কথা সঞ্জীবনী | রামকৃষ্ণ দর্শন

সেই কথা শুনে, আমার যেন পায়ের তলা থেকে জমি সরে গেল। আমার মেয়েটাকে আমি জলে ফেলে দিতে পারিনা। … কথায় বলে, ভক্ত ভগবানের রূপ হয়। আমার কন্যার মনের মধ্যে যেই শুদ্ধভক্তি দানা বেঁধেছে, এরপর তো বলার অপেক্ষা রাখেনা, আমার আরাধ্যা এইমুহূর্তে আমার কন্যার বেশে বিরাজ করছেন।

কি করবো, কি করবো বুঝতে না পেরে, আমি আমার মেয়ের স্কুলের দিকে গেলাম। রিমির স্কুলছুটির সময় হয়ে গেছে। পথেই রিমির সাথে দেখা। … আমাকে দেখে, রিমি হন্তদন্ত ভাবে এগিয়ে এসে বলল – কি হয়েছে বাবা! তোমায় দেখে খুব অসুস্থ দেখাচ্ছে। … কি হয়েছে?

আমিও কি বলবো বুঝতে পারলাম না। হঠাৎই মুখ থেকে কথা বেড়িয়ে এলো – এখনই রমেনদার কাছে যেতে হবে।

রিমি – কেন? উনার কি শরীর খারাপ হয়েছে?

বাবা – ওখানে গিয়ে বাকি কথা হবে।

রিমি আর কথা বাড়ালোনা। … আমরা রমেনদাঁড় বাড়ি গিয়ে পৌছাতে, আমাকে দেখে রমেনদাও একই প্রশ্ন করলেন, যা রিমি করেছিল। আমি এবার একটু নিশ্বাস নিয়ে, একগ্লাস জল খেয়ে বললাম – ওর মা, ওর কনো বড়লোক ব্যবসাদারের সাথে বিয়ে ঠিক করছে। … রমেনদা কিছু করতে হবে আমাদের।

রিমি এবার একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল – বাবা, দুশ্চিন্তা করাটা তোমার একটি নেশায় পরিণত হয়ে গেছে। … বাবা একটা জিনিস বুঝতে পারছোনা, যার সাথে আমার বিয়ে হবার কথা, তার সাথেই বিয়ে হবে। না তুমি চেয়ে তা পালটাতে পারবে, না মা, আর না আমি স্বয়ং। … আর এটাও বুঝতে পারছো না তুমি যে, স্বামী আমার ইচ্ছামত হবে না। … স্বামী স্ত্রীর, আর স্ত্রী স্বামীর লুকিয়ে থাকা সত্ত্বার পরিচয় প্রদান করে। … আমাদের যেই সত্ত্বাকে আমরা লুকিয়ে রাখি, অগ্রাহ্য করি, আমাদের সত্ত্বা বলে মানতে পারিনা, সেই সত্ত্বাই আমাদের সম্মুখে আমাদের স্বামী বা স্ত্রী রূপে আসে।

আমি সেই কথাতে একটু বিরক্ত হচ্ছিলাম দেখে, রিমি আবার বলল – বাবা, যার মনের মধ্যে কামভাব সুপ্ত, অর্থাৎ আছে, তবুও সেই থাকাকে অগ্রাহ্য করে সেই মানুষ, তাঁরই স্বামী বা স্ত্রী কামুক হন। … যার অন্তরে ধনের প্রতি লোভ আছে, সম্মানের প্রতি মোহ আছে, কিন্তু অস্বীকার করে সে সেই অস্তিত্বকে, তাঁরই স্বামী বা স্ত্রী ধনের পিছনে বা যশের পিছনে দৌড়ে বেরায়।  … তাই বাবা, কে আমার স্বামী হবে, তা নির্ভর করছে, আমার আত্মজ্ঞানের উপর, মায়ের প্রচেষ্টা, তোমার প্রচেষ্টা বা অন্য কারুর প্রচেষ্টার উপর নয়। … আমি যতটা শুদ্ধ, আমার স্বামীও ততটাই শুদ্ধ হবেন। … আমার মধ্যে যদি বিকারের ঘনঘটা থেকে থাকে, তবে যেই সেই স্বামীর নির্বাচন করুন, তিনি বিকারগ্রস্তই হবেন।

আমি তাও রিমির কথা মানতে নারাজ। তাই রিমি বারেবারে আমাকে বলতে থাকলো – বাবা, নিশ্চিন্ত হও। তুমিই বলো না, তাঁর ইচ্ছা ছাড়া, একটি গাছের পাতাও নড়ে না; তবে এখন সেই কথা ভুলে গেলে কেন? কেন ভুলে গেলে যে, তিনিই আমার স্বামী হবেন, যাকে স্বয়ং জগন্মাতা নির্বাচন করে রেখেছেন। … যদি তাঁর ইচ্ছাকে সম্মতি না দেওয়া হয়, তবে আমার বিয়েই হবেনা, আর বিবাহ হবার জন্য যা যা উন্নতি আমার মধ্যে হতে পারতো, বা তাঁর মধ্যেও হতে পারতো, তা সম্পূর্ণ ভাবে স্থগিত হয়ে যাবে।

আমি অবাক হয়ে রিমির কথা এবার শুনছিলাম। কতটা বুঝতে পারছিলাম জানি না, তবে শুনছিলাম। সত্যিই হয়তো সেদিন বুঝতে পারিনি ওর কথা, কিন্তু আজ বুঝতে পারি। … রিমি বলতে থাকলো – বাবা, আমাদেরকে সম্পূর্ণ ভাবে বিকারমুক্ত হতে হয়। আমরা সবাই রাজা, আমাদের রাজার সাথে মেলার জন্য। … বাবা এটা কেবল কথার কথা নয়, সেই রাজা আমাদের হতে হয়। … আমাদের ঈশ্বরী, আমাদের সত্য, আমাদের স্বরূপ, সেই জগজ্জননী হলেন পরমাশূন্য। তিনি সম্পূর্ণ ভাবে নিরাকারা, নির্গুণা, নির্বিকারা। বুঝতে পারছো বাবা, বিকারশূন্য তিনি, নির্বিকার তিনি। … যদি আমাদের মধ্যে তাহলে বিকার থেকে যায়, তবে তাঁর সাথে আমরা একাত্ম কি করে হবো?

তাই জন্যই তো বাবা, আমাদেরকে বিকারমুক্ত হতে হয়। … হ্যাঁ, চরম ভাবে যিনি বিকারে আবদ্ধ, তিনিও বলে ফেরেন, তিনি বিকারমুক্ত। … এই আমি, আমিও মনে করি যে আমি বিকার মুক্ত। কিন্তু আমরা আমাদেরকে কতটা চিনি বাবা! … যিনি আমাদের মা-বাপ, সমস্ত কিছু, তিনিই জানেন আমি কতটা বিকার মুক্ত। … আর যেই যেই বিকার আমার মধ্যে রয়েছে, তা যে আমার মধ্যে রয়েছে, সেটা আমি জানবো কি করে? আমার স্বামীর মধ্যে সেই সমস্ত বিকার থাকবে বাবা। … স্বামী বা স্ত্রী, অন্যজনের লুক্কায়িত চরিত্রের দর্পণছবি হন বাবা। … তোমার বিচার করার খুব ইচ্ছা, কিন্তু পারো না; তাই মা বিচারশীল। মাও আধ্যাত্মিকতার উপর বিশ্বাস রাখেন, কিন্তু ভয় পান আধ্যাত্মিক হয়ে উঠতে, তাই তুমি আধ্যাত্মিক। …

বাবা, তাই এমন কেন ভাবছো যে আমার স্বামী সম্পূর্ণ বিকারমুক্ত হবেন! … আমার স্বামীর মধ্যে বিকার থাকবে। যেই যেই বিকার আমার মধ্যে রয়েছে, অথচ আমি তা মানিনা, সেই সেই বিকার আমার স্বামীর মধ্যে থাকবে। … আমি যদি ভণ্ড হই, অথচ আমি নিজেকে ভণ্ড না মানি, তবে আমার স্বামী ভণ্ড হবেন। … আমি যদি কামুক হই, অথচ আমি নিজেকে কামুক বলে মানতে অরাজি হই, তবে আমার স্বামী কামুক হবেন। আর যদি আমি শুদ্ধ হই, যদি আমি জগন্মাতার সেবক হবার জন্য ব্যকুল হই, তবে তিনি তেমনই হবেন। এর অন্যথা হবেনা। … তাই এই দুশ্চিন্তা বন্ধ করো। তাঁর উপর বিশ্বাস রাখো বাবা। …

হ্যাঁ মানছি, তিনি তোমাকে আমার দেখভাল করার জন্য রেখেছেন। তাই তোমারও কিছু দায় আছে। … কিন্তু তুমি এটা কি করে ভুলে যাচ্ছ যে, আসলে আমি, তুমি, রমেনকাকা, আমার মা, আমার ছোটমাসি, আমার হবুস্বামী সকলেই তাঁর সন্তান। তিনি তাঁর সন্তানদের সাথে অন্যায় কি করে হতে দিতে পারেন! … পারেন না বাবা। … তিনি ভুল করেও ভুল করেন না। … আমার মধ্যে যেই বিকার উপস্থিত আছে, তিনি সেই বিকারকে আমার চোখের সামনে আনবেনই। … তবেই না আমি আমার বিকারকে আমার কলুষতা বলে চিহ্নিত করে, তার নাশ করে, নিজেকে তাঁর ক্রোড়ে অর্পণ করার জন্য শুদ্ধ করতে পারবো।

আমি এবার বললাম – কিন্তু!

রিমি – কনো কিন্তু নয় বাবা! … ঠাকুরের কথা মুখেই বল কেবল তুমি! মন থেকে মানো না! … যদি মানোই, তবে কেন তুমি কেবল পুরোহিত নারায়ণকেই নারায়ণ বলছো? ব্যাবসাদার নারায়ণ কেন নারায়ণ নন! বিকারগ্রস্ত নারায়ণ কেন নারায়ণ নন!  … কেন মাহুত নারায়ণকে অস্বীকার করছো বাবা! … বাবা, মা চেয়েও সন্তানের অকল্যাণ করতে পারেন না। কৈকেয়ী রামকে বনবাসে পাঠিয়েও রাবণবধের নিমিত্ত হলেন। … বাবা, মানুষকে নয়, মানুষের মধ্যে থাকা নারায়ণকে বিশ্বাস করো বাবা। … মানুষকে দেখলে, কেবল তাঁর বিকারই দেখতে পাবে। কিন্তু অন্তরের নারায়ণকে দেখলে, বিকারশূন্যতা কে দেখতে পাবে। … জীবনকে জীবনের ধারায় প্রবাহিত হতে দাও বাবা। …

এটা ভালো, ওটা খারাপ করে, তুমি কার উপর সন্দেহ পোষণ করছো? স্বয়ং জগদ্ধাত্রীর উপরই তুমি সন্দেহ করছো। … কেন? কারণ তোমাদেরই কথা, তাঁর ইচ্ছা ছাড়া চোখের পলকও পরেনা। … তাহলে তিনি না চাইলে, কনো সম্বন্ধ আমার সামনে আসবে কি করে বাবা! … তিনি না চাইলে, আমার যারতার সাথে বিয়ে হয়ে যাবে কি করে বাবা! … যা হচ্ছে হতে দাও বাবা। … যেটা করার তিনিই করেন; সম্মুখে যা এসে উপস্থিত হবে, তা বিষ হলেও, তাকে বিষ জেনেও গ্রহণ করতে হয়; একেই সমর্পণ বলে। তুমি মিরার কথা বলো; তিনি তো তাই করে দেখিয়েছিলেন, তাই না বাবা!

আমি সত্যিই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলাম। দুশ্চিন্তা তখনও হচ্ছিল, কিন্তু আমার নিজের কন্যাকে দেখে, একমুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল যেন সাখ্যাত ভগবতীকে দেখছি। এমন অদম্য বিশ্বাস, কই আমার তো এমন বিশ্বাস নেই! … এমন নিশ্চল বিশ্বাস যে, তিনি আমার মা, আর তিনি আমার অহিত করবেন না। যেটাই তিনি করবেন, সেটাতেই আমার হিত, তাই তা হবে। … এই বিশ্বাস আমার তো নেই!

আমি এবার সন্দিহান চোখে রমেনদার দিকে তাকালাম। রমেনদা হেসে বললেন – আর দুশ্চিন্তা আছে পবিত্র! … দুশ্চিন্তা করো না। তিনি আমাদের সমানে মার্গ দেখিয়ে যান। … সর্বক্ষণ দেখিয়ে যান। … তুমি এক কাজ করো। … আজ শান্তিতে বাড়ি যাও, আর হ্যাঁ নিশ্চিন্তে থাকো। বুঝতে পারছি, তোমার কন্যাকে নিয়ে তোমার চিন্তা হচ্ছে। … আমারও যে হচ্ছে না, তেমনটা নয়। … এই যুবতীবয়সে এই পাহাড়প্রমাণ বিশ্বাসের পর, তাঁকে নিয়ে দুশ্চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। হাজার খুঁজলে এমন বিশ্বাসের দেখা মেলে। আর দেখা মিললেও ভয় হতে শুরু করে, এই বিশ্বাস হারিয়ে না যায়। … তবে রিমিই ঠিক, তাঁর ইচ্ছাতেই ওর তাঁর প্রতি এই বিশ্বাস জন্মেছে। তাঁর ইচ্ছা হলেও সেই বিশ্বাস অঢিক হবে, আর তাঁর ইচ্ছা হলে সেই বিশ্বাস হারিয়েও যাবে। …

(একটা জোরে নিশ্বাস নিয়ে) তাই বলছি নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও, আর নিশ্চিন্তে থাকো যাতে তোমাদের মতিগতি তোমার স্ত্রী জানতে না পেরে যান। … কালকে তুমি একাকী এসো আমার কাছে। বসে কথা বলছি। মনে রেখো পবিত্র, তোমার স্ত্রী যদি জানতে পারেন যে তুমি তাঁর কথা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছো, তবে কিন্তু তিনি আরো অধিক তাড়াতাড়ি করতে শুরু করে দেবেন, যাতে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। … তাই শান্ত থাকো, আর কাল এসো আমার কাছে।

আমি আর রিমি বাড়ি ফিরে গেলাম। রিমিকে দেখলাম, নিজের মত রইল ও সারাটা দিন। স্কুলের কাজ করলো, তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া করে শুইয়ে পরলো, আবার ভোর ভোর উঠে পরলো, সাধন করলো। আমার মন অত্যন্ত উচাটন। মনের ভাব স্ত্রীর থেকে লুকিয়ে রাখার চিন্তা করে চলেছি সমানে। আর রিমি কি ভাবে এত শান্ত হয়ে রয়েছে, সেই কথাই ভাবতে থাকলাম। এতটা বিশ্বাস ওর জগন্মাতার উপর! সাধন হলেও, তাঁর ইচ্ছাতেই, আর থেমে গেলেও, তাঁরই ইচ্ছাতে! এমন বিশ্বাস, ও পেল কি করে? এই টুকু একরত্তি মেয়ের মধ্যে এমন বিশ্বাস দেখে, নিজের উপরেও লজ্জা লাগছিল।

যাই হোক, কনো ভাবে নিজেকে অফিস যাবার সময় পর্যন্ত শান্ত রাখলাম। অফিস যাবার নাম করে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে, সরাসরি চলে গেলাম রমেনদার কাছে। আমায় দেখে, রমেনদা হেসে বললেন – রাত্রে ঘুমোও নি মনে হচ্ছে তো!

আমি – ঘুমিয়েছি, ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম। … খুব ভয় হচ্ছে দাদা! … মেয়েটার এমন ভক্তি বিশ্বাস জন্মেছে, সব নষ্ট হয়ে যাবে নাতো!

রমেনদা – হুম, মেয়ের বিশ্বাস সত্যিই অসাধারণ। সাধন হচ্ছে, তাঁরই ইচ্ছাতে; কাল নষ্ট হয়ে গেলেও তাঁরই ইচ্ছাতে। এমন বিশ্বাস সত্যিই বিরল। পবিত্র, এমন বিশ্বাস সচারচর দেখা যায়না। হতে পারে, এই বিশ্বাস আগামীদিনের কনো বিশেষ ঘটনার সূচনা দিচ্ছে আমাদেরকে।

আমি – বিশেষ? কিরকম বিশেষ?

রমেনদা – ঠাকুর রামকৃষ্ণের বাবার এমন বিশ্বাস ছিল বুঝলে পবিত্র। সারদা মায়ের মায়েরও এমন বিশ্বাস ছিল। … এমন বিশ্বাস এক বিশেষ কারুর আবির্ভাবের সূচনা দিচ্ছে আমাকে।… হুম, মাহুত নারায়ণের উপর বিশ্বাস করার কথা আমরা ঠাকুরের উক্তি উদ্ধৃতি করার সময়ে বলি তো ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে তা ভুলে যাই।

আমি – আপনি এসব বলছেন, আমার কিন্তু একটা ভয় লাগছে। … ওর মা কে আমি চিনি। খুব জাঁদরেল। কি যে করে বসবে, কেউ জানেনা।

রমেনদা – সাধনকে ভয় পান নাকি?

আমি – ভীষণ। রিমিকে একাধিকবার বলতে শুনেছি, ওসব ধ্যানট্যান করার বয়স নাকি এটা? রিমি অত্যন্ত হেসে উত্তরে ঠাকুর রামকৃষ্ণেরই কথা বলে দেয়। ওই যে ঠাকুরের কথা আছে না, বয়স্ক মহিলা তেলের ব্যবসা করতেন। মৃত্যুর সময়ে ছেলেরা গীতা পাঠ করাতে গেলে, মৃত্যু শয্যায় থাকা মা বলেন, পিদিমের আলোটা কমিয়ে দে, বেশি তেল পুরছে। … সেই কথা বলে রিমি বলে, সারাজীবন যা করবে, মৃত্যুর সময়ে তাই মনে আসে। … বয়সকালে গিয়ে অভ্যাস করা যায়না। সারাজীবন ধরে অভ্যাস করলে, বয়সকালে গিয়ে সেই অভ্যাস সুফল দেয়।

রমেনদা – হুম, ওই ঠাকুরের কথা আছে না, নিত্যের থাক। … বদ্ধজীব, মুমুক্ষু, মুক্ত আর নিত্য। … রিমি হলো মুক্ত জীব … হ্যাঁ পবিত্র। একটু বয়স বাড়তেই, নিজের মূর্তি ধারণ করেছে। … ওর মধ্যে খেয়াল করে দেখেছ, তোমার আমার মত মুক্তি পাবার কথা থাকেনা। ওর ভাব এমন যেন ও বরাবরই মুক্ত। … তা মা-মেয়ে ঠোকাঠুকি লাগে নাকি?

আমি – আপনার এখনও রসিকতা করতে ইচ্ছা করছে! … লাগে বৈকি ঠোকাঠুকি, তবে ঠিক ঠোকাঠুকিও বলা যায়না। ওর মা সমানে ওর পিছনে টিকটিক করতে থাকে। রিমি নিজের মত চলতে থাকে। মুখ ও তখনই খোলে, যখন ওর কনো কাজের সময়ে ওকে অতিরিক্ত বিরক্ত করা হয়। … তাও ওর আচরণ বিচিত্র ধরনের। অনেকগুলো কথা ওর মা ওকে বলল, ও আসতে করে একটা কথা বলে। সাধারণত কথাগুলি হয় ঠাকুরের কথা হয়, নয় গীতার কথা আবার কখনও রামায়ণ মহাভারতের কথা। আর অদ্ভুত ব্যাপার এই যে, কথাটা বলে ও থেমে গিয়ে, আবার নিজের কাজে মনোযোগ দেয়।

রমেনদা হেসে উঠে বলল – আর তার প্রতিক্রিয়া?

আমি – ওর মা যেন সেই কথাতে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। … সেই জায়গা থেকে তখনের মত চলে যায়। কিন্তু সমানে গজগজ করতে থাকে। … যখন দেখে গজগজে কনো উত্তর আসছে না, তখন গজগজটাতে একটু নিজেই আকর দিয়ে, তারস্বরে কথা বলে নেন। … প্রায় এক ঘণ্টা এমন চলতে থাকে। তারপর যখন দেখে রিমি উনার কথা শুনছেও না, তখন মুখচোখ লাল হয়ে ওঠে রাগে, আর শেষে বলেন – হ্যাঁ, আমার কথা কেন শুনবে! আমি তো ব্রাত্য এই সংসারে।

রমেনদা এবার একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন – তারপর একবার চোখটেরিয়ে দেখে নেন যে, তাঁর এই ছোবলে কাজ হলো কিনা। যখন দেখেন যে এতেও কনো কাজ হলো না, তখন সরাসরি গর্তে চলে যান। কি তাই তো?

আমি – আপনি বলছেন সাপের স্বভাব!

রমেনদা – হুম, সমস্ত যোনি পেরিয়েই তো মানুষ হয়েছি, সমস্ত যোনির স্বভাবই তাই আছে আমাদের মধ্যে। সময়ে সময়ে, একাকটা যোনির স্বভাব আমাদের মধ্যে প্রকাশ পায়। যে খাবার দেয় রোজ, তার কাছে আমাদের স্বভাব পোষা কুকুর বেড়ালের মত হয়ে যাই। আবার যে আমাকে উল্লঙ্ঘন করছে, তার কাছে বাঘ, সিংহ বা সাপ হয়ে যাই। … মাথা খারাপ হয়ে গেলে হাতির মত ধুলো মাখি, আবার অন্যের খেয়ে নিজের মত চলার ইচ্ছায় গরুর মতও করি।

আমি আজকে রমেনদার রসিকতাতে হাসছিলাম না। তাই রমেনদা আবার বললেন – অতো ভেবো না পবিত্র, ঠাকুর বলতেন না, জটিলে কুটিলে না হলে লীলা পোষ্টাই হয়না; এও তেমনই ব্যাপার। … আচ্ছা আর রিমি কি বলে, একটু বলো। মেয়েটার কথা বড় শুনতে ইচ্ছা করে। আসলে রূপে লক্ষ্মী ও একা নয়, ওর মত অনেকেই হয়, কিন্তু ওর স্বভাব সরস্বতীর মত, চুপচাপ, নিজের সাধনে মন। আবার ওর কথা মহাদীপ্তিসুলভ, যা ওর বয়সের আজকের দিনে একটা মেয়ের থেকে আশা করা মানে, যমের থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসার সমান।

আমি – বলে, একাক দিন একাক কথা বলে। একদিন ওর মা বলছিল, বেশ শান্ত ভাবেই বলছিল, তুই যে এই বয়স থেকে ঈশ্বর, সাধনা, ধ্যানজপ করছিস, এটা কি এইসবের বয়েস! …

রমেনদা – রিমি উত্তরে কিছু বলল?

আমি – অনেক ক্ষণ কিছু বলে নি, স্কুলের কাজ করছিল। শেষে যখন একই কথা ওর মা, ওর কানের কাছে বলে চলেছিল, তখন বইখাতাগুলোকে শান্ত ভাবে টেবিলে রাখলো। তারপর উঠে গিয়ে, ফ্রিজ থেকে একটা আপেল বার করলো, সেটা নিয়ে ঘরে ফিরে এলো। … আমি রগড়খানা কেবল দেখছি, চুপচাপ খবরের কাগজে মুখ ঢেকে রেখে। … রিমি দেখলাম আপেলে একটা কামড় বসালো। … ওর মা চেঁচিয়ে উঠলো, এখন আবার ফল খেতে গেলি কেন? একটু পরেই খেতে দেব!

রমেনদা ভ্রু কুঁচকে কথা শুনছিলেন। সেই দেখে আমিও বলতে থাকলাম – রিমি ফলে একটা কামড় অলরেডি দিয়ে দিয়েছিল। তাই ও বলল – একটু পরেই খেতে দেবে না। ঠিক আছে তাহলে, ঠাকুরের কাছে এই ফলটা দিয়ে দিই। ঠাকুর খাবে।

রমেনদা এবার একটু হেসে উঠতে আমি বললাম – ওর মা তো সেই কথা শুনে কাইমাই করে উঠলো, কি এঁটো ফল ঠাকুরের কাছে দিবি! … তোর কি কনো কাণ্ডজ্ঞান নেই! … রিমি হেসে উঠলো এবার, আর বলল, তাহলে ভাবো, এই একটা এঁটো ফল তোমার ঠাকুরের কাছে দেয়া যাবেনা। … তবে (নিজের মাথা থেকে নাভি পর্যন্ত আঙুল দেখিয়ে) এই ফলটাকে তুমি বলছো এঁটো করে, তারপর ঠাকুরের কাছে দিতে? …

রমেনদা – নিশ্চয়ই তোমার স্ত্রী কথার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারেনি!

আমি – না, একদমই পারেনি। ওর মা বলে উঠলো, এর মানে কি? … রিমি একটা ব্যাকা হাসি হেসে বলল, ওই যে তুমি বলছিলে, এটা বয়স নয়, ঠাকুরের কাছে (নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে) এই ফলকে এখন দেবার। … বলছিলে না! … বলছিলে তো, আগে এটাকে ভালো করে এঁটো করে নিয়ে, তারপর ঠাকুরকে দিতে। বলছিলে তো! এই ফল যখন শুকিয়ে গিয়ে খাবার অযোগ্য হয়ে যাবে, সেই বয়সকালে একে ঠাকুরের কাছে দিতে। … তা তোমার আজ্ঞারই তো পালন করছিলাম। … যাই দিয়ে আসি এই এঁটো আপেলটা ঠাকুরের কাছে?

রমেন দা এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠে বললেন – প্রতক্রিয়া?

আমি – সে আর বলবেন না, ওর মা তো রেগে আগুন! … বলে, যা খুশী কর, এতকাল তোর বাবা আমার মাথাটা চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়েছে। তাতেও হয়নি, এখন তাঁর মেয়ে এসেছে, যেটুকু ছোলা ছাতু হওয়া বাকি, তাকেও পিষে পিষে ছাতু করে দেবার জন্য। … যা খুশী কর। আমি আর কনো কিছুতে কিচ্ছু বলতে আসবো না। … মেয়ে আমার আরেক কাঠি উপর দিয়ে চলে। … এখানে ক্ষান্ত হয়ে গেলেই পারতো। সে আবার মুখ টিপে বলে, মা হয়ে মেয়েকে তুমি মিথ্যে কথা বলার শিক্ষা কি করে দিতে পারো? … কাল তো আবার বলবে এইসব কথা, তবে মিথ্যে কেন বললে, আর বলবে না! …

রমেন দা এবার হাসি থামাতে পারেননা। উনি হাসতে হাসতেই বললেন – নিশ্চয়ই স্থান ত্যাগ করলেন তোমার স্ত্রী!

আমি – আর বলেন কেন? খোঁটা ঘুরে এসে পরলো আমার উপর। … আমার উদ্দেশ্যে গজগজ শুরু হয়ে গেল, তোমার জন্যই যতকিছু। এই কচি বয়সে মেয়ের মাথায় এসব ঢুকিয়েছে। … আমার জীবনটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে আংরা করে দিল, বাপবেটিতে। … এই বয়সে মাথায় এইসব না ঢোকালেই কি চলতো না। … রিমির ভাব অন্যরকম। ও কথারপৃষ্ঠে কথা বলে না। ওর ধারাটাই অন্যরকম। … ঘুরে এসে মাকে পিছন থেকে জরিয়ে ধরে বলল, মা, ঈশ্বরকে কি মাথা দিয়ে ধারণা করা যায়? হৃদয় দিয়ে ধারণা করতে হয়, চেতনা দিয়ে ধারণা করতে হয়। … আর আমার চেতনার জননী তো তুমি নও মা। যিনি এই চেতনার জননী, তিনিই এতে এসব দিয়েছেন, শুধুশুধু নিজেকে দোষ দিয়ে কেন দুঃখ পাও।

রমেনদা একটু ভ্রু কুঁচকালে, আমি বললাম – আমিও একটু থতমত খেয়ে গেছিলাম কথাটা শুনে। দোষ তো দিচ্ছে আমাকে, নিজেকে দোষারোপ কেন বলল রিমি! … ওর মাও ওর দিকে তাকালে, ও বলল, স্বামীস্ত্রী আলাদা নাকি, বাবাকে দোষ দিচ্ছ মানে তো নিজের কাঁধেই বন্দুক তুলছো না! … তুমি আর বাবা মিলেই তো একজন, কিগো মা, ভুল বললাম!

রমেনদা একটা তৃপ্তির হাসি হাসলে, আমি বললাম – মেয়ের কথা শুনে আমিও থতমত খেয়ে যাই, এই সমস্ত গভীর দর্শন আমি তো ওকে শেখাই নি।

রমেন দা – আর ওর মায়ের প্রতিক্রিয়াও নিশ্চয়ই অন্যরকম হয়। গজগজ করার জায়গা তো আর রাখলো না রিমি!

আমি – সে আর কি বলবো দাদা। কেমন করে একটা বাঘ একমুহূর্তে বিড়াল হয়ে যায়, চাক্ষুষ করলাম সেদিনকে। … কিন্তু এমনটা কেন হলো, আমি এখনও বুঝিনি।

রমেনদা – অপ্রিয় কথার শেষে, একটা যদি আশাতীত প্রিয় কথা বলে দেওয়া হয়, তবে মানুষের মন এমনই শান্ত আর তৃপ্ত হয়ে যায়। … রিমি আসলে একজন, ওই যে বললাম, মুক্তের থাক। … স্বভাবিক ভাবেই ও, মানুষকে ডিল করতে জানে। শিখতে হয়না এদেরকে। যেন সাখ্যাত জগন্মাতা এদের হৃদয়ে বসে, সেই সমস্ত কৌশল বলতে থাকেন, আর পূর্ণভাবে সমর্পিত হবার কারণে, এঁরা সেই সমস্ত নির্দেশ শুনতে পায়, যা আমরা পাইনা, কারণ আমরা পূর্ণ সমর্পিত নই। ওই ঠাকুর বলতেন না, জগন্মাতার একগণ্ডূষ অমৃত পান করে, শিব শব হয়ে পরে গেল, রিমি হলো সেই শব হয়ে পরে যাওয়া একজন।

আমি – আপনার দুশ্চিন্তা হচ্ছে না, এই মেয়ের যদি তেমন ঘরে বিয়ে হয়ে যায়, তাহলে ওর এই ভক্তি বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাবে?

রমেনদা হেসে বললেন – একদমই দুশ্চিন্তা হচ্ছেনা পবিত্র। ঠাকুরের কথার স্পষ্টতা আমার চোখের সামনে ভাসছে। উনি বলতেন না, একবার গাছ বড় হয়ে গেলে, খুঁটিতে হাতি বেঁধে দিলেও, গাছের কিছু হয়না। … রিমি হলো সেই গাছ। ওকে হাতিও কিছু করতে পারবে না, তো গরুছাগলে কি করবে? একটু পাতা খাবার চেষ্টা করবে, শেষে সুবিধা করতে না পারলে, গা ঘোষে চলে যাবে।

আমি – কিন্তু আমার তো আরেক চিন্তার বিষয় হলো, রিমির মা। … এতো কথা রিমির থেকে শোনে, তাও যেন কিছু এফেক্টই হয়না!

রমেনদা – উট কাঁটা ঘাস খায়, মুখ দিয়ে দরদর করে রক্ত পরে, তারপরেও কাঁটা ঘাসই খায়। পবিত্র, আধ্যাত্ম হলো অক্সিজেন নেওয়ার হুঁশ। যে জানে সে অক্সিজেন নিচ্ছে, সেও অক্সিজেন নিচ্ছে; আর যে জানেনা যে অক্সিজেন নিচ্ছে, সেও সেই একই অক্সিজেন নিচ্ছে। পার্থক্য কেবলই অন্তর্দৃষ্টির। … আধ্যাত্মের অধিকারী সকলেই; সকলেই এটা জানার অধিকারী যে সে অক্সিজেন নেয়। কিন্তু কেউ অন্তর্মুখী হয়ে তা জানে, আর বাকিরা জানেনা।

আমি – আমার একটা প্রশ্ন আছে রমেনদা। … রিমি এমন হলো কি করে? … আমি কিন্তু ওর সাথে আধ্যাত্মিক কথা বিশেষ যে বলেছি, তা কিন্তু নয়। ও যেই যেই শিক্ষকের কাছে পড়েছে, তাঁদেরকেও আমি জানি। তাঁদের মধ্যেও এমন একজনও নেই যিনি আধ্যাত্মিক চর্চা করেন। তাহলে এমন কি করে হলো রিমি!

রমেনদা – জীবের তিন স্তর পবিত্র; কারণ অর্থাৎ ত্রিগুণের স্তর যার অধিপতি হলো আত্মা; সূক্ষ্ম বা পঞ্চভূতের স্তর যাতে মনবুদ্ধি থাকে; আর স্থূল বা পঞ্চভূতের অন্তিম ভুত অর্থাৎ শরীর, যা ইন্দ্রিয়ের ভরসায় থাকে। … কেউ অন্যের থেকে জেনে শুনে কনো দিশায় চলেন, এঁরা স্থূলে থাকেন। কেউ অন্যের ভাবধারাকে দেখে কনো রাস্তায় চলার প্রেরণা পায়, এঁরা সূক্ষ্মে বিরাজ করে। আর অল্পসংখ্যক কেউ কেউ, সরাসরি আত্মার থেকেই কনো পথে চলার প্রেরণা পায়। …

রমেনদা বলতে থাকলেন – চাকরী বাকরির জন্য যারা দৌড়ায়, তাঁরা স্থূলে বিরাজ করে। ইন্দ্রিয়ে মাধ্যমে দেখে শোনে যে অমন চাকরী করলে, বেশ আভিজাত্য আসে, তাই সেই পথে চলে। বাণিজ্য বা রাজনীতির দৌড়ে যারা থাকে, তারা সূক্ষ্মে বিরাজ করে। অনুভব করে তারা যে এমন করলে, অমন করলে বিশেষ হয়ে ওঠা যায়, তাই করে। … আর আধ্যাত্মের ক্ষেত্রে প্রয়োজন আত্মার চেতনা। যারা ইন্দ্রিয়ের প্রভাবে এসে আধ্যাত্মের পথে চলে, তারা একটু দূর গিয়ে, হিসাব করতে বসে যায়, কি পেলাম আর কি দিলাম, আর অমনি ফল না দিয়েই গাছ থেকে ফুল ঝড়ে যায়। …

আবার যারা মনবুদ্ধি দিয়ে বিচার করে আধ্যাত্মের পথে আসে, তারা নিজেদের বিশাল ভক্ত মনে করি; কেউ যদি তার বিশ্বাসের মধ্যে থাকা অবিশ্বাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, সে বলে, আমার আরাধ্যা জানেন আমার ভক্তি কেমন। বুঝতে পারছো তো পবিত্র, ভক্তির অহংকার, মহাস্খলনের পূর্বাভাস, বোঝই তো। … এই অহংকার যার এসে গেছে, তাঁর পতনকে আটকানো ঈশ্বরেরও সামর্থ্যের বাইরে। … রিমি হলো সে যে, আত্মার চেতনার থেকে ঈশ্বরের প্রতি আকর্ষিত। কনো বাহ্য বোধ, ইন্দ্রিয় লাগেনি ওর এই আকর্ষণের জন্য। … আর একেই বলে শুদ্ধাভক্তি পবিত্র। সেই কারণেই ওর ভক্তির মধ্যে অহং নেই; ও কি বলে, তাঁর ইচ্ছাতেই সে ভক্ত। … বুঝলে কিছু?

আমি – কিছুটা দাদা, এটুকু বুঝলাম যে, ইনজেকশন দিয়েও আম ফলানো যায়, কিন্তু দেখতে তা আমের মত হলেও পুষ্টি তাতে কিছুই থাকেনা। যেই আম নিজের থেকে হয়, পুষ্টি তাতেই থাকে। … তারমানে তো দাদা, আধ্যাত্ম সকলের জন্য নয়!

রমেনদা – সকলের জন্য হলে কি আর ঠাকুর রামকৃষ্ণের ১১ শিষ্য থাকে, আর সামান্য মহারাজের হাজার শিষ্য থাকে? আধ্যাত্ম হলো মহাসম্পত্তি; এই সম্পত্তি যার কাছে থাকে, তার কাছে কি থাকে জানো? সদানন্দ। সদানন্দের অধিকারী সে। … যে প্রকৃত রাজা, তার রাজসিংহাসন লাগেনা; সে একটা পাথরের চটির উপর বসলেও, সে রাজা। … মুখ খুললেই সে রাজা। আর যে ময়ূরপুচ্ছ লাগিয়ে রাজা সাজে, তার সিংহাসন না থাকলেই দুশ্চিন্তা। দেখো না ভায়া, বর্তমান রাজনীতিতে। … সিংহাসন হারিয়ে যাবার চিন্তা আসলেই, কেমন আগ্রাসী হয়ে ওঠে নেতামন্ত্রীরা।

আমি – তাহলে প্রচার?

রমেনদা – প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একটি ছোট কক্ষের, আশ্রমের প্রয়োজন নেই। … আধ্যাত্ম স্বর্গের দ্বার নয় পবিত্র; আধ্যাত্ম মোক্ষের দ্বার। … দুইচারজন মুক্তি চাইবে; যখন চাইবে, তখন তাঁদেরকে জগন্মাতা সেই ছোট্ট কক্ষে ঠিকই নিয়ে চলে আসবেন। … ব্যাস কাজ শেষ।… আধ্যাত্ম জনে জনে বিলানোর জিনিস নয়। … লকারের গয়না সবাইকে দেখানোর জিনিস নয়; বাড়ির মালিক ফিরেও তাকান না সেই দিকে, কিন্তু জানেন সেগুলিই দুঃসময়ের ভরসা। … আধ্যাত্ম হলো লকারের সেই গয়না; সময় এলে সেই গয়নাই আমাদের উদ্ধার করে। কিন্তু সময় না হলে, সেই গয়না দেখলেই জুয়া খেলে উড়িয়ে দেবার ইচ্ছা জাগে। … তাই আধ্যাত্ম যদি সকলের কাছে বিলিয়ে দিতে যাও, যখন গয়নার প্রয়োজন পরবে, তখন দেখবে একটাও গয়না অবশিষ্ট নেই। … আজকের সময়কেই দেখো না।

রমেনদা বলতে থাকলেন – আজ, সব দিকে বাণিজ্যই বাণিজ্য। … সব দিকে কামনাই কামনা। সিগারেটবিড়ির নেশা করা স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকারক, সিনেমার কাস্টিংএ বলা হয়; কিন্তু কামনাবাসনার নেশায় চুর সমাজকে একবারও বলা হয়না, সেই নেশা করে তাঁরা তাঁদের ইহকাল পরকাল সমস্ত বিনষ্ট করে মানুষজাতিকেই বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বলবে কে, জানবে তবে তো বলবে। … এই সময়ে ভাবো, আধ্যাত্ম কতটা বড় ভূমিকা পালন করতো! … কিন্তু না, আধ্যাত্মকে লকার থেকে বার করে দিয়ে সার্বজনীন সম্পত্তি করা হয়েছে, তাই তার আর কনো মূল্য নেই।

একটু নিজের মনেই হেসে – যিনি গীতার শ্লোক আওরাচ্ছেন, তিনিও নাকি আধ্যাত্মিক, আবার যিনি জীবনের সাথে মিলিয়ে দিচ্ছেন সমস্ত ধর্মগ্রন্থের কথা, তিনিও নাকি আধ্যাত্মিক। বুঝতে পারছো, ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টও মেধাবী, আবার মুখস্ত করে উগড়ে দেওয়া ছাত্রও নাকি মেধাবী। … কনো ভেদ রাখেনি, আধ্যাত্মকে লকার থেকে বার করে সার্বজনীন সম্পত্তি করে দিয়ে। … মানুষ এমন কীর্তি করছে যে, মানবযোনি থেকেই সে স্খলিত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আধ্যাত্ম এখন ছেলেখেলা হয়ে গেছে; দুটো গীতার শ্লোক আওরালেই সে আধ্যাত্মিক ব্যক্তি, তাই সেই স্খলনের থেকে বাঁচানোর কেউ নেই। … (হতাশ হয়ে) তাঁর সংসার, তিনি ঠিক করে তো দেবেনই। ধরে নিতে পারো, তোমার কন্যা সেই সঠিক করে দেবার ভগবতীসেনার একটি বিশেষ সৈন্য বা সেনাপতি।

আমি – কিন্তু ওকে কেউ যদি জ্ঞান প্রদান করতে বললে, ও বলে জ্ঞান প্রদান করা যায়না। … আপনার ভ্রান্ত ধারণা যে জ্ঞান প্রদান করা যায়। … আমি একাধিকবার ওকে এটা বলতে শুনেছি। … কিন্তু বুঝতে পারিনা, যদি নাই বলে ও, তবে কি করে মানুষ উন্নত হবে?

রমেনদা হেসে উঠে বললেন – ঠিকই তো বলে রিমি। … ভ্রান্তি ওর দিকে নেই, শ্রোতার দিকে রয়েছে। … শ্রোতা ভাবেন, বিদ্যাই জ্ঞান, জ্ঞানই বিদ্যা। … পবিত্র, বিদ্যাকে মুখে বলা যায়, জ্ঞানকে নয়। জ্ঞান বলা সম্ভব নয়, জ্ঞান অনুভবের বস্তু; জ্ঞান উচ্ছিষ্ট নয়, বিদ্যা উচ্ছিষ্ট।

আমি – একটু বুঝিয়ে বলুন; ঠিক বুঝতে পারলাম না।

রমেনদা – তোমার কন্যাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করো নি!

আমি – করেছি, তবে ওর কথা আমার মাথায় ঢোকেনি।

রমেনদা – এই তো তোমাদের সমস্যা পবিত্র; সমস্ত কিছু মাথা দিয়ে বুঝতে চাও। মাথার সামর্থ্য কোথায় এত কিছু বোঝার! … ঠাকুরের কথা শোন নি! একশের ঘটিতে কি চারশের দুধ ধরে! … হৃদয় দিয়ে অনুভব করো। … যাইহোক, কি উত্তর দিয়েছিল রিমি!

আমি – ও বলল, কি কি, কি ভাবে, কি করে, আর কে কেন। কে কেন হলো জ্ঞান; কি করে আর কি ভাবে হলো বিদ্যা, আর কি কি হলো তথ্য। … আমি না সত্যি বলছি, কথাটা হেঁয়ালি মনে হয়েছিল। তাই আর কথা বাড়াইনি।

রমেনদা – হুম, আশ্চর্য ধরনের মেধা। … না, ভগবতীর অশেষ কৃপা না থাকলে, এমন মেধা ধারণারও অতীত। … এর মানে কি, বুঝতে পারোনি, তাই তো। … বেশ শোন। কে কেন মানে হলো ঈশ্বর কে, আর এই জীবন কেন। কি ভাবে আর কি করে, অর্থাৎ হলো কি ভাবে জীবনের সৃষ্টি হলো, আর কি করে তা চলতে থাকছে। কি কি মানে, জীবন কি কি করতে থাকে। …

আমি বোঝার জন্য একটু ঝুঁকে গেলে, রমেনদা আবার বললেন – জীবন কি কি করে, এগুলি হলো তথ্য। জীবনের সঞ্চার কেন হলো আর জীবনের সঞ্চার কি ভাবে হলো, এই  নিয়েই সমস্ত বেদ, বেদান্ত, পুরাণ, উপনিষদ ইত্যাদি, অর্থাৎ যাদেরকে তোমরা জ্ঞান বলো। আসলে সেগুলি হল বিদ্যা। … এতটাই মুখে বলা যায়। কিন্তু জ্ঞান কি? এই জীবনের সঞ্চার যেই ঈশ্বরের কারণে হলো, সেই ঈশ্বর কে, আর সেই ঈশ্বর কেন এই জীবনের সঞ্চার করলেন। পবিত্র, এই কথা মুখে বলা যায়না। এই কথা কেবলই ধ্যানসমাধিতে উপলব্ধি করা সম্ভব। … অর্থাৎ কি বুঝলে?

আমি থতমত খেয়ে গেছিলাম রিমির জ্ঞানের পরিধির কথা ভেবে। কিছু বলতে যাবো, এমন সময়ে একজন যুবক প্রবেশ করলেন ঘরে। প্রবেশ করতে করতেই বললেন সেই যুবক – কে গুরুমশাই! … কে এমন অসাধারণ কথা বলেছেন! … আপনি তাঁর নিজমুখে ভূয়সী প্রশংসা করছেন, জানলার বাইরে থেকে শুনলাম। কেন প্রশংসা করছেন, তা জানার জন্য পা চালিয়ে গেটের কাছে আসতে শুনলেম, কি কি, কি ভাবে, কি করে, কে, কেন। … আশ্চর্য ধরনের মেধা। কে ইনি!

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9