১১.২। শ্রীজন্ম পর্ব
নিষ্ঠাবান নিজের সংশয় দূর করার জন্য, সুধামার সাথে যোগাযোগ করে, মহারাজ করিমুণ্ডকে বিহারের নামকরে একান্তে আসতে অনুরোধ করলে, মহারাজ করিমুণ্ড এসে বহুতর কথাবার্তা বললেন রাজা নিষ্ঠাবানের সাথে, যেখানে নিষ্ঠাবান বীর্যের জম্বুদেশের সম্রাট রূপে করিন্দ্রকে স্থাপনের যোজনার কথা বললে, করিমুণ্ড বললেন, বীর্যের সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে, কারণ জম্বুদেশের যেই মানচিত্র বীর্যের কাছে আছে, জম্বুদেশ তার থেকে বহুতর বৃহৎ।
বিস্তারে জানতে চাইলে, করিমুণ্ড জানান যে, মালদরাজ্য, মেদিনীরাজ্য, কাতা, চন্দনরাজ্য, এবং মাতা সর্বাম্বা দেহত্যাগ করাতে পরিত্যক্ত মুর্শিদরাজ্য ছাড়াও, এমন প্রদেশ রয়েছে, যেখানে কনো নৃপতিই নেই, যেমন বর্ধমান চত্বর, কাতার সম্মুখে ভাগীরথীর বিপরীত কুল, যাকে হোর পরগনা বলা হয়, এবং তার পিছনের স্থান, যাকে শ্রীক্ষেত্র বলা হয়।
উত্তরে নিষ্ঠাবান বলেন, সেই স্থানগুলিকে কেন অধিকার করা হচ্ছেনা! করিমুণ্ড হেসে উত্তর দেন, এখন যেকেউ সেই স্থান অধিকার করে নিলেই, বীর্য তার থেকে সেই স্থানগুলিকে ছিনিয়ে নেবে। তাই এমন কেউ যদি উপস্থিত হয়, যার থেকে বীর্য সেই স্থানগুলি ছিনিয়ে নিতে পারবেনা, তাঁকেই এই স্থানগুলিকে অধিকার করার জন্য মার্গদর্শন করা উচিত। আরো বলেন তিনি যে, এই স্থানগুলি অত্যন্ত উর্বর, এবং এখানের মানুষও অত্যন্ত প্রতিভাশালী তথা হৃদয়বাণ। তাই, এক হৃদয়বান ও সামর্থ্যবাণ শাসক হবার যোগ্য যিনি, তাঁকেই এই স্থানগুলির ব্যাপারে বলা উচিত।
রাজনৈতিক চালের কথা বলে করিমুণ্ড বলেন, “মহারাজ নিষ্ঠাবান, বিচার করে দেখুন, যাকে জম্বুদেশ জ্ঞান করে উপস্থাপন করবে বীর্য, যদি তার রাজ্যের থেকেও বিশাল হয় আরেকজনের রাজ্য, আর সেই দ্বিতীয়জনের রাজ্যের অবস্থান এমন হয় যে, বীর্যকে নিজের রাজ্যের এক পরগনা থেকে অন্য পরগনা যেতে হলে, তাঁর থেকে অনুমতি নিয়ে চলতে হয়, তাহলে কি আর বীর্য নিজে বা কারুকে সম্রাট করে তুলতে পারবে!”
করিমুণ্ডের এমন কথা শ্রবণ করে, নিষ্ঠাবানের তাঁর উপর ভরসা জাগলেও, আরো একবার পরীক্ষণ করে নেবার জন্য তিনি বললেন, “কিন্তু আমি যতদূর বুঝেছি, আপনার পুত্র, করিন্দ্রকেই সেই সম্রাট করার কথা ভাবছেন বীর্য”।
করিমুণ্ড হেসে বললেন, “আমার বৌদি, দেবী চিত্তা, যার থেকেই আমি যেই যৎসামান্য রাজনীতি জানি, সেই অনুসারে তিনি বলতেন, অযোগ্য রাজা যদি নিজের পুত্রও হয়, তবুও তাঁর বিরোধিতা করা আবশ্যক, কারণ এক রাজার পুত্র কেবল রাজপুত্র হননা, সমস্ত প্রজাও হন। তাই এক পুত্র যদি অন্য সমূহ পুত্রের শোষণকর্তা হন, তার থেকে পুত্রহারা হয়ে থাকা ঢের ভালো”।
নিষ্ঠাবান এবার নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, করিমুণ্ড উপযুক্ত ব্যক্তি, আর তাই তাঁর সম্মুখে মাতা সর্বাম্বার কথন ও পত্রের কথা উত্তোলন করে মাতা মাতা সর্বাম্বার পত্র দেখালে, করিমুণ্ড রাজনীতির কিছু গোপন কথার বিবরণ দিলেন নিষ্ঠাবানকে, যা তিনি দেবী চিত্তার থেকে জেনেছেন, আর তিনি ব্যতীত আর কেউ জানেন না, কারণ মাতা সর্বাম্বা আর দেহে বিরাজ করছেন না।
এই মাতা সর্বাম্বার দেহত্যাগও এক মহাসংবাদ হয় বীর্য ও তাঁর ভগিনীদের কাছে। মহারাজ বিহারে গেছেন, আর তাঁর বিশ্বাসের পাত্র, সুধামাও রাজ্যে নেই। তাই মাতা সর্বাম্বার দেহত্যাগের একপ্রকার বিশাল উৎসব পালন করলেন, সকলের নেপথ্যে। সেই উৎসবে ছিল অফুরন্ত সুরা, আর ছিল দেবী হুতা, মিতা, স্ফীতা তথা তাঁদের পুত্ররা। গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলেন এই উৎসবের, যেখানে কেবলই সুরার ফোয়ারা উঠেছিল, কারণ বীর্য চাননা যে, এই বিষয়ে তাঁদের মনোভাব রাজা ভৃগুসেন, ঘৃতকুমারীরা বা দেবী শৃঙ্খলাও জানেন।
মাতা সর্বাম্বার দেহত্যাগের অপেক্ষাই তাঁরা করছিলেন, কারণ তাঁর দেহত্যাগ হওয়া মাত্রই, এবার করিন্দ্রকে সম্রাট করে স্থাপন করা কেবলই সময়ের অপেক্ষা।
তবে যতই গোপনীয়তা বজায় রাখুক বীর্য, রাজপুরের দাসীদের থেকে করিমুণ্ড এই উৎসব ও উৎসবের কারণ দুইই জানেন। আর তা জেনে তাঁর অন্তরে এক ধিক্কারের জন্ম নেয় যে কাদের দ্বারা তিনি ঘেরা থাকেন সর্বদা।
অন্যদিকে, নিষ্ঠাবান চিন্তিত হয়ে পরেন, মাতা সর্বাম্বার কথিত কথা নিয়ে। তিনি স্বয়ং তাঁর কাছে সন্তান হয়ে আসবেন, এই কথা জেনে, এতটাই আনন্দিত হয়ে গেছিলেন যে, কি ভাবে সেই সন্তান লাভ হবে, সেই ব্যাপারে তিনি প্রশ্নই করেন নি মাতাকে। কিন্তু তিনি তো অবিবাহিত! তাহলে সেই সন্তানের জন্ম কি ভাবে হবে!
রাজকার্যে তাঁর মন নেই। সর্বক্ষণ এই একই প্রশ্ন তাঁর মস্তকে ঘূর্ণন করতে থাকলে, নিজেকে বড় অসহায় লাগে তাঁর। এমনই সময়ে, তাঁর কাছে বার্তা আসে যে, উত্তরের জঙ্গলে তন্ত্রসিদ্ধ উগ্রশাস্ত্রী সহ তাঁর কিছু শিষ্য তপস্যার অগ্নি প্রজ্বলিত করেছিল, সেই থেকে বনে অগ্নি লেগে গেছে। আর তাতে উগ্রশাস্ত্রী সহ সকলে আটকা পড়ে গেছেন।
সেই শুনে, প্রজাদের কিছু নির্দেশ দিয়ে, মহারাজ নিষ্ঠাবান পরিকিমরি করে সেই স্থানের উদ্দেশ্যে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন, এক প্রকাণ্ড বলশালী পুরুষ ও তাঁর বেশবলশালী পত্নী আপ্রাণ প্রয়াস করছেন, সকল তন্ত্রসাধকদের উদ্ধার করার, আর সেই মহাবলশালী পুরুষ স্বয়ং নিজের স্কন্ধে উগ্রশাস্ত্রীর দেহকে স্থাপন করে, অগ্নির মধ্য থেকে নির্গত হচ্ছেন।
সেই দেখে, মহারাজ উগ্রশাস্ত্রীকে যত্ন করার জন্য সেদিকে কিছু সেবিকাদের নিয়ে গমন করলে, সেই বলশালী স্ত্রীর কণ্ঠস্বর শুনতে পান, যিনি বলতে থাকলেন, “স্বামী, এখানে এক দিব্য কন্যা রয়েছেন, অগ্নি বড় বিশাল, মনে হচ্ছে এই কন্যা প্রাণ হারিয়েছে! একে নিয়ে আমি অগ্নি থেকে নির্গত হতে পাচ্ছিনা”।
নিষ্ঠাবান বুঝলেন যে, এই স্ত্রী এই বলবান পুরুষের পত্নী। আর তাঁর কণ্ঠস্বর বলবান পুরুষ পর্যন্ত পৌঁছচ্ছেনা, কারণ সে উগ্রশাস্ত্রীর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে ব্যস্ত। … তাই মহারাজ নিষ্ঠাবান কনো কিছু না ভেবে, অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করে, সেই স্ত্রীকে আর সেই বালিকাকে নির্গত করে আনলেন অগ্নির থেকে। সেই স্ত্রী ক্রন্দনের সুরে বললেন, “মহারাজ, এই ফুলের মত দেখতে কিশোরী কি মূর্ছা গেছে নাকি তাঁর প্রাণ শরীর থেকে চলে গেছে?”
মহারাজ নিষ্ঠাবান সেই কন্যার মুখের দিকে তাকালেন। এক নজর দেখে তিনি ছিটকে উঠলেন, কারণ তাঁর যেন মনে হলো সেই কন্যা এক দ্বাদশ বৎসরের সামান্য কন্যা নয়, সাখ্যাত মাতা সর্বাম্বা। কন্যার অঙ্গবর্ণ শুভ্র গোলাপি, ঠিক মাতা সর্বাম্বার ন্যায়, মুখশ্রী অত্যন্ত দিব্য, দেহগঠন অত্যন্ত তহ্নি। নিষ্ঠাবান যতই সেই কন্যাকে মাতা সর্বাম্বা বলে চিহ্নিত করতে থাকলেন, ততই তাঁর অন্তরে ক্রন্দন এসে গেল। তাই তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে, কন্যার বুকের উপর বারংবার চাপ দিলেন, তাঁর প্রাণ ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে।
তাতেও কাজ না হলে, কন্যার ওষ্ঠে ওষ্ঠ রেখে, নিজের শ্বাস তাঁকে দিতে থাকলে, সেই কন্যা অস্বস্তির সাথে শ্বাস নিতে নিতে ফিরে এলেন দেহে। দেহে ফিরে এসে প্রথম সে মহারাজ নিষ্ঠাবানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবা! … কিছু সাধু আগুনে পুড়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা কোথায়?”
নিষ্ঠাবানের আর বোঝা বাকি নেই মাতার লীলা। তিনি বুঝে গেলেন যে, মাতা এই ভাবে তাঁর কাছে ফিরে এলেন, আর তাঁর থেকে শ্বাস গ্রহণ করে, তাঁর কন্যা হয়ে অবস্থান করলেন। এতক্ষণে সেই বলবান পুরুষও উগ্রশাস্ত্রীর প্রাণ ফিরিয়ে এনেছেন, আর রাজা নিষ্ঠাবানের সেবিকারা, অন্য তন্ত্রসাধুদের। উগ্রশাস্ত্রী সুস্থ হতে, নিজের তন্ত্রবলে পার্শ্ববর্তী পদ্মা থেকে জল আনিয়ে বর্ষণ করিয়ে, সেই অগ্নিকে নির্বাপিত করলেন। আর এবার সেই বলবান পুরুষ ও নিজের শিষ্যদের সাথে সাখ্যাত করে, সেখানে গেলেন যেখানে মহারাজ নিষ্ঠাবান, সেই বলশালী পুরুষের স্ত্রী ও নিষ্ঠাবানের সদ্যলভ্য কন্যা ছিলেন।
নিষ্ঠাবান সেই কন্যাকে প্রশ্ন করলেন, “তোমার নাম কি মা!”
সেই কন্যা বললেন, “তুমি যেই নাম দেবে আমায়, আমার নাম তাই হবে”।
নিষ্ঠাবান পরলেন বড় জ্বালায়, স্বয়ং মাতার নামকরণ করতে হবে তাঁকে! … ইতস্তত করলে, বলশালী পুরুষের ভার্যা বললেন, “রূপে গুণে, সর্বস্ব ভাবে তুমি তো শ্রী মা। … মহারাজ এই কন্যার নাম শ্রী হলে কেমন হয়!”
মহারাজ নিষ্ঠাবান আদরের সাথে বললেন, “শুধু কি শ্রী? এই কন্যার কাছে তো সর্ব শ্রী বিদ্যমান, তাই এঁর পুরো নাম হোক, সর্বশ্রী, আর আজ থেকে সে আমারই কন্যা”।
এই কথাতে, শ্রী পুলকিত হয়ে, নিষ্ঠাবানের বক্ষকে আলিঙ্গন করলে, নিষ্ঠাবান নিজের নেত্র বন্ধ করে, মাতাকে বক্ষে ধারণ করার পরমসুখ লাভ করলেন আর তাঁর রোমরোম পুলকিত হতে থাকলো।
উগ্রশাস্ত্রী হেসে বললেন, “পিতাপুত্রীর মিলন সম্পন্ন হলে, এই অধমের দিকেও একটু দৃষ্টিপাত করবেন মহারাজ”।
নিষ্ঠাবান এই কথাতে লজ্জিত হয়ে বললেন, “ক্ষমা করবেন মহাশয়, আমি আসলে কন্যার আবেগে মোহিত হয়ে গেছিলাম। আমি রথ আনায়ন করিয়েছি। আপনাদের সকলের দেহ অগ্নিদগ্ধ হয়ে দুর্বল। রথে আরোহণ করে, রাজপুরে চলুন মহাশয়, আর আমার আতিথ্য গ্রহণ করুন। একটি নিবেদন মহাশয়। যদি শরীরস্বাস্থ্য সঠিক হয়ে ওঠা পর্যন্ত রাজপুরের আতিথ্য স্বীকার করেন। আমার সেবিকারা সকলে অত্যন্ত পবিত্র। ক্ষীণ তাঁদের কামনাবাসনা, স্নেহশিলা তাঁরা একাকজন জননীর ন্যায়। তাই মহাশয়”।
উগ্রশাস্ত্রী হেসে বললেন, “থাক আর বলতে হবেনা মহারাজ। … যিনি নিজের সেবিকা দাসীদেরকে জননীন্যায় বলতে পারেন, সেই রাজন কেমন হৃদয়বাণ তা বোঝাই যায়। আর যেই রাজা এমন হৃদয়বাণ তাঁর দাসীদের প্রতিও, তাঁর দাসীদের চোখে তাঁদের মহারাজ কতটা পবিত্র, তা বোঝাই যায়। আর কন্যার মোহ! … কন্যা যদি সাখ্যাত পরমেশ্বরী হন, তাহলে কোন বাপেরই আর দিগ্বিদিকের জ্ঞান অবশিষ্ট থাকে! … সত্য বলতে মহারাজ, আপনার এই কন্যাকে বেশ কিছুদিন দেখতে পাবো, তাই আমাদের বিশেষ ইচ্ছা যে, আপনার রাজ্যে বেশ কিছুদিন বিরাজ করি”।
এবার বলশালী পুরুষ ও তাঁর ভার্যার দিকে তাকিয়ে উগ্রশাস্ত্রী বললেন, “আর মহারাজ, এই বলশালী পুরুষ আর তাঁর পত্নী যদি সঠিক সময়ে না আসতেন, তাহলে আমাদের প্রাণ ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে যেত”।
মহারাজ নিষ্ঠাবান বিস্ফারিত নেত্রে সেই বলবান পুরুষকে দেখে বললেন, “এত বলশালী, আমি একটিই পুরুষকে চিনতাম, চিত্তাপুত্র চিত্তাল, বা তাল। তাকে ছাড়া, এতটা বলবান আমি কারুকে দেখি নি”।
সেই সুপুরুষ এবার হেসে মহারাজের চরণ স্পর্শ করে বললেন, “মহারাজ, অধমের নাম খালি। আর আপনি সঠিক বলেছেন মহারাজ। আমার দৃষ্টিতেও বলবান পুরুষ একজনই, আর তিনি হলেন চিত্তাপুত্র তাল। তিনি আমার বিশেষ বন্ধু ছিলেন মহারাজ। আমি ছিলাম তাঁর একমাত্র মল্লযুদ্ধ অভ্যাস করা সঙ্গী। একমাত্র আমার সাথে মল্ল অভ্যাস করেই তিনি তৃপ্ত হতেন। আজ তিনি নেই, তাই আমাকেও রাজ্য থেকে নিষ্কাসিত করে দেওয়া হয়েছে, কারণ আমি অধিক ভোজন করি, আর সেই অধিক ভোজনের ব্যয় বহন করবেন না, এমনটা করিপুত্র, করিন্দ্র স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। তাই মহারাজ, আমার ভার্যা, দেবী লীনাকে সঙ্গে নিয়ে এদিক সেদিক, বনে বনে ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছি। কিছু ফল, কিছু শিকার, এই দিয়ে উদরপূর্তি হয়ে যাচ্ছে”।
মহারাজ নিষ্ঠাবান বললেন, “তোমার পত্নী লীনাও তো বেশ শক্তিশালী মনে হচ্ছে!”
খালি মৃদুহেসে লজ্জিত হয়েই বললেন, “ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন মহারাজ, দেহকামনায় লিপ্ত হলে, যদি দেবী লীনার ন্যায় কেউ আমার ভার্যা না হতেন, তবে তো সেই স্ত্রীর উপর নির্যাতন করা হয়ে যেত! আমার কামনাই তাঁর কাছে অত্যাচার হয়ে যেত। তাই মহারাজ, দেবী লীনাকে দেখে, আমি তাঁর কাছে এই একই কথা বলে তাঁকে পত্নী রূপে লাভ করার ভিক্ষা চেয়েছিলাম”।
নিষ্ঠাবান হেসে বললেন, “বলশালী হবার সাথে সাথে, বাস্তববাদী এবং হৃদয়বাণও তুমি। সঠিক কথা পুত্র, চিত্তাপুত্রের সখা, হৃদয়বাণ না হয়ে কি করে থাকতে পারেন! … তাঁদের ন্যায় হৃদয়বাণ তো এই সম্পূর্ণ জম্বুদেশে দ্বিতীয় নেই”।
খালি মৃদুহেসে বললেন, “শুধুই কি হৃদয়বাণ মহারাজ, আজ এই অগ্নির মধ্যে সব থেকে অধিক যার কথা স্মরণ আসছিল, তিনি হলেন রাজকুমার সুর। তিনি থাকলে, এই অগ্নি শিখা পর্যন্ত পৌঁছনর আগেই, নির্বাপিত হয়ে যেত। … জনসেবা যে চিত্তাপুত্রদের এক অভ্যাস, এক আনন্দের অনুভূতি”।
উগ্রশাস্ত্রী এবার বললেন, “মহারাজ, এই খালি ও তাঁর ভার্যা, আমাদের প্রাণরক্ষা করেছেন। তাই এঁরা কি কনো পুরস্কারের অধিকারী নয়!”
নিষ্ঠাবান হেসে বললেন, “নিশ্চয়ই মহাশয়, কিন্তু আমি বুঝে পাচ্ছিনা, কি পুরস্কারে এঁদের ভূষিত করবো”।
উগ্রশাস্ত্রী বললেন, “দেখে তো মনে হচ্ছে, সদ্য বিবাহ করেছে খালি। তাই উদরে ক্ষুধা নিয়ে, সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে, বনে বনে ভ্রমণ, এক রাজার নেত্রে, এই দৃশ্য এসে যাবার পর, তাদেরকে আর কি করে এমন বনে বনে ভ্রমণের জন্য ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। … মহারাজ, এই স্ত্রীর আপনার কন্যার প্রতি মাতৃত্বের দৃষ্টি আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। … আপনার স্ত্রী নেই, তাই কেননা এই স্ত্রী, দেবী লীনাকেই শ্রীর দেখাশুনার জন্য রেখে দেন! … আর এই বলশালী পুরুষ, স্বয়ং চিত্তালের সঙ্গী মল্লযোদ্ধা। এমন বলশালী পুরুষকে যদি রাজকন্যার দেহরক্ষক রূপে রেখে দেন, তাহলে এঁদের আহারাদির সমস্যাও থাকেনা, আর আপনার কন্যাও কিছু আপনজনদের সঙ্গলাভ করতে থাকবেন”।
নিষ্ঠাবান আনন্দিত হয়ে বললেন, “অতি উত্তম প্রস্তাব, অতি উত্তম। … তাই হবে মহাশয়। আজ থেকে আমি খালিকে আমার প্রিয়তমা, সর্বশ্রীর অঙ্গরক্ষকের কর্মে নিযুক্ত করলাম। আর তাঁর পত্নী, দেবী লীনাকে নিযুক্ত করলাম, শ্রীর পালিকা রূপে”।
সস্ত্রীক খালি মহারাজ নিষ্ঠাবানের ও উগ্রশাস্ত্রীর চরণ বন্দনা করে বললেন, “অশেষ অশেষ ধন্যবাদ আপনাদের হে বরেণ্য। … আমাদের থাকার নিবাস দেবার জন্য তো বটেই, আমাদের আহারের উপায় করে দেবার জন্যও, আর সর্বাধিক ভাবে রাজকন্যার সেবায় নিয়জিত হয়ে, তাঁর দিব্যতার সাখ্যাতকার করার নিত্যসুযোগ প্রদান করে, আপনারা আমার ও আমার ভার্যার জীবনকে উদ্ধার করে দিয়েছেন। পুনঃপুন ধন্যবাদ আপনাদেরকে”।
দেবী লীনা হেসে বললেন, “মহারাজ, একটি অনুরোধ আছে। নাথ, আপনি আমাদের আহার ও নিবাসের স্থান প্রদান করেছেন, তাতেই আমরা আপ্লুত। সঙ্গে রাজকন্যার সঙ্গ লাভ করার সুখ দিয়েছেন। তাই আমাদের অনুরোধ যে, কৃপা করে আমাদের পৃথক করে বেতন প্রদান করবেন না। … প্রভু, রাজকন্যার সেবা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করছি আমি ও আমার পতি। বেতন লাভ করলে, তা আর সেবা কি করে হতে পারে মহারাজ! … কৃপা করে আমাদের এই আর্জিকে গ্রহণ করুন, হে নাথ”।
নিষ্ঠাবান সম্মুখে এসে লীনার শক্তিশালী স্কন্ধকে আকর্ষণ করে বললেন, “তোমাদের আচরণই বলে দেয় যে, তোমরা দেবী চিত্তা ও তাঁর পুত্রদের সান্নিধ্য লাভ করেছ। নাহলে এমন উচ্চভাব কার মধ্যে থাকতে পারে। … আমি আপ্লুত তোমাদেরকে আমার আত্মীয় করে লাভ করে। এসো তোমরা, আসুন মহাশয় উগ্রশাস্ত্রী, আমার আতিথ্য গ্রহণ করুন কৃপা করে”।
একদিকে, যখন এই ভাবে, সকলের অলক্ষ্যে, জম্বুদেশের এক নূতন ইতিহাস রচনা হতে থাকে, তেমন অন্যদিকে, ইতিহাস পরিবর্তনের এক প্রকাণ্ড প্রয়াস হতে থাকে, মুর্শিদরাজ্যে, অর্থাৎ যা ছিল এককালে মাতা সর্বাম্বার শূন্যপুর।
মাতা সর্বাম্বা দেহত্যাগ করাতে, সেই রাজ্য যেন সম্যক ভাবে শোকাহত। বৃদ্ধ মানস সেই রাজ্যের সিংহাসনে স্থিত তো থাকেন, কিন্তু তাঁর কনো কিছুতেই মন নেই। কি করে ভুলতে পারেন যে, তাঁর কন্যা মেধার সমস্ত জীবনের সাধনার ফল ছিলেন মাতা সর্বাম্বা, যিনি একই সাথে তাঁর আরাধ্যা, তাঁর মাতা, তাঁর কন্যা, তাঁর ব্রহ্মময়ী। তাঁর যে এমন দুর্দশা, সেই আন্দাজ সহজেই করেছিলেন বীর্য, আর তাই ২০ করিন্দ্রপুত্রদের সঙ্গে নিয়ে, আক্রমণ করেন তিনি মানসকে।
না মানসের যুদ্ধ করার মানসিকতা বেঁচে ছিল আর না প্রজাসেনাদের। সকলেই মাতৃহারা। সকলেই মর্মাহত। এমন অবস্থায় যুদ্ধ! … মানস জানেন বীর্য মোহিনীর পুত্র, আর তাঁর উদ্দেশ্যে ছায়াপুরকে পুনরায় গঠন করা। জানেন তাঁর হাতে রাজ্য চলে যাবার অর্থ, শূন্যপুরের সমস্ত গরিমাকে ধুলিস্যাত করে দেওয়া, তাও তাঁর আর যুদ্ধ করার মানসিকতা নেই। তাই বিরক্ত হয়েই, রাজ্য ত্যাগ করে, বনবাসী হয়ে ওঠার চিন্তা করলেন তিনি। প্রজা ও সেনাও সহমত রাজার সাথে। তাঁদেরও একই বক্তব্য। যখন মাতাই নেই, তখন আর যুদ্ধ করে কি করবো। গৃহে থেকেই বা কি করবো। এর থেকে শ্রেয়, বাকি জীবন বনবাসী হয়ে, প্রকৃতির কোলেই মৃত্যু নিশ্চয় করবো।
তাই বীর্যের আক্রমণের কনো প্রত্যুত্তর এলো না সেনার থেকে বা রাজার থেকে। কিন্তু প্রত্যুত্তর তাঁদের থেকে না এলেও, প্রত্যুত্তর যে এলো না, তেমন কিছুতেই নয়। রাজ্যের উত্তর কোনে এক সঙ্গীতের সুর সকলে শুনতে পেতেন। আর আজ সেই সঙ্গীতই তরঙ্গরূপে সম্পূর্ণ শূন্যপুরের রক্ষণ করা শুরু করেছে। সেই তরঙ্গ বীর্য বা করিপুত্রদের এক চুলও অগ্রসর হতে দিলনা।
অদ্ভুত এই কৃত্যকে কি ভাবে সকলে ব্যখ্যা দেবেন বুঝতেই পারলেন না। কেউ বললেন, “মাতা দেহত্যাগ করেছেন, মাতা আমাদের থোরাই ত্যাগ দিয়েছেন! … তিনি স্বয়ং নিজের রাজ্যকে রক্ষণ করছেন”। তো অন্যরা বলা শুরু করলেন, “সকলেই মায়ের সন্তান। মায়ের স্বপ্ন এই শূন্যপুর, তাঁকে তাঁর সন্তানরা কি ভাবে নষ্ট হতে দেন!… মায়ের স্নেহময় কনো এক সন্তান এসে, দেখো কেমন অনায়সে সমস্ত শূন্যপুরের রক্ষণ করছেন!”
মানসের কানেও এই সংবাদ এসে পৌছায়, আর সে হতচকিত হয়ে, সেই ব্যক্তির সন্ধান করতে নির্গত হয়, যিনি এই শূন্যপুরকে সঙ্গীতের নাদ দ্বারা রক্ষণ করছেন। অন্যদিকে বহু প্রয়াসের পরেও না তো সেনা একচুল অগ্রসর হতে পারলেন, আর না বীর্য বা করিপুত্ররা। তাই অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে হুংকার দ্বারা সেনাকে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করলেন বীর্য।
পথে করিন্দ্র বিরক্ত ও ব্যাকুল হয়ে বললেন, “এটা কি হলো মামা! এমন ধারার যুদ্ধের তো আজ পর্যন্ত আমরা কেউ কোনোদিন সম্মুখীন হইনি!”
বিরক্ত হয়ে বীর্য বললেন, “মাতা সর্বাম্বার গড় যে তাঁর দেহত্যাগের পরেও এমন অজেয় থাকবে, তা আমি কল্পনাতেও ভাবতে পারিনি। … যাইহোক, নিজের গড় রক্ষা করুন মাতা সর্বাম্বা, কিন্তু বাকি জম্বুদেশ অধিকারে তো আর তিনি বাঁধা দিতে পারবেন না। চলো পুত্র, তোমার হবু সম্রাজ্ঞীর সাথে আলাপ করবে চলো। আর কিছু বছর পরেই, তোমাদের সকলের বিবাহ দিয়ে, সম্রাট করে স্থাপন করবো জম্বুদেশের। আর তখন থেকে শুরু করবো মোহিনীশাসন। দেখি, কেমন করে আর কতদিন শূন্যপুর নিজের সামর্থ্যকে এই ভাবে ধরে রাখে”।
করিন্দ্র বললেন, “মামা, আপনি খুব খুশী হচ্ছেন কারণ চিত্তাপুত্রদের থেকে আর মাতা সর্বাম্বার চোখরাঙ্গানির থেকে মুক্ত হয়েছেন বলে, কিন্তু আরো একটি শত্রু আছে, যার কথা আপনি ভুলে যাচ্ছেন”।
জিজ্ঞাসু তির্যকদৃষ্টিতে বীর্য করিন্দ্রের দিকে তাকালে, করিন্দ্র বললেন, “মা জগদ্ধাত্রী। … তিনি এখনো আরাধ্যা রূপে বিরাজ করছেন আমাদের রাজ্যে। আর তিনি বিরাজ করা মানে, প্রজার কাছে সুসংস্কার আস্তেই থাকবে। আর সুসংস্কারের অর্থ, ধনকাম বিমুখতা। আর এঁদের থেকে বিমুখ হলে, ছায়ারাজ্য স্থাপন অসম্ভব মামা”।
বীর্য বললেন, “কথা তো তুমি সঠিক বলেছ পুত্র, কিন্তু তোমার পিতা রাজা করিমুণ্ড থাকতে, কিছুতেই মা জগদ্ধাত্রীর আরাধনা বন্ধ করতে পারবেনা”।
করিন্দ্র একটি গভীর নিশ্বাস নিয়ে বললেন, “সম্ভব যদি পিতাকে গদিচ্যুত করা যায়। … কেননা আমরা একটি বিদ্রোহীগোষ্ঠীর নির্মাণ করে, তাদের দ্বারা দাবি তুলি যে, অন্ধরাজাকে তাঁরা চায়না!”
বীর্য করিন্দ্রের কথাতে অসহমত পোষণ করে বললেন, “না ভাগ্নে, এমন করে রাজাসন থেকে করিমুণ্ডকে অপসরণ করিয়ে, তুমি যখন জগদ্ধাত্রী আরাধনা বন্ধ করতে যাবে, তখন প্রজা তোমার বিরুদ্ধে চলে যাবে। আর একবার প্রজা বিরুদ্ধে চলে গেলে, আর তোমাকে সম্রাটের আসনে বসতে দেবেনা”।
করিন্দ্র খানিক চুপ করে নিজের অন্তরে মনন করে খল এক হাস্য প্রদান করে বললেন, “তাহলে মহারাজের অর্থ মন্ত্রী হয়ে যাই আমি। জগদ্ধাত্রী আরাধনার যে খরচ মহারাজ দেন, সেই খরচের ধনকে মহারাজের আদেশ বলে প্রজার হাতে যেতে দেবনা”।
করাভ বললেন, “পিতা কিছুদিন পর, যখন প্রজা বিদ্রোহ করবে, তখন তোমার থেকে সেই ধন নিয়ে, প্রজার হাতে নিজেই তুলে দেবেন। এই ভাবে কি আর আটকানো যায় জগদ্ধাত্রী আরাধনা!”
করিন্দ্র পুনরায় এক খল হাস্য প্রদান করে বললেন, “সেই দিবসেই, রাজার আদেশ বলে, প্রজার থেকে সেই ধন পুনরদ্ধার করে আনবো”।
বীর্য বললেন, “প্রস্তাব মন্দ নয়, কাজ তুমি করবে, বদনাম তোমার পিতার হবে। কিন্তু তাও কিছুর যেন খামতি রয়েছে! … এক বিকল্প আরাধনা লাগবে, যদি তা আনা যায়, তাহলে প্রজাকে দেখানো যাবে যে, তারাই অর্বাচীন, কারণ সর্বত্র অন্য এক আরাধনা হচ্ছে, আর তারা জগদ্ধাত্রী আরাধনা নিয়েই উলমালা হয়ে আছে”।
মনকরি বললেন, “মামা, এই কাতা রাজ্যে, দুর্গা আরাধনা হয়না!”
বীর্য বললেন, “না, রাজবাড়িতে হয়না। রাজবাড়ি থেকে দূরে, এক ব্যাধজাতির সমাজ এই আরাধনা করেন, আর মহিষ শিকার করে, দেবীর কাছে তা বলি চরান”।
এই সমস্ত কথার মধ্যেই যখন কাতার রাজ্যের নিকটে উপস্থিত হয়ে গেছিলেন বীর্য ও করিপুত্ররা, তখন এক বৈদ্য সেদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন হন্যে হয়ে। সেই দেখে, বীর্য প্রশ্ন করলেন সেই বৈদ্যকে, যেন তাঁর পূর্বপরিচিত, “রাজবৈদ্য, এমন হন্যে হয়ে যাতায়াতের কারণ কি?”
বৈদ্য বললেন, “মহারাজ খুব অসুস্থ। তাই …”
বীর্য আচম্বিত হলেন সেই কথা শুনে, আর রাজপুত্রদের সঙ্গে নিয়ে দ্রুততার সাথে রাজপুরে প্রবেশ করলেন। রাজা ভৃগুসেন তখন শয্যাশায়ী। মিত্র বীর্য আর তাঁর সাথে করিন্দ্রদের দেখে, ভৃগুসেন বললেন, “মিত্র তুমি এসেছ। … ভালোই হয়েছে। মিত্র, বৈদ্য বলেছেন যে, বছর খানেক আমার পূর্ণ বিশ্রাম প্রয়োজন”। … দাসীদের কক্ষ থেকে চলে যেতে বললে, কক্ষে যখন কেবল বীর্য আর ভৃগুসেন রইলেন, তখন আবার ভৃগুসেন বললেন, “অতিরিক্ত বীর্যক্ষরণের কারণে, আমার শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে গেছে। তাই বৈদ্য বলেছেন যে, কিছু বছর রাণীদের থেকে দূরে অবস্থান করে, বিশ্রাম নিতে। সম্মুখে যেন কনো স্ত্রী না থাকে সেই কালে, নিজের কন্যারাও নয়”।
বীর্য বললেন, “এত ভীষণ পরিস্থিতি মিত্র। কাতার ন্যায় এমন গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য যদি রাজাকেই না পায়, তাহলে চলবে কেমন করে?”
ভৃগুসেন বললেন, “আমি এই নিয়ে মনমন্থন করেছি মিত্র। শীঘ্রই আমি তোমাকে বার্তা প্রেরণের চিন্তাও করছিলাম। বলছি কি, আমার কন্যারা এখন দ্বাদশ বর্ষীয় হয়ে গেছে। তাঁরা নিয়মিত রজসিলাও হচ্ছে। তাই বলছিলাম, যদি তাঁদের বিবাহটা করিপুত্রদের সাথে দিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তো রাজ্য রাজাহারা থাকবেনা। করিন্দ্রকে রাজসিংহাসনে আঢ়ুর করে, মালদ, মেদিনী আর কাতার রাজ্যের রাজারূপে চিহ্নিত করে, তাঁকে তো জম্বুদেশের সম্রাট রূপে ঘোষণা করে দেওয়া যেতেই পারে, কি তাই না?”
বীর্য বললেন, “কেবল এই তিন রাজ্যই বা কেন? দক্ষিণা সাগররাজ্যও তো বৃহৎব্যঘ্রকে হারিয়ে নৃপতিশূন্য। তাকেও তো আমাদের প্রদেশ বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে!”
ভৃগুসেন মাথা নেড়ে বললেন, “না মিত্র, সেই চেষ্টা করো না। কনো এক মায়াবী শক্তি সেই সুন্দরের বনকে, সাগর রাজ্যকে আর সমুদ্রতটকে রক্ষা করছে। আমি সেখানে অধিকার স্থাপন করতে গেছিলাম। সঙ্গে করে অষ্টাদশ সহস্র সেনা নিয়ে গেছিলাম। সমস্ত সেনা খুইয়েছি, এমনকি আমার পত্নীরা নিজেদের মায়াবী শক্তিও হারিয়েছে, আর তাই শেষে আমি গুরুতর ভাবে আহত হই। তারপরেই তো আমার এই দুর্বলতা প্রকাশ্যে এলো”।
বীর্য চিন্তিত হয়ে বললেন, “সে কি? মায়াবী শক্তি! … মায়াবী শক্তি কি করে এলো সেখানে?”
ভৃগুসেন বললেন, “সঠিক ভাবে জানিনা, তবে স্থানীয়রা বলেন, বনবিবির সুরক্ষা কবচ। নাকি, বৃহৎব্যঘ্রের কারণে, এই সুরক্ষা কবচ হারিয়ে ফেলেছিলেন সকলে। বৃহৎব্যঘ্র চলে যেতে, সেই সুরক্ষাকবচ পুনরায় ফিরে পেয়েছেন তাঁরা”।
বীর্য মাথা নেড়ে বললেন, “বিচিত্র সমস্ত ব্যাপার। উগ্রশাস্ত্রীকে অগ্নিদ্বারা হত্যার ষড়যন্ত্র বিফলে গেল, শূন্যপুরকে আমি অধিকার করতে গেলাম, সঙ্গীতের নাদ আমাদের পথ অবরোধ করে দিল, এখন সুন্দরের বনেও বনবিবি এমন সুরক্ষা করছে! … হচ্ছেটা কি! … ভেবছিলাম, সর্বাম্বা গেল, চিত্তা গেল, চিত্তার পুত্ররা গেল, এবার সমস্ত কিছু আমাদের। কিন্তু তা আর হচ্ছে কোথায়!”
ভৃগুসেন বললেন, “দুশ্চিন্তা করো না মিত্র। করিন্দ্র একাধারে শক্তিধর আর বুদ্ধিমান। খলবুদ্ধিতে তার জুরি মেলা ভার। তাকে একবার সম্রাট ঘোষণা করলে, সে সমস্ত কিছু সামলে নেবে”।
বীর্য চিন্তিত থাকলেও, সে তার নিজের যোজনায় সাফল্য লাভ করে বেশ আনন্দের সাথে, নিজের ভগিনীদের গুপ্ত ভাবে ডেকে এনে, করিন্দ্র সহ তাঁর ১৬ ভ্রাতার বিবাহ দিলেন ঘৃতকুমারীকন্যাদের সাথে। আর বিবাহের পর, করিন্দ্রকে সম্রাট করে সিংহাসনে স্থাপিত করে, তাঁর অধীনে মেদিনী, মালদ ও কাতা রাজ্য সঁপে দিলেন ভৃগুসেন ও বীর্য।
অন্যদিকে, শূন্যপুরে বৃদ্ধ মানস সন্ধান করতে গেলেন, সেই ব্যক্তির, যিনি তাঁর রাজ্যকে সুরক্ষা প্রদান করলেন। এক সুপুরুষ যুবককে সেখানে রুদ্রবীণা হস্তে উপস্থাপন করে, সঙ্গীতের বিভিন্ন রাগভঞ্জন করতে দেখে আপ্লুত বৃদ্ধ মানস তাঁর কাছে অগ্রসর হয়ে বললেন, “কে তুমি! তোমাকে আগে কখনো তো এই শূন্যপুরে দেখিনি!”
যুবক মুখ তুলে বললেন, “ক্ষমা মহারাজ মানস, আপনার উপস্থিতি আমি উপলব্ধি করতে পারিনি। … অধমের নাম সুরধ্বজ। চন্দননগরে আমার নিবাস। আমার একমাত্র সম্বল, আমার বৃদ্ধা জননী, সেখানেই বিরাজ করছেন। এই অধমের সময়ের কনো জ্ঞান নেই মহারাজ। সে এসেছিল মাতা সর্বাম্বাকে সঙ্গীতসুখ প্রদান করতে। কিন্তু এখানে এসে জেনেছি যে তিনি তাঁর অবতারলীলা সমাপন করে দেহকে ত্যাগ দিয়েছেন। … তাই মনের বেদনায় তাঁর উদ্দেশ্যেই সঙ্গীত ভঞ্জন করছিলাম মাত্র”।
বৃদ্ধ মানস হেসে বললেন, “মাতার অদ্ভুত লীলা পুত্র। তাঁরই প্রেরণাতে তিনি তোমাকে এখানে আনলেন, বেদনা প্রদান করলেন, সঙ্গীত ভঞ্জন করালেন, আর সেই সঙ্গীতের নাদ শূন্যপুরকে আক্রমণ করার অভিলাষী, বীর্য তথা করিপুত্রদের শূন্যপুরে প্রবেশ অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাদেরকে বিতাড়িত করলো। অত্যন্ত শুভ পুত্র, অত্যন্ত শুভ। তোমার সঙ্গীতের নাদ অত্যন্ত শুভ। তাই তো অশুভ শক্তিকে অনায়সে অবরুদ্ধ করে দিল তা। তোমার কল্যাণ হোক। তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে এই রাজ্যে একটি অট্টালিকা করে দিতে পারি। তুমি সেখানেই বিরাজ করো”।
সুরধ্বজ করজোড়ে রাজা মানসের উদ্দেশ্যে বললেন, “আপনার আদেশ অমান্য করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী মহারাজ, কিন্তু আমার মাতা একাকী চন্দনদেশে অবস্থান করছেন। আমাকে তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। সংবাদ পেয়েছি যে, করিন্দ্রকে সম্রাট ঘোষণা করা হয়েছে। তাই হতে পারে, আমার জননীর উপরও কনো সংকট নেমে আসতে পারে। তাই আমাকে প্রস্থানের অনুমতি দিন মহারাজ”।
সুরধ্বজ শূন্যপুর ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু ক্রমে তাঁর ও তাঁর সঙ্গীতের সুনাম সমস্ত জম্বুদেশে ছড়িয়ে পরতে থাকলো। সেই সংবাদ করিন্দ্রেরও কান পর্যন্ত পৌঁছেছে। বুঝতে অসুবিধা হয়না তার যে, এই সুরধ্বজই সেদিন তাঁদের শূন্যপুরে পথ আটকেছিল। তাঁর থেকে বিপদের আশঙ্কা আছে। তেমন বিচার করেই, করিন্দ্র সেই সকল স্থানে সেনা প্রেরণ করলেন, যেখানে যেখানে সুরধ্বজের সঙ্গীত শোনা যেতে থাকলো। উদ্দেশ্য তাঁকে যেকোনো উপায়ে বন্দী করে, তাঁর প্রাণ হনন করা। বিপদ যার থেকে, তার অস্তিত্বকে বিনষ্ট করতে সর্বদাই তৎপর করিন্দ্র।
কিন্তু আরো একটি বিপদের কথা করিন্দ্র ভুলে যায়নি। সঙ্গে আরো দুটি সংবাদ তাঁকে বিরক্ত করতে থাকলো। একদিকে বনবিবি, আর অন্যদিকে নিষ্ঠাবানের নবরাজ্য। নিষ্ঠাবানের নবরাজের সংবাদ লাভ করে, সেখানের সুরক্ষা ব্যবস্থা জানার জন্য সেনা প্রেরণ করেন। সেই গুপ্তচরের থেকেই জানতে পারেন যে রাজা নিষ্ঠাবানকে পিতা নামে ভূষিত করা এক সর্বাঙ্গসুন্দরী কন্যা আছেন, যার নাম হলো সর্বশ্রী। ছদ্মবেশে স্বয়ং করিন্দ্র সেখানে গেছিলেন সর্বশ্রীকে দেখার জন্য, আর সেই কালে সর্বশ্রীর রূপ দর্শন করে বিস্মিত ও কামাক্রান্ত হয়েছেন করিন্দ্র।
কামান্ধতার কারণে শ্রেষ্ঠ সেনা প্রেরণ করেছিলেন সর্বশ্রীকে হরণ করে আনার জন্য, কারণ তিনি জানেন নিষ্ঠাবান তাঁর সাথে নিজের কন্যার বিবাহ কিছুতেই দেবেন না। কিন্তু প্রতিবার তাঁর সেনারা ব্যর্থ হন, সর্বশ্রীর অঙ্গরক্ষক, খালির কাছে। প্রকাণ্ড বলবান সেই খালি, আর তাঁর পত্নী হলেন এক মায়াবিনী। এই শুনে বারবার বিরক্ত হয়েছেন করিন্দ্র। বারংবার শ্রেষ্ঠ সেনাদের প্রেরণ করেছেন, আর বারংবার সেনাদের আহত হয়ে ফিরতে হয়েছে।
তাই করিন্দ্র এবার ক্ষিপ্ত এবং দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ যে, স্বয়ং তিনি এবার যাবেন, এবং সেই বলশালী পরুষকে হত্যা করে, সর্বশ্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। কিন্তু তার আগে, তাঁকে জগদ্ধাত্রী আরাধনা বন্ধ করতে হবে। তাই তিনি এবার জগদ্ধাত্রী আরাধনার ঠিক পূর্বের ক্ষণে, কাতার ব্যাধেরা যেই দুর্গা আরাধনা করতেন, তার আরাধনা করলেন, এবং ৫ বছরব্যাপী, এই দুর্গা আরাধনাকে মালদ, মেদিনী, তথা কাতা রাজ্যের সর্বত্র ছড়িয়ে দিলেন। আর এমন করার পর, তিনি স্বয়ং তাঁর পিতা করিমুণ্ডের সম্মুখে দণ্ডায়মান হয়ে বললেন, “আপনারা কি কুলদেবী কুলদেবী করে করে জগদ্ধাত্রী আরাধনা করেন! দুর্গা আরাধনা শুরু করুন। তিনিই আসল দেবী। এবার জগদ্ধাত্রী আরাধনা বন্ধ করুন”।
করিমুণ্ড পুত্রের মনসা বেশ বুঝেছেন। তাই বললেন, “তুমি দুর্গা আরাধনা করছো করো পুত্র, জগদ্ধাত্রী আমাদের এই দেশের কুলদেবী, এখানের প্রজাদের আরাধ্যা দেবী। আমরা তাঁর আরাধনা করবোই”।
করিন্দ্র এবার খল হাস্য হেসে বললেন, “বেশ তবে দেখা যাক কি করে করেন আরাধনা জগদ্ধাত্রীর”। চন্দনদেশকে নিজের রাজ্যের সাথে বন্ধু রাজ্য করে জুরে রেখেছিলেন। এবার কাতায় ফিরে গিয়ে, করিমুণ্ডকে সরাসরি পত্র দিলেন সম্রাট করিন্দ্র আর বললেন, “চন্দনদেশে আপনি সিংহাসনে উপনীত হতে পারেন, তবে এবার আর কাতার মিত্র রাজ্য হয়ে বিরাজ করতে পারবেন না। যদি সমর্পণ করেন চন্দনদেশকে, তবে আমার সাম্রাজ্যের চতুর্থ পরগনা হয়ে চন্দনদেশ সমস্ত সুখভোগ করবে, না হলে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান”।
শত্রুতার বীজবপনের প্রয়াস করছে পুত্র, তা বুঝে, সমর্পণ করলো চন্দনদেশ। আর তার পরেপরেই সমস্ত চার রাজ্যে, অর্থাৎ কাতা, মেদিনী, মালদ আর চন্দনদেশ, সমস্ত চার পরগনাতে নির্দেশ জারি করলেন যে, সমস্ত ধন সম্রাটের হাতে কুক্ষিগত থাকবে। যেই রাজ্য সম্রাটকে না জানিয়ে, বা সম্রাটের অনুমতি না নিয়ে একটিও ধনকড়ি ব্যয় করবেন, সেই রাজ্যের রাজাকে শুলে চড়ানো হবে।
এমন ফরমানের পর, যাই সমস্ত রাজ্যের ধনভাণ্ডার চলে গেল সম্রাট করিন্দ্রের হাতে, অমনি জগদ্ধাত্রী আরাধনার জন্য যেই ধন রাজকোষ থেকে প্রদান করা হয়, তাকে বন্ধ করে দিল করিন্দ্র। প্রজা এবার নিরুপায় হয়ে গেলে, সুরধ্বজ দুর্গাপূজার কালেই চন্দনদেশ থেকে বাইরে যাত্রা করে, বিভিন্ন স্থান, যা করিন্দ্রের অধীনে ছিলনা, সেখান থেকে ধনসঞ্চয় করে এনে, অধিক ধুমধাম করে জগদ্ধাত্রী আরাধনা করলে, করিন্দ্র এবার সেনা প্রেরণ করেন, সুরধ্বজকে হত্যা করার জন্য, কারণ বিদ্রোহী নাম দিয়ে তাঁকে হত্যা করতে পারছিলেন না।
সেনাকে বলে দেন তিনি যে, যখন সুরধ্বজ সঙ্গীতচর্চা করছেনা, তখন তাঁর কাছে গমন করে, ঘুমন্ত অবস্থা হলেও, তাঁর ছেদন করা মুণ্ড এনে দিতে হবে সম্রাটের কাছে। আর এত বলে, তিনি স্বয়ং চলে গেলেন সুন্দরের বনে, বনবিবির হত্যা করতে। সঙ্গে নিলেন বেশ কিছু ভ্রাতাকে।
কিন্তু গেলে কি হবে, সুন্দরের বনে বারংবার পথ হারাতে থাকলেন করিন্দ্র ও তাঁর ভ্রাতারা। যেই পথই ধরেন, ঘুরে ফিরে সমুদ্র উপকুলে উপস্থিত হয়ে যান। অনন্তবার প্রয়াস করেও, বনের অন্তরে প্রবেশ করতে না পারলে, বিরক্ত হয়ে, সমুদ্রতটে এসে সুরাপান করে, গৃহ উদ্দেশ্যে যাত্রা করে, সংবাদ লাভ করেন যে, সুরধ্বজকে হত্যা করা যায়নি, বরং তিনবার সেনা গেছে সেখানে তাঁর মুণ্ডকে ছেদন করে নিয়ে আসতে, তিনবারে সেখানে যাওয়া ত্রিশ সেনাই আর কাতা রাজ্যে ফিরে আসেনি।
একদিকে বনবিবিকে নাগালের মধ্যে পেলেন না, অন্যদিকে সুরধ্বজকেও নাগালের মধ্যে পাচ্ছেন না। করিমুণ্ডকে কিছুতেই নিজের আয়ত্তে লাভ করতে পারছেন না যে, সুরধ্বজকে তিনি সম্রাটের হাতে তুলে দেবেন, এই সমস্ত কিছু নিয়ে ব্যতিব্যস্ত করিন্দ্র। আর এরই মধ্যে সংবাদ এসেছে তাঁর কাছে যে, রাজশাহীর রাজকন্যা দেবী সর্বশ্রী, যিনি এই বৎসর অষ্টাদশ বর্ষীয় হয়েছেন, তিনি ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন সুরধ্বজকে বিবাহ করার। আর তাই সেই প্রস্তাব নিয়ে, তাঁর অঙ্গরক্ষক খালি আসছেন চন্দনদেশে, সুরধ্বজকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে।
কি করবেন সেই ব্যাপারে অনিশ্চিত হয়ে তিনি বীর্যের কাছে গেলে, বীর্য বললেন, “সুরধ্বজকে হত্যা করতে তুমি যাকে যাকে প্রেরণ করেছ ভাগ্নে, সকলে অবলুপ্ত হয়ে গেছে। খালির সম্মুখে তোমার শ্রেষ্ঠ সেনাও পরাস্ত হয়ে গেছে। তাই তাঁদের দুইয়ের সম্মুখে তো কারুকে প্রেরণের মানেই হয়না। তার চাইতে অধিক শ্রেয় তুমি স্বয়ং শ্রেষ্ঠ সেনা নিয়ে এই ফাঁকে আক্রমণ করো রাজশাহীকে। সেখানে খালি নেই, অর্থাৎ তা সুরক্ষিত নয়। তাই সেই স্থানে আক্রমণ করে, সর্বশ্রীকে তুলে নিয়ে এসে বিবাহ করে নাও।
তাঁকে তুলে আনলে, খালি আর সুরধ্বজ স্বয়ংই তোমার রাজ্যে পদার্পণ করবে, তোমার সাথে যুদ্ধ করার অভিলাষে। আর এখানে আক্রমণ করলে, তুমি, তোমার বাকি সমস্ত ভ্রাতারা তো থাকবেই। সঙ্গে আমি, ভৃগুসেন থাকবো, আর থাকবে ঘৃতকুমারী কন্যাদের মায়া আর আমার কন্যাদের মায়া। তাই খালি আর সুরধ্বজ, উভয়কেই রাজদ্রোহী করে বন্দী বানিয়ে, তাদের মুণ্ডচ্ছেদ করা যাবে। বাঁধা দেবার মতও কেউ থাকবেনা”।
করণ্ডর হেসে বললেন, “অতি উত্তম প্রস্তাব মামা। … এবার সমস্ত কাঁটাকে উৎপাটন করে করে ফেলে দেব, আর কেউ আমাকে বাঁধা দেবার সাহসও পাবেনা”।
এমন বলে, শ্রেষ্ঠ সেনা, করাভ, মনকরি আর করঙ্ককে নিয়ে রাজশাহী আক্রমণ করলেন করিন্দ্র। আর সরাসরি সেখানে উপস্থিত হয়ে, রাজা নিষ্ঠাবানকে হুংকার দিয়ে বললেন, “রাজা নিষ্ঠাবান, যুদ্ধ সম্রাট চায়না, তবে যুদ্ধে সে ডরায়ও না। হয় তোমার কন্যা, দেবী সর্বশ্রীকে সম্রাটের পত্নী, সম্রাজ্ঞী করে নিজের রাজ্য থেকে বিদায় দাও, নয় যুদ্ধ করে পরাজিত হয়ে, এই রাজ্যের সমস্ত স্ত্রীকে সম্রাটের সম্ভোগশালার দাসী করার জন্য প্রস্তুত হও”।
নিষ্ঠাবান এই কথা শুনে উগ্রমেজাজি হয়ে যুদ্ধ তৎপর হয়ে, রণবেশ ধারণ করে রণাঙ্গনে সেনা নিয়ে উপস্থিত হতে গেলে, পথে দেখলেন, করিন্দ্র স্বয়ং আর তাই দুই ভ্রাতা, করাভ আর মানকরি মন্দিরের পথে যাত্রাকারী দেবী সর্বশ্রী ও দেবী লীনাকে আক্রমণ করেছেন। করিন্দ্রের থেকে মাত্র তিন হাতের দূরত্বে তাঁর কন্যা স্থিত। তাই যদি তিনি বা তাঁর সেনা অধিক গতি ধরন করেন, মুহূর্তের মধ্যে করিন্দ্র তাঁর কন্যাকে অপহরণ করে নিয়ে চলে যাবে। তাই কি করবেন তিনি, কিচ্ছু বুঝে পেলেন না।
