কথা সঞ্জীবনী | রামকৃষ্ণ দর্শন

আমি একজন বেলুর মঠের সদস্য ছিলাম। বহুকালই ছিলাম। হয়তো এখনো থাকতাম, যদি না এই ব্যক্তিটির সান্নিধ্য লাভ করতাম। আমার সম্বন্ধে আগে বলি। আমার নাম পবিত্র গোস্বামী। সামান্য একজন সরকারি ক্লারিকাল চাকুরীরত ব্যক্তি। না, আমি কনো লেখক নই, আর কনো প্রবন্ধও লিখিনি জীবনে। তবে এই ব্যক্তিটির সম্বন্ধে না লিখলে, শান্তি পাচ্ছিলাম না। তাই লিখতে বসলাম। হয়তো অধ্যাবসায় নেই, তাই অনেক ক্ষেত্রেই লেখার খেই হারিয়ে ফেলবো। সেই ত্রুটি নিজগুণে মার্জনা করে নেবেন।

তবে এই ব্যক্তির সান্নিধ্যে আসার পর, আমি মানুষটাই পালটে যাই। একসময়ে আমার তো মনে হতে শুরু করে দেয় যেন ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব পুনরায় দেহ ধারণ করে এসেছেন, তাঁর কথার মানে কেউ উদ্ধার করতে পারেন নি, তাই সেই কথার ব্যখ্যা দিতে। … এখনো সেই ধারণা আমার পালটায়নি, বরং, আজ তাঁর, অর্থাৎ যার কথা আমি বলতে বসেছি, তাঁর দেহত্যাগের প্রায় ৪ বছর পর, আমার যেন বেশি বেশি করে মনে হচ্ছে যে আমিই ঠিক ছিলাম, অর্থাৎ তিনি ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবেরই পুনঃআবির্ভাব।

তা, আমার ধারণাকে আপনারা গ্রহণ করবেন কেন? না করাটাই স্বাভাবিক। তার থেকে বরং, আমি সেই মানুষটার কথাই আপনাদের বলি। আপনারা সেই কথা জেনে বিবেচনা করে নেবেন, আমি কতটা ভ্রান্ত এবং উদ্ভ্রান্ত।’

কথার শুরু হয়, সেই দিন যেইদিন আমি উনার সাথে প্রথম সাখ্যাত করি। সাখ্যাতও হয়, এক আশ্চর্যরকম দৈবাৎ ভাবেই। বেলুরমঠ থেকে জেটি করে দক্ষিণেশ্বর গিয়ে, সেখান থেকে ফিরবো। বাড়ি চুঁচুড়া। তাই একটা বাস ধরে, বালি হল্টে নেমে, সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে, বালি স্টেশন থেকে বর্ধমানগামী ট্রেন ধরবো। এই ভদ্রলোক আমার সাথে সেই বাসেই উঠলেন। উনি নামবেন বৈদ্যবাটি। বেশ ভালোই হলো, ফেরার রাস্তাটা মুখ বন্ধ করে ফিরতে হবে না, সঙ্গে একজন সাথী পাওয়া গেল।

আলাপ করে জানলাম, উনি মাসে একবার করে কলকাতায় আসেন গিরীশপার্ক চত্বরে, কারণ সেখানে উনার বাপঠাকুরদার কিছু দোকানঘর ইজারা দেওয়া আছে, তার সেলামি নিতে আসেন। বৈদ্যবাটি থেকে বালি, সেখান থেকে দক্ষিণেশ্বর। দক্ষিণেশ্বর থেকে মেট্রো ধরে গিরীশপার্ক। আর সেই পথেই ফেরেন। আমি এতকিছু জানলাম, আমার নির্বুদ্ধিতার কারণেই। আসলে, দক্ষিণেশ্বর থেকে উঠেছেন দেখে প্রশ্ন করি যে মন্দিরে এসেছিলেন কিনা, তার উত্তরেই তিনি এই সমস্ত কথা বললেন।

তবে যেই কথা দিয়ে শুরু করেছিলেন সেই কথা, সেই বাক্য শুনে আমার কান লাল হয়ে গেছিল। বলেন কি, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে আর কিছু আছে নাকি! ঠাকুরও চলে গেছেন, সঙ্গে সঙ্গে মা ভবতারিণীও। কথাটা শুনে থেকে আমার মনে প্রচুর কথা গজগজ করছিল। মনে হচ্ছিল, দুচারটে কথা শুনিয়ে দিই। শোনাতে ছাড়িনি। বালিহল্টে নেমে, ট্রেন পেয়ে ট্রেনে উঠতে উঠতে, প্রায় আধাঘণ্টা সময় লেগেছিল। সেই সময়েই নিজের বিষ উগ্রে দেবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তাতে হিতেবিপরীতই হলো। অর্থাৎ, ঢালতে গেছিলাম বিষ আমি, পালটে আমার কাছে উঠে এলো অমৃত কলসের সন্ধান।

বালিহল্টে নেমে, রাস্তা পার করে, যখন ফুটব্রিজ ধরে নামছি, তখনই কথা পারলাম। বললাম – আপনি তো মশাই, বড় ইয়ে গোচের! এত মানুষ বিশ্বাস করে যাচ্ছেন দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে, আর আপনি বলে দিলেন, সেখানে আর কিচ্ছু নেই!

উনি একটু মুখ বেঁকিয়ে হেসে বললেন – বিজ্ঞান তাঁদের একদিন ভগবানের দর্শন করাবে, তাহলে কি সেই বিশ্বাস সত্য হয়ে যাচ্ছে! … বিশ্বাস আর অন্ধবিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য আছে, বোঝেন নিশ্চয়ই। বিশ্বাস অত্যন্ত দিব্য এক গুণ, আবার অন্ধবিশ্বাস ঠিক বিপরীত ভাবে একটি মহা-আসুরিক গুণ।

আমিও ছেড়ে দেবার পাত্র নই। একটু তর্কের সুরেই বললাম – মা ভবতারিণী অত্যন্ত জাগ্রতা, আপনি তা মানেন না!

উনি প্রায় তাৎক্ষনিকই উত্তর দিলেন, কনো ভাবনা চিন্তা না করেই – ছিলেন; যার কারণে ছিলেন, তিনি যতদিন ছিলেন, ততদিন ছিলেন।

আমি তখনও ঠাওর করতে পারিনি, কার সাথে আমি কথা বলছি। বে-আক্কেলে তর্ক করার সুরে বললাম – তারমানে আপনি তো বলছেন, বামাক্ষেপা গেছেন, আর তারাপীঠের তারামাও নিস্তেজ হয়ে গেছেন!

উনি এবার একটু ম্লান হাসি দিয়ে বললেন – তারাপীঠ, তন্ত্রের পিঠ। তন্ত্রসাধকদের সিদ্ধভূমি সেটি। তন্ত্রসাধকদের জন্যই তা এক শক্তিক্ষেত্র। … আর রইল কথা তারামায়ের, বা মা ভবতারিণীর, বা যেকোনো জাগ্রতা মূর্তির, সেই মাটির ঢেলা বা পাথরের ঢেলায় যে প্রাণ বসেই, সাধকের অপার ভক্তিরসের কারণে। … সাধকের ভক্তিরস পান করে, আর তাঁকে প্রেমরস পান করানোর জন্যই যে ঈশ্বরীর এমন লীলা। … তা, ভক্তিরস পান করানোর যদি কেউ না থাকে, উনি কাকেই বা আর প্রেমরস পান করাবেন! … কেনই বা আর পরে থাকবেন সেখানে!

একটু থেমে বললেন – যেই কুয়োর জল শুকিয়েছে, সেই কুয়োতে আর বালতি ফেলেন! … ফেলেন না তো! … তাহলে আপনি ভগবানকে এতটা মূর্খ ভাবলেন কি করে যে তিনি শুকনো কুয়োতে বালতি ফেলবেন! কুয়োতে যখন জল এসেছিল, তখন উনি বালতি ফেলেছিলেন। আজ আর জল নেই, তাই বালতি ফেলেন না। যেই কুয়োতে জল আছে, সেখানে বালতি ফেলছেন উনি।

এই কথাটা শুনে, আমার অন্তরমন বুঝে গেছিল, আমি কার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। কিন্তু তাও একটা এঁড়ে তর্কবাগীশ লোক আমি। অত সহজে হার মেনে যাবো! … আমার ইগো হার্ট হয়ে যাবে না! … তাই বললাম – শুধু রামকৃষ্ণ, বামাখ্যাপাই ভগবানের কাছে প্রিয়! বাকিরা কি কিছু নয় উনার কাছে!

উনি হাল্কা করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন – কয় ভাইবোন!

আমি ভ্রুকুঁচকে বললাম – দুই, এক দিদি আর আমি এক ছেলে।

উনি – মায়েরা কয় বোন?

আমি – তিন

উনি – মাসিদের ছেলেমেয়ে?

আমি – সবার দুটি করে।

উনি – তাঁরা আপনার মায়ের কাছে প্রিয় নয়?

আমি – হ্যাঁ, খুব প্রিয়।

উনি – সকলকে স্তন দিয়েছেন উনি!

আমি এবার উত্তর দিতে গিয়ে, থমকে গেলাম। … কি বলবো কিছু বুঝে পাচ্ছিলাম না।

উনি তাই আবার বললেন – কেন দেন নি জানেন! … কারণ তাঁরা আপনার মাকে, মা নয়, মাসিমা মনে করেন এবং অন্য একজনকে মা মনে করেন বলে। … যিনি ভগবতীকে মাসিমার স্থান থেকে মায়ের স্থান দেবেন, তাকেই তিনি স্তন দেবেন। বাকিদের, যেমন আপনার মা, তাঁর ভগিনীর ব্যস্ততার সময়ে তাঁর সন্তানের মুখে ফিডিং বোতল দিয়েছিলেন, তেমনই দেবেন ঈশ্বরী। … ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব, বামাখ্যাপা, মাসিমার স্থান থেকে নিজের মায়ের আসনে নিয়ে এসেছিলেন ঈশ্বরীকে। তাই তিনি স্তন দিয়েছেন তাঁদেরকে, আর বাকিদের ফিডিং বোতল। আর কি বলুন তো ফিডিং বোতল ধরার জন্য, উনাকে কনো মূর্তিতে আস্তে হয়না। … এই যে প্রকৃতি দেখছেন, এর থেকেই ওই ফিডিং বোতল দেওয়া হয়ে যায়।

এবার আমার ইগো সত্যি সত্যিই খুব বিপর্যস্ত হয়ে গেছিল। বেলুরমঠের সদস্য, দীর্ঘ ১২ বছরের উপর সময় ধরে নিত্য যাতায়াত করি; দীক্ষা নিয়েছি। তাই ইগো বেশ জমাট হয়ে উঠেছিল। উনার, মানে রমেনদাকে তাকে এতগুলো কথা বলতে হয়, আমার এন্টার্কটিকার বরফ গলাতে। ও ভালো কথা, ভদ্রলোকের নামটাই তো বলা হয়নি। উনার নাম রমেন মজুমদার। যখন আমার সাথে এই প্রথম আলাপ, তখন উনার বয়স ৫৫। আমি তখন ৪৩। দীর্ঘ ১২ বছরের আলাপ। আজ আমি ৫৯। আজ থেকে চার বছর আগে, উনি দেহ রেখেছিলেন। তার আগে পর্যন্ত আমি নিত্য তাঁর কাছে যেতাম।

ভদ্রলোক বিপত্নীক। একটি কন্যাসন্তান ছিল তাঁর। উনার মৃত্যুর দিনেই তাঁকে প্রথম দেখি। লাকনউতে থাকেন উনার কন্যা, স্বামী রেলের কর্মী, সেই সুবাদে সেখানেই উনার বাস। বাবার মৃত্যুর দিন উনি আস্তে, উনার সাথে আলাপ হয়। … অর্থাৎ রমেনদা একাই থাকতেন, তাঁর একটি একতলা ছোটো বাড়িতে। আর আমার নিত্য যাতায়াত থাকতো উনার কাছে।

সেতো পরের কথা। সেইদিনে, আমার ইগো উনার মা আর মাসিমার কথাতে বেশ আঘাত প্রাপ্ত হতে, আমি একটু নরম হয়ে প্রশ্ন করলাম – আপনি কি সাধক? আপনি কি কনো জায়গা থেকে দীক্ষা নিয়েছেন?

উনি হেসে বললেন – সাধক কি সাধু, সে তো বলতে পারবো না! … ভগবান তো আর সার্টিফিকেট দেন না। তাই বলা সম্ভব নয়। আর মানুষ এই সার্টিফিকেট দেবার যোগ্যতা ধরেনা। তাই মানুষ এই ক্ষেত্রে কি বলে, সেটি কনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। … মানুষ আমার সম্বন্ধে খুব একটা কিছু বলতে পারেন না, কারণ আমি খুব একটা কথা বলিনা। … কলেজে পড়ার কালে, আমাকে সাধক তো বলা হতো না, হ্যাঁ পাগল অবশ্য বলা হতো। আমার স্ত্রী ও কন্যারও একই অভিমত। তাই মানবিক বিচারে, আমাকে পাগল বলাই ঠিক হবে। ঈশ্বর আমাকে সাধক বলেন, সাধু বলেন, না ঋষি বলেন, সেটা এখনও জেনে উঠতে পারিনি। জানতে পারলে নিশ্চয়ই বলবো।

আমি কিছু বলতে চাইছিলাম, কিন্তু কি বলতে চাইছিলাম, সেটা নিজেই জানি না। তাই আমতা আমতা করছি দেখে, উনি নিজেই আবার বললেন – আর কি বললেন, দীক্ষা না! … দীক্ষা মানে কি বলতে চাইছেন? গুরু যেই বীজমন্ত্র দেন, সেটি? … যদি সেটিকেই বলেন, তবে না আমাকে দীক্ষা প্রদান করা হয়নি। তবে হ্যাঁ, মা তো আমিও মানতে পারিনি, মাসিমাই মেনেছি। তাই আমাকে ওই ফিডিং বোতলে করে, শিক্ষা দিয়েছেন ভগবতী, মানে এই প্রকৃতির মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন, বা বলতে পারেন এখনও দিচ্ছেন। … আপনি নিশ্চয়ই দীক্ষা নিয়েছেন, তাই তো?

আমার এবার এই কথা শুনে একটু আনন্দ হয়। অন্তত কিছু তো বলার মত পেলাম। তাই বললাম – হ্যাঁ, বেলুরমঠ থেকে। … আপনি কি করে বুঝলেন!

রমেনদা হেসে বললেন – আপনার গলার ভলিউম শুনে।

আমার বেলুনের হাওয়া আবার ফুঁস করে বেড়িয়ে গেল। আমি বললাম – দীক্ষা নেওয়া তো আবশ্যক তাই না!

উনি হেসে বললেন – যেই মন কৃষি কাজ জানে, সেই মন ঠিক করবে। রামপ্রসাদের গান শুনেছেন তো, মনরে কৃষিকাজ জানো না!

আমার মাথায় কথার অর্থ ঢুকল না। তাই প্রশ্ন করলাম – এই গানের সাথে দীক্ষার কি সম্পর্ক!

উনি বালিহল্ট স্টেশনে উঠতে উঠতে মুচকি হেসে বললেন – দীক্ষা মানে বীজদান। শিক্ষা মানে ভূমি কর্ষণ। যেই মন কৃষি কাজ জানে, সে ঠিক ঠিক জানে কতক্ষণ ভূমি কর্ষণ করতে হয়, আর কতটা ভূমি কর্ষণ করা হয়ে গেলে, তাতে বীজ ফেলতে হয়। … তাই বললাম, যেই মন কৃষিকাজ জানে, সে ঠিক করবে, কতক্ষণ শিক্ষা, আর কখন দীক্ষা।

আমার মুখটা খানিকক্ষণ খোলাই ছিল। এই গান কতবার শুনেছি, কিন্তু এই গানের এত গভীর অর্থ, এতো কনোদিন শুনি নি! … এই মানুষটা তো দীক্ষাও নেন নি। বলছে প্রকৃতির থেকেই যা শিক্ষা নেওয়ার নিয়েছেন। তাহলে ইনি এত কিছু জানলেন কি করে? আমি এত বড় বড় মহারাজদের সামনে বসেও যা জানতে পারলাম না, তা এই মানুষটা অনায়স অনর্গল ভাবে কি করে বলে যান! … আমি এবার একটু মন থেকেই বললাম – আমি কি আপনার সান্নিধ্য পেতে পারি, মানে … একটু বেশিক্ষণ?

উনি আবার মুচকি হেসে বললেন – তিনি আপনাকে আর আমাকে কাছাকাছি এনেছেন, আর তিনিই আপনার মনে এই ভাবের সঞ্চার করলেন যে আমার সাথে একটু বেশিক্ষণ সময় কাটালে মন্দ হতো না। … তাই, এখানে আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য অযোগ্য।

মানুষটার কথাগুলো বড্ডই কাঠকাঠ, কিন্তু প্রতিটি কথা যেন একাকটা বেলচের আঘাত। … যেন প্রতিটি কথার মধ্যেই মহামহাজ্ঞান লুকিয়ে রয়েছে। আমি বললাম – আজকে আপনার সাথে বৈদ্যবাটিতে নেমে কি আপনার বাড়িটা দেখে আস্তে পারি!

রমেনদা – আপত্তি করার মত কনো কারণ নেই আমার কাছে। তাই আপনার মন বললে, সুস্বগাতম।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। অন্য কনো ভাবনাও আসেনি মনে। সরাসরি চলে গেলাম উনার সাথে, উনার বাসায়। ছোট বাড়ি। খাবার জায়গা ছাড়া দুটি ঘর। পিছনে বড় খোলা বাগান। তাতে নিমগাছ, আমগাছ, পিয়ারাগাছ, একটা পলাশ গাছ, আর তাদের ছাওয়ার তলায়, কিছুদিন আগের ছাঁটা ঘাস।

ছিলাম সেদিনকে প্রায় আরো দুই-তিন ঘণ্টা। সংসার বিষয়ক যেই প্রশ্ন হতো আমার, তাতে উনার উত্তর হতো এক কথায় কি দুই কথায়। আধ্যাত্মিক প্রশ্ন করলে, সেই উত্তর বড় হতো।

আমি প্রশ্ন করলাম – কতদিন হয়েছে বিপত্নীক আপনি?

উনি – ১০

আমি – মেয়ের বিয়ে কতদিন হলো?

উনি – ১২

আমি – আসেন না উনি এখানে?

উনি – সময় হয়না।

আমি – ফোন?

উনি – মাঝে মাঝে, ১০ দিনে একবার।

আমি – নাতিপুতি?

উনি – এক নাতি। ৪ বছর আগে দেখেছি। এখন বয়স ১০। মুখ মনে নেই। ফোনে কথা বলে না।

আর সংসার বিষয়ে কথা বাড়াই নি। বুঝে গেছিলাম, সংসার নিয়ে উনার বিন্দুবিসর্গ মাথা ব্যাথা নেই। বললাম – কাজের মেয়ে আছে?

উনি – ঘর মোছে, আর সপ্তাহে একদিন বিছানার চাদর ইত্যাদি ভারিভারি গুলো কাচে।

আমি – রান্না!

উনি – ভাত আলুসেদ্ধ; দুই বেলা। সন্ধ্যায় চালভাজা, চিড়েভাজা। সকালে কাঁচা সবজি, দিশি মুরগির ডিমের সময়ে একটা করে হাফ বয়েল। আর সময়ে অসময়ে যেই সময়ে যেই ফল, সেই ফল।

আমি – আর বাকি সময় কাটে কি করে?

উনি ম্লান হেসে – বড় বড় গাছ আছে; অনেক পাখি আসে। ওদের দেখে প্রকৃতির থেকে শিক্ষা নিতে নিতে; ঠাকুরের কথা, রামপ্রসাদ, মিরা, কমলাকান্তের গানের মধ্যে থাকা গভীর দর্শন উদ্ধার করতে করতে, আর সেই সমস্ত কিছুর উপর ধ্যান করতে করতে, রাত হয়ে যায়। ঘুমিয়ে পরি। পরের দিন একই নিয়মে জীবন চলে।

আমি – চলে কি সেলামীর টাকাতেই?

উনি – স্ত্রী বেঁচে থাকতে, কিছু বই পাবলিশ করে ছিলাম; তাদের থেকে বছরে লওয়ালটি পাই। তা প্রায় ৮০-৯০ হাজার টাকা। আর সেলামি বাবদ বছরে দেড় লাখ টাকা। দুই মিলিয়ে, খেয়েপড়েও অর্ধেকের বেশি বেঁচে যায়।

আমি – স্ত্রী যাবার পর কি সম্পূর্ণ ভাবেই সংসার বিমুখ?

উনি – এক হাতে ধরে ছিলাম তাঁকে, ঠাকুর যেমন বলেছেন। স্ত্রীকে সরিয়ে নিতে, উনি জায়গা করে দিলেন, তাই দুই হাতেই ধরলাম চেপে। … আসলে সমস্তই নাটক। ধরে তো তিনিই ছিলেন চেপে, জন্ম থেকেই। আমি মূর্খ, তাই দেরিতে বুঝলাম, আর দেরি করে বোঝার জন্য, দেরি করেই তাঁকে জরিয়ে ধরলাম।

আমি – সংসার করার সময়েও তাঁতে মন থাকতো? … আসলে, আমি প্রায়শই বেলুরমঠ যাই। যাই বাড়ি ফিরি, অমনি সমস্ত কিছু ভুলে, কোথায় মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধের চিন্তা, পরের দিন অফিসে যাবার চিন্তা, পরের দিন সকালের বাজারের চিন্তা। ছেলের কলেজের ফিজ জমা দেবার চিন্তা। সব মিলিয়ে কোথায় সমস্ত কথা হারিয়ে ফেলি! দুতিন পরে মনে হয় যে সমস্ত হারিয়ে ফেললাম। তখন আবার বেলুরমঠ ছুটি।

উনি – মন হলো ধোপাবাড়ির কাপড়ের মতন। যেই রঙে ছোপাবে, সেই রঙের হবে। ঠাকুরের কথা। … একবার মন তাঁর রঙে ছুপে গেলে, আর কি সেই রঙ যায়! … যদি পাটোয়ারি বুদ্ধি রাখেন যে এই রঙেও ছোপাবো, সেই রঙেও ছোপাবো, তবেই রঙ ফিকে হয়ে যায়। আবার পালিশ মারতে হয়।

আমি – উপায় কি?

উনি – উপায় ঠাকুরের কথা। … ঠাকুর বলতেন না, বড় চম্বুক টেনে নিলে, আর ছোট চম্বুক টানতে পারেনা। কিন্তু কি বলতেন ঠাকুর, বড় চম্বুক টানতে পারে না। কেন? আলপিনের গায়ে মাটি লাগানো থাকে বলে টানতে পারে না। … কামিনী কাঞ্চন কাদা আলপিনের গা থেকে মুছে ফেললে, তবেই বড় চম্বুক টানে। … বেলুরমঠ যান তো। এই সমস্ত কথাই নিশ্চয়ই বলে সেখানে!

আমি – আজ্ঞে না, বলে না। … কিন্তু সংসার মানেই তো কামিনী কাঞ্চন, মানে কামনা বাসনা, ধন সম্পত্তি, নামযশ। এই সমস্ত কিছুর থেকে মন সরাবো কি করে?

উনি – ঠাকুরের কথাই সমস্ত কিছুর উত্তর মশাই। … জলে কচ্ছপ চলবে, মন থাকবে আড়ায় যেখানে ডিমগুলো আছে। … বড়লোকের বাড়ির কাজের লোকের মত থাকতে হয়; মালিকের ছেলেকে বলে আমার রাম, আমার শ্যাম, কিন্তু মনে মনে জানে, আমার ছেলে গ্রামে আছে। … মাছি হলে চলবে না; ওই ভাতেও বসবো, বিষ্ঠাতেও বসবো আর মধুও খাবো। যেদিন মধু পরবে পেটে, সেদিনই বদহজমে মৃত্যু। মৌমাছি হতে হয়, তবেই সংসারের কাজল ঘরে থেকেও, গায়ে একটুও কাজল লাগবে না।

আমি – কিন্তু মৌমাছি হবো কেমন করে?

উনি হেসে বললেন – ঠাকুরের বাণী গুলো শুনে তো ছেন, কিন্তু মাথামুণ্ডু বোধকরি বোঝেন নি। … বড়লোকের বাড়ির কাজের লোকের মত থাকবে, মালিকের ছেলেকে বলবে আমার রাম, আমার শ্যাম। কিন্তু জানবে তোমার ছেলে গ্রামে রয়েছে। … এর মানে বুঝেছেন?

আমার সাথে এতক্ষণ কথা বলে উনি বুঝে গেছেন, আমি হলাম সেই গোত্রের মানুষ, যে কিচ্ছু বোঝে না, কিন্তু সব কথাতে একটা বুঝি বুঝি ভাব দেখায়। তাই আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই বললেন – ওই যে আগে বললাম, মা আর মাসিমা, সেটাই। … বুঝলেন না তো! … মানে এই যে, যাকে মা বলেন, তাকে মাসিমা জানুন, আর যাকে মাসিমা বলেন তাঁকে মা জানুন। …

আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছিলাম না। তাই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ছিলাম। সেই দেখে উনি মাথা নেড়ে বললেন – ঠিক ঠিক জ্ঞান যে, ঈশ্বরই প্রকৃত জননী; আর জন্মদাত্রী হলেন সৎমা, মাসিমা বা ভিক্ষামা, যেটাই বলবেন। … আসলে আমরা সকলেই ব্রাহ্মণ। সকলেই ব্রহ্মজ্ঞান হৃদয়ে নিয়েই জন্মেছি। আর তাই আমাদের আসল মা আমাদেরকে ভিক্ষামায়ের কাছে রেখে দিয়েছেন, শিক্ষা অর্জন করে ব্রাহ্মণ হবার জন্য। তাই দেখবেন, জন্মের কালে সকলেই মুণ্ডিত অবস্থাতেই জন্মাই।

একটু থেমে আবার বললেন – বুঝলেন না এখনো তাই তো! … ঠাকুর বলছেন, ঠিক ঠিক জ্ঞান হওয়া দরকার যে, ঈশ্বরই আমাদের প্রকৃত জনক বা জননী, আর জন্মদাত্রী পিতামাতা আমাদের পালিত পিতামাতা। যার সেই ঠিক ঠিক জ্ঞান হয়, সে-ই জানে, তাঁর আসল সন্তান তাঁর গ্রামে। এখানে মালিকের ছেলেকেই আমার রাম, আমার শ্যাম বলে ফিরছি। … অর্থাৎ যেই পাটোয়ারি বুদ্ধি আপনারা ঈশ্বরীর সাথে খাটান, অর্থাৎ তাঁর নাম করছি, তিনি আমাদের সংসারকে ভালো রাখবেন, ঠিক তার উলটো পাটোয়ারি বুদ্ধি রাখতে হয়। যিনি রাখতে পারেন, তিনি কামিনীকাঞ্চনের জঙ্গলে থেকেও, মগলি বা টারজন হয়ে যান, যেমন ঠাকুর স্বয়ং।

আমি – মানে, ঈশ্বরই প্রকৃত পিতামাতা, এই সত্য জেনে, এই জগতের সমস্ত আত্মীয়-অনাত্মীয়, এমনকি পিতামাতা, স্ত্রীসন্তান সকলকে আমার রাম, আমার শ্যাম করে যাওয়া, কিন্তু মনে মনে জানা যে আমার সন্তান আমার গ্রামে, মানে আমার প্রকৃত আপনজন ঈশ্বর – এই বোধের কথা বলছেন?

উনি হেসে বললেন – আমি বলছি না, ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব বলছেন। আমি তো তাঁর কথার অনুসরণ করছি মাত্র, তাও তাঁর কৃপাবশত, যতটুকুনি তিনি করাচ্ছেন, ততটুকুনিই করতে পারছি।

আমি একটু অবাক হয়েই বললাম – এতো ভয়ঙ্কর কথা মশাই! … এতো গুহ্য কথা উনি বলে দিলেন এমন হেলায়! … এই কথা তো মানতে গেলে, বুকে খুব ধক চাই মশাই!

উনি হেসে বললেন – তা তো চাই। সাধন করা, সে কি মুখের কথা। শ্রেষ্ঠ বীর বলে যাদেরকে সমাজ মানে, তারাও এই দ্বারে এসে কেন্দাই হয়ে যায়।

আমার অবাক ভাব তখনও যায়নি। আমি সেই একই অবাক ভাবেই বললাম – এর অর্থ, যার মন এই সত্য জেনে নিয়েছে আর সম্পূর্ণ ভাবে মেনে নিয়েছে যে একমাত্র ঈশ্বরই নিজের আপন, বাকি কেউ কনোকালেই আপন হননি, হতেও পারেন না, তিনিই কি তবে সাধন করতে পারেন?

রমেনদা এবার হেসে বললেন – হ্যাঁ, এটাই হল ঠাকুরের এই কথার গুহ্য ও মূল অর্থ। কিন্তু তারপরেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। অত সহজে কি আর হয়।  … দশবার মুখে মুখে আওড়ে নিলাম, ঈশ্বরই আমার জনকজননী, আর কেউ নেই আমার, ব্যাস তাহলেই কি যাদের সাথে কামনাবাসনার সম্পর্ক, সমস্ত কেটে যায়! … ওই ঠাকুর বলতেন না, আচারের ব্যরাম, আর ঘরে আচারের শিশি, রোগ কি করে সারবে!

আমি – এর মানে?

উনি – যদি মন ঠিক ঠিক বুঝে যায় যে, ঈশ্বরই সত্য, বাকি সমস্ত কিছু অনিত্য, তারপরেও তো এতকালের কামনাবাসনার সম্পর্ক যাদের সাথে, তাদের প্রতি আসক্তি বিরক্তি যায়না। এতকালের অভ্যাস দুপুর বেলা আচারের শিশি থেকে আচার খাওয়া। আজ হঠাৎ রোগ হয়েছে, তাই আচারের শিশি দেখেও লোভ সামলানো যায়! … তাই ঠাকুর বলেছেন, নির্জন বাসের কথা। … নির্জনে দই পাতার কথা বলেছেন ঠাকুর। প্রথম অবস্থায় বেড়া দিতে বলেছেন, নাহলে গরুছাগল সমস্ত গাছ খেয়ে চলে যাবে।… গায়ে হলুদ মেখে জলে নামতে বলেছেন, যাতে কুমিরে না ধরে।

আমি – একা একা থাকতে হবে? আর গায়ে হলুদ মানে?

উনি – বৈরাগ্য। বৈরাগ্য না জন্মালে, কামিনীর গায়ের গন্ধ যে আচারের শিশির মত আকর্ষণ করবে। … স্ত্রীর সাথে লেপটে বিছনায় শুলে যে, কামনার ফাঁদে পা দিতেই হবে। … একটি সন্তান হয়ে গেলে, আলাদা ঘরে থাকুন। নির্জনে থাকুন। স্ত্রীর প্রতি, সন্তানের প্রতি কর্তব্য করুন, কিন্তু ওই আমার রাম, আমার শ্যাম। মনে মনে জানবেন, তাঁরা আপনার কেউ নয়।

আমি হেসে বললাম – স্ত্রী যদি আপত্তি করে?

উনিও হেসে বললেন – দুইতিন রাত্রি না ঘুমিয়ে, সিংহের গর্জন করে নাকডাকুন। … রামপ্রসাদের গানটা শুনেছেন তো, আপনি চলে গেলে, দেবে গোবর জলের ছড়া। … আপনার নাকডাকাতে ঘুম না এলে, দুদিন পরেই অশান্তি করবে। সেই অশান্তির রেশ ধরে পাশের ঘরে চলে যান। আস্তে আস্তে সেখানেই থাকুন। কর্তব্য করুন, আমার রাম, আমার শ্যাম করুন, আর সেখানেই নির্জনে থেকে নিজের সাধনা করুন। … বুঝতে পারছেন না তো! … ছোটবেলায় মায়ের সাথে করতেন। মা ঘুমিয়ে পরলেই, পাস থেকে উঠে পা টিপে টিপে উঠে যেতেন। সেটাই করুন আবার। … এতদিন, যারা আপনার আপন নন, কিন্তু আপন হবার অঙ্গিকার করে এসেছে, তাঁদের জন্য ঈশ্বরের সাথে পাটোয়ারি করতেন। এবার ঠিক উল্টোটা করুন। … যে আপন, তাঁর কাছে যাবার জন্য বাকি সকলের সাথে পাটোয়ারি করুন। …

আমি – এ আমার দ্বারা হবে না। … এর থেকে তো সন্ন্যাস নিয়ে নেওয়া ভালো!

উনি এবার উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠে বললেন – দীক্ষা নিয়েছেন, ভক্ত আপনি। নিজের ভক্তির বহর নিজেই দেখুন। সামনে আঙুর রয়েছে দেখলে, আঙুর না খেয়ে থাকতে পারবেন না, তাই আঙুর ছেড়ে পালাচ্ছেন হ্যাঁ! … কোথায় পালাবেন মশাই! …আঙুর আপনার সামনে নয়, আপনার মনের মধ্যে রয়েছে। … যেখানেই তাকাবেন, সেখানেই আঙুর। … কামনাবাসনা হলো রিপু। রিপু মানে বোঝেন? শত্রু। … শত্রুর থেকে পালিয়ে কে কবে শত্রুদমন করেছেন মশাই! … শত্রুর মুকাবিলা করেই শত্রুর দমন সম্ভব।

আমি – কিন্তু এতো ঠকানো হয়ে যাচ্ছে, তাই না!

রমেনদা – কাকে ঠকাচ্ছেন? এতকাল কাকে ঠকিয়েছেন? … যিনি আপন, তাঁকে এতদিন ঠকাতে একবারও মন কাঁপল না, আর যে আপন না হয়েও আপন হবার সং করছে, তাকে ঠকাতে আদর্শভাবের জন্ম হচ্ছে! … তাহলে বুঝে গেলেন। … কিচ্ছু হবেনা। যতই বেলুরমঠ-বাড়ি করুন, আর যতই দীক্ষা নিন। শুধু বেলুরমঠ কেন, সমস্ত জায়গা থেকে দীক্ষা নিয়ে নিন, কিন্তু কিচ্ছু হবে না। যতক্ষণ না, তাঁকে সর্বেসর্বা জ্ঞান করে, নিজের জীবনকে তাঁর কাছে অর্পণ করতে পারছেন, ততক্ষণ হাজার দীক্ষা, হাজার ঈশ্বরকথা, হাজার গীতাপাঠ, হাজার নামাজ পরলেও, কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু হবেনা। সেই এক, জন্মালাম মরলাম, মরলাম জন্মালাম, করতে থাকুন ডেলিপেসেঞ্জারি।

সেদিনের মত উঠবো ঠিক করলাম এবার। একটু হতাশ হয়েই ঠিক করলাম। ওঠার সময়ে শেষে বললাম – আমি কিন্তু তাঁর কাছে যেতে চাই।

উনিও আবার হেসে বললেন – গায়ে বরফ ঘষে জলে চান করা যায় না মশাই। … বরফ ঘষায় মন থাকলে, সেটাই করুন। আর যদি জলে চান করতে ইচ্ছা হয়, তবে বরফকে ডিপফ্রিজে ঢুকিয়ে রেখে, জলে স্নান করুন। … বুঝলেন না তো? স্ত্রী আর বনিতা, এক ঘরে থাকতে পারেনা। … হয় স্ত্রী থাকবেন, নয় বনিতা। … আমার কড়া কথার জন্য ক্ষমা করবেন। … আজকের সমাজে যারা নিজেদেরকে ভক্ত বলে দাবি করেন, তাঁরা ঈশ্বরকে সেই বনিতার আসনই দিয়েছেন। … তাই, লুকিয়ে লুকিয়ে, তাঁর সাথে দেখা করতে যান।… আপনার স্ত্রী জানেন, আপনি আজ বেলুরমঠে এসেছেন, বা প্রায়শই আসেন!

আমি – আজ্ঞে না… আর কি বলি মশাই, যদি জানে, তাহলে ভক্তির ঢং করে বলে আমিও সঙ্গে যাবো।

উনি হসে বললেন – বুঝলেন তো, স্বামীকে বনিতার কাছে একা কি করে ছাড়ে? … যাই হোক, যদি তাঁকে বনিতাই ভাবতে থাকেন, তবে যেমন চলছে, তেমনই চলবে, আর সেটা আল্টিমেটলি জন্ম-মৃত্যু, মৃত্যু-জন্মের ডেলিপেসেঞ্জারি হয়েই থেকে যাবে। …

আমি বাড়ি চলে এলাম সেদিনে মত। ট্রেনে বসে, বাড়িতে এসে, মুরি চেবাতে চেবাতে, চা খেতে খেতে, উনার কথাগুলিই কানে বাজছিল। সত্যই তো, ঈশ্বরকে যেন বনিতার স্থানই দিয়ে রেখেছি আমি। যতই ভাবনা চলল, এই বিষয়ে, ততই নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। বাড়িতে একটা ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের পট আছে। রাত্রে শোবার আগে একটা লোকদেখানি প্রণাম করে শুতাম। সেদিনও লোক দেখাতে সামনে গেছিলাম। এত ঘৃণা জন্মাচ্ছিল নিজের উপর, যে ঠাকুরের দিকে তাকাতে পারলাম না।

বিছনায় শোবার পর, রোজকার মতন, স্ত্রীর সমস্ত হেঁসেলের কথা চলছিল। অন্যদিন একটু শুনি, মাঝে মাঝে কমেন্ট পাসও করি। সেদিন আর শুনতে ইচ্ছা করছিল না। মন প্রচণ্ড ভারি। চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল। সত্যিই তো, ঈশ্বরকে বিনীতা বানিয়ে রেখেছি। যখন খেয়াল হলো গেলাম, যখন কাজের চাপ গেলাম না। … আর গেলেই, এতো এতো দাবি। এই চাই, ওই চাই। দীক্ষা নিয়েছি বলে যেন সাপের পাঁচ মাথা দেখে ফেলেছি। দাবি করে বলি, তোমার নাম করি, তার পরেও এমন দুর্দশা কেন?

ঈশ্বর তো সত্যই আপন। তাঁর কারণেই আমরা সকলে রয়েছি। তিনিই তো আছেন, বাকি সমস্ত কিছুকে সর্বত্র বলা হয় নাস্তি নাস্তি। … ঠাকুরও স্পষ্ট বলে গেছেন, আসল ছেলে গ্রামে; এখানে মালিকের ছেলেকে নিয়ে খালি আদিখ্যেতা করতে হয়। … নাটক করে গেছি সমানে, কিন্তু সেটা ঈশ্বরের সাথে। আর যাদের সাথে আমার কামনাবাসনার সম্পর্ক, তাঁদের তোষামোদ করে গেছি। শরীর সর্বস্বজীব একটা। যখনই কিছু বলা হয়, তখনই কি বলি, শরীরখারাপ হলে তারাই তো দেখে। … কিন্তু এই শরীরটাই যে আমি নই। …

এতকিছুর মধ্যে ঘুমিয়ে পরলাম। তবে এই মনের মধ্যের বার্তালাপ একদিনেই শেষ হয়নি। তিনদিন পরস্পর চলে তা। আর তৃতীয়দিন সকালে গেল মাথা ধরে। খুম থেকে উঠে পর্যন্ত স্ত্রীর মুখঝামটা – মরে যাবো আমি। মরে যাবো। … তোমার জ্বালায় না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মরে যাবো।

অনেকক্ষণ এমন চলার পর, আমি বললাম – কি হয়েছে, একটু খুলে বলবে!

স্ত্রী – বলি ডাক্তার দেখাও। তোমার নাকডাকার জন্য তো আমাদের সকলের ঘুম লাটে উঠেছে।

আমার কানে কথাটা ঢুকতেই, আমার সারাশরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। … চোখগুলো জ্বলে উঠেছিল কিনা জানিনা। তবে হ্যাঁ মনে তো হয়েছিল, তেমনই। … মন আমার চঞ্চল হয়ে উঠলো।

আমি তড়িঘড়ি করে স্নান করে পোশাক পরে নিলাম। … স্ত্রী গর্জন করে উঠল – এত সকালে চললে কোথায়?

আমার মাথায় পাটোয়ারি বুদ্ধি খেলে গেল। বললাম – ডাক্তার দেখাতে।

স্ত্রী – এত সকালে কোন ডাক্তার তোমার জন্য বসবে শুনি!

আমি – কলকাতায় যাবো, ভাল ডাক্তার দেখাবো। আসছি।

স্ত্রী বললেন – খেয়ে গেলে না!

আমি – রাত্রে খাবো। … কখন ফিরবো কনো ঠিক নেই।

বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলাম। ডাক্তার দেখাতে নয়, যাচ্ছি রমেনদার কাছে। … মন ঈশ্বরীকে আজ খুব ধন্যবাদ দিচ্ছে। … মন বলছে, মা, আমি তোকে রোজ ঠকিয়েছি। রোজ তোকে আপন বলেছি, আর বনিতা বানিয়ে ছেড়েছি। … কিন্তু তোর স্নেহ ভাবনারও অতীত। ঠাকুর বলতেন, ঈশ্বরের জন্য সামান্য চোখের জলও বৃথা যায়না। … কি তিনদিন একটু চোখের জল ফেললাম, আর তুই গলে গেলি! … তোকে জানার মার্গ খুলে দিলি রমেনদার মাধ্যমে, স্ত্রীর থেকে দূরে থাকার উপায় করিয়ে দিলই নাকডাকিয়ে! … মা অতো তত্ত্ব তো আমি বুঝি না। কিন্তু এটুকু বুঝে গেছি, তুই আমার নিজের মা। … নাহলে ছেলের এই একটিবার চোখের জলে তুই নরম হতিস!

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9