ধর্মপ্রজ্ঞা – সত্য মার্গ

সেই সময়কালের জন্য দেবী ধরিত্রীকে নিজের মনের প্রশ্নসমূহকে অপ্রকাশিত করেই রাখতে হলো। তবে অতি সন্তর্পণে তিনি সেই সমূহ প্রশ্নকে নিজের কাছে গচ্ছিত রেখে দিয়েছিলেন। আর তাই যখন সপ্তকলার বিস্তারের শেষে মৃষু সর্বাম্বাকে পাঠ প্রদান করছিলেন, তখন তিনি তাঁর সেই সকল প্রশ্নের উত্তর পেতে থাকলেন। আর তা লাভ করে তিনি সেই সমূহ উত্তরই প্রদান করলেন মীনাক্ষীকে যখন মীনাক্ষী শ্রীপুর রাজ্যের স্থাপনার জন্য এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।

সেই পাঠ প্রদানের পূর্বে এক বিচিত্র পরীক্ষাও নিয়েছিলেন দেবী ধরিত্রী, তবে সেই বিচিত্র পরীক্ষার মাঝেই মীনাক্ষীর মধ্যে সন্দেহ জাগে যে, যিনি তাঁর এই পরীক্ষা নিচ্ছেন, তিনি সাধারণ কেউ নন। আর তাই তিনি দেবী ধরিত্রীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন যে, “দেবী, আপনি আমাকে পরীক্ষা করছেন, অতি উত্তম কথা। কিন্তু আমাকে বলুন যে এই পরীক্ষায় আমি উত্তীর্ণ হতে পারলে, কি লাভ করবো?”

দেবী ধরিত্রীর সেই কথা শুনে মনে হয় যেন মীনাক্ষী কর্মফলের চিন্তা করছে। তাই তিনি মীনাক্ষীকে কনো মৌলিক বস্তু দেবেন না এমন ভাবনা রেখে, মিষ্ট হেসে বললেন, “আমি তোমাকে ধর্মপ্রজ্ঞা প্রদান করবো যদি তুমি আমার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারো”। মীনাক্ষী সেই কথাতে কেবলই মৃদু হাসলেন আর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার দিকে মনোযোগ স্থাপন করলেন। আসলে মীনাক্ষীর এই প্রশ্ন করার উদ্দেশ্যই ছিলো তাঁকে যিনি পরীক্ষা করছেন, সেই দেবীর ভেদ জানা। যেই মুহূর্তে তিনি ধর্মপ্রজ্ঞা প্রদানের কথা বলেন, মীনাক্ষী তৎক্ষণাৎ বুঝে যান যে উপস্থিত দেবী অন্য কেউ নন, স্বয়ং ধরিত্রী দেবী। সন্দেহ তাঁর পূর্বেই ছিলো, কেবলই নিজের ধারণার সত্যতা জানার উদ্দেশ্যেই তাঁর সেই প্রশ্ন ছিলো, যা শুনে ধরিত্রী দেবীর মনে হয়েছিলো যে মীনাক্ষী কর্মফলের চিন্তা করছে।

অতঃপরে, মীনাক্ষী যখন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যায়, তখন দেবী ধরিত্রী তাঁকে প্রশ্ন করলেন, “বলো পুত্রী, ধর্মপ্রজ্ঞার কি অধ্যায় থেকে বিবরণ শুরু করবো আমি?”

উত্তরে মীনাক্ষী বললেন, “মাতার থেকে আপনি যা কিছু জেনেছেন দেবী, তা আমি ইতিমধ্যেই জেনেছি মাতা সর্বশ্রীর থেকে। যা জানিনা, তা হলো মৃষুর থেকে আপনি যা জেনেছেন, সেই কথা। তাই আমাকে সেই আদি ধারণ থেকে বিবরণ প্রদান করুন, কা আমার জ্ঞানপরিধির অতীতে স্থিত”।

দেবী ধরিত্রী মীনাক্ষীর মেধার সন্ধান পেয়ে হাস্যবেশে নিজের ধরিত্রীরূপ ধারণ করে বলতে থাকলেন, “মৃষু শিশু সর্বাম্বার সম্মুখে বনজ জীবজন্তুর বিষয়ে অবিরাম ভাবে বলতে থাকতো। সেই সুত্রেই একবার বালিকা সর্বাম্বা প্রশ্ন করলেন মৃষুকে, ‘আচ্ছা পিতা, আপনি এই বনজ জন্তুদের কথা কেন বলতে থাকেন? এর থেকে আমাদের শেখার কি আছে? আমরা তো আর বনে থাকিনা, তাহলে আমাদের সেই কথা জেনে কি লাভ? তাদের জীবনসমগ্রাম জেনে, আমরা কি লাভ করতে পারি?”

মৃষু হাস্যমুখে বললেন, “পুত্রী, ঠিক যেমন করে যিনি আজ আচার্য তিনি একসময়ে ছাত্র বা ছাত্রীই ছিলেন। আর সেই ছাত্র বা ছাত্রীর অভিজ্ঞতাকে সংগ্রহ করেই তিনি আজ একজন আচার্য। তেমনই পুত্রী, আজ যাদের তুমি মানুষ বা তার থেকেও উন্নত নির্বাণ যোনিতে স্থিত থাকতে দেখবে, জেনে রেখো সেই প্রতিটি মেধা একসময়ে পূর্বের এই সমস্ত যোনিদের দেহ ধারণ করে করেই আজ মানুষ বা তার থেকেও উন্নত নির্বাণ যোনির দেহ ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। পুত্রী, তাই এমন মনে করা অহেতুক এবং অজ্ঞানতা সমান যে, মানুষের সংগ্রাম এই জীবজন্তুদের সংগ্রামের থেকে বিচ্ছিন্ন”।

“সত্য তো এই যে, মানুষ বা নির্বাণ যেই যেই মনোবৃত্তি নিজেদের মধ্যে সঞ্চিত রেখে আজ মানবের চরিত্র ধারণ করে রয়েছে, সেই মনোবৃত্তি এই সমস্ত জীব দেহে বিরাজ করার সময়কাল থেকেই তারা লাভ করেছে। তাই এই সকল জীবের মনোবৃত্তি যতক্ষণ না অনুভব করবে, ততক্ষণ মানবের মনোবৃত্তির কথা জানা সম্ভবই নয়। আর যদি মানবের মনোবৃত্তি না জানতে পারো, তাহলে মানব সত্যকে কেন অদেখা করে, আর মিথ্যার প্রতি কেন আকৃষ্ট থাকে, বা কি কারণে তারা এরূপ মনোবৃত্তি রাখে, তার কনো ধারণাই তুমি লাভ করবে না”।

“আর যদি তা না লাভ করো, তাহলে মানবকে তাঁদের লক্ষ্য থেকে কি কি ভাবনা ও মনস্তত্ব দূরে সরিয়ে রেখেছে, তাও জানতে পারবেনা। আর তা না জানতে পারলে, মানবকে লক্ষ্যের পথে পুনরায় স্থাপন করাও অসম্ভব হয়ে থেকে যাবে। তাই, এই সমস্ত কিছুর কারণে, বনজ জীবজন্তুর সত্য জানা আবশ্যক পুত্রী”।

মৃষু এমন বললে, বালিকা সর্বাম্বা সম্পূর্ণ ভাবে নিজের মেধাকে ধ্যনস্থ করে নিজের পিতার ভাবধারাতে, আর তা দেখে মৃষু বনজ জীবদের চরিত্র সম্বন্ধে বিস্তারে বলা শুরু করলেন। মৃষু বললেন, “পুত্রী, একই পরিস্থিতিতে একজন বলশালী ও একজন দুর্বল উপস্থিত হলে, বা একজন দ্রুতগামী এবং একজন মন্থর পতিত হলে, বা একজন অস্ত্রধারী ও একজন নিরস্ত্র পতিত হলে, তাদের আচার আচরণ সমস্ত কিছু পরিবর্তিত হয়ে যায়। সেই কারণেই তৃণভোজীর মধ্যেও এতো ভেদ, আবার মাংসাশী বা উভোভোজীদের মধ্যেও এতো ভেদ”।

“কনো তৃণভোজীর কাছে আছে অস্ত্র, তো কারুর কাছে আছে বল, আবার কারুর কাছে আছে গতি, আবার কারুর কাছে এঁদের মধ্যে যেকোনো দুটি আছে। একই ভাবে কনো মাংসাশীর কাছে আছে গতি ও বল, আবার কারুর কাছে গতি অধিক কিন্তু বল কম, আবার কারুর কাছে অস্ত্র অধিক কিন্তু গতি কম, এইরূপ ভেদ সর্বক্ষণ রাখা হয়, যাতে করে মেধা সমূহ এই সমস্ত দেহ দেহান্তরে যাত্রা করে করে, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারে কাল সম্বন্ধে, প্রকৃতি সম্বন্ধে, নিয়তি সম্বন্ধে এবং আত্ম সম্বন্ধেও”।

“এই অগ্রিম কথা বলে রেখে, এবার আমি তোমাকে একটি একটি করে বিভিন্ন জীবের বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে বলবো পুত্রী। বনের সর্বাধিক বসবাসকারীরা তৃণভোজী। তৃণ সঙ্গমে অপটু, প্রজাপতি বা মৌমাছির দৌলতে তাঁরা সঙ্গমে লিপ্ত হতে সক্ষম। তাই কাম্য লাভের উপায় নেই তাদের কাছে, আর সেই কামনা তাঁদের অন্তরে ঘন, গহন ও সুপ্ত। তাই তৃণভোজীদের মধ্যে সেই কামনার বিস্তার অধিক”।

“পুত্রী, খাদ্য কেবল আমাদের পুষ্টি প্রদান করেনা। খাদ্য আমাদের চারিত্রিক গুণাবলিও প্রদান করে। যা কিছু আমরা আহার করি, তাদের আবেগাদিও আমাদের মধ্যে প্রভাবের সঞ্চার করে। বনে ভ্রমণ করতে থাকলে দেখবে, একটি হরিণ বছর বছর একটি করে হিরণ শাবকের জন্ম দেয়, কিন্তু যেই হরিণকে চিতাবাঘের তারা খেতে হয়েছে, সে প্রায় দুই বছর সন্তানের জন্ম দেয়না। এর অর্থ এই যে, তৃণ আহার করে যেই কামনার সঞ্চার হয়, সেই কামনার বীজ থেকে মুক্তি পাবার একটিই উপায় আর তা হলো অস্বাভাবিক কঠোর পরিশ্রম। একমাত্র অস্বাভাবিক কঠোর পরিশ্রমই তৃণভোজীদের অন্তরে জাগ্রত হওয়া কামনার নাশ করতে সক্ষম”।

“কিন্তু এই অস্বাভাবিক পরিশ্রম যে অকারণে করা সম্ভবই নয়। আর যেহেতু সকলে প্রাণের শঙ্কা লাভ করেনা, তাই সকলে সেই অস্বাভাবিক পরিশ্রমও করেনা। আর তার ফলস্বরূপ হলো বনের জীব সংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশই হলো তৃণভোজী, আর এঁদের মধ্যেও অধিক হলো সেই জীব যারা সর্বক্ষণ মস্তক নিম্নমুখি করে তৃণ গ্রহণ করে। কেন? কারণ ভূমির সাথে সংলগ্ন তৃণ যে সঙ্গমে সক্ষম, কারণ একাধিক সেই তৃণের শেকড় ভূমিতলে গায়ে গায়ে অঙ্গাঙ্গী হয়ে স্থিত। কিন্তু তার পরেও তারা সঙ্গমে অপারঙ্গম”।

“কনো তৃণভোজীর চরণের চাপে, বা তাঁদের আহারের কারণে ছেদন করার কালে যখন একটি তৃণের শেকড় অন্য তৃণের শেকড়ের নৈকট্য লাভ করে, তখনই তাঁদের সঙ্গম হয়। বিচার করে দেখো, সঙ্গম সম্ভব অথচ সেই সঙ্গমের জন্য স্বয়ং অপারগ, এবং হাপিত্যেশ করে কারুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অর্থাৎ কামনা পূর্তি হবার পূর্ণ আশা রয়েছে, কিন্তু সেই আশার অন্তরায়ে থাকে অনিশ্চিত কালের অপেক্ষা। আর তাই এঁদের মধ্যে সর্বাধিক কামনার স্পৃহা, আর সেই কারণেই এঁদের প্রগতি ও প্রজননও সর্বাধিক”।

“আর সেই কারণেই, এঁদেরকে আহার করা তৃণভোজীদের মধ্যেও কামনার বিস্তার সর্বাধিক। আর সেই কারণেই সর্বদা দেখবে, হিরণ, গরু, ছাগল, মহিষ, জেব্রা, খচ্চর, এঁদের সংখ্যা স্তন্যপায়ীদের মধ্যে সর্বাধিক গতিতে বৃদ্ধি পায়। তবে, এঁদেরকে আহার যারা করে, তাদের কামনার জ্বালা অনেকাংশেই সীমিত, এবং সহজেই তা সীমাবদ্ধ করা সম্ভব হয়। কেন? কারণ তৃণদের থেকে লব্ধ কামনাকে এই জীবরা ধারণ করে, সেই কামনার প্রকাশ করে, একাধিক সন্তানের জন্ম দিয়ে দেয়। আর তাই, এঁদের কামনা তৃপ্ত হতে থাকে। আর যেহেতু এঁদের কামনা তৃপ্ত থাকে, সেই কারণে এঁদের আহার করলে যিনি আহার করছেন, তাঁর কামনা সীমিত থাকে”।

“অন্যদিকে থাকে সেই তৃণভোজীরা, যারা মস্তক নিচু করে আহার করেনা। অর্থাৎ যারা উঁচু বৃক্ষ থেকে ফল, পাতা ইত্যাদি আহার করে, যেমন জলহস্তী, হস্তী, গণ্ডার, জিরাফ এঁরা। এঁদের মধ্যে কামনার স্পৃহা কম হয়না, কিন্তু এঁদের আকৃতি বিশাল হবার কারণে কামনার অভিব্যক্তি এঁদের কাছে পীড়াদায়ক, আর তাই এঁদের কামনা সুপ্ত থেকে যায়”।

“আর তৃণভোজীদের মধ্যে শেষে থাকে ঘোড়া ও তার প্রজাতি। এঁরা দানা খায়, আর দানা মানে হলো বীজ। বীজ মানেই হলো উদ্যম, অনিশ্চয়তার অন্ধকারে স্থিত হয়ে থেকে, অক্লান্ত পরিশ্রমের সামর্থ্য। আর কামনা? তৃণ পদার্থদের মধ্যে এঁদের কামনা সর্বাধিক কম, কারণ এঁরা বীজ অর্থাৎ অপরিণত। আর তাই ঘোড়া প্রজাতির মধ্যে যেমন কামনা সীমিত থাকে, তেমনই দেখবে যে তারা একটি কাজে তীব্র ভাবে মনস্থির করতে যেমন সক্ষম, তেমন পরিশ্রমও অক্লান্ত ভাবে করতে সক্ষম। তা সেই কর্ম কামনা প্রকাশের উদ্দেশ্যে হোক, বা কনো সংশয় থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে হোক। আর সেই কারণে, মানুষের সর্বাধিক প্রিয় বাহন হলো ঘোড়া। তবে সেই বাহনের চোখে তারা ঠুলি পরিয়ে রাখে, কারণ একমাত্র সংশয় থাকলে তবেই এঁরা পরিশ্রমী, নয়তো এঁরা অলস”।

“পুত্রী, এবার আসবো এই তৃণভোজীদের যারা আহার করে, তাদের কথাতে। পরবর্তীতে আরো গহন ভাবে এই তৃণভোজীদের চরিত্রের আরো একটি দিক সম্বন্ধে বলতে ফিরবো, আর সেই দিক হলো আত্মসুরক্ষার দিক। তবে তা করার জন্য যা জানা আবশ্যক তা হলো মাংসাশীদের চরিত্র জানা, কারণ এঁদের চরিত্র না জানা হলে, এঁরা কাকে আক্রমণ করবে আহারের জন্য, শিকারের জন্য, আর কাকে আক্রমণ করবেনা, তা জানতে পারবে। আর তৃণভোজীদের আত্মসুরক্ষার চিন্তা যে মাংসাশীদের আক্রমণের চিন্তার উপরই ভিত্তি করে অবস্থান করে”।

“মাংসাশী জীবের মধ্যে সর্বাধিক সামর্থ্যশালী হলো সিংহ। শিকারের নীতি ও নিয়মের রচয়িতা সে। শিকারের আদর্শস্থাপক সে, আর যখন যখন এই আদর্শের পালন করা হয়না, তা যেই মাংসাশীই উল্লঙ্ঘন করুক সেই নীতির, এঁরা তাকে শাসন করে। আর এই শাসন করা স্বভাবের কারণে এঁদেরকে বনের রাজা বলা হয়। এঁদের নীতি অনুসারে সেই জীবকে আহার করেনা এঁরা যাদের কামনা পূর্তি হয়নি। অর্থাৎ যদি কনো সন্তানপ্রসবা হরিণকে এঁরা ভুল বসত আক্রমণ করে হত্যা করেও ফেলে, এবং তাদের মৃত্যুর কালে তাঁদের শাবকের জন্ম হয়, তাহলে এঁরা সেই মা হিরণকে আহার করেনা, কারণ সেই মা হিরণের কামনার পূর্তি না হওয়ার কারণে তাকে ভক্ষণকারী সেই সমস্ত কামনাকেও গ্রহণ করে নেবে”।

“সিংহ গতিশীল হলেও হরিণের গতি ধারণ করতে পারেনা, তাই তারা সাধারণ ভাবে হরিণ শিকার করেনা। আর হরিণ আকৃতিতে এতটাই ছোটো যে, এঁদের শিকার করার পরিশ্রম অধিক হয়ে যায়, নিজেদের উদরপূর্তির তুলনায়। সেই কারণেও এঁরা হরিণ শিকার করেনা। যদিও বহুকাল আহার না লাভ করলে, বাধ্য হয়ে শিকার করতে যায় এঁরা হরিণের। নাহলে এঁদের মূল শিকার হয় খচ্চর, মহিষ, গরু, জেব্রা, এই সব। আর যখন আহারের জ্বালা এমন হয়ে যায় যে এবার আহার না করলে দেহ রাখতে হবে, তখন এঁরা দঙ্গল মিলে হস্তী শাবক, জিরাফের শাবক, জলহস্তীর শাবক, বা গণ্ডারের শাবক শিকার করতেও যায়”।

“তবে সেই আক্রমণ সংঘবদ্ধ ভাবে করে তারা। এর প্রথম কারণ বিপরীত দিক থেকে আসা আক্রমণ। হস্তিনীর দল যদি একবার আক্রমণ করে দেয়, তাহলে আর একজনও বাঁচবে না। একই কথা জলহস্তী ও গণ্ডার ও জিরাফের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই এই বৃহৎ প্রাণীর শাবকদের আক্রমণ নিজেদের খিদে মেটানোর জন্য অন্তিম উপায় হয় এঁদের কাছে। আর দ্বিতীয় এক কারণ হলো কামনার স্পৃহা। আকৃতিতে বিশাল হবার কারণে, এঁদের কামনা অতৃপ্ত থাকে। অর্থাৎ তাঁদের আহার করলে সেই অতৃপ্ত কামনা এঁদেরকেও গ্রহণ করতে হবে। তাই এঁরা এই সমস্ত জীবের আহার থেকে বিরত থাকে”।

“এই শিকারিদের মধ্যে, অর্থাৎ সিংহের কুলের মধ্যেও দুই প্রকার শিকারি দেখা যায়। একটি হলো সিংহ, এবং দ্বিতীয় হলো সিংহী। সিংহের শিকার করার ধারা ভিন্ন এবং সিংহীর শিকার করার ধারা ভিন্ন। সিংহীর দেহভার কম। আর তাই এঁদের গতি অধিক। আর তাই এঁরা বেষ্টন করে শিকার করে। অর্থাৎ শিকারকে চারিপাশ থেকে এঁরা মুড়ে নেয়। প্রথমে তারা তৃণদের আড়ালে অদৃশ্য থাকে। ক্রমশ এঁরা এই বেষ্টনকে শিকারের নিকটে, আরো নিকটে আনা শুরু করে। আর যখন এঁরা শিকারের কাছে দৃশ্যমান হয়, তখন শিকার চারিপাশে কেবল সিংহীই দেখতে পায়”।

“সিংহী এই ভাবে ব্যূহ নির্মাণ করে শিকার করলেও, সিংহের শিকার করার ধারা ভিন্ন। সিংহ উন্নত ও গাণিতিক শিকারি। সে শিকার করার জন্য একটি স্থান নির্বাচন করে, সেখানে অপেক্ষা করে তৃণের আড়ালে। সিংহীরা তাঁর আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু বেষ্টন করে নেয়, অথচ দৃশ্যমান অবস্থায় সিংহীরা রয়েছে দেখে, শিকার মনে করে যে তাঁদের ভয়ের কনো কারণ নেই। সিংহ ঠিক এঁদের মাঝে অবস্থান করে, তবে তৃণের আড়ালে অদৃশ্য থেকে”।

“সেই স্থানে বসে বসে, সিংহ গতিশীল শিকারদের পালের দিকে নজর রাখে, আর হিসাব কষে যে, শিকারের অভিমুখ কেমন থাকলে কোন নির্দিষ্ট স্থানকে অতিক্রম করছেই শিকার। সেই নির্দিষ্ট স্থানকে নির্বাচন করে নিলে, এবার সিংহ প্রস্তুত হয়ে যায় যে সেই নির্দিষ্ট স্থানেই সে আক্রমণ করবে। এর পরবর্তী হিসাব সে কষে গতির। শিকারের গতিকে সে নিরীক্ষণ করে, আর নির্ধারণ করে যে, শিকার কোন স্থানে এসে গেলে, আর নিজের গতিকে সেই নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানো থেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেনা”।

“আর হিসাব করে যে, শিকার গতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যতক্ষণ সময়ের মধ্যে সেই নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হচ্ছে, সেই সময়ের মধ্যে সে নিজের অবস্থান থেকে সেই স্থানে পৌছাতে পারবে কিনা? যদি সেই হিসাব মিলে যায়, তো সিংহ এবার আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়, আর যদি দেখে সে যে এই হিসাব অনুসারে তার গতি কম পরে যাচ্ছে, তাহলে তৃণের মধ্য দিয়েই হামাগুড়ি দিয়ে নিজের জন্য সঠিক স্থান নির্বাচন করে নেয়”।

“এবার যখনই সে শিকারকে সেই স্থানে নিরীক্ষণ করে নেয়, যেই স্থান থেকে শিকার আর গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেনা, সে দেখে নেয় যে শিকারের অভিমুখ তাঁর নির্ধারিত নির্দিষ্ট স্থানের দিকে কিনা। যদি সমস্ত কিছু মিলে যায়, সিংহ নিজের শ্রেষ্ঠ গতি দ্বারা উপস্থিত হয় নিজের নির্ধারিত স্থানে আর নিজের দেহকে ভাসমান করে, শিকারের কণ্ঠনলি ধারণ করে সমস্ত পাল থেকে আলাদা করে নিয়ে সে চলে যায়”।

“পুত্রী, সাধারণ ভাবে সিংহ শিকার করতে আসেনা। সিংহীই শিকার করে। তবে যখন দীর্ঘকাল শিকার লাভ হয়না, আর সমস্ত সিংহের সংসার অভুক্ত থাকা শুরু করে দেয়, তখনই সিংহ শিকার করতে উদ্যত হয়। তবে সেই শিকার করার কালে, সিংহ কখনোই শিকার নীতির উল্লঙ্ঘন করেনা। যাকে সে ও তার পরিবার ভক্ষণ করবে, তাকে ছাড়া একটি প্রাণীকেও সে আহত করেনা। যাকে সে ভক্ষণ করবে, তাকে সে অহেতুক পীড়া কিছুতেই দেবেনা। কেবলই কণ্ঠনলি ধারণ করে থাকবে, তার প্রাণ ত্যাগের অপেক্ষা করে”।

“প্রাণ ত্যাগ হবো হবো করলে, টুটি ছেড়ে দেবে সে, আর শিকারকে মৃত্যুকালের শান্তি উপভোগ করতে দেবে। এই ভাবেই সে শিকারের শুদ্ধিকরণ করে। এছাড়াও, সিংহ শূকর আহার করেনা, আর আহার করেনা অন্য কনো মাংসাশী জীবের। শুকরের আহারের ফলে সুযোগ সন্ধানী ভাব অর্থাৎ দুর্নীতির ভাব প্রবল হয়ে ওঠে। আর অন্য মাংসাশী জীবদের মধ্যে অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামের কারণে, কামনার ভাব এঁদের অত্যন্ত কম হয়ে যায়। আর তাই এঁদের আহার করলে, পরিবার বিস্তারই অসম্ভব হয়ে যায়। তাই সন্তানের সুরক্ষার কারণে এঁদেরকে সময়ে সময়ে হত্যা করতে হয়, কিন্তু হত্যা করলেও আহার করেনা এঁদেরকে”।

“সিংহের শাসনের কারণে, সিংহীকেও এই সমস্ত নীতির পালন করতে হয়। আর তাই সিংহ হলো বনের রাজপরিবার, কারণ তারা কনো কারণে নীতির উল্লঙ্ঘন করেনা। কিন্তু এমন নয় যে, সেই নীতি সকল মাংসাশী জীব পালন করে। আর সত্য বলতে, বাঘিনী ছাড়া অন্য কনো মাংসাশী জীব এই ধারার পালন করেনা। সর্বাধিক বিরোধ করা স্থলচর মাংসাশীদের মধ্যে বাঘ অন্যতম, চিতা ও হায়নাও উপস্থিত এঁদের মধ্যে। আর জলচরদের মধ্যে এঁদের দৃষ্টান্ত হলো কুমীর। এই প্রাণীদের আক্রমণের কনো নীতিই নেই”।

“এঁদের মধ্যে বাঘ অধিক শক্তিশালী আর বাঘের কনো নিয়ম নেই শিকার করার। কেবলই দাদাগিরি স্থাপনের জন্য, সে যাকে তাকে যখন খুশী হত্যা করে দেয়। এই কারণে সিংহ ও বাঘের প্রায়শই যুদ্ধ হতে থাকে। আর শুধু সিংহের সাথে নয়, হস্তীও বিশেষ করে মদ্দা হস্তী সম্মুখে কনো বাঘ পেলে, তাকে আঘাত করে দেয়। তবে বাঘের এই স্বভাবের কারণে, বাঘিনীরাও বাঘের সাথে বসবাস করা পছন্দ করেনা। আর বাঘিনীদের এই নিয়মনিষ্ঠার কারণে, সিংহীদের কাছে বাঘিনীরা সম্মানীয়। আর তাই সিংহী যদি কনো শিকার করতে গিয়ে দেখে বাঘিনীরা পূর্ব থেকেই সেখানে বেষ্টন পদ্ধতি করা শুরু করে দিয়েছে, তারা সেই স্থান থেকে নিঃশব্দে চলে আসে। একই নীতির পালন বাঘিনীরাও করে সিংহীর ক্ষেত্রে”।

“পরে রইলো চিতা ও হায়না। চিতা হরিণ শিকারে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু এমন নয় যে সকল আক্রমণে সে সফল হয়। হরিণ অত্যন্ত দ্রুতগামী, আর তার থেকেও বড় কথা, হরিণ সর্বক্ষণ এক রেখায় দৌড়ায় না, আর সকল সময়ে সে শুধু দৌড়ায়ও না, সময়ে সময়ে সে লম্ফ দিয়ে অনেকটা দূরত্ব বাড়িয়ে নেয় চিতার সাথে। আর তারই সাথে বেশ কিছু হরিণের তীক্ষ্ণ সিং থাকে, যা অনেক চিতাকে ঘায়েলও করে, কখনো হত্যাও করে দেয় চিতাকে। তাই এমন নয় যে চিতা সহসা শিকার করতে পারে হরিণের”।

“আর তা পারেনা বলেই, সময়ে সময়ে সে শুকরের শিকার করে। আর যদি সিংহ একবার সেই সংবাদ পেয়ে যায়, তাহলে চিতাকে শিকার নিয়ে গাছের ডগায় উঠে পড়তে হয়, নাহলে সিংহ তাঁকে এই দুর্নীতি কিছুতেই করতে দেবেনা, এবং নাগালে এসে গেলে চিতাকে মেরেও দেবে সিংহ। এছাড়া চিতা সেই সমস্ত কিছুকে আহাররূপে গ্রহণ করার প্রয়াস করে, যাদেরকে সিংহ কেবল দণ্ড দেবার জন্য হত্যা করে। অর্থাৎ যাদেরকে সিংহ হত্যা করেও আহার করেনা। এই চৌর্যবৃত্তির কারণেও চিতাকে অনেক সময়েই সিংহের শাসনের শিকার হতে হয়”।

“হায়না অন্য দিকে দস্যু স্বভাবের। মাংসাশী পশুদের মধ্যে সব থেকে কম সামর্থ্যের অধিকারী হায়না। আর তাই এঁকে হামলা করে শিকার ছিনিয়ে নেবার কাজই করতে হয়। চিতা, বাঘিনী আর সিংহীদের উপর এঁরা সর্বাধিক এহেন হামলা করে। আর যদি একবার সিংহের বাকি টোলের কাছে এই সংবাদ পৌঁছে যায়, তখন একাধিক হায়নাকে সেদিন সিংহের শাসনের কাছে মৃত্যু লাভ করতে হয়। এঁর নিজের থেকে যদি কিছু শিকার করে আহার করতে পারে, তা হলো একমাত্র শূকর। তবে সেখানেও তাদেরকে সিংহের থেকে প্রতিরোধ সহ্য করতে হয়”।

“আর শেষে আসে কুমীর। সিংহ এই জীবকে একপ্রকার সহ্যই করতে পারেনা। না এটা সত্ত্বার লড়াই নয়। কুমীরের কীর্তিই এমন অভব্য এবং দুরাচার পরিপূর্ণ। যেখানে জলের সমস্ত জীব তার আহার হতে পারে, সেই অধিকার তার কাছে আছে, তবুও কুমীরের লালা ঝরে স্থলচরদের মাংসতেই। উদরপূর্তি হয়ে থাকলে শিকার করেনা এঁরা। সেই কাজ একমাত্র বৃক আর হায়নাই করে থাকে। তবে অত্যন্ত অলস প্রকৃতির হয় কুমীর। আর তাই এঁরা সুযোগসন্ধানী হয় তীব্র ভাবে”।

“এঁদের যেই অপরাধকে সহ্য করতে পারেনা সিংহ তা হলো তৃণভোজীদের অভিবাসনের কালে যখন অধিক অধিক সংখ্যক তৃণভোজী একত্রিত হয়ে স্থান পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করে, তখন এঁরা তৃণভোজীদের ভক্ষণ করতে সচেষ্ট হয়। সেই কারণে পুত্রী, যদি কনোদিনও অভিবাসনের দৃশ্য দেখো, তাহলে দেখবে বিশাল সিংহবাহিনী নদীতটে অপেক্ষারত থাকে। কুমীরদের অনাচার দেখলেই, তারা আক্রমণ করে দেয় কুমিরের উপর। আর এই কাজে সিংহের সহায়ক জলহস্তীও হয়, তবে জলহস্তীর মনস্থিতি ভিন্ন, তারা ন্যায় করতে এমন করেনা। আর যেহেতু বনে সর্বক্ষণ ন্যায় স্থাপনের ক্রিয়াতে সিংহ রত থাকে, সেই কারণে সিংহকে বনের রাজা বলা হয়”।

“এই সমস্ত কিছুর পরে যে পরে থাকে, সে হলো বাঁদর প্রজাতি এবং উভভোজী প্রজাতি যেমন ভাল্লুক ও গরিলা। বাঁদর নামই দেওয়া হয়েছে এঁদেরকে, কারণ এঁদের স্বভাবই উৎপাত করা আর অন্তর্ঘাত করা। বাঁদর ব্যঘ্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়, কারণ ব্যঘ্রের প্রায় সমস্ত দুর্নীতিপূর্ণ কাজে সে সহায়ক হয়। বার্তা প্রদান করা থেকে, শিকারকে পথভ্রষ্ট করিয়ে দিয়ে বাঘের কাছে এনে উপস্থিত করা, এই কাজের জন্য বাঁদর বনে এক ব্রাত্য জীব। অর্থাৎ প্রায় সমস্ত অন্য জীব বাঁদরকে অপছন্দ করে”।

“আর রইল প্রসঙ্গ গরিলা আর ভাল্লুকের, উভভোজীদের স্বভাব ভিন্ন। সামর্থ্য এঁদের প্রকাণ্ড, কর্মক্ষমতাও এঁদের বিশাল। তবে এঁরা শান্ত হয়, হিসাবি হয়, আর খাদ্যকে সুরক্ষিত ভাবে গ্রহণ করার উপায় সন্ধানে বিশ্বাসী হয়। পুত্রী, কন্দম ও মানুষও একই প্রকার, আর সপ্ত বিশেষ যোনির সকলেই এমন হবে, কারণ এঁরা সকলেই উভভোজী হবে। কেন? কারণ উভভোজী হবার অর্থ, আহার গ্রহণের জন্য চিন্তা কমিয়ে দেওয়া, অর্থাৎ বিচার করার সময় লাভ করা”।

“পুত্রী, কি আহার করলে কি হয়, আর কি আহার করা যায় বা যায়না, এই সম্বন্ধনিয় সমস্ত কথা জানলে তুমি। এবার আমি তোমাকে এই বনজদের এক ভিন্ন কথা বলবো। আর তা হলো নিজেদের প্রাণকে সুরক্ষিত করার প্রবণতা। পুত্রী, মনোযোগ দিয়ে এই কথা শ্রবণ করো, কারণ আমরা অর্থাৎ উন্নত সাতটি যোনি সর্বাধিক যেই মানসিক ব্যাধি আমাদের মধ্যে সঞ্চিত করে রাখি, তা এই সুরক্ষার ভাবনার কারণ থেকেই করি”।

“এই সুরক্ষা চিন্তার মধ্যে বেশ কিছু ধারা রয়েছে, যাদের প্রথমটিই হলো খাদ্য সুরক্ষা। খাদ্যসুরক্ষার অর্থাৎ পর্যাপ্ত খাদ্য লাভের সম্ভাবনার চিন্তা সকলকেই করতে হয়। তৃণভোজীদের সেই একই চিন্তা করতে বন থেকে বনান্তরে যাত্রা করতে হয়, যাকে বলা হয়, অভিবাসন। আর অন্যদিকে মাংসাশীদের তথা উভোভোজীদের খাদ্যকে সুরক্ষিত করে রাখার জন্য গুহার নির্বাচন করতে হয়। তবে শুধু আহারের সুরক্ষা করার জন্যই নয়, গুহার আবশ্যকতা পরে নিজের সন্তানের প্রাণের সুরক্ষার জন্যও”।

“তুমি বলবে, প্রাণের সুরক্ষার চিন্তা বাঘ বা সিংহকে কেন করতে হয়? পুত্রী, বাঘ বা সিংহ যতক্ষণ না কারুকে আক্রমণ করছে শিকারের জন্য, ততক্ষণ তাঁদের কনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি কেবলমাত্র গোষ্ঠী দ্বন্ধের কারণেই হতে পারে। কিন্তু এখানে সুরক্ষার চিন্তা থাকে শাবকের। আকাশের ইন্দ্র, গরুড় পাখি বাঘ, সিংহের শাবকদের শিকার করাই অধিক শ্রেয় মনে করে, কারণ এঁদের শাবকের আকৃতি ছোটো হয়”।

“এ ছাড়াও আলাদা আলাদা জীবের আলাদা আলাদা রকমের দুশ্চিন্তা থেকেই থাকে। মাংসাশী জীবদের সর্বাধিক দুশ্চিন্তার বিষয় হয় বুভুক্ষু অবস্থায় আহার লাভ। পুত্রী, এমন অনেক সময়েই হয়ে থাকে যে, প্রায় দুই সপ্তাহ ব্যাপী একটি বাঘ বা একটি সিংহ কনো প্রকার শিকার লাভ করেনি। আবার এমনও প্রায়শই হয় যে, ১৫ দিন পরে যখন একটি জেব্রা বা একটি বিচিত্র শক্তিশালী হরিণ শিকার করতে যায় তারা, তখন এঁদের থেকে পাল্টা আঘাত লাভ করে মুখ ফেটে যায় এঁদের। আর এর ফলে, আরো দিন ১৫ বা আরো অধিক সময় এঁদের অনাহারেই থাকতে হয়। আর এমনও অনেক সময় হয় যে সেই আঘাতের থেকে মুক্ত হওয়ার পূর্বেই তাঁদের জীবন অবসান হয়ে যায়”।

“এই গেল সাধারণ সমস্যা যা প্রতিটি বনের পশু সম্মুখে লাভ করে। এমন কখনোই নয় যে, তৃণভোজীরা এই সমস্যার সম্মুখীন হয়না। কেবল মাত্র গ্রীষ্মের তাপের কারণেই যে তাদেরকে বন ত্যাগ করে বনান্তরে যেতে হয়, তা কখনোই নয়। অধিকাংশ সময়েই এমন হয় যে, বনে আহার উপলব্ধ থাকলেও তাদেরকে বন ত্যাগ করতে হয়। আর এর কারণ হলো বৃক্ষ ও তৃণ। পুত্রী, এমন কখনোই নয় যে তৃণভোজীদের শিকার অর্থাৎ বৃক্ষ বা তরু কনো প্রকার বাঁধা দেয়না। তারা নিজেদের মধ্যে বিষের সঞ্চার করে, আর তাই আহার ত্যাগ করে অন্যত্র যেতে হয় তৃণভোজীকে”।

“পুত্রী, তৃণকে কখনোই দুর্বল ভেবো না। সমস্ত জীবের মতই তাদের শিকার করার জন্যও যথাযথ হিংসার প্রয়োজন, আর তার থেকেও বড় চিন্তার কারণ হয় এঁদের স্মৃতিশক্তি। একটি জীবের শিকার হওয়া থেকে বাঁচতে যদি একটি তৃণ বিষ সঞ্চার করে, তাহলে এমন নয় যে পরবর্তী দিন সেই তৃণকে আবার এসে ভক্ষণ করতে পারবে পশুটি। তরুটির স্মৃতিশক্তি তাঁকে সেই পশুকে সনাক্ত করিয়ে দেয়, আর তাই সেই পশুর আবেশকে অনুভব করার সাথে সাথেই বিষের সঞ্চার করা শুরু করে দেয়”।

“ক্রমে এমন হয় যে, সেই সম্পূর্ণ যোনিকেই সনাক্ত করে নেয় তৃণরাজি, এবং সেই বার্তা সকল সমগোত্রীয় তৃণদের মধ্যে ছড়িয়ে পরে। তাই তৃণভোজীকে তখন বনান্তরে যেতেই হয়, আহারের সুরক্ষার চিন্তা করে, কারণ পূর্বের বনে তারা আর কনো প্রকার শিকার করতে পারবেনা। এতো গেল সকলের সমস্যা। এছাড়াও আলাদা আলাদা যোনির জীবের আলাদা আলাদা সমস্যা থাকে”।

“উদাহরণ স্বরূপ, জলহস্তীর প্রয়োজন শান্তি। অশান্তি ও অরাজগতা এঁদেরকে বড়ই বিরক্ত করে। আর সেই কারণে, যদি একটি হরিণ ধরে নাও, একদিকে কুমিরের ফাঁদে আর অন্যদিকে বাঘের ফাঁদে পরে গিয়ে, কনো ভাবে প্রাণ রক্ষা করতে পারবেনা বলে চিৎকার করা শুরু করে, তবে জলহস্তী নিজের শান্তিকে সুরক্ষিত করতে সেই হরিণকে হত্যাও করে দেয়। তবে এমন নয় যে দুর্বল প্রাণী বলে সে হরিণকে হত্যা করে। একটি জলাশয়ে জলহস্তীর দল শান্তিতে জলসমাধি গ্রহণ করছে, সেই সময়ে যদি একটি কুমীর অহেতুক ক্রীড়া করে শান্তি নষ্ট করে, তাহলে জলহস্তী সেই কুমীরকেও আস্ত চিবিয়ে দেবে”।

“একই ভাবে হস্তির শান্তি ধুলো মাখাতে, শৃগাল প্রজাতির শান্তি একত্রে পরিবারবর্গ নিয়ে থাকাতে, ইত্যাদি ইত্যাদি, প্রতিটি যোনিরই কিছু না কিছু ভালো লাগা থাকে, আর সেই ভালোলাগাকে সুরক্ষিত করার চিন্তাও তাঁদেরকে ভাবিত করতে থাকে”।

“পুত্রী, এই সমস্ত চিন্তা জন্ম জন্মান্তরে করে করে, কখনো সুরক্ষিত থাকতে পারে, আর বাকি অধিকাংশ সময়তেই অসুরক্ষার চিন্তায় চিন্তিত থেকে তারা উন্নত যোনি অর্থাৎ কন্দম বা মানুষ বা আরো উন্নত যোনি হতে থাকে, যাদের সামর্থ্য অশেষ কারণ তারা কেবল জন্মসুত্রে লব্ধ বস্তুতেই আবদ্ধ থাকেনা, বরং তারা প্রকৃতি প্রদত্ত সমস্ত বস্তুর ব্যবহার করতে সক্ষম। … কিন্তু তা হলেও, এই জন্ম জন্মান্তরের চিন্তা থেকে তারা মুক্ত তো হতে পারেনা। আর তাই নতুন যোনির অশেষ সামর্থ্যকে প্রায়শই অদেখা করে থাকে তারা”।

“পুত্রী, এবার আমি তোমাকে, কন্দম, মানুষ বা নির্বাণ, এই সমূহ উন্নত যোনির চিন্তার কথা আর চিন্তা অনুসারে কর্মকাণ্ডের কথা বলবো। তাহলেই বুঝতে পারবে যে, কনো প্রয়োজন না থাকলেও, এরা কেন আর কিভাবে আত্মচিন্তায় বিভোর হয়ে থেকে ধর্মভ্রষ্ট হয়ে যায়। ধর্মভ্রষ্ট হবার কথা কেন বললাম? পুত্রী, সমস্ত পূর্বের যোনি ত্যাগ করে এই উন্নত যোনিতে স্থিতই হয় এক মেধা, সত্যকে ধারণা করবে বলে আর মিথ্যাকে ত্যাগ করবে বলে। কিন্তু এরপরেও, কেবলমাত্র পূর্বের দেহদেহান্তরের স্মৃতির কারনে, সত্যকে ধারণা করা থেকে নিজেদের অপসারিত করে, অসত্যতেই আটকে থাকে তারা। কি ভাবে? এবার তোমাকে সেই কথাই বলবো”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13