আদি কৃতান্ত – প্রকৃত ঈশ্বরকথা

ত্রিমূর্তি নিজেদের আগামী কর্মসূচি কি হবে, সেই নিয়ে এবার উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন কারণ শক্তি ও তাঁর পুত্র জগতে দেহধারণ করতে থাকার কারণে, জগতের মানবদের মধ্যে চেতনাপ্রবাহ বিস্তৃত হয়ে চলেছে। যেখানে ত্রিমূর্তি স্ত্রীর মধ্যে শক্তির প্রকাশ অধিক সম্ভব বলে, আত্মভাবের বিস্তার করার জন্য স্ত্রীদের দাসী করে রেখে শোষণের ধারা স্থাপন করে রেখেছিলেন, সেখানে আসন জন্ম নিয়ে স্ত্রীদের প্রতি প্রীতি প্রদান করে, স্ত্রীজাতির শক্তিকে অপার বলে ঘোষণা করে এসেছেন।

আর এই সকল কিছুর কারণে, স্ত্রীজাতির প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস অধিক হতে শুরু করেছিল বিশ্ববাসীর। বিশেষ করে আম্মি রূপে অম্বিকা দেবী জন্ম নিয়ে যেই কীর্তি স্থাপন করে এসেছেন, তার কারণে আসনের বক্তব্য সঠিক প্রমাণিত হয়ে গেছে আর তাই সেই আস্থা ও বিশ্বাস অধিক হওয়া শুরু করেছিল। স্ত্রীরা সমাজে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া শুরু করে দিয়েছিল। তাই ত্রিমূর্তি অধিক উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন এই বিচার করে যে, এমন ভাবে চললে যে তাঁদের কথামত আত্মভাবের বিস্তারই সমাপ্ত হয়ে যাবে।

যদি সমস্ত মানব চেতনার জাগরণের উদ্দেশ্যে ধাবিত হয়, তাহলে যে জগতে মোক্ষের দ্বার উন্মোচিত হয়ে যাবে, আর তাহলে ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে সকল প্রাণকে জীবনমৃত্যুর শিকলে আবদ্ধ করে রাখবেন কি করে! … সেই বিচারের কথা শুনে, রমনাথ বললেন, “হে পীতাম্বর, আমার মনে হয়, আমাদের মানবকে আত্মমুখি করার প্রয়াসের সাথে সাথে, অম্বিকা আর তাঁর পুত্রের বিস্তারকে কলুষিত করাটার দিকে মনোনিয়োগ করা অধিক আবশ্যক। … বিচার করে দেখুন। অম্বিকার পুত্রের প্রতি অম্বিকারই অংশস্বরূপ শ্রীর কি পরিমাণ আকর্ষণ ছিল যে, তিনি অম্বিকাপুত্রের ভার্যা হয়েও তাঁর সঙ্গলাভে রুচি রাখলেন। বুঝতে পারছেন কিসের ইঙ্গিত করছি আমি?”

শ্রীমান মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ বুঝতে পারছি। আপনি এই বলছেন যে, একই ভাবে দেবী বিদ্যাও অম্বিকার পুত্রের সাথে যুক্ত থাকতে চাইবেন, কারণ তিনিও অম্বিকারই অংশস্বরূপ। এই তো? আমরা অম্বিকা পুত্রকে চিনিনা, কিন্তু দেবী বিদ্যার উপর আমরা সহজেই নজর রাখতে পারবো। তাই তাঁর উপর নজর রেখে আমরা অম্বিকা পুত্রের নিকটে পৌঁছে যাবো। আর একবার তা করতে পারলে, অম্বিকা পুত্র যেই চেতনাভাবে সকল মানবকে উদ্বুদ্ধ করবে, তাকে কলুষিতও করতে পারবো”।

কোকিলা বললেন, “আমার মত ভিন্ন পীতাম্বর। আসনের ভ্রাতা রূপে কারা ছিলেন? বিদ্যা, কৃত্তিকা আর পাবনি। এঁদের মধ্যে বিদ্যা দেবী অম্বিকার অংশস্বরূপ। অর্থাৎ মায়া তাঁর পক্ষেও করা সম্ভব। বিচার করে দেখুন, এঁরা সকলে মিলে, অম্বিকা পুত্রের লালনপালন করেছেন। অর্থাৎ এঁরা সকলেই তাঁর সাথে যুক্ত হয়ে থাকতে চাইবেন। আর সম্ভবত অম্বিকা পুত্রের সাত সুপ্ত কলা কৃত্তিকা লোকেই বিরাজ করছে”।

“বিচার করে দেখুন, দেবী অম্বা কৃত্তিকাকে এই লোক নির্মাণ করতে বলেন। হয়তো, তখন থেকেই তিনি তাঁর এই লীলার প্রেক্ষাপট নিজের অন্তরে স্থাপন করে রেখে দিয়েছিলেন! … অর্থাৎ কৃত্তিকা ও পাবনিও অম্বিকাপুত্রের কলাপ্রকাশে ভাগীদার হবেই। আর তাঁরা মায়ার রচনা করতে জানেন না। অর্থাৎ, যদি আমরা তাঁদের উপর নজর রাখি, তাহলে আমাদের অম্বিকাপুত্রের সন্ধান পাওয়া সহজ হবে”।

রমনাথ বললেন, “সঠিক বলেছে কোকিলা। আমারও এই বিষয়ে একমত। আপনি কি বলেন পীতাম্বর?”

পীতাম্বর ভাবনাচিন্তা করে বললেন, “এক কাজ করি, রমণ বেশে আমি অষ্টমুণ্ডের নির্মাণ করেছিলাম। তাঁদেরকে দেবী পাবনির সন্ধান করতে পাঠাই জগতে। আর মেঘকবচকে পাঠাই কৃত্তিকার সন্ধান করতে”।

কোকিলা বললেন, “সঠিক বলেছেন। আমি সেই ফাঁকে নাগিনীপুত্র কলির কাছে যাই। তাঁকে তাঁর সপ্তভ্রাতাসহ প্রস্তুত থাকতে বলি, যাতে করে যেইক্ষণে অম্বিকাপুত্র জন্ম নেবে, সেই ক্ষণে তাঁরা ধরাধামে জন্ম নিয়ে, অম্বিকাপুত্রের বিনাশ করতে পারে। বিচার করে দেখুন পীতাম্বর, দেবী নাগিনীর কাছে বরদান আছে যে, তাঁর পুত্রদের অনিল ব্যতীত কেউ হত্যা করতে পারবে না। আর সাথে সাথে কলির কাছে বরদান আছে যে, তাঁকে অনিল পরাস্ত করতে পারলেও, তাঁর হত্যা কনো মানবদ্বারা অসম্ভব”।

পীতাম্বর বললেন, “শুধু কলি আর তার ভ্রাতাদের দিয়ে কার্যসিদ্ধি হবেনা কোকিলা। অম্বিকাপুত্রের বল সম্বন্ধে আমার ধারণা প্রত্যক্ষ। তাকে নিধন করা সহজ কথা নয়। জটিলা পুত্র ষণ্ঢ আর তার চার ভাই, রুক্ষ, শশ, দ্রথ আর পুণ্ড্রকেও জন্ম নিতে বলতে হবে। এই পাঁচ বলশালী ভ্রাতা কলিকে কলির বিস্তার করতে সহায়ক হবে”।

রমনাথ বললেন, “কলি আর ষণ্ঢ ঠিক আছে, কিন্তু আমার মেঘকবচ আর মুণ্ডদের নিয়ে অন্য প্রস্তাব আছে। আমরা ত্রিমূর্তি। আমাদের সমস্ত সামর্থ্য আছে আত্মকে পরিচালনা করার। তো কেন না, আমরা আমাদের সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়েই ক্রিয়া করি। যদি অম্বিকা কৃত্তিকাকে কাজে লাগাতে পারেন নিজের কাজে, তাহলে আমরা দেবী মাঘাকেও তো ব্যবহার করতে পারি অম্বিকাপুত্রকে জন্ম দেবার জন্য। মাঘা তো দেবী অম্বিকার প্রতি অনুরক্ত। তাঁকে এই কাজ বললে, কিছুতেই অরাজি হবেন না। আর তিনি পবিত্র। তাই তাঁর গর্ভে তো অম্বিকা নিজের পুত্রকে অর্পণ করতেই পারে।  … অন্যদিকে, আমরা চরিত্রকেও জন্ম নিতে বলি। অর্থাৎ নিশ্চিত ভাবে মাঘা চরিত্রকেই বিবাহ করবে। আর মাঘাকে আমরা প্রকাণ্ড সাধশ্রেষ্ঠ অলিন্দের ভগিনী রূপে জন্ম দিই। মাঘা আর চরিত্র জন্ম দেবে অম্বিকাপুত্রের আর অলিন্দ তাঁকে শিশু বেশের হত্যা করে দেবে”।

পীতাম্বর ও কোকিলা সেই কথাতে সহমত হয়ে বললেন, “প্রস্তাব বেশ ভালো, কিন্তু অম্বিকার কনো বিশ্বাস নেই। সে যেকোনো ভাবে নিজের পুত্রকে সুরক্ষিত করে নিতে পারে। তখন কি হবে?”

রমনাথ বললেন, “হুম, ঠিকই। চরিত্র কৃত্তিকার পতি হলেও, তাঁদের সম্পর্ক ভ্রাতা ও ভগিনীর মত, এবং তাঁদের প্রীতিও অপার। অর্থাৎ, নিশ্চিত ভাবে চরিত্রের ভগিনী হয়েই কৃত্তিকা জন্ম নেবে। তাই যদি অম্বিকা নিজের পুত্রকে বাঁচিয়েও দেয় অলিন্দের থেকে, তাহলে নিশ্চিত ভাবে কৃত্তিকার কাছেই তো তাকে অর্পণ করবে। আর আমরা তাহলে আগেভাগে জানবো সেই কথা, আর সেই অনুসারে কলিকে এবং ষণ্ঢকে জন্ম গ্রহণ করতে বলবো”।

পীতাম্বর বললেন, “আর যদি কৃত্তিকার কাছে না অর্পণ করে, পাবনির কাছে অর্পণ করে অম্বিকা নিজের পুত্রকে?”

রমনাথ বললেন, “ঠিক যেমন করে আমরা কৃত্তিকাকে খুঁজবো না, বরং বাধ্য করবো তাঁকে আমাদের নির্দেশনা অনুসারে স্থানে জন্ম নিতে, তেমন ভাবেই পাবনিকেও বাধ্য করবো, আমাদের দৃষ্টির সামনে থাকার জন্য”।

কোকিলা বললেন, “কিন্তু সেটা সম্ভব কি ভাবে?”

রমনাথ বললেন, “মুণ্ডরা আট ভ্রাতা ধরাধামে গিয়ে, চেতনার বিস্তারক সাধুর গাভী হনন করবে। নিশ্চিত ভাবে তারা শ্রাপ পাবে। শ্রাপ লাভ করার পর তারা সরাসরি পাবনির কাছে উপস্থিত হবে। পাবনি ধরাধামে নদী রূপে প্রবাহিত হয়েছে, অম্বিকার পুত্রকে জন্ম দেবার কালে। তাই তাঁর কাছে পৌছতে মুণ্ডদের কনো বেগ পেতে হবেনা। সেখানে গিয়ে শ্রাপের তাপ হননের আবেদন করবে তারা। অম্বিকার বরদান পাবনির প্রতি যে সকল জগতবাসীর শোকতাপ হনন করতে পারে। তাই মুণ্ডরা তাঁর কাছে যেতেই পারে। আর অভয়দান স্বরূপ তাঁরা পাবনির অষ্ট সন্তান হয়ে জন্ম নেবে। অর্থাৎ কৃত্তিকা আর পাবনি আমাদের চোখের সামনেই থাকবে সর্বক্ষণ। আর তাই যদি কনো ভাবে অম্বিকাপুত্র অলিন্দের থেকে বেঁচেও যায়, তারপরেও সে আমাদের দৃষ্টির অগোচর হতে পারবেনা”।

পীতাম্বর বললেন, “অদ্ভুত যোজনা। সঠিক বলেছেন। এই ভাবেই আমাদের যোজনা স্থির থাকবে। এবারে আমরা অম্বিকার পুত্রের নাশ করবোই। হয় অলিন্দের কাছে, নয় মুণ্ডের কাছে, নয় কলির কাছে আর তা নাহলে ষণ্ঢ-এর কাছে। এঁদের কারুর না কারুর হাতে তাঁকে হত্যা হতেই হবে”।

যেমন পরিকল্পনা করা হলো, সেই অনুসারেই সমস্ত দায়িত্ব অর্পণ করা হলো, এবং সকলে সেই অনুসারেই দায়িত্বগ্রহণ করলেন। মুণ্ডভ্রাতারা সাধুর গাভী হনন করলে, অবিশপ্ত হন, এবং পাবনির থেকে বরদান গ্রহণ করেন যে তাঁর সন্তান হয়ে জন্ম গ্রহণ করবেন তারা। বচনের মান রাখতে হস্তী নামক অরুরাজপুত্রকে বিবাহ করেন পাবনি। কিন্তু এক এক করে সপ্ত মুণ্ডকে পাবনির জলেই ভাসিয়ে প্রাণনাশ করে দিলে, পীতাম্বরের প্রেরণায় হস্তী নিজের অষ্টমপুত্রকে সুরক্ষিত করে নেন, আর সেই পুত্র ব্রত নামে পরিচিত হন জগতে, এবং পরে অরুরাজ্যের রাজা হয়ে উপবেশন করে আশা, অন্বেশা ও বিশা নামক তিন রাজকন্যাকে বিবাহ করেন। অন্বেশার গর্ভে ধর্মকে জন্ম দেওয়াতে পারেন ত্রিমূর্তি যার নাম হয় দ্বিজ। বিশার গর্ভে খনিজকেও জন্ম দেওয়াতে পারেন ত্রিমূর্তি, যার নাম হয় ধৃত। কিন্তু আশার গর্ভে কিছুতেই সন্তান আসেনা।

আশা তাই অবশেষে পূর্ণহতাশা নিয়ে মাতা অম্বিকার সাধনা করলে, দেবীকৃপায় তাঁর গর্ভে একটি সন্তান আসে, যে অন্য কেউ নয় গোলোক, কিন্তু তিনি যে গোলোক, সেই সংবাদ কারুর কাছে থাকেনা, আশার কাছেও নয়। তাঁর নাম হয় রিন্ধ।

একদিকে যখন মুণ্ডের বিস্তার করছিলেন ত্রিমূর্তি, তখন অন্যদিকে চরিত্রকেও জন্ম দেন তরুকুলে। তরুর পুত্র হয়ে জন্ম নেন চরিত্র, আর তাঁর ধরাধামে নাম হয় সুধীর। এবং যেমন পরিকল্পনা করেছিলেন, তেমনই ভাবে দেবী কৃত্তিকা তাঁর ভগিনী বেশেই জন্ম নেন, যার নাম হয় সুধা। তরুর আরো দুটি কন্যা সন্তান হয়, যাদের নাম হয় আঙ্কা ও অনিকা। সুধীরের পিতা তরুর ভ্রাতা চারুর কুলের জন্ম নেয় জটিলা ও জটিলার ভ্রাতা বেশে জন্ম নেয় স্বয়ং পীতাম্বর, এবং এই দুই ভ্রাতাভগিনীর নাম হয় ধার ও ধারী। এবং তাঁদের সাথে আরো এক কন্যার জন্ম হয় রাজা চারুর, আর তার নাম হয় ভাময়ন্তি। অন্যদিকে মাঘা ও অলিন্দ জন্ম নেয় জারুরাজের কন্যা ও পুত্র হয়ে, এবং দুইজনেই নিজের নিজের নামেই প্রসিদ্ধ হন ধরাধামে।

মুণ্ড খুব প্রয়াস করেছিলেন যাতে ধৃতকে সুধার সাথে বিবাহ দেওয়া যায়। কোকিলা তাঁকে বারংবার সেই কাজ করতে বলেছিলেন। কিন্তু সুধা সেই সম্বন্ধকে অস্বীকার করলে, শেষে রিন্ধের সাথে বিবাহ দেন সুধার। ধৃত বিবাহ করেন চারুরাজকুমারী ধারীকে। মাঘা আর সুধীরের বিবাহ স্বয়ং অলিন্দ নিজে থেকে দেন। আর তাঁদের সন্তানরূপে জন্ম নেয় অম্বিকাপুত্র মৃষু, যার নাম হয় অনন্য। রমনাথের নির্দেশে অলিন্দ অনন্যর হত্যা করার প্রয়াস করে, কিন্তু সেখানে এক দিব্যখেলা হয়। কিছুতেই সে অনন্যকে নিজের বাহুদ্বারা ভূমি থেকে উত্তোলন করতে পারেন না। আর এমন সমানে প্রয়াসের শেষে, পা পিছলে দুর্গের ছাদ থেকে পাহাড়ের নিচে পতিত হয়ে অলিন্দ নিজের প্রাণ হারায়। পরবর্তীতে মাঘা ও সুধীরের আরো দুই সন্তান হয় ভদ্র ও ভদ্রা, যাদের মধ্যে ভদ্র ছিলেন গোচরণ।

আঙ্কা ছেদ বংশের রাজা, জালিমা কুলের জেরুপুত্র আমিমের পত্নী হয় এবং শশকে গর্ভে ধারণ করে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আরো এক পুত্রী হয়, যার নামই রাখা হয় জালিমা, কারণ তিনি সম্পূর্ণ জালিমা রাজ্যের সর্বাধিক সুন্দরী স্ত্রী ছিলেন।

অনিকা মেঘরাজকে বিবাহ করেন এবং রুক্ষ ও পুণ্ড্রকে জন্ম দেওয়ার সাথে সাথে এক সর্বাঙ্গসুন্দরী কন্যারও জন্ম দেন যার নাম রাখা হয় মেঘা। মেঘরাজ চারুর পুত্রী ভাময়ন্তিকেও বিবাহ করেছিলেন, আর তাঁর থেকেও একটি কন্যা লাভ করেন, যার নাম হয় ভামা।

চারুপুত্র ধার বিবাহ করেন সেই রাজ্যেই জন্ম নেওয়া কুটিলাকে, যার নাম ছিল অধরা, আর তাঁর থেকে দ্রথকে জন্ম দেয়। অন্যদিকে, যরা নামক রক্ষের পুত্র হয়ে জন্ম নেয় ষণ্ঢ। রিন্ধ আর সুধার পাঁচপুত্র ও এক পুত্রী হয়। মাতা অম্বিকার নির্দেশে তাঁদের পাঁচপুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র হয়ে জন্ম নেয় স্বয়ং নভ, দ্বিতীয় পুত্র হয়ে জন্ম নেয় অনিল, তৃতীয় পুত্র হয়ে জন্ম নেয় স্বয়ং ষণ্ড, চতুর্থ পুত্র হয়ে জন্ম নেয় পাবক এবং পঞ্চমপুত্র হয়ে জন্ম নেয় মীনধ। আর এই পাঁচ পুত্রের নাম হয়, সেবা, বল, গুণ, অগ্নি ও বারি। এবং তাঁদের কোলে একটি আদরের ভগিনী হলো, যিনি পাবনির মানস কন্যা, যমুনা।

অন্যদিকে, অরুকুলের অন্য প্রান্তে, ধৃত আর ধারী জন্ম দেয় কলি তথা সকল কলির ভ্রাতাকে তথা স্বয়ং দেবী নাগিনীকে। তাঁদের ভ্রাতা ভগিনী সকলেরই নাম শুরু হয় “দুরা” দিয়ে, যাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন কলি স্বয়ং অর্থাৎ দুরাধার, এবং তাঁর পরবর্তী সকল ভ্রাতারা ছিলেন, দুরাচার, দুরালয়, দুরাশয়, দুরাদিশা, দুরামেধা, দুরাভাব, এবং ভগিনীর নাম ছিল দুরাচারী। তো দ্বিজ এক দাসীকে বিবাহ করে জন্ম দেয় মেঘকবচকে, যার নাম হয় অরি।

আর এই সমস্ত অরুবংশ, তরুবংশ, জারুবংশ, চারুবংশ, মেঘবংশ এই সকল বংশের থেকে দূরে আরো দুই বংশ অলক্ষ্যে স্থিত ছিল। তারা হলো, করি বংশ এবং গোবংশ। করিবংশে স্বয়ং রমনাথ বিরাজমান রইলেন করিবেশে, এবং তাঁর পুত্র রূপে কোকিলা বিরাজমান রইলেন করিজ রূপে, তো গোবংশে বিরাজমান রইলেন গোপাল, আর তাঁরই যজ্ঞ থেকে জন্ম নেওয়া কন্যা অনন্যা।

এই সমস্ত কিছু নিয়ে অম্বিকা পুত্রের তৃতীয়কলা অনন্যের বিনাশকে নিশ্চয় করার পথে এগোতে থাকলেন ত্রিমূর্তি। যদিও, অনন্য কততম কলাপ্রকাশ অম্বিকাপুত্রের, তা জানাছিলনা ত্রিমূর্তির। ঘটনার সূত্রপাত বহুদিন ধরে হলেও, কর্মকাণ্ড বীভৎস আকার ধারণ করে, এই শেষ প্রজন্ম থেকে, অর্থাৎ যখন থেকে ধারীপুত্ররা, আর সুধাপুত্ররা বড় হতে শুরু করে। ঘটনা আকৃতি ধারণ করতে শুরু করে যখন রিন্ধ, ধৃত ও দ্বিজ একত্রে বনে মৃগয়া করতে গিয়ে প্রাণ হারালেন, তখন থেকে।

পীতাম্বর অর্থাৎ ধার স্বয়ং অরুদের দেশে এসে সকলের অবিভাবক হবার ভূমিকা পালন করা শুরু করলেন। কিশোর সমস্ত রাজপুত্রদের শিক্ষা প্রদানের জন্য, ধার এক গুরুর সন্ধান করলেন, আর সেই গুরু অন্য কেউ নন স্বয়ং রমনাথ অর্থাৎ করি। করি নিজের পুত্র, করিজকে সঙ্গে নিয়ে অরুচলে এসে নিজের কুটির নির্মাণ করে রাজপুত্রদের শিক্ষা দিতে শুরু করলেন। মানবীয় দেহে অবস্থান, তাই তৃতীয়নেত্রও নেই, আর ত্রিকালদর্শনও নেই। কেবল মেধা, বুদ্ধি, ও সূক্ষ্ম বুদ্ধি দ্বারা এবার সকলকে হয় আত্মের নয় চেতনার বিস্তার করতে হবে।

তাই ষণ্ডকেও চিনতে পারলেন না করি, করিজ, আর তাঁর ভ্রাতাদেরও, কারণ তাঁরা যে তাঁদের পরিকল্পনা অনুসারে জন্ম নেননি। শীঘ্রই করির প্রশিক্ষণ শুরু হয়, আর তা হতেই, চারু, তরু, জারু, সমস্ত স্থানে করির প্রশংসা ছড়িয়ে দিলেন ধার। ফলে সমস্ত দেশের সমস্ত রাজপুত্র এসে করির কাছে রণবিদ্যা গ্রহণ করা শুরু করে। শাস্ত্রবিদ্যাও তিনি প্রদান করতেন, কিন্তু তাঁর শাস্ত্রবিদ্যার প্রতি আকর্ষণ কারুরই ছিলনা। তাই কেবল অস্ত্রশিক্ষাতেই তা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

সকল রাজপুত্র একত্রিত হওয়ার অর্থ, যেমন অরুকুলের রিন্ধরা, ধৃতরা ছিলেন এবং দ্বিজপুত্র অরি  ছিলেন, তেমনই এলেন অনন্য, ভদ্র, জেরুপুত্র শশ, মেঘপুত্র রুক্ষ ও পুণ্ড্র, এবং ধারপুত্র দ্রথ। সঙ্গে সঙ্গে এলেন ষণ্ঢও। অর্থাৎ সমস্ত প্রতিপক্ষ তথা মিত্ররা একত্রিত হয়ে গেলেন করির কাছে, যাদের সাথে করি স্বয়ং, তাঁর পুত্র করিজও রইলেন, আর রইলেন ধার, অর্থাৎ ত্রিমূর্তি স্বয়ং।

প্রশিক্ষণ শুরু হতে ধীরে ধীরে সমস্ত শিষ্যরা তিন খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যেতে শুরু করলো, যাদের মধ্যে বিবিধ অস্ত্রে পারদর্শীরা প্রায় সমান ভাগে বিস্তৃত রইল।

একটি বিভাগে রইল দুরাধার ও তাঁর ৭ ভ্রাতা, যারা সকলেই মুগুর অর্থাৎ গদাবিদ্যায় পারদর্শী; রইলেন অরি যিনি মহাধনুর্ধর; ও রইলেন গুরুপুত্র করিজ, যিনিও মহাধনুর্ধর। যত অস্ত্র শিক্ষা এগোতে থাকলো, এই গোষ্ঠীকে দুরা নামেই চিহ্নিত করা হলো। যত প্রকার দুরাচার, দুর্বুদ্ধি এবং দুর্নীতি সমস্ত এঁদের থেকে আসা শুরু করলো। কাকে কিভাবে বিপাকে ফেলা যায়, কিভাবে কার থেকে কি হাতিয়ে নেওয়া যায়, আর কি ভাবে প্রতিটি কীর্তির শ্রেয় অর্জন করা যায়, সেই দিকেই এই দুরাগোষ্ঠীর দৃষ্টি থাকতে থাকে।

দ্বিতীয় গোষ্ঠীকে সুরা গোষ্ঠী বলা হলো, কারণ এঁদের গোষ্ঠীর প্রতিটি যোদ্ধা মহাবলশালী হলেও সকলেই সুরা আসক্ত। এই সুরা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিতেন ষণ্ঢ, আর তাঁর সাথে যুক্ত ছিলেন শশ, রুক্ষ, পুণ্ড্র এবং ধারপুত্র দ্রথ। এঁদের সাথে আরো যুক্ত রইলেন একটি পাহাড়ি কুলের সাত ভ্রাতা, যাদের একত্রে বলা হতো নেরু। এই গোষ্ঠী কারুর সাথেই তেমন মিশতেন না, এবং নিজেদের মধ্যেই থাকতেন এবং দিবারাত্র সুরাপানে মত্ত থাকতেন। না সদাচার আর না দুরাচার, কনো কিছুতেই এঁদের মন থাকতো না। তবে, অলিন্দ এঁদের সকলের জ্ঞাতি ছিলেন, তাই অনন্য, যাকে মৃত্যু দিতে গিয়ে অলিন্দের মৃত্যু হয়, সে ছিল এঁদের চক্ষুশূল। দ্রথ ও রুক্ষ ছিলেন মহাধনুর্ধর, আর শশ তথা ষণ্ঢ স্বয়ং ছিলেন গধাধর, আর পুণ্ড্র ছিলেন অনন্যের নকলনভিস।

অনন্য আশেপাশের গ্রামের স্ত্রীদের কাছে খুব যেত। স্ত্রীদের সাহায্য করা তাঁর খুব পছন্দের কাজ, আর তাই স্ত্রীরাও তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, যা তাঁদের স্বাভাবিক প্রকৃতিও। তাই অনন্য আশেপাশের গ্রামের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। বাস্তববুদ্ধি সম্পন্ন এবং যথার্থ ক্ষমতাসম্পন্ন অত্যন্ত স্বল্পভাবে নিজকে স্থাপন করার স্বভাব, এই সমস্তকিছুই তাঁকে স্ত্রীদের প্রিয় ভ্রাতা আর পুত্রসমান করে তুলেছিল। অনন্যের সঙ্গে থাকতো তাঁর ভ্রাতা ভদ্র, যিনি মহাগদাধর এবং অপ্রতিম বলশালী। আর সঙ্গে থাকতো গুণ, অর্থাৎ রিন্ধপুত্রদের মধ্যমপুত্র। গুণ আর অনন্য যেন অভিন্নচেতনা হয়ে বিরাজ করতো সমস্ত সময়ে, আর ভদ্র আর মহাবলশালী বল ছিল এঁদের ছায়া।

বল ও ভদ্র অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং সামর্থ্যশালী। বিশালদেহী দুইজনেই, আর ষণ্ঢ সমান বলবান যদি কেউ থাকতো এঁদের সকলের মধ্যে, তা হল বল ও ভদ্র। সঙ্গে থাকতো, সেবা, অগ্নি আর বারি, যারাও সমান ভাবে পরোপকারী। আর তাই এঁদের গোষ্ঠীকে বলা হলো চেতা গোষ্ঠী। এই চেতা গোষ্ঠীর মধ্যে বল আর ভদ্র ছিলেন যারা প্রকাণ্ডবলশালী হবার সঙ্গে সঙ্গে শ্রেষ্ঠ গদাধর। অনন্য নিজে আর গুণ ছিলেন যাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর কে বলা খুব কঠিন। সেবা ভালার প্রয়োগে অদ্বিতিয়ম ছিলেন, যদিও অনন্য এবং গুণও সেই ক্রীড়াতে গুণবান ছিলেন। আর অগ্নি বারি ছিলেন তরবারি চালনে সিদ্ধহস্ত।

এই দুরা, সুরা এবং চেতা গোষ্ঠীর নাম সমস্ত ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, কারণ এঁরা হলেন শ্রেষ্ঠ বীর। আর তাঁদের সাথে সাথে যাদের নামের বিস্তার ছিল, তাঁরা হলেন গুরু করি এবং পাবনিপুত্র মুণ্ড, যারা মহাধনুর্ধর ছিলেন, আর ছিলেন ধার, যিনি অসিচালনে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। বীরত্ব কেবল এঁদের অস্ত্রের বলেই সীমাবদ্ধ ছিলনা। রাজনীতিতেও এঁরা সকলেই পক্ক, যদিও প্রজাসেবার ভূমিকায় সেবা ছিলেন অদ্বিতিয়ম, আর স্বত্বাধারণে ধার ও মুণ্ডের জুটিকে টেক্কা দেবার মত কেউ ছিল কিনা, কারুর জানা ছিলনা।

অস্ত্রশিক্ষা সমাপ্ত হলে, এবার আসে গুরুদক্ষিণা দেবার সময়। আর গুরু করি আর ধার মিলে, এই স্থানে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক চাল প্রয়োগ করলেন, সমস্ত ভূখণ্ডের তিন শ্রেণীর বীরকে একে অপরের বিরোধী করে তোলার উদ্দেশ্যে। দুরা গোষ্ঠী পেলেন প্রথম সুযোগ গুরুদক্ষিণা প্রদানে। শর্ত এই যে, যদি এঁরা গুরুদক্ষিণা প্রদানে সফল হয়, তবে এঁদের গুরুদক্ষিণা এঁদের থেকে সুরা বা চেতা যেই গোষ্ঠী দখল করে আনতে পারবে, সেই হবে শ্রেষ্ঠ গোষ্ঠী।

গুরুদক্ষিণা রূপে কি ধার্য হলো? গোপালের পুত্রী অনন্যা। গোপাল, মুণ্ড, ধার ও করি একই গুরুর কাছে অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করেছে। সেই স্থানেই একে অপরের কাছে বচন দিয়েছিলেন যে, কেউ প্রথম কারুর কাছে গিয়ে কিছু চাইলে, তা প্রদান করতে হবে। সেই অনুসারেই, মুণ্ড ধারের কাছে তাঁর পুত্রীর হাত চেয়েছিলেন যখন, তখন ধারীকে প্রদান করেছিলেন; ধারী যখন করিকে গুরু রূপে চেয়েছিলেন, তাতে করি সম্মত হয়েছিলেন; কিন্তু যখন গোপালের কাছে তাঁর কন্যা অনন্যার হাত করিজের জন্য চেয়েছিলেন করি, তখন তিনি বলেন, পুত্রী যদি পাত্র বেশে করিজকে গ্রহণ না করে, তাহলে তাঁর কিচ্ছু করার নেই।

আর তাই গোপালের কন্যা অনন্যাকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হওয়াকেই গুরুদক্ষিণা বেশে ধার্য করলেন করি, যদিও কেন তাঁকে আনতে হবে, আনার পর কি হবে, তেমন কিচ্ছু বললেন না কারুকে, যা এক তিনি জানতেন আর জানতেন ধার, মুণ্ড ও করিজ। তবে গোপালকে পরাস্থ করা মুখের কথা নয়, কেননা গোপালের রক্ষক স্বয়ং অনন্য ও ভদ্র। দুরাগোষ্ঠী তাই এই গুরুদক্ষিণার পরীক্ষা নিয়ে অত্যন্ত আনন্দিত, কারণ এই দ্বন্ধের কারণে চেতা গোষ্ঠী ভগ্ন হয়ে গেল, কিন্তু তাঁরা অখণ্ডই রইল। অন্যদিকে সুরাগোষ্ঠী তো এটিই চেয়েছিলেন এতকাল, কিন্তু সম্যক যুদ্ধের কারণ পাচ্ছিলেন না বলে, চেয়েও আক্রমণ করতে পারছিলেন না অনন্যকে।

দুরা গোষ্ঠী আক্রমণ করলেন। কিন্তু ভদ্রের প্রকোপ তাঁদেরকে প্রচণ্ড পরিমাণ বেগ দিতে থাকে। দুরাধার তাঁর সঙ্গে গদাযুদ্ধে মাতে, কিন্তু একটি প্রহরও টিকে থাকতে পারেনা। অন্যদিকে অনন্যের ধনুর্বাণ সামর্থ্যের সম্মুখে কেবল বাকি দুরাধার ভ্রাতারাই নয়, স্বয়ং অরিও অস্ত্রসন্ধান করতে ভুলে যায়। বিশেষত্ব কনো বিশেষ ধরনের বাণ নয়, বিশেষত্ব গতি। অনন্যের প্রচণ্ড গতি একাধারে সমস্ত মহারথী ধনুর্ধরকে ধরাশায়ী করে দেয়।

সেই বুঝে ঘাতক কোকিলাস্ত্র প্রয়োগ করলেন করিজ, এবং রমনাস্ত্র প্রয়োগ করলেন অরি। অনন্য কালান্তরের পূর্বে কালান্তর করবেনা বলে, এই দুই অস্ত্রের সম্মুখে মহাশূন্য স্থাপন করে দিলেন, যা কেবল সমস্ত অস্ত্রকেই গ্রাস করলো না। সমস্ত সেনা রথ, সমস্ত কিছু গ্রাস করে নিয়ে, সমস্ত দুরাভ্রাতা, করিজ এবং অরিকে পূর্ণনগ্ন করে ভুমিসায়ি করে দিলেন। লজ্জায় যে যার মত বনে পলায়ন করে নিজের নিজের অঙ্গকে বৃক্ষের পত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে নিলে, অনন্য এবার অত্যন্ত ক্ষুধার্ত এক গরুড় ও ষণ্ডের পাল ছেড়ে দিলেন, যারা দুরাদের সমস্ত পত্রের বস্ত্রকে আহার করে তাঁদের পুনরায় নগ্ন করে দিতে তাঁদের পশ্চাৎধাবন করলেন।

সেই দেখে দুরাসকলে পলায়ন করলেন রণস্থল থেকে, এবং সমস্ত কথা গুরু করিকে, ধারকে এবং তাঁদের অবিভাবক মুণ্ডকে বললেন। দুরারা পরাজিত হয়েছে, সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু এই মহাশূন্যস্থাপনকারী বাণ! এটি কি প্রকার বাণ! … এমন অদ্ভুত সামর্থ্যের কথা তো কেউ কখনো শোনে নি। করিজ ব্যখ্যা করলেন নিজের পিতাকে। বললেন, “পিতা, এই বাণ আমাদেরকে পিষে হত্যা করে দিতো আরো একটু সময় নিজের মধ্যে আমাদের ধারণ করে রাখলে”।

মুণ্ড প্রশ্ন করাতে অরি বললেন, “আমাদের দেহ থেকে যেন সমস্ত অস্থি, সমস্ত চর্ম, সমস্ত মাংসকে ছিনিয়ে নিচ্ছিল সেই শূন্যরূপ গহন অন্ধকার!”

এমন অস্ত্রের সন্ধান করলো কি করে অনন্য! এমন অস্ত্রের ব্যাপারে তো তাঁরাও এর পূর্বে কখনো শোনেনি! … উত্তর খুঁজে পেলেন না, করি, মুণ্ড, ধার, কেউই।

আক্রমণে গেলেন এবার সুরা গোষ্ঠী। একপ্রকার তাণ্ডব করা শুরু করলেন তাঁরা। বিশেষ করে ষণ্ঢ ছারখার করে দিলেন ভদ্রের সেনাকে, এবং গদার আঘাতে শশ ও ষণ্ঢ যখন প্রায় প্রাণ নিতে উদ্যত হয়ে গেলেন ভদ্রের, তখন অনন্যের কালশূন্য বাণ কালকেই স্তব্ধ করে দিলেন সকলের সমক্ষে। একাকী সে এই কালশূন্য অবস্থায় চলমান, আর সেই ভাবেই, ভদ্রকে উদ্ধার করলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে কালবেষ্টনী বাণ নিক্ষেপ করে, সকলকে কালের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিলেন।

প্রকাণ্ড সেই কালবেষ্টনীর বন্ধন স্থিত হবার পর কালশূন্য বাণকে নিষ্ক্রিয় করে দিলেন অনন্য। ষণ্ঢ থেকে থেকে আরম্ভ করে শশ, রুক্ষ, পুণ্ড্র এবং দ্রথ, সকলেই সেই কালবেষ্টনীতে আবদ্ধ থেকে তার থেকে মুক্ত হবার জন্য হাঁসফাঁস করলেন। আর যতই অধিক প্রয়াস করলেন মুক্ত হবার, ততই কালবেষ্টনীর বন্ধন অধিক পীড়াদায়ক হতে শুরু করে সকলের উদ্দেশ্যে। প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠলে, প্রাণের ভিক্ষা চেয়ে উঠলেন শশ ও রুক্ষ। ষণ্ঢ চিৎকার করে উঠলেন, “ছল … ছল হয়েছে আমাদের সাথে। … সম্যক যুদ্ধে অক্ষম এই অনন্য, সর্বক্ষণ খালি ছল করে। ছল করে সে শিশুকালেই অলিন্দকে হত্যা করেছে। আর এখন ছল করেই আমাদের বন্দী করেছে”।

অনন্য সম্মুখে এসে বললেন, “হুম, সশস্ত্র যোদ্ধার সম্মুখে অস্ত্রপ্রয়োগ যদি ছল হয়, তাহলে তো মানতেই হয়, আমি ছল করেছি। … কি জানো তো ষণ্ঢ, আমাকে দুটো জিনিস শিখতে হবে। এক হলো ছল করা, আর দ্বিতীয় হলো নিজে নিষ্ক্রিয় থেকে যুদ্ধে জয় করা। হ্যাঁ ষণ্ঢ, তোমরা তো আমারই মত বোকা। যেমন আমি বোকা, আর বোকা বলে নিজে যুদ্ধ করতে এগিয়ে যাই বারবার, তেমনই তোমরা। এবার আমাকে শিখতে হবে, নিজে নিষ্ক্রিয় থেকে, আসল শত্রু যারা নিজেদের আড়ালে রেখে, যুদ্ধ করে, তাঁদের সামনে টেনে আনা”।

কথার জালে আবদ্ধ করার প্রয়াস করছে অনন্য, এমন মনে করে ষণ্ঢ মুখ ঘুরিয়ে নিলে, অনন্য আবার বলল, “বল তো তোমাদের আছে। আমিও মানি এই কথা। কিন্তু কি জানো তো, বলের সাথে সাথে সেই বলপ্রদর্শনের যেই চেষ্টা থাকে তোমাদের, তার কারণে তোমাদেরকে আমি সঙ্গে নিতে পারবো না। শুধরে যাও, নাহলে একে একে, সকলকে পিষে দেব। … স্মরণ রেখো কথাটা, আমি যুদ্ধ করতে পারি এমন দেখানোর জন্য যোদ্ধা নই। আমি যুদ্ধ জয় করা আবশ্যক, এমন মনে করা যোদ্ধা। তাই আমার যুদ্ধে জয় চাই, ছল দ্বারা হোক, বল দ্বারা হোক, আর কৌশল দ্বারা হোক। … আর হ্যাঁ, যোদ্ধা কথা বলে না, আঘাত করে। এটাও স্মরণ রেখো”।

“শশ আর রুক্ষ প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছে। ষণ্ঢ, তুমিই বলো, শর্ত প্রদান করে, এঁদের প্রাণদান দেওয়া উচিত। কি তাই না! … তা তুমিও প্রাণদান চাও। না আসলে তুমি তো এঁদের নেতা। তাই তোমাকেই প্রশ্ন করছি। যদি তুমি মুক্তি চাও, তাহলে শর্ত দিয়ে, তোমাদের সকলকে মুক্ত করবো, নয়তো খালি শশ আর রুক্ষকে”।

ষণ্ঢ উত্তরে উগ্র হয়ে বলল, “আমাদের ছাড়লে, তোমারই বিপদ অনন্য। আমরা তোমার বংশকে সমূলে উৎপাটন করে দেব। পারলে নিজের তরুবংশকে রক্ষা করো। যদি মনে কর আমাদের ছাড়লে, রক্ষা করতে পারবেনা তরুবংশকে, তাহলে আমাদের মৃত্যু দিয়ে দাও”।

অনন্য হেসে বললেন, “এখনি রক্ষা করছি আমার বংশকে। সত্যি বলছি, এখনই করছি। যেই শর্ত দেব, তাতে শশ আর রুক্ষ তো কিছুতেই আক্রমণ করবেনা তরুকুলকে। দেখতে চাও? বেশ দেখে নাও। মুক্ত করতে পারি শশ আর রুক্ষ, তোমাদের সকলকে, তবে তার জন্য আমার সাথে তোমাদের ভগিনী, মেঘা, জালিমা আর ভামার বিবাহ দিতে হবে। বার্তা পাঠাও নিজের নিজের রাজ্যে। রাজকন্যারা এসে বরমাল্য প্রদান করুক আমাকে, অতঃপরে মুক্ত করে দেব তোমাদেরকে”।

প্রাণনাশের ভয়ে, তাই তাই করলেন শশ আর রুক্ষ, যেমনটা অনন্য বললেন। তিনপত্নীকে বিবাহ করে, অনন্য প্রশ্ন করলেন, “শশ, রুক্ষ, তোমাদের ভগিনীর কুল এই তরুকুল। এঁর নাশ করবে? তোমাদের ভগিনীর কুলের নাশ করবে?”

শশ আর রুক্ষ মাথা নামিয়ে নিলে, অনন্য ষণ্ঢের কাছে এসে বললেন, “দেখলে ষণ্ঢ, বলেছিলাম না, এখনই সুরক্ষিত করে নিচ্ছি তরুকুলকে। দেখ ভবিষ্যতে নয়, এখানে এই মুহূর্তে তাকে ঠিক করলাম। … কুটিল হতে শিখেছি, কি বলো? … না তোমরা আমার শর্ত রেখেছ, এবার তো তোমাদের মুক্ত করতেই হবে। … যাও, মুক্ত করলাম তোমাদেরকে”।

মুক্ত ও নিরস্ত্র হয়ে, সুরাগোষ্ঠী প্রত্যাবর্তন করলে, এবার পালা চেতাগোষ্ঠীর। রণক্ষেত্রে এলেনও তাঁরা। কিন্তু অনন্য দেখলেন, তাঁরা সকলে নিরস্ত্র। ভদ্র আক্রমণ করতে গেলেন তাঁদেরকে, তো অনন্য বললেন, “দাঁড়াও ভ্রাতা, এঁরা নিরস্ত্র। অর্থাৎ এঁরা যুদ্ধ করতে আসে নি। … বলো সেবা, গুণ, বল, … তোমরা এইভাবে নিরস্ত্র হয়ে কেন এসেছ?”

গুণ বললেন, “সখা, গুরুদেব তো গুরুদক্ষিণা প্রদানের সময়ে কখনোই বলেন নি যে, আমাদের যুদ্ধ করতে হবে! … তিনি বলেছেন দেবী অনন্যাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে। আমাদেরকে দেবী অনন্যা দিয়ে দাও। আমরা চলে যাবো। যুদ্ধের কিই বা প্রয়োজন?”

ভদ্র এই কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে গিয়ে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিমায় গদা তুলে প্রহার করতে উদ্যত হয়ে উচ্চ্বইস্বরে বললেন, “এক স্ত্রীর নিজের পতি নির্বাচনের স্বতন্ত্রতা কেড়ে নেওয়াকে তুমি সমর্থন করো গুণ! … তোমাকে সজ্জন মানতাম, এই তোমার সদ্ভাব?”

গুণ বললেন, “শান্ত হন ভ্রাতা ভদ্র, আমরা এখানে কারুকে বল পূর্বক নিয়ে যেতে আসিনি। এসেছি আমাদের ভগিনী যাকে প্রেম করে, তাঁর কাছে তাঁকে অর্পণ করতে”।

এতবললে, পাঁচভ্রাতার পশ্চাৎ থেকে দেবী যমুনা সম্মুখে এগিয়ে এলে, গুণ পুনরায় বললেন, “সখা, আমার এই ভগিনী তোমাকে স্বপ্নে, বাস্তবে সর্বক্ষণ হৃদয়ে ধারণ করে চলে। কৃপা করে তাঁকে ভার্যারূপে গ্রহণ করো”।

অনন্য বললেন, “এই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আর আমার একার নেই সখা। আমার তিন পত্নী যদি সহমতি প্রদান করেন এই বিবাহে, তবে অবশ্যই স্বীকার করবো এই সম্বন্ধকে”।

দেবী জালিমা বললেন, “আমাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠা হলেন দেবী মেঘা। যদি তিনি সম্মত থাকেন, আমার কনো আপত্তি নেই সুচরিত্রের রিন্ধকন্যা যমুনাকে সতিনরূপে স্বীকার করতে”। দেবী ভামাও সহমত হলে, দেবী মেঘাও রাজি হলেন। তাই সকলের সমক্ষে দেবী যমুনাকে গ্রহণ করলেন অনন্য। আর এই সমস্ত কিছুর পরে, গুণ বললেন, “সখা, এবার তো আমরা সম্বন্ধী হলাম। তা এবার তো দেবী অনন্যাকে আমাদের কাছে প্রদান করো”।

দেবী অনন্যা সম্মুখে এসে বললেন, “আমি যেতে প্রস্তুত আপনাদের সাথে, তবে আমি অবিবাহিতা হয়ে যাবো না সেখানে। যদি আপনাদের মধ্যে কেউ আমাকে বিবাহ করতে পারেন, তাহলে তাঁর ভার্যা হয়ে যাবো আমি ধনুর্ধর করির কাছে”।

গুণ বললেন, “দেবী, আপনি স্বয়ং বেছে নিন, যাকে আপনি বেছে নিতে চান নিজের পতি বেশে”।

দেবী অনন্যা সম্মুখে অনন্যের ভগিনী ভদ্রাকে আনলেন, আর বললেন, “বলো ভদ্রা, এঁদের মধ্যে কাকে তুমি তোমার স্বামী রূপে বেছে নেবে? তুমি যাকে বেছে নেবে, আমিও তাঁকেই আমার স্বামী রূপে বেছে নেব। আমি কথা দিয়েছিলাম তোমাকে ভদ্রা, আমি তোমার সতিন হবো। এবার আমার কথা রাখা সময় হয়ে গেছে”।

ভদ্রা হেসে বললেন, “আমি গুণকেই আমার স্বামী রূপে বেছে নেব”।

সুধীর সম্মুখে এসে বললেন, “সুধা আমার ভগিনী, আর তাঁর কুলে আমার আরো যেই চার কন্যা রয়েছে, মালতী, আরতি, সুমতি ও তপতী, এঁদের সকলকেই বাকি চার সুধাপুত্রের সাথে বিবাহ দিতে চাই”।

বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলে, সেবা বললেন, “কিন্তু এবার আমরা গুরুদক্ষিণা প্রদান করবো কি করে?”

অনন্য বললেন, “কেন গুণের স্ত্রীরূপে। গুরুদেব কেবলই অনন্যাকে গুরুদক্ষিণারূপে নিয়তে আসতে বলেছেন। কেন তা বলেছেন, তা তো আমরা লোকমারফত শুনেছি, তাই না? করিজ সেই কথা দুরাধারকে বলেছিল, আর সেই থেকেই সকলে জেনেছে। কিন্তু গুরুদেব তো আর বলেন নি সেই কথা। তিনি শুধুই অনন্যাকে সম্মুখে উপস্থিত করতে বলছেন। তা গুণ যদি তাঁকে বিবাহ করে, নিজের স্ত্রীকে গুরুদেবের সাথে সাখ্যাৎ করাতে উপস্থিত করে, তাহলেও তো গুরুদেব যেই গুরুদক্ষিণা কামনা করেছেন, তা পূর্ণই হয়”।

সেবা বললেন, “কিন্তু, এ তো ছল?”

অনন্য হেসে বললেন, “খলের উত্তর ছল হয় ভ্রাতা সেবা। এক স্ত্রীকে তাঁর সম্মতির বিরুদ্ধে কারুর কাছে অর্পণ করে দিয়ে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ধারণ করে নেওয়া, এটি খল। আর যিনি সেই ক্রিয়া করছেন, তিনি আমাদের গুরু। তাই প্রত্যক্ষ ভাবে তাঁর বিরোধ করা তো অন্যায়। অর্থাৎ আমাদের কি করতে হবে? খল ও বলের দ্বারা নির্মাণ করা ষড়যন্ত্রের থেকে অন্যায় না করে মুক্ত হতে হবে। তাহলে ছল ছাড়া কি পরে থাকলো?”

“এই যে তোমরা পাঁচ ভ্রাতা এখানে দুরা আর সুরাদের মত যুদ্ধ না করে, সন্ধি করে, অনন্যাকে লাভ করলে, এটা কি ছিল? এও তেমনই কীর্তি ছিল, তাই নয় কি? … অনন্যার রক্ষক তোমাদের সখা, আর তাঁর সাথে যুদ্ধ করা অন্যায়। তাই সেই অন্যায় থেকে মুক্ত থেকে, নিজেদের উদ্দেশ্য পূর্তি করার কৌশল করেছ তোমরা। … একই কৌশল তো গুরুদেবের উপরেও প্রযোজ্য”।

সহমত হলে, সমস্ত রিন্ধপুত্ররা অনন্যাকে নিয়ে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হলেন গুরুদেব করির সম্মুখে। সকলে চমকিত হয়ে গেলেন, অনন্যাকে নিয়ে এসেছে বলে নয়, অনন্যার রূপ দেখে। শুভ্র নয়, অতিশুভ্র তাঁর অঙ্গের বর্ণ। আর রূপ যেন অসম্ভবদৃশ্য। সুন্দর ভাবে যেন আঁকা তাঁর ঘনকালো নয়ন। তাঁদের মধ্য থেকে নিখুঁত আঁকা টিকালো নাসিকার নিচে পাতলা ওষ্ঠদেশ যেন শুভ্র মেঘের মধ্যে সিঁদুরের রক্তিম আভার মতন দেখতে লাগলো। অঙ্গের শোভাও অতি সুন্দর। অতিমনোরম দেহগঠন সেখানে উপস্থিত সকল পুরুষকে কামাতুর করে দিলো।

গুরু করি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করলেন গুণের বীরত্বের ফলেই অনন্যা আজ তাঁর সমক্ষে দণ্ডায়মান। কিন্তু চমকিত হলেন যখন গুণ অনন্যাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর চরণবন্দনা করে বললেন, “গুরুদেব, আমাকে ও আমার পত্নীকে আপনার আশীর্বাদ দ্বারা ধন্য করুন”।

করি সেই কথাতে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে উঠলেন, আর অন্তরে অন্তরে ক্ষিপ্তও হয়ে উঠলেন। দুরা ও সুরারা সেই কথাতে নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে এবার গুণ পুরস্কার নয় দণ্ড ভোগ করবে। ক্ষিপ্ত করি বললেন, “তোমাদেরকে অনন্যাকে নিয়ে আসতে বলেছিলাম, বিবাহ করতে কখন বলেছিলাম?”

গুণ সম্মুখে এগিয়ে এসে বললেন, “গুরুদেব, আমার সম্মুখে সেই অনন্য দাঁড়িয়েছিলেন, যিনি একাধারে মহাশূন্য অস্ত্র, কালশূন্য অস্ত্র ও কালবেষ্টনী অস্ত্রের অধিকারী। সেই অনন্য দণ্ডায়মান ছিলেন যিনি ভয়ঙ্কর কালান্তর ধনুশধারী। তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার সামর্থ্য কনো বীরের নেই। কারণ তাঁর উপর জয়লাভ করার জন্য সমস্ত বীরত্বই অতি তুচ্ছ। একমাত্র সমর্পণই তাঁকে পরাস্ত করতে পারে, একমাত্র আত্মভাবশূন্যতাই তাঁকে পরাস্ত করতে পারে, একমাত্র সদাচারই তাঁকে পরাস্ত করার উপায়। তাই সেই উপায়ই ধারণ করেছিলাম”।

“গুরুদেব, আপনি তো আমাদের শুধুই অস্ত্র সন্ধান করতে আর অস্ত্র চালনা করতে শেখাননি, তাই না? আপনি আমাদেরকে কোন স্থানে কিরূপ ব্যবহার করে যুদ্ধ জয় করতে হয়, তাও শিখিয়েছেন। আপনিও তো জানতেন যে কি ভাবে এই যুদ্ধ জয় করা সম্ভব। সেই ভাবেই এই যুদ্ধ জয় করেছি। … তবে যুদ্ধ জয়ের শেষে, দেবী অনন্যা স্বয়ং বলেন যে তিনি আপনার কাছে স্বেচ্ছায় উপস্থিত হতে রাজি, যদি আমি তাঁকে বিবাহ করে, গুরুর থেকে আশীর্বাদ গ্রহণের জন্য নিয়ে যাই। তাই সেই উপায়ই করেছি”।

ধার ও মুণ্ড সম্মুখে এসে তিরস্কারের সাথে বললেন, “কিন্তু গুণ, অনন্যাকে গুরুদেব করি আনতে বলেছিলেন, গুরুপুত্র করিজের সাথে তাঁর বিবাহ দেবেন বলে। … সেটার কি উপায় হবে?”

গুণ বললেন, “মান্যবর, এই কথা তো আমাদের পূর্বে বলা হয়নি। না গুরুদেব স্বয়ং বলেছিলেন, আর না আপনারা যারা সেই কথা জানতেন, আর যাদের মুখের উচ্চারিত কথাকে আমরা বিশ্বাস করি, তাঁরা বলেছিলেন। তাহলে আমরা সেই কথা জানবো কি করে? গুরুদেব তো দেবী অনন্যাকে সম্মুখে উপস্থিত করতে বলেছিলেন, তা তিনি উপস্থিত এখানে”।

দুরা সম্মুখে এসে বললেন, “আদেশ করুন গুরুদেব, আমরা গুণের থেকে অনন্যাকে ছিনিয়ে নিচ্ছি করিজের জন্য”।

গুণ এবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে বললেন, “সাবধান ভ্রাতা দুরাধার। নিজের বচনের ও কর্মের প্রতি সাবধান হয়ে যাও, নাহলে গুণের থেকে তোমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবেনা। গুণকে যদি কনো পুরুষের রোধ করার সামর্থ্য থাকে, তা একমাত্র সখা অনন্য। সেই কথা তুমিও ভালো ভাবেই জানো”।

অরি সম্মুখে এসে বললেন, “বেশ তো আজ সিদ্ধ হয়ে যাক, কে বড় বীর, গুণ না অরি”।

করিজ অরির কাছে এসে উচ্চৈঃস্বরে বললেন, “কে বড় বীর, তার থেকেও বড় প্রশ্ন এখানে এই যে অনন্যা কার। গুণ তাঁকে বিবাহ করে নিয়ে এসেছে, আর পিতা তাঁকে আমার পত্নী হবার জন্য নিয়ে আসতে বলেছিলেন। তাই আমার গুণের মধ্যে হোক দ্বৈরথ। যে জিতবে, সেই হবে অনন্যার স্বামী”।

গুণ বললেন, “যুদ্ধে তুমি আমাকে পরাস্ত করতে পারবে না করিজ, সেই কথা তুমিও জানো। কিন্তু তাও আমি যুদ্ধ করা এই শর্তে উচিত বোধ করছিনা, কারণ দেবী অনন্যা কনো পণ্যদ্রব্য নন, কনো স্থবির রাজ্য নন যে, যুদ্ধ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি কার হবেন। তিনি একজন রক্তমাংসের মানুষ, তিনি একজন পূর্ণভাবে সচেতন মানুষ, আর তাঁর নিজের জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার ও সামর্থ্য দুইই আছে। … তাই নিজেকে শ্রেষ্ঠ বীর প্রমাণ করে আমি দেবী অনন্যাকে কনো পণ্যরূপে প্রতিপন্ন করবো না। তবে হ্যাঁ, স্বামী আমি তাঁর। তাই তাঁর সম্মান ও সুরক্ষা দুইয়ের রক্ষক আমি। সেই অর্থে, যদি তোমরা সকলে বা কেউ একাকী তাঁর সুরক্ষাকবচকে ভেদ করতে উদ্যত হও, তাহলে গুণ তাঁর অস্তিত্বই সমাপ্ত করে দেবে”।

“আমি সখা অনন্য নই যে ক্ষমা করে দেবে, গুরুভ্রাতা বলে। আমি যুদ্ধ করি শুধু বিজয়ী হতে নয়, শত্রুর সমূল নাশ করতে। তাই যুদ্ধে জয়লাভ করেও আমি ক্ষান্ত হবো না। প্রাণ নিয়েই তবেই আমি ক্ষান্ত হবো”।

এতো বলতে সকল সুরা ও দুরা একত্রে আক্রমণ করতে এলে, গুণ ও বল অনন্যাকে বাকি তিন ভ্রাতার বেষ্টনের মধ্যে সুরক্ষিত রেখে, ধনুর্বাণ ও গদা নিয়ে যুদ্ধ করতে শুরু করলেন। গুণ আজ যেন অসম্ভব যোদ্ধা। তাঁর হস্তের গতির কাছে যেন কারুর ধনুশ ধারণ করে রাখাই সম্ভব হচ্ছিল না। নিরন্তর বাণ নিক্ষেপ করতে থাকলেন। এক পলকের মধ্যে এক শতক বাণ নিক্ষেপ করে দিলেন, এবং সকল ধনুর্ধারীর ধনুশ ভঙ্গ করে, তাঁদেরকে নিজের বাণে বিদ্ধ করে যন্ত্রণায় ভূপতিত করে দিলেন। পরে রইলেন কেবল করিজ আর অরি।

করিজ সরাসরি কোকিলাস্ত্রের সন্ধান করলেন, আর অরি সরাসরি রমনাস্ত্র সন্ধান করলেন। সেই দেখে ক্ষিপ্ত গুণ সন্ধান করলেন সূর্যাস্ত্র, যার বলে এক বিশালাকায় অভেদ্য দর্পণ রেখে দিলো অরি ও করিজের সম্মুখে। যেই অস্ত্রই প্রয়োগ করবে তাঁরা, যদি তা কালের অধীনে হয় তবে তা সূর্যাস্ত্রের কারণে প্রতিফলিত হয়ে অস্ত্রের চালককেই আঘাত করবে। করিজ আর অরি সূর্যাস্ত্রের প্রভার কারণে কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছিলেন না, কিন্তু প্রতিহিংসার ফলে তাঁরা যুদ্ধ থেকে বিরাম দিতেও রাজি নন।

কিন্তু করি দেখলেন, এই বাণ যদি করিজ নিক্ষেপ করে, সেই মুহূর্তে করিজের বিনাশ নিশ্চিত। তাই হস্তক্ষেপ করে বললেন, “আচ্ছা ঠিক আছে ঠিক আছে। …রণে ভঙ্গ দাও। এটা তোমাদের গুরুর আদেশ। … শিষ্য পুত্র সমান হয়, আর আমি অনন্যার বিবাহ পুত্রের সাথে দিতে চেয়েছিলাম, তাই যা হয়েছে তা উচিতই হয়েছে। আমার পুত্রসমান গুণই আজ অনন্যার স্বামী। আমি তাঁদের আশীর্বাদ প্রদান করছি”।

মুণ্ড সম্মুখে এসে বললেন, “কিন্তু আমি সুধাপুত্রদের এই ভ্রাতৃবিরোধকে প্রশ্রয় দিতে পারি না। তাঁরা তাঁদের নিজের ভ্রাতাদের উপর অস্ত্র সন্ধান করেছে। তাঁদের লহু বইয়েছে। তাই তাঁদের আমি রাজ্য থেকে নির্বাসনে পাঠালাম ১২ বৎসরের জন্য”।

গুণ সম্মুখে এসে বললেন, “এতো অন্যায় প্রপিতা! … যুদ্ধ আমরা করতে যাইও নি, আর চাইও নি। আমরা কেবলই আক্রমণের উত্তর দিয়েছি। … যুদ্ধের শুরু তাঁরা করলেন, আর ভ্রাতৃবিরোধের দণ্ড প্রদান করছেন আমাদের? এ কেমন ন্যায়!”

মুণ্ড উত্তেজিত হয়ে বললেন, “গুরুজনের মুখের উপর কথা বলার সংস্কার লাভ করেছ তুমি গুণ!”

গুণ উত্তরে বললেন, “দুরাচারের আর অনাচারের প্রতিবাদ করার সংস্কার পেয়েছি আমরা আমাদের মাতার থেকে”।

মুণ্ড উত্তেজিত হয়ে উঠে বললেন, “এখনও আমি এই রাজ্যের রাজা। আদেশ দিলে তোমাকে রাজদণ্ডে ভূষিত করতে পারি এক্ষণে”।

গুণ উত্তরে বলে উঠলেন, “দুরাচারী যদি রাজা স্বয়ংও হয়, তার মুণ্ডচ্ছেদ করতে আমার বিন্দুমাত্র হাত কাঁপবে না প্রপিতা!”

সেবা সম্মুখে এসে বললেন, “এখান থেকে চলো গুণ। আমরা এখন নির্বাসিত। তাই আমাদের এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলা সাজেনা”।

গুণ ভ্রুকুঞ্চিত করে উগ্র হয়েই বললেন, “কিন্তু ভ্রাতা অন্যায়কে সহ্য করে নেওয়া যে …”

সেবা বললেন, “সামান্য অন্যায় সহ্য করে নিলে যদি শান্তি বজায় থাকে, তাহলে সেই অন্যায় সহ্য করে নেওয়াই উচিত গুণ”।

বল এবার গুণের পক্ষে এসে বললেন, “কিন্তু ভ্রাতা এখানে আপনজনরাই আমাদের সাথে ষড়যন্ত্র করছে”।

সেবা উত্তরে বললেন, “যারা ষড়যন্ত্র করে, তারা আপনজন হতে পারেনা। আপন বা পর, তা রক্ত নির্ণয় করেনা বল। আপন বা পর, তা আত্মীয়তা প্রমাণ করে। … যেখানে আত্মীয়তা নেই, স্বার্থচরিতার্থ করার জন্য ষড়যন্ত্র থাকে, সেখানে আপনজন শব্দপ্রয়োগই এক ভ্রান্তি। আমরা এখানে সামান্য প্রজা, তাই রাজদণ্ডে ভূষিত করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি কথা দিচ্ছি তোমাদেরকে, রাজদণ্ড প্রদানের অধিকারই আমরা কেড়ে নেব তাঁদের থেকে। সেদিন এই রাজদণ্ড প্রদানের অধিকার তাঁদের নয়, আমাদের থাকবে। এখন এখান থেকে চলো”।

এতো বলে রিন্ধপুত্ররা সেখানে থেকে প্রস্থান করে, তাঁদের পত্নীদের নিয়ে ও মাতা সুধাকে নিয়ে তাঁরা অরুরাজ্য ত্যাগ করে চলে গেলেন। সেই দেখে, ধার উদ্বেগ প্রকাশ করে বললেন, “রিন্ধরা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী, আর তার সাথে জুড়েছে অনন্য আর ভদ্র। মহাশক্তিশালী তারা। কিছু করতে হবে, নয়তো এঁরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে ১২ বৎসরের পর”।

দুরাধার সামনে এসে বললেন, “আমরা থাকতে আপনারা কনো চিন্তা করবেন না। শুধু একটা প্রতিশ্রুতি প্রদান করুন। তারপর দেখুন আমরা কেমন করে এই সুধাপুত্রদের আপনাদের চরণের দাস করে দিই”।

মুণ্ড বললেন, “কি প্রতিশ্রুতি চাও তুমি?”

দুরাধার খল হাস্য প্রদান করে বললেন, “তেমন কিছু নয়, এই যে সম্যক যুদ্ধ হলে, আপনারা অর্থাৎ গুরুদেব, মহারাজ আপনি, আর মামাশ্রী ধার, আপনি, আপনারা সকলে আমাদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন। … সুরাপুত্ররা আমাদের সম্মুখীন হলে হয়তো আমাদেরকে পরাস্ত করতে সক্ষম হবে, কিন্তু আপনাদের সম্মুখীন হবার সামর্থ্য তাঁদের নেই”।

ষণ্ঢ সম্মুখে এসে বললেন, “আমরা সকলে একত্রিত হলে এমনিও পারবেনা ওরা আমাদের সম্মুখীন হতে”।

করি সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “চিন্তা অন্য কারুকে নিয়ে নয়, এক গুণকে নিয়ে, আর অনন্যকে নিয়ে। … গুণ আর অনন্যের ন্যায় ধনুর্ধরের সম্মুখীন হওয়ার মত যোদ্ধা এক আমি আর রাজা মুণ্ড”।

অরি আর করিজ সম্মুখে এসে বললেন, “আজই ওর নাশ করে দিতাম, গুরুদেব আপনি বাঁধা না দিলে”।

ধার মাথা নেড়ে বললেন, “মূর্খের মত কথা বলো না। সে তোমাদের সম্মুখে কি অস্ত্র রেখেছিল, তোমাদের ধারণাও আছে? সূর্যাস্ত্র। মানে জানো এর? কালের অতীতে যদি কিছু না থাকে, সেই সমস্ত কিছুকে প্রতিফলন করাতে পারে এই অস্ত্র। অর্থাৎ তোমাদের কোকিলাস্ত্র আর তোমাদের রমনাস্ত্র গুণের নয়, তোমাদেরই ভস্ম করে দিতো। … মাথায় ঢোকে না, এই সমস্ত অস্ত্রের সন্ধান গুণ আর অনন্য পায় কোথা থেকে? কনো কি গুপ্ত ক্ষেত্র রয়েছে, এই অস্ত্র লাভের!”

মুণ্ড বললেন, “রাজ্য ছেড়ে চলে গেলে, আমরা ওদের নিবাসের সমস্ত স্থানকে খতিয়ে দেখবো। নিশ্চিত ভাবে কনো না কনো গোপন স্থান হবে, যার মধ্যে তাঁরা এই সমস্ত অস্ত্র গুপ্ত ভাবে রাখে বা গুপ্ত ভাবে লাভ করে। একবার তার সন্ধান পেয়ে গেলে, সেই অস্ত্র নির্মাণ প্রক্রিয়া জেনে নিয়ে, আমরাও সেই অস্ত্রের নির্মাণ করতে পারবো”।

করি বললেন, “বেশ দুরাধার, আমরা তোমার শর্তে রাজি। তোমরা তোমাদের পদ্ধতিতে এগিয়ে যাও। তবে, কি সেই পদ্ধতি, তা কি জানতে পারি?”

দুরাধার হেসে বললেন, “আমরা হলাম উচ্ছন্যে যাওয়া রাজপুত্র। প্রজা তো এমনই ভাবে আমাদের সম্বন্ধে। তাই আমরা যা খুশী করতে পারি। আপনারা এর মধ্যে থাকবেন না খালি। আপনারা রাজা, গুরু, মন্ত্রী। আপনারা এই সমস্ত কিছুর মধ্যে থাকলে, আপনাদেরকেই কেচ্ছায় লিপ্ত হতে হবে। … শুধু আজ যেই ভাবে সুধাপুত্রদের রাজ্য থেকে তারিয়ে দিলেন, সেদিনও সর্বশ্রান্ত করে দেবেন খালি, এমনই কনো বিধানের মাধ্যমে। বাকি আমরা দেখে নেব”।

অন্যদিকে সুধাপুত্ররা সস্ত্রীক তাঁদের মাতাকে নিয়ে যাত্রা করলে, অনন্য ও ভদ্র তাঁদের সম্মুখে এসে বললেন, “কোথায় যাচ্ছ তোমরা?”

সেবা বললেন, “বনে যাচ্ছি মিত্র”।

অনন্য প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু কেন? তোমাদের নির্বাসনে যেতে বলা হয়েছে, বনবাসে নয়। … ভুলে গেলে সেই কথা যা তুমি তোমার ভ্রাতাদের দিয়েছ? তুমিই বলেছিলে না যে একদিন তোমরা নিজেদেরকে রাজদণ্ড দেবার অবস্থায় উন্নত করবে! … কি তাই তো বলেছিলে তুমি গুণ? এমনই বলেছিলেন তো তোমাদেরকে? তা সেই কোথা রাখো এবার। সম্রাট হয়ে উঠুন সমস্ত ভুবনের এবং রাজদণ্ড দেবার উপযুক্ত হয়ে উঠুন”।

গুণ সম্মুখে এসে বললেন, “না সখা, সেই সময়ে ভ্রাতা আমাদের শান্ত করার জন্য কথাগুলি বলেছিলেন নিশ্চয়। কিন্তু আমাদের এখন এই মনে হয় যে, নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করার জন্য সম্রাট হয়ে ওঠার কনো অর্থই হয়না। বরং যেই মনোনিয়োগ আর পরিশ্রম আমরা নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার চিন্তা করেছিলাম, তা লোকহিতের জন্য করলে, জগতের কল্যাণ হবে”।

অনন্য মিষ্টহাস্য হেসে বললেন, “অতি উত্তম কথা সখা, কিন্তু একটা কথা বলো আমাকে, জগতবাসীর কল্যাণ করবে কি করে? সেই কর্ম করার অধিকার তো সম্রাটই নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন, তাই না? তুমি যদি কিছু জীবকল্যাণের জন্য গ্রন্থও লেখো, তাও জীবের কাছে পৌছাতে পারবে কিনা নির্ভর করে সম্রাটের অনুমোদনের। যদি কিছু গীত রচনা করো, সেই গীতও গাওয়া হবে কিনা, তা নির্ভর করছে সম্রাটের অনুমোদনের। আর রাজার আসনে বিভিন্ন রাজ্যে তো বসে রয়েছেন, মুণ্ড, ষণ্ঢ, ধার ইত্যাদিরা। তাঁরা তো লোকহিতের জন্য করা কনো কিছুকেই অনুমোদন করেওনা আর করবেওনা। তাহলে লোকহিত করবে কি করে?”

সেবা বললেন, “তাহলে কি আমাদের লোকহিত করার জন্য কনো রাজ্যের রাজা হতে হবে?”

অনন্য আবারও মিষ্ট হাস্য হেসে বললেন, “এক ব্যতিক্রমী রাজা কি সত্যিই লোকহিত করতে পারে সেবা? তুমি তো রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিপক্ক। তা তুমিই এই কথার উত্তর দাও বরং”।

সেবা মাথা নেড়ে বললেন, “না পারেনা। যদি ব্যতিক্রমী হয়ে উঠতে চায় সেই রাজা, তাহলে অন্য সমস্ত রাজারা তাঁর বিরোধিতা করে, তাঁর নামে অপপ্রচার করে, তাঁর রাজ্যে অবিচার হচ্ছে এমন প্রমাণ করার প্রয়াস করে, তাঁর রাজ্যে অরাজগতা বিস্তার করে সেই ব্যতিক্রমী রাজাকে অযোগ্য প্রমাণের প্রয়াস করে। অতঃপরে, হয় সেই ব্যতিক্রমী রাজাকে রাজ্য ত্যাগ করতে বাধ্য করে, নয়তো তিনি বাধ্য হন বাকি রাজাদের মত করে রাজ্যচালনা করতে”।

অনন্য হেসে বললেন, “তাহলে লোক হিতের উপায় কি?”

সেবা মাথা নিচু করে বললেন, “সম্পূর্ণ ভুজগতেরর সম্রাট হয়ে উঠে, যথার্থ লেখককে, কবিকে, দার্শনিককে, ধার্মিককে সনাক্ত করা এবং রাজ্যবাসীকে উন্নত করার দায়িত্ব অর্পণ করা সেই যথার্থ ব্যক্তিত্বদের হাতে। এই হলো লোকহিতের উপায়। কিন্তু অনন্য, আমাকে এই কথা তো বলো যে, যথার্থ লেখক কে, যথার্থ কবি বা দার্শনিক, ধার্মিক এঁরা কারা, তা সনাক্ত করার জন্য তাঁদের গুণাবলি তো জানা আবশ্যক। তাঁদের গুণাবলি কি হওয়া উচিত, যাতে তাঁদেরকে যথার্থ বলে সনাক্ত করা সঠিক হয়?”

অনন্য মৃদু হাস্য হেসে বললেন, “যথার্থ তিনিই যিনি সেই দিকে সকলের ধ্যান আকর্ষণ করেন, যেই দিকে সকলের ধ্যান আকর্ষিত হলে, সকলের মধ্যে মৈত্রী, সংহতি, সদ্ভাব ও সদাচার বিস্তার লাভ করে। যা কিছু ব্যবস্থা দুটি মানুষের মধ্যে বৈরী ভাবের, বিদ্বেষ ভাবের, লালসার, সম্ভোগ ভাবের, এবং একে অপরের থেকে শ্রেয়, এই ভাবের জন্ম দেয়, তাই হলো সম্পূর্ণ সমাজের অহিতের বীর্য”।

“সেবা, যদি ১০টি উপস্থিত ব্যক্তির মধ্যে কনো একটি ব্যক্তি আত্মচিন্তায় মগ্ন থেকে আত্মসুখবৃদ্ধির জন্য ক্রিয়া করে, এবং সেই ক্রিয়া করার কালে অধিক থেকে অধিক সম্পদ নিজের কাছে গচ্ছিত রেখে, অন্যের থেকে শ্রেয় হবার প্রয়াস করে, তাহলে বাকিদেরকেও সেই একই প্রয়াস করতে হয়, নাহলে তাঁদের কাছে কনো সম্পদই অবশিষ্ট থাকেনা। সেই সম্পদ ধনরত্ন হতে পারে, জনমত হতে পারে আবার বিদ্যাও হতে পারে। তাই যথার্থতা তাই যেখানে সমানভাবে বণ্টন ভাবনা থাকে, যেখানে সঞ্চয় নয়, উজাড় করে দেওয়ার ভাব থাকে”।

গুণ বললেন, “এর অর্থ এই যে, আত্ম চিন্তনে ব্যস্ততাই সমাজকে বিনষ্ট করে দেবার মূল ভাবনা। আত্মের চিন্তাই তার মানে মানবকে বিনষ্ট করে দেবার মূল ষড়যন্ত্র। কিন্তু সখা, বর্তমানে সমস্ত রাজারা তো সেই প্রয়াসই করে চলেছে অনুক্ষণ! সকল মানবকে আত্মচিন্তা করতে বাধ্য করছে তাঁরা। এমনকি পরমাত্মার আরাধনাতেও মাতিয়ে রেখেছে তাঁরা। পরমাত্মার ত্রিগুণকে অর্থাৎ ত্রিমূর্তিকেই তাঁরা ভগবান রূপে জগতে ব্যপ্ত রেখেছে। সেই ত্রিমূর্তি যে তখনই সারা দেয় যখন কেউ আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য বরদানের কামনা করে। এমন অবস্থায় লোকহিত কি ভাবে সম্ভব!”

“যদি ত্রিমূর্তির মদতেই এই আত্মতুষ্টির জন্য জনমানসের যাত্রা হয়, তারমানে তো, যদি আমরা আত্মতুষ্টির থেকে মানবকে সরিয়ে আনি, তাহলে তাঁরা আমাদের উপরই ক্রুদ্ধ হয়ে যাবে। তখন আমাদের কেই বা রক্ষা করবে? ত্রিমূর্তির সাথে সংগ্রাম করার সামর্থ্য আমাদের তো নেই। তখন আমরা কি করবো সখা?”

অনন্য হেসে বললেন, “কেন তিনি তো আছেন, যিনি আমাদের সকলের মা! … যিনি আমাদের সকলের মা বলেই আমরা সকলে সকলের ভ্রাতা আর ভগিনী। তিনি আমাদের বল দেবেন। তিনি আমাদের পথ দেখাবেন। … সখা, আত্মবিনাশের সম্ভাবনা জেনে সেই পথে যদি চলাই বন্ধ করে দাও, তাহলে তো সমস্ত জগতে সাধদের রাজত্ব শুরু হয়ে যাবে!”

বল বললেন, “কিন্তু সেই পথে যাত্রা করার উপায় কি? ত্রিমূর্তি সকলের অন্তরের ইচ্ছাকে, চিন্তাকে আর কল্পনাকে অনুক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। যদি আমরা কনো কিছু করার ইচ্ছাও করি, তারও তো এই অর্থ যে আমরা ত্রিমূর্তির দ্বারাই চালিত হচ্ছি!”

অনন্য উত্তরে হেসে বললেন, “উপযুক্ত কথা বলেছে ভ্রাতা বল। সেই জন্যই তো আমাদের কর্তব্য হবে যাত্রা করা। আমাদের যাত্রা যাতে সঠিক হয়, উপযুক্ত হয়, সঠিক উদ্দেশ্যে হয়, অর্থাৎ এক কথাতে আমাদের যাত্রা যাতে যথাযথ হয়, সেই দিকেই আমাদের মনোনিয়োগ করা উচিত। ফলের চিন্তা করে, ফল লাভের জন্য দিবারাত্র আশা করে নয়। হ্যাঁ ফল লাভ যাতে হয়, সেই উদ্দেশ্যে আমরা অবশ্যই চিন্তন করবো, আর সেই অনুসারে ক্রিয়াও করবো। কিন্তু ফল লাভের চিন্তন করে সেই অনুসারে কর্ম করা আর ফল লাভের ইচ্ছা করার মধ্যে অনেক ভেদ”।

“যেখানে ফল লাভের ইচ্ছা করার অর্থ এই যে, যেই মার্গ ধারণ করলে অসত্যের বিস্তার হবে, সেই মার্গ ধারণ করে হলেও লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আমরণ প্রয়াস, সেখানে ফল লাভের জন্য ইচ্ছা না করে, ফল লাভকে সার্থক করে তোলার প্রয়াসে এমন কনো কিছুকে ধারণ করা হয়না, যার কারণে অসত্যের বিস্তার হয় সমাজে। হ্যাঁ, ছলা, কলা, বল ও জ্ঞান, এই চারকেই ব্যবহার করতে হয় দুই ক্ষেত্রেই, তবে প্রথম ক্ষেত্রে অসত্যের বিস্তারকেও প্রশ্রয় দেওয়া হয়, কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা করা হয়না”।

“উদাহরণ স্বরূপ এমন দেখতে পারো যে, তোমার একটি গ্রন্থ রচিত আছে, যা লোকহিতের জন্য রচিত। তুমি সেই গ্রন্থকে সকলের কাছে পৌঁছে দিতে চাও। এবার এটিকে তুমি ইচ্ছা রূপে ধারণ করলে, তুমি এমনও করতে পারো যে, সকলে যে দেহসর্বস্ব, সেই দেহসর্বস্বতাকে ব্যবহার করে সকলের দেহসেবা করলে, আর অতঃপরে সেই দেহসেবা করার পিছনে দর্শনরূপে তুমি তোমার গ্রন্থকে স্থাপন করলে। হ্যাঁ লক্ষ্যপূর্তি তো হলো এতে, কিন্তু বিচার করে দেখো, তুমি অসত্যকে নিজের সঙ্গী রূপে ব্যবহার করলে। আর তাই, তোমার গ্রন্থ তো পরিচিতি লাভ করলো, কিন্তু পাঠকরা দেহসর্বস্ব হয়ে থেকে অসত্যতেই মজে রইল। তাঁদের চেতনার লেশমাত্রও উন্নতি হলো না। অর্থাৎ, তোমার গ্রন্থের প্রচার হলো, কিন্তু সত্যের বিস্তার লেশ মাত্রও হলো না”।

“অন্যদিকে দেখো, তোমার গ্রন্থকে স্থাপন করার লক্ষ্যে তুমি দেখলে যে, লোকসমাজ গ্রন্থপাঠে একদমই মনযোগী নয়। তারা বরং পালাগান, কবিগান ইত্যাদিতে অধিক উৎসাহী। সেই দেখে তুমি কি করলে? তুমি তোমার গ্রন্থকে পালাগান রূপে, কবিগান রূপে বিস্তার করলে। অর্থাৎ লোকহিতের জন্য তুমি অসত্যকে সঙ্গী করলেনা এক্ষেত্রে, বরং তাঁকে অস্ত্ররূপে ব্যবহার করলে”।

“অর্থাৎ, আমাদের কর্তব্য হবে অসত্য যাকে আত্মের প্রভাবে লোকসমাজ সর্বস্ব বলে জ্ঞান করে নিয়েছে, তাকে অস্ত্ররূপে ব্যবহার করে সত্যকে স্থাপন করা, কিন্তু কখনোই আমরা অসত্যকে সঙ্গী করে, এমন বলবো না যে, এই অসত্যের সাথে সাথে সত্যকেও গ্রহণ করে নাও। … অর্থাৎ অসত্যের সাথে কনো প্রকার আপস করার প্রশ্নই ওঠেনা। যদি সেই আপস না করার জন্য ব্যর্থতারও সম্মুখীন হতে হয়, তাও শ্রেয়। কিন্তু আপস তাও অসত্যের সাথে কিছুতেই নয়। অসত্যকে অস্ত্র করা যেতে পারে, সামগ্রী করা যেতে পারে, মাধ্যম করা যেতে পারে, কিন্তু দেয় পদার্থ কখনোই নয়”।

গুণ বললেন, “এর অর্থ এই যে, আমরা অসত্য প্রদান কনো ভাবেই করবো না, অসত্যকে অস্ত্র করতে পারি সত্য প্রদানের জন্য, কিন্তু কনো শর্তে, কনো কারণে আমরা অসত্য প্রদান করবো না। অসত্য মানে যেমন দেহসর্বস্বতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, দেহসুখ, শ্রেষ্ঠত্বের সুখ, যন্ত্রের সুখ, কনো ভাবেই এগুলি আমরা প্রদান করবো না। কিন্তু এগুলিকে প্রয়োজন মত অস্ত্র করতে পারি সত্যকে বিস্তৃত করার জন্য”।

সেবা বললেন, “বেশ অনন্য, আমরা প্রস্তুত সম্রাট হবার জন্য। সম্রাট হওয়াই যদি লোককল্যাণের উপায় হয়, তবে তাই সই। হ্যাঁ হতে পারে যে, আমাদের সেই পথে চলার কারণে বহুসংগ্রাম করতে হবে কারণ ত্রিমূর্তি স্বয়ং আমাদের বিরোধ করবেন। কিন্তু তাও আমরা সংগ্রাম করবো”।

অনন্য এবার একটি গহন নিশ্বাস নিয়ে বললেন, “একাধারে যদি দুরা আর সুরারা তোমার বিরোধী হয়, তাহলে কখনোই সম্রাট হতে পারবেনা। তাই প্রথম সুরা আর দুরার মধ্যে যেকোনো একপক্ষের নাশ করতে হবে। অরু তোমাদের নিষ্কাসিত করেছে রাজ্য থেকে। অরুর সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত হলো চারু। এরই মধ্যে যদি তরু, জেরু, মেঘ আর ষণ্ঢের কুল অর্থাৎ জরা কুলও তোমাদের সাথে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলেই তোমরা সম্রাট হতে পারবে”।

সেবা বললেন, “কিন্তু অনন্য, এঁরা তো সকলে সুরা। তারা আমাদের সাথে সঙ্গ দেবে কেন?”

অনন্য হেসে বললেন, “পুণ্ড্র আমাকে নকল করে। তাই আমার তাঁকে বিনষ্ট করার অধিকার আছে। আমি তাঁকে বিনষ্ট করবো। রুক্ষকে গুণ নিধন করবে। মেঘরাজ্যে গিয়ে আমি পুণ্ড্রকে নিধন করলে, রুক্ষ আক্রমণ করবেই আমাদেরকে। গুণ আর আমি মিলে রুক্ষকে বিনষ্ট করে মেঘরাজ্যকে সম্রাট সেবার চরণে নিবেদন করবো”।

ভদ্র বললেন, “শশ সর্বদাই গদাযুদ্ধে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে চায় নিজেকে। তাই অগ্নি আর বারি তাঁর কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে যাবে মেঘরাজ্য অধিকারের পর যে যদি বলকে সে দ্বৈরথে পরাস্ত করতে পারে, তাহলে মেঘরাজ্যকে সে অধিকার করে নেবে। শশকে পরাস্ত করতে পারলে, জালিমার অধিপতি হয়ে যাবে বল, আর সে সেবার কাছে জালিমা প্রদান করবে। আর আমরা তরু সাম্রাজ্য নিবেদন করবো সেবার কাছে, এবং তাঁকে সম্রাট রূপে স্থাপন করবো”।

অনন্য বললেন, “ষণ্ঢ একাকী হয়ে যাবে এই সমস্ত কিছুর পরে, কারণ দ্রথ শীঘ্রই দুরাচারীর পতি হয়ে অরুকুল আর চারুকুলের সম্বন্ধকে মজবুত করে নিতে চলেছে। হ্যাঁ, দ্রথ ষণ্ঢের সাথে যুক্ত থাকার কারণে অরুকুল বা দুরারা কিছুতেই সুরাদের থেকে অধিক শক্তিশালী হতে পারছে না। তাই মুণ্ড আর ধার মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দ্রথকে দুরাচারীর সাথে বিবাহ দিয়ে সুরাগোষ্ঠীকে ভেঙে, দুরাগোষ্ঠীকে অধিক শক্তিশালী করবে”।

“তাই আমাদের এই সামান্য অপেক্ষা করতেই হবে। ষণ্ঢ নিজেকে সম্রাট রূপে স্থাপন করার জন্য, অঙ্গরাজাদের বন্দী করে চলেছে। আর সে ১ শত এমন অঙ্গরাজাদের বন্দী করা পর্যন্ত অন্নজল স্পর্শ করবেনা, এমন মনস্থির করে রেখেছে। এমন সময়ে, আমরা যদি শশ, রুক্ষ আর পুণ্ড্রকে বিনষ্ট করে, তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে সম্পূর্ণ তরুকুল, আর চেতাগোষ্ঠীকে অর্পণ করার প্রস্তাব দিই, সে কিছুতেই অরাজি হতে পারবে না”।

“বল, অন্নজল ত্যাগ করা দুর্বল ষণ্ঢকে নিসস্ত্র দ্বৈরথে তোমাকে পরাস্ত করতে হবে। ক্লান্ত করে তাঁর হত্যা করতে হবে। অতঃপরে সেবাকে আর সম্রাট বলে স্থাপন করাতে কনো বাঁধা নেই”।

সেবা বললেন, “বেশ অনন্য, তুমি আর গুণ তবে মেঘরাজ্যে গমন করো। আর অগ্নি বারি তোমরা প্রস্তুত থাকো। অনন্যের থেকে সবুজ সঙ্কেত পেলেই জালিমাতে যাবে, আর শশকে যেমন বলা হলো, তেমন ভাবে প্রস্তাব দেবে”। এতো বলে সেবা সেখান থেকে সকল ভ্রাতাদের নিয়ে চলে গেলে ভদ্র বললেন, “কিন্তু ভ্রাতা, অরুকুল কি মেনে নেবে এই সাম্রাজ্য? তারা কি আক্রমণ করবেনা!”

অনন্য হেসে বললেন, “ভয় পায় তাঁরা তোমাকে ভ্রাতা। ভয় পায় তারা বলকে, গুণকে আর আমাকে। তাই সরাসরি আক্রমণ তো করবেনা, কারণ সেই আক্রমণে ধার, গুরু করি আর মুণ্ড সম্যক ভাবে তো ভাগ নেবেনা, কারণ তারাই সুধাপুত্রদের নির্বাসনে পাঠিয়েছে। নির্বাসনে প্রেরণ করার পর, যিনি নির্বাসনে প্রেরণ করেছেন, আর যারা নির্বাসনে প্রেরণ করেছেন, তাঁরা একে অপরের মুখ দেখবেনা, এমন তাঁদেরই নির্মিত বিধান। আর তাই দুরাধার কিছুতেই সরাসরি আক্রমণ করবেনা সুধাপুত্রদের। তবে হ্যাঁ, অন্য পথ তারা অবশ্যই বেছে নেবে”।

“আর ভ্রাতা, এই অন্য পথ বেছে নেওয়া খুব আবশ্যক, কারণ তা না হলে সেবা নিজের সম্বন্ধীদের সাথে যুদ্ধ করতে কিছুতেই রাজি হবেনা। আর সেই যুদ্ধ না হলে যে, যেই গভীর চক্রান্ত ত্রিমূর্তি করেছে, তার উত্তরও দেওয়া যাবেনা, তবে হ্যাঁ, তার কারণে আমাদের হয়তো কিছু বড় মূল্য দিতে হবে।  হয়তো অনেক অপমান সহ্য করতে হবে। তাই তৈরি থেকো সেই অপমানের জন্য”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22