ধর্মপ্রজ্ঞা – সত্য মার্গ

মেধাকে ধারণ করে, ধরিত্রীর এমন পরিণতি হওয়া পরমাত্মের কাছে বেশ চাঞ্চল্যকর তথ্য হয়ে দাঁড়ায়। আশার অতীত ঘটনা দেখে সে একই সাথে বিস্মিত, ভয়ার্ত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠে। বিস্মিত হবার কারণ এই যে, যা ঘটেছিল, তা ছিল তার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত; ভয়ার্ত এই ভেবে যে যদি পরাশক্তির ভ্রূণের এমন সামর্থ্য হয়, তবে সেই ভ্রূণ পরিপক্ক হয়ে উঠলে কি হবে, আর সেই ভ্রূণের জন্মদাত্রীর সামর্থ্য ঠিক কতখানি; আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠে সে কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার প্ররোচনায়।

ত্রিব্রহ্মমল একত্রে পরমাত্মকে বলেন, “প্রভু, আপনিও এই সকল মেধার সাথে যুক্ত হয়ে যান। এঁরা ভ্রূণ, অর্থাৎ দেবীর পূর্ণ প্রভাব এঁদের উপর বর্তাবে না। এমন অবস্থায় আপনি যদি আমাদের সঙ্গে নিয়ে এঁদের উপর ক্রীড়া করেন, তাহলে এঁদেরকে এই ভ্রূণ অবস্থাতেই আটকে রাখা সম্ভব হবে। আর সাথে সাথে, এঁরা আমাদের ও আপনার প্রভাবের কারণে, আপনার আরাধনা করা শুরু করে দেবে, যদি আপনি এঁদের মধ্যে কামনার বিস্তার করেন, আর স্বয়ং আপনিই সেই কামনার পূর্তি করেন, তখন আপনি আর কেবল পরমাত্ম থাকবেন না, পরমেশ্বর হয়ে উঠবেন”।

পরমাত্ম উত্তরে বললেন, “কিন্তু দেবী তা হতে দেবেন কেন? আমি যদি নশ্বর হয়েও ঈশ্বর হয়ে উঠতে সচেষ্ট হই, দেবী কি আমার বিরোধ করবেন না! আর দেবীর সামর্থ্যের সামনে কি আমি টিকে থাকতে পারবো? … আর তার থেকেও বড় কথা এই যে, এই সমস্ত মেধাকে কামনাতে পরিপূর্ণ করে তোলার জন্য, এঁদেরকে সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে নিয়ে আসতে হবে। তা কি করে সম্ভব হবে?”

দেবী কল্পনা বললেন, “প্রথম কথা এই যে, দেবী ঈশ্বরত্ব নিয়ে উদাসীন। ঈশ্বর রূপে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য তিনি ব্রহ্ম থেকে ব্রহ্মময়ী হননি, বরং মাতৃত্বের মমতার কারণে তিনি এমন হয়েছেন। আর তাঁর সেই মমতাতে আঘাত হানার কারণে, এখন তিনি প্রগলের মত নিজের ভ্রূণদের থেকে সন্তানকে জন্ম দেবার প্রয়াস করে চলেছেন। বিচার করে দেখুন নাথ, মেধা থেকে সন্তান হবার অর্থ হলো, মেধা থেকে চেতনা হয়ে ওঠা। আর মেধা থেকে চেতনা হয়ে উঠতে গেলে, এঁদের সকলকে বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে ধারণ করতে হবে। আর তা ধারণ করতে হলে, এঁদেরকে স্থূলে আসতেই হবে”।

“তাই, এমন অবস্থায় যদি আপনিও এঁদেরকে স্থূলে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া করেন, তবে আপনি দেবীর কোপের পাত্র হবেন না, বরং দেবীর সহায়তা লাভ করবেন আপনি। … দেবীর সহায়তা মানে, দেবীর থেকে উৎপন্ন চার ভূত, অর্থাৎ আকাশ, মৃত্তিকা, অগ্নি ও বায়ুকে আপনি চালনা করতে পারবেন। আর এঁদের মাধ্যমে মেধাদের সূক্ষ্ম থেকে স্থূল করে দেওয়া হবে আপনার কাজ”।

পরমাত্ম এই কথন শুনে, সেই কথাতে ভরসা রেখে, চারভূতের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, “যা আমি করেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই আমি। আর তা করার জন্য, আমার তোমাদের সহায়তা লাগবে। তোমরা যদি এই প্রতিটি মেধাখণ্ডের সাথে যুক্ত হও, তাহলে তোমাদের মাতা এই সকল মেধার মধ্যে বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য রূপ অমৃত ঢালতে পারবেন, আর তা সম্ভব হলে, এই প্রতিটি মেধা সহসা ভ্রূণ থেকে শিশু হয়ে উঠে তাঁদের মায়ের কোলে ফিরে আসতে পারবে”।

আকাশ, যে জ্যেষ্ঠ বলে তাকে বাকি তিন ভূত গণ্যমান্য করে, সে উত্তরে বলল, “আমরা দেহাবয়ব গঠনের পক্রিয়াতে আপনার সঙ্গ দিতে পারি, কিন্তু মেধার উপর অধিকার কেবল ও কেবল মাতার। তাই মাতা সেই অবয়বের সাথে কনো মেধাকে যুক্ত হতে দেবেন কিনা, তার নিশ্চয় আমরা করতে পারবো না। … তবে আপনি, প্রক্রিয়ার শুরু করতে পারেন, আর তা করে গবেষণা করে দেখে নিতে পারেন যে, মাতা তাঁর ভ্রূণকে সেই অবয়বে যুক্ত করেন কিনা”।

দেবী মৃত্তিকা বললেন, “কিন্তু হে পরমাত্ম, এই সমস্ত কিছুর আগে, ধরিত্রীকে আলোকিত করার চিন্তা করুন। এমন অন্ধকার জগতে যদি আমরা স্থূল অবয়বের গঠনও করি, তাও মেধাদের মা যুক্ত করবেন না, কারণ স্থূল শরীর মানে সীমিত শক্তি, আর সীমিত শক্তি মানে, আলোক প্রদান না করলে, তারা অন্ধ। আর অন্ধ থাকলে বিচার করাও সম্ভব নয়, বিচার না করতে পারলে বিবেক জাগ্রত হওয়াও সম্ভব নয়, আর বিবেক জাগ্রত না হলে, আসক্তি বিরক্তির ঊর্ধ্বে, অর্থাৎ বৈরাগ্যে স্থাপিত হয়াও সম্ভব হবেনা। অর্থাৎ, আলোক স্থাপনের প্রক্রিয়া না করলে, মাতা তাঁর একটি ভ্রূণকেও সেই অবয়বদের সাথে যুক্ত করবেন না”।

পরমাত্ম সেই কথাতে চিন্তিত হয়ে গিয়ে প্রত্যাবর্তন করে, ত্রিব্রহ্মমলকে সমস্ত কথা বললে, দেবী কল্পনা বললেন, “নাথ, অগ্নির কাছে যান। অগ্নির তত্ত্ব জানা আবশ্যক। অগ্নির কারণেই আলোকের সূত্রপাত হয় স্থূলজগতে। তাই যদি কনো বিজ্ঞান মেনে ধরিত্রীকে আলোকিত করা সম্ভব হয়, তার জ্ঞান আপনি কেবল অগ্নির থেকেই পাবেন”।

এমন প্রস্তাব শুনে, পরমাত্ম চলে গেলেন অগ্নির কাছে, এবং অগ্নিকে তাঁর প্রশ্নের সদুত্তর দেবার জন্য রাজি করতে পারলে, অগ্নি বললেন, “অগ্নির থেকে আলোক বিচ্ছুরিত হয়, কিন্তু যদি অগ্নির থেকে সরাসরি আলোক গ্রহণ করতে যান, তাহলে সমস্ত স্থূল পদার্থ মুহূর্তের মধ্যে জ্বলে যাবে। তাই আপনি এক কাজ করতে পারেন। মৃত্তিকা যখন অতিসূক্ষ্ম তখন সে বালুকা হয়ে ওঠে, আর বালুকা অতি মেধাবী অগ্নির থেকে আলোক সংগ্রহ করে, তাকে প্রতিফলন করানোর জন্য। তাই আপনি যেই যেই গ্রহ নির্মাণ করেছেন, তাদের মধ্যে এমন গ্রহের সন্ধান করুন, যার মৃত্তিকা আপনার বাহুবলের কারণে অতিসূক্ষ্ম বালুকা হয়ে গেছে। আর তাকে ধরিত্রীর একটি কোনে স্থাপন করুন, মাঝে আকাশকে স্থাপিত রেখে”।

“আকাশকে স্থাপিত রাখলে, ধরিত্রীর গর্ভে যেই অগ্নি অবস্থান করছে, তার তাপ গ্রহণ করবে না সেই সিকতা পরিপূর্ণ গ্রহ, কিন্তু তা আলোককে ধারণ করে, তার প্রতিফলন করবে, আর সেই আলোকে ধরিত্রী আলোকিত হবে। তবে পরমাত্ম, একাকী ধরিত্রীর অগ্নির বলে যথার্থ পরিমাণ আলোক প্রতিফলন করানো সম্ভব হবেনা, কারণ অগ্নি ধরিত্রীর গহ্বরে স্থিত, বাহ্যে নয়। তাই বেশ কিছু আরো আপনার নির্মিত গ্রহকেও সেই সিকতা পরিপূর্ণ গ্রহের সাথে সংলগ্ন করুন। এমন করলে, সমস্ত গ্রহের গহ্বরে স্থিত অগ্নির থেকে প্রকাশিত আলোক, সেই সিকতা পরিপূর্ণ গ্রহের থেকে প্রতিফলিত হয়ে ধরিত্রীকে আলোকময় করে তুলবে”।

পরমাত্ম বললেন, “কিন্তু ধরিত্রী তো আকাশের বক্ষে স্থাপিত থাকার কারণে সমানে আবর্তন করে চলেছে, আর তা ছাড়াও ধরিত্রী তো আর একটি চিত্র নয়, সে স্বয়ং একটি অবয়ব। অর্থাৎ তার কনো একটি দিক যদি এই আলোক প্রতিফলনকারী গ্রহের সম্মুখে থাকে, তবে অন্য একটি দিক তো এঁর থেকে দূরেও থাকবে। সেই স্থানের মেধারা কি তবে দেহ ধারণ করবেনা!”

অগ্নি বললেন, “বেশ, তবে আপনি আরো একটি কাজ করুন তাহলে। ধরিত্রীর থেকে ক্ষুদ্র কিছু আপনারই নির্মিত গ্রহের সন্ধান করুন, যা সিক্ত শুভ্র মৃত্তিকার দ্বারা নির্মিত। এমন একটি গ্রহকে সম্মুখে রাখুন ধরিত্রীর সাথে। স্মরণ রাখবেন, এঁর অবস্থানকে আপনি স্থির রাখতে পারবেন না, কারণ এঁর আয়তন ধরিত্রীর থেকে ক্ষুদ্র হবার কারণে, আকাশতত্ত্ব এঁকেও আবর্তনের মধ্যেই স্থাপিত রাখবে। তবে ধরিত্রীর থেকে আলোককে প্রতিফলিত করে, এই গ্রহ শুভ্র স্নিগ্ধ আলোক প্রদান করবে। আর তা ধরিত্রীর সেই দিককে আলোকিত করবে, যেই দিক সিকতাপূর্ণ গ্রহের সম্মুখে থাকবে না”।

পরমাত্ম এই সমস্ত বিজ্ঞান ধারণ করে এসে ত্রিব্রহ্মমলকে বললে, তাঁরা সন্ধান করলেন এমন দুই গ্রহের। এবং তা লাভ করে, ঠিক সেই ভাবে তাদেরকে স্থাপন করলেন, যেমনটা অগ্নি বলেছিলেন। ফলস্বরূপ, সিকতাপূর্ণ গ্রহ ধরিত্রীকে অধিক আলোক দিতে থাকলো, আর তার থেকে ধরিত্রী দিবস ধারণ করলে, পরমাত্ম সেই গ্রহের নামকরন করলেন, সূর্য, অর্থাৎ যে সুরক্ষিত হবার জন্য পরিশ্রম করার প্রেরণা প্রদান করে। আর অন্যদিকে সিক্ত মৃত্তিকা নির্মিত গ্রহকেও স্থাপন করলেন, যার থেকে ধরিত্রী রাত্রিকে অনুভব করলো। আর এই গ্রহের নাম রাখলেন চন্দ্র, অর্থাৎ যা কামনার চঞ্চলতাকে ইন্দ্রিয়ে স্থাপন করে”।

এই দুই কর্ম করা সম্পূর্ণ হলে, এবার যা হলো, তা পরমাত্মার, ত্রিব্রহ্মমলের, তথা সকল ভূতের ধারণার অতীত। ধরিত্রীর বক্ষে স্থাপিত মেধা সকল এবার চঞ্চল হয়ে ওঠা শুরু করে, এবং তারা চঞ্চল হতেই, নির্মিত হয় জলধারা। ক্রমশ ধরিত্রী জলমগ্ম হতে শুরু করে দেয়, এবং তারই মাঝে বেশ কিছু স্থানে মৃত্তিকাস্তর উন্নীত থেকে যায়।

এমন কৃত্য হবার কারণে, ধরিত্রীর অন্তরে থাকা অগ্নির প্রভাবে জল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, আর তা জলবায়ুরূপ ধারণ করে বায়ুর সাথে ক্রীড়ায় মেতে ওঠে। আর এই অগ্নির সাথে তথা বায়ুর সাথে ক্রীড়ার কারণে মেধা অর্থাৎ জল জলবায়ুতে পরিণত হয়ে গিয়ে, বর্ষণের সূত্রপাত করে। আর এই সমস্ত প্রক্রিয়া সহস্র বৎসর চলতে থাকলে, অগ্নির প্রভাবে মৃত্তিকার সঙ্কুচন, তথা জলের প্রভাবে মৃত্তিকার সঙ্কুচন, তথা বায়ুর প্রভাবে মৃত্তিকার সঙ্কুচন, এই তিন মিলেমিশে একাকার হয়ে পাহাড়, পর্বত, নদ, নদী, সমতল, মালভূমি, তথা বালুকা পরিপূর্ণ এবং বরফ পরিপূর্ণ মরুভূমির নির্মাণ হতে থাকে।

আর এঁদের অবস্থান, আবহাওয়া এবং তাপউত্তপ তথা শীতলতার এমন বিচিত্র পরিকাঠামো নির্মিত হয় যেন মনে হয়, ধরিত্রী হলেন অগ্নি, বায়ু তথা জল অর্থাৎ মেধার প্রভাবের জননী, আর সেই জননী তাঁর প্রতিটি সন্তানের সাথে পৃথক পৃথক রসায়নের সঞ্চার হয়। এই কথাকেই রূপক ভাবে কৃতান্তে বর্ণিত করা আছে, আর তাই সেখানে তোমরা দেখেছ যে, আকাশ ও ধরিত্রী হলেন পতিপত্নি, এবং অগ্নি, বায়ু তথা জল হলেন তাঁদের তিন সন্তান। এই তিনের সাথে আত্মের বিভিন্ন প্রক্রিয়াতে সংযোগের কারণে, যা যা কীর্তিকলাপ হয়, তাকেই কৃতান্ত বিবৃত করেছে সর্বাম্বা কাণ্ডে।

কিন্তু এই সমস্ত কিছু যখন একদিকে হচ্ছিল, তখন দেবী ধরিত্রী জিজ্ঞাসু হয়ে ব্রহ্মময়ী মাতার সম্মুখে গিয়ে তাঁর দর্শন কামনা করে তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, “মা, পরমাত্ম কি সত্যই প্রায়শ্চিত্ত করতে উদ্যত? তার মধ্যে এমন প্রায়শ্চিত্তের ভাব আকস্মিক উদিত হলো কেন?”

মাতা হাস্যমুখে বললেন, “না তো সে প্রায়শ্চিত্ত করতে উদ্যত, আর না সে প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য এই সমস্ত কিছু করছে। সে এই সমস্ত কিছু করছে নিজেকে পরমেশ্বর রূপে প্রতিস্থাপন করার জন্য। পরমেশ্বর রূপে প্রতিস্থাপন করার জন্য, তাকে পরমেশ্বর রূপে মান্যতা প্রদানের জন্য কারুকে প্রয়োজন। সমস্ত মেধাখণ্ডকে সে সেই উদ্দেশ্যেই ধাপিত করতে চাইছে”।

ধরিত্রী পুনরায় জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “মা, আমি জানি যে তুমি স্বয়ং চেতনা। তোমার চেতনা ছাড়া কনো কিচ্ছুর নড়ার সামর্থ্যও নেই। পরমাত্ম তো কোন ছাড়, স্বয়ং তুমিও তোমার চেতনার বিরুদ্ধে চলতে সক্ষম নও। এর অর্থ, তুমিই ব্রহ্মমলদের প্রেরণা প্রদান করেছ, সেই প্রেরণাতে পরমাত্মকে প্রেরিতও তুমিই করেছ, আর অগ্নিকেও প্রেরণা প্রদান করেছ যাতে সে স্থূল জগত নির্মাণের বিজ্ঞান পরমাত্মকে বলে। আমার প্রশ্ন হলো কেন? কেন তুমি যে ঈশ্বর নয়, যে নশ্বর নয়, তাকে ঈশ্বর রূপে নিজেকে স্থাপন করার প্রয়াসে সহায়তা প্রদান করছো?”

মাতা হেসে বললেন, “ধরিত্রী, প্রয়োজন পূর্ণ হওয়া নিয়ে কথা। যদি পরমাত্মের ঈশ্বরত্ব লাভের লোভকে ব্যবহার করে, আমার নিরাকার থেকে সাকার হবার প্রয়োজন পূর্ণ হয়, তবে সেটিই তো সর্বাধিক সহজ উপায় হবে। তাই নয়কি?”

ধরিত্রী পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “একটু বুঝিয়ে বলো মা। না বুঝতে পেলে, তোমার লীলাকে অনুধাবনই করতে পারবো না। আমি তোমার লীলাকে অনুভব করতে চাই, তাতে বিহ্বল হতে চাই। তাই মা, আমার বোধগম্য হবে, এমন ভাষায় বলো সেই কথা”।

মাতা হেসে বললেন, “পরমাত্ম আমার সন্তানদের অর্থাৎ মেধাদের স্থূল দেহ প্রদান করতে চায়, কারণ স্থূল দেহ মানেই সীমিত কালের গঠন, আর সীমিত কালের গঠন মানেই সেই গঠন বিনষ্ট হয়ে যাবার ভয় ও শঙ্কা। অর্থাৎ, স্থুল দেহে এলেই সর্বক্ষণ আশা করবে তারা যাতে তাদের এই গঠনের নাশ না হয়। সেই উদ্দেশ্যে তারা কামনা করবে, কল্পনা করবে, একাধিক ইচ্ছা করবে, আর সর্বক্ষণ চিন্তা করবে। আর সেই সমূহকে পূর্ণ করার অভিনয় করবে পরমাত্ম, এবং সেই অভিনয়ের জেরে সে পরমেশ্বর রূপে নিজেকে স্থাপন করবে জগতে। এই তার প্রয়াস”।

“আর রইল কথা, আমার প্রয়োজন এতে কিভাবে সিদ্ধ হবে! স্থুল দেহ ধারণ না করলে, বিচার করানো সম্ভব নয় মেধাদের। বিচার না করতে পারলে, বিবেক জাগরণও সম্ভব নয় আর বৈরাগ্য ধারণও সম্ভব নয়। আর এই তিন না একত্রিত হলে, মেধা কখনোই ভ্রূণ থেকে আমার সন্তান হয়ে ওঠার অর্থাৎ চেতনা হয়ে ওঠার প্রেরণা লাভ করবেনা। … তাই পরমাত্ম নিজেকে পরমেশ্বর করে তোলার জন্য, যেই কাজ করবে অর্থাৎ মেধাদের স্থূলদেহ প্রদানের প্রয়াস করবে, সেই একই প্রয়াস আমার প্রয়োজন অর্থাৎ আমার সন্তানদের পুনরায় ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে”।

“সেই কারণেই বহ্মমলদের, পরমাত্মকে এবং ভূতদের এই প্রেরণা প্রদান করেছি। অর্থাৎ আমি ততক্ষণ এই সকলের কল্পনার অতীতে উপস্থিত থেকে এঁদেরকে চেতনা ও প্রেরণা প্রদান করিয়ে কাজ করাতে থাকবো, আর স্বয়ং নিষ্ক্রিয় থাকবো, যতক্ষণ না সেই বিশেষ দেহধারীদের উপস্থাপনা হবে, যারা পূর্ণ ভাবে বিচার করতে সক্ষম, বিবেক জাগ্রত করতে সক্ষম আর বৈরাগ্যের প্রকাণ্ড উত্তাপ সইতে সক্ষম। যখন সেই দেহধারী, অর্থাৎ যোনির উদ্ভব হবে, তখনই আমি অন্তরাল থেকে মুক্ত হয়ে, প্রত্যক্ষ ভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠবো, তার আগে কেবলই কাল বেশে বিস্তৃত হবো, আর সকলভূতদের হাত ধরে যোনিনির্মাণের পথ ধরে, প্রকৃতি বেশে স্থাপিত হবো”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13