ভূমিকা
ব্রহ্মসনাতন তাঁর সম্পূর্ণ কথা সমাপ্ত করার আগেই দেহত্যাগ করে চলে যান। দিব্যশ্রী এক তো পিতার মৃত্যুতে বিমর্ষ হয়ে যান, আর তার সাথে সাথে কৃতান্তিক ধর্ম স্থাপিত করতে না পারার জন্যও বিমর্ষ হয়ে পরেন। প্রায় একটি বছর চলে গেলেও, সেই বিমর্ষভাব দূর না হলে, তিনি নিশ্চয় করেন যে তিনি আর নিজের দেহরক্ষা করবেন না। হতাশায় গ্রস্ত হয়ে তিনি বলেন, “যখন কৃতান্তিক ধর্মই স্থাপন করতে পারলাম না, তখন আর দেহ রেখে কি করবো?
এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি একদিন গঙ্গা বিহারে গিয়ে, মধ্য গঙ্গায় নিজের বিসর্জন দেবেন, এই স্থির করে গৃহ থেকে নির্গত হতে গেলে, তাঁরই এক বান্ধবী, দেবী মতি তাঁর মাত্র ৮ বৎসরের কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত ব্যস্ততার সাথে বললেন, “দিব্যশ্রী, আমি তোর কাছেই আসছিলাম। … আমার স্বামীর দেহান্ত হয়েছে, তা তো তুই জানিস। এবার আমারও কর্কট রোগে দেহান্তের পালা। একটি আশ্রমে আমার দেহদান করা আছে। তাই তাঁরা আমার এই অন্তিম অবস্থায় আমাকে সেখানে উপস্থিত থেকে তাঁদের সেবা গ্রহণ করে দেহত্যাগের জন্য বলেছে।
আর তারই সাথে, আমার এই একমাত্র কন্যা, শ্রীমতি সর্বক্ষণ তোর কথাই বলে চলে। সে আমাকে বলে যে, সে নাকি কনো বায়সী ছিল, আর সে কৃতান্ত নামে কিছু একটি গ্রন্থের দ্বিতীয় ও তৃতীয় কাণ্ড বিস্তারিত ভাবে জানে, আর তা নাকি সে তোকে বলবে। সে তোর কাছেই থাকবে সারাজীবন এই তাঁর অঙ্গিকার। ঈশ্বর অত্যন্ত করুণাময়ী। তাই আমার মেয়েটার একটা হিল্লে করে গেলেন। মা জীবিত থাকতেই, সে তোকে সর্বক্ষণ মা জ্ঞান করে। … তাই আমাকে একটি বড় দুশ্চিন্তা, যে আমার মৃত্যুর পর আমার মেয়ের কি হবে, তাই থেকে মুক্ত করেছে।
আমার প্রাণের সখী তুই। তাই আমার এই একটি অনুরোধ গ্রহণ কর দয়া করে। আমার মেয়েকে তুই নিজের মেয়ে করে গ্রহণ কর। আমি সমস্ত আইনি কাজ করে, তোর কাছে পাকাপাকি আমার মেয়েকে রেখে যেতে চাই।
নিরাশা তো মিটলো না দিব্যশ্রীর, কারণ কৃতান্তিক ধর্ম স্থাপন তো তাঁর হলো না, কিন্তু বেশ বুঝলেন তিনি যে তাঁর পিতা তাঁর মৃত্যুকে আটকে দিলেন।
আইনি সমস্ত কার্যাবলী হয়ে যাবার পর, যখন দিব্যশ্রী তাঁর কন্যা, যাকে সর্বদাই অত্যন্ত স্নেহ করতেন তিনি, সেই শ্রীমতির সাথে ক্রীড়া করছিলেন, তখন বালিকা শ্রীমতী বললেন, “মা, আমি না বায়সী ছিলাম, যে ব্রহ্মসনাতনের থেকে কৃতান্ত দ্বিতীয় ও তৃতীয় কাণ্ড ও পরবর্তী কাণ্ড, মানে জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড, সর্বশ্রী কাণ্ড এবং প্রজ্ঞা কাণ্ডসমূহ শুনেছি। … তোমাকে সেই কথা বলতে হবে, তবেই তুমি নাকি কৃতান্তিক ধর্মকে স্থাপিত করতে পারবে, এমনই তিনি আমাকে বলেছিলেন”।
দিব্যশ্রী প্রথম যখন তাঁর সখী মতির থেকে এই কথা শুনেছিলেন, তখন গুরুত্ব দেননি। তিনি ভেবেছিলেন, দেবী মতিকে তিনি কৃতান্ত সম্বন্ধে অনেক কথা বলেছেন এর আগে। তাই হয়তো, যাতে তাঁর মেয়েকে কাছে রাখেন তিনি, তাই কৃতান্তের কথা বলেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় কাণ্ডের নাম যে জগদ্ধাত্রেয়, আর তৃতীয় কাণ্ডের নাম যে সর্বশ্রী এবং পরবর্তী কাণ্ড সমূহের নাম যে প্রজ্ঞা, এই কথা তো তিনি ছাড়া কেউ জানেন না!
তাই তিনি আগ্রহী হয়ে প্রশ্ন করলেন, “তুমি জানো ব্রহ্মসনাতন কে ছিলেন? তিনি তোমাকে এই কথা কি করে বললেন? তুমি তো খুবই ছোটো ছিলে!”
শ্রীমতী বললেন, “জানি। তিনি ছিলেন ৯৬ কলা পূর্ণ অবতার। আর আমাকে তো তিনি আমার এই জন্মে এই কথা বলেন নি। তিনি আমাকে পূর্বজন্মে এই কথা বলেছিলেন। আমি তখন এক বায়সী ছিলাম। সত্য বলতে আমাকে তিনি সেই কথা বলেনও নি। কিন্তু আমি নিত্য তাঁর কাছে বসে সেই কথা শ্রবণ করতাম। সমস্ত কথা শ্রবণ করার পর, আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, আমি জন্মমৃত্যু রহিত হবো, তাই আর জন্ম নেবো না। এবার মৃত্যু বরণ করবো। ঠিক যেমন তুমি ভাবছিলে গঙ্গায় ডুবে দেহত্যাগ করবে, আমিও তেমনই ভাবছিলাম।
কিন্তু সেই কালে একটি কাকারি আমাকে ধাওয়া করলে, আমি প্রাণ নিয়ে পলায়ন করতে করতে, বেশ কিছু চক্কর কেটে, ব্রহ্মসনাতনের চরণ ধারণ করে ক্রন্দন করে বলি, “আমাকে বাঁচান!”
তিনি উত্তরে বলেন, “তুমি তো প্রাণ ত্যাগ করতেই যাচ্ছ, আর কনোদিনও জন্ম নেবেনা বলে। তাহলে তুমি প্রাণের ভয় নিয়ে পলায়ন করছো কেন? তোমাকে তোমার ইচ্ছামত মৃত্যু দিতেই তো কাকারির আবির্ভাব!”
আমার ভ্রম ভেঙে যায় সেই কথাতে, আর আমি বলি, “প্রভু, জন্মমৃত্যু থেকে মুক্ত হবো বললেই কি মুক্ত হওয়া যায়! … আমি আপনার সমস্ত কৃতান্ত কথা শুনেছি, আর মনে করছিলাম যে আমি মুক্ত হয়ে গেছি। আসলে আমি তো কেবলই সেই কথা শ্রবণ করেছি, তাঁকে না উপলব্ধি করেছি আর না তাঁকে ধারণ করেছি। তাহলে আমি কি করে মুক্ত হবো প্রভু!”
প্রভু ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “একবার নিজের তনুর দিকে তো তাকাও বায়সী। নিজেকে বড় হাল্কা হাল্কা লাগছেনা! … একবার দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে দেখো তো, নিজের সমস্ত ভারকে সেখানে দেখতে পাও কিনা!”
আমি তাঁর কথাতে নিজেকে অত্যন্ত লঘু অনুভব করতে, দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আমার তনু পরে রয়েছে সেখানে, মৃত। আতঙ্কে আমি প্রভুর দিকে তাকাতে, প্রভু ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, দেবী মিতা তোমাকে গর্ভে ধারণ করবেন বলে বসে রয়েছেন। তাঁর গর্ভে স্থান গ্রহণ করো। যখন তিনি তনুত্যাগ করবেন, তখন তোমাকে আমার কন্যা, দিব্যশ্রীর কাছে অর্পণ করে যাবেন।
দিব্যশ্রী আমার থেকে কৃতান্ত কথার কেবল সর্বাম্বা কাণ্ড শ্রবণের পর নিজের জিজ্ঞাসা ধারণ করে কৃতান্তিকা শ্রবন করতে চাইবে, তাই তাঁর আর কৃতান্ত কথার অন্তিম কাণ্ডসমূহ শ্রবণ করা হবেনা আমার থেকে। তুমি তাঁকে এসে, সেই সমূহ কাণ্ড বিবৃত করে, তাঁকে দিয়ে কৃতান্ত কথা সমাপ্ত করিয়ে, তুমি ও সে মিলে কৃতান্তিক ধর্মের স্থাপনা করবে। সঙ্গে যা আবশ্যক সাহায্য, তাও লাভ করবে। এখন যাও আর দেবী মিতার গর্ভে স্থান গ্রহণ করো”।
মা, আমিই সেই বায়সী, আর আমিই দেবী মিতার কন্যা, শ্রীমতী। আর আজ প্রভুর কথন অনুসারে আপনার সম্মুখে উপস্থিত, আপনাকে কৃতান্ত কথার অন্তিম কাণ্ডসমূহ শ্রবণ করাতে, যাতে রয়েছে মাতা সর্বাম্বার পরবর্তী লীলা, ও মানসের কীর্তি সমূহ। তাই যদি অনুমতি প্রদান করেন, তাহলে আপনাকে তা শ্রবণ করাবো”।
দিব্যশ্রী যেমন শ্রীমতীকে নিজের ক্রোড়ে আকর্ষণ করে নিয়ে যৎপরনাস্তি স্নেহ করলেন, তেমনই নিজের পিতা, প্রভু ব্রহ্মসনাতনকে প্রাণভরে প্রণাম করে শ্রীমতীর উদ্দেশ্যে বললেন, “নিশ্চয়ই শ্রবণ করবো পুত্রী। পিতা আমাকে একটি কীর্তি করিয়েছিলেন, প্রথম কাণ্ড অর্থাৎ সর্বাম্বা কাণ্ড শ্রবণ করানোর পূর্বে। সেই কীর্তি চলো আমি আর তুমি উভয়েই পুনরায় করি। অতঃপরে তুমি তোমার কথা শ্রবণ করাও”।
দেবী শ্রীমতী এবং দিব্যশ্রী এরপর নয়বার শ্রেষ্ঠ সম্ভব স্বল্প নিশ্বাস গ্রহণ করে বীজমন্ত্র উচ্চারণ করে, নিজদের মনকে শান্ত করলে, এরপর দিব্যশ্রী অনুরোধ করলেন তাঁর আদরের কন্যা শ্রীমতীকে, যাতে তিনি কৃতান্তের দ্বিতীয় কাণ্ড জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড শ্রবণ করান। তাই দেবী শ্রীমতীও আনন্দ চিত্তে নিজের কথন শুরু করলেন, ঠিক তেমন ভাবে যেমন ভাবে তিনি প্রভু ব্রহ্মসনাতনের থেকে সেই পাঠ শুনেছিলেন, আর একাগ্রচিত্ত হয়ে দেবী দিব্যশ্রীও সেই কথন শুনতে থাকলেন।
