কথা সঞ্জীবনী | রামকৃষ্ণ দর্শন

আমি তড়িঘড়ি করে বললাম – আমি নই, আমার মেয়ের কথা। ভালো নাম, রাধিকা, বাড়ির নাম রিমি। যুবকটাকেও বেশ দেখতে। উচ্চতায় এই পাঁচফুট ৯-১০ হবে; অঙ্গের বর্ণ গৌর। মুখশ্রী সুন্দর, ক্লিন শেভ করা। চেহারা স্বাস্থ্যবান, বেশ বলশালী কিন্তু মেদের আধিক্য নেই। সৌম্যতা আছে বেশ, দেখে মনে হলো, রীতিমত সাধনা করে।

রমেনদা বললেন – তারপর অতিন্দ্র, কাজ কেমন এগোচ্ছে?

অতিন্দ্র – বিয়ে করতে হবে গুরুমশাই। আমার ছেলেমেয়েদের মধ্যে মায়ের অভাব প্রত্যক্ষ হচ্ছে। গুরুমা লাগবে তাঁদের। … না মুখে বলেনি, তবে মায়ের অভাবে বারমুখী হয়ে যাচ্ছে। শুধুই ধ্যানের সময়ে অন্তর্মুখী, সংসারের মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজতে পারছে না। গুরুমা ছাড়া, এই কাজ করার সামর্থ্য কারুর নেই।

রমেনদা – তা বেশ তো, বিয়ে করে নাও।

অতিন্দ্র হেসে বললেন – গুরুমশাই, এমন কন্যা কোথায় পাবো, যিনি বিবাহের সাথে সাথে এমন ছয়ছয়টা সন্তানকে আগলে ধরবেন!

রমেনদা – হুম, তা অবশ্য ঠিক। … কিন্তু আমাকে বলো, কি ভাবছো তুমি! … দেখি তেমন কন্যার সন্ধান পাই কিনা!

অতিন্দ্র সামান্য হেসে বললেন – আজকে কি আর অনুসুইয়া বা অরুন্ধতীর যুগ আছে গুরুমশাই! তেমন কন্যা পাবেন না। … ঈশ্বরের যেমন ইচ্ছা তেমন কন্যাই আসবেন। … যদি তাঁর ইচ্ছা থাকে যে তিনি এই ছয় ছেলেমেয়ের গুরুমাতা হয়ে উঠবেন, তাহলে উঠবেন। … আসলে ব্যাপারটা আমার প্রয়োজন নয়, ব্যাপারটা এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা প্রেরণা জেগেছে যে বাপের সাথে সাথে মায়েরও চরণধূলি তাঁরা প্রতিসকালে পাবেন। … তাই, একজন কন্যা লাগবে, বিবাহের জন্য। … তাঁদের দাবি, তাঁদের বিকারের দাবি না ঈশ্বরীর দাবি, সেটা তো সেই কন্যাই বলে দেবেন। তিনি যদি এঁদের গুরুমাতা হয়ে উঠতে পারেন, তবে জানতে হবে, ঈশ্বরীরই ইচ্ছা, এই ছেলেমেয়েদের মুখদিয়ে প্রকাশ পেয়েছিল, আর যদি তা না হয়, তবে জানতে হবে, এঁদের বিকারের প্রভাব।

আবার একটু হেসে অতিন্দ্র বললেন – যদি গুরুমাতা না হয়ে উঠতে পারেন তিনি, তবে এঁদের বিকার এঁদের চোখের সামনে প্রকাশ পেয়ে যাবে; তাই এঁদের বিকারের উড়ন্ত পিপীলিকার ডানা ঝড়ে যাবে। আর যদি এঁদের মুখ দিয়ে ঈশ্বরীরই এমন দাবি হয়, তবে এই ছেলেমেয়েদের বিকাশ সেই গুরুমাতার হাত ধরেই হবে।

রমেনদা এবার একটু মুচকি হেসে বললেন – কিন্তু বাবা, যদি তিনি গুরুমাতা না হয়ে উঠতে পারেন, তবে হ্যাঁ, ছেলেমেয়েরা নিজেদের বিকারকে সামনাসামনি দেখে, বিকারমুক্ত হবে ঠিকই, কিন্তু তোমার জীবনে যে ঝঞ্ঝাট এসে যাবে!

অতিন্দ্র হেসে বললেন – গুরুমশাই, গুরুর স্থানে তিনিই আমাকে বসিয়েছেন; আমি তো আর স্বেচ্ছায় কনো বেশভূষা ধারণ করে, নিজেকে গুরু বলে প্রচার করিনি। … তাই নিজের যাত্রাপথ নিয়ে আমি একদমই চিন্তিত নই। আজ যেই ভূমিকায় আমি উত্তীর্ণ, তা তাঁর ইচ্ছাতেই। তাই কি করলে আমার সম্মুখের পথ আমার ও আমার উপর যাদেরকে তিনি আশ্রিত রেখেছেন, তাঁদের জন্য ঠিক হবে, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর থেকে শ্রেয় ভাবে নেবার সামর্থ্য কারুর নেই। … আমি জানি গুরুমশাই, যা কিছু হয়েছে, তাও সবার ভালোর জন্য হয়েছে, আর যা ভবিষ্যতেও হবে, তাও সবার ভালর জন্যই হবে। … (হেসে) যা হতে চলেছে, তা আমাদের কাছে অবশ্যই অনিশ্চিত ফলের সম্ভাবনা প্রদান করে ঠিকই, কিন্তু তাঁর কাছে সেই ফল নিশ্চিত। তাই আমি সত্যি বলতে বিব্দুমাত্র চিন্তিত নই, সেই কন্যা কেমন হবে।

রমেনদা – হুম বুঝলাম, অর্থাৎ সেই মেয়ে গুরুমাতা হয়ে উঠুন, এমন তোমার ছয়শিষ্যের দাবি। … এই তো? … ও ভালো কথা, তোমার সাথে আলাপ করিয়ে দিই, ইনি আমার বিশেষ বন্ধু, নাম পবিত্র, পবিত্র গোস্বামী, বাড়ি চুঁচুড়াতে। … আর (আমার দিকে তাকিয়ে) পবিত্র, এই যুবক হলো আমার একমাত্র শিষ্য, নাম অতিন্দ্র নন্দী, বাড়ি চন্দননগরে। … ও যখন এমবিয়ে পড়ছে ভারতীয় বিদ্যাভবনে, তখন আমি সেখানের ইকনমিক্সের টিচার ছিলাম। তখনই আমার সাথে ওর আলাপ, তা আজ থেকে প্রায়, কত বছর আগের কথা হবে অতিন্দ্র!

অতিন্দ্র – তখন আমি ছিলাম ২১, আর আজ ২৯, মানে ৮ বছর আগের কথা।

রমেনদা – হ্যাঁ, আট বছর আগের কথা। … ঈশ্বরে মন ওর আমার সাথে আলাপ হবার আগে থেকেই ছিল। বলতে পারো ঈশ্বর অন্ত প্রাণ ছিল ও। কিন্তু তোমার মত ছিল না, কনো স্থান নেই, তাই যেগুলোর মার্কেটিং করা হয়, সেই জায়গায় ও যায়নি। … নিজেই নিজেই আধ্যাত্মিক গ্রন্থ পাঠ করতো, আর বিচার করার চেষ্টা করতো, কিন্তু কূলকিনারা পেতোনা। … তেমনই অবস্থায় আমার সাথে ওর দেখা, আর আমি ওকে রামকৃষ্ণ কথামৃতের সাথে পরিচয় করাই। …

নিজের মনেই একটু হেসে রমেনদা আবার বললেন – ওর বাড়িতেই সেই গ্রন্থ ছিল, ওর বাবার কেনা। কিন্তু বাবাও কেবল কিনে রেখে দিয়েছিলেন, আর ও সেই বইয়ের পাতা পালটে দেখেনি। … তা যাই হোক, আমার সংস্পর্শে এসে, রামকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ শুরু করে, আমাকে প্রশ্ন করতে, আমার বাড়ি আসাযাওয়া করে, আর ক্রমশ ওর জাহাজ যেই কূলকিনারা পাচ্ছিল না, সেই জাহাজ ভূমির দেখা পেয়ে যায়।

রমেনদা একটা বিড়ি ধরিয়ে নিয়ে আবার বললেন – তারপর এমবিএ পাস করে, একটা মাল্টিন্যাসানাল কোম্পানিতে ৩ বছর চাকরিও করে। সেখানে শেষের দিকে, ও কিছু গরীবমানুষকে লুণ্ঠন করার প্রতিবাদ করায়, ওর পিছনে আদাজলখেয়ে ম্যানেজমেন্ট লেগে পরে, তাই ও সেই কাজ ছেড়ে দিয়ে, এক বছরের জন্য একটি ম্যানেজমেন্ট কলেজে এইচআরএম পড়ানোর কাজ ধরে। … সেখানে থাকতে থাকতেই, ওর অনুগত হয়ে ওঠে, তিনটি ছেলে, আর তিনটি মেয়ে।

বিড়িতে একটা লম্বা টান মেরে, আবার রমেনদা বললেন – তারপর, আমার সাথে পরামর্শ করেই, ও একটা ইন্সটিটিউট খোলে, চন্দননগরেই, যেখানে বিভিন্ন ম্যানেজমেন্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীরা, যাদের মাথায় ম্যানেজমেন্টের সাবজেক্ট ঢোকেনা, তারা ভর্তি হতে থাকে। … প্রথম দুই বছর লশেই চালিয়েছে কাজ, ৪-৫ জনের বেশি ছাত্রছাত্রী হয়নি। … কিন্তু এখন প্রায় … কতগুলি ছাত্রছাত্রী আছে?

অতিন্দ্র – এই মুহূর্তে ৭০।

রমেনদা – ফিজ কেমন নাও একাকজনের থেকে?

অতিন্দ্র – প্রতি সাবজেক্টের জন্য মাসে ৫০০ টাকা। … ওই এভারেজ ধরে নিতে পারেন, ১৫০০ টাকা।

রমেনদা – এবার হিসেব করে নাও, ৭০ জনের ১৫০০ টাকা।

আমি – এক লক্ষ পাঁচ হাজার টাকা।

রমেনদা – হুম, আর যারা পড়ায় ইন্সটিটিউটে, তাঁরা হলো ওরই প্রতি আকৃষ্ট হওয়া, সেই ম্যানেজমেন্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। … সকলে ওর কাছেই থাকে, আর ওদের ভরণপোষণের দায়িত্ব অতিন্দ্রেরই। … সঙ্গে বোধহয়, কিছু হাতেও টাকা দাও না!

অতিন্দ্র – ১০ হাজার করে, আপাতত। … তবে এই দুইবছর দিচ্ছি। প্রথম দুইবছর কিছু দিতে পারিনি।

রমেনদা – হুম, আর এই ছয় ওর ইন্সটিটিউটের টিচার একদিকে ছাত্রছাত্রী পড়ায়, আর অন্যদিকে অতিন্দ্রের কাছে থেকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণ করে, এবং ওর কাছে থেকে সাধনাও করে।

আমি – অসামান্য কাজ তো অতিন্দ্র!

অতিন্দ্র বিনয়ের সাথে বললেন – মাফ করবেন, তবে এতে আমার কনো হাত নেই। … না আমি এই তিন ছেলে, তিন মেয়েকে সনাক্ত করেছি, আর না এদেরকে আমি আমার কাছে থেকে এই সব করতে বলেছি। … এরা নিজেরাই আকৃষ্ট হন, জগন্মাতার ইচ্ছায়। আর এরা নিজেরাই ম্যানেজমেন্ট শেষ করে আমার কাছে এসে বলে, তাঁরা আমার কাছে থেকেই এই সমস্ত কিছু করতে চায়। … ওদের কথা মতই, আমি এই ইন্সটিটিউট খুলি, তবে খোলার আগে, গুরুমশাইয়ের সাথে পরামর্শ অবশ্যই করি। … অর্থাৎ বলতে পারেন, জগদ্ধাত্রীই এই টোল চালান, যার বেতনভুক্ত কর্মচারী হলাম আমি।

আমি এবার হেসে ফেললাম। একমুহূর্তের জন্য মনে হলো, আমার মেয়ের আপডেটেড ভার্সানকে আমি দেখছি। আরো অনেক কিছু বেকার জিনিস মাথার মধ্যে চলছিল, রমেনদার কথাতে, সেই আবোলতাবোল ভাবনার ঘোর কেটে গেল। …

রমেনদা এবার অতিন্দ্রের উদ্দেশ্যে বললেন – তা বেতন কেমন দিচ্ছেন তোমার জগদ্ধাত্রী তোমাকে?

অতিন্দ্র হেসে বললেন – নগদ ৪০-৪৫ মতন হবে, আর দিচ্ছেন গুরুর সম্মান, সঙ্গে ফ্রি আছে শিষ্যের উন্নতি দেখে লাভ করা তৃপ্তির পাহাড়।

সেই কথা শুনে, রমেনদা আমি দুইজনেই হেসে উঠলাম।

রমেনদা আমার উদ্দেশ্যে বললেন – আমাকে গুরুমশাই বললেও, ভেবো না আমাতেই অতিন্দ্র সীমিত থেকে গেছে। অতিন্দ্র অনেক এগিয়ে গেছে। সম্পূর্ণ রামায়ণ, মহাভারতের ব্যাখ্যা লিখেছে ও। আর সঙ্গে সঙ্গে আধ্যাত্মিক প্রেমতত্ত্বের সম্পূর্ণ বিজ্ঞান লিখছে এখন ও। … ওর ছাত্রছাত্রীরাও তো প্রচার করার জন্য উলোমালা। … অনেক কষ্টে, তাদেরকে বুঝিয়েছে ও যে আধ্যাত্মিক শিক্ষা সকলকে দেবার বিষয় নয়। … বেছে বেছে সেই শিক্ষা প্রদান করতে হয়।

অতিন্দ্র – আমি কি আর শেখাতে পেরেছি! … মা জগদ্ধাত্রীই বুঝিয়ে দিয়েছেন ওদেরকে। … যেই ৭০টা ছাত্রছাত্রী ইন্সটিটিউটে পড়তে আসে, তাদের মধ্যে ওরা সেই শিক্ষা প্রদান করতে চেষ্টা করে, বিফল হয়। সেই বিফলতা তো মা জগদ্ধাত্রীই ওদের প্রদান করে, ওদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছে, মাছিদের আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতে নেই। … তাই এখন ওরা মৌমাছির সন্ধান করে।

রমেনদা – তা কনো মৌমাছি জুটেছে?

অতিন্দ্র – ১৫ জনকে ওরা মনে করছে মৌমাছি। এঁদের মধ্যে ৪জন আসলে মৌমাছি। … সময় হলে, সেটাও মা জগদ্ধাত্রী ওদেরকে বুঝিয়ে দেবেন। …

রমেনদা – হুম, একবার যখন মৌমাছি সনাক্ত করতে শিখে যাবে, তখন দেখ, মা জগদ্ধাত্রী বছর বছর মৌমাছি পাঠাবেন। শেষে দেখবে, এই ৪ বাড়তে বাড়তে ৪০ হয়ে যাবে।

আমি – কিন্তু সেই সংখ্যা ৪০ হয়ে গেলে, তারপর কি?

অতিন্দ্র – সংখ্যা ৪০ হলে, তা মা জগদ্ধাত্রীর ইচ্ছাতেই হবে; তাই তাঁদেরকে নিয়ে কি করা হবে, সেই পথও তিনিই দেখাবেন, যেমনটা আমার কাছে যারা এসেছে, তাঁদের সংখ্যা ৬ হবার পর, তিনি আমাকে পথ দেখিয়েছিলেন। … তবে এঁদের একটা ইচ্ছা আছে যে এঁরা একটা ক্ষেত্র করবে সকলকে নিয়ে। … সেই ক্ষেত্রে সকলকে স্বনির্ভর করবে। … স্বনির্ভর মানে এঁদের ভাষায় আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর নয়। … মা জগদ্ধাত্রী আমার মাধ্যমে এঁদেরকে যেই শিক্ষা দিয়েছেন, তার থেকে এঁদের মনে এই ধারণা জন্মেছে যে, অর্থের বিস্তারের কারণেই যত রাজ্যের গুলামি মানুষ করেন, তার থেকে মুক্ত হতে পারেনা। … তাই এঁরা এমন একটা ক্ষেত্র করার চিন্তা করছে, যেখানে অর্থের আবশ্যকতাই থাকবে না।

আমি – অর্থাৎ?

অতিন্দ্র – ওরা একটা ক্ষেত্র করতে চাইছে যেখানে সাধকেরা থাকবেন কেবল। তবে সেই সাধকরা সন্ন্যাসী হবেন না। … এঁরা ক্ষেতি করবে, ওষুধ নির্মাণ করবে। আর সনাতন ভাবে সেখানে বিরাজ করবে। অর্থাৎ টেকনোলজি মুক্ত হয়ে, সামান্য আহার, ফল সেবন, দুগ্ধ সেবন, আর আয়ুর্বেদিক ওষুধ নির্মাণ করে, সেই দিয়ে চিকিৎসা করে, সরষের তেলের দ্বারা মশাল জ্বালিয়ে থাকবে। সামান্য জীবনযাপন, আর চুটিয়ে সাধন।

আমি – আর জগতে এঁর ভূমিকা? মানে, যেমন বিভিন্ন আশ্রম হয়, সেখানে মানুষ সামান্য শান্তি লাভের জন্য যায়; এখানে কি হবে সেইরূপ?

অতিন্দ্র – এখানেও মা জগদ্ধাত্রী আমাকে দিয়ে খেলেছেন। আমার মধ্যে দিয়ে তিনি এমন ধারণা প্রদান করেছেন যে, শান্তির জন্য, বা সুখের জন্য আধ্যাত্মিকতা নয়। আধ্যাত্মিক ভাবে গঠিত আশ্রম না তো স্বর্গের দ্বার হবে, আর না নরকের; তা হবে মোক্ষের দ্বার। … তাই এরা সেই আদর্শে শিক্ষিত হয়ে এমন ধারণা রাখে যে, সেই আশ্রম সাধকদেরই আশ্রয়ক্ষেত্র হবে; আর সেখানে এসে সাধকরা সাধনা করে, মোক্ষলাভের জন্য তপস্যা করবে। … একাধারে জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি, ধ্যান চারযোগের তপ করবেন তাঁরা, আর শেষে প্রেমযোগের তপ করে, মোক্ষলাভ করতেই আসবেন। … তাঁরা ছাড়া সাধারণ মানুষ যদি আসেন, তবে সেই সকল কিছুরই ধারণা লাভ করতে আসবেন। …

একটু থেমে আবার অতিন্দ্র বললেন – অর্থাৎ, সুখ বা শান্তির জন্য সেখানে কারুরই আগমনকে প্রশ্রয় দেওয়া হবেনা। হয় সাধন করতে আসবেন, নয় সাধনের প্রেরণা পেতে আসবেন। … স্বর্গের বা নরকের দ্বার হবেনা তা; তাই তার স্থানে স্থানে বিস্তার বা মার্কেটিংএরও প্রয়োজন নেই। … সারাজগতে একটি কি দুটি মোক্ষের দ্বার থাকতে পারে। সেই একটি কি দুটি মোক্ষের দ্বারের মধ্যে একটি হবে তাঁদের নির্মিত আশ্রম, এই তাঁদের ভাবনা। এরপর এখন তাঁরাও জেনে গেছে যে, মা জগদ্ধাত্রীর কৃপা না হলে কিছুই সম্ভব নয়। … আর সত্যি করে বলতে গেলে…

কথাটা বলতে গিয়ে থেমে গেলে, রমেনদাই বললেন – সত্যি করে বলতে গেলে যে … কি?

অতিন্দ্র – তাঁদের এই ভাবনাতে মা জগদ্ধাত্রীর সায় আছে না নেই, সেই উত্তর পেতেই, এঁদের মধ্যে গুরুমা লাভ করার ইচ্ছা জেগেছে। … এঁদের মতে, যদি আমার পত্নী এঁদের গুরুমা হয়ে উঠতে পারেন, তবে এঁরা নিশ্চিত হবে যে, তাঁদের মধ্যে যেই ইচ্ছার উদয় হয়েছে আশ্রম নিয়ে, তা তাঁদের নিজেদের ইচ্ছা নয়, মা জগদ্ধাত্রীর ইচ্ছা। … আর যদি আমার পত্নী এঁদের গুরুমাতা হয়ে উঠতে না পারেন, তবে এঁরা ধরে নেবে যে এই আশ্রমের, এই মোক্ষদ্বারের ইচ্ছা তাঁদেরই কেবল, যাতে মা জগদ্ধাত্রীর বিন্দুবিসর্গ প্রেরণা নেই।

আমি – এটা কেমন কথা!

অতিন্দ্র – প্রথমে আমিও তেমনটাই ভেবে, ওদের ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছিলাম। কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারলাম, সন্তান কেবল বাপের আদর্শকে ধারণ করে কর্ম করার ভাবনাকে তো ধারণ করতে পারে, কিন্তু সেই কর্মের প্রেরণা তাঁরা মাতার থেকেই লাভ করেন। … আমি আমাকে দিয়েই সেই কথা উপলব্ধি করি। … গুরুমশাই আমার পিতাসমান নয়, আমার পিতার থেকেও উচ্চআসনে তিনি স্থিত। … তাঁর আশ্রয়ে এসে আমি শিক্ষিত হই, আমি উন্নত হই, এবং আমি সাধনে মনযোগী হই। … কিন্তু আমার গুরুমাতা নেই, তাই আমি কনো কর্মের প্রেরণা লাভ করিনি। … সেই প্রেরণা প্রদানের জন্য আমার প্রকৃত মাতা, মা জগদ্ধাত্রী আমাকে প্রেরণা প্রদান করেন, তবেই সেই কর্ম হয়ে আজ ইন্সটিটিউট নির্মাণ হয়ে, তাকে আশ্রয় করে, আমার ছয় শিষ্যশিষ্যা উপস্থিত। …

অতিন্দ্র এবার আমার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে বললেন – বুঝলেন তো, এক বাপের কারণে ধারণা তো হয়, কিন্তু প্রেরণা লাভ হয়না। … প্রেরণা লাভের জন্য মায়ের প্রয়োজন, আর তাই আমার ছেলেমেয়েরা সেই মায়ের সন্ধান করছেন। … সেটা বুঝতে পেরে, আমি গুরুমশাইয়ের কাছে এসেছি, আমার উপলব্ধি কতটা সঠিক বা বেঠিক, তা জানার জন্য।

রমেনদা – গর্ব হয় তোমার জন্য অতিন্দ্র, আবার লজ্জাও লাগে, তোমার বিনয় দেখে। … সত্যি বলতে আধ্যাত্মিক পথে, তুমি আমাকে ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছ। … তারপরেও, সিদ্ধান্ত নেবার আগে, তুমি আমার দ্বারস্থ হও। … আর সত্যি কথা, তুমি সঠিক উপলব্ধি করেছ। … তবে এখানে আমার আরো একটা কথা বলার যে, আমি তোমার কথার মাধ্যমেই সেই সত্যকে উপলব্ধি করলাম, অর্থাৎ সোজা কথাতে, এই সত্য, এই পিতার থেকে ধারণা, আর মাতার থেকে প্রেরণা, এই সহজ সত্য আমি নিজে কনোদিন উদ্ধার করতে পারিনি। … দেখছি বাবা, একটি এমন কন্যার তো সন্ধান করে চেষ্টা করতে চাই, যাতে সে গুরুমাতা হয়ে উঠতে পারেন, তারপর তুমি যেমন বললে, সমস্তই মা জগদ্ধাত্রীর ইচ্ছা, সমস্ত কিছুর শেষে তো সেটিই অন্তিম সত্য।

সেদিনের মত উঠে পরলাম, আমিও, অতিন্দ্রও। একই ট্রেনে চেপে আমরা এলাম। … অতিন্দ্র সত্যিই খুব ভালো ছেলে। আর আধ্যাত্মিক ভাবে যে চরমে উঠে গেছে, তা ওর অঙ্গের শোভা, ওর অঙ্গের থেকে কনো রকম গন্ধ না পাওয়া, আর ওর দেহের রোমের বৃদ্ধি যে হ্রাস পেয়ে গেছে, তা দেখে বেশ ভালোই বুঝতে পারি। … সাধন করতে করতে, সমস্ত ইচ্ছার নাশ হলে, রোমকুপ থেকে লোমাবলি প্রকাশ হওয়া হ্রাস পায়, কারণ ভগবতীর তেজে, চেতনার তেজে সেই সমস্ত রোমকুপ জ্বলে যায়। … সাধনা মানে, না তো পজিটিভ হওয়া, আর না নেগেটিভ। পজেটিভ মানে আসক্তি, আর নেগেটিভ মানে বিরক্তি। … আধ্যাত্ম সম্পূর্ণ ভাবে ভগবতীর প্রতি সমর্পিত করে দিয়ে, নিউট্রাল করে দেয়, ভোলা করে দেয়। তাই আধ্যাত্মিক ভাবে উন্নত ব্যক্তির অঙ্গে কনো প্রকারই গন্ধ থাকেনা। … আর সাধনের জন্য তেজ, সে তো এক অন্য সাধকেরই নজরে আসে। … এই তিন দেখে, অতিন্দ্রের বিনম্রতা দেখে, আর নামযশ, খ্যাতিধন, এই সমস্ত কিছুর থেকে উদাসীন দেখে, বেশ বুঝে গেলাম, খাটি কনক সে।

অতিন্দ্র চন্দননগরে নেমে গেল। এক সাধকের অন্য সাধককে দেখলে, খুব তৃপ্তি হয়। সেই তৃপ্তি নিয়েই একটু চোখ বুঝলাম। তারপর আমার চোখের সামনে যা ভাসলো, তাতে আমি চঞ্চল হয়ে উঠলাম। … আমার মাথায় এই কথা আগে এলো না কেন? … কথাটা কি পারবো?

চুঁচুড়া স্টেশনে নেবে, স্টেশন থেকে বেড়িয়ে এসেই, রমেনদাকে আমি ফোন লাগালাম – রমেনদা!

রমেনদা – হ্যাঁ বলো, কিছু ফেলে গেলে নাকি?

আমি – না না, সেই জন্য নয়। আসলে আমার এখন খেয়াল হলো, আচ্ছা দাদা অতিন্দ্রের সাথে রিমির সম্বন্ধ করলে কেমন হয়? …

রমেনদা হেসে উঠে বললেন – আরে পবিত্র, অতিন্দ্র যে আজকে আসবে, তা তো আমি তিন দিন আগে থেকে জানি। কালকে তুমি তোমার মেয়ের বিয়ের কথা বলছিলে বলেই তো আজকে একাকী তোমায় আসতে বললাম, যাতে তুমি ছেলেটাকে দেখতে পাও। … না অতিন্দ্র যে বিবাহের ব্যাপারে আমার সাথে কথা বলতে আসছে, তা আমি জানতাম না। তবে, রিমির জন্য উপযুক্ত পাত্র সে, সেটা মনে হবার জন্যই, তোমাকে ডাকি আমি। … তারপর দেখলাম, কন্যার পিতারই তাতে সহমত নেই, তাই আমি আর কথা বাড়ালাম না।

আমি – না দাদা, অসহমত হবার তো কনো কারণই নেই। … আসলে অতিন্দ্রকে দেখে, আমি এতটাই হতবাক হয়ে গেছিলাম! … মনে হচ্ছিল যেন আমার রিমিরই ভবিষ্যৎ দেখছি ওর মধ্যে। … সেই বিচারের মধ্যে বিয়েথাওয়ার ব্যাপারটা মাথাতেই আসেনি। … চন্দননগরে রমেন নেমে যেতে, আমার মাথায় কথাটা এলো। ট্রেনে অনেক লোক ছিল, তাই ফোন না করে, এই চুঁচুড়া স্টেশন থেকে বেড়িয়েই আপনাকে ফোন লাগালাম।

রমেনদা – বেশ তবে, আমি একদিন অতিন্দ্রকে ডাকছি। কবে ও সময় বার করে আসতে পারে, বলে দেখি। তারপরে তোমায় জানাচ্ছি। … তুমিও সেদিন এসো। তারপর না হয় নিজে মুখেই নিজের কন্যার পাণিগ্রহণের দাবি করো। … কি ঠিক আছে?

আমি – বেশ বেশ তাই হবে।

রমেনদা – আর কিছু প্রশ্ন আছে? মানে অতিন্দ্রের ব্যাপারে আর কিছু জানতে চাও?

আমি – না দাদা, একজন ঈশ্বরী অন্তপ্রাণ, ছয় শিষ্যশিষ্যার গুরু। তাঁর সম্বন্ধে আর কি জানার থাকতে পারে?

রমেনদা সামান্য হেসে – এই সমস্ত কথা তো তোমাকে তৃপ্ত করবে, কিন্তু তোমার স্ত্রীকে?

আমি একটু থেমে গেলাম আর ভাবলাম, সত্যিই তো এই সমস্ত কথা আমার স্ত্রীকে বললে, এই বিয়ে তো হারগিস হতে দেবেনা সে। মেয়েকে আধ্যাত্মের থেকে দূরে ঠেলতে মরিয়া, মেয়ের আধ্যাত্মিকতা চরমে উঠে যেতে পারে, সেটা জানলে কি আর রাজি হবে! … কিন্তু তাহলে তো স্ত্রীকে অন্য ভাবে রাজি করাতে হবে। সেই বিচার করে কিছু ভেবে উঠতে না পারলে, রমেনদাকে বললাম – তাহলে দাদা কি বলি বলুন তো স্ত্রীকে?

রমেনদা – অতিন্দ্রের ইনকাম কেমন?

আমি – এই ৪০-৪৫ হাজার মাসে, ওর ইন্সটিটিউটে ছাত্রসংখ্যা নিশ্চয়ই আরো বাড়বে, তাই ইনকামও বাড়বে।

রমেনদা – হুম, তারমানে তোমার স্ত্রী যেই ব্যবসাদার খুঁজছিলেন, সেই ব্যবসাদার হিসাবে অতিন্দ্রকে দেখানো যায় তো?

আমি – হ্যাঁ তাই তো… আরিবাস। … রমেনদা, এই সমস্ত বুদ্ধি আপনার মাথায় আসে কি করে বলুন তো! … বেশ আমি আজই গিয়ে আমার স্ত্রীকে বলছি, রিমির জন্য একটা ভালো ছেলের সন্ধান পেয়েছি, উঠতি ব্যবসাদার, সবে পশার হচ্ছে; এখন মাসে ৪০-৪৫ আয়, বুঝতে পারছো, কিছু বছরের মধ্যে লাখে পৌঁছে যাবে, তোমার মেয়েকে রাজরানি করে রাখবে।

রমেনদা – এরপরের প্রশ্ন আসবে, কয় ছেলে? বাপমা কি করে? বাপমায়ের সাথে থাকে না আলাদা! বাড়ি কেমন, বাড়িতে কে কে আছেন ইত্যাদি।

আমি – এসব প্রশ্নের মানে কি? এতো বায়োডাটা পুরো!

রমেনদা – ধন উপার্জন করে, মানে আর্থিক ভাবে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত, বোঝা গেল। কিন্তু সামাজিক ভাবে বা সাংসারিক সুরক্ষা! সেই বিষয়ে কি তাঁর মত দর্পযুক্ত সংসারী ব্যক্তি জানতে চাইবেন না! … পবিত্র, সংসারী মানুষের ঈশ্বরীর উপরে বিন্দুমাত্রও বিশ্বাস থাকেনা। তাঁদের কাছে ঈশ্বরীর উপর বিশ্বাস কেমন জানো! … তারা মনে করে তাদের ইচ্ছাকে ঈশ্বরী মদত দেবেন, এটাকেই তারা বিশ্বাস বলেন। … ভক্ত কি তাই করে?

আমি – ভক্ত এই মনে করেন, যা কিছু হচ্ছে সব ঈশ্বরীর ইচ্ছাতেই হচ্ছে, আর যা কিছু হচ্ছে, তার অর্থ আমি এখন বুঝতে পারছি না ঠিকই, কিন্তু তা হচ্ছে আমার হিতের উদ্দেশ্যেই। কেমন হিত, সেটাও এখন বুঝতে পারছিনা। কিন্তু ঈশ্বরী আমার নিজের মা, তিনি তাঁর সন্তানের জন্য যা করবেন, তাই হিত। ধরে ফেলে দিলেও, সেটাও কালকে দাঁড়াতে পারি যাতে সেই জন্য; আদর করে কাছে টেনে নিলেও, যাতে কাল আরো এগিয়ে যেতে পারি সেই জন্য।

রমেনদা – কিন্তু সংসারীর ভাব অন্য। সে মনে মনে অনেক পরিকল্পনা যোজনা করে সে যা সিদ্ধান্ত নেবে, সেই সিদ্ধান্তে ভগবানকে সহায় হতে হবে, একটা ভগবানকে দাস বানিয়ে রাখার ভাব।  … তাই, সংসারী মানুষের কর্তা ভাব খুব প্রখর; ঈশ্বরীর হাতে কিচ্ছু ছাড়ে না তারা; সব নিজে করতে চায়। … তাই বিচার তো উনি করবেনই।

আমি – কিন্তু ছেলের বাড়িতে কে আছে, কারা সঙ্গে থাকে, কারা সঙ্গে থাকেনা; এই সমস্ত জেনে কি সুরক্ষার কথা বুঝবে, সেটাতো আমি বুঝলাম না দাদা!

রমেনদা – কয় ছেলে, আর কারাকারা সঙ্গে থাকে, সেই কথা এটা বলবে যে, ছেলের দায়বদ্ধতা কি কি। অর্থাৎ ছেলেকে নিজের উপার্জনের ভাগ কতটা দিয়ে দিতে হয়, আর সাথে সাথে, উনার কন্যাকে কাদের কাদের দেখভাল করার জন্য পরিশ্রম করতে হবে।

আমি – ওরে বাবারে, এত দূরদৃষ্টি! এত দূরদৃষ্টি যদি জীবনের প্রতি থাকতো, এতদিনে তো মোক্ষলাভ করে যেত দাদা! … কিন্তু অপাত্রে ঘি ঢেলে ঢেলে, পরের জন্মে মানুষ যোনি পাবে কিনাই অনিশ্চিত করে নিয়েছে। … যাইহোক, এই সমস্ত কিছুর উত্তরে কি বলবো একটু বলে দিন।

রমেনদা – বলবে, ছেলেরা তিন ভাই। … একভাই বিদেশে থাকে, দেশে ফিরবে না। অন্যভাই রেলে মোটাবেতনের কাজ করে। … বাবা মারা গেছেন, মা পেনশন পায়, আর বড়ছেলে অর্থাৎ রেলে কাজকরা ছেলের কাছে থাকে। … অতিন্দ্র ছোট, আর ব্যবসা করবে বলে, দাদুর পুরনো বাড়িকে সারিয়ে নিয়ে, তাতেই থাকে। চার তোলা বাড়ি, স্করপিও গাড়ি আছে। … ফর্মালিটির জন্য মায়ের সাথে দেখা করতে যায়, ব্যবসাতেই মনোযোগ।

আমি – আর অতিন্দ্রের কাছে যেই ছেলেমেয়েরা থাকে! তাদের ব্যাপারে কি বলবো?

রমেনদা – বলবে, ওরই ব্যবসার কর্মচারী। কাজ যাতে ঠিক করে করতে পারে, তাই কোয়ার্টার করে দিয়েছে।

আমি এই সমস্ত কিছুকে একপ্রকার মুখস্ত করে নিয়েই বাড়ি গেলাম।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9