১.৩। জন্ম পর্ব
দেবী অম্বিকা স্বামীকে দেখে প্রফুল্ল হলেন, কিন্তু শবেশের অবস্থা অত্যন্ত হীন। কামনায় অস্থির হয়ে তাঁর সর্বাঙ্গ স্বেদে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর তাঁর প্রশ্বাস সেই স্বেদকে ধারণ করে প্রকাণ্ড এক ঘূর্ণাবর্তের রচনা করে, শবেশের থেকে তা দ্রুততার সাথে দেবী অম্বিকার কাছে গমন করে, দেবী অম্বিকাকে পূর্ণ ভাবে মলিন করে দিলো। ভীত রমনাথ পুনরায় স্বর্ণকপাট খুলে, সকলের চোখ এড়িয়ে রমবনের দক্ষিণ প্রান্তে গিয়ে, ভীতিতে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকলে, তাঁর সমস্ত লোমকুপ থেকে প্রচুরমাত্রায় বীর্য স্খলন হলে, পূর্বের যেই বীর্যস্তূপ নির্মাণ হয়েছিল, তারই উপরে সেই দিনের বীর্যসমূহও স্থাপিত হলে, রমনাথ শান্ত হলেন।
এমন ভাবেই এক এক করে ৫ দিন একই ভাবে রমনাথের কামনার উদ্বেগ ঘটে, দেবীর কক্ষে যান, তাঁর কামনা আর ভীতি একত্রিত হয়ে এক ঘূর্ণাবর্ত হয়ে দেবীকে সম্পূর্ণ ভাবে মলিন করে দেয়, আর রমনাথ ভীত হয়ে দক্ষিণ রমবনে উপস্থিত হয়ে, বীর্যপাত করলে, পঞ্চমদিন এমন বীর্যপাতের পর, সেই বীর্যের স্তূপ থেকে এক প্রকাণ্ড শক্তিশালী পুরুষ শিশুর জন্ম হয়। আর সে রমনাথের উদ্দেশ্যে বলে, “প্রণাম পিতা, আমার নাম কি হবে? আমার জীবনের উদ্দেশ্য কি হবে!”
রমনাথ মিষ্ট হেসে বললেন, “পুত্র তোমার নাম হবে মোহক, তবে তুমি আমার কাছে থাকবেনা। আমি তোমাকে সর্বক্ষণ মার্গ প্রদর্শন করবো, তবে তোমাকে লালন করবেন দেবী নাগিনী ও পরমপিতা কোকিলা। তাঁদের কনো পুত্র নেই, সকলেই কন্যা। তাই তাঁদের কাছে তোমাকে অর্পণ করে, তাঁদের প্রফুল্লতার কারণ হবে তুমি। এসো আমার সাথে”।
এতো বলে মোহককে সঙ্গে নিয়ে রমনাথ সপ্তধনুশে গমন করলে, সেখানে দেবী নাগিনী ও স্বয়ং পরমপিতা কোকিলা তাঁকে সম্ভাষণ করলে, তাঁর পুত্র মোহককে অর্পণ করে আসেন কোকিলার কাছে। অন্যদিকে তাঁর প্রত্যাবর্তনেরই অপেক্ষা করেই অস্থির দেবী অম্বিকা পায়চারি করছিলেন। দেবী অম্বিকা কনো স্থানে যাত্রার জন্য সজ্জ হয়ে ছিলেন। কিন্তু কোথায় তিনি যাত্রা করবেন, সেই প্রশ্নও করতে পারলেন না রমনাথ, কারণ দেবী অম্বিকাকে দেখা মাত্রই পুনরায় কামে অস্থির হয়ে গিয়ে ঘূর্ণাবর্তের জেরে দেবী অম্বিকাকে মলিন করে দিলেন তিনি, এবং পলায়ন করে দক্ষিণ রমবনে গিয়ে বীর্যস্খলন করতে থাকলেন।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সেই স্থানে উপস্থিত হলেন দুধেশ্বর। উচ্চৈঃস্বরে তিনি বলতে থাকলেন, “দাঁড়ান প্রভু, দাঁড়ান”। এই বলে দ্রুততার সাথে সম্মুখে এসে একটি পাত্রে রমনাথের সমস্ত বীর্য ধারণ করে বললেন, “নাথ, এরই কারণ আমার পত্নীর গর্ভের সন্তান কিছুতেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল না। জটিলার গর্ভে যেই কন্যা সন্তান রয়েছে, তার পতি আপনারই পুত্র হবে, আমি এমন ভাবেই সেই কীর্তির রচনা করেছিলাম। তবে আমারই ভুল। আমি ভেবেছিলাম আপনার ও দেবী অম্বিকার সন্তানের পত্নী হবে সে। কিন্তু বাস্তবে সে কেবলই আপনার সন্তানের পত্নী হবে। মোহক আপনার সন্তান, আর সেই সন্তানের পত্নী হবে আমার কন্যা মোহকি, তবে শুণ্ডের পত্নী হবার গুণ যে তাঁর মধ্যে নেই। সেই গুণ লাভ করার জন্য যে আপনার বীর্যের প্রয়োজন ছিল। আজ সেই বীর্য লব্ধ হলো। এই বীর্য দেবী জটিলাকে প্রদান করতে পারলে, তবেই আমার কন্যা মোহকি ভূমিষ্ঠ হবে”।
“নাথ, আমাকে এখন অনুমতি প্রদান করুন। দেবী অম্বিকা আমার স্ত্রীর কাছেই যাচ্ছিলেন, তাঁর গর্ভের সন্তান বৃদ্ধি না পাওয়ায় চিন্তিত হয়ে। আপনার কামনা তাঁকে মলিন করায়, তাঁর বিলম্ব হয়েছে। তিনি শুদ্ধ হয়ে যাত্রা করবেন। তাঁর দুধসাগরে উপস্থিত হবার পূর্বেই আমাকে এই বীর্য প্রদান করতে হবে দেবী জটিলাকে। আজ্ঞা দিন আমাকে এক্ষণে”।
এতো বলে প্রস্থান করলেন মগরধারী, তো তিনি ও কুটিলা মিলে জটিলার গর্ভে রমনাথের মহাবীর্য স্থাপন করলে, মুহূর্তের মধ্যে দেবী জটিলার গর্ভ বিশাল হতে থাকে। অসহ্য হয়ে ওঠে ক্রমশ দেবী জটিলার প্রসব বেদনা, কিন্তু সন্তান কিছুতেই ভূমিষ্ঠ হয়না। এমনই সময়ে দেবী অম্বিকা সেখানে উপস্থিত হলে, সমস্ত কিছু দেখে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন তিনি। অস্থির হয়ে দেবী জটিলার গর্ভে নিজের কোমল হস্ত স্থাপন করতেই, শিশু গর্ভ থেকে বাইরে বেড়িয়ে আসতে সজ্জ হয়ে ওঠে।
এরপর দেবী কুটিলা ও দেবী অম্বিকার প্রয়াসে দেবী জটিলা প্রথমবার একটি কন্যার মাতা হন, কিন্তু এই কন্যা ভূমিষ্ঠ হবার সাথে সাথে দেবী অম্বিকার কেশকে প্রবল বেগে আকর্ষণ করে থাকলে, দেবী কুটিলা বলতে থাকেন, “ওরে ছাড় রে, ছাড়। জানিস তুই কার কেশ আকর্ষণ করে তাঁকে ব্যাথা দিচ্ছিস। তুই শিশু তাই তিনি চুপ করে আছেন, যদি বড় হতিস, তাহলে এমন ইচ্ছা করলেও, তোকে ধুলিস্যাত করে দিতেন তিনি”।
দেবী অম্বিকা মৃদু হেসে বললেন, “এ আবার কেমন ধরনের কথা দেবী কুটিলা। সন্তান মায়ের কেশ আকর্ষণ করেছে, তাতে কি হয়ে গেছে!”
কেউ হয়তো বুঝতে পারলেন না, কিন্তু দুধেশ্বর বুঝে গেলেন যে, মোহকি দেবী অম্বিকার কেশ আকর্ষণ করার জন্যই দেবী জটিলার গর্ভ থেকে মুক্ত হয়েছে, অর্থাৎ দেবীর কেশ সে বড় হয়েও আকর্ষণ করে দেবীকে ব্যাথা দেবার প্রয়াস করবে, আর তখন কি পরিণতি হবে সেটা ভেবেই ভয়ার্ত হয়ে গেলেন মগরধারী। সেই পরিস্থিতি যাতে না হয়, তেমন প্রয়াস করার জন্য এবার কাছে এসে মোহকির কানে কানে বললেন, “কেশ ছেড়ে দাও, পরিণাম ভীষণ হয়ে যেতে পারে”।
মোহকি যেন সমস্ত কিছু শুনে শান্ত হলো, দেবীর কেশ ত্যাগ করলেন তিনি। দেবী অম্বিকার সেই দিকে কনো হেলদোল নেই। যেই উদ্দেশ্যে দুধসাগরে আসা, অর্থাৎ দেবী জটিলার বেদনার নাশ করা, তা সম্পন্ন হয়েছে। তাই আনন্দের সাথে মিষ্টান্ন ভোজন করে দেবী অম্বিকা এক অদ্ভুত ভাব নিয়ে দুধসাগর থেকে প্রস্থান করে রমবনে প্রস্থান করলেন।
তাঁর স্বামী এখন সর্বক্ষণ গোষণ্ডদের কনো না কনো কাজে ব্যস্ত রাখেন, পা-মুড়ে বসতেও দেন না। তাঁর সখীরাও অন্তঃসত্ত্বা বলে আসেন না। বড় একা তিনি। একজন কেউ নেই, যিনি তাঁর জন্যই বাঁচবেন, তাঁর জন্যই থাকবেন, যার কাছে তিনিই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড হবেন।
এমন চিন্তা করতে করতে, তিনি রমবনের পূর্বকোনে এসে উপস্থিত হলেন। এই সেই স্থান যেখানে রমনাথ যেই ছয়বার তাঁকে মলিন করেছেন, সেই মলিনতার বর্জ্যমল ত্যাগ করেছিলেন। ছয় ছয়টি স্তূপ হয়ে রয়েছে তাঁর সম্মুখে। কিন্তু দেবী অম্বিকার সেই দিকে কনো হুঁশ নেই। মনের খেয়ালে তিনি সকল কিছুর সামনে বসে রইলেন। হৃদয়ে তাঁর শিশুর আলিঙ্গনের ব্যকুলতা, মমতা, বাৎসল্য, আর স্নেহ যেন তাঁর অন্তর থেকে ঠিকরে বেড়িয়ে আসতে চাইছে। … আর তিনি দেবী জটিলার সন্তান প্রসব করানোর কারণে যে মলিন হয়ে গেছিলেন, তা নিজের অঙ্গ থেকে তুলে তুলে নিজেকে শুদ্ধ করতে রত।
মন সেই শুদ্ধ হওয়াতে নেই। মন যেন বাৎসল্য রসে পরিপূর্ণ। সমস্ত অঙ্গের মল ত্যাগ করলেন। কিন্তু সেই স্থান থেকে উঠে যেতে তাঁর মন চাইলো না। দৃষ্টি পড়লো, বিবাহের রাত্রের মল অঙ্গ থেকে মুক্ত করার পর যেই স্তূপ হয়ে ছিল, তার দিকে। এগিয়ে গেলেন দেবী সেই স্তূপের দিকে। মনের হরষে একটি শিশু বালকের রূপ দান করলেন সেই মল থেকে। সেই রূপ দেখে মনের খেয়ালেই খিল খিল করে হেসে উঠলেন তিনি। হরষ যেন অধিক হয়ে গেল। দ্বিতীয়দিনের রমনাথের থেকে প্রাপ্ত মলকে নিজের স্বেদদ্বারা মর্দন করে, তাকে লেপন করলেন নির্মিত শিশুমূর্তির উপর।
অধিক স্পষ্ট হয়ে উঠলো শিশুর রূপ। দেবী অম্বিকার স্তনে দুগ্ধ জন্ম নিলো সেই শিশুমূর্তিকে দেখে জাগ্রত মমতার কারণে। আর সেই দুগ্ধের জন্ম হতে, যেন সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড আকৃষ্ট হলো দেবী অম্বিকার দিকে। সমস্ত পক্ষ, সমস্ত কীটাণু, সমস্ত সূক্ষ্মরূপ প্রগলের মত রূপ ধারণ করতে শুরু করলো। সকল জীবের অন্তরের চেতনা যেন সেই দুগ্ধ পানে লালায়িত হয়ে উঠলো, আর সেই বাৎসল্যভাব এক প্রবল অণুস্তর হয়ে দ্রুতবেগ ধারণ করে ধ্রাবমান হলো দেবী অম্বিকার দিকে।
সেই ধ্রাবমান অণুস্তরকে নিরীক্ষণ করলেন ডাহুক আর বললেন, “সকল চেতনার বাৎসল্যপূর্ণ ভাবে এমন অণুরূপ ধরে দিগ্বিদিকশূন্য ভাবে যাত্রা! তাও আবার রমবনের উদ্দেশ্যে! সাধ জিতেশ, আমার বিশ্বাস, দেবী অম্বিকা জননী হতে চলেছেন। একমাত্র তাঁর প্রতিই এই প্রবল বাৎসল্যপূর্ণ আকর্ষণ সম্ভব। কিছু করুন জিতেশ!”
জিতেশ উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে উঠলেন, “কি করা যেতে পারে!”
ডাহুক বললেন, “যদি আমাদের বরদান দেবীর থেকে আমাদের সুরক্ষিত রাখতো, তাহলে আমরাই যেতাম। কিন্তু আমরা তাঁর থেকে সুরক্ষিত নই। তাই আপনাকেই কিছু করতে হবে সাধশ্রেষ্ঠ। … দেবী জননী হয়ে গেলে, তিনি মমতার কারণে উৎফুল্ল হয়ে থাকবেন। সেই সময়ে তাঁর থেকে এই শিশুর উর্জ্জাকে হরণ করে তার নাশ করতে হবে। আর আপনাকেই সেই কাজ করতে হবে সাধ শ্রেষ্ঠ”।
ডাহুকের তর্ক উচিত মনে হলো জিতেশের। আর তাই সাধশ্রেষ্ঠ সেই অণুসমষ্টির পিছনে ধাওয়া করলেন। কিন্তু প্রচণ্ড গতি যেন সেই অণুসমষ্টির। যেন দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে তারা ধাবমান। তাই সমানে জিতেশ আরো আরো পিছনে যেতে থাকলো। নিসাধলোকের সম্মুখ থেকেও সেই অণুসমষ্টি যাত্রা করলো। তা দেখে সকল কলাসাধক, শ্রীসাধক তথা স্বয়ং নভ প্রথমে চিন্তিত হয়ে উঠলেন, কিন্তু তাদের পশ্চাতে হন্যে হয়ে জিতেশের ধাবন দেখে তাঁরাও নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে নিশ্চিত ভাবে দেবী অম্বিকা জননী হতে চলেছেন। তাই তো জগন্মাতার বাৎসল্যরস পান করতে সমস্ত চেতনার অণুরূপ ধাবমান। আর সেই কারণেই এঁদের পিছু নিয়েছে জিতেশ, যাতে দেবীর সন্তান, যে তাঁর মৃত্যুর কারণ হবে, তাঁর নাশ করা হায়।
এমন বিচার করে নিসাধসম্রাট নভ পাবকের উদ্দেশ্যে বললেন, “পাবক, মাতার উর্জ্জাবিস্তারকে ধারণ করার সামর্থ্য একমাত্র তোমারই আছে। তাই দ্রুত যাত্রা করো আর মাতার সন্তানকে সুরক্ষিত করো। আর অনিল তুমিও যাও, মাতার সন্তানই আমাদেরকে জিতেশের থেকে রক্ষা করবে। যা কাল আমাদের রক্ষা করবে, তার আজ রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। তাই যাও, মাতার সন্তানকে রক্ষা করার কালে পাবককে গতি প্রদান করে, জিতেশের থেকে দূরে রাখো। প্রয়োজনে সম্যক ব্রহ্মাণ্ডে মাতার সন্তানকে ততক্ষণ ভ্রমণ করাও যতক্ষণ না সে পূর্ণ শিশু হয়ে উঠছেন। কিছুতেই যেন সেই শিশুর নাগাল না পায় জিতেশ। যাও শীঘ্রতা করো”।
অনিল ও পাবক একদিকে যাত্রা করলেন, তো অন্যদিকে গগনি, অনিলা, পাবকি তথা মীনের একত্রে প্রসব বেদনা জাগ্রত হয়, এবং তাঁরা অদ্ভুত দিব্য ভাবে, একে অপরের দিকে সমানে আকর্ষিত হতে থাকে। শায়িত অবস্থায় তাঁদেরকে একত্রে দেখে মনে হতে থাকলো যেন, একটি বিন্দু থেকে চারটি ছটা নির্গত হয়েছে। কিন্তু ক্রমশ তাঁদের দূরত্ব কমতেই থাকে, এবং একসময়ে এমন হয়ে যায় যে চার নিসাধপত্নীর যোনীদেশ একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়ে গেল, যেন তাঁদের কারুর একজনের সন্তান হবেনা, সকলের গর্ভস্থ ভ্রূণ একাকার হয়ে একটিই সন্তান প্রসবিত হবে।
কিন্তু সেই দিকে এখন কারুর নজর দেবার সময় নেই। একা দেবী কৃত্তিকাই তাঁর কন্যার যত্ন করা শুরু করলেন। অন্যদিকে চেতনাপুঞ্জরা যতই দেবী অম্বিকার দিকে অগ্রসর হতে থাকলো, ততই দেবী একটি একটি করে রমনাথের ত্যাগ করা সমস্ত মলস্তূপকে পলস্তা করে নিজের নির্মিত শিশুমূর্তির উপর স্থাপন করতে থাকলেন, এবং মমতায় বিভোর হয়ে গিয়ে শিশুর ন্যায় পুলকিত হতে থাকলেন। এমন করে করে, যখন সমস্ত রমনাথের মলকে তথা নিজের স্বেদকে এবং অন্তে দেবী জটিলার কাছ থেকে ফেরার পর নিজের অঙ্গের মলকে একত্রিত করে একটি দিব্যশিশুর মূর্তি নির্মিত হয়ে যায়, তখন সেই শিশুর মূর্তিকেই শিশুজ্ঞান করে, মহানন্দে তাঁকে বক্ষের মধ্যে আলিঙ্গন করে রইলেন।
আর সেই মূর্তিকে যতই দেবী অম্বিকা নিজের বক্ষে ধারণ করে সন্তান আলিঙ্গনের সুখ অনুভব করতে থাকলেন, ততই তাঁর স্তনদেশ দুগ্ধ ত্যাগ করতে থাকলো।
নিসাধ, সাধ, সমস্ত লোক, এমনকি ত্রিমূর্তিও চেতনাপুঞ্জ, জিতেশ তথা অনিল পাবককে দেখে বুঝে গেছেন যে দেবী অম্বিকা মাতা হতে চলেছেন। ত্রিমূর্তি কিছুটা হতবাকও হয়ে গেছেন। প্রকৃতির সামর্থ্য, লীলা, স্নেহ, মমতা, প্রেম, বাৎসল্য সম্বন্ধে তাঁরা কিচ্ছু জানেন না। কেউই কিচ্ছু জানেন না। তাই কেউই যেন পূর্ণ ভাবে মানতে চাইছেন না। কিন্তু জিতেশের প্রাণপণে দৌড়ান আর কিই বা কারণে হতে পারে, এই বিচার করেই সকলে যেন জোর করেই মানা শুরু করলেন যে দেবী অম্বিকা মা হতে চলেছেন।
চিন্তিত ত্রিমূর্তি একত্রিত হলে, দুধেশ্বর কথা পারলেন। রমনাথের উদ্দেশ্যে বললেন, “কিন্তু নাথ, আপনি যে বললেন, আনি দেবীর সাথে সঙ্গমে অসমর্থ হয়েছেন। প্রতিবারই অসমর্থ হয়েছেন!”
রমনাথ বললেন, “আমি তো সেটাই বুঝতে পারছিনা পরমগুরু! কি করে সমস্ত কিছু সম্ভব!”
পরমপিতা বললেন, “সঙ্গমে অসমর্থ হয়েছেন, কিন্তু কিছু কি মুক্ত করেছিলেন আপনি আপনার থেকে? আপনার কি বীর্যপাত হয়েছিল, বা অন্য কিছু যা দেই অম্বিকা ধারণ করেছিলেন?”
রমনাথ বললেন, “না না আমার বীর্য থেকেই তো মোহক আর মোহকির জন্ম হয়েছে। দেবীর প্রতি আমি কামাকৃষ্ট হয়েছি, কিন্তু এক প্রকাণ্ড ভীতি যেন আমার সমস্ত স্বেদ, প্রশ্বাসকে একত্রিত করে, এক ঘূর্ণাবর্ত হয়ে দেবীকে প্রতিবার মলিন করে দিয়েছে”।
পরমপিতা এক গম্ভীর নিশ্বাস ত্যাগ করে বললেন, “বলতেই হচ্ছে, প্রকৃতির লীলা অদ্ভুত। যাকে আমরা বর্জ্য ভেবে এসেছি, তা দেবীর অঙ্গকে স্পর্শ করার পর আর বর্জ্য কি করে থাকতে পারে। তিনি নিজের সত্য ভুলে থাকতে পারেন, কিন্তু তার কারণে তো তিনি অন্য কিছু হয়ে যাননা। প্রকৃতিই থাকেন। প্রকৃতি অর্থাৎ চেতনার জননী, পরাচেতনা। তাঁর স্পর্শ মাত্রই সমস্ত কিছু পবিত্র হয়ে যায়। তাই আমরা যাকে বর্জ্য জ্ঞান করেছি, তাও তাঁকে স্পর্শ করা মাত্রই পবিত্র হয়ে গেছে। আর তাই সেই বর্জ্যদ্বারাই পরাপ্রকৃতি আজ জিতেশের মৃত্যুর অস্ত্র নির্মাণ করছেন”।
দুধেশ্বর বললেন, “এর অর্থ, কামনামুক্ত পরাপ্রকৃতি আমাদের কামনাকে ব্যবহার করে, নিজের প্রবল মমতা দিয়ে সেই সমস্ত কামনাকে পবিত্র করে নিয়ে, প্রভু পরমেশ্বরের এবং নিজের সন্তানের জন্ম দিয়ে, জিতেশের মৃত্যুর জন্য যেই অস্ত্র আবশ্যক ছিল, তার নির্মাণ করছেন। … ভয়ঙ্কর তিনি। অবলা, ভোলা প্রকৃতিই যদি এমন ভয়ঙ্কর হয়, তাহলে তিনি সবলা হয়ে গেলে, আর সচেতন হয়ে গেলে … প্রভু, আমাদের দুর্গকে তো মুহূর্তের মধ্যে নাশ করে দেবেন তিনি!”
রমনাথ গম্ভীর হয়ে উঠে বললেন, “যুদ্ধ জেতার অস্ত্র সঙ্গে থাকলেই যুদ্ধ জয় হয়ে যায়না মগরধারী! যুদ্ধ জয়ের জন্য সেই অস্ত্রকে সুরক্ষিত রেখে যুদ্ধে ব্যবহার করতে হয়। … এই সন্তানকে আমি কিছুতেই যুদ্ধে ব্যবহৃত হতে দেব না। হয় এই অস্ত্রের নাশ করবো, নয় এই অস্ত্রকে অকেজ করে দেব।… যতক্ষণ না ইচ্ছাধারী আর অনন্তবীর্য প্রস্তুত হচ্ছে, ততক্ষণ তো এই অস্ত্র ব্যবহার হতেই দেবনা আমি। কিছুতেই না”।
দুধেশ্বর বললেন, “আমরা এখন প্রত্যক্ষ ভাবে কিচ্ছু করতে পারবো না প্রভু। প্রত্যক্ষ ভাবে কিছু করতে গেলে, হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। দেবী অম্বিকা নিজেকে পরাপ্রকৃতিরূপে জানেন না। কিন্তু তাঁর মাতৃত্ব প্রকাণ্ড। যদি একবার আমরা তাঁর মাতৃত্বকে আঘাত করে দিই প্রত্যক্ষ ভাবে, তাহলে তিনি জাগ্রত হয়ে যাবেন, আর জাগ্রত হয়ে গেলে অধিক সময় লাগবেনা তাঁর পরাপ্রকৃতি স্বরূপ প্রত্যক্ষ হতে। আর একবার তা হয়ে গেলে, আমাদের আর কিচ্ছু করার থাকবেনা”।
কোকিলা বললেন, “পরমগুরু সঠিক বলেছেন। এক্ষণে আমাদের নিরপেক্ষ দর্শকের আসনে বসে সমস্ত কিছু দেখা উচিত। আমরা কারুকে সাহায্য করতে পারিনা। প্রকৃতি নিজের স্বরূপে না থেকে কি কি করতে পারে, এর থেকে অধিক শ্রেয় সুযোগ আমরা পাবো না তা দেখার। সেই দিকেই আমাদের এখন দৃষ্টি রাখা উচিত”।
ত্রিমূর্তি এই প্রস্তাবে সম্মত হলে, তাঁর সকলে রমবনেই স্থিত হয়ে, দিব্যদৃষ্টিদ্বারা দেবী অম্বিকা আর তাঁর কীর্তিকে দেখতে থাকলেন। তাঁরা দেখলেন, দেবী অম্বিকার স্তনযুগলের দুগ্ধ পানে লালায়িত চেতনাপুঞ্জ প্রবেশ করলেন সেই সপ্তস্তরবিশিষ্ট শিশুমূর্তির মধ্যে, আর সেই শিশু ক্রমশ মূর্তি থেকে এক উর্জ্জা পুঞ্জ হয়ে উঠলো, আর দেবী অম্বিকাকে সেই উর্জ্জা পুঞ্জ প্রবল ভাবে বাৎসল্য প্রেম প্রদান করতে থাকলে, নেত্র বন্ধ করে দেবী অম্বিকা সন্তানকে অনুভব করতে থাকলেন।
আর ঠিক সেই ক্ষণে পাবক সেখানে উপস্থিত হয়ে, সেই উর্জ্জা পুঞ্জকে হনন করে উত্তর দিকে যাত্রা করলেন। প্রবল বেগ প্রদান করলেন পাবককে তাঁরই ভ্রাতা অনিল। কিন্তু সমস্ত কিছুই যেন ব্যর্থ হতে থাকে এবার জিতেশের গতির কাছে। উর্জ্জাপুঞ্জ কিছু দূরে যেতেই, দেবী অম্বিকা সন্তানের বাৎসল্য লাভ না করতে পারার কারণে নিজের নেত্র খুললেন। উর্জ্জাপুঞ্জকে নিজের নেত্রের সম্মুখে না দেখতে পেয়ে পুনরায় নেত্রবন্ধ করলেন, আর তাঁর চোয়াল ভয়নাক ভাবে কঠিন হয়ে গেল।
উন্মত্ত উগ্রের ন্যায় নেত্র খুললেন তিনি। সেই নেত্র খোলার তীব্রতা এতটাই ভয়ানক যে ত্রিমূর্তির ধ্যানও ভঙ্গ হয়ে গেল। কিছুতেই পুনরায় দেবীর দিকে দৃষ্টি রাখতে না পারলে এবার উর্জ্জাপুঞ্জের কি ভবিষ্যৎ হলো, তা দেখাতে মনোনিয়োগ করলেন তাঁরা। আর ঠিক সেই মুহূর্তে দেবী অম্বিকা গর্জন করে উঠে বললেন, “পাবনি! … যেই কারণে তোমাকে ব্রহ্মাণ্ডে নদী রূপে প্রবাহিত হতে বলেছিলাম, সেই ক্ষণ এসে গেছে। নিজের ভূমিকা পালন করো এবার”।
গিরিশের প্রথম কন্যা দেবী পাবনি সম্মুখে উপস্থিত হয়ে দেবী অম্বিকার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে পাবকের সম্মুখে প্রবাহিত হতে থাকলে, দেহী অম্বিকা পুনরায় হুংকার ছাড়লেন, “দেবী কৃত্তিকা, তোমার লোক প্রস্তুত তো! … যাও তার দ্ব্বার খুলে দাও। আমার পুত্র আর কিছুক্ষণ পরেই তোমার লোকে প্রবেশ করবে। … সেখানে প্রস্থান করো। তোমার কন্যাদের প্রসবের চিন্তা করো না। সেখানে স্বয়ং আমি বিরাজ করছি, তাঁদের সন্তানের জন্ম আমার হাতেই হবে, তবে তা আমার সন্তান আকৃতি গ্রহণের পরেই হবে। তাই যাও শীঘ্রতা করো, নিজের কর্তব্য পালন করো”।
দেবী কৃত্তিকা প্রণাম করে বললেন, “যথা আজ্ঞা মাতা। আমি এখনই যাত্রা করছি”। … দেবী কৃত্তিকা চলে গেলেন নিজের নির্মিত লোকে, আর পিছন ফিরে দেখলেন, দেবী অম্বিকা স্বয়ং চন্দ্রকলা ও রবিকলা শোভা ধারণ করে তাঁর চারকন্যাকে প্রসবিনী করার ভূমিকায় স্থাপিতা হলেন। তা দেখে তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, “জগজ্জননী স্বয়ং যেখানে দেখভাল করছেন, সেখানে তো আর কনো চিন্তা করা মানে মূর্খতা!”
কিন্তু এই সমস্ত কিছু যা হলো, তা ত্রিমূর্তির ধারণারও বাইরে রইল, কারণ তাঁরা যে দেবী অম্বিকার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে নবজাত উর্জ্জার দিকে দৃষ্টি রেখেছিলেন সেইক্ষণে। সত্য বলতে, পরাপ্রকৃতির গতিপ্রগতি সম্বন্ধেও তাঁরা অচেতনই রইলেন। তাঁরা তাঁর ঈশ্বরত্বকেই খুঁজতে থাকলেন, কিন্তু তাঁর ঈশ্বরত্ব যে তাঁর মাতৃত্বের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়, কারণ তিনি নিজের একটি পরিচয়কেই মূল্য দেন, আর তা হলো এই যে তিনি মা, সেই সম্বন্ধেও অচেতনই থেকে গেলেন ত্রিমূর্তি তথা সকলে।
কিন্তু যা দৃশ্য তাঁরা দেখলেন, তাতেও তাঁদের বিস্ময় কম জন্মালো না। দেখলেন, পাবক ও অনিল আপ্রাণ প্রয়াস করলেও, জিতেশের গতি তাঁদের মিলিত গতির থেকেও অনেক অধিক। ঠিক যেমন চেতনাপুঞ্জের কাছে জিতেশের গতি অতীব সামান্য ছিল, তেমনই অনিল আর পাবকের গতি জিতেশের গতির কাছে অতি তুচ্ছ। তাই জিতেশ প্রায় পাবকে ধরেই ফেলেছিলেন।
অনিল পাবকের উদ্দেশ্যে বললেন, “পাবক গতি বৃদ্ধি করো, আমি আমার সমস্ত শক্তি তোমাকে প্রদান করেছি। তুমি নিজের গতি অধিক করতে পারো এখনের থেকে। কিন্তু তেমন করছো না কেন?”
পাবক উত্তরে বললেন, “মাতার নির্মিত এই উর্জ্জাপুঞ্জের তেজ প্রকাণ্ড। আমার থেকে সম্যক ব্রহ্মাণ্ড তাপলাভ করে, কিন্তু আমিও সেই উর্জ্জার ভার আর তাপ সইতে পারছিনা ভ্রাতা। এখন কি করা উচিত, কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা আমি”।
অনিল বললেন, “ভ্রাতা, সম্মুখে এক বিশাল তটিনী বয়ে চলেছে। এঁর আগে এঁর অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমিও জানতাম না, কারণ ব্রহ্মাণ্ডের এই দিকে আমরা তো আসিই না প্রায়। আশা করি, এই উর্জ্জার তাপ তিনিই সহন করতে পারবেন”।
বিধ্বস্ত পাবক প্রায় মূর্ছা যায় যায়, এমন অবস্থায় বললেন, “সঠিক বলেছ ভ্রাতা। … ইনি তো পাবনি, মাতা অম্বিকার জ্যেষ্ঠ ভগিনী। নিশ্চিত ভাবে তিনি মাতার সন্তানের রক্ষার্থেই অবস্থান করছেন এখানে। … এক তিনিই এই ভার ধারণ করতে সক্ষম”।
এই কথন শুনে দুধেশ্বর ভ্রু উত্তোলন করে রমনাথের উদ্দেশ্যে বললেন, “পাবনি এদিকে কি ভাবে প্রবাহিত হলো! … আর সত্য বলতে প্রবাহিত হলোই বা কি করে! … সে আমাদের ত্রিমূর্তির দ্বারে দ্বারে আশ্রয়ের জন্য ঘুরে ঘুরে আমাদের বিরক্ত করছিল বলে তো, কোকিলা তাঁকে শ্রাপ দিয়েছিলেন যে, মৃত্তিকা সঙ্গমেই তিনি মুক্ত হবেন, নয়তো সমস্ত সময়ে চারমৃত্তিকার মধ্যে আবদ্ধ থাকবেন তিনি!”
রমনাথ সেই কথাতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন অম্বাপুরিতে, আর যা দেখলেন তা দেখার জন্য সকলকে সেইদিকে দেখতে বললেন। সকলে দেখলেন, দেবী অম্বিকা সেই স্থানে বিরাজমান, আর চার মৃত্তিকারূপ একত্রিত হয়ে, নিজের নিজের গর্ভ থেকে একটি একটি করে একটিই কন্যার চার অংশকে জন্ম দিচ্ছেন, আর চারজনেরই গর্ভ একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়ে এক বিচিত্র স্বস্তিক চিহ্নের আকার ধারণ করেছে।
সেই দেখে, পরমপিতা কোকিলা তিরস্কার সুরে আচম্বিত হয়ে বললেন, “অসম্ভব! … এ কি করে সম্ভব! মৃত্তিকা স্ত্রীরা যাতে জননী না হতে পারে, তার কারণে আমি তাঁদেরকে অভিশাপ দিয়েছিলাম যে তাঁরা একাকী কেউই কনো একটি সন্তানের পূর্ণ অবয়বের জন্ম দিতে পারবেনা। কিন্তু দেবী অম্বিকা চার মৃত্তিকাকে এক বিচিত্র স্বস্তিক আকারে স্থাপিত করে, তাঁদেরকে দেওয়া অভিশাপের মান রেখে, এক সন্তানের জন্ম দেওয়াচ্ছেন! … আর তাঁদের এই মিলিত রূপের কারণে, তাঁদের অন্তরে আমার শ্রাপের কারণে আবদ্ধ পাবনি একের যোনীদেশের থেকে অন্যের যোনীদেশের সান্নিধ্যে এসে, মুক্ত হয়ে গেছে!”
রমনাথ মাথা নেড়ে বললেন, “আমরা একের পর এক জটিল জটিল চাল চেলে যাচ্ছি, আর আমাদেরই চালে প্রকৃতি আমাদেরকে পরাস্ত করে চলেছেন! … আমি শুধু একটাই কথা ভাবছি। যদি নিজের স্বরূপের ভান না থাকা অবস্থাতেই প্রকৃতি এমন বীভৎস হয়, তাহলে স্বরূপে প্রত্যাবর্তন করলে কি হবেন তিনি!”
কোকিলা বললেন, “প্রভু, আমাদের এখন ভাবার সময় নয়, ক্রিয়া করার সময়। জিতেশকে তাঁর লক্ষে সফল করতে হবে আমাদেরকে। তবেই দুর্গরক্ষা হবে। নাহলে এমনই ভাবে আমাদের সমস্ত চালকে প্রকৃতি নস্যাৎ করে দিচ্ছেন যে অতি শীঘ্রই আমাদের সমস্ত যোজনার নাশ হয়ে যাবে”।
দুধেস্বর বললেন, “প্রত্যক্ষ ভাবে আমরা সহায়তা করি, প্রকৃতিও এইটিই চান। তাহলে তিনিও প্রত্যক্ষ ভাবে আমাদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারবেন, যা এক্ষণে তিনি পারছেন না”।
রমনাথ বললেন, “প্রত্যক্ষ ভাবে না পারলেও, পরোক্ষ ভাবে তো করা সম্ভব সাহায্য। … যেই উর্জ্জার ভার স্বয়ং পাবক নিতে পারছেনা, সেই উর্জ্জাকে খণ্ডন করার দিকে অগ্রসর জিতেশ। কিন্তু তার পক্ষেও কি এই উর্জ্জাকে খণ্ডন করা সম্ভব! … পরমপিতা, আপনি ব্রহ্মাণ্ডের সৃজন করেছেন। অর্থাৎ সৃজনের সমস্ত শক্তি আপনার কাছে আছে। … আপনি সেই সমস্ত সৃজনে শক্তিকে ধারণ করে এক মহাশক্তিধর অস্ত্রের নির্মাণ করুন, যা উচিত কালে আমরা জিতেশকে প্রদান করবো”।
দুধেশ্বর বললেন, “কিন্তু প্রত্যক্ষ ভাবে আমরা যদি সেই অস্ত্র তাঁকে প্রদান করি, তাহলেও প্রত্যক্ষ ভাবে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া হয়ে যাবে। বিচার করে দেখুন একবার এই কথাকে”।
রমনাথ বললেন, “বেশ, সাধশিল্পকার চারুকে ডেকে পাঠান মগরধারী। আর পরমপিতা তাঁর কাছে কোকিলাস্ত্র প্রদান করবেন। পরে যখন জিতেশ আমাদের থেকে শক্তির কামনা করবে, তখন আমি তাকে উচিত ভাবে মার্গ দেখিয়ে দেব”।
দুধেশ্বর বললেন, “বেশ তাই হোক”।
এতো বলে চারুকে ডেকে, তাঁর কাছে কোকিলাস্ত্র প্রদান করলে, রমনাথ তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, “জিতেশ যখন তোমার আবাহন করবে চারু, তখনই তাঁকে এই অস্ত্র প্রদান করবে, তার পূর্বে নয়”।
চারু অত্যন্ত নিপুণ শিল্পী। যতক্ষণ না জিতেশ সেই অস্ত্রের কামনা করে, তার পূর্বেই সেই অস্ত্রের অনুরূপ বহু এমন কোকিলাস্ত্র নির্মাণের কাজে তিনি লেগে পরলেন। কেবল রূপে এক নয়, রূপে গুণে, এবং শক্তি সামর্থ্যে অবিকল এক প্রকার অস্ত্র নির্মাণ করতে থাকলেন, যাতে সাধকুলের কাছে এমন বহু অস্ত্র সজ্জ থাকে। নিসাধ কুলের কাছে তুফান আছে, দাবানল আছে, ঘূর্ণাবর্ত আছে, প্লাবন আছে, ঘূর্ণন আছে, সঙ্গে সঙ্গে ভূকম্প তথা বজ্র আছে। কিন্তু সাধদের কাছে তেমন কনো ভয়ঙ্কর অস্ত্র নেই।
নিসাধদের অস্ত্র দ্বারা স্বয়ং প্রকৃতিরূপা দেবী অম্বা সজ্জিত করেছিলেন, কিন্তু সাধদের কাছে তেমন কনো অস্ত্র নেই, কারণ প্রকৃতির সঙ্গ তারা পায়না, প্রকৃতি বিরোধী তারা, আত্মপূজারি তারা, তাই প্রকৃতির কনো বলতে কনো বরদান তাঁদের সঙ্গে নেই। এমন বিচার করে সাধশিল্পী চারু এমন বহু কোকিলা অস্ত্র নির্মাণ করা শুরু করলেন। আর শুধু কোকিলাস্ত্রই নয়, সেই একই আদলে বহু এমন অস্ত্র নির্মাণ করলেন, যেখানে শক্তি নির্মাণের কক্ষকে খালি রাখলেন, এবং এমন মনস্থির করে রাখলেন যে, যেমন যেমন রমনাথ বা দুধেশ্বরের শক্তি লাভ হবে, তাদের স্বেদকে সেই শক্তিনির্মাণ কক্ষে স্থাপিত করে করে, রমনাস্ত্র তথা মগরাস্ত্র নির্মাণ করে নিসাধদের উপর সাধরা সহজ বিজয় লাভ করবে।
একদিকে যখন এই সমস্ত কিছু চলছিল, তখন অন্যদিকে পাবক আর কিছুতেই মাতা অম্বিকার উর্জ্জাকে বহন করতে পারছিলেন না। তাই বাধ্য হয়েই শেষে দেবী পাবনির কাছে এসে উপস্থিত হয়ে তিনি মূর্ছাপ্রায় হয়ে বললেন, “দেবী পাবনি, রক্ষা, রক্ষা। এই উর্জ্জাকে রক্ষা করুন দেবী। এ অন্য কারুর উর্জ্জা নয়, স্বয়ং আপনার ভগিনীর নির্মিত উর্জ্জা। জিতেশ সাধদুর্গের দ্বারপাল, আর তাঁকে পরাস্ত না করলে মাতা কিছুতেই সাধদুর্গের নাশ করতে পারবেননা, আর তা না করতে পারলে কিছুতেই নিসাধকুল সুরক্ষিত হতে পারবেনা”।
“দেবী, জিতেশের বরদান ছিল যে, স্বয়ং শবেশের থেকে লব্ধ প্রকৃতিপুত্রই তাঁর নাশ করতে সক্ষম হবে। এই উর্জ্জা সেই একই উদ্দেশ্যে সৃজিত। হে দেবী, একে রক্ষা করুন। এই উর্জ্জার প্রবল তাপ তো আমিও সহন করতে পারছিনা। রক্ষা করুন দেবী”।
এতবলে পাবক মূর্ছা গেলে, দেবী পাবনি সেই উর্জ্জাকে গ্রহণ করে দক্ষিণ প্রান্তে ভ্রমণ করতে থাকলেন। জিতেশ সেই স্থানে এসে, পাবককে মূর্ছিত অবস্থায় দেখে, সেই উর্জ্জাকে বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে বাণ দ্বারা পাবনি যেই উর্জ্জাকে বক্ষে ধারণ করে দ্রুততার সাথে ভ্রমণ করছিলেন, সেই উর্জ্জা অংশকে আঘাত করতে গেলেন, কিন্তু সেই বাণকে নিষ্ক্রিয় করে দিলেন অনিল।
অনিলের এই দুঃসাহসের পর, জিতেশ তাঁকে একাধিক বাণে জর্জরিত করে দিলে, অনিলও ঘোর ঘূর্ণাবর্ত হয়ে সেই সমস্ত বাণকে দিশাহিন করে দিয়ে নষ্ট করে দিলেন। এরপর জিতেশকে সেই স্থান থেকে আটকাতে, প্রবল ঘূর্ণাবর্ত রূপ ধারণ করে, সেই স্থানের সমস্ত বৃক্ষকে উৎপাটিত করে, তাদেরকে দিয়ে জিতেশকে বারংবার আক্রমণ করলে, আক্রমণে জেরবার জিতেশ হুংকার ছেড়ে, নিজের হস্তে নিজের গদা ধারণ করে, সেই সমস্ত বৃক্ষরাজিকে আঘাত করতে করতে, অনিলের সম্মুখে এসে, নিজের গদার ফলাকে অনিলের বক্ষে গেঁথে তাঁর মৃত্যু নিশ্চয় করতে গেলে, সেই স্থানে ডাহুক বাহুক এসে বললেন, “এর পিছনে সময় নষ্ট করবেন না সাধপাল। এঁকে মূর্ছিত করে দেবীর উর্জ্জার নাশ করুন সাধরাজ। পাবনি সেই উর্জ্জা নিয়ে বহুদূরে চলে যাচ্ছে”।
সেই কথা শুনে, অনিলের মস্তকে গদা দ্বারা আঘাত করে তাঁকে মূর্ছিত করে রেখে, জিতেশ এবার ধনুর্বাণ ধারণ করে একাধিক বার সেই উর্জ্জাকে আক্রমণ করলেন, কিন্তু দেবী পাবনি সেই সমস্ত আঘাতকে নিজের স্রোতের দ্বারা প্রতিহত করে করে, দেবী অম্বিকার উর্জ্জাপুঞ্জকে বক্ষে ধারণ করে যাত্রা করতে থাকলেন। কিন্তু এই যাত্রার কালে, তিনিও অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে উঠলেন উর্জ্জার তাপের কারণে।
সমানে তাঁর অঙ্গ শুভ্র থেকে ধুসর হতে শুরু করে দেয় সেই তাপের কারণে। তাঁর গতি শ্লথ হয়ে যায়। আর যাত্রা করতে পারছেন না দেবী পাবনি। আর তাই তীব্র গতি ধারণ করে জিতেশ সেই স্থানে উপস্থিত হয়ে, পরস্পর ধনুর্বাণ নিক্ষেপ করতে থাকলেন। পরস্পর বাণ কনো কিছুই করতে পারেনা সেই উর্জ্জার।
জিতেশ প্রথমে ভেবেছিলেন দেবী পাবনি সেই উর্জ্জার রক্ষণ করছেন, কিন্তু পরে আবিষ্কার করলেন যে তাঁর সমস্ত বাণকে খাদ্য রূপে আহার করে নিচ্ছে সেই উর্জ্জাখণ্ড। চমকিত হলেন সেই দৃশ্য দেখে, আর অনুমানও করতে থাকলেন যে যদি সামান্য উর্জ্জাপুঞ্জের এমন শক্তি হয়, তাহলে সেই উর্জ্জাপুঞ্জ যখন বাস্তবিক রূপ ধারণ করবে, তখন কি হবে!
সেই বিচারের শেষে, ডাহুক বাহুক তথা জিতেশ একত্রে সেই উর্জ্জাকে প্রহার করতে শুরু করলে, তাতেও কিছু এসে যায়না। সমস্ত কাষ্ঠ, লৌহ, যেই দ্বারাই নির্মিত বাণ নিক্ষেপ করা হউক, উর্জ্জাপুঞ্জ সমস্ত কিছু আহার করে নিচ্ছে। সেই দেখে অসহায় জিতেশ এবার দর্শন প্রার্থনা করলেন নিজের পিতার, দুধেশ্বরের।
আবাহনে দুধেশ্বর সেখানে উপস্থিত হলেও, সম্মুখে রাখেন বিরক্তি। পিতাকে সম্মুখে দেখে সাধপতি জিতেশ বললেন, “পিতা, আমাদের কনো বাণ এই উর্জ্জাপুঞ্জের উপর কনো প্রভাব ফেলতে পারছেনা কেন?”
দুধেশ্বর বিরক্তি সম্মুখে রেখে বললেন, “তা আমি কি করে জানবো! … তোমার অস্ত্র, তুমি জানবে। যে তোমার অস্ত্র নির্মাণ করেছে, সে জানবে। আমি কি তোমার অস্ত্র নির্মাণ করেছি যে আমি জানবো?”
এতোবলে দুধেশ্বর চলে গেলে, বাহুক বললেন, “বললাম না, কনো ছল হচ্ছে আমাদের সাথে। দেখলেন ভ্রাতা, পিতার ব্যবহার কেমন অদ্ভুত ছিল”।
জিতেশ সেই কথাতে গম্ভীর হয়ে গেলে, ডাহুক বললেন, “আমার তো অন্য গন্ধ লাগছে বাহুক। পিতা আমাদেরকে তিরস্কার করলেন না মার্গ দেখালেন। … আমাদের অস্ত্র নির্মাতা সাধশিল্পী চারু। পিতা কি তবে আমাদের এই বলে গেলেন যে চারুকে আবাহন করতে”।
জিতেশ বিরক্ত হয়ে বললেন, “যেখানে কেউ কিছু করতে পারছেনা, সেখানে সাধশিল্পী কি করবেন?”
ডাহুক বললেন, “সাধপাল, সম্রাট সে নয় যে সমস্ত কাজ একাকী করে। সম্রাট তো সে যে সঠিক কাজ সঠিক ব্যক্তিকে দিয়ে করান। … অস্ত্র চালনায় সাধশিল্পী চারু কনো উপায়ই নয়, কনো সন্দেহ নেই এই ব্যাপারে। কিন্তু অস্ত্র নির্মাণের হুতা তো সে-ই। বিশ্বাস করুন আমার সাধপাল, আমার মনে হচ্ছে পিতা আমাদেরকে মার্গ বলে গেলেন। আর যেই বিরক্তি দেখালেন, তা একটি নাট্য মাত্র। আবাহন করুন সাধপাল আমাদের মহাশিল্পী, চারুকে”।
জিতেশ একটু বিরক্তি নিয়েই বললেন, “প্রকট হও চারু। সাধপাল জিতেশ তোমার আবাহন করছে”।
আবাহনের উত্তরে চারু সেখানে একটি অস্ত্র ধারণ করে উপস্থিত হলে, চারুর হাতে এক প্রকাণ্ড বাণ দেখে হতবম্ব সাধপাল জিতেশ বললেন, “এ কি প্রকার বাণ! … এতো বড় বাণকে নিক্ষেপ করার জন্য উপযুক্ত ধনুকেরও প্রয়োজন। আমাদের সামান্য ধনুকে এত সামর্থ্য কোথায় যে এই বিশালাকায় বাণকে নিক্ষেপ করবে। আর কি বাণ এটি! কি বিশেষত্ব এটির!”
সাধশিল্পী চারু বললেন, “এর সামর্থ্য কি, তা তো বলা সম্ভব নয় কারণ এই অস্ত্র এঁর পূর্বে কখনো ব্যবহার হয়নি। তবে এটুকু বলতে পারি যে, এই অস্ত্র সমস্ত প্রকার সৃজনকে নির্মাণও করতে পারে, আর নষ্টও করতে পারে, কারণ এই অস্ত্রের নির্মাতা আমি নই, স্বয়ং পরমপিতা কোকিলা। তিনি নিজের সমস্ত সামর্থ্যকে এই অস্ত্রের মধ্যে সজ্জ করেছেন। এই ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত প্রকার সৃজন তাঁর, আর তিনি সমস্ত প্রকার সৃজনকে নষ্টও করতে পারেন। তাই আমি নিশ্চিত যে, যেই উদ্দেশ্যে আপনি এই অস্ত্রের আবাহন করলেন, এই উর্জ্জার নাশ, তা এ করতে সক্ষম”।
প্রকাণ্ড সেই বাণকে ধারণ করলেন জিতেশ। আকারে তাঁর সমান সেই বাণ। তাই নিজের আকৃতিকে বিশাল করলেন তিনি সেই বাণকে নিক্ষেপ করার জন্য। আর বললেন, “বেশ ধারণ তো করলাম এই বাণ, কিন্তু এই বাণ নিক্ষেপ করার ধনুশ কই?”
সাধশিল্পী চারু এবার নিজের হাতে একটি বিশালাকায় ধনুশ ধারণ করে বললেন, “এই ধনুশ স্বয়ং প্রভু রমনাথের ধনুশ। একে ধারণ করুন হে সাধপাল, আর আপনার লক্ষ্যকে বিদ্ধ করুন”।
ধনুর্বাণ প্রদান করে, সেই স্থান থেকে চারু চলে গেলে, এবার সেই বিশালাকায় ধনুশে বিশালাকায় বাণ স্থাপন করে, বিশালাকায় সাধপাল পাবনির বক্ষে স্থাপিত সেই উর্জ্জাকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করলেন কোকিলাস্ত্র। আর সেই বাণের আঘাত মাত্রই, সেই উর্জ্জা সাতটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে দেবী পাবনির বক্ষ থেকে উর্ধ্বপানে সাত দিশায় ধাবিত হয়ে গেল।
সেই দেখে অট্টহাস্য হেসে উঠলেন সাধপাল, তো সাধনরেশ ডাহুক বাহুকও উচ্ছ্বসিত হলেন এই কৃত্যে। অন্যদিকে ত্রিমূর্তিও নিজেদের লক্ষ্যে সফল হলেন, কিন্তু তাঁরা দেবী অম্বিকার প্রত্যক্ষ ভাবে শত্রুতা করবেন না বলে, শান্ত থাকলেন। কিন্তু শান্ত থাকলেন না দেবীও অম্বিকা আর শান্ত থাকলেন না, জিতেশও।
দেবী অম্বিকা এবার ক্ষিপ্ত বেশে আবির্ভূত হলেন, জিতেশের সম্মুখে। সেই দেখে ঘর্মাক্ত হলেন রমনাথ, আর তাঁর স্বেদকণাকে তস্করি করে, চারু নির্মাণ করলেন রমনাস্ত্র। এবং একই সময়ে দুধেশ্বর নিজের মান ক্ষয় নিশ্চিত জেনে পলায়ন করতে গেলে, স্বেদে তিনিও পরিপূর্ণ হন, আর তাঁর স্বেদকে ধারণ করে চারু নির্মাণ করলেন মানাস্ত্র।
আর এই দুই বাণকে শীঘ্রতার সাথে তিনি গিয়ে সাধপাল জিতেশের কাছে অর্পণ করে বললেন, “দেবী অম্বিকাকে আটকাতে এই দুই অস্ত্রই কাজ দেবে আপনাকে প্রভু”।
জিতেশ দেবী অম্বিকাকে সামান্য জ্ঞান করে প্রথমে একাধিক সাধারণ বাণ নিক্ষেপ করলেন, কিন্তু সেই বাণ সমূহ দেবীর কাছে পৌছাতেও পারলো না দেখে তিনি এবার কোকিলাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন দেবীর উদ্দেশ্যে। দেবী অম্বিকা উচ্চৈঃস্বরে গর্জন করে উঠলেন, “এক জননীকে কনো অস্ত্র নিধন করতে পারেনা। তোর সামনে এক জননী দাঁড়িয়ে রয়েছে আজ জিতেশ। কনো কবচ, কনো বাণ তোকে আজ বাঁচাতে পারবেনা”।
এই বলে সাখ্যাত কোকিলাস্ত্রকে আহার করে নিলেন দেবী অম্বিকা। সেই দেখে, এবার জিতেশ নিক্ষেপ করলেন রমনাস্ত্র। আর তা নিক্ষেপ করার সাথে সাথে, দেবীর উর্জ্জাকে ভেদ করে, দেবীর বামবক্ষে তা নিক্ষিপ্ত হলে, দেবীর থেকে একটি অংশ পৃথক হয়ে পতিত হয়ে যায়। সেই দেখে ডাহুক তড়িঘড়ি করে বললেন, “সাধপাল মানাস্ত্রও এক্ষণে নিক্ষেপ করে দিন। দেরি হলে আর সুযোগও পাবেন না সেই অস্ত্র ব্যবহার করার জন্য”।
ডাহুকের কথাতে সহমতি জানিয়ে তৎক্ষণাৎ নিক্ষেপ করলেন সাধপাল সেই মানাস্ত্র। আর তা নিক্ষিপ্ত হতে, দেবীর দক্ষিণ বক্ষ থেকে একটি খণ্ড খণ্ডিত হয়ে পতিত হলে, মূর্ছিত দেবী অম্বিকা লুটিয়ে পরলেন সেই স্থানে। তা দেখে ডাহুক বাহুক ও জিতেশ উচ্চস্বরে আনন্দ প্রকাশ করে বললেন, “আজ সমস্ত কিছু সমাপ্ত। আর আমাদের কারুর থেকে ভয় নেই, কারুর থেকে নয়। অতিসুন্দর নিসাধপুরী এবার আমাদের, তাঁদের সকল সুন্দর সুন্দর কলাশিল্পী রমণীরা আমাদের”।
এই বলে সেখান থেকে প্রস্থান করলে, দেবী পাবনি দ্রুততার সাথে দেবী অম্বিকার কাছে এসে উপস্থিত হলে, তিনি দেখলেন এক নয় তিন তিনটি দেবী অম্বিকা। একজন গৌরি বর্ণের, একজন পীত বর্ণের এবং একজন শুভ্র বর্ণের। তা দেখে চমকিত দেবী পাবনি বললেন, “তুমি কোনটি অম্বিকা, আমার ভগিনী!”
তিন স্ত্রীই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমরা সকলেই অম্বিকা”। … দেবী পীতা মিষ্ট হেসে বললেন, “আমি পীতা বা অম্বিকার শ্রীরূপ। জিতেশের বাণে নয়, দেবীর ইচ্ছাতেই আমি তাঁর থেকে পৃথক হয়েছি। দুধেশ্বর মান আমাকে ধারণ করে তিনি স্বয়ং শ্রীমান হবেন, পীতাম্বর হবেন”। … আর দেবী শ্বেতা মিষ্ট হেসে বললেন, “আমি শ্বেতা। কোকিলার সাথে আমি যুক্ত হলে, তিনি শ্বেতাম্বর হয়ে যাবেন”।
আর দেবী গৌরি হেসে বললেন, “আমি তোমার ভগিনী অম্বিকা”।
দেবী পাবনি চিন্তিত হয়েই বললেন, “কিন্তু এই লীলার কারণ কি অম্বিকা!”
দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “আমি এই রূপে যে আমার পুত্রের কাছেই যেতে পারবো না। যদি যাই, তাহলে আমার পুত্রের বিপদের আশঙ্কা বেড়ে যাবে। তাই আমি নিজের থেকে এই দুই রূপ নির্মাণ করলাম, শ্রী অর্থাৎ পবিত্রতা আর শ্বেতা বা কলাবতী, যার থেকে সমস্ত কলার রচনা। … শ্রীকে মান ধারণ করবেন শ্রীমান হবার লালসায়, কিন্তু শ্রীর অর্থ যে পবিত্রতা তা তিনি কখনো জানবেন না, তিনি জানবেন শ্রী মানে বৈভব। আর শ্বেতাকে ধারণ করে সমস্ত সৃজনী শক্তির অধীশ্বর হয়ে ওঠার লালসায় কোকিলাও তাঁকে ধারণ করবেন, আর তাঁকে ধারণ করে কোকিলা থেকে হয়ে উঠবেন শ্বেতাম্বর। আর পীতাম্বরের পীত তথা শ্বেতাম্বরের শ্বেত হবার কারণে দেবী শ্রী ও শ্বেতা সর্বত্র যেতে পারবেন। আমার পুত্রকেও স্নেহ দিতে পারবেন”।
দেবী পাবনি রোদনের সুরে বললেন, “শান্ত হও অম্বিকা। তোমার পুত্র আর নেই, সাধপাল কোকিলাস্ত্র নিক্ষেপ করে তাঁকে সাত খণ্ডে বিভক্ত করে দিয়েছে। শান্ত হও”।
দেবী গৌরি হাস্যবসে বললেন, “শ্রী শ্বেতা, মৃত্তিকাদের কাছে যাও, তাঁদের সন্তানের জন্ম দেবার ব্যবস্থা করো। অতঃপরে সেই সন্তান আমার পুত্রের পত্নী হবে। আর হ্যাঁ, ধরিত্রী অর্থাৎ মৃত্তিকাপুত্রীর জন্ম হয়ে গেলে, তোমরা নিজেদের লীলাবশে মানকে শ্রীমান পীতাম্বর করো, আর কোকিলাকা শ্বেতাম্বর করো। আমি পাবনিকে সঙ্গে নিয়ে কৃত্তিকালোকে যাত্রা করলাম। আমার পুত্র সেখানেই আছে। পীতাম্বর আর শ্বেতাম্বর করার পর, আমার পুত্রকে সঙ্গ দিও দেবীরা”।
“আমি কৃত্তিকাকে সমস্ত ভার দিয়ে এসে, অখণ্ড তপে স্থিত হবো। আমার তপ তো একমাত্র আমার পুত্রের স্নেহেই ভঙ্গ হবে। তার পূর্বে নয়। আমার পুত্র সপ্তখণ্ডে বিভাজিত হয়ে গেছে। দেবী শ্রী, দেবী শ্বেতা, তোমাদের সৃজনই করেছি, আমার পুত্রের সপ্তখণ্ডকে একত্রিত করে দেবার জন্য। তা করে আমার কোলে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিও শ্রীশ্বেতা। আমার পুত্র একবার জিতেশের নাশ করার পূর্বে, আমার পুত্রই তোমাদেরকে ধীরে ধীরে আমার মধ্যে পুনরায় ধারণ করে দেবে। জিতেশের নাশপদ্ধতি আমার পুত্রকে শেখাতে, আমাদের এক নয় তিন হওয়া আবশ্যক দেবীরা। এবার আমাকে অনুমতি দাও”।
দেবী অম্বিকা গৌরি এবার দেবী পাবনিকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণে কৃত্তিকালোকে যাত্রা করলেন, আর দেবী শ্রী তথা দেবী শ্বেতা অম্বাপুরে যাত্রা করে, মৃত্তিকার সেবা করে, একটি অপরূপ সুন্দরী শিশু কন্যার জন্ম নিশ্চয় করলেন। দেবী মৃত্তিকারা সন্তানের মুখদর্শন করে, দেবী শ্রী আর দেবী শ্বেতার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “সখী তোমাকে এমন পীত বর্ণের দেখাচ্ছে কেন? শ্বেত বর্ণের দেখাচ্ছে কেন? তুমি এক থেকে দুই হয়ে গেলে কেন?”
দেবী শ্রী বললেন, “আমরা তোমাদের সখী নই, তাঁরই সৃজিত রূপ, শ্রী ও শ্বেতা। তাঁর পুত্রকে ও তোমার কন্যাকে দেখভাল করার জন্যই আমাদের সৃজন হয়েছে। তাঁদের দুইজনকেই আমরা পবিত্রতার বৈভব আর কলার স্নিগ্ধতা প্রদান করবো, যাতে করে তাঁরা আসতে আসতে পূর্ণভাবে পরাপ্রকৃতির চেতনাকে অন্তরে ধারণ করতে পারেন। আর তোমাদের কন্যা সেই সমস্ত যোনীকে ধারণ করবে নিজের বক্ষে আর আমাদের থেকে লব্ধ শ্রী ও কলা তাঁদের সকলের মধ্যে সমানে প্রদান করতে থাকবে, যাতে এই সম্যক সৃষ্টি যে মাতা অম্বিকার সন্তান, তা একদিন না একদিন তাঁরা অনুভব কততে পারেন”।
দেবী গগনি অশ্রুপূর্ণ নয়নে বললেন, “আর আমাদের সখী! সে কি আমাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছে!”
দেবী শ্বেতা বললেন, “না গগনি, রুষ্ট কেন হবেন তোমাদের প্রতি। তোমরা তাঁর সখী, অত্যন্ত আদরের সখী তোমরা। … তিনি একটি বিশেষ কাজে গেছেন। তিনি বলেছেন, ফিরে এসে তোমাদের আর তোমাদের কন্যার মুখ দেখে, তিনি ধ্যনস্থ হবেন, নিজের পুত্রকে দিবারাত্র দেখার জন্য তিনি ধ্যনস্থই থাকবেন”।
দেবী অনিলা প্রশ্ন করলেন, “কেন কি হয়েছে? তিনি নিজের পুত্রকে চর্মচক্ষে কেন দেখতে পারবেন না! ধ্যানে কেন দেখতে হবে? সন্তানকে মায়ের থেকে কে আলাদা করার স্পর্ধা করছে”।
দেবী শ্রী হেসে বললেন, “কে স্পর্ধা করেছে, তা তো তোমরা জানো অনিলা! … আর এও জানো যে তোমরা তাঁদের সম্মুখীন হতে চাইলেও সামনা করতে সক্ষম নও। … শুধু তোমরা কেন, জিতেশের বিনাশ না হলে স্বয়ং দেবী অম্বিকাও তাঁদের সামনা করতে পারবেন না। জিতেশ তাঁদের কবচ হয়ে সামনে দণ্ডায়মান। কিন্তু জিতেশ দেবী অম্বিকার কাছে অভিশাপ নয়, বরদান। জিতেশের জন্যই তিনি নিজের থেকে নিজের পরিচয়ে একটি সন্তানকে ধারণ করলেন, যিনি সার্বিক ভাবে তাঁরই সন্তান। সকলের সমস্ত চেতনা তো তাঁরই, কিন্তু সেই সন্তানের ক্ষেত্রে তনু, অঙ্গ, ভূত, চেতনা সমস্তই তাঁর”।
দেবী শ্বেতা বললেন, “হতে পারে, তাঁর বাকি সন্তানরা দেবী অম্বিকাকে পূর্ণ ভাবে মমতা লোটাতে দেবে না, কিছুটা অন্তত আত্মবোধ ধারণ করে রেখে দেবে সকলে। কিন্তু তাঁর এই পুত্র! … সে যে সার্বিক ভাবে অম্বিকার পুত্র। সম্পূর্ণ ভাবে সে নিজেকে এক না এক সময়ে তার মায়ের কাছে লুটিয়ে দেবেই। কি অদ্ভুত না দৃশ্য হবে সেদিন। জগজ্জননীর প্রেমকে প্রত্যক্ষ করবে জগত। আর তাঁর প্রেমই শক্তি হবে তাঁর পুত্রের”।
দেবী পাবকি প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু ধ্যানে কেন? নিজের সন্তানকে বক্ষে ধারণ করতে পারবেন না, এ কেমন নির্মম অভিশাপ!”
দেবী শ্রী মাথা নিচু করে বললেন, “যেই পুত্রকে সাতপলস্তাদ্বারা সৃজন করেছিলেন দেবী অম্বিকা, সেই পুত্রকে ত্রিমূর্তি নির্মিত অস্ত্র পুনরায় সাত খণ্ডে বিভাজিত করে দিয়েছে। … হ্যাঁ সাতটি খণ্ডের জননী দেবী অম্বিকাই, কিন্তু তাঁর পুত্রের স্মৃতি তো সাতখণ্ডে তাঁর মাতাকে দেখেনি। তাই যতক্ষণ না সাতখণ্ড পুনরায় একত্রিত হবে, ততক্ষণ সে তাঁর মাতার ধারণা বারবার করবে, কিন্তু তাঁর মাতার জন্য পাগলের মত হন্যে হয়ে এসে মায়ের বক্ষে আছরে পরবে না”।
“দেবী অম্বিকা তাই আমাদের দুইজনকে তাঁর পুত্রের এই সাত অংশকে স্নেহদান করার জন্য রেখে গেছেন, আর পুত্রের থেকে এই বিরহের অসহনীয় পীড়াকে তিনি ধ্যানস্থ হয়ে পূর্ণভাবে ভোগ করতে স্থিত হবেন”।
দেবী মীন এবার অসহায় ভাবে ভূমিতে পতিতা হয়ে গিয়ে অশ্রুপূর্ণ নয়নে বললেন, “নামেই সখী আমরা তাঁর। কিচ্ছু করতে পারিনা আমরা। অসহায় হয়ে তাঁকে পীড়া ভোগ করতে দেখবো। … না… মাতার প্রেম তো দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু মাতার ন্যায় প্রেম তো দেওয়া সম্ভব। সম্পূর্ণ প্রকৃতিতে আমরা মিশে যাবো। সমস্ত ভাবে তাঁর পুত্রকে আমরা প্রেম দেব। তাঁর মাতা যে তাঁকে কতটা প্রেম করে, তা কিছুতেই ভুলতে দেবো না আমরা। … আর হ্যাঁ, সঠিক বলেছেন দেবী, সামর্থ্য আমাদের অত্যন্ত লঘু, তাই যিনি বা যারা মা-সন্তানের এই বিচ্ছেদকে অনুষ্ঠিত করেছে, আমরা কিচ্ছু করতে পারবো না তাদের”।
“তবে কিছু করতে না পারলেও, আমাদের হৃদয় থেকে যেই ধিক্কার জাগছে তাঁদের প্রতি, যদি মাতা চান তবে এই ধিক্কার তাঁদের জন্য ঘাতক অভিশাপ হয়ে বর্ষণ করবে। তাই শ্রাপ দিচ্ছি আমরা এই চার মৃত্তিকা, যারা জগন্মাতার হৃদয়ে এই ছুরিকা আঘাত করার দুঃসাহস করেছে, একদিন না একদিন তাঁরা মাতার চরণের ধুলো হয়ে বিরাজ করবে, আর একবার তাঁর চরণের ধুলো হলে, আর কনোদিনও সেই অবস্থা থেকে উন্নত হতে পারবেনা। … যদি মাতার প্রতি আমাদের প্রেম শুদ্ধ হয়, যদি মাতার সন্তানের প্রতি আমাদের মমতা নিঃস্বার্থ হয়, তবে মাতা স্বয়ং আমাদের এই অভিশাপকে ফলিভুত করবেন”।
একদিকে নিসাধপুরে যখন এইসমস্ত হচ্ছিল, তখন দেবী অম্বিকা ও পাবনি ছিলেন কৃত্তিকালোকে। আর ত্রিমূর্তি একত্রে সাধপুরে উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে ছিলেন। আর ঠিক সেই সময়েই মৃত্তিকা দেবীদের এই অভিশাপ সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে হেলিয়ে দিলে, ত্রিমূর্তি বিচলিত হয়ে উঠলেন, তো দেবী অম্বিকা চোয়াল শক্ত করে বললেন, “তথাস্তু মৃত্তিকা”।
দেবী অম্বিকা আর দেবী পাবনি কৃত্তিকালোকে কদম রাখার পূর্বেই, সেখানে অবস্থান করছিলেন দেবী কৃত্তিকা। তিন দৌড়ে এসে দেবী অম্বিকার চরণে পতিত হয়ে বললেন, “এ কি হলো মা! … তোমার পুত্র তো এলো না, তাঁর সাতটি খণ্ড এলো কেবল। এ কি হলো মা!”
দেবী অম্বিকা হাস্যমুখে বললেন, “কৃত্তিকা, একটি পুত্রকে রাখবে বলে তো তোমাকে এতোবড় কৃত্তিকালোক নির্মাণ করার কথা বলিনি আমি। … তোমাকে তো আমার সাতপুত্রকে ধারণ করার জন্য এই বৃহৎ লোকের আয়োজন করতে বলেছিলাম”।
দেবী পাবনি এবং দেবী কৃত্তিকা হতবাক হয়ে দেবী অম্বিকার মুখের দিকে তাকালে, দেবী অম্বিকা মিষ্ট হেসে বললেন, “তোমার কি মনে হয় দিদি, আমার পুত্রকে এমনি এমনি ওরা ৭ খণ্ডে বিভক্ত করে দিলো! … আমি না চাইলে, ওকে কোকিলাস্ত্র কেন, স্বয়ং কোকিলাও স্পর্শ করতে অক্ষম”।
দেবী কৃত্তিকা বললেন, “কিন্তু কেন দেবী? এমন পীড়া ভোগ করার মার্গ কেন বেছে নিলেন আপনি!”
দেবী অম্বিকা মৃদু হেসে বললেন, “আমার পুত্র, আমার উর্জ্জা। আমার উর্জ্জাকে ধারণ করা মুখে কথা নয় কৃত্তিকা। সেই উর্জ্জাকে, সেই উর্জ্জার উৎসকে, সেই উর্জ্জার সামর্থ্যকে অনুধাবন করা সহজ কথা কনো ভাবেই নয়। … আর তার সাথে সাথে এই ব্রহ্মাণ্ডের সম্যক কথাকে অনুধাবন করা একটি দেহে তো সম্ভবই নয়। তাই সাত সাতটি দেহ প্রদান করলাম আমি আমার পুত্রকে। … আর এই সাত দেহে আমি তাঁর সম্মুখে প্রত্যক্ষ হবো না। কারণ আমার সান্নিধ্য পেলে, না তো সে আর না আমি, কেউই কর্তব্যে মনোনিয়োগ করতে পারবো না”।
“দেবী কৃত্তিকা, শ্রী ও শ্বেতার কৃপায় ধরিত্রী জন্ম নিয়েছে। আর তাই সমস্ত যোনী তাঁর মধ্যে বিরাজমান হবে আমার চেতনাকে ধারণ করে। অর্থাৎ, আমার সহস্র সহস্র সন্তান। তাদের সকলকেই তো আমার চেতনা সম্বন্ধে সচেতন করতে হবে। কে করবে তা? এক দেহে তা কি করা সম্ভব? সপ্ত দেহ ধারণের পূর্বেই বহু দেহ ধারণ করবে আমার পুত্র, আর অতঃপরে সপ্ত দেহ ধারণ করে সমস্ত যোনীকে প্রকৃতির সাথে পরিচত করাবে, আত্মের সাথে পরিচিত করাবে, প্রকৃতি ও আত্মের এই মহাসংগ্রামের সাথে পরিচিত করাবে, আর প্রকৃতির সাথে মমতায় আবদ্ধ হয়ে আত্মের থেকে মুক্ত হয়ে মহানন্দে মোক্ষধারণের কথা বলবে সে”।
“দিদি, একা আমার এই একপুত্রকে উদ্ধার করলে, আমি জগজ্জননী কি করে হলাম? আমার যে সহস্র সহস্র সন্তান, আর আমার এই এক সন্তান আমার সহস্র সন্তানকে সচেতন করবে। … আর যখন সে স্বয়ং সচেতন হয়ে যাবে, তখন শুরু হবে দুর্গভঙ্গের কাজ, আত্মকে সার্বিক ভাবে দমন করার কাজ। মা আর সন্তানের নীবির সম্পর্কে আমার পুত্র যেমন যেমন জরাবে, তেমন তেমন সে আমার বাকি সন্তানদেরও সেই মুক্তি নামক বন্ধনে আবদ্ধ করে, মহানন্দ প্রদান করবে। … এই আমার যোজনা”।
“তাই যখন দেখলাম মহাত্ম আমার মাতৃত্বকে পীড়া দিতে উদ্যমী, আমাকে দুর্গের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে বদ্ধপরিকর, তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, আমি একটি পুত্রের জন্ম দেব, যার নাম হবে মৃষু। আর সেই মৃষুকে আমি সাত স্তরে খণ্ডিত করবো, যাতে করে সে সাতটি বার দেহ ধারণ করে, আর নিজেকে উদ্ধার করে, আর সমস্ত যোনীকে উদ্ধারের মার্গ বলে। … সেই কারণে, আমি কৃত্তিকাকে পূর্ব থেকেই এই লোকের নির্মাণ করে রাখতে বলেছিলাম। ধরিত্রীর জন্ম মৃত্তিকার থেকে হবে, আর চার ভূতের থেকে হবে, তা পূর্ব থেকেই নিশ্চয় করে, ভূতলোক নির্মাণ করে দিয়েছিলাম।
“আর দিদি, আমি নিজে দ্বিতীয়বার রূপ ধারণ করার পূর্বে, তোমাকে রূপ প্রদান করেছিলাম যাতে করে, তুমি আমার সাত টুকরো সন্তানকে বহন করে কৃত্তিকালোকে পৌঁছে দিতে পারো। (মৃদু হেসে) পূর্বে আমি অম্বা বেশে এসেছিলাম। আমার উদ্দেশ্যই ছিল, আমার সন্তানদের উপর কি কি ভাবে, কি কি করা হচ্ছে, তা দেখার জন্য। তখনই আমি আমার পুত্রের জন্ম দেব, আমার পুত্রের সাথে যারা পবিত্র, অর্থাৎ ভূত আর মৃত্তিকা, তাঁদের কন্যার বিবাহ দেব, আমার পুত্রকে সাত অংশে রাখবো, যাতে সে অন্তে সাত বার দেহ ধারণ করে নিজেকে চেনে আর আমাকে চেনে, আর এই চেনার সময়ে আমার বাকি সন্তানদের সে মার্গদর্শন করে আসতে পারে। এই সমস্তই ঠিক করে যাই”।
“আর শুধু তাই নয়, আমি ত্রিমূর্তির মধ্যে ত্রাস তৈরি করে যাই, যাতে তাঁরা জটিলা, কুটিলা আর নাগিনীকে বিবাহ করে, তাঁদের সন্তানদের শক্তিশালী করে একটি মহাদুর্গ নির্মাণ করে আমাকে প্রতিরোধ করার জন্য। হ্যাঁ, দুর্গ নির্মাণ হবে, এই সিদ্ধান্ত আমার নয়, পরমাত্মের ত্রিগুণের, অর্থাৎ ত্রিমূর্তির। সেই দুর্গকে শক্তিশালী করে আমাকে ব্যস্ত রাখার প্রয়াস করবে, সেই সিদ্ধান্তও তাঁদের। কিন্তু তাঁদের মধ্যে আমি যদি ত্রাস না সঞ্চার করতাম, তাহলে তাঁরা এই সমস্ত কিছু করতেনই না। সেই কারণেই আমি তাঁদের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করি”।
দেবী পাবনি প্রশ্ন করলেন, “এই দুর্গ নির্মাণ করতে বাধ্য করলে কেন তাঁদের! এঁর কি উদ্দেশ্য?”
মাতা অম্বা মৃদু হেসে বললেন, “দিদি, আমার পুত্র বহু দেহ ধারণ করে, অবশেষে সাত বিশেষ দেহ ধারণ করে জীবদের মধ্যে বিরাজ করবে আর তাঁদেরকে মার্গদর্শন করবে চেতনা জাগ্রত করে মহাত্মের কবল থেকে মুক্ত হবার। কিন্তু কি করে সে সফল হবে তাঁর মার্গদর্শনে! যদি পরমাত্ম ত্রাসই না সৃষ্টি করে, তবে সমস্ত জীব কেনই বা আমার পুত্রের কথা শুনবে! যদি সমস্ত জীবকে ত্রিমূর্তি সহজ সাধারণ এবং সুখময় জীবনযাপন করতে দেয়, তাহলে আমার পুত্র কারুকে যখন বলবে পরমাত্মের থেকে মুক্ত হবার কথা, তখন তাঁর কথা কেউ শুনবে কেন? মানবেই বা কেন?”
“ত্রিমূর্তি অত্যন্ত ধূর্ত। তাঁরা সম্মুখে কারুকে রেখে আমার সন্তানদের ভুলিয়ে রাখতে চায়, আর তাঁদের সম্মুখে নিজেরা ভালো হবার মুখোশ পরে থাকে। পূর্বের বারেই দেখে নিয়েছিলাম, মদকে সম্মুখে রেখে, সমানে তাঁরা আমাকে পিছন থেকে আক্রমণ করে গেছে। সেই কারণে এবার তাঁদের মুখোশ খুলে ফেলে, তাঁদের আসল রূপ সম্মুখে নিয়ে আসতে বাধ্য করতেই এই দুর্গ নির্মাণ করতে দেওয়া”।
“যতক্ষণ না আমার পুত্র নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে চেনা আর আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে চেনার দিকে মনোনিয়োগ করবে, ততক্ষণ আমাই তাঁকে ত্রিমূর্তির এই প্রকৃত চরিত্রের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাবো না। যখনই সে প্রস্তুত হয়ে যাবে নিজেকে আর আমাকে চিনতে, তখনই আমি একটি অবতার রূপ ধারণ করে তাঁর জন্য সম্যক অতীত ও ভবিষ্যতের তথ্য ও তত্ত্ব প্রদান করে আসবো। আর তারপরেই সে অন্তিম ৭ অবতার রূপে দেহধারণ করবে, আর আমার প্রদত্ত সেই তত্ত্ব ও তথ্য থেকে নিজেকে, আমাকে আর মহাত্মদের সঠিক ভাবে চিনবে”।
“যেদিন সে সম্যক তত্ত্বকে জেনে চিনে, আমাকে আর নিজেকে সম্যক ভাবে জেনে ও চিনে, ভবিষ্যৎকে পূর্ণ ভাবে দেখতে সক্ষম হবে, সেদিন শুরু হবে আমার আর আমার পুত্রের মহালীলা। সেদিন বিনষ্ট করা হবে এই দুর্গ, আর অন্তে দুর্গের নির্মাতাকে তাঁদের নিয়তিতে পৌঁছে দেওয়া হবে”।
দেবী কৃত্তিকা ও দেবী পাবনি এবার নতজানু হয়ে বসে পরলেন দেবী অম্বিকার সম্মুখে, আর বললেন, “মা! … তুমি তো পরমেশ্বরী, স্বয়ং ব্রহ্ম। এতো লীলার প্রয়োজন কি মা? তুমি তো চাইলে, এই এক্ষণে সমস্ত কিছুর নাশ করে, তোমার সন্তানদের তোমার কাছে ফিরিয়ে আনতে পারো! … তাহলে এই অবধি কেন? এই লীলা কেন? এই নিজেকে সন্তানের থেকে দূরে রাখার পীড়া কেন? এই সন্তানরা তোমাকে ভুলে থাকে, সেই পীড়া গ্রহণ কেন?”
মাতা অম্বিকাও শিশুর মত কৃত্তিকা ও পাবনির সামনে ভূমিতে বসে পরে বললেন, “কৃত্তিকা তুমি মৃত্তিকার মা, দিদি তুমি আমার উর্জ্জাকে বক্ষে ধারণ করে মাতৃত্ব অনুভব করেছ। তাহলেই বলো, ঈশ্বরত্ব না মাতৃত্ব, কোনটি অধিক প্রিয় হতে পারে! … তোমার থেকে কিছু কামনা করার জন্য দিবারাত্র কেউ তপস্যা করে চলেছে, অর্থাৎ তোমার সাথে নিজের সম্পর্ককেই কামনা করা আর কামনা পুড়ন করার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা, সেই ঈশ্বরত্ব আমার কাছে প্রিয় নয় দিদি”।
“কৃত্তিকা, দশজন হোক বা শতজন বা সহস্র জন বা সমস্ত জীব হোক। তাঁরা আমার সামনে হাত জোর করে ঠিক যেই ভাবে এখন তোমরা বসে রয়েছ, সেই ভাবে বসে থাকবে, আমার নামে জয়ধ্বনি দেবে, আমাকে মিষ্ট মিষ্ট কথা শোনাবে, আমার এই ভাব প্রিয় নয়। … আমার কাছে প্রিয় ভাব সেটি, যেখানে সকলে আমাকে তাঁদের আপনের থেকেও আপন জ্ঞান করে নিজেদেরকে সঁপে দেবে আমার বক্ষে। মলমূত্র কনো কিছু ত্যাগ করার সময়েও ভাববে না সে, নিশ্চিন্ত হয়ে আমার বক্ষকে সে আঁকড়ে ধরে থাকবে। অখণ্ড বিশ্বাসে, অনন্ত প্রেমে, সে আমাকে নিজের একান্ত নিজের বলে গণ্য করবে, আমার কাছে এই ভাব প্রিয়”।
“আমাকে সে গাল দেবে, অতিরিক্ত মনখারাপ হলে কোমল কোমল হাত দিয়ে আমাকে আঘাত করারও প্রয়াস করবে। আমার কেশ ধরে খেলা করবে, আমাকে সে ঐকান্তিক ভাবে নিজের ধন, নিজেস্ব সমপত্তি জ্ঞান করে, স্নেহবসে লেহন করবে, ক্রোধ বসে কোমল হস্তে আঘাত করবে, ক্রীড়া বসে আমার কেশে নিজেকে লুকাবে, নিজের ভূমি জ্ঞান করে আমার ক্রোড়কে সে নিজের চরণদ্বারা পিষ্ট করবে। … দিদি, আমার ঈশ্বর হয়ে থাকতে নয়, মা হয়ে থাকাতেই অধিক আনন্দ”।
“কৃত্তিকা, ঈশ্বর হয়ে ভক্তকে অভুক্ত রেখে নিজে সুস্বাদু আহার করতে আমি পারবো না। বরং মা হয়ে সন্তানের অন্তরে চেতনা হয়ে বিরাজ করে, সন্তানকে আগে আহার করিয়ে, অবশিষ্ট আহার তাঁর অন্তরে থেকে গ্রহণ করাতেই আমার আনন্দ। কারুর তোষামোদিপূর্ণ বাক্য শ্রবণের থেকে সন্তানের থেকে শাসন শোনার ব্যকুলতাই আমাকে আকর্ষণ করে দিদি। আমি আমার সন্তানদের কাছে পূজিতা হয়ে থাকতে চাইনা। তাঁদের একান্ত আপন মা হয়েই থাকতে চাই, যার কাছে তাঁরা কেবল কামনার কথা নয়, হরষের, অভিজ্ঞতার, হতাশার, বেদনার, সমস্ত কথা বলতে পারে”।
“আমি তাঁদের কাছে এমন হয়ে থাকতে চাই যাতে তাঁরা আমাকে উচ্ছিষ্ট প্রদান করার সময়েও কুণ্ঠিত না হয়। মাকে কি আহার করালাম তা ভাবা সন্তানের ধর্ম নয়, সন্তানের ধর্ম এই চিন্তা করা যে মা যাতে অভুক্ত না থাকে। … সন্তান জানে যদি সে স্বয়ং অভুক্ত থাকে তাহলে মা কিছুতেই ভোগ স্বীকার করবে না। তাই লেশ মাত্র আহার থাকার পর, অর্ধেক নিজে আহার করে, আমার মুখে এক টুকরো ফল তুলে দেবে, আমি হাসি মুখে তা খাবো”।
“ফল লাভ করেনি, একটি বৃক্ষও ফল দেয়নি। শিকার করেছে একটি পক্ষী বা একটি পশু। যেন সেই আহারও আমাকে খাওয়াতে কুণ্ঠা না হয় তাঁর, তবেই আমি মা। মায়ের কাছে কুণ্ঠা থাকতে পারেনা দিদি! … একমাত্র মা-এর কাছেই পুত্র কন্যা সকলে উলঙ্গ হয়ে অবস্থান করতে পারে বিনা দ্বন্ধে, কারণ মায়ের কাছে কনো দ্বিধা নেই, কনো কুণ্ঠা নেই, কনো লজ্জা নেই, কনো অবগুণ্ঠন নেই। আমি সেই মা হতে চাই দিদি। ঈশ্বরী হওয়াতে আমার কনো রুচি নেই”।
“কি বস্ত্র ধারণ করে আসতে হবে সেই চিন্তা, কি আহার করানো যাবে আর যাবেনা সেই চিন্তা, কি কথা বলা যাবে আর যাবেনা সেই চিন্তা… কেন? কেন দিদি? কেন আমার সন্তানরা এমন ভাবে সঙ্কুচিত থাকবে তাঁদের মায়ের কাছে? আমার সন্তানরা উন্মুক্ত থাকবে আমার কাছে। তারা যাকে খুশী ঈশ্বর বলুক গিয়ে। ত্রিমূর্তিদেরই ঈশ্বর বলুক গিয়ে, আমার কিছু আসে যায়না। আমার সন্তান আমার বুকে থাকলে, আমার সন্তান আমার কোলে থাকলে, যে খুশী নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করে, পূজা গ্রহণ করুক আমি দেখতেও যাবো না”।
“কিন্তু দিদি, ত্রিমূর্তি আমার মাতৃত্বে আঘাত করেছে। আমার সন্তানদের ভ্রমিত করার চেষ্টা করেছে। চেষ্টা করেছে আমার সন্তানদের তাঁদের মায়ের কথা ভুলিয়ে দিতে। … মায়ের থেকে সন্তানকে আলাদা করার প্রয়াস তাঁদের জন্য অত্যন্ত ভারী পরবে। প্রতিমুহূর্তে তাঁদেরকে আমি শঙ্কিত করে রাখবো। প্রতিমুহূর্তে নিজেদের মিথ্যা সকলের সামনে এসে পরার ভয়ে আতঙ্কিত করে রেখে দেব। যতদিন নিজেদেরকে ঈশ্বর বলে দাবি করে ফিরছিল, আমি তাঁদের দিকে ফিরেও তাকাই নি। কিন্তু এবার তাঁরা মায়ের মাতৃত্ব নিয়ে খেলা করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। এর পরিণাম আমি তাঁদের দেবই। নিজেদের নির্মিত ব্রহ্মাণ্ডে নিজেদেরকেই ভৃত্য রূপে স্থাপিত করেই ছাড়বো। এ এক মায়ের বচন, এ এক মায়ের প্রতিজ্ঞা”।
দেবী কৃত্তিকার নেত্র থেকে অশ্রু বয়ে চলল। তিনি বললেন, “এই ভাবে নতজানু হয়ে করজোড়ে বসে থেকে কষ্ট দিচ্ছিলাম না তোমাকে গৌরি? যেখানে দুই বাহু প্রসারিত করে তোমাকে আলিঙ্গন করা উচিত ছিল, সেখানে … কি করি বলো? যখন যখন তোমার মাতৃত্বের সম্মুখে এসে দাড়াই, এতো আপ্লুত হয়ে যাই, নিজেকে এতটাই তুচ্ছ জ্ঞান হয় যে, মা নয় ঈশ্বর ভাবই প্রথম আসে”।
দেবী পাবনি বললেন, “এসব কথা ছাড়ো। গৌরি, ছেলের নাম কি রাখবি, ঠিক করেছিস কিছু? আমি একটা নাম ভেবে রেখেছি। যেই মুহূর্তে সে আমার কোলে এসেছিল, আমার মধ্যে যেই বাৎসল্য জেগেছিল, সেই বাৎসল্য আমাকে একটি নাম প্রদান করেছে”।
দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “সেটাই নাম হবে আমার ছেলের। কি নাম দিদি!”
দেবী পাবনি হেসে বললেন, “মা হয়ে গেলি, তাও তোর দুষ্টুমি বুদ্ধি গেল না। … একটু আগেই তো তুই সেই নাম বলে দিলি। … যখন তুই বলে দিলি, একমুহূর্তের জন্য বুকটা হাহাকার করে উঠলো। মনে হলো, ছেলের নাম রাখবো ঠিক করেছিলাম। ছেলের মা সেটাও রাখতে দিলো না”।
দেবী কৃত্তিকা বললেন, “কি নামে ডেকেছিল গৌরি। আমি তো শুনিনি সেই ডাক!”
দেবী পাবনি বললেন, “মৃষু। জন্মমৃত্যুর চক্রকে সম্যক ভাবে জানে যিনি, সে হলো মৃষু”।
দেবী অম্বিকা বললেন, “বেশ তাহলে আমাদের ছেলের নাম মৃষুই থাকবে। তবে হ্যাঁ, যখন সে নিজের সম্যক পরিচয় জেনে নিজের সমস্ত সাতকলাকে ধারণ করে নেবে, তখন তার নাম হবে মৃষু”।
দেবী পাবনি শিশুর মত ওষ্ঠফুলিয়ে বললেন, “দেখেছ কৃত্তিকা, কেমন দুষ্টু। একটু আগে নিজেই মৃষু শব্দ উচ্চারণ করলো না! এমন ভাব করছে যেন প্রথমবার নামটা শুনলো মৃষু। যেন আমিই নামটা দিয়েছি, এমন প্রমান করার প্রয়াস করছে”।
গৌরি বললেন, “সত্যিই তুমিই নামটা দিয়েছ। তোমার মনের মধ্যে থাকা নামটা আমার কাছে প্রত্যক্ষ হয়ে যাওয়াতে আমি ওই নামে ডেকে ফেলেছিলাম। … মৃষু তোমারই দেওয়া নাম”।
কৃত্তিকা বললেন, “কিন্তু গৌরি, শ্রী আর শ্বেতা কি দুধেশ্বর আর কোকিলার কাছে নিজেদের অর্পণ করতে পারবে?”
গৌরি হেসে বললেন, “গ্রহণ করবে বইকি, আর শুধুই কি গ্রহণ করবে, পীতাম্বর পীতাতে আর শ্বেতাম্বর শ্বেতাতে এমন আসক্ত হয়ে যাবে যে … (মিষ্ট হেসে) ক্রমশ প্রকাশ্য (খিল খিল করে হাসি)”। দেবী পাবনি হেসে বললেন, “ফাজিল মেয়ে একটা!”
