জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

আরো দিন দুই যেতে, একদিন করিমুণ্ডের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হলো, আর তিনি এবার ক্রন্দনের সাথে বিলাপ করে উঠলেন। সেই বিলাপ অতীব ভয়ঙ্কর ছিল, এবং হৃদয়বিদারকও। একই প্রকার বিলাপ আরো একদিকে হচ্ছিল, যেই দিকে কারুর চোখ ছিলোনা, বা সত্য বলতে কারুর দৃষ্টিই ছিলোনা, আর তিনি হলেন নিষ্ঠাবান।

নিষ্ঠাবানকে শুশ্রূষা করেছিলেন চিত্তাপুত্ররা, আর সেই শুশ্রূষার উপরান্তে, তিনি বিভিন্ন প্রকার ক্ষেদ নিয়ে চলে গেছিলেন রাজশাহী অঞ্চলে। ক্ষেদ তাঁর বিভিন্ন ছিল, তবে সেই ক্ষেদ সুপ্তই থাকতো। নৃপতি হিসাবে তিনি অত্যন্ত দায়িত্ববান এবং কর্তব্যশীল। আর এই দুইকে সঙ্গে নিয়ে, তিনি নিজের অঙ্গে যা গহনা ছিল, তা দ্বারা পত্যন্ত রাজশাহীর অধিবাসীদের সেবা করে, তাঁদের মন জয় করে, ক্রমে সেই রাজ্যের নৃপতি হয়ে উঠেছিলেন।

এই কথা মহারাজ চন্দন সর্বদা বলতেন। তিনি বলতেন, “যিনি রাজা, তিনি সর্বত্রই রাজা, সর্বসময়েই রাজা”। তাঁর কথা যে কতটা সত্য ছিল, তার প্রমাণ ছিল নিষ্ঠাবান। যুদ্ধে পরাজিত ও রাজ্যচ্যুত হবার পরেও, তাঁর অন্তরের নৃপতির মৃত্যু হয়নি। তাই তো তিনি রাজশাহীতে গমন করে, সার্বিক ভাবে নিঃস্ব হওয়া সত্ত্বেও পুনরায় নৃপতি হয়ে উপস্থাপন করলেন।

রাজশাহীতে অবস্থান করার কারণে, আর রাজশাহী জম্বুদেশের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে, নিষ্ঠাবানের খবর তো কেউ রাখতেন না। কিন্তু রাজা করিমুণ্ডের কাছে বীর্য অবস্থান করছিলেন, তাঁর পুত্ররা অবস্থান করছিলেন, তাঁর পত্নীরা অবস্থান করছিলেন। তাই তাঁর বিলাপ সকলেই দেখেছেন। তাঁর বিলাপ হয়তো তাঁর পত্নী, তাঁর পুত্র আর বীর্যের কাছে হাস্যস্কর, আর প্রমোদের কারণ, কারণ তাঁরা তো চিত্তামুক্ত জম্বুদেশ লাভ করে বেজায় আনন্দিত। কিন্তু সুধামা সহ যারা হৃদয়বান ছিলেন চন্দননগরে, তাঁরা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিলেন রাজা করিমুণ্ডের এই বিলাপের ফলে।

যুবক অবস্থায় অনেক স্ত্রীকে সম্ভোগ করেছেন করিমুণ্ড, যাদের মধ্যে অধিকেরই অনুমতি ও অভিপ্রায়কে উপেক্ষা করেই তাঁদের সম্ভোগ করেছিলেন। তার কারণে হয়তো তাঁদের অন্তরে সুপ্ত ক্রোধও ছিল রাজা করিমুণ্ডের প্রতি। কিন্তু করিমুণ্ডের এই বিলাপ তাঁদেরও হৃদয়কে বিদীর্ণ করে দিলো। তাঁদের অধিকাংশই এই বিলাপঘটনার পর অন্তরে অন্তরে যাকে দুষ্ট রাজা বলে মানতেন, তাঁরা নিজেদের মত পরিবর্তন করেন।

আর বীর্য এই মতপরিবর্তনকে স্পষ্ট ভাবে দেখেছেন, আর তা দেখেও, এই সমস্ত অহেতুক জেনে, তাকে উপেক্ষা করেছেন। বিলাপের কালে, বীর্য সম্পূর্ণ ভাবে রাজা করিমুণ্ডের পাশে ছিলেন। অন্তরে তিনি হাসছিলেন, আর প্রমোদ করছিলেন এই ভেবে যে, আর বিলাপ করে কনো লাভ নেই, জম্বুদেশ চিত্তামুক্ত হয়েই গেছে। তবুও, মহারাজকে এটি বোঝানোর জন্য যে, তিনি মহারাজের অনুভূতিতে সহমর্মী, তিনি সম্পূর্ণ সময় মহারাজের সাথেই রইলেন, তাই সুধামার সাথে সাথে মহারাজের সম্পূর্ণ বিলাপের সাক্ষী তিনিও।

মহারাজ ক্রন্দন করে উঠে, নিজের সিংহাসন থেকে ক্রমে ভূমিতে পতিত হলে, ভূমিতেই, একটি চরণ সম্মুখে অগ্রসর করে, দ্বিতীয় চরণকে জানু থেকে মুদ্রিত করে, সেই জানুর উপর হস্তের কনুই স্থাপন করে, ক্রন্দন করলেন বেশ কিছুক্ষণ। তারপর উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, “কেন? … না কেন প্রশ্ন করার অধিকার আমার নেই। সমস্তই আমার কর্মের ফল। না আমি দুশ্চরিত্র হতাম, না আমার সাথে এমন হতো। ধন গেলে, ধন পাওয়া যায়; রাজ্য গেলে রাজ্যও লাভ করা যায়; সময় চলে গেলে, পরিশ্রম করে সময়ের গতিকে অতিক্রমও করা যায়; কিন্তু চরিত্র গেলে, শুধুই তার কর্মফল পরে থাকে, যা আমি এক্ষণে ভোগ করছি।

আমার চরিত্রের কলঙ্ক, একাধিক স্ত্রীকে সম্ভোগ করার প্রবৃত্তি, আমার সমস্ত ছিনিয়ে নিলো আজ। এই চরিত্রই পূর্বে আমার দেবতুল্য ভ্রাতাকে ছিনিয়ে নিয়েছে, আজ সাখ্যাত জননীতুল্য বৌদিকেও ছিনিয়ে নিলো আর পুত্রের থেকেও আপন, সন্তানদের ছিনিয়ে নিলো। জানো বীর্য, আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার উপর আমার খুব ঈর্ষা হতো। আমার ছিল স্ত্রীদেহ সম্ভোগের নেশা, আর স্ত্রীসহ সমস্ত প্রজা আমার থেকে দূরে স্থিত থাকতেন। তাই আমাকে দেহবল ব্যবহার করে স্ত্রীসম্ভোগ করতে হতো।

কিন্তু ভ্রাতা! … তাঁকে প্রজা স্নেহ করতেন, স্ত্রীরা নিজের ঘরের পুরুষের থেকেও অধিক ভরসা করতেন। কিন্তু আমার ভ্রাতার তো স্ত্রীদেহ সম্ভোগের নেশা ছিলনা। তিনি তো স্নেহ করতে ভালো বাসতেন। তাই আমার ঈর্ষা হতো। মনে হতো আমি যদি আমার ভ্রাতার মত প্রজাপ্রিয় হতাম, তাহলে আমাকে আর স্ত্রীসম্ভোগের জন্য দেহবল ব্যবহার করতে হতো না। যুবা ছিলাম, অজ্ঞও ছিলাম পূর্ণ ভাবে। তাই বুঝিনি যে, কামপ্রিয় নন বলেই, সম্ভোগের নেশা নেই বলেই, ভ্রাতা প্রজাপ্রিয়।

বুঝলাম যেদিন প্রথম বৌদিকে দেখলাম। আমার পিতা, মাতা জগদ্ধাত্রীর সন্তান হওয়া সত্ত্বেও, তাঁর প্রতি দুর্বল হয়েছিলেন। জগদ্ধাত্রী, ওই সুর বলতো না, মাতা তিনি। প্রকৃত জননী তিনি। সন্তানের হিতের কারণে ব্যাশ্যা হতে হলে, তিনি তাই হয়ে যান। তাই আমার পিতার কামনাকে ধারণ করলেন, কিন্তু জননীর প্রতিই কামনাকৃষ্ট হবার কর্মফলস্বরূপ, তিনি তাঁর সন্তানদের প্রত্যক্ষ ভাবে ত্যাগ দিয়েছিলেন, পরোক্ষভাবে তো তিনি ত্যাগ দিতেও পারেন না। সুরের কথামতই, তিনি ছাড়া আছেনই বা কে আর।

তাই মাতাকে লাভ করিনি কনোদিন। যখন ভ্রাতা বিবাহ করে নিয়ে এলেন সর্বাম্বাভগিনী, দেবী চিত্তাকে, প্রথমবার জননীলাভের আনন্দ অনুভব হলো অন্তরে। তাঁকে দেখা মাত্রই মনে হলো যেন মাতা জগদ্ধাত্রী জানেন, তাঁকে ছাড়া তাঁর পুত্ররা বড় অসহায় হয়ে আছেন, তাই অন্যরূপ ধারণ করে তিনি এসেছেন। কিন্তু হতভাগ্য আমি। বৌদি আসার আগেই, আমি নিজের চরিত্রকে কলঙ্কিত করে ফেলেছি। … প্রচণ্ড ভয় হলো, যদি আমার কলঙ্ক আমার এই পূর্ণপবিত্র মাতান্যায় বউদির অঙ্গে লেগে যায়! …

প্রথমবার নিজের প্রতি নিজের ধিক্কার জাগলো, নিজেকে নিজে বলে উঠলাম ছি! … বৌদিকে মাতাই মানতে থাকলাম, কিন্তু তাঁর নিকটে যেতে পারলাম না, কারণ বয়সে তিনি আমার মাতা হননা, আর আমার চরিত্র এতটাই নিন্দনীয় যে, প্রজা বুঝবেন না যে তিনি আমার মাতা। অর্থাৎ আমার কলঙ্কের কাজল তাঁর অঙ্গেও লাগিয়ে দেবে। তাই মা পেয়েও মা পেলাম না, বুঝলে সুধামা! … মা পেয়েও, মা পেলাম না।

দূরে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখতাম; আমার দৃষ্টি সর্বক্ষণ তাঁর চরণকে দেখতে চাইতো, যা দেখে অন্তরে অন্তরে প্রণাম করতাম তাঁকে। কিন্তু সামনে যেতে পারতাম না। নিজেকে নিজেই বলতাম, বৌদি আমার ভাব জানেন না। আমি তো কনোদিন তা বলিই নি, সম্মুখেও যাইনি। … কিন্তু আমি ভুল প্রমাণিত হলাম। আমার দাদার অকাল প্রয়াণ হলো। বৌদিকে রাজ্য থেকে নিষ্কাসিত করে দেবার ধ্বনি উঠলো। দ্বিতীয়বার মা-হারা হবার বেদনা হৃদয়ে গুঞ্জন করলো সেই ধ্বনি শুনে।

মনে হলো, দ্বিতীয়বার মা-হারা হবার বেদনা সইতে পারবো না। তাই সকলের বিরোধ করেই, তাঁকে রাজ্যে রেখে দিলাম। রাজা হবার না তো আমি যোগ্য ছিলাম, আর না তো আমি রাজা ছিলাম। কিন্তু বৌদিকে যাতে বিতাড়িত না করা হয়, তাই রাজা হলাম। আদেশ দিলাম সকলের উদ্দেশ্যে আর প্রথমবার বলপ্রয়োগ করলাম কারুকে রক্ষণ করার জন্য। রক্ষণ সম্ভব হলো, অন্তরে একটি আনন্দও অনুভব করলাম। জানিনা কিসের আনন্দ, রক্ষণের জন্য বলপ্রয়োগ করে সফল হবার আনন্দ, নাকি যার চরণ দেখে মন শান্ত হয়, তাঁকে না হারাবার আনন্দ।

কিন্তু অন্তরে অন্তরে এও বললাম, আমি তাঁকে মা মানি, তিনি তো আর তা জানেন না। ভুল প্রমাণিত হলাম। বৌদির কাছে আমাকে যেতেই হলো, কারণ রাজ্যচালনার কনো কিছুই আমি জানিনা, প্রজাহিতের ব্যাপারে আমি কখনো ভাবিনি, তাই জানিওনা প্রজাহিত কি ভাবে করতে হয়। আর যখন তাঁর কাছে গেলাম, তখন জানলাম, তিনি বরাবর জানতেন যে আমি তাঁকে নিজের মা মনে করতাম।

অন্তরে অন্তরে ভেঙে পরলাম। চোখের সামনে উঠে এলো, সেই সমস্ত স্ত্রীদের মুখছবি, যাদেরকে আমি দেহবল ব্যবহার করে সম্ভোগ করেছি। অন্তরে অন্তরে বিদীর্ণ হয়ে গেলাম। আমার মন সেদিন আর্তনাদ করে বলে উঠেছিল, যাদেরকে তুমি মা-জ্ঞানে মান্য করেছ, যাদেরকে তুমি ভগিনী-জ্ঞানে মান্য করেছ, কনো প্রয়োজন নেই, তাঁদের কাছে গিয়ে গিয়ে স্বমুখে সেই কথা বলার। তোমার কেবলমাত্র দৃষ্টিই তাঁদেরকে সমস্ত কিছু বলে দেয়।

আমার দৃষ্টিই বলে দিতো সকলস্ত্রীকে যে আমি তাঁদের সম্ভোগের দৃষ্টিতে দেখি। তাই তো, আমি তো কনোদিন বৌদিকে বলিও নি যে আমি তাঁকে মা ছাড়া অন্যভাবে দেখতে পারিনি, তারপরেও তিনি আমার কেবল দৃষ্টিদেখে সেই কথা জানে গেছিলেন। ধিক্কার জন্মালো নিজের প্রতি। ইচ্ছা হয়েছিল খুব। সকল সেই স্ত্রীদের কাছে যাই, আর সকলের চরণ ধরে ক্ষমা চাই। বৌদিকে বলেও ছিলাম, এমন করার কথা।

বৌদি বলেছিলেন, রাজমুকুট ত্যাগ করে যদি যেতে পারো, তাহলে নিশ্চয় যেতে পারো। তিনি বলেছিলেন, ব্যক্তি করিমুণ্ড নিচু হতেই পারেন, যেকোনো কারুর কাছে। কিন্তু রাজা করিমুণ্ড নত কেবলমাত্র ঈশ্বর অর্থাৎ কুলদেবীর কাছেই হবেন। … মা তিনি, উত্তম সংস্কারে সন্তানকে শোধন করা, তাঁর সহজাত গুণ। কিন্তু আমি ভয়ার্ত। প্রজা আমার উপর অত্যন্ত রুষ্ট, আমারই চরিত্রের কারণে। রাজা, তাই সেই ক্রোধকে অন্তরেই লুক্কায়িত রাখেন। রাজবেশ ত্যাগ করলে, তাঁরা হয়তো, গনপিটুনিদ্বারা আমাকে হত্যা করে দেবেন।

তাই ইচ্ছা হলেও, সাহস হয়নি। বৌদিকে সেই কথাও বলেছি। তিনি হেসে বলেছিলেন, যেমন মা জগদ্ধাত্রীর ইচ্ছা। তিনি চাননা যে তুমি ক্ষমাপ্রার্থনা করে, নিজের কর্মের বোঝা থেকে হাল্কা হয়ে যাও। তিনি চান যে ক্ষমা চাইতে না পেরে, সেই বোঝাকে হৃদয়ে ধারণ করে করে তুমি সেই বোঝার চাপে পিষ্ট হয়ে গিয়ে শুদ্ধ হয়। … তাই তিনি ক্ষমাপ্রার্থনার ইচ্ছা তো তোমাকে করতে দিলেন, কিন্তু ক্ষমা চাইবার সাহস দিলেননা।

মার্গদর্শক ছিলেন তিনি। প্রতিটি মুহূর্তে তিনি আমাকে মার্গদর্শন প্রদান করে করে আমাকে নৃপতি করে তুলেছিলেন। মা ছিলেন তিনি আমার। গর্ভে ধারণ করেন নি, কিন্তু মাতৃত্ব প্রদান করা থেকে কখনো পিছুপা হননি। আদর্শ স্ত্রী ছিলেন তিনি আমার কাছে, কারণ আমি তো মাতা জগদ্ধাত্রী আর তাঁর স্বরূপ, মাতা সর্বাম্বাকে কখনো দেখিনি। … কেবল নিজের চরিত্রের কলঙ্ক তাঁকে কলঙ্কিত যাতে না করে, সেই কারণে তাঁকে স্পর্শ করতাম না।

ইচ্ছা করতো, ছোটো শিশুর মতন তাঁর ক্রোড়ে মাথা রাখি, আর মায়ের স্নেহ লাভ করি। কিন্তু আমি কালিমাময়, আর প্রজা আমার কালিমাতে তাঁকে কালিমালিপ্ত করে দেবেন। তাই এই দুঃসাহস করতে পারিনি। কিন্তু তাঁকে সেই কথা বলতে হতো না। মা যে তিনি। মাকে কি সব কথা মুখ ফুটে বলতে হয়! মা সমস্ত কিছু বুঝে যান, না বললেও বুঝে যান। তাই তো তিনি স্নেহ প্রদান করতে কখনো পিছুপা হতেন না। মার্গদর্শন করার ক্ষেত্রে, তিনি কখনো দ্বিতীয়বার ভাবতেন না।

কখনো ভাবতেন না যে, হতেও পারে যে তাঁর কথাকে অমান্য করা হতে পারে। মনেপ্রাণে, দেহেচেতনায় তিনি ছিলেন মহীয়সী। আর সেই কারণেই তো তাঁর তিন তিনটি মাতা জগদ্ধাত্রী প্রদত্ত সন্তানই হয়েছেন পবিত্র। ছন্দ তো সম্পূর্ণ ভাবেই যেন আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। এমন অনেক কথা ছিল, যা আমি আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে বলতে পারতাম না। সেই সমস্ত কিছু তাঁকে বলেছি।

সম্মুখে দাঁড়িয়ে, কিশোর ছন্দকে নিজবক্ষে আলিঙ্গন করে বলেছি যে, আমি তাঁর পিতাকে ঈর্ষা করতাম, কিন্তু অপার স্নেহ আর সম্মান ছিল আমার তাঁর প্রতি। তিনি আমার কাছে একজন ভগবান ছিলেন। তাই যতই ঈর্ষা থাকুক, তাঁর অবজ্ঞা করার চিন্তাও করতে পারতাম না। ছন্দের চরিত্রও ঠিক তাঁর পিতার মতন। তাঁর পিতা যেমন জানতেন যে আমি তাঁর আজ্ঞার অবহেলা করবোনা, কিন্তু তিনি কারুকে পরাধীন রাখতে চাননা, তাই আমাকেও পরাধীনতা প্রদান করবেন না বলে আদেশই দিতেন না। ছন্দও ঠিক তেমন।

তাল প্রকাণ্ড বলবান। অসম্ভব তাঁর দেহবল, কিন্তু তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতা যেন তাঁর পিতা, কনিষ্ঠ ভ্রাতা যেন পরমমিত্র, যাকে সে সর্বক্ষণ চোখে হারায়। আর মাতা, দেবী চিত্তা। তালের কাছে তো তিনিই সাখ্যাত মা জগদ্ধাত্রী। সেই কারণেই তো এত বল থাকা সত্ত্বেও মদাচ্ছন্নতা তাঁর হৃদয়কে গ্রাস করতে পারেনি। আর সুর! না, আমার কাছে শব্দ নেই, তাঁর ব্যাখ্যা করার। সেই অতীব। সর্বক্ষেত্রেই সে অতীব। মেধায়, একাগ্রতায়, নিষ্ঠায়, কৌশলে, বলে, জ্ঞানে, ভাবে – সমস্ত কিছুভাবে সে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু মজার কথা এই যে, এই সমস্ত কিছু প্রতিভা তাঁর প্রাপ্ত প্রতিভা নয়, আর না তা তার লব্ধ প্রতিভা। কেবলই জগন্মাতার প্রেমলাভ করে তৃপ্ত সুর, জগন্মাতাকে প্রেম প্রদান করার ব্যকুলতার কারণে, অক্লান্ত পরিশ্রম করতে থাকলে, এই সমস্ত প্রতিভা তাঁর অন্দরে জাগ্রত হয়, এবং স্থাপিত হয়।

সত্য বলতে গেলে, এই সমস্ত গুণ তাঁর কাছে প্রেমলব্ধ। … আর সেটিই আমার কাছে সর্বোত্তম বিস্ময়। … দেবী চিত্তার পবিত্রতা, তিন তো মাতা জগদ্ধাত্রী ও মাতার জগদ্ধাত্রীর উৎস, অর্থাৎ মাতা সর্বাম্বার প্রতিফলন মাত্র। ছন্দের সরলতা, উন্নতমানসিকতা, মহারাজ নিষ্ঠাবান তাঁর বিকল্প। কিন্তু তালের বলের বিকল্প কি? তালের নিষ্ঠার বিকল্প কি? সুরের প্রেমের বিকল্প কি?

সুরের ন্যায় তো কেউ নেই যিনি স্বয়ং মাতার উদ্দেশ্যে বলার সাহস রাখে, “তোমার প্রেমে আমি আপ্লুত, তোমার মত প্রেম করার সামর্থ্য নেই, কিন্তু তাও যতটা সামর্থ্য তুমি স্বয়ং দিয়েছ, সেই সামর্থ্যদ্বারা তোমাকে প্রেম দিতে চাই। কেবল আমাদেরই প্রেমলাভের অধিকার আছে? না, কেবল সন্তান প্রেম গ্রহণ করে যাবে, আর মাতা প্রেম দিয়ে যাবে, তা হতে পারেনা। এবার মাতাকেও প্রেম পেতে হবে। তিনি কেবল দাতা হয়ে থেকে যাবেন। … না অসহ্যকর অনুভূতি তা। তাঁর যেন প্রেম লাভের অধিকারই নেই! … না তোমাকেও এবার প্রেম গ্রহণ করতে হবে।

শুধু সন্তানই আনন্দে থাকবে! না এবার সেই সন্তানদের আনন্দ দেবার প্রয়াসে যিনি নিদ্রাত্যাগ করেছেন সমস্তকালের জন্য, সেই মাকেও আনন্দ লাভ করতে হবে। সেই মাকেও স্নেহ পেতে হবে, সেই মাকেও আদর খেতে হবে। সে মাকেও সন্তানের ক্রোড়ে শুতে হবে। সন্তানের কোমল হাতের স্পর্শ তাঁকেও তাঁর মস্তকে গ্রহণ করতে হবে। কেন খালি সন্তান তাঁর ক্রোড়ে মাথা রেখে দুঃখের কান্না কাঁদবে? কেন যার ক্রোড়কে সন্তানরা সর্বদা সিক্ত করে থাকে, নিজেদের বেদনার অশ্রুদিয়ে, তাঁর ক্রন্দনের অধিকার থাকবে না!

না, এবার সেই মাকেও সন্তানের ক্রোড়ে মুখ রেখে কাঁদতে হবে। খালি সন্তান মায়ের কাছে আবদার করে যাবে, আর মা সেই আবদারের পুড়ন করে যাবেন নয়তো শাসন করবেন! না, এবার সেই মাকেও আবদার করতে দিতে হবে। এবার সন্তানের দায় মাতার আবদার পুড়ন করার। এবার মাকে স্নেহ করার, মাকে প্রেম করার, মাকে শাসন করার, মাকে কাঁদতে দেবার, মাকে আনন্দ করার সুযোগ দিতেই হবে সন্তানদের। সকলেই তাঁর সন্তান। কারুকে না কারুকে তা শুরু করতে হবে। কেউ না করলে, শুরু আমি করবো”।

এই সন্তান কি করে এমন অকালে চলে যেতে পারে! … বীর্য, সুধামা, আমার হৃদ মানতে চাইছে না। সুরের অকাল প্রয়াণ আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আমি মানতে পারছিনা সুরের প্রয়াণকে”।

সুধামা সান্ত্বনা প্রদান করার জন্য বললেন, “কিন্তু মহারাজ, প্রকৃতির প্রকোপ কি আর বিচার করে, কে সেই কোপের পাত্র হবেন আর কে হবেন না! প্রকৃতির রোষানলের সম্মুখে যেই পরেন, তিনিই পিষ্ট হয়ে যান”।

রাজা করিমুণ্ড ক্ষিপ্র হয়ে উঠলেন প্রমাদের মধ্যেই আর বলে উঠলেন, “কেন এমন বলছো সুধামা! … কেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসার পরেও, কিছু শিশুকে ভূমিতলে লুকিয়ে নেননা প্রকৃতি? বৃক্ষপরে তুলে রক্ষা করেন না! … না না সুধামা, এহেন বিচার স্বয়ং সুর আমাকে প্রদান করে, আমার নেত্রে অঙ্গুলি প্রদান করে বলেছিল যে, প্রকৃতি জননী। যদি তিনি কারুকে রক্ষা করতে চান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও তাঁকে রক্ষা করেন।

তাই আমার হৃদয় কিছুতেই মানতে চাইছে না যে, দেবী চিত্তার, ও তাঁর পুত্রদের আর বিশেষ করে সুর ও তালের এমন অকাল মৃত্যু অনুষ্ঠিত করেছেন প্রকৃতি। কিছুতেই মানতে ইচ্ছা করছে না আমার এই কথাকে সত্য বলে যে, তাঁরা আর তাঁদের দেহে নেই। তাঁদের যে অনেক কাজ অসম্পন্ন থেকে গেছে এখনো। জম্বুদেশের ভূমির প্রয়োজন তাঁদেরকে। জম্বুদেশের মানুষ সুরতালছন্দকে দেখে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল। জম্বুদেশের মায়েরা নিজেদের সন্তানদের থেকেও অধিক আশাবাদী এই তিন রাজপুত্রের উপর করা শুরু করেছিলেন। আর স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা তাঁদেরকে ভরসা করতেন।

যদি দুর্যোগের কথাই বলো সুধামা, তাহলে তো মাতা সর্বাম্বা স্বয়ং মহামাতৃকা, স্বয়ং পরাপ্রকৃতি তিনি! তিনি এমন কি করে হতে দেবেন! না না, কোথাও কনো ভ্রান্তি হচ্ছে আমাদের, দেবী চিত্তা ও চিত্তাজদের মৃত্যু হয়নি। হতে পারেনা এখন সেই হত্যা”।

ব্যথিত মহারাজ করিমুণ্ডকে বাস্তবের সাথে সম্মুখীন করার জন্য, এবার বীর্য বললেন, “মহারাজ, তাঁদের শবদেহকে আপনি স্বয়ং স্পর্শ করেছেন। আমরা নিজেদের নেত্রে দেখেছি তাঁদের শবদেহ। সেটি কি করে ভুল হতে পারে!”

সেই কথা শুনে ক্রন্দনে ফেটে পরলেন মহারাজ করিমুণ্ড। আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি, সুউচ্চ কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, “বৌদি, তুমি তো জানো তুমি আমার মা ছিলে। একজন সন্তানকে কতবার অনাথ করবে মা! … পিতাকে হারিয়েছি, ভ্রাতাকে হারিয়েছি, দু-দুবার পিতাকে হারিয়েছি; মাতা জগদ্ধাত্রীকে হারিয়েছি, দেবী চিত্তাকে হারালাম, দু-দুবার মাতাহারা হলাম আমি। আর এবার তো সন্তানহারা হলাম। … মা, এবার আমার মৃত্যু অনুষ্ঠান করে দাও। আর বেদনা সহন করার সামর্থ্য আমার নেই। এবার আমার মৃত্যু নিশ্চিত করো মা”।

সেদিন মহারাজের ক্রন্দন সকল চন্দননগরবাসী শুনেছিলেন। তাঁর উপর যার যা ক্রোধ, অভিযোগ যা কিছু ছিল, সমস্ত গলে জল হয়ে গেল। তাঁর দ্বারা সম্ভোগনিপীড়িত স্ত্রীরা একত্রিত হয়ে এসে, তাঁর সাথে সাখ্যাত করলে, করিমুণ্ড তটস্থ হয়ে, মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলেন একপাশে।

সেই দেখে সেই স্ত্রীরা বললেন, “মহারাজ, আপনিও জানেন, আপনি আমাদের উপর অত্যাচার করেছেন। আর আমরাও জানি যে, আজ আপনি সেই কৃত্যের জন্য অনুতপ্ত। … আমরা মেনে চলতাম যে, আপনি সম্পূর্ণ নির্দয়, কিন্তু আজ জেনেগেছি যে, আপনি হৃদয়হীনা নন। তাই মহারাজ আমরা আজ বলতে এসেছি আপনাকে যে, যদি ক্ষমা করার বল মাতা জগদ্ধাত্রী দেন, তাহলে আমরা আপনাকে আপনার সমস্ত কৃত্যকে ক্ষমা করতে চাই। মহারাজ, জানি আপনি বেদনাগ্রস্ত আজ। বেদনাগ্রস্ত সমস্ত প্রজা। কিন্তু মহারাজ, আপনিই আমাদের আজ শেষ ভরসা। আপনি এই ভাবে ভেঙে পরলে, প্রজার এই রাজ্য ছেড়ে পলায়ন করা ছাড়া আর কনো মার্গ উন্মুক্ত থাকবেনা”।

করিমুণ্ড এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। যেখানে দণ্ডায়মান ছিলেন, সেখানেই নতজানু হয়ে বসে পরে, বিনাশব্দে ক্রন্দন করতে থাকলেন আর বলতে থাকলেন, “স্ত্রী যে মায়ের জাত, তা আপনারা আজ বুঝিয়ে দিলেন দেবীরা। … যেই অপরাধ আমি আপনাদের সাথে করেছি, তাকে কি সত্যই ক্ষমা করা যায়! … কি করে পারলেন আপনারা ক্ষমা করার কথা ভাবতেও! … সুর বলতো, স্ত্রী সব অবস্থাতেই মা। … ভগিনী, বৌদি, সখী, কন্যা, পত্নী, শ্যালিকা, কন্যা, পুত্রবধূ, এগুলি কেবলই সং। প্রকৃত অর্থে, তাঁরা শুধুই মা। বিভিন্ন বেশ ধারণ করে, সেবা করে চলা মা তাঁরা।

আজ তার কথা যে কতটা ধ্রুবসত্য, তা অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পারছি। সত্য বলছি দেবী, আর বেঁচে থাকার কনো ইচ্ছা নেই, আর জীবিত থাকার জন্য শ্বাস গ্রহণের ইন্ধনও লাভ করতে পারছিনা। আর সেই কালেই আপনারা এসে যেই আশা আর ভরসা প্রদান করলেন, তা আমাকে পুনরায় জীবিত থাকার প্রেরণা দিচ্ছে আর বলছে, তোকে সকলের দরকার, এখনো তুই স্বার্থপর হয়ে থাকবি!…

না দেবী, আর কনো কিছু পাবার ইচ্ছাও নেই আমার। কিন্তু আমার প্রজা, যারা আমার ভ্রাতাকে, আমার বৌদিকে, আমার সন্তান চিত্তাপুত্রদের এতটা ভরসা করতেন, তাঁদেরকে একা ফেলে যাবো না। শুধু তাঁদের জন্যই এবার জীবিত থাকবো। কথা দিলাম দেবীরা। যেই ক্ষতি আমি আপনাদের হৃদয়ে করেছি, তাকে তো আমার পক্ষে পুড়ন করা সম্ভবই নয়। কিন্তু আপনারা যে আজ আমাকে ক্ষমা করার প্রয়াসও করে মাতৃত্বের প্রমাণ প্রদান করলেন, সেই মাতৃত্বকে নিরাশ করবো না দেবী।

ছন্দ বলতো, কুকর্মকে সুকর্ম দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায়। সে বলতো, নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়ে সেবা করো। নিজের মান মর্যাদা সুখ আনন্দ সমস্ত কিছুকে নিজের হস্তে হত্যা করে সেবা করলে, কুকর্মকে সহজেই ঢেকে দেওয়া যায়। দেবী আজ আমি সেই সুকর্ম করতে চাই যাতে মৃত্যুর পর, দেবী চিত্তার সাথে সাখ্যাত করতে পারি। বলতে পারি তাঁর কাছে গিয়ে যে, বৌদি তোমাকে আমি সর্বদা মাতাই জ্ঞান করেছি, সজ্ঞানে নয়, অজ্ঞানেও তোমাকে মাতাই জেনেছি, মাতাই মেনেছি। … এত কুকর্ম আছে আমার, আর দেবী চিত্তা এতটাই পবিত্র যে, আমি কিছুতেই তাঁর সাথে সাখ্যাত করতে পারবো না। তাই আমাকে সুকর্ম করতেই হবে, অনেক সুকর্ম করতে হবে, নাহলে দেবী চিত্তার কাছে আমি যেতেই পারবো না”।

মজারাজ করিমুণ্ডের এই আচরণ, বীর্য তথা তাঁর ভগিনী, ও করিপুত্রদের বিচলিত করে দিল। তাঁরা ভাবতে থাকলেন, চন্দননগর কি চিত্তাপুত্রদের গত হবার পরেও তাঁদের হস্তাগত হবেনা!

একদিকে যেমন ভাবে বিলাপ পর্ব হচ্ছিল, যেখানে রাজা করিমুণ্ড মনে করছিলেন যে, তিনি তাঁর কর্মফল ভোগ করছেন, আর তাঁকে শুদ্ধ হতে হবে, সেখানে পূর্ণশুদ্ধ রাজা নিষ্ঠাবানের বিলাপ ছিল ভিন্ন, আর সত্য বলতে আরো অধিক ভয়ঙ্কর।

তিনি আজ ক্রুদ্ধ। প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ। আর ক্রুদ্ধস্বরে ক্রোধের মাধ্যমে তিনি বিলাপ করে বললেন, “চিত্তাপুত্রদের কাছে পরাজিত হয়ে আমি অপমানিত হতাম না মা, যদি সেই যুদ্ধের ডঙ্কার বীর্য না পিটত। আমি অপমানিত হইনি মা, লজ্জিত হয়েছিলাম সেদিন। গ্লানিতে ভরে গেছিলাম সেদিন, আর গ্লানি নিজের জন্য হইনি, তোমার জন্য হয়েছিলাম। সেদিন তোমার সাথে ছলনা করা হয়েছিল। তোমারই ভক্তের ভক্তিকে ব্যবহার করে, একজন ছলনাকারী তোমার অন্য ভক্তের সাথে ছল করে চলে যায়, অথচ তুমি কিচ্ছু করতে পারো না।

অত্যন্ত আনন্দিতও হয়েছিলাম সেদিন মা। সুরের স্পর্শ আমি লাভ করেছিলাম, আর সেই স্পর্শ যেন তুমি আমার মস্তক স্পর্শ করে যেদিন আশীর্বাদ আর অভয়দান দিয়েছিলে, সেই স্পর্শের সমান পবিত্র স্পর্শ। চমকিতও হয়েছিলাম। যতক্ষণ না তাঁরা নিজেদের বাস্তবিক পরিচয় প্রদান করেছিলেন, আমি হতবাক হয়ে ছিলাম যে, কে এই দিব্যব্যক্তিত্ব, যার স্পর্শ তোমার স্পর্শের সমরূপ!

যখন তাঁদের পরিচয় লাভ করেছিলাম, সেদিন বেদনাগ্রস্তও হয়েছিলাম আবার আনন্দিত হয়েছিলাম। বেদনা পেয়েছিলাম এই কারণে যে, আমার যদি একটি কন্যা থাকতো, তাহলে সুরকে আমার জামাতা করতাম। পিতা হারিয়েছে সে, তাই পিতার স্নেহ দিতাম। যে তোমাকে স্নেহ দেবার জন্য ব্যকুল, তাঁকে স্নেহ করার কতই না আনন্দ হতো। কিন্তু আমার কনো কন্যা নেই, তাই আমি তাঁকে না তো জামাতা করে লাভ করতে পারবো, আর না তাঁকে পিতৃসুখ প্রদান করতে পারবো।

আর আনন্দ হয়েছিল এই জেনে যে, রাজ্য হারিয়ে হলেও, তোমার এক অসামান্য ভক্তের সাথে আলাপ হলো। সে যে এক সম্পূর্ণ অর্থে কৃতান্তিক। না আছে তাঁর নিজেকে কর্তা ভাবার ইচ্ছা, আর না সে নিজেকে কর্তা জ্ঞান করে। তাঁর কাছে যে এক তুমিই কর্তা। আর সেই জ্ঞান তাঁর আন্তরিক বোধ, আন্তরিক অনুভব, অর্থাৎ তাতে দ্বিতীয় কারুর হস্তক্ষেপ নেই। না সংস্কারদাতার আর না কনো গুরুর। অর্থাৎ পূর্ণপবিত্র সে।

আনন্দিত হয়েছিলাম কারণ একজনের সাথে সাখ্যাত হয়েছিল, একজনের স্পর্শসুখ পেলাম, যিনি আমার পরবর্তী প্রজন্ম এবং সে তোমাকে অপার স্নেহ করে। না না, সে আমার থেকেও শ্রেয়, আমার থেকেও উন্নত প্রেমী তোমার। আমি তো তোমার প্রেম আস্বাদন করে পুলকিত আর সর্বক্ষণ ফিকির খুঁজি তোমার প্রেম আরো আরো লাভ করার। লোভী আমি, আত্মবোধ তো এতেও রয়েছে। আমিত্ব তো এতেও রয়েছে নাহলে কি আর প্রেম লাভের লোভ করতাম। কে ভোগ করতো এই প্রেম, যার লোভ আমি করতাম? আমার চেতনা, আমার অর্থাৎ আত্ম। আত্মের কি চেতনা থাকে!

কিন্তু তাকে দেখে আপ্লুত হয়েছিলাম। সে যে আত্মের থেকে পূর্ণ ভাবে মুক্ত। তার তো এই বোধ যে, মা অর্থাৎ তুমি তো স্নেহ করেই যাও। তোমার থেকে স্নেহ না চাইলেও, মার্গদর্শন না চাইলেও, প্রেম না চাইলেও, প্রেম, স্নেহ মার্গদর্শন প্রদান করতেই থাকো। কিন্তু তোমাকে কে স্নেহ করবে? তোমাকে কে প্রেম করবে? তোমাকে কে একটু বিশ্রাম দেবে!

অর্থাৎ তাঁর ভাবের মধ্যে ‘আমি’, ‘আমার’ ইত্যাদির লেশমাত্রও নেই। কেবলই তুমি, তুমি আর তুমি। তাঁর পবিত্রতা দেখে যতটা না চমকিত হয়েছিলাম, তার থেকেও অধিক পুলকিত হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল যে, আমার পরবর্তী প্রজন্ম তোমার দ্বারা স্থাপিত কৃতান্তিক ধর্মকে অন্য মর্যাদায় নিয়ে যাবে। এটিই তো কৃতান্তিক ধর্মের মধ্যে কথা। মাকে পাওয়ার কথা তো তন্ত্রও বলে, কিন্তু কৃতান্ত তো মা হবার কথা বলে। মায়ের মা হওয়া, মায়ের সমস্ত সন্তানের মা হয়ে ওঠা।

সুর যে সেই পথেরই আরোহী ছিল। তা দেখে হৃদয় ভরে গেছিল। মনে হয়েছিল একবার তোমার কাছে একটি পুত্রীই কামনা করি, আর সেই পুত্রীর সাথে সুরের বিবাহ দিই। জামাতার সাথে দেখা করতে বারংবার তাঁর কাছে যেতে তো পারবো। তাঁকে স্পর্শ তো করতে পারবো। এমন ভক্তকে স্পর্শ করার আনন্দই তোমাকে লাভ করার আনন্দের সমান।

সে যে বিশ্বাসের অর্থ ঠিক তেমনটাই বোঝে, আর স্বাভাবিক ভাবে তা বোঝে, যেমনটা তুমি কৃতান্তিক ধর্মস্থাপনের কালে বলেছিলে, অর্থাৎ যাতে লেশ মাত্রও অবিশ্বাস নেই। যিনি একে বিশ্বাস বলেন যে, তুমি নিশ্চয়ই তার কামনাপূর্ণ করবে, তিনি তোমাকে বিশ্বাস করলেন নাকি নিজের কামনাকে? কি অদ্ভুত ভাব সুরের! কি নিখুঁত ভাব তাঁর! নিখুঁত তাঁর বিশ্বাস। তোমাকে বিশ্বাস করার অর্থ, তুমি যা আনবে জীবনে, সম্মুখে, তাই তোমার মার্গদর্শন।

যদি কামনা জাগাও, তাও আমাদের অন্তরে লুক্কায়িত আমিত্বকে সম্মুখে টেনে আনার কৌশল। যদি সেই কামনাকে পূর্ণ করো, তাহলে আমার আমিত্ব আরো অনেক উপস্থিত, যার লেশমাত্রই সম্মুখে এসেছে, আর অন্তরে অনেক অবশিষ্ট রয়েছে। আর যদি সেই কামনাকে অপূর্ণ করে রেখে হত্যা করো, তাহলে আমার আমিত্ব যেই লেশমাত্র রয়েছে, তাকে তুমি হত্যা করতে উদ্যোগী। অসম্ভব বিশ্বাস তাঁর। সর্বক্ষেত্রে তোমাকে বিশ্বাস, সর্ব কিছুতে তোমাকে কর্তা জ্ঞান করা, আর সর্বক্ষণ এই জ্ঞান করা যে তুমি ভ্রান্তি করতেই পারো না।

কামনা প্রকাশ করালেও তুমি সঠিক, কামনা করতে না দিলেও। কামনাকে পূর্ণ করলেও তুমি সঠিক, কামনাকে অপূর্ণ করে রাখলেও। এমন বিশ্বাস যে আমারও নেই, আর এমন বিশ্বাসই তোমার কাম্য, আর তাই তো তুমি কৃতান্তিক ধর্মস্থাপনের ক্ষেত্রে এমন বিশ্বাসেরই উল্লেখ করেছিলে।

প্রকাণ্ড প্রেম তোমার প্রতি, প্রকাণ্ড স্নেহ তোমার প্রতি। চমকিত করে দেয় তাঁর প্রেমের স্পর্ধা। বলে কি সে! মা কি খালি প্রেম করবেনই। তাঁর কি প্রেম লাভ করার কনো অধিকার নেই! … তিনি কেবল ক্রোড় দেবেনই, ক্রোড় লাভ করার কনো অধিকার নেই তোমার! … কেন মা-ই কেবল চোখের জল মোছাবেন! কেন আমরা মায়ের চোখের জল মোছাবো না! কেন আমরা খালি বসে থাকবো, মা আমাদের চোখের জল মুছিয়ে দেবেন বলে!

মা, এমন প্রেম দেখে আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেছিলাম। আপ্লুত হবো নাকি নিজের প্রেমের তুচ্ছতাকে দেখে বেদনাগ্রস্ত হবো, কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না। মনে হয়েছিল, আমি বৃথাই নিজেকে তোমার ভক্ত বলি। অহংকার করি কেবল নিজের। কই সে তো নিজেকে ভক্ত বলে দাবিও করেনা। কিন্তু তাকে দেখো, সে মায়ের থেকে প্রেম, স্নেহ ইত্যাদি লাভের কথা চিন্তাই করেনা। তার তো বক্তব্য, মা তো প্রেম করেই থাকেন, না চাইলেও করেন। মা তো স্নেহ করতেই থাকেন, না কামনা করলেও করেন।

কিন্তু তাঁর বক্তব্য, শুধু কি মা-ই প্রেম করবেন! তাঁর অধিকার কি কেবল প্রেম করাতেই! তাঁর কি প্রেম পাবার কনো অধিকার নেই! … সে তোমাকে প্রেম করতে চায়। তোমার চোখের জল মোছাতে চায়, তোমার অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তোমার স্বেদস্রোতকে স্নেহ করে মোছাতে চায়। সে তোমার সাথে নিশিদিন জাগতে চায়, আর বলে যদি মা নিজের সন্তানের জন্য দিবানিশি জেগে থাকেন, সেই সন্তানরা তো আমাদেরও ভাইবোন। কই আমরা তো তাঁদের জন্য দিবানিশি পরিশ্রম করিনা!

একা মায়েরই দায় তাঁর সন্তানদের জন্য পরিশ্রম করার! আমরা তাঁর সন্তান হয়ে সামান্য পরিশ্রম করে, তাঁর পরিশ্রমকে একটু লঘু করতে পারিনা! কেমন সন্তান আমরা, যে কেবল নিজের পরিশ্রম কম করতে চায় আর মায়ের পরিশ্রম বৃদ্ধি করতে চায়! … সে যে মা, তোমার চরণের আলক্ত হতে চাইতো, আর বলতো, মায়ের চরণে পীড়া যেই পাথর দেবে, সেই পাথর আগে আমাকে বিঁধুক, তারপর মায়ের চরণ পর্যন্ত সে পৌঁছাবে।

অপার স্নেহ দেখেছি, অপার প্রেম দেখেছি তাঁর চোখে মা। যতই আমি বলি, আমি তোমার সন্তান, সন্তান, কিন্তু কনোদিনও ভুলতে পারিনি যে, তুমি ঈশ্বরী, তুমি সর্বেশ্বরী। তাই তো সর্বদা এই মেনে যেতাম যে, তুমি তো নিরাকার, তোমার আবার কিসের পীড়া! তুমি তো নির্বিকার, তোমার আবার কিসের বেদনা! … ওই ছোট্ট ছেলে, সুর এসে বলল, সেই নিরকারাই যে আমাদেরকে উদ্ধার করতে স্বাকারা হয়ে প্রকৃতি, কালী আর নিয়তি। সাকারের তো বেদনা থাকে, থাকেনা! সাকারের তো পীড়া থাকে, থাকেনা! … সেই পীড়ার কি? সেই বেদনার কি?

স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম সেই কথা শুনে। নিজেকে অতি অতি তুচ্ছ জ্ঞান হয়েছিল, আর আনন্দে হৃদয় ভরেগেছিল এই মনে করে, এবার তো তোমাকে প্রেম করার কেউ এসেছেন। … বড় আশা করে বুক বেধেছিলাম মা। দৈহিক ভাবে তার সাথে আমার কনো সম্বন্ধ নেই। কিন্তু তাও সর্বক্ষণ মনে হতো, আমার পুত্র, আমার সখা, আমার গর্ব, আমার আনন্দ। তাই মা, মনে হয়েছিল, বেশ হয়েছিল যে তুমি আমার হয়ে সেদিন যুদ্ধ করতে আসো নি। যদি আসতে, তাহলে এই শ্রেষ্ঠ মানবটিকে জানতেও পারতাম না, চিন্তেও পারতাম না।

কিন্তু আজ! মা, আজ সেই সুরকে তুমি হত্যা করে দিলে, প্রকৃতিরূপ ধারণ করে! … সেবারও তোমার সাথে ছল হয়েছিল, তোমার এক ভক্তকে তোমার অন্য ভক্তের সম্মুখে এনে, তোমাকে বশীকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু এবারে! এবারে তো স্বয়ং তোমাকে বশীকরণ করা হলো মা! … তোমাকে বশীকরণ করে, স্বয়ং তোমারই হাতে তোমার এতপ্রিয় সন্তানকে হত্যা করালো! …

ধিক্কার আসছে মা আজ। তুমি স্বয়ং শ্রেষ্ঠ অবতাররূপ ধারণ করে উপস্থাপন করার পরেও, তোমার সাথে এমন ছল কি করে করতে পারে কেউ? কি লাভ তাহলে তোমার এই শ্রেষ্ঠ অবতাররূপ ধারণ করে অবস্থান করার। ত্যাগ করে দাও তাহলে এই রূপ। যখন এই রূপ দ্বারা তুমি তোমার প্রিয়সন্তানকেই রক্ষা করতে পারবেনা, তখন এই রূপের কি প্রয়োজন!”

ক্রোধে আস্ফালন করতে থাকলে, চারিপাশে প্রথমে ধূম্র দেখলেন নিষ্ঠাবান, আর শেষে শূন্যসমান অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে দেখলেন, তাই বেশ বুঝলেন মাতা সর্বাম্বার প্রকাশ হচ্ছে তাঁর সম্মুখে। দিব্য স্বর তাঁর কানে এসে পৌঁছল, “এখানেই তোর সাথে সুরের পার্থক্য নিষ্ঠা”।

শব্দকে অনুধাবন করে, কোন দিশায় মাতা আবির্ভূত হয়েছেন, তা নিশ্চয় করে, নিষ্ঠাবান সেই দিকে তাকালেন। সম্মুখে তাঁর সাখ্যাত জগজ্জননী, ব্রহ্মময়ী মাতা, দেবী সর্বাম্বা। নতজানু হয়ে উপস্থাপন করে নিষ্ঠাবান এবার ক্রন্দনে ফেটে পড়ে বললেন, “অজ্ঞান আমি মা, কিন্তু বড় আশা জেগেছিল সুরকে দেখে, সে তোমাকে তাই দেবে মনে হয়েছিল, যা দেবার কথা আমরা ভাবতেও পারিনি কনোদিন। আশাহত হয়েছি মা। আশাহত হবার জন্য কুকথা বলে ফেলেছি। ক্ষমা করে দাও মা!”

মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “সুর বলে, মা আমি তাঁর। ক্রোধের বসে মাকেই তো কটুকথা বলে সন্তান। কটুকথা কি মাকে অপমান করার জন্য হয়, নাকি তা স্নেহ করারই আরেক রূপ! … পুত্র নিষ্ঠা, সুর হলে বলতো, মাকে বশীকরণ করা যায়না। যারা নিজেদেরকে কর্তা জ্ঞান করে, তাদের ভ্রম এই যে তাঁরা প্রকৃতিকে, সময়কে, নিয়তিকে বশ করে ফেলেছে। … সত্য তো এই যে, যা কিছু হয়, তা মা-ই করেন। যিনি কর্তাবোধ ত্যাগ করে কৃতান্তিক হয়েছেন, তিনি প্রত্যক্ষ করেন মায়ের লীলা, আর যিনি কর্তাবোধ ধারণ করে থেকে পরমাত্মপূজারি, তিনি বোধ করেন যে, তাঁরা মাতাকে বাধ্য করেছেন, এমন করতে”।

নিষ্ঠাবান বললেন, “কি বলছো মা, আমি কিছু বুঝতে পারছিনা! … আমাকে বুঝিয়ে দাও মা!”

মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “অনেকে অপেক্ষা করছে আমার দেহত্যাগের। তাই আমি এবার দেহত্যাগ করবো পুত্র। সুপ্ত অধর্মকে হত্যা করা যায়না। তাই যেই অধর্ম সুপ্ত হয়ে বিরাজ করছে, তাকে প্রত্যক্ষ হতে দিতে হবে। আর তা হতে দেবার জন্য আমার দেহত্যাগ করা অত্যন্ত আবশ্যক, কারণ আমার উপস্থিতির কারণে, সেই অধর্মীরা নিজেদের অধর্মকে প্রকাশ্যে আনতে ভয় পাচ্ছে। … তাই আমি দেহত্যাগ করবো”।

নিষ্ঠাবান ক্রন্দন করে মাথা নেড়ে উঠে বললেন, “না মা, দয়া কর, কৃপা করো। আমি তোমার নিতান্ত একটি ক্ষুদ্র সন্তান। আমার কথাতে অভিমান করে তুমি দেহত্যাগ করোনা। ছি ছি! এ আমি কি বলে ফেললাম!”

মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “দেখলে নিষ্ঠা! সেই কর্তাবোধ। সেই নিজেকে কর্তা ভেবেই চললে। নিজেকে কর্তা জ্ঞান করে মনে করতে থাকলে যে, তুমি কিছু বলেছ আমাকে, তাই আমি এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। … পুত্র, আমার পুরো কথা শোনো। আমার কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু তা সম্পন্ন করতে গেলে, যেই অধর্ম সুপ্ত, তাকে প্রকাশ্যে আন্তেই হবে। যেই অধর্ম মনের অন্তরে থাকে, তাকে অধর্মী বলা যায়না। তাকে অধর্ম করাতে হয়, তবেই তাকে অধর্মী বলা যায়। এবার সময় এসেছে, সেই মনের অন্তরে সুপ্ত অধর্মকে প্রকাশ্যে এনে, তাদেরকে অধর্মী বলে সনাক্ত করার, আর তাঁদের দমন করে কৃতান্তিক ধর্মকে স্থাপন করার।

তাই পুত্র, আমাকে দেহত্যাগ করতে হবে। তোমার কথাতে নয়, আমার কর্তব্যের আহ্বানেই আমি আমার দেহত্যাগ করবো। … তবে ওই যে বললাম, আমার কর্ম এখনো সম্পন্ন হয়নি। তাই আমাকে অবস্থান করতেই হবে। তবে ওই যে বললাম, আমি এই দেহে বিরাজ করলে, সেই অধর্মীরা নিজেদেরকে অধর্মী রূপে আত্মপ্রকাশিত করবে না। তাই আমি এই দেহত্যাগ করবো, তাদের নিজেদের অধর্মী দানবীয়তাকে প্রকাশ্যে আসার সুযোগ দেব, আর তবেই সেই অধর্মের নাশ করবো।

সেই কারণে পুত্র, আমি এই দেহ শূন্যপুরে ইতিমধ্যেই ত্যাগ করে তোমার কাছে এসেছি। আমি তোমার পুত্রী হয়ে জন্ম নেব। তবে শিশু কন্যা হয়ে নয়, আমি ১২ বৎসরের কন্যা হয়ে জন্ম নেব তোমার কাছে। আর এই কথা, অর্থাৎ তোমার কন্যা যে আমি স্বয়ং, তা কেবল তুমি আর কিছু কৃতান্তিক সাধু, যারা এই ক্ষণে আমার আর তোমার সংলাপ শুনছেন, তাঁরাই জানবেন, অন্য কেউ নন। … আর কি হচ্ছে তুমি বুঝতে পারছো না, তাই না! … গোপনে আলাপ করো রাজা করিমুণ্ডের সাথে, তিনি তোমাকে সমস্ত কিছু বিস্তারে বলে দেবেন। আমার এই পত্রটি সঙ্গে নিয়ে যাও। এই পত্র দেখে তিনি নিশ্চিত হবেন যে, আমিই তোমাকে তাঁর কাছে প্রেরণ করেছি, আর তবেই তিনি সমস্ত কথা তোমাকে ব্যক্ত করবে, তবে স্মরণ রেখো, অত্যন্ত গোপনে। প্রয়োজনে, তোমার এই অজ্ঞাত রাজ্য, যার কথা কেউ জানেন না, সেখানেও গোপনে রাজাকে ডেকে নিতে পারো”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28