৩.২। অপমান পর্ব
পরিকল্পনা অনুসারে পুণ্ড্রের কাছে পৌঁছালে, অনন্য ও গুণ দেখলেন, একটি স্থানে লোকসমাবেশ করে পুণ্ড্র নিজেকে অনন্য বলে দাবি করছেন। সেই দেখে গুণ সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “যদি ইনি অনন্য হন, তবে ইনার প্রাণসখা গুণ কোথায়?” হাস্য হেসে পুনরায় বললেন গুণ, “সেই গুণ আমি। হ্যাঁ আমার সাথে অনন্যও আছে। কে আসল অনন্য? এই পুণ্ড্র নাকি আমার সখা? অনন্য মহাশক্তিমান। তাই আমার সখা আর এই পুরুষের মধ্যে দ্বন্ধ হয়ে যাক। আমৃত্যু দ্বন্ধ হবে সেটি। অর্থাৎ যে অনন্য, সেই জীবিত ফিরবে মৃত্যুমণ্ডপ থেকে। আপনারা প্রস্তুত তো?”
সকলে উৎসাহী হলে পুণ্ড্র আর অনন্যের মল্লযুদ্ধ শুরু হলো। তবে তা অধিকক্ষণ চলল না। পুণ্ড্রকে সাড়ে তিন আছার দিয়ে, তাঁর দেহের উপরের মুণ্ডকেই ঘুরিয়ে দিল অনন্য। পুণ্ড্রের শবদেহ ভূমিতে পতিত হয়ে গেল। পুণ্ড্রের মৃত্যুর খবর গেল রুক্ষের কাছে। উগ্র হয়ে উঠে রুক্ষ ঘোষণা করলো, “অনন্য, যদি সাহস থাকে, সম্যক এসে আমার সাথে যুদ্ধ করো। আমার সেনা আর আমি রুক্ষ, এই অবস্থান করলাম মেগরাজ্যের বিখ্যাত শিলার নিচে”।
গুণ ও অনন্য এই হুংকারেরই অপেক্ষা করছিলেন। দুই সখা সম্মুখে এগিয়ে এলেন। রুক্ষ অপেক্ষা করছিলেন ৫ সহস্র সেনা নিয়ে। আর গুণ ও অনন্য সেনা ছাড়া কেবল দুইজনেই, তাও পদব্রজে প্রবেশ করলেন সেই রণক্ষেত্রে। রুক্ষ উগ্র হয়ে সেনাকে আক্রমণ করতে বললেন, তো গুণ সেই সেনার নিধন করা শুরু করলেন, ঝাঁকে ঝাঁকে বাণের বন্যা দ্বারা। প্রায় অর্ধেক প্রহর সেনাসমূহ আকাশ দেখতে পেলো না। কেবলই বাণের বন্যা দেখলো। রুক্ষের সমস্ত সেনার নিধন হয়ে গেল, আর তাই রুক্ষও রণক্ষেত্র ছেড়ে চলে গেলেন।
অন্যদিকে গুণের ও অনন্যের অস্ত্রভাণ্ডারও সমাপ্ত। তাই তাঁরাও মৌফল জঙ্গলে প্রবেশ করলো। গুণ নিজের অসি দ্বারা বাণের সামগ্রীরূপে প্রচুর বৃক্ষছেদন করছিলেন। ঠিক সেই সময়ে অনন্য দেখলেন একদল বিশালকায় দানবের গোষ্ঠী তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে। গুণকে সতর্ক করলেন অনন্য, কিন্তু সতর্ক করার পরপরেই শুরু হয় তাঁদের উদ্দেশ্যে বল্লমের বর্ষা। গুণ ও অনন্য বহু কৌশলে সেই বর্ষণকে অতিক্রম করলেন। কখনো বৃক্ষের ডাল ধরে ঝুলে, তো কখনো বৃক্ষের উপর উঠে পরে, কখনো প্রচণ্ড বেগে দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে, আবার কখনো ঝর্নার জলের আড়ালে লুকিয়ে পরে।
এমনই ভাবে বিরদ্ব ঝর্নার আড়ালে অনন্য ও গুণ লুকিয়ে থাকার সময়ে, যখন তাঁরা গণনা করছিলেন কতজন দানব রয়েছেন সর্বসাকুল্যে, তাঁরা দেখলেন সংখ্যায় তারা একশত একটি। এবং সকলের পৃষ্ঠে তখনো তিনটি করে ভালা বাঁধা রয়েছে। সেই সময়তেই ঝর্নার কাছাকাছি স্থানে সেই দানবরা গুণ আর অনন্যের সন্ধান করতে এলে, প্রকাণ্ড লম্ফ দিয়ে ঝর্নার দুই দিক থেকে দুই সখা বেড়িয়ে এসে, অসম্ভব গতি বেগ আর বল ধারণ করে, উপস্থিত ১০জন দানবের মুণ্ড ভেঙে দিয়ে, তাঁদের থেকে ত্রিশটি বল্লম অধিগ্রহণ করে নিলেন। অতঃপরে, ঝর্নার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে থেকে, গুণ আর অনন্য নিজেদের ধনুকে সেই বল্লমসমূহকে স্থাপন করে অনন্ত বল প্রয়োগ করে, পরবর্তী ৩০জন দানবের হত্যা করলেন। এরপর, পাথরের পিছনে লুকিয়ে লুকিয়ে, সেই ৩০ জন দানবের থেকে ৯০টি ভালা সংগ্রহ করার কালে, দানবরা তাঁদের ৩০ জনন সঙ্গীর শবদেহ দেখে, একপ্রকার ভয়ার্ত হয়েই, এলো পাথারি ভাবে বল্লম ক্ষেপণ করতে থাকলেন।
অনন্য ও গুণ অপেক্ষা করলেন যতক্ষণ না সকলের সকল ভালার ভাণ্ডার সমাপ্ত না হয়ে যায়। যেই ক্ষণে তাঁরা দেখলেন যে সকলের ক্ষেপণ অস্ত্রের ভাণ্ডার সমাপ্ত হয়েছে, তখন এদিক সেদিক দিয়ে ভীষণ বেগ ও বল দ্বারা নিজেদেরকে ক্ষেপণ করে করে, অনন্য ও গুণ সমস্ত দানবের নাশ করলেন। এই কীর্তি সম্পন্ন করে, পুনরায় যখন তাঁরা ঝর্নার জলে স্নান করে শুদ্ধ হতে গেলেন, তখন দুইজনেরই পৃষ্ঠে দুটি বাণ এসে লাগতে দুইজনই মূর্ছাপ্রাপ্ত হয়ে ভূমিতে পরে গেলেন।
সংজ্ঞা ফিরলো যখন, তখন অনন্য ও গুণ দেখলেন, তাঁদের সম্মুখে এক বৃদ্ধ বসে রয়েছেন। অনন্য প্রশ্ন করলেন, “কে আপনি? আমাদের বন্দী করেছেন কেন?”
বৃদ্ধ বললেন, “আমি? আমি মৃত্যুপথযাত্রী, মেঘার ও ভামার পিতা, মেঘরাজ। ওই দুষ্ট ভাময়ন্তি আমার পত্নী নয়। আমার পত্নীর নাম শর্বাণী। ভাময়ন্তি এক দাসী মাত্র। ভাময়ন্তি আমার ভ্রাতা, বজ্রকে বিবাহ করে রুক্ষকে জন্ম দেয়, আর রুক্ষ আমার পত্নীকে হত্যা করে, আমার দুই কন্যাকে দাসী করে রেখে দিয়েছিল। আমি তোমাকে চিনি অনন্য আর তোমাকেও গুণ। আমি তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম আমার অস্ত্র ভাণ্ডার নিয়ে, যা আমার ব্যবহার করার সামর্থ্য নেই। এই একটি তুনির যার বাণ কখনো সমাপ্ত হয়না। পুরাকালে দেবী দসীর সেবক হতেন আমার প্রপিতা। তাঁর প্রতি তুষ্ট হয়ে দেবী দসী এই তুনির আর এই মহাধনুশ, যার নাম শ্রীধনুশ, এটি প্রদান করেছিলেন। অনন্য, তোমার কাছে কালান্তর ধনুশ আছে, তাই তোমার আর কনো ধনুশের প্রয়োজন নেই। তোমার কাছে মহাশূন্য, কালশূন্য ও কালবেষ্টনী অস্ত্র আছে, যার দ্বারা তুমি স্বয়ং ত্রিমূর্তির সাথেও যুদ্ধ জয় করতে সক্ষম। তাই আমার কাছে দেবী দসীরই প্রদান করা এই তিন মোক্ষম বাণ, প্রাণান্ত বাণ, যক্ষনাশী বাণ, আর নাগাশূন্য বাণ প্রদান করলাম গুণকে। আর তোমার জন্য অনন্য এই কালহরা গদা প্রদান করলাম, এই গদার প্রতিটি প্রহারে, যার উপর, যেই বস্তুর উপর, যেই জন্তুর উপর, যেই মানবের উপর তার প্রয়োগ হবে, তার থেকে ১০ বৎসর কাল হরণ করে নেবে”।
“এই অস্ত্রগুলি হনন করতে চেয়েছিল রুক্ষ। রুক্ষের বলের সামনা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলনা, তাই এই বনে চলে এসেছি। কিন্তু এখানেও সে নিজের দেড় শত নাগা ও দেড় শত যক্ষ সেনাদের পাঠিয়ে দেয়, আমার সন্ধান করতে। তোমরা এক শত সেই দানবের নাশ করেছ। কিন্তু সম্মুখে এখনো একশত নাগা ও একশত যক্ষ অপেক্ষা করছে। গুণ তোমার এই অস্ত্র আর অনন্য তোমার এই কালহারা গদা সহজেই তাদের বিনাশ করবে। আমার ভ্রাতার মৃত্যু হয়ে গেছে, রাজা হয়ে অবস্থান করছে রুক্ষ, কিন্তু আমার আরেক ভ্রাতার পুত্র, অভয় এখনো জীবিত। সে সদাচারী, বীরও সমান ভাবে। তাকে রাজা করে দিও”।
গুণ বললেন, “আপনি এখানেই অপেক্ষা করুন, আমরা সমস্ত রুক্ষ সেনার নাশ করে আসছি”। এই বলে এবার সম্যক যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন অনন্য ও গুণ। নাগাদের সূক্ষ্মপঞ্চভূতের অস্ত্রকে ভেদ করে সমস্ত এক শত নাগার নাশ করতে আর যক্ষদের রত্নসহ যক্ষদের সমাপ্ত করতে অধিক সময় লাগলোনা গুণের। আর তাই তাঁরা প্রত্যাবর্তন করলেন এবার সরাসরি রুক্ষকে আক্রমণ করতে।
রুক্ষ নিজের সমস্ত সেনাকে আবারও সজ্জ করছিলেন, কিন্তু সেই সময়েই একঝাঁক বাণ আকাশ অন্ধকার করে ছুটে এসে শত শত সেনার নাশ করে দিলে, রুক্ষ ক্ষিপ্ত ভাবে অনন্য আর গুণকে আক্রমণ করলেন। সেনা যেন এবার সমুদ্রের মত, সহস্র সহস্র সেনা ছুটে আসতে থাকলো গুণের দিকে, আর গুণের শক্তি যেন কয়েকশত গুণ অধিক হয়ে গেছে শ্রীধনুশের কারণে। অনন্ত তুনিরের বাণ সেই সঙ্গে সঙ্গত দিলে, সেনাসমূহ একাকী গুণের বাণকেই সহ্য করতে নাজেহাল হয়ে গেলেন।
অন্যদিকে অনন্যের কালান্তর ধনুশের কথা বেশ ভালো ভাবেই জানে রুক্ষ। তাই ধনুর্বাণে না গিয়ে সরাসরি গদাযুদ্ধে আবাহন করলেন অনন্যকে, আর তাই অনন্যও নিজের নূতন কালহারা গদা প্রয়োগের উপযুক্ত সময় পেয়ে গেলেন। অধিক সময় লাগলো না। তিনটি আঘাতেই রুক্ষের গদা চূর্ণ হয়ে গেল। অনন্য বুঝতে পারলো, ত্রিশ বৎসর আয়ু ছিল রুক্ষের গদার। আর অতঃপরে মাত্র একটি প্রহারেই রুক্ষের মরদেহ ভূমিতে পতিত হয়ে গেলে, বাকি সেনা ভয়ার্ত হয়ে কেল্লার অন্তরে পলায়ন করলে, গুণ ও অনন্য বনে গিয়ে, মেঘরাজকে নিয়ে আসতে চান, কিন্তু তাঁরা পৌঁছে দেখেন, বয়সের কারণেই মৃত্যু লাভ করেছেন মেঘরাজ।
তাই তাঁর শবদেহকে নিয়ে এসে, রাজপুত্র অভয়কে প্রদান করে, তাঁকে দিয়ে শ্রাদ্ধকর্ম করিয়ে, তাঁকে সিংহাসনে আঢ়ুর করে, মেঘরাজ্য থেকে বিদায় নিলেন অনন্য ও গুণ। আর তাঁরা তরুরাজ্যে পৌছাতেই বল অগ্নি ও বারিকে নিয়ে জালেম রাজ্যে পৌঁছালেন।
শশ পূর্ব থেকেই ক্রুদ্ধ ছিলেন রুক্ষ ও পুণ্ড্রের হত্যার সংবাদ লাভ করে। তাই অগ্নি ও বাণীকে দেখে ক্রোধের আভাসে তাঁদের সাথে যুদ্ধ করতে তৎপর হয়ে সম্মুখে এগিয়ে এলে, অগ্নি আর বারি বললেন, “মহাবলি শশ, মেঘরাজ্য আপনার কাছে অর্পণ করতে এসেছি আমরা। ক্ষমা করবেন, প্রয়াত রাজা মেঘরাজের প্রস্তাব তাঁর জামাতা অনন্য প্রত্যাখ্যান না করতে পারায়, রুক্ষের সাথে দ্বন্ধে জরাতে বাধ্য হন তিনি”।
“মহারাজ রুক্ষ আগে থেকে সমস্ত কিছু জানতেন। এমনই বলেছিলেন অনন্য তাঁর শ্যালককে যে, তিনি রুক্ষের কাছে বন্দী হবেন, তাহলেই রাজা মেঘরাজের ইচ্ছা পূর্ণ হবে। কিন্তু পুরানো শত্রুতাকে ভুলতে পারেন নি মহারাজ রুক্ষ, আর তাই বন্দী করার স্থানে হত্যা করতে গেছিলেন তিনি অনন্যকে। এবার কি করতে পারে এক যোদ্ধা, আপনিই বলুন মহারাজ শশ। যুদ্ধ করতে তিনি বাধ্য হলেন, আর পরিণাম তো আপনি জানেনই”।
শশ সেই কথাতে ঈষৎ থেমে গিয়ে বললেন, “বটে! এমন হয়েছে? … আমার কাছে তো মহারাজ ষণ্ঢ যেই সমাচার প্রেরণ করেছেন, তাতে তো এমন বলা হয়নি! সেখানে তো বলা হয়েছে যে, প্রকাণ্ড গদাঘাতে রুক্ষকে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে অনন্য”।
বারি মাথা নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করে বললেন, “মহারাজ শশ, আপনারা শত্রুতা বড়ই পছন্দ করেন। সুযোগ পেয়েছেন সম্রাট ষণ্ঢ, আর সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে উস্কানি দিয়ে দিয়েছেন। … আপনিই দেখুন না, যদি মেঘরাজ্য আমাদের কাছে এতো প্রিয় হতো, তাহলে আমরা আপনার কাছে এসে তা অর্পণ করতে চাইতাম। এবার আপনিই বলুন? আমরা তো শত্রুরাজ্য অধিকার করে নিয়ে মহাসুখশান্তিতে সেখানে বিরাজ করতাম। ঠিক কি না?”
শশ বললেন, “হুম, কথায় তো তোমাদের যুক্তি আছে। তা দানপত্র এনেছ, আমাকে মেঘরাজ্য অর্পণ করার জন্য?”
অগ্নি বললেন, “হ্যাঁ এনেছি না! … এই যে দানপত্র। এতে অনন্যের সাক্ষ্যরও আছে”।
বারি বললেন, “অগ্নি! তুমিও না! … কি যে বলো, রাজা শশের মত এমন বলবানকে যদি এমনিই একটা রাজ্য দান করে দেওয়া হয়, তাহলে তাঁর বীরত্বের অপমান করা হবেনা? … মহারাজ শশ, আপনার সম্মানের কথা ভেবে, আমরা আমাদের ভ্রাতা বলকে বুঝিয়ে সুজিয়ে এনেছি। উনাকে বলা আছে। আপনার সাথে যুদ্ধে, দুইতিনটি আপনার গদার আঘাত খেয়ে, ব্যাথায় আপনার কাছে সমর্পণ করবেন। আর আপনি মেঘরাজ্য তাঁর থেকে দান রূপে গ্রহণ করবেন না, পরাজয় গ্রহণের ভেট রূপে স্বীকার করবেন। চারীদিকে আপনার নামে জয়ধ্বনি শোনা যাবে, মহবলি বলকে পরাজিত করেছেন জালিমার রাজা, জেরুপুত্র শশ”।
শশ আনন্দের সাথে নিজের গোঁফ পাকিয়ে বললেন, “কোথায় বল?”
বল নিজের গদা আর বিশালাকায় দেহ নিয়ে সম্মুখে এসে দাঁড়ালে, শশ বললেন, “কি বল, প্রস্তুত তো আমার দুইতিনটি গদার আঘাত খেতে! … নাও এসো তোমার গদা নিয়ে, প্রথম আমাকেও দুইতিনটি আঘাত করো, তারপর আমি তোমাকে আঘাত করে ভূমিতে পতিত করবো”।
বল সেই কথা শুনে, সম্মুখে এসে প্রবল শক্তিদ্বারা আঘাত করলেন শশকে। সেই আঘাত এমনই প্রবল ছিল যে শশের দেহ ভূমি থেকে হাত চারেক উপর উঠে গেল। শশ চমকিত হয়ে গেছিল এমন প্রবল আঘাতের জন্য। কিন্তু কিছু বলতে পারার পূর্বেই, বলের দ্বিতীয় প্রহার আসে শশের বক্ষদেশে। পবনের ঝোঁকা এলে, শুকনো পত্র যেমন উড়ে যায়, তেমন করে শশের দেহ উড়ে গেল বেশ কিছুটা, অতঃপরে ভূমিতে পতিত হয়ে গিয়ে রক্তবমন করা শুরু করলো।
শশ এবার উত্তেজিত হয়ে গিয়ে বলকে পূর্ণবল দ্বারা আঘাত করার প্রয়াস করলে, বল প্রকাণ্ড আঘাত আনলেন এবার শশের গদাতে, যার কারণে শশের হাত থেকে গদা ভূমিতে, প্রায় ২০ হাত দূরে ছিটকে পরে গেল। সেই দেখে, বল নিজের গদাও ভূমিতে রেখে, মুক্তহস্তে শশের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে, শশ পূর্ণবল দ্বারা লম্ফ দিয়ে, বলকে একটি মোক্ষম মুষ্ট্যাঘাত করতে প্রয়াস করে। কিন্তু সেই মুষ্ট্যাঘাত বলের বক্ষে আঘাত প্রদান করলে, এক হাতও পিছনে টলাতে পারলো না বলকে।
কিন্তু এরপর বল যেই মুষ্ট্যাঘাত করলো, তাতে শশের পূর্ণ শরীর শূন্যে উঠে গেল। বল অত্যন্ত গতিশীলও। একটি আঘাতের পরবর্তী আঘাত করতে সে সামান্যও দেরি করেনা। ভূমি থেকে ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়া শশের দেহের চরণকে আকর্ষণ করে, ভূমিতে পতিত করে, দুই বাহু দ্বারা শশের দুইচরণকে আকর্ষণ করে, শূন্যে লাগাতার ত্রিশবার ঘূর্ণন করিয়ে, একপ্রকার মাথার খরের ঝাঁকা উল্টে দেবার ন্যায়, শশের দেহকে উল্টে ভূপতিত করলেন বল।
শশের এরপর উঠে দাঁড়াতে বেশ কিছু সময় লাগলো। বল সেই অপেক্ষাই করলেন। অতঃপরে যখন শশ উঠে দাঁড়ালেন, তখন বল প্রবল বেগে দৌড়ে গিয়ে, নিজের দেহকে শূন্যে ক্ষেপণ করে, মুখে প্রকাণ্ড শব্দ করে, জানু দ্বারা শশের কলিজাতে আঘাত করলে, শশের দেহটি উড়ন্ত চাকির মত রাজমহলের প্রাচীরে গিয়ে আঘাত খেলো, আর ভূমিতে পরে গেল তা। আর সকলে তাঁর দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো কারণ শশের কলিজা দেহের সম্মুখ থেকে অন্দরে প্রবেশ করে, তা পৃষ্ঠদেশে প্রত্যক্ষ হয়ে গেছে, আর শশের নিথর দেহটি ভূমিতে চক্ষুকে গগনের দিকে স্থির করে শায়িত হয়ে রয়েছে।
জালিমার সর্বত্র আওয়াজ উঠলো, “জয় মহাবলি বলের জয়”।
বেশ কিছু সেনা সম্মুখে এসে নতশির হয়ে বললেন, “শুনেছি আমরা মহাবলির বলের কথা, কিন্তু আজ প্রত্যক্ষ করলাম তাঁর বল ঠিক কি প্রকার। মানব নয়, হস্তির থেকেও অধিক ক্ষমতাশালী আপনি। আমাদের দাসত্ব স্বীকার করুন। রাজা জালেম ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, আর তাঁর পুত্র জেরু ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ। কিন্তু তাঁর পুত্র হয়েছিল কুলাঙ্গার যে সর্বক্ষণ প্রজাদের লুণ্ঠন করতো। সমস্ত পদার্থে কর স্থাপণ করে করে, একই বস্তুর থেকে অজস্রবার কর গ্রহণ করতো, এই নরাধম। স্ত্রীদেরকে তো মানুষই মনে করতো না, যেন থালার আহার জ্ঞান করে ভক্ষণ করতো তাঁদেরকে। কিন্তু আমরা মহারাজ সেবার প্রজাপ্রেমের কথা শুনেছি”।
“জানি আমরা, তিনি প্রজার থেকে করই গ্রহণ করেন না। প্রজাকে কৃষি করার জমিও দেন আর সামগ্রীও, আর সেই কৃষিক্ষেত্রের থেকে উপার্জন যা হয়, তার অর্ধেক গ্রহণ করেন, আর অর্ধেক কৃষককে প্রদান করে দেন। … স্ত্রী, দুর্বল, শিশু, সকলে তাঁর রাজ্যে সুরক্ষিত। আমাদেরকে আপনার দাস করুন প্রভু, আর মহারাজ সেবার অনুচর রূপে স্বীকার করুন”।
এই সমস্ত নতজানু প্রজার মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন, শশের পুত্র, ভামর। তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে বল বললেন, “এমন লুকিয়ে অবস্থান করছো কেন? তোমার পিতার মৃত্যু হয়েছে। … আর তাঁর অত্যাচারের শিকার হয়ে থাকতে হবেনা”।
এক সেনা বললেন, “রাজপুত্র তো স্বেচ্ছায় সেনার মধ্যে স্থিত হয়ে পিতার অত্যাচার সহ্য করতেন। তাঁর স্পষ্ট কথা ছিল যে, পিতা বলে বিরোধিতা করতে পারিনা, কিন্তু প্রজাকে একাকী অত্যাচারের কবলেও রেখে দিতে পারবো না। তাই আমিও সেনা হয়ে, সকল প্রজার মত করে আপনার অত্যাচার সহ্য করবো”।
বল বললেন, “এমনই তো হওয়া উচিত রাজা। রাজা হলেন রাজ্যের পিতা। যে পিতা সন্তানকে না খেতে দিয়ে নিজে আহার করে, তার তো পিতা হবার যোগ্যতাই নেই। রাজা সে যে নিজের থালের আহারও অভুক্ত প্রজার মুখে তুলে দেয়। রাজা সে যে, প্রজাকে যা যা অপমান সহ্য করতে হয়, যা যা অত্যাচার সহ্য করতে হয়, তাই তাই সে সহ্য করে। … তাই ভামরের থেকে অধিক শ্রেয় রাজা তো হতেই পারেনা এই পবিত্র জালিমা রাজ্যের, যা একদিন সাখ্যাত অম্বিকাপুত্র আসনকে স্থান দিয়েছিল, যার রক্ষণ একদিন স্বয়ং জগদম্বা আম্মি বেশে করেছিলেন”।
ভামর সম্মুখে এসে বললেন, “যতই রাজা হই প্রভু, আমি রাজা সেবারই সেবক হয়ে থাকতে চাই। তাঁরই মার্গদর্শনে আমি আমার প্রজার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চাই। কৃপা করে, জালিমা রাজ্যকে গ্রহণ করুন হে মহাবলি”।
বল, অগ্নি ও বারি হেসে বললেন, “বেশ তাই হোক। রাজা ভামরের রাজতিলকের আয়োজন শুরু করা হোক”।
ভামরের হাতে জালিমা রাজ্য প্রদান করে, সেবাকে তাঁর সম্রাট রূপে মান্যতার স্বীকৃতি নিয়ে বল, অগ্নি ও বারি প্রত্যাবর্তন করলে, এবার অনন্য বল ও গুণকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করলেন ষণ্ঢের কাছে।
ষণ্ঢ তখন দুই মাস ব্যাপী উপবাসে ছিলেন, তাই শীর্ণকায় হয়ে গেছেন। সৈনিকরা তিন রাজপুত্রকে বন্দী করে এনেছেন তাঁর সম্মুখে। সিপাহী সরে যেতে ষণ্ঢ তাঁদের মুখদর্শন করলেন। অনন্য, বল ও গুণ। বিশ্বাসই করতে ইচ্ছা হলো না ষণ্ঢের, সাধারণ সিপাহী তাঁদেরকে বন্দী করেছে।
অনন্য মুচকি হেসে বললেন, “বিশ্বাস হচ্ছেনা, তাই না! সামান্য সেপাহি আমাদের বন্দী করেছে!… (পুনরায় হেসে) বন্দী করেনি, আমরা স্বেচ্ছায় বন্দী হয়েছি।… সামনে এসে একটা প্রস্তাব দেব বলে”।
ষণ্ঢ কেবলই বিকৃত দৃষ্টি নিয়ে অনন্যকে দেখলে, অনন্য হেসে বললেন, “পুণ্ড্র তো কনো কাজে লাগতো না আপনার, মহারাজ ষণ্ঢ। তাই দুটি যোদ্ধা হারিয়েছেন আপনি, শশ আর রুক্ষ। সেই জন্য নিজের সাথে দুজনকে এনেছিলাম, বল আর গুণ। আমাদের মধ্যে যেকোনো একজনকে হত্যা করে দিন আমরণ মল্লযুদ্ধে আর বাকি দুইজনকে আপনার যোদ্ধা করে নিন। শ্রেষ্ঠ দুই যোদ্ধা এসেছে আপনার সামনে, যারা গেছে, তাদের থেকে অনেক অধিক শ্রেয়। একজন শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর তো অন্যজন শ্রেষ্ঠ গদাধর”।
ষণ্ঢ বিকট একটা হাসি হেসে বললেন, “তোকে আমি তো বুদ্ধিমান ভেবেছিলাম অনন্য। কিন্তু তুই তো শ্রেষ্ঠ বোকা। … আমি অনন্য আর গুণকে আমার যোদ্ধা করে চাই। গদাধর তো আমি নিজেই। ধনুর্ধর নেই তোদের মত। তোরা আমার যোদ্ধা হয়ে গেলে, আমাকে আর সম্রাট হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবেনা। … আখারা তৈরি করো, বলকে আমি হত্যা করবো”।
গুণ কেবল মুচকি হাসলেন। অনন্য বলেইছিলেন যে, অনন্যের সামনাসামনি হবেনা ষণ্ঢ। যুদ্ধ করবে সে বলের সাথে। বলকেও শিখিয়ে পরিয়ে এনেছেন, কি কি করতে হবে, কি ভাবে করতে হবে, সমস্ত কিছু।
মল্ল শুরু হলো। উপবাসে থাকলেও ষণ্ঢ ভয়ঙ্কর শক্তিশালী। অনন্যের শেখানো পদ্ধতি অনুসারেই, বল আক্রমণ করলো না, কেবলই ষণ্ঢের প্রহার থেকে নিজেকে বাঁচাতে থাকলো, আর সুযোগ পেলেই, দুই থেকে তিনটি দেহের এদিক সেদিক মুষ্ট্যাঘাত করতে থাকলো। প্রতিটি ব্যর্থ আঘাত করার প্রয়াসে ষণ্ঢ উত্তেজিত হতে থাকলো। আর উত্তেজনা তথা বলের মধ্যে মধ্যে মুষ্ট্যাঘাতের কারণে সমানে তাঁর উর্জ্জানাশ হতে থাকলো।
প্রভাত থেকে যুদ্ধ শুরু হয়ে, দ্বিপ্রহর গড়িয়ে গেছে। ষণ্ঢ হাঁপিয়ে উঠেছে, সঠিক করে দাঁড়াতেও পারছেন না। উপবাস, ব্যর্থ প্রহার, আর বলের মুষ্ট্যাঘাত সমূহ তাঁকে প্রায় নির্বল করে দিয়েছে। বল ইঙ্গিত বুঝে অনন্যের দিকে তাকালো। অনন্য মুচকি হেসে ঘাড় হেলালে, বল বুঝে গেলেন, এবার আর আঘাত থেকে বাঁচার প্রয়োজন নেই, এবার আঘাত করার সময়। তাই হেসে, একটি প্রকাণ্ড আঘাত করতে, ষণ্ঢের দেহ সামান্য শূন্য উঠে গিয়ে, রক্ত বমন করে ভূমিতে লুটিয়ে পড়লো।
আগ্রাসী হয়ে ভূমি থেকে ওঠার প্রয়াস করলো ষণ্ঢ, কিন্তু বল অত্যন্ত গতিশীল। ভূমি থেকে ওঠার সময়ও দিলেন না। সরাসরি উড়ন্ত চাকির মত সম্মুখে এসে, সজোরে মুখমণ্ডলে আরো একটি মুষ্ট্যাঘাত করতে, পুনরায় ভূমিতে লুটিয়ে পড়লো ষণ্ঢের শরীর। এমন প্রায় অজস্রবার মুষ্ট্যাঘাত, কখনো পদাঘাত, কখনো তুলে আছার মারতে থাকলেন বল, কিন্তু সম্পূর্ণ দেহ রক্তময় হয়ে গিয়েও, ষণ্ঢের মৃত্যু কিছুতেই হলো না। রাত্রি হয়ে গেল। সমস্ত রাত্রি আঘাত করতে থাকলেন বল। বলের বল ক্ষীণ হয়ে যাওয়া শুরু হলো, কিন্তু তাও ষণ্ঢের নাশ হলো না। উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন গুণ, প্রগল হয়ে উঠলেন বল। অনন্য বিচারশীল হয়ে উঠে ভাবলেন, যতক্ষণ হৃদপিণ্ড চলবে, ততক্ষণ ষণ্ঢের নাশ সম্ভবই নয়, কারণ সে তো রক্ষের দুগ্ধ পান করেছে।
অস্ত্র দিয়ে হোক বা যেই ভাবেই হোক, হৃদপিণ্ড ভেদ করতে হবে। বিনা অস্ত্রে হৃদপিণ্ড ভেদ করতে হলে, দেহের বাইরে হতে হবে হৃদপিণ্ডকে। তাই বেশকিছুক্ষণ বলকে তাঁর দিকে দৃষ্টি রাখার জন্য বলতে থাকলেন। অতঃপরে যখন বল অনন্যের দিকে তাকালেন, তখন অনন্য আকারে ইঙ্গিতে কি করতে হবে বলে দিলেন।
বল ষণ্ঢের কলিজা মুষ্ট্যাঘাতের সাহায্যে ভেঙে, হৃদপিণ্ড বাইরে বার করে এনে, তাকে ভূমিতে ফেলে, নিজের দেহবল দ্বারা সম্পূর্ণ ভাবে থেঁতলে দিলেন, আর ষণ্ঢের শব দেহ ভূমিতে লুটিয়ে পড়লো। চারীদিকে বলের জয়জয়কার গুঞ্জিত হলে, ষণ্ঢ-এর ভ্রাতুষ্পুত্র, অনির্বাণ সম্মুখে এসে করজোড়ে অবস্থান করলে, অনন্য তাঁকে বললেন, “কাল প্রভাতে তোমার রাজতিলক হবে। তুমি কি স্বতন্ত্র রাজা হবে, নাকি কারুর অধীনে থাকতে চাও অনির্বাণ?”
অনির্বাণ বললেন, “আমার স্বতন্ত্র রাজা হবার যোগ্যতা আমার নজরে তো নেই। তাই প্রভু, যদি মহারাজ সেবা আমাকে নিজের শরণে রাখেন, তবে…”
অনন্য হেসে বললেন, “তোমার রাজ্যে নিমন্ত্রণ পত্র এসে যাবে”। গুণ সকল বন্দী রাজাদের মুক্ত করে নিয়ে আসলে, তাঁরাও অনন্যের কাছে মাথা নত করলে, অনন্য বললেন, “তোমাদের সকলের রাজ্যে নিমন্ত্রণ পত্র চলে যাবে। রাজা সেবাকে সম্রাট রূপে ঘোষণা করার অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ পত্র। সকলে সেখানে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সম্রাট বলে স্বীকার তোমাদের স্বীকৃতি সকলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে স্বীকার করো”।
রাজতিলক করে ফিরে গেলেন অনন্য ও তাঁর সাথে বল ও গুণ। নির্মাণ করালেন এক ভব্য রাজমহল, জম্বুদেশে মালদছেত্রে নদীতটে। নিয়ে এলেন নিজের চার পত্নীকে। সঙ্গে এলেন ভদ্র এবং তরুকুলের সমস্ত গণ্যমান্যরা। এক এক করে সমস্ত রাজাদের শিবির স্থাপন হলো। জালিমাপতি, মেঘপতি, এবং অনির্বাণকে রাজমহলেই রাখলেন সুধাপুত্ররা। এবং মহাভব্য অনুষ্ঠান হলো, যেখানে সমস্ত রাজারা সেবাকে নিজেদের সম্রাট বলে মান্যতা প্রদান করলো, এবং প্রচুর প্রচুর নজরানা প্রদান করলেন।
কিন্তু সেই সংবাদ লাভ করে প্রতিহিংসায় জ্বলে উঠলেন দুরাধার। সম্যক যুদ্ধে সুধাপুত্রদের পরাজিত করা সম্ভবই নয়, কারণ এখনো ভাগ নেওয়াতে পারবেন না মুণ্ড, করিকে এবং ধারকে, কারণ তাঁদের শর্ত অনুসারে দুই পক্ষ একত্রে যুদ্ধ ঘোষণা করলে, তবেই তাঁরা যুদ্ধে ভাগ নেবেন। তাই নির্মাণ করলেন একটি জঘন্য যোজনা”।
নিমন্ত্রণ করলেন তাঁরা সমস্ত সুধাপুত্রদের আর তারই সঙ্গে সম্রাজ্ঞী অনন্যাকে। বার্তা এই রাখলেন সকলে মিলে যে, সমস্ত ভূখণ্ডের সম্রাট হয়ে উঠেছে তাঁরা কিন্তু বাকি থেকে গেছে কেবলই হস্তীপুর। তাই নিমন্ত্রণের মাধ্যমে তাঁদের ডেকে নিয়ে এসে, ভোজ করিয়ে অর্পণ করা হবে তাঁদের রাজ্য সম্রাটের হাতে।
গুণ সন্দেহের গন্ধ পেল। তাই বারবার বলল সেই কথা সেবাকে। কিন্তু সাংসারিক মর্যাদাকে প্রাধান্য দেওয়া সেবা সেই কথাতে কর্ণপাত করলো না। অনন্যা ও বলও আপত্তি জানালো, কিন্তু তাঁদের কথাও শোনা হলো না।
পিতার অবর্তমানে, সেবাই সকলের পিতসমান। তাই পিতৃসমান সেবার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে বাধ্য সমস্ত সুধাপুত্র ও অনন্যা যাত্রা করলেন মুণ্ডের আসরে। সঙ্গে দেবী ভদ্রাকেও নিমন্ত্রণ করেছিলেন তাঁরা, কিন্তু দেবী ভদ্রা স্পষ্ট ভাবে বলে দিলেন যে তিনি যাবেন না। আরো বললেন যে, তাঁর আপত্তি সত্ত্বেও তাঁকে নিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো তাঁর উপর বলপ্রয়োগ করা। তাই সেবা বাধ্য হলো ভদ্রাকে না নিয়েই সেখান থেকে প্রস্থান করতে।
বিশেষ করে যখন অনন্যাও ভদ্রার পক্ষ নিলেন তখন আর সেবা জোর খাটাতে পারলেন না। দেবী ভদ্রা অনন্যাকেও বললেন, “হস্তীপুরে যেও না দিদি, সেখানে সমূহ বিপদ হতে পারে। তুমি গেলে, পরিস্থিতি আরো অনেক জটিল হয়ে যাবে”।
অনন্যা উত্তরে বললেন, “আমি প্রতিজ্ঞাবধ্য ভদ্রা। বিবাহের কালেই আমি প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলাম যে, সেবার নির্দেশ আমার কাছে আদেশ হবে। তাই আমি বাধ্য তাঁদের সাথে যেতে। যতই বিপদ হোক, আমাকে যেতেই হবে। ভদ্রা, যদি আমাদের কিচ্ছু হয়ে যায়, আমার ৫ সন্তান আর তোমার দুই সন্তানের খেয়াল রেখো। যদি দেখো যে পরিস্থিতি অত্যধিক ভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, সেবাজ, বলজ, গুণজ, অগ্নিজ আর বারিজ, আমার এই পাঁচপুত্রের সাথে সাথে, নিজের সন্তান, বিত্ত ও ক্ষেত্রকে নিয়ে অনন্যের শরণে চলে যেও। সেখানেই সর্বাধিক সুরক্ষিত থাকবে তুমি আর আমাদের সন্তানেরা”।
এতবলে, নিজেদের রাজধানী নভপুর ত্যাগ করে, সুধাপুত্ররা অনন্যাকে সঙ্গে নিয়ে হস্তীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। হস্তীপুরে পৌছাতে, রাজপুরের সকলের মধ্যেই আচরণে এক অদ্ভুত কুণ্ঠা লক্ষ্য করলেন সুধাপুত্ররা। একদিকে সম্রাটের আগমনে তাঁরা তটস্থ এবং সংযত, আবার সেই সংযমের মধ্যেও সকলের মধ্যে এক বিরক্তি আর চাপা উগ্রতা লক্ষণীয় হলো।
সমস্ত কিছুর চাপ স্থাপিত হলো প্রজার উপর, যারা তাঁদের প্রয় সুধাপুত্রদের ফিরে পেয়ে অতিশয় আনন্দিত হয়ে তাঁদের কাছে আসতে আগ্রহী। হস্তীসেনা, রাজপুরের নির্দেশ অনুসারে রীতিমত বলপ্রয়োগ করে প্রজাদের দূরে ঠেলে রাখলেন রাজপুর থেকে। সেই দৃশ্য সুধাপুত্ররাও দেখলেন।
আর সেই দৃশ্য দেখে, গুণ ও বল সরাসরি এগিয়ে গেলেন প্রজার দিকে, এবং প্রজার সাথে বার্তালাপে রত হলেন। সেবা গুণ আর বলের এই আচরণে অসন্তুষ্টই হলেন কারণ, যেই রাজার রাজ্যে এসেছেন, তাঁর নিয়মের উপর হস্তক্ষেপ করা উচিত কাজ কখনোই নয়, এমনই রাজনীতির সিদ্ধান্ত বলে তাঁর মনে হয়।
তাই গুণ আর বলের প্রত্যাবর্তনে নিজের অসন্তোষ ব্যক্ত করলেন সেবা। উত্তরে গুণ বললেন, “আপনি হয়তো ভুলে গেছেন ভ্রাতা, আপনি হলেন সমস্ত ভূখণ্ডের, সমস্ত মানবকুলের সম্রাট। আপনার নিয়ম মানতে বাধ্য সমস্ত রাজা। তাই যেই রাজনীতির জ্ঞানের বুলি দিনরাত আপনি বলে চলেন, সেই রাজনীতি অনুসারেই, হস্তীরাজ ও রাজপুর দণ্ডের অধিকারী। অর্থাৎ রাজনীতির পাঠ আমরা নই, আপনি ভুলে গেছেন”।
“বার বার বলছি, শীঘ্রই যদি রাজনীতির অনুসরণ না করেন, সম্রাটের পদ থেকে স্বয়ং নিয়তি আপনাকে অপসারিত করে দেবে। … আপনি যথাযজ্ঞ এই পদের জন্য। প্রজা আপনার কারণে উন্নত হতেও সক্ষম। কিন্তু আপনিই তো রাজধর্ম ত্যাগ করে ভ্রমজগতে নিমজ্জিত হচ্ছেন। রাজধর্মে কনো বয়োজ্যেষ্ঠ বলে কিছু হয় কি? তাহলে কেন সম্রাট হয়েও কেবল বয়োজ্যেষ্ঠ বলে কিছু অসাধুকে সম্মান দিয়ে যাচ্ছেন?”
বল বললেন, “শীঘ্রই রাজধর্মে প্রত্যাবর্তন করুন, তা না হলে, সমস্ত কিছুর নাশ হয়ে যাবে। আমাদেরও, আমাদের সাম্রাজ্যেরও, আর মানুষের উন্নতির আশারও”।
সেবা উত্তরে মাথা নেড়ে বললেন, “তোমরা কেন বুঝতে পারছো না যে, এক সম্রাট হবার সাথে সাথে, আমি একজন পুত্রও। আমি একজন অরুকুলের সন্তানও। রাজধর্মের কাছে সন্তানধর্ম আর কুলধর্ম কি ভাবে ত্যাগ করি আমি?”
গুণ বললেন, “কোন ধর্মকে গুরুত্ব প্রদান করা উচিত, সেই বিষয়ে একটি সহজ রেখা প্রদান করেছে অনন্য। পরিষ্কার কথা তাঁর, যেই ধর্মের পালনের উপর যত অধিক প্রাণ নির্ভরশীল, সেই ধর্ম পালনই প্রাধান্য পেতে সক্ষম। … রাজধর্ম পালনের উপর নির্ভরশীল সহস্র লক্ষ কোটি প্রাণ, আর কুলধর্ম পালনে নির্ভরশীল মাত্র কিছু শতক, দশক বা সহস্র প্রাণ। তাই বুঝতেই পারছেন, কোন ধর্মের প্রাধান্য দেওয়া উচিত আপনার”।
সেবা উত্তেজিত হয়ে বললেন, “কিন্তু তা বলে নিজের বয়োজ্যেষ্ঠ জ্ঞাতিদের দণ্ড দেব?”
অগ্নি বললেন, “কেন ভ্রাতা, আপনিও তো অনুজ। স্নেহের পাত্র। কি এমন অপরাধ করেছিলেন আপনি? নারীত্বের রক্ষা করা হয়েছিল, দেবী অনন্যাকে বিবাহ করে। নারীর সম্মানের রক্ষা করা হয়েছিল। নারীর বিশ্বাসের মান রাখা হয়েছিল। কিন্তু কুলধর্ম পালন হয়নি বলে, স্নেহের পুত্র ও পৌত্রদের স্নেহদান না করে, রাজ্য থেকে বহিষ্কার করা হয়নি! … কেন করা হলো তখন? কোথায় ছিল তখন কুল? কোথায় ছিল তখন কুলের মর্যাদা?”
সেবা বিরক্ত হয়ে বললেন, “কিন্তু তাই বলে, কনিষ্ঠ হয়ে জ্যেষ্ঠকে দণ্ড দেব?”
এক গম্ভীর ও গভীর নিশ্বাস নিয়ে গুণ বললেন, “দেবী ভদ্রা আমাদের এখানে আসার আগে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যদি আপনি রাজধর্ম থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেন, তাহলে আমরা সর্বহারা হতে চলেছি। … তাই এবার সর্বহারা হবার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান ভ্রাতা। যদি দোষীকে সম্রাট দণ্ড দিতে পিছিয়ে আসে, তাহলে দোষী সম্রাটকে উলঙ্গ করে দেবে। এবার উলঙ্গ সম্রাট হবার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান”।
সেবা বিরক্ত হয়ে বললেন, “এসব কি বলছো তুমি গুণ…!”
আরো হয়তো কিছু বলতে চাইছিলেন সম্রাট সেবা, কিন্তু সেই অবকাশ পেলেন না, কারণ তাঁদের বিশ্বস্ত সেবক, হাজি এসে অশ্রুপূর্ণ নয়নে আকুতিপূর্ণ হয়ে বললেন, “সর্বনাশ হয়ে গেছে সম্রাট। শীঘ্র চলুন, নয়তো দেবী অনন্যার মান সম্মান, আর কনো কিছুকে রক্ষা করা যাবেনা”।
সেই কথা শুনে গুণ ও বল অতিতীব্রতার সাথে ক্রোধধারণ করে হাজির পশ্চাৎধাবন করলেন, তো অগ্নি ও বারিও তাঁদের অনুসরণ করলেন, আর শেষে সেবা তাঁর সমস্ত ভ্রাতার অনুসরণ করে, সভাগৃহে উপস্থিত হলে, সেখানে গিয়ে দেখলেন, এক বিষম অরাজগতা বিরাজ করছে সর্বত্র।
হস্তীর সমস্ত স্ত্রীরা হাঁটুগেড়ে বসে রয়েছেন দুরাধারের সামনে। সমস্ত দুরাধারভ্রাতাদের পত্নীরা সামিল রয়েছেন তাঁদের মধ্যে। উপস্থিত রয়েছেন অরির স্ত্রীও। সকলে একটিই কথা বলছেন, “স্বামী, যদি আপনার যৌনস্পৃহারই প্রশ্ন হয়, তাহলে আমাদের সকলের মান সম্মান গ্রহণ করে নিন। আমরা নির্বিকার ভাবে আপনার কাছে সমর্পণ করছি। নিঃশর্ত ভাবে আপনার কাছে নিজেদের মান সম্মান সমস্ত কিছু অর্পণ করছি, কিন্তু কৃপা করুন দেবী অনন্যার উপর”।
দুরাচারের পত্নী ভাগ্যহীনা ক্রন্দন করে বললেন, “এই হস্তী রাজ্যের সর্বোত্তম সুন্দরী আমাকে বলা হয়। আমার দেহলালিমা আপনি ভক্ষণ করে নিন হে মহারাজ দুরাধার, কিন্তু অনন্যভগিনী দেবী অনন্যাকে ছেড়ে দিন। গুণপত্নীর উপর এমন বিষ নজর দেবেন না প্রভু। … সমস্ত হস্তীকুলের বিনাশ করে দেবে একা অনন্য ও গুণ”।
ক্ষিপ্ত দুরাচার তাঁর পত্নীর সম্মুখে এসে বললেন, “তোমাদের এই প্রলাপ বন্ধ করো। যা জানো না, তা নিয়ে কথা বলো না। … দেবী অনন্যা এক ও একমাত্র করিজের। সুধাপুত্ররা ষড়যন্ত্র করে করিজের থেকে অনন্যাকে ছিনিয়ে নিয়েছে। বা সত্য এই যে, অনন্যা ষড়যন্ত্র করে করিজকে নিজের প্রাপ্তির থেকে বহিষ্কার করেছে”।
দুরাশয় সম্মুখে এসে বললেন, “তাই হয় আজ করিজকে নিজের পতি বলে স্বীকার করতে হবে অনন্যাকে, নয় আমাদের সমস্ত অষ্টভ্রাতা, অরি আর করিজের শয্যাসঙ্গিনী হতে হবে তাকে”।
অরিপত্নী অরিহা সম্মুখে এসে বললেন, “স্বামী, বোঝান আপনার সখাকে। দেবী অনন্যা হলেন সম্রাজ্ঞী। তাঁর সাথে কনো অন্যায় করলে, সম্রাটের কোপের পাত্র হতে হবে আপনাদেরকে”।
কেউ কথা না শুনলে, মুণ্ডের কাছে ও করির কাছে উপস্থিত হয়ে দেবী সদ্ভাব, যিনি করিজের পত্নী, তিনি বললেন, “হে মহাবলি মুণ্ড, হে গুরুদেব করি, হে শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ধার, কৃপা করে এই অন্যায়ের প্রতিকার করুন। অনন্যা আপনার এই কুলের কুলবধু হে মহামান্য মুণ্ড। তাঁকে এই অর্ধনগ্ন করে রাজসভাতে ফেলে রেখে, সমস্ত রাজপুত্ররা নিজেদের যৌনস্পৃহার স্বীকার করবে, এ যে এই মহান অরুকুলের বদনাম। ইতিহাস এই কুলকে কি বলে সম্বোধন করবে, ভেবে দেখুন একবার”।
সকল স্ত্রীরা একত্রে বললেন, “দয়া করুন সকলে। বিচার করে দেখুন একবার, অনন্য, গুণ ও বল একত্রিত হলে, আর তাদের সাথে যখন ভদ্র ও সম্পূর্ণ তরুকুল যুক্ত হবে, তখন কি প্রকাণ্ডই না তাণ্ডব হবে সর্বত্র”।
গুরু করি মাথা নাবিয়ে বললেন, “সুধাপুত্রদের নিমন্ত্রণ করেছিল এই সভাতে দুরাধার। আর সেই নিমন্ত্রণে সম্রাট স্বয়ং সারা দিয়ে এসেছেন। তাই সে এখন সম্রাট তো নয়ই। কারণ রাজধর্ম বলে সম্রাট কখনো কনো রাজার নিমন্ত্রণে সারা দিতে পারে না। কিন্তু তাও সে সারা দিয়েছে। এর অর্থ সে এখানে সম্রাট নয়। তাই তুমি শান্ত হও পুত্রী। সম্রাটের কোপের পাত্র কেউ হতে পারবে না, কারণ সম্রাট এখানে উপস্থিতিই নেই”।
ধার বললেন “তুমি সামান্যও চিন্তা করো না পুত্রী, সম্রাট না হয়েও সম্রাট এখানে উপস্থিত। সম্রাট প্রয়োজনে নিজের সাম্রাজ্যই ত্যাগ করে দেবেন। এতো কেবল তাঁদের স্ত্রীদের সম্মানহানির প্রশ্ন নয়। এতো নারীত্বের সম্মানহানি। যেই সম্রাটের উপস্থিতিতে নারীত্বের সম্মানহানি হয়, তাকে কি আর কেউ সম্রাট বলে মান্যতা দেয়! … তাই সম্রাটকে নিজের সম্রাট হবার গুণ প্রদর্শন করতেই হবে, আর তা করে নারীত্বের রক্ষার জন্য, প্রয়োজনে নিজের সাম্রাজ্যই ত্যাগ করতে হবে”।
মুণ্ড সমস্ত কথার মধ্যে একটিই কথা বললেন, “আর রইল কথা দুরাধারের। তো তার কথা তো অনোচিত নয়। অনন্যার তো করিজকে বিবাহ করার কথা। সে ষড়যন্ত্র করে সুধাপুত্রদেরকে স্বামী রূপে বেছে নিয়ে, হস্তীপুরের সাথে আর অরুকুলের সাথে শত্রুতা করেছে। অরুকুলের কাছে সে তো অপরাধী!”
গুণ এবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে সম্মুখে লম্ফ দিয়ে এসে বললেন, “অকাট্য মূর্খ তুমি মুণ্ড। ভাবতেও লজ্জা লাগে যে তুমি দেবী পাবনির পুত্র! … নিশ্চিত ভাবে মাতৃগুণ তো তুমি পাওনি। তাহলে এমন মূর্খের মত প্রলাপ করতে না!”
সেবা সম্মুখে এসে বাঁধা দিয়ে বললেন, “কাকে কি বলচ্ছো গুণ! … উনি আমাদের সকলের জ্যেষ্ঠ!”
গুণ ক্ষিপ্ত ভাবে বললেন, “এক স্ত্রীর স্বতন্ত্রতাকে নিয়ে যে বাণিজ্যের মত নোংরা কটাক্ষ করে, তাকে মূর্খ ছাড়া আর অন্য কিছু বলতে পারবো না আমি। আমি প্রতিজ্ঞা নিচ্ছি, একদিন রণক্ষেত্রে এই মূর্খের মুণ্ডকে কেটে, তাকে সমস্ত রণক্ষেত্রে পদাঘাত করে, যোগ্য সম্মান দেব এক মূর্খের প্রতি”।
মুণ্ড এই কথাতে ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়ে, নিজের ধনুর্বাণ ধারণ করে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলে, গুণও নিজের শ্রীধনুশ নির্গত করে তাতে প্রত্যঞ্চা স্থাপন করলে, সমস্ত হস্তীপুর সেই শ্রীধনুশের প্রত্যঞ্চার শব্দে কম্পিত হয়ে উঠলে, সুধাপুত্রদের সামর্থ্য দেখে সমস্ত হস্তীপুর নিশ্চিত হয়ে গেল যে, যদি কনোদিন হস্তীপুর সুধাপুত্রদের সাথে যুদ্ধে রত হয়, তাহলে পূর্ণ ভাবে ধ্বংস করে দেবে সম্পূর্ণ হস্তীপুরকেই।
অন্যদিকে গুণের এই ভয়ঙ্কর রূপ দেখার পর, পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে মরিয়া অরি নিজের ধনুশের সন্ধান করলে, খল দুরাধার দেবী অনন্যার আঁচল ধরে প্রবল টান দিলে, বক্ষদেশকে নগ্নরূপে উন্মোচিত হতে না দেওয়া দেবী অনন্যা নিজের দুই হস্ত দ্বারা বক্ষদেশকে ঢেকে রাখলে, দুরাধারের বলপ্রয়োগের কারণে ভূলুণ্ঠিত হলো দেবী অনন্যার দেহ।
সেই দেখে, অনন্যর প্রদান করা কালহরা গদা ধারণ করে প্রবল ভাবে রুদ্র হয়ে ওঠা বল হুংকার ছেড়ে গর্জন করে উঠলেন, “”মনে মনে প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলাম যে একদিন রণক্ষেত্রে তোদের অষ্ট ভ্রাতারই বিনাশ করে দেব, আর তুই দুরাধার, তোর নক্করজনক বিচার যেই হৃদয়ে থাকে, সেই হৃদয়কে চিড়ে, তার দেহের সমস্ত লহু তোর দেহ থেকে মুক্ত করে রণাঙ্গনে ছড়িয়ে দেব। কিন্তু না, সেই অবকাশও তুই দিলিনা। আজই সেই দশা করবো তোর”।
এতো বলে কালহরা গদা উঁচিয়ে বল রুদ্রভাবে এগিয়ে গেলে, সম্মুখে দুরাভাব আর দুরাদিশা নিজেদের গদা নিয়ে অগ্রসর হলে, দুই থেকে তিন প্রহারের মধ্যে তাদের গদাকে টুকরো টুকরো করে দিলে, পুনরায় সকলে চমকিত হলেন সুধাপুত্রদের সামর্থ্য দেখে। তাই পুনরায় দুরাধার বল প্রয়োগ করলেন অনন্যার উপর, তো এবার অরি আর করিজও একত্রিত হলেন, বদ্ধপরিকর হয়ে যে অনন্যার সমস্ত দেহসৌন্দর্য ও দেহরসমাধুরী সর্বসমক্ষে ভক্ষণ করবেন।
বল প্রকাণ্ড হয়ে উঠে ধেয়ে গেলেন সকলের উদ্দেশ্যে, তো গুণও নিজের ধনুশে বাণ স্থাপন করলেন। সেই দেখে দুরাধার হুংকার ছেড়ে উঠলেন, “যদি মৃত্যুও এসে যায়, অনন্যার সমস্ত মান লুণ্ঠন করেই আমরা মৃত্যুবরণ করবো সম্রাট সেবা। সম্রাট, যেমন মামাশ্রি ধার বললেন, তেমন ভাবেই নিজের সাম্রাজ্য আমার কাছে দিয়ে দাও, আর পত্নীর মান অক্ষুণ্ণ করে নিয়ে যাও”।
সেবা সেই কথা শুনে উৎকণ্ঠার সাথে বলে উঠলেন, “বল, গুণ, দাঁড়িয়ে যাও। এখন আমাদের অনন্যার মান রক্ষা করা অধিক আবশ্যক, সেই কথা মানো তো! … বর্তমানে, এটিই আবশ্যক। তাই তেমনই করো যাতে অনন্যার মান রক্ষিত হয়”।
অগ্নি ক্ষিপ্ত হয়ে অস্ত্র ধারণ করে সম্মুখে এসে বললেন, “ভ্রাতা, আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে আপনি হলেন সম্রাট, আর এরা আপনার দাস। আদেশ করুন আর ওই পাপিষ্ঠ মুণ্ড থেকে শুরু করে, সকলকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করুন। শীঘ্রতা করুন। এখানের সেনাও আপনারই সেনা, কারণ আপনি রাজা নন হস্তীপুরের, আপনি সম্রাট সমস্ত ভূখণ্ডের আর তারমধ্যে হস্তীপুরও আসে। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ করুন”।
সেবার সমস্ত দেহকম্পমান। সে ভয়ার্ত। সে ভয়ের সুরেই বলে উঠলো, “শুনলেনা, রাজনীতিশ্রেষ্ঠ ধার কি বললেন, আমি এখন সম্রাটই নই, কারণ সম্রাট রাজার নিমন্ত্রণে সারা দিতে পারেনা”।
বারি সম্মুখে এসে বললেন, “যদি সম্রাটই না হন, তাহলে আপনি সাম্রাজ্যই বা কি করে প্রদান করতে পারেন! … নির্দেশ দিন আমাদেরকে, নির্দেশ দিন ভ্রাতা বল ও গুণকে। আমরা চার ভ্রাতাই যথেষ্ট এই সম্যক হস্তীপুরকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে। সত্য বলতে তো একাকী ভ্রাতা গুণ ও বলই যথেষ্ট সেই কাজ করার জন্য। নির্দেশ দিন ভ্রাতা। শীঘ্রতা করুন”।
সেবা ঘর্মাক্ত হয়ে উঠেছে, যেই ধর্মবোধে নিজেকে পারদর্শী মানতেন এতকাল, সেই ধর্মের অজ্ঞানতাই তাঁকে আজ জরাজীর্ণ করে ফেলেছে। সেই ধর্মের অজ্ঞানতাই তাঁকে আজ ভয়ার্ত করে দিয়েছে। কনো সমাধান দেখতেই পাচ্ছেন না তিনি। যেই দিকেই দৃষ্টি নিক্ষেপ করছেন, কেবল এই দেখতে পাচ্ছেন যে তাঁকে সকলে বারণ করেছিলেন এই পথে চলতে, সকলে বলেছিলেন রাজধর্মের পালন করতে, আর তা না করে, কুলধর্ম পালন করতে গিয়ে, তিনি আজ এই বিপাকে পরে গেছেন।
বিচার করার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। যখনই বিচার করতে যাচ্ছেন, তখনই কেবল সম্মুখে অনন্যার অসহায় অবস্থাকে দেখছেন, দেখছেন বল ও গুণের হাতে কুলের বিনাশের নিশ্চয়তা, আর দেখতে পাচ্ছেন নিজের সাম্রাজ্য হারাবার কথা। … সমস্ত কিছু এক সাথে হতে পারে না। কিছুতেই সমস্ত কিছু একসাথে হতে পারেনা। সেই বিচার করে প্রবল ভাবে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠে সেবা চিৎকার করে উঠলেন, “থামুন সকলে, সকলে থামুন। বল, গুণ, তোমরাও থামো, দুরাভাব, অরি সকলে থামো।… আমি এখনো সম্রাট সমস্ত ভূখণ্ডের। আমি নির্দেশ দিচ্ছি, সকলে থামো”।
ধার চোখের ঈসারা করলে, দুরাধার অনন্যার বস্ত্রের আঁচল ত্যাগ করে দিলেন। ঘর্মাক্ত ও কম্পমান সেবা বললেন, “আমাদের অনন্যাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দাও, আমি তোমাদেরকে সম্পূর্ণ সাম্রাজ্য দিয়ে দিচ্ছি। আমি কখনো নিজের বচন থেকে সরি না। সেই কথা তোমরাও জানো। তাই আমার বচনের উপর বিশ্বাস রাখো, আমি এই হস্তীপুর ত্যাগ করার পূর্বেই, আমার সমস্ত সাম্রাজ্য তোমাদের নামে ১২ বৎসরের জন্য লেখাপড়া করে দিচ্ছি”।
করি বললেন, “কেবলমাত্র এতেই তো হবে না সম্রাট সেবা! … করিজের সাথে যেই অন্যায় তোমরা করেছ, তার তো নিদান করো! এক সম্রাট যদি এর নিদান না করে, তাহলে আর কেই বা এর নিদান করবে!”
সেবা বললেন, “বরদান দিচ্ছি আমি করিজকে। আমরা সকলে দেহত্যাগ করার পরে, দেবী অনন্যাও দেহত্যাগ করার পরে, তিনি দুই সহস্র জাগতিক বৎসরের জন্য করিজের পত্নী হয়ে বিরাজ করবেন”।
সেই কথাতে দেবী অনন্যা ক্রুদ্ধ আস্ফালন করে বলে উঠলেন, “আমার হয়ে এই বচন দেবার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে সম্রাট! আপনি ভূসম্পত্তির সম্রাট, আপনি নিয়তির লিখনে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কার থেকে লাভ করলেন!”
সেবা মাথা নত করে বললেন, “ক্ষমা করবেন দেবী। আপনি মহাজ্ঞানী। আপনিও জানেন, আমরা যা কিছু ভাবনা ভাবতে স্বতন্ত্র, যাকিছু ইচ্ছা, চিন্তা বা কল্পনা করতেও, কিন্তু আমরা মুখ থেকে কথা নিঃসৃত করার কালে নিয়তির কাছে পরাধীন। বিশেষ করে আমরা যদি সৎচরিত্রের হই, তাহলে নিয়তি আমাদের মুখ ব্যবহার করে, নিজের বচন প্রদান করেন। … দেবী আমি নিরুপায়। … পারলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন, না পারলে দণ্ড দেবেন, কিন্তু আপনার এই ভাবে মানক্ষয় হতে আমি দেখতে পারবো না। এই ভাবে আপনার উপর নিপীড়ন হওয়া দেখতে পারবোনা”।
দেবী অনন্যার সমস্ত দেহ সমানে কাঁপতে থাকলো এই সমস্ত কথাতে। তিনি জানেন করিজ আসলে হলেন কোকিলা অর্থাৎ, তিনি তাঁকে ধারণ করে শ্বেতাম্বর হয়ে উঠবেন। দুই নেত্র বেয়ে কেবল অশ্রু বিসর্জন হতে থাকলো তাঁর। আর তাই তিনি সম্পূর্ণ ভাবে নিঃশব্দ হয়ে গেলেন এই ঘটনার পর।
অন্যদিকে খল ধার বললেন, “শুধুই করিজের সাথে ন্যায় করলে কি করে হবে সম্রাট সেবা! … আপনি যে আপনার কুলের সাথে অন্যায় করছেন! … ১২ বছরের জন্য কেবল রাজ্য সঁপে দিলেন! … এটা তো ঠিক নয়! এ কেমন ধারার ন্যায়। স্ত্রীর মানকে সমস্ত কালের জন্য সুরক্ষিত করলেন, আর মাত্র ১২ বছরের জন্য রাজ্য অর্পণ করলেন?”
সেবা একটি গভীর নিশ্বাস নিয়ে কিছু বলতে গেলে, ধার বললেন, “না না, এতটা উদাসীন হবার কিছু হয়নি। যখন করিজের কাছে অনন্যাকে অর্পণ করেই দিয়েছ তুমি, তাহলে তোমাদের জন্যও কিছু রেখে যাওয়া আমাদের ধর্ম। তাই আমি তোমার ফরমানকে সঠিক করে দিচ্ছি। ১১ বৎসরের জন্য সমস্ত রাজ্য ত্যাগ করে তোমরা বনবাসী হবে, আর অন্তিম একটি বৎসর তোমরা অজ্ঞাতবাসে যাবে। যদি এই অজ্ঞাতবাসের কালে, আমাদের পুত্ররা তোমাদের আবার সনাক্ত করে নিতে পারে, তাহলে এই একই এগারো বৎসরের বনবাস ও এক বৎসরের অজ্ঞাতবাস”।
গুণ এবার সামনে এসে বললেন, “আরো একটু নির্দিষ্ট করুন ফরমানকে, মহারাজনীতিবিদ ধার! … যদি আপনাদের পুত্ররা আমাদের অজ্ঞাতবাসে সনাক্ত করতে না পারে, তাহলে আমরা তো ফিরে আসবো। আর তখন আমাদেরকে আমাদের পুড়নো রাজ্য ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি না ফিরিয়ে দেওয়া হয় তখন, আমরা আমাদের রাজ্য ছিনিয়ে নিতেও স্বতন্ত্র থাকবো। … হ্যাঁ, এটা ফরমানে লিখিত থাকা উচিত, তাই না? কারণ তখন তো এই দুরাচারী দুরাধার সম্রাট থাকবে। তাই যদি ফরমানে এমন লিখিত না থাকে, তখন তো সম্রাট নিজের আসক্তি ত্যাগ করে সাম্রাজ্য ফিরিয়ে দেবেই না!”
দুরাধার এই কথাতে আগ্রাসী হয়ে এগিয়ে এলে, বল তাঁর গণ্ডদেশ আকর্ষণ করে শূন্যে তুলে দিয়ে বললেন, “মূর্খ, এখনও ফরমান লেখা হয়নি, অর্থাৎ এখনও ভ্রাতা সেবাই সম্রাট আছেন। তোকে সম্রাজ্ঞীর উপর আক্রমণের কারণে মৃত্যুদণ্ড দেবার অধিকার এখনো আছে আমাদের। … এতক্ষণ দেবী অনন্যার আঁচল ধারণ করে, তাঁকে অত্যাচার করে, ভরাসভায় তাঁর মান নিয়ে ছেলেখেলা করে, ভ্রাতা সেবাকে বাধ্য করেছিস না তুই, নিজের সাম্রাজ্য ত্যাগ করতে। এবার তুই আমার হাতে বন্দী থাকবি, যতক্ষণ না ফরমান লিখিত হচ্ছে”।
সেবা বললেন, “ছাড়ো বল ওকে ছাড়ো”।
বল বললেন, “না ভ্রাতা। ভুলে যান আপনি যে আমি আপনার মত রাজধর্ম ত্যাগ করে কুলধর্ম পালন করতে নেমে, এমন মূর্খদের প্ররোচনায় পা দেব। … এবার আপনার উপর নির্ভর করছে। আপনি যতক্ষণ না ফরমান নির্মাণ করছেন, ততক্ষণ আমি দুরাধারকে মুক্ত করবো না। শীঘ্রতা করুন, নয়তো আমার হাতে গণ্ড রেখে এমন শূন্যে অধিকক্ষণ ভাসমান থেকে প্রাণ ধরে রাখতে পারবেনা দুরাধার। … তাই এমনও হতে পারে যে, আপনি ফরমান সমাপ্ত করার পূর্বেই দুরাধার নিজের প্রাণ ত্যাগ করে দেবে”।
মুণ্ড হুংকার ছেড়ে বললেন, “ছাড়ো বল ওর গণ্ড!”
বল সেই কথা শুনে নিজের ভ্রুকুঞ্চিত করে নিজের অঙ্গুলির উপর অধিক বল প্রদান করলেন, তো দুরাধারের মুখ থেকে রক্ত ভূমিতে চলকে পরে গেল। সেই দেখে অরি আর করিজ অগ্রসর হলে, গুণ নিজের শ্রীধনুশে নাগাশূন্য বাণ স্থাপন করে নিক্ষেপ করে দিলেন সরাসরি অরি ও করিজের উপর, আর তাই তাঁদের দেহের সমস্ত পঞ্চভূত তাঁদের দেহত্যাগ করা শুরু করে দেয়।
সেই দেখে সকলে ভয়ার্ত হয়ে উঠলে, মুণ্ড কোকিলাস্ত্র স্থাপন করলেন নিজের ধনুশে গুণের উদ্দীশ্যে নিক্ষেপ করবেন বলে। সেই দেখে মহাশক্তিশালী কালহরা গদাকে অগ্নি ও বারি একত্রে শূন্যে তুলে নিক্ষেপ করলেন মুণ্ডের দিকে। আর সেই গদার কারণে, কোকিলা অস্ত্র নিক্ষেপের পূর্বেই দুই টুকরো হয়ে গেল, এবং মুণ্ডের ধনুশ চার টুকরো হয়ে গেল, আর কালহরা নিজের স্থানে পুনরায় ফিরে এলো।
এমন অদ্ভুত কৃত্য দেখে, ধার বললেন, “আহা সকলে শান্ত হন। এতো উত্তেজিত হবার কারণ কি? … বল, তুমি ধরে থাকো দুরাধারকে আর গুণ, আমি বচন দিচ্ছি, কেউ বলকে কনোরকমে বাঁধা দেবে না। যদি দেয়, তাহলে তুমি পুনরায় তোমার বাণ নিক্ষেপ করবে, আমি কনো বাঁধা দেব না।… সেবা, তুমি তোমার ফরমান নির্মাণ করো দেখি! নিশ্চিন্তে করো”।
সেবাও দুরাধারের মৃত্যু হয়ে যেতে পারে, এই ভয়ে ভয়ার্ত হয়ে উঠে তড়িঘড়ি ফরমান লিখে, মুণ্ডকে হস্তক্ষেপ করলে, এবার ধার বললেন, “আর সেবা সম্রাট নেই। বল, বিচার করে নাও। এবার যদি তুমি দুরাধারকে ধরে থাকো এইভাবে, তাহলে তোমাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে বাধ্য হবো আমরা”।
বল নিজের বাহু নামিয়ে নিলেন, দুরাধারের দেহ ভূমিতে পরে গেল। মূর্ছা গেছে সে। সকলে মিলে তাঁকে মূর্ছা অবস্থা থেকে মুক্ত করতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আর দেবী অনন্যাকে নিয়ে সুধার পঞ্চপুত্র, হস্তীপুর ত্যাগ করে চলে যেতে থাকলেন। প্রজারা বড় আশা করেছিলেন যেন তাঁদের ভালো দিন ফিরে আসতে চলেছে। কিন্তু আশাহত হয়ে তাঁরা বলতে থাকলেন, “কেন আমাদেরকে এই ভাবে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন রাজপুত্র! … আমাদের তো সর্বস্ব লুণ্ঠন করে নেয় এঁরা!”
আরো অনেক অনেক দিক থেকে কণ্ঠস্বর আশা শুরু হলো, “একটি কন্যাও নিজের স্বামীর কাছে নিজের সতীত্ব নিয়ে যেতে পারেনা রাজপুত্র। প্রথম এই রাজপুরের রাজপুত্ররা তা গ্রহণ করে, তবেই তাদের বিবাহ হতে পারে! … কেন রাজপুত্র, কেন আমাদের এই ভাবে ত্যাগ দিলেন? সমস্ত সময়ে আমাদেরকে মিথ্যাচারণের শিক্ষা প্রদান করা হয়, সমস্ত ফসল ছিনিয়ে নিয়ে আমাদেরকে অনাহারে মরতে দেওয়া হয়। আমাদেরকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়ে আমাদের বেতন আটকে রেখে, সেই দিয়ে মচ্ছব করে এঁরা। কোন শিয়াল কুকুর দের হাতে আমাদের ছেড়ে যাচ্ছেন রাজপুত্র!”
সেবা একটি কথাও বললেন না। গুণ একটি হুংকার ছেড়ে মৃদুস্বরে বললেন, “কুলধর্ম পালন করতে গিয়ে, রাজধর্মকে ত্যাগ দিলেন। দেখুন তাকিয়ে ভ্রাতা, একবার প্রজার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখুন তো! কত আশা করে ছিলেন তাঁরা যে তাঁদের দুঃখের দিন সমাপ্ত হবে। তাদের সকলের ঘর হবে, আহার থাকবে, অঙ্গে বস্ত্র থাকবে, হৃদয়ে সম্মান থাকবে। আর কি অবস্থায় ত্যাগ দিচ্ছেন এঁদেরকে? কি মনে করেন, এঁদের এই অবস্থার জন্য, একা দুরাধাররাই দায়ী! না ভ্রাতা, তাদের থেকেও অধিক দায়ী আপনি”।
“লুণ্ঠনকারী যদি সমস্যার স্রষ্টা হয়, তবে যার সেই লুণ্ঠনকারীকে আটকানোর সামর্থ্য আছে, তার নিজের কর্মে উদাসীনতার পরও সে নির্দোষ কি করে হতে পারে!”
বল বললেন, “আমার মনে হয়, আমাদের এখানে বাক্যব্যয় করে সময় নষ্ট না করে, দেবী ভদ্রা আর সন্তানদের কাছে যাওয়া উচিত। নিশ্চিত ভাবে তাঁদের উপর এই দুরাচারী মুণ্ডরা একই আচরণ করতে যাচ্ছে, যেমনটা তারা দেবী অনন্যার সাথে করেছে”।
এমন আলাপ করে দ্রুততার সাথে সকলে রাজ্যের দিকে গমন করলে, পথে সাখ্যাত হলো অনন্যের। অনন্যের সাথে ভদ্রা ও সুধাপুত্রদের সমস্ত পুত্রদের দেখে শান্তচিত্ত হলেন সকলে। অনন্য সম্মুখে এসে বললেন, “গুপ্তচরের থেকে সমস্ত সংবাদ লাভ করেছি আমি। আর তাই মনে হয় যে দেবী অনন্যাকে রক্ষা করার জন্য তোমরা সকলে আছো, কিন্তু ভদ্রাকে রক্ষা করার জন্য কেউ নেই। তাই তাঁকে ও তোমাদের পুত্রদের রক্ষা করে এনেছি। তাঁদের সাথে সাখ্যাত করে নাও। অতঃপরে আমি সকলকে নিয়ে আমাদের তরুচলে চলে যাবো। সেখানে সকলে বড় হয়ে উঠবে এই ১২ বৎসরে। ফিরে এসে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে মহাসংগ্রাম, সেই সংগ্রামের জন্য আমি স্বয়ং এঁদের সকলকে প্রস্তুত করবো”।
সেবা সম্মুখে এসে বললেন, “সমস্ত কিছু ভুল করে ফেললাম অনন্য। আজ যদি দেবী অনন্যার কিছু হয়ে যেত, কি ভাবে ক্ষমা করতাম নিজেকে!”
ভদ্রা সম্মুখে এসে বললেন, “জ্যেষ্ঠভ্রাতা, ১২ বৎসর সময় আছে, নিজেকে সঠিক করে নিন। রাজধর্মের থেকে বড় ধর্ম যদি কিছু হয়, তা একমাত্র হলো সত্যধর্ম, যা এক সন্তান জগজ্জননীর উদ্দেশ্যে করে থাকে। তাই সত্যধর্ম ব্যাতিত রাজধর্মকে কখনোই কনো শর্তে ত্যাগ করা যায়না। না কুলধর্ম, না ভ্রাতাধর্ম, বা অন্য কনো ধর্ম রাজধর্মের উপরে স্থিত থাকতে পারে। … এই সত্যকে নিজের চরিত্রে স্থাপন করে নেবার জন্য ধরে নিন স্বয়ং পরানিয়তি আপনাকে ১২ বৎসর সময় দিয়েছে”।
দেবী অনন্যার কাছে দেবী ভদ্রা যেতে, দেবী ভদ্রাকে আঁকড়ে ধরে দেবী অনন্যা ক্রন্দন করে উঠলেন, আর তারপর যা বললেন, তা কারুরই মস্তিষ্কতে কনো রকম রেখাপাত করলো না। দেবী অনন্যা বললেন, “কি হয়ে গেল অম্বা। কোকিলার কাছে আমাকে!”
দেবী অম্বা কে, সেই নিয়ে সকলে একে অপরের মুখের দিকে তাকালেও, সেইদিকে নজরও না দিয়ে, দেবী ভদ্রা বললেন, “এটিই ভবিতব্য শ্বেতা। চিন্তা করো না, ২ সহস্র সন দেখতে দেখতে কেটে যাবে। মৃষু ঠিকই তোমাকে উদ্ধার মরে আনবে। তখন আর আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবেনা”।
শান্ত হলেন দেবী অনন্যা। গুণ অনন্যের সম্মুখে এসে বললেন, “আমাদের জন্য কি নির্দেশ সখা?”
অনন্য বললেন, “পূর্বের সমস্ত শক্তশালী রাজা, যারা সাধারণ মানুষকে মূর্খ করে রেখে দেওয়াতেই বিশ্বাস করতো, তাদের পরাস্ত করে, হত্যা করা হয়েছে। দক্ষিণে মদ্ররাজ, উত্তরে কাশ্মিরা, পশ্চিমে গুরজারা আর পূর্বে অহমা এখন খুব শক্তিশালী রাজা। এঁদের মধ্যে কাশ্মিরা আর গুরজারাও অনেকটা রুক্ষ আর শশের মত। তাই এঁদেরকে হত্যা করে, আর মাদ্ররাজ্যের সাথে সন্ধি করে, তাঁদের রাজ্যের ছয় রাজকন্যাকে বিবাহ করে, রাজ্যবলকে সঙ্গে নিয়ে নাও তোমরা। আর অহমারাজ্যের প্রধান, মহারাজ গুহা এক বিকট সমস্যার মধ্যে আছেন। তাঁর রাজ্যে অজ্ঞাতবাসে যাত্রা করে, তাঁর সমস্যার সমাধান করে, শক্তিশালী সেনা সহ শক্তিশালী রাজাদের সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করে, আগামী যুদ্ধের শক্তিসঞ্চয় করো গুণ, বল”।
“তরুকুল, তোমরা পঞ্চভ্রাতা, তোমাদের সপ্ত পুত্র, আর এই চাররাজ্য, অর্থাৎ মাদ্র, গুরা, আহমি, এবং কাশ্ম, যথেষ্ট এই পাপিষ্ঠদের ভূমিতে মিসিয়ে দেবার জন্য। মানুষকে অসত্যের পথে চালনা করেছে এঁরা। তাই বিনাশ এঁদের হতেই হবে। মানুষকে আত্ম সর্বস্ব করে চরম অধর্ম করেছে। তাই এঁদের বিনাশের যুদ্ধ হবে প্রথম ধর্মযুদ্ধ। সেই ধর্মযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকো”।
গুণ প্রশ্ন করলেন দেবী ভদ্রার কাছে এসে, “দেবী ভদ্রে, আমরা যে এতগুলি বিবাহ করবো, তাতে তোমার কি অভিমত?”
দেবী ভদ্রা উত্তরে বললেন, “দিদির শ্লীলতাকে আক্রমণ করেছে যারা, সেই অধর্মীদের উত্তর তো দিতেই হবে স্বামী। … আর তাঁদের উত্তর দিতে হলে, কেবল আমি আর দিদি, এই দুইরূপে যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়। যুদ্ধ জয় করতে গেলে, নয় শক্তিকে প্রকাশ্যে আনা আবশ্যক। তাই বিবাহ আপনাদের করতেই হবে। যাত্রা করুন নাথ, আর বিজয় নিশ্চিত করে প্রত্যাবর্তন করুন। ভ্রাতা অনন্য আপনাদের কাছে সময়ে সময়ে যাবেন। সঠিক সময়ে তিনি আপনাদেরকে অজ্ঞাতবাসের মন্ত্রণাও প্রদান করে আসবেন। স্বামী, পরিশ্রমীর জন্য অভিশাপ হয়না। পরিশ্রমীর কাছে প্রতিটি পরিস্থিতিই বরদান। তা প্রমাণ করুন আপনারা”।
বনবাসে যাত্রা করলেন সুধাপুত্ররা, দেবী সুধাকে, দেবী ভদ্রাকে, এবং তাঁদের সাত পুত্রকে অনন্যের কাছে রেখে। প্রথমেই তাঁরা যাত্রা করলেন কাশ্মিরাতে, যেখানে প্রকাণ্ড বলশালী হয়ে উপস্থাপন করছিলেন কাশ্মিরা। কাশ্মিরা বলশালী নিজের বাহুবলের কারণে নয়, বরং নিজের সেনার বলে। সেনাদের দিয়ে, সমস্ত প্রজাকেই একপ্রকার গৃহবন্দী করে রেখে দিয়েছিলেন তিনি, আর তাই একটিও প্রজা তাঁকে সমর্থন না করলেও, বাধ্য হতেন তাঁকে সমর্থন করতে।
কাছের লালজাম বনে নিবাস করার সময়ে সেই সংবাদ লাভ করে সুধাপুত্ররা। সেখানের শিশুদের স্তনপানও করতে দেওয়া হতোনা তাদের জননীদের। এমন শুনে, মমতার উদ্বেগ ঘটলে, দেবী অনন্যা সুধাপুত্রদের একদিন বললেন, “হে সুধাপুত্রগণ, এক জননী যখন তাঁর সন্তানকে স্তনদান করতে পারেনা, তখন কেবল তাঁর মমতার হত্যা হয়না, তাঁর দেহক্ষয়ও হয়। যেই দুগ্ধ তাঁর স্তনে নির্মাণ হতে থাকে তাঁর লহুর থেকে পুষ্টিগ্রহণ করে করে, তা সমাপ্ত না হবার কারণে, তা মানবদেহের কোষের চরিত্র পালটাতে থাকে। কোষের স্বভাব আপনারা সকলেই ভালো করে জানেন। যদি একটি কোষে চরিত্রও ভিন্ন হয়ে যায়, সমস্ত কোষ সেই পরিবর্তিত চরিত্রকে ধারণ করতে সচেষ্ট হয়, আর তেমনই হয় জননীদের দেহে, আর তেমন হবার কারণে কর্কট রোগের বিস্তার হয় তাঁদের মধ্যে”।
সেবা বললেন, “আপনি বলতে কি চাইছেন দেবী? স্পষ্ট করে বলুন”।
দেবী অনন্যা বললেন, “প্রথমত অপুষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে শিশুদের স্তনদান আবশ্যক। জননীদের স্তনদান করতে না দেবার কারণে, তাঁদের স্তন আর দুগ্ধ নির্মাণ করেনা। সেই ক্ষেত্রে আমি প্রস্তুত সমস্ত কাশ্মিরা শিশুদের স্তনদান করতে। আর দ্বিতীয় কথা এই যে, শীঘ্রই এই স্ত্রীদের উদ্ধার করার ব্যবস্থা করুন। তা নাহলে কর্কট রোগ যেই বিভীষিকার রূপ ধারণ করবে, তা সম্যক মানবযোনিরই বিনাশ করে দেবে”।
গুণ বললেন, “কিন্তু আমরা যে কিছু করবো, আমরা করবো কি উপায়ে? আমরা তো সম্যক যুদ্ধেও যেতে পারছিনা!”
দেবী অনন্যা অগ্নি ও বারির কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, “যোজনা নির্মাণে আপনারা দুই ভ্রাতা শ্রেষ্ঠ। এই যুদ্ধ বলের জোরে নয়, যোজনার বলে জিততে হবে আমাদেরকে। আর তা জিততেই হবে কারণ এটি ক্ষমতা স্থাপনের প্রশ্ন নয়, এটি মানবযোনির রক্ষার প্রশ্ন”।
বারি বললেন, “কাশ্মিরা রাজ্যের পূর্বের নাম ছিল জমন। জমন ছিলেন কাশ্মিরার তিন পুরুষ পূর্বের ব্যক্তিত্ব যিনি অত্যন্ত দয়াবান ছিলেন এবং তিনিই এখানের মানুষদের সহায়তা করে, সকলকে অনুশাসনের মধ্যে স্থিত থাকার উদ্দেশ্যে এই রাজ্যের নির্মাণ করেন। তাঁর তিন পুত্র ছিল, অনল, বিমল ও কুণাল। অনলের বংশধর হলেন কাশ্মিরা, যার অত্যাচারী মানসিকতা আর ক্ষমতালোভ সম্বন্ধে আমরা খুব ভালো ভাবেই অবগত”।
“বিমলের কুলে দুই পুত্র আছে, এবং ৫ কন্যা আছে। দুই পুত্রের নাম হলো অজিত ও সুজিত। এঁরা অত্যন্ত দক্ষ শাসক এবং প্রজাপ্রেমীও। গুপ্ত ভাবে এঁরা প্রজার সাহায্য করতে গিয়ে অনেকবারই কাশ্মিরার সেনার সাথে সংঘাতে জরিয়েছে, আর এখন এঁরা উত্তরের অমরগুহায় লুকিয়ে আছে কাশ্মিরা সেনার থেকে বাঁচতে। এই দুই ভ্রাতাকে চালিত করতো, এবং সুরক্ষিতও রাখতো বেশ বলশালী কুণালের বংশধর, বিস্ময়। সে গুহাবাসী হয়নি। এখানেই এই কাশ্মিরা রাজ্যেই তিনি একাকসময়ে একাক ছদ্মবেশ ধারণ করে ঘুরে ঘুরে প্রজার সেবা করে ফেরেন”।
“আর তিনি এই কাজ একাকীও করেন না। তাঁর পত্নী, দেবী বিনতাও এই একই কাজ করেন, তবে পতি ও পত্নী একই সময়ে এক স্থানে কখনোই থাকেন না, যাতে কাশ্মিরার সেনা তাঁদেরকে দেখে সনাক্ত করতে না পারে”।
বল সামনে এসে বললেন, “এই সমস্ত কথার মানে কি বারি?”
অগ্নি বললেন, “ভ্রাতা, কনো স্থানের রাজাকে হত্যা করলে, সেই রাজ্যের জন্য বিকল্প রাজা আর শাসকের চিন্তা আগে করে নেওয়া উচিত। অনন্যও তাই করতেন বরাবর, বিচার করে দেখুন। আর এমনটা আবশ্যকও কারণ, যদি কনো বিকল্প রাজা না থাকে, তাহলে বলবান সেনারা সেই আসন গ্রহণ করতে এগিয়ে গিয়ে, সাধারণ প্রজার জীবন, মান, সম্মান সমস্ত কিছুকেই অন্বেষণ করে নেয়”।
গুণ বললেন, “বেশ বিকল্প রাজার চিন্তা করেছ, এতো ভালো কথা। কিন্তু কাশ্মিরার নিধনও তো আবশ্যক। তা কি করে সম্ভব হবে?”
অগ্নি বললেন, “ভ্রাতা আমরা এক্ষেত্রে কনো সময়েই সম্মুখে যেতে পারবো না। তাই রাজা, তাঁর দুই শাসককে যেমন প্রস্তুত রাখতে হবে, তেমন রাজতিলক যিনি করবেন, তাঁকেও। তাই ভ্রাতা, আমি ও বারি সেইদিক সামলাতে চলে যাবো। প্রথম বিস্ময় আর দেবী বিনতাকে এই কাজ সঁপতে হবে। অতঃপরে, অমরগুহাতে গিয়ে, অজিত ও সুজিতকে নিয়ে এসে এই রাজ্যেই ছদ্মবেশে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। অতঃপরে রাজবংশী কুণাল এখন জীবিত নেই, কিন্তু বিমল আছেন। তাই তাঁকে রাজতিলকের জন্যও প্রস্তুত করে রাখতে হবে। আমি ও বারি এই কাজ সমূহ করে রাখবো”।
বারি বললেন, “আর এই সময়কালে, যেকোনো একটি বাড়িতে আপনাদের দুই ভ্রাতাকে ছদ্মবেশে নিবাস করতে হবে। প্রতিরাত্রে প্রতিটি বাড়িতে চারটি করে সেনা নিয়োগ করে রেখে বাসিন্দাদের গৃহবন্দি করে রাখা হয়। আপনাদের সেই বাড়ির পাহারায় থাকা সমস্ত কাশ্মিরা সেনার নিধন করতে হবে। প্রতিদিন যখন একটিই বাড়ির সেনার নিধন হয়, তখন নিশ্চিতই দিন দশের মধ্যে সেনাপতি স্বয়ং সেই গৃহের পাহারায় থাকবে। তাঁকেও হত্যা করলে স্বয়ং কাশ্মিরা আসবে পাহারা দিতে। আর তখন কাস্মিরার নাশ করে দেবেন আপনারা”।
অগ্নি বললেন, “এটা আমাদের প্রকৃত পরিচয়ও কেউ জানবেনা, আর কাশ্মিরার অধিবাসীদের স্বাভাবিক জীবন প্রদান করে, জমন রাজ্যের অধিপতি বলশালী বিস্ময়ের সাথেও সন্ধি স্থাপন করা হয়ে যাবে”।
অগ্নি ও বারির প্রস্তাবে সকলে রাজি হলে, যেমন যোজনা করেছিলেন অগ্নি ও বারি, সেই অনুসারেই ক্রিয়া করা হয়, এবং তাতে একটি বৎসরের মধ্যেই কাশ্মিরার বিনাশ করা সম্ভব হয়ে যায়। অজিত সুজিতকে মন্ত্রী ও সেনাপতি রূপে নিয়োগ করে, বিস্ময়কে রাজা ও বিনতাকে রানীর আসনে স্থিত করে রাজতিলক করেন বিমল। আর সেই কাজ সম্পন্ন হবার শেষে, সেবার নির্দেশে এবার তাঁরা গুরজারাতে যাত্রা করার জন্য প্রস্তুত হন, আর ঠিক সেই সময়েই আগমন ঘটে সস্ত্রীক রাজা বিস্ময়ের এবং তাঁর দুই ভ্রাতার।
