চতুর্থ পর্ব – তেমনই একদিন
তেমনই একদিন আমি রিমিকে নিয়ে রমেনদার কাছে গিয়েছিলাম। রিমিরও রমেনদাকে বেশ অন্যরকম লাগে। প্রথম যেদিন নিয়ে গেছিলাম, তারপর প্রায়ই রিমি রমেনদার কাছে যেতে চাইতো। আমি নিজে রমেনদার কাছে সপ্তাহে একবারও যেতাম না। মাসে দুবার থেকে তিনবার যেতাম। রিমির সুবাদে, সেই সংখ্যা মাসে ৫ থেকে ৬ বার হতে শুরু করলো।
রিমিও রামকৃষ্ণ কথামৃত পড়েছে, আর শুধু তাই নয়, অন্য ধর্মগ্রন্থও ও অনেক পড়েছে। একই সঙ্গে, ওর মধ্যে বিভিন্ন আশ্রমগুলিকে নিয়ে একটা আগে থেকেই উদাসীনতা ছিল, অর্থাৎ আমার মত নয়। আমি যেমন কনো বিচার না করেই, আশ্রম রয়েছে, তাই সেখানে গিয়ে নিজের নাম লিখিয়েছিলাম, রিমি কিন্তু সেরকম নয়। সে একটু বিচারশীল। এই বিচারশীলতা ওর মায়ের থেকে পেয়েছে বোধহয় ও, কারণ আমার মধ্যে তো এই বিচারবুদ্ধি একটু কেন, বেশ কমই আছে।
রিমির কথা অনুসারে, আশ্রমের উদ্দেশ্য সুখ দেওয়া নয়, অহেতুক সুখের পিছনে ছোটাকে বন্ধ করা। ওর কথা হলো, সংসারী মানুষ সুখের পিছনেই ছুটবে, সেটাই স্বাভাবিক। আশ্রমের উদ্দেশ্যই হলো, সেই সুখের পিছনে ছোটা বন্ধ করার প্রেরণা প্রদান করা। যুক্তি দিয়ে, যথার্থ জ্ঞানশিক্ষা প্রদান করে, উপদেশাদি শুনিয়ে, সংসারী মানুষকে সুখের পিছনে ছোটা, তারপর সংসারী মানুষদের সাধারণ প্রবৃত্তি, অর্থাৎ ভেদভাবের থেকে দূরে করা, তারপর সম্প্রদায়কেই ধর্ম বোধ করা থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে, যথার্থ ধর্মবোধ হৃদয়ে স্থাপন করা, এই হওয়া উচিত আশ্রমের কীর্তি। আর ওর মতে, এমন কিছুই হচ্ছে না আশ্রমে। তাই ও আশ্রমগুলির প্রতি উদাসীন।
আমি রিমিকে ওর এই মনোভাব পালটানোর জন্য বেশ কয়েকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি। এমনও বলেছি, বিভিন্ন আশ্রম মহাপুরুষদের আদর্শে স্থিত, তাই সেখানে যাক আর না যাক, তাদের সম্বন্ধে উদাসীন না হতে। কিন্তু ওর পাল্টা যুক্তিতে আমি থেমে যেতাম। ও বলতো, ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব কি বলতেন? উট কাঁটা ঘাস খায়, মুখ দিয়ে দরদর করে রক্ত ঝরে, তারপরেও কাঁটা ঘাসই খায়। উনি কি বলতেন? উনি বলতেন, পোয়াতি মেয়ে প্রসব যন্ত্রণা ভোগ করে বলে আর স্বামীর কাছে ফিরে যাবেনা। কিন্তু পরের বছর আবার সে পোয়াতি হয়ে যায়।
এই সমস্ত উক্তি উদ্ধৃতি করে, রিমি আমাকে বলতো, ঠাকুর রামকৃষ্ণ ঘোর সংসারীদের দেখলে, দুরদুর করে তারিয়ে দিতেন। যার সংসারকে তথৈবচ করে রেখে দিয়ে ঈশ্বরে মন, তাঁকেই তিনি তুলে আনতেন। তাহলে আমি কি সুত্রে বলি যে তাঁদের আদর্শে স্থিত সমস্ত আশ্রম? …
রিমি আরো বলতো, ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন, শিব জ্ঞানে জীব সেবা করতে। এর অর্থ কি? এর অর্থ এই যে এটা স্পষ্ট ভাবে জানতে যে, জীব স্বরূপে শিব, স্বরূপ জ্ঞানের অভাবেই তারা জীব, আর তাই তাঁরা দুঃখকষ্ট ভোগ করছে। অর্থাৎ কি দাঁড়ায়? তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, বা বলা যেতে পারে যে নির্দেশ দিয়ে দিয়েছেন যে জীবকে তাঁর দুঃখকষ্ট যে অহেতুক, সেই বোধ করানোই সেবা। জীবের দুঃখকষ্ট দূর করার কথা উনি বলেছেন! যদি না বলে থাকেন, তবে যেই আশ্রমসমূহ জীবের ভ্রান্ত ও অজ্ঞান থেকে জন্মানো দুঃখকষ্টের ধারণাকে তোষামোদ করে, তারা উনার আদর্শে কি করে স্থিত হলো?
আমি একরকম রিমির এই সমস্ত বাক্যবাণে নিরুত্তর হয়েই গিয়েই, ওকে রমেনদার কাছে নিয়ে যাই। কিন্তু এতে যা হয়, তা হিতে বিপরীত। রমেনদা, রিমির মধ্যে থাকা বিচারের তীক্ষ্ণতা খুব ভালোলাগে। তিনি ওর এই যুক্তিসমূহে অত্যন্ত প্রভাবিত হন, এবং বলেন – রিমি, সমস্যা যখন সামনে আসে, তখন দুটি বিচার অবশ্যই করবে। প্রথম হলো, সেই সমস্যার সমাধান কি। আর দ্বিতীয় হলো এই যে জগজ্জননীর জগতে সেই সমস্যা নির্মিত হলো কি করে।
সেই সুত্রে তিনি যা বলেন, তা রিমির পরবর্তী বেশ কিছুদিনের ভাবনার খোরাক হয়ে ওঠে। তিনি বলেন – রিমি, এই জগত মানুষের নয়, না জীবের। আমাদের কনো সামর্থ্যও নেই, এই জগতে কিচ্ছু করার, যদি তিনি তার জন্য সহমত পোষণ না করেন। তবে যেই আচারগুলিকে অনাচার বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সেই অনাচার জগতে স্থাপিত হতে পারছে কি করে? রিমি, সেই নিয়ে বিচারের প্রয়োজন আছে বইকি। সেই অনাচারকেও যখন তিনি সম্মতি প্রদান করেছেন, তখন সেই অনাচারেরও যথাযথ ঔচিত্য আছে, যেটা আমাদের বিচারের সামনে ধরা পরেনি। সেটাকে খুঁজে বার করো। যদি সেটা বার করতে পারো, তবে দেখবে, সেই সমস্যার সমাধানও সামনেই পরে রয়েছে।
আমি ভাবতাম, আমিই কেবল এই ব্যাপারে সিরিয়াস। রিমির সিরিয়াসনেশ দেখে বুঝলাম, আমি সিরিয়াস নই, আমি সিরিয়াস হতে আগ্রহী মাত্র। সিরিয়াস তো রিমি। সেদিন রমেনদার থেকে ফেরার সময় থেকে, ৪দিন পর পর্যন্ত, যখন ও আবার রমেনদার কাছে যেতে চাইলো, ততক্ষণ পর্যন্ত, দিবারাত্রি কেবল রমেনদা যেই বিচার করতে বলেছিলেন, সেটাই করে গেল রিমি। … আমি ওর মনোযোগ দেখে, আর ওর স্বাভাবিক নিষ্ঠা দেখে, একই সঙ্গে একজন গর্বিত পিতা রূপে নিজেকে অনুভব করলাম, আবার নিজের যেই নিষ্ঠাকে খুব বড়নিষ্ঠা বলে মনে করতাম, তার উপর হাসিও পেলো।
চারদিন পরে, রমেনদার কাছে আবার ও যেতে চাইলে, বুঝলাম, ওর উত্তর রেডি। রমেনদার কাছে নিয়ে গেলাম। সেখানে গিয়ে রিমি বলল – রমেনকাকু, আমার উত্তর আমাকে সন্তুষ্ট করেছে, তবে তাও পুরপুরি নয়। আমার মনে হয়েছে, জগজ্জননী হলেন বিচিত্র প্রকারের এক শিক্ষিকা বা শিক্ষক, যেটাই বলুন, কারণ তাঁর তো কনো লিঙ্গ হয়না। … তিনি আমাদেরকে সঠিক উত্তর দেন না, তিনি আমাদেরকে ভ্রান্তিটি কেবল ধরিয়ে দেন, আর প্রেরণা প্রদান করেন যাতে আমরা সেই উত্তর নিজেরাই লাভ করতে পারি।
আমরা ভ্রান্তিকে দেখি, কিন্তু একটি ভ্রান্তিকে শুধরে নিতে গিয়ে, অন্য আরেকটা ভ্রান্তি করি। … আর সেই ভ্রান্তিকে শুধরে নেবার জন্য তিনি আবার প্রেরণা প্রদান করেন, কনো না কনো মহাপুরুষ বা অবতারের মাধ্যমে। … এ যেন, একটা আশ্চর্য রকমের খেলা! … যেমন আমরা একটা জায়গাতে পেঁচিয়ে থাকা কিছুকে বাইরে বার করে নিয়ে আসার জন্য, একবার তাকে টানি, আবার খানিকটা ছাড়ি, আবার টানি, আবার ছাড়ি, এও যেন তেমনই। … উনি যেন, আমাদের মধ্যে জরিয়ে থাকা বিকারগুলিকে, একবার টেনে বার করেন, আবার যখন তা জরিয়ে যায়, তখন ছেড়ে দেন। সেগুলো আবার যখন জরিয়ে একজায়গায় স্থিত হয়ে যায়, তখন তিনি আবার টেনে বার করেন।
রমেনদাকে দেখলাম বেজায় আনন্দ পেয়েছেন এই কথা শুনে। তিনি হাসি মুখে বললেন, এর অর্থ কি রিমি? কেউ কি কিছু ভুল করছেন?
রিমি – না কাকু, ঠাকুর বিকারকে বার করে ফেলে দেবার কথা বলেছেন। ঈশ্বরের কথা। সেই কথার যে সকলে সঠিক অর্থ বুঝবেন, সেটাই তো অস্বাভাবিক। … টিচার একটা শিক্ষা দেন, ক্লাসের একাকজন ছাত্রছাত্রী তার একাক মানে করেন। … কেউ কেউ অনুভব করেন যে, সেই কথার অর্থ তিনি উপলব্ধি করতে পারেন নি, তাই সেই কথাগুলোকে হৃদয়ে ধারণ করেই চলতে থাকেন, আর যথাসময়ে তা অনুধাবন করে ফেলেন। আবার বেশিরভাগই শিক্ষকের কথাকে অগ্রাহ্য করে চলতেই ভালোবাসেন। সামনের বেঞ্চের কয়জন থাকে, যারা বুঝুক আর ছাই না বুঝুক, সেই কথাগুলোকে নোট করে নিয়ে, ঝেড়ে মুখস্ত করে নম্বরের বন্যা বইয়ে দেয়। আর যারা টিচারকে অগ্রাহ্য করেছিলেন, তাঁরা সেই নম্বরের বন্যা দেখে, টিচার নয়, সেই ফাস্ট বেঞ্চারদের অনুগামী হয়ে ওঠে। … এও ঠিক তেমন কাকু।
রমেনদা – একটু ব্যাখ্যা করে বলো।
রিমি – ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব হলেন টিচার। কেউ কেউ ছিলেন যারা অনুভব করে ফেলেন যে তাঁর অমৃত কথার অর্থ তিনি উপলব্ধি করতে পারেন নি। তাই সমানে প্রয়াস করতে থাকেন, তাদেরকে উপলব্ধি করার, যেমন আপনি। … বেশির ভাগই সেই কথার কনো গুরুত্বই দেন নি, যেমন ক্লাসের পিছনের দিকের ছেলেপিলেরা করে, টিচার পড়িয়ে যাচ্ছে, আর তারা লুকিয়ে কাটাকুটি খেলে যাচ্ছে।
রমেনদা – আর ফাস্ট বেঞ্চার?
রিমি – টিচারের কথা বুঝুক আর না বুঝুক, নোট করে মুখস্ত করা আর পরীক্ষার খাতায় বমি করে দিয়ে প্রচুর নম্বর আনা, এই তো তাদের কাজ। যেমনটা আশ্রমগুলি করেছে। আর যাই তারা ভালো নম্বর করলো, অমনি কাটাকুটি খেলা ছাত্ররা, টিচার ছেড়ে, ওই ফাস্ট বেঞ্চারদের, যারা প্রচুর নম্বর এনেছে, তাদের নোট জেরক্স করতে থাকলো।
রমেনদা সেই কথায় মুখটিপে একটা তৃপ্তিদায়ক হাস্য হেসে বললেন – সমস্যা তো জানা গেল, এবার সমাধান?
রিমি – অপেক্ষা, অপেক্ষা তাদের বোঝার, যারা বুঝেছিলেন বুঝতে পারেন নি, আর সেটা বুঝে বোঝার চেষ্টা করছিলেন। … ফাস্ট বেঞ্চাররা ডাক্তার হন, ইঞ্জিনিয়ার হন, এর থেকে অধিক কিছু হতে পারে না তারা। কাটাকুটি খেলা ছাত্ররা, সেই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা তৈরি করা ফার্মে কর্মচারী হন। কিন্তু যারা বুঝতে সচেষ্ট ছিলেন, তাঁরা হন এন্টারপ্রিনার, বৈজ্ঞানিক, ঐতিহাসিক, লেখক বা দার্শনিক, অর্থাৎ তাঁরাই ভবিষ্যতের নির্মাণ করেন।
রমেনদা – হুম, সে তো বুঝলাম; কিন্তু উপায় কি?
রিমি – ওই যে বললাম, অপেক্ষা। … যারা সেই বোঝার চেষ্টা করার জন্য জীবনকেই অর্পণ করে দিয়েছেন, তাঁদের কেউ না কেউ তো বুঝতে পারবেন। যখন তাঁরা বুঝতে পারবেন, তখন তাঁদের কর্মকাণ্ডের উপর নির্ভর করছে, আগামী পদক্ষেপ কি হবে। … অর্থাৎ, যিনি বুঝে এন্টারপ্রিনার হয়ে গেলেন, তিনি সমস্ত কিছু বুঝে সেই শিক্ষাকে ধন-আদি ভ্রমের উপার্জনের পথ করলেন। তাই তাঁর আশেপাশে তাঁদেরকে জগদম্বা জমায়েত করাবেন, যারা তথৈবচ উপায়ে ধন উপার্জনের ইচ্ছা রাখেন না। … আর তাঁদের মধ্যে যাদের এই ভাবনা থাকবে যে তিনি বুঝে গেছেন, তাই যারা বুঝতে চান, তাঁদেরকে তিনি বোঝাবেন, তখন সেই তাঁদেরকে জগন্মাতা একত্রিত করেন উনার কাছে, যারা সেই বোঝার জন্য জীবনপ্রাণ এক করে দিয়েছেন।
রমেনদা – কেন? জীবনপ্রাণ এক করে দেওয়া মানুষই কেন? এমন তো অনেকেই আছেন, যারা সেগুলি বুঝতে চাইছেন, কিন্তু তাঁরা জীবনপ্রাণ এক করেননি?
রিমি একটু হেসে – আপনি আমাকে বাজিয়ে নিচ্ছেন কাকু। ঠিক আছে। … ঠাকুরেরই কথা বলি তবে। মাছিকে ভাতের হাড়িতে রাখলে হেদিয়ে হেদিয়ে মরে যায়। … ঠাকুরেরই কথা, মৌমাছি মধু না পেলে, অনাহারে মরে যায়; কিন্তু মাছি সন্দেশেও বসে, মধুও খায়, আবার বিষ্ঠাতেও বসে। … কাকু, যারা মাছি, তারাও মধু খেতে চায়। কিন্তু চাইলে কি হবে, তাদের মনে যে কি পেলাম, কি দিলাম, কত সম্মান পেলাম, কত সম্মান দিলাম, এই সমস্ত অহেতুক হিসাবমিকাশ চলতে থাকে, আর তারফল তারা হয়ে থাকে চঞ্চল; তাই মধু খেয়ে মধুর উপরেই পরে মরে যায়। …
রিমি আবার বলল – ঠাকুর বলতেন, শুদ্ধ আত্মা চাই। … অর্থাৎ মৌমাছি, যারা বোঝার জন্য জীবনপ্রাণ এক করে দিয়েছেন। যারা সমস্ত কাজের ফাকে ফাকে মূর্তি করে, তাঁদের মূর্তির কখনো মুখ ব্যাকা হয়, তো কখনো হাত ছোটো হয়। … কিন্তু যারা মূর্তিকার, সর্বক্ষণ সেই মূর্তিনির্মাণই যাদের ধ্যানজ্ঞান, তারা যখন খালি বসে থাকে, তখনও মূর্তির ছাঁচ তৈরি করে। … কাকু, যেই পাত্রে জল ঢালা হচ্ছে, জল যতই শুদ্ধ হোক, সেই পাত্রই যদি নোংরা হয়, তবে জল তো নোংরা হয়েই যাবে, তাই না! … তাই শুদ্ধ জল যেমন দরকার, তেমন শুদ্ধ পাত্রও আবশ্যক।
রমেনদা – তাহলে কি করা উচিত?
রিমি – প্রথম নিজেকে শুদ্ধ পাত্র করে তোলা উচিত। ঠাকুর বলতেন কামিনীকাঞ্চন। মনে সামান্যও কামিনীকাঞ্চনের চিন্তা থাকলেই অশুদ্ধি। অর্থাৎ, কনো প্রকার কামনা, না সুখের কামনা না যশের, না আমাকে কেউ বুঝবে, সেই ভাবনা, কনো প্রকার কামনাই যার মনে নেই; কাঞ্চন অর্থাৎ বিলাসিতা, যার মনে সামান্যও বিলাসিতা নেই; যার মন সম্পূর্ণ ভাবে শুদ্ধ, সম্পূর্ণ ভাবে ঈশ্বরের কাছে নিজেকে নিবেদন করতে প্রস্তুত, তেমনই আধার প্রয়োজন। …
রমেনদা একটু ক্লেরিফিকেশন চেয়ে ভ্রু কোঁচকালে, রিমি আবার বলল – অর্থাৎ, মনে কনো আনুসাঙ্গিক কথাই থাকবে না। না থাকবে, কি দিয়েছি, সেই হিসাব; না থাকবে কি পেয়েছি, সেই হিসাব। না থাকবে আমার কথা কে শুনলো, সেই হিসাব; না থাকবে কে আমার কথা শুনলো না, সেই হিসাব। না থাকবে আমাকে কে সম্মান করলো, তার হিসাব; আর না থাকবে আমাকে কে অপমান করলো, তার হিসাব। … মান, সম্মান, চাওয়া, পাওয়া, এই সমস্ত কিছু তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যাবে, তবেই সে শুদ্ধ আধার হলো, কারণ তাঁর মন একাগ্র হলো, যা যেকোনো জায়গায় এবার বসানো যেতে পারে।
রমেনদা কনো কথা না বলে রিমির কথা শুনতে থাকলেন। রিমি বলতে থাকলো – অনেকটা শিলনোড়াতে পোস্ত বা বাটনা বাটার মত।… ছড়িয়ে যায়, আবার গুছিয়ে নিতে হয়, তারপর আবার পিষতে হয়। মন যদি এদিক সেদিক, অর্থাৎ চাওয়া পাওয়া, মানসম্মান, ধনউপার্জন, ভালোলাগা না লাগা, এই সমস্ত কিছুতে ছড়িয়ে থাকে, তবে মন একত্রিত কি করে হবে? আর যদি একত্রিতই না হয়, তবে শিল যতই কাটানো থাকুক না কেন, নোরা কি তা পিষতে পারবে?
রমেনদা – বেশ তুমি নিজেকে এই ভাবে শুদ্ধ করে নিলে। তারপর?
রিমি – এবার বুঝতে হবে, যা কিছু বুঝিনি, সমস্ত কিছু বুঝতে হবে, এবং সমস্ত কিছুর সার নিষ্কাশন করতে হবে; ঠাকুরের কথা অনুসারে গোলমালের গোল বাদ দিয়ে মাল তুলে নিতে হবে। … মালে মালে মালাকার হয়ে গেলে, সেই মালা কাকে পরানো হবে, আর সেই মালা কে কে কিনবে, তাকে ভগবতীই প্রদান করে দেবেন। ব্যাস, তাঁকে সেই মালা পড়িয়ে দাও, আর তাদেরকে মালা বিক্রি করে দাও, কাজ শেষ।
রমেনদা – এই বিচার তুমি করবে কি করে?
রিমি – আর বিচার নয় কাকু। বিচার তাঁকে জেনে নেবার জন্য। একবার তাঁকে জেনে নিলে, আর বিচারে কি কাজ। ঠাকুর বলতেন না, যত আওয়াজ, পাতে নুচি পরার আগেই। … পাতে একবার নুচি পরে গেলে খালি সুপসাপ আওয়াজ, আর কনো কথা নেই। … একবার যদি মন বুঝে যায় যে, আমি নুনের পুতুল, সাগরে নামলেই আমি তলিয়ে যাবো, তাহলে সে তো কেবল সাগরের উপর সমর্পণ করে। আর সে কি কনো যোজনা, যাচনা বা কল্পনা করে? সাগরই নির্ধারণ করবে এবার সেই নুনের পুতুল দিয়ে কি করাবে সে। … ভগবতীকে জানতে মন দিতে হয়। তিনিই ঠিক করে দেবেন, আমার ভাবীকালে কি থাকবে। …
রিমি আবার বলল – ঠাকুর বলতেন না, বিড়ালছানা হতে। মা যেখানে রাখবেন, সেখানেই থাকবো। … যখন সেখানে থেকে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যাচ্ছে, এমন লাগবে, মিউ মিউ করে ডাকবো। … মা-ই সেখানে রেখেছেন, মা-ই সেখান থেকে সরাবেন। … নিজের ঠুনকো বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে, সুরাহা তো কিছু হবেই না, বরং মায়ের কাজ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। … মা এসে সেখানে খুঁজবে, যেখানে তিনি আমাকে রেখেছিলেন, আমি সেখান থেকে চলে গেলে, আমি যে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবো, তাই না!
রমেনদা – তুমি ঠাকুরের কথার এমন ধারণা কি করে করতে শিখলে?
রিমি – আপনার থেকেই। … বাবা আপনার থেকে কিছু জিনিস জেনে এসে বলতেন। সেই শুনতে শুনতে, সেই রকম করেই বিচার করতে শিখি। … অনেকটা একলব্যের মতন। … গুরুর চরণে না বসেই, গুরুর থেকে শিক্ষা অর্জন করতে থেকেছি।
রমেনদা – এরপর কি করার ইচ্ছা?
রিমি – বিড়ালছানা হয়ে থাকার ইচ্ছা। … জগন্মাতাকে সবেই অনুভব করতে শিখেছি। … তাঁকে হৃদয়প্রাণ দিয়ে অনুভব করতে চাই। … শুনেছি, তাঁর প্রেম সাগরের মত অগাধ। … সেই প্রেমকে প্রতিমুহূর্তে অনুভব করতে চাই। … সেই অনুভূতি যত অধিক হবে, ততই তাঁর প্রেম দেখে, নিজের প্রেম করার সামর্থ্যকেই তুচ্ছ মনে হবে, আর ততই পাগল হয়ে যাবো তাঁর প্রতি। … তিনি সর্বস্ব হয়ে যাবো, তিনি ময় হয়ে যাবো, এই ইচ্ছা বলতে পারেন।
রমেনদা – সে তো নিজের জীবনের প্রতি তোমার ইচ্ছা, অন্যত্র?
রিমি – ওই যে বললাম কাকু, বিড়ালছানা হবো। … তিনি যেখানে রাখবেন, সেখানেই থাকবো। তেমন ভাবেই থাকবো?
রমেনদা – বিয়ে থাওয়া? আর কনো প্রচারকর্ম?
রিমি – কাকু, তিনি বিবাহ দিলে, বিড়ালছানার মতই বিবাহ করবো। … যার সাথে তিনি বিবাহ দেবেন, নির্বিচারে তাঁরই অনুগামী হবো। … তিনি যদি প্রচারের স্থান দেন, শিক্ষার স্থান দেন, শিক্ষা প্রদানের আদেশ দেন, দেব; আর যদি শিক্ষা নেবার স্থান দেন, তাও নেব। … নির্বিচারে সমস্ত কিছু করবো কাকু। … আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই তাঁর থেকে। … শুধু তাঁকে জানতে জানতে, উন্মাদ হয়ে যাবার সাধ রইল। … তাও তিনি যদি চান তবেই হবে।
রমেনদাকে খুব তৃপ্ত লাগছিল। … এমন তৃপ্ত আমি উনাকে কনোদিনও দেখিনি। … সেদিনে আর তেমন বিশেষ কথা হয়নি। তবে আরো বেশ খানিকক্ষণ ছিলাম। … নিজের কন্যার জন্য খুব গর্ববোধ হচ্ছিল। … তবে একটা ভয়ও হচ্ছিল। একবার যদি ওর মা, এই সমস্ত কিছু জেনে যায়, তবে আর রক্ষে নেই। …
তবে ভয় আমার রিমিই কাটিয়ে দিল। … ট্রেনে ফেরার সময়ে রিমি নিজের থেকেই আমাকে বলল – ঠাকুর বলেন, সাধনা করতে হয়, কোনে, বনে, মশারির মধ্যে। … বাবা, নিশ্চিন্তে থাকো, যদি জগন্মাতা না চান, তবে আমার গর্ভধারিণী টেরও পাবেন না যে, আমি সাধন করছি। … মা-বিড়াল না চাইলে, তাঁর ছানাকে দেখার ক্ষমতা কারুর কি আছে?
রিমি এতো বড় হয়ে গেল কবে? বাবার মনের কথা বুঝে নিচ্ছে, তাও একটা দুটো নয়, সমস্ত, অনর্গল ভাবে! … আমার মনে দ্বিতীয় ভয় এসে দানা বাঁধতে শুরু করে। … মেয়ে বড় হয়েছে। বিয়ে দিতে হবে। কে হবে ওর স্বামী? আমার এই ফুলের মত মেয়েটাকে সে যত্ন নিতে পারবে তো?
রিমি কি অন্তর্যামী হয়ে গেছে নাকি? আমার মনের কথা সমস্ত জানতে পারছে কি করে ও? আমার প্রশ্ন আমার মনেই ছিল, কিন্তু ওর থেকে প্রত্যক্ষ উত্তর এলো – বাবা, স্বামী ও স্ত্রী, পৃথক পৃথক হননা। একই মূর্তির সামনে আর পিছন হন। একজন আগে যান, অন্যজন সাপোর্ট দেন। … তাহলে তুমি কেন চিন্তা করছো? … তাঁর যদি আমাকে তাঁর কাছে টানার হয়, যেই ভাবে তিনি আমাকে টানতে পারবেন, আমার স্বামীও সেইরূপই হবে। …
আমার মন শান্ত হয়নি, তাই আবার বলল রিমি – যদি আমার মধ্যে কনো সুপ্ত বিকার থেকে থাকে, সেটা থাকলে তো আর তাঁর কাছে আমি যেতে পারবোনা। পারবো কি! … তাই আমার স্বামীর মধ্যে দিয়ে আমার সেই বিকারকেই সামনে এনে দেবেন তিনি, আর আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবেন, আমার মধ্যে কি কি বিকার রয়েছে, যার জন্যে তিনি আমাকে গ্রহণ করতে পারছেন না। … তাই বাবা, স্বামী যে সুচরিত্রের হবেন, সেটা আবশ্যক নয়। আবশ্যক এই যে, স্বামীর মধ্যে সেই সেই বিকার থাকবে, যা আমারও বিকার, কিন্তু আমি সেই বিকারগুলি যে আমার মধ্যে রয়েছে, তা স্বীকার করছি না।
রিমি যতই বলুক, আমার মন যেই ভয় পাচ্ছিল, তাই হলো। ওর মা, আমার সাথে মেয়েকে থাকতে দেখে, বেশ বুঝে গেছে, মেয়ের মতিগতি কোনদিকে যাচ্ছে। সেটা জানলাম, দুইদিন পরে। বিকালে একটু এদিক সেদিক ঘুরে আস্তে গেছিলাম। রিমির ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তা হচ্ছিল, তাই মনকে শান্ত করতে সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়িতে গেছিলাম। সেখান থেকে ফিরে আসার সময়ে, আমার বাইকটা একটু খারাপ হয়। কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছিল না। … বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছি; তার উপর পরের দিন রবিবার আছে। সকাল সকাল গ্যারেজে নিয়ে গিয়ে গাড়ি সারাই করিয়ে নেব, এমন ভেবে আমি গাড়িটাকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়েই পাড়ার মোর থেকে আনছিলাম।
ক্লান্ত হয়ে গিয়ে, বাড়ির গেটটা কনোভাবে আস্তে করে খুলে, গাড়িটা স্ট্যান্ডের উপর দাঁড়করিয়ে, গ্যারেজের চাবিটা পকেটে হাতড়াচ্ছিলাম। সেই অবস্থায় আমার ছোটো শ্যালিকার কণ্ঠস্বর শুনে একটু থমকে গেলাম। আমার স্ত্রী আর সে কথোপকথন করছে। আমার স্ত্রী বলছেন – তোর জামাইদাদাকে চিনিস তো, মাথায় আধ্যাত্মিকতার ভুত ভর করে সময়ে সময়ে। … রিমিটা ওর বাবার সাথে সবসময়ে থাকে। ওর মধ্যেই একটা অদ্ভুত শান্ত ভাব আমি বেশ কিছু বছর ধরে দেখছি। … সমানে সেই শান্ত ভাব বেড়ে যাচ্ছে। সমানে মন অন্তর্মুখী হয়ে যাচ্ছে। … আমার মেয়েকে খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে হবে বুনি (আমার শ্যালিকা) … আর দেরী করলে, ওর মন যদি সত্যি সত্যি পুরোপুরি অন্তর্মুখী হয়ে যায়, তবে কি হবে বুঝতে পারছিস!
আমার শ্যালিকা – দেখছি তাহলে পাত্র। … ঠিকই বলেছিস, আমিও রিমিকে বেশ কিছু বছর ধরে দেখছি, সকলের সাথে কথাবার্তা যেন ওর ঢং। … বলতে হয়, তাই বলে। … আসলে যেন মনের মধ্যেই ঢুকে থাকে সবসময়ে। … কেমন ছেলে দেখবো দিদি!
আমার স্ত্রী – ইঞ্জিনিয়ার দেখ। … ইঞ্জিনিয়ার মানে সম্পূর্ণ বার-মুখি, যান্ত্রিক তাই মনের খেয়াল রাখেই না, কেবলই যন্ত্রের, ধন, সম্পদের খেয়াল। … সেই রিমির জন্য ঠিক হবে। রিমির ওই অন্তর্মুখী মনের সেরা ওষুধ হবে।
আমার শ্যালিকা – কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হবেনা তো? … রিমি কিন্তু অত্যন্ত চাপা স্বভাবের। … দুঃখকষ্ট আর বেদনা সইবার আশ্চর্য ক্ষমতা আছে ওর মধ্যে। … মাঝে মাঝে তো আমার এমন লাগে যেন, এই সমস্ত কিছু ওকে ছুতেও পারেনা। … তাই এমন হবে না তো, রিমির জীবনটা নরক হয়ে যাবে? যদি হয়ও, রিমিকে আমি চিনি। ও কিন্তু সাতচরে রাও কাটবেনা। … চুপচাপ সয়ে নেবে।
আমার স্ত্রী – হুম, সইতে হবে বইকি। … অসব অন্তর্মুখী হওয়া যাবে না। তার জন্য যদি দুঃখ সইতে হয়, সইতে হবে। এখন আমাদের কঠোর হতে হবে। যদি এখন কঠোর না হতে পারি, তবে কনদিন শুনবো, আমাদের মেয়ে বিবাদী হয়ে গেছে।
আমার শ্যালিকা – দিদি, একবার ভালো করে ভেবে দ্যাখ। … মানুষ যদি নিজের ইচ্ছার ধারা প্রবাহিত হতে থাকে, তবে সামান্য এদিক সেদিকের জিনিস সইয়ে নেয়। কিন্তু যদি সেই সহনশক্তির বাঁধ ভেঙে যায়, তখনই কিন্তু মানুষ বিবাদী হয়। … তুই যেমন বলছিস, তেমন অনুসারে আমরা রিমির বিবাদী হওয়াকে আটকাচ্ছি নাকি ওকে বিবাদী হতে বাধ্য করছি!
আমার স্ত্রী – পড়াশুনা জানে, চাকরি করে। তাছাড়া, বেশ ফরসা, আর রূপ ওর বাবার মতই পেয়েছে, বেশ সুন্দরী। এক কাজ করনা, কনো ভালো বা বড় ব্যবসাদার পাবি না! … প্রচুর পয়সা, চাকরবাকর সব মিলিয়ে এমন মহারানী করে রেখে দেবে ওকে যে, ওর মন বহির্মুখী হতে বাধ্য হবে।
আমার শ্যালিকা – এটা বেশি ঠিক দিদি। … মনের উপর চাপ দেওয়া ঠিক নয়। … ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি না মনের উপর বেশি চাপ দেওয়া হয়ে যাচ্ছিল। কিছু হারানো তখনই যায়, যখন সেই হারানোর পরিবর্তে কিছু পাওয়া সম্ভব হয়। … অন্তর্মুখী মন ছিনিয়ে নিলে, বৈভব দিতে হবে। … দাঁড়া দিদি। … মেজ জামাইদাদা ব্যবসা করে তো। ওর অনেক ব্যবসাদারের সাথে আলাপ। … ওকে বলে দিই। যোগার হয়ে যাবে। চিন্তা করিস না।
