১০.৩। চিন্তাবসান পর্ব
যখন ভৃগুসেনের নিকটে পৌঁছালেন বীর্য ও তাঁর দুই ভাগ্নে, তখন জানলেন ঘৃতকুমারীরা সকলে চারটি চারটি করে কন্যার জন্ম দিয়েছেন। বীর্যের সমূহ যোজনাও শ্রবণ করলেন ঘৃতকুমারীরা আর বললেন, তাঁদেরকে স্বয়ং উপস্থিত থাকতে হবে সাগরদ্বীপে। সেখান থেকেই তাঁরা সমস্ত কিছুকে পরিচালিত করবেন। তাঁদের নিয়ে চিন্তিত হতে বারং করলেন সকলকে আর বললেন, যদি সম্ভব হয়, তাহলে জম্বুদ্বীপকেই সাগরের জলের মধ্যে ধুলিস্যাত করে দেবেন তাঁরা।
অন্যদিকে দেবী ফুলেস্বরির সাথে সাখ্যাত করে, তিন রাণী বললেন যে, তাঁদের উদ্ধার করতে দেবী চিত্তা ও তিনরাজপুত্র আসবেন জম্বুদ্বীপে। আর তাঁদের কাজ হবে, বৃহৎব্যঘ্রকে দিশা দেখিয়ে, জম্বুদ্বীপে নিয়ে যাওয়া। তাঁদের জন্য তেজস্বীনৌকা আর সেনা অপেক্ষা করবে সুন্দরবনের মাতলা নদীতে। সেখান থেকে তাঁদেরকে নিয়ে জম্বুদ্বীপে যাত্রা করবেন। সেখানে দেবী চিত্তা ও তাঁর পুত্ররা অপেক্ষা করবেন, তাঁদের উদ্ধার করার জন্য। চিন্তা করতে বারং করে দেবী হুতা বললেন, “চিত্তার পুত্ররা ভয়ানক বলশালী। তাই চিন্তিত থেকো না। তাঁরা ঠিকই উদ্ধার করবে তাঁদেরকে বৃহৎব্যঘ্রের থেকে আর চিরতরে বৃহৎব্যঘ্রের থেকে তাঁদেরকে মুক্ত করে দেবেন”।
যোজনা অনুসারে সমস্ত কিছু হলে, এবার দেবী হুতা ও তাঁর দুই ভগিনী চন্দননগরে, রাজা করিমুণ্ডের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, “মহারাজ, আপনার জন্য একটি সুখদ সমাচার ও একটি দুঃখদ সমাচার আছে। দুইটিই একত্রিত করে বলতে পারি আমরা, যদি আপনি অনুমতি প্রদান করেন”।
মহারাজ করিমুণ্ড তাঁর স্ত্রীদের ভালো করে চেনেন । তাই নিজের বিচারশক্তিকে জাগ্রত করে নিয়ে, তিন রাণীকে তাঁদের কথা বলার অনুমতি প্রদান করলে, বাক্যব্যয়ে পটু, দেবী মিতা বলা শুরু করলেন, “মহারাজ, আপনার স্বপ্ন ছিল সর্বকাল যে, দক্ষিণের সমুদ্র উপকুল, সাগরদ্বীপ, জম্বুদ্বীপ এবং সুন্দরবন অধিকার করার, কারণ সেখান থেকে বহুল রাজস্ব আয় হতে পারে। সেই সুযোগ এসে গেছে আমাদের হাতে”।
রাজা করিমুণ্ড এই কথাতে একটু নড়েচড়ে বসলে, দেবী স্ফীতা এবার বললেন, “আপনি জানেন কিনা জানিনা, বৃহৎব্যঘ্র বলে এক দৈত্য এই সমস্ত অঞ্চলকে অধিকার করে বসে আছে। আর এতাবৎ কাল পর্যন্ত তার কনো দুর্বলতা কারুর জানাছিল না। তবে এক্ষণে তার একটি দুর্বলতা আমরা জেনে এসছি। … তাই অনায়সে সেই দুর্বল স্থানে আঘাত করে, তার থেকে এই সমস্ত অঞ্চলকে অধিকার করে নিয়ে, আপনার অধীনে আনতে পারেন সেই অঞ্চলকে”।
রাজা করিমুণ্ড বললেন, “বৃহৎব্যঘ্রের কথা আমি জানি। প্রবল বলশালী সে। আর হ্যাঁ, সত্যই তার কনো দুর্বলতা ছিলনা। অঞ্চলের বাইরে থেকে কেউ প্রবেশ করলেই, সে তার উপর আক্রমণ করতো, আর সে এতটাই বলশালী যে, কারুর কনো সেনাবল তার উপর প্রযোজ্য থাকেনা”।
দেবী হুতা বললেন, “হ্যাঁ মহারাজ, আমরা তার বল দেখে এসেছি। উগ্র সে, কিন্তু বলশালী রূপে আমাদের তাল তাকে অনায়সেই পরাস্ত করতে সক্ষম। হ্যাঁ সে মায়াবী, কিন্তু সুরের মায়াভেদী শক্তি অনায়সে তার মায়াকে নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম। … হ্যাঁ, সেনাবলে তাকে পরাস্ত করা অত্যন্ত কঠিন, আর আরো কঠিন তাকে সুন্দরবনের মধ্যে পরাস্ত করা, কারণ তার থেকে অধিক সুন্দরবনের নকশা আর কেউ জানেনা। তাই বাইরে থেকে কেউ যদি সেখানে যায়, তাকে বৃহৎব্যঘ্র অনায়সেই সুন্দরবনের মধ্যে পথ হারিয়ে, অতর্কিত আক্রমণ করে, পরাস্ত করা সম্ভব”।
স্ফীতা বললেন, “হ্যাঁ মহারাজ, একমাত্র যদি তাকে কনো খালি জায়গায় নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, তাহলে আমাদের সুর আর তাল অনায়সে তাকে পরাস্ত করে দেবে”।
মহারাজ করিমুণ্ড নিজের থেকেই এবার বললেন, “কাছেপিটে জম্বুদ্বীপ আছে, রিক্ত স্থান। সেখানে নিয়ে আসা যাবে বৃহৎব্যঘ্রকে? … যেতে পারে, তবে একমাত্র তার দুর্বলতাকে ব্যবহার করেই তা করা সম্ভব হবে। সেই দুর্বলতা কি?”
মিতা বললেন, “এক ভদ্রমহিলার দুই কন্যা, পদ্মিনী ও নলিনী। এই দুই কন্যার রূপই বৃহৎব্যঘ্রের দুর্বলতা। … এই পরিবারকে যদি সুতীব্র নৌকা দিয়ে মাতলি নদী বেয়ে জম্বুদ্বীপে আনা সম্ভব হয়, তাহলে অনায়সেই বৃহৎব্যঘ্র জম্বুদ্বীপে চলে আসবে, আর আমাদের দুই রাজপুত্র যদি সেখানে অপেক্ষা করে, তাহলে বৃহৎব্যঘ্রকে সেখানেই ভূপতিত করে, সম্পূর্ণ দক্ষিণ অঞ্চল আপনার হাতে তুলে দেবে”।
রাজা করিমুণ্ড বললেন, “কিন্তু সেই অবস্থায় সেই তিন স্ত্রী, অর্থাৎ দুই কন্যা ও তাঁদের মাতাকেও তো সুরক্ষা প্রদান করতে হবে। তা কি করে সম্ভব করবে সুর ও তাল?”
দেবী মিতা আগ্রহী হয়ে বললেন, “মহারাজ, দেবী চিত্তা যদি যুবরাজ ছন্দকে নিয়ে সেখানে যান, তাহলে দেবী চিত্তা সেই স্ত্রীদের আশ্রয় দেবেন, ছন্দ তাঁদের রক্ষা করবেন, আর সেই কালে সুরতাল বৃহৎব্যঘ্রের সম্মুখীন হয়ে তাকে হত্যা করবে। … এই আমাদের যোজনা। এর ফলে সেই পরিবারও রক্ষা পাবে, বৃহৎব্যঘ্রের থেকে দক্ষিণকুলও রক্ষা পাবে, আর যুবরাজের উপস্থিতিতে তা সম্ভব হবে, তাই তাঁকেও সকলে বরণ করে নেবে। অর্থাৎ সেই সমস্ত অঞ্চল আমাদের অধীনে চলে আসবে”।
অন্ধরাজা করিমুণ্ড, হাত বাড়িয়ে ছন্দকে সন্ধান করলে, ছন্দ মহারাজের হাত ধরে, কিছু বলতে গেলে, মহারাজ করিমুণ্ড তাকে থামিয়ে দিয়েই বললেন, “যুবরাজ সভাকে বিশ্রাম দিয়ে দাও আজকের জন্য। তোমার সাথে আমার কিছু শলাপরামর্শ করার আছে”। যুবরাজ সম্মত হলে, সভাকে সেদিনের মত মুলতবি করে দেওয়া হয় আর মহারাজ করিমুণ্ড তাঁর রাণীদের উদ্দেশ্যে বললেন, “আমি যুবরাজের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করে নিয়ে, সকলকে রাজসিদ্ধান্ত জানাচ্ছি”।
সকলে সভা থেকে চলে গেলে, মহারাজ করিমুণ্ড যুবরাজকে বললেন, “পুত্র, দেবী চিত্তা আর তোমার দুই ভাইকে ডেকে নাও এখানে। তাঁদের সকলের সাথে একত্রে আমি পরামর্শ করতে চাই এই ব্যাপারে”। যুবরাজ ছন্দ মহারাজের আদেশ মান্য করে, তাই তাই করলেন যা যা মহারাজ বললেন। দেবী চিত্তা ও তাঁর সমস্ত পুত্র সম্মিলিত হলে, মহারাজ করিমুণ্ড সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “দাসদাসীদের থেকে নিশ্চয়ই খবর পেয়ে গেছ যে কেন আমি তোমাদের সকলকে ডেকেছি”।
সকলে মহারাজের কথাতে সহমত জানালে, করিমুণ্ডই বললেন, “দেখো পুত্ররা, দেখো বৌদি, আমি এতকাল আমার পত্নীদের দেখছি, এর আগে কখনো রাজ্যের হিতের জন্য, এত নিখুঁত যোজনা করতে তাঁদের দেখিনি। … আমার সন্দেহ হচ্ছে যে, এই যোজনার একটিদিকই আমাদের বলা হচ্ছে, আর অন্যদিক আমাদের থেকে লোকানো হচ্ছে। … তাই তোমাদেরকে একত্রে ডাকলাম সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য”।
দেবী চিত্তা কিছু না বলে, যুবরাজের দিকে তাকালে, ছন্দ বললেন, “সন্দেহ আমারও হচ্ছে মহারাজ এই ব্যাপারে। … কিছু একটা অন্য যোজনা নিহিত আছে, এই যোজনার মধ্যে”।
চিত্তাল বললেন, “আপনি চিন্তা করবেন না মহারাজ, সুর সঙ্গে থাকলে, আমি যে স্বয়ং আত্মের সাথেও যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। আমরা ঠিকই তাকে পরাস্ত করবো”।
দেবী চিত্তা বললেন, “আর সমস্যা যদি একাকী বৃহৎব্যঘ্র নাই হয়! অর্থাৎ সমস্যা অন্যকিছু, কিন্তু বৃহৎব্যঘ্রকে সমস্যা করে যদি দেখানো হয়!… মহারাজ আপনার জানা আছে কিনা জানিনা, আমার ধারণা এই দুই কন্যার মাতা, কিছুদিন আগেই এখানে এসেছিলেন দেবী হুতার কাছে। দাসী-মারফত যা জেনেছি, সেই অনুসারে এই স্ত্রী দেবী হুতার বাল্যসখী। … আর দাসীসুত্রেই জেনেছি যে, তিনি সুন্দরবন থেকে এসেছেন। … অর্থাৎ এমন তো হতেই পারে যে, অন্য কিছুর যোজনা করছেন দেবী হুতারা, আর আমাদের সম্মুখে শুধু সেটুকুই বলছেন, যা শুনে আমরা তাঁদেরই যোজনাতে নিজেদের চরণ গলাই!”
করিমুণ্ড বললেন, “ঠিকই বলেছ বৌদি, বিপদের আশঙ্কা হচ্ছে। … কিন্তু আমিই একসময়ে এই দক্ষিণভূমির উপর আকর্ষণ দেখিয়েছিলাম। এখন কি বলি আমি!”
তাল বললেন, “বলে দেবেন যে, আপনি খবর নিয়ে দেখেছেন যে, দক্ষিণদেশ আর আগের মত রাজকোষ ভরার সামর্থ্য রাখেনা। তাই এই অহেতুক ঝঞ্ঝা গ্রহণ করবেন না আপনি”।
ছন্দ বললেন, “না ভ্রাতা, এক রাজা কখনো এই ভাবে মিথ্যা বলতে পারেন না। প্রজার সেই ক্ষেত্রে রাজার উপর থেকে বিশ্বাস চলে যায়”।
সুর একটি কথাও না বললে, করিমুণ্ড তাঁকে পৃথক করে বললেন, “সুর, তুমি কিছু বলো এই ব্যাপারে!”
সুর গম্ভীর ভাবেই বললেন, “মহারাজ, আমার বুদ্ধি না নেওয়াই সঠিক হবে। আমি অত্যন্ত বিভ্রান্ত। সেই ছোটো বয়স থেকে মাতার সন্ধান করছি, অথচ কনো সন্ধান পাচ্ছিনা। এখন তো মনে হয়, স্বয়ং মৃত্যু সম্মুখে এসে গেলে, তাতেও ঝাঁপিয়ে পরি। যদি তখন মাতা এসে যান! … তাই আমার তো খালি মনে হচ্ছে যে, এই যোজনাকে যতই মাতা হুতারা নিজেদের যোজনা বলে দাবি করুন না কেন, আসলে এই যোজনা স্বয়ং মাতার। … আচ্ছা আমি যেমন তাঁর জন্য উন্মাদের মত ঘুরে বেড়াচ্ছি, তিনি কি আমাকে সন্ধান করছেন না! … হতেও তো পারে যে তিনিও সন্ধান করছেন আর তাঁর এই যোজনা তাঁরই সন্ধানের প্রতিফল”।
ছন্দ বললেন, “আহ সুর! রাজনীতির বিষয়ে কথা হচ্ছে এখানে। এখানে আবার মাতার প্রসঙ্গ আছে কেন?”
দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “পুত্র, যার হৃদয় যেখানে গত হয়েছে, সে তো সেখানেরই কথা বলবে। সুর মাতার সন্ধানে সর্বদা রত থাকে, তাই সে মাতার জগতেই বিচরণ করে, আর তাই সর্বত্র মাতারই স্পন্দন অনুভব করে। আর সত্য বলতে, তার কথাকে উড়িয়ে দেওয়াও যায়না পুত্র। মানুষ যতই দাবি করুক যে সে-ই কর্তা, কর্তা তো এক পরানিয়তিই। তাই সমস্ত কিছুর মধ্যে পক্ষান্তরে তাঁরই হাত আছে, এই কথা তো অনস্বীকার্য, তাইনা!”
করিমুণ্ড বললেন, “সুর, তুমি বলছো, এটি যোজনা জেনেও, মানুষের যোজনা নয়, মাতারই যোজনা জেনে, তাতে প্রবেশ করবে! … পুত্র, তোমার বিশ্বাস অপার, তাই আমি তোমার বিশ্বাসে অবিশ্বাস করতে পারছিনা। কিন্তু পুত্র, এই বুড়ো কাকার কথাও তো একবার ভাবো! … সে তার মাতা হারিয়েছে জন্মের মুহূর্তেই, পিতা হারিয়েছে, ভ্রাতা হারিয়েছে, বৌদি তাঁর কাছে দেবী সমান, তাই তাঁর সম্মুখে যাবার সাহসও হয়না। এমন অবস্থায়, পুত্র তোমরাই এই জগদ্ধাত্রীনগরের প্রজাদের অন্তিম বিশ্বাস, আমার শেষ ভরসা।
এখন আমার কনো সিদ্ধান্তের জন্য যদি বউদির কিছু হয়ে যায়, তোমাদের কিছু হয়ে যায়, আমি মাতা সর্বাম্বাকে গিয়ে কি জবাব দেব!”
সুর বললেন, “এতক্ষণে আপনি সঠিক নাম উচ্চারণ করলেন মহারাজ। আমার মনে হয়, এই যোজনা আমাদের বিরুদ্ধে নয়, মাতা সর্বাম্বার বিরুদ্ধে। আমার ভ্রাতা, যুবরাজ ছন্দই মাতা সর্বাম্বার শেষ ভরসা কৃতান্তিক রাজ্য স্থাপনের জন্য। আর মাতা উপস্থিত আছেন বলেই, এঁদের সকলের এত সমস্যা। তাই এঁরা নিশ্চিত ভাবেই আমার ভ্রাতাকে অপসারিত করতে চাইছেন, আর মাতা সর্বাম্বাকে আঘাত করতে চাইছেন। … ভ্রাতার কিছু হলে, যুবরাজ পদও খালি হয়ে যাবে, আর তাই করিন্দ্রের সুবিধা হবে। আর অন্যদিকে মাতা সর্বাম্বাও যদি আশাহত হয়ে, দেহত্যাগ করেন, তাহলে তো এঁদের পোয়াবারো”।
দেবী চিত্তা এবার বিচলিত হয়ে উঠলেন, মাতা সর্বাম্বার বিপদের কথা শ্রবণ করে। সেই দেখে সুর পুনরায় বললেন, “চিন্তা করবেন না মাতা, মাতা সর্বাম্বাকে নিয়ে তো বিন্দুবিসর্গও চিন্তা করবেন না। যদি তাঁর বিরুদ্ধে কনো ষড়যন্ত্র করে এঁরা, সেটি হবে এঁদের শ্রেষ্ঠ ভ্রান্তি। কারণ, চক্রান্তটির কর্তা রূপে কেবলই এঁরা নিজেদের ভেবে যাবেন, কিন্তু সেই ষড়যন্ত্রের চাবিকাঠি মাতা সর্বাম্বার কাছেই থাকবে। মাতা সর্বাম্বা স্বয়ং ব্রহ্মময়ী। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অর্থ নিজেদের পায়ে নিজেরা কুঠার মারছেন এঁরা”।
করিমুণ্ড হেসে বললেন, “আচ্ছা পুত্র সুর, তুমি তো স্পষ্ট ভাবে জানো যে, যেই মাতাকে তুমি হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছ, সেই মাতা স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা। তা জেনেও তুমি তাঁর কাছে কেন যাচ্ছনা!”
সুর হেসে বললেন, “মহারাজ, যদি ভক্তকে ভগবানের কাছে যেতেই হয়, তাহলে তাঁর ভক্তির আর কি সম্মান বেঁচে থাকলো? … মহারাজ যদি প্রেমীকে নিজমুখেই নিজের প্রেমের বাখান করতে হয়, তাহলে তা আর প্রেম কি করে হলো! … মহারাজ, এ হলো যোগ্যতার পরীক্ষা। আমি যতক্ষণ না যোগ্য হয়ে উঠবো, তাঁর নির্দেশ শ্রবণের জন্য, তাঁর প্রেমকে প্রত্যক্ষ করার জন্য, ততক্ষণ তিনি আমার থেকে দূরে অবস্থান করবেন, আর আমাকে বিভিন্ন অবস্থায় স্থাপিত করে পরীক্ষণ করে যাবেন। এই তো ভক্ত ভগবানের সম্বন্ধের গভীরতা মহারাজ”।
দেবী চিত্তা বললেন, “সুর সঠিক বলছে, আমারও মনে হচ্ছে, এই সমস্ত কিছুর মধ্যে তারা দিদিকেই চক্রান্তের মধ্যে আবদ্ধ করতে চাইছে। আর বাস্তবে এই যোজনা তাঁদের নয়ই, এই যোজনা স্বয়ং দিদির। হয়তো দিদির পরবর্তী লীলা করার সময় আসন্ন। তাই আমাদের সেই লীলাতে অংশ নেওয়াই সঠিক হবে। পরিণতির চিন্তা করে, তাঁর যোজনা থেকে সরে যাবার থেকে, অনেক শ্রেয় বিনাবিচারে তাঁর যোজনার মধ্যে অংশগ্রহণ করা। যদি এই যোজনা তাঁর না হয়, তবে তাঁর প্রতি আমাদের নিরপেক্ষ বিশ্বাসের কারণে, তিনি নিশ্চিতই আমাদেরকে অগ্রসর হওয়া থেকে আটকাবেন। যদি তেমনটা না হয়, তাহলে জানবেন যে যা কিছু হচ্ছে তা দিদির, অর্থাৎ মাতা সর্বাম্বার ইচ্ছাতেই হচ্ছে”।
তখনও সিদ্ধান্ত না নিতে পারা করিমুণ্ড বললেন, “আর মা যে এই যোজনার সাথে যুক্ত, তার কি কনো প্রমাণের অপেক্ষা করবো না!”
দেবী চিত্তা বললেন, “মানুষ যা কিছু ক্ষেত্রে নিজেকে কর্তাজ্ঞান করে কর্ম করে, দিদিই সেই সমস্ত কর্মকে সঞ্চালন করেন, এবং মানুষ মানতে শুরু করে যে কর্তা আসলে সে-ই। … ভাই করি, দিদি যে বীর্যদের কর্তা জ্ঞান করাচ্ছেন, তার প্রমাণ আমরা পেয়ে গেছি ইতিমধ্যেই। যখন নিষ্ঠাবান নিজের যুদ্ধে মাতা সর্বাম্বাকে নিজপক্ষে লাভ করলো না, তখনই এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, দিদি এঁদেরকে অর্থাৎ বীর্যদেরকে কর্তা জ্ঞান করাচ্ছেন, আর নেপথ্যে স্বয়ং তিনি কিছু একটা করছেন, যার আন্দাজও আমাদের কাছে নেই। … তাই সুর সঠিকই বলছে, মাতার যোজনাতে আমাদের নির্বিচারে অংশ গ্রহণ করা উচিত। … পরিণাম যাই হোক না কেন, জেনে রেখো ভাই যে, দিদিরই এমনই ইচ্ছা”।
দেবী চিত্তা তথা তাঁর পুত্রদের কি হবে সেই নিয়ে সংশয় থাকলেও, জম্বুদ্বীপের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করলেন তাঁদেরকে মহারাজ করিমুণ্ড। আর অন্যদিকে নিজেদের যোজনা সফল হতে দেখে, আনন্দিত হুতা ও তাঁর ভগিনীরা যোজনা অনুসারে বীর্যকে সমাচার প্রেরণ করলে, বীর্য একদিকে দেবী ঘৃতকুমারীদের নিয়ে উপস্থিত করলেন সাগরদ্বীপে, আর অন্যদিকে যোজনা অনুসারেই, গতিশীল নৌকায় করে দেবী ফুলেস্বরি তথা তাঁর দুই কন্যাকে অপসারিত করা হলে, বীর্যের প্ররোচনা অনুসারে বৃহৎব্যঘ্রকে সেই সূচনা প্রদান করা হয়।
মালতী নদী ত্যাগ করে যখন গঙ্গার মধ্যে দেবী ফুলেস্বরিদের নৌকা পদার্পণ করলো, তখন তাঁকে নিয়ে যেই চন্দননগরের সেনারা যাত্রা করছিলেন, তাঁরা প্রথমবার বৃহৎব্যঘ্রকে দেখলেন। প্রকাণ্ড বলশালী সেই দানব তাঁদের রাজকুমার তালেরও দুগুণ আকারে, আর বলও প্রায় তাঁর দিগুণই হবে। আত্মকে সে বেশ কয়েকবার রক্ষা করেছিল, তাই আত্ম তাঁকে বরদান দিয়েছিল যে, যখন যখন সে কারুকে হত্যা করবে, যাকে হত্যা করবে, তার সম্পূর্ণ বল সে লাভ করবে। আর যখন সে পরাজিত হবে, তখন তাকে যে পরাজিত করে হত্যা করবে, সে তার সমস্ত বল লাভ করবে।
এই বরদানের জেরেই, আজ সে এই অসামান্য ভাবে শক্তিশালী। সেনারাও বুঝে গেলেন, মহারাজ করিমুণ্ডকে এই সূচনা প্রদান করতে হবে। তাই দ্রুততার সাথে নৌকাকে জম্বুদ্বিপের দিকে নিয়ে যেতে থাকলে, একটি সেনা সেখান থেকেও অন্য নৌকায় উত্তীর্ণ হয়ে, পারে উপস্থিত হয়ে, ঘটকে চেপে, মহারাজ করিমুণ্ডের কাছে বৃহৎব্যঘ্রের সম্বন্ধে সমাচার প্রদান করতে চলে গেলেন।
অন্যদিকে, ইতিমধ্যেই দেবী চিত্তা ও তাঁর পুত্ররা জম্বুদ্বীপে এসে অপেক্ষা করছিলেন। তাই নৌকা নিকটে আসতেই, সুরতাল সাগরের কিনারায় এগিয়ে গিয়ে, টেনে দেবী ফুলেস্বরিদের নৌকাকে তিরে আনেন। দেবী ফুলেস্বরিকেও বেশ মিষ্ট দেখতে, কিন্তু তাঁর দুই কন্যা রূপেগুণে অসামান্য। মায়াশক্তি এঁদেরও আছে। সুন্দরবনে জীবিত থাকতে গেলে, এই মায়াশক্তি আবশ্যক।
তাই দেবী চিত্তার কাছে রূপেগুণেই শ্রেয় লাগে ফুলেস্বরির দুই কন্যাকে। আর শুধু দেবী চিত্তাই বা কেন। মৃত্তিকাবর্ণের কোমলাঙ্গী দেবী পদ্মিনীর সুন্দর আনন ও কমনীয় দেহগঠন দেখা মাত্রই কামনাক্রান্ত হয়ে যান ছন্দ, তবে একাকী ছন্দ নন, দেবী পদ্মিনীও ছন্দের প্রতি আকৃষ্ট হতেই থাকেন সমানে। বিশেষ করে, ছন্দের সুন্দর ব্যবহার, হৃদয়বাণ আচরণ, এবং স্নেহশীল চরিত্র তাঁকে সমানেই আকৃষ্ট করতে থাকে।
দেবী নলিনীর উচ্চতা অনেকটাই অধিক। এমনকি দেবী চিত্তা ও ছন্দের থেকেও সে সুউচ্চ, প্রায় সুরের সমসাময়িক উচ্চতা। আর তার সাথে অঙ্গের শ্যামলা বর্ণ আর রূপের মধ্যে সুন্দর লালিমা, এই সমস্ত কিছু মিলিয়েই আকৃষ্ট করতে থাকলো তালকে তাঁর প্রতি। সাধারণের থেকে অনেকটাই সুউচ্চ, আর বলশালী হবার কারণে, প্রায়শই পুরুষরা তাঁর থেকে দূরে থাকে, কিন্তু তালের বিশালাকায় দেহ, আর সুউচ্চ বলশালী চেহারা দেখে, দেবী নলিনির মধ্যেও কামনার পুষ্প অঙ্কুরিত হয়েছে।
আর সমান ভাবে, দেবী নলিনির আকারআকৃতি আর মুখলাবণ্য, তালকেও বোধ করিয়েছে যে, সে-ই তাঁর উপযুক্ত স্ত্রী। তাই সেও ক্রমশ আকৃষ্ট হতে থাকলো দেবী নলিনীর প্রতি। এই দৃশ্য সুর তথা দেবী চিত্তা উভয়ের থেকেই লুক্কায়িত থাকেনি। তবে সেই দিকে মাথাঘামাবার আর সময় পায়না তাঁরা, যখন তাঁরা সামান্য দূরে একটা দৈত্যকে সাগর সাঁতরে তাদের দিকে আসতে দেখলেন।
একদেখায় ছন্দ আতঙ্কিত হয়ে গেলেন, আর বললেন, “এতো এক দানব। এর সামনা কি করে করবো আমরা!” উত্তরে সুর বললেন, “আত্মকে বহুবার বাঁচিয়েছেন এই বৃহৎব্যঘ্র। তাই তাকে বরদান প্রদান করেছিলেন আত্ম যে, যাকে যাকে সে হত্যা করবে, তার বলের অধিকারী সে হয়ে যাবে, আর যদি কেউ তাকে হত্যা করতে পারে, তবে তার বলের অধিকার তাঁর হত্যাকারী হয়ে যাবে। … তাই, অন্যের বল লাভ করে করে এমন বিশালাকায় হয়েছে সে”।
ছন্দ বললেন, “ইতিহাস জেনে কি হবে অনুজ! এঁর বর্তমান যে ভয়ানক!”
সুর বললেন, “ভ্রাতা আপনি স্ত্রীদের আর মাতাকে নিয়ে ছাউনির মধ্যে যান, আর সেনাদেরও এদিকে আসতে দেবেন না। আমি আর ভ্রাতা তাল দেখছি, এর কি করা যায়”।
দেবী চিত্তা ও দেবী ফুলেস্বরি ছাউনির দিকে এগিয়ে গেলেন, পদ্মিনীও ছন্দের অঙ্গে অঙ্গ বারংবার লাগিয়ে লাগিয়ে ছাউনির দিকে এগিয়ে গেলেন, কিন্তু দেবী নলিনীর মন তালের দিকেই পড়ে আছে। ছন্দ এক প্রকার তাঁকে বারংবার বলে বলে ছাউনিতে নিয়ে গেলে, ছাউনিতে স্থিত থেকে সকলে নিজেদের নজর রাখলেন সুর আর তালের উপর।
সুর তালের উদ্দেশ্যে বললেন, “মল্ল যুদ্ধে একে আহ্বান করবে ভ্রাতা, আর প্রহার করবে কেবল এঁকে উত্তেজিত করার জন্য। এ উত্তেজিত হলে, নিজের উর্জ্জা ক্ষয় করবে, একে উর্জা ক্ষয় করতে দেবে। সময় নেবে, যত অধিক পারো সময় নেবে। একে আহার করতে দেবেনা, নিদ্রা যেতে দেবেনা। এর উর্জ্জা ক্ষয় হলে, একে হত্যা করবে। স্মরণ রাখবে, বলগত ভাবে এ তোমার থেকে অধিক বলবান। তাই যতক্ষণ না এঁর বল তোমার থেকে কম হচ্ছে, ততক্ষণ এঁকে যুদ্ধ করা থেকে বিরাম নিতে দেবেনা”।
তাল বললেন, “এ মায়াবীও শুনেছি”।
সুর উত্তরে বললেন, “তুমি শুধুই বল দ্বারা যুদ্ধ করো। মায়ার নাশ আমি করতে থাকবো। তুমি চিন্তা করো না সেই নিয়ে”।
সাগর তটে এসে, উগ্র মেজাজে উঠে এলো বৃহৎব্যঘ্র, এবং এদিক সেদিক সে খুঁজতে থাকলে, তাল তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, “দেবী পদ্মিনী আর নলিনীকে সন্ধান করছো! সে আমার হেফাজতে আছে। আমাকে হত্যা না করে, তুমি তাদের কাছে পৌছাতে পারবেনা”।
সেই কথাতে অতিশয় উগ্র হয়ে উঠে, চরণের কাছে একটি প্রস্তর অবস্থান করছিল, তাকেই পদাঘাত করে তালের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করলে, নেপথ্যে স্থিত সুর, নিজের ধনুকে একটি টঙ্কার করলে, সেই প্রস্তর মধ্য গগনেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। তা দেখে, ব্যঘ্র মনে করলো যে প্রস্তরটিকে নাশ করেছে তাল। তাই অতিউগ্র হয়ে বললেন, “বেশ বলশালী মনে হচ্ছে। আজ মজা হবে যুদ্ধ করতে”। এই বলে ব্যঘ্র দৌড়ে তালের দিকে এগিয়ে গেলে, উচ্চতায় অর্ধেক তাল, নিম্নগামী হয়ে, ব্যাঘ্রের দুটি চরণকে নিজের বাহুবলে আকর্ষণ করলে, পিছনের দিকে ভূপতিত হলেন ব্যঘ্র।
সেই দেখে তাল সাফল্যের নিশ্বাস ছাড়লে, নেপথ্যে থাকা সুর বললেন, “চরণ মুচকে দাও ভ্রাতা”।
কথা শুনতে দেরি হলো তালের। তবে যেই সময়ে ব্যঘ্র উঠে দাঁড়াতে গেলেন, সেই সময়ে শুনতে পেরে যান তাল, সুরের কথা। তাই তীব্রতার সাথে দুই করের বলে, একটি চরণকে গড়ালি থেকে মুচকে দেন তাল। বেদনায় চিৎকার করে উঠলো ব্যঘ্র। বেদনা অতিক্রম করে দাঁড়াবার প্রয়াস করলে, দুদুবার সে ভূপতিত হয়ে গেল কারণ সে চরণে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারছিল না। তৃতীয়বারে যখন দাঁড়াবার প্রয়াস করলো, তখন সুর বললেন, “জানুতে পদাঘাত ভ্রাতা, জানুতে পদাঘাত”।
এবার তাল সতর্ক ছিলেন। তাই একবারেই শুনতে পেয়ে যান, আর সরাসরি উড়ন্ত চাকির ন্যায় নিজের দেহকে গগনে উন্নীত করে, ব্যঘ্রের জানুতে পদাঘাত করলে, পুনরায় ভূপতিত হলেন ব্যঘ্র। সুর এই আঘাত লাভ করা আর ভূপতিত হবার মাঝের সময়ে, একটি ভারী প্রস্তরকে সেই স্থানে প্রেরণ করলেন তীব্রতার সাথে, যেই স্থানে ব্যঘ্রের মুণ্ড ভূমিতে পতিত হবে। তাই ভূপতিত হবার কালে, এবার ব্যঘ্র নিজের মস্তকেও ভীষণ জোর আঘাত লাভ করে।
সেই দেখে, সুর পুনরায় বললেন, “ভ্রাতা নাভি… নাভি …”
তাল সেই কথা শুনে, সামান্য দূরে সরে গিয়ে, দৌড়ে নিজের বেগ বাড়িয়ে, ব্যঘ্রের নাভিতে উড়ন্ত প্রস্তরের মত পতিত হলে, মুখ দিয়ে রক্তবমন করে, ব্যঘ্র নিজের তনুর উপরিভাগকে ভূমি থেকে উন্নত করলে, এবার তাল সজোরে একটি মুষ্ট্যাঘাত করলেন ব্যঘ্রের মুখমণ্ডলে। তাতে তার মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেলে, সে পুনরায় প্রস্তরে মাথা ঠুকে ভূপতিত হলে, এবার মূর্ছা যায় সে।
সেই দেখে, তাল ঘুরে গিয়ে দেবী নলিনির দিকে তাকান। নলিনির নেত্রে তখন গর্ব, আর তালনলিনী দুজনের নেত্রেই তখন অন্তরঙ্গতার কামনা আদানপ্রদান হতে থাকে। সেই দৃশ্য দেখে, সুর খানিক চুপ করে গেলে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যঘ্র পুনরায় মূর্ছা থেকে উন্নীত হলেন। সুর তখন চিৎকার করে বললেন, “ভ্রাতা!”
কিন্তু কামনার হাতছানি যেখানে, সেখানে আর দিগ্বিদিকের হুঁশ কার থাকে। ব্যঘ্র উগ্রভাবে নিজের একটি বাহুকে দ্বিতীয় বাহুদ্বারা বন্ধনে বেঁধে, একটি বাহুদ্বারা সজোরে আঘাত করলেন তালকে। তাই তাল সেই আঘাতে সম্মুখে তিন চার কদম এগিয়ে গিয়ে, হুমড়ি খেয়ে পরতে যাবেন, সেই সময়ে একটি বৃক্ষের ডালকে ধরে আকর্ষণ করে নিলে, ভূপতিত হওয়া থেকে রুদ্ধ হন। তবে এই আঘাত তালকে অত্যন্ত বিশ্রীভাবে আহত করে, কারণ এই আঘাত তাঁর দেহকে নয়, তাঁর মদকে আহত করে, কারণ তখন তিনি কামনার নেশায় ছিলেন দেবী নলিনির সাথে, আর দেবী নলিনী তখন সম্যক ভাবে তাঁকেই দেখছিলেন।
তাই ক্রুদ্ধ আবেশে, ভূমিতে চাপ দিয়ে, নিজের দেহকে শূন্যে উড়ন্ত করে নিয়ে, সজোরে নিজের দক্ষিণ চরণ দ্বারা ব্যঘ্রের মুখে একটি পদাঘাত করলেন। আঘাতটি মোক্ষম ছিল, তাই ব্যঘ্রও একটু হেলে গেলেন সেই আঘাতে। কিন্তু এবার সে উগ্র। সে নিজের অন্তরে যুদ্ধ করার নতুন যোজনা নির্মাণ করে ফেলেছে। তাই এবার এক এক করে সমস্ত বৃক্ষ উৎপাটন করতে থাকলেন, আর তা তালের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করতে থাকলেন। তাল সমানে সেই সমস্ত বৃক্ষের আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে থাকলেন।
আর এই বৃক্ষপ্রেরণ আর তার থেকে বাঁচতে থাকা, প্রায় চার দিবস চলতে থাকলো। সাগরদ্বীপ থেকে, এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ দেখতে থাকলেন, বীর্য, করিন্দ্র, ভৃগু আর ঘৃতকুমারীরা। তাঁরা দেখলেন, বৃহৎব্যঘ্র তো ভয়ঙ্কর, কিন্তু চিত্তালও কম ভয়ঙ্কর নয়। কিন্তু তাঁরা যা দেখতে পেলেন না, তা হলো দেবী নলিনীর করা মায়া। এই চারদিবস যেমন তালের নিদ্রা নেই, তেমনই ব্যঘ্রের। কিন্তু এই চার দিবস ব্যঘ্রের আহার নেই, কিন্তু মায়াবলে নলিনী সমানে তালকে আহার প্রদান করতে থাকলেন।
আর সেই কারণেই, পঞ্চমদিবসে এসে, যখন আর একটিও বৃক্ষ প্রকৃতিনির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করছিলনা, তখন আর ব্যঘ্রের পক্ষে নিচু হয়ে উৎপাটিত বৃক্ষ তোলার ক্ষমতা ছিলনা। সুর এই সময়েরই ইঙ্গিত করেছিলেন, তাই এবার তাল নিজের মোক্ষম আঘাত আনলেন। তাল ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্র ভাবে শূন্যে উন্নীত হয়ে, প্রচণ্ড বেগে ভুমিতে আঘাত করলে, এক বিশাল কম্পন ও ভূমিফাটল ক্রমশ একটি দিশায় এগিয়ে যাবার প্রয়াস করলে, সুর নিজের প্রচণ্ড গতি কাজে লাগিয়ে, সেই দিশাকে চরণের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দ্বারা ব্যঘ্রের দিকে চালিত করে দিলে, ব্যঘ্রের দেহের চাপে, সেই স্থানের ভূমি ধসে নিম্নে প্রবেশ করে গেলে, ব্যঘ্রের দেহও সেই খাইতে পতিত হয়ে থাকলো।
অনুকূল অবস্থা দেখে, প্রকাণ্ড উর্জ্জা সঞ্চয় করে, গতি ধারণ করে, এবার তাল দৌড়ে গিয়ে, প্রবল এক আঘাত করতে, ব্যঘ্রের মুণ্ড তার দেহ থেকে পৃথক হয়ে বেশ কিছুক্ষণ শূন্যে স্থিত হয়ে ভূমিতে পতিত হয়ে গেল। বৃহৎব্যঘ্রের মৃত্যু হতে, করিন্দ্র ও মনকরি তটস্থ হয়ে গেল, আর ভৃগু বলে উঠলো, “সঠিক বলেছ বীর্য, এই রাজপুত্ররা বেঁচে থাকলে, আমাদের সাম্রাজ্য গঠনের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে, তা আর কখনোই বাস্তবে পরিণত হতে পারবে না”।
বীর্য মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, দেবী ঘৃতকুমারী, আপনারা এবার প্রস্তুত হন। আজ সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আশা করা যায়, এঁরা কাল প্রভাতে নির্গত হবে, রৌদ্র ঠিক করে ওঠার পর। তার পূর্বেই আপনাদের ঘূর্ণাবর্ত প্রদান করতে হবে”।
ঘৃতকুমারীরা বললেন, “হে বীর্য, আমাদের আজকের সন্ধ্যা থেকে গহন রাত্রি পর্যন্ত সময় লাগবে মাত্র। ঘূর্ণাবর্তকে সাগরে অবস্থান করিয়েই রেখেছি। কেবল তাকে গতি দ্বারা আকর্ষিত করে, এই জম্বুদ্বীপকে গ্রাস করে নেবার দিশায় প্রেরণ করতে হবে মাত্র। রাত্রি দ্বিপ্রহরের মধ্যে আমাদের কর্ম সম্পন্ন হয়ে যাবে। অতঃপরে আমাদের এখান থেকে সরে যেতে হবে। কাল প্রভাতের মধ্যে ঘূর্ণাবর্ত রাজপুত্র, দেবী চিত্তা আর অন্য সকলকে ঘিরে নেবে। বৃক্ষরাজিরা ভূমিতেই পতিত রয়েছে যুদ্ধের ফলে, তাদেরকে তুলে নিয়ে এসে আঘাত করে করেই ঘূর্ণাবর্ত সকলকে প্রাণে শেষ করে দেবে। কিন্তু আমাদেরকে এখান থেকে সুরক্ষিত দূরত্বে সরে যেতে হবে, নাহলে আমাদেরকেও এর কবলে পরতে হতে পারে”।
বীর্য বললেন, “চিন্তা করবেন না, আমাদের সুতীব্রগতির নৌকা প্রস্তুত আছে। এখানে কাজ সম্পন্ন হলেই আমরা ফিরে যাবো উপকুলে। ঘূর্ণাবর্তের তাণ্ডব সমাপ্ত হলে, তবেই আমরা এখানে ফিরে এসে, পরিস্থিতি দেখে যাবো”।
বৃহৎব্যঘ্র দমন হলে, সকলে নিশ্চিন্তে শিবিরে অবস্থান করলে, নলিনী আর সুর মিলে তালের দেহমর্দন করে করে তাঁর দেহের ব্যথা সারাতে থাকলেন, সেই অবস্থায় দেবী পদ্মিনী বললেন, “আমাদের এখান থেকে পলায়ন করতে হবে এবার”।
ছন্দ বললেন, “কাল সকালেই আমরা চলে যাবো এখান থেকে”। দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “আর সঙ্গে তোমাদেরকেও নিয়ে যাবো। তোমাদেরকে তোমাদের পছন্দ অনুসারেই, আমার দুইও পুত্রের বধূ করে, দিদিকে আমার বেয়ান করে নেবো”।
এই কথাতে দেবী নলিনী লজ্জিত হলেন, কিন্তু দেবী পদ্মিনী বললেন, “কথা এটুকুই নয় মাতা, আমি দেবী হুতাকে তাঁর ভগিনীদের সাথে কথা বলতে শুনেছি, বীর্য ঘৃতকুমারীর সাথে মিলে, কনো এক যোজনা করেছে, যদি ব্যঘ্রের মৃত্যু হয়, তাহলে আপনাদের হত্যার জন্য”।
নলিনী উগ্র হয়ে বললেন, “মায়া আমরাও করতে পারি, কিন্তু কি মায়ার বিরোধিতা করে মায়া করতে হবে, তা তো জানা আবশ্যক”।
সুর বললেন, “ঘূর্ণাবর্ত। যদি ব্যঘ্র আমাদের হত্যা করে দেয় তো মিটে যেত, আর যদি সে না পারে, তাহলে আমাদেরকে ঘূর্ণাবর্ত দ্বারা হত্যা করার ছক করার জন্যই এই জম্বুদ্বীপকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ঘৃতকুমারীরা ঘূর্ণাবর্ত করারই মায়া জানেন। আর কনো মায়াতে তারা সিদ্ধহস্ত নন”।
নলিনী বললেন, “কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আমরা ঘূর্ণাবর্তের উত্তর দিতে পারবো কি করে?”
সুর বললেন, “ঘূর্ণাবর্তের উত্তর দিতে হবেনা। বরণ অন্য এক মায়া করতে হবে আপনাকে। আপনাকে সেই বিষয়ে বিস্তারে বলছি আসুন”। সকল চিত্তাপুত্ররা এবং দেবী পদ্মিনী তথা দেবী নলিনী সেই যোজনার সম্বন্ধে জানলে, নলিনী ও পদ্মিনী সেই মায়ার রচনা করা শুরু করলেন। আর অন্যদিকে, দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “এই সমস্ত পরেও করা যাবে। কিন্তু প্রথম যা আবশ্যক, তা হলো অগ্নি প্রজ্বলিত করে, আমি ছন্দ আর পদ্মিনীর, এবং তাল ও নলিনীর বিবাহ দিতে চাই”। দেবী ফুলেস্বরিও এই প্রস্তাবে আনন্দিত ও উৎসাহিত হলে, প্রথমে সুরের দুই ভ্রাতার বিবাহ অনুষ্ঠিত হলো, অতঃপরে, তাঁরা তাঁদের যোজনানুসারে কর্ম করতে থাকলেন।
যেমন সুরের ধারণা ছিল, ঠিক তাই হলো। ঠিক প্রভাত হবার মুহূর্তে, প্রকাণ্ড এক ঘূর্ণাবর্ত আছরে পরলো জম্বুদ্বীপে, আর সমস্ত কিছু লণ্ডভণ্ড করে গেল। শিবিরে উপস্থিত সমস্ত সেনা, সমস্ত কেউ এমনকি দেবী চিত্তা, দেবী ফুলেস্বরি সহ, সমস্ত রাজপুত্র তথা ফুলেস্বরি কন্যাদের শবদেহ পরবর্তীদিবসে ঘূর্ণাবর্ত সমাপ্ত হবার উদ্ধার করলেন, বীর্য, করিন্দ্র তথা তাঁদের সেনা। এবং শোকে বিহ্বল হয়ে, তাঁরা সমস্ত শব দেহ নিয়ে, প্রত্যাবর্তন করলেন চন্দননগরে।
মহারাজ করিমুণ্ড তখন একটি পত্রপাঠ শুনছিলেন, যা তাঁকে তাঁর দাস সুধামা পাঠ করে শ্রবণ করাচ্ছিলেন। সবে সেই পত্রপাঠ সমাপ্ত হয়েছে, আর সুধামা সেই পত্রকে পুনরায় গুটিয়ে মহারাজের গুপ্ত সিন্দুকে তা রেখে দিচ্ছিলেন, এমন সময়ে প্রচণ্ড আর্তনাদ করে বীর্য এসে উপস্থিত হয়ে মহারাজের চরণে পতিত হলেন আর বললেন, “সর্বনাশ হয়ে গেল মহারাজ, সর্বনাশ হয়ে গেল!”
মহারাজ করিমুণ্ড ব্যকুল হয়ে বললেন, “কি হয়েছে তা তো বলো বীর্য!… সংবাদ কি? তোমার স্ত্রী, তোমার কন্যারা সকলে কুশল তো!”
দেবী হুতা, মিতা ও স্ফীতা এতক্ষণে অন্তঃপুর থেকে এসে হাহুতাশ করে উঠে বললেন, “মহারাজ সর্বনাশ হয়ে গেল আমাদের! … জানিনা কে কুদৃষ্টি দিয়েছে এই পরিবারটার উপর! সম্পূর্ণ পরিবারটিই শেষ হয়ে গেল”।
মহারাজ এবার অতীব বিচলিত ও চিন্তিত হয়ে উঠে বললেন, “আরে কেউ কি কিছু বলবে, নাকি খালি বিপদ হয়ে গেল, সর্বনাশ হয়ে গেল, এই বলে যাবে!”
দেবী মিতা বললেন, “আর কি বলবো মহারাজ! … গতকাল প্রভাতে জম্বুদ্বীপে এক ভয়ানক ঘূর্ণাবর্ত আছরে পড়ে সর্বস্ব লুণ্ঠন করে নিয়ে গেছে আমাদের”।
মহারাজ সেই কথা শুনে নিজের সিংহাসন থেকে উঠতে গিয়ে পুনরায় সিংহাসনেই পতিত হয়ে গেলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “রাজপুত্ররা কেমন আছে, বৌদি কেমন আছেন!”
বীর্য ক্রন্দনের সুরেই বললেন, “আমার তিন শ্রেষ্ঠ শিষ্য মহারাজ, সুরতালছন্দ কেউ নেই আর! … কালকের ঘূর্ণাবর্তের সংবাদ লাভ করে, আজকে আমরা সেখানে গেছিলাম। বৃহৎব্যঘ্র সহ, দেবী ফুলেস্বরি, তাঁর দুই কন্যা, দেবী চিত্তার ও রাজপুত্রদের শবদেহ সহ, সমস্ত উপস্থিত সেনার শবদেহ লাভ হয়েছে মহারাজ! … সমস্ত কিছু শেষ হয়ে গেল!”
হতবম্বের মত রাজা করিমুণ্ড নিজের সিংহাসনে বসে রইলেন। তাঁকে ঘিরে সকলে বেষ্টন করে বসে ক্রন্দন করতে থাকলেন। ক্রমাগত সমস্ত রাজপুত্রদের ও দেবী চিত্তার শবদেহকে দাহ করলেন উপস্থিত রাজপুত্ররাই, কারণ করিমুণ্ড যেন সম্পূর্ণ ভাবে পাথর হয়ে গেছেন।
এমন ভাবে দুইদিন চলে গেলে, দেবী হুতা একদিন বিরক্ত হয়ে উঠে বললেন, “আর কতদিন এমন করে নাকেকান্না কাঁদতে হবে ভ্রাতা! … চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে তো আমার গলা শুকিয়ে গেল!”
বীর্য চাপাস্বরে বললেন, “যতদিন না মহারাজ নিজের শোক কাটিয়ে উঠছেন, ততদিন এই নাটক চালিয়ে যেতেই হবে। ভেবে দেখো, যদি মহারাজ চোখে দেখতে পেতেন, তাহলে কতই না কঠিন হতো এই কাজ। এখন তো শুধু চেঁচাতে হচ্ছে, তখন তো কাঁদতেও হতো। আগামীদিনে যেই সুখ আমাদের জন্য রয়েছে, তার কথা চিন্তা করে, কেঁদে তো নাও এখন”।
দেবী মিতা বললেন, “ভ্রাতা, আমার একটা অন্য বিষয়ে চিন্তা হচ্ছে। আচ্ছা সর্বাম্বার থেকে কনো কিছুই গোপন নেই, মানে আমরা যা করেছি বা যা যা হয়েছে। সে যদি এবার আমাদেরকে হত্যা করতে চলে আসে! তাহলে তো আমাদের কারুর আর রক্ষা নেই!”
মাথা নেড়ে বীর্য বললেন, “সংবাদ কি তিনি পান নি! এতক্ষণে সংবাদ নিশ্চয়ই তাঁর কাছে পৌঁছে গেছে। শোকাহত তিনি। তিন রাজপুত্রে আসক্ত ছিলেন তিনি, আর চিত্তা তো তাঁর নিজের ভগিনী। শোকাহত হয়ে দেহত্যাগের চিন্তা করছে দেখগে যাও। নাহলে এতক্ষণে আমাদের প্রাণ নিয়ে যত্রতত্র পালাতে হতো। তা যখন হচ্ছেনা, তখন নিশ্চিত ভাবে, তিনি দেহত্যাগেরই চিন্তা করছেন”।
স্ফীতা বললেন, “আর তো তিনিও বুঝে গেছেন, কৃতান্তিক রাজ্য স্থাপন সম্ভবই নয়। তিনিও বুঝে গেছেন, এবার মোহিনীরাজ্যস্থাপিত হবে, সম্পূর্ণ জম্বুদেশ এবার পুনরায় ছায়াপুর হয়ে উঠবে। আমাদের দাদু, আত্মকে হত্যা করার কারণ ছিল। তখন তো মানস ছিল, সমর্পিতা ছিল, এঁরা সকলে ছিল। আর এখন? এখন তো আর কেউ নেই। তাই আমাদের হত্যা করেই বা কি হবে? আমরা রাজত্ব স্থাপন করলে ছায়াপুর করবো, আর আমাদের হত্যা করলে, অন্যকেউ জম্বুদেশই রাখবে। কৃতান্তিকদের রাজ্য তো আর হবেনা! … তাই এবার তিনি নিশ্চিতই আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
আর ভ্রাতা ঠিকই বলেছেন। যদি আমাদের হত্যা করার হতো, এতক্ষণে আমাদের হত্যা হয়ে গিয়ে থাকতো। আমাদের কে কি এতক্ষণ আর বাঁচিয়ে রাখতো। জানোই তো গুহ্যা বেশ ধরলে, আর কতক্ষণই বা তার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে!”
বীর্য হেসে বললেন, “তাই মহারাজকে একটি শোক সামলে নিতে দাও। শোক সামলে নিলে একটু বিলাপ করবেন, তারপর পুনরায় রাজকাজে ব্যস্ত হয়ে প্রথম করিন্দ্রকে যুবরাজ ঘোষণা করবেন। ততক্ষণ অব্ধি আনন্দকে অন্তরে পুষে রেখে দাও। আমি বলছি মিলিয়ে নিও, শীঘ্রই আরো একটু সুখদ সমাচার আসতে চলেছে। সর্বাম্বাও শীঘ্রই দেহত্যাগ করতে চলেছে”।
