তৃতীয় পর্ব – প্রথম ধ্যান
পরের একটি সপ্তাহ বেশ ভালোই কাটল; স্ত্রীও ডাক্তারের ফরমাইশ বলে বিরক্ত করে নি। আলাদাই ঘুমাচ্ছিলাম। রাত্রি ১১টার মধ্যে ঘুমিয়ে পরছিলাম; ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে রোজই ঘুম ভাঙছিল। চাকরিতে যাচ্ছিলাম ১১টার মধ্যে, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে ফিরে আসছিলাম। আর রাত্রে ১০টার মধ্যে শুইয়ে পরে, রমেনদার কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ১১টার মধ্যে ঘুমিয়ে পরছিলাম।
সমস্যা শুরু হলো এক সপ্তাহ পর থেকে। স্ত্রী এবার বলতে শুরু করে দিল, আর কতদিন লাগবে? মুখে এসে গেল বলি, অনন্তকাল। কিন্তু না, রমেনদার কথাগুলো মনে পরে গেল। ঠাকুরের কথার রেশ ধরে বলেছিলেন উনি, কি করছ, কারুকে জানতে দেওয়া যাবেনা। জানলেই গরুছাগলে তোমার ছোট্ট চারাগাছটা মুরিয়ে চলে যাবে। গোপনে সাধন কর। তাই বললাম, মাস খানেক এমন অভ্যাস করতে বলেছে ডাক্তার।
স্ত্রীর কথাটা পছন্দ হলো না। সে বলে, একটা অন্য ডাক্তার দেখাচ্ছ না কেন? আমি উত্তরে বললাম, এই ডাক্তার ওষুধ দেয়নি কিছু, তারপরেও ভালো আছে, এতে ক্ষতি কি হচ্ছে! মানুষের স্বভাব, যেমন রমেনদা বলেন, একদমই ঠিক বলেন। নিজের ইচ্ছামত হলে, হলাহলও অমৃত, আবার ইচ্ছা অনুসারে না হলে, অমৃতও হলাহল। স্ত্রীর কাছে আমার এই আলাদা শোয়াটা ক্রমশ অপ্রীতিকর হতে শুরু করলো।
আমারও রাত্রে ঘুম আগের মত তাড়াতাড়ি আসা বন্ধ হয়ে গেল। বেশ কিছুদিন বিছনাতেই এদিক সেদিক করতে থাকলাম। ঘুম আস্তে আস্তে রাত দুটো বেজে যাচ্ছে, আর সকালে ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সেই ৭টা বেজে যাচ্ছে। কিছুদিন অপেক্ষা করে, রমেনদাকে একদিন অফিস ফেরতা একটা ফোন করে বললাম সমস্ত কথা। উনি বললেন – ভাই, সময়ের অপচয় করো না। তোমার ইচ্ছামত সমস্ত কিছু হলো না হলোনা, সেটা বড় ব্যাপার নয়। বড় ব্যাপার হলো তাঁর ইচ্ছামত তুমি চলতে পারছো কিনা, সেটা। … তিনি যখন দেরি করে ঘুম আনছেন, তখন সেই সময়টা তাঁর চিন্তাতেই কাজে লাগাচ্ছনা কেন?
কথাটা আমার মনে ধরলো। আমি সেইরাত্রেই আধশোয়া হয়ে জগন্মাতার চিন্তা করতে থাকলাম। রমেনদার থেকে পুরাণের সাররূপে, আর ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের কথা রমেনদার মুখ থেকে, যেটুকু জেনেছি, সেখান থেকে এই জেনেছি যে, যিনিই ব্রহ্ম, তিনিই শক্তি। অব্যাক্ত নিরাকার তিনিই, আমাদের উদ্ধারের হেতু সাকার। তিনিই সকলের শক্তি, সকলের বিদ্যা, সকলের শ্রী, সকলের সমস্ত সামর্থ্য। … সকলের নিজের নিজের সামর্থ্যকে অন্য অন্য নাম দিচ্ছেন, কিন্তু সেই সকল সামর্থ্য উনিই। একই বিদ্যুৎকে এসি, ডিসি, হাই ভোল্টেজ, লো ভোল্টেজ বলছি, আসলে সমস্তই সেই একই বিদ্যুৎ। … ধারকের অনুসারে ভেদ। …
এই সমস্ত নিয়ে ধারনা করতে করতে, কখন যেন হারিয়ে গেলাম। বেশ কিছু সেকেন্ড পরে আবার ফিরে এলাম। যেন এতক্ষণ আমি ছিলামই না। আমার জীবন থেকে সেই কয়েক সেকেন্ড যেন কেটে বাদ চলে গেল। কিন্তু তাতে আমার কনো দুঃখ নেই, বরং এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করলো। কি হলো এটা? এমন তো, এর আগে কনোদিনও হয়নি! … রমেনদাকে এর কথা বলতে হবে; উনিই আমার জানা একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এই অনুভবের সত্যতা আমাকে বলতে পারেন।
ঘুমিয়ে পরলাম, সকাল ৬টার মধ্যে ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম খুবই ভালো হয়েছে, চোখমুখ পুরো ফ্রেস। কিন্তু রমেনদাকে সমস্ত কথা বলার জন্য মনটা হুহু করছে। আমি পায়ে স্যান্ডালটা গলিয়ে, হাতে ফোনটা নিয়ে বাইরে চলে গেলাম। স্ত্রী সন্তান সকলেই ঘুমাচ্ছেন। এখনো তাঁদের ঘুম ভাঙতে এক ঘণ্টা দেরি তো বটেই। বাড়ির থেকে একটু দূরে একটা ঝিল আছে। সেখানে গিয়ে রমেনদাকে ফোন করলাম আর সমস্ত কিছু বললাম। তিনি বললেন – ধ্যান হয়ে গেছিল তোমার।
আমি – ধ্যান হলে এমন হয়?
রমেনদা – হ্যাঁ ভায়া, ধ্যান মানে সত্যে প্রত্যাবর্তন, স্বরূপের আভাস লাভ হয় তাতে। … আর আমাদের স্বরূপ হলো ব্রহ্ম, অর্থাৎ মহামহা শূন্য, এমন শূন্যতা যেন কনো কিছুই কনোকালেই ছিলোনা। কিছু আছে, সেটাই হলো শ্রেষ্ঠ ভ্রম; ঠাকুর বলতেন অনিত্য। মিথ্যা বলতেন না, কারণ ভ্রম হলেও, সেই ভ্রমের জন্ম দিচ্ছে শূন্যই, অর্থাৎ ব্রহ্মই; তাই সত্যের থেকে জাত কনোকিছু মিথ্যা কি করে হতে পারে, সেই কারণে তিনি একে অনিত্য বলতেন। … কিন্তু নিত্য বা সত্য তো সেই শূন্যই, যেই শূন্যে তুমি কাল রাত্রে কিছুকষনের জন্য চলে গেছিলে।
আমি – সেই কারণেই কি, এমন শূন্যতার পরেও একটা অনাবিল, অযাচিত, আর অনাকাঙ্ক্ষিত আনন্দ হচ্ছিল!
রমেনদা – হ্যাঁ ভায়া, পরমসুখ, পরমানন্দ একেই বলে। সমস্ত ভজন, কীর্তন, ইত্যাদি করাই হয়, এই উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে পদার্পণ করতে হলে যে জগন্মাতার প্রেম ছাড়া উপস্থিত হওয়া যায়না। ধ্যানে বসলেও ধ্যান হয়না, হাজার কীর্তন করলেও ধ্যান হয়না। তিনি যতক্ষণ না চাইবেন, ততক্ষণ কিচ্ছু হবেনা। আর তিনি তখনই তা চাইবেন, যখন আমরা সমস্ত ভ্রম থেকে মুক্ত হতে চাই। ভক্ত যদি ভক্তিবিলাসকেই সর্বস্ব জ্ঞান করেন, তখনও তিনি সেই দ্বার খোলেন না; ভক্ত যদি জ্ঞানসর্বস্ব হয়ে থাকেন, তবুও তিনি সেই দ্বার খোলেন না। … ভক্তের মনে যখন ঠিক ঠিক এমন বোধ হয়ে যায় যে, সমস্তই ভ্রম, সমস্ত নাম, গুণ, রূপ, রঙ, সমস্তই ভ্রম, তখনই তিনি সেই দ্ব্বার খুলে, ভক্তকে পরমসত্যের আভাস প্রদান করেন।
আমি – দাদা, আর আমার চাকরি বাকরি করতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু ছেলেমেয়ের পড়াশুনা আছে, পয়সা তো দরকার। তাই অগত্যা! … পরশুরাত্রে ইচ্ছা হচ্ছিল, সমস্ত ছেড়েছুড়ে সন্ন্যাস নিয়ে নি। … জানিনা কতদিন আর সংসারের জ্বালা সইতে হবে!
রমেনদা হেসে উঠে বললেন – সংসার এক মজার কুটি, আমি খাই দাই আর মজা লুটি। … ভায়া, সাধন করো, সংসার এক মজার কুটি হয়ে থেকে যাবে। আর মন তাঁর চরণে চলে যাবে।… সংসার হলো রণক্ষেত্র ভায়া, রিপুপাশ, ইন্দ্রিয়াদি, পঞ্চভূত আর ত্রিগুণ এখানে কুরুক্ষেত্রের আকারে যুদ্ধে রত। … সন্ন্যাস নিয়ে রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেলে, যুদ্ধ জয় করবে কি করে?… আর যুদ্ধ করতে গেলে, তবেই না কৃষ্ণসান্নিধ্য লাভ করবে। …
আমি – তবে কি সন্ন্যাস নেওয়া উচিত নয় ?
রমেনদা – তিনি আদেশ দিলে তবেই। … গুরুমুখ দিয়ে তিনি আদেশ দেন সন্ন্যাসের, আবার অবতারদের, অর্থাৎ যাদের উপর গুরুর আদেশ বর্তায় না, তাঁদেরকে তিনি স্বয়ং স্বপ্নাদেশ দেন। … শ্রীচৈতন্যকে তিনি স্বপ্নাদেশ দিয়ে সন্ন্যাস নিইয়েছিলেন, আবার নরেন্দ্রনাথকে তিনি গুরুমুখ অর্থাৎ ঠাকুরের মুখদ্বারা আদেশ দিয়েছিলেন সন্ন্যাসের। … সন্ন্যাস সাধনের জন্য নয় ভায়া, সন্ন্যাস ঈশ্বরের কর্ম করার জন্য। যার যখন ঈশ্বরের কর্ম করার জন্য সন্ন্যাসের প্রয়োজন হয়, ঈশ্বর তখনই তাঁকে সন্ন্যাসের আবাহন করেন। … বাকি যারা, স্বেচ্ছায় সন্ন্যাস নেন, এককথায় সময়ের অপচয় করেন, আর যেই কর্তাবোধ থেকে তাঁদেরকে মুক্ত হতে হতো, সেই কর্তাবোধকেই তাঁরা নতুন নামে বরণ করে নেন।
আমি – কিন্তু সংসারে থেকে সাধন করার সময়! … আমি ধরুন একটা ক্লার্কের চাকরি করি, সময় পেয়ে যাই। কিন্তু যারা প্রাইভেটে কাজ করেন, বা যারা ধরুন সরকারি বড়কর্তা, তাঁদের হাতে তো সময়ই নেই। তাঁরা সাধন করবেন কি করে?
রমেনদা একটু হেসে নিয়ে ফোনেই বললেন – ভায়া পবিত্র, এই ভ্রমের সঞ্চার আমরাই করেছি, তাই এই ভ্রম থেকে যে আমাদেরকেই তীরে যেতে হবে। যার মধ্যে সাধনের ইচ্ছা জাগবে, তার জীবন ততই ওষ্ঠাগত হয়ে উঠবে। কারণ? কারণ হলো তাঁর রিপুপাশ তত বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে তার প্রতি। একদম সময় পাবে না সে। কিন্তু তার মধ্যেই তাঁকে সময় বার করে নিতে হবে, সাধন করার। ঠাকুর কি বলতেন মনে আছে তো, পোয়াতি মেয়েমানুষের কাজ কমিয়ে দেন শাশুড়ি।
আমি – বুঝলাম না, একটু খুলে বলুন। আমি কি যাবো আপনার কাছে? ফোনে এত কথা হয়না।
রমেনদা সম্মতি দিতে, অফিস বাঙ্ক মারলাম। স্কুলে যৎসামান্যই বাঙ্ক মেরেছি, কলেজেও অত্যন্ত কমই বাঙ্ক মেরেছি। এখন অফিস বাঙ্ক যে আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে, এমন সত্যিই ভাবিনি। … তবে খুব আনন্দ হচ্ছিল, ঈশ্বরের জন্য বাঙ্ক মারছি। … ঈশ্বরের জন্য কিছু করছি, এটা ভাবলেই, মনে হতে শুরু করেছিল যে জীবনটা সার্থক হয়ে যাচ্ছে আমার।
রমেনদার কাছে গেলাম সেইদিনই। সরাসরি প্রশ্ন করলাম, পোয়াতি মেয়েমানুষের কথাটা একটু বিস্তারে বলুন দাদা।
রমেনদা – ঠাকুরের অনবদ্য কথার মধ্যে একটি। … মহাগুহ্য কথা ভায়া। … কথাগুলোকে একটু গভীর ভাবে অনুধাবন করো। … পোয়াতি মেয়েমানুষের কাজ কমিয়ে দেন শাশুড়ি। … এর মানে কি বুঝলে? সন্তানলাভের চেষ্টা করলে, শাশুড়ি কাজ কমায় না। পোয়াতি হলে, তবেই শাশুড়ি কাজ কমান। … এর মানে বুঝলে?
আমি – না, এখনও ঠিক করে বুঝিনি।
রমেনদা একটু মুচকি হেসে বললেন – পোয়াতি মানে হলো, ফললাভ। … যখন সাধনের ফললাভের সময় হয়, তখনই শাশুড়ি মানে ভগবতী কাজ কমিয়ে দেন। তার আগে নয়। এর মানে এই যে, সাধন করার কালে, তোমার কাজ তিনি কমিয়ে দেবেন না। সমস্ত ব্যস্ততা অতিক্রম করেই, তোমাকে সাধন করতে হবে। … যত অধিক সাধন করবে, তত বেশি ব্যস্ততা দেবেন তিনি। একসময়ে এমনও মনে হবে যে, কি করে সাধন করবো? এত কাজের চাপে কি সাধন করা যায়? … কিন্তু ওই সেই আগের কথাই, কচ্ছপ জলে চড়ে বেড়াবে, কিন্তু মন পরে থাকবে আড়ায়, যেখানে ডিমগুলো আছে।
আমি – মানে, যত কাজের চাপই বাড়ুক, মনে রাখতে হবে, সেই সমস্ত চাপই আমারই কর্মের ফল। মানে এক সময়ে এই ভ্রমের জগতে ডুবে যাবার চেষ্টা করেছিলাম, তাই আজ সেই কর্মের ফল পাচ্ছি। … মনে রাখতে হবে যে, এই সমস্ত কাজ হলো মালিকের বাড়ির কাজ; এখানে মুখেই খালি আমার রাম, আমার শ্যাম করতে হবে, কিন্তু মন পরে থাকবে, গ্রামের বাড়িতে, যেখানে নিজের রাম, শ্যাম আছে। … মানে এককথায়, সমস্ত কাজ করতে হবে, কিন্তু মনে রাখতে হবে যে সেই সমস্ত কাজ অহেতুক, সমস্তই ভণ্ডামি, বা সমস্তই ফালতু সময় নষ্ট করা। সেই কাজ যাই হোক না কেন, তা কারুকে বিদ্যাদান হোক, বা দেশ শাসন হোক, বা কারুকে সরকারি অনুদান দেওয়ার কাজ হোক, সমস্তই ভ্রমের ইঁদুরদৌড়, এটা ভুললে চলবেনা।
রমেনদা – একদমই তাই। যদি এমন করতে পারো, তবেই মন সাধন করতে থাকবে। … নাহলেই, অফিসের সাহেব কিছু করতে বললে, মন সেই কাজে মেতে উঠবে। … হাত সেই কাজ অবশ্যই করবে, কিন্তু মন জানবে, সমস্তই নাটক। … এমন অভ্যাস করতে করতে, যখন সেই অবস্থায় মন উন্নত হয়ে যাবে যেখানে পৌঁছে মন জানে একমাত্র ঈশ্বরই সত্য, একমাত্র কারুকে ঈশ্বরের সাথে আলাপ করানই কর্ম, বাকি সমস্তই অপকর্ম যা ভ্রমের আগুনে ঘি ঢালা কেবল, তখনই সাধন সম্পূর্ণ হলো, আর তখনই সাধনের ফল লাভের সময়। … যখন সেই ফল লাভের সময় হবে, তখনই শাশুড়ি কাজ কমিয়ে দেবেন। তার আগে নয়।
আমি – তার আগে পর্যন্ত একহাতে ঈশ্বরকে শক্ত করে ধরে রেখে, অন্য হাতে ভ্রমের কাজ করে যেতে হবে। যখন ফল লাভের সময় হবে, তখন দুই হাতে ঈশ্বরকে ধরতে হবে। … এইটাই ঠাকুর বলেছিলেন! … কিন্তু সময়! … সময় কি করে পাওয়া যাবে? আর যদি সময় পাওয়াও যায়, একাকীত্ব কি করে পাওয়া যাবে? যতই মনের মধ্যে সেই কথা চলুক, একটু সময় তো নির্জনে থেকে, তাঁর কথা চিন্তন করতে হবে! কাজ করতে করতে সেই চিন্তন করলে তো আর ধ্যান হয়ে যেতে পারবে না!
রমেনদা হেসে বললেন – সঠিক বলেছ। তবে নির্জনতা মানে, যেখানে কেউ নেই, এমন স্থান নয়। যেখানে কেউ নেই, সেখানে তো তুমিও নেই। সেখানে তুমি যাবেও না, আর গেলেও থাকবে না, আর থাকলেও তাঁর স্মরণ করবে না। …
আমি – তবে নির্জনতা কি করে পাবো?
রমেনদা আবার একটু হেসে বললেন – ফোন না থাকা মানেই কি নির্জনতা ভায়া? ফোন সুইচ অফ মানেও তো সেই একই নির্জনতা, তাই না?
আমি একটু কথার অনুধাবন করে বললাম – মানে যেই সময়ে সকলেই আছেন, কিন্তু সকলে সুইচ অফ, সেটাই নির্জনতা! … মানে তো, যখন সকলে ঘুমাচ্ছেন, সেটাই নির্জনতা! … হ্যাঁ, আমার ধ্যানও তো সেই সময়েই হয়েছিল। এর মানে রমেনদা, আমাকে আমার ঘুম থেকে সময় কেটে বার করতে হবে। … যদি সাধনের ইচ্ছা হয়েই থাকে, তবে আমাকে সময় দেবেন না জগন্মাতা, আর শুধু তিনি কেন, আমার রিপুপাশ ইন্দ্রিয়ও আমাকে শশব্যস্ত করে রাখবে সর্বক্ষণ। যেই কাজই করি আমি, সমস্ত কাজই অহেতুক, এটা স্মরণ রেখে, সেই কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়া থেকে আটকে রাখতে হবে। আর তারপর যখন সকলে ঘুমাবে, তখন নিজের নির্জনবাসকে নিশ্চিত করতে হবে। … হ্যাঁ দাদা, ঠিক বলেছেন, যেই কাজ করছি, সেই কাজকে যতক্ষণ না ফালতু সময় নষ্ট মনে হচ্ছে, ততক্ষণ কিচ্ছু হওয়া সম্ভব নয়।
রমেনদা আমাকে পরীক্ষা করার জন্যই প্রশ্ন করলেন – কেন, এমন কেন বললে ভায়া?
আমি – আসলে, যদি যেই কাজ করছি, সেই কাজকে সামান্যও গুরুত্ব প্রদান করে দেয় আমাদের মন, তাহলে যখন নির্জনে থাকি, তখনও সেই কাজের আনুসাঙ্গিক ব্যাপারই মনে উঠে আসে। … তবে যেই মুহূর্তে সেই সমস্তই অহেতুক সময় নষ্ট করা মনে হয়, সেই মুহূর্ত থেকেই, যাই সেই কাজ শেষ, তাই সেই কাজ সম্বন্ধনিয়, সমস্ত ভাবনারও সমাপ্তি। অর্থাৎ মন সম্পূর্ণ ভাবে শূন্য হয়ে গেল।
রমেনদা এবার হেসে বললেন – তাহলে কি বুঝলে ভায়া, সন্ন্যাস নেবে?
আমি – তিনি আদেশ দিলে অবশ্যই নেব। যেই অবস্থায় থাকবো, সেই অবস্থাতেই নেব। কিন্তু তার আগে নয়। সন্ন্যাস নিয়ে সাধন অসম্ভব। সন্ন্যাস তাঁর কাজ করার জন্য প্রয়োজন পরে; সাধন করতে হলে সংসার আবশ্যক। সংসারই হলো রিপুপাশদের কুরুক্ষেত্র; আর সেখানেই যুদ্ধ করে সমস্ত কৌরবদের পরাজিত করতে হবে। তবেই একচ্ছত্র সম্রাট হওয়া সম্ভব হবে। আর যিনিই সেই যুদ্ধ করতে তৎপর হন, তাঁর সাথেই জগন্মাতা তাঁর চেতনাপ্রকাশ অর্থাৎ কৃষ্ণরূপে সেই ব্যক্তির সঙ্গ দেন। …
রমেনদা – কিন্তু তোমাদের যা কাজ! … সরকারি অনুদান প্রদান করা! কত মানুষের সুরাহা করার কাজ, সেটা, তাই না!
আমি – না দাদা, বুঝে গেছি। … ভ্রম এই অস্তিত্ব; আর সেই ভ্রম অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই জয়যাত্রা। সেই জয়যাত্রা কি করে কল্যাণময় হতে পারে দাদা! … সেই অনুদান যে সকলকে কেবলই পরমুখাপেক্ষী করে তুলছে, শুধু তাই নয়; শুধুই যে ভোটব্যাঙ্ক ঠিক করা হচ্ছে, তাই নয়। উপরন্তু, যেই অস্তিত্বই এক ভ্রম, সেই ভ্রমকে সত্য মানার যাত্রা এটি। যেই অনুদান ছাড়া চললে, এক সময়ে বিরক্ত হয়ে সেই সমস্তকিছুকে ভ্রম মানতে ইচ্ছা হত, অনুদান পাবার পর, সেই সম্ভাবনাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। … ভ্রমই সত্য মনে হচ্ছে। … না দাদা, বুঝে গেছি আমি।
রমেনদা – কি বুঝলে ভায়া!
আমি – নিদ্রা থেকে কেটে আমাকে সময় আর নির্জনতা বার করতে হবে। সেই দিয়ে সাধন করে, মনকে সমস্ত ভ্রমজগতের থেকে মুক্ত করতে হবে। … যেদিন মুক্ত করতে পারবো, সেদিনই শূন্যতা আমার মধ্যে স্থান পাবে। ঈশ্বরও সেই মহাশূন্য। তাই শূন্যতাই তাঁর বীজ। আর সেই বীজ ধারণ করেই আমি হবো পোয়াতি। আর যেদিন পোয়াতি হবো, সেদিন আমার শাশুড়ি, অর্থাৎ জগন্মাতা আমার কাজ কমিয়ে দেবেন। …
রমেনদা এবার হেসে বললেন – বেশ তবে, সেই করো। … চলতে থাকো, এগিয়ে যাও ভায়া।
সেদিনের মত বারি ফিরে এলাম। আর রমেনদা যেমনটা বললেন, সেটি আগামী এক বছরে হারে হারে টের পেলাম। সমানে কাজের চাপ বাড়তে থাকলো। এতটাই কাজের চাপ বাড়লো, যে রাত্রে বালিশে মাথা ঠেকাতেই ঘুমিয়ে পরতাম। ঠিক ভোর ৪টে থেকে ৪টে ১৫র মধ্যে ঘুম ভেঙে যেত। বাথরুম করে এসে, ঈশ্বরচিন্তা করতে থাকতাম। চিন্তা করতে করতে কনোকনোদিন ধ্যান হয়ে যেত, আবার কনোকনোদিন হতো না। ক্রমশ, সন্ধ্যায় বারি না ফিরে এসে, বাইক নিয়ে পাশে চন্দননগরের বড়াইচণ্ডী শ্মশানঘাটে যেতাম। গঙ্গার পার, কিন্তু শ্মশান থাকার জন্য ভিড় থাকতো না। খানিকক্ষণ মনের খেয়ালে গান গেয়ে আসতাম। …
কখনো কখনো গানের ভাবে, চোখ থেকে জল বেড়িয়ে আসতো, আবার কখনো ধ্যানও হয়ে যেত। … সেই সমস্ত করে, আগে যেমন ৭টার মধ্যে বাড়ি চলে আসতাম, সেটা এগিয়ে গিয়ে ৯টা হয়ে গেল। বাড়িতে বলতাম, কাজের খুব চাপ। কিন্তু বাস্তবে কাজের চাপ অনুভব হতো না, কারণ কাজ তো যতটা বলা হতো, ততটাই করতাম। না কনো কিছুতে মাথা খাটাতাম, আর না কনো কিছু নিজের থেকে করতাম। …
হ্যাঁ, এর ফলে আমার প্রতি আমার অফিসের সকলে উদাসীন হতে আরম্ভ করে দিয়েছিলেন। … কনো গতানুগতিক কাজ হলে, তবেই আমাকে দিতেন, অন্যথা আমাকে দিতেন না। … এতে আমার ভালোই হয়, ফালতু মাথাঘামানো বন্ধ হয়ে যায়। আগের মত, আর তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করার চিন্তাও করতাম না। … কাজ দিলে, কাজের নিজের গতিতে কাজ করতাম। … সেই গতিতে যবে কাজ শেষ হবে, তবে হোক। এখন জেনেগেছি, এই ভ্রমজগতের কাজের কনো শেষ নেই। একটা শেষ হলে, আরেকটা ভ্রম এসে জোটে। তাই শেষ করবো কাজ, এই ভ্রমে আর পা গলালাম না। …
না ধীরে কাজ করি, আর না দ্রুত। কাজ কাজের মতই চলতে থাকলো। কাজে কনো মনও যেমন রইল না, তেমন অনীহাও রইলনা। ঈশ্বরী সংসার দিয়েছেন, যাকে চালাতে গেলে ধন লাগবে। কাজও তিনিই দিয়েছেন, সেই সংসার চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। তাই অবিরাম সেই কাজ করতাম, কিন্তু শুধুই সংসার চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্যই করতাম। তাই কাজের জায়গা থেকে কিচ্ছু প্রাপ্তির চিন্তাও অবশিষ্ট নেই।
আবার যেই সংসার তিনি দিয়েছেন, তাও এই কারণেই দিয়েছেন যাতে এই ভ্রমের শরীর অক্ষত থাকে, আর সেই ভ্রমের শরীরে থেকে, সমস্ত ভ্রম মিটিয়ে সত্যে ফিরে যেতে পারি। তাই সেই সংসারের থেকেও কনো কিছু আশা নেই, আবার নিরাশাও নেই। … যে যা করছে, কনো কিছুতে কনো বাঁধা দিই না, আবার উৎসাহও দিই না। … ছেলে মেয়ে যদি এসে পরামর্শ চায়, তবেই দিই, নচেৎ নয়। স্ত্রীর ক্ষেত্রেও তাই। … অর্থ লাগবে বললে, জিজ্ঞেস করি কত লাগবে। যা বলে, তার ৫ গুণ সঙ্গে থাকলে, বিনা বাক্যব্যায়ে তা দিয়ে দিই, নয়তো বলে দিই, হবেনা।
ছেলের দামি কলেজে অ্যাডমিশন করাবে বলে, স্ত্রী এসে বললেন কত লাখ নাকি লাগবে। আমি সরাসরি স্ত্রী যেই পরিমাণের কথা বললেন, তার ৩ ভাগের একভাগ আছে বলে বললাম, এতো আছে, তাতে যা হবে, তাই হবে। স্ত্রী আরো কিসব বলছিল, ওখানে লোণ করতে, সেখানে লোণ করতে। আমি স্পষ্ট বলে দিলাম, ফ্যাসিলিটি নেই। যেই মাইনের কাজ করি, তাতে ওই লোণ পাবো না।
স্ত্রী দেখলাম হম্বিতম্বি করলেন বেশ কিছুদিন। কিছুদিন পরে বললেন – যদি ছেলেকে ভালো কলেজে পড়াতেই পারবে না, তো এমন কাজ করে লাভ কি!
আমি হেসে বললাম – বেশ, ছেড়ে দিচ্ছি কাজ। কাল থেকে তুমি কাজ খুঁজে নিও। … আজই রিজাইন করে দিচ্ছি।
স্ত্রী দেখলেন, এতো বড় জ্বালা। কনো কথাই এই মানুষের উপর কনোরূপ প্রভাব ফেলছে না। … থেমে গেলেন। ছেলেকে দেখলাম, এই কাণ্ডের পর থেকে বাপের সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করলো। দেখলাম, আর মনে মনে হাসলাম ঈশ্বরীর প্রতি, আমার রাম, আমার শ্যাম। … গ্রামের বাড়ি যাবার সময় হয়েছে। মালিকের ছেলেকে আর রামশ্যাম করে লাভ নেই।
স্ত্রী আর ছেলে, দুইজনেই ছন্নছাড়া হয়ে গেলেন আমার থেকে। তাঁরাও আমার কাছে, আছে তাই আছে; আমিও তাঁদের কাছে আছি তাই আছি। মানে ওই আরকি – না থাকলেও কিছু অসুবিধা নেই। … কিন্তু এখানে আমার কন্যা আবার আমার নিকটে চলে এলো। … প্রথমে ভয় লেগে গেছিল। এ আবার নতুন কি জ্বালা!… কিন্তু পরের দিকে দেখলাম, কন্যা আমার সমস্ত গোপন কীর্তি জানে। কি করে জানে, তা জানি না, তবে জানে। …
সে মন্টেসরি কোর্স করে, একটা ৪-৫ হাজারের চাকরি জুটিয়েছে। সেই পয়সা থেকে, আমি যাতে ঠেশ দিয়ে বসে ধ্যান করতে পারি, সেই জন্য একটা শক্ত বালিশ করেছে। … নিয়মিত ধ্যানাদি হবার ফলে, আমার ত্বক নরম হয়ে গেছে। তাই আমার জন্য ধুতি কিনে এনে, সেটাকে লুঙ্গির মত সেলাই করে এনে দিয়েছে।
আমি একদিন না থাকতে পেরে বললাম – তুই এই সমস্ত কিছু আনছিস কেন?
কন্যা আমায় বলল – আমি জানি বাবা, তুমি কি করো, কেন করো। … তোমার ধ্যানের সুবিধার জন্য এইগুলো করলাম। আমি জানতাম না, রিমি এইসব জানে, রিমি আমার মেয়ের নাম। আমি একটু অবাক হতে, সে বলল – আমাকেও তো একটু শিক্ষা দিতে পারো! … আমি মুচকি হাসলাম। তারপর থেকে, সন্ধ্যার সময় করে, আমি অফিস থেকে ফেরার সময়ে রিমিকে ওর স্কুল থেকে বাইকে তুলে, বড়াইচণ্ডীর শ্মশানে যেতে থাকলাম। সেখানেই আমাদের কথা হতে থাকলো।
অন্যদিকে, সাধন যত হচ্ছে, ততই মনে জিজ্ঞাসা জাগছে, আর জাগছে অনেক দ্বন্ধও। মন বলে দিয়েছে, সমস্ত প্রশ্নের উত্তর ঠাকুর রামকৃষ্ণ দিয়ে গেছেন। আর তা উদ্ধার করার জন্য, ঠাকুরই রমেনদাকে আমার সামনে এনে দিয়েছেন। … তাই প্রায়শই রমেনদার কাছে যেতাম। কখনো কখনো রিমিকেও নিয়ে যেতাম। যদিও, সেই বিষয়ে আমার স্ত্রী কিচ্ছু জানতেন না।
