২.২। লুপ্তশ্রী পর্ব
দেবী দসীকে দেখা মাত্রই রমণ সনাক্ত করে ফেললেন তাঁকে শ্রী রূপে। ফিরে গেলেন তিনি মেঘকবচ আর করনকে সঙ্গে নিয়ে। ফিরে গিয়ে বরণকে প্রশ্ন করলেন তিনি, “দেবী দসী ওযুর রাজপুত্র যেই আসনকে বিবাহ করেছেন, সেই বিবাহ সম্ভব হলো কি করে? আমাকে বিস্তারে বলো সেই কথা বরণ”।
বরণ বললেন, “ভ্রাতা, এই সমস্ত কিছুর সূত্রপাত হয়, এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে। রাজা জন্মদ ও দেবী দসী ওযু রাজ্যের শরণে আসেন। সেখানে আসনের সাথে দেবী দসীর আলাপ, আর দেবী দসী স্বয়ং আসনকে বিবাহ করার জন্য প্রেরিত করেন। অর্থাৎ এই বিবাহ দেবী দসীর ইচ্ছা অনুসারে হয়েছে, যাতে রাজপুত্র আসন সহমত প্রদান করেন”।
রমণ গম্ভীর ভাবে বললেন, “এবার প্রশ্ন হলো কেন? … কে এই আসন? এটা তো নিশ্চিত যে, অম্বিকার সন্তান সম্পূর্ণ ভাবে সমাপ্ত হয়নি। কারণ তাঁর সন্ধান করতেই তো শ্রী এখানে এসেছেন। কিন্তু প্রশ্ন এই যে সন্তানকে কি মাকে বিবাহ করতে পারে!”
করন ও বরণ উভয়েই ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “পুত্রকে মা বিবাহ করবেন? এও কি সম্ভব!”
রমণ উত্তরে মাথা নেড়ে বললেন, “সব কিছু সম্ভব। যেখানে প্রকৃতি বা তাঁর অংশ উপস্থিত, সেখানে সব কিছু হতে পারে। যেখানে পবিত্রতাই নিশ্বাস প্রশ্বাস, সেখানে সমস্ত সম্বন্ধই মাতা ও পুত্রের সম্বন্ধ”।
করন উত্তেজিত হয়ে গিয়ে বললেন, “তাহলে তো আমাদেরকে একবার শক্তিপরীক্ষণ করতেই হয় এই আসনের”।
বরণ বললেন, “কিন্তু শুনেছি আসন অত্যন্ত নিরীহ, এবং যুদ্ধবিরোধী”।
করন বললেন, “হতে পারে সে যুদ্ধ বিরোধী, কিন্তু যদি সে অম্বিকাপুত্র হয়, তাঁকে এক প্রকাণ্ড যোদ্ধা হতেই হবে, কারণ জিতেশের সাথে যুদ্ধ করানোর উদ্দেশ্যেই দেবী অম্বিকা এই পুত্রের সৃজন করেছিলেন”।
রমণ বললেন, “তাহলে এক উপায় করা যাক। … দেবী দসীকে আমরা অপহরণ করি। অপহরণ তো করতেই হবে তাঁকে। অপহরণ না করলে, তাঁকে মানাবো কি করে আমার সাথে দুধসাগরে যাবার জন্য। কিন্তু এই অপহরণ হলে, অবশ্যই আসনের যোদ্ধা সত্ত্বা বাইরে প্রকাশিত হবে, তখন তাঁর যুদ্ধবলকে পরীক্ষা করে নেওয়া সম্ভব হবে”।
করন বললেন, “উত্তম প্রস্তাব। রমণ আমার মতে মেঘকবচকে প্রেরণ করা উচিত তাঁকে অপহরণ করার জন্য”।
বরণ বললেন, “যেখানে আমরাই তাঁকে স্পর্শ করতে গিয়ে বিদ্যুৎপিষ্ট হই, সেখানে মেঘকবচ তো তাঁর কাছে যেতেও পারবেনা!”
রমণ বললেন, “উম হুম, দেবী শ্রী আসবেন না। কিছুতেই আসবেন না। বরণ তুমি বললেনা, তোমাকে এক দেখা দেখেই দসী সনাক্ত করে ফেলেছিলেন! … এর অর্থ, তিনি আমাদের সামনে এমনি ভাবে তো ধরা দেবেন না। … তাই মেঘকবচ অনায়সেই তাঁকে অপহরণ করতে সক্ষম হবেন। তবে বরণ, তোমাকে যেমন বললাম তেমন করো। আসন যখন দেবী দসীকে উদ্ধার করতে আসবে, তাঁর সহায়ক হয়ে, তাঁর কাছে থেকে তাঁকে পরখ করো, আর নিশ্চিত হয়ে নাও যে সে অম্বিকাপুত্রই কিনা। আর যদি সে কনো ভাবে আমাদের পরাস্ত করে দিতে পারে, তাহলে তুমি তাঁর সঙ্গী হয়ে থেকো। নিশ্চিত ভাবে দেবী দসী প্রত্যাবর্তন করবেন তখন, আর তোমাকে আসন তাঁর দায়িত্ব প্রদান করবে, আর তুমি তাঁকে নিয়ে সরাসরি দুধসাগরে উপস্থিত হবে”।
করন বললেন, “প্রস্তাব তো অতি উত্তম, কিন্তু আপনার মনে হয়ে যে অম্বিকার পুত্র আমাদেরকে পরাস্ত করতে পারবে? এতো সামর্থ্য তাঁর? একটু বেশিই গুরুত্ব দেওয়া হয়ে যাচ্ছে না তাঁকে?”
রমণ মিষ্ট হেসে বললেন, “প্রথম কথা তো এই যে আমরা জানিই না আদপে সে জীবিত কিনা। দ্বিতীয় কথা এই যে আমরা এও জানিনা যে তাঁর সামর্থ্য ঠিক কতখানি। তাই, আমাদের এখনই কনো মীমাংসায় না গিয়ে, তাঁকে পরখ করে নেওয়ার দিকে মনোনিয়োগ করা উচিত”।
করন বললেন, “বেশ, তাহলে মেঘকবচকে পাঠাও দেবী দসীর কাছে”।
একদিকে যখন রমণ, করণ ও বরণ এমন ষড়যন্ত্রের নির্মাণ করছিলেন, তখন অন্যদিকে আসন দেবী দসীর সংস্পর্শে সর্বক্ষণ থেকেও তৃপ্ত হতে পারেন না। দেবী দসী অপার প্রেম করেন তাঁকে, কিন্তু তবুও আসনের মধ্যে হতাশার অন্ত না হওয়াতে তিনি প্রশ্ন করেন, “আমার প্রেমে কি কনো খাদ আছে? তাহলে তুমি তৃপ্ত কেন হওনা!”
আসন উত্তরে বলেন, “জানিনা দেবী। আপনার অঙ্গের সুবাস আমার কাছে অত্যন্ত পরিচিত হয়েও যেন অপরিচিত। আপনার স্পর্শসুখ আমার কাছে জানা হয়েও অজানা। কেন যেন মনে হয় যে, আপনার এই স্পর্শ, আপনার অঙ্গের সুবাস, এমনকি আপনার প্রেমও আমি পূর্বেও লাভ করেছি। আর তার থেকেও বড় কথা এই যে, আমার বার বার এই মনে হয় যেন সেই সমস্ত কিছু লাভ করে আমি পূর্বেও তৃপ্ত ছিলাম না। যেন এই সমস্ত কিছু সেই সুবাসের অংশ বিশেষ, যার জন্য আমার প্রাণ সর্বক্ষণ ক্রন্দন করে। যেন এই স্পর্শসুখ সেই স্পর্শসুখের এক অংশ বিশেষ, যা লাভ না করে, আমার জীবনকেও মৃত্যু মনে হয় সর্বক্ষণ”।
অন্তরে ক্রন্দন ধারণ করে আসন বললেন, “কেন মনে হয় দেবী এমন? আমি সর্বক্ষণ অনুশোচনার মধ্যে থাকি। এই অনুশোচনা হতে থাকে আমার যে, আপনার এতো প্রেম, এত স্নেহ, সমস্ত কিছুকে আমার এই মনে হওয়া অপমান করে চলেছে সর্বক্ষণ। চোখে চোখ রাখতে পারিনা আপনার। ভয় হয়, আমাই যে অপমান আপনাকে করে চলেছি সর্বক্ষণ, তা যদি আপনি দেখে ফেলেন! … যদি তা দেখে আপনি মনে আঘাত পান!”
দেবী দসী স্নেহের হস্ত আসনের অঙ্গে স্থাপন করে, হেসে বললেন, “আমার মনে হয় তোমার যা মনে হয়, তা সঠিকই মনে হয়। না না, মনে হয় বলা বেঠিক হবে, আমার বিশ্বাস যে তোমার যা মনে হয়, তা সঠিক মনে হয়। তবে আমার এও বিশ্বাস যে এই অপূর্ণকে পূর্ণ একমাত্র তুমিই করতে পারবে। হ্যাঁ, সঠিক বলছি, তোমার মন লাগতে বলছিনা। সত্য বলছি, আমারও নিজেকে অপূর্ণই মনে হয়। আমারও সর্বক্ষণ এই মনে হয় যে, আমি তো তোমাকে পূর্ণ ভাবে প্রেম প্রদানই করতে পারিনা। সত্য বলতে আমারও কষ্ট হয়, ভয় হয় তোমার চোখে চোখ মেলাতে, পাছে আমার অন্তরের এই অপূর্ণতা আর এই অপূর্ণতার কারণে জন্ম নেওয়া বেদনা আর শ্লাঘা তোমার নজরে এসে যেতে, তুমি আমার বিরহের অনুভব করে কাতর হয়ে যাও, তাই”।
এমনই সময়ে, বসন, ভরন ও পোষণ কক্ষের সম্মুখে এসে বললেন, “ভ্রাতা আসন, পিতা তোমাকে ডেকেছেন, আর দেবী দসী, আপনাকে একবার রসুইঘরে ডেকেছেন, আপনি কনো ব্যঞ্জন নির্মাণ করতে বলেছেন, তার স্বাদ পরীক্ষা করার জন্য”।
আসন কক্ষ থেকে চলে গেলে, ভাবুক ভাবে দেবী দসী প্রস্থান করতে চাইলে, সেই সময়ে সম্মুখে এসে উপস্থিত হন, দেবী ধরিত্রী। অশরীরী অবস্থায় দেবী ধরিত্রীর চেতনাকে প্রত্যক্ষ করে, বাৎসল্যরসে সিক্ত হয়ে দেবী দসী বললেন, “ধরা, তুমি এখানে। কেমন আছো তুমি পুত্রী! কতকাল তোমাকে দেখিনি। … আমি তো বন্দিনী হয়ে গেছিলাম! হ্যাঁ কর্তব্যের খাতিরে তা হতেই হতো, কিন্তু তোমাদের কারুকে দেখতে না পেয়ে, বড় অসহায় লাগে সেখানে”।
দেবী ধরিত্রী বললেন, “মাতা, তাঁরা আবার আসছেন, আপনাকে অপহরণ করতে। … আপনি আপনার এই দেহ আমাকে প্রদান করে, আপনি অম্বালোকে চলকে যান। সেখানে আমার মাতারা আর নিসাধরাজ আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। … কৃপা করে সেখানে চলে যান। … অপহরণ করবে তাঁরা, কিন্তু আপনার নয়, আমাকে অপহরণ করবে”।
দেবী দসী উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “কিন্তু তাঁদের কাছে আমি তোমাকে কি করে ছেড়ে দিই পুত্রী?”
দেবী ধরিত্রী বললেন, “তাঁরা আপনার এই তনুকে কিছুতেই নষ্ট হতে দেবেন না, কনো ক্ষতি হতে দেবন না এই তনুর। তাই তাঁরা আমাকেও কনো প্রকার আঘাত করবেন না। … আর আপনার আসনও চুপ করে বসে থাকবেন না। নিশ্চিত ভাবে তিনি আপনাকে উদ্ধার করতে যাবেন সেখানে। তাই নিশ্চিন্ত থাকুন”।
দেবী দসী বললেন, “না না, তা কি করে হতে দিই আমি। মৃষু সেখানে একাকি গেলে, তাঁরা তিনজন মিলে তো তাঁকে ছিঁড়ে খাবে! … না না, সে এখনও বালক। তাঁকে এই সংকটের মুখে কি করে ফেলে দিয়ে চলে যাই! কেমন মাতা আমি যে সন্তানকে এমন অসহায় ভাবে ছেড়ে চলে যাবে?”
দেবী ধরিত্রী বললেন, “মাতা, আমাকে এখানে স্বয়ং মাতা অম্বিকা পাঠিয়েছেন। তাঁরই নির্দেশে আমি এখানে এসেছি। তিনি বলেছেন, তিনি থাকতে তাঁর পুত্রকে কেউ স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারবেনা। তাই নিশ্চিন্ত হয়ে যান মাতা। পরাপ্রকৃতির কাজে আমাদের সহায়ক হওয়া উচিত, বাঁধা নয়, তাই না!”
দেবী দসী আর একটিও কথা বললেন না, মাতা অম্বিকার আদেশ শ্রবণ করার পর। তিনি নিজের তনু দেবী ধরিত্রীকে প্রদান করে, ওযু রাজ্য থেকে সরাসরি ফিরে গেলেন অম্বালোকে, দেবী গগনির কাছে। তো দেবী গগনি বললেন, “দেবী এখানে আপনি সম্পূর্ণ ভাবে সুরক্ষিত। ত্রিমূর্তি এখন দেহ ধারণ করে রয়েছেন, তাই তাঁরা ত্রিকাল তো দর্শন করতে পারছেন না। আর তাই তাঁরা এই অম্বালোকে কে রয়েছেন, কি করছেন, কিচ্ছু জানতে পারছেন না”।
দেবী শ্রী বললেন, “কিন্তু আমার পুত্র মৃষু!”
দেবী গগনি হেসে বললেন, “দেবী, তাঁর সৃজন তখন হয়েছে যখন আপনি ও দেবী শ্বেতা মাতা অম্বিকার থেকে পৃথক হয়ে যাননি। তাই তাঁর সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার কনো কারণ নেই। আর মাতা অম্বিকা স্বয়ং তাঁর সহায়ক হবেন, এমন অঙ্গিকার করে ধরাধামে গেছেন। তাই নিশ্চিন্ত হয়ে যান মৃষুকে নিয়ে। মাতা তাঁর পুত্রের কনো ক্ষতি হতে দেবেন না। তিনি পরাপ্রকৃতি। কিন্তু যদি তা নাও হতেন, তাও ক্ষতি হতে দিতেন না। ত্রিমূর্তিই হোক আর তাঁদের নির্মিত দুর্গই হোক, তিনি মা। আর মা থাকতে সন্তানের অঙ্গে একটি ঘাত করার সামর্থ্যও কারুর নেই”।
অন্যদিকে, দেবী ধরিত্রী দসী হয়ে রন্ধনশালার দিকে গেলে, এক রাঁধুনি স্ত্রী তাঁর কাছে এসে বললেন, “দেবী, এদিকে আসুন, দেখুন কি করেছি আমি আপনার জন্য”।
দেবী দসী হাস্য মুখে নদীর তীরবর্তী সেই স্থানে গেলে, এক সময়ে আবিষ্কার করলেন যে তাঁকে সর্বদিক থেকে ঘিরে রাখা হয়েছে। সেই রাঁধুনি স্ত্রী এবার মেঘকবচের স্ত্রী, কুদৃষ্টি হয়ে গেলেন, আর অট্টহাস্য হেসে বললেন, “কি অসহায় হয়ে পরে এই দেবীরা যখন তাঁদের সাথে কেউ ছল করে, তাই না স্বামী?” মেঘকবচ সম্মুখ এসে বললেন, “পিতার আদেশ, আপনাকে ততক্ষণ স্পর্শ না করা, যতক্ষণ না আপনি বাধ্য করবেন আমাকে আপনার উপর জোর প্রয়োগ করতে। তাই স্বেচ্ছায় আমার বিমানে উঠুন। আপনাকে আমাদের সাথে ডঙ্কারাজ্যে নিয়ে যাবো”।
দেবী দসী ক্রন্দনের সুরে উগ্রস্বরে বলে উঠলেন, “আসন! কোথায় তুমি! আমাকে অপহরণ করতে দস্যুরা এসেছে”।
ওযুর প্রাসাদ থেকে এতটাই দূরে অবস্থান করলছিলেন সেই মুহূর্তে দেবী দসী যে তাঁর কণ্ঠস্বর আসন পর্যন্ত পৌঁছল না। কিন্তু আসনের কান পর্যন্ত না পৌঁছালেও, এক রজক সেই সময়ে নদীর জলে বস্ত্র ধৌত করছিলেন। তিনি সেই কথা শুনতে পেয়ে, তড়িঘড়ি করে ওযুপ্রাসাদের দিকে ছুটে গেলেন তিনি। নিজের সঙ্গে সেই রজক আসন ও তাঁর ভ্রাতা বসনকে আনলেনও, কিন্তু ততক্ষণে মেঘকবচ অপহরণ করে নিয়ে চলে গেছেন দেবী দসীকে।
আসন প্রমাণও পেলেন যে দেবী দসীর অপহরণ হয়েছে। নদী তটে দেবী দসীর চিকুরগহনা পরে ছিল। কেশ আকর্ষণ করে বল প্রয়োগের কালে, তাঁর মাথা থেকে এই গহনা খুলে যায়, এমন অনুমান করেন আসন। সেই দেখে, গহনা হাতে ধারণ করে, হতাশ হয়ে আসন বসে পরলে। বসন তাঁকে সান্ত্বনা দেবার প্রয়াস করেন। বেশ কিছুক্ষণ চোখের জলে দেবী দসীর থেকে লব্ধ প্রেম, স্নেহ ও মমতাকে স্মরণ করলেন আসন। তারপর দৃঢ়কণ্ঠ হয়ে রজকের উদ্দেশ্যে বললেন, “কেমন দেখতে ছিলেন তাঁরা! কিসে করে এসেছিলেন তাঁরা? তরীতে করে? কেমন দেখতে ছিল সেই তরী?”
রজক বললেন, “রাজপুত্র, তাঁরা বিমানে করে এসেছিলেন। যিনি এসেছিলেন তাঁর সাথে এক স্ত্রীও ছিলেন। দুইজনেই বেশ বলশালী রক্ষদের মত দেখতে। সেই বিমানে দেবী দসীকে তুলতেই প্রয়াস করছিলেন তাঁরা। তখনই আমি তাঁদেরকে দেখি, আর আপনাকে খবর দিতে দৌড়ে যাই”।
আসন বললেন, “বিমান! … একমাত্র দণ্ড রাজ্যের রাজাদের কাছেই বিমান আছে বলে জানি। … এর অর্থ, যে বা যারা এসেছিলেন, তাঁরা দণ্ড রাজ্য থেকে এসেছিলেন। … ভ্রাতা বসন, দণ্ডরাজ্য কোন দিশায় জানো?”
বসন বললেন, “শুনেছি রুক্ষ মরুভূমি ঘেরা সেই স্বর্ণমণ্ডিত রাজ্য অভেদ্য। যে সেই দিকে যায়, হয় সে সেই রুক্ষ মরুভূমিতেই প্রাণ ত্যাগ করে, নয় দক্ষিণ দিকের অরণ্যে হিংস্র জন্তুর শিকার হয়, কিন্তু কেউ সেখানে পৌছাতে পারেনা। শুনেছি পশ্চিম দিকে তার অবস্থান, কিন্তু তার সঠিক সঠিক অবস্থান তো কেউ জানেনা। ত্রিভুবন বিজেতা রমণ সেখানের রাজা, আর শুনেছি ডঙ্কেশ স্বয়ং আর তাঁর ভ্রাতা করন নাকি অজেয়। কিন্তু এর অধিক তো কিছুই জানিনা”।
আসন ক্ষিপ্র বেগে রাজমহলে প্রবেশ করে নিজের ধনুর্বাণ ধারণ করে নির্গত হতে গেলে, রাজা সুরথ বসনের থেকে সমস্ত কিছু জেনে উৎকণ্ঠার সাথে আসনের পথ আটকে বললেন, “তুমি কি পাগল হয়ে গেছ পুত্র? আমি তোমাকে পুনরায় বিবাহ দেব। এবার এক নয় তিন তিন রাজকন্যার সাথে বিবাহ দেব। … তুমি দসীর চিন্তা ছেড়ে দাও। ডঙ্কা থেকে আজ পর্যন্ত কারুকে মুক্ত হতে দেখা যায়নি। সেখানে যাওয়ার অর্থ নিজের প্রাণ অর্পণ করে দেওয়া তাঁদেরকে”।
আসন মুখ গম্ভীর করে বললেন, “আমাকে না আটকে, রাজা জন্মদকে কি উত্তর দেবেন তাঁর কন্যার ব্যাপারে, সেটা চিন্তা করুন মহারাজ। আমি তো যাবোই। হ্যাঁ প্রাণ নাও থাকতে পারে, কিন্তু সেই প্রাণ থেকেও কি লাভ যে দেবী দসীর ন্যায় এমন পবিত্র স্ত্রীর রক্ষা করতে অক্ষম! … তাই যাবো তো আমি অবশ্যই। যদি প্রাণ থাকে তাহলে দেবী দসীকে নিয়ে ফিরবো, আর তা না হলে মৃত্যু লাভ করবো। কিন্তু প্রাণ থাকতে আমি খালি হাতে ফিরবো না”।
বসন, ভরন ও পোষণ বললেন, “আমরাও যাবো তোমার সাথে ভ্রাতা। সঙ্গে আমাদের সেনাও নিয়ে যাবো। রাজা জন্মদকে সংবাদ প্রেরণ করি আমরা। আমাদের কাছে তেমন সংখ্যক সেনা তো নেই। তাই যদি তাঁর সেনা আমাদের সাথে যাত্রা করেন, তবে আমরা নিশ্চিত ভাবেই সফল হবো”।
আসন বললেন, “না ভ্রাতারা, আমি যেখানে যাচ্ছি, সেখান থেকে আজ পর্যন্ত কেউ ফিরে আসেনি। তাই হয়তো আমিও ফিরবো না। এমন অবস্থায় পিতাকে আর ওযু রাজ্যকে নিঃসঙ্গ করে যাত্রা করা হলো চরম ভাবে স্বার্থপরতা আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। আর সেনার কথা বলতে, আমাদের এখানের সেনা সেই মরু অঞ্চলে যুদ্ধ না করেই প্রাণ হারাবে। তাই, তাঁদের নিয়ে গিয়ে তাঁদের প্রাণ সংকটে ফেলার কনো মানেই হয়না। … তোমরা এখানেই থাকো। আমি একাকীই যাবো”।
বসন বললেন, “না ভ্রাতা, তুমি একাকী তো যাবেনা কিছুতেই। যদি কারুকে না নিয়ে যেতে চাও, তাই হবে, কিন্তু আমি তোমার সাথে যাবো। যাত্রাপথে আমরা যোগ্য সেনার সন্ধান করবো যারা সেই মরুদেশে জীবন রক্ষা করতে পারবেন। কিন্তু তুমি একাকী তো কদাপি যাবে না”।
রাজা সুরথ ক্রন্দনে ভেঙে পরে বললেন, “একি অনাসৃষ্টি হয়ে গেল! … এক স্ত্রীর জন্য তুমি এতো বড় ঝুঁকি নিতে চলে যাচ্ছ আসন! তোমার কি মতিভ্রম হয়েছে!”
আসন নেত্র বন্ধ করে নিজের ক্রোধকে সম্বরণ করে বললেন, “সামান্য স্ত্রী! … পিতা, স্ত্রী কি করে সাধারণ হন? যেই স্ত্রী আমাদের রক্ষণ করেন সর্বক্ষণ, সর্বক্ষণ আমাদের আহার করান, আমাদের সেবা করেন, আমাদেরকে সর্বক্ষণ আগলে রাখেন, আর তাঁর বিপদের কালে তিনি সাধারণ, তাঁর রক্ষণের প্রয়াস নিষ্প্রয়োজন! কেন পিতা, এমন কেন? পিতা, আমরা আমাদের মাতাকে কখনো দেখিনি। আর তাঁর ব্যাপারে আপনি আমাদেরকে কিছু বলেনও নি। আপনার পত্নী তিনি, আপনি যা ঠিক মনে করেছেন, তাই করেছেন তাঁর সাথে, আমরা কেউ সেই ব্যাপারে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নই”।
“কিন্তু দেবী দসী আমার পত্নী। স্ত্রী সে, সমস্ত রূপেই তিনি জননী। এক জননী যেমন করে তাঁর সন্তানকে রক্ষা করেন, আহার করান, পালন করেন, ঠিক বেঠিকের পাঠ প্রদান করেন, স্নেহ করেন, নিজের মমতা দ্বারা আগলে রাখেন, দেবী দসীও অনুরূপ করতেন আমার প্রতি। তাই আমি তাঁর কাছে ততক্ষণ যাবার প্রয়াস করবো যতক্ষণ আমার দেহে প্রাণ আছে। তাঁর মমতাকে, স্নেহকে, বিশ্বাসকে, নিঃস্বার্থ প্রেমকে আমি কিছুতেই অদেখা করতে পারবো না, আর কিছুতেই অদেখা করবো না। তাই আপনি অনুমতি দিলেও আমি যাবো, আর অনুমতি না দিলেও আমি যাবো”।
রাজা সুরথ এবার নিজের জোর খাটিয়ে বললেন, “পিতার আদেশের উল্লঙ্ঘন তুমি করতে পারো না। তোমার মর্যাদা তোমাকে এই কথাই শেখায় পুত্র”।
আসন উত্তরে বললেন, “আমার মর্যাদা, আমার ধর্ম আর আমার নীতি আমাকে একটিই কথা বলছে। বলছে যাই হয়ে যাক, দেবী দসীর ন্যায় পবিত্রস্ত্রীর উদ্ধার করতে না যাওয়ার অর্থ তুমি পুরুষ তো পরের কথা, তুমি মানুষই নও। মানুষ হয়ে যদি পবিত্রতার সম্মান না করা যায়, পবিত্রতার পূজা না করা যায়, তাহলে মানবজন্ম গ্রহণ করাই বৃথা। … সন্তানের ধর্ম পিতার আদেশের পালন করা, রাজপুত্রের ধর্ম রাজার আদেশের পালন করা। কিন্তু আমি পুত্র বা রাজপুত্র এসব কিছু হবার পূর্বে একজন মানুষ। আর মানুষের ধর্ম আমাকে বলছে যে, দেবী দসীর উদ্ধার উদ্দেশ্যে না যাওয়ার অর্থ সমস্ত স্ত্রীজাতিকে বলা যে, তাঁদের পবিত্রতার কনো মূল্য নেই, অর্থাৎ সমস্ত স্ত্রীজাতিকে পবিত্রতা ত্যাগ করে, দুশ্চরিত্র হয়ে ওঠার দিকে প্রেরিত করা”।
“তাই পিতা, আমি যাবো তো অবশ্যই, কারণ এটিই আমার ধর্ম। নারী যতকাল পবিত্র থাকবেন, ততদিনই সমাজ সুরক্ষিত থাকবে, কারণ ততদিনই পুরুষ সংযত থাকবে, মার্জিত থাকবে, আর কামনার থেকে স্নেহকে অধিক গুরুত্ব দেবেন। যেদিন নারী পবিত্রতার আরাধনা করা বন্ধ করে দেবেন, সেদিন থেকে পুরুষও আর মার্জিত হবার প্রয়াস করা বন্ধ করে দেবেন, সংযত হবার ইচ্ছাও ত্যাগ করে দেবেন, আর কামনার দাস হয়ে উঠবে। আর যেদিন তেমন হবে, সেদিন স্বয়ং প্রকৃতিই মানবযোনিকে এই ধরাধাম থেকে চিরকালের মত বিলুপ্ত করে দেবেন”।
“দেবী দসী একজন পূর্ণপবিত্র নারী, যিনি সমস্ত নারীকে পবিত্র হয়ে থাকার প্রেরণা প্রদান করেন। … তাঁর উদ্ধার করতে না যাওয়ার অর্থ, সমস্ত স্ত্রীকে পবিত্রতার আরাধনা থেকে বিমুখ করে দেওয়া হবে। আর তেমন করা মানবধর্মের বিরোধিতা করা হবে। তাই পিতা, যদি আপনার আদেশ না পালন করার জন্য আমাকে আর পুত্র বলে স্বীকার না করেন আপনি, আমার কাছে তাও একটি পুরস্কার; মহারাজ সুরথ আপনার আদেশ পালন না করার জন্য যদি রাজদ্রোহ করার অপরাধে আমাকে রাজ্য থেকে বহিষ্কারও করেন, তাও আনন্দের সাথে গ্রহণ করবো। কিন্তু দয়া করে আমাকে দেবী দসীর উদ্ধার করা থেকে বিরত করে, মহাপাতক করে দেবেন না। কৃপা করে আমাকে এতো বড় দণ্ড দেবেন না”।
বসন বললেন, “আমাকে সঙ্গে নাও। তোমার যুক্তিকে আমি মানছি যে, রাজ্যকে নিঃস্ব করে আমাদের চার ভ্রাতার যাওয়া উচিত নয়। ভরণপোষণ থাকুক এখানে। আমাকে তোমার সঙ্গে নাও। বসন ছাড়া আসন নির্মাণ হয়না ভ্রাতা। তোমার থেকে আমাকে এই ভাবে আলাদা করে দিও না ভ্রাতা। এই দণ্ড আমাকে দিও না ভ্রাতা। তোমার ক্রোড়ে মাথা রেখে মৃত্যু লাভ করাও আমার জন্য গৌরবের, কিন্তু তোমার থেকে দূরে থেকে, রাজসুখ ভোগ করা আমার জন্য অভিশাপ ছাড়া অন্য কিছু নয়”।
ভরনপোষণ বললেন, “বসনকে নিয়ে যাও ভ্রাতা, আর হ্যাঁ, কখনো কনো প্রয়োজন হলে, আমাদের বার্তা প্রেরণ করবে। আমরা চার ভ্রাতা এক হলে, ত্রিভুবনজয়ী রাজা রমণ হোক, আর স্বয়ং ত্রিকাল হোক, কেউ আমাদেরকে আটকাতে পারবেনা। আমরা সত্যের জন্য যুদ্ধ করি, আমরা আপনভ্রাতার জন্য যুদ্ধ করি। দেবী দসী যে কতটা পবিত্র ছিলেন, তা আমরা জানি ভ্রাতা। আমরা জননীকে কখনো পাইনি। কিন্তু তিনি আমাদের মাতা সমান ছিলেন। আমাদেরকে তো তিনি ছোটো ভ্রাতা করেও কখনো দেখেন নি। সর্বদা পুত্রের দৃষ্টিতেই দেখেছেন। … তাঁর জন্য আমরা সর্বদা যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ভ্রাতা। তোমার নির্দেশ মেনে, পিতার সম্বল রূপে আমরা এখানে থেকে অবশ্যই যাচ্ছি, কিন্তু আমাদের অন্তরের প্রাণ তো তুমি ভ্রাতা। তোমার সাথে সাথে আমাদের প্রাণও আমাদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। তাই ভ্রাতা, আমাদের যখনই প্রয়োজন হবে স্মরণ করো, আমরা উভয় ভ্রাতা সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকবো তোমার সেবায় উপস্থিত হতে”।
আসন এবার পিতার চরণ বন্দনা করলে, রাজা সুরথ বললেন, “নিজের উদ্দেশ্যে সফল হও পুত্র। পুত্রবধূকে ফিরিয়ে নিয়ে এসো”।
আশীর্বাদ গ্রহণ করে আসন ও বসন পশ্চিম দিশায় চলতে থাকলেন, মরুদেশের সন্ধানে। পথে তাঁরা বহু মানুষের সাথে সাখ্যাত করলেন। কিন্তু কেউ তাঁদেরকে ডঙ্কাদেশের সন্ধান দিতে পারলেন না। এঁদের মধ্যে এক বৃদ্ধা আসন ও বসনের জিজ্ঞাসাবাদ শুনে তাঁদেরকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, “কি হয়েছে আমাকে বিস্তারে বলো তো বাছারা! ডঙ্কা দেশের সন্ধান কেন করছো তোমরা? সেখান থেকে তো কেউ বেঁচে ফেরে না শুনেছি”।
আসন বললেন, “আমার নাম আসন আর ইনি আমার ভ্রাতা বসন। আমরা ওযু দেশের রাজপুত্র। আমার স্ত্রীকে ডঙ্কা থেকে অপহরণ করা হয়েছে। আমরা তাঁরই অনুসন্ধানে বেড়িয়েছি। আপনি কি আমাদেরকে সাহায্য করতে পারবেন কোনভাবে?”
সেই বৃদ্ধা বললেন, “কি করে জানলে যে ডঙ্কা থেকেই অপহরণ কর্ম করা হয়েছে?”
আসন বললেন, “যেই প্রত্যক্ষদর্শী রজক আমাদের সংবাদ প্রেরণ করেছিলেন, তিনিই বলেছিলেন যে এক বিমানে করে অপহরণকারীরা এসেছিলেন। আর হে মাতা, একমাত্র ডঙ্কা রাজ্যের কাছেই বিমান আছে। তাই …”
বৃদ্ধা বললেন, “কিন্তু এক স্ত্রীকে উদ্ধার করতে ডঙ্কাতে যাত্রার কি কনো মানে হয়? শুধুশুধু নিজের জীবনকে সঙ্কটে ফেলা। তার চাইতে অন্য এক স্ত্রীকে বিবাহ করে নিলেই তো পারো!”
আসন বললেন, “আপনি স্বয়ং একজন স্ত্রী হয়ে এই কথা বলছেন? কি করে বলছেন আপনি এই কথা? … যেই স্ত্রী আমাদের এতো দেখভাল করেন। নিজের সুখসুবিধা সমস্ত ভুলে গিয়ে আমাদেরকে সেবা করেন, আজ তাঁর অপহরণ হয়ে গেছে বলে, আমরা অন্য এক স্ত্রীকে বিবাহ করে নিয়ে, তাঁকে ভুলে যাবো? … তাঁর নিঃস্বার্থ সেবার কি কনো মূল্য নেই মাতা? তাঁর অকপট স্নেহপ্রদানের কি কনো মাহাত্ম নেই? তাঁর বিশ্বাসের কি কনো দাম নেই? … মাতা স্ত্রীর শক্তি তাঁর মমতায়, তাঁর স্নেহদানে, কিন্তু পুরুষের কাছে তো বাহুবল দিয়েছেন আদিশক্তি। সেই শক্তি কি কাজের, যদি এমন মূল্যবান মমতাস্নেহ শক্তিকে রক্ষাই না করা যেতে পারে?”
“মাতা, বাহুবল অত্যাচারীর নাশ করার জন্য হয়, আর মমতাস্নেহবল যে দুরাচারীকে সদাচারী করার জন্য হয়। যদি সেই মহাশক্তিকে মূল্য দিতেই না পারি, তাহলে রাজপুত্র হয়ে যুদ্ধকলা জেনে কি লাভ আমাদের? ধিক্কার এমন মানবজন্মকে, যদি এমনভাবে কেবল বাহুবলকেই শক্তিজ্ঞান করে যেতে হয়। মাতা, স্ত্রীর শক্তির কারণেই সমাজ সংযমী, সদাচারী, আর পরোপকারী। যদি স্ত্রীর শক্তিকেই এইভাবে তাচ্ছিল্য করা হয়, অপমান করা হয়, তাহলে সমাজ তো দুইদিনে বিনষ্ট হয়ে যাবে!”
বৃদ্ধা এবার হেসে বললেন, “যোগ্য পুত্রের মুখ থেকে মাতা শব্দ শ্রবনেও মহানন্দ হয় পুত্র। … তোমরা যথাযোগ্য এই অসম্ভব কর্মকে সম্ভব করার জন্য। যাদের উদ্দেশ্য মহৎ হয়, যাদের উদ্দেশ্য জগতকল্যনকর হয়, তাদের সাথে স্বয়ং জগজ্জননী শক্তিবেশে যুক্ত হন। … তোমরা সঠিক পথেই যাত্রা করছো। এখান থেকে পশ্চিমে গেলে, রেবা নদী পাবে। রেবা নদীকে বামদিকে রেখে যাত্রা করবে। একস্থানে পৌঁছে দেখবে, রেবা দক্ষিণমুখি হয়েছে, আর সরাসরি গেলে একটি গিরিবন পাবে। নিশ্চিন্তে সেই বনে প্রবেশ করবে। এমন কিছু গহন অরণ্য নয় তা”।
“শুধু স্মরণ রাখবে, দিনের আলোতে প্রবেশ করবে সেই বনে, যাতে রাত্রি ঢলে পরার মধ্যে সেই বন থেকে মুক্ত হতে পারো। সেই বনে একটি বিশেষ হিংস্র প্রজাতির যোনি বসবাস করে। রাত্রিকালে তাঁদেরকে কেউ পরাস্ত করতে সক্ষম নয়। তাই রাত্রি হবার পূর্বেই সেখান থেকে মুক্ত হয়ে বিস্তীর্ণ কর্দম স্থানে পৌঁছাবে। এরপর, সেই কর্দম স্থান অতিক্রম করে, একটি বিস্তীর্ণ রুক্ষ স্থান পাবে। যাত্রা থামাবে না সেখানে। সরাসরি সেই স্থানকে ভেদ করলে, আরো একটি সাগর পাবে। সেই সাগর অতিক্রম করলে, আবার একটি সমতল স্থান। আর সেই সমতল স্থান যেখানে সমাপ্ত হচ্ছে, সেখানেই ডঙ্কা রাজ্য স্থিত”।
আসন ও বসন সেই বৃদ্ধার আশীর্বাদ গ্রহণ করে পথ চলতে শুরু করলে, বেশ কিছু কদম এগিয়ে যাবার পর বসন বললেন, “ভ্রাতা, বৃদ্ধা আমাদের পরীক্ষা নেবার জন্য এমন কথা বললেন, তাই না?”
আসন সেই কথা শুনে বৃদ্ধার প্রতি স্নেহভাবে পিছনে ফিরে তাকালে দেখলেন, দূরদূর পর্যন্ত কেউ নেই সেই স্থানে। ভ্রুকুঞ্চিত হলো তাঁর। কেউ সাহায্য করলেন তাঁদের, নাকি কেউ তাঁদের ভ্রমিত করলেন!… একটি কথাও না বলে পশ্চিম দিকে বিন্ধাঞ্চল অতিক্রম করে, রেবা নদীর বামদিক বরাবর চলতে থাকলেন আসনবসন।
অন্যদিকে বরণ এসে রমণকে বললেন, “ভ্রাতা আসন আর তাঁর ভ্রাতা বসন আমাদের রাজ্যের উদ্দেশ্যে আসছেন। কি করনীয় আমাদের?”
রমণ হেসে বললেন, “আসতে দাও তাঁদেরকে। যতক্ষণে তাঁরা এসে পৌঁছাবে এখানে, ততক্ষণে দেবী দসী আমার পত্নী হয়ে গেছেন। … আমি তাঁকে বিবাহ প্রস্তাব দিয়েছি, আর দুই মাস সময় দিয়েছি আমাকে তাঁর সিদ্ধান্ত বলার জন্য। তার মধ্যে তাঁকে আমাদের ডঙ্কার সমস্ত সামর্থ্য আর বৈভব প্রদর্শন করছি। স্ত্রী তো বৈভবেই বদ্ধ, সামর্থ্য দেখলে তিনিও বুঝে যাবেন যে আসন বসন এখানে এলে, তাঁদের বিনাশ নিশ্চিত। তাই তিনি অনায়সেই আমার পত্নী হয়ে যাবেন। তারপর তো আসনের কাছে দসী পরস্ত্রী, রমণের কাছে তো সে নিজের স্ত্রী!”… এতো বলে হো হো করে অট্টহাস্য হাসলেন রমণ, তো বরণ সেখান থেকে চলে গেলেন।
কিন্তু বরণ বিচার করতে থাকলেন, “যদি আসন সামান্য পুরুষ হয়, তাহলে ভ্রাতার সামনে দাঁড়াতেও পারবেনা। কিন্তু যদি আদিশক্তির পুত্র হয়? তাহলে কি ভ্রাতারা তাঁর সম্মুখীন হতে পারবে? … না না, আমার উচিত এই দুইমাস তাঁকে ভ্রমিত করে পথেই আটকে রাখা। তাহলে সমস্ত কিছুই সহজ ভাবে হয়ে যাবে?”। এমন বিচার করে স্বয়ংই এক বৃদ্ধ কাঠুরিয়ার রূপ ধারণ করে চলে গেলেন আসনবসনের পথে।
কাঠুরিয়া হয়ে কাঠ কাটতে কাটতে তিনি উচ্চৈঃস্বরে একটি গান ধরলেন, “ডঙ্কার মরু, আমার দারু, দুইয়ে মিলে হবে দেবদারু”।
এই গীতশুনে আসন তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, “ডঙ্কার মরু আপনি দেখেছেন?”
সেই কাঠুরিয়া একটি কথাও বললেন না। বেশ কয়েকবার আসন একই প্রশ্ন করতেও উত্তর না দিলে, আসন ও বসন পুনরায় পথ চলা শুরু করলেন। তখন কাঠুরিয়া বললেন, “ওদিকে গিয়ে সাগরে ডুব দেওয়ার ইচ্ছা আছে? … তোমাদের মনে হয় মায়াবী গিরিবনের জীবরা ডেকে নিয়ে যাচ্ছে নিজেদের আহার করবে বলে, তাই না?”
আসন পুনরায় কাঠুরিয়ার কাছে ফিরে গিয়ে বললেন, “গিরিবনে দিনের বেলা তো ভয় নেই, তাই না?”
কাঠুরিয়া বললেন, “সেই বনে যে একবার চরণ রাখে, সে আর কখনো ফেরে না। কখন যে দিন থেকে রাত হয়ে যায়, সে বুঝতেও পারেনা। … তোমরা ডঙ্কা যাবে তো? তো এদিক দিয়ে যাচ্ছ কেন? উত্তর পশ্চিমে যাও। কিছু খালবিল পাবে, জলাশয় পাবে। পাশ কাটিয়ে চলে গেলেই তো মরু। এসেই তো গেছ? আবার এই দিকে গিরিবনে নরখাদকদের শিকার হতে কেন যাচ্ছ?”
আসনবসন নিজেদের মধ্যে কথা বললেন, “সেই বৃদ্ধা তার মানে আমাদেরকে এই গিরিবনে পাঠানোর চক্রান্ত করেছিল! চলো ভ্রাতা আমরা উত্তরপূর্বে যাই”।
উত্তরপূর্বে বেশ কিছু জলাশয় অতিক্রম করার পরেই মরুঅঞ্চলের দাবদাহ অনুভূত হতে থাকলো আসনবসনের। তাঁরা উৎসাহী হিয়ে উঠলেন এই ভেবে যে তাঁরা ডঙ্কা রাজ্যের কাছাকাছি এসে গেছেন। বহুল পথ অতিক্রম করে করে, তাঁরা যখন বালুকার সাগর দেখতে পেলেন, তখন তাপে দগ্ধ হয়ে যাবার মত অবস্থা হলেও, বালুকা রাশি দেখে আনন্দে উৎফুল্লে তুই ভ্রাতা একে অপরকে আলিঙ্গন করে বললেন, “আমরা এসে গেছি ভ্রাতা”।
এক যুবতী আদিবাসী কন্যা, দেখে মনে হবে যেন রাজকন্যারাও তাঁর রূপের প্রতি ঈর্ষান্বিত হবেন, একবস্ত্রে কিছু কাঠের টুকরো নিয়ে যাচ্ছিলেন। দুই ভ্রাতাকে এমন ভাবে আলিঙ্গন করে আনন্দিত হতে দেখে ঠোঁটবিকৃত করে বললেন, “বাবা গো!… এই বালির গাদ দেখেও কারুর আহ্লাদ জাগে, বাপের জন্মে দেখি নাই!”
আসন আর বসন সেই কথাতে একটু সংযত হয়ে গিয়ে বললেন, “আপনি কি এখানেরই অধিবাসী? ডঙ্কারাজ্য কি ভাবে যাবো বলতে পারেন!”
যুবতী একটি অদ্ভুত টানব্যবহার করে বললেন, “ডঙ্কা যাবে! … কেনে! মরার সখ জেগেছে নাকি!”
আসন বললেন, “আহা আপনি বলুনই না”।
যুবতী বললেন, “ডঙ্কা কি এখানে নাকি! … সে তো বহু দূর! … উত্তুরের পাহাড় পেরিয়ে, সুজা গেলে, সাগরতটে জালিমের দেশ। তারপর সাগর পেরিয়ে ডঙ্কা। কিন্তু কেনে! … ডঙ্কা কেনে যাবে! … আচ্ছা! মরদরা! … তোমাদের এদিকে আসতে কে বলিছে বলো তো! … নিচে কাঁদার গাদা পেরুলে তো সহজ হতো যাওয়া! … এদিক পানে এলে কেন! … কোথা থেকে আসা হয় বাবুদের!”
আসন আর বসন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু সেখানে গিরিবন আছে না!”
যুবতী বললেন, “অতো ছুটো বন। কাকভোরে ঢুকলে, সন্ধ্যায় বন শেষ। রাতে থাকবে তবে তো নরখাদকরা গুহা ছেড়ে বাড়হুবে। … তুবে ডঙ্কা কেনে যাবে, বললি নিতো!”
আসনবসন বুঝলেন, বৃদ্ধা নয়, সেই কাঠুরিয়া তাঁদের সাথে ছল করেছে। আসন সামনে এসে বললেন, “আমার স্ত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে সেই রাজ্যে। তাঁকে মুক্ত করতে যাচ্ছি আমরা!”
সেই কথা শুনে যুবতী বেশকিছুক্ষণ নিস্তব্ধ ভাবে আসনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। যেন আসন কি এক আজগুবি কথা বলেছে। … কিন্তু এই তাকিয়ে থাকা কালীন আসনবসন সেই স্ত্রীকে সম্যক ভাবে দেখলেন। কি অপরূপ মুখশ্রী। অঙ্গের বর্ণ যেন দুধের মধ্যে কিছু ফোঁটা আলতা ফেলে দেবার মত, তবে প্রখর রৌদ্রের কারণে সেই আলক্তের ভাব অধিক লাগছে। অঙ্গের শোভা এমন যে প্রতিটি পুরুষের এই স্ত্রীর অঙ্গের প্রতি কামনা জাগবে, কিন্তু তাও এই নারীর মধ্যে এমন কিছু আছে যা কামনার বিস্তার তো দূরে থাক কামনার জন্মও হতে দিচ্ছেনা।
সেই যুবতী এবার বললেন, “জালিমের নাম শুইনেছ?”
আসন মাথা নেড়ে বললেন, “না!”
যুবতী বললেন, “ডঙ্কার রাজা রমণ, তাঁর দুই ভাই, করন আর বরণ। এঁদের মাইয়া হলো কর্কটি। আর কর্কটির ভাইয়া হলো জালিম। জালিমের পোলার নাম জেরু। আর সেই জেরুকে আমি বড় করেসি। … আমার সোটো ভাইয়ার মত সে। কেন করেসি? কারণ কর্কটির ছেলিরা জালিমে মারিধরি অথর্ব করে দিসে। … জালিমের পোলা, জেরু বদলা নিতে সায়, কিন্তু জালিম ডঙ্কার নাম শুইনলেই ভয়ে আধখান হই যায়। … কি এক গাসের জাল বুনিছে জালিম। যদি কেউ সেই জালে বেঁধে, তবে তার ভরসায় পোলারে ডঙ্কা যেতি দিবে”।
“জেরুর বড় সেনা আসে। … পথও জানা আসে, ডঙ্কা যাবার। আমার সাথে সলো, জেরু এই পাহাড়েই আসে। দিনরাইত বদলা নিতে সায়, বাপ নিতে দেয়না। তাই রাগিমাগি, বাপের দাসীর গলা টিপে দিসিলো। তাই তারে এখানে এনেসি। কিসু দিন এখানে থাইক্লে, মাথা ঠাণ্ডা হবি। … চলো, যাবে তার কাসে?”
আসন বললেন “চলুন। … আপনার নাম কি?”
সেই যুবতী বললেন, “আমার ন্যাম! জেরু আমারে আম্মি বলি ডাকে। তুমরাও তাই ড্যাকো”।
আম্মির সাথে আসন ও বসন মরুর উপরে স্থিত পাহাড়ের দেশে গেলেন। এমন রুক্ষ মরুর ঊর্ধ্বে এমন তৃণঘেরা সুন্দর পাহাড়। কেউ না দেখলে বিশ্বাসই করবে না। সাখ্যাত হলো জেরুর সাথে। তাঁর ভাষা সাবলীল। সাখ্যাত হতে প্রণাম জানিয়ে তিনি বললেন, “আমার পিতা জালিম আমাকে নিয়ে সবসময়ে চিন্তায় থাকেন। স্বপ্নেও দেখেন, আমাকে নাকি ডঙ্কেশ হত্যা করছে। … আম্মির কাছেই আমায় থাকতে দিতো নাকি! … সে তো আম্মি ডঙ্কা আর জালিমারের মধ্যে সাগরকে টেনে আনলেন, তাই থাকতে দিলেন তাঁর কাছে। … আমি তাঁর কাছেই মানুষ”।
আসন ভ্রুকুঞ্চিত হয়ে বললেন, “সাগর টেনে আনলেন মানে?”
জেরু বললেন, “মানেটা এই যে, আজ ডঙ্কা আর জালিমের মাঝে সেই সাগর রয়েছে, তা একসময়ে, অনেক দূরে ছিল। প্রায় শ’তিনেক যোজন দূরে। আমার পিতার এই দশা দেখে, আম্মি সেই সাগরের পার ভেঙে ভেঙে তিনশো যোজন টেনে এনেছে সাগরকে, আর ডঙ্কাকে জালিমারের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। এই অদ্ভুত কৃত্যের পর, পিতার বিশ্বাস হয়েছে যে আম্মির কাছে আমি সুরক্ষিত। তাই আমাকে তাঁর কাছে থাকতে দেন”।
আসন হতবাক হয়ে আম্মির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এতো ক্ষমতা, একজন সাধারণ মানুষের?”
আম্মি লজ্জাপেয়ে মুখ নামিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, “শক্তির প্রয়োগ হয় নাই। তোমার বিবিরে উদ্ধার করাতে নিয়ে গেলে, ডঙ্কার সর্বনাশ করে আইসবো। আমার জেরুর জীবন ওই ডঙ্কা শেষ করি দিয়েসে। একবার সেখানে যাই, তারপর ডঙ্কার ডঙ্কা বাজায় দিব”।
জেরু বললেন, “আমার সাথে আমার কিছু সেনাপতিরাও আছে। আম্মির মত বল কারুর নেই। কিন্তু তারাও বেশ বড় যোদ্ধা। রমণ, করন, বরণকে না মারতে পারলেও, তাদের ছেলেদের প্রাণ নেবার ক্ষমতা রাখে আমার দুই সেনাপতি, পলেস্ত আর তুরঙ্ক। সঙ্গে আমার সেনাবলও আছে, সাগরের ধার ধরে অনায়সে ডঙ্কা যেতে পারবো”।
বসন বললেন, “কিন্তু জালিমার এখান থেকে তো অনেক খানি!”
আম্মি বললেন, “এই বনে ছোটো আকারের কিসু ঘোড়া হয়। তাড়াতাড়ি পোষ মানে। ঘোড়া সুটিয়ে তিন রাত্রে পউসে যাবো জালিমারে। কিন্তু সেথায় গিয়ে ওই যে বললুম, গাছের খাঁচা, তারে ভেদতে হবে, তবেই অনুমতি পাবে”।
আসন বললেন, “কিন্তু দসী, মানে আমার স্ত্রীকে ডঙ্কায় কোথায় রেখেছে, তা জানবো কি করে? … যদি এমন হয় যে আমরা ডঙ্কার যেইদিকে আক্রমণ করবো, সেই দিকেই রেখেছে তাঁকে?”
আম্মি বললেন, “না না, রাইখলে পূর্ব দিশায় রেখেছে। সেখানের হাওয়াবাদল ভালো, দখিন পচ্চিমে গরম আগুন খেলে। আর উত্তুরে ডঙ্কা সেনা শিবির ধরে। পুবেই প্রাসাদাদি”।
আসন প্রশ্ন করলেন, “তুমি গেছিলে নাকি সেখানে আম্মি?”
আম্মি কিছু বলার আগেই জেরু বললেন, “আমার চর হয়ে অনেকবার গেছে আম্মি। আকার পালটাতে পারে আম্মি। মায়াবীও। বিশাল বড়, আবার অতি ক্ষুদ্র। … সমস্ত ডঙ্কা ঘুরে, নকশা করে এনে দিয়েছে আমাকে, যাতে আমি আক্রমণের যোজনা করতে পারি। আম্মি আমার সব কিছু। বয়সে দিদি, আসলে আমার মা হন তিনি। শুধু পেটে ধরেন নি, আর স্তনপান করাননি। বাকি সমস্ত কিছু করেছেন, মলমূত্রও পরিষ্কার করেছেন”।
আসন হেসে বললেন, “সেই জন্যই তো একমাত্র তিনিই আমাকে প্রশ্ন করলেন না যে, এক স্ত্রীর জন্য কেন আমি ডঙ্কা যাচ্ছি। বাকি পথে সকলে একই কথা বলেছেন”।
আম্মি বললেন, “না, এই জন্যি জিগাইনি যে জেরু সেখানে যেতি চায়। … স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করতে যেই মরদ জীবনের ঝুঁকি নেয়, তাঁকে সেই নিয়ে জিগানো মানে, তাঁরে অপমান করা হয়। তাই জিগাইনি”।
আর কথা না বাড়িয়ে সামান্য আহার করে, আম্মি দুটি ঘোড়াকে পোষ মানিয়ে আনলে, জেরু আর আম্মি নিজের নিজের ঘোরায়, আর আসন বসন নূতন পোষ মানানো দুই ঘোরায় চেপে গেলেন জালিমারে। জালিমারে গিয়ে আসন বসনের ডঙ্কা যাবার প্রয়োজনের কথা বলতে, জালিম তাঁদেরকে নিজের তরুজালের নিকট নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে বললেন, “এই যে আটটি বৃক্ষ দেখছো যারা মিলে একটি বৃত্ত ধারণ করে আছে, যে এই বৃক্ষদের একটি বাণে বিদ্ধ করে, মুণ্ডচ্ছেদ করতে পারবে, একমাত্র সেই রমণ আর করনের বধ করতে পারবে। তাই আসন নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দাও”।
আসন প্রশ্ন করলেন, “এমন অদ্ভুত ধারণা কেন আপনার যে, এই কাজ যে করতে পারবে, রমণ আর করনের নাশ সে-ই করতে সক্ষম? কি যোগসুত্র আছে এই দুইয়ের?”
জালিম স্থির দৃষ্টি রাখলেন আসনের উপর আর বললেন, “এর আগে এই প্রশ্ন অন্য কেউ করেনি। … হুম বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে তোমাকে। … রমণ আর করন এক প্রাণ দুই দেহ। রমণের জন্ম আগে হয়, আর তাঁর মস্তক আটটি অবস্থায় স্থিত হয়ে করনের মস্তক ও তার দেহ নির্মাণ করে। তাই দুই ভ্রাতাকে একত্রে অষ্টকও বলা হয়। তাই আমার বিশ্বাস যে, তাদের মৃত্যুও একমাত্র সেই ভাবেই সম্ভব হবে, অর্থাৎ করনের মস্তককে আঘাত করে যদি সেই বাণ বৃত্তাকার ভাবে আট স্তরে ঘূর্ণন করে রমণের মস্তককে ছেদ করতে পারে, তবে অষ্টকের মৃত্যু সম্ভব হবে”।
জেরু উত্তেজিত হয়ে বললেন, “এই ভাবে কখনো কনো বাণ নিক্ষেপ করা যায় না পিতা। আপনার ধারণাও আছে, কতোটা দক্ষতা থাকতে হয় এমন বাণ নিক্ষেপ করার জন্য! একই সঙ্গে একাধিক লক্ষকে বিঁধতেই অসম্ভব মেধা লাগে। এখানে তো একই সঙ্গে আটটি লক্ষ্যকে বিঁধতে হবে! কি পরিমাণ বল প্রয়োজন এই কর্মের জন্য, আপনার কনো ধারণা আছে!”
জালিম বললেন, “যদি সম্ভব না হয়, তবে রমণ আর করনের মৃত্যুও সম্ভব হবেনা। এব্যপারে নিশ্চিত থেকো”।
আসন সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “এমন বিচিত্র ধারার জন্ম তো কনো মানবের হয়না হে মান্যবর। তাঁরা তবে কারা!”
জালিম উত্তরে বললেন, “তারা কারা? তারা এই ব্রহ্মাণ্ডের হর্তাকর্তাবিধাতা। তাঁরাই কারুর অনুসন্ধান করার জন্য দেহধারণ করেছেন। মানব হয়ে তাঁরা সম্পূর্ণ সামর্থ্য ধারণ করতে পারবেনা, তাই তাঁরা রক্ষ হয়ে জন্ম নিয়েছে। কর্কটির স্বামী, যার ঔরসে এই তিন বালক লাভ করেছিলো সে, তিনি একজন মহারক্ষ। কিন্তু রক্ষ হয়েও তিনি ভীরু ছিলেন। তাই রমণ ও করন দুই ভ্রাতা মিলে, তাঁদের পিতার নাশ করেন, এবং ডঙ্কার নৃপতি হয়ে স্থাপিত হন রমণ। অতঃপরে রমণ ও করন সম্পূর্ণ ত্রিভুবনকে নিজেদের অধীনে আনে, যা পূর্ব থেকেই তাঁদের অধীনে ছিল। পুত্র, আসন, তোমার মধ্যে আমি সেই গুণ দেখতে পাচ্ছি যার বলে তুমি সামনা করতে সক্ষম সেই দুই দানবের। তবে তার আগে তুমি নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করো, এই আট বৃক্ষের একটিই বাণে বৃত্তাকার ভাবে মুণ্ডচ্ছেদ করে”।
আসন বললেন, “যথাজ্ঞা”। এই বলে অস্ত্রসন্ধান করে, প্রকাণ্ড আঘাত হানলেন আসন। সেই আঘাতে সম্পূর্ণ জালিমা কম্পিত হয়ে গেল, সমস্ত আকাশ গর্জন করে উঠলো। আর মুহূর্তের মধ্যে বৃত্তের আকারে স্থিত সেই অষ্টবৃক্ষের মুণ্ড ছেদিত হয়ে ভূমিতে পতিত হলো।
সেই দেখে পুত্র জেরুর হাত ধরে জালিম উঠে এসে আলিঙ্গন করলেন আসনকে আর বললেন, “যথার্থ বলশালী তুমি পুত্র। সে-ই যথার্থ বলশালী, যার মধ্যে বল থাকার অহংকার থাকেনা, যে যথার্থ ক্ষেত্রেই নিজের বল প্রয়োগ করে, এবং সকলকে, বিশেষ করে, অন্তর থেকে সম্মান করে। তুমি আম্মির অদ্ভুত দিব্যরূপ দর্শন করেও অবিচল ভাবে তাঁর প্রতি মাতাজ্ঞানে, সঙ্গীজ্ঞানে সম্মান ধারণ করেছ। তা দেখেই আমার মনে হয়েছিল, তুমি নিশ্চিত ভাবেই বিশেষ”।
“তাছাড়াও তোমার কথা শুনেছি। যেই সুদর্শন যুবক রাজপুত্র চাইলেই অঢেল রাজকন্যাকে ধারণ করতে সক্ষম, সে নিজের একমাত্র স্ত্রীকে অদম্য দানবদের হাত থেকে উদ্ধার করতে এতদূর এগিয়ে এসেছে। তখনই বুঝেছিলাম, তুমি বিশেষ বলশালী, গৌরিপুত্রের কথা আমরা শুনেছি যার নাশ করেছিল সাধপাল জিতেশ। সেই কথা শুনে অন্তরে অন্তরে যেই পুরুষকে প্রতিটি নারী ধারণা করেছিলেন, তুমি অবিকল সেই পুরুষের মতই, যার স্নায়ুতে স্নায়ুতে মাতার প্রতি সমর্পণ, যে প্রতিটি নারীকে, সম্বন্ধ নির্বিশেষে মাতা বিনা অন্য কিছু জ্ঞান করতে পারেনা, সেই গৌরিনন্দন তুমি। জয় হোক তোমার”।
আসন বললেন, “আপনি কিছু বলবেন বলেছিলেন আমাকে, কিন্তু তার পূর্বে আমাকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে বলেছিলেন। সেই কথা বলবেন না?”
জালিম বললেন, “শোনো পুত্র, তোমার স্ত্রী কে আমি জানি না। তবে আমি রমণ, করনের সম্বন্ধে একটি কথা জানি। তা তোমাকে বলবো। তাঁদের কাছে আমি দেবী শ্রীর কথা অনেকবার শুনেছি। তাঁরা দেবী শ্রীকে খুঁজছেন। যদি তোমার স্ত্রীকে তাঁরা অক্ষত রাখেন, তাহলে নিশ্চিত ভাবে জানবে, তোমার স্ত্রী অন্য কেউ নন, দেবী শ্রীই। সেই কারণেই তাঁরা তাঁর নাশ করে নি, বরং তাঁকে ধারণ করার প্রয়াস করছে”।
আসন বললেন, “মান্যবর, আপনি সমানেই রমণ কারণের কথা বলছেন, তাঁদের তো আরো একটি ভ্রাতা আছে, যার নাম বরণ। তাঁর কথা বলছেন না কেন?”
জালিম বললেন, “যুদ্ধের কালে যদি সম্ভব হয়, তাহলে এই বরণকে বাকি দুই ভ্রাতার থেকে আলাদা করে দেবে। তবেই যুদ্ধ জয় করতে পারবে। এই তৃতীয় ভ্রাতা যুদ্ধ করে না। অস্ত্রের সঙ্গে তাঁর তেমন সম্বন্ধ নেই। তবে তাঁর বুদ্ধি যদি রমণ করন লাভ করতে থাকে, তাহলে তাঁদেরকে পরাস্ত করা অসম্ভব হয়ে যাবে। বাকি দুই ভ্রাতার থেকে সে সম্পূর্ণ ভিন্ন, কিন্তু পুত্র, মাতার থেকে পুত্রকে অধিক কেউ চেনেন না, আর আমার ভগিনী কর্কটির কথা অনুসারে, ভিন্ন হলেও, তিনভ্রাতা একে অপরের থেকে অভিন্ন। কিন্তু এই কথার অন্তরে থাকা রহস্য আমার কাছে অজানা। তাই সতর্ক থেকো, তিনজনকে নিয়েই। বলবান হবার সাথে সাথে, তাঁরা মহাধূর্ত আর মহাকৌশলী”।
যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে এবার সকলে উঠে পরে লাগলেন। সর্বাধিক ভাবে আগ্রহী রইলেন জালিমপুত্র জেরু, যে চিরকাল পিতার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার নিতে লালায়িত ছিল। কিন্তু সমস্ত কিছুর মধ্যে আসন বললেন, “আম্মি, যদি সম্ভব হয়, আপনি একবার সংবাদ আনুন কৃপা করে যে আমার স্ত্রী জীবিত আছেন তো। … যদি তা না হয়, তবে এতো মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়ার অপরাধ বোধ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে”।
আম্মি হেসে বললেন, “অবশ্যই আনসি খপর প্রভু। এই গেলুম আর এই এলুম”।
আসন বললেন, “আমি তোমার প্রভু নই আম্মি। ভাই হতে পারি, সখা হতে পারি, কিন্তু প্রভু কনো ভাবেই নই। তাই প্রভু বাদে কি নামে আমাকে ডাকবে সিদ্ধান্ত নিয়ে নাও। … প্রভু ডাক আমার পছন্দ নয়”।
আম্মি হেসে বললেন, “তাইলে সখা বলি!”
আসন হেসে বললেন, “বেশ তাই বলো”।
জেরু বললেন, “আম্মি, আগে দেবী দসীর সংবাদ নিয়ে নেবে, তারপরে ওই রমণকে হুশিয়ারি দিয়ে আসবে যে, আমরা তাঁকে আক্রমণ করতে যাচ্ছি”।
আসন বললেন, “না আম্মি, কনো হুশিয়ারি দেবে না। … হুশিয়ারি দিলে, আমরা রণকৌশল তরী করতে পারি আর না পারি, তারা রণকৌশল তৈরি করে ফেলবে। ত্রিভুবনের প্রভু সে। তাই ত্রিভুবন থেকে সমস্ত এমন সেনা আর সেনাপতি নিয়ে আসবে যে, আমরা তাঁদের প্রতি সম্মান ধারণ করার জন্য, তাঁদেরকে সঠিক ভাবে আঘাতও করতে পারবো না। … আর তা ছাড়া, আম্মি একা একজন নারী। আর রমণ সম্বন্ধে যা শুনেছি, সেই অনুসারে সে দুরাচারী। যোদ্ধার সাথে যুদ্ধ নয় খালি, সে নিজের রাজ্যে আম্মির সাথে অসভ্যতা করতেও ছাড়বে না। … তাই কনো প্রকার কিচ্ছু নয়। শুধু সংবাদ নিয়ে চলে আসবে। আমরা তাঁদেরকে অতর্কিতে আক্রমণ করবো”।
পলেস্ত আর তুরঙ্ক বললেন, “অতর্কিতে আক্রমণ! আমাদের এখানে এই আক্রমণকে অন্যায় বলা হয়”।
বসন বললেন, “আর নিশ্চয় একে অন্যায় এই রমণরাই মানতে শিখিয়েছে। তাই না?”
জেরু ক্রোধ আর বিরক্তি ধারণ করে বললেন, “হ্যাঁ”।
বসন আবার বললেন, “কিন্তু দেবী দসীকে তিনি কিন্তু অতর্কিতেই শুধু নয়, ছল করে অপহরণ করেছেন। … ছলের উত্তর ছল। অতর্কিতের উত্তর অতর্কিত। যুদ্ধের এই নিয়ম। তুমি যা মূর্তি দেখাবে, আমরাও ঠিক তার দর্পণ চিত্র দেখাবো”।
আসন বললেন, “বসন সঠিক কথা বলেছে। যুদ্ধ মানে কেবল বীরত্ব প্রকাশ কখনোই নয়। দশজনের প্রাণকে বলি দিয়ে কখনো বীরত্ব প্রকাশ করা হয়না। … যুদ্ধ মানে, কেবল শত্রুর উপর জয়লাভ নয়, বরং শত্রুর ন্যায় মানসিকতা যারা যারা ধারণ করে, তাঁদের সকলের উপর জয়লাভ হয়। অতর্কিতে আক্রমণের উত্তর অতর্কিতে আক্রমণ, আর এই বার্তা যখন সর্বত্র পৌঁছে যাবে, তখন এমন কদাচার করার পূর্বে সকলে সতর্ক হয়ে যাবে কারণ তাঁদের স্মরণে থাকবে যে, তারা যেই রূপ আচরণ করবে, সেই রূপ আচরণই সম্মুখ থেকে আসবে”।
আম্মি বললেন, “হক কথা কইসে সখা। যুদ্ধতে শুধু বাহুবল আর অস্ত্রবল যদি জিতে, তাহলে তা জুলুমবাজি হয়, যুদ্ধ নয়। যুদ্ধের মানে হইল শত্রুর কুরূপকে সামনে নিয়ে আসা। যদি শত্রুর কুরূপকে সামনেই নিয়ে আসা না যায়, আর সকলের সামনে শত্রু ভালোমানুষের মুখোশ পরি থাকে, তাহলে বাহুবলে অস্ত্রবলে যুদ্ধ জিতলেও, জয় শত্রুরই হয়, কারণ সকলে শত্রুর জন্যেই কাঁদে। যখন সকলে শত্রুর নামে সি সি করবে, তখনই আসল যুদ্ধজয়। তাই শত্রুর মুখোশ খুইলে দিতে হবে”।
আসন বললেন, “বেশ আম্মি, তুমি যাও, আর সাবধানে যেও। কনো বাহাদুরি দেখানোর প্রয়োজন নেই। তোমার যদি কিছু অনিষ্ট হয়ে যায়, জেনো তোমার সখা নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না”।
আম্মি আসনের নিকটে এসে বললেন, “তুমি বড় ভালো রে সখা। … প্রাণ বসে তোমাতে। ইসসা তো হসসে, বড় আকার ধরি, তোমার স্ত্রীরে কাঁধে নিয়ে চলি আসি”।
বসন বললেন, “যদি এমন করতে পারো, তো ভালোই হয়। তাহলে আর যুদ্ধের প্রয়োজনই থাকেনা”।
আম্মি হেসে বললেন, “না রে ভাই, যুদ্ধ দরকার এখানে। … স্বামীর কর্তব্য পবিত্র স্ত্রীকে রক্ষা করা, স্ত্রীশক্তিকে সম্মান করা, সেইটে সকলকে দেখাতে হবিনে! … যুদ্ধকে লোকশিক্ষার মাধ্যম কইরতে হয়, বুঝলে ভাই। … আর সাথে সাথে রমণ করনের বড় বার বেড়েসে। সেখানেও তো লোকশিক্ষা দিতে হবে না যে, তুমি যেই হও না কেন, ভগবানই কেন হও না, যদি প্রভু হতি সাও, তাহলে গলা কাটা যাবে”।
আসন বললেন, “তাহলে আমাকে তুমি প্রভু বললে কেন আম্মি?”
আম্মি হেসে বললেন, “দেখতে হবে না, যার মাথায় জয়ের মুকুট দিব, সেও একই জাতের কিনা!”
আসন হেসে বললেন, “জানো আম্মি, আমি দেবী দসীকে বলতাম, তাঁর থেকে অপার স্নেহ পাওয়ার পরেও আমি যেন পূর্ণ প্রেম পাচ্ছিনা। কিছু একটা যেন নেই, সব থেকেও নেই। তোমার সান্নিধ্যে আসার পর যেন, সেই পূর্ণ প্রেমের স্বাদ পাচ্ছি। সেই যে প্রেম, যাতে স্নেহের সাথে সাথে শাসনও থাকে। আদরের সাথে সাথে পরখ করাও থাকে, সম্মানের সাথে সাথে শিক্ষাও থাকে, সেই পূর্ণপ্রেমের স্বাদ পাচ্ছি। জানি না আম্মি, কি সম্পর্ক তোমার সাথে আমার। জানিনা তোমার সাথে আমার পুরানো কনো গভীর সম্পর্ক আছে কিনা, তবে সত্যি বলছি, তুমি আমার প্রাণের সখী। … সাবধানে যেও আম্মি, আর হ্যাঁ দেবী দসীর সাখ্যাত হলে তাঁকে বলো, তাঁর কোলে মাথা রাখে না ঘুমাতে পেরে, আমার রাত্রে ঘুম আসেনা”।
আম্মি একটি কথাও বললেন না। শুধু একটি মিষ্ট হেসে। প্রবল গতি ধারণ করে সেখান থেকে চলে গেলেন। দূরে সমুদ্রের কোলে সকলে দেখলেন একবার আম্মিকে, কিন্তু তারপর তিনি নিজের আকৃতি ক্ষুদ্র পিপীলিকার ন্যায় করে নিলেন না কি করলেন, কেউ দেখতে পেলেন না। সকলের চোখের সামনে থেকে তিনি হারিয়ে গেলেন।
যখন উপস্থিত হলেন দেবী দসীর সম্মুখে, তখন তিনি একজন মাত্রই পিপীলিকা, যা সকলের চোখের আড়ালে দেবী দসীর সম্মুখে এসে উপস্থিত হলেন। দেবী দসী তাঁকে দেখেছেন। আকারে তিনি তো এক পিপীলিকা মাত্রই, কিন্তু তাঁর আকৃতি তো এক স্ত্রীর মত। তাই মনোযোগ সহকারে দেবী দসী তাঁকে দেখতে থাকলেন। সেই দেখে আম্মি নেত্র বন্ধ করলেন একবার আর সকল উপস্থিত প্রহরী রাক্ষসীগণ নিদ্রা চলে গেলেন।
অতঃপরে আম্মি নিজের আকৃতি ধারণ করতে, দসী ভয়ে চিৎকার করতে গেলে, আম্মি দসীর মুখে নিজের হাত রেখে তাঁকে চুপ করালেন। দেবী দসী মোহিত হয়ে গেলেন আম্মির নেত্রের দিকে তাকিয়ে। তাই বললেন, “কে তুমি! … তুমি তো এখানের কেউ নয়? দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি কনো আদিবাসী? কিন্তু তোমার রূপ যে স্বয়ং দেবী শ্রীকেও লজ্জিত করে দেবে!”
আম্মি হেসে বললেন, “আমি সখা, তোমার স্বামী আসনের দূত হয়ে এসেছি, তোমারে মেরে ফেলেসে না বাঁচিয়ে রেখেসে, তা দেখে খপর দিব তারে গিয়ে। … তুমি সিন্তা করো না, আসসে সে, তোমার স্বামী, আর তোমার দেবর বসন। সঙ্গে থাকবে জেরু, আর জেরুর দুই সেনাপতি, পলেস্ত আর তুরঙ্ক। আর সাথে থাকবে বিশাল জালিমার সেনা। সঙ্গে থাকবো আমি, আম্মি। রমণের রাজ্য নষ্ট করি, তোমারে নিয়ে যাবো। … তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। আর হ্যাঁ, কারুকে বলো না, আমরা আসসি। অতর্কিতে তোমারে সুরি করে এনেসে, তাই আমরাও অতর্কিতেই এদের নাশ করবো। আসি আমি গো। যেমন ছিলে দুশ্চিন্তায়, তেমনই থেকো। কেউ যেন কিছু বুঝতে না পারে, কেমন”।
দসী হেসে বললেন, “আরেকবার আমাকে ছুঁয়ে যাও না আম্মি। তোমার ছোঁয়া পেয়ে কি অদ্ভুত আনন্দ লাগলো”। আম্মি সেই কথা শুনে, দসীর বদনে একটিবার স্নেহস্পর্শ করে সেখান থেকে ঠিক যেমন করে এসেছিলেন তেমন করে ফিরে গেলেন, আর রাক্ষসীরা আবার নিদ্রা থেকে ফিরে এলেন। সকলে একবার একবার করে একে অপরের মুখের দিকে তাকালেন জানার জন্য যে কিছু কি হয়েছিল। কিন্তু কারুর কাছেই এই প্রশ্নের উত্তর নেই, কারণ সকলের কাছেই সেই একই প্রশ্ন। তাই কিচ্ছু হয়নি, এমন মনে করে সকলে পুনরায় পাহারা দিতে থাকলেন।
অন্যদিকে আম্মি এসে উপস্থিত হলেন আসন সকলের সাথে বসে যুদ্ধপরিকল্পনা করছিলেন যেখানে, সেই স্থানে। আসন আম্মিকে দেখে উৎসাহ নিয়ে প্রশ্ন করলেন, “সাখ্যাত হলো আম্মি দসীর সাথে?”
আম্মি হেসে বললেন, “হ্যাঁ, রাজপোশাকেই রেখেসে সখীকে। রাজসিক সুখই দিসসে, কিন্তু বন্দিনী করেও রেখেসে। যুদ্ধের জন্য তৈরি হওয়া দরকার এবার”।
আসন বললেন, “তুমি বলো আম্মি, কি হবে আমাদের পরিকল্পনা”।
আম্মি বললেন, “রমণের চার পোলা, মেঘকবচ, সর্পরমণ, অক্ষয় আর বিশালকায়। এদের মধ্যে, মেঘকবচ আর সর্পরমণ মায়াবী। এরা সামনা সামনি যুদ্ধ তো করবে না গো। বাকি দুইকে যুদ্ধে পলেস্তা আর তুরঙ্কই হারায়ে দিবে। মেঘকবচ একটি গুহায় কালা জাদুর সাধনা করে। সেই গুহায় তার কনো কালা জাদু অস্ত্র কাজ করেনা। সেখানে গিয়া মারতে হবে তারে। তবে সেই গুহা পর্যন্ত আগে আমাদের যেতে হবে তো! … সেখান পর্যন্ত পৌছাতে আমাদের করনের দুই পোলার সম্মুখে যেতে হবে, জীবান্তক আর নিসাধান্তক। জীব আর নিসাধদের বসে রাখার জন্যই এঁদের সৃজন করেসে করন”।
“এঁরা বিশাল শক্তিশালী সখা। এঁদেরকে জেরু আর আমি দেখে নেব। করনের আরো দুই পোলা আসে, করটি আর রটি। বসন ভাই, তুমি এদেরকে দেখে নিও। এরপর আমরা যার সম্মুখে আসবো, সে হল করন। বিশাল শক্তিশালী। সখা, আমাকে তোমাকে মিলে এর নাশ করতে হবে। রমণ এর বলেই ত্রিভুবন জয় করেসে। তাই যুদ্ধ বড় হবে। আমার বড় আকার কাজে লাগবে এখানে”।
“এরপর আমরা পাবো সেই কালাগুহা, যেখানে মেঘকবচকে পাবো। জেরু তারে নাশ করবে। জালিমের এই অবস্থা সেই করেসিলো, তাই জেরুই তার নাশ করবে। তবে, সেখানে মেঘকবচের দুই শক্তিশালী সাক্রেদ থাকে। তাদের নাশও করতে হবে, আর তাদের নাশ তুমি একা করতে পারবে না বসন ভাই, কারণ এঁদের একজন রাক্ষস আর একজন রাক্ষসী। এরপর পরি থাকে, কর্কটি, বরণ, রমণ আর সর্পরমণ। সর্পরমণের বাপের সাথে বনে না, তাই সে যুদ্ধে ভাগ নেবে কিনা, বলতে পারবো না সখা”।
আসন বললেন, “এতো তুমি পুরো যুদ্ধের নকশাই বলে দিলে, কিন্তু আক্রমণ আমরা কোন দিশা থেকে করবো?”
জেরু বললেন, “পূর্ব দিশা থেকে, আর উত্তর দিশা থেকে। এই দুই দিশা থেকে আক্রমণ করলে আমাদের সেনার আহার পানির অসুবিধা হবেনা। বাকি দুই দিক রুক্ষ মরুভূমি”।
আম্মি বললেন, “ওরা রাক্ষস। দিনে ঘুমায়, রাতে জাগে। আমরা তাই দিনে আক্রমণ করবো। পূর্ব দিশায় সখা তুমি তোমার বাণ দিয়ে ওদের দ্বার ভেঙে দিও। বসন ভাই, আর জেরু সেইদিকেই থেকো সেনার সাথে। আর উত্তরে আমি দরজা ভেঙে দেব। আর আমার সাথে যেই সেনা থাকবে তার নেতা হবে পলেস্তা আর তুরঙ্ক। বেশি সেনা আমার দিশায় রেখো, কারণ উত্তরেই সেনা শিবির ডঙ্কার। পুবে প্রথমদিনে বসন ভাই, তুমি রটি আর করটিকে পাবে, আর জেরু তুমি পাবে অন্তক ভাইদের। এঁদেরকে ঠেকিয়ে তোমরা গবল পাহাড় পাবে। তার মাথায় উঠে যাবে। এই পাহাড়ে রাক্ষসরা উঠতে পারে না, মুনির অভিশাপ আসে”।
“ওখানেই আমরা শিবির করবো। অক্ষয় আর বিশালকায়কে পলেস্তা আর তুরঙ্ক দেখে নেবে। আর আমি সেনা মেরে, আমাদের সেনা নিয়ে সেই গবল পাহাড়ে পউসে যাবো। এই হবে আমাদের প্রথম দিনের যুদ্ধ। … দ্বিতীয়দিন, জেরু আমরা অন্তকদের নাশ করবো, আর করনের কাছে সলে যাবো। মাঝে মেঘকবচ কিসু ফাজলামি তো করবেই। কি হয় দেখা যাক”।
