কথা সঞ্জীবনী | রামকৃষ্ণ দর্শন

চুঁচুড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে বৈদ্যবাটি। আর সেখান থেকে রমেনদার বাড়ি। মনের মধ্যে এক অনাবিল আনন্দের ছোঁয়া লাগছিল। জানিনা কেন, কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছিল, কোথা থেকে ছুটি পেয়ে গেছি। আনন্দের সাথেই উনার বাড়ি গিয়ে কলিংবেল বাজাতে, দরজা খুলে, চাপ দাড়ির মধ্যে থেকে একটা নির্মল হাসি আমার উদ্দেশ্যে দৌড়ে এলো। আমার মধ্য থেকেও একটা তদনুরূপ নির্মল হাসি বেড়িয়ে আস্তে, উনি দরজা দিতে দিতেই বললেন – আজ যেন একটু আনন্দে রয়েছেন মনে হচ্ছে!

আমি বললাম – যোজনা করে নাক ডাকতে হয়নি, যেন জগন্মাতাই নাকটা ডাকিয়ে দিলেন। ডাক্তার দেখাবার নাম করে এসেছি। বলেছি কলকাতা যাচ্ছি, ভালো ডাক্তার দেখাতে। গিয়ে বলবো, ওষুধ দেয় নি, প্রানায়ম করতে বলেছে, আর যতদিন না ঠিক হয়, আলাদা শুতে বলেছে, নাহলে মনের মধ্যে টেনশন থাকবে, আর টেনশন থাকলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে।

রমেনদা – ঠকাচ্ছেন তাহলে! খারাপ লাগছে না!

আমি – প্রথমবার লাগছে না। মন যেন বলছে, এই প্রথমবার আমার সত্যিকারের আপনজনকে ঠকাচ্ছি না, আর তাঁকে না ঠকানোর জন্য অন্যকে ঠকাচ্ছি। এই প্রথমবার মনে হচ্ছে, ঈশ্বরের জন্য বাঁচছি। আর সেটা ভেবেই এক অনাবিল আনন্দ হচ্ছে। সেই আনন্দই যেন বলে দিচ্ছে, আগামী দিনেও তাঁর জন্যই বাঁচবো। তাঁর কনো প্রমাণ দেবার প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু এর মধ্যেই তিনি প্রমাণ দিয়ে দিয়েছেন যে তিনিই আসল মা, আসল পত্নী। প্রমাণ পেয়ে খুব আনন্দও হচ্ছে, আবার তাঁকে প্রমাণ দিতে হলো, এটা ভেবে, মনে একটা লজ্জাবোধও আসছে। সব মিলিয়ে একটা অন্যরকম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে মনে, যেমনটা …যেমনটা, এর আগে কখনো হয়নি। … যেন মনে হচ্ছে, হারানো সংসারে ফিরে যাচ্ছি।

রমেনদা শুধুই শুনছিলেন। আমি আবার বললাম – জানেন, গ্রায়জুয়েশন করার পর, ম্যানেজমেন্ট পড়ার জন্য হস্টেলে থাকতাম। না আমার শহরে আমার কনো বিশেষ বন্ধু ছিল, আর না আমার বাড়ির প্রতি খুব একটা টান ছিল। তাও যখন প্রথম হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরি, তখন একটা শিশুর মত আনন্দ হয়েছিল। আজও সেই রকম আনন্দ হচ্ছে। যেন মনে হচ্ছে, ফিরে যাচ্ছি আমি আমার বাড়ি।

রমেনদা – কিছুদিন পরে, আপনার স্ত্রী তো আপত্তি জানাবে, তখন কি করবেন?

আমি – এই কয়দিনের মধ্যে তাড়াতাড়ি শুইয়ে পরা আর তাড়াতাড়ি ওঠার অভ্যাস করতে হবে। জগজ্জননী যখন কাছে টেনেছেন, তখন তিনিই ব্যবস্থা করে দেবেন। একবার হয়ে গেলে, বাহানা দেওয়া যাবে, আমি তাড়াতাড়ি উঠে পরি, তোমার ঘুমের ব্যাঘাত হবে। তাই এখানে আলাদাই শুই। ছাড়ুন ওসব কথা, ভক্ত চিনি খেতে চায়, চিনি হতে চায় নাকি!

রমেনদা একটু মুচকি হেসে বললেন – ঠাকুরের এই কথাটা লক্ষ্য করেছেন! … ভক্ত চিনি খেতে চায়, চিনি হতে চায়না। … মানে বুঝলেন, ভক্ত জানেন যে তিনি চিনিই, তাও চিনি না হয়ে চিনি খেতে চান। …

আমি – তারমানে, ভক্তকে স্বরূপ জানতে হয়। স্বরূপ না জানলে, ভক্তি হলো না ঠিক করে!

রমেনদা – হুম, ঠাকুর তো একপ্রকার স্পষ্ট করেই তা বলে দিলেন। অজ্ঞানতা থেকে ভক্তি হলো পাটোয়ারি বুদ্ধি; এই করলে সেই হবে, সেই করলে ওই হবে, এমন করে যাওয়া। ঠাকুর বলতেন ওহৈতুকি ভক্তি, অর্থাৎ ভক্তির প্রয়োজন নেই, তাও ভক্তি। মানে বুঝতে পারছেন, জানি যে আমিও যা, তিনিও তাই, আমিও ব্রহ্ম, তিনিও ব্রহ্ম, তারপরেও ভক্তি।

আমি – তারমানে অন্ধবিশ্বাসের থেকে করা ভক্তি নিয়ে যতই অঙ্ক কষা হোক, ভক্তির ফল অর্থাৎ ঈশ্বরলাভ হয়না। … হুম, বুঝলাম। … বেশ বুঝতে পেরেছি, এতকাল সময় নষ্ট করেছি। কিচ্ছু বুঝিনি, খালি বুঝেছি বুঝেছি ভাব দেখিয়ে এসেছি। … আচ্ছা রমেনদা, আমাকে একটা কথা বলুন, ঠাকুর যে বলেছেন, তিনটান এক হলে, তবে ঈশ্বর লাভ হয়। … আছে না কথামৃতে, মায়ের ছেলের প্রতি টান, সতীর পতির প্রতি টান, আর একটা কি যেন!

রমেনদা – বিষয়ীর বিষয়ের প্রতি টান।

আমি – হ্যাঁ, এর মধ্যে কি গভীর কথা বলেছেন ঠাকুর। … মানে, এতকাল না আমি ভেবে যেতাম কি বলুন তো, ব্যাপারগুলো অত্যন্ত সহজ, কেন আমরা সহজ করে ভাবতে পারিনা, ঠাকুর এই বলে গেছেন। … আজ একটু একটু আন্দাজ হচ্ছে যে, ঠাকুরের কথার গভীরতা আমরা তলিয়ে দেখতেই পারিনি। … তাই, এরও কি গভীর কিছু অর্থ আছে!

রমেনদা মুচকি হেসে বললেন – মশাই, ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব কি আর যে সে ব্যক্তি! সাখ্যাত অবতার গরিষ্ঠ। তাঁর সামান্য কথাও যে অত্যন্ত বিশেষ অর্থপূর্ণ। সামান্য কথাকে তলিয়ে দেখলেও, তলাতলের রত্ন পাবেন। ওই যে একটা কথা বলেছিলেন না ডাক্তারকে, তেঁতুলতলায় গাড়ি দাঁড়িয়েছিল, তাই অম্বল হয়ে গেছে। … বুঝতে পারছেন, সামান্য রসিকতা, কিন্তু এই রসিকতার মাধ্যমে সমাজকে পুরো এক হাত নিয়ে নিলেন। বর্তমান সমাজকে দেখুন, ঠিক সেই প্রকারই করছে। সবেতে বাহানা।

আবার একটু থেমে – যিনি ঘুষ খাচ্ছেন, প্রশ্ন করুন, কেন খাচ্ছেন? উত্তর আসবে, সবাই খাচ্ছে, তাই আমিও খাচ্ছি। যিনি একাধিক স্ত্রীসঙ্গ করছেন, তাকে প্রশ্ন করুন, কি উত্তর আসবে? আমি কি আর যাই, আমার কাছে আসে। … মানে বুঝতে পারছেন, কেবলই বাহানা, কনো কাজের পিছনে স্থির মনের কনো নির্দিষ্ট আদর্শ নেই। সবটাই ধোঁয়াশা। আর ঠাকুর তো এই রসিকতার মধ্যে দিয়ে সেটাই বললেন।

নিজের মনেই একটু হেসে – হ্যাঁ, কি যেন বললেন, … ও হ্যাঁ, তিনটান এক হলে, তাই তো। … পবিত্র, সামান্য নয়, মহাগুহ্য কথা এটি। এই তিনটান মানে জানো? এই তিনটান মানে, স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণের টান। অর্থাৎ ঠাকুর বলছেন, যতক্ষণ না আপনার স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ একসঙ্গে ঈশ্বরের জন্য আটুপাটু করবেনা, ততক্ষণ ঈশ্বরের দর্শন লাভ হবেনা। … আঁটুপাটু মনে আছে তো কেমন?

আমি – আজ্ঞে, ঠাকুরই বলেছিলেন, গুরু শিষ্যের মাথা জলে গুঁজে দিলেন। যখন শিষ্যের প্রাণ যাই যাই করতে লাগলো, তখন মাথা তুলে নিয়ে বললেন, যখন এমন হবে ঈশ্বরের জন্য, তখন ঈশ্বরের দেখা পাবে।

রমেনদা ঈষৎ হেসে বললেন – বেশ বেশ। … বুঝতে হয়তো আপনি পারেন নি, কিন্তু ফাঁকি আপনি মারেন নি। পড়েছেন, বেশই পড়েছেন।

আমি – হ্যাঁ দাদা, খুব চেষ্টা করতাম। তবে কেমন বলুন তো! অঙ্ক মাথায় ঢোকেনা বলে অঙ্কই মুখস্ত করে চলে যেতাম। … আপনার পেপারে, একটু ঘুরিয়ে দিয়েছে অঙ্ক, আর অমনি আমি ডাহা ফেল!

আমরা দুইজনেই হেসে উঠলাম। আমি আবার বললাম – কিন্তু এই স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না রমেনদা। আর এও বুঝলাম না যে, এই তিন টানের সাথে এঁদের সম্পর্ক কি বা কেমন করে?

রমেনদা হেসে বললেন – তাহলে তো আগে, স্থূল কি, সূক্ষ্ম কি, আর কারণ কি, সেই ব্যাপারে বলতে হয়। স্থূল মানে যা কিছু ফিজিকাল, মানে এই আমার শরীর, আপনার শরীর, বা আমরা ইন্দ্রিয় দ্বারা যা কিছু বুঝতে পারি, সেই সমস্ত কিছু। এই টানের মানে হলো, যখন আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয়ও কেবল ঈশ্বরেরই দর্শন কামনা করবে। একে কি দিয়ে বলেছেন ঠাকুর? মায়ের ছেলের প্রতি টান দিয়ে। মায়ের ছেলের প্রতি টান, সম্পূর্ণ ভাবেই ভৌতিক টান। কেন জানেন? বা জানেন, কি প্রমাণ করে যে এটি কেবলই ভৌতিক টান?

আমি ভ্রু কুঁচকে রইলাম দেখে আবার উনিই বললেন – আমার ইন্দ্রিয় যাকে আমার সন্তান বলে মান্যতা দিচ্ছে, সেই কেবল আমার সন্তান, বাকি কেউ নয়। আমার গর্ভ থেকে যার জন্ম হয়েছে, বা যাকে আমি আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়দের সাক্ষী রেখে স্বীকার করে নিয়েছি আমার সন্তান বলে, তারই প্রতি আমার টান। অর্থাৎ এই টান সম্পূর্ণ ভাবেই ভৌতিক। শুনতে খারাপ লাগলেও, এটিই বাস্তব যে, সন্তানের মন উদাস হয়ে গেল, বা সন্তানের মন হাহাকার করে উঠলো, এই সমস্ত কিছুতে তাঁর গর্ভধারিণীর কিচ্ছু আসে যায়না। তবে অন্যদিকে, সন্তান যদি অনাহারে থাকে, বা সন্তান যদি অনিদ্রায় থাকে, বা সন্তানের স্বাস্থ্যের কনো হানি হয়, তখন গর্ভধারিণীর আহারনিদ্রা উড়ে যায়। (হেসে) এই সমস্ত কিছু কি বলে পবিত্র! জাগতিক মা-সন্তানের সম্পর্ক হলো সম্পূর্ণ ভাবেই ভৌতিক বা স্থূলের টান।

আমি উনার কথাগুলো মেলাতে থাকলাম। হ্যাঁ উনি যা বলছেন, তা একটু বেশিই চাঁচাছোলা, কিন্তু একদমই সঠিক বলছেন। আমি আমার জীবনের সাথে মেলালাম সমস্ত কথা। যতগুলি জননী দেখেছি, আমার স্ত্রী সমেত, সকলের কথা স্মরণ করলাম। আর দেখলাম হ্যাঁ, উনি ধ্রুবসত্য বলছেন। সেই বুঝে একটু মুখে হাসি ফুটে এলো আমার। আমি আবার বললাম – আর সূক্ষ্ম!

রমেনদা নিজের সাবলীল গতিতে বললেন – পঞ্চভূতের টান। জানেন তো কি কি এই পঞ্চভূত?

আমি – হ্যাঁ, আকাশ, জল, অগ্নি, বায়ু আর মাটি।

রমেনদা – এগুলো দিয়েই আপনি আপনার অস্তিত্ব মানেন, তাই না!

আমি – হ্যাঁ, বেদ তো তাই বলে। কিন্তু কি করে, সেটা প্রশ্ন করবেন না। এতো গভীর ভাবে, আমি এর আগে কনোদিনও কনোকিছুর বিচার করিনি।

রমেনদা হেসে বললেন – মাটির শরীর, এটা জানেন তো?

আমি – হ্যাঁ, … মানে কি তবে মৃত্তিকাতত্ত্ব দিয়ে শরীর?

রমেনদা হাল্কা মাথা নেড়ে বললেন – হ্যাঁ, বাকিগুলো হলো আপনার প্রাণবায়ু অর্থাৎ পবন; আপনার আহার নিদ্রা মৈথুনের এনার্জি লেভেল, অর্থাৎ?

আমি – অগ্নি।

রমেনদা সদুত্তর লাভ করে হেসে – আপনার বুদ্ধি অর্থাৎ জল। কি করে বলতে পারেন?

আমি – বুদ্ধি মানে জলতত্ত্ব! … না … কি করে?

রমেনদা এবার একটা নিশ্বাস নিয়ে বললেন – জলের ধর্ম কি উপর থেকে নিচে যায়, ঠিক (আমি মাথা নারতে থাকলাম) জমা হয়ে থাকলে দুষিত হয়ে যায় (মাথা নাড়লাম), প্রবাহধারা থাকলে গতিশীল থাকে (আবার মাথা নাড়লাম), তাপ দিলে বাষ্প হয়ে সরে যায় আর চাপ দিলে বরফ হয়ে জমে যায়।

আমি বললাম – বুঝেছি, বুদ্ধিও তো তেমনই। ছেড়ে রাখলে নিম্নমুখী মানে বকে যায়; জমে গেলে, অর্থাৎ অলস থাকলে, নোংরামো বাসা বাধে, বেগ থাকলে অগ্রগতির চিন্তা করে, তাপ মানে পাজিল্‌ড হয়ে গেলে ভেস্তে যায়, আর চাপ দিলে বাপ বলে জমে যায়। … আরিবাস! … সহজ কিন্তু অসাধারণ তো! … ঋষিরা কি অদ্ভুত ভাবে ইনটেলিজেন্ট ছিলেন মশাই! … চোখের সামনের জিনিস, কিন্তু … আরিবাস। … সেরা চমক।… আর আকাশতত্ত্ব কি তবে মন?

রমেনদা হেসে বললেন – একদম।

আমি একটু থেমে থেকে চিন্তা করলাম, তারপর বললাম – আকাশতত্ত্ব মানেই কি ইন্দ্র? যেমন বরুণ মানে জল, অগ্নি মানে … আকাশতত্ত্ব মানেই কি ইন্দ্র, বলুন না?

রমেনদা – হ্যাঁ, ঠিক, একদমই ঠিক, আকাশতত্ত্বকেই দেবরাজ বলা হয়েছে, কারণ সমস্ত পঞ্চভূতের সঞ্চার সেখান থেকেই। … কিন্তু এতে উৎসাহিত হয়ে উঠলেন কেন?

আমি – তারমানে এই যে ইন্দ্রের নষ্টামির কথা বলা আছে। অমুকের তপস্যা ভেঙেছে, তমুকের সাথে ছলনা করেছে, এমনকি অহল্যার সাথেও নষ্টামি করেছে, এগুলো কি তারমানে মনের ক্রিয়া কলাপ। … মনই তো আমাদের যত প্রকার অযাচিত ভয়, লোভ দেখায় আর দুষ্কর্ম করিয়ে ফেরে। সেই কথাই কি তবে ঋষিরা বলেছেন?

রমেনদা এবার একটু মুচকি হেসে বললেন – দেখলে পবিত্র, সকলের মধ্যেই সকল কিছু আছে। ঠাকুর বলতেন না, চোর নারায়ণ, পুলিশ নারায়ণ, বাঘ নারায়ণ, হাতি নারায়ণ আর মাহুত নারায়ণ। দেখলে, সামান্য কি ধরিয়ে দিলাম, অমনি তোমার নারায়ণ তোমার কাছে সত্যকে স্পষ্ট করে দিচ্ছেন। … ঠাকুরের কথার তেজ দেখেছ ভায়া! … রাস্তা চলতে চলতে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি দিতে পারেন তিনি। … ভাতের থালা করে রেখে দিয়েছিলেন আধ্যাত্মকে বিভিন্ন সাধুরা। ঠাকুর তাকে একবারে সবসময়ের অক্সিজেনে পরিবর্তিত করে দিয়েছিলেন।

আমি – বিষয়ীর বিষয়ের প্রতি টান, এটিই হলো তারমানে সূক্ষ্মের টান। কারণ এই টানের মধ্যে তো, প্রাণ, মন, বুদ্ধি, দেহচিন্তা সব থাকে।

রমেনদা এবার একটু তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন – শেষ হলো কারণের টান। কারণ শরীরের তিন উপাদান, সত্ত্বগুণ, রজোগুণ, আর তমগুণ। সমস্ত প্রকার সুখ, সমস্ত প্রকার চাওয়াপাওয়া, আর সমস্ত প্রকার দীর্ঘমেয়াদি সুখ। অর্থাৎ যার কাছে ঈশ্বরলাভই একমাত্র সুখ আর ঈশ্বরলাভ না করাই একমাত্র অসুখ হয়ে গেছে।

আমি – সতীর পতির প্রতি টান। সতীর ধ্যান জ্ঞান সমস্ত কিছুই পতি। তারমানে ঠাকুর বলছেন, ইন্দ্রিয়, পঞ্চভূত আর ত্রিগুণ সর্বত্র যখন ঈশ্বরময় হয়ে যায়, তখনই ঈশ্বরের দর্শন লাভ হয়। অর্থাৎ সার্বিক ভাবে যখন ঈশ্বরের কাছে ব্যক্তি সমর্পিত হন, তখনই ঈশ্বরলাভ! তার আগে কনো সম্ভাবনাই নেই! … কি আশ্চর্যরকমের সত্য কথা! এমন ভাবেও সত্য বলা যায়!

রমেনদা – এই জন্যই তো তিনি অবতারগরিষ্ঠ পবিত্র, এমনি এমনি কি আর!

আমি – আর এই সত্ব, রজ তমের কথাও তিনি বলেছেন। তিনজনেই দস্যু! তাই না। … সেই ব্যাপারে বলুন দাদা। … খিদে লাগছে প্রচণ্ড। যেন মনে হচ্ছে সব খেয়ে নেব। কিচ্ছু ছাড়বো না। … আর আপনি হয়ে গেছেন, আমার সেই খাদ্য। … এই কারণেই কি গানে ছিল, এবার কালি তোকে খাবো! … সব খাওয়া হয়ে গেছে, এবার একমাত্র কালি, তুই-ই বাকি, এবার তোকে খেয়ে নিয়ে, শূন্যকায় হয়ে যাবো? এতটাই কি গভীর অর্থ  রমেনদা!

রমেনদা হেসে বললেন – নেশা না!

আমি – হ্যাঁ, জ্ঞান অর্জনের নেশা। এই নেশা তো অন্য নেশাদের বাপ, দাদা! … যাইহোক, বলুন না, সত্ত্ব, রজ আর তমের কথাটা।

রমেনদা সোফায় নিজের সুন্দর মেন্টেন করা শরীরটা এলিয়ে দিয়ে, ফতুয়ার দুটি কাঁধ ধরে একটু ঝাঁকিয়ে নিয়ে, লুঙ্গিকাটিং ধুতিটির কোঁচটা একটু ঠিক করে নিয়ে, একটা পায়ের উপর আরেকটা পা তুলে দিয়ে বলতে শুরু করলেন – ঠাকুর বলছেন, সত্ত্ব, রজ বা তম, তিনজনেই ডাকাত। একজন বেঁধে অত্যাচার করে, একজন বাঁধন খুলে ছেড়ে দেয়, আরেক জন সমস্ত লুটপাট করার পর, বাড়ি ফেরার সময় একটু খাবার দিয়ে দেয়। … মানে ওই যাকে বলে, মুরি চেবাতে চেবাতে বাড়ি চলে যা।

বিড়ির বান্ডিল থেকে একটা বিড়ি বার করে ধরিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন – আসলে কি জানো পবিত্র, আমাদের সম্পদ হলো ব্রহ্মজ্ঞান, আর আমাদের থেকে সেই ব্রহ্মজ্ঞান কে ডাকাতি করে নিয়ে নেয় জানো?

আমি সন্দিহান চোখে একাগ্র হয়ে তাকিয়ে থাকলে, উনি মৃদু হেসে বললেন – সুখের চিন্তা। এই সুখের চিন্তা, আমাদেরকে কখনো শান্তিতে বসতে দেয়না। কেমন দেখো, স্কুলে গেলে, কোন কলেজে পড়বো, কি নিয়ে পড়বো, সেই নিয়ে চিন্তা; কলেজে গেলে, কলেজ পাস করার পর, কি করবো, সেই চিন্তা। চাকরীতে ঢুকলে, আরো ভালো চাকরীতে ঢুকে লাইফ সেটেল করার চিন্তা। সেই ভালো চাকরী হলে, বিয়ে করার চিন্তা, কেরকম বউ হবে, চাকরী করবে না গৃহবধূ হবে, সেই চিন্তা। বউ হলে, বউয়ের সখ পুড়নের চিন্তা। কিছু বছর হয়ে গেলেই, সন্তান লাভের চিন্তা। সন্তান হয়ে গেলেই, তাকে স্কুলে ভরতি করার চিন্তা। … ব্যাস, এতদিন যেই চিন্তা নিজের জন্য করে এসেছি, এবার সেই একই চিন্তা সন্তানের জন্য করার চিন্তা।

আবার একটু থেমে হেসে বললেন – কি বুঝলে? … একটাতেও সুখ নেই, কিন্তু সমস্ত কিছুতে সুখের হাতছানি আছে। কলেজে পড়লে সুখ পাবো; কলেজের চিন্তা করলাম। চাকরী পেলে সুখ পাবো, চাকরী পেতে ছুটলাম; ভালো চাকরী পেলে সুখ পাবো, সেখানে ছুটলাম। কিন্তু সুখ আর পাওয়া হলোনা। যতক্ষণ না ভালো চাকরী পেলাম, ততক্ষণ আগের চাকরীর থেকে সুখ পাওয়া হলো না। যাই ভালো চাকরী পেয়ে গেলাম, এতো প্রেশার, হয় কাজের নয় টার্গেটের যে সুখ পাওয়া হলো না। … তাহলে সুখ কিসে?

আমিও একটু মজার ছলেই বললাম – ভাবনায়। … মানে সুখ পাবো, এই ভাবনাতেই সুখ।

আসলে আমি বুঝিনি যে, আমি ঠিক উত্তর দিয়ে ফেলেছি, রমেনদার পরের কথাতে বুঝতে পারলাম সেটা। উনি হেসে বললেন – একদমই ঠিক পবিত্র, একদমই ঠিক। সুখের বাস্তবে কনো অস্তিত্বই নেই। শুধুই সুখলাভের ইচ্ছাতেই সুখ আছে, অন্যত্র কোথাও সুখ নেই। কিন্তু তাও এই সুখের পিছনে আমরা ছুটি। … ছুটবো নাই বা কেন? যতই চিনি স্টক করবোনা, চিনি খাবো ভাবি, আসলে তো আমরা চিনিই। তাই সদানন্দ লাভ করা যে আমাদের জন্মগত অধিকার। তাই সেই সদানন্দের সন্ধান করতেই থাকি। কিন্তু করলে কি হবে, রয়েছি তো মায়েপোয়ে, বিষয়বিষয়ীতে, আর সতীপতিতে মেতে। তাই এই স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ জগতই সত্য হয়ে বসে আছে আমাদের কাছে।

আবার একটু নিজের মনে হেসে – তাই আনন্দের পরিবর্তে আমরা সুখের সন্ধানই করে ফিরি। আর এই সুখের সন্ধান করিয়ে ফিরি আমরা ত্রিগুণের চক্করে পরে। একটা রামপ্রসাদী আছে, শুরুটা মনে নেই, মাঝের একটা লাইন আছে, ছিলাম ষড়রিপুর ঘরে, এলাম ত্রিগুণের দ্বারে। … বুঝলে ভাই, ছয় তস্করের হাত থেকে রেহাই পেলে, দেখি কি? দেখি যে তিন ডাকাতের খপ্পরে রয়েছি আমরা।

মনের খেয়ালে একটা নিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে হেসে আবার বললেন – অনেকটা সিনেমার মত, বা মোবাইলে গেম খেল, সেরকম ব্যাপারটা। কে যে আসল ডন, ধরা যায়না। একজন একজন করে বাঁধা সরাচ্ছি, আর দেখছি, আরো ভয়ানক রাক্ষস সামনে রয়েছে। … তেমনই, ইন্দ্রিয় সরালে, রিপু, রিপু সরাতে সরাতে পাশ। রিপুপাশের থেকে মুক্তি পেলাম, তো কি দেখলাম? দেখলাম এতো পাঁচ ডনের একজন, মৃত্তিকা তত্ত্ব। বাকি এখনো ৪ ডন, ৪টি ভূত। এক এক করে, সেই বিকারগুলোকে কাটিয়ে উঠে, ক্ষতবিক্ষত হয়ে একটু স্বস্তির নিশ্বাস নিতে যাবো, দেখি কি আরো তিন ডন এসে হাজির, ত্রিগুণ।

অদ্ভুত খেলার ছলে বলে চলছিলেন দাদা। আমি শুনছিলাম আর ভাবছিলাম, এতো জায়গায় গেছি। কত বড় বড় নাম। তাঁরাও কত কথা বলেন, যাই তাত্ত্বিক কথা বলতে বসেন, অমনি বই খুলে শ্লোক আওরান। এই মানুষটা! কেউ একে জানেও না, চেনেও না। কিন্তু অনায়স, অনর্গল ভাবে, বিড়ি টানতে টানতে বলে চলেছেন! এই মানুষটা কে?

রমেনদা নিজের মত বলে চললেন – এই ত্রিগুণ সুখের জন্য দৌড় করায় আমাদের। কেমন করে? তমগুণ দিবারাত্র আমাদের বলতে থাকে, এটাতে বেশি সুখ, ওটাতে বেশি নামযশ, ওটাতে সর্টকাট। (আবার হেসে) রজগুণ কি বলে জানো? বলে ওই সুখ পেতে গেলে, এই এই করতে হবে। এই করলে ওই হবে, সেই করলে তাই হবে। সেই সমস্ত কিছুর থেকে বাঁচলে তবেই সুখলাভ। অর্থাৎ তমগুণ একটু ওয়াইল্ড। শিশুর মত, নাছোড়বান্দা। আমার ওই ক্যাডবেরি চাই। রজগুণ হলো একটু মেচিওর্ড। সে বলে, ওই ক্যাডবেরি পেতে গেলে, পয়সা লাগবে; এই কাজটা করলে সহজে পয়সা পেয়ে যাবো, তাহলে ক্যাডবেরি খেতে পারবো।

আর এদের বাপ হলো সত্ত্বগুণ। সে বলে কি জানো? সে বলে, ওই একবার ক্যাডবেরি খেয়ে কি হবে? কাল খেতে ইচ্ছা করলে, কি আবার ওই একি ভাবে খাটবো? … বরং একটা অন্য উপায় করো। এমন উপায় করো যাতে রোজ ক্যাডবেরি খেতে পারো। … অর্থাৎ কি বুঝলে, তমগুণ সুখের চিন্তার জন্ম দেয়, তো রজগুণ সেই সুখের চিন্তাকে মন মস্তিষ্কে বসিয়ে দেয়। আর সত্ত্বগুণ বলে, না ভাই মন বুদ্ধি দিলে হবে? আত্মায় বসলে তবে পাবে। তাই স্বয়ং আত্মা, যা স্বরূপে ব্রহ্ম, তাকেও নিচে নামিয়ে নিয়ে চলে এসে ভ্রমের সাগরে ফেলে দিয়ে, সমস্ত ব্রহ্মজ্ঞান আমাদের থেকে লুণ্ঠন করে নেয়। … তাই ঠাকুর বলছেন, এরা তিনজনেই ডাকাত।

আমি এবার না বলে থাকতে পারলাম না। বললাম – দাদা, একটা সভা করবো? বেলুরমঠে আমি যাই। সেখানে বেশিরভাগই শোকতাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য ভিড় করে, কেউ কেউ স্ট্যাটাস বাড়াতে ভিড় জমায়। কিন্তু দুচারজন আছেন দাদা, যারা সত্যিই জানতে চান। মহারাজদের উত্তরে সন্তুষ্ট হননা। কিন্তু আর কনো উপায় নেই বলে তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে থাকতে হয়। তাদেরকে এখানে নিয়ে চলে আসবো?

রমেনদা এবার একটু ঝাঁঝ মেরেই বললেন – ঠাকুর ঠিকই বলতেন, মানুষের খালি মাতব্বরি করার চিন্তা। … ভাই তুমি আম খাচ্ছ, আম খাও না। … তুমি কি নিজে নিজে সন্ধান করে এই আম গাছের সন্ধান পেয়েছিলে? … পাওনিতো। … তিনি তোমাকে এই আমগাছের নিচে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তা তুমি খাও। অন্য কারুরও যদি আম খাবার সময় হয়, তবে তিনি যেমন করে তোমাকে পাঠিয়েছেন, তেমন করে তাঁকেও কনো না কনো আমগাছের নিচে পাঠিয়ে দেবেন। … এত কর্তাভাব কেন ভাই? রামপ্রসাদী শোনো  নি, কালাকালের কর্তা এলে, এই কর্তারে দেবে ফেলে। … শোনো পবিত্র, এক তিনিই কর্তা। বাকি সব অকর্তা। এই বোধ যদি ঠিক ঠিক না হয়, তবে আম খাওয়া থেকে মন সরে যাবে, আর আম গাছের হিসাব করতে শুরু করে দেবে।

আমি একটু আমতা আমতা করেই বললাম, কারণ আজ আর আমার উনার সাথে তর্ক করার মত মুখ নেই। উনি আমার কাছে একজন দেবতা হয়ে গেছেন। আমি বললাম – কিন্তু আমরা কি তবে কিছুই করবো না?

রমেনদা একটা ব্যাকা হাসি দিয়ে বললেন – হুম করবে তো, দেখবে, শুনবে আর শিখবে। যা চোখে দেখা যায়না, সেটা দেখবে; যা কানে শোনা যায়না, সেটা শুনবে; আর যা বই পরে শেখা যায়না, সেটাই শিখবে। এই শিখতে শিখতে, তাঁকে অনুভব করবে। আর যেদিন করবে, সেদিন কমলাকান্তের গানের অর্থ বুঝবে। কি গান! (গান ধরলেন রমেন দা) … আপনি গাও মা, আপনি নাচো মা; আপনি দাও মা করতালি। … সেদিন বুঝবে, না তো কনো কর্তা কনোকালে ছিল, আর না সম্ভব। তিনিই গান করেন, তিনিই সেই গানে নাচেন, আবার তিনিই সেই নাচগানে হাততালি দেন। … সব নারায়ণ পবিত্র, সব নারায়ণ। … খাদ্যও নারায়ণ, খাদকও নারায়ণ, আর খাদ্যের উপাদান বা খাবারের পাত্রও নারায়ণ।

সেদিন আর কথা বাড়াই নিই। স্পষ্টই বললাম – দাদা আজ আর না। যতটা নিয়েছি, সেটা একটু হজম করি। … আপনার কথাগুলোর উপর একটু গভীর চিন্তা করতে ইচ্ছা করছে। … বাড়ি যাই আজ?

রমেনদা হেসে বললেন – এসো। … নির্জনে চিন্তন করো। আর হ্যাঁ, কনো কথাই আমার নয়। … শব্দও তিনি, শব্দের উচ্চারণও তিনি, শব্দের কথকও তিনি, শব্দের শ্রোতাও তিনি। … সমস্ত ক্ষেত্রে তাঁকে অনুভব করো পবিত্র। তিনি নেই এমন কনো মুহূর্ত নেই, এমন কনো স্থান নেই, এমন কনো কণা নেই, এমন কনো কোনা নেই। … সর্বত্র, সর্বক্ষণ, সর্বকিছুতেই তাঁকে খোঁজো। …

এই বলে আবার গান ধরলেন – মা দে মা আমায় পাগল করে। কাজ নেই মা জ্ঞান বিচারে, দে মা পাগল করে। … বেশ কিছুক্ষণ গান করে উনি বললেন – রামপ্রসাদ কি বলেন জানো? … উনি ভগবতীর উদ্দেশ্যে বলেন – তিনি হলেন প্রেমে উন্মাদিনী; উমা পাগলের শিরোমণি। … কি বুঝলে পবিত্র, প্রেমে পাগল হয়ে যেতে হবে, তবেই হবে। … কে কত আম খেলো, আম পেলো কিনা, ওসব হিসাব ছেড়ে, তোমাকে তিনি আম খেতে পাঠিয়েছেন, চুটিয়ে আম খাও। … যাও আজ বাড়ি যাও। … আবার একদিন এমন সময় করে চলে আসবে। … যাও।

বাড়ি চলে এলাম। ট্রেনে আস্তে আস্তে মনে হচ্ছিল, আবার ফিরে যাই। … আর সংসারী কথা শুনতেই ইচ্ছা করছেনা। … কিন্তু যেতে হবে অগত্যা। তাই বাড়ি ফিরে গেলাম।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9