অষ্টম পর্ব – অতিন্দ্রের আগ্রহ
অতিন্দ্র রিমির ব্যাপারে কথা শুনে, বেশ আগ্রহী হলো রিমির ব্যাপারে। বলল – বাহ, গভীর আর নিখাদ বিশ্বাস ঈশ্বরে।
আমিও সেই সুযোগে বললাম – আসলে তুমি বিবাহের কথা বলছিলে সেদিন। আমি আসলে তোমার মধ্যেই আমার কন্যাকে দেখে না একটু বোকা বনে গেছিলাম। তাই মাথাতেই আসেনি। … আসলে আমি আজ এসেছিলাম এটা জেনেই যে তুমি আসছো। আর বোধ হয়, রমেনদা তোমাকে আজ এখানে ডেকেছেনও, এই একই কারণে। … আসলে আমি বলতে চাইছিলাম, আমার কন্যার পাণিগ্রহণের ব্যাপারে।
অতিন্দ্র একটু হেসে রমেনদার দিকে তাকিয়ে বললেন – আপনি দেখেছেন উনার কন্যাকে গুরুমশাই?
রমেনদা – হ্যাঁ, দেখেছি, দেখে অবাকও হয়েছি, বিচলিতও হয়েছি। অনেকটা তোমারই কার্বনকপি, কিন্তু কনো শিক্ষা ছাড়াই।
অতিন্দ্র আর কথা বাড়ালো না। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন – আপনার কন্যা যদি সম্মত হন, আমার কনো আপত্তি নেই।
রমেনদা – একবার দেখে তো নাও!
অতিন্দ্র – দেখে কি করবো গুরুমশাই! … মাংসের দোকানের মাংস থোরাই যে তরতাজা কিনা দেখে নেব!
রমেনদা – গোস্বামীদের মেয়ে, আচার আচরণ বা মনোভাব কেমন, সেই ব্যাপারে!
অতিন্দ্র – যদি বিবাহ সম্ভব হয়, তবে তাঁর আচরণ, মনোভাব, সমস্তই আমার কাছে ভগবতীর শিক্ষা ও দীক্ষা। বিবাহ জগন্মাতার ইচ্ছাতেই সম্পন্ন হবে। … তাই না তো আমি পাত্রীকে বিবাহের আগে দেখতে চাই, আর না কথা বলতে চাই। হ্যাঁ যদি পাত্রী চান, তবে আমি বাধ্য সেই ব্যাপারে। … কিন্তু আমার তরফ থেকে এমন কনো বাহানা নেই। … না কিছুর দাবি আছে, আর না কিছু আমার চাই। তিনি যেমন হবেন, ভগবতীর নির্দেশ তাঁর মধ্যেই অবস্থান করবে।
আমি – বাবা, একটা কথা … মানে যদি মনে না করো। … আসলে, এই আদর্শের ব্যাপার স্যাপার না, সকলে বোঝে না। তাই মনের মধ্যে যাই থাকুক, যদি লোকদেখাতে একবার মানে বাড়িতে গিয়ে দেখাশুনা করে, … মানে বুঝতে পারছো কি বলছি!
অতিন্দ্র – হুম বুঝতে পারছি কিছুটা, তবে একটু খোলসা করে বললে ভালো হতো। … মানে আমার বুঝতে পারার মধ্যে অনেক কিছুই ধরে নেওয়া আছে তো; হতেও তো পারে আমার ধরে নেবার মধ্যে অনেক কিছু ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। তাই আর কি…
আমি – না মানে, নিজের স্ত্রীর ব্যাপারে এমন বলতে লজ্জাই লাগে, কারণ তোমার মুখ থেকে, রিমির মুখ থেকে যা শুনেছি, তাই থেকে আমি এতদিনে এইটি তো বুঝে গেছি যে, স্বামীস্ত্রী যতই দাবি করুক যে তাঁরা আলাদা ব্যক্তিত্ব, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। … বাস্তব এই যে স্বামীই স্ত্রীর আদর্শের বার্তা দেয়, আবার স্ত্রীই স্বামীর চেতনার বার্তা দেন। তাই নিজের স্ত্রীর কথা যেইকালে বলতে চলেছি, সেই ক্ষেত্রে নিজেরই অধোমুখী চেতনার কথাই বলছি।
অতিন্দ্র – কুণ্ঠা না করে, নিশ্চিন্তে বলুন। যে যেই চেতনারই অধিকারী হন না কেন, স্বরূপে সকলেই সেই ব্রহ্ম। তাই, যারা অধোমুখী চেতনা বা আদর্শ নিয়ে বিরাজমান, তাঁরাও সেই ব্রহ্মই, কিন্তু নিজের অজান্তেই, চেতনা না ধারণ করার লীলা করে যাচ্ছেন তাঁরা। তাই কুণ্ঠা করবেন না। সরাসরি বলুন।
উন্নত মনের কথা শুনেছিলাম, কিন্তু আজ প্রত্যক্ষ করছিলাম। সেই উন্নত মন দেখেই, মনে সাহস জুটিয়ে বললাম – আসলে বাবা, ব্যাপারটা এমন যে রিমি, মানে আমার মেয়ে রাধিকা, ওর মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ কি করে হয়েছে, তা আমারও জানা নেই। আমিও অকস্মাৎই একদিন আবিষ্কার করি সেই চেতনার কথা। আর যতদিন যায়, তত আবিষ্কার করি যে ওর মধ্যদিয়ে যেই চেতনা প্রবাহ চলছে, তার ধারণা আমার পক্ষেও করা সম্ভব নয়। … কিন্তু আমি যেমন যেমন তা আবিষ্কার করি, তেমনই ওর মাও সেই একই জিনিস নিশ্চয় আবিষ্কার করেন।
অতিন্দ্র একাগ্রচিত্তে আমার কথা শুনছে দেখে আমি বললাম – তার প্রমাণ আমি সেইদিন পাই, যেইদিন আমার স্ত্রীকে আমি আমার শ্যালিকার সাথে আলাপ করতে শুনি, রিমিকে বিয়ে দেবার ব্যাপারে। রিমির আধ্যাত্মিক চেতনা নিয়ে তাঁরা খুবই চিন্তিত, আর তাই তাঁরা কনো উঠতি ব্যবসাদারের সাথে রিমির বিয়ে দিতে আগ্রহী, যাতে বিপুল ধনরাশির মুখ দেখে, সে আধ্যাত্মের থেকে দূরে সরে আসে।
আমি আবার একটু ঢোক গিলে বললাম – না প্রথমে সেই সিদ্ধান্তে তাঁরা আসেন নি। প্রথমে তাঁরা বলছিলেন যে বিয়ে দিয়ে রিমিকে সাংসারিক দায়িত্বের মধ্যে আবদ্ধ করে দেবার কথা। কিন্তু পরের দিকে সেই আলোচনা এই জায়গায় এসে দাঁড়ায় যে, দায়িত্বভারে আধ্যাত্মভাব নাকি ঘোঁচে না, তা ঘোঁচে বৈভবে। তাই রিমিকে বৈভবের মুখ দেখাতে হবে। … তাই আমি, তোমাকে আমার বাড়িতে ব্যবসাদার করেই দেখিয়েছি।
একটু সামনের দিকে এগিয়ে, অতিন্দ্রের কাছে নিজেকে নিয়ে এসে বললাম – তাই, বুঝতে পারছো তো! … মানে ওর মা যদি বিয়ের আগে ঘনাক্ষরেও টের পায় যে, তুমি একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তি, তাহলে এই বিয়ে হতে দেবেন না উনি। … হয়তো তিনি তোমাকে পরে বলতেও পারেন রিমির আধ্যাত্মিকতার ব্যাপারে, আবার চেপেও যেতে পারেন এই ভেবে যে সময়ের সাথে সাথে যা ঠিক হয়ে যাবে, সেই কথা বলে ভালো পাত্র হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা কেন রাখবেন।
অতিন্দ্র একটা মুচকি হেসে বললেন – আমার বড়দা বা বাড়ির সকলেই জানেন যে আমি ব্যবসা করি, আমি যে আধ্যাত্মিক চর্চা করি মা জগদ্ধাত্রীর ইচ্ছায়, সেই ব্যাপারে মা জগদ্ধাত্রীই সকলের কাছে গোপন করে রেখে দিয়েছেন। আমার আধ্যাত্মিকতার ব্যাপারে জানেন গুরুমশাই, আমার ছয় ছেলেমেয়ে, আর এখন আপনি। তাই, পাত্রী দেখার যেই কথা বললেন, সেটা না হয় আমার বড়দা আর বড়বৌদিকে নিয়েই করে নেওয়া যাবে। … হুম, আমার ছেলেমেয়েদের বলে রাখবো, যাতে তাঁরা বিবাহকালে নিজেদের ভাবকে প্রকাশ না করেন। নিজের নিজের বাড়িতে ওরাও এই ব্যাপারে গোপন করেছে, তাই ওদের জন্য এই কাজ করা খুব কঠিন হবেনা।
আমি একটু লজ্জিত হয়েই বললাম – আমার খুবই খারাপ লাগছে বাবা; আসলে নিজের চরিত্র গোপন করা তো তস্করবিত্তি; সেটা জেনেও, সেই কাজ তোমাকে করতে বলাটা …
অতিন্দ্র হেসে বললেন – স্ত্রীর জন্য, পরিবারের জন্য, ঘুষ খাওয়া; চাকরি পাবার জন্য ঘুষ দেওয়া, প্রমশান বা ট্র্যান্সফার পাওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়া, টেন্ডার পাওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়া, ইন্টার্ভিউ ক্র্যাক করার জন্য চরিত্র গোপন করা, কমবেশি সকলেই তো করেছে এইসব, তাই না কাকু! … যেই জীবনই এক মায়া, সেই মায়াকে টিকিয়ে রাখার জন্য, এত কিছু করা যায়, আর ঈশ্বরের নির্দেশে এইসব করতে গেলেই, যত আপত্তি!…
একটা অভিজ্ঞের হাসি হেসে আবার বলল অতিন্দ্র – না কাকু, আজকের সমাজ ঋষিকেন্দ্রিক সমাজ নয় যে, সেখানে আধ্যাত্মবাদ চরমচেতনার বার্তা বহন করে। বাণিজ্যকেন্দ্রিক সমাজ আধ্যাত্মকে অত্যন্ত ভয় পায়, কারণ আধ্যাত্মের ফলে মনে যেই ত্যাগ জন্মে যায়, তাতে বাণিজ্য করা বা বাণিজ্যকে আগিয়ে নিয়ে যাওয়া, বা এক কথায় বলতে গেলে ধন-নাম-যশের যেই জগতজোরা আরাধনা এই মুহূর্তে চলছে, সেই আরাধনার থেকে মন উঠে যায়। তাছাড়াও, দিকে দিকে, কোনায় কোনায় অসাধুরা সাধুর বেশ ধারণ করে আধ্যাত্মকে এবং ঈশ্বরকে যেই চরম ভাবে অপমান করেছে এবং করে চলেছে, এতে আধ্যাত্মিক ব্যক্তির কথা কেউ শুনলেই, তার মাথায় দুটি কথা আসে – প্রথম হলো ভণ্ড; আর যদি ভণ্ড না হন তবে এই ত্যাগীর থেকে দূরে থাকো।
আবার হেসে বলল – তাই, আধ্যাত্মিক মানসিকতাকে, যারা সত্য অর্থে ঈশ্বরের দাস, যারা সত্য অর্থে ঈশ্বরের কাছে নিজের সমস্ত জীবন সঁপে দিয়ে অকর্তা হয়ে গেছেন, তাঁদেরকে অত্যন্ত গোপনেই এই সমাজসংস্করণ করতে হবে। এই গোপনীয়তার প্রথম কারণ অবশ্যই এই যে, সমাজ আজ আধ্যাত্মবিরোধী; তাঁদের ভোগের বাসনার কারণে হোক বা আধ্যাত্মের নাম করে ভোগবাসনার এক নতুন মার্গকে দেখে হোক, কিন্তু সত্য অর্থে আজ এই জগত সম্পূর্ণভাবে, আপাদমস্তক ভাবে আধ্যাত্ম-বিরোধী। কিন্তু আপনি বলেবন, আমরা তো সত্য অর্থেই সমাজসংস্করণ করতে চাইছি, তবে আত্মগোপন কেন? তাই তো?
আবার হেসে – কারণ হলো এই যে, সংস্করণ রাতারাতি বা একজীবনে সম্ভবও নয়। ঈশ্বর কনো চমৎকার করেনও না, করা পছন্দও করেন না। যদি গোঁড়া হিন্দু না হয়ে, প্রতিটি সম্প্রদায়কেই ধর্মের একাক হাত, ঈশ্বরের একাক চরণ জ্ঞান করে কোরানে চোখ রাখেন তবে দেখবেন, চমৎকার শয়তানের কীর্তি, ভগবানের নয়। শয়তানই মৃতকে জীবিত করে দিয়ে, চমৎকার দেখিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, সে ভগবান। কিন্তু ভগবান! না তিনি চমৎকার করেন, আর না তিনি চমৎকার পছন্দ করেন। তাই এই সংস্করণ বিপুল সময়ের ব্যাপার। … আর যতক্ষণ না সেই সংস্করণ ভিতরে ভিতরে সজ্জ হচ্ছে, ততক্ষণ এই কাজকে অতি গোপনেই করতে হবে।
আমি এবার মুখ খুললাম – কিন্তু, যারা পূর্ণভাবে আধ্যাত্মিক, তাঁরা তো মোক্ষলাভের অভিলাষী, তাঁরা মোক্ষ লাভ করে চলে গেলে, এই সংস্করণের কাজ যে মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যাবে না, সেই কথা কে বলতে পারে!
অতিন্দ্র হেসে – স্বামী বিবেকানন্দ ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে নরেন্দ্রনাথ হয়ে থাকা অবস্থায়, বারবার নির্বিকল্প সমাধির আবদার করতেন। জানেন তো সেই কথা? ঠাকুর কি বলতেন? তুই এতো স্বার্থপর! ভেবেছিলাম তুই একটা বড় বনস্পতি হয়ে কতজনকে ছায়া দিবি! … এমনই বলেছিলেন না?
আমি বুঝিনি অতিন্দ্র কি বলতে চাইছে। না বুঝেই ঘাড় নাড়লাম। অতিন্দ্র তাই আবার বলতে শুরু করলো – প্রথম আমাদেরকে মোক্ষ নিয়ে চলে যাবার মত অবস্থায় পৌছাতে হবে, আর তারপর জগন্মাতার কাছে, তাঁর এই সংসারে তাঁর কাজে সহযোগী হয়ে থেকে যাবার আবদার করে যেতে হবে, অর্থাৎ মোক্ষ লাভের অধিকারী হয়ে মোক্ষ ত্যাগ করে, তাঁর কাজে নিজেকে নিয়জিত করতে হবে, এটিই আমাদের এখন কর্তব্য। … আমরা বারবার আসবো। যতক্ষণ না এই সংস্করণ সমাপ্ত হচ্ছে, ততক্ষণ বারবার আসবো। ততক্ষণ মোক্ষ নিয়ে, আমরা স্বার্থপরের মত চলে যেতে পারিনা। … এই জগতকে পুনরায় মোক্ষকামী না গড়ে তোলা পর্যন্ত আমাদের একমাত্র জননী নিশ্বাস ফেলবেন না, তাহলে আমরা কি করে নিশ্বাস ফেলতে পারি! … কিন্তু যতক্ষণ না সেই সংস্করণ সম্পন্ন হচ্ছে, যতক্ষণ না পুনরায় জগতে ঋষিকুল স্থাপিত হচ্ছে, যতক্ষণ না জগতে পুনরায় মোক্ষলাভই জীবনের লক্ষ হয়ে উঠছে, ততক্ষণ আমাদের নেপথ্যে থেকেই কাজ করতে হবে। …
একটু গম্ভীর হয়ে উঠে সে আবার বলল – সেই গোপনীয়তাকে অঢিক রাখার জন্য, হাজার মিথ্যাচারন করতে হলেও করবো। সেই সত্যবাদীতার কনো মানেই হয়না, যেই সত্যবাদীতার কারণে, অসত্য বা মিথ্যা জগতে স্থাপিত হয়। … জগতে সত্য স্থাপনই প্রকৃত অর্থে সত্যের সেবার করা, আর সেই সেবা করার জন্য হাজারো মিথ্যাকথা, হাজারো গোপনীয়তা, হাজারো ছলনাই যে কাম্য, তা তো মহর্ষি ব্যাস, মহাভরতের পাতায়, শ্রীকৃষ্ণের মাধ্যমেই বলে গেছেন। … সত্য স্থাপনের জন্য তাই, হাজার নয় সহস্রসহস্রবার মিথ্যা কথা বলতে আমি প্রস্তুত। সেই মিথ্যা বলার জন্য যদি প্রতি জন্মের শেষে নরকদর্শন করতে হয়, তবে তার জন্যও আমরা সজ্জ। … আমাদের জননীর জন্য, নরকদর্শন কেন, নরকের অধিবাসী হতেও আমরা প্রস্তুত।
কথাগুলি যখন অতিন্দ্র বলছিল, তখন ওর চোখগুলি জ্বলজ্বল করছিল। আর রমেনদার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, উনার চোখ, নিজের শিষ্যরূপ সন্তানের জন্য গর্বে ও তৃপ্তিতে কোমল হয়ে গেছে। এ কেমন বিচারধারা! এ তো কেবল সাধু নয়, এ তো একটি মহাযোদ্ধা! … এখানে যেন দ্রৌপদী হলেন সাখ্যাত ভগবতী, আর সেই দ্রৌপদীর জন্য যেন পঞ্চপাণ্ডব সমস্ত জগতকে এদিক থেকে সেদিক করে দিতে প্রস্তুত। … এ আমি কার দেখা পাচ্ছি! … যেন সাখ্যাত ভগবতীর সেনার দেখা পাচ্ছি!
এই সমস্ত ভাবতে ভাবতে একটা অন্যজগতে চলে যাচ্ছিলাম। অতিন্দ্রই আমাকে আবার ফিরিয়ে আনলো। সে বলল – তা বলুন, কবে আর কোথায় যাবো বড়দা, বড়বৌদিকে নিয়ে।
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম – তুমি ঠিক করে আমাকে বলে দাও। … তুমি যেদিন বলবে, আমি প্রস্তুত।
অতিন্দ্র – তাহলে পরের সোমবার করতে পারেন। … সোমবার সোমবার করে আমার ইন্সটিটিউট বন্ধ থাকে আসলে। সেইদিনই না হয়!
আমি আমতা আমতা করে বললাম – রবিবার করলে হতো না! … না আসলে, রিমি এখনো একটা বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়াচ্ছে। আর তা ছাড়া…
অতিন্দ্র – হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। … রবিবারই ঠিক হবে। … বড়দার পোস্টিং খড়গপুরে। শনিবার উনি আমার কাছে চলে আসবেন, আর হয়তো রবিবার রাত্রেই ফিরে যাবার জন্য রওনা দেবেন। … ঠিক আছে, আমাকে আপনার ফোন নম্বরটা দিন। আমি বড়দার থেকে কোন রবিবার হয়, সেটা কনফার্ম করে, আপনাকে বলে দিচ্ছি। হাতে সময় নিয়েই বলছি। … আমি, বড়দা আর বড়বৌদি, এই তিনজন যাবো, আর হ্যাঁ আমি একজন উঠতি ব্যবসাদার, এটাই আমার পরিচয় হবে।
অতিন্দ্র সেদিনকে চলে গেল। রমেনদা সোফাতে নিজের শরীরটা এলিয়ে দিলেন। আমি বললাম – রমেনদা, সব ঠিক হচ্ছে তো!
রমেনদা শরীরকে এলিয়ে রেখেই বললেন – ভগবতীর সংসারে ঠিক ছাড়া ভুল হওয়া কি সম্ভব! … আমি ভাবছি অন্য কথা।
অন্য কি কথা ভাবছেন, সেই বিষয়ে নিজে থেকে না বললে, আমিই প্রশ্ন করলাম – কি কথা?
রমেনদা – অতিন্দ্র একটা অন্য মানুষ হয়ে গেছে। … যেই অতিন্দ্রকে আমি শিক্ষা প্রদান করেছিলাম, সেই অতিন্দ্র আর নেই। এতটাই আগে চলে গেছে ও, যে আমারও ধরাছোঁয়ার বাইরে। … (একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে) তবে আমাকেও আজ ও, শেখাবার চেষ্টা না করেও, অনেক কিছু শিখিয়ে গেল; বা বলতে পারো, ওকে মাধ্যম করে, ভগবতী আমাকে অনেক কিছু শিখিয়ে গেলেন।
নিজের খেয়ালে হেসেই বললেন – শিষ্য যখন গুরুর গুরু হয়ে ওঠে, ভায়া, এর থেকে বড় গুরুদক্ষিণা বোধহয় আর কিছু হয়না। হৃদয়ে এমন একটা আনন্দের স্রোত খেলা করে তখন, তার ব্যাখ্যা করতে গেলে কি বলতে হয় বলো তো ? … অনির্বচনীয়।
রমেনদার চোখেমুখে আমি আগেই এই তৃপ্তির ভাব দেখেছি। সেই ভাবেরই তিনি নিজে থেকে ব্যাখ্যা দিলেন। তবে আমার মাথায় এখনো যেটা ঢুকল না, সেটা হলো, অতিন্দ্র এমন কি শিখিয়ে গেল, যা রমেনদার কাছেও লব্ধ শিক্ষা!
রমেনদা নিজের থেকে সেই ব্যাপারে না বললে, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমিই প্রশ্ন করলাম – কি শিখিয়ে গেল অতিন্দ্র!
রমেনদা ঈষৎ হেসে – মোক্ষের লোভও লোভই। … সেই লোভকেও ত্যাগ করে, নিজেকে জগন্মাতার কাছে সঁপে দিতে হয়। হ্যাঁ ঠাকুরেরই কথা, কিন্তু ঠাকুরের সেই কথার গাম্ভীর্য আমি এতকাল বিচার করিনি, কিন্তু অতিন্দ্র সেই বিচার করে ফেলেছে। … আর একটা শিক্ষাও দিলো ও, সেটা হলো শব্দ প্রয়োগ।
আমি – শব্দপ্রয়োগ! সেটা কি ভাবে?
রমেনদা – যিনি মোক্ষলাভের অধিকারী, তিনিই মোক্ষের লোভ ত্যাগ করার যোগ্য। তাই প্রথম মোক্ষ লাভ করার অধিকারী হতে হয়, তবেই তা ত্যাগ করা যায়। … স্বামীজির একটা কথা মনে পরছে এই ক্ষেত্রে। উনি বলতেন, ভিখারির কাছে ত্যাগ করার কিছুই থাকেনা। সে কি করে ত্যাগী হবে? রাজা হতে হয়, তবেই ত্যাগ করা যায়। রাজা মানে বুঝলে পবিত্র ভায়া! … রাজা মানে মোক্ষধনের অধিকারী। আগে সেই ধন লাভ করে মহারাজ হতে হয়, শ্রেষ্ঠ ধনি হতে হয়, তারপর জগন্মাতার প্রেমে, সেই ধন ত্যাগ করতে হয়। …
খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে আবার বললেন রমেনদা – ঠিকই বলেছে অতিন্দ্র, সমাজসংস্করণ। এই সমাজের প্রতি আমাদের দায়কে আমরা এড়িয়ে যেতে পারিনা। … এখানে সকলেই আমিই। কারণ আমি যে ব্রহ্ম, আমার তো কনো ভেদই সম্ভব নয়। ভ্রমের কারণেই আমি তুমি, এই ভাব। যদি ভ্রমের নাশ হয়ে যায়, যদি সত্যের সম্মুখীন হওয়া যায়, তবে যে শুধুই ওহম। ওহম ব্রহ্মাস্মি। … তাহলে আর আমি তুমি কেন? তাই যাদেরকে আমরা তুমি বলছি, তারাও তো বাস্তবে আমিই। আর সেই কারণেই তো বলা হয়েছে, বাসুদেব কুটুম্বকম, অর্থাৎ সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড আমার কুটুম্ব, সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড আমি স্বয়ং। … তাই এই একটি শরীরের ভ্রমে আবদ্ধ আমিকে আমি মনে করে, এর মোক্ষের চিন্তা করার অর্থ, সে তো নিজের সাথে নিজেরই করা মিথ্যাচার; স্বয়ং ভগবতীর সাথে করা মিথ্যাচার!
আমি – কিন্তু এত গোপনে কেন?
রমেনদা – সম্মান। … হুম সম্মানের জন্য। অন্যকে সম্মান করার জন্য নয়, নিজেকে নিজে সম্মান করার জন্য; সাখ্যাত ভগবতীকে সম্মান করার জন্য। কেবল আমার আদর্শই আমার আদর্শ নয়, সকলের আদর্শই আমার আদর্শ, কারণ সকলে আমিই। … সকলেই ব্রহ্মের অবতার, সকলেই ব্রাহ্মণ। তাই সকলের ভাবনাকেই সম্মান করা আবশ্যক। …
আমি ভ্রুকুঁচকে তাকালে, রমেনদা বললেন – এই ব্যাপারে, আমি বিস্তারে বলতে অপারগ। তবে আমার পরামর্শ এই যে, এই ব্যাপারে, রিমির সাথে একটু কথা বলো না গিয়ে। তাহলে অতিন্দ্রের সাথে রিমির ধারনার রেঞ্জটাও মিলিয়ে দেখে নিতে পারবে।
ব্যাপারটা সত্যিই আমার কাছে এখনও ধোঁয়াশা। তাই রিমির কাছেই গেলাম। সন্ধ্যার দিকে একটু হাটতে বেড়িয়েছিলাম। তখনই কথাটা পারলাম। বললাম – আচ্ছা রিমি, আমাকে একটা কথা বল, এই সমস্ত আধ্যাত্মিক ধারণা, এই সব কেন? মোক্ষপ্রাপ্তির জন্যই তো?
রিমি – হুম, সেটিই তো অন্তিম লক্ষ। যেই ভ্রমের কারণে এই অনিত্য ব্রহ্মাণ্ডের কল্পনা করে, যা বাস্তবে নেই, তাকে বাস্তব মনে করে চলেছি, সেই ভ্রমের থেকে সম্পূর্ণ ভাবে মুক্ত হওয়া, অর্থাৎ সমস্ত অস্তিত্বের ভ্রম থেকে মুক্ত হওয়াই জীবনের অন্তিম লক্ষ।
আমি – বেশ, তাহলে একটা কথা বল; মোক্ষের চিন্তা করা কি ঠিক না ঠিক নয়?
রিমি একটু হেসে বলল – কে করবে সেই মোক্ষের চিন্তা আর কার করবে?
আমি – আমি করবো, আমার মোক্ষের চিন্তা করবো।
রিমি আবার হেসে বলল – তুমি টা কে? এই শরীর, যা কিছুদিন আগে ছিলনা, আর কিছুদিন পরে থাকবে না? নাকি সেই আত্মা? যেই আত্মা একের পর এক দেহ ধারণ করে কিছু একটা খুঁজে চলেছে, কিন্তু কি খুঁজে চলেছে, তা সে নিজেই জানেনা! … কোনটা তুমি?
যখন এই প্রশ্নগুলো আমার কাছে, রিমির থেকে, অতিন্দ্রের থেকে, রমেনদার থেকে উল্কার মত ছুটে আসেনা, তখন মনে হয় যেন আমি কাক হয়ে পেখম লাগিয়ে ময়ূর সাজতে এসেছি এঁদের মাঝে। কি উত্তর দেব, কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না।
তাই রিমিই বলল – অসীম ব্রহ্ম। যে অসীম, তার কি ভাগ হয় বাবা! … ভাগ হলেই যে সে সসীম হয়ে গেল, আর অসীম রইল না। তাই আত্মা, যার সংখ্যা সকল সময়েই সমান, কিন্তু যার সংখ্যা সহস্র লক্ষ্য, তা কি করে ব্রহ্ম হতে পারে? তা অসত্য কখনোই নয়, কিন্তু সত্যও নয়; ঠাকুর তাই এঁদেরকে বলতেন অনিত্য। অর্থাৎ সেই ব্রহ্ম, যার কনো অণু সম্ভব নয়, যার কনো ভাগ সম্ভব নয়, তাঁকেই ভ্রমবশত বহু ভেবে নিজেকে আমরা আত্মা মনে করে ভ্রমিত। … তাহলে আসলে আমরা কে?
আমি এবার কিন্তু কিন্তু করে, ভয়ে ভয়েই মুখ খুললাম; নিজের মেয়ে তো, একটু যদি ভালোবেসে বকুনিও দেয়, শুনে নেব। বললাম – আমিই তাহলে তুই, আমিই তাহলে সকলে?
রিমি এবার হেসে বলল – ঠিক তাই। … আমিই সমস্ত কিছু; সমস্ত কিছু আমারই কল্পনায় উপস্থিত। তাই এই শরীরের মধ্যে যে রইছে, সে যদি মোক্ষ পেয়েও যায়, তাও কি মোক্ষ প্রাপ্তি হলো আমার? না হলো না; সেদিনই আমি মোক্ষ লাভ করবো, যেদিন সমস্ত কল্পনার নাশ হবে; যেদিন সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের সকল আমির নাশ হবে… যাকে মহম্মদ বলেছে কি? কায়ামত। … অর্থাৎ কেয়ামত যতদিন না হবে, ততদিন মোক্ষলাভও হবেনা।
আমি – তাহলে কর্তব্য কি আমাদের?
রিমি সামান্য হেসে – কর্ম আমরা করতে কবে পারতাম? ব্রহ্ম আমরা। সম্পূর্ণ ভাবে নিষ্ক্রিয়। এক জগন্মাতাই হলেন সক্রিয় ব্রহ্ম, বা পরাচেতনা। কর্ম তো তিনিই করেন। আমরা কেবল তাঁর কাছে সমর্পণ করে, তাঁর কর্ম করার পুতুল হতে পারি। … আমাদের কর্তব্য তাই তাঁর কাছে সেই পুতুল হয়ে সমর্পণ করা, আর তিনি যেমন আমাদেরকে নাচাচ্ছেন, তেমন তালে নাচতে থাকা।
আমি – কিন্তু সেই কাজের ডঙ্কা বাজানো কি অপরাধ?
রিমি – নিজের মন বুদ্ধি ইত্যাদি পঞ্চভূত দিয়ে যেই সিদ্ধান্তই নেওয়া হবে, সেখানেই ঝঞ্ঝাট, কারণ সেখানেই সমর্পণের অভাব। তিনি যদি ডঙ্কা বাজাতে বলেন, যেমন চৈতন্যদেবকে বলেছিলেন, মহম্মদকে বলেছিলেন, বিশপকে বলেছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দকে বলেছিলেন, তখন ডঙ্কা বাজাতে হবে; আবার যেমন তিনি বুদ্ধকে, ঠাকুর রামকৃষ্ণকে, বিশ্বামিত্রকে, বেদব্যাসকে, মার্কণ্ডকে ডঙ্কা বাজাতে দেননি, তখন ডঙ্কা বাজবে না।
আমি – কিন্তু এই গোপনীয়তার কারণ কি?
রিমি একটু হেসে বলল – গ্রামে বাঘ ঢুকে পরেছে। কিন্তু সেই কথা সকলে জানেনা। কি করা উচিত তখন?
আমি – মাইক, চোঙ সব নিয়ে, সকলকে ঢাক পিটিয়ে বলা যে, বাড়ির বাইরে যেন না বার হয় কেউ।
রিমি – বেশ, রাজা জানতে পেরেছে, চারজন দুষ্কৃতি একজনের ছেলেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কি করবে তখন রাজা?
আমি – সকলকে সতর্ক করবে … না না, এতে তো সকলে ভয় পেয়ে যাবে। রাজা গোপনে নিজের সেনা পাঠিয়ে, সেই চার দুষ্কৃতিকে ধরবে, আর ছেলেটাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসবে।
রিমি এবার হেসে বলল – এই দুটি অবস্থা, গ্রামে বাঘ পরা, যেখানে ডঙ্কা বাজানো হলো, আর দুষ্কৃতির আক্রমণ, যেখানে ডঙ্কা না বাজিয়ে গোপনীয়তা রাখা হলো, এর পার্থক্য বলতে পারবে?
আমি একটু এদিক সেদিক বলার চেষ্টা করলাম। খানিক চেষ্টা করে বুঝলাম, কিছুই বলতে পারছিনা। তাই শেষে বললাম – তুই বুঝিয়ে দে। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
রিমি মিষ্টি হেসে বলল – বাঘের ভয় সবার আছে। তাই বাঘের নাম শুনে সকলে ঘরের মধ্যে ঢুকে দরজা দিয়ে দেবে। অর্থাৎ যদি সাধারণ মানুষ বোঝেন যে ভয়ের কিছু আছে, তবে তাদেরকে যা নির্দেশ দেওয়া হয়, তাই করে তারা। তান্ত্রিকের থেকে ভয় কাজ করছিল সর্বত্র তখন, ধর্মপরিবর্তনের ভয় কাজ করছিল তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে। তাই চৈতন্যদেবকে তিনি ডঙ্কা বাজাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আর চৈতন্যদেব তাই করলেন। আরবের দস্যু ও বর্বরদের থেকে আরবের মানুষ ভীত, তাই মহম্মদের নির্দেশ সকলে শুনতেন, আর তাই আল্লাহের নির্দেশে ডঙ্কা বাজে।
একটা পার্কের সিমেন্টের সিটে বসে আবার বলল রিমি – কিন্তু দুষ্কৃতির থেকে হয় মানুষ ভয় পেয়ে কি করা উচিত বুঝবে না, নয় তারা দুষ্কৃতির থেকে ভয়ই পাবেনা, ফলে গাফিলতি দেবে। তাই রাজা ডঙ্কা পেটালেন না। তেমনই ঠাকুর রামকৃষ্ণের মহাদর্শন যেই উদ্দেশ্যে অর্থাৎ মানুষকে কামিনীকাঞ্চনের থেকে ফিরিয়ে আনা, তা সাধারণ মানুষ বুঝবেন না, কারণ তারা কামিনী অর্থাৎ কামনাবাসনায় আর কাঞ্চন অর্থাৎ ধনবৈভবের নেশায় মত্ত। তাই ঠাকুর কনো ডঙ্কা বাজালেন না। সরাসরি কিছু মানুষ যারা কামিনীকাঞ্চনের জন্য বিরক্ত, তাদেরকে নিজের অমোঘকথা শুনিয়ে নীরবে বীজ পুঁতে দিলেন। অর্থাৎ, যখন যেমন, তখন তেমন।
আমি – এখন তবে কি করনিয়?
রিমি – অত্যন্ত গোপনে অপেক্ষা করে থাকতে হয়। হয়তো তোমার জীবনে একজন কি দুইজন, বা খুব বেশি হলে চার-ছয়জন আসবেন, যারা এই পঞ্চভূতের জগত থেকে বিরক্ত। তাদের মধ্যে সেই বীজকে অতি গোপনে স্থাপন করে দাও, যাতে সেই বীজ তাঁর মধ্যে গাছ হয়, আর সেই গাছ আবার কিছু বীজ হয়ে কারুর কারুর মনে স্থাপিত হতে থাকে। … মোক্ষচিন্তা একদমই নয় এখন, ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব নরেন্দ্রনাথের নির্বিকল্প সমাধির ইচ্ছাকে তিরস্কার করে, স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে দিয়েছেন তার। … অর্থাৎ যার মধ্যে মাজননী মোক্ষপ্রাপ্তির ন্যায় আধ্যাত্মিক চেতনা প্রদান করেছেন, তাদের বারবার জন্ম নিতে হবে, বারবার দেহ ধরে অত্যন্ত গোপনে, বীজ থেকে গাছ করতে হবে, আর সেই গাছের বীজ বেশ কিছু মনে ছড়িয়ে যেতে হবে। প্রায় ধরে নাও, দশেক এমন জন্ম নেবার পরেই, এমন গাছের সংখ্যা প্রায় ১০-১২ বা ২০-২৫ হবে, আর চারাগাছের সংখ্যা ১০০-১৫০ হবে। যেদিন হবে, সেদিন এসে ডঙ্কা বাজাতে হবে। আর হিল্লোল তুলে যেতে হবে। … সেই হিল্লোল বহুদিন চলবে, আবার ধীরে ধীরে তাতেও পচন ধরে যাবে, যেমন এখন চৈতন্যমতে পচন ধরে গেছে।
আমি – মানে, যতক্ষণ না মূর্তি তৈরি হচ্ছে, ততদিন আড়াল করে রাখতে হবে! মূর্তি গড়া শেষ হলে, তবেই আত্মপ্রকাশ!
রিমি – হ্যাঁ, ঠিক তাই!
আমি এবার সম্পূর্ণ ব্যাপারটা বুঝলাম, আর এও বুঝলাম, রিমি হলো অতিন্দ্রের পুরোপুরি যেন কার্বন কপি; সত্যিই স্বামীস্ত্রী যেন একই আত্মার দুই মুখ। নিচু অবস্থায়, অর্থাৎ আমার ও আমার স্ত্রীর ন্যায় দম্পতি, যারা অবিদ্যার সংসারে মেতে উঠি, ভোগবাসনা, ধনযশ, দেহসুখ ইত্যাদি নিয়ে, তাদের ক্ষেত্রে এই সত্যতা লুকিয়ে থাকে, বুঝতে পারা যায়না। কিন্তু অতিন্দ্র রিমির যেই বিদ্যার সংসার গড়তে চলেছে, তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, স্বামীস্ত্রী একই আত্মার যেন দুটি মুখ হয়; তা না হলে, একই মানসিকতা, একই ধারা বিচার; একই ধারার হৃদয়ের ভাব কি করে হতে পারে!
