আদি কৃতান্ত – প্রকৃত ঈশ্বরকথা

দেবী অম্বিকার পুত্রের নাশ হয়ে গেছে, এই বিচারে সাধপাল জিতেশ থেকে শুরু করে সাধনরেশ ডাহুক দিবারাত্র উৎসবে মেতে রইলেন, তো ত্রিমূর্তি প্রকৃতিকে পরাভূত করে দিয়েছেন, এই আনন্দে সদামশগুল হয়ে রইলেন। কিন্তু এরই মধ্যে, কৃত্তিকা লোকে বেড়ে উঠতে থাকলো, প্রকৃতিপুত্র মৃষু, আর সকলের সামনে থেকেও অদেখা হয়ে থাকা দেবী ধরিত্রী।

ধরিত্রীকে ব্যপ্ত করলেন দেবী শ্রী, এবং দেবী শ্বেতা, এবং ব্যপ্ত করার শেষে তাঁর মধ্যেই সমস্ত যোনীকে স্থাপন করলেন তাঁরা। এই অভূতপূর্ব কৃত্যের দিকে দৃষ্টিপাত না করলেও, যখন সমস্ত যোনী ধরিত্রীতে নিবাস করে প্রকৃতিকে বহন করে চলা শুরু করে দিলেন, তখন ডাহুক একদিন ত্রিমূর্তির মজলিশে এসে উপস্থিত হয়ে বললেন, “ও আপনারা উৎসব মানাচ্ছেন! অন্যদিকে প্রকৃতি নিজের বিস্তার করেই চলেছেন। … কোথায় পরমেশ্বর রমনাথ, আপনার স্ত্রী কোথায়? সন্ধান করেছেন তাঁর! … তাঁর পুত্রের নাশের পর তো সে আর রমবনে কদমও রাখেনি, খবর রেখেছেন তাঁর!”

ডাহুকের এমন তির্যক মন্ত্রণায় অস্থির হয়ে উঠে রমনাথ বললেন, “যা বলতে চাও স্পষ্ট ভাবে বলো ডাহুক”।

এক নিকৃষ্ট হাসি হেসে ডাহুক বললেন, “আপনার পত্নী তিন ভাগে খণ্ডিত হয়ে গেছিলেন, আপনাদেরই স্বেদ থেকে নির্মিত বাণের প্রভাবে। আর সেই তিন খণ্ড মিলে ধরিত্রীকে মহাউর্বর করে তুলেছে। … একবার তাকিয়ে তো দেখুন। দেবী অম্বিকা শক্তিরূপে, আর তাঁর দুই অঙ্গ শ্রী ও বিদ্যারূপে প্রবাহিত হয়ে হয়ে সমস্ত যোনীদের মধ্য থেকে এক এমন যোনির নির্মাণ করে দিয়েছে, যেই যোনি আপনাদের অধিকারের থেকে মুক্ত হতে সক্ষম। … তাকিয়ে দেখুন”।

“আর সেই যোনিতে শ্রী ও বিদ্যা বারংবার ক্রিয়া করে করে, বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১০১ যোনিশ্রেষ্ঠ প্রেরণ করে করে, এই যোনিকে আপানদের বিরোধী করে তুলেছেন। এবার আপনারা কি করবেন?”

রমনাথ উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, “আর তোমরা কি করছো? তোমরা তোমাদের দায়িত্ব পালন করছোনা কেন?”

উত্তরে বাহুক বললেন, “আমরা আমাদের কর্তব্য পালন সমানেই করে চলেছি। সাধপাল জিতেশ যন্ত্র, মন্ত্র আর তন্ত্র রূপে তিনলোক স্থাপন করে দিয়েছে। আমি আর আমার ভ্রাতা ডাহুক সকল যোনিকে বল আর ছলের প্রতি আশ্রিত করে দিয়েছি। কিন্তু এই দেবী শ্রী আর দেবী শ্বেতা, যাকে এই যোনিশ্রেষ্ঠরা দেবী বিদ্যা বলেন, তাঁদেরকে আমরা কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিনা। … এঁরা না তো যুদ্ধ করে, আর না যুদ্ধে অংশ নেয়। এঁদেরকে আমরা ধরাছোঁয়ার মধ্যেই পাচ্ছিনা। কিন্তু আপনারা তো নিষ্ক্রিয় হয়ে উৎসবে মেতে রয়ছেন!”

দুধেশ্বর সম্মুখে এগিয়ে এসে বললেন, “বেশ আমরা যা করার করে দিচ্ছি। শ্রী আর বিদ্যাকে নিয়ে তোমাদের ভাবতে হবেনা। দেবী পীতাকে আমি ধারণ করে পীতাম্বর হয়ে যাবো, আর কোকিলা দেবী শ্বেতাকে ধারণ করে শ্বেতাম্বর হয়ে যাবেন। তারপর থেকে তাই করবেন তাঁরা, যা আমাদের সিদ্ধান্ত হবে। তোমরা গিয়ে শক্তির সামনা করো”।

ডাহুক ও বাহুক সেখান থেকে প্রস্থান করলেন কারণ তাঁদের যা প্রয়োজন ছিল, তা তারা করে দিয়েছেন। দেবী অম্বিকা কৃত্তিকালোকের বাইরেই অবস্থান করে ধ্যনস্থ থাকেন সর্বক্ষণ, যাতে তাঁর পুত্রকে তিনি মাঝে মাঝে দেখতে পান। সেই স্থানে এবার দেবী শ্রী ও দেবী শ্বেতা এসে উপস্থিত হয়ে বললেন, “দেবী, দুধেশ্বর এবং কোকিলা আসছে আমাদের দুইজনকে নিজেদের সাথে নিয়ে যেতে। কিছু করুন দেবী!”

দেবী অম্বিকা মৃদু হেসে বললেন, “চলে যাও তাঁদের সাথে। উচিত সময়ে আমি তোমাদেরকে ডেকে নেব আমার কাছে”।

দেবী পাবনি ও দেবী কৃত্তিকা সম্মুখে উদিত হয়ে বললেন, “এ কি বলছো গৌরি! মৃষুকে ১০১ বার যোনিশ্রেষ্ঠ রূপে স্থাপন করে করে, আমরা সকলে মিলে যে তাঁকে তাঁর সপ্তরূপকে জাগ্রত করার অবস্থায় নিয়ে আসতে পেরেছি, তা দেবী পীতা ও দেবী শ্বেতার কারণেই। এখন মৃষু যখন সেই সাত রূপকে ধারণ করবে, সেই সময়ে দেবী শ্রী ও দেবী বিদ্যা তাঁর সম্মুখে থাকবেই না!”

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “আমি জানি কৃত্তিকা, আমার পুত্র এবার নিজেকে জানার জন্য যেই সাত রূপকে স্বীকার করা প্রয়োজন, সেই সাত রূপকে স্বীকার করা জন্য সাতবার যোনিশ্রেষ্ঠদের মধ্যে জন্ম নেবে। আর জানি বলেই এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি যে, শ্রী মায়ারূপে দুধেশ্বরের সাথে যুক্ত হয়ে দুধেশ্বরকে মায়াপতি করে তুলে ভয়ানক ভাবে পীতাম্বরকে অহংকারী করে তুলবে; আর বিদ্যা কোকিলার সাথে যুক্ত হয়ে তাঁকে বিদ্যাপতি করে তুলে তাঁকে অহিমিকায় চূড় করে দেবে”।

দেবী পাবনি মাথা নেড়ে ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “না গৌরি না, এমন হতে পারেনা। তুমি কি মনে করো মৃষু একা তোমার পুত্র। আমরা সকলে মিলে তাঁকে সন্তানরূপে ধারণ করেছি। আমরা তোমার এই সিদ্ধান্তে সহমত নই। … মৃষু দিবারাত্র তাঁর মাকে সন্ধান করে ফেরে, মনমরা থাকে। আর তুমিও তো তাই। এই কৃত্তিকালোকের অভ্যন্তরে দেখার অধিকার বা সামর্থ্য কারুর নেই। সেই সামর্থ্য তুমি নিজের কাছেও রাখো নি, পাছে তোমার থেকে সেই সামর্থ্য কেউ চেয়ে নিয়ে তোমার সন্তানকে বিপদে ফেলে দিতে পারে। তাই তুমি দিবারাত্র তোমার সন্তানকে একঝলক দেখবে বলে, এখানে এই কৃত্তিকালোকের দ্বারে ধ্যানাসনে বসে থাকো। … এই মায়ের আর ছেলের বেদনাপর্ব এমন ভাবে চিরকাল চলতে পারেনা! … তোমার এই সিদ্ধান্তে আমরা সহমত নই”।

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “অম্বিকা কখনোই ভগবতী নয় দিদি। কেন জানো? কারণ সে তো কেবলই তৃতীয় নেত্র। তাঁর বাকি দুই নেত্র, আর সেই নেত্রের দুই পর্দা, কেউই তো অম্বিকা নয়। সেই দুই নয়ন হলেন দেবী শ্রী আর বিদ্যা, আর সেই দুই নয়নের পর্দা হলেন দেবী কৃত্তিকা আর দেবী পাবনি। এই চারজন তাঁর সাথে এক হলে, তবেই তো ত্রিনয়ন, আর তবেই ত্রিনয়নী ভগবতী”।

আবার মিষ্ট হেসে, “এবার বলো, এই সত্য তোমরাই জানো না, তাহলে তোমাদের থেকে যে শিক্ষা গ্রহণ করে, সেই মৃষু কি করে জানবে?… না জানবে না, আর যদি না জানে, তাহলে সে তাঁর মাকেও জানবেনা, আর মাকে না জানলে সে নিজেকেও জানবেনা, কারণ সে যে মা সর্বস্ব। মাকে জানার আগে সে যে নিজের দিকে দৃষ্টিও রাখে না”।

হাস্য মুখে দেবী পাবনিকে পিছন থেকে আলিঙ্গন করে দেবী অম্বিকা বললেন, “দিদি, এবার মৃষুকে স্বনির্ভর করতে হবে। প্রত্যক্ষ ভাবে তোমরা কেউ তাঁর সহায়তা করবেনা। জানি পরোক্ষ ভাবে সহায়তা না করে তোমরা থাকতেও পারবেনা, আমিও পারবো না। মা আমরা তাঁর, আর সে যে মা অন্ত প্রাণ। … হ্যাঁ, আমরা প্রত্যক্ষ ভাবে তাঁকে সহায়তা না করলে, তার মধ্যে মায়ের প্রতি অভিমানও জাগবে, হয়তো বিদ্বেষও জাগতে পারে। কিন্তু এটা করা আবশ্যক। তাকেও বুঝতে হবে যে তাঁর মা কেবল প্রত্যক্ষ নন। তাকেও জানতে হবে যে, তার মা যতটা প্রত্যক্ষে, তার সহস্র গুণ অধিক পরোক্ষে”।

“তাঁকে এবার জানতে আর বুঝতে হবে যে, তাঁর মা শুধু তাঁর নিদ্রার জন্য আর আহারের জন্য প্রয়োজন নয়, তাঁর তথা সমস্ত যোনির সমস্ত জীবের জীবনের জন্য প্রয়োজন। … দিদি, কৃত্তিকা, শ্রী, শ্বেতা, যাত্রা না করে কনো কিছুকে লাভ করলে, সেই বস্তুর প্রতি আসক্তি তো জন্ম নেয়, কিন্তু সেই বস্তুর জ্ঞান ব্যক্তির মধ্যে স্থান পায়না। … তেমনই মৃষু যে না চাইতেই কৃত্তিকার থেকে দৃঢ়তা পেয়েছে, দিদির থেকে বিস্তার পেয়েছে, শ্রীর থেকে পবিত্রতা পেয়েছে, আর শ্বেতার থেকে কলা পেয়েছে”।

“সমস্ত কিছু সে সমস্ত সময়েই পাবে, কিন্তু আর সহজাত ভাবে নয়। এবার তাকে তা অর্জন করতে হবে। যাত্রা করতে হবে তাকে তার মায়েদের কাছে, আর তাঁকে মা জ্ঞানে, গ্রহণ করতে হবে। তাকে এবার প্রয়াস করে দৃঢ় হতে হবে, তপস্যা করে বিস্তৃত হতে হবে, নিষ্ঠাসহকারে পবিত্রতা লাভ করতে হবে, আর অধ্যাবশায় দ্বারা কলাজ্ঞান অর্জন করতে হবে। … তোমাদের সকলে যে কেবল তার নয়, সমস্ত যোনির সমস্ত চেতনাদের জননী, এবার তাকে এই কথা উপলব্ধি করতে হবে। তবেই সে সপ্তকলা পূর্ণ মৃষু হবে, নিখাদ মৃষু হবে, আমাদের পুত্র মৃষু হবে”।

“শুধু শ্রী আর বিদ্যা নয়, কৃত্তিকা তোমাকেও আবার পক্ষদের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করতে হবে, এবং আদিত্যদের দাস হয়ে যে তোমার বাকি ভগিনীরা রয়েছে, তেমন ভাবে তোমাকেও থাকতে হবে। পাবনি তোমাকেও এবার ধরিত্রীতে বইতে হবে, দিবারাত্র তোমাকে কলুষিত হতে হবে। … হ্যাঁ, এবার আমাদের কঠিন হতেই হবে”।

“সন্তান নিজের মা’কে পীড়িত দেখলে, তবেই নিজের অন্তরের সমস্ত সামর্থ্যকে একত্রিত করা শুরু করে। মাতাকে পঙ্ক থেকে উদ্ধার করাই সন্তানের কাছে স্বপ্ন হয়, জীবনের ব্রত হয়। সন্তানের প্রাণ প্রবাহিতই হয় তাঁর মাতাকে পঙ্ক থেকে উদ্ধার করার জন্য। আর তাই মাতাকে সন্তানের কাছে বাস্তবিকতা জানানোর আর শেখানোর সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হলো নিজেকে বিপাকে স্থাপন করায়”।

“সন্তান যখন তাঁর মাতাকে বিপাকে দেখে, তখন সে নিজেকে অসহায় বলে মানতে নারাজ হয়ে যায়। সে নিজে নিজের সহায় হয়ে ওঠে। তার অন্তরের সামর্থ্য তখনই জাগ্রত হয়। … তাই আমাদেরকে এই রাস্তা বেছে নিতেই হবে। জগতে স্থিত হয়ে দিদি তুমি যখন নদী বেশে বইবে আর তোমাকে আত্মসর্বস্ব হয়ে আত্মের দ্বারা বশীভূত হয়ে তোমাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে বাঁধ নির্মাণ করবে, তখন আমাদের পুত্রের অসহনীয় পীড়া হবে তোমাকে এই অবস্থায় দেখে। কিন্তু বিচার করো দিদি, তোমার এই অবস্থা দেখার পর সে পীড়িত হয়ে কাকে দেখবে? শুধু তোমাকে? না দিদি, তোমার সাথে সাথে সে আত্মকেও দেখবে, আর আত্মকে নিজের শত্রু বলে গণ্য করতে সক্ষম হবে”।

“কৃত্তিকা, তুমি যখন আদিত্যদের দাসী হয়ে থাকবে, আর তোমাকে তোমার ভগিনীদের সাথে আদিত্যরা যখন জ্যোতিষের কারাগারে বন্দী করে রেখে দেবে, তোমার পুত্র মৃষুর নেত্র বিস্ফারিত হয়ে অশ্রু প্রকাশ্যে এসে যাবে। কিন্তু সে কি শুধু তোমাকে দেখতে পাবে তখন! না, তোমার সাথে সাথে জ্যোতিষ দ্বারা সকল চেতনাকে যেই ভাবে বন্দী করার প্রয়াস করে আত্ম, তাকে প্রত্যক্ষ করবে, আর নিজেকে নিজের শত্রুর সাথে যুদ্ধের জন্য সজ্জ করা শুরু করবে”।

“একই ভাবে শ্রী, বিদ্যা, তোমাদের প্রতি তোমাদের পতিদের আচরণ, তোমাদের দাসী করে রেখে দেওয়াকেও সে দেখবে আর ত্রিগুণকে সে শত্রু রূপে সনাক্ত করতে পারবে। দিদি, কৃত্তিকা, শ্রী, বিদ্যা, মৃষু কেন কারুর পক্ষেই সাধদের শত্রু জ্ঞান করা এমন কনো কঠিন ব্যাপার নয়। তাঁরা তো প্রত্যক্ষ ভাবেই শত্রু। কিন্তু তাঁদেরকে যারা চালনা করে, তাদেরকে শত্রু ক’টি যোনি জ্ঞান করতে পেরেছে? যোনিশ্রেষ্ঠদের মধ্যেই বা কয়জন তা সনাক্ত করতে পেরেছে! না দিদি, কেউ পারেনি”।

“অর্থাৎ যারা প্রকৃত শত্রু, যারা মিত্রের মুখশ ধারণ করে নিজেদেরকে ভগবান সাজিয়ে রেখে, মায়ের আর সন্তানের মধ্যে দূরত্বের সঞ্চার করে চলেছে, তারা কারুর নজরে শত্রু বলে চিহ্নিতই হচ্ছেনা। … তাঁদের শত্রু বলে সনাক্ত করানোর জন্য, মৃষুর মায়েদের কঠিন হতে হবে। মায়ের নেত্র দিয়ে সন্তান জগত চেনে। তাই মায়েরই কর্তব্য সন্তানকে জগত চেনানো। জানি মায়ের প্রাণ পরে থাকে কখন সন্তানকে স্নেহ করবে সেই আশে। কিন্তু কেবলমাত্র স্নেহ করাই এক মাতার কর্তব্য বা ধর্ম নয়। মাতার কর্তব্য সন্তানকে সঠিক আর বেঠিক সম্বন্ধে সচেতন করে তোলা, সন্তানের মধ্যে বিচারশক্তির সঞ্চার করা, সন্তানের মধ্যে বিবেকের জন্ম দিয়ে তাঁকে ভাব ও আবেগের মধ্যে ভেদ বোঝানো, তাঁর মধ্যে বৈরাগ্যের সঞ্চার করে আসক্তি বিরক্তি উভয় থেকেই বিমুখ করে তুলে প্রকৃতঅর্থে শক্তিশালী যোদ্ধা করে তোলা। সন্তানকে যখন বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য সম্পন্ন এক মহাযোদ্ধা রূপে প্রকাশিত করা সম্ভব হয়, তখনই এক মায়ের সার্থকতা। তোমরা সকলে সার্থক মা হও, শুধু নামে মা হয়ো না, শুধু সন্তানের সাধ পুড়ন করা মা হয়ো না, সন্তানকে মুক্তির পথে ধাবিত করা মা হও, সন্তানকে মুক্তিযোদ্ধা নির্মাণ করা মা হও”।

কৃত্তিকা সম্মুখে এসে বললেন, “আমাদের সকলের কথা বললে, তোমার কথা তো বললে না গৌরি!”

দেবী অম্বিকা মৃদু হেসে বললেন, “কৃত্তিকা, ব্যক্তি একবার শক্তির সাথে সাখ্যাতকার করে ফেললে, আর তাঁর মধ্যে বিচার, বিবেক, বৈরাগ্য, পবিত্রতা, বিদ্যা, কনো কিছু দানা বাঁধতে পারেনা। অহংকারী হয়ে ওঠে সে। তোমরা কি চাও যে তোমাদের পুত্র অহংকারী হয়ে যাক! … (পুনরায় মৃদু হেসে) আগে সে তোমাদের গ্রহণ করুক, তোমাদেরকে মাতা বলে জ্ঞান করুক। অতঃপরে সে স্বয়ংকে চিনবে আর আমাকেও। আর যখন সে আমাকে চিনবে, তখন আর আমারা পৃথক অস্তিত্ব থাকবো না। আমরা তখন এক ও একাকার হয়ে গিয়ে তাঁর সম্পূর্ণ মাতা হয়ে উঠবো, যাকে সে মাতা অম্বিকা বলবে না, বলবে সর্বাম্বা”।

“আর সেদিন সে সমস্ত কিছু স্বতঃই জেনে যাবে, যা এতাবৎ কাল হয়েছে। আর আগে হবে। সেদিন সে সম্যক ভাবে পরমাত্মকে, পরমাত্মের ত্রিগুণকে, আর সেই ত্রিমূর্তির কীর্তিকে জেনে যাবে। জেনে যাবে তাঁর সমস্ত ১০১ ও অন্তিম ৭ রূপের যাত্রার কথা, জেনে যাবে ত্রিমূর্তি নির্মিত দুর্গের কথা, আর তা জেনে সে স্বয়ং আমাকে রথী করে নিজে আমার রথের সারথি হয়ে উঠে মহাসংগ্রামে রত হবে”।

দেবী পাবনি উৎকণ্ঠার সাথে বললেন, “আর ততদিন তুমি এই বেদনার মধ্যেই বিরাজ করবে গৌরি!”

এক গভীর শ্বাস নিয়ে দেবী অম্বিকা বললেন, “আমার থেকে অধিক পীড়া গ্রহণ করবে মৃষু স্বয়ং। আমি তো মা, সন্তানের সামনে যাচ্ছিনা ঠিকই, কিন্তু সন্তানকে সন্তান বলে সর্বদাই জানছি। তাঁর মুখ থেকে মা ডাক শুনছি না ঠিকই, কিন্তু সর্বদা তাকে আমি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সে তো আমাকে দেখতেও পাবে না, অনুভব করবে কিন্তু কি অনুভব করবে? (কম্পিত গলায়) নিজের মাকে অপূর্ণ রূপে অনুভব করবে। … তাঁর বেদনা কতই না অধিক হবে। কে জানে, যখন সম্পূর্ণ সত্য জানবে, আমার এই দূরত্ব বজায় রাখার জন্য তখন আমাকে ক্ষমা করতে পারবে কিনা!”

দেবী শ্রী বললেন, “না না, এমন কিছুতেই হবেনা। বিচার তাঁর মধ্যে জাগবে তো! বিবেক, বৈরাগ্য দ্বারা সে সমস্ত কিছু বুঝে যাবে যে তাঁর মা কেন এই দূরত্ব রেখেছিল তাঁর সাথে। … মায়ের আর পুত্রের মিলন হবেই। দেখে নিও দেবী। তোমার সন্তান তোমার বক্ষে আছরে পরে তোমার বক্ষবস্ত্রকে নিজের অশ্রুতে সিক্ত করে দেবে”।

দেবী পাবনি এবার নতজানু হয়ে করজোড়ে বসে পরলেন দেবী অম্বিকার সম্মুখে। তা দেখে দেবী অম্বিকা ইতস্তত হয়ে তড়িঘড়ি দেবী পাবনিকে পুনরায় দণ্ডায়মান করে বললেন, “এ কি দিদি, আমার পুত্রের জননী নতজানু কেন হবে!”

পাবনি বললেন, “ক্ষমা গৌরি, ক্ষমা জগজ্জননী। … মা হবার অহংকারে আমি জগজ্জননীর আত্মত্যাগকে পাষাণহৃদয় ভেবে বসেছিলাম। সন্তানের কল্যাণের জন্য তিনি যে অমার্জিত ত্যাগ করতে দ্বিতীয়বার ভাবেন না, একে তাঁর দ্বিচারিতা ভেবে বসেছিলাম। … ক্ষমা গৌরি, অকথা বলে দিয়েছিলাম। ভুলে গেছিলাম যে আমরা মৃষুর পালিতা মা, বাস্তবে তুমিই যে তাঁর মা। তোমার প্রতিটি কোষ তাঁর সাথে যুক্ত, তোমার প্রতিটি নাড়ি তাঁর সাথে যুক্ত, তোমার প্রতিটি স্বেদকণা তাঁকে নিত্যস্নান করায়। ক্ষমা গৌরি”।

দেবী শ্রী সম্মুখে এসে বললেন, “মৃষুর অন্তিম সাত আত্মজ্ঞান পর্যায়ের প্রথম পর্যায়ের সময় এসে গেছে দেবী। আমি মায়াবেশে তাঁকে আমার আঁচল ছাড়া করবো। প্রস্তুত থেকো সকলে, হয়তো সে মায়ের থেকে বিচ্ছেদের কারণে একটু অধিকই অভিমানী হয়ে যাবে। … কিন্তু এমন করবো আমি মায়াপতির মায়া হবার জন্য। মায়াপতির চরণসেবা করবো আমি, যাতে মৃষুর কোমল হৃদয়ে প্রবল আঘাত লাগে, আর সে তাঁর মা’কে এই দাসত্ব থেকে উদ্ধার করতে উদ্যত হয়ে ত্রিগুণের সর্বাধিক বিষাক্ত গুণের সাথে পরিচিত হয়”।

দেবী শ্বেতা সম্মুখে এসে অশ্রুপূর্ণ নয়নে বললেন, “দেবী শ্রী ত্যাগ দেবার পর, আমি তাঁকে ত্যাগ দেব। তাঁকে ত্যাগ দিয়ে আমি পঞ্চভূতের কাছে স্থিত হয়ে পঞ্চভূতের প্রতি সাধদের এবং ত্রিগুণের আচরণকে প্রত্যক্ষ করাবো মৃষুর কাছে”।

দেবী পাবনি বললেন, “শ্বেতার পর আমার পালা। আমি ত্যাগ দেব তাঁকে, আর ত্যাগ দেবার পর তাকে দেখাবো, আমাকে কি অসহনীয় পীড়া প্রদান করে আত্মসর্বস্বরা”।

দেবী কৃত্তিকা বললেন, “শেষে আমি ত্যাগ দেব তাঁকে। আমি ত্যাগ দিলে, আমি সহ আমার ভগিনীদের উপর আদিত্যদের অত্যাচারকে দেখাবো তাকে”।

দেবী শ্রী বললেন, “কিন্তু এতে তো তাঁর পাঁচ দেহধারণই সম্পন্ন হলো। তারপর কি হবে?”

দেবী শ্বেতা বললেন, “ষষ্ঠম বারে, আমাদের কারুকে না পেয়ে সে দেবী অম্বিকাকে আঁকড়ে ধরবে, আর দেবী আমাদের সকলের আভাস তাঁর নিজের মধ্যেই প্রদান করবেন। সেই আভাস ধারণ করে সপ্তম বারে সে পূর্ণ ভাবে তাঁর সমস্ত মাতাকে ধারণ করবে সে, আর পূর্ণ ভাবে নিজেকে সনাক্ত করে, আমাদের সকলের সাথে মিলিত হবে”।

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “একবার তা হয়ে গেলে, শুরু হবে দুর্গবিনাশ অভিযান”।

দেবী কৃত্তিকা অশ্রুপূর্ণ নয়নে করজোড়ে বললেন, “ধন্য হে জগন্মাতা। অপার তোমার মাতৃত্ব। অপার তোমার সন্তানপ্রেম। সন্তানকে লোকদেখানি প্রেম তো সকল মাতাই করেন। কিন্তু সন্তানের চরিত্রনির্মাণের জন্য প্রেম করেন কেবলমাত্র জগজ্জননী। হৃদয়ে পাথর রেখে প্রেম করেন তিনি”।

দেবী অম্বিকা মাথা নেড়ে বললেন, “প্রশংসা শুনতে ভালো লাগে না দেবী। আমার পুত্রের লীলা দেখতে ইচ্ছা করে খালি। … শুরু করো দেবীরা, তোমাদের লীলা, আর প্রসারিত হতে দাও তোমাদের আদরের মৃষুর লীলা। সে কাঁদবে, সে অভিমান করবে, সে বেদনায় ছটফট করবে। জানি তোমাদের সেই সমস্ত কিছু দেখে বারবার হৃদয় কেঁপে কেঁপে উঠবে। কিন্তু দুর্বল হয়ে যেও না। জেনে রেখো, সকলের নজরে মৃষু মৃত। তোমাদের দুর্বলতা সকলকে বলে দেবে যে সে জীবিত”।

মৃষু ভ্রূণ থেকে মুক্ত হয়ে শিশুর আকার ধারণ করলেন। স্বর্ণের মত গাত্রবর্ণ, কুঞ্চিত কেশ, বিস্ফারিত নয়ন, মৃদু কাষ্ঠবর্ণের ওষ্ঠ, এবং শূর্প নাসিকা। কোমল, অতি কোমল অঙ্গ। রূপ দেখে তাঁর স্বয়ং শ্রীও যেন বশীভূত হয়ে গেলেন। বিদ্যার মধ্যে যেন এক অজানা তৎপরতা জেগে উঠলো এই পুত্রের সাথে একাত্ম হবার জন্য। পাবনি ধরিত্রীর মুখে নেমে এলেন, একবার পুত্রের স্পর্শ লাভ করার লালসায় অবিরাম ভাবে সাগরের দিশায় চলতে থাকলেন। কৃত্তিকা যেন মধ্যগগন থেকে নড়তেই আগ্রহী নয়। আদিত্যদের হাঁকডাকে তিনি তেজস্বিনী হয়ে উঠলেন, এই বোধ হয় তাঁর অন্তরের আদিশক্তি সম্মুখে এসে যাবে, এমন অবস্থা হয়ে গেল।

আর মোহিত হয়ে রইলেন দেবী ধরিত্রী। মৃদু ভূকম্পনে নিজেকে মাতিয়ে রাখলেন যাতে মৃষুর এই রূপের কোমল চরণ একটি কঙ্করকেও নিজের পদতলে না অনুভব করে। বাহ্যিক ভাবে অতি সামান্য সেই বালক, যার নামকরণ করা হয়েছিল গতি। স্বয়ং দেবী মায়া তাঁর নামকরণ করেছিলেন। পুত্রকে দেখে আপ্লুত মায়া দুইবাহু উন্নত করে, আলিঙ্গনসুখ লাভ করতে নেত্র বন্ধ করলে, শিশু গতি মাতার ক্রোড়ে লম্ফ দেবার জন্য ব্যকুল ভাবে দৌড় লাগালেন। কিন্তু সেই দৌড় মাঝপথেই সমাপ্ত হয়ে গেল, যখন দেবী মায়ার রূপে লালায়িত হয়ে, স্বয়ং দুধেশ্বর পীতাম্বর হবার তীব্র বাসনায় নেত্র বন্ধ করা মায়াকে নিজের বিজয়রথে অপহরণ করে নিয়ে চলে গেলেন।

বালক গতির দৃষ্টি উর্ধ্বপানে যেখানে তাঁর মাতা হাঁসফাঁস করছিলেন তাঁর পুত্রের কাছে ফিরে যেতে, কিন্তু তিনি আসতে পারছিলেন না কারণ জগতের পরমগুরু তাঁর রূপে কামাক্রান্ত হয়ে তাঁকে অপহরণ করেছেন। কৃত্তিকা হাঁসফাঁস করলেন বেদনাগ্রস্ত পুত্রকে বক্ষে ধারণ করতে, তো দেবী অম্বিকা তাঁর স্কন্ধ আকর্ষণ করে তাঁকে আটকালেন। দেবী বিদ্যার সমস্ত অঙ্গ যেন পুত্রের দিকে এগিয়ে যেতে ব্যস্ত, কিন্তু কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা তাঁর চরণকে ভূমিতে আটকে রেখে দিল।

শান্ত হলেন সকলে, যখন এই দিব্য বালকের দিব্যরূপে আকৃষ্ট হয়ে নিঃসন্তান দেবী প্রজাপতি। জননীর আঁচল তো পেলেন, কিন্তু মানবজননীর মধ্যে কি সেই দিব্য নিঃস্বার্থপ্রেম প্রদানের সামর্থ্য থাকে! … শিশু গতির মনে কনো আনন্দ নেই। দিবারাত্র মাতার অঙ্গের গন্ধের সন্ধান করে ফেরে সে। বেদনাই যেন তাঁর জীবনের সংজ্ঞা হয়ে ওঠে। আর তাই সর্বত্র বেদনার দৃশ্যই তাঁর নেত্রে, মস্তকে এবং চেতনার সাগরে ভেসে যায়। সমস্ত জীবের বেদনা, সমস্ত মানবের বেদনা, পীড়ার বেদনা, আঘাতের বেদনা, জ্বরার বেদনা, মৃত্যুর বেদনা, এই সমস্তই তাঁর জীবনের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হয়ে উঠতে শুরু করলে, তাঁর অন্তরের যোদ্ধাকে এই বেদনাসমূহই আহ্বান জাগিয়ে বলল, “গতি, এই বেদনার কি কনো অন্ত নেই? কনো নিরাময় নেই এই বেদনার?”

গতি নিশ্চয় করলো, গৃহত্যাগ করবে সে আর এই বেদনার নিরাময়ের উত্তর লাভ করবে। সেই সংবাদ ধরিত্রীকে প্রদান করলেন স্বয়ং দেবী কৃত্তিকা। তাই ধরিত্রী গোপালিকা রূপ ধারণ করে পরিকিমরি করে গতির সম্মুখে এসে, তাঁর সঙ্গলাভের জন্য আকুতি করলেন। গতি তাঁকে ত্যাগ তো করেলন না, কিন্তু গ্রহণ করেও করলেন না। তাঁকে রেখে দিয়ে, স্বয়ং চলে গেলেন বেদনার নিরাময়ের উত্তর সন্ধানে।

একাকী বনে ঘুরে ঘুরে বেড়ান গতি। তাঁর জননীরা ব্যকুল হয়ে তাঁকে পরোক্ষ ভাবে সেবা করতে থাকলে, গতি একদিন বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন, “যদি প্রত্যক্ষে এসে স্নেহ করতে আপত্তি থাকে, প্রতিবন্ধকতা থাকে কনো প্রয়োজন নেই আমাকে স্নেহ করার। আমি আমার মাতার অঙ্গের সুবাসকে ভালো করেই চিনি। আমি জানি আপনি এখানে রয়েছেন আর নিত্য আমার সেবা করে চলেছেন। কেন? হয় প্রত্যক্ষ হন, আমাকেও সেবা করার অনুমতি প্রদান করুন, নয় আমাকে ঋণী করা বন্ধ করুন”।

দেবীরা আরো একটু দূরত্ব বাড়িয়ে সেবা করা শুরু করলেন গতির, কিন্তু পুত্রের থেকে মা কি করে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন! … গতি মানবীয় বন্ধনে আবদ্ধ। তাই দূরে দাঁড়িয়ে সেবা করা মাতার অঙ্গ গন্ধ পেলেন না। … একদিকে বেদনার কারণ জানার প্রয়াসে মাতা বিদ্যার থেকে সহায়তা লাভের কামনা, আর অন্যদিকে সেই মাতার থেকেই দূরে থাকার অভিমান। দুই মিশিয়ে গতির জীবনকে অতিশয় কাতরতাপূর্ণ করে তুলল। আহার করে না সে, আহার করলেই যেন মায়ের অঙ্গগন্ধ যুক্ত হাত তাঁর মুখে সম্মুখে এগিয়ে আসে। শিশুর মত ঠোঁটফুলিয়ে কেঁদে ওঠে গতি সেই সুবাস লাভ করে, কিন্তু অভিমানে আর মুখ খুলে আহার গ্রহণ করেনা।

নিদ্রা যায়না সে। নিদ্রা গেলেই যেন মায়ের সুবাসযুক্ত বাহুর গন্ধ পেতে থাকে নিজের মস্তকের নিম্নদেশ থেকে, যেন মাতা নিজের বাহু প্রসারিত করে দিয়েছেন পুত্রের নিদ্রার জন্য। মাতাকে অপহরণ করা হয়েছে, তাই মাতা প্রত্যক্ষ ভাবে আসতে পারছেন না। বিবশ মাতার বেদনায় কাতর গতি। তাঁর বাহুর সুমধুর গন্ধ তাঁকে এই সকল কথা স্মরণ করিয়ে দিলে, তাঁর নয়ন থেকে অশ্রুর ধারা নিম্নের দিকে, যেখানে তাঁর মাতার বাহু অপেক্ষা করছে উপাধান রূপে, সেদিকে এগিয়ে যেতে থাকে। তড়িঘড়ি গতি উঠে পরে শয্যা অবস্থা থেকে। মাতার জন্য বেদনাগ্রস্ত এটা জানলে মাতার বেদনা আরো অধিক হয়ে যাবে। তাই নিজের অশ্রুধারাকে মাতার বাহুস্পর্শ করতে দেবেনা সে।

আর শুধু তাই নয়, এরপর থেকে নিদ্রা যাওয়াও বন্ধ করে দিলো গতি। উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন তাঁর সকল মাতা। উপস্থিত হলেন মাতা অম্বিকার কাছে। তিনি হেসে বললেন, “অন্যের বেদনার কারণ খুঁজে পাওয়া ততক্ষণ সম্ভব নয়, যতক্ষণ না সেই একই বেদনা নিজে ভোগ করে। … গতি সেই বেদনা ভোগ করার দিকেও অগ্রসর। শীঘ্রই সে বেদনার আসল কারণের সন্ধান করে ফেলবে। … দেবী অভিমানী সে, কিন্তু জানেন কি প্রেমী কখনো অভিমান করেনা। অভিমানের উৎস যা, বেদনারও উৎস তাই, কারণ বেদনার প্রথম পূর্বাভাসই অম্ভিমান”।

“শীঘ্রই গতি সেই সত্য জেনে ফেলবে। আর তা জেনে ফেলার পর, তাঁর হৃদয়ে মাতাকে নিয়ে যেই সামান্য কলুষ অবশিষ্ট রয়েছে, তার অধিকাংশই সে নিজের থেকে ত্যাগ করে দেবে। আমার পুত্রের লীলা দেখো দেবীরা। তাঁর লীলা অপরম্পার। তাঁর প্রতিটি গতিপ্রগতি সমস্ত যোনির জন্য জীবন শিক্ষা। তাই তাঁকে তাঁর লীলা করতে দাও, সমস্ত জীবকে শিক্ষা দিতে দাও তাকে”।

দেবী কৃত্তিকা উৎকণ্ঠার সাথে বলে উঠলেন, “কেমন মা তুমি! এতোটুকুও দুর্বলতা নেই পুত্রের প্রতি!”

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “মোহ থাকলে দুর্বলতাও থাকতো, কিন্তু প্রেম করি যে তাঁকে। দুর্বল কি ভাবে হতে পারি। যদি মা’ই দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে পুত্র কি করে সবল হবে। … হ্যাঁ, প্রেমবিরহে আমার বক্ষ যেন সর্বক্ষণ ফেটে যাচ্ছে। একই বুকফাটা কষ্ট আমার পুত্রও ভোগ করছে সেখানে ওই ধরণীতলে স্থিত হয়ে। … কিন্তু মা-ছেলে আমরা। দুইজইনেই দুর্বল হতে পারিনা। আমাদেরকে সকলের বল হয়ে স্থিত থাকতে হবে। সে পুত্র হয়ে দুর্বলতার সাথে যুদ্ধ করছে, সবল হবার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, আমি মা হয়ে দুর্বল হয়ে গেলে, সে কি করে নিজের যুদ্ধ চালিয়ে যাবে!”

দেবী পাবনি বললেন, “গৌরি, এমন না হয় যে, সে এই বেদনা সইতে সইতে পাষাণ হয়ে যায়! যদি তেমন হয়, তখন কিন্তু তুমি আর কখনো তোমার পুত্রকে ফিরে পাবেনা, এটা স্মরণ রেখো”।

দেবী অম্বিকা মৃদু হেসে বললেন, “প্রেম মানে বিশ্বাস দিদি। বেদনা পাষাণ অবশ্যই করে, তুমি সঠিক বলেছ দিদি। কিন্তু বিরহ পাষাণ করেনা, বিরহ যে কোমল পুষ্প করে দেয় তাকে। … আমার পুত্র বেদনার সাথে যুদ্ধ করছে, বিরহের সাথে নয়। মাতাকে হারিয়ে সে বিরহকাতর, কিন্তু সেই বিরহজ্বালা থেকে সে মুক্ত হতেই চায়না, বরং হৃদয় জুরে সে এই বিরহজ্বালাকে সংরক্ষণ করে রেখে, মাতার প্রতি নিজের প্রেমকে আরো ঘন করে তুলতে চায়। তার আপত্তিন তার বেদনা নিয়ে। তার বেদনা যে তাঁর মাকে অধিক বিরহ কাতর করবে, সেই ব্যাপারে সে নিশ্চিত। কিন্তু কিছুতেই নিজের বেদনার নিদান খুঁজে পাচ্ছেনা। সে বেদনার থেকে মুক্ত হয়ে চাইছে, বিরহের থেকে নয়। সে পুষ্প হতে চাইছে, পাষাণ হতে নয়”।

দেবী বিদ্যা বললেন, “আমি স্বয়ং বিদ্যা, কিন্তু আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা দেবী, আপনার কথা আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা। হয়তো আপনি যা বলছেন, তা বিদ্যাই নয়, তা হলো জ্ঞান, আর তাই আমার বোধগম্য হচ্ছেনা। … নয়তো পুত্রের মোহে আমার হৃদয় এতটাই গতিশীল হয়ে রয়েছে যে, আমি আর কিছু বোঝার মত অবস্থাতেই নেই। কৃপা করে আমাকে বুঝিয়ে বলে দিন সমস্ত কিছু দেবী”।

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “জ্ঞানের আলোকমালা মায়ের নিজের প্রকাশ করতে যত না আনন্দ হয়, তার চাইতে ঢের অধিক হয় যখন তাঁর সন্তান সেই কথা বলেন আর মা সেই কথা শোনেন। দেবী শ্বেতা, শীঘ্রই আপনি আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন। বেদনা ও বিরহের ভেদ কি, এই তো আপনার জিজ্ঞাসা। শীঘ্রই আমার পুত্র আমার শরণে আসবে এই কথা জানতে, আর আমার থেকে ফিরে গিয়ে জগতকে সেই কথা বলবে। আমি তাঁর কাছে ছদ্মবেশে যাচ্ছি, তাঁকে আমার কাছে আসার আহ্বান জানাতে। অপেক্ষা করুন আপনারা সকলে”।

এক স্বল্পবয়সী যুবতী হয়ে হাতে পরমান্ন ধারণ করে উপস্থিত হলেন তিনি গতির কাছে। গতি তাঁকে দেখে বললেন, “আমি আহার করিনা দেবী। আপনি এই আহার ফিরিয়ে নিয়ে যান!”

সেই কন্যা বললেন, “এ আবার কেমন ধারার কথা। যেই আহার সকলের বেদনা হ্রাস করে, সেই আহারকেই তুমি ত্যাগ করে রেখেছ সাধু! … খাবে খাও, ফেলে দেবে দাও। আমি তো এই আহার তোমার নাম করেই করেছি। কতদিন ধরে দেখছি, তুমি না খেয়ে বেদনায় কাতর হয়ে বসে আছো। আমি এই আহার ফিরিয়ে নিয়ে যাবো না। এই রেখে গেলাম এখানে, শাল পাতা চাপা দিয়ে”।

এত বলে সেই কন্যা খানিক দূরে চলে গিয়ে অবলুপ্ত হয়ে গিয়ে আবার দেবী বিদ্যা, কৃত্তিকা ও পাবনির সামনে দেবী অম্বিকা বেশে প্রস্ফুটিত হলেন। গতির কি খেয়াল আসে, সে একবার সেই কন্যার দিকে দেখতে চায়। কিছুই পলক হয়েছে মেয়েটি তাঁর সামনে থেকে চলে গেছে। কিন্তু মেয়েটিকে আর দেখতে পায়না সে। গতির নয়ন থেকে অশ্রু স্খলিত হলো। মুখ থেকে একটিই শব্দ উচ্চারিত হলো, “মা …!”

দেবী পাবনি মুখ ঘুরিয়ে দেবী অম্বিকার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার পুত্র তোমারই মত হয়েছে গৌরি। কি অকপট বিশ্বাস। সেই যুবতী তাঁর মা ভিন্ন অন্য কেউ নয়। … অদ্ভুত বিশ্বাস!”

গতি আর সঙ্কোচ করলো না, আহার করলো সে পরমাহ্ন। সাখ্যাত অন্নপূর্ণার নির্মিত পায়স। অমৃতও ত্যাগ করা যায় এই আহারের জন্য। আহারের উপরান্তে অপার শান্তি লাভ করে, পুনরায় গতি বললেন, “পথ দেখাও মা। … তোমার মার্গদর্শন ছাড়া আমি সমস্ত কিছুতেই ব্যর্থ”।

দেবী অম্বিকা আশীর্বাদ ভঙ্গিতে হস্ত প্রসারিত করলে, সকলে দেখলেন গতিকে যেন এক স্বর্ণ উষ্মা বেষ্টন করে, তাঁর অন্তরে সেই উষ্মা প্রবেশ করে গেল। গতি ধ্যানস্থ হলো। মহাধ্যান তা। দিনের পর দিন কেটে যায়, ধ্যান ভাঙ্গে না তাঁর। অবশেষে নেত্র খুললেন, আর বললেন, “বেদনার উৎস মোহ, আর বিরহের উৎস প্রেম। কামনা পূর্ণ না হওয়ায় মোহ, আর সেই থেকে বেদনা। পৃথক অস্তিত্ব অসহনীয় তাই বিরহ, আর সেই বিরহই প্রেম। … ক্ষমা মা, আমি তো বিরহে নয়, বেদনায় কাতর ছিলাম। মোহতে অন্ধ হয়ে ছিলাম মায়ের। মা সম্মুখে থাকুন আর না থাকুন, তিনি তো সন্তানের জন্যই অবস্থান করেন। এই সহজ সত্য আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল আমার মোহ”।

“যদি এই মোহ আমার মধ্যে বেদনার সঞ্চার করে, এর অর্থ মোহই সকলের বেদনার কারণ! আসক্তি, সমানে সমস্ত কিছুর থেকে আশা করতে থাকা, আর আশা পূর্ণ না হওয়া। আশা পূর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও মোহ বশে অপেক্ষা করা যে আশা একদিন না একদিন পূর্ণ হবে। তাও সেই আশা পুড়ন হয়না। আর তাই থেকে বিস্তার পায় বেদনা! … মৃত্যু আসবেনা এই আশা, কিন্তু মৃত্যু আসে, তাই বেদনা! ব্যাথা লাগবেনা আশা, কিন্তু ব্যাথা লাগে, তাই বেদনা! … আসক্তিই বেদনার কারণ। … শুনছো, কে কোথায় আছো শোনো শোনো, আসক্তিই বেদনার কারণ”।

অনেককে এই কথা বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কেউ তাঁর কথায় গুরুত্ব দিলেন না। সেই দেখে এবার আর গতি মনমরা হলেন না, আর তিনি আসক্তির বশে নেই। তিনি অনুধাবন করলেন, জীবনের সাথে মিলিয়ে বলতে হবে, তবেই সকলে শুনবে, বুঝবে। … তাই জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়কে একত্রিত করে করে, অমৃত বাণী প্রদান করতে থাকলেন। দেবী পাবনি তথা কৃত্তিকা ও দেবী বিদ্যা ধন্য ধন্য করে উঠে বললেন, “অদ্ভুত তোমার আর তোমার পুত্রের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও প্রেম। যেন তোমরা নামেই পৃথক, পৃথক হয়েও যেন তোমরা পৃথক নও। … কি অদ্ভুত প্রেমবন্ধন তোমাদের গৌরি! … এ তো সেই শ্রেষ্ঠ বন্ধন, যেই বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া মাত্রেই মুক্তি!”

গতির বাণী দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়লো, শত শত চেতনা নিজদের উদ্ভাসিত করতে পারলেন তাঁর বাণীকে ধারণ করে। মৃষুর সপ্তকলার প্রথম কলা রক্তিম রং ধারণ করে প্রকাশিত হতে শুরু করলে, দেবী কৃত্তিকা আনন্দে বিগলিত হয়ে, বারংবার দেবী গৌরিকে আলিঙ্গন করতে থাকলেন। … দেবী অম্বিকা তাও নিশ্চল। পাবনি বিরক্ত হয়ে উঠে বললেন, “এবার কি? এবার তো একটু হাসো গৌরি?”

দেবী অম্বিকা বললেন, “দেবী শ্রী সমস্ত কিছু দেখলেন। তাঁর হৃদয় বাৎসল্যরসে পরিপূর্ণ হয়েছে। তিনি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারছেন না। তিনি এবার মৃষুর কাছে আসবেনই। দিদি, এবার যা ঘটতে চলেছে, তা কনো কারণেই প্রীতিকর নয়, তবে মৃষুর জন্য তা একটি মহা অধ্যায়। মাতার ব্যাখ্যা একটি অন্য চরণে স্থিত হয়ে যাবে তার কাছে, আর সাথে সাথে ত্রিমূর্তির প্রথম মূর্তি সম্বন্ধে এবার ধারণা হতে চলেছে তার। বিরহ এবার ব্যাপক হতে চলেছে দিদি, একাধারে মৃষুর বিরহ আর সঙ্গে সঙ্গে শ্রীর বিরহ”।

দেবী কৃত্তিকা বললেন, “গৌরি, আমরা কি মৃষুর বিরহের অংশীদার হতে পারি। পুত্রের এমন বিরহ দেখে পাষাণের মত এখানে দাঁড়িয়ে থাকার মত অসম্ভব প্রেম আমরা ধারণ করিনা গৌরি। বিশ্বাস করো, আমরা জগজ্জননী নই, এতো এতো সন্তান থাকার পরেও, খালি ক্রোড় নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে, নয়নের জলকে প্রবাহিত হওয়াকে বিরত করার সামর্থ্য আমাদের নেই। একটি পুত্রের বেদনাতেই আমরা কাতর। অনুমতি দাও আর উপায় বলে দাও। যদি মৃষু জানতে পারে আমরা সকলে তাঁর আশেপাশে উপস্থিত, সে নিজের যাত্রাতে মনই দিতে পারবেনা আর। তাই উপায় বলো গৌরি”।

দেবী অম্বিকা হাস্য মুখে বললেন, “বেশ, তবে তোমরা তাঁরই বাকি তিন ভ্রাতা হয়ে জন্ম নাও। সে আসন রূপে জন্ম নেবে যখন নিজের সপ্তকলার দ্বিতীয় কলার বিস্তারের জন্য, তখন তোমরা তাঁর ভ্রাতা, বসন, ভরন আর পোষণ রূপে জন্ম নাও। … কিন্তু জন্ম নেবার পূর্বে, কি লীলা চলছে, দেখে যাও সকলে”।

সকলে দেখলেন, দেবী শ্রী ভূমির মধ্যে আত্মগোপন করেছেন, আর তাঁর এই গোপন হওয়া সম্বন্ধে পীতাম্বর কিচ্ছু জানেন না। দেবী শ্রী বদ্ধপরিকর পুত্রের সাথে এবার তিনি মিলিত হয়েই থাকবেন। আর পুত্রের থেকে দুরে থাকার বিরহবেদনা সহ্য করতে পারছেন না তিনি। দেবী পীতাকে দেখতে না পেয়ে, শ্রীমান অস্থির হয়ে রমবনে গিয়ে বললেন, “হে রমনাথ, হে শ্বেতাম্বর, শ্রী অবলুপ্ত হয়েছে। কোথায় গেছে সে, কেন গেছে সে, কিচ্ছু জানি না আমি। কোথায় খুঁজবো, তাও জানি না”।

রমনাথ ভ্রুকুটি উত্তোলন করে বললেন, “প্রকৃতির অংশকে স্বীকারই কেন করলে তোমরা দুইজন। প্রকৃতিকে কনো বিশ্বাস নেই। দাঁড়াও আমাকে ভাবতে দাও। শ্রীর মত করে ভেবে কনো লাভ নেই। প্রকৃতি রূপে তাঁকে ভাবো। কি অবস্থায় তাঁকে তোমরা পেয়েছিলে, তা স্মরণ করো। … বিচার করে দেখো, দেবী অম্বিকার থেকে তাঁদের জন্ম হয়েছে। দেবী অম্বিকা কোথায় অবস্থান করছে, তা আমরা কেউ জানিনা। কিন্তু তাঁর অভিপ্রায় আমরা জানি”।

পুত্র হারিয়ে সে প্রগল হয়ে গেছে। সেই জন্য সে সমস্ত যোনির সমস্ত স্ত্রীর মধ্যে অধিক ভাবে বিরাজমান হয়ে রয়েছে। যোনিশ্রেষ্ঠ মানবের প্রতি তাঁর অধিক আকর্ষণ কারণ মানবের মমতা প্রদান করার সামর্থ্যও অধিক আর বাৎসল্য ভোগ করার সামর্থ্যও অধিক। আর তাই মানবের মধ্যে স্ত্রী তাঁর কাছে সর্বাধিক আকর্ষণ কারণ স্ত্রীর মধ্যে বিরাজ করলে সে পুত্রদের স্নেহ করতে পারে। এবার আমার কাছে প্রত্যক্ষ হচ্ছে কেন, সমস্ত যোনির স্ত্রীদের আচরণে এমন পরিবর্তন এসেছে। আর বিশেষ করে মানবের স্ত্রীরূপের মধ্যে এই পরিবর্তন সর্বাধিক এসেছে”।

“অর্থাৎ নিশ্চিত ভাবে কনো না কনো স্ত্রীর মধ্যে শ্রী প্রবেশ করে রয়েছে। মমতা সমস্ত স্ত্রীর মধ্যেই অধিক মাত্রায় আছে। আর তাই মানবের স্ত্রীর মধ্যে আত্মগোপন করা অতি সহজ শ্রীর পক্ষে। হয়তো সে এই আত্মগোপন করে নিজের পুত্রকে খুঁজছেন। হয়তো তাঁর এখনও বিশ্বাস হয়নি যে তাঁর পুত্র সাত খণ্ডে বিভক্ত হয়ে বিনষ্ট হয়ে গেছে। অর্থাৎ আমাদের মানব স্ত্রীর মধ্যে দেবী শ্রীকে সন্ধান করতে হবে”।

কোকিলা বললেন, “কিন্তু এই কাজ কি করা সম্ভব!”

রমনাথ বললেন, “সম্ভব। শ্রী যেসে নারীর মধ্যে স্থান গ্রহণ করবেনা। প্রকৃতি স্বরুপা সে, অর্থাৎ কনো সাধিকা বা অত্যন্ত কমনীয় স্ত্রীরূপই হবে সে। বাস্তবে সেই স্ত্রী কমনীয় ও রমণীয় না হলেও, শ্রী তাঁর অন্তরে নিবাস করার কারণেই সে হয়ে উঠবে এমন কমনীয় ও রমণীয়। তাই আমাদের কমনীয় ও রমণীয় স্ত্রীদের প্রথমে একত্রিত করতে হবে। আর তারপর তাঁদের পরীক্ষণ করে দেখতে হবে, কার মধ্যে পবিত্রতার প্রতি দৃষ্টি সর্বাধিক। শ্রী পবিত্রতা রূপী সম্পদের বিস্তার করে। তাই সেই স্ত্রীর মধ্যে থাকবে পবিত্রতার প্রতি ভান”।

পীতাম্বর বললেন, “চলুন আমরা তিন ভ্রাতা বেশে জন্ম নিই। প্রভু, আপনি ত্রিভুবন জয় করে, সমস্ত রমণীয় ও কমনীয় রমণীদের একত্রিত করবেন। আর আমি সকলকে শাসন করে করে তাঁদের মধ্যে পবিত্রতমকে সন্ধান করবো। আমার বিশ্বাস আমরা ঠিকই দেবী শ্রীকে খুঁজে পেয়ে যাবো”।

কোকিলা বললেন, “আর আমার কর্ম কি হবে?”

পীতাম্বর বললেন, “দেবী শ্রীকে পেলেই কেবল হবেনা। তাঁকে সহমতও করতে হবে আমাদের কাছে আসার জন্য। স্বেচ্ছায় তো তিনি রাজি হবেন না। তাঁর সাথে ছলই করতে হবে। প্রকৃতিরূপিণী সে, তাই ছল বোঝে না। কোকিলা, যদি দেখো যে আমরা দেবী শ্রীকে পেয়ে গেছি আর সে কিছুতেই আমাদের সাথে ফিরতে রাজি নন, জানবে যে নিশ্চয়ই তিনি কারুকে না কারুকে ঠিক করে রেখেছেন যে তাঁকে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নেবে”।

“আমরা অবশ্যই তাঁকে পরাস্ত করে দেবী শ্রীকে নিয়ে আসবো আমাদের সাথে। কিন্তু যদি আমরা সক্ষম না হই, তাহলে তুমি অপেক্ষা করবে আমাদের বিনাশের। তুমি কনো প্রকার যুদ্ধে অংশ নেবেনা, নিজেকে সর্বদা সুরক্ষিত রাখবে। যখন দেবী শ্রীর সেই ভরসার পাত্রের জীবের নিয়ম অনুসারে মৃত্যু হয়ে যাবে, তখন দেবী শ্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার অঙ্গিকার করে, তাঁকে নিয়ে এখানে দুধসাগরে চলে আসবে”।

রমনাথ বললেন, “কিন্তু কে আমাদের পরাস্ত করবে! এমন কে আছে যে আমাদেরকে পরাস্ত করবে?”

পীতাম্বর বললেন, “প্রভু, প্রকৃতি আর মা, এই দুইজনকে দুর্বল মনে করা সর্বাধিক বড় ভুল, এটা আপনার থেকে অধিক কেই বা জানেন? এক্ষেত্রে তো প্রকৃতিই মা। তাই সামর্থ্য তাঁর দ্বিগুণ। হতেও তো পারে যে তাঁর পুত্রের সাত খণ্ডের মধ্যে কনো এক খণ্ড জীবিত আছে, আর তিনি তাঁরই সন্ধান করছেন। নিশ্চিত থাকুন প্রভু, যদি দেখেন যে শ্রী কারুর উপর ভরসা করছে অধিক মাত্রায়, সে তাঁর পুত্র ছাড়া অন্য কেউ হবেনা। এক মাতা নিজের পুত্রের থেকে অধিক ভরসা কারুকে করেনা। আর যদি তেমন কেউ হয়, আর সে প্রকৃতির পুত্র হয়, আমরা কেউ জানিনা যে তাঁর বল ঠিক কি পরিমাণ হবে। তাই কোকিলাকে এই আপতকালীন পরিস্থিতিতে কি করতে হবে বলে রাখলাম”।

এই ভাবে একদিকে মৃষু জন্ম নেয় আসন রূপে, আর তাঁকে ঘিরে দেবী বিদ্যা, দেবী কৃত্তিকা ও দেবী পাবনি আসনের তিন ভ্রাতা, বসন, ভরন ও পোষণ রূপে দেহ ধরেন, তো অন্যদিকে ত্রিমূর্তি একত্রে দেহ ধারণ করেন দেবী কর্কটির তিন পুত্র রূপে, যেখানে রমনাথ করন নামে, পীতাম্বর রমণ নামে আর কোকিলা বরণ নামে বিরাজমান হয়ে মৃষুর ১০৩ তম প্রকাশের কথাকে অত্যন্ত বিচিত্র করে তোলে।

রমণ, করন ও বরণ যতই যুবক হতে থাকে, ততই তাঁরা নিজেদের দেহধারণ করার উদ্দেশ্যকে স্মরণ করে করে, তা পালন করতে উদ্যত হন। এঁদের মধ্যে করন অত্যন্ত বলশালী শুধু নন, বিশালাকৃতিরও হয়। আর তাঁর সাথে রমণ হয় রাজনীতিতে অদ্বিতিয়ম এবং বলে সেও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। আর তাঁরা দুইজন মিলে ত্রিভুবনের সমস্ত শক্তিকে পরাভূত করা শুরু করে। নিসাধদেরকে নিজেদের অধীনে নিয়ে এসে, আদিত্যদের, পক্ষদের সকলকে নিজেদের অধীনে রাখলেন, কলাশিল্পী জাতি তথা চারুশিল্পী জাতিদেরও অধীনে নিয়ে এলেন নিজেদের, আর এমন করে করে, সমস্ত শ্রেণীর রমণীয় ও কমনীয় স্ত্রীদের নিয়ে আসলেন তাঁরা।

কেবল নিয়ে আসলেই হলোনা, তাঁদেরকে একত্রে রেখে, তাঁদের পবিত্রতার শক্তিকে পরীক্ষণ করতে হবে। তাই রমণ এক ডঙ্কা নামক স্বর্ণমণ্ডিত রাজ্যের নির্মাণ করে, আর সেখানে সমস্ত ত্রিভুবনের সমস্ত কমনীয় ও রমণীয় স্ত্রীদের গচ্ছিত করেন কর্কটিপুত্ররা। পরীক্ষণের ভূমিকায় একাকী রমণ অবতীর্ণ হন, কারণ শ্রীর উপর অধিকার একা তাঁর। আর সেই পরীক্ষণে নেমে, রমণ একত্রিত প্রায় সমস্ত স্ত্রীর সাথে সঙ্গমকর্মে লিপ্ত হয়। কিন্তু এঁদের একজনকেও যথার্থ ভাবে শ্রী বলে চিহ্নিত করতে পারেন না।

আর পারবেনই বা কি করে, শ্রী যে জন্মদ রাজার পুত্রী হয়ে দেহ ধারণ করেছেন। বীর্যগুণে প্রকৃতিরূপার জন্ম দেওয়া তো সম্ভবই নয়। তাই তিনি মৃত্তিকার মধ্যে স্থাপিত হয়ে, জন্মদের লাঙলের দসির কারণে আবিষ্কৃত হন। আর তাই তাঁর নামই রাখা হয় দসী। আসন জানেন না দসীর কথা, কিন্তু দসী জন্ম মুহূর্ত থেকেই আসনের সন্ধান করতে থাকেন। জম্বুদেশের দক্ষিণাঞ্চলে এক নদীর তটে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য নাম ওযু, আর সেই রাজ্যের রাজপুত্র রূপে বিরাজমান ছিলেন আসন অর্থাৎ মৃষু।

সেই স্থানের সন্ধান পেলেন দেবী দসী এক বিচিত্র ভাবে। উত্তরজম্বুর রাজা ছিলেন জন্মদ। কিন্তু মৃগয়া করতে তিনি যাত্রা করেন দক্ষিণ জম্বুর উপকুল অঞ্চলে। কিন্তু দক্ষিণ উপকুল পর্যন্ত পৌছাতেও পারলেন না তিনি, তাঁর সেনা ও তাঁর সাথে বিরাজমান তাঁর নয়নের মণি দেবী দসী। এক ভয়ানক দুর্যোগ তাঁদেরকে ঘিরে ফেললে, তাঁরা নিজেদের বজরার দিশা পালটে দেন এবং সমস্ত বনাঞ্চল ও ক্ষেতভূমি অতিক্রম করে সাখ্যাত পান ক্ষুদ্র রাজ্য ওযুর। ওযুর রাজা, সুরথ উত্তরজম্বুর রাজার বজরা নোঙ্গর করেছে জেনে, তাঁর আহ্বান করতে উপস্থিত হলে, তিনি রাজা জন্মদের সমস্ত সেনাকে নিজের রাজ্যে থাকতে দিলেন, আর রাজা জন্মদ ও তাঁর পুত্রী দেবী দসীকে প্রাসাদে থাকতে দিলেন।

দেবী দসীকে একদেখা দেখেই দেবী বিদ্যা যিনি পোষণ বেশে অবস্থান করছিলেন, তাঁকে চিনে ফেলেন। গোপনে তাঁর কাছে উপস্থিত হলেন পোষণ এবং বললেন, “কি ব্যাপার শ্রী! তুমি এখানে এই ভাবে? পীতাম্বর তোমাকে …”

দেবী দসী মৃদু হেসে বললেন, “এখনও পর্যন্ত দুধেশ্বর আমার সন্ধান পাননি, তবে তিনি সন্ধান করছেন আমার। আমি এসেছি আমার পুত্রের টানে। তাঁর সন্ধান দিতে পারবে আমাকে?”

পোষণ হেসে বললেন, “মাতা অম্বিকার কৃপায় তুমি সঠিক স্থানেই এসেছ শ্রী। মৃষু আমাদেরই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আসন হয়ে এখানেই বিরাজমান। কিন্তু তুমি তার সাথে সাখ্যাত করবে কি করে? সে তোমাকে মাতা বলে সনাক্ত করবে কি করে? তুমি তার সঙ্গলাভ করতে এসেছ, কিন্তু সেই সঙ্গ তুমি পাবে কি করে?”

দেবী দসী হেসে বললেন, “মানবের মধ্যে কনো স্ত্রী যদি কনো পুরুষের সঙ্গ পেতে আগ্রহী হয়, তাহলে তো দুটিই প্রশস্ত উপায় আছে, এক জননী হওয়া আর দুই পত্নী হওয়া। যখন জননী হবার অবকাশ নেই, তখন পত্নীই হবো”।

পোষণ উত্তরে বললেন, “তুমি তোমার পুত্রের পত্নী হবে?”

দেবী দসী মৃদু হেসে বললেন, “যখন আদিমাতার এমনই ইচ্ছা, তখন তেমনই হবে। তাঁর লীলা তিনিই জানেন। তিনি তাঁর পুত্রকে সর্বস্ব চেতনা প্রদান করে, তাঁর যোগ্য পুত্র করে তুলতে সদাব্যস্ত। আর তারই সাথে সাথে তাঁর পুত্রকে মাধ্যম করে, তিনি তাঁর সমস্ত সন্তান, যারা সমস্ত যোনির সমস্ত জীবের চেতনা হয়ে বিরাজমান, তাঁদেরকে তাঁর সন্তানতত্ত্বের সাথে পরিচিত করাতে উদ্যোগী। … পোষণ, তিনি তো স্বয়ং নিয়তি। যা কিছু হয়, তাঁর নির্মিত কালধারাতেই হয়, কালকে তো তিনিই একমাত্র নিয়ন্ত্রণ করেন। তাই তিনি নিশ্চিত ভাবে এমনই লীলার রচনা করেছেন। নিশ্চিত ভাবে তিনি আসন আর আমাকে মাধ্যম করে কিছু একটি বিশেষ সংকেত দিতে চাইছেন”।

পোষণ উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “কিন্তু তোমার পুত্রের পত্নী হতে তোমার অস্বস্তি হবেনা!”

দেবী দসী হেসে বললেন, “যেই বেশে বিরাজ করুন না কেন, মা তো মা’ই হয় পোষণ। নির্ভর করছে পুত্রের পবিত্রতার উপর যে সে কেবল জননীর বেশে বিরাজমানকেই জননী বলে চিহ্নিত করতে পারে নাকি তাঁর ভগিনীবেশে, ভ্রাতার স্ত্রীর বেশে, শ্যালিকা বেশে, কন্যা বেশে, পুত্রবধূ বেশে আর পত্নী বেশে বিরাজ করা স্ত্রীকেও জননী বেশে স্বীকার করতে পারে কিনা। হয়তো মৃষুকে এই শিক্ষাই প্রদান করছেন দেবী অম্বিকা”।

“হয়তো তাঁকে জননীর খোলস থেকে মুক্ত করে প্রতিটি স্ত্রীর মধ্যে জননীর সন্ধান করতে বলছেন মাতা। হয়তো পত্নীর মধ্যেও মাতাকে সন্ধান করতে বলছেন তিনি। নাহলে পুত্রের সঙ্গ লাভের ব্যকুলতা থাকার পরেও তিনি আমাকে তাঁর পত্নী হবার মার্গে কেন স্থাপিত করলেন”।

আসনের সাথে সাখ্যাত হলো দেবী দসীর। পুত্রকে এতকাল পরে লাভ করে আপ্লুত হলেন তিনি। আলিঙ্গনের বড় সাধ জাগলেও, মানবীয় মর্যাদা অনুসারে আসন এক পরপুরুষ, এবং দসী এক অবিবাহিতা স্ত্রী। তাই নিজের স্নায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ ততক্ষণ রাখলেন যতক্ষণ না আসনকে তিনি একাকী লাভ করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই চার ভ্রাতা, আসন, বসন, ভরন ও পোষণ দেবী দসীকে ওযুরাজ্য ও তাঁর সুন্দর পুষ্পবাটিকা ভ্রমণ করাতে নিয়ে গেলে, পোষণ সকলকে সকল কথা বলে দেবার কারনে, আসন ও দসীকে এক নির্জন স্থানে রেখে তাঁরা অন্যত্র ভ্রমণ করতে থাকেন।

আর সেই কালে, দেবী দসী এক সরীসৃপ দেখে ফেলার আতঙ্ককে সম্মুখে রেখে আসনকে আলিঙ্গন করলেন। মানবীয় ভাবেই অত্যন্ত লজ্জিত হয়েছেন তিনি এমন দেখালেও, আসন অত্যন্ত বিচলিত হয়ে উঠলেন। একটি কথাও বললেন না দীর্ঘক্ষণ। সেই দেখে দেবী দসী নিজে থেকেই বললেন, “আমি অত্যন্ত লজ্জিত রাজকুমার। আসলে সরীসৃপকে দেখে আমি …”

আসন বিনম্রতা পূর্বক এক মৃদু লোকদেখানি হাস্য প্রদান করে বললেন, “ঠিক আছে দেবী। … আসলে আমি ভাবছিলাম যে, আমাদের সেই অবস্থায় কেউ দেখে ফেলেননি তো! … আপনি হলেন সম্রাট জন্মদের পুত্রী, আর আমি একজন সামান্য রাজকুমার। তিনি এইভাবে আমাদের দেখে নিলে, হতে পারে যে আমার পিতার উপর তিনি অধিক শুল্ক বসিয়ে দেবেন”।

দেবী দসী আসনের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলেন যে, আসন মনে এক অন্য কথা ধারণ করে মুখে এক অন্য কথা বলছে। তাই তিনি বললেন, “রাজকুমার আপনি মিথ্যা বলতে পটু নন। আপনার মনের মধ্যে অন্য কথা চলছে আর আপনি মুখে অন্য কিছু বলছেন!”

অপ্রস্তুত হয়ে আসন কথা ঘোরানোর প্রয়াস করলে, কনো অন্য কথা খুঁজে না পেয়ে চুপ করে গেলেন। কিন্তু দেবী দসীও স্বয়ং দেবী শ্রী। তাঁকে তাঁর আকাঙ্ক্ষিত উত্তর না প্রদান করে কি করে পলায়ন করতে পারে তাঁরই পুত্র! … দেবী দসী অগ্রে না গিয়ে দাঁড়িয়ে পরলেন। নিজের পাশে দেবী দসীকে না দেখে ভয়ার্ত হয়েই একপ্রকার এদিক সেদিক দেখতে থাকলেন আসন। সেই দেখে দেবী দসী বললেন, “আমি এদিকে, আপনার পিছনে রাজকুমার”।

দেবী দসীকে একস্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আসন পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “কি ব্যাপার, আপনি দাঁড়িয়ে পরলেন যে! … কিছু কি হয়েছে?”

দেবী দসী মৃদু হেসে বললেন, “যেই কথাকে আপনি মনের মধ্যে রেখে মুখে অন্য কথা বললেন, সেই কথা শোনার আগে আমি একপাও এগবো না। আগে আমাকে সেই কথা বলতে হবে”।

আসন একটু ইতস্তত করে বললেন, “দেবী, সেই কথার আপনি অন্য মানে করতে পারেন। তাই … দয়া করে জেদ ধরবেন না”।

দেবী দসী বললেন, “কথা দিলাম, অন্য মানে করবো না। এবার বলুন রাজপুত্র। … না হলে কিন্তু আমি সারা জীবন এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো”।

আসন পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কুণ্ঠিত হয়েই বললেন, “আপনি যখন ওই সরীসৃপের কারণে আমাকে আলিঙ্গন করলেন, তখন এমন মনে হলো যেন আপনার স্পর্শ আমার কাছে অত্যন্ত পরিচিত। অত্যন্ত পছন্দের এক স্পর্শ। অত্যন্ত আপনজনের অঙ্গের সুবাস যেন আপনার থেকে পেলাম। কিন্তু এমন কনো আপনজনকে আমি স্মরণ কিছুতেই করতে পারলাম না”।

দেবী দসী মৃদু হাসলেন। পুত্রের থেকে মা কি করে লুকিয়ে থাকতে পারে! মায়ের কাছে তো অনেক পুত্র থাকে, পতি থাকে, সম্বন্ধী থাকে, কিন্তু পুত্রের কাছে? পুত্রের কাছে যে তাঁর মাতাই তাঁর জগত, তাঁর ব্রহ্মাণ্ড। এই ভেবে তিনি বললেন, “আমার মনে হয়, কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। … আরো একবার আলিঙ্গন করে দেখবেন?… এখানে তো আমরা দুইজন বাদে আর কোন ও মনুষ্যকে দেখতে পাচ্ছিনা। আশা করি সম্রাট জন্মদের থেকে ভয়েরও তাই কনো কারণ নেই এখানে। … তা আলিঙ্গন করে দেখবেন?”

আসন পুনরায় কুণ্ঠা অনুভব করছিলেন। সেই দেখে দেবী দসী বললেন, “কি হলো, রাজা জন্মদের ভয়ও নেই, তাহলে এতো কুণ্ঠা কিসের?”

আসন উত্তরে বললেন, “এই আলিঙ্গনে আপনার চরিত্রে কনো দাগ লাগবেনা তো? … আসলে আমাদের সমাজে স্ত্রীদের কালিমালিপ্ত করতে সকলে অত্যন্ত ভালোবাসেন। … তাই ভয় হয়”।

দসী ভ্রু তুলে, ওষ্ঠকে মিষ্ট ভাবে বিকৃত করে বললেন, “বাহ রে! … এই পুরুষতাত্ত্বিক সমাজে দাঁড়িয়ে, এই প্রথম পুরুষ দেখলাম যে স্ত্রীর জন্য ভাবে! … তা এমন ভাবনার কারণ কি, সেটা জানতে পারি? … না মানে, হঠাৎ স্ত্রীজাতির প্রতি এমন দুর্বল মনোভাব কেন?”

আসন মাথা নিচু করে বললেন, “স্ত্রী মানেই মমতা, স্নেহ আর ত্যাগ। আর মমতা, স্নেহ, ত্যাগের কথা বললে একটিই সম্বন্ধের নাম স্মরণ আসে, মা। … অর্থাৎ স্ত্রী সর্বক্ষণই মা। যেই রূপেই থাকুক না কেন, তিনি মা। হয়তো পাত্রবিশেষে তাঁর স্নেহপ্রদানের ধারা পালটে যায়, ত্যাগ করার ধরন পালটে যায়, মমতা ধারণের পদ্ধতি পালটে যায়, কিন্তু তিনি সেই মমতাই প্রদান করেন, স্নেহই দান করেন আর সর্বদা ত্যাগ করারই চিন্তা করেন। … এর অর্থ তো এই দাঁড়ায় যে স্ত্রী সর্বসরূপে, সর্বঅবস্থায়, সর্বসম্বন্ধেই মা। তাই না! … সেই মায়ের উপর কালিমা লেপনের এমন সর্বক্ষণ প্রয়াস আমার দম আটকে দেয় মাঝে মাঝে”।

দেবী দসী নন, দেবী শ্রী তাঁর পুত্রকে দেখছিলেন। প্রাণ ভরে দেখছিলেন, আর তাঁর কথা শ্রবণ করে মমতায় বিগলিত হচ্ছিলেন। আসন থামলে, দেবী দসী একটি বড় ধরনের শ্বাস ত্যাগ করে বললেন, “আপনার কথা শুনে, কি মনে হচ্ছে জানেন? মনে হচ্ছে, যদি আপনার সঙ্গ না পেলাম তাহলে পুরুষ কেমন তা জানলামও না, চিনলামও না। … বিবাহ করবেন আমাকে? এই একটিই উপায় আমার কাছে আপনার সঙ্গ লাভ করার”।

আসন এবার একটু বেশিই অপ্রস্তুত হয়ে উঠলেন। সেই দেখে দেবী দসী হেসে বললেন, “চিন্তার কিছু নেই, আপনাকে কারুকে কিচ্ছু বলতে হবেনা। আমিই আমার পিতার কাছে বলবো, আমার পছন্দ, সত্য কথাই বলবো। আমার পিতার নয়নের মণি আমি। তিনি আমাকে না করবেন না। আর তাছাড়া, ছোটো রাজ্য হতে পারে ওযু, কিন্তু সেই রাজ্যের রাজপুত্র তো আপনি। তাই পাত্র রূপেও তো আপনি হেলাফেলা নন। … কিন্তু তার জন্য আমার স্পষ্ট সদুত্তর লাগবে আপনার থেকে। আপনি কি আমাকে পত্নী রূপে গ্রহণ করতে রাজি!”

আসন এক কুণ্ঠিত হাস্য হেসে বললেন, “যার স্পর্শ মাত্রেই মনে হচ্ছে যেন তাঁকে আমি বহুকাল চিনি। যার অঙ্গের সুবাস আমাকে জন্মান্তরে নিয়ে চলে যাচ্ছে। … দেবী, আমার কাছে একটি বিষয় তো স্পষ্ট, আপনার আর আমার কেবল এই জন্মের সম্বন্ধ নয়। হয়তো আমার আপনার দুইজনেরই স্মৃতি থেকে সেই কথা মুছে গেছে। … কিন্তু সম্বন্ধের নামের স্মৃতি মুছে যেতে পারে, মমতার গন্ধ কখনো স্মৃতি থেকে মুছে যেতে পারেনা। … আপনার অঙ্গের সুবাস আমাকে বলে দিচ্ছে যে পূর্বেও আমি আপনার মমতা লাভ করেছি। তাই আপনার সাথে এই সাখ্যাতও কেবল দৈবাৎ নয়, আপনার আমাকে বিবাহ করতে চেয়ে, পুনরায় মমতা প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করাও দৈবাৎই বটে। তাই দৈবাৎ সেই কর্মে আমি বাঁধা দেবার কে হই দেবী?”

বিবাহদিন স্থির হলো দেবী দসী আর আসনের। আর সেই বিবাহতে নিমন্ত্রিত হলেন সকলে। সকল বড় বড় রাজ্যের রাজাদের নিমন্ত্রণ করলেন রাজা জন্মদ। আর সেই রাজ্যের মধ্যে ডঙ্কা রাজ্যও নিমন্ত্রিত ছিলেন। তবে রাজা রমণ সেই নিমন্ত্রণে না এসে, নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পাঠালেন ভ্রাতা বরণকে।

বিবাহ আসরে তিনি আসনকে দেখলেন, কিন্তু তাঁকে তেমন উল্লেখযোগ্য লাগেনি বরণের। কিন্তু দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলেন না যার থেকে, তিনি হলেন দেবী দসী। দেবী দসীও একদেখাতে চিনে নিয়েছিলেন বরণকে কোকিলা বলে। তাই ঈষৎ সংযত হয়ে গেছিলেন। তাই পরখ তো করতে পারলেন না বরণ, কিন্তু সমাচার অবশ্যই বহন করে নিয়ে গেলেন ডঙ্কাতে, নিজের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রমণের কাছে।

ফিরে গিয়ে তিনি রমণকে বললেন, “ভ্রাতা, সম্পূর্ণ ডঙ্কাতে একটিও তেমন সুন্দরী নেই, যেমন সুন্দরী দেবী দসী। রূপে, লাবণ্যে তিনি অদ্বিতিয়ম, এই ব্যপারে কনো সন্দেহ নেই। দেবী শ্রী কিনা তা জানিনা, পরখ করার  সুযোগ তো পাইনি। তবে হ্যাঁ, এমন রূপসী একজনও নেই এই সম্যক ত্রিভুবনে, এই ব্যাপারে নিশ্চিত আমি। যেমন সুন্দর মুখশ্রী, তেমনই স্বর্ণাভ অঙ্গের বর্ণ, আর তেমনই তৈলাক্ত ত্বক তাঁর। উন্নতস্তনা, অভাবনীয় উদরপ্রান্ত, আর তেমনই সুগঠিত নিতম্বু তথা কটিদেশ। এককথায় বলতে গেলে, এমন রূপসীর কল্পনা করাও সম্ভব নয়, তেমনই তিনি”।

রক্ষকুলের শিরোমণি রমণ সেই কথা শুনে বললেন, “কি আবোলতাবোল বলছো বরণ। আমি ডঙ্কেশ, আমার রাজ্যে রয়েছে ত্রিভুবনের শ্রেষ্ঠ সুন্দরীসমূহ। শ্রেষ্ঠ কমনীয়ারা। শেষে কিনা মানব! তুমি জানো না বরণ, মানব সর্বাধিক স্বল্প কামগুণসম্পন্ন যোনি! … দেবী শ্রী নাকি, সেই যোনিতে জন্ম নিয়েছেন! কথা বলার কালে কিছু বিচার করে তো বলো!”

বরণ এই ভাবে তিরস্কৃত হয়ে কিছুটা মদধারণ করেই বললেন, “কতবার সঙ্গমে স্থিত করতে পেরেছেন আপনি দেবী শ্রীকে? সঙ্গম ছাড়ুন, নিজের ইচ্ছায় তো একটিবার স্পর্শও করতে পারেন নি। যতবার স্পর্শ করতে গেছেন, আপনার হস্তে বিদ্যুৎঝলক লেগেছে। … তা কি ভাবে জানলেন যে শ্রী কামাতুর হবেন! … কামাতুর আমরা, প্রকৃতি কখনোই কামাতুর ছিলেন না। বিচার আমার নয় আপনার করা আবশ্যক। রমনাথ দেবী অম্বাকে একটিবারের জন্যও সঙ্গমের জন্য রাজি করতে পারেন নি, দেবী অম্বিকার প্রতি সঙ্গমস্পৃহা ধারণ করার কালে তিনি ভয়ার্ত হয়ে শয়নকক্ষ থেকে পলায়ন করেছেন ছয়ছয় বার। আর আপনিও দেবী শ্রীকে স্পর্শ করতে গেলে, আপনাকে বিদ্যুতপিষ্ট হতে হয়েছে”।

“যেতে বলেছিলেন, গিয়ে ছিলাম, অদ্ভুত রূপ দেখে প্রভাবিত হয়েছি, তাই বলেছি। এবার তাঁকে পরখ করবেন, নাকি করবেননা, তা ব্যক্তিগত আপনার ব্যাপার”।

করন বললেন, “ভ্রাতা বরণ যখন বলছে, তখন একবার তোমার দেখে আসা উচিত রমণ। চলো, আমরা দুই ভ্রাতা বরং মেঘকবচের সাথে, মেঘের আড়াল থেকে তাঁকে দেখে আসি। তুমি তো তাঁকে একদেখাতেই সনাক্ত করতে পারবে, তাই না! … তাই তোমার দেখাটা অত্যন্ত আবশ্যক। চলো”।

এত বলে রমণপুত্র মেঘকবচকে সারথি করে, রমণ আর করন যাত্রা করলেন ওযু রাজ্যের ঊর্ধ্বগগনে, দেবী দসীকে প্রত্যক্ষ করতে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22