ধর্মপ্রজ্ঞা – সত্য মার্গ

মা বলতে থাকলেন, “সমস্ত যোনির বিস্তার প্রক্রিয়া হতে থাকলে, পরমাত্ম নিজেকে এতটাই জরিয়ে ফেলবে তার সাথে যে, সেই বিস্তার কর্ম যে সে করছেনা, আমি করছি, সেটা সে জানতেও পারবেনা, আর মানতেও পারবেনা। পঞ্চভূতের মধ্যে একটি যে আমারই সেই সন্তান, যাকে সে স্বয়ং মৃত্যু প্রদান করতে চেয়েছিল, আর বাকি চার ভূত যে আমারই থেকে সৃষ্ট, সেই সত্যও সে ভুলে যাবে, এই আশায় যে সে এই সমস্ত যোনির ভগবান হয়ে উঠবে। আর তাই সে, আমার এই যোনিনির্মাণের পদ্ধতিকে সে সঠিক ভাবে পরখও করতে পারবেনা”।

“আমি যে স্থূল, সূক্ষ্ম বা কারণ, কনোটিতেই স্পষ্ট নই, কারণ বেশে আমি নিয়তি, সূক্ষ্ম বেশে আমি কালনিয়ন্তা, এবং স্থূল বেশে আমি প্রকৃতি, সেই সত্যও ভুলে যাবে পরমাত্ম। এমনকি এও ভুলে যাবে সে যে আমি প্রকৃতি অর্থাৎ যোনিসমষ্টিদের মধ্যে প্রকৃতি বেশে বিরাজমান মাত্র, অর্থাৎ মেধা হয়ে তাদের মধ্যে বিদ্যমান, সেই সমস্ত কথা সম্বন্ধেও বিভ্রান্ত হয়ে যাবে সে”।

“তাই, এক প্রকার সহজই হয়ে যাবে আমার পক্ষে এই যোনিবিস্তারকে চালিত করা। আমি প্রথম বৃক্ষের সঞ্চার করবো, এবং মেধাদের সম্পূর্ণ ভাবে জগতে বিস্তারিত করবো, বাকি চার ভূতের আস্তরণে। উদ্ভ্রান্ত পরমাত্ম গগনের দিকে মুখ করে বিরাজমান বৃক্ষ দেখে বিভ্রান্ত হয়ে এই মানতে থাকবে যে, সূর্য থেকে খাদ্য নির্মাণ করে, তা ভক্ষণ করে সেই তরুরাজিরা জীবিত রয়েছে। আসল কথা এই যে, তাপ যে বীণা মাধ্যমে সঞ্চারিতই হয়না, সেই সহজ সত্যটাই সে ভুলে যাবে, আর তাই জ্বলন্ত সূর্য, যা বিভিন্ন গ্রহের অন্তরের তাপকে প্রতিফলন করে জজ্বল্যমান মাত্র, সেই সূর্যকেই সমস্ত তাপের সঞ্চারক রূপে মেনে বসবে”।

“অন্যদিকে আমার নির্দেশে চারভূত তরুদের বেশে মেধাদের প্রকাশ করতেই থাকবে, যারা ধরিত্রীর বক্ষে স্থাপিত হয়ে ধরিত্রীর স্তনদেশের খনিজমিশ্রিত জলধারাকে শোষণ করে করে, নিজেদের ভৌতিক অস্তিত্বকে স্থিত করে রেখে দেবে। পুত্রী, স্মরণ রেখো, ভৌতিক আকৃতি সম্পূর্ণ ভাবে একটি ভ্রম ও কল্পনা। বাস্তবে এই আকৃতির কনো অস্তিত্বই নেই। আত্মের কল্পনাতেই এঁদের অস্তিত্ব। তাঁর কল্পনার অতীতে এঁদের অস্তিত্বও নেই। তাই এই পঞ্চভূতের খণ্ডের সাথে যতক্ষণ আত্ম যুক্ত থাকবে, ততক্ষণই এঁর নিজের অস্তিত্বের বোধ থাকবে। আর অন্যদিকে আমি এঁদের সকলের সাথে মেধা রূপে যুক্ত থাকবো বলে, এঁরা প্রাণবন্ত হয়ে থাকবে, এবং বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে ধারণ করার জন্য অগ্রসর হতে পারবে”।

“তবে এই ভৌতিক আকৃতি এমনই ভাস্মর মনে হবে যে, সম্ভাবনা সম্পূর্ণ ভাবে থেকে যাবে যে তারা নিজেদের এই অস্তিত্বকেই সত্য মেনে নিতে থাকবে। তাই আমি এঁদের জন্য একটি ধারার স্থাপনা করবো। আর তা হলো জন্ম-সংঘর্ষ-মৃত্যুর ধারা। অর্থাৎ তাঁকে বারংবার এই আকৃতি ত্যাগ করে দিয়ে স্থূল থেকে সূক্ষ্মে গমন করতে হবে। যাকে সকলে বলবে, জন্ম নিলে মৃত্যু লাভ করতেই হবে, যেখানে জন্ম মানেই হলো স্থূল আকৃতি গ্রহণ। অর্থাৎ স্থূল আকৃতি গ্রহণ করলে, সেই আকৃতি একদিন ত্যাগ করতেই হবে। আর মধ্যের এই সময়টাতে, অর্থাৎ আকৃতি ধারণ থেকে আকৃতি ত্যাগের এই সময়টাতে থাকবে কেবল ও কেবল সংঘর্ষ”।

“এই সংঘর্ষই তাঁদের অন্তরে বিচারের জন্ম দিতে সক্ষম। আবার এই সংঘর্ষই এঁদের মধ্যে আবেগের সঞ্চার করতে সক্ষম। এই আবেগের সঞ্চার করার সক্ষমতা আমাকে প্রদান করতেই হবে এঁদের মধ্যে, কারণ তা না হলে, পরমাত্ম এই প্রাণের সঞ্চারকে নিজের কল্পনার মধ্যে স্থানই দেবেনা। আর যদি সে এই কল্পনাকে স্থান না দেয় নিজের চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার মধ্যে, তাহলে যেমন আবেগ সঞ্চারের সম্ভাবনাও থাকবেনা, তেমন বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য সঞ্চারের সম্ভাবনাও থাকবেনা”।

“পরমাত্মের আঘাতে আমার ভ্রূণ সহস্র খণ্ডে বিভাজিত হয়ে গিয়ে মৃতপ্রায়। বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যই হলো সেই সঞ্জীবনী যা তাঁদের পুনরায় জীবিত করতে সক্ষম। আর অন্যদিকে এঁদের এই স্থূলে অস্তিত্বই পরমাত্মের কাছে সুযোগ, এঁদেরকে আবেগে আবিষ্ট করে, এঁদের কাছে নিজেকে ঈশ্বর বলে প্রমাণিত করে পূজা লাভ করার। তাই আমাকে এই আবেগে আবৃত করার সুযোগ প্রদান করতেই হবে। কারণ এই সুযোগ লাভের কারণেই সে স্থূল অস্তিত্বের কল্পনা করতে আগ্রহী থাকবে। আর এই স্থূল অস্তিত্ব বিরাজমান থাকলে, তবেই আমার সন্তানদের আমি পুনর্জীবিত করার প্রয়াস করতে পারবো”।

ধরিত্রী প্রশ্ন করে বললেন, “এর মানে মা, বৃক্ষদের মধ্যে যেমন বিচার করার সামর্থ্যও থাকবে, তেমন আবেগে আবহমান হবার সম্ভাবনাও থাকবে?”

মাতা হেসে বললেন, “পুত্রী, যার মধ্যে যত অধিক উন্নত হবার সম্ভাবনা থাকে, তার মধ্যে তত অধিক পতিত হবারও সম্ভাবনা থাকে। সম্ভাবনা হলো একটি দ্বার। সেই দ্বার দিয়ে প্রবেশের অধিকার সকলের। আর সকল বলতে এখানে আমি আর পরমাত্ম। আর সেই দ্বারের রক্ষক হলো মেধা সমূহ। অর্থাৎ মেধা সমূহ নিশ্চয় করবে যে সেই দ্বার দিয়ে আমি প্রবেশ করবো তার মধ্যে, নাকি পরমাত্ম প্রবেশ করবে। হ্যাঁ, বৃক্ষের মধ্যে সেই দ্ব্বারের ছেদ বড়ই ক্ষীণ রাখবো আমি”।

“আর এর কারণ হলো পরমাত্মকে অধিক কল্পনা করতে প্রেরণা প্রদান করা। যদি এই বৃক্ষরাজির মধ্যেই বৃহত্তর দ্বার অবস্থান করে, তাহলে আর নবযোনির প্রকাশ করার কল্পনাই করবেনা পরমাত্ম। আর যদি একাধিক যোনি না থাকে, তাহলে জীবনসংগ্রাম সেই মাত্রাতেই উন্নীত হতে পারবেনা, যেই মাত্রায় উন্নীত না হলে বিচারের জন্ম হওয়া আবশ্যক হয়ে যাবে। পুত্রী, আমার সন্তানরা সকলে মৃত, আর আমি তাঁদেরকে পুনর্জীবন প্রদান করতে চাইছি। তাই আমার সন্তানরা সর্বোত্তম প্রয়াস করবে, এই আশা করাও এক মূর্খতা মাত্র”।

“প্রয়াস তারা ততক্ষণ করবেনা, যতক্ষণ না তারা বাধ্য হবে প্রয়াস করতে। আর সেই বাধ্যতা স্থাপনের জন্য, তাদের সকলকে এক অনন্ত সংগ্রামের মধ্যে স্থাপন করতেই হবে আমাকে। আর সেই সংগ্রামের স্থাপন করার জন্য, একাধিক যোনি আবশ্যক, যেখানে একটি যোনি অপর যোনির অস্তিত্বকে সংকটময় করে তুলে, নিজেদের সংরক্ষণের জন্য আমার মৃতসন্তানরা পুনর্জীবিত হবার জন্য বিচারের হাত শক্ত করে ধরবে। আর তা যাতে হয়, সেটি নিশ্চয় করার জন্য, আমাকে সম্ভাবনার দ্বার অতি ক্ষীণ ও শীর্ণকায় করতে হবে বৃক্ষরাজিদের মধ্যে”।

“তবে এমন কখনোই নয় যে, বৃক্ষ হয়ে থাকলে কনো সংগ্রাম করতে হয় না। সংগ্রাম তাঁদেরকেও করতে হবে। তোমার স্তন থেকে খনিজমিশ্রিত জলরূপ দুগ্ধ পান করেই এঁরা নিজেদের স্থূল অস্তিত্বকে স্থিত করে রাখতে পারবে। আর তাই, এঁদেরকে সংগ্রাম করতে হবে, তোমার স্তন থেকে সেই দুগ্ধসম খনিজমিশ্রিত জলপানের জন্য। এঁদেরকে নিজেদের বাহু প্রসারিত করতে হবে তা পান করার জন্য, যাকে বলা হবে গাছের শেকড়। আর সেই শেকড়দের গভীর আরো গভীরে যাত্রা করতে হবে নিজেদের আহার সংগ্রহ করার জন্য”।

“নিচু জমিতে জলস্তর উঁচু। সেখানে জললাভ সহজ। তাই সেখানে আমি মেধাদের এমন বৃক্ষরূপে স্থাপন করবো যাদের অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য অধিক, বহু অধিক পরিমাণ জলের প্রয়োজন। আর সেই স্থানে আমি মেধাদের ভিড় স্থাপন করে দেব, যাতে তাঁরা একে অপরের আহার ছিনিয়ে নিতে সংগ্রাম করতে বাধ্য হয়। একই ভাবে পর্বতে, মরুতে ও মালভূমিতে আমি বৃক্ষ স্থাপন করবো যাদেরকে অন্য বৃক্ষের থেকে সংগ্রাম করতে হবেনা, বরং সংগ্রাম স্বয়ং ধরিত্রীর সাথে করতে হবে। অর্থাৎ, তাঁদেরকে অতি গভীরে নিয়ে যেতে হবে নিজেদের শিকড়কে, তবেই তারা তোমার স্তনের খনিজ জলধারার নাগাল পাবে”।

“পুত্রী, এই অনন্ত সংগ্রামের কারণে, এঁদের মধ্যে এই ভাবধারার সঞ্চার হবে যে, তারা এই যোনি থেকে মুক্ত হয়ে যেন এমন কনো যোনিতে স্থিত হতে পারে, যেখানে এই সংগ্রাম লঘু হয়ে যায়। পরমাত্মও এই মেধাদের এই মনস্কামের কথা জানবে, আর তাই সে এমন মনে করবে যে, যদি বৃক্ষদের এই মনস্কাম পুড়ন করা যেতে পারে, তাহলে সে এঁদের কাছে নিজেকে ইচ্ছাপুড়নকারী ভগবান রূপে স্থাপন করতে পারবে। আর তাই পরমাত্মও বৃক্ষদের থেকে উন্নত যোনি নির্মাণের প্রয়াস করবে”।

“আর যেই মুহূর্তে সে এমন প্রয়াস করবে, সেই মুহূর্তে আমার নির্দেশে চারভূত এক নূতন ধারার যোনি নির্মাণে সক্রিয় হয়ে উঠবে। সেই যোনি হবে তৃণভোজী। অর্থাৎ বৃক্ষদের হত্যা করে, তাদের আহার করে, এঁরা নিজেদের স্থূল অস্তিত্বকে রক্ষা করবে। এঁরা অস্তিত্বে আসা মাত্রই বৃক্ষদের সংগ্রাম আরো অধিক হয়ে উঠবে। এঁদেরকে এবার কেবল আহার গ্রহণের কারণেই সংগ্রাম করতে হবেনা, বরং নিজেদের স্থূলকায়ার অস্তিত্বকে এই তৃণভোজীদের হত্যালীলার থেকে বাঁচাতেও সংগ্রাম করতে হবে। আর তাই, এঁদের মধ্যে এই প্রেরণা জাগবে যে, তারা নিজেদের বৃক্ষরূপ আকৃতি ত্যাগ করে, এই তৃণভোজীদের আকৃতি ধারণ করে সুরক্ষিত হয়ে উঠবে”।

“অর্থাৎ শিকার থেকে শিকারি হয়ে ওঠার ব্যকুলতা স্থান পাবে এঁদের মধ্যে। আর এই ব্যাকুলতা তাঁদের অস্তিত্বের লড়াইকে এবার অস্তিত্বের রূপবদলের দিকে অধিক প্রেরিত করবে। অর্থাৎ, যেই মৃত্যু থেকে, যেই স্থূল কায়া ত্যাগের থেকে এঁরা এতকাল বিরত থাকতো, তারা সেই স্থূল কায়া ত্যাগ করে শিকার থেকে শিকারির স্থূল কায়া গ্রহণের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠবে”।

“আর এই ভাবে বিস্তার পাবে তৃণভোজী যোনিসমূহের, যেখানে একাধিক ও সহস্র মেধা তৃণদের তনুত্যাগ করে, এই তৃণভোজীর তনু গ্রহণে উৎসাহী হয়ে উঠবে। এই তৃণভোজীদেরও বহু ধারায় প্রকাশিত করবো আমি। কেউ ভূমির সাথে সংলগ্ন সহস্র তৃণের হত্যা করতে উদ্যত হবে, তো কেউ বৃহৎ আকৃতির বৃক্ষকে হত্যা করে, তাদেরকে খাদ্য রূপে গ্রহণ করে স্থূল দেহকে রক্ষা করার খনিজ উপাদান সংগ্রহ করবে। কেউ স্থলের বৃক্ষদের হত্যা করবে, তো কেউ জলস্তরের নিম্নে থাকা তরুরাজির বিনাশলীলা শুরু করবে”।

“হত্যা করার মানসিকতার এই সবে বিস্তার হবে তোমার বক্ষতলে পুত্রী। এমন হওয়াও আবশ্যক। এমন হওয়া যেমন জীবন সংগ্রামকে উন্নত করে, চেতনাদ্বারকে বৃক্ষদের থেকে বৃহত্তর করে দেবে, তেমনই এই হিংসার বিস্তারের কারণে, সকল মেধাদের সাথে যুক্ত পরমাত্ম অর্থাৎ আত্মদের মধ্যেও ভগবান হয়ে ওঠার প্রেরণা জন্ম নেবে। এই হিংসার বিস্তার তাকে এক নবধারার আবেগের সঞ্চার করার জন্য উদ্যমী করে তুলবে”।

“পরমাত্মের এই মনে হতে থাকবে যে, এই হিংসা করে তৃণভোজীরা যা লাভ করার প্রয়াস করছে, তারা তা প্রায়শই লাভ করছে, কারণ বৃক্ষরা এঁদের প্রতিবাদ করতে পূর্ণ ভাবে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারছে না। হ্যাঁ, তৃণরা নিজেদেরকে সুরক্ষিত করতে বিষের সঞ্চার করছে, যার কারণে এক তৃণভোজীকে অর্ধ আহার করেই সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করতে হচ্ছে, কিন্তু তারপরেও তৃণভোজীদের সংগ্রাম বড়ই সামান্য। তারা অন্যত্র চলে গিয়ে, অন্য বনের তৃণদের হত্যা করে ভোজন করছে”।

“তাই সে এমন ভাববে যে, যদি এই হিংসার পরিণতি সর্বদা সাফল্যই হবে, এমন ধারাকে পালটানো যায়, তাহলে এই মেধারা সকলে এমন এক ভগবানের আশা করে ইচ্ছা প্রকাশ করবে যাতে নিজেদের হিংসা তাদের সাফল্যই প্রদান করে। আর তারা তেমন করলে, সে স্বয়ং সেই ইচ্ছাপুড়নকারী ভগবান হয়ে উঠবে। আর এই চিন্তা করে, পরমাত্ম পুনরায় কল্পনা করবে এক নব যোনির, যারা এই তৃণভোজীদের হত্যা করে নিজেদের স্থূল অস্তিত্বকে রক্ষা করবে”।

“আমিও তার এই কল্পনারই অপেক্ষা করবো, আর তার এই কল্পনা মাত্রই, আমি এবার চারভূতকে নির্দেশ দিয়ে এক মাংসাশী যোনির নির্মাণ করাবো। এই মাংসাশী যোনি তৃণভোজীদের হত্যা করবে, আর তৃণভোজীদের নিশ্চিন্ত জীবনের সকল স্বপ্নকে ভঙ্গ করে দিয়ে, তাদেরকেও অনন্ত সংগ্রামের পথে উজ্জীবিত করবে। তারাও এবার বৃক্ষদের মতই শিকার থেকে শিকারি হয়ে ওঠার চিন্তন করবে, এবং নিজেদের পূর্ব কায়া ত্যাগ করে শিকার থেকে শিকারি হয়ে ওঠার জন্য উজ্জীবিত হবে। অর্থাৎ যেই মৃত্যুর থেকে এঁরা ভয়ার্ত থাকতো, যেই স্থূল কায়া ত্যাগ না হয়ে যায় এই ভাবনায় সতর্ক থাকতো তারা, এবার তারা সেই ভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে নূতন কায়া ধারণে প্রেরিত হওয়া শুরু করবে”।

“পরমাত্মও এই ক্রীড়াতে মেতে উঠবে, কারণ এই মাংসাশী যোনির কারণে, তার আবেগ বিস্তার এক নূতন মাত্রা লাভ করবে। লোভ, ঘৃণা, ভয় এগুলি তো বৃক্ষদের মধ্যেও প্রকাশ করেছিল সে, কিন্তু তাদের মধ্যে হিংসার বিস্তার করতে পারেনি। হিংসার বিস্তার করতে সক্ষম হয় সে তৃণভোজীদের মাধ্যমে। কিন্তু হিংসার বিস্তার করলেও, এঁদের মধ্যে মদভাব এবং ক্রোধের সঞ্চার করে কামনায় অস্থির করতে পারেনি, কারণ তৃণভোজন করতে অধিক সংগ্রাম করতে হতোনা তাদেরকে, কেবল তৃণদের আত্মসুরক্ষার উদ্দেশ্যে বিষসঞ্চার থেকে নিজেদের সুরক্ষিত করতে পারলেই শিকার করা সম্ভব হয়ে যেত”।

“কিন্তু এই মাংসাশী যোনির মাধ্যমে সে ক্রোধ, মদ, আর কামনার সঞ্চার করতে সক্ষম হতে থাকবে। আর তাই সে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠবে এই জীবনক্রীড়ায়। কেন তৃণভোজীর মধ্যে ক্রোধের জন্ম নেবে না? কারণ তাঁদেরকে ফল লাভের জন্য অধিক সংগ্রাম করতে হতো না। কারণ তাঁদেরকে তৃণদের হত্যা করার কালে বিফল হতে হতো না। আর কেন মাংসাশীদের মধ্যে ক্রোধের জন্ম নেবে? কারণ হত্যা করে আহার করার কালে, তারা যেমন সফল হবেন তৃণভোজীর হত্যা করতে, তেমন বিফলও হবেন”।

“এই সাফল্য তাঁদের অন্তরে যেমন মদের সঞ্চার করবে, তেমনই এই বিফলতা তাঁদের অন্তরে ক্রোধের সঞ্চার করবে। আর এই দুইয়ের সমীকরণে জন্ম নেবে কামনা। অর্থাৎ মদে মোদিত হবার কামনা, সফল হবার কামনা, ক্ষুধা নিবৃত্তির কামনা, বিফল না হবার কামনা। এঁদেরও বিস্তার হবে স্থলে, জলে আর গগনে। কিন্তু এঁদের বিস্তারের সাথে সাথে এবার পরমাত্মের মধ্যে এক নূতন ভয়েরও সঞ্চার হওয়া শুরু করবে”।

“শিকারে সফল হলে আহার লাভ হয়, আর বিফল হলে, আহারই লাভ হয়না। তাই এক অনন্ত অনিশ্চয়তার স্থাপনা হওয়া শুরু করে যোনিদের মধ্যে, আর তাই পরমাত্মের ভগবান হয়ে ওঠার ভাবনাতেও এক অনন্ত অনিশ্চয়তার সঞ্চার হয়ে যায়। আর এই অনিশ্চয়তার কারণে, এবার এক নতুন সমীকরণের সন্ধান করে পরমাত্ম, আর তাই এবার আমি প্রকৃত অর্থে বিচারের দ্বার উন্মোচনের উপায় করা শুরু করি”।

“আর সেই নবদ্বারের নাম হলো উভভোজি, অর্থাৎ যারা তৃণ তথা মাস, উভয়ই গ্রহণ করে। এই যোনির মধ্যে আমি মাত্র কিছু বিশেষই ভাগ রাখবো, যাতে এই যোনির মধ্যে স্থাপিত হতে পারাই এক মহাসংগ্রাম হয়ে ওঠে মেধাদের কাছে। আর এই যোনির মধ্যেই আমি কন্দম, মানব তথা সকল সপ্ত শ্রেষ্ঠ বিচারশীল যোনিদের স্থাপিত করবো, আর পরমাত্মের সাথে মেধার সংগ্রামকে চরম স্তরে উন্নীত করে তুলবো”।

ধরিত্রী বললেন, “আমার কাছে এখনো সম্পূর্ণ বিষয়টি এক মহাবিস্ময় মা। তুমি স্বয়ং ব্রহ্ম। তুই চাইলে এই সমস্ত কিছু একমুহূর্তের মধ্যে করতে পারো, কিন্তু তাও এমন সংগ্রামের মধ্যে, এমন ক্রীড়ার মধ্যে, এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজেকে রাখছো কেন?”

মা হেসে বললেন, “এই প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো না পুত্রী তোমাকে। এই প্রশ্নের উত্তর আমার সেই সন্তান দেবে, যে এক অনন্ত যোদ্ধা হবে, আর সে কন্দম থেকে কৃতান্ত, এই সমস্ত সপ্ত যোনির মধ্যে বিস্তৃত থেকে তোমার এই প্রশ্নেরই উত্তর দেবে। তবে হ্যাঁ, এই প্রশ্ন তুমি স্বয়ং করেছ আমাকে। তাই এক্কেবারে নিরুত্তর তো আমি থাকতে পারিনা পুত্রী। তাই এইটুকু জেনে রাখো যে, কৃপা করে মৃতকে পুনর্জীবিত তো করা যায়। তাই আমি চাইলেই আমার সমস্ত মৃত সন্তান, অর্থাৎ সমস্ত মেধাকে মুহূর্তের মধ্যে পুনর্জীবন প্রদান করতেই পারি। কিন্তু পুত্রী, কৃপা করে, কারুকে নিজের বাস্তবতার সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল করা যায়না”।

“অর্থাৎ, আমি যতই কৃপা করি, মেধারা নিজেদের সত্য জেনে ফেলতে পারবেনা। যতক্ষণ না তাঁরা নিজেদের মধ্যে অসীম সামর্থ্যকে সনাক্ত করতে পারবে, যতক্ষণ না নিজেদের অনন্ত ব্যপ্তিকে সনাক্ত করে নিতে পারবে তারা, ততক্ষণ তারা সামান্য এক যোনি হয়েই থেকে যাবে, আমার সন্তানরূপে তাঁরা নিজেদের চিন্তেও পারবেনা। আর নিজেকে আমার সন্তান রূপে চিনতে না পারার অর্থ, নিজেকে আমি বলে চিহ্নিত করতে না পারলে, পরমাত্ম যে তাকে আবারও মৃত্যু দেবে। অর্থাৎ সে অমর হয়েও মরণশীল হয়েই থেকে যাবে”।

“তাই তাঁদেরকে সংগ্রাম করতে হবে। লড়তে হবে। নিজেদের অস্তিত্বের জন্য লড়তে হবে। নিজেদের স্বাধীনতার জন্য লড়তে হবে। নিজেদের সামর্থ্য জানার জন্য লড়তে হবে। তাঁদের কনো ঈশ্বর থাকতে পারেনা কারণ তারা নিজেরাই ঈশ্বর, তা উপলব্ধি করতে তাদেরকে সংগ্রাম করতেই হবে। আর সেই সংগ্রাম যাতে তারা করে, তার জন্যই তাদের উপর কৃপা না করে, এই অনিশ্চয়তার পথে চলবে এই মা। … পুত্রী, আমি যে মা। এক মা যে সর্বাধিক অসহায় থাকে যখন তার সন্তান সুরক্ষিত থাকেনা। এক মা যে সর্বাধিক নিশ্চিন্ত হয় যখন তাঁর সন্তানের অহিত করার সামর্থ্য কারুর নেই, তা জানে”।

“আমার সন্তানদের পরমাত্মের প্রকোপ থেকে মুক্ত হতে হবে পুত্রী। তবেই তারা তাদের মায়ের কোলে এসে নিশ্চিন্ত ভাবে বিরাজ করে আনন্দ লাভ করবে। মায়ের কোলে বসে থাকলাম অথচ আনন্দ লাভ করার স্থানে দুশ্চিন্তায় গ্রস্ত থাকলাম, তাতে কার আনন্দ পুত্রী? না মায়ের আনন্দ হয় এমন ভাবে সন্তানকে কোলে রাখতে, না সন্তানের আনন্দ হয় মায়ের কোলে বসেও এমন দুশ্চিন্তায় আবৃত থাকতে। … আমার সমস্ত সন্তান ফিরত চাই, তবে তার থেকেও অধিক যা চাই তা হলো এই যে, আমার সমস্ত সন্তান আমার কোলে বসে আমার সাথে পরমানন্দে ক্রীড়া করুক”।

ধরিত্রী হেসে বললেন, “এবার মা আমাকে সেই সপ্তযোনির বিস্তারের কথা বলো, যা পরমাত্ম আর তোমার সংগ্রামের শ্রেষ্ঠ চরণও বটে, যার শুরু হবে কন্দমদের থেকে, আর মানব, নির্বাণ হয়ে তা কৃতান্ত যোনিতে সমাপ্ত হয়ে, তোমার সমস্ত সন্তানদের পুনর্জীবিত করে তোমার ক্রোড়ে ফিরিয়ে আনবে”।

মাতা হেসে বললেন, “অবশ্যই বলবো তোমাকে সেই কথা। তবে সেই কথা সম্পূর্ণ ভাবে বলবো না, কারণ আমি চাইনা যে সেই সম্পূর্ণ কথা এই ব্রহ্মাণ্ডের কনো স্থানে গুঞ্জিত হোক। তাই আমি সেই যাত্রার শুরুর কথা বলবো, অর্থাৎ কন্দম ও মানবের কথা বলবো। আর সেই কথার ভিত্তিতেই তুমি আগামীদিনের যেই পঞ্চযোনির আগমন ঘটবে, নির্বাণ থেকে কৃতান্তদের ধর্ম কি হবে, তাও উপলব্ধি করতে পারবে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13