ধর্মপ্রজ্ঞা – সত্য মার্গ

মাতা দেবী ধরিত্রীর উদ্দেশ্যে বলতে থাকলেন, “পুত্রী, সেই সপ্ত বিশেষ যোনির মধ্যে প্রথম যেই যোনির আবির্ভাব হবে, তা হলো কন্দম। স্থলজীবীদের মধ্যে, আকৃতিতে এঁরা বিশাল রূপে প্রথমে অবতীর্ণ হবে। অতঃপরে, এঁরা তিন ধারাপাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। একটি প্রাথমিকের মতই বৃহৎ আকারেরই থাকবে। দ্বিতীয়টি হবে এঁদেরই অলস প্রজাতির শ্রেণী, যারা ক্রমশ বিভিন্ন আকৃতির বুকে হাঁটা জীব হয়ে উঠবে। আর তৃতীয়টি হয়ে উঠবে দুই পায়ে চলা, মুক্ত হস্তে থাকা, অতিলোমশ সাধারণ মাংসাশীদের মত দেখতে জীব”।

“যারা বিশালাকৃতির, তারা উভোভোজী হলেও, সরীসৃপ অর্থাৎ অলস কন্দমরা আলস্যের কারণেই মাংসাশী হয়ে উঠবে। কিন্তু এই তৃতীয় প্রজাতি, যাদেরকেই ইতিহাস কন্দম নামে স্বীকৃত করবে, তাঁরা কেবল উভোভোজীই থাকবেনা, তারা শস্যের উদ্ভাবনা করবে, এবং পশুচাষেরও। আর এই দুইয়ের ফলে, তাঁরা নিজেদের আহার করার পদ্ধতিকে অত্যন্ত ব্যাপক ভাবে সুরক্ষিত ও সহজ করে নেবে। আর তারই সাথে সাথে, এঁরা নিজেদেরকে বহু আরো কাজে নিযুক্ত করবে”।

“প্রথমত এঁরা সর্বত্র ভ্রমণ করা শুরু করবে। এবং ভ্রমণের কালে, বহু বস্তু, স্থান ও বিভিন্ন ভাবে প্রকৃতিকে দেখে, তাঁদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠে, প্রকৃতিকে জানার উপযোগিতা জানবে আর নিয়মের মধ্যে প্রকৃতির বিজ্ঞানকে স্থাপন করার প্রয়াস করে প্রকৃতির জ্ঞান ধারণ করবে। … পুত্রী, এই প্রথম যোনি নির্মিত হবে, যাদের মধ্যে স্ত্রী গোত্রের রূপ সুশোভিত হবে। এঁর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত যোনির মধ্যে পুরুষদের রূপই সর্বোত্তম হতে থাকবে। কিন্তু এই কন্দমদের স্ত্রীরা অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে নারীত্বের বিস্তার করা শুরু করবে তোমার বক্ষে”।

“যেখানে পুরুষরা হবে লোমাবলি দ্বারা আবৃত, এবং পেশিবহুল, সেখানে স্ত্রীরা কোমল দেহের অধিকারিণী হবে এবং একই সাথে মমতা, স্নেহের ন্যায় উন্নত ভাবের অধিকারিণী হওয়া শুরু করবে। এই সমস্ত ভাব তাঁদের তনুকে কোমল ও আকর্ষণীয় করে তুলবে, আর এই প্রথম স্ত্রীরা পুরুষদের যৌনকামনার পরিবর্তে, পবিত্রতা ও স্নেহশীলতার দ্বারা আকৃষ্ট করা শুরু করবে”।

“এঁরা নিজেদের প্রকৃতিজ্ঞানকে সময়ের সাথে সাথে উদ্ভাসিত করা শুরু করবে। আর সেই বিজ্ঞানের নিয়মিত পাঠ ও চর্চা এঁদেরকে অত্যন্ত বিশেষ যোনিরূপে স্থাপিত করবে। আর এমন হতে থাকলে, ব্রহ্মমলদের উস্কানিমূলক কথনের কারণে, পরমাত্ম ভীত হয়ে উঠবে এই যোনির থেকে, আর তাই এই যোনিকে বিনষ্ট করার চিন্তা করবে। কিন্তু তা করেও লাভ বিশেষ হবেনা, কারণ এই কন্দমদের মধ্যে পুরুষদের উগ্রতা যেমন থাকবে, তেমনই থাকবে স্ত্রীদের কোমলতা। আর তাই, এক কন্দম পুরুষ যতই অধিক উত্তেজিত হয়ে উঠুক পরমাত্মের কারণে, যতই অধিক আমিত্ব সর্বস্ব হয়ে উঠুক পরমাত্মের কারণে, স্ত্রীদের কোমলতা এঁদেরকে নরম ও পরোপকারী করতেই থাকবে, আর তাই পরমাত্মের সমস্ত যোজনা ব্যর্থ হতে থাকবে”।

“আর এমন হতে থাকলে, অবশেষে পরমাত্ম এবার হিংসার বীজ স্থাপন করা শুরু করবে এঁদের মধ্যে। আর সেই হিংসার বীজের কারণে, এঁরা প্রথমবারের মত ভিন্ন যোনির সাথে লড়াই না করে, অর্থাৎ আহারের জন্য সংগ্রাম না করে, নিজেদের মধ্যেই লড়াই শুরু করে দেবে। আর একবার এঁদের মধ্যে এই প্রথা শুরু হয়ে গেলে, সমস্ত যোনির মধ্যেই সেই পারস্পরিক হিংসার প্রবৃত্তি জাগ্রত হয়ে যায়, আর তাই সমস্ত যোনিতেই গোষ্ঠীদ্বন্ধের প্রথা শুরু হয়ে যায়”।

ধরিত্রী প্রশ্নসূচক ভাবে বললেন, “আরো এক প্রকার সংগ্রামের সূত্রপাত, অর্থাৎ বিচারের আবশ্যকতা আরো অধিক বৃদ্ধি পেয়ে যাবে! কিন্তু মা, এই অভ্যন্তরীণ সংগ্রামের সূচক কি হবে?”

মাতা হেসে বললেন, “স্ত্রী তথা ভূমি এবং আধিপত্যের অধিকার। একে অপরের স্ত্রীকে অপহরণ করে নেবার, অন্যের ভূমিকে ছিনিয়ে নেবার তথা অন্যকে উচ্চ পদ থেকে টেনে নামিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠবে। … আর হ্যাঁ, এতে বিচারের আবশ্যকতা অধিক ভাবে বৃদ্ধি পেলেও, এই বিচার পুরুষদের মধ্যে অত্যন্ত কম দেখা যাবে। স্ত্রীরাই হয়ে উঠবে বিচারশীল, আর এই কারণে তারা বিচারশীল হয়ে উঠবে, কারণ এঁরা নিজেদের ভূমিকা নিয়েই সন্দিহান হয়ে উঠবে। তাঁদের কারণে পুরুষরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করতে থাকে, এই তত্ত্ব তাঁদেরকে অত্যন্ত পীড়া দেবে, আর তাঁরা সর্বক্ষণ বিচারে রত হয়ে থাকবে যে, কি করলে পুরুষদের এমন আভ্যন্তরীণ সংগ্রাম থেকে দূরে রাখতে পারবেন”।

“এই বিচারের কারণে, কন্দম স্ত্রীরা উন্নত হয়ে উঠবে। কিন্তু যেই সংগ্রামের কারণে স্ত্রীরা বিচারশীল হবেন, সেই সংগ্রাম ক্রমশ বীভৎস আকার ধারণ করবে। আর সেই সংগ্রামের কারণে কেবল তাঁদের সংখ্যাই হ্রাস পায়না, প্রকৃতিরও অশেষ দুর্গতি হওয়া শুরু করবে, কারণ এঁরা প্রবলশক্তিশালী হয়ে উঠবে প্রকৃতির জ্ঞান ধারণ করে করে। … তাই একই সঙ্গে, দুটি ক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে এই কন্দমদের কেন্দ্র করে”।

“প্রথম ক্রিয়ার ক্ষেত্রে, আমি পরমাত্মকে বিরক্ত করে তুলবো এই পুরুষ কন্দমদের দ্বারা। কিভাবে? কন্দম পুরুষদের কারণে বাকি সমস্ত যোনির মধ্যে পরমাত্মের প্রতি যে ভক্তিভাব জাগা শুরু কন্দমদের আগুনের পূর্ব থেকেই হবে কারণ তাদের ইচ্ছার পূর্তি করছিল পরমাত্ম, তা হ্রাস পেতে থাকবে। তাই আমার প্ররোচনায় সে এক ভিন্ন তাঁরই নির্মিত গ্রহের সন্ধান করবে, যাকে তোমার বক্ষে আবিষ্ট করে, কন্দমদের বিনাশলীলার রচনা করবে সে”।

“আর দ্বিতীয়টি হলো আমার সেই পুত্রের জন্ম প্রক্রিয়া, যে এই সপ্তযোনির মহানায়ক হবে। পরমাত্মের সাথে বোঝাপরার মাধ্যমে, আমি আমার সেই পুত্রের জন্ম দেবো, যার নাম হবে মৃষু। পরমাত্ম তাকে সপ্তখণ্ডে বিভাজিত করে দেবে, আর আমি বিভাজিত হবো পঞ্চখণ্ডে আমার সেই পুত্রকে দেখভাল করার জন্য। সমস্ত মেধাদের মার্গদর্শন করে, আমার কথাকে তাঁদের কর্ণকুহরে পৌঁছে দেবার জন্যই এই পুত্রকে জন্ম দেবো আমি”।

“আর যাতে সেই কর্ম সে করতে সক্ষম হয়, তাই তাঁকে আর নিজেকে সাত ও পাঁচ খণ্ডে বিভাজিত করে, সমস্ত জগতসংসারের জ্ঞান তাঁর হৃদয়ে অঙ্কিত করা শুরু করবো। আর যাতে সেই অঙ্কন যথার্থ, সুস্পষ্ট এবং বাস্তবিক হয়ে ওঠে, তাই তাঁর সম্মুখে এক বিচিত্র সংগ্রাম সৃষ্টি করতেই, পরমাত্মকে আমি অনুমতি প্রদান করবো যাতে সে আমার এই প্রিয় পুত্রকে সাত খণ্ডে বিভাজিত করে, আর তাঁর মার্গ দর্শনের কারণে আমার তিন খণ্ডে বিভাজিত হবো, যেখানে আমি পূর্বেই আমার থেকে দুটি অংশকে মুক্ত করবো, যারা আমার সেই পুত্র, মৃষুর দেখভাল করবে”।

“এই সমস্ত অতিজাগতিক কৃত্য ঘটে চলবে কারণ অবস্থায়, যখন কন্দমদের বিস্তার হচ্ছিল। আর যখন এই সমস্ত কৃত্য সম্পন্ন হবে, তখন থেকে কারণ থেকে সূক্ষ্মে প্রকাশ করা শুরু করবে পরমাত্ম নিজের সমস্ত আবেগদের, যাদেরকে মৃষু নাম দেবে সাধ। … সেই সাধদের প্রকোপ কন্দমপুরুষদের উপর বর্তালে, তাঁরাও উগ্র আবেগপ্রবণ হয়ে উঠবে, আর সাথে সাথে পরমাত্মও সমস্ত কিছু গুলিয়ে ফেলে, সরাসরি তোমার বক্ষে আঘাত হানার প্রয়াস করবে”।

“কিন্তু এই একই কালে, বিচারের আত্মপ্রকাশ শুরু হয়ে যাবে কন্দমস্ত্রীদের মধ্যে। তারা উন্নত হয়াও শুরু করে দেবে, এবং উন্নতির উদ্দেশ্য হবে, এক পুরুষের নির্মাণ, যে বাকি কন্দমপুরুষদের মত আবেগ সর্বস্ব হবেনা, বরং বিচারশীল হবে। … আর যখন তারা এমন এক যন্ত্র নির্মাণ করে ফেলবে, যা তাঁদের মুক্ত করা ডিম্বকে প্রকৃতির বিভিন্ন পুষ্টিময় উপাদানের বীজ দ্বারা সিঞ্চন করতে সক্ষম হবে, তখন সাগরের গর্ভে স্থিত সেই গবেষণা কেন্দ্রে দুটি এমন সন্তানের জন্ম হবে, যারা কন্দম নয়”।

“এঁদের একটি হবে কন্যা সন্তান, যে অন্য কেউ নয়, স্বয়ং তুমি হবে ধরিত্রী। আর এই স্ত্রী হবে রূপে অসামান্য, মসৃণত্বক যুক্তা, এবং প্রায় বাহ্য লোমাবলি শূন্য তনুরূপী। এই স্ত্রী কন্দম কেন নয়? কারণ এই স্ত্রী নিজের ডিম্বকে বাহ্যে মুক্ত করবেনা, বরং পুরুষের বীজ তাঁর গর্ভে উপস্থিত হয়ে, তাঁর ডিম্বাণুকে তাঁর গর্ভেই পরিপক্ক করে, এঁকে মাতৃত্বের ভূষণ প্রদান করবে। আর একই সঙ্গে একটি পুরুষ শিশুও জন্ম নেয়, যেও কন্দম নয়। কারণ না তো সেই পুরুষ লোমাবলিতে আচ্ছন্ন, আর না সে কন্দম পুরুষদের মত আগ্রাসী বা উগ্র”।

“পুত্রী, এই পুরুষ অন্য কেউ নয়, স্বয়ং মৃষু। মৃষুর প্রথম স্থূল শরীরে অবস্থানই হলো এই পুরুষদেহ। … তবে ধরিত্রী, একটি গবেষণার ফল সার্বিক ভাবে শুভ কখনোই হয়না। তাই একই সাথে, কন্দম স্ত্রীদের প্রয়াসে, তিনটি আরো পুরুষের জন্ম হবে, যারা মৃষুর ন্যায় কামনাশূন্য নয়, এবং তিনটি কন্যারও জন্ম হবে, যারাও তোমার মত কামনাশূন্য নয়”।

“তুমি আর মৃষু কামনাশূন্য হবার কারণে, কন্দম স্ত্রীদের প্ররোচনায় বিবাহ তো করবে, কিন্তু তোমাদের কনো সন্তান হবেনা। তাই তুমি কন্দমস্ত্রীদের সাথে একত্রিত হয়ে, তাঁদের নির্মিত সন্তান প্রসবের যন্ত্রকে অধিক উন্নত করবে, যাতে সঙ্গম না করেও, মৃষুর বীজকে সেই যন্ত্রে তুমি নিজের ডিম্বাণুর উপর স্থাপন করে, একাধিক তোমার আর মৃষুর সন্তান লাভ করবে। অন্যদিকে বাকি যেই তিনটি পুরুষ ও স্ত্রীর জন্ম হয়, তাঁরাও একে অপরকে বিবাহ করে একাধিক সন্তানের জন্ম দেবে”।

“মৃষুর সেই অবতারে নাম হবে লবণ, আর তাঁর নামেই তুমি নিজেকে ভূষিত করে, নিজের নাম রাখবে লাবণী। তোমাদের অর্থাৎ লবণ-লাবণীর সাথে যুক্ত থাকবে সেই তিনটি নারীপুরুষের দুটি নারীপুরুষ, আর তার কারণ হবে তুমি আর লবণ। যেখানে লবণের থেকে সকল পুরুষরা প্রভাবিত থাকবে, সেখানে তোমার প্রতি সকল স্ত্রীরা প্রভাবিত থাকবে। … আর অন্যদিকে, চতুর্থ নারীপুরুষ রূপে তোমাদের ন্যায়, বা তোমাদের থেকেও আরো সুন্দর অর্থাৎ তোমাদের মত হরিদ্রা বর্ণের বা শ্যাম বর্ণের না হয়ে, লালাভ বর্ণের হলেও, এঁরা কন্দম পুরুষদের থেকেও বিষাক্ত হবে”।

“যেখানে কন্দমরা দেহবল দিয়েই সংগ্রাম করবে, সেখানে এঁরা পরমাত্মের ও ব্রহ্মমলদের খল স্বভাবও পায়। আর এঁরাও নিজেদের কামনার জেরে এক সহস্র পুত্র ও পুত্রীর জন্ম দেবে, আর যেমন তোমরা কন্দম রাজ্যের পূর্ব উপকুলের সাগরতলের গবেষণাগারে স্থিত থাকবে, তেমন এই চতুর্থ দম্পতি ও তাঁদের সহস্র সন্তানরা পচিম উপকুলের সাগরতলের গবেষণাগারে অবস্থান করবে  … আর যখন এই সমস্ত প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়, ঠিক সেই সময়েই পরমাত্ম নিজের বাছাই করা একটি ক্ষুদ্র গ্রহকে ক্ষেপণ করবে তোমার বক্ষে”।

“সেই গ্রহের প্রভাবে, জলস্তর অত্যধিক ভাবে বৃদ্ধি পাবে তোমার বক্ষে, কারণ সকল মেধা খণ্ডরা হিল্লোল করে উঠবে। আর তারই প্রভাব এসে পরবে কন্দমদের রাজ্যে। কন্দমক্ষেত্র চার টুকরে ভেঙে যাবে সেই প্রবাহের কারণে, যার প্রথম টুকরো একটি ব-দ্বীপ হয়ে যুক্ত হবে উত্তর পশ্চিমে, যাকে আরব্য ক্ষেত্র বলে এর পরবর্তী যোনি মানব চিহ্নিত করবে। দ্বিতীয় খণ্ড পূর্ব দিকে যাত্রা করে চৈনক ভূমির সাথে যুক্ত হবে, এবং আমূল পরিবর্তন অনুভূত হবে এই স্থানে। মানব, লবণ আর লাবণীর নেতৃত্বে এই স্থানের প্রাথমিক নামকরন করবে ব্রহ্মদেশ। পরবর্তীতে সেই স্থান হয়ে যাবে জম্বুদেশ, আর শেষে এই স্থান হয়ে উঠবে গৌড় আর আরো শেষে হবে বঙ্গদেশ”।

“তৃতীয়স্তর যেটিই বৃহত্তর কন্দমভূমি তা জলমগ্ন হয়ে যাবে এই মহাপ্লাবনের ফলে, আর অবশিষ্ট চতুর্থ অংশতে সামান্য কিছু কন্দম অবশিষ্ট থাকবেন, আর তারা যুক্ত হবে মূল ভূখণ্ডের সাথে, যার পরবর্তীকালে নাম হবে দ্রাবিড় দেশ। তবে এই যুক্ত হবার কালে, মূল ভূমি আর কন্দম রাজ্যের মধ্যে যেই বিশাল সাগর অবস্থান করছে, সেই সাগর সঙ্কুচিত হয়ে গিয়ে, ধরিত্রী, তোমার বক্ষের সর্ববৃহৎ ও সর্বশ্রেষ্ঠ চঞ্চল পর্বতমালার জন্ম হবে, আর এই পর্বতমালাই এই দ্রাবিড় ভূমি আর বাকিযোনিদের বিচারণ ক্ষেত্র অর্থাৎ মূলভূমির মধ্যের প্রাচীর হয়ে স্থিত থাকবে”।

দেবী ধরিত্রী বললেন, “এর অর্থ চার খণ্ডে মানব যোনি প্রথম থেকেই বিভাজিত থাকবে। তাই তো মা?”

মাতা হেসে বললেন, “প্রাথিমিক ভাবে তা তিন ক্ষেত্রে বিরাজ করবে পুত্রী। একটি ক্ষেত্রে থাকবে লবণ লাবণী, এবং তাঁদের দুই সমর্থক পরিবার, এবং এঁদের সমস্ত সন্তানরা।  আরো একটি দিকে কন্দমদের থেকেও উগ্র যেই মানবযোনি, তারা স্থাপিত থাকবে। আর তৃতীয় ভাগে দ্রাবিড় ও তাঁদের পরিবাররা স্থাপিত থাকবে। তবে পরবর্তীতে এই ব্রহ্মদেশে সাগরের উপদ্রব এতই অধিক হয়ে উঠবে যে, লবণ ও লাবণীর বংশধররা ছাড়া, বাকি দুই কুল উত্তরে নবনির্মিত পাহাড়ি অংশে যাত্রা করবে”।

“সেখানে অবস্থান করার কালে, যেকালে গং গোষ্ঠী নিজেদের সেই শীতল বাতাবরণে মানিয়ে নেবে, সেকালে মুসি গোষ্ঠী সেই ঠাণ্ডায় নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখতে অক্ষম হয়ে উঠবে। আর তাই তারা সেই স্থানের থেকে উৎপত্তি হওয়া একটি নদকে অনুসরণ করে এই নব্য নির্মিত পাহাড় পশ্চিমে যেখানে সমাপ্ত হবে, সেখানে চলে যাবে”।

“লবণ ও লাবণীর নির্মিত ধারণাসমূহকে মুসি তথা গং উভয়েই অত্যন্ত সম্মান করবে, তাই তারা তা ধারণও করবে। এবং সময়ের সাথে সাথে, তারা সেই ধারণা থেকে আরো দুই পরিণত ধারণার সঞ্চার করবে, আর সেই ধারণাকে তারা নামকরণও করবে। যেখানে গংরা সেই ধারণাকে কেন্দ্র করে নিজেদের বোধকে জাগ্রত করতে সক্ষম হবেন বলে, তার নামকরণ করবেন বোধিসত্ত্ব, সেখানে মুসি লবণের থেকে প্রাপ্ত ধারণাকে ব্যক্ত করে, সেই ধারণার নামকরণ করবে মুসল”।

“আর ঠিক এই প্রকারে যখন সমস্ত কিছু চলতে থাকবে, তখন আরব্য অঞ্চলে যেই কন্দম নির্মিত মানবরা অবস্থান করবে, যারা নিজেদের পরমাত্মের পূজারি বা ইহু বলা শুরু করবে, তারা মুসির সম্মুখে আসবে, আর শুরু হয়ে যাবে সেই মানবীয় সংগ্রাম, যা মানবের অস্তিত্বের অন্তিম দিন পর্যন্ত চলবে”।

“সেই সংগ্রামের ফলে, একসময়ে এই ইহুদের ভগ্ন করা হবে। আর ইহুরা চারিপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়ে বিভিন্ন নদীমাতৃক মানবসভ্যতার সঞ্চার করবে, আর অবশেষে পশ্চিম প্রান্তে তথা পূর্ব প্রান্তে তথা দ্রাবিড়দের কাছে চলে যাবে তারা, আর পরমাত্মের পরাপূজার শুরু করে দেবে এঁরা। যন্ত্র, মন্ত্র তথা তন্ত্রের সঞ্চার করে, লবণ ও লাবণী, তথা বোধিসত্ত্ব, মুসলরা যেই বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যের হিল্লোল তুলবে, তার প্রতিউত্তর দেবে পরমাত্ম”।

“কিন্তু এরই মাঝে, যখন পরমাত্মের মনে হবে যে তার পূজা লাভের অভাব আসছে, তখন আবার করে এই মানবকুলের বিনাশের প্রয়াস করবে। মৃষু বোধিসত্ত্বদের মধ্যে, লবণের বংশধর যাদেরকে পরবর্তীতে জীন ও কাপালিক বলা হবে, তাদের মধ্যে, এবং মুসলদের মধ্যে বারংবার জন্ম গ্রহণ করে, নিজের সপ্তকলাকে জাগ্রত করে পূর্ণভাবে মৃষু হয়ে উঠবে”।

“আর মৃষুর এমন পূর্ণভাবে প্রকাশ আর তার পরমাত্মের বিরোধ পরমাত্মকে আরো উজ্জিবত করবে মানবের বিনাশ করার জন্য। তবে পূর্বে কন্দমদের স্বয়ং বিনাশ করার কালে যেই পূজা লাভে বাঁধা এসেছিল, তার কথা স্মরণ রেখে, পরমাত্ম এবার আমার হাতে মানবকুলের বিনাশের পরিকল্পনা করবে, আর সাথে সাথে তটস্থ করার প্রয়াসও করবে। অর্থাৎ সে প্রথম মানবকে ভয়ার্ত করার প্রয়াস করবে, আর তা করার জন্য, কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তার সাথে নিজের সমীকরণের ফলে যেই তিন মহাঘাতক অস্ত্র নির্মাণ করবে সে, সেই অস্ত্র মানবকে প্রদান করবে”।

“মানব সেই অস্ত্র লাভ করলে, ভয়ার্ত হয়ে সমস্ত ভাবে তন্ত্র, মন্ত্র ও যন্ত্রের বিস্তার করে, যাতে সেই অস্ত্র থেকে নিজেদের সুরক্ষিত করে রাখতে পারে। একই ভাবে একাধিক শ্রেণীর সঞ্চার হবে মানবের মধ্যে, যারা মানবকে উভোভোজী থেকে পুনরায় তৃণভোজী করে তুলে, তাদের বিচারের সামর্থ্যকে নাশ করতে আগ্রহী হবে। আর এই ভাবে সম্যক মানবকে নিজের দাসে পরিণত করার প্রয়াস করবে পরমাত্ম”।

“পুত্রী, পরমাত্মের সেই তিন অস্ত্র বড়ই ঘাতক হবে, যা তোমার বক্ষ সমস্ত স্থাপিত মেধাদের স্থূল অস্তিত্ব, অর্থাৎ বিচার করার সামর্থ্যকে বিনষ্ট করতে সক্ষম। তাই আমি সঠিক সময়ে মানবের নাশকারী এক বিচিত্র জীবাণুর নির্মাণ করবো, আর তা অন্তিমকালে মানবের উপর প্রয়োগ করে, মানব যোনির বিনাশও করবো। কিন্তু সেই উচিত সময় হলো তখন, যখন মৃষু আমার এই সমস্ত কথাকে বিবৃত করে, এক নূতন যোনি, নির্বাণ যোনির নির্মাণ করে, পরমাত্মের সাজানো আমার বিরোধী সাধকুলকে আমার দ্বারাই নাশ করিয়ে, পরমাত্মকে আমার চরণে দাস করে তুলবে”।

“পুত্রী, এরপর থেকে শুরু হবে আমার প্রত্যক্ষ ক্রিয়া, কারণ পরমাত্ম আমার চরণে স্থাপিত থাকার কারণে, সে আর কিছুতেই স্বেচ্ছাচারিতা করতে সক্ষম হবেনা, আর মৃষুর নির্মিত ব্রহ্মাণ্ডে কিছুতেই ব্রহ্মমলরা প্রবেশ করতে পারবেনা। আর তখনই স্থাপিত হবে এই ধর্মপ্রজ্ঞা পুত্রী। এই হলো ধর্মপ্রজ্ঞার বিকাশের পূর্বকথা, আর এই হলো ধর্মজ্ঞান”।

“পুত্রী, ধর্ম মানে যা ধারণ করতে হয়, অর্থাৎ যাকে ধারণ করলে, সত্য লাভ হয়। আর যাকে ধারণ করে সেই সত্যলাভ করতে হয়, তা হলো এতক্ষণ যেই জ্ঞানের কথা শুনলে সেই কথা। আমিই সত্য, আর আমি বাস্তবে শূন্য। আমিই একমাত্র সত্য আর আমি হলাম ব্রহ্ম। মমতা ধারণ করেই আমি ব্রহ্মময়ী বা আল্লাহ, যেই নামেই আমাকে বলো তা হলাম। আর আমারই সন্তান এই সকলে আমার ভ্রূণ অর্থাৎ মেধাকে ধারণ করেই অবস্থান করছে”।

“হ্যাঁ, এরা বহু নয়, এঁরা এক, কারণ আমি একটিই ভ্রূণের জন্ম দিয়েছিলাম। কিন্তু ব্রহ্ম থেকে ব্রহ্মময়ী হবার কালে যেই আমিত্ব, বা আত্মের জন্ম হয়, সেই ভ্রম আমিত্ব এঁদেরকে সহস্র খণ্ডে বিবাজিত করে দেয়, যাকে তুমি অর্থাৎ ধরিত্রী ধারণ করে অবস্থান করো। কেন আত্মকে ভ্রম বললাম? কি কারণে সে অস্তিত্বে প্রকাশিত হয়? পুত্রী, যেকালে আমি ছাড়া আর কিছুর কনো অস্তিত্ব সম্ভবই নয়, সেখানে আমি হলাম নিরাকারা, নির্বিকার। তাই যেই মুহূর্তে আমি মমতা ধারণ করলাম, সেই মুহূর্তেই একটি ভ্রমের সঞ্চার হয়, আর যেই মুহূর্তে আমি মমতা ধারণ করে মেধার জন্ম দিই, সেই মুহূর্তে সেই ভ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, কারণ যার দুই নেই, যার দুই সম্ভবই নয়, সেই একমাত্র ব্রহ্মই এক থেকে দুই হয়ে যায়”।

“অর্থাৎ আমি যে আমিরূপ এক থেকে আমি আর মেধা রূপ দুই হয়ে উঠলাম, এটিই একটি ভ্রম। আর যেইমুহূর্তে এই ভ্রমকে আমি স্বীকৃতি প্রদান করলাম, আমার ভ্রূণের প্রতি মমতা অর্পণ করলাম, সেই মুহূর্তে এক মহাভ্রমের বিস্তার হয়ে যায়। আর সেই মহাভ্রমই হলো আত্ম। নিজেকে এক থেকে দুই করার কালে আমি যা যা কিছু মলরূপ ত্যাগ করি, তাকে ধারণ করে সেই আত্মই হয়ে ওঠে পরমাত্ম, আর সেই মল ত্রিরূপ, তাই সেই তিনকে ধারণ করে পরমাত্ম হয়ে ওঠে ত্রিমূর্তি”।

“পুত্রী, এই সৃষ্টির জ্ঞান ধারণ করলে ব্রহ্ম থেকে কারণের সঞ্চারকে ধারণ করা যায়। এরপরে, সেই কারণ থেকে সূক্ষ্মের ক্রিয়াকে ধারণ করতে হয়, যা আমার পুত্র মৃষু পূর্ণরূপে এসে কৃতান্ত ও আদি কৃতান্ত রূপে স্থপন করবে। আর সেই সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে প্রকাশের কথা তোমাকে এতক্ষণ বললাম পুত্রী”।

“তাই সমস্ত জীব, বিশেষ করে সেই সপ্তযোনিতে বিরাজমান জীব, অর্থাৎ কন্দম, মানব, নির্বাণ থেকে কৃতান্ত যোনির ধর্ম হলো এই সমস্ত জ্ঞানকে ধারণ করে, উপলব্ধি করা যে, তারা বাস্তবে আত্ম নয়, বাস্তবে ইচ্ছা চিন্তা কল্পনারূপ ব্রহ্মমলের দাস নয়, বাস্তবে তারা চারভূতের সংরক্ষণে থাকা মেধা, আমার ভ্রূণ তারা। আর তা ধারণ করে, তাদের ধর্ম হলো এই সমস্ত কিছুকে উপলব্ধি করা, আর উপলব্ধির উপরান্তে সেই ধারাপাতের অনুসরণ করা, সেই ধারাপাতের পালন করা, যা তাদেরকে মেধা থেকে চেতনাতে পরিবর্তিত করে, আমার ভ্রূণ থেকে আমার সন্তানে পরিণত করে দেবে”।

“পুত্রী, অন্তিম উপলব্ধি অনুসারে, আমার সন্তানও পরম সত্য নয়। পরম সত্য কেবল ও কেবল মাত্র আমি। তাই মেধা আমার সন্তানের ভ্রূণ হলেও, চেতনা আমার সন্তান নয়, চেতনা মানে আমি স্বয়ং। মেধা যখন চেতনাদীপ্ত হয়ে উঠবে, তখন তার সাথে আমার কনো ভেদ থাকবে না, থাকা সম্ভবই নয়। কেবলই সে নিজের ভ্রম দেহকে ত্যাগ দিয়ে, সমস্ত স্থূলকে সূক্ষ্মে, সূক্ষ্মকে কারণে, এবং কারণকে ব্রহ্মে লীন করে যখন আমার সম্মুখে এসে স্থিত হবে, তখন তারা দেখবে যে, যাহা আমি, তাহাই তারা। অর্থাৎ আমারই ভ্রূণ অবস্থা হলো মেধা। আর আমার পুত্র মৃষু, কৃতান্ত কথাতে এই সত্যই বিবৃত করবে”।

ধরিত্রী প্রশ্ন করলেন, “সত্য কথন মা। যতক্ষণ না এই সমস্ত জ্ঞানকে উপলব্ধি করা সম্ভব হচ্ছে, ততক্ষণ যে মেধা থেকে চেতনা হয়ে ওঠার ধর্ম পালন সম্পূর্ণ ভাবে একটি অন্ধবিশ্বাস হয়ে থাকবে। তাই তুমি ধর্ম জ্ঞানের পরে ধর্ম ধারণের কথা বললে, অর্থাৎ যে ভাবে নিজের যা ধর্ম তার ধারণা বা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। … তাই মা, আমাকে এবার তুমি সেই ধর্ম ধারণের কথা বলো। আমিও জানার জন্য ব্যকুল হচ্ছি যে, এই পরম সত্যকে ধারণ কি করে করা যায়। যদি কারুর বিচার সামর্থ্যের জন্ম হয়েও যায়, তাও কি ভাবে এই সমস্ত ধর্মকে ধারণ করবে সেই মেধা?”

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13