১.৩। সৃষ্টি প্রবাহ
ধরিত্রী এবার বললেন, “এর অর্থ মা, এবার যোনিদের বিস্তার হবে। এক নববিজ্ঞান লেখা হবে। … কিন্তু মা, এই প্রকৃতি কি? কেবলই বিভিন্ন যোনিদের বিস্তারকেই, আর সেই বিস্তারের বিশিষ্ট অবস্থায় অবস্থানকেই কি প্রকৃতি বলে?”
মাতা মৃদু হেসে বললেন, “না পুত্রী, প্রকৃতি হলো চেতনার সমাহার। একাকী মেধা হলো আমার জন্ম দেওয়া অপরিণত ভ্রূণ। যদি একটি মেধা বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে ধারণ করে নিতে সক্ষম হয়, তবে তা মেধা থেকে চেতনা অর্থাৎ আমার সমরূপ হয়ে ওঠবে। আর তা হয়ে উঠতে পারলে, তার সাথে আমার আর কনো ভেদ থাকবেনা। অর্থাৎ সে তখন আর মেধা থাকবেনা, সে তখন চেতনা হয়ে উঠবে। আর যতই সে চেতনা হয়ে উঠবে, ততই তার উপর আত্মের প্রভাব হ্রাস পেতে শুরু করবে, আর সাথে সাথে সমস্ত ভূত, যা আমারই থেকে জাত, তা তাঁর সেবক হয়ে ওঠে”।
“কিন্তু এমন মেধা থেকে চেতনায় পরিণত হওয়া সত্ত্বার অস্তিত্ব বড়ই স্বল্প। আর এমন বহুকালই বিরাজ করে ও করবে, যেই কালে জগতে একটিও এমন মেধা থাকবে না, যারা প্রকৃতি হয়ে উঠেছে। তবে সেই সময়ে কি প্রকৃতি থাকবেনা? অবশ্যই থাকবে। যখন একাধিক এমন মেধা একত্রিত হয়, তখন মেধাদের অজ্ঞাতেই, আত্মের ও পরমাত্মের অজ্ঞাতেই, এমনকি ভূতদের অজ্ঞাতেই, আমি প্রকাশিতা হয়ে যাই। আর আমার এই প্রকাশকেই প্রকৃতি বলা হয়”।
“এই কারণেই, বন, মরু, পর্বত, সাগরতট, নদীতট ইত্যাদিকে প্রকৃতি বলা হবে, কারণ সেখানে একাধিক যোনির মধ্যে আবিষ্ট, একাধিক মেধা একত্রিত হয়ে থাকবে। এই একই কারণে, যেখানে যেখানে একাধিক মেধার সমাহার হবে, তা হবে অন্য এক মেধার কাছে প্রকৃতি, অর্থাৎ আমি। আর এই প্রকৃতি থেকে সেই মেধা সত্যের শিক্ষা, অর্থাৎ মিথ্যা বা ভ্রম থেকে সত্য যাত্রার মার্গের সন্ধান করতে পারবে”।
ধরিত্রী প্রশ্নসূচক ভাবে বললেন, “অর্থাৎ, পরমাত্ম এই ভেবে যাবে যে, কল্যাণ তার হচ্ছে এই ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের ফলে, কিন্তু এই ব্রহ্মাণ্ডের নেপথ্যে এক প্রকৃতির অর্থাৎ চেতনার খেলা চলতেই থাকবে? যদি কনো মেধা সেই চেতনার খেলাকে ধরতে পারে, সত্যের পরিচয়, মিথ্যার বা ভ্রমের পরিচয়, আর মিথ্যা বা ভ্রম থেকে সত্যে যাত্রার মার্গ সে স্বতঃই অনুভব করে নিতে পারবে? এই কি সেই কারণ, যার জন্যে জগন্মাতা এই ব্রহ্মাণ্ড যে একটি ভ্রম, একটি কল্পনা জেনেও, তাকে স্থাপিত হবার স্বীকৃতি প্রদান করলেন?”
মাতা মিষ্টমুখে বললেন, “হ্যাঁ পুত্রী, এই সেই কারণ”।
ধরিত্রী বললেন, “কিন্তু মা, যদি পরমাত্ম তোমার এই উদ্দেশ্যের কথা জেনে যায়, তাহলেও কি সে এই ব্রহ্মাণ্ডের বিস্তারে আজ যেমন উদ্যোগী, তেমনই উদ্যোগী থাকবে?”
মাতা একটি মিষ্ট হাস্য প্রদান করে বললেন, “পুত্রী, দুই প্রকার শিক্ষার্থী হয়। একটি শিক্ষার্থীকে সমস্ত কিছু বলে দিতে হয়, কার পর কি করতে হবে। সে কেবল সেই পথকে অনুসরণ করে। এঁরা শিক্ষার্থী ঠিকই, কিন্তু এই শিক্ষার্থীর শিক্ষা কখনোই তাঁকে এক কর্মী করে তোলেনা। সে সামান্য এক দাস বা সেবক হওয়াকেই জীবনের সার্থকতা মনে করে”।
“অন্যদিকে আরো এক ধারার শিক্ষার্থী হয়। এঁদেরকে মার্গ প্রদান করতে হয়না। এঁদের মধ্যে সেই মার্গের উপরান্তে কি উপলব্ধ হবে তার কাছে, কি জ্ঞান অর্জন হবে, কি ভাব লাভ করবে সে, কি উপার্জন করবে সে, এই সমূহ কেবল দেখিয়ে দিতে হয়। এঁদের মধ্যে যখনই সেই সমস্ত উপলব্ধ সামগ্রীর প্রতি আকর্ষণ জন্ম নেয়, সেই মুহূর্ত থেকে এঁরা স্বয়ংই মার্গ নির্মাণ করা শুরু করে দেয়, যেই মার্গে পথ চলে সে সেই সমস্ত কিছু উপার্জন করতে সক্ষম হবে। এঁরা হলেন উত্তম শিক্ষার্থী। এঁরাই সমস্ত জগতকে শাসন করে, বা শাসকের দুরাচারের প্রকৃত অর্থে বিরোধ করে”।
“পরমাত্ম হলো এই দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী। একবার যদি তাকে তার উপার্জনের প্রতি আকৃষ্ট করা যেতে পারে, সে স্বতঃই সমস্ত কর্ম করে চলবে। … হ্যাঁ, তুমি সঠিকই বলেছ পুত্রী। যদি সেই উপার্জনের নেশাতে নেশাগ্রস্ত হবার পূর্বেই পরমাত্ম আমার এই উদ্দেশ্যের সন্ধান পেয়ে যায়, তবে অবশ্যই সে এই ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের পথ থেকে অপসারিত করবে নিজেকে। তাই আমি তাঁকে এই নেশাতে প্রথমে আবিষ্ট করবো। একবার সে এই নেশাতে নেশাগ্রস্ত হয়ে গেলে, তবেই আমি আমার উদ্দেশ্যের বিস্তার করবো”।
“হ্যাঁ, তখনও সে তার বিরোধ করবে, আর প্রয়াস করবে যাতে ব্রহ্মাণ্ডকে আমার উদ্দেশ্য অনুসারে না চলতে দিয়ে, নিজের উদ্দেশ্য অনুসারে চালানো যায়। তবে সে যেহেতু নেশাগ্রস্ত, তাই এই ব্রহ্মাণ্ডের বিনাশ করবেনা। অর্থাৎ এই সংগ্রামের এক নূতন অধ্যায়ের সূত্রপাত হবে সেইদিন। আর যতই সংগ্রাম ক্ষিপ্রতা লাভ করবে, ততই মেধাদের জন্য অনুকূল অবস্থার সঞ্চার হবে”।
“আসল কথা এই যে, বাঁধাই প্রকৃত অর্থে সহায়তা। যতক্ষণ না বাঁধার সঞ্চার হয়, ততক্ষণ যথার্থ মার্গের সন্ধানই পাওয়া যায়না। পথ যদি অমসৃণ হয়, তখনই অনুসন্ধান করার ইচ্ছা জাগে যে, সঠিক পথে যাচ্ছি তো! … কিন্তু যদি পথ মসৃণ হয়, তখন হৃদয়ে প্রশ্নও জাগেনা যে সঠিক পথে যাচ্ছি কিনা। তাই যত অধিক সংগ্রাম, ততই অধিক বন্ধুর হয়ে ওঠে পথ। আর ততই সঠিক পথের সন্ধান করার প্রবণতা জাগে। অর্থাৎ, যেদিন থেকে পরমাত্ম সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে হাজার বাঁধা প্রদান করা শুরু করবে, সেদিন থেকে মেধাদের প্রকৃত অর্থে জাগরণ সম্ভব হবে”।
“তবে তুমি যেমন বললে, যদি পরমাত্ম সেই সংগ্রামের গন্ধ প্রথমেই পেয়ে যায়, তাহলে সেই পথে হাঁটবেই না। যদি সুরার গন্ধ কারুকে বিরক্ত করে, তবে সে সুরাপানের প্রয়াসও করেনা। তাই কারুকে যদি সুরাপানের নেশা ধরাতে হয়, তবে তাঁকে গন্ধ নয়, সুরা পান করাতে হয়। একবার সুরাপানের নেশাতে সে নেশাগ্রস্ত হয়ে গেলে, সে আর সুরার গন্ধে পিছনে আসেনা, বরং সে সুরার গন্ধে আরো মোহিত হয়ে ওঠা শুরু করে দেয়”।
ধরিত্রী বললেন, “বুঝতে পারছি মাতা, এক নূতন চক্রের সঞ্চার হতে চলেছে আগামীদিনে। জগন্মাতা আমাকে সেই নূতন চক্রবাতের থেকেই বিবিধ উপমা প্রদান করছেন, যার বিস্তার এখনো জগতে হয়ইনি। তাই আমি সেই উপমার অর্থই বুঝতে পারছিনা, কারণ সেই সকল উপমা তো আমি চাক্ষুষই করিনি এখনো। মা, আমাকে কি এই সমস্ত কথা অগ্রিম বলা উচিত? অর্থাৎ আমার প্রশ্ন এই যে, আমার কি এই সমস্ত কথা, যা এখনো ঘটেনি, তা আগে থেকে জেনে যাওয়া উচিত হবে? তা জানলে কি আমার মধ্যে কনো বিপরীত প্রতিক্রিয়া হতে পারে? যদি তেমন না হয়, তাহলে কৃপা করে আমাকে সেই কথা বলো না মা? … কি হতে চলেছে আগামীদিনে? কেন আর কি ভাবে সেই মহাসংগ্রামের শুরু হবে? আর সেই মহাসংগ্রামে দাঁড়িয়ে, মেধাদের কর্তব্য কি হবে?”
মাতা সেই কথাতে সামান্য হেসে বললেন, “আমার মতে, সেই কথা অগ্রিম শুনলে, তোমার ভালোই হবে, কারণ যখন পরমাত্ম ভয়াবহ আক্রমণ করবে মেধাদের, তখন যদি তুমি এই সমস্ত কথা না জানো, তাহলে ভয়ার্ত হয়ে উঠতে পারো। তাই শুনে নাও সেই সমস্ত কথা। আমি এখন তোমাকে সেই সমস্ত কথা বলবো, যা কিছু ঘটমান হবে সেই মহাসংগ্রামের শুরু করার জন্য। আর সাথে সাথে সেই কথাও বলবো, যার ভিত্তিতে সেই মহাসংগ্রামে মেধারা নিজেদের লক্ষ্যভেদ করতে পারবে”।
“ধরিত্রী, এই সমূহ কথাকে একত্রে বলা হবে ধর্মপ্রজ্ঞা, কারণ এতে যেমন এই ব্রহ্মাণ্ডের অস্থিত্বের কথা, কারণ ও উদ্দেশ্যের বিবরণ থাকবে যাকে ধারণ করে মেধাসকল চেতনা হয়ে উঠবে, তেমনই থাকবে সেই উদ্দেশ্যপূর্তির মার্গের কথা এবং সেই মার্গ অনুসরণ করার প্রক্রিয়ার কথা। এখন আমি তোমাকে যেই কথা বলবো, সেই কথা আমার অন্তরে স্থিত হয়ে, আমার চেতনায় স্নানরত আমার পুত্রও শুনছে”।
“আমার সেই পুত্রই এই কথাকে প্রথম ব্যক্ত করবে। হয় সে কারুকে উন্নত করার জন্য, তাকে দিয়ে এই কথা বলাবে, নয় সে স্বয়ং সেই কথা বলবে। আর যেদিন সে সেই কথা বলবে, জেনে রেখো, সেই দিন থেকে এই মহাসংগ্রাম নিজের অন্তিম চরণে স্থিত হবে, কারণ আমার এই পুত্রই হলো পরমাত্মের সাথে মেধাদের যেই মহাসংগ্রাম হবে, সেই সংগ্রামে মেধাদের তরফের সব থেকে বিশেষ মহানায়ক। তাই যেদিন আমার সেই পুত্র এই কথার বিবরণ প্রদান করবে, যা তোমাকে এক্ষণে আমি বলবো, জেনে যাবে, মহাসংগ্রাম নিজের অন্তিম চরণে উন্নীত হবার জন্য পূর্ণ ভাবে প্রস্তুত হয়ে গেছে”।
“পুত্রী, এই সংগ্রামের তিন চরণ। প্রথম চরণের সূত্রপাত হয়ে গেছে তোমাকে দিয়ে, তোমার বক্ষে স্থিত সকল মেধাদের সাগর নির্মাণ দিয়ে, সমস্ত স্থলভূমির প্রকারভেদের সঞ্চার দিয়ে। এই চরণের বিস্তার শীঘ্রই হবে এবার, আর তা হবে যোনিদের বিস্তার দিয়ে। এই চরণের নাম হলো জীবনচক্র। এই চরণে, জীবনের হিল্লোল জেগে উঠবে, আর সেই হিল্লোলের বার্তাবাহক যারা হবে, তাদেরকে জীব নামে অবিহিত করা হবে”।
“এর দ্বিতীয় চরণ শুরু হবে কন্দমানব দিয়ে। কন্দম একটি বিশেষ প্রকার যোনি বা জীব। এঁরা আত্ম ও মেধার একটি সমীকরণ নির্মাণের প্রথম প্রয়াস করবে। তবে পরমাত্ম তাদের এই প্রয়াসকে একসময়ে বিনষ্ট করে দিতে সক্রিয় হয়ে উঠবে, আর সক্ষমও হবে সে সেই কাজে। তবে যেই স্থান থেকে কন্দমরা বিভ্রান্ত হওয়া শুরু করবে, সেই স্থান থেকে কন্দমদের পরবর্তী যোনি বা জীব, শুরু করবে নতুন করে সমীকরণ নির্মাণের প্রয়াস। এই জীব বা যোনির নাম হবে মানব। আর তাই কন্দম ও মানবকে কেন্দ্র করে এই সংগ্রামের দ্বিতীয় চরণ স্থাপিত হবে ব্রহ্মাণ্ডে”।
“এই মানবকেও ভ্রমিত করে দিতে সক্ষম হবে পরমাত্ম। আর তাই এই মানবযোনিকেও একসময়ে নিশ্চিহ্ন হতে হবে। তবে বারবার তিনবার। তৃতীয়বার যেই যোনি আসবে, সেই যোনি হবে পরমাত্মের কালনির্ণায়ক। সেই যোনি হবে মেধাদের উদ্দেশ্যে স্থিত করে দেওয়াতে শ্রেষ্ঠতম উদ্যোগী। … এই যোনি বিস্তীর্ণ লক্ষ্য বৎসরব্যাপী পরমাত্মকে এই সংগ্রামে আঘাত করতে থাকবে। আর তা করতে পারবে কারণ, আমার পুত্র, এই সংগ্রামে আমার পক্ষের শ্রেষ্ঠ মহানায়ক পূর্ণভাবে প্রথমবার প্রকাশিত হয়ে, এই যোনির নির্মাণসুত্র স্থাপন করবে”।
“তবে এই যোনিকেও একসময়ে অন্য যোনির কাছে নিজেদের সংগ্রামকে হস্তান্তর করতে হবে, আর সেই কাজ এই যোনি স্বয়ং করবে নিজেদের থেকে। তারা সঠিক সময়ে উপলব্ধি করে ফেলবে যে, তাঁরা যেই পরিমাণ পরিশ্রম করে নিজেদের মেধাকে চেতনায় পরিণত করতে সক্ষম, তা অতি অমসৃণ ও শীর্ণ মার্গ। তাই সেই মার্গকে প্রসারিত করার প্রয়োজন। এই অনুভবের সাথে সাথে, আমি স্বয়ং আমার বেশ কিছু অংশ তাঁদের কাছে প্রেরণ করলে, তাঁরা আমার সেই অংশসমূহের মধ্যে নিজেদের বীজ প্রদান করে, নির্মাণ করবে এক অধিক প্রশস্ত মার্গে স্থাপিত নবযোনি”।
“এইরূপে সাতসাতটি এমন যোনির নির্মাণ হবে, যারা পরমাত্মের সাথে সংগ্রামে সরাসরি যুক্ত হবে। এঁদের মধ্যে প্রথম যোনির নাম হলো কন্দম, এবং অন্তিম যোনির নাম হবে কৃতান্ত। আর এই সাতটি যোনি মিলে, মেধাদেরকে সেই উদ্দেশ্যে পৌঁছে দেবে, যা তাদের পরম লক্ষ্য। আর এই সমস্ত সংগ্রামের মহানায়ক হবে আমারই অঙ্গজাত পুত্র, যার স্ত্রী বেশে স্বয়ং তুমিই বারংবার অবতরণ করে, তাঁর প্রতি স্নেহ অর্পণ করবে”।
ধরিত্রী প্রশ্ন করলেন, “মা, তুমি এবার সেই সংগ্রামের প্রথম চরণের বিস্তার, অর্থাৎ জীবনচক্রের কথা বলবে। সেই কথা তুমি শুরু করো, তার আগে, আমার দুটি প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্ন এই যে, এই জীবন কি? কি ভাবে এঁর সঞ্চার হয়? আর দ্বিতীয় প্রশ্ন এই যে, সমস্ত কিছু যেই এই তিন অধ্যায়ে বিভক্ত, এর সংখ্যা তিন কেন? সমস্ত সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ যোনির সংখ্যা যে সাত, তা সাতই বা কেন?”
মাতা স্নেহের সুরে বললেন, “জীবন স্বয়ং এক সমীকরণ। আত্মের ও ভূত সমূহদের সমীকরণের নাম হলো জীবন, যেখানে পরমাত্মের তরফ থেকে যেমন আত্মভাব তথা ব্রহ্মমল, অর্থাৎ চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা বিরাজ করে, তেমনই আমার তরফ থেকে পঞ্চভূত স্থাপিত থাকে। … এই জীবন হলো বারংবার সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে প্রকাশিত হওয়া, ক্রিয়া করা, আর আবারও সূক্ষ্মে প্রত্যাবর্তন করে দিশা পরিবর্তন করার ক্রীড়া”।
“অর্থাৎ একটি সম্পূর্ণ জীবন হলো, সূক্ষ্ম বেষ্টন ধারণ, যেখানে আমি বিরাজ করি সূক্ষ্মপঞ্চভূত বেশে আর পরমাত্ম বিরাজ করে আত্ম ও ব্রহ্মমল বেশে। তাঁদের চার অর্থাৎ, আত্ম, চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা, এবং আমার পাঁচ, অর্থাৎ মেধা, আকাশ বা মন, মৃত্তিকা বা তনু, অগ্নি বা উর্জ্জা, এবং বায়ু, এই নয় উপাদানের সংমিশ্রণ”।
“এরা যখন সূক্ষ্ম থাকে, তখনও এঁরা সকলেই বিরাজ করে, সূক্ষ্ম বেশে। আর যখন স্থুলে বিরাজ করে, তখন ব্রহ্মমলদের ধারণ করে আত্ম একাকী বিরাজ করে, এবং তার সাথে আমার মেধা প্রাণ বেশে বিরাজ করে তো পঞ্চভূত একত্রিত হয়ে বিরাজ করে, ত্রিসংখ্যায় বিস্তীর্ণ হয়ে অবস্থান করে। আর যেমন যেমন স্থূলদেহের স্ফীতি ঘটে, তেমন তেমন আত্মের থেকে ব্রহ্মমলরা বিস্তার লাভ করে, ৪ হয়ে ওঠে, আর ভূতরাও বিস্তার লাভ করে ৪ হয়ে ওঠে, আর এই দুইয়ের মাঝে থাকে প্রাণ অর্থাৎ আমি বা আমার জন্ম দেওয়া ভ্রূণ, অর্থাৎ মেধা”।
“এই সূক্ষ্ম থেকে স্থুলে বারংবার প্রত্যাবর্তনের কারণ কি? আত্মের তরফ থেকে কারণ হলো, ব্রহ্মমলদের রাণী ও নিজেকে রাজা রূপে বিরাজ করিয়ে, সমস্ত আবেগদের জন্ম দিয়ে, সহস্র সংখ্যার সদস্যবল নিয়ে বিরাজ করে, মেধাকে নিজের অধীনে স্থাপিত করা। আর মেধার উদ্দেশ্য হয় আমার ধারণা করে, বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে ধারণ করে, সমস্ত আবেগের নাশ করে চতুর্ভাবের জন্ম দেওয়া”।
“যদি মেধা এই কাজে সফল হয়, তবে সে আত্ম, চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার নাশ করে, এবং তখন কেবলই স্বয়ংসহ পঞ্চভূত, বিচার, বিবেক, বৈরাগ্য, এবং চার ভাব, অর্থাৎ প্রেম, সমর্পণ, মমতা ও বিশ্বাসের স্থাপনা করে, ১২টি উপাদান ধারণ করে, স্বয়ং চেতনা হয়ে ওঠে, এবং নিজেকে আমার সন্তান জ্ঞানে, আমার ক্রোড়ে সমর্পণ করে মোক্ষ অর্জন করে”।
“অর্থাৎ জীবনের মূল নয় উপাদান, আত্ম, ত্রিব্রহ্মমল, চারভূত ও মেধা। সূক্ষ্ম থেকে এঁরা স্থূলে গমন করে, এবং সেই স্থূলে গমন করার কালে আত্মের উদ্দেশ্য হয় আবেগের বিস্তার করে মেধাকে বশীকরণ করা। আর মেধার উদ্দেশ্য হয় বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য তথা চার ভাবের সঞ্চার করে, নিজের স্বরূপ অর্থাৎ চেতনায় প্রত্যাবর্তন করে, মোক্ষ লাভ করা”।
“কিন্তু এঁর মধ্যে বহু ভেদ থাকে পুত্রী। সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে এসে কর্ম করে, কর্মফল গ্রহণ করতে হয় আমার থেকে, অর্থাৎ আমার সূক্ষ্মরূপ কালের থেকে। সেই স্থূলে এসে আমার স্থূলরূপ অর্থাৎ প্রকৃতির থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এই মার্গ অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যের থেকে চারভাবকে লাভ করার মার্গ ধারণ করতে হয়। এই উদ্দেশ্যে, যখন যখন সূক্ষ্ম আবেশ থেকে স্থূল দেহে কনো এক যোনির দেহ ধারণ করবে মেধা আর প্রকৃতির থেকে শিক্ষা নেবে, তথা কালের থেকে কর্মের কর্মফলকে গ্রহণ করে সত্যের দিকে অগ্রসর হবে, তখন তখন সে উন্নত যোনিতে উন্নীত হবে, এবং অধিক ভাবে এই সমস্ত কিছু ক্রিয়া করার সুযোগ পাবে”।
“অন্যদিকে যখন যখন সে এই সমস্ত কিছুর থেকে অর্থাৎ কালের থেকে কর্মফল গ্রহণে বিরত হবে, এবং প্রকৃতির অবমাননা করে তার থেকে শিক্ষা না গ্রহণ করার অঙ্গিকার করবে, তখন তখন তার পতন হবে, এবং নিকৃষ্ট যোনিতে তাকে দেহধারণ করতে হবে। আর এই সমস্ত কিছুর সাথে আরো একটি অবস্থা আসে, আর তা হলো প্রকৃতির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, তথা কর্মের থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেওয়া”।
“কর্ম করলেই কর্মফল গ্রহণ করতে হবে, তাই কর্ম করা থেকেই বিচ্যুত হয় সে। আবার প্রকৃতির দিকে তাকালেই, প্রকৃতির থেকে লব্ধ শিক্ষাকে ধারণ করতে হবে। তাই প্রকৃতির দিকে ফিরেও তাকায়না সে। তখন সে ক্রমশ সৃষ্টির উদ্দেশ্য থেকেই বিমুখ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, তখন সে যেমন মেধার লক্ষ্য থেকে নিজেকে অবসারিত করে, তেমনই পরমাত্মের লক্ষ্য থেকেও নিজেকে অপসারিত করে। যদি এমন করে সে, তখন তাকে পিশাচ যোনিতে পতিত হতে হয়”।
“এই পিশাচ যোনি হলো সেই যোনি, যার মধ্যে না তো আত্মভাব স্পষ্ট থাকে, আর না মেধাভাব স্পষ্ট থাকে। আর তাই তার স্থূল শরীর ধারণই অসম্ভব হয়ে যায়। আর তেমন হবার কারণে, সে এক অনন্ত অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, যা সত্যের ন্যায় শূন্যন্যায় অন্ধকারও নয়, আবার অসত্যের ন্যায় আলোকও নয়। সে তখন এক এমন অন্ধকারে পতিত হয়ে যায়, যেখানে দাঁড়িয়ে তার অস্তিত্ব অন্ধকারময় হয়ে থাকে, সে সম্মুখে ভ্রমজগত অর্থাৎ আলোককে দেখতেও পায়, কিন্তু সেখানে পদক্ষেপ করার সামর্থ্য থাকেনা, কারণ তাঁকে হয় অন্য সূক্ষ্মজীবনরা প্রতারিত করে সেই আলোকে যাত্রা করার থেকে, না অন্ধকার গ্রহণ করে তাকে। আর তাই তাকে এক অনন্ত বেদনার সাগরে নিমজ্জিত হতে হয়”।
“পুত্রী, এই হলো জীবন, আর জীবনের তিন পরিণাম। এবার আসি, তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নে। কেন জীবনসংগ্রামের এই তিন চরণ। পুত্রী, যেকোনো প্রক্রিয়ার তিনটিই মূল চরণ হয়। প্রথম চরণ হলো ধারণা নির্মাণ, দ্বিতীয় চরণ হলো কর্মবিস্তার, আর তৃতীয় চরণ হলো কর্মের ফল থেকে সত্যধারণ করা। তাই সর্বত্র, এই তিন সংখ্যার সম্মুখীন হতেই থাকবে তুমি। আর রইলো কথা, সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ যোনির সংখ্যা সাত কেন, তো পুত্রী, সাতটিই স্তর হয় একটি প্রকাশের, একটি বিকাশের”।
“প্রথম স্তরে, থাকে অনুভব করা। দ্বিতীয় স্তরে, সেই অনুভবকে সঠিক ভাবে বিচার করে সিদ্ধান্তে আসা। তৃতীয় স্তরে, সেই সিদ্ধান্ততে স্থির থাকার অঙ্গিকার। চতুর্থ স্তরে, সেই অঙ্গিকারকে কর্মে রূপান্তরিত করার উদ্যম। পঞ্চম স্তরে, সেই উদ্যমকে পুষ্টি প্রদান করে সক্রিয় করে তোলা। ষষ্ঠ স্তরে, সেই পুষ্টি প্রদানের জন্য প্রকৃতির থেকে, আমার থেকে, জননীর থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করা। আর সপ্তম স্তরে, সম্পূর্ণ পদ্ধতিকে একত্রিত করে জাগ্রত হয়ে ওঠা”।
“পুত্রী, তোমার বক্ষে প্রাণের বিস্তারও এই সাত পদক্ষেপেই স্থাপিত হয়েছে, বিচার করে দেখো। প্রথমে তোমার আমার ভ্রূণসমূহকে ধারণ করে স্নেহের ও মমতার ভাব সঞ্চার হয়ে উপলব্ধি জেগেছিল। অতঃপরে, পরমাত্মের ভূমিকা নিয়ে তুমি সন্দিহান হয়ে ওঠো, আর সেই কারণেই এক্ষণে তুমি আমার কাছে এসে প্রশ্ন করছো। তৃতীয় স্তরে, চারভূত একত্রিত হয়ে মেধাকে ধারণ করে রেখে, নিজেদের কর্তব্যে দৃঢ়তা প্রদর্শন করে। চতুর্থ স্তরে, মেধা স্বয়ং জল হয়ে তোমাকে বেষ্টন করে কর্ম করে। পঞ্চম স্তরে, মেধা নিজের পুষ্টির ব্যবস্থা করতে, জলবায়ু হয়ে বর্ষণ করে করে, ভূমির নির্মাণ করে। ষষ্ঠ স্তরে, সে নিজের পুষ্টির প্রবাহ সঠিক রাখার জন্য এবার যোনি সঞ্চার করবে। আর সপ্তম স্তরে, সে সমস্ত কিছুকে একত্রিত করে নিয়ে কন্দমানব পর্বের শুরু করবে”।
“যেখানেই সংগ্রাম, যেখানেই যুদ্ধ, যেখানেই উত্থানের তথা স্বতন্ত্রতার প্রয়াস, সর্বত্র এই সাতটিই স্তর, সাতটিই ধারা। এমনকি যোনি বিস্তারের ক্ষেত্রেও তুমি দেখবে, এই একই ধারা। প্রথম একটি মেধা নিজকে স্থূল অস্তিত্বে আনার প্রয়োজন অনুভব করে হৃদপিণ্ড ধারণ করবে। অতঃপরে, সে সেই অনুভূতিকে সঠিক ভাবে ধারণ করতে মস্তিষ্কের সঞ্চার করবে। তৃতীয় পদক্ষেপে, সে সেই ধারণাকে দৃঢ়তা প্রদান করতে মেরুদণ্ড ধারণ করবে। চতুর্থ চরণে, সেই দৃঢ়তাকে স্থাপন করতে কর্ম করার জন্য হাতপা বিস্তৃত করবে। পঞ্চম স্তরে, সে এই সমস্ত প্রক্রিয়াকে পুষ্টিপ্রদান করার জন্য উদর বিস্তার করে, খাদ্য পাচনের উপায় নির্মাণ করবে। ষষ্ঠ স্তরে, সে সেই পুষ্টি লাভকে অক্ষয় করার জন্য, মাতার নাড়ির সাথে নিজেকে সংযুক্ত করবে এবং মাতার থেকে আহার লাভ করতে থাকবে। এবং অন্তে সপ্তম স্তরে, এই সমস্ত কিছুকে চালিয়ে রাখার জন্য সে নির্মাণ করবে পঞ্চইন্দ্রিয়”।
“তাই পুত্রী, যেখানেই উত্থান, যেখানেই সংগ্রাম, সেখানেই ৭ সংখ্যা। আর তাই তো, মেধাদের মহানয়ক, আমার পুত্র যে এই ৭ সংখ্যাকে ধারণ করেই অবস্থান করবে। আর আমি হলাম সমস্ত কিছুর সার, আর সার সর্বদা ত্রিস্তরেই বিস্তৃত থাকে। তাই আমি যখন যখন প্রকাশ্যে আসবো, সর্বদা ৩ সংখ্যাই ধারণ করে থাকবো। আর তুমি হলে সাম্যতা স্থাপনের পরিভাষা। তুমি যেমন পরমাত্মকে ধারণ করবে, তেমন আমাকেও ধারণ করবে। তুমি জানো, এই দুইকে স্থাপন করলে তবেই, সংগ্রাম সম্ভব, আর সংগ্রাম সম্ভব হলে, তবেই মীমাংসা স্থাপিত হবে। তাই তুমি সর্বদা ৯ সংখ্যাকে ধারণ করো, কারণ ৯ মানেই আত্ম ও ব্রহ্মমল তিন, মেধা ও চার ভূত”।
দেবী ধরিত্রী এবার গদ গদ হয়ে বললেন, “এবার বিস্তার করো মা। জীবনচক্রের প্রাথমিক কথার অধ্যয়ন তো আমি পূর্বেই করেছি। তাই যতটুকু জেনেছি, তার পর থেকে জীবনচক্রের বিবরণ প্রদান করো মা আমাকে”।
