজ্ঞান করাই পবিত্রতা। জননী থেকে পত্নী, শ্যালিকা থেকে সঙ্গিনী, সকলকে জননী জ্ঞান করাই হলো পবিত্রতা। আর সেই পবিত্রতাই এই কৃতান্তিক ধর্মের মেরুদণ্ড।

তাই মহারাজ, সুন্দরের বন থেকে জগদ্ধাত্রী নদী বরাবর সমস্ত রাজ্যকে জয় করে এনে, তাঁর অধিরাজ হয়ে অবস্থান করা এই বর্ধিষ্ণু, নিজের সমস্ত রাজ্যের রাজধানী বর্ধমানে স্থাপিত করে, তা মহারাজ ছন্দের কাছে উৎসর্গ করতে এখানে উপস্থিত।

মহারাজ, খুব শীঘ্রই কুর্নিশ অর্থাৎ মল্লারের রাজা, তামরস অর্থাৎ নদিয়াদের রাজা, এবং রাজা নিষ্ঠাবান অর্থাৎ রাজশাহীর রাজা একত্রিত হয়ে, রাজা ছন্দকে সম্রাটের উপাধিতে ভূষিত করতে চলেছে। মালদ, মেদিনী এবং কাতা ব্যতীত সমস্ত রাজ্যের অধীশ্বর, রাজা ছন্দ এবার সম্রাট রূপে অধিষ্ঠান করবেন, আর আমরা সকলে আপনার অধীনে, কৃতান্তিক অধিরাজ হয়ে অবস্থান করে, আপনার নির্দেশ অনুসারে কৃতান্তিক ধর্মের অনুসারে রাজ্য চালনা করে জম্বুদেশকে সমৃদ্ধতার শীর্ষে নিয়ে যাবো।

মহারাজ, সকল রাজাগণ নিজের নিজের নজরানা সহ আগামী কোজাগরী পূর্ণিমাতে এখানে এসে উপস্থিত হবেন, এবং অতঃপরে মহাকৃতান্তিক উৎসব পালন করে, উৎসবের উপরান্তে, আপনাকে সম্রাট রূপে ভূষিত করবেন”।

এই সমাচার যেখানে বর্ধিষ্ণু প্রদান করছিলেন রাজা ছন্দের সম্মুখে, একই ভাবে সেই কথার বিবরণ প্রদান করছিলেন রাজা করিন্দ্রের সম্মুখে, বর্ধিষ্ণুর থেকে বিরক্ত, তাঁরই ভ্রাতা অর্ধেন্দু। তিনি করিন্দ্রের সম্মুখে এই সমস্ত কথা বলে বিরক্ত হয়ে বলছেন, “মহারাজ করিন্দ্র, সম্রাট হবার কথা ছিল আপনার, আর সম্রাট হচ্ছেন ছন্দ। প্রতিষ্ঠিত হবার ছিল আর্যদের বৈদিক ধর্মের, যা ছায়াপুরের উদ্দেশ্য ছিল। সেখানে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কৃতান্তিক ধর্ম”।

উগ্র করিন্দ্র গর্জন করে উঠলেন, “না, আর সহ্য করা যায় না! … দিন প্রতিদিন, চিত্তাপুত্ররা বিস্তার লাভ করেই চলেছে, আর আমরা বসে রয়েছি কেবল! … ছন্দ হয়ে উঠবে সম্রাট, আর করিন্দ্র দেবে তাঁকে নজরানা!… অসম্ভব। না এবার সময়ে হয়ে গেছে মামা, এর উত্তর দেবার সময় হয়ে গেছে। … যেই উপায়ে ধনেশকে পরাস্ত করেছে তারা, ঠিক একই উপায়ে আমরাও তাঁদের সমস্ত সাম্রাজ্য আত্মসাৎ করে নেব।

মিত্র ভণ্ড, আমি আর মামা, ওদের কাছে যাবো আর আমাদের রাজ্যকেও অর্পণ করার কথা বলবো, শর্ত রাখবো, তোমার আর সুরের মধ্যে দ্বৈরথ। যদি সুর যেতে, আমাদের রাজ্য তাঁদের হবে, আর যদি তুমি যেত, তবে তাঁদের রাজ্য হবে আমাদের। … মিত্র, তুমি সুরকে পরাজিত করতে পারবে তো? নিশ্চিত তো! … দেখো, এবার তোমার স্কন্ধে ভরসা করে, সম্পূর্ণ সম্পদকে দাও রাখছি”।

বীর্য সম্মুখে এসে বললেন, “তুমি পাগল হয়ে গেছ ভাগ্নে। দ্বৈরথে যাকে আবাহন করছো, সে অন্য কেউ নয়, সে ছন্দ নয়, সে সুর। বুঝতে পারছো, ব্যঘ্রের গুহায় গিয়ে ব্যঘ্রকে তুমি দ্বৈরথের জন্য আবাহন করছো!”

করিন্দ্র হেসে উঠে বললেন, “মামা, তোমার বয়স হয়েছে। বুদ্ধি পরে কাজে লাগে, ভয় আগে কাজে লেগে পরে। আমাকে আমার কাজ করতে দাও। নিশ্চিন্তে থাকো, চিত্তাজদের সমস্ত কিছু হরণ করবো আমি। এবার তো স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা সম্মুখে এসে গেলেও আমাকে আটকাতে পারবেনা। কারণ বল নয়, ছলে জয় করবো আমি সমস্ত কিছু। … বড় বলেছিল না ছন্দ, রাজা নিষ্ঠাবানকে, শত্রুকে জয় করার জন্য, প্রথমে গাঢাকা দিতে হয়।

গাঢাকা দিতে তো সে পেরেছে, কিন্তু গা ঢাকা দিয়ে কি করতে হয়, কি ভাবে করতে হয়, এবার আমি তাকে দেখাবো। নিশ্চিন্তে থাকো মামা, এবার সমস্ত কিছু আমাদের। সমস্ত জম্বুদেশ আমাদের হতে চলেছে। আর কনোভাবে একে কেউ বদালাতে পারবেনা, এই আমার প্রতিশ্রুতি”।

বীর্য বিরক্ত হয়ে বললেন, “ভাগ্নে, এক ভণ্ড কোথা থেকে এসে বলল, সে সুরকে পরাজিত করে দেবে, আর তুমিও তার কথাতে নাচতে শুরু করলে! … তার ভরসায় নাচতে শুরু করে দিলে, আর স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিলে যে, জম্বুদেশের সম্পূর্ণ সাম্রাজ্য তোমার হতে চলেছে!”

করিন্দ্র পিছন থেকে বীর্যের দুই স্কন্ধকে ধারণ করে বললেন, “মামা, তোমার এই ভাগ্নে এতোটা কাচা নয় যোজনা নির্মাণে। সত্যি বলছি দেখতে থাকো, আগে আগে কি কি হয়। কথা যখন দিয়েছি যে, সমস্ত জম্বুদেশ আমি হরণ করে নেব, তা আমি নেবই। কিন্তু পদ্ধতি কি হয়, দেখতে থাকো। শেষ পর্যন্ত ধৈর্য নিয়ে দেখলে, নিশ্চিত ভাবে তুমি তোমার ভাগ্নের জন্য গর্ববোধ করবে, এই ব্যাপারে কনো দ্বন্ধ নেই”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28