২.৩। প্রাপ্তশ্রী পর্ব
যেমন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তেমনই ভাবে আক্রমণ শুরু হলো। পূর্বের দ্বারকে ভেঙে দিলেন আসন নিজের বাণের মাধ্যমে, আর উত্তরদিকের দ্বারকে ভেঙে দিলেন আম্মি নিজের বলের মাধ্যমে। আর এরপর, যেমন আম্মি বলেছিলেন, তেমনই হলো। উত্তরের সেনার মধ্যে ত্রাহিমাম ত্রাহিমাম লেগে গেল, জালিমার সেনার প্রকোপে, তার থেকেও অধিক পলেস্তা আর তুরঙ্কের প্রকোপে আর সর্বাধিক ভাবে বিশাল আকার ধারণ করা আম্মির কারণে। সেনা এদিক সেদিক পলায়ন করতে থাকলো আম্মির আক্রমণ থেকে বাঁচার কারণে, কারণ তিনি রক্ষসেনাদের ছুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হত্যা করছিলেন।
আম্মির সেই রূপ আসন দেখেনি। দেখলে সেও চমিকিত হতো, কিন্তু সেই রূপ যে পলেস্তা আর তুরঙ্কের কাছেও নতুন। তাঁদের আঘাতেও শত শত সেনা প্রাণ ত্যাগ করতে থাকলো। আর এমন ভাবে মাত্র এক প্রহর চলার পরে, আর উত্তরের সেনা শিবিরে একটিও সেনা রইল না। শত শত রক্ষ সেনা প্রাণ হারিয়েছিলেন। তবে তারপরেও শত শত সেনা পলায়ন করেছিলেন পশ্চিম দিকে।
অন্যদিকে সেই খবর রমণ করনের কাছে পৌছাতে, বিশালাকায় আর অক্ষয় আক্রমণ করলো উত্তর দিকে, তো রটি করটি আক্রমণ করলো পূর্ব দিকে। আর এঁদের পিছনে রইল দুই অন্তক ভ্রাতা। এঁরা সকলে মিলে ধুন্ধুমার করা শুরু করলো জালিমা সেনার। আর তা দেখে, পলেস্তা অক্ষয়ের সাথে দ্বন্ধে যুক্ত হলো, তো বিশালাকায় যুক্ত হলো তুরঙ্কের সাথে দ্বন্ধে। অন্যদিকে বসন রটি ও করটি ভ্রাতাদের আক্রমণ করে নিজের বাণের দ্বারা জেরবার করতে থাকলে, অন্তক ভ্রাতাদের সাথে জেরু যুদ্ধ করতে শুরু করে। আসন সেনা নিধন করতে করতে গবল পাহাড়ের দর্শন পেয়ে, সেখানে উঠে গিয়ে শিবির নির্মাণ করা শুরু করে দেয় কিছু সেনার সাথে। আর পলেস্তা তথা তুরঙ্ককে যুদ্ধে রত দেখে, আম্মিও গবল পাহাড়ে উঠে আসেন শিবির নির্মাণের কাজে আসনকে সহায়তা করতে।
আম্মির সংসর্গ পেলেই যেন আসন মোহিত হয়ে যায়। গতি বেড়ে যায় তাঁর কাজের, বেড়ে যায় তাঁর সামর্থ্য। আর মাঝে মধ্যে একত্রে কাজ করার সময়ে যখন যখন আম্মির সাথে আসনের অঙ্গের ঘর্ষণ হয়, আসনের যেন হৃদস্পন্দনের অনুভবই চলে যায়, আর আম্মিরও যেন সেই স্পর্শ বড় প্রিয়, তাই তাঁরও কাজের গতি শিথিল হয়ে যায়।
আম্মি আর আসনের মধ্যে এই রসায়নের সাক্ষী অন্য কেউ নন, কারণ তাঁরা দুইজনেই নিজেদের ভাব ও অভিব্যক্তি নিজেদের অন্তরেই আবদ্ধ রাখলেন, বাইরে তা প্রকাশিত হতে দিলেন না। অন্যদিকে, বসনের বাণের জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠে রটি অন্য সমস্ত অস্ত্র ত্যাগ করে গদা ধারণ করে আক্রমণ করতে এলে, বসন তা দেখে, কাষ্ঠ বাণের পরিবর্তে একটি লৌহবাণ নিক্ষেপ করেন তাঁর দিকে, যা সরাসরি রটির বক্ষ ভেদ করে, তাঁর প্রাণ নিয়ে নেয়।
সেই দেখে একাকী হয়ে যাওয়া করটি একত্রে ৫টি বাণ নিক্ষেপ করলে, বসন নিজেকে রক্ষা তো করে সেই বাণের থেকে কিন্তু সেই পাঁচ বাণের তিনটি বাণ, তাঁর দুই হস্তকে এবং পৃষ্ঠকে আঘাত করে, তার থেকে লহু প্রকাশিত করে। সেই আঘাতের কারণে দমে তো গেলেন না বসন, বরং একাধিক লৌহবাণ পরস্পর নিক্ষেপ করলেন তিনি করটির দিকে। করটি প্রথমবাণকে অনায়সেই নিজের ধনুশের বলে সরিয়ে দেন। কিন্তু দ্বিতীয় বাণকে অপসারিত করতে দেরি হয়ে যাওয়ায় তা তাঁর হস্তে আঘাত করে, তার হাত থেকে ধনুশকে ভূমিতে পতিত করে দেয়।
তৃতীয় বাণ আঘাত লেগে তটস্থ হয়ে যাওয়া করটির বাহুতে গেঁথে গেলে, বাণের গতির কারণে করটি প্রায় এক হাত পিছনে চলে যায়, তো অপ্রস্তুত করটির মস্তকে চতুর্থ বাণ সরাসরি গেঁথে যায়। মূর্ছা চলে যান তিনি, কিন্তু তাঁর দেহ তখনও দণ্ডায়মান ছিল, তাই পঞ্চম বাণ সরাসরি তাঁর গণ্ডদেশকে বিঁধে, তাঁর দেহ থেকে তাঁর প্রাণকে মুক্ত করে দেয়। রটি ও করটিকে এই ভাবে ভূমিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে, সেনা পলায়ন করা শুরু করে, কিন্তু জেরুর সাথে যুদ্ধে রত অন্তক ভ্রাতার মধ্যে নিসাধান্তক উগ্র হয়ে উঠে বসনের উদ্দেশ্যে একটি বিশাল পাথর ছুড়ে আঘাত করলে, আম্মি তিন লম্ফে, গবল পাহাড় থেকে নিচে নেমে এসে, বসনকে নিজের বাহুদ্বারা আঘাত করে, সুরক্ষিত করেন সেই পাথরের থেকে।
অতঃপরে যা দেখলেন আসন বসন এমনকি জেরু, তাতে আম্মি সম্বন্ধে তাঁদের সম্পূর্ণ ধারণাই পালটে গেল। দেখলেন, ঊর্ধ্বগগনে তিনি তাঁর হস্তকে প্রসারিত করে, একটি বজ্রধারণ করলেন, আর সেই বজ্রকে একপ্রকার চাবুকের মত ধারণ করে, নিসাধান্তককে উত্তমমধ্যম প্রহার করতে থাকলেন। আর যখন প্রহার সমাপ্ত করলেন তখন একপলকের অপেক্ষা, আর তারপর, নিসাধান্তকের দেহ প্রায় তিন শত টুকরো হয়ে ভূমিতে পাহাড়ি ধসের ন্যায় পরে গেল।
সেই দেখে হতবম্ব হয়ে যাওয়া জীবান্তককে একটি ভয়নক পদাঘাত করলেন জেরু, তো তাঁর দেহ ভূমিতে লুটিয়ে, একটি লম্ফ দিয়ে, তাঁর গণ্ডের উপর নিজের জানু দ্বারা চেপে বসলেন জেরু। দমবন্ধ হয়ে গিয়ে হাঁসফাঁস করতে থাকা জীবান্তককে মুক্ত করতে এগিয়ে যাওয়া অক্ষয়ের কটিদেশে প্রবল গদাঘাত করলেন পলেস্তা তো, অক্ষয়ের দেহ ভূমিতে পরে যায়। অক্ষয়কে দেহ ঘুরিয়ে ভূমি থেকে ওঠারও সুযোগ দিলেন নে পলেস্তা, সরাসরি তাঁর মস্তকে দ্বিতীয়বার গদাঘাত করতে, চূর্ণ করে দিলেন অক্ষয়ের মস্তক।
জীবান্তক জেরুর জানুর বলে প্রাণ ত্যাগ করলে, তুরঙ্ককে ভয়ানক ক্রুদ্ধ হয়ে যাওয়া বিশালাকায় গলা টিপে ধরে শূন্যে তুলে দিলে, পলেস্তা নিজের দেহকে গগনে উন্নীত করে প্রবল ভাবে একটিবার ঘূর্ণন করে সরাসরি মস্তকে নিজের গদা দ্বারা আঘাত করলে, কান ঝালাপালা হয়ে যায় বিশালাকায়ের। দেহের ভার সামলাতে না পারা বিশালাকায় যখন টলমল করছিল, তখন তুরঙ্ক ও পলেস্তা সমানে তাঁকে গদাঘাত করতে থাকলে, তার বিশাকালায় দেহ আসতে আসতে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ভূমিতে পরে যায়, তো তাঁর কলিজার উপর পলেস্তা তুরঙ্কের গদাঘাত তাকে প্রাণ থেকে মুক্ত করে।
আর ঠিক সেই সময়ে একটি অযাচিত ও অজ্ঞাত ভাবে গগনের দিশা থেকে উড়ে আসা শেল বসনকে বিদ্ধ করলে, বসনের দেহ ভূমিতে লুটিয়ে পরে যায়। সেই দেখে আসন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে, দৌড়ে আসতে গেলে, আম্মি তড়িঘড়ি বসনের দেহকে নিজের দুই বাহুতে ধারণ করে গবল পর্বতে উঠে এলেন, এবং জেরু সকলকে সেই পাহাড়ে উঠে আসার নির্দেশ দিলেন। এরপর, পরস্পর বাণ ধেয়ে আসতে থাকে সকলের দিকে গগন থেকে, তো প্রায় এক শত সেনা প্রাণ হারান, যতক্ষণ না তিন সহস্র সেনার বাকিরা ও সেনাপতিরা গবল পর্বতে উঠে এলেন।
ভয়ার্ত হয়ে রয়েছেন আসন। উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করে উঠে বললেন, “পিতাকে গিয়ে আমি কি বলবো এবার! কেন তুমি জেদ ধরলে বসন আমার সাথে আসার জন্য!” … সেই ভয় দেখে আম্মি বললেন, “কিচ্ছু হবেনা সখা, সব ঠিক হয়ে যাবে”।
আসন প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু কি হলো এটা? অকস্মাৎ গগন্থেকে বাণ ছুটে এলো কি করে?”
আম্মি গম্ভীর ভাবে বললেন, “মেঘকবচ। গগনের আড়াল থেকেই সে আক্রমণ করে। আমাদের আজকের রাত্রি এখানেই অবস্থান করতে হবে। কাল প্রভাতে আমি বসন আর জেরুকে নিয়ে কালাগুহায় যাবো মেঘকবচের বিনাশ করতে”।
আসন বললেন, “কিন্তু আম্মি, কি করে? বসন যে …”
আম্মি গম্ভীর হয়ে বললেন, “কিচ্ছু হবেনা বসন ভাইয়ের। আমি আসছি তাঁর ওষধি নিয়ে। কাল সকাল হবার আগে কেউ নাইমবিনা এই পাহাড় থেকে। নাইমলেই নির্ঘাত মৃত্যু। মনে থাইকবে সকলের?”
এত বলে আম্মি তিন চার লম্ফে সমুদ্রের দিকে চলে গেলেন। পাহাড়ের উপর থেকে সকলে দেখলেন লালসাগরের মধ্যে ডুব দিলেন আম্মি। আসন সেই দেখে কি হচ্ছে কিচ্ছু বুঝতে না পারলে, জেরু বললেন, “চিন্তা করবেন না। আম্মি যখন বলেছে কিচ্ছু হবেনা, তখন কিচ্ছু হবেনা। লালসাগরের মাঝে এক স্থানে আম্মি সমস্ত ওষধি রেখে দেয়। শীঘ্রই ফিরবে আম্মি সেখান থেকে। আমার পিতা জালিমকে আজ যতটা সুস্থ দেখছেন, তা আম্মির কারণেই হয়েছে”।
“আম্মি বলেছিল যদি শূলবিদ্ধ হবার সাথে সাথে তিনি পিতাকে পেতেন, তাহলে সম্পূর্ণ ভাবে স্বাভাবিক করে দিতে পারতেন সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু তাঁর সাথে আমার আলাপ হয়েছে যখন তখন পিতা প্রায় তিন বছর হয়ে গেছিলে শূলের প্রকোপে অথর্ব হয়ে গেছিলেন। তাই তাঁকে উঠে দাঁড় করাতে তো পেরেছেন, কথা বলাতেও পেরেছেন, কিন্তু স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি। তবে পিতা সমানে আগের থেকে ভালো হচ্ছেন, আম্মির ওষুধের জোরে। ভ্রাতা বসনের এই মাত্র শূল লেগেছে। তাই আম্মি নিশ্চিত ভাবে তাঁকে পুরপপুরি সুস্থ করে দেবে, আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে যান”।
আসন বললেন, “কিন্তু শূল কি ধরনের অস্ত্র? এঁর আগে তো এঁর ব্যাপারে কিচ্ছু শুনিনি বা জানিনি!”
জেরু বললেন, “ডঙ্কেশের নির্মিত অস্ত্র এটি, যা তিনি তাঁর পুত্র মেঘকবচের মায়াশক্তি দেখে আপ্লুত হয়ে তাঁকে বরদান স্বরূপ দিয়েছিলেন। এই অস্ত্রের কারণে ব্যক্তির অন্তরে ত্রিগুণকে স্থগিত করে দিয়ে তাঁকে চেতনার থেকে দূরে স্থিত করে দেয়। … এঁর ওষধি হলো চিৎশক্তি, আর তা প্রদান করে সাগরের নিচে জন্ম নেওয়া বটবৃক্ষ। আম্মি সেটিই আনতে গেছেন”।
সন্ধ্যা হতে রক্ষসেনারা সকলে গবল পর্বতের নিম্নে একত্রিত হয়ে রণহুংকার ছাড়তে শুরু করে। আর ঠিক সেই সময়েই তিন লম্ফে আম্মি গবল পর্বতে উঠে আসেন। তাঁকে ঘিরে বেশ কিছু রক্ষ সেনা আক্রমণের ভঙ্গি করলে, ভূমিতে চরণকে প্রবল বেগে আঘাত করে, সেই সেনাদেরকে পাহাড়ের তলদেশ থেকে ভূমিতে পতিত করে আম্মি উঠে আসেন আসন বসনের কাছে। এবং একটি প্রস্তর দিয়ে একটি শেকড় বেটে, সেই রস দুই প্রহর সমানে পান করালে, বসনের হুঁশ আসে। আর প্রভাতে সূর্যের আলো ফোটার সাথে সাথে সে সম্পূর্ণ ভাবে স্বভাবিক হয়ে ওঠে।
সেই দেখে আসন বসনকে বারংবার আলিঙ্গন করলেন, আর শেষে আম্মিকেও প্রাণভোরে আলিঙ্গন করলেন তিনি। সেই আলিঙ্গনের কালে আম্মি যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। যেন তাঁর সময় থেমে গেল কিছু মুহূর্তের জন্য। আর আসন যখন আবিষ্কার করলেন যে তিনি এক স্ত্রীকে এই ভাবে আলিঙ্গন করেছেন, তখন তিনি অন্তরে অন্তরে লজ্জিত হলেন ঠিকই, কিন্তু আম্মিকে আলিঙ্গনের আনন্দই যেন কিছু আলাদা ছিল। যেন এক কি অদ্ভুত মধুর সুবাস তাঁর সর্বাঙ্গে খেলা করে চলেছিল, যেন কি এক দিব্য পবিত্রতা তাঁকে পূর্ণ ভাবে ঘিরে রইল।
আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হয়ে আসন লজ্জিত হয়ে বললেন, “আনন্দ উত্তেজনায় ভুলে গেছিলাম আম্মি যে তুমি এক নারী আর আমি এক পুরুষ। অপরাধ মার্জনা করো। আম্মি আসনের মুখবদনে স্নেহের হস্ত রেখে, হাস্য বেশে বললেন, “আলিঙ্গন তো পোলাও তাঁর মাকে করে, ভাইও তাঁর বোনেরে করে। তাতে কি হয়েসে? পবিত্রতাই সব। তোমার মনে, সেতনায় পবিত্রতা আমাকে জরিয়ে ধরেসিল। কি জানো তো সখা, পবিত্রতার কনো লিঙ্গ হয় না। … তাতে পুরুষ ও যা, মেয়ে মানুষও তা”।
খানিক থেমে আম্মি আবার বললেন, “রক্ষরা ঘুমাতে গেসে, মেঘকবচও সাধনে বসেসে। এই কালে যেতি হবে আমাদের কালাগুহায়। জেরু আর বসন, তোমরা তৈরি তো! … সলো আমার সাথে তাহলে”।
কালাগুহায় প্রবেশ করতেই সতর্ক হয়ে গেলেন মেঘকবচের দুই রক্ষী। বসন পুরুষ রক্ষীর সাথে যুদ্ধে রত হলো, তো আম্মি যেন যুদ্ধই করলো না, একটি মুষ্ট্যাঘাতে স্ত্রীরক্ষীর মুষ্টির সমস্ত অস্থি গুড়িয়ে দিয়ে দ্বিতীয় আঘাতে তাকে সরাসরি ছিটকে মেঘকবচের যজ্ঞের অগ্নির মধ্যে পতিত করে, তাঁকে অগ্নিদাহ করে দিলেন।
যজ্ঞভঙ্গ হতে ক্রুদ্ধ আস্ফালন সহ উঠে এসে অসি ধারণ করা মেঘকবচের কাছে উড়ন্ত চাকির মত গিয়ে তাঁর বক্ষে পদাঘাত করলেন জেরু। হাত থেকে অসি ছিটকে পরে যেতে, সেই অসির সন্ধান করতে যাওয়া মেঘকবচকে জেরু তুলে ধরে শূন্যে ঘুরিয়ে পুনরায় পাথরের গায়ে ছিটকে ফেলে দিলে, তার বিভিন্ন অঙ্গ থেকে লহু প্রবাহিত হওয়া শুরু করে দেয়। জেরু আজ অপ্রতিরদ্ধ জন্মের পর বোধ হওয়া থেকে পিতাকে পঙ্গু রূপে দেখে এসেছে সে। কেবল মাত্র সম্পত্তির অংশ দেবেনা বলে তাঁর পিতার এমন অবস্থা করার পিছনে যার প্রধান হাত ছিল সে হলো মেঘকবচ। কিন্তু মায়ার কারণে মেঘকবচ কারুর হাতে আসেনা। আজ সে হাতে এসেছে, মায়া কাজ করছে না তার কারণ এই গুহার বাইরেই তার যত মায়া।
তাই জেরু আজ ভয়ঙ্কর। সমস্ত ক্রোধ দিয়ে সে আজ মেঘকবচকে যেন একই দেহে শতদেহত্যাগের আঘাত করে চলেছে। ভূমিতে পতিত হয়ে যায় মেঘকবচ আর তাকে বাহু দ্বারা তুলে নিয়ে ঘূর্ণন করিয়ে ছুড়ে ছুড়ে পাথরের গায়ে ফেলে দেয় জেরু। রক্তাক্ত দেহ মেঘকবচের। সেই দিয়েই একটি মুষ্ট্যাঘাত করার প্রয়াস করে সে। জেরু সেই করকে ধারণ করে, মেঘকবচের বক্ষের উপর চরণ স্থাপন করে সেই বাহুকেই বিকল করে দিলেন। পুনরায় তার বক্ষের উপর চরণ দ্বারা প্রবল বেগে আঘাত করায় মেঘকবচ রক্তবমন করা শুরু করে দেয়।
এরপর জেরু মেঘকবচের দেহকে উল্টে দিয়ে, তার দুই উরুর উপর ভর নিজের সম্পূর্ণ দেহভার স্থাপন করে, পিছন দিকে মেঘকবচের মস্তককে ধারণ করে টান দিলে, মেঘকবচের কটিদেশের অস্থি ভেঙে যায়। বিজয় লাভ করার জন্য আস্ফালন করতে থাকে এরপর জেরু। বসনও তাকে শান্ত করতে এগিয়ে যায়। কিন্তু উভয়ই নজর দেয়না যে সরীসৃপের মত করে মেঘকবচ সেই গুহার বাইরে বেড়িয়ে আসতে থাকে। আম্মি সেই দিকেই নজর স্থাপন করে রাখে। কিন্তু কিছু করেনা, কেবল মেঘকবচের সরীসৃপের মত গুহার বাইরে এগিয়ে যাওয়া দেহের পিছন পিছন তিনি যেতে থাকেন।
মেঘকবচ গুহার বাইরে বেড়িয়ে আসতেই, সে হয়ে ওঠে মহাশক্তিশালী। সমস্ত অস্থির মোচন সে নিজে নিজেই ঠিক করে নিয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে পরে, আর নিজের দেহের বিভিন্ন স্থানের থেকে নির্গত লহু দেখে দেখে ক্ষিপ্ত হতে শুরু করে। আদেশ দেয় সে নিজের বিমানকে তো সেই বিমান এগিয়ে আসে তার দিকে। সেই বিমানে উঠে ধনুর্বাণ ধারণ করে সে কোকিলাস্ত্র, রমনাস্ত্র ধারণ করে একই সঙ্গে জেরু ও বসনকে আক্রমণ করতে উদ্যত হলে, আম্মি এবার ভয়ঙ্কর একটি লম্ফ দিয়ে গগনে নিজের দেহকে উন্নীত করেন, এবং হস্ত প্রসারিত করে বজ্র ধারণ করে, সেই বজ্রকে ভালার ন্যায় মেঘকবচকে আঘাত করেন।
একবার নয়, এমন সমানে সাতবার বজ্র ধারণ করে মেঘকবচকে আঘাত করলেন আম্মি, তাও এক পলকের মধ্যে। আর যখন তা সমাপ্ত হলো, তখন মেঘকবচের দেহ সাত টুকরো হয়ে গগনে ভাসমান হলে, ওষ্ঠবলে পবন ক্ষেপণ করে, আম্মি তাঁর দেহের এই সাত টুকরোকে রমণ ও করনের সামনে পতিত করলেন।
আম্মির এই অদ্ভুত কৃত্য দেখে বসন আর জেরু চমকিত হয়ে গেলেন। জ্বয়ধ্বনি উঠলো সম্পূর্ণ জালিমা সেনার মধ্যে যে মেঘকবচের বিনাশ সম্ভব হয়েছে। আর অন্যদিকে সাত টুকরে বিভক্ত মেঘকবচের দেহ দেখে রমণ কম্পমান হয়ে ভূমিতে পুত্রের টুকরো টুকরো ভাবে বিচ্ছিন দেহের পাশে বসে বিলাপ করা শুরু করলেন। বরণ ও করনও সেই দৃশ্য দেখে ভয়ার্ত হয়ে উঠলেন। দূতকে সন্দেশ দিলে, দূত সম্মুখে এসে বললেন, “আদেশ মহারাজ”।
কারণ বললেন, “রণক্ষেত্রে কি হয়েছে বলো”।
দূত বললেন, “মহারাজ, এক আদিবাসী স্ত্রী জেরু ও বসনকে নিয়ে কালাগুহাতে প্রবেশ করেন। সেখানের দুই রক্ষীকে হত্যা করে, জেরু মেঘকবচ রাজপুত্রকে প্রচণ্ড ভাবে প্রহার করেন। রক্তাক্ত করে তাঁর একাধিক অস্থিকে চূর্ণ চূর্ণ করে দেয় জেরু। জেরু মনে করে যে আমাদের রাজকুমার মৃত। তাই হুংকার ছাড়া শুরু করে প্রচণ্ড উগ্রতায়, তো বসন তাঁকে শান্ত করতে থাকে”।
“কিন্তু মহারাজ, আমাদের রাজপুত্রের দেহে তখনও প্রাণ ছিল। তিনি সরীসৃপের মত করে গুহার বাইরে আসতে থাকেন সকলের অলক্ষ্যে, কিন্তু সেই আদিবাসী স্ত্রী তাঁর উপর নজর রেখেছিলেন। গুহার বাইরে এসে, নিজের অস্থির মোচ এবং চূর্ণ ঠিক করে, নিজের ক্ষতদাগ মিটিয়ে, পুনরায় বলবান হয়ে নিজের মায়াবিমানে উঠেছিলেন, আর একই সঙ্গে কোকিলাস্ত্র তথা রমনাস্ত্র ধারণ করেছিলেন জেরু আর বসনের বিনাশের জন্য”।
“ঠিক তখনই এই আদিবাসী স্ত্রী ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে গগনে লম্ফ দিয়ে উন্নীত হয়ে যায়, আর একের পর এক বজ্র ধারণ করে করে, সাতটি বজ্র দ্বারা মেগকবচকে আঘাত করেন। কনো মায়া কাজ করেনা রাজপুত্রের সেই আদিবাসীর সামনে। আর তাঁর দেহ সাতটুকরো হয়ে ভূমিতে পড়তে শুরু করলে, সেই আদিবাসী নিজের নিশ্বাসের পবনের জোরে সেই সাতখণ্ডকে আপনাদের সম্মুখে প্রেরণ করে দেন”।
বরণ বললেন, “আর কি জানো সেই আদিবাসী স্ত্রী সম্বন্ধে?”
দূত বললেন, “আফগান ছেত্রের আদিবাসী তিনি। তাঁর গোলাপি গাত্রবর্ণ সেই ইঙ্গিতই দেয়। হৃষ্টপুষ্ট দেহ, অসম্ভব কমনীয় ও রমণীয় রূপ। মুখলাবণ্যও অদ্ভুত। অপার সৌন্দর্যের অধিকারিণী তিনি। অঙ্গে বস্ত্র বলতে, একটি মাত্র তুলা নির্মিত বস্ত্রখণ্ড ধারণ করে, যা তার সম্পূর্ণ উদরদেশকে ঢাকতে পারেনা, আর না পারে তাঁর সম্পূর্ণ স্তনদেশকে ঢাকতে, আর না পারে তাঁর জানুর পর থেকে চরণকে ঢাকতে আর না পারে তাঁর পৃষ্ঠ দেশকে ঢাকতে। ত্বক অত্যন্ত মসৃণ বলেই মনে হয়। বাহুদুইতে, করদুইতে, আর চরণ দুইতে একটি করে করে পিতলের কড়া ধারণ করে রাখেন তিনি। নাকে ও কানে ছিদ্র করা, যাতে কিছু ধাতুর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গহনা পরে থাকেন। কণ্ঠে একটি কালো রঙের তুলার রশি থাকে, যাতে একটি বাতাসা আকৃতির ছোটো পিতলের পাত লাগানো থাকে। আর তাঁর থুতনিতে, আঁখির দুই পাশে আর কপালে তিনটি আলক্তের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তিলক কাঁটা থাকে, যা তাকে অপার সুন্দরী করে তোলে”।
করন বিরক্ত হয়ে বললেন, “আহা, সে আমার রমণসঙ্গিনী নয়। যখন হবে তখন আমি নিজেই এই সব দেখে নেব। … তার বলের সম্বন্ধে বলো”।
দূত বললেন, “তিনবার ইনার আঘাত দেখেছি আর একবার ইনার কীর্তি। … তিনি বিশালাকার ধারণ করতে পারেন। প্রথম দিনে এমন বিশাল আকার ধারণ করে শত শত রক্ষ সেনার বিনাশ করেছিলেন একাকী। একই ভাবে বিশাল আকার ধারণ করে ইনি নিসাধান্তককে বজ্রদ্বারা হত্যা করেছিলেন। আর আজকে ইনার আঘাত দেখেছি। কীর্তির মধ্যে মহারাজ, যুবরাজ যখন বসনকে শূলদ্বারা বিদ্ধ করেছিল, তখন এই স্ত্রী তিন লম্ফে লোহিত সাগরের মধ্যস্থলে ডুব দিয়েছিল, আর সাগরের তল থেকে কনো ওষধি নিয়ে এসে, বসনের প্রাণ ফিরিয়েছিল। এর অধিক কিচ্ছু জানি না মহারাজ”।
করন বললেন, “ঠিক আছে তুমি যাও”।
বরণ বললেন, “ভ্রাতা, আমি যা ভাবছি, তুমিও কি তেমনই কিছু ভাবছো?”
করন মাথা নেড়ে বললেন, “বুঝতে পারছি না, আমাদের সর্বশক্তিমান পুত্রের ঠিক সাতটিই টুকরো করা আর আমাদের সামনে তা প্রেরণ করা। এটাকি শুধুই একটা কাঁকতলিয় ভাবে মিলে যাওয়া ব্যাপার নাকি এই আদিবাসী স্ত্রী তিনিই, যার পুত্রকে সাত টুকরো করে দেওয়া হয়েছিল?”
রক্তচক্ষু হয়ে রমণ বললেন, “যেই হোক সে, ছাড়বো না আমি তাকে। … করন বরণ যাও। ছল বল যেই ভাবেই হোক, এই স্ত্রীর দেহ থেকে আলাদা করা মুণ্ড আমার লাগবে”।
করন চলে গেলেন উগ্র মেজাজে। যতই তাঁর মেজাজ উগ্র হলো, ততই তাঁর দেহ বিশাল হতে শুরু করলো। আর অন্যদিকে বরণ চলে গেলেন নিরস্ত্র ভাবে জালিমা সেনা শিবিরের দিকে। বিশাকালায় করন রণক্ষেত্রে প্রবেশ করে, নিজের পদাঘাতেই প্রায় তিন শত জালিমা সেনার নিধন করে দিলেন। জেরু তাঁকে দেখে ক্ষিপ্ত ভাবে এক মোক্ষম মুষ্ট্যাঘাত করলেন, যার কারণে করন তিন চার কদম পিছিয়ে গিয়ে নিজের পদের আঘাত আরো দশক দশক জালিমা সেনার নাশ করে ফেলেন নিজের অজ্ঞাতেই।
কিন্তু জেরুর এই আঘাতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে, নিচু হয়ে নিজের বাহু প্রসারিত করে জেরুর কটিদেশ ধারণ করে শূন্যে তুলে ধরলেন, আর তাকে আহার করতে প্রস্তুত হলেন, সেই দেখে তুরঙ্ক ও পলেস্তা নিজেদের গদা ক্ষেপণ করলে, তা করনের হাত পর্যন্ত পৌঁছলও না। তাই দেখে বসন নিজের বাণ নিক্ষেপ করলেন করনের হাতকে লক্ষ্য করে। বিঁধলও সেই বাণ, কিন্তু যেন সেই বাণসমূহ করনের কাছে কাষ্ঠের চোঁচের মতন লাগলো। বিরক্ত হয়ে সে এক হুংকার দিয়ে মাথা নেড়ে জেরুকে আহার করার জন্য প্রস্তুত হলে, এবার আসন একটি মোক্ষম বাণ নিক্ষেপ করলেন করনের জানুতে।
সেই মোক্ষম বাণ করনকে ভয়ঙ্কর পীড়া দিলে, সে জেরুকে নিজের হাত থেকে মুক্ত করে, জানু গেড়ে বসে সেই বাণকে নিজের জানু থেকে উৎখাত করলেন। উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু জানুর যন্ত্রণা তাঁকে উঠে দাঁড়াতে বেশ বেগ প্রদান করলো। করনের বিশাল দেহের নিরিখে সমানুপাতিই লহু নির্গত হচ্ছিল জানু থেকে, কিন্তু সেই লহু জালিমা সেনার কাছে একটি হ্রদের ন্যায় হয়ে উঠেছিল। সেই পীড়া দেখে, আসন পুনরায় একটি মোক্ষম বাণ প্রয়োগ করলেন করনের দ্বিতীয় জানুতে।
হুমড়ি খেয়ে পড়লো করন সেই আঘাতের ফলে। সমস্ত জালিমা সেনা সেই পতিত দৈত্যের দেহের চাপে পিষ্ট হওয়া থেকে বাঁচতে এদিকে সেদিকে ছুটে পালাতে থাকলেও, প্রায় এক শত সেনা তাঁর দেহ চাপে পিষ্ট হয়ে গেলেন। করন রণক্ষেত্রেই উঠে বসলেন, আর জানু থেকে সেই বাণকে উৎক্ষেপণ করলেন। লহু নির্গত হতেই থাকলো, আর তা এমনই পরিমাণে হতে থাকলো যে এতকাল যাকে কেবল নামেই লোহিত স্বাগর বলা হতো, এবার সেই সাগর বাস্তবেই লোহিত হতে শুরু করে দিলো, করনের লহুর প্রবাহ ধারণ করে করে।
কিন্তু করন এবার রুদ্র মূর্তি ধারণ করা শুরু করলো। আসনকে দেখে, সে নিজের বাহুকে প্রবল গতির সাথে নির্গত করে আসনের কটিদেশকে ধারণ করার প্রয়াস করলো। আসন সেই দেখে বেশ কিছু বাণ নিক্ষেপ করলেন, যাতে ঈষৎ পীড়াও পেলেন করন, কিন্তু নিজের হস্ত প্রসারণ ছাড়লেন না। যখন প্রায় আসনকে ঘিরে নিয়েছেন নিজের হাতের তালুতে, কেবলই তাঁকে মুষ্টিবদ্ধ করবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে একটি দ্বিতীয় হস্ত আসনকে সেই স্থান থেকে অপসারিত করে নিয়ে চলে গেল।
করন যখন সেই ঘটনাকে অনুধাবন করে মস্তক তুলে সেই দ্বিতীয় হস্ত কার তা দেখতে গেলেন, তখন সজোরে এক জানুর আঘাতে করনের দেহ শূন্যে উঠে গিয়ে প্রায় এক শত যোজন দূরে গিয়ে পতিত হলো। এবার আর জালিমা সেনার ক্ষয় হলো না, বরণ সহস্র রক্ষ সেনার নাশ হলো, কারণ যেই স্থানে গিয়ে করনের দেহ পতিত হলো, সেই স্থানে রক্ষ সেনারা অবস্থান করছিলেন।
এমন বিশালাকায় আঘাত লাভ করে, এবার করন ঝেরেমেরে উঠে দাঁড়িয়ে সেই আঘাতকারিণীকে দেখতে গেলে, দেখলেন সেই আদিবাসী স্ত্রী তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে বিশালাকায় দেহ ধারণ করে। করন উঠে দাঁড়াতেই আম্মি নিজের হাতের তলে আসনকে ধারণ করে থেকে আসনের উদ্দেশ্যে বললেন, “বাণ সালাও সখা”।
আসন সেই কথা শুনে একের পর এক মোক্ষম লৌহ বাণ নিক্ষেপ করতে থাকলেন করনের উদ্দেশ্যে যা করনকে সঠিক ভাবে দাঁড়িয়েও থাকতে দেয়না। করনের সমস্ত দেহ লহুময় হয়ে উঠলো সেই বাণের নিরিখে তো করন এবার দ্রুতবেগ ধারণ করে ধেয়ে এলেন আম্মিকে আঘাত করতে, তো আম্মি নিজের মুষ্টিকে বদ্ধ করে নিলেন যাতে আসন সুরক্ষিত থাকে তাঁর মুষ্টিতে, এবং একপ্রকার উড়ন্ত পর্বতের মত গগনে উন্নত হয়ে, লম্ফ দিয়ে সরাসরি করনের বক্ষে পদাঘাত করলে, করনের দেহ ভূমিতে পরে সহস্র সহস্র রক্ষ সেনার হত্যা করে, ভূমিতে ঘর্ষণ সহ্য করতে করতে কালাগুহার পর্বতে গিয়ে ধাক্কা খেলেন।
তার ধাক্কায় কালাগুহা সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙে গেল, আর শুধু তাই নয়, সেই সম্যক পাহাড়ই হুরমুরিয়ে ভেঙে গিয়ে নিজের সমস্ত পাথরকে নিক্ষেপ করতে থাকলেন করনের দিকে, এবং করনের অস্তিত্বকেই সঙ্কটাপন্ন করে দিলেন। সেই দেখে আহত হয়ে যাওয়া প্রকাণ্ড সিংহের ন্যায় করন এবার উঠে পাথরের পর পাথর নিক্ষেপ করতে থাকলেন আম্মির দিকে, তো আম্মি নিজের মুষ্টি খুলে দিলে, আসন সরাসরি এক চন্দ্রআকৃতির বাণ নিক্ষেপ করলেন করনের দক্ষিণ হস্তের দিকে, যা করনের দক্ষিণ হস্তকে তাঁর দেহ থেকে আলাদা করে ভূমিতে পতিত করে দিলো।
এই পীড়া অসহনীয়, আর তাই করনের আর্তনাদও হয় অসহনীয়। এমনই ভয়ঙ্কর হয় সেই পীড়ার গর্জন যে, রমণও নিজের পুত্রের সাতখণ্ড নিয়ে বিলাপকে থামিয়ে বাতায়নের কাছে এসে দেখার চেষ্টা করেন যে কি হয়েছে। আর যখন তিনি তা দেখেন, তখনই আসন দ্বিতীয় একই প্রকার বাণ দ্বারা আঘাত করে করনের বাম হস্তও তাঁর দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন। রমণ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আম্মির কথা অনুসারে, আসন এবার একটি মোক্ষম বাণ নিক্ষেপ করেন করনের হৃদপিণ্ডে যা করনকে মৃত্যুশয্যায় শায়িত করে দেয়।
মৃত্যুর কালে করন মূর্ছাপ্রায় হয়ে উঠে বলেন, “গৌরি! … আমি তোমার স্বামী!”
আম্মি গর্জন করে উঠলেন সেই কথাতে, “সন্তানের হত্যাকারী কারুর স্বামী হবার যোগ্য নয়। … তোমার আর তোমাদের পতনের এই শুরু সবে। সম্যক বিনাশই তোমাদের বিধান”।
করন আর একটি কথাও বলতে পারলেন না, তাঁর মৃতদেহ কালাপর্বতকে পিছনে রেখে, তাকে ঠেস দিয়ে পরে রইল। রমণ আম্মিকে দেখলেন, আর দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। আর তারপর আসনের দিকে দেখলেন, আর বিচার করলেন, “কে এই মহাবলি যার বাহুবল এমন যে করনকে বিদ্ধ করে দেয়!” সমস্ত কিছু দেখে ভয়ার্ত হয়ে তিন কদম পিছনে চলে এলেন রমণ। তো রণক্ষেত্রের সমস্ত সেনা পলায়ন করলেন করনের এই বীভৎস অন্ত দেখার পর।
আসনকে নিয়ে আম্মি শিবিরে প্রত্যাবর্তন করে জেরুর কাছে এসে বললেন, “জেরু তোমার কোমরে খুব সোট লেগেসে না! … দাঁড়াও মালিস করি দিসি”। … জেরু বললেন, “চোট সমস্ত ঠিক হয়ে গেছে তোমাকে দেখে আম্মি। তুমি কে গো আম্মি! … তুমি চাইলে তো আমার পিতার কাছে কবেই নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করে আমাকে নিয়ে যুদ্ধে চলে এসে এই ডঙ্কা রাজ্যের নামোনিশান মিটিয়ে দিতে পারতে?”
আম্মি হেসে বললেন, “না গো জেরু, ভুল ধারণা তোমার। সখার বাণের শক্তি দেখেস? হয়তো আমার দিকে বেশি নজর দেবার জন্য দেখো নি। আমি দেখেসি। এমন গতিতে বাণ সালাতে আমি না কারুরে শুনেসি আর না দেখেসি। … সখার বাণ সারা করনরে মারা তো সম্ভবই সিলো না!”
“করনের মৃত্যু হয়নি। … রমণের মৃত্যু না হলে করনের মৃত্যু সম্ভবই নয়। বিশ্বাস না হলে একবার তাঁর মরদেহের দিকে তাকিয়ে দেখো, করনের মুণ্ড কোথায়?” এক আগুন্তুকের থেকে এমন কথা ভেসে এলে, সকলের দৃষ্টি প্রথমে সেই আগুন্তুকের দিকে যায়, তারপর যায় করনের মৃতদেহের দিকে। আম্মি এক দেখায় চিনে নিয়েছিলেন সেই আগুন্তুককে, আর চিনে নিয়ে চুপ করে গেছিলেন। জেরুও তাঁকে চিনে ফেললেন আর বললেন, “একি কাকা বরণ, তুমি এখানে?”
বরণ বললেন, “সমস্ত শক্তি যার থেকে প্রকাশিত হয়, সেই স্ত্রীকে দেখে আর মহাবলশালী ধনুর্ধর আসনকে দেখে আমি নিশ্চিত যে, এই যুদ্ধ রমণ করনের পক্ষে জয়লাভ করা সম্ভবই নয়। দেবী দসীকে মুক্ত করার কথা আমি প্রথমদিন থেকেই বলে আসছি, কিন্তু কেউ আমার কথাতে কর্ণপাতই করেনা এখানে। কেবলই বলের আরাধনা হয় এখানে। সদ্বুদ্ধির কনো দাম নেই এখানে। তবে মেঘকবচকে আমিও ভয় পেতাম। সে থাকতে যদি আমি তোমাদের কাছে চলে আসতাম, তাহলে অন্য কারুকে সে হত্যা করুক আর না করুক, আমাকে নিশ্চিত ভাবে সে হত্যা করতো। তাই তাঁর মৃত্যুর পরেই আমি তোমাদের কাছে এসেছিলাম। কিন্তু তোমরা তখন করনের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলে”।
আসন বললেন, “আপনি যে আমাদের সাথে ছলনা করছেন না, তার প্রমাণ আগে দিন, অতঃপরে আপনার সমস্ত কথা শুনবো”।
বরণ বিদ্রূপের হাস্য হেসে বললেন, “এই যে এই গলব পর্বতে আমি দাঁড়িয়ে আছি, এর থেকে বড় প্রমান আর কিই বা হতে পারে? এখানে তো রক্ষ, আরক্ষরা কেউ আসতে পারেনা, সেটা জানো না তুমি আসন?”
আসন বললেন, “রক্ষ শুনেছি, আরক্ষ কোন জাতি?”
বরণ পুনরায় বিদ্রূপের হাস্য হেসে বললেন, “আমরা তিন ভ্রাতা হলাম আরক্ষ, আর আমাদের বংশধররা হলো আরক্ষ। আসন, রক্ষপুরুষদের দুটি করে যৌনলিঙ্গ থাকে। আমার জন্মের কালে, আমারও ছিল। আর এই দুই লিঙ্গ থাকার কারণেই হয়তো, তাঁরা কামাতুর হলেও, বলবান হলেও ভীরু, যেমন আমি ভীরু। কিন্তু আমাদের মাতা, দেবী কর্কটি আমার এই দ্বিতীয় লিঙ্গকে আমার দেহ থেকে কেটে বাদ দিয়ে দেন। আর সেই দ্বিতীয় লিঙ্গই হলো করন। জন্মের কালে মানে আমার দ্বিতীয় লিঙ্গ কেটে দেবার পরে তাঁর কনো মস্তক ছিলনা। নিথর দেহ পরে থাকতো তার”।
“তাই দেখে, মাতা আমার দ্বিতীয় লিঙ্গকেও কেটে ফেলেন। পঙ্গু হয়ে যাই আমি তারপর থেকে। তবে সেই দ্বিতীয় লিঙ্গ কেটে দেবার পর কেবল রমণের জন্মই হয়না, রমণের মুণ্ড থেকে একটি মুণ্ড নির্গত হয়ে আটপাক খেয়ে তা করনের দেহে স্থিত হলে, করন প্রাণ লাভ করে বৃহৎ আকৃতি ধারণ করতে থাকে। পরে রমণ আর করন নিসাধলোক অধিকার করে আমার পঙ্গু অবস্থা কাটানোর জন্য ওষধি নিয়ে আসলে, আমি সুস্থ হই”।
“অর্থাৎ এই যে করনের দেহ আলাদা আর মস্তক আলাদা, যদি তোমরা তাঁর মস্তককে নষ্ট করে দিতে পারতে, তাহলে রমণের মৃত্যু সহজ হতো, কারণ রমণের আটটি মুণ্ডের মধ্যে একটি মুণ্ড সেইক্ষেত্রে বিনষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু তোমরা তো করনের মুণ্ডতে একটি আঘাতও করোনি। তাই সেই মুণ্ড যার, তার কাছে চলে গেছে। … জেরু, তোমার পিতা এই কথা বলেননি! … শুনেছি, তিনি তো আর পঙ্গু নেই। তিনি তো এখন কথা বলতে পারেন। তাঁর এই কথা বলে তোমাদের সতর্ক করে দেওয়া উচিত ছিল”।
আসন বললেন, “এবার আমাদের কি করনীয়?”
বরণ বললেন, “দেবী কর্কটি আসবেন এবার রণক্ষেত্রে। না তিনি বিশালাকায় আর না তিনি মায়াবী। কিন্তু তিনি আরক্ষদের জননী, আর ভয়ঙ্করী। মানবের রক্তপান করেন তিনি। অত্যন্ত বিচিত্র যোদ্ধা তিনি। কনো অস্ত্র তাঁর কিচ্ছু করতে পারেনা। একমাত্র বাহুবলেই তাঁকে পরাস্ত করা সম্ভব। কিন্তু কনো নারীর এতো দেহবল কোথায়? … এই আদিবাসী স্ত্রী অত্যন্ত বলশালী। ভ্রাতা করনকে আঘাত করার কালে আমি দেখেছি উনাকে”।
“একমাত্র উনিই দেবী কর্কটির নাশ করতে পারেন। অন্য কারুর তাঁর সমক্ষে যাওয়ার অর্থ, তাঁকে অধিক শক্তিশালী করা হবে, কারন যেমন যেমন তিনি রক্তপান করবেন, তেমন তেমন বলশালী হয়ে উঠবেন। আর হ্যাঁ, উনি কিন্তু এই পাহাড়ে উঠে আসতে পারেন, আর রমণও করন তাঁরা দুইজনেই রক্ষ নন। তাই হতে পারে পুত্রহারা হয়ে তিনি আজ রাত্রেই আক্রমণ করে দেবেন এই গবল পাহাড়েই। প্রস্তুত থেকো”।
আসন বললেন, “আর দেবী দশী?”
বরণ বললেন, “রমণের প্রাসাদের পরে একটি ছোট্ট প্রাসাদে তিনি মুক্ত হয়েও বন্দী। রমণের হত্যা করার আগে সেখানে তোমরা কেউ যেতে পারবেনা”।
জেরু বললেন, “আর সর্পরমণ?”
বরণ বললেন, “পিতার সাথে তাঁর বৈরী। তবে শুনেছি যে কনো এক যজ্ঞ করছে সে, শ্রেষ্ঠ মায়াবী হয়ে ওঠার জন্য। আর সেই যজ্ঞ পূর্ণ হবার জন্য, কনো দম্পতির বলি চড়াতে হবে তাকে, যারা পূর্ণভাবে পবিত্র, অর্থাৎ যাদের মধ্যে কামনার গন্ধ পর্যন্ত নেই। এমন দম্পতি পাওয়া যায় নাকি? তাই সে বাইরে আসেনা”।
এই কথোপকথন করতে করতেই সকলে শুনতে পেলেন কনো নারীর হুংকার। আর সেনারা সম্ভবত সেই নারীকে দেখে ভয়ার্ত হয়ে উপরের দিকে উঠে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনটি সেনা অর্ধেক গণ্ডদেশ নিয়ে, অর্ধেক বাহু নিয়ে উঠে এলেন, আর কিছু বলার আগেই মৃত্যু বরণ করলেন। সকলে উদ্বিগ্ন হয়ে গিয়ে উঠে দেখলেন দেবী কর্কটি একটি একটি করে সেনাকে ধরে, কারুর স্কন্ধ, কারুর বাহু তো কারুর গণ্ডকে কামরে ছিঁড়ে নিচ্ছেন আর রক্তাক্ত মুখ নিয়ে আহার করছেন।
সেই দেখে আসন সকলকে বললেন, “আপনারা সকলে গুহায় লুকিয়ে পরুন। এতো ভয়ানক নরখাদক!”
আম্মি জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলে, সম্মুখে এগিয়ে গেলে আসন তাঁর উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠলেন, “আম্মি! … না আম্মি। … কনো একটা অন্য উপায় ভাবা যাবে। … এভাবে নয় আম্মি। ও তোমাকেও আস্ত চিবিয়ে খেয়ে নেবে”।
কিন্তু আম্মি একটি কথাও যেন শুনতে পেলেন না। সরাসরি লম্ফ দিয়ে একটি পদাঘাত করলে, কর্কটি পাহাড় থেকে ভূমিতে আছার খেয়ে পরলেন। ভয়ানক ভাবে রক্তাক্ত হয়ে উঠলেন তিনি। আগ্রাসী তিনি, কিন্তু তাঁর থেকেও অধিক আগ্রাসী যেন আম্মি। তিনিও পুনরায় লম্ফ দিয়ে কর্কটির চরণের সামনে স্থাপিত হয়ে, পাদুকা ধারণ করে, শূন্যে বনবন করে ঘূর্ণন করাতে থাকলেন কর্কটিকে।
সেই ঘূর্ণন প্রকাণ্ড ঘূর্ণাবর্তের থেকেও ভয়ঙ্কর। এক সময়ের পর কেউ আর কিচ্ছু দেখতে পেলেন না। না কর্কটির শূন্যে ভ্রম্যমান দেহকে দেখতে পেলেন আর না আম্মিকে। বেশ কিছুক্ষণ পরে বরণের পায়ের সামনে একটি স্ত্রীর অঙ্গ খণ্ড উড়ে এসে পড়লো। খানিক পরে, আরো এক খণ্ড বসনের কাঁধের পাস দিয়ে ছুটে গেল। আরো খানিকক্ষণ পরে আম্মিকে দেখা যেতে থাকলো। কেবল তাঁর হাতে দেবী কর্কটির চরণ রয়ে গেছিল। প্রবল ঘূর্ণনের কারণে, কর্কটির সমস্ত দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। এতই টুকরো হয়ে গেছে দেহের যে, তাদেরকে আর একত্রিতও করা সম্ভব হলো না।
পরে রইল কেবলই রমণ। আর তাঁর সাথে দ্বৈরথে যুক্ত হয় পরেরদিন প্রভাতে আসন। রমণ যুদ্ধ করে অব্ধুত ভাবে। বলশালী তো সে বটেই। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা কখন যে নিজের বিমানকে ভূমিতে রেখে বাণ নিক্ষেপ করছে, আর কখন যে গগনে উন্নীত করছে বিমানকে, আসন বুঝতেই পারছিলেন না। আর এই বুঝতে না পাড়ার ফাঁকেই আট দিশা থেকে আসনকে আঘাত করে করে আসনের দেহ থেকে লহুপাত করাচ্ছিলেন রমণ।
সেই দেখে আম্মি ক্রুদ্ধ হয়ে গিয়ে বিশাল আকার ধারণ করে, রমণের বিমানকেই নিজের হাতে ধরে রইলেন। আসন সেই দেখে বিস্তীর্ণ বাণদ্বারা যুদ্ধ করা শুরু করলে, একে একে রমণের সমস্ত অস্ত্রের ভাণ্ডারকে সমাপ্ত করে দিতে থাকলেন আসন। সূর্যাস্ত তখনও হয়নি। আর রমণের কাছে বলতে গেলে আর কনো অস্ত্রই শেষ নেই। সেই দেখে, রমণ এবার নিজের অষ্টমুখ দ্বারা আসনকে ঘিরে, আসনের উদ্দেশ্যে অগ্নি বমন করতে থাকলেন। সেই দেখে আম্মির নির্দেশে, আসন একই প্রকার বাণ দুটি পরস্পর নিক্ষেপ করলেন।
প্রথম বাণ অষ্টমুখেরই অগ্নিকে নির্বাপিত করে দিলে, মুহূর্তের মধ্যে অন্য বাণটি প্রতিটি আটমুখকে বিঁধতে থাকে, আর তা বেধা শেষ হয়ে গেলে, একটিই বাণ আটটি মুণ্ডকে ধারণ করে গগনে বিরাজ করা অবস্থায় আম্মি বললেন, “সখা, মাটিতে বাণ পরার আগে, মাথাগুলা গুরায় দাও”।
সেই কথা শুনে আসন আরো একটি বাণ নিক্ষেপ করলে, সেই আটটি মাথা সহ বাণটিই ভস্মীভূত করে দিলেন আসন। চারিদিকে জ্বয়ধ্বনি উঠতে শুরু করে আসনের নামে, তো সকলকে থামিয়ে আসন বললেন, “এই জয় সকলের জয়। সকলে মিলে আমরা এই অসাধ্য সাধন করেছি, আর যদি আম্মি না থাকতো, তাহলে কিচ্ছু হতে পারতো না, কিচ্ছু না”।
এতবলে আম্মির কাছে আসন উপস্থিত হয়ে বললেন, “আম্মি, পূর্বে অযাচিত ভাবেই তোমাকে আলিঙ্গন করেছিলাম। পরমসুখ লাভ করেছিলাম। আজ অযাচিত ভাবে নয়, সচেতন ভাবে তোমাকে আলিঙ্গন করতে চাই। তোমার স্পর্শ মাত্রই আমার মধ্যে কি যে এক অদ্ভুত হিল্লোল চলে, তা বলে বোঝাতে পারবো না। কিন্তু সেই হিল্লোল যেন আমাকে বলে দেয় যে তোমাকে আমি জন্ম জন্ম ধরে চিনি। তোমার সাথে আমার গভীর নীবির সম্পর্ক, আর বলে তুমি আমার প্রাণের থেকেও আপন কেউ। … উত্তর তো নেই আমার এই প্রশ্নের, কিন্তু হ্যাঁ, তোমার আলিঙ্গন আমাকে বড়ই অধিক আনন্দ প্রদান করে, যেন মনে হয় হারিয়েই যাই তোমার মধ্যে। তাই অনুরোধ করছি, একটিবার আরো তোমার আলিঙ্গনের সুখ প্রদান করো আম্মি”।
আম্মি আনন্দের সাথে আসনকে আলিঙ্গন করলে, আসন সমস্ত আলিঙ্গনের সময় চোখ বন্ধ করে আম্মির দেহের অত্যন্ত মধুর সুবাসকে, অত্যন্ত কোমল স্পর্শকে অনুভব করলেন। অতঃপরে বরণ বললেন, “আসুন রাজপুত্র আসন, আপনাকে দেবী দসীর কাছে নিয়ে যাই”।
আসন সহ সকলে সেখানে উপস্থিত হলে, বরণকে দেখে রক্ষী রাক্ষসীরা পথ ছেড়ে দিলে দেবী দসী আসনকে এসে আলিঙ্গন করলে, আসন দেবী দসীর থেকে না সেই পূর্বের স্নেহভাবও অনুভব করলেন আর না তাঁর অঙ্গ থেকে সেই সুবাস। দেবী দসীর থেকে পূর্বে যেই সুবাস পেতেন আর তাঁর আলিঙ্গনে যেই অনুভবও পেতেন তা যেন বিশেষ কিছু গুণ অধিক মধুর আর স্নেহভাব নিয়ে সম্মুখে এসেছিলেন তাঁর কাছে যখন তিনি আম্মিকে আলিঙ্গন করেছিলেন। তবে কি আম্মিকে আলিঙ্গনের কারণেই দেবী দসীর আলিঙ্গনের ভাবকে ফিকে লাগছে?
এমন বিচার করে, দেবী দসীকে পুনরায় আলিঙ্গন করলেন আসন। দেবী দসীকে আলিঙ্গনের সময়ে তাঁর মধ্যে কেমন যেন স্বামীভাব কম আর পুত্রভাব অধিক থাকতো। একই হয় যখন আম্মিকে আলিঙ্গন করে। আসনের তো মানতেও ইচ্ছা হয়না যে আম্মি তাঁর প্রায় সমবয়সী। যেন তাঁর অন্তরমন বলে আম্মি তাঁর জননীই। যদি এই জন্মে নাও হয়, কনো না কনো জন্মে তো অবশ্যই তিনি তাঁর জননী ছিলেন। কেমন যেন তাঁর অঙ্গ থেকে জননীর উষ্মা লাভ করে সে। কিন্তু এখন দেবী দসীকে আলঙ্গন করার কালে না তো স্বামীর ভাব পাচ্ছেন আর না সন্তানের ভাব, যেন পিতার ভাব ভেসে আসছে তাঁর কাছে। কেমন যেন মনে হচ্ছে পুত্রীকে আলিঙ্গন করেছেন তিনি।
অঙ্গ থেকেও দসীর সুবাস বা আম্মির সুবাস পাচ্ছেনা, যেন পবিত্র মাটির গন্ধ ভেসে আসছে। এমন বিচার করে তিনি পুনরায় আলিঙ্গনের প্রয়াস করলেন দেবী দসীকে। এবার তিনি নিজের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে প্রথমে সজাগ রাখলেন, আর তারপর সমস্ত ইন্দ্রিয়কে স্তব্ধ করে দিয়ে হৃদয়দ্বারা অনুভব করে দেখলেন। না, সেই একই মাটির গন্ধ, সেই একই পুত্রীকে আলঙ্গিনের ভাব। কি হচ্ছে এসব। এসব কনো মায়া নয়তো!
আম্মি আসনের মধ্যে বিরাজমান অসহজভাব দেখে কাছে এসে বললেন, “সখা, রক্ষদের কাসে সিলেন তো এতকাল। তা কিসুতো তাঁদের প্রভাব এসেছেই। তুমি এক কাজ করো, সখী দসীকে শুদ্ধকরন করতে দাও। আমি নিজে তাঁকে শুদ্ধ করে তুলবো”।
আম্মি তাঁর মনের ভাব বুঝে গেছেন দেখে আনন্দিত হয়ে আসন বললেন, “বেশ, তাই করো আম্মি। আমি বরং ডঙ্কার নতুন রাজাকে সিংহাসনে বসিয়ে আসি। রাজ্য রাজা ছাড়া কেন থাকবে। বরণই রাজসিংহাসনে বসবেন”। সকলে সেই কথাতে সম্মত হলে, সকলে মিলে বরণকে রাজসিক স্নান করাতে নিয়ে গেলেন।
একই সময়ে শুদ্ধকরন করানোর কালে, দেবী শ্রী এলেন এবং দেবী ধরিত্রী দেবী দসীর দেহত্যাগ করতে উদ্যত হলে, দেবী শ্রী আম্মিকে দেখে চমকিত হয়ে বললেন, “দেবী তুমি? … তুমি এখানে?”
আম্মি হাস্যমুখে বললেন, “যেই উদ্দেশ্যে তুমি আসনের কাছে এসেছিলে, আমিও সেই একই উদ্দেশ্যে এসেছিলাম। শুধু পুত্রসঙ্গ পেতে নয়, পুত্রকে রক্ষা করতে আর, পুত্রের বল তাঁর শত্রুদের দেখাতেও সঙ্গে জুড়েছিলাম”।
এই কথা বলার কালে আম্মির চোখে জল দেখে দেবী শ্রী সম্মুখে এসে বললেন, “দুঃখ পেও না। সে এখনো সম্পূর্ণ ভাবে সপ্তচেতনাযুক্ত হয়নি। তাই সে তার নিজের মাতাকে চিনতে পাচ্ছেনা। আমাকেও চিনতে পারেনি সে। তবে হ্যাঁ, আমার অঙ্গের গন্ধ, আর আমার স্পর্শকে সে অতি পরিচিত আর অতি আপন বলে চিহ্নিত করেছে। যদি আমার ক্ষেত্রেই এমন করে থাকে, তবে তোমার ক্ষেত্রে তো তা করেই থাকবে। … সঠিক সময়ে সে সমস্ত কিছু জেনে যাবে দেবী। জানি, মা হয়েও মা ডাক সন্তানের মুখ থেকে শুনতে না পেলে, মায়ের কতই না বেদনা জন্ম নেয়। আমারও জন্মেছে। তবে পুত্রের সঙ্গ তো লাভ করেছি! … আমাদের পুত্র সুচরিত্রের, উন্নত মনের, এবং শ্রেষ্ঠ চেতনার হয়ে উঠছে, সেটা দেখে দেখেই আনন্দ অনুভব করেছি। এক মায়ের কাছে এর থেকে বড় প্রাপ্তি কিই বা আর হয় বলো?”
আম্মি হেসে বললেন, “তুমি পুনরায় দসীর দেহে প্রবেশ করতে চলেছ, তাই তো?”
দেবী শ্রী বললেন, “আসলে, ধরিত্রীই এসে আমাকে সংবাদ দেয় যে রমণপুত্র মেঘকবচ আর তাঁর পত্নী আমাকে অপহরণ করতে আসছে। তাই আমাকে দসীর দেহ ত্যাগ করে, তা তাঁকে হস্তান্তর করে চলে যেতে বলে, আর বলে যে তুমি নাকি স্বয়ং সেই নির্দেশ দিয়ে ওকে প্রেরণ করেছ”।
আম্মি হেসে বললেন, “শ্রী, ধরিত্রীর সৃজনই হয়েছে সে মৃষুর পত্নী হবে বলে। জানি মাতার থেকে অধিক লোভী কেউ হয়না। কিন্তু সেই লোভের জন্য কারুর অধিকার কেড়ে নেওয়াও তো ঠিক নয়। … তুমি বরণের কাছে যাও শ্রী। তার সাথে ফিরে যাও দুধেশ্বরের কাছে”।
শ্রী অস্বস্তিতে স্থিত হয়ে বললেন, “সেখানে যেতে আমার ভালো লাগেনা দেবী। আমার পুত্রকে ছেড়ে থাকতে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে। আর তাছাড়া … পীতাম্বরের স্পর্শ আমার কাছে বিষের মত লাগে। যেন মনে হয় পরপুরুষ আমাকে স্পর্শ করার প্রয়াস করছে”।
আম্মি হেসে বললেন, “স্পর্শ সে করতে চাইলেও তো স্পর্শ করতে পারেনা তোমাকে। তোমাকে স্পর্শ করতে গেলেও তাঁর হাতে যেন শূলফুটছে, এমন বোধ হয় তার। … তাই ফিরে যাও তাঁর কাছে, আর তাঁর চরণ সেবা করে, তাঁর সর্বাঙ্গকে শূলের আঘাতে বেদনাগ্রস্ত করে দাও। … সঙ্গে সঙ্গে, তাঁর মধ্যে তোমাকে দাসী করে রাখার ভাব রয়েছে, সেই ভাবকেও তো বিস্তৃত করো। তোমাকে ধারণ করেই সে সমস্ত মায়ার অধীশ্বর। আর সেই মায়ার অধীশ্বর হয়ে সে নিজেকে ভগবান মনে করছে। … শ্রী তাঁকে সেই ভগবান হবার ভাবে আসক্ত করে দাও, যাতে যেদিন তাঁর থেকে শ্রীকে আমি ছিনিয়ে নেব, সেদিন সে অসহায় হয়ে যায়, ঠিক সেই রকম অসহায় যেই রকম অসহায় এই মা হয়েছিল, তাঁর পুত্রকে বিনষ্ট করে দেবার কালে”।
“শ্রী, ত্রিমূর্তি আমাকে বশ করতে চেয়েছে, আমি একটি কথাও বলিনি। সহ্য করে নিয়েছি, যেন বুঝতেই পারছিনা কিছু, এমন ভান করে থেকেছি। কিন্তু তারা আমার পুত্রকে আঘাত করেছে। আমার পুত্রকে বিনষ্ট করতে চেয়েছে। না, তাঁরা জীবনভর এবার আমার তপস্যা করলেও, আমার থেকে ক্ষমা লাভ করবে না। সার্বিক ভাবে তাঁদেরকে ধ্বংস করে দেব। পুত্রের উপর আঘাত মানে, সে মাতার শত্রু হয়ে গেল”।
“আমি ঈশ্বর, স্বয়ং ব্রহ্ম, তাতে আমার কিছু আসে যায় না। কিন্তু আমি মাতা, এতে আমার আসেও যায়ও। আমার মাতৃত্বে যখন তারা আঘাত করেছে, তখন এবার তাদেরকে তাদেরই ব্রহ্মাণ্ডে কৃতদাস করে রেখে দেব। … সেই কাজের জন্যই বলছি, বরণের কাছে যাও আর তার সাথে দুধসাগরে চলে যাও। উচিত সময়ে তোমাকে পুনরায় নিজের মধ্যে ফিরিয়ে নেব শ্রী। জিতেশের বাণে তোমার সৃজন হয়নি শ্রী, সেই কথা তুমিও জানো। তোমার আর শ্বেতার সৃজন আমি করেছি, পীতাম্বর আর শ্বেতাম্বরকে তোমাদের প্রতি আসক্ত করে, তাদের থেকে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে তাঁদেরকে তাঁদেরই আসক্তির জ্বালায় ভস্ম করে দিতে”।
দেবী শ্রী বললেন, “আর রমনাথ? তাঁর কি হবে দেবী?”
আম্মি হেসে বললেন, “আসল নাটের গুরু তো সে-ই। পীতাম্বর আর শ্বেতাম্বরের সৃজন তো সেই করেছে দেবী। এঁরা পীড়িত হলে, তাঁরা তো তাঁরই মধ্যে পুনরায় ফিরে যাবেন। পরে তো তিনিই থাকবেন। দুর্গের নাশও তিনিই দেখবেন, আর নাশের পর তাঁর পরিণতি নিশ্চয় করবে আমাদের পুত্র”।
দেবী শ্রী হেসে বললেন, “তুমি সবই জানতে যখন তখন দসী হয়ে আমায় জন্ম নিতে আটকালে না কেন?”
আম্মি হেসে শ্রীর গালে স্নেহের হাত রেখে বললেন, “শ্রী, তুমি তো আমারই অঙ্গ। আমি জানিনা তুমি পুত্রের সঙ্গ পাবে বলে কতটা ছটফট করছো? তাই তো তোমাকে আটকাই নি। কিন্তু পুত্রের সঙ্গ তুমি লাভ করেছ ইতিমধ্যে। এবার ফিরে যাও”।
দেবী দসীর বেশে থাকা দেবী ধরিত্রী এবার আম্মির কাছে এসে, করজোড়ে বললেন, “আমার জন্য কি আদেশ মাতা”।
আম্মি হেসে বললেন, “স্বামীর সাথে ঘর করো, তোমার মধ্যে তোমার স্বামী সন্তানকে দেখতে পায়। আমার পুত্র সে, আমি জানি, সে দুটিই ভাবকে চেনে, মা আর কন্যা। আর অন্য কনো ভাবকে সে চেনেও না, আর গুরুত্বও দেয়না। কিন্তু তোমাকে তোমার স্বামীর উপযুক্ত কন্যা হয়ে উঠতে হবে। আর এই এক বেশে তুমি তাঁর উপযুক্ত কন্যা হয়ে উঠতে পারবে না। তাই তোমার নদীকে, প্রস্তরকে, আকাশকে আর মাটিকে আলাদা করে নাও। তবেই তুমি তাঁকে চারিপাশ দিয়ে বেষ্টন করতে পারবে, আর তাঁর সঙ্গ সঠিক ভাবে পাবে পুত্রী”।
দেবী শ্রী অন্যদিকে বরণের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, “আমাকে নিয়ে যাবার কনো প্রয়োজন নেই। আমি নিজেই দুধসাগরে যাচ্ছি। পুত্রের সঙ্গ পাবার ছিল, তা আমি পেয়েছি। তার বলও দেখে নিয়েছ তোমরা। সাবধান হয়ে যাও”।
বরণ সেই কথা শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলে, নিজের অন্তরেই বলে উঠলেন, “সর্পরমণ, কোথায় তুমি? তোমার বলির উপযুক্ত নরনারী অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। হরণ করো তাদেরকে”।
দেবী শ্রীকে বিদায় জানাচ্ছিলেন আম্মি, আর বরণের রাজতিলকের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আসন। এমনই সময়ে দেবী দসীর স্থানে ধূম্র দেখে চমকিত হয়ে যান আম্মি। আর সেই কালেই আসনের স্থানেও ধূম্র দেখা যেতে, ব্যস্ত হয়ে পরেন আসন ও জেরু। কিন্তু ব্যস্ত হয়ে গেলে কি হবে, না তো নিজের স্থানে দেবী দসী রইলেন আর না আসন। আম্মি নিজের চোয়াল শক্ত করে নিলেন। আর একটি বিকট লম্ফ দিলেন।
অন্যদিকে বরণ উত্তেজিত হয়ে বললেন, “নিশ্চিত ভাবে সর্পরমণ জেগে উঠেছে। সে টেনে নিয়ে চলে গেছে আসনকে। কিন্তু তাঁর ডেরা কোথায়, তা কেউ জানেনা। তাই সেখানে যাওয়াও সম্ভব নয়। সেই কথা শুনে জেরু হন্তদন্ত হয়ে “আম্মি! আম্মি!” বলে হাঁক দিয়ে অস্থির হয়ে গেলেও আম্মির কনো সারাশব্দ নেই। সেই দেখে অন্দরমহলে জেরু গেলে সেখানেও দেখলেন আম্মি নেই।
বরণ বুঝলেন যে আসন ও দসী, উভয়কেই সর্পরমণ নিয়ে চলে গেছেন নিজের ডেরায়, কিন্তু আম্মি কোথায় গেলেন!
আম্মিও যে ঠিক সেইখানেই গেছিলেন যেখানে আসন আর দসীকে অপহরণ করে নিয়ে গেছিলেন সর্পদমন। সর্পরমণ জানতেও পারলেন না যে আম্মিও সেখানে উপস্থিত। তিনি নিজের উপস্থিতির ভানও প্রদান করলেন না। তাই নিশ্চিন্তে নিজের বলির কাজে ব্যস্ত রইলেন সর্পদমন। দসী ও আসন দুইজনেরই হাত পা মুখ বাঁধা। তাই অস্থির হয়েও তাঁরা কিচ্ছু করতে পারলেন না।
এমনই সময়ে সমস্ত বলির আয়োজন শেষ করে, বিকট গলায় সর্পরমণ এক হাস্য প্রদান করে হুংকারের সাথে বললেন, “স্ত্রীর উদ্ধার করতে এসে মহান হয়ে গেছিলে তাই না আসন। তাই তোমার চোখের সামনে আগে তোমার স্ত্রীরই বলি দেবো। তারপর তোমার”।
মাথা ভর্তি সিঁদুর লেপন করে দসীকে বলির কাষ্ঠে মাথা রেখে নিজের খড়গ তুলে আঘাত করলেন। কিন্তু তারপর যা হলো, তা সর্পরমণ দেখতে পেলো না, কিন্তু আসন দেখতে পেলেন। দেবী দসীর দেহ থেকে একবিন্দুও রক্ত স্খলিত হয়নি। কিন্তু তাঁর থেকে একটি অন্য দেহ নির্মিত হয়ে গেছে।
সেই দেহ আসনের নিকটে এসে তাঁর বন্ধন খুলে দিলেন। সেই সময়ে সর্পরমণ আবিষ্কার করলেন বলির কাঠে জীবিত দসী। তাই চমকিত হলেও, পূর্ণ ক্রোধের সাথে দ্বিতীয়বার আঘাত করলেন দসীকে। কিন্তু তাতেও দসীর নাশ হলো না। বরং আরো একটি দসীর নির্মাণ হয়ে গেল। পুনরায় দসীর উপর আঘাত করলে, চতুর্থ দসীর নির্মাণ হয়ে গেল। আর সেই অবস্থায় আসনের বন্ধন খুলে দেওয়া হয়ে গেলে, আসন পূর্ণ বেগে সর্পরমণকে পদাঘাত করলে, হাত থেকে খড়গ ছিটকে পরে গিয়ে, সর্পরমণ ভূমিতে আছরে পরলেন।
উঠে দাঁড়িয়ে সর্পরমণ দেখলেন, চার চারটি দেবী দসী। বিরক্ত আর ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, “মায়া হয়েছে আমার সাথে। … আহ:!! … মায়াপতির সাথে মায়া! … এই বলে আসনকে সরাসরি বাহুবলে আক্রমণ করলেন সর্পদমন। দেহবলে আসনের সাথে যে ত্রিমূর্তিও পারবেন না। আসন সর্পরমণের দেহকে বারংবার ভূমি থেকে তুলে তুলে পুনরায় ভূমিতে ফেলে দিলেন। সর্পদমনের সমস্ত দেহ লহুপূর্ণ হয়ে গেছে। সে এও বুঝে গেছে যে মায়াবল ছাড়া কিছুতেই পেরে উঠবে না সে আসনের সাথে।
তাই নজর দিলো সে নিজের খড়গের দিকে। নিজের দেহের প্রগতিকে সর্পের ন্যায় করে নিয়ে ভিম্রি খাইয়ে দিলো আসনকে আর নিজের খড়গ তুলে নিলো সে। এরপর শুরু হলো মায়ার বিস্তার। এই সে দৃশ্যমান তো এই সে অদৃশ্য। দেবী দসী তাঁর স্বামীকে নাজেহাল হতে দেখলেন, আর দেখলেন সর্পদমন দৃশ্যতা আর অদৃশ্যতার মায়া রচনা করে পিছন থেকে এসে আসনকে আঘাত করছে।
সেই দেখে, এবার বলির স্থানে পরে থাকা আরো একটি খড়গকে তুলে নিলেন তিনি আর আসনের পিছনে গিয়ে অবস্থান করলেন। যখন পিছনে উদিত হয়ে সর্পরমণ আঘাত করার প্রয়াস করলো আসনকে, দসী সজোরে আঘাত করলো সর্পদমনকে সেই খড়গ দিয়ে। আর শুধু তাই নয়, বাকি তিন রূপে বিদ্যমান দেবী দসী, মুষ্ট্যাঘাত ও পদাঘাত দ্বারা এমনই ভাবে আঘাত করলেন সর্পরমণকে যে, তাঁর হাত থেকে খড়গ পুনরায় দূরে চলে যায়।
মায়াশক্তি চলে যেতে, দেবী দসী নিজের হাতের খড়গ আসনের হাতে দিয়ে দিতে, আসন সরাসরি সর্পদমনের গলে খড়গ চালালে, সর্পদমনের মুণ্ড তাঁর দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায়। সেই দেখে আসন নিশ্চিন্ত হলে, দেবী দসী বললেন, “স্বামী, এই দুষ্ট মায়াবীর প্রাণ ওর খড়গে আছে। ওর খরোগের নাশ করুন প্রথম। আসন কথার মধ্যে যুক্তি লাভ করে, সর্পদমনের খড়গকে একাধিক টুকরো করতে থাকলে, প্রতিটি টুকরো করার সময়ে সর্পরমণের মুণ্ড আর্তনাদ করে উঠলো। অবশেষে দেবী দসীর কথাই সঠিক অনুভব করে, সর্পরমণের খড়গ দিয়েই তাঁর মস্তকে আঘাত করলে, খড়গ ও মস্তক দুইই অগ্নিবিস্ফোরণের ন্যায় বিস্ফোরিত হয়ে নষ্ট হয়ে গেলে, আসন ও দেবী দসীর চার রূপ প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে রমণের প্রাসাদে।
সেই দেখে চমকিত হলেন সকলে আর বিশেষ করে বরণ। জেরু ও বসন আসনের কাছে এসে তার কুশলতার সন্ধান করতে, চারিপাশে দেখে আসন বললেন, “এর অর্থ সর্পরমণ কখনোই কোথাও যায়নি। এই প্রাসাদেই অদৃশ্য হয়ে থাকতো সে। চার চারটি দেবী দসী দেখে বসন বললেন, “আপনার এই অবস্থা কি করে হলো?”
দেবী দসী বললেন, “জানি না ভাই। সর্পরমণ আমাকে বলি দেবার জন্য আঘাত করতে থাকলো, আর আমি এক থেকে দুই হয়ে গেলাম। তিনবার আঘাত করলেন, আর আমি চার … চার … চার!”
বসন বললেন, “চার…! … হ্যাঁ তারপর বলুন”।
দেবী দসী বসনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কেউ আমাকে চার হয়ে যেতে বলেছিলেন। আম্মি কই? তাঁকে তো দেখতে পাচ্ছিনা!”
বসন আর জেরু বললেন, “আমরাও তো তাঁকে খুঁজছি। তোমরা লুপ্ত হবার পর তো তিনিও লুপ্ত হয়ে গেছিলেন”।
দেবী দসী ক্রন্দনের স্বরে বললেন, “আম্মি! … আম্মি তুমি কই! … আমাকে চার হতে বললে, আর সর্পরমণের আঘাতকে কাজে লাগিয়ে আমাকে চার করেও দিলে। তারপর কোথায় গেলে!”
আসন এই সমস্ত কথা শুনে এদিক সেদিক “আম্মি! আম্মি!” বলে সন্ধান করতে থাকলেন তাঁর। কিন্তু না পেয়ে, অনুসন্ধান করতে করতে নির্গত হয়ে গেলেন। রাত চলে গেল, পরের দিন চলে গেল। আরো চার দিন চলে গেল আম্মিও আর ফিরলেন না, আসনও আর ফিরলেন না।
বসন চারচারজন দেবী দসীকে সঙ্গে নিয়ে ওযু ফিরে গেলেন। বরণও চলে গেলেন সপ্তধনুশে আর জালেম জেরুকে রাজা করে দিলেন জালিমার, ডঙ্কা যার হলো রাজধানী।
মৃষুর দ্বিতীয় কলার প্রকাশ হলো পূর্ণ ভাবে। পূর্ণ ভাবে পরিচয় হলো এবার তাঁর জননীর সাথে। আর দেবী শ্রী নিজের দায়িত্ব সম্পূর্ণ বুঝে নিয়ে, পুত্র মৃষুকে অতি নিকট থেকে লাভ করে, তাঁকে পূর্ণ স্নেহ প্রদান করে দুধসাগরে ফিরে গেলেন, আর যেমন যেমন দেবী গৌরি তাঁকে বলেছিলেন, ঠিক তেমনই ভাবে সেখানে তিনি বিরাজ করতে থাকলেন। আর অন্যদিকে ত্রিমূর্তি স্পষ্ট ভাবে জেনে গেলেন যে পরাপ্রকৃতির সন্তানের নাশ হয়নি। বরং সেই সাত কলার কিছু কলা নিশ্চিত ভাবে জীবিত, আর তারা নিজেদের স্বরূপ লাভ করছে ধীরে ধীরে।
প্রশ্ন করলেন পীতাম্বর রমনাথের উদ্দেশ্যে, “কিছু কিছুই বেঁচে আছে তো? নাকি সমস্ত সাত কলাই বেঁচে আছে? … স্মরণ করে দেখুন, আসনের আম্মি কিন্তু মেঘকবচকে সাতটুকরো করেই ফিরিয়ে দিয়েছিল, কম টুকরো ছিল না তাতে, আর এবার এটা বলবেন না যে, আপনারা বুঝতে পারেন নি যে তিনিই পরাপ্রকৃতি”।
রমনাথ একটি কথাও না বললে, শ্বেতাম্বর বললেন, “কি ব্যাপার প্রভু, আপনি যে কিছু বলছেন না!”
রমনাথ বললেন, “তাঁর সাখ্যাত প্রহার আমি লাভ করেছি। প্রকাণ্ড তিনি, যেন সমস্ত শক্তির উৎসই তিনি। পুত্রের বিয়োগের পর তিনি রমবনে ফেরেননি। এখানে এসে তো দেখছি, ষণ্ডরাও আর নেই এখানে। তারাও কি তাঁর সন্ধান লাভ করে এখান থেকে চলে গেছেন?… এবার কি তাহলে আমাদেরকে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে? যদি মানব বেশেই এমন শক্তি হয় তাঁর, তাহলে প্রকৃতি বেশে তিনি তো অসম্ভব সহনীয়”।
পীতাম্বর বললেন, “আমি তো আসনের কথা চিন্তা করছি। যদি সে সাত কলার একটিই কলা হয়, তার পূর্ণ সাতকলার সামর্থ্য ঠিক কতখানি! … প্রভু, অসম্ভব বল তার। আর তার থেকেও অধিক মাতৃভক্তি। আম্মি আর আসনের রসায়ন দেখে আমি নিশ্চিত যে আসন তাঁকে মা বলে চেনে না। অর্থাৎ আসন দেবী অম্বিকার কাছে নয়, অন্যত্র কোথাও বেড়ে উঠছে। আর তাই সে মা’কে চেনেনা। এবার কথা এই যে, যদি মা’কে না চেনার পরেও মায়ের প্রতি এমন আকর্ষণ হয়, মা’কে চিনলে কি হবে!”
