জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে রাজা নিষ্ঠাবান কি করবেন বুঝে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু এমতসময়ে, কি যেন হয়ে গেল সেই স্থানে, তা রাজা নিষ্ঠাবান প্রথমে না বুঝতে পারলেও, অতঃপরে বুঝতে পারলেন, কিন্তু করিন্দ্র বা তাঁর ভ্রাতারা সম্পূর্ণ ভাবে হতবম্ব হয়ে গেলেন।

কোথা থেকে এক ঝাঁক শর এসে, প্রথমে করিন্দ্র ও তাঁর ভ্রাতাদের এবং দেবী শ্রী ও দেবী লীনার মধ্যে বাঁধা সঞ্চার করলো! সেই শরের উৎস সন্ধান করার পূর্বেই, আরো বেশ কিছু ঝাঁক শর এসে, করিন্দ্রদের চারিপাশ দিয়ে ঘিরে দিলে, হতবম্ব করাভ নিজের মুশল দ্বারা সেই শরের দেওয়াল ভাঙার প্রয়াস করতে গেলে, আরো এক শক্তিশালী বাণ, করিন্দ্ররা যেই ভূমিতে দাঁড়িয়েছিলেন, তাকেই উপরে দেয়। এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় বাণ সেই উপড়ানো ভূমিকে উল্টে দিলে, সকলের সকল অস্ত্র তাঁদের হাত থেকে স্খলিত ও পতিত হয়।

পুনরায় একটি বাণ এসে, উল্টে গিয়ে যেই ভূমিতে তাঁরা স্থাপিত ছিলেন, সেই ভূমিকেও উৎপাটিত করে, এবং এই ভাবে, সম্পূর্ণ ভাবে ভূমি দ্বারা উপর ও নিচ বেষ্টিত ও শর দ্বারা চারিপাশ বেষ্টিত একটি খাঁচার মধ্যে করিন্দ্র, করাভ তথা মনকরিদের আবদ্ধ করে দেয়। করিন্দ্র দ্বন্ধে পতিত হয় যে এমন কৃত্য তো কেবল ও কেবলমাত্র সুর করতে সক্ষম। সে তো আর জীবিত নেই। তাহলে এই কর্ম কে করলো!

এমন বিচার যে নিষ্ঠাবানের অন্তরেও চলছিলনা, তেমন নয়। কিন্তু সেই কালেই আরো একটি বিপরীত দিকে থেকে বাণ নিক্ষিপ্ত হলে, তা সেই শরের দেওয়ালকে পূর্ণ ভাবে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই দেখে আরো অধিক চমকিত হলেন সকলে। ক্রমে সেই পুরুষ সম্মুখে এসে আত্মপরিচয় প্রদান করে বললেন, “আমি, ধরাত্ম পুত্র, ভণ্ড। যখন দেবী ধরা করাগারে আবদ্ধ ছিলেন, তাঁকে তাঁর অনুমতি বিনাই সঙ্গমে আবদ্ধ করেছিলেন আমার পিতা, আত্ম, আর তার থেকে আমি জন্ম নিয়েছিলাম”।

করিন্দ্র তথা সকলে এই নূতন তথ্যে চমৎকৃত হলে, সেই পুরুষ, ভণ্ড বলেন, “পূর্বে আমার সামর্থ্য ছিল, মানসের তথা সকলের অন্তরে প্রবেশ করে, তাঁদের সমস্ত আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করার। পিতা আত্মের নির্দেশে আমি তাই মানসের মধ্যে, ধরার মধ্যে, এবং অনেকের মধ্যে নিজের বিস্তার করে করে, দেবী সর্বাম্বাকে তাঁর মাতা, অর্থাৎ দেবী মেধার হত্যাকারী রূপে সজ্জিত করেছিলাম। মহারণের কালে, মাতা সর্বাম্বা আমার সেই শক্তি হনন করে নেন, কিন্তু প্রাণে মারেন না, কারণ আমি যা কিছু করেছিলাম, তা কেবল পিতার নির্দেশের পালন ছিল।

আমার এই বিশেষ শক্তি আমার থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য, আমি মাতা সর্বাম্বার কাছে ন্যায়বিচার চাইলে, তিনি আমাকে একটি অভেদ্য কবচ দেন, আর ধনুর্বিদ্যা প্রদান করেন, আর বলেন যে, যদি এই কবচকে কেউ আঘাত করে ভেদ করতে সক্ষম হয়, জানবে তোমার কেবল তাঁর থেকেই মৃত্যুভয় আছে, অন্য কারুর থেকে তোমার মৃত্যুভয় নেই”।

করিন্দ্রের উদ্দেশ্যে বললেন, “সম্রাট করিন্দ্র, আমি জানি তুমি সুর এবং তালকে নিয়ে চিন্তা করো সর্বক্ষণ। তালের সাথে বলে তুমি পেরে না উঠলেও, নিজেকে শ্রেষ্ঠ গধাধর তপনশাস্ত্রীর কাছে নিয়জিত করে, এমন গদাবিদ্যা ধারণ করেছ যে, তোমার হাতে গদা বর্তমান থাকলে, তোমাকে পরাজিত করা কনো গদাধরের পক্ষেই সম্ভব নয়, এমনকি তালও তোমাকে দমন করতে পারবেনা, যতক্ষণ তোমার কাছে গদা বর্তমান থাকবে।

কিন্তু, সুরের সাথে যুদ্ধেরত হবার যোগ্য তোমার একটি ভ্রাতাও নেই। তাই তো আমি, ভণ্ড এসেছি তোমাকে এই যুদ্ধে সঙ্গ দেব বলে। সুরের সম্মুখীন হবার সামর্থ্য তোমাদের কারুর নেই, কিন্তু আমার আছে। আমি শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর, আর আমাকে পরাজিত করার সামর্থ্য সুরেরও নেই”।

করিন্দ্র হাস্যপ্রদান করে বললেন, “কিন্তু সুরই বা আর কোথায়, তালই বা এখন কোথায়? তাঁরা নিশ্চয়ই পরবর্তী দেহধারণ করেছেন, নয়তো অনুরূপ করার চিন্তা করছেন “।

ভণ্ড হাস্য প্রদান করে বললেন, “বৃথা এমন চিন্তা করো সম্রাট। বিচার করে দেখো, যেই কারাগারে তোমাদের বন্দী করা হয়েছিল, তা নির্মাণ করার সামর্থ্য সুর ব্যতীত আর কারুর কি আছে? সাগরদ্বীপে আমার বসবাস। তাই আমি সেদিন যা কিছু হয়েছিল, তা সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

ঘূর্ণাবর্ত এমনি এমনি প্রভাতের মধ্যে কেটে যায়নি। তা কেটে গেছিল, আমার বাণের প্রভাবে। আর তার পূর্বের রাত্রে, ফুলেস্বরির দুই কন্যা, পদ্মিনী ও নলিনী, বৃহৎব্যঘ্রকে তাল হত্যা করার পর, বিবাহ করেন ছন্দকে এবং তালকে। অতঃপরে, তাঁরা অনুমান করে নেয় পরবর্তীদিনে ঘৃতকুমারীদের যোজনাকে, অর্থাৎ ঘূর্ণাবর্তকে। আর তা অনুমান করে নেওয়া মাত্রই, সুরের পরামর্শেই সম্ভবত, দেবী নলিনী ও পদ্মিনী, যারা জাদুবিদ্যায় পারদর্শী, তাঁরা দেবী চিত্তা ও তাঁর পুত্রদের, এবং দেবী ফুলেস্বরি ও তাঁর কন্যাদের সমস্ত দেহগুণ বিশিষ্ট প্রতিমূর্তি নির্মাণ করেন।

রাতারাতি মৃত্তিকাদ্বারা সেই নির্মাণ করে, তাঁরা রাত্রে যখন সমস্ত সেনা নিদ্রা গেছিল, তখনই তীব্রগতির নৌকা নিয়ে, সেই সমস্ত মায়াবী মূর্তিদের জলে ভাসমান করে রেখে, জম্বুদ্বীপ থেকে পলায়ন করেন। তোমরা সেই মৃত্তিকা নির্মিত মূর্তিদেরকেই মনে করেছিলে যে চিত্তাপুত্র, ফুলেস্বরি কন্যা আর তাঁদের মাতারা। আর আনন্দে আত্মহারা হচ্ছিলে এই ভেবে যে চিত্তাপুত্রদের হত্যা হয়ে গেছে।

প্রকৃত অর্থে তাঁরা জীবিত, আর তাঁদেরকে তোমরা চেনও। সম্রাট, যেই পুরুষ তোমাদের শূন্যপুরে প্রবেশ করা থেকে সঙ্গীত দ্বারা অবরোধ সৃষ্টি করেছিল, সেই যুবক অন্য কেউ নন, স্বয়ং সুর। গুপ্তচর যখন রাজা করিমুণ্ডকে তোমাদের শূন্যপুর অধিকার করার যোজনা ব্যক্ত করছিলেন, দেবী চিত্তা তখনই জানেন সেই কথা, কারণ মহারাজ করিমুণ্ড স্বয়ং গুপ্তচর দ্বারা সেই সমাচার প্রেরণ করেন দেবী চিত্তার কাছে। আর তাই তিনি তাঁর যথাযোগ্য পুত্র, সুরকে নির্দেশ দেন, শূন্যপুরে গিয়ে, সেই দেশকে আক্রমণকারীদের থেকে সুরক্ষিত করতে, অথচ নিজের পরিচয় গোপন রাখতে। তাই সঙ্গীতকে ব্যবহার করে, চিত্তাপুত্র সুর এক অভাবনীয় কর্ম সম্পাদন করেছিল”।

করিন্দ্র ভ্রুকুঞ্চিত করে, জিজ্ঞাসু নেত্রে প্রশ্ন করলেন, “দেবী চিত্তাকে গোপনে সংবাদ প্রেরণ করতেন মহারাজ করিমুণ্ড, এর অর্থ তো তিনি জানতেন যে, দেবী চিত্তা ও তাঁর পুত্ররা জীবিত!”

ভণ্ড বললেন, “আমি স্পষ্ট দেখেছি ও নিজের কানে শুনেছি চিত্তাপুত্রদের সংলাপ। যেই একটি সেনা তাঁদের জম্বুদ্বীপ থেকে কুলে এনেছিলেন, তাঁর হাতেই একটি পত্র দিয়ে, ছন্দ বলেছিলেন, “মহারাজ করিমুণ্ডের ছায়াসঙ্গী, আমাত্য সুধামাকে, এই পত্র প্রদান করে বলবে, মহারাজ যেন আমাদের চিন্তা না করেন”।

অর্থাৎ মহারাজ বেশ ভালো করেই জানতেন, দেবী চিত্তার সত্য, আর চিত্তাপুত্রদের সত্য। তাঁর বেদনা ছিল কেবলই এক নাট্য। … আর শুধু মহারাজ করিমুণ্ডই নন, রাজা নিষ্ঠাবানও জানেন তাঁদের জীবিত থাকার সত্য। তিনি জানেন যে, সুরধ্বজ অন্যকেউ নন, স্বয়ং সুরচিৎ, অর্থাৎ চিত্তাপুত্র, যাকে তিনি জামাতা রূপে পেতে আগ্রহী ছিলেন। তাই তো তাঁর কন্যা সুরধ্বজকে বিবাহ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলে, তিনি একটিবারও বাঁধা প্রদান করেন নি।

তিনি তো এও জানতেন যে, তাঁর কন্যার অঙ্গরক্ষক অর্থাৎ খালি, স্বয়ং তাল, এবং তাঁর পত্নী দেবী লীনা হলেন নলিনী। দেবী ফুলেস্বরি কিছুদিনের মধ্যেই প্রাণ হারান, আর তারপর আত্মগোপন করে থাকার জন্য, তিন চিত্তাপুত্র তিন দিকে ছড়িয়ে যান। এই রাজশাহীতে উপস্থিত হন তাল ও তাঁর পত্নী দেবী নলিনী, সুর তাঁর মাতা দেবী চিত্তাকে সঙ্গে নিয়ে মহারাজ করিমুণ্ডের নিকটেই নিবাস করলেন, আর দেবী পদ্মিনী বরাবরই বনবিবি নামে পরিচিত ছিলেন।

তিনি ও তাঁর স্বামী সুন্দরের বনে বিরাজ করে, বনবিবি হয়ে দক্ষিণদেশকে রক্ষণ করছিলেন। মহারাজ ভৃগুসেন সেখানে গেছিলেন, নিজের অধিকারে সমস্ত রাজ্যকে স্থাপিত করতে। বনবিবি তাঁকে গুরুতর আহত করে, সেখান থেকে অপসারিত করে। আর এই বনবিবির কীর্তি যে, দেবী পদ্মিনী ও ছন্দেরই কীর্তি, তাও জানেন রাজা নিষ্ঠাবান ও করিমুণ্ড”।

করিন্দ্র ক্রুদ্ধ আস্ফালন করে বললেন, “অর্থাৎ সবাই সমস্ত কিছু জানেন, জানিনা কেবল আমরা! … কিন্তু তুমি আমাদের সাহায্যে এসেছ কেন?”

ভণ্ড হেসে বললেন, “সম্রাট, দেবী সর্বাম্বা আমার পিতা আমার মাতা সমস্ত কিছু কেড়ে নিয়েছেন, এমনকি আমার মায়াবী শক্তিও আমার থেকে হরণ করে নিয়েছেন। … তাঁর সম্মুখীন হবার সামর্থ্য আমার ছিলনা, তাই এতকাল সাগরদ্বীপে আত্মগোপন করেছিলাম। কিন্তু এখন তিনি দেহত্যাগ করেছেন। তাই আমি সম্মুখে এসেছি, চিত্তাপুত্ররা হলেন সর্বাম্বার বিস্তার। তাঁর কনো বিস্তারকে আমি জীবিত থাকতে দেবনা। … তোমরা সকল ভ্রাতারা, বীর্য ও ভৃগুসেন মিলে সমস্ত তাল ও ছন্দকে আটকাতে পারবে। ঘৃতকুমারী ও তাঁর কন্যারা মিলে পদ্মিনী ও নলিনীর মায়াকে পরাস্ত করতে পারবে, কিন্তু সুরকে আটকানোর সামর্থ্য তোমাদের কারুর নেই। তাই আমি সম্মুখে এসেছি”।

করিন্দ্র হেসে বললেন, “মিত্র তুমি আমার। আজ থেকে তুমি আমার মিত্র হয়েই থাকবে। তাই সম্রাট নই আমি তোমার কাছে। তোমার কাছে আমি মিত্র। … তা মিত্র, এই সর্বশ্রী আমার মধ্যে কামনার সঞ্চার করেছে। একে হরণ করাতে আমার সহায়তা করো”।

ভণ্ড মাথা নেড়ে বললেন, “মিত্র, বাস্তবসম্মত হয়ে চিন্তা করো। এখানে না আছেন ঘৃতকুমারীরা আর না তাঁর কন্যারা। দেবী পদ্মিনী ও দেবী নলিনীর মায়ার উত্তর দেবার সামর্থ্য আমাদের নেই। আর একবার মায়াতে তাঁরা আমাদের বন্দী করে দিলে, যদি এখানে ঘৃতকুমারীরা বা তাঁদের কন্যারা না আসেন, তাহলে আমাদের মুক্ত হওয়াও সম্ভব হবেনা। কারণ মায়ার বন্ধনকে মায়া দ্বারাই ভেদ করতে হয়, দেহবল বা অস্ত্রবলে তা ভেদ করা সম্ভব নয়। তাই মিত্র, একগুঁয়েমি ছেড়ে, এখান থেকে আমাদের চলে যাওয়াই সঠিক হবে। সর্বশ্রীকে আমি ঠিকই তোমার কাছে এনে দেব, এককালে। তাই চিন্তা করো না”।

এমন কথা শুনে, করিন্দ্র সহমত হয়ে, সেখান থেকে বিদায় নিলে, রাজা নিষ্ঠাবান এবার চিত্তাপুত্রদের একত্রে লাভ করে, আনন্দের সাথে সুরের বিবাহ সর্বশ্রীর সাথে দেবার জন্য উদগ্রীব হলে, ছন্দ তাঁর উদ্দেশ্যে কিছু গভীর কথা বললেন, তবে তা ছিল মহারাজ নিষ্ঠাবানের এক প্রশ্নের উত্তর।

মহারাজ নিষ্ঠাবান সকল চিত্তাপুত্রদের একত্রিত রূপে দেখে, প্রশ্ন করলেন জ্যেষ্ঠ চিত্তপুত্র, ছন্দকে, “এই আত্মগোপনের কি কারণ ছিল পুত্র! … এই আত্মগোপন না করলেও তো হতো! … যারা ষড়যন্ত্র করেছিল, তাদেরকে সাফল্যের অনুভূতি প্রদান করে কি লাভ হলো?”

ছন্দ হাস্য ও সম্মান প্রদান করে বললেন, “মহারাজ, আমাদের অন্তরে কনো বিশেষ অসুস্থতা হলে, সেই অসুস্থতা যতক্ষণ অন্তরে লুক্কায়িত হয়ে থাকে, ততক্ষণ তার থেকে সম্পূর্ণ নিরাময় আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়না। তাই রাজবৈদ্য প্রথমে ওষধি প্রদান করে প্রথম সেই সমস্ত জীবাণুকে আমাদের থেকে মুক্ত করে। অতঃপরে, আমাদেরকে সেই জীবাণুর থেকে মুক্ত করে। … রাজনীতিও ঠিক তেমনই। বীর্য তথা করিপুত্ররা ও তাঁদের জননীরা বরাবরই আমাদের উপস্থিতিকে অপছন্দ করতেন।

তাই স্পষ্টই বুঝতে পারা যায় যে, আমাদের উপস্থিতির কারণে, তাঁরা নিজেদের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশিত করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। বা তাঁদের মধ্যেও এমন কেউ আছেন, যিনি আত্মপ্রপকাশ করতে পারছেন না। তাই যার উপস্থিতি অপছন্দের, তাকে বেশ কিছুদিন লুক্কায়িত হয়ে থাকতে হয়। তবেই রাক্ষস মায়াবী পোশাক ত্যাগ করে, নখদন্ত বিকশিত করেন। আমরাও অনুরূপ করেছিলাম। তবে মহারাজ, এই সমস্ত কিছুর প্রেরণা প্রদান করেছিল আমাদেরকে আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুর।

হতে পারে, তার কাছে রাজনৈতিক জ্ঞান তেমন নেই, অর্থাৎ যেই জ্ঞান আছে, তাকে রাজনীতি-জ্ঞানের আখ্যা দিলে অপমান করা হবে, কারণ তা কেবল রাজনৈতিক জ্ঞান নয়, তা জীবনের জ্ঞান। তবে সেই জীবনের জ্ঞান তাঁর কাছে আছে, তা মুগ্ধকর। তাঁর জ্যেষ্ঠ হয়ে তাঁর সান্নিধ্য লাভ করে আমি তাই অত্যন্ত ধন্য মনে করি নিজেকে”।

নিষ্ঠাবান প্রশ্ন করলেন, “আর করিমুণ্ডকে সংবাদ প্রেরণ করার উদ্দেশ্য!”

ছন্দ হেসে বললেন, “এই প্রস্তাব আমাদের মাতার, দেবী চিত্তার। তিনিই বলেছিলেন যে, মহারাজ করিমুণ্ড তাঁকে মাতাসম দৃষ্টিতে দেখেন, আর আমরাও জানি যে আমাদেরকে তিনি নিজসন্তানের থেকেও অধিক স্নেহ করেন। তাই মাতা বলেছিলেন যে, মহারাজ করিমুণ্ড আমাদের মৃত্যুর সংবাদ লাভ করে, ভয়ঙ্কর ভাবে ভেঙে পরবেন, কারণ এক আমরাই তাঁর নিকটের মানুষজন, তাঁর আত্মীয়। সেই কারণে, তাঁকে এই পত্র প্রদান করেছিলাম আমরা। … কিন্তু মহারাজ, আমাদের সত্য আপনার তো জানার কথা ছিলনা।

অর্থাৎ আমার বক্তব্য এই যে, আমরা জানি যে আপনি মহারাজ করিমুণ্ডকে এখানে ডেকে এনে, তাঁর সাথে বিশেষ আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু মহারাজ করিমুণ্ড যেইকালে আমাদের মৃত্যুর সত্য কারুকে বলেননি, সেকালে তিনি আপনাকে এই সত্য কেন বললেন?”

মহারাজ নিষ্ঠাবান হেসে বললেন, “মাতা সর্বাম্বা এসেছিলেন, আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সমস্ত সত্য করিমুণ্ড জানেন, তাই তার থেকে তাঁরই দেও পত্র প্রদর্শন করে, সমস্ত সত্য জেনে নিতে। সেই পত্রের কারণেই মহারাজ করিমুণ্ড আমাকে সমস্ত কথার বিবরণ প্রদান করেন। … কিন্তু আমার এখনো বেশ কিছু সংশয় আছে পুত্র। যদি তোমরা আত্মগোপনই করে ছিলে, তাহলে আজ সেই উন্মোচন থেকে মুক্ত হলে কেন? নাকি, আমার কন্যা শ্রী বিপদে পরেছে বলে, তাঁকে রক্ষা করার জন্যই এই উন্মোচন?”

ছন্দ হেসে উত্তরে বললেন, “না মহারাজ, এই ৮ বৎসরের সময়ে, সুর একটিবারের জন্যও তাঁর ধনুশ ধারণ করেনি। কিন্তু আজ সে তা ধারণ করেছিল, কারণ আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, এবার আমাদের প্রকৃত সত্য বলে দেওয়া উচিত। যদিও এই কথাও সুরই আমাকে বলে। সে বলে যে, বিবাহের ন্যায় পবিত্র কর্ম কখনো মিথ্যার ভরসায় করা যেতে পারেনা। সে বলে যে, দেবী শ্রী স্বয়ং নিজের ইচ্ছায় সুরধ্বজকে বিবাহ করতে চেয়েছেন। তাই তাঁর সম্মুখে বিবাহের জন্য আমাদের ভ্রাতাকে উপস্থিত হতেই হবে।

অর্থাৎ যদি সে না বলে যে সে প্রকৃত অর্থে  চিত্তাপুত্র সুরচিৎ, তাহলে দেবী শ্রীর সাথে ছলনা করা হতো। তাই সে আমাকে বলে যে, মাতার নির্দেশ এসে গেছে এবার যে আমাদের আত্মপ্রকাশ করতেই হবে। সেই কারণেই তো মাতা দেবী শ্রীর মাধ্যমে আমাদেরকে আবাহন করলেন নিজেদের আত্মগোপনীয়তাকে উন্মোচিত করতে, আর সম্যক সত্য সকলের সম্মুখে স্থাপিত করতে। তাই মহারাজ, আমরা অস্ত্রে সজ্জিত হয়েই আসছিলাম আপনার সকাশে। কিন্তু তারই মধ্যে দেবী শ্রীর এই বিপদ দেখে, সুর নিজের ধনুর্বিদ্যার প্রদর্শন করতে বাধ্য হয়। হয়তো মাতারই এমন লীলা, সত্যকে সম্মুখে সহজ ভাবেই স্থাপন করার জন্য”।

মহারাজ নিষ্ঠাবান এবার কিছুটা বিমর্ষ হয়েই বললেন, “মাতা সর্বাম্বা কি এই সত্য জানতেন না! যদি জানেন, তাহলে তিনি দেহত্যাগ কেন করলেন?”

ছন্দ এই কথার কি উত্তর দেবেন বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকলে, সুর এবার সম্মুখে এসে, দেবী শ্রীর নেত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রথম কথা মাতার অজ্ঞাত কিছুই নেই। দ্বিতীয়ত, মাতা যদি অজ্ঞাতই থাকতেন, তাহলে আপনাকে কেন বলবেন তিনি যে মহারাজ করিমুণ্ডের থেকে সমস্ত সত্য জেনে নেবার কথা! … তৃতীয়তো, তিনি কোথাও যাননি। … যেমন ভ্রাতা বললেন, কারুর প্রকৃত রূপকে সামনে আনার জন্য, আত্মগোপন করতে হয়, মাতাও ঠিক তেমনই কিছু করেছেন। অন্তত কিছু নেত্রজোরা আমাকে এই কথাই ব্যক্ত করছে”।

মহারাজ নিষ্ঠাবান বেশ বুঝে গেলেন যে, সুর মাতার সত্য অর্থাৎ শ্রীর সত্য জেনে ফেলেছে, আর স্বয়ং মাতার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত সেই সত্যকে লুকিয়ে রাখার জন্য, এমন অদ্ভুত ভাবে কথাটি বললেন। সেই কথা বুঝে, শান্ত হাস্য হেসে নিষ্ঠাবান প্রশ্ন করলেন, “তাহলে সম্মুখে কি এলো হে চিত্তাপুত্ররা?”

সুর হেসে বললেন, “ধরাত্মপুত্র, মহাশক্তিধর ভণ্ড। মহারাজ, করিন্দ্র ও বীর্য এবার নতুন ভাবে শক্তিধর হলো। করিন্দ্র তালের সাথে বলে পারেনা, তাই গদাযুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিল। ছলা ও মায়াবিদ্যায় শ্রেষ্ঠত্ব লাভের ইচ্ছাতে তাঁরা ঘৃতকুমারীদের সাথে আত্মীয়তা স্থাপন করেন। কিন্তু সেখানেও মাতা সর্বাম্বা আমাদের সাথে দেবী পদ্মিনী ও নলিনীকে যুক্ত করে দেন। তাই কনো ভাবেই তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাতে পারছিলনা। এরপরে আমার ধনুর্বাণ বিদ্যা তাদেরকে সকল সময়েই ভাবাচ্ছিল। এই ভণ্ডের উদয় হতে, তাই তাঁরা জ্ঞান করছেন যে, তাঁদের পক্ষ অদম্য হয়ে গেল এবার”।

খালি এবার তালের বেশে এসে মহারাজ নিষ্ঠাবানকে প্রণাম করে বললেন, “সর্বদাই এঁরা একটা যুদ্ধের সমীকরণ প্রস্তুত রাখতে চায়। সেটাকি যুদ্ধের প্রস্তুতি, নাকি এই বার্তা প্রদান করা যে, যুদ্ধ করতে এলে, আমরাও ছেড়ে কথা বলবো না, তা ঠিক বুঝে পাইনা মহারাজ। হয়তো রাজনৈতিক বুদ্ধিতে পারদর্শী আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, এর সঠিক উত্তর দিতে পারবেন”।

ছন্দ বললেন, “সম্ভবত, ওরা আমাদের প্রতিদ্বন্ধি ভাবে, আর তাই সর্বক্ষণ বোঝাতে চায় যে, আমাদের থেকে ওরা অধিক বলশালী। কিন্তু আমরা তো ওদের প্রতিদ্বন্ধি নই! সেটা ওরা বুঝতে পারেনা”।

সুর গম্ভীর হয়ে বললেন, “বোঝার প্রয়োজন ওদের নয়, আমাদের ভ্রাতা। ওরা সর্বক্ষণ নিজেদের শক্তিবৃদ্ধির চিন্তা করে করে, নিজেদের শক্তিশালী করে। কিন্তু আমরা তো শক্তিশালী হতে চাইনা। তারপরেও মাতা কেন আমাদের মধ্যে ভ্রাতা তালকে এতটা বলশালী করলেন! কেন আমাকে ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী করলেন! কেন ঘৃতকুমারীদের বিপরীতে দেবী পদ্মিনী ও নলিনীকে প্রদান করলেন আমাদের! … কেন ভণ্ডের বিপরীতে তিনি নিজেকে আমাদের সাথে যুক্ত করলেন!

ভ্রাতা, আমরা তো প্রতিদ্বন্ধিতা করছিনা, তারপরেও আমাদেরকে মাতা সর্বাম্বা করিন্দ্রদের যথার্থ প্রতিদ্বন্ধি রূপে স্থাপিত করে থাকছেন। কেন? উত্তর আছে আপনার কাছে এর?”

ছন্দ খানিক চুপ করে থেকে বললেন, “ভ্রাতা, ওরা আমাদের ভ্রাতা হয়। মহারাজ করিমুণ্ডের পুত্র তাঁরা! … কেন তোমরা আমাকে বারংবার তাঁদেরকে শত্রু মানতে বলো?”

তাল বারংবার এই বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও পারেন না। তাই রাগে দুঃখে মাথা নত করে থাকলে, দেবী পদ্মিনী বললেন, “নাথ, কনো সম্বন্ধই এক তরফা হয়না। যদি ভ্রাতা হবার কথা বলেন, তাহলে উভয় তরফ থেকেই এই ভ্রাতৃত্বভাব থাকা আবশ্যক। … তাঁরা আপনাদের ভ্রাতা তো মানেন না, তা তো সর্বজন স্বীকৃত সত্য। ভ্রাতা কখনো ভ্রাতাকে প্রাণে হত্যা করতে চায়! … ঈর্ষা থাকতে পারে, সেই ঈর্ষার কারণে ভ্রাতার থেকে  সে নিজেকে শ্রেয় দেখাবার প্রয়াস করতে পারে। কিন্তু হত্যা!”

সুর এগিয়ে এসে বললেন, “শত্রুতা করার কথা আমিও বলবো না ভ্রাতা, কারণ একটিই, আর তা হলো মহারাজ করিমুণ্ড। তাঁদের কিছু হলে, তিনি তো আহত হবেনই, এই কথাতে কনো দ্বন্ধ নেই। তাই শত্রুতা করার কথা আমি এক্ষণে বলবোই না, যতই তাঁরা প্রমাণ করে দিক আমাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করে যে, তাঁরা আমাদেরকে শত্রু ব্যতীত কিছুই মনে করেনা।

আর সত্য বলতে, তাদেরকে আমরা প্রতিদ্বন্ধি বলে গণ্য করিনা। আমার কাছে প্রতিদ্বন্ধি কেবল মাত্র আমি স্বয়ং। আজকে আমার মাতার প্রতি নিষ্ঠা যদি গতকালের থেকে হ্রাস পায়, আমি পরাজিত। আর যদি তা অধিক শুদ্ধ হয়, তবে আমি বিজেতা। আর এই প্রতিদ্বন্ধিতার মধ্যে অন্য কেউই আসেন না। অন্য কনো নিষ্ঠাবানও নন। কারণ আমার যিনি মা, তিনি তো একই সাথে তাঁর সমস্ত সন্তানকে সমান প্রেম করতে সক্ষম। তাহলে সেই নিষ্ঠাবান আমার প্রতিদ্বন্ধি হন কি করে!

তাই শত্রুও নয়, প্রতিদ্বন্ধিও নয়; ভ্রাতা বা মিত্র যে তারা নয় তা তো তাদের নিজেদেরই দাবি। তাই এই শত্রু, মিত্র, ভ্রাতা, আত্মীয়, অনাত্মীয়, প্রতিদ্বন্ধি এই সমস্ত কথাই আমার কাছে ভিত্তিহীন এঁদের ক্ষেত্রে। কিন্তু আমি বেশ কয়েকটা বিষয় জানি। প্রথম এই যে মাতা সর্বাম্বা মানবজাতিকে রক্ষা করার অন্তিম প্রয়াসরূপে কৃতান্তিক ধর্মের সূচনা করেছেন এই জম্বুদেশে। অর্থাৎ মানবজাতিকে যদি কেউ বাঁচাতে পারে অবলুপ্ত হওয়া থেকে, তা হলো এই জম্বুদেশের মানুষ।

আর দ্বিতীয় কথা এই যে, যাকে তুমি ভ্রাতা বা আত্মীয় বলে সম্বোধন করছো ভ্রাতা, তারা এই জম্বুদেশকে ছায়াপুর করে তুলতে ব্যস্ত, অর্থাৎ এখানকার মানুষদের সেই অবস্থায় নিয়ে যেতে চান এঁরা, যেই অবস্থায় পৌঁছে গেলে মানবযোনির নাশ এবার অবশ্যম্ভাবী। অর্থাৎ সরাসরি বলতে গেলে, এঁরা স্বয়ং ব্রহ্মময়ীর বিরোধ করছে। আর যে বা যারা আমার মাতার বিরোধ করবে, সে স্বতঃই আমাকে শত্রু করে লাভ করবে।

যদি ভ্রাতা ভ্রাতা করে, জাগতিক সম্বন্ধকে প্রাধান্য প্রদান করে, তুমিও ওদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাতার বিরোধ করো, তা প্রত্যক্ষ ভাবেই হোক আর পরোক্ষ ভাবেই হোক, সেক্ষেত্রে কেবল করিপুত্র নয়, ভণ্ড নয়, স্বয়ং তুমিও আমাকে শত্রু রূপেই পাবে। যুদ্ধের পরিণাম কি হবে, তা মাতা নির্ধারণ করবেন, কিন্তু এই দেহে অন্তিম রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত আমি যুদ্ধ করে যাবো, আমার মাতাকে স্থাপনের উদ্দেশ্যে”।

সুরের কথাতে একপ্রকার ভিম্রি খেয়ে গেল ছন্দ। সুরের তেজ অপ্রতিম, আর শুধু তাই নয়, তা মাতার সাথে যুক্ত, তাই অপারও। তাই থতমত খেয়েগিয়ে বললেন, “কিন্তু একটি দিক দিয়ে তো তাঁরা আমাদের থেকে এগিয়েই, তাই না! … রাজ্য অধিকার করে, তারা এখন সম্রাট”।

নিষ্ঠাবান উত্তরে বললেন, “না না, এই ব্যাপারে, আমারও মতামত এমনই ছিল, কিন্তু রাজা করিমুণ্ড আমাকে বিশেষভাবে মার্গদর্শন প্রদান করে গেছেন এই ক্ষেত্রে। … তিনি স্পষ্ট বলে গেছেন, বর্ধমান, ভাগীরথীতটের বেশ কিছু পরগনা, এই রাজশাহী, আর দক্ষিণ, এই বিস্তীর্ণ স্থান অবস্থান করছে, যা জম্বুদেশের মধ্যে থেকেও, শাসিত নয়। তাদেরকে শাসনের অধীনে নিয়ে আসলেই, যারা সম্রাট হয়ে অবস্থান করছে, তাদের সাম্রাজ্যতে আর সম্রাট থাকবেনা, থাকবে রাজা”।

ছন্দ বিরোধ করে বললেন, “কিন্তু মহারাজ, যেই ক্ষণে আমরা সেই রাজ্যগুলিকে অধিকারে আনবো, পুনরায় আমাদের উপর ঈর্ষা করা হবে, আর পুনরায় কনো ষড়যন্ত্রের রচনা করা হবে। কি প্রয়োজন এই সমস্ত ষড়যন্ত্রের!”

তাল সংশোধন করে বললেন, “কিন্তু ভ্রাতা, ব্রহ্মময়ী মাতার কাজ কি তাহলে কিছুই না! … তাঁর কাজের কি কনো মাহাত্ম নেই আপনার কাছে! … তাঁর পরাধীনতামুক্ত কৃতান্তিক ধর্মস্থাপন কি তবে নেহাতই ছেলেখেলা আপনার কাছে!”

সুর হেসে বললেন, “আসলে ভ্রাতা তাল, এমন কখনই নয় যে চার যুগ চার আলাদা আলাদা সময়কাল। হ্যাঁ প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ড সময়ে সময়ে সত্যযুগে, ত্রেতাযুগে, দ্বাপর যুগে বা কলিযুগে নিবাস করেন। কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডের অর্থ একটি মানুষ বা যেকোনো যোনির জীবনকাল। অর্থাৎ তোমার ব্রহ্মাণ্ড আলাদা ভ্রাতা, আর আমার আলাদা। আর তাই আমি একটি যুগে নিবাস করতে পারি, আর তুমি অন্য যুগে। আর তেমন করেই চারজন চার যুগে নিবাস করতে পারেন, একই সঙ্গে একই কালে বর্তমান থেকে। আসলে যুগ হলো মনের অবস্থান।

কারুর মন সত্যযুগে অবস্থান করে। তখন সে প্রতিটি কর্মই করেন ব্রহ্মময়ী মাতার, প্রকৃতির, কালের মার্গদর্শন অনুসারে। তাঁকে আলাদা করে মাতার অনুমতি গ্রহণ করতে হয়না কনো কালে। সে তো সমস্ত কর্মই মাতার নির্দেশ অনুসারে করে, তাই তাঁকে আর আলাদা করে মাতার অনুমতি গ্রহণ করতে হবেই বা কেন?

অন্যকারুর মন ত্রেতাযুগে বিরাজ করে। তখন সে সাধারণত নিজের অহং, নিজের আত্মকে ধারণ করেই সমস্ত কর্ম করে। কিন্তু তেমন করতে করতে, এমন কিছু বিশাল কর্মযোগ্যে অবতীর্ণ হবার আহ্বান এসে যায় তার কাছে যে, তার তখন মনে হয় যে, মাতার আশীর্বাদ ছাড়া সেই কর্ম সে করতেই পারবেনা। তখন সে প্রকৃতির স্মরণে আসার প্রয়াস করে। ত্রেতার মানসিকতাকে নিজের কাব্যগুণ দ্বারা প্রদর্শন করেছিলেন মহাবতার বাল্মীকি। সেখানে রামচন্দ্র দ্বারা ত্রেতার মানসিকতাকে স্পষ্ট করে দেখিয়েছিলেন।

আরেকজনের মন দ্বাপরে বিরাজ করে। সে সর্বক্ষণ আত্মনির্ভর। সকল ক্ষেত্রে সে আত্মের নির্ধারণ,  নির্বাচন, মার্গদর্শনেই চলেন। কিন্তু বিশাল কর্মযোগ্য সম্মুখে এসে গেলে, প্রকৃতির আরাধনা তো করেন, কিন্তু অনুমতি নেবার প্রয়োজনও মনে করেন না। মহাকবি, মহাবতার ব্যাসদেব নিজের কৃষ্ণ ও অর্জুন চরিত্র অঙ্কন দ্বারা দেখিয়েছিলেন। সেখানেও তিনি দেখিয়েছিলেন, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে, কৃষ্ণার্জুন মহামায়ার আরাধনা তো করলেন, কিন্তু তাঁর দর্শন বা তাঁর আশীর্বাদের অপেক্ষাও করলেন না।

আমাদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কলিযুগে বিরাজ করার মানসিকতা। তাই তো তিনি সর্বদা নিজের আত্মের কথাই শুনে চলেন। মাতা কি বললেন, কি করলেন, কি করে গেলেন, কি মার্গ নির্মাণ করলেন, তাতে তাঁর কি! তাঁর তো কেবল নিজের আবেগ, নিজের আত্মের কথাই শ্রবণ করার”।

ছন্দ এই তির্যক অপমানকর কথাতে অত্যন্ত অপমানিত বোধ করলে, সুর পুনরায় বললেন, “মহারাজ নিষ্ঠাবান, মহারাজ করিমুণ্ড যেই কথা বলেছেন, সেই পথেই আমি চলবো। যুবরাজ ছন্দ আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, আমার পিতাসমান। তাই রাজ্যজয় করে এনে তাঁর চরণেই সঁপবো। তারপর তিনি যা করেন করবেন”।

তালও সুরের সাথে গলা মিলিয়ে বললেন, “আমিও সহমত সুরের সাথে। সুরের ন্যায় আমি তো সত্যযুগে নিবাস করিনা, তবে অন্তত দ্বাপরে বিরাজ করি। না, সুরের মতন প্রতিটি কর্মে মাতার মার্গদর্শন অনুভব করে করে আমি তো চলিনা। তাই অবশ্যই তাঁর মত আমি সত্যযুগে অবস্থান করিনা। আর নিজের থেকে মাতার থেকে নির্দেশ লাভ করারও প্রয়াস করিনা মহারাজ নিষ্ঠাবানের মত। সুর যখন এই চারজুগের বিবরণ দিচ্ছিল, তখন ত্রেতার বিবরণ শ্রবণ করার কালে আমার মধ্যে কেবল মহারাজ নিষ্ঠাবানের কথাই স্মরণ আসছিল।

আমি দ্বাপরেই অবস্থান করি, কারণ মাতার স্মরণ করে সমস্ত কাজ তো করি, কিন্তু না তাঁর মার্গদর্শন অনুভব করি আর না তাঁর অনুমতি গ্রহণ করি। তাও সুরের ছায়ারূপে আমি অবস্থান করি বলেই বোধ হয় দ্বাপরে অবস্থান করতে সক্ষম হই, নাহলে কলিতেই অবস্থান করতাম”।

ছন্দ মাথা নত করে বললেন, “সঠিক বলেছ ছন্দ। আমাকেও সুরের ছায়ারূপ থাকতে হবে। নাহলে সুর সঠিকই বলেছে। এক সময়ে কলির গ্রাস হয়ে যাবো আমি। … মানুষ নিজেই নিজেকে আবেগ আর আত্মতে বশীভূত করে রেখে নিজেকে কলিযুগে স্থাপিত করে রাখে, আর বলতে থাকে যে, যুগটাই কলি, তো কলির মতই তো হবো! … আর এই করে করে, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড মিলে সম্পূর্ণ দেশকালকেই কলিযুগ করে দেয়।

না না, সঠিক বলেছে সুর। এবার আমাকে বদলাতে হবে। এবার আমাকে আত্মের নয়, আবেগের নয়, প্রকৃতির ছত্রছায়াতে অবস্থান করতে হবে। আর তা আমার নিজের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু ব্রহ্মময়ী মাতার অশেষ কৃপা যে, আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা, সুর সম্মুখে রয়েছে, যে সম্যক ভাবে সত্যযুগে নিবাস করে। অর্থাৎ তাঁকে অনুসরণ করে করেই আমাকে কলি থেকে উন্নত হতে হবে।

মহারাজ নিষ্ঠাবান, আমরা দুই জ্যেষ্ঠভ্রাতা দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের অতিপ্রিয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুরচিৎ-এর বিবাহ দিতে চাই, আপনার কন্যা, দেবী সর্বশ্রীর সাথে। অতঃপরে আমি আমার ভ্রাতাদের দুই দিশাতে প্রেরণ করে, সেই স্থানের রাজার আসনে উপবিষ্ট হবো। মাতার আদেশ এতাবৎ এতটাই লব্ধ হয়েছে। তাই প্রথম এতটা অতিক্রম করা যাক। অতঃপরে মাতার নিশ্চয় পরবর্তী কর্মের নির্দেশ আসবে। যেমন আসবে, তা স্বয়ং অনুভব করি, বা সুরের মাধ্যমে অনুভব করি, তেমনই করবো, এই আজ আমি প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করলাম।

তবে এক কলির কবলে থাকা ব্যক্তির প্রতিজ্ঞাতেও দৃঢ়তা থাকেনা। আত্মীয় ও পরিবারের সহযোগিতা না পেলে, তার পক্ষে এই পরিবিরতন অসাধ্য হয়ে যায়। আপনারা এখানে উপস্থিত সকলে আমার আত্মীয়। তাই ঐকান্তিক অনুরোধ রইল সকলের কাছে যে, আমাকে এই পরিবর্তনের জন্য সহযোগিতা করুন। কলিতে বিরাজ করছি, তাই নিজের স্বার্থই প্রথম দেখতে পাই। তাই স্বার্থের কথাই বলছি। নিজের স্বার্থে আমাকে এই পরিবর্তনে সহযোগিতা করুন। আমাকে আপনারা সকলে উপেন্দ্র পদ প্রদান করছেন, অর্থাৎ আমি যেই পথে চালিত হবো, যেই কর্ম করবো, আপনারা সকলেই সেই কর্মের অধিকারী হবেন আর সেই একই কর্মফলের। তাই যদি আমি কলি থেকে উন্নত হই, তাহলে আপনারাও উন্নীত হবেন। তাই নিজের স্বার্থ চিন্তা করেই আমাকে কলি থেকে উন্নীত হবার প্রতিজ্ঞাতে উত্তীর্ণ হবার সহযোগ প্রদান করুন”।

মহারাজ নিষ্ঠাবান হাস্যপ্রদান করে বললেন, “বিবাহের জন্য রাজপুরে প্রবেশের আজ্ঞা হোক চিত্তাপুত্ররা। … যেদিন আমি প্রথমবার সুরকে দেখেছিলাম, তাঁর স্পর্শলাভ করেছিলাম, সেদিন থেকে তাঁকে পুত্র করে না পেলেও জামাতা করে পাবার বাসনা জন্মেছিল। কিন্তু আমার না ছিল স্ত্রী, আর না ছিল কন্যা। কিন্তু আমার সেই বাসনাকে মাতা এই ভাবে পূর্ণ করবেন, আমি তা ভাবতেও পারিনি। আজ সুর আমার জামাতা হতে চলেছে। আমি আনন্দিত নই, আপ্লুত। এসো হে তালছন্দ, তোমাদের ভ্রাতাকে, আমার কন্যার বরের কর্তা হয়ে, বরকে নিয়ে মণ্ডপে এসো”।

বধূ বেশে স্থিতা দেবী সর্বশ্রীকে আশীর্বাদ করতে প্রথমে উপনীত হলেন, সুরের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছন্দ। কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে, মৃদুহাস্যে ছন্দ বললেন, “মাতা সর্বাম্বার দর্শনলাভের সৌভাগ্য আমার হয়নি দেবী। তবে তাত, করিমুণ্ডের থেকে শুনেছি, তাঁকে নাকি প্রায় আমার মাতা, দেবী চিত্তার ন্যায় দেখতে, আর তাঁর সম্মুখে দাঁড়ালে, আমাদের মাতা, দেবী চিত্তাকে নাকি অতিসামান্য লাগে, কারণ মাতা সর্বাম্বার রূপ-দিব্যতা এমনই সর্বব্যাপী যে, তাঁর সম্মুখে আমার মাতার অপরিসীম রূপকেও যেন সীমিত মনে হয়।

দেবী, তোমার মুখের আভাও ঠিক তেমনই। আজ আমি ২৪ বৎসরের যুবক। তাই আমার জননীও আজ প্রাপ্ত বয়স্কা। তবে আমি যখন সদ্যজন্মা ছিলাম, তখনও তাঁর মুখআভা আমার স্মরণ আছে। দেবী, তোমাকে তাঁর থেকেও অধিক সুন্দরী দেখাচ্ছে। না কেবল রূপের জন্য নয়, যেন এই রূপের অন্তরায়ে লুক্কায়িত রয়েছে অসীম মেধা আর অনন্ত দিব্যতা। কি তার রহস্য তা তো আমার জানা নেই, তবে যদি তা রহস্যই হয়, তবে সেই রহস্যের কারণেই তোমার রূপের আভা অত্যন্ত দিব্য, আমার মাতার থেকেও দিব্য। যেন মনে হচ্ছে, মাতা সর্বাম্বা দেহত্যাগ করলেও, প্রাণ ত্যাগ করেন নি। তোমার বেশে তিনি প্রাণ ধরে রেখে দিয়েছেন, কৃতান্তিক স্থাপনের উদ্দেশ্যে।

মাতাকে কি আশীর্বাদ দেওয়া যায়, তা আমার জানা নেই দেবী। শুধু এটুকুই বলবো, আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা আমার কাছে অত্যন্ত বিশেষ। তাঁর দ্বিতীয় জননী তুমি, বা তাঁর ভাসায় বলতে গেলে, তুমি তাঁর তৃতীয় জননী। তাই তোমার পুত্রকে যত্নে রেখো, সে নিজের যত্ন করতে জানেনা। একদমই জানেনা। তাঁর খেয়াল রেখো”।

আশীর্বাদী সুরে দেবী পদ্মিনী বললেন, “কেন যেন মনে হচ্ছে, তুমি চিত্তাকুলকে ইতিহাসের পাতায় নায়ক করে রাখার জন্যই তাঁদের সাথে যুক্ত হয়েছ। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পত্নী বলে জ্যেষ্ঠা জ্ঞান করে দূরে থেকো না। হয়তো আমার আপনজ্ঞান করানোর মন্ত্র জানা নেই। তাই নিজগুণেই আমাকে আপন করে নিও”।

চিত্তাল আশীর্বাদের আসনে বসে, বেশি কিছু কথা বললেন না। কেবল বললেন, “আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারিনা। তবে এটুকু বলবো, আমার ভ্রাতা সুরকে আমি চোখে হারাই। তাঁকে ছেড়ে থাকতে বড় কষ্ট হয় আমার। অসহায় মনে হয়। সে অবশ্যই তোমার স্বামী, তাই তোমার অধিকার তার উপর সব থেকে বেশি। তবে আমাদেরকেও তার একটু ভাগ দিও, সবটা নিয়ে নিও না”।

অন্তে দেবী নলিনী আশীর্বাদের আসনে বসলে, তাঁর নেত্রে অশ্রু। তিনি বললেন, “কন্যা জ্ঞানেই তোমাকে ছোটো থেকে বড় হতে দেখেছি। কন্যা বিনা কিচ্ছু ভাবতে পারছিনা আমি। তবে দিদি যেমন বললেন, আমারও তেমন মনে হচ্ছে যে, ইতিহাসের পাতায় চিত্তাকুলকে স্বর্ণজ্বল করে তোলার জন্যই তোমার আমাদের কুলে আগমন। তাই তোমাকে বলছি শ্রী, নারী প্রায়শই কুলকে স্বর্ণমণ্ডিত করে রাখতে, নিজেকে তার মধ্যে সুপ্ত করে দেয়। এমনটা করো না শ্রী। যদি এই কুল স্বর্ণমণ্ডিত হয়, তবে সেই কনকের খনি হয়ে যেন তুমিই থেকো। তোমার নামটা যেন ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে না যায়, এটা দেখো”।

সুর এবার বললেন, “জানি কন্যাজ্ঞান করেন। হয়তো সেই কারণে কন্যার প্রতি আসক্ত আপনি বৌদি। তাই হয়তো, তাঁকে এমন স্বার্থচিন্তা করার প্রেরণা প্রদান করছেন। বৌদি, স্বার্থচিন্তা করা ব্যক্তি যদি ইতিহাসের পাতাতে নিজের নাম কখনো তোলেও, তাও সেই নাম কিছু বৎসরের মধ্যেই পুনরায় তলিয়ে যায়। তাই আমি দেবী শ্রীকে অনুরোধ করবে, তিনি যেন সম্পূর্ণ নিস্বার্থপর হয়েই বিরাজ করেন। যদি তাঁর কারণে চিত্তাকুল ইতিহাসের পাতায় উন্নীত হয়, তবে সেটা আমার কর্তব্য হবে যে, তাঁকে যেন সেই ইতিহাস স্বর্ণের খনি বলেই চেনে। কিন্তু নিজের প্রয়াসে নিজেকে খ্যাতনামা করা, সে যে কলিযুগিয় মানসিকতা বৌদি।

ক্ষমা করো বৌদি, তোমার মুখের উপর এমন ভাবে কথা বলার জন্য। তুমি আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। জানি তুমি অত্যন্ত স্নেহশিলা, আর সৎগুণ সমাহিতা। তাই এও জানি যে, তুমি আমার এই অনৈতিক স্থানে বচনের কারণে আহত হবেনা। তবে আমার কথা এই যে, যদি তোমার কন্যাসমা শ্রীকে কনো উপদেশই দাও, তাহলে তাঁকে এই উপদেশ দাও যাতে সে সর্বক্ষণ নিস্বার্থপর হয়ে থাকে। তাঁর সেই নিস্বার্থপরতাই তাঁকে ইতিহাসে স্বর্ণের খনি করে তুলবে”।

দেবী নলিনী হাস্য বেশে শ্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখলে তো শ্রী, তোমার জ্যেষ্ঠরা, তাঁদের স্ত্রীরা যে সমানে দাবি করলো, তাঁদের দেওর ও ভ্রাতা, সুর কতটা বিশেষ, তা নিজের চোখেই দেখে নিলে। সে এমনই। স্বার্থপরকে মার্গদর্শন করতে হয়না, কারণ সে নিজেই নিজের মার্গদর্শন করতে থাকে। কর্মের মার্গদর্শন তিনি গ্রহণ করেন না, আর খ্যাতির মার্গদর্শন তাঁর প্রয়োজন পড়েনা। আর নিস্বার্থপর কর্মের মার্গদর্শন স্বয়ং দেখতে থাকে, কিন্তু খ্যাতির মার্গদর্শন তাঁকে দেখিয়ে কনো লাভ নেই, কারণ সে তার বিপরীত দিশাতেই যাবে। তাই পুত্রী, তোমাকে এই দায়িত্ব নিতে হবে আজ যে, সুরের খ্যাতির চিন্তা তুমি স্বয়ং করবে”।

এরপর নিষ্ঠাবান আশীর্বাদের আসনে উপবেশন করে বললেন, “পুত্রী, জম্বুদেশে অশুভ বাদল ছেয়ে রয়েছে। আমি জানি তুমি বিশেষ, আর তোমার সামর্থ্যও আছে, এই দেশকে সেই অশুভ বাদল থেকে মুক্ত করার। সত্য বলতে তোমার কাছে শ্রেষ্ঠ অস্ত্র রূপে, শ্রেষ্ঠ মেধাবী পুরুষ, অর্থাৎ তোমার স্বামী, সুরচিৎ বর্তমান। আর তুমিও জানো যে, তাঁর পদাঙ্ক তাঁর জ্যেষ্ঠরাও অনুসরণ করেন। অর্থাৎ তোমার কাছে তিন তিনটি মোক্ষম অস্ত্র সামিল আছে, যাদের মাধ্যমে তোমাকে এই জম্বুদেশের থেকে অশুভ বাদলকে অপসারিত করতে হবে”।

দেবী শ্রী প্রথমবার নিজের ওষ্ঠ ফাঁক করে বললেন, “পিতা, পত্নী শিষ্যা হন, আর পতি গুরু। যদি পতির গুরু হবার সামর্থ্য না থাকে, তাহলেই এর বিপরীত ভূমিকা গ্রহণ করতে হয় পত্নীকে। আর যদি পতি গুরু হবার যোগ্য হবার পরেও স্ত্রী তাঁর শিষ্যা না হয়ে গুরু হবার প্রয়াস করে, তা এক নারীর জন্যে, সমস্ত স্ত্রীজাতির জন্য কলঙ্ক ব্যতীত কিচ্ছু নয়। আমার স্বামী, চিত্তাপুত্র সুর যে এক শ্রেষ্ঠগুরু, আমি তাঁর মার্গদর্শন অনুসারে চলে, সম্যক জম্বুদেশকে দেখাবো, আমি এই অঙ্গিকার করলাম”।

এরপর কৃতান্তিক ধর্মানুসারে সর্বশ্রী ও সুরচিতের বিবাহ সম্পন্ন হবার কালে, প্রতিটি কুণ্ডলিনী চক্রের জন্য পতি পত্নীকে, এবং পত্নী পতিকে একটি করে প্রতিশ্রুতি প্রদান করলে, একে অপরকে মাল্যদান দ্বারা বরণ করে, একে অপরকে সিন্দূর প্রদান করে, বিবাহ সম্পন্ন করলে, নবদম্পতি সকল বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করে করে, আশীর্বাদ অর্জন করলেন।

অতঃপরে, মহারাজ নিষ্ঠাবান সম্মুখে এসে বললেন, “আমি আমার জামাতা, চিত্তাপুত্র সুরচিৎকে আমার রাজ্যের সিংহাসন প্রদান করতে আগ্রহী। যদি সুর, সেই প্রস্তাবে রাজি ঠেকেন তাহলে …”।

সুর বাঁধা প্রদান করে বললেন, “না মহারাজ, আপনি এখনো যথাযথ যোগ্য এবং যথোচিত সামর্থ্যবাণ এই সিংহাসনে উপনীত থাকার জন্য। তাই কৃপা করে এই সিংহাসন ত্যাগ করবেন না। এখানের প্রজা আপনাকে মান্য করেন, ভরসা করেন, এবং বিশ্বাস করেন। তাই আপনিই এই সিংহাসনে আঢ়ুর থাকবেন, আর আমি চিত্তাপুত্র সুরচিৎ মাতা চিত্তার নামে অঙ্গিকার করে শপথ গ্রহণ করছি যে, আমরা তিন চিত্তাপুত্র মিলিত ভাবে এই রাজ্যের সুরক্ষার দায় গ্রহণ করলাম।

যখন যখন এই রাজ্যের উপর শত্রুর কালিমাময় বাদল ঘনীভূত হবে, তখন তখন তাঁরা তাঁদের সম্মুখে চিত্তাকুলকে পাবেন। সেটি দেবী নীলিমাকে সারথিবেশে ধারণ করা মহাবলশালী চিত্তালই হোক, মার্গদর্শক দেবী সর্বশ্রীকে সারথি বেশে ধারণ করে চিত্তাপুত্র সুরচিৎই হোক, বা বনবিবি স্বরূপা দেবী পদ্মিনীকে সারথি বেশে ধারণ করে মহারাজ ছন্দচিৎই হোক”।

ছন্দচিৎ সম্মুখে এসে বললেন, “মহারাজ নিষ্ঠাবান, আপনি আমাদের আত্মীয় তথা বন্ধু রাজ্য হয়েই থাকবেন। আর আমাদের আদেশ দিন এক্ষণে, আমাদের মহারাজ করিমুণ্ডের কাছে যাত্রা করার। সেখানে স্বয়ং মহারাজ আমাদের অপেক্ষা করছেন, আমাদের জননী মাতা চিত্তা আমাদের পথ দেখায় প্রহর গুনছেন, আর আমাদের কুলদেবী মাতা জগদ্ধাত্রীও নিশ্চয়ই তাঁর প্রিয়পুত্র সুরকে সস্ত্রীক দেখার আনন্দে বুক বেধেছেন।

আর মহারাজ, আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি। নব্যবিবাহিত সুর তাঁর বৈবাহিক জীবনে সামান্য স্থিতিশীল হয়ে গেলে, মহারাজ করিমুণ্ডের কথানুসারে, এবং আপনার আবেদন অনুসারে, জম্বুদেশের অজিত রাজ্যসমূহকে নিজেদের অধিকারে এনে, সেখানে সুশাসন স্থাপন করবো”।

মহারাজ নিষ্ঠাবান সমস্ত চিত্তাপুত্র ও পুত্রবধূদের আশীর্বাদ প্রদান করে, চক্ষুবারি দ্বারা নিজের কন্যা, দেবী সর্বশ্রীকে বিদায় প্রদান করলে, সস্ত্রীক চিত্তাপুত্রগণ চন্দননগরে, যেখানে তাঁদের আত্মীয়স্বজনরা তাঁদের অপেক্ষা করছিলেন, সেখানে প্রস্থান করলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28