কথা সঞ্জীবনী | রামকৃষ্ণ দর্শন

বাড়ি পৌছালাম বিকাল ৫টায়। … আসলে আমার খেয়াল ছিল না যে, আমি অফিসে গেছিলাম, মানে অন্তত বাড়িতে সেরকমই জানতো। … মনে থাকলে, আরো দু-ঘণ্টা এদিক সেদিক ঘুরে বাড়ি ঢুকতাম। কিন্তু খেয়াল না থাকায়, সরাসরি বাড়ি ঢুকে গেলাম। আর ঢুকতেই গিন্নির প্রশ্ন – কি? এত তাড়াতাড়ি অফিস থেকে চলে এলে!

প্রশ্নটা শুনে, আমি একটু থতমতই খেয়ে গেছিলাম। আসলে আমার যে মনেই নেই আমি অফিসের জন্যই সকালে বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিলাম। … তবে হ্যাঁ, উত্তর দেবার সময়ে আমতা আমতা করিনি। … রমেনদাঁড় সাথে থেকে থেকে, আর রিমির প্রভাবেও কিছুটা স্মার্ট হয়ে গেছি। এই জিনিসটা আসলে রিমিই আমাকে শিখিয়েছিল, যদি প্রশ্নের উত্তর রেডি না থাকে, উত্তর বানাতে সময় লাগে, তাহলে এমন ভান করতে যেন প্রশ্নটা শুনতেই পাওনি। দ্বিতীয়বার একই প্রশ্ন আসার আগে, উত্তরটা রেডি করে নিতে হয়; এমন না করলেই সামনের লোক ধরে ফেলে, উত্তর বানিয়ে বলা হচ্ছে।

সেই কথা মাথায় রেখেই, পায়ের বুট জুতো খোলাতে মন দিলাম। … উত্তর রেডি হয়ে গেল। প্রশ্ন আবার রিপিট হলো। গিন্নি বললেন – কি গো, আজ তাড়াতাড়ি ফিরে এলে অফিস থেকে! শরীরটরির ঠিক আছে তো!

আমি একমুখ হাসি নিয়ে বললাম – হ্যাঁ শরীর ঠিক আছে। আসলে আজ হাফ করেই বেড়িয়ে পরেছিলাম। একজায়গায় গেছিলাম। সেখান থেকেই আসছি।

গিন্নি ভ্রু কুঁচকে বললেন – অফিসের কাজেই!

আমি – না না, সংসারের কাজে।

গিন্নি এবার একটু ভ্রুটা উপরে তুলে, মুখটায় একটা গাম্ভীর্যের ভান করে বললেন – বাবা সংসারের কাজে উনি নাকি হাফ নিয়েছেন। … তা কি সংসারের কাজে গেছিলে শুনি একটু!

আমি একটা নিশ্বাস নিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিলাম। তারপরে বললাম – একটা ভালো ছেলের সন্ধান পেয়েছিলাম। উঠতি ব্যবসাদার, বেশ ভালো পশার জমিয়ে ফেলেছে এর মধ্যেই। আর বেশ পয়সা করেছে। … বাড়িঘর যা দেখলাম, রিমিকে পুরো রাজরানি করে রেখে দেবে। …

গিন্নির যেন দারুণ উৎসাহ জন্ম নিলো। অফিস থেকে ফিরলে, হাতপা ধুইয়ে নেবার আগে বসতেই দেয়না আমাকে। আজ বিপরীত রূপ গিন্নির। আমার সামনেই একটা টুল নিয়ে এসে বসে, নরম সুরে বললেন – কোথায় গো? … কেমন দেখতে ছেলে কে? কি করে ছেলে? বাড়িতে কে কে আছে?

আমি একটু ফ্যালফ্যালে চোখ করে তাকিয়ে বললাম – বাবা! এতো প্রশ্ন একসাথে! … তাও এতো বিনম্রতার সাথে! … আরে রিমির মা, বিয়ে তোমার মেয়ের; তোমার উৎসাহ দেখে তো মনে হচ্ছে তোমারই বিয়ে!

রিমি এবার ফিক করে হেসে ফেলল, সঙ্গে আমাদের ছেলে অনিকও। অনিক এখন কলেজে পরছে। নরমাল বিএ গ্র্যাজুয়েট। সঙ্গে ক্যাটারিংএর কাজ করে, শিখছে আর সামান্য কামাচ্ছেও। বাবা বা মা, কারুরই নেওটা নয় সে, তবে হ্যাঁ দিদিকে প্রচণ্ড বিশ্বাস করে। সমস্ত আবদারও দিদির কাছেই।

আমার গিন্নি আজ যেন দুকান কাটা। ছেলে মেয়ে তার উপর হাসলে, হয় লজ্জা পায়, নয় একটু দাদাগিরি দেখায়। আজ দুটোই করলো না। যেন সত্যি সত্যি মেয়ের না, উনারই বিয়ের সম্বন্ধ এনেছি। … আমি সেই সমস্ত কিছুকে দেখে, একটু চাল মারার ভঙ্গিতেই বললাম – এখনই মাসে ৪৫ কামায়। … প্রতিমাসে আগের মাসের থেকে ইনকাম বাড়ছে। … বছর ছয়েক পরে কি হবে বুঝেছ! …

গিন্নি উৎসাহে টুলটা আরো এগিয়ে নিয়ে এসে বলল – দেখতে শুনতে কেমন! … বাড়ি কোথায়?

উৎসাহ আর ধরে না। আমি আবার একটু চাল মেরে বললাম – ইন্সটিটিউট আছে নিজের। সেখানে পরানোর ৬জন টিচার আছে। যাতে স্কুলের কামাই না হয়, আর যাতে ব্যবসার ক্ষতি না হয়, তাই টিচারদের নিজের বাড়িরই নিচের ফ্লোরে রাখে, কোয়ার্টার করে দিয়েছে। … চারতোলা বাড়ি। …  নিচের তোলায় গাড়ি, স্করপিও আছে ছেলের। দুই তোলায় ইন্সটিটিউট। তিন তোলায় কওয়ারটার। আর চতুর্থ তোলায় ছেলে একাকি থাকে, রাজমহল বুঝলে, রাজমহল।

এই চার তোলার ভাগের ব্যাপারে কিচ্ছু জানতাম না, ঢপের মালা পড়িয়ে দিয়েছিলাম। পরে চিন্তা হচ্ছিল, যদি না মেলে, তখন কি হবে! রিজেক্ট করে দেবে না তো! … ওমা, পরে দেখি যেমন বলেছিলাম ঠিক তেমনই। … না স্করপিও গাড়ি আর চারতোলা বাড়ির কথা রমেনদাই বলেছিলেন, কিন্তু বাকিটা আমি আমার গিন্নিকে প্রথমদিন বানিয়ে বলেছিলাম।

গিন্নির ইন্টারেস্ট আরো বেড়ে গেল। আমায় বলল – কোথায় ব্যবসা! … ছেলের বাড়ি কোথায়?

আমি বিশাল রং চড়িয়ে বলতে থাকলাম – ছেলে সুপার ইনটেলিজেন্ট। দাদুর আমলের বাড়ি চন্দননগরে। পাছে প্রমটার নিয়ে নেয়, তাই নিজেই ফেলে দিয়ে, চারতলা বাড়ি হাঁকিয়ে নিয়েছে। তিন ভাই, একভাই বিদেশে থাকে, আর ফিরবে না। … বড়ভাই রেলের বড় পোস্টে কাজ করে। … ফ্ল্যাট আছে কলকাতায়, কিন্তু কাজের জন্য স্ত্রী ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে কাজের জায়গার কোয়ার্টারে থাকে। কাজ যেমন স্মার্টলি করে, ছেলেকে দেখতেও তেমন স্মার্ট। গৌর বর্ণ, লম্বা, মানাবে দারুণ রিমির সাথে।

টুকাই, মানে আমার ছেলে বলল এবার – ইন্টেলেক্ট কোচিং কি?

আমি বললাম – হ্যাঁ ওরকমই একটা নাম।

টুকাই – ম্যানেজমেন্ট পড়ানো হয়। … খুব নাম, স্টুডেন্টদের ভরসার জায়গা খুব। … উত্তরউত্তর স্টুডেন্ট বাড়ছে। … আমি গেছি ওখানে। একবার খাবার সাপ্লাই দেবার ছিল। … ক্লাসের ক্যাপাসিটি প্রায় ৩০০জনকে ধরানোর মত। এখন ৭০জন আছে। তবে এইবারের সেশানে প্রায় ১৪০জন এডমিশন নিয়েছে। ভদ্রলোকের নাম অতিন্দ্র বোধ হয়। … অতিন্দ্র … সারনেমটা কি যেন! … নন্দী, নন্দী। … খুব ভালো লোক। … ব্যবসা করে ঠিকই, তবে মনোভাব ব্যবসাদারের নয় ঠিক। মানে … স্টুডেন্টদের প্রতি খুব সিন্সিয়ার।

আমি – হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওটাই ওটাই। …

টুকাই – হ্যাঁ বুঝে গেছি, তোমার ডেসক্রিপশন থেকেই বুঝে গেছি। খুব ভালো ছেলে মা। … পাড়ার লোকেরাও খুব সুখ্যাত করে উনার।… স্বভাবচরিত্রও খুব ভালো।

আমার গিন্নি বেশ গদগদ হয়ে গেলেন। সেই দেখে আমি একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম, আর মনে মনে বললাম – মা জগদ্ধাত্রী সহায়।

অন্যদিকে রিমির মনে অন্য কথা উঠেছিল। সেইদিন তো আমাকে কিছু বলল না। … পরেরদিন গুডফ্রাইডের ছুটি ছিল। তাই আমি একটু মর্নিং ওয়াকে যাবো ঠিক করেছিলাম। আসলে রিমির জন্য একটা ভালো সম্বন্ধ পাওয়া গেছে, তাই মনটাও একটু ফুরফুরে লাগছিল। … রিমিকেও দেখলাম আজ, সালওয়ার না পরে, ট্র্যাকসুট পরে, পায়ে স্নিকারশ পরে উপস্থিত।

আমি – আমার সাথে ওয়াকে যাবি নাকি!

রিমি হেসে – চলো।

আমি একটু বুঝি কম। তাই রিমির এই আচমকা মর্নিং ওয়াকে যাবার কথা শুনেও কিছু বুঝলাম না! … খানিক দূরে যেতেই, রিমি বলল – হঠাৎ তুমি আমার সম্বন্ধ নিয়ে পরলে যে! … তাও আবার ব্যবসাদার!

আমি একটা কাছাকাছি থাকা পার্কের মধ্যে ঢুকে, একটু ভিতরদিকে একটা গাছের ছাওয়ার নিচে সিমেন্টের বেদিতে বসে পরলাম। রিমিও বসলো। ওর ফরসা মুখটা একটু দৌড়তেই লাল হয়ে গেছে। … সামনে দিয়ে লেবুচা যাচ্ছিল। দুজনের দুটো লেবু চা নিয়ে, একচুমুক মেরে বললাম – ব্যবসাদার তো খোলসটা রিমি। আসলে ছেলেটা ছয়টি ছেলেমেয়ের আধ্যাত্মিক গুরু। আর তাঁর ছেলেমেয়েরা গুরুমায়ের সন্ধান করছে। … কিন্তু সেই কথা তোর মাকে বললে, কি হতো বুঝতে পারছিস!

রিমি একচুমুক মেরে বলল – জানতে তো একদিন না একদিন পারবেই!

আমি – হুম, শুধু বিয়ের আগে যেন না জানতে পারে, ব্যাস।

রিমি আর কিছু বলল না; একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল – চলো, আর ছুটবে না!

আমি – তুই খুশী নয়!

রিমি – মা জগদ্ধাত্রীর দেশে তিনি আমাকে নিয়ে যেতে চাইছেন, এতে খুশী হবো না! … আর তা ছাড়া, তিনি আমাকে যেখানেই রাখতেন, আমি তাতেই বিড়ালছানার মত খুশী। … বাবা, এখন আমি খুশী হবার চিন্তা কম করছি, আর ভাবছি, ছটি ছেলেমেয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে। … মা জগদ্ধাত্রী যেন সেই শক্তি দেন যাতে, আমি তাঁদের সত্যি সত্যি মা হয়ে উঠতে পারি। কারুকে মা বলতে হলেও, তাঁকে মা বলে আলিঙ্গন করতে না পারলে, হৃদয় ফেটে যায়; তেমনটা যেন না হয়। যেমন মা ডাকবে, তেমন যেন মায়ের কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে শুতে পারে, সেইরকম আমাকে হতে হবে। মা জগদ্ধাত্রী যেন আমাকে সেই শক্তি দেন।

আমি – আর ছেলেটার কথা কিছু জানতে চাইবি না!

রিমি – স্বামী সবসময়েই স্ত্রীর গুরু হন বাবা। … তা আমার তো খুব ভাগ্য যে, এক গুরুই আমার স্বামী হতে চলেছেন। … মা যে আমাকে দূরে না ঠেলে দিয়ে, কাছে টেনে নিচ্ছেন, এরপরও আর কি ভাবার বাবা! … এক গুরুর হৃদয়ে তিন জিনিস থাকে। এক নিজের আরাধ্যা, দুই নিজের সাধনা, আর তিন নিজের শিষ্যদের সাধনভবিষ্যৎ। … আমার একটাই প্রচেষ্টা হবে, যেন এই তিন ভেঙে চার না হয়।

আমি এবার চিন্তিত হয়ে গেলাম এই কথা শুনে। বললাম – আর তুই! তাঁর হৃদয়ে তুই থাকবি না!

রিমি – একজন আদর্শ পত্নী তিনিই হন বাবা, যিনি স্বামীর হৃদয়ে আলাদা স্থান করেন না, বরং স্বামীর হৃদয়ে যেই যেই স্থান রয়েছে, সেই সমস্ত স্থানে নিজেকে সহযোগী করে স্থাপন করে দেন। … এতে স্বামীর হৃদয়ে স্থান তো হয়, কিন্তু আলাদা করে স্থান না করার কারণে, স্বামীর জীবনের উন্নতির কাণ্ডারি হয়ে ওঠেন স্ত্রী। … আর একেই তো সতীস্ত্রী বলা হয়, তাই না বাবা!

আমি একটু বিহ্বল হয়ে গিয়েই বললাম – জানিনা রে! একটু বুঝিয়ে বল না!

রিমি – যেই স্ত্রী স্বামীর মনকে নিজের প্রতি আকর্ষিত করতে চেষ্টা করেন, সেই স্ত্রী যে স্বামীকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতেই আগ্রহী। তিনি কি করে সতীস্ত্রী হতে পারেন! যেই স্ত্রী স্বামীর ধ্যানকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট না করে, স্বামীর ধ্যান যেই যেই বিষয়ে উপস্থিত, সেই সেই বিষয়ে স্বামীর মনকে অধিক ধ্যানস্থ করে তুলে, স্বামীর উন্নতিকে নিশ্চয় করেন, সেই তো এক আদর্শ পত্নী। … কি তাই না?

আমি আর এই কথার কি উত্তর দেব? আমার ভাবনা চিন্তার সামর্থ্যের বাইরের কথা বলছে রিমি। এতোটা উন্নত ভাবনা ভাবার সামর্থ্য আমার তখনও ছিলনা, এখনও নেই। আমি যেন ভবিষ্যতের এক মহীয়সীকে দেখতে পাচ্ছিলাম।

আমি বললাম – ছেলে কিন্তু মাছমাংস সব খায়।

রিমি হেসে বলল – সেতো তুমিই আমাকে অভ্যাস করিয়েছো। নাহলে আমার মা তো গোঁড়া গোস্বামী। ঈশ্বরচিন্তা থাকুক না থাকুক, দেখনদারি তো তাঁর ষোলোআনা।

এই কথায় আমরা দুইজনেই হাসলে, আমার মনটা কেন যেন আমার নয়নের মনিকে হারিয়ে ফেলের জন্য খাঁখাঁ করে উঠলো। আমি বেদনার সুরেই বললাম – হ্যাঁ রে, ছেলেটাকে একবার দেখবি না!

রিমি হেসে বলল – যেকালে তুমি দেখেছ, রমেনকাকা দেখেছেন, তখন আমার দেখার কিই বা প্রয়োজন বাবা!

আমি – রমেনকাকা!

রিমি – রমেনকাকার বাড়িতে একটা ধুপ জ্বলে সর্বক্ষণ। তোমার জামা দিয়ে কালকে সেই গন্ধ আমি পেয়েছি।

আমি আর কথা বাড়ালাম না; ধরা পরে গেছি কিনা! … তাই একটা মিষ্টি হাসি দিলাম। … একদিকের কথা হলো, এবার অন্যদিকটা সামলাতে হবে। দেখি রমেনদা কবে ফোন করে ডাকে আমাকে।

বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না। দিন তিনচারেক পরেই রমেনদা ফোন করলেন। বললেন – পবিত্র, কাল সোমবার, অতিন্দ্রের ইন্সটিটিউট বন্ধ থাকে। তাই ও কাল আসছে, এই ১১টা নাগাদ; তুমি চলে আস্তে পারো।

আমি – রিমিকে নিয়ে যাবো?

রমেনদা – এখনই নয়। একবার নিজে কথা পেরে দেখ, অতিন্দ্র কি বলে। আশা করি, অতিন্দ্র না করবে না। তবুও, বিশেষ ক্ষেত্রে, মানুষকে চেনা যায়, তাই না? ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে, সকলেই দাবি করে। কিন্তু যখন জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তখনই দেখা যায়, ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস উধাও হয়ে গিয়ে, নিজের বুদ্ধির উপর মানুষ বিশ্বাস করা শুরু করে দেয়। তাই একবার বাজিয়ে নেওয়া উচিত।

আমি – আপনার শিষ্য অতিন্দ্র!

রমেনদা একটু হেসে বললেন – শিষ্য বলেই তো পরীক্ষা করে নেবার অধিকার রয়েছে, ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার। তাই শিষ্যকে একটু বাজিয়ে নেবো না! … ঈশ্বরের বিশ্বাস কেমন হয়েছে শিষ্যের; ঈশ্বরের নির্দেশকে গুরুত্ব কতটা দেয়, আর নিজের বুদ্ধিকে কতটা; কতটা নিজের পঞ্চভূতকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে, এক গুরুরই তো সেটা বাজিয়ে দেখে নেবার অধিকার আছে, আর কারুর কি সেই অধিকার আছে?

আমি এবার একটু হেসে বললাম – ঠিক আছে, আমি কাল যাচ্ছি।

পরেরদিন, অফিস বাঙ্ক মেরে রমেনদার কাছে গেলাম। পৌঁছে দেখলাম, অতিন্দ্র সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত। রাস্তায় যেতে যেতে, অনেক রকম ভাবে ভেবে রেখেছিলাম, কি ভাবে কথাটা পারবো, অতিন্দ্রের সামনে। কিন্তু সেখানে গিয়ে, আমার মুখ দিয়ে এমন কথা বেরিয়ে এলো, যা আমার পরিকল্পনায় দূরদূরান্ত পর্যন্ত উপস্থিত ছিল না।

আমি বললাম – আরে অতিন্দ্র, ভালো হলো তোমাকে এখানেই পেলাম। … আগের দিন, তুমি ট্রেন থেকে নেমে যাবার পর, আমার মনে একটা কথার উদয় হয়। কিন্তু তুমি তো ট্রেন থেকে নেমে গেছিলে, তাই বলতেই পারিনি।

অতিন্দ্র মিষ্টি হেসে বলল – হ্যাঁ বলুন না। আজ আসলে গুরুমশাই আমাকে কনো কাজে জরুরি সমন পাঠিয়েছিলেন। পাঠিয়েছিলেন বেশ কিছুদিন আগেই। কিন্তু ইন্সটিটিউট-এর এখন নতুন এডমিশন চলছে, তাই একটু কাজের চাপ ছিল।

আমি – আচ্ছা, বেশ বেশ। … তো এই সেশনে কয়জন নিলো এডমিশন?

অতিন্দ্র – ১৫০জন হয়েছে। … আরো এডমিশন নিতে চাইছে, কিন্তু এবারের মত এডমিশন এখানেই বন্ধ করলাম।

আমি – কেন? বেশি হলে ক্ষতি কি?

অতিন্দ্র একটু হেসে – আসলে কাকাবাবু, নিলেই তো হলো না। কলেজে পড়ে সকলে। সেখানের পড়া বুঝতে পারছেনা, আর বুঝতে পারছেনা বলে, তাদের কেরিয়ার ঝরঝরে হয়ে যাচ্ছে, এমন ধারনা করেই তো সকলে এডমিশন নিচ্ছে। তাই সকলকে তাদের দুর্বলতা থেকে উদ্ধার করার জন্যই তো ইন্সটিটিউট। … আগের সেশনে ছাত্রসংখ্যা ছিল ৭০। এবারে অলরেডি সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে। এর থেকে বেশি হলে, টিচাররা সামলাতে পারবে না। … আগে এই সংখ্যাতে অভ্যস্ত হোক; এই সংখ্যাতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, তখন না হয় সংখ্যা বাড়ানো যাবে।

আমি – এটা কিন্তু ব্যবসাদারের মত কথা নয়, আপনি কি বলেন রমেনদা!

অতিন্দ্র হেসে বললেন – আপনার এই কথাতে আমার আপত্তি আছে কাকাবাবু। … হ্যাঁ বলতে পারেন, আজকের ব্যবসাদারদের মত কথা নয় এটা। কিন্তু আমার মনে হয়, এটাই একটা ব্যবসাদারের চিন্তা হওয়া উচিত। … অর্থাৎ, যেই পয়সা ক্লায়েন্টের থেকে নিচ্ছি, তার যথার্থ মূল্য দেওয়ার চিন্তা ক্লায়েন্টের নয়, ব্যবসাদারের থাকা উচিত। … যদি তা না থাকে, আর যদি যতটা বেশি সম্ভব অর্থ উপার্জনের চিন্তা থাকে, যেখানে যথার্থ ভাবে সেই পয়সার মূল্য দেওয়া হয়না, সেটা অন্য কিছুর সাথে ছেড়ে দিন, স্বয়ং নিজের বাণিজ্যের সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। … তাই নয় কি?

আমি – বেশ বললে তো?

অতিন্দ্র – গুরুমশাইএর থেকে এমনই শিখেছি কাকাবাবু। উনিই শিখিয়েছেন, যে যেই কাজ করছে, সেই কাজের প্রতি তাঁর যদি নিষ্ঠা থাকে, তবেই সমাজ যথার্থতা লাভ করে। অর্থাৎ পুলিশ যদি পুলিশের কাজে নিষ্ঠাবান হয়, অর্থাৎ দেশের মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি সুরক্ষাই তাঁর চিন্তার বিষয় হয়, তবে তাদেরকে কনো নেতামন্ত্রী কিনে নিতে পারেন না। … কিন্তু তেমনটা তো হয়না, তাই না! … আমরা কিছুতেই ভুলতে পারিনা যে আমরা আজ যা হয়েছি, তা কি করে হয়েছি।

আমি এই কথাটা বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে তাকালে, অতিন্দ্র আবার বলল – অর্থাৎ, একজন নেতা মন্ত্রী হয়ে যাবার পর, কিছুতেই ভুলতে পারেন না যে তিনি একজন নেতা। মন্ত্রী কিন্তু কনো নেতা নন, মন্ত্রী একজন পাবলিক সারভেন্ট। … যদি পূর্বপরিচয়কে সরিয়ে রেখে, সেই ব্যক্তি নিজের নেতা-ভাবকে পরিত্যাগ করে মন্ত্রী হয়ে উঠতেন, তবে সমাজ এমনিই সুন্দর হয়ে উঠতো। … তেমনই পুলিশ, সরকারি আধিকারিক, বা সকলেই। … কেউ ভুলতে পারেন না যে, তাঁর বেতন আসছে সরকারের জন্য, আর সরকার নির্মিত হয়েছে কিছু নেতার দ্বারা। … যদি এই অতীতকে আঁকড়ে না ধরে থাকতো, আর যদি বর্তমানে বিরাজ করতো, তবে নেতাদের তোষামোদ করা সম্পূর্ণ ভাবেই বন্ধ হয়ে যেত।

আমি বললাম – সমস্যা তারমানে অতীতে?

অতিন্দ্র – না, শুধু অতীতে নয়, অতীত এবং ভবিষ্যতে। … বর্তমানে কেউ থাকতে চান না। বর্তমানকে হয় ভয় পায় মানুষ, নয় অগ্রাহ্য করে। আর এই ভয় বা অগ্রাহ্য করার মানসিকতার ফলস্বরূপ যত রাজ্যের তোষামোদি, কোরাপশন, জালিয়াতি, ফরজারি, ইত্যাদি ইত্যাদি ক্রাইম। … মজার কথা এই যে, যারা অশিক্ষিত, তারা এমন করেন সেটা যুক্তিযুক্ত, কারণ তাঁদেরকে এই শিক্ষাই প্রদান করা হয়নি। কিন্তু এই জিনিস বেশি দেখা যায়, তাদের মধ্যে যারা তথাকথিত ভাবে শিক্ষিত। … আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাই এই বর্তমানে অবস্থানের শিক্ষা দেয়না।

অতিন্দ্র বলতে থাকলো – দেখুন না, স্কুলে কলেজে পড়তে যাবার সময়ে কি বলা হয়! বড় হয়ে কি হবে, কলেজের পড়াশুনা শেষ করে কি করবে? এতদিন কি করে এসেছ? … এই শিক্ষা কখনোই দেওয়া হয়না যে, কাল কি করবে, কাল ভেবো, আজ যা করছো, সেটা মন দিয়ে করো। এখন তো বেশ কিছু বোর্ডএ গীতা পড়ানোও হচ্ছে; বলা হচ্ছে সেখানে কাজের ফলের চিন্তা করো না। তারপরে যারা সেই পাঠ প্রদান করছেন, সেই শিক্ষকরাই আবার কালকে কি হবে, সেই চিন্তা করতে বলছেন। … কাকাবাবু, যতই গতকাল আর আগামীকালের চিন্তা, ততই আসক্তি আর বিরক্তির জন্ম, আর ততই বর্তমানকে অস্বীকার করা। … আর এর ফল, আজকের সমাজ।

আমি – কিন্তু ভাই, তুমি একা কিই বা করতে পারো?

অতিন্দ্র – অনেক কিছু কাকু। কারুর নিন্দা করে সময় নষ্ট না করে, যেই জিনিসের নিন্দা করছি, সেটা নিজের মধ্যে থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াই কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়! … আজ ঈশ্বরের কৃপায়, বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী হচ্ছে আমার কাছে। তাঁদের হৃদয়ের মধ্যে এই বর্তমানে স্থিত থাকার কথা স্থাপন করাই যেতে পারে। … এরাই কালকে সমাজের কাণ্ডারি হবে। এদের ছেলেমেয়েরাই আগামীদিনের দেশের ভবিষ্যৎ হবে। তাই এই বর্তমানে বিরাজ করার শিক্ষা যদি একবার তাঁদের হৃদয়ে বর্তমানে বসে যায়, তবে তা প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয়ে বসতে থাকবে। … কাকু, আজকের বীজই তো কালকে বড় গাছ হবে, তাই না! …

তাই কোন গাছ বিষবৃক্ষ হয়ে গেছে, সেই বিচার ছেড়ে, অমৃতের বীজ ভূমিতে স্থাপন করলেই হয়। বিষবৃক্ষ আছে থাকুক না। আজ আমাদের চোখের সামনে ভগবতী বিষবৃক্ষগুলি রেখেইছেন তো এই উদ্দেশ্যে যে আমরা এই বিষের প্রতিকার করার জন্য অমৃতের বীজ স্থাপন করি। … দেখুন কাকু, একদিন এই বিষের বীজ ভূমিতে স্থাপন হয়েছিল বলেই না আজ তা গাছ হয়েছে! … যদি ভগবতী সেই বিষের বীজগুলিকেও যত্ন করে গাছ করে দেন, তবে কি তিনি অমৃতের বীজগুলিকে গাছ করবেন না! … তাই এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে আমরা একাকী কি করতে পারি। … স্বরূপে আমরা সকলেই যদি ব্রহ্ম হই, আমাদের সকলের সামর্থ্যও ব্রহ্মের মতই অসীম। …

আমি – কিন্তু করা কি উচিত?

অতিন্দ্র – ভাইরাস কে ব্যাকটেরিয়া করে দেওয়া যায়না। ভাইরাসের এফেক্টকে কাটতে হলে এন্টিডোড প্রয়োজন। অর্থাৎ যা আছে, তাকে পরিবর্তন করার চেষ্টা একটি অলিক কল্পনা মাত্র। … বিষবৃক্ষ হয়ে যে বিরাজ করছে, সে বিষবৃক্ষ হয়েই থাকে। তাকে হাজার পরিবর্তন করলেও, তা অমৃত হতে পারেনা। … মাংসকে যেমন ভাবেই রান্না করা হোক, সেটা সবজি হয়ে যায়না। সবজিকে যেমন করেই রান্না করা হোক, সেটা মাংস হয়ে যায়না। … তাই পরিবর্তন মানে যদি এই মনে করা হয় যে, যা আছে সেটাকে পালটে দেওয়া হবে, সেটা একটি মূর্খের ভাবনা মাত্র। পরিবর্তন তখনই সম্ভব যখন যা আছে, তার বিকল্প সামনে রাখা হয়।

অতিন্দ্র আবার বলল – বিরিয়ানি আপনি তখনই খাবেন না, যখন ফ্রায়েডরাইস পাওয়া যায়। … তেমনই যেই সিস্টেম কোরাপটেড, তাকে পালটাতে পারবেন না। পালটানো তখনই সম্ভব, যখন একটা নতুন সিস্টেম সামনে রেখে দেবেন। … তেমনই যেই মানুষরা অতীত আর ভবিষ্যতের চিন্তাতে নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে, তাঁদেরকে আপনি কিচ্ছু করতে পারবেননা। … প্রয়োজন তাদের নিয়ে কাজ করার, যারা এখনও অতীত বা ভবিষ্যতের হাতে নিজেদের সঁপে দেন নি।

আমি আজ যেন একটা অন্যমানুষ। আমি বললাম – আচ্ছা, এই কাজ তো তুমিই করছো, তাহলে তোমার শিষ্যরা আবার গুরুমাতা চাইছে কেন? … তোমার কি মনে হয়না, সেই দাবি অহেতুক?

অতিন্দ্র এবার একটু হেসে বলল – প্রথম কথা কাজ আমি করছিনা। কাজ ভগবতীই করছেন। আমরা তো নিষ্ক্রিয় ব্রহ্মস্বরূপ। যে নিষ্ক্রিয় তার কাজ করার সামর্থ্য কোথায়! … ভগবতীও ব্রহ্মস্বরূপ, কিন্তু তিনি আমাদের মত ভ্রমে জীব বা শিব নন। তিনি আমাদের ন্যায় ভ্রম থেকে মুক্ত চেতনা হয়ে বিরাজমান। তাই তিনিই আমাদেরকে খেলিয়ে খেলিয়ে আমাদের স্বরূপের ভান করান। তাই কাজ তো তিনিই করেন, আমরা সকলেই পুতুল মাত্র। দ্বিতীয় কথা এই যে, এই খেলার প্রথম পুতুল আমি ছিলাম, আর এখন আমার শিষ্যশিষ্যারা। আর এই ছেলেমেয়েরা কাকে দেখে এই খেলায় সামিল হচ্ছে, (নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে) এই পুতুলটিকে দেখে।

আবার একটা মুচকি হেসে – কিন্তু এই পুতুলটার মধ্যে যে তারা সম্পূর্ণতা খুঁজে পাচ্ছেনা। … দৈহিক ভাবে পুরুষ হন বা স্ত্রী, সেই একই অহং, যাকে বেদ আত্মা বলে, অর্থাৎ ভ্রমিত ব্রহ্ম, তার কারণে পুরুষ বিদ্যমান; আবার একই সঙ্গে চেতনা অর্থাৎ প্রকৃতির প্রকাশও এতে বিদ্যমান। যার মধ্যে পুরুষ ভাব অধিক অর্থাৎ আত্মিক ভাব অধিক আর তাই চেতনার প্রতি তিনি আকৃষ্ট অর্থাৎ প্রকৃতির প্রতি তিনি আকৃষ্ট, তিনি পুরুষ দেহ লাভ করেন; আবার যার মধ্যে চেতনার ভাব অধিক এবং আত্মার প্রতি তিনি আকৃষ্ট, তিনি স্ত্রীবেশে আত্মপ্রকাশ করছেন। …

একটু থেমে আবার বলল অতিন্দ্র – বুঝতে পারছেন কাকু! এই পুতুলের মধ্যে, আমার ছয় ছেলেমেয়ে আদর্শের ঘনঘটা বেশি দেখতে পাচ্ছে; চেতনার প্রতি আকর্ষণ বেশি দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু সেই চেতনাকে দেখতে পাচ্ছেনা। আর তাই, সেই চেতনার সাখ্যাত করার জন্য তাঁদের মনপ্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। … (আবার হেসে) রামকে দেখে বানরসেনা সীতা মায়ের একটা ছবি মনে এঁকে রেখেছে, কিন্তু সীতার দেখা পাচ্ছেনা। … তাই মন তাদের ব্যকুল।

আমি – কিন্তু সীতাকে যখন বানর সেনা দেখলো, তারপরেও তো প্রমাণ চাইলো যে, তিনিই রামের সীতা!

অতিন্দ্র – সেটাই কি স্বাভাবিক নয়! … আপনিই বলুন না। আমার গুরুমশাইকে আপনি আগে যতটা মানতেন, আমাকে দেখার পর, সেই মান্যতা অধিক ঘন হয়েছে না হয়নি?

আমি – হ্যাঁ তা হয়েছে তো বটেই। রমেনদা হলেন গাছ, আর তুমি সেই গাছের ফল।

অতিন্দ্র আবার হেসে বলল – ঠিক তেমনই রাম হলেন সেই গাছ, আর সীতা সেই গাছের ফল। আম গাছ বড় হয়েছে, মনে আনন্দ। কিন্তু যতক্ষণ না সেই আম গাছের ফল চেখে দেখছি, ততক্ষণ শান্তি নেই। একবার যদি সেই আমগাছের ফল চেখে দেখি যে অত্যন্ত মিষ্টি সেই ফল, তখনই মনে শান্তি। … তেমনই অবস্থা আমার ছেলেমেয়েদের এই মুহূর্তে।

আমি – কিন্তু সেই ফল যদি তেমন মিষ্টি না হয়, তখন! 

অতিন্দ্র – গাছের প্রতি অবহেলা জন্ম নেবে। … আমাকে যদি আপনি দেখতেন একটা ডেঁপো ছেলে, বা কামিনীকাঞ্চনে মুখর, তবে কি হতো? গুরুমশাইয়ের প্রতি বিশ্বাস কমে যেত আপনার। কি যেত না!

আমি – তোমার গুরুমশাই তোমাকে চেনেন। তাই তিনি যখন তোমার সামনে আমাকে রাখলেন, তখন তিনি জানতেন, আমি এতে প্রভাবিত হবো। কিন্তু তোমার যিনি স্ত্রী হবেন, তাকে তো তুমিও চেন না! তাহলে এই ফল যে অনিশ্চিত। … মানে আমি বলতে এই চাইছি যে, রাম জানতেন সীতা কেমন, তাই নিশ্চিন্ত ছিলেন; কিন্তু তুমি তো তোমার সীতা কেমন, তাই জানো না!

অতিন্দ্র এবার একটু হেসে বললেন – রাম জানতেন তাঁর সীতা কেমন, কিন্তু এও জানতেন যে সীতা বেশে যিনি রয়েছেন, তিনি সীতা নন, বেদবতী। … তাই তাঁর তো অধিক ভয় থাকা উচিত ছিল, তাই না। … অর্থাৎ আমি তো জানিনা আমার সীতা কেমন, কিন্তু রাম তো জানতেন যে তাঁর সীতার বেশে বেদবতী রয়েছেন, একবার ভাবুন, তাঁর মন যদি সাধারণ মানুষের মতন হতো, তবে তাঁর মনে কতটা অনিশ্চয়তা বাসা বাধতো!

অতিন্দ্র এবার একটু নড়েচড়ে বসে বলল – আসল কথাটা এই যে, আমি জানিনা আমার স্ত্রী কেমন হবে, এটা একটা মিথ্যা বচন। … আমার চেতনা যেমন, আমার স্ত্রী তেমনই হবেন। সত্য বলতে আমার যিনি স্ত্রী হবেন, তিনিও জানেন আমি কেমন। অর্থাৎ তাঁর আদর্শ যেমন, আমি তেমন। … পুরুষের অন্তরের ভাব অর্থাৎ চেতনার প্রকাশই তাঁর স্ত্রী ও কন্যাসন্তান। আবার স্ত্রীর অন্তরে লুকিয়ে থাকা আদর্শবোধই তাঁর স্বামী ও পুত্রসন্তান।

আমি একটু সন্দিহান চোখে বললাম – একটু খোলসা কর ভাই; যেন মনে হলো, এমন কিছু বলে দিলে তুমি, যার ধারনা করতে সম্পূর্ণ মানুষজাতিও এখনও পারেনি।

অতিন্দ্র এবার একটা জোরে নিশ্বাস ফেলে বলল – আমার কথার অর্থ এই যে, পুরুষের মধ্যে আদর্শ প্রকাশ্যে বিরাজ করে। আদর্শ কি? এই যেমন ধরুন সরকারের পৃষ্ঠপোষক হবো, মানুষকে অর্থদান করবো, মানুষকে শিক্ষাদান করবো, নিজের সুখশান্তির জন্য ভণ্ডামি করতে হলেও ছাড়বো না, অর্থ উপার্জন নিয়ে কথা অর্থাৎ অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে সকল উপায়ই সৎপথ, মনের শান্তিই জীবনের উদ্দেশ্যে, ঈশ্বরের কাছে নিজের জীবন অর্পিত থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি। … আর স্ত্রীর মধ্যে চেতনার প্রকাশ বেশি। চেতনা কি রূপ?

আমি চুপ করে থাকলে, অতিন্দ্রই আবার বলল – চেতনা মানে, আপনি কিসের গুরুত্ব কতটা দিচ্ছেন। ধনই সব, গহনাই সব, নামযশই সব, উচ্চপদই সব, মনের সুখই সব, ঈশরই সব। একটু খেয়াল করে দেখুন, দুটি জিনিস কিন্তু দারুণ ভাবে ম্যাচ খাচ্ছে। … দেখেছেন?

আমি এবার একটু বলার চেষ্টা করলাম। বললাম – হ্যাঁ, ধনই সব, নামই সব, উচ্চপদই সব, এই সমস্ত কিছু ভৌতিক, যাই অনেক পুরুষের আদর্শ, অর্থাৎ নামযশের পিছনে, ধনের পিছনে, ইত্যাদির পিছনে সারাজীবন দৌড়ে যাওয়া। আবার মনের শান্তির সাথে মনই সব মিলে যায়। তেমনই ঈশ্বরই সবের সাথে ঈশ্বরের কাছে জীবন অর্পণ মিলে যায়।

অতিন্দ্র এবার মিষ্ট হেসে বললেন – তাহলে দেখলেন তো, স্ত্রীর মধ্যে যেমন চেতনা, পুরুষের মধ্যে তেমন আদর্শ। … অর্থাৎ একটি পুরুষ যদি নিজের চেতনা কি বলে জানেন, তবে তিনি জানেন তাঁর স্ত্রী কেমন হবেন। আবার বিবাহের পর, সেই পুরুষের মধ্যে আরো পরিবর্তন হলো। এবার তাঁর যেই চেতনার অবস্থা হলো, তার প্রকাশ হবে তাঁর কন্যাসন্তানের মধ্যে। অর্থাৎ তাঁর পরিবর্তিত চেতনা নিয়ে অবস্থান করবেন তাঁরই কন্যা।

একটু থেমে – একই ভাবে, এক স্ত্রীর মধ্যে যেই আদর্শের সন্ধান থাকে, তাঁর স্বামীর মধ্যে সেই আদর্শই প্রকাশ পায়। আর সেই স্বামীর সাথে ঘর করতে করতে, যেই পরিবর্তন তাঁর মধ্যে প্রকাশ পায়, তার প্রকাশ হয়, তাঁর পুত্র সন্তানের মধ্যে।… অর্থাৎ বুঝতে পারছেন, সন্তান বালক না বালিকা হবেন, তাও নিশ্চিত। যদি পুরুষের আদর্শ পূর্বের থেকে অধিক জমাট হয়ে ওঠে, তবে বালিকা হবে, কারণ চেতনার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। আবার যদি স্ত্রীর চেতনা অধিক জমাট হয়ে ওঠে, তবে বালক হবে, কারণ আদর্শের ভাবধারা পুরপুরি পালটে গেছে।

আবার একটু হেসে – বর্তমানে, স্ত্রীদের মধ্যে শিক্ষা অর্জন করার মানসিকতা খর্ব হয়ে গেছে; অধিকাংশ স্ত্রীই মনে করতে শুরু করেছেন যে, তাঁরা সর্বদা সঠিক। সেই কারণে, আদর্শের ভিন্নতা আসছে না, আর তাই বালকের জন্মের হার কমে গেছে। অন্যদিকে বিবাহের পর পুরুষেরা অনেকটাই বাস্তবকে জানতে শিখছেন, যা পূর্বে বারমুখি হবার কারণে জানতে আগ্রহী থাকতেন না; তাই কন্যাসন্তানের হার বেড়ে গেছে। অর্থাৎ বুঝতে পারলেন তো, যদি বিবাহের পর দেখেন, পুরুষটি অনেক পাল্টে গেছেন, তবে কন্যাসন্তান হবে; আবার যদি দেখেন স্ত্রীটি অনেক পাল্টে গেছেন, তবে পুত্র সন্তান হবে।

আমি এবার রমেনদার দিকে তাকাতে, দেখলাম রমেনদাও নিস্পলক ভাবে তাঁর শিষ্যটিকে দেখছেন। বুঝলাম, রমেনদার কথাই সঠিক; তাঁর শিষ্য তাঁকে অতিক্রম করে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। … আমি এবার বললাম – তারমানে তুমি জান তোমার স্ত্রী কেমন হবে?

অতিন্দ্র হেসে বললেন – সাখ্যাত ভগবতীর অংশরূপ হবেন তিনি। … আমার হৃদয় প্রাণ সমস্ত ভৌতিকতা, সমস্ত মন-বুদ্ধি ইত্যাদির প্রতি উদাসীন হয়ে উঠে, দিবারাত্র ভগবতীতে লীন থাকে। সেটা আমার গুণে নয়, তিনি আমার হৃদয়ে প্রকাশিত হচ্ছেন বলেই তা সম্ভব হয়েছে। … তাই আমার চেতনা সমস্ত স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ থেকে মুক্ত হয়ে সাখ্যাত ভগবতী হয়ে উঠেছে। তাই আমার স্ত্রী যিনি হবেন, তাঁকে তো ভগবতীর অংশরূপ হতেই হবে। … হ্যাঁ, এটা আমি জানি, আর যেটা আমি জানিনা, সেটা হলো আমার মধ্যে এখনও কি কি বিকার বিরাজ করছে, যার হদিশ আমার কাছে নেই। … আমার স্ত্রীর মধ্যে সেই সমস্ত বিকার বিরাজ করবে।

আমি – এই একই কথা আমাকে আরো একজন বলেছে। একটু বুঝিয়ে বলবে, এমনটা কেন?

অতিন্দ্র – স্বামীস্ত্রী একেরই অপূর্ণ অংশ। তাই স্বামীকে স্ত্রীর মাধ্যমে, আর স্ত্রীকে স্বামীর মাধ্যমে, ভগবতী বুঝিয়ে দেন যে, তাঁর মধ্যে কি কি খামতি এখনও রয়েছে। … আমরা আসলে নিজের খামতিকে নিজেরা আবিষ্কার করতে পারিনা, আমরা আসলে নিউট্রাল নই তো, তাই। … আর সেই কারণে ভগবতী স্বয়ং আমাদের সম্মুখে স্ত্রী বা স্বামীকে রেখে, সেই খামতিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। … গুরুমশাই বলেছেন না এই কথা আপনাকে!

রমেনদা – না না, আমি এতদূর যাই নি, অতিন্দ্র। … ঠাকুরের কথা উদ্ধার করতে করতেই আমার জীবন চলে গেল। এতটা গভীরে যাবার অবকাশ এখনো পাইনি। … তাই জন্যই তো তোমার কথা এত মনোযোগ দিয়ে শুনছি।

আমি – এই কথা আসলে আমার কন্যা, রাধিকার। … আসলে আমি যেন তারই প্রতিচ্ছবি দেখছি তোমার মধ্যে।… তাকেও দেখেছি বিবাহ নিয়ে নিশ্চিন্ত। … যেন সে জানে, তাঁর স্বামী কেমন হবেন। তবে সে এত সুন্দর ব্যাখ্যা দিতে পারেনা। কেবলই বলে, জগদম্বা জানেন আমার জন্য কি ঠিক আর কি বেঠিক; যেটা ঠিক, সেটাই তিনি করবেন। … আর সেই কথার সুত্রে বলে, আমি কি তাঁর পর? আমি তাঁর নিজের সন্তান। নিজের সন্তানকে তিনি না তো কনোদিন জলে ফেলেছেন, আর না ফেলবেন। … যেখানে রাখেন, সেটা যে আমার যথার্থ উন্নতির স্থান, সেটা না বুঝেই আমরা ভাবি আমাদেরকে জলে ফেলে দিলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9