আদি কৃতান্ত – প্রকৃত ঈশ্বরকথা

এক বিস্তীর্ণ সময়ের পর মগরধারীর বন্ধন খুলে যায়। মদপুরী ততক্ষণে সম্পূর্ণ ভাবে এক ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়ে গেছে। তাই সেইদিকে আর না তাকিয়ে, সরাসরি রমবনে উপস্থিত হয়ে পরমপিতাকেও সেখানে ডেকে, দেবী ভূতানির সমস্ত কীর্তির কথা বলে রমনাথের উদ্দেশ্যে বললেন, “প্রভু আমাদের সেই ৫১ অংশকে খুঁজে বার করতে হবে। নাহলে দেবী পুনরায় জন্ম নেবেন”।

শবেশ মৃদু হাস্যে বললেন, “আর আমি তো চাই যে দেবী আবার জন্ম নিক। তাঁর আবির্ভাবের কারণে যেই শক্তিলাভ হয়েছে আমার, শ্রীলাভ হয়েছে আপনার আর কলালাভ হয়েছে কোকিলার, তা বোধ করি আপনি খেয়াল করেন নি। আর সত্য বলতে, সেই শক্তি, শ্রী আর কলার বিস্তার সর্বাধিক হয়েছে এই অন্তিম পর্বে, যখন তিনি অম্বা কম আর প্রকৃতি অধিক হয়ে উঠেছিলেন!”

“অর্থাৎ হে দুধেশ্বর, এবার আমি চাই যে দেবীর পুনরায় জন্ম হোক। আর তিনি শীঘ্রই নিজের স্বরূপের আভাস লাভ করে ফেলুন। তবেই তাঁর থেকে আমরা বহুগুণ অধিক শক্তি, শ্রী ও কলা লাভ করে, সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে উঠবো”।

পরমপিতা বললেন, “কিন্তু এবারে তিনি দেহধারণ করলে, তিনি তো আমাদের বিনাশের চিন্তাও করতে পারেন!”

দুধেশ্বর বললেন, “সঠিক বলেছেন পরমপিতা। আমাদের সেই বিষয়ে ভাবা উচিত প্রভু”।

শবেশ ঈষৎ মুচকি হেসে বললেন, “সেই কাজ তো আপনারা আগেই করে রেখেছেন দ্বিমূর্তি! … জটিলা ও কুটিলার থেকে সাধের জন্ম দিয়েছেন, আর নাগিনীর থেকে সাধির। এবার প্রয়োজন হলো ১৭টি শ্রেষ্ঠ সাধের নির্মাণ করতে হবে, আর তাঁদের দিয়ে এক মহাদুর্গের নির্মাণ করতে হবে। আমি এঁদের সকলকে বরদানের কবচ প্রদান করে করে মহাশক্তিশালী করে তুলবো, যাতে এঁদের দমন করতে করতেই দেবী অনন্তকাল ব্যস্ত থাকেন”।

“অনন্তকাল ব্যাপী এই দুর্গে স্থিত হয়ে তিনি যুদ্ধ করবেন, আর তাঁর থেকে অনন্ত শক্তি, শ্রী ও কলার নির্মাণ হবে, যা গ্রহণ করে করে, আমরা হয়ে উঠবো অধীশ্বর। … এতে করে, দেবীও খুশী কারণ তিনি তাঁর সন্তানদের সঙ্গ লাভ করবেন, আর আমরাও দেবীর থেকে অনন্তকাল সুরক্ষিত হয়ে সামর্থ্য লাভ করতে থাকবো”।

দুধেশ্বর প্রশংসামুখর হয়ে বললেন, “কিন্তু এই সংখ্যা এমন অদ্ভুত কেন! ১৭ কেন?”

পুমেশ মৃদু হেসে বললেন, “এঁদের সকলের রাজা হয়ে আমরা একত্রে বিরাজমান, যাকে কেউ গুরুত্ব দেবার কথা ভাববেই না, কারন আমাদের নাট্য সকলকে এই বলবে যে আমরা সেই ১৭ সাধকে দমন করতে ব্যকুল, কিন্তু তাঁদের বরদানের কারণে আমরা নিরুপায়”।

দুধেশ্বর হেসে বললেন, “অদ্ভুত পরিকল্পনা প্রভু। কিন্তু তার জন্য আমাদের যেমন দেবীর দ্বিতীয়বার দেহ নেবার অন্তরায়ের মধ্যে এই দুর্গ নির্মাণ করতে হবে, তেমন দেবীর জন্ম কোথায় হচ্ছে, সেই দিকেও নকজর রাখতে হবে, কারণ তাঁকে এই দুর্গে প্রবেশ করাতেও তো হবে, আর তা প্রবেশ করানোর জন্য আপনার পত্নী করে তাঁকে অবস্থান করাতে হবে”।

পরমপিতা বললেন, “সঠিক কথা। চলুন হে বিশ্বাণু, আমাদের এবার সেই শ্রেষ্ঠ সাধদের জন্ম দেবার চিন্তা করা উচিত”। এই বলে সকলে স্বস্বধামে প্রস্থান করলে, শুরু হয় দেবীর দ্বিতীয় সংগ্রামমঞ্চ সজ্জ করার কৌশলের বাস্তবায়ন। ক্রমশ সেই দুর্গের নির্মাণ শুরু হলো।

সেই দুর্গকে সার্বিক ভাবে অভেদ্য করতে দুই জটিলাপুত্রকে বেছে নিয়েছিলেন নরেশ, যারা একে অপরের ভ্রাতা আর যারা যুদ্ধপ্রেমী। এই দুই ভ্রাতার নাম হলো ডাহুকবাহুক। প্রবল আগ্রাসী বাহুক, আর তার থেকেও অধিক কুটিলবুদ্ধিধারী ডাহুক। তবে এই দ্বিগজকে অর্থাৎ দুই মহাগজকে মাঝে রেখে, আরো নিপুণ ভাবে দুর্গের নির্মাণ করতে থাকলেন নরেশ। পরমপিতার মার্গদর্শন অনুসরণ করে, ডাহুক ও বাহুক পরমেশের থেকে বরদান লাভ করলেন যে একমাত্র কনো বস্ত্রহীনা দিগম্বরী নারীই তাঁদের দমন করতে পারবেন।

নারী নিজের বস্ত্র ছাড়া অত্যন্ত দুর্বল, এতটাই দুর্বল যে সামান্য এক কীটও তাঁর দমন করতে সক্ষম সেই কালে। আর তাই পরমপিতা কোকিলা এমনই বিচিত্র বরদান কামনা করালেন ডাহুক ও বাহুকদের দিয়ে।

কিন্তু একাকী এই দ্বিগজে কিই বা হবে! পরাপ্রকৃতির তাণ্ডবের সামনে যে এঁরা অত্যন্ত নগণ্য! … তাই এই দুইয়ের দুইপার্শ্বে দুই আড়াইচালে চলা ঘটক রাখলেন, যাদের নাম হলো জিতেশ ও ইচ্ছাধারি। দুই ঘটকের কাছে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আদিশক্তিকে। তাই তাঁদের পাশে দুই তরী রাখলেন নরেশ, যাদের নাম হীরা ও কয়লা। আর মধ্যখানে রাখলেন মহাবলশালী অনন্তবীর্যকে মন্ত্রী করে। এছাড়া সম্মুখে ঘাতক সেনা রূপে রাখলেন, ৮ মহাশক্তিধরকে, অর্থাৎ মুমু, শুণ্ড, মদমন্ত, বারুদ, মুমুপুত্র হাজত, মন্ত্রার, সংহার ও মোহক।

ডাহুক বাহুককে বরদানের কবচ প্রদান করে শক্তিধর ইতিমধ্যেই করে দিয়েছেন। এবার পালা বাকিদের শক্তিশালী করে তোলার। অভেদ্য হয় যেন সেই বরদানের কবচ আর সঙ্গে সঙ্গে এমনও হয় যেন যে ত্রিমূর্তির কেউই তাঁদের দমন করতে পারবেননা। ফলে, তাঁদেরকে কেউই এই দুর্গের প্রকৃত রাজা বলে মানতেও পারবেনা। এই পরিকল্পনা অনুসারে, ত্রিমূর্তি নিশ্চয় করতে থাকলেন কে কি বরদান কামনা করবে, আর সেই অনুসারে তাঁরা বরদানের কবচে সুরক্ষিত হওয়া শুরু করলেন।

ডাহুক বাহুকের পরবর্তী বরদান গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হলেন জিতেশ, তবে সেই কালে ইচ্ছাধারীর জন্মও হয়নি। তাই শুরু হলো ইচ্ছাধারীর জন্মপ্রক্রিয়া, দুই সাধভ্রাতা বিরাম ও করের মাধ্যমে। নভ সকল সাধদের সাধনা ভঙ্গ করতে ব্যস্ত ছিলেন কারণ সাধরা বরদান লাভ করে করে, অধিক শক্তিশালী হয়ে নিসাধদের শান্তির সমাজকে অশান্ত করে তুলতে সদাব্যস্ত। বেশ কিছু বার নভ ত্রিমূর্তির কাছেও গেছিলেন, এর নিদান চাইতে। তাঁর বক্তব্য, নিসাধরা তপ কখনো আগ্রাসন ধারণ করেনা, কখনো অন্যের রাজত্ব অধিগ্রহণে রুচি রাখে না, তাহলে তাঁদের সাথে এমন কেন করা হয়। কিন্তু সেই কথা বলেও কিছু লাভ হয়নি। আর ডাহুক বাহুকের বরদান তো এমন লাভ হয়েছে যে, ত্রিমূর্তি চেয়েও কিছু করতে পারবেন না। তাই এবার নভ আর ত্রিমূর্তির অপেক্ষাতে থাকলেন না, সরাসরি এঁদের বরদান কামনা করা থেকেই অবরোধ প্রদান করলেন।

সেই বুঝেই পরমপিতা কোকিলা বিরাম ও করের নিকটে গেলেন তাঁদের মন্ত্রণা প্রদান করতে, কিন্তু ততক্ষণে বিরাম দুধেশ্বরের মন্ত্রণা লাভ করে রমনাথের তপস্যা করতে উপনীত হয়ে গেছেন। তাই করকেই কোকিলা বললেন, “পুত্র কর, পরমেশের তপস্যা করার পূর্বে, সহজপ্রসন্ন দুধেশ্বরের তপস্যা করে, তাঁর থেকে তোমার তপস্যার সুরক্ষা, আর তোমার তপস্যার ফলের সুরক্ষা কামনা করে নাও। নচেৎ নভ এসে তোমাদের তপস্যাকে ভঙ্গ করে দিতে পারে”।

শ্বশ্রূপিতার এমন মন্ত্রণা শুনে, প্রথম কর তপস্যা করলেন মগরধারীর, আর তাঁর থেকে তপস্যা ও তপস্যার ফল রক্ষার বরদান লাভ করে, অতঃপরে পরমেশ রমদেবের তপস্যা করা শুরু করলেন। যেমন কোকিলা বলেছিলেন তেমনই হলো, বিরামের কাছে নভ কুম্ভীর বেশে এসে তাঁর তপস্যাই শুধু নয়, তাঁর জীবনও নষ্ট করে চলে গেলেন। কিন্তু করের তপস্যা ভঙ্গ করতে গেলে, তা করতে পারলেন না, কারণ তাঁর তপস্যাকে রক্ষা করার জন্য স্বয়ং পরমগুরু দুধেশ্বর সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

তাই নভ করের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে, কর সফল হলেন নিজের তপস্যায়, আর তাঁর সম্মুখে রমনাথ এসে উপস্থিত হলে, তিনি বরদান লাভের সুরে বললেন, “প্রভু, আমার আপনার মত বলশালী আর অমর পুত্র চাই। কৃপা করুন আমার উপর”।

রমনাথ সেই কথা শুনে হেসে বললেন, “বেশ, আমি তোমাকে আমার একটি অংশ প্রদান করলাম। বলশালী হবে সে অদ্বিতিয়ম। কনো পুরুষ তাঁকে পরাস্ত করতে পারবেনা, এমনকি ত্রিমূর্তিও নয়। তবে অমরত্ব লাভ করতে হলে, তাকে তপস্যা করতে হবে। তাঁর তপস্যার ফলরূপেই সে অমরত্বের বরদান লাভ করতে সক্ষম হবে”।

এতবলে রমনাথ সেখান থেকে প্রস্থান করলে, কর এক মায়াবী যক্ষিণীকে বিবাহ করলেন, যার নাম করি, আর তাঁর গর্ভে একটি সন্তান অর্পণ করলেন। কিন্তু সেই সন্তানের মুখ দেখা সম্ভব হলো না করের পক্ষে, কারণ এক অন্য সাধ করকে দ্বৈরথে নিযুক্ত করে, তার হত্যা করে। করের হত্যার পর, করের গর্ভবতী স্ত্রী, করিকে অধিগ্রহণের প্রয়াস করলে, দেবী করি বললেন, “আমি একজন যক্ষিণী আর যক্ষিণীদের মধ্যে এই বিধান নেই যে এক স্ত্রী বা এক পুরুষ অন্য পুরুষ বা অন্য স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে পারে। আমরা কামনার আরাধনা করিনা”।

সেই সাধ উত্তরে হুংকার দিয়ে বললেন, “দেবী, তুমি একজন সাধের স্ত্রী, আর তাই তোমার যক্ষিণী গোষ্ঠীদের কি নিয়ম পালন হয়, তা বিচার করে লাভ নেই। তোমাকে সাধদেরই নিয়ম মানতে হবে। আমি তোমার পতির প্রাণ নিয়েছি, তাই তোমার পতির দাসী এখন আমার দাসী হয়ে গেল, আর তাই তোমাকে আমার সম্ভোগের পাত্র হতেই হবে”।

দেবী করি উচ্চৈঃস্বরে চেঁচিয়ে বললেন, “সেই ক্ষেত্রে, আমি মৃত্যুই পছন্দ করবো”। এও বলে নিজকে অগ্নিদাহ করে দিলেন দেবী করি। সেই সংবাদ লাভ করে ডাহুক অত্যন্ত বিচলিত হয়ে গেলেন। তিনি শুনেছিলেন কর কি বরদান লাভ করেছেন, আর তাই তাঁর সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বিশ্বাস করছিলেন যে, এই সেই সন্তান হবে যার হাত ধরে সাধ গোষ্ঠী সমস্ত জগতের উপর অধিকার স্থাপন করবে। ডাহুক বাহুক তাই সেই স্থানে এলেন এবং সেই সাধ, যার কারণে দেবী করির এই দশা হলো, তাঁকে মৃত্যু দিলেন।

কিন্তু এই সমস্ত কিছুর পর তাঁরা দেখলেন যে, যেই স্থানে দেবী করি অগ্নিদাহ হয়েছেন, সেই স্থানে একটি ছোট্ট শিশু ক্রীড়া করতে করতে সমানে বৃহৎ আকার ধারণ করে চলেছেন। সেই দেখে উচ্ছ্বসিত ডাহুক বললেন, “কর পরমগুরুর থেকে তপস্যা ও তপস্যার ফল রক্ষার বরদান নিয়েছিল। তাই দুধেশ্বর তাঁর তপস্যার ফলের রক্ষা করেছেন। মহাশক্তিমান কর ও করির সন্তান জীবিত”।

সেই সন্তান ইতিমধ্যেই বিশাল আকার ধারণ করে উঠে এক মহিষের রূপ ধারণ করে সম্মুখে এসে বললেন, “হ্যাঁ, আমি জীবিত। আমার জন্য কি আদেশ!”

বাহুক কিছু বলতে গেলে, তাঁকে থামিয়ে দিয়ে ডাহুক বললেন, “আদেশ! … আদেশ তো তুমি দেবে আমাদের, মহাশক্তিশালী ইচ্ছাধারি সাধ! … আজ থেকে তোমার নাম হলো ইচ্ছাধারী। তবে শোনো, আমরা সমস্ত সাধ তোমাকে আমাদের রাজা করে লাভ করতে প্রস্তুত কিন্তু, তার আগে তোমাকে রমনাথের থেকে বরদান নিয়ে আসতে হবে। তোমার কাছে শক্তি রয়েছে অফুরন্ত, কিন্তু যাতে সেই শক্তির নাশ না হয়, সেই ব্যাপারে নিশ্চিত তোমাকেই করতে হবে। … বরদান গ্রহণ করে নিজের শক্তিকে সুরক্ষিত করে এসে আমাদের সকল সাধদের রাজা হয়ে উপবেশন করো সিংহাসনে”।

এত শুনে, মহাবলশালী ইচ্ছাধারী শুরু করলেন রমনাথের তপস্যা, তো সেই কালে একজনের তপস্যা সমাপ্ত হয়ে গেছিল, আর তিনি হলেন জিতেশ। রমনাথ তাঁকে তপস্যার ফল প্রদান করতে আশার আগে, রমবনে উপস্থিত হলেন দুধেশ্বর ও প্রজাপতি। উভয়ে গিয়ে রমনাথকে বললেন, “প্রভু, জিতেশ এক বিচিত্র বরদান কামনা করার প্রয়াস করছে। আপনাকে কিন্তু সাবধান হয়ে যেতে হবে”।

রমনাথ উত্তরে হেসে বললেন, “যেই বরদানের কামনা করছে জিতেশ, সেই বরদানের মন্ত্রণা আমিই তাকে ছদ্মবেশে গিয়ে প্রদান করেছিলাম। তাই নিশ্চিন্ত হয়ে যান দ্বিমূর্তি”।

দুধেশ্বর জিজ্ঞাসু হয়ে প্রশ্ন করলেন, “অর্থাৎ… কিন্তু কেন? আপনার ও প্রকৃতির সন্তান! … কি ভাবে সম্ভব এটা!”

রমনাথ হেসে বললেন, “আর সম্ভব না হলে, কি হবে? প্রকৃতিকে লাচার করে দেবার এই সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ সুযোগ পরমগুরু। তাঁর দ্বারাও বদ্ধ নয় এমন সাধ উপস্থিত থাকলে, বুঝতে পারছেন, তিনি কতটা লাচার হবেন! … আর সন্তান তো তাঁর একার নয়, আমার ও তাঁর সন্তান। অর্থাৎ বুঝতে পারছেন, তাঁকে সেই সন্তানের জন্ম দিতে হলে, আমার সাথে একত্রিত হতেই হবে। আর আমার সাথে একাত্ম হওয়া মাত্রই আমি তাঁকে আমার প্রতি আসক্ত করে দেব। কিন্তু তাও সেই সন্তানকে ভূমিষ্ঠ হতে দেব না”।

“প্রকৃতি লাচার হয়ে এদিক থেকে সেদিকে যাবে, আর সেদিক থেকে এদিকে, কিন্তু সেই সন্তান তাঁর কিছুতেই ভূমিষ্ঠ হবেনা, আর যদিও হয়েও যায়, তাকে কনো না কনো অছিলায়, আমি সেই সন্তানের প্রাণ নাশ করতে থাকবো। অর্থাৎ জিতেশের উপর কনো ভাবে জয়লাভ করবেনা প্রকৃতি, অর্থাৎ আমাদের নির্মিত দুর্গ থেকেও কিছুতেই মুক্ত হবেনা প্রকৃতি”।

দুধেশ্বর মৃদু হেসে বললেন, “অদ্ভুত পরিকল্পনা প্রভু। যান তাঁকে এই বরদান প্রদান করে আমাদের পক্ষকে অক্ষয় করে আসুন”।

পরমপিতা বললেন, “কিন্তু প্রভু, একবার বিচার করে তো দেখুন, এই বরদান দেবার পর আমাদের কনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না জিতেশের উপর। যদি কনো কারণে জিতেশ আমাদেরই অস্তিত্বকে সঙ্কটে ফেলে দেবার চিন্তা করে!”

দুধেশ্বর হেসে বললেন, “পরমপিতা, আমরা প্রকৃতির সাথে সাখ্যাতে কনো যুদ্ধ করছিনা। সাখ্যাতে তো আমরা তাঁর পরমাত্মীয়। তাই তাঁর কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে আমাদের কেনই বা কুণ্ঠা থাকবে!… প্রয়োজনে, আমরা তাঁর কাছে হাত বাড়াবো”।

পরমপিতা বললেন, “এর অর্থ তো আমাদেরকে এমন আরো অনেক সাধের জন্ম দিয়ে তাঁদেরকে এমন অখণ্ড বরদানে ভূষিত করতে হবে, নাহলে যে আমাদের নির্মাণ করা দুর্গই দুর্বল হয়ে যাবে”।

রমনাথ মুচকি হেসে বললেন, “চিন্তা করবেন না, ইচ্ছাধারী তপস্যা করছে এক বিচিত্র বরদান লাভের জন্য। সে ছাড়াও বরদানের জন্য কামনা করছে অনেকে, কিন্তু অন্যদিকে এক বিচিত্র বরদানের কামনা করছে, দুই ভ্রাতা, হীরাকয়লা এবং এক বিচিত্র সাধ, নাম অনন্তবীর্য। তাছাড়া, মুমু, শুণ্ড, মুমুপুত্র হাজত, মন্ত্রার, সংহার, মোহক, মদমন্ত, বারুদ, সকলেই প্রস্তুত হচ্ছে। তবে স্মরণ রেখো, জিতেশ, ইচ্ছাধারী, অনন্তবীর্য হবে আমাদের নির্মিত দুর্গের শ্রেষ্ঠ তিন শক্তিধর, যাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রকৃতির পক্ষেও অসম্ভব হয়ে যাবে। আর সঙ্গে থাকবে ডাহুক বাহুক, যারা একত্রিত হলে বল ও বুদ্ধির এমন সংমিশ্রণ যে, বাকি সমস্ত সাধদের নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম”।

দুধেশ্বর বললেন, “অর্থাৎ এই দুর্গের আকার ভঙ্গি কেমন হবে, সেই কথা আমাকে বলুন হে পরমেশ”।

পরমেশ রমনাথ বললেন, “হে মগরধারী, তিনটি স্তর এই দুর্গের, স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ, এবং তিনটি গুপ্ত কক্ষ এই দুর্গের। স্থূলের রক্ষক হবে একাকী জিতেশ। সে একাই যথেষ্ট দুর্গের এই প্রথম অংশকে সুরক্ষিত করে রাখার জন্য। এর পরবর্তী অংশ হলো সূক্ষ্ম, সেখানের অধীশ্বর হয়ে থাকবে ডাহুক বাহুক। তাঁদের নেতৃত্বে থাকবে মুমু, মুমুপুত্র হাজত, মন্ত্রার আর মোহক। কারণ অংশের নেতৃত্বে থাকবে ইচ্ছাধারী, আর তার অধীনে থাকবে শুণ্ড, মদমন্ত বা দূষণ, বারুদ বা জ্বরা”।

“এ ছাড়া দুটি গুপ্তকক্ষ দুই পাশে। তাতে বিরাজ করবে দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকারের দুই সাধ, হীরা ও কয়লা, যারা স্থুল ও সূক্ষ্ম, দুই অবস্থাতেই দুর্গের রক্ষা করতে সক্ষম। আর রইল পরে, তৃতীয় ও অন্তিম দুর্গের গুপ্ত স্থল, সেখানে বিরাজমান হলো অনন্তবীর্য, যার সামর্থ্যের নাশ করতে যিনি যাবেন, তিনি স্বয়ং একজন সাধ হয়ে যাবেন”।

দুধেশ্বর এবং পরমপিতা একত্রে বললেন, “হে পরমেশ্বর, ডাহুক বাহুকের বরদান সম্বন্ধে আমরা জানি, আর জিতেশ কি বরদানের কামনা করতে চলেছে, তাও আমরা জানি। বাকিদের বরদানের সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞাত করান, যাতে এই দুর্গের সম্বন্ধে আমাদের পূর্ণ ধারণা থাকে”।

রমদেব বললেন, “প্রথমেই যাদের কথা বলতে হয়, তা হলো হীরা ও কয়লা, আর অনন্তবীর্য। হীরা ও কয়লা এই বরদান লাভ করেছে আমাদের থেকে যে, তাঁরা যেন প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণে আনার সমস্ত কৌশল সম্বন্ধে স্বতঃই জ্ঞান লাভ করতে থাকে। … বুঝতে পারছেন তো, এঁরা কেন গুপ্ত কক্ষের অধিকারী আমাদের দুর্গের মধ্যে! যখন যখন এঁরা সম্মুখে আসবে, তখন তখন প্রকৃতি অস্বস্তির মুখে পতিত হবে, কারণ এঁরা তাই তাই করবে যার দ্বারা প্রকৃতি অনিয়ন্ত্রিত এবং চঞ্চল হয়ে যায়। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভ, কিন্তু প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়াসের ফলে, যা হবে তা হলো প্রকৃতির চাঞ্চল্য বৃদ্ধি পাবে, অর্থাৎ প্রকৃতি অস্থির হয়ে উঠবে”।

“এর পরে যার বরদানের কথা আপনাদের বলবো, তিনি অন্য কেউ নন, স্বয়ং অনন্তবীর্য। এঁর কাছে এই বরদান আছে যে, এঁর প্রতিটি কোষ এঁর সমান শক্তিশালী, অর্থাৎ এঁর সম্যক যা শক্তি, তাই এঁর প্রতিটি কোষের শক্তি ও সামর্থ্য। অর্থাৎ এনেকে বিনষ্ট করতে হলে, এঁর সমস্ত কোষকে একত্রে বিনষ্ট করতে হবে। যদি তার একটি কোষও জীবিত থাকে, সেই একটি কোষ এঁকে পুনরায় জীবিত করে দেবে, এঁর সমস্ত অন্য কোষকে জীবিত করে দেবে। অর্থাৎ এঁর নাশ করতে হলে, এঁকে আহার করে নিতে হবে একবারে। সেই কারণেই বললাম যে, যিনি এঁর নাশ করবে, সে স্বয়ংই একজন সাধ হয়ে যাবে”।

“এর পরে যাদের বরদানের কথা বলবো তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মুমু। এঁর বরদান অনুসারে, কেউ যদি এঁর কলিজাকে এককোপে দুখণ্ড করে দিতে পারে, তবেই এঁর নাশ সম্ভব। মদমত্ত ধূম্রের সমান, তবে সামান্য ধূম্র নয়, দূষণের ধূম্র যার কণায় কণায় বিরাজ করছে জ্বরা। অর্থাৎ এঁর নাশ সামান্য ভাবে করতে চেষ্টা করলে, নাশ তো এঁর হবেই না, উল্টে সমস্ত স্থানে দূষণ ও জ্বরা ছড়িয়ে সম্যক প্রকৃতিকেই বিনষ্ট করে দেবে। এঁর নাশের উপায় হলো এঁকে এক মুহূর্তের মধ্যে এতটা স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে এঁর সমস্ত গুনাগুণ বিনষ্ট হয়ে যায়”।

“এর দুই পুত্র, শুণ্ডদণ্ড আর বারুদ। মদমত্তেরই দুই গুণ দূষণ ও জ্বরা এঁর দুই সন্তান, যেখানে শুণ্ডদণ্ড হলো দূষণ আর বারুদ হলো জ্বরা। অর্থাৎ পিতা শুণ্ডকে যদি নাশ করে দেওয়াও যায়, যেই ভাবে বললাম, সেই ভাবে, তাহলে তাঁর পুত্ররাও অনন্ত সংখ্যায় সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে পড়বে, আর তাঁরা সমস্ত চেতনাদের অস্থির করতে থাকবে জ্বরা আর দূষণের মাধ্যমে”।

“মুমুপুত্র হাজতের বরদান বিচিত্র। তাঁর বরদান এই যে, সে স্বয়ং একটি দুর্গ আর গোলকধাঁধা। আর তাই সে যাকে ধারণ করে থাকবে, সে কনো ভাবেই মুক্ত হতে পারবেনা তার থেকে। অর্থাৎ তাঁর মৃত্যু তখনই সম্ভব, যখন তাঁর সমস্ত দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে, আর তা তখনই সম্ভব যখন সে নিজে হাতে নিজের দুর্গকে নাশ করবে। মন্ত্রার নিজের মন্ত্রের বলে যাকে কামনা করবে, তাকে বশ করতে সক্ষম। যা কিছু আমাদের ত্রিমূর্তির অধিকারে স্থিত, সমস্ত কিছুকে সে অধিকার করে নিতে পারে কেবলই মন্ত্রের বলে”।

“সংহারের এক সহস্র হস্ত আর তাঁর মৃত্যু কেবলই কনো কুমারী কন্যার হাতেই সম্ভব হবে, এই বরদান আমি তাঁকে দেওয়াবো। এঁকে দীর্ঘলাল আমি লুকিয়ে রাখবো। যদি আমার আর প্রকৃতির সন্তান জন্ম নেয়, তবেই এঁকে প্রকাশ্যে আনবো, কারণ তবেই তো এঁর নাশ অসম্ভব হয়ে যাবে। আর অন্তে রয়েছে মোহক। এ যে সর্বত্র অন্ধকারের বিস্তার করতে সক্ষম”।

“তবে হে দুধেশ্বর, আসল ব্যক্তির বরদানের কথা তো এখনো আপনারা জানেনই না। ইচ্ছাধারী, জানেন তাঁর কি বরদানের বাসনা! … সমস্ত কিছুর শক্তি যিনি একত্রে ধারণ করে থাকবেন, তাঁর মৃত্যু তখনই সম্ভব, তার কাছেই সম্ভব। … বুঝতে পারছেন তো, ব্রহ্মাণ্ড থাকতে তা সম্ভবই নয়”।

“তবে যাই হোক, এঁরা সকলে যে বরদানে ইতিমধ্যেই ভূষিত হয়ে গেছেন, তেমন নয়। এঁদের অনেকে ইতিমধ্যেই বরদান লাভ করেছে, আর বাকিরা সময়ের সাথে সাথে বরদানের কবচ ধারণ করে আমাদের দুর্গকে অক্ষয় করে দেবে। তাই দুর্গ নির্মাণ তো হয়ে যাবে হে দুধেশ্বর, কিন্তু আমার চিন্তা হলো এই দুর্গের মধ্যে দেবীকে প্রবেশ করানো। প্রথম তাঁর জন্মের সংবাদ আমাদের লাভ করতে হবে, আর দ্বিতিয় তাঁর জন্মের পর তাঁকে প্রবেশ করাতে হবে এই দুর্গে। তা কি করে সম্ভব হবে?”

পরমপিতা বললেন, “হে পরমেশ্বর রমনাথ, পরমগুরু দুধেশ্বর সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে নিজের চর স্থাপন করে রেখেছেন যাতে করে দেবীর জন্মের স্থান ও পাত্রকে সঙ্গে সঙ্গে জানতে পারেন তিনি। তবে আমি ভাবছি অন্য কথা প্রভু। আমি ভাবছি যে যদি আমি একটি গ্রন্থের নির্মাণ করে, তাকে সমস্ত যোনীদের কাছে বাধ্যতামূলক করে দিই? তাহলে দেবী যেখানেই জন্ম নিক না কেন, তাঁকে এই দুর্গে প্রবেশ করতেই হবে, অর্থাৎ আমরা তাঁর জন্মের সন্ধান পাবোই পাবো”।

রমনাথ প্রশ্ন করলেন, “কি ভাবে সন্ধান পাবেন?”

পরমপিতা উত্তরে বললেন, “এই গ্রন্থের মধ্যে যেই যেই নীতি ও রীতি থাকবে, সেই সমস্ত কিছুই হবে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল সমূহ। আর প্রকৃতি কারুর নিয়ন্ত্রণে থাকেন না। অর্থাৎ এই গ্রন্থ যখন দেবীকে বাঁধতে সচেষ্ট হবে, তখন দেবী এঁর প্রতিবাদ করে উঠবেনই, আর তখন আমাদের পক্ষেও সহজ হবে দেবীর অবস্থানকে জেনে নেওয়া। … অতঃপরে, তাঁর কাছে আমরা ত্রিমূর্তি আত্মীয় হয়ে যাবো। আমি গুরুস্থানীয় হবো, দুধেশ্বর হবেন ভ্রাতা সমান, আর আমরা উভয় মিলে তাঁকে আপনার পত্নী করে দেব”।

রমনাথ বললেন, “এই প্রস্তাব তো যথার্থ। আপনি রচনা করে ফেলুন সেই গ্রন্থ। কি নাম দেবেন সেই গ্রন্থের?”

পরমপিতা বললেন, “কর্তা ভাবে সম্পন্ন হবে সেই গ্রন্থ; তাই তাঁর নাম হবে কৃতা”।

দুর্গনির্মাণ একদিকে চলতে থাকলো, আর অন্যদিকে দেবীর জন্মের আগেই, দেবীকে দুর্গে প্রবেশ করানোর জন্য কৃতার রচনা শুরু করলেন। তো অন্যদিকে দুধেশ্বর সন্ধান করতে থাকলেন দেবী জন্মের স্থান ও দেবীর অবয়বকে। মদের প্রভাবে অধিকাংশ পুরুষই স্ত্রীসন্তানের উপর অনধিকার অধিকার স্থাপনে মত্ত, আর তেমন কারুর কন্যা হয়ে তো কিছুতেই আসবেন না প্রকৃতি। তাই সহজ হয়ে গেল দুধেশ্বরের সন্ধান। কিন্তু সহজ হলো কি? কোথায় এমন পুরুষ? সন্ধান করে করেও যখন তাঁর সন্ধান পাচ্ছিলেন না, তেমনই এক দুর্গম শীতল মনোরম স্থানে, এক সদ্যজাত কন্যার কণ্ঠধ্বনি লাভ করেন দুধেশ্বর, আর তাকিয়ে দেখেন, সেই কন্যার চারিপাশে কেমন যেন এক পবিত্র শুভ্র আভা ক্রীড়া করে বেড়াচ্ছে।

সেই দেখে সেই দিকে গেলেন তিনি, তো দেখলেন এক পুত্রীর জন্ম দিয়েছেন রাজা গিরিশের পত্নী হিমানী। সেই কন্যাকেই দেবী প্রকৃতি জ্ঞান করে, সেই সমাচার প্রদান করলেন এসে বাকি দ্বিমূর্তিকে। আর তাই ত্রিমূর্তি সেই কন্যাকে দেখতে গেলেন। সেই কন্যা ত্রিমূর্তিকে দেখা মাত্রই প্রণাম করলে, দ্বন্ধে পতিত হয়ে যায় সকলে। প্রকৃতির স্বভাব ভিন্ন। সামান্য ভাবে তিনি আসেন এবং অসামান্য হয়ে ওঠেন, এমন অসামান্য হয়েই জন্ম নেওয়া দেবী কি করে প্রকৃতি হতে পারে? কিন্তু যদি প্রকৃতি না হন, তাহলে তিনি কে?

দ্বন্ধের সমাপ্তি করার জন্য, অম্বার বিরহে কাতর সেজে রমনাথ দেবী পাবনি, সেই কন্যার নাম যা, তাঁর আশেপাশে ভ্রমণ করা শুরু করলেন। যদি প্রকৃতি হন, নিশ্চিত ভাবে সেই স্থান থেকে অপসারিত হয়ে যাবেন তিনি, এমন স্থির করে রাখলেন রমনাথ। কিন্তু পাবনি তো রমনাথের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া শুরু করলেন। তাই দ্বন্ধ আরো অধিক হয়ে উঠলো। আর ঠিক তেমন সময়ে, দেবী হিমানী দ্বিতীয়বার অন্তঃসত্ত্বা হলেন, আর শুধু তাই নয়, ঠিক সেই সময় থেকেই দেবী পাবনিকে আর দেখা গেল না। তিনি গগনে নদীর আকারে প্রবাহিত হয়ে সমস্ত নিসাধলোকের, অর্থাৎ নিসাধ, কলাবিদ, ক্রীড়াবিদ, সকলের তৃষ্ণা মেটাতে থাকলেন।

দুধেশ্বর বুঝলেন না, পাবনি তো পরাপ্রকৃতি নন। তাহলে কি গিরিশ ও হিমানী পরাপ্রকৃতির জননী নন! … দ্বন্ধে রইলেন তিনি। কিন্তু অন্যদিকে দেবী হিমানী প্রায় ৫ বৎসর ব্যাপী অন্তঃসত্ত্বা রইলেন কিন্তু তাঁর সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেন না। সেই দেখে তির্যক হাস্য হেসে দুধেশ্বর আর হিমানীর উপর নজর রাখলেন না। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই, একদিন দেবী হিমানীর অকস্মাৎ প্রসব বেদনা জাগে।

পূজার থালি নিয়ে তিনি গিরিরাজের উপাসনা করতে যাচ্ছিলেন। তাই তাঁর সাথে দুটি সিপাহী আর দুটি সখী ছিলেন কেবল। দুটি সিপাহী মহারাজ গিরিশকে সংবাদ দিতে চলে গেলেন আর দুই সেবিকা মহারানী হিমানীর সেবা করতে তৎপর হয়ে উঠলেন। কিন্তু এই কালে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। দেহের ভার বহন করতে না পেরে, দেবী হিমানী একটি গিরিস্থানের উপর নিজের উদরকে স্থাপন করে ভার কম করে শ্বাস নিচ্ছিলেন।

খানিক পরে দেখলেন, তাঁর আর অন্তঃসত্ত্বা ভাব নেই। উদ্ভ্রান্তের মত তিনি নিজের গর্ভের সন্তানের সন্ধান করতে থাকলে সেই স্থানে গিরিরাজ গিরিশ এলেন। তিনি তাঁর মহারানীকে এমন অস্থির দেখে প্রশ্ন করতে তিনি বললেন, “দেখুন না মহারাজ, এই গিরিটি আমার গর্ভের সন্তানকে নিয়ে নিয়েছে। আমাকে দেখুন, আমাকে দেখে কি গর্ভবতী মনে হচ্ছে! … এই গিরিকে ভেঙে দিন মহারাজ। এ আমার সন্তানকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে”।

নাছোড়বান্দা এক জননীর আর্জিকে কিছুতেই খারিজ করে দিতে পারলেন না গিরিরাজ। তাই গিরিশ নিরুপায় হয়ে সেনাকে ডেকে সেই গিরিকে ভাঙতে গেলে, সেই গিরি নিজের অন্তরে থেকে এক অপরূপা সুন্দরী কন্যাকে তুলে দিলেন দেবী হিমানীর কাছে। আর সম্মুখে এসে বললেন, “ক্ষমা করবেন দেবী হিমানী। আপনার এই কনব্যার মধ্যে কনো প্রকার কলুষ থাকতে পারেনা, তাই আমি তাঁকে ধারণ করে, তাঁর অন্তরে আপনার থেকে লব্ধ যেই সামান্য কলুষ ছিল, তা হনন করে আপনাকে ফিরিয়ে দিলাম”।

এই অদ্ভুত দৃশ্যের পর, সেই সদ্যজাত কন্যার নামকরণ করা হয় গিরিজা, অর্থাৎ যার জন্ম গিরি থেকে হয়েছে। কন্যা বেড়ে উঠলো। কৈশোর ছেড়ে যুবতী হয়ে উঠলো। তবে এই সম্যক সময়কালে তাঁকে কৃতা প্রদান করার প্রয়াস হলে, তিনি কিছুতেই গ্রহণ করলেন না তা। কেবল গুহাবাসী হয়ে নিজেকে অবয়বের অতীতে নিয়ে গিয়ে ধ্যনস্থ রাখেন তিনি। এই সংবাদ নিয়ে পরমপিতা উপস্থিত হলেন দুধেশ্বরের। তো দুধেশ্বর সমস্ত কিছু শুনে বললেন, “আচ্ছা, দেবী হিমানীর সন্তান হলো তাহলে। সে তো আমার নজরদারির কারণে ভূমিষ্ঠই হচ্ছিলনা”।

দুধেশ্বর এবং পরমপিতা এবার গেলেন সেই কন্যাকে দেখতে। ছদ্মবেশ ধারণ করে ভিন্নভিন্ন ভাবে পরীক্ষাও করলেন। রূপে অনন্যা সেই কন্যা, যার থেকে চোখ ফেরানোই যায়না। দেবী অম্বা তো কৃষ্ণাবর্ণা ছিলেন, কিন্তু এই গিরিজা অম্বিকা অদ্ভুত ভাবে দুধেআলতা বর্ণের। হরিদ্রা, লালাভা তথা এক ক্ষীণ গোলাপি তথা তুঁতে আভা যেন তাঁর অঙ্গ থেকে ঠিকরে বেড়িয়ে আসে। মুখবদন অদ্ভুত সুন্দর এবং দীপ্তি সম্পন্ন। দেহের গঠন হৃষ্টপুষ্ট। নধর কটিস্থান তথা উদর দেশ, উন্নত স্তন তথা নিতম্বু। উন্নত ও দীর্ঘ স্কন্ধ থেকে দুই বেশ বলশালী অথচ অত্যন্ত কোমল দুই হস্তবাহু ধারণ করে রয়েছে দুই শক্তিশালী তথা অত্যন্ত সুদৃশ্য কোমল হস্তদ্বয়কে।

সব মিলিয়ে বড়ই বিচিত্র দেবী অম্বিকার রূপ, যা দেবী অম্বার রূপের সাথে অনেকটাই ভিন্ন। কেবলই অঙ্গের বর্ণের কারণে নয়, রূপে তিনি অদ্বিতীয়া। কিন্তু তাঁর থেকেও বড় কথা এই যে তাঁর অসম্ভব সুন্দরী রূপের সাথে তাঁর শক্তিশালী দেহের কনো সামঞ্জস্য থাকার কথা নয়, কিন্তু যেন একমাত্র দেবী অম্বিকার ক্ষেত্রেই এই দুই একত্রিত হয়ে তাঁকে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য প্রদান করছে, যা তাঁর প্রতি সকল পুরুষকে আকৃষ্ট করেও করছেনা, অর্থাৎ রূপের কারণে তাঁরা আকৃষ্ট হচ্ছে, কিন্তু বলশালী চেহারার আকার দেখে সেই আকর্ষণ একদিকে বৃদ্ধিও পাচ্ছে, আবার অন্যদিকে ভীতির সঞ্চার হচ্ছে আর ফলে সেই আকর্ষণ চলেও যাচ্ছে।

এই অদ্ভুত সমীকরণকে মেলাতে পারে একমাত্র কাম। এমন চেহারার স্ত্রী অবশ্যই কামনায় অস্থির হবেন, শুধুই তাঁকে উৎসাহ প্রদান করতে হবে, বা বলা যেতে পারে সামান্য উস্কানি প্রদান করতে হবে। কিন্তু দেবী অম্বিকার মধ্যে কামনার যেন লেশ মাত্রও নেই। পুরুষদের কাছেও, আবার স্ত্রীদের কাছেও, কারুর কাছেই তিনি ঘেঁষেন না। শিশুদের কাছে তিনি ঘেঁষেন। সকল প্রকার যোনির শিশুই যেন তাঁর প্রতি প্রবল ভাবে আকৃষ্ট হয়। আর শুধু আকারে শিশুরাই নন, সকল যোনী যেন তাঁর কাছে আসলে স্বতঃই নিজের নিজের বয়স ভুলে শিশু হয়ে যান।

পরমপিতা বললেন, “আমার মনে তো হচ্ছে, ইনিই দেবী অম্বা। অনেক অধিক সংকল্প নিয়ে, আর অনেক অধিক সামর্থ্যের ভাণ্ডার নিয়ে ইনি উপস্থিত হয়েছেন। নাহলে ইনার মধ্যে কনো কামগন্ধ নেই কেন! … পূর্ণপবিত্রা! এমন তো কারুকে এর পূর্বে দেখিই নি! … লেশ মাত্রও কামগন্ধ নেই ইনার”।

দুধেশ্বর বললেন, “কিন্তু এই ভাবে কাজ কি করে চলবে? কামের বর্ষণ করুন পরমপিতা। আপনার কাছে তা গচ্ছিত থাকে সর্বদা। আপনিই সকলকে কামাতুর করে তোলেন। তাই এই স্ত্রীকেও কামাতুর করে তুলুন। দেখে তো মনে হচ্ছে, হয় এই কন্যার কনো সামর্থ্য নেই, নয়তো এ সমস্ত নিজের সামর্থ্য ভুলে রয়েছে। হে পরমপিতা, যদি অম্বিকাই দেবী অম্বা হন, প্রকৃতি হন, আর যদি এই দেহের গঠনে সমস্ত সত্য তাঁর স্মরণ এসে যায়, বীভৎস হয়ে উঠবে এই কন্যা। তাই কামবর্ষণ করুন, কামগন্ধের স্পর্শ পেলে, হয় এই কন্যা কামাতুর হয়ে উঠে চিরভ্রমিত হয়ে যাবে, নয় কামের গন্ধে মোহিত হয়ে, নিজের দেহগঠনকে লঘু করে নেবে”।

এতো বললে, পরমপিতা কোকিলা কামরেণুদ্বারা দেবী অম্বিকাকে ঘিরে ফেললেন চারীদিক থেকে। দেবী অম্বিকা সমানে বিরক্ত হতে থাকলেন, কিন্তু কনো ভাবেই আকৃষ্ট হলেন না কামের কারণে। সেই দেখে পরমপিতা কামরেণুর সংখ্যা বৃদ্ধি করতেই থাকলেন সমানে। এমন চলতে থাকলে, এক সময়ে বিরক্ত অম্বিকা নিজের কেশকে শূন্যে নিক্ষেপ করে, উল্টোদিকে ঘূর্ণন করে চলে আসতে গেলে, তাঁর কেশের চাপে, সমস্ত কামরেণু জ্বলে ভস্ম হয়ে গেল, আর অম্বিকা যেন সেই কথা জানলেনও না।

এই দৃশ্য দেখে দুধেশ্বর বলে উঠলেন, “আমাদের প্রভু রমনাথকে এই সমস্ত কথার বিবরণ প্রদান করতে হবে। ইনি দেবী অম্বা ছাড়া কেউ নন। এতো সামর্থ্য কারুর নেই যে কামরেণুকে বিনাপ্রয়াসে ভস্ম করে দেয় কেউ। তবে বড় কথা এই যে, এই স্ত্রী তো উগ্র হবার বেশেই রয়েছেন। একে প্রথম থেকে দমিয়ে না রাখলে, কে জানে আমাদের নির্মিত দুর্গও এঁর কিছু করতে পারবে কিনা! … তাই, এঁর প্রতি আমাদের করুণা প্রদর্শন করে, প্রথম থেকেই এঁকে আমাদের দাসী করে নিতে হবে”।

“সামান্য এক দেহীকে যদি প্রভু রমনাথের সাথে বিবাহ দেওয়া যায়, তাহলে এমনই সৌভাগ্য প্রদান করা হবে, যার কারণে দেবী অম্বিকা চিরকাল দাসী হয়ে থাকবেন। কৃতা যখন তাঁকে বশ করতে পারেনি, তখন রমনাথই তাঁকে বশ করবেন। অনন্ত কামের সাগর তিনি, কনো কামের রেণু নন। তাঁর নাশ করার প্রয়াসও মুর্খামি। তার উপর জিতেশের বরদান দেবীর থেকে রমনাথের ঔরসে সন্তান কামনা করে। কামসাগরে এবার তো দেবীকে ডুবতে হবেই হবে। চলুন আমরা সূচনা দিই রমনাথকে দেবীর আবির্ভাবের ব্যাপারে”।

 একদিকে ত্রিমূর্তি একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়াস করলেন যে আগে কি করা উচিত, তো অন্যদিকে দেবী গগনি, পাবকি, অনিলা ও মীন একত্রিত হয়ে তাঁদের পতি নিসাধদের সম্মুখে গিয়ে বললেন, “নাথ, মাতা পুনরায় দেহ ধারণ করেছেন। … পূর্ব জন্মের ব্যপারে সম্যক ভাবে অজ্ঞান হয়ে রয়েছেন তিনি। আমাদের সেখানে যাওয়া উচিত। তিনি আমাদের সংগ্রামে মাতা যেমন করে সন্তানের সংগ্রামে সঙ্গ দেন, সেই ভাবে সঙ্গ দিয়েছেন। এখন আমাদের দায়িত্ব পালনের সময় এসেছে”।

নিসাধপতি নভ বললেন, “অবশ্যই যাবেন দেবী। তবে অতীত বলার ভুল করতে নয়। স্মরণ রাখবেন যার কাছে আপনারা যাচ্ছেন, তিনি স্বয়ং প্রকৃতি। তাঁর অজ্ঞাত কিছুই নেই। যদি তিনি অজ্ঞাত সেজে উপস্থাপন করে থাকেন, নিশ্চিত ভাবে তাঁর সেই অজ্ঞ হয়ে থাকার পিছনেও কনো গুরুতর কারণ আছে, কারণ অকারণ তিনি কিচ্ছু করেন না। চেতিনি সর্বসময়ে তাঁর সন্তানদেরকে আত্মগুণ থেকে সুরক্ষিত করে যথাযথ চেতনায় উদ্ভাসিত করে সত্যের সম্মুখীন করিয়ে মুক্ত করতে যাত্রারত। তাই, এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে তিনি ভুলে রয়েছেন বা ভুল করছেন”।

“তিনি ভুল কিচ্ছু করেন না। আর তাঁর ভাবকে ধারণ করা … সে তো অসম্ভব। মাতা আর মাতা-ন্যায়ের মধ্যে বহুতর পার্থক্য থাকে দেবী। তিনি মাতার ন্যায় নন, তিনি এই সমস্ত সংসারের সমস্ত যোনির সমস্ত কিছুর, সমস্ত ভূতের, সমস্ত নিসাধের, পক্ষের, তথা যা কিছু ভাবা যায়, সকল কিছুর প্রকৃত জননী। আর তাই, তাঁর যেই ক্রিয়াধারাকে আপনারা আমরা সামান্য দৃষ্টি দ্বারা দেখে মনে করি তিনি ভুল করছেন, তা এই কারণে মনে করি কারণ আমরা মাতার নজর দিয়ে দেখতেই পারিনা”।

“তাই দেবীরা, যাবেন আপনারা অবশ্যই, তবে যদি মাতা অতীত সম্বন্ধে জানতে চান, তবেই বলবেন। তিনি ভুল করেও ভুল করেন না। তাই যদি তাঁর অতীত জানার প্রয়োজন না থাকে, তাহলে তিনি কিছুতেই অতীত জানার জন্য প্রশ্ন করবেন না। তাই শুধু একটি বিশয়েই সতর্ক থাকতে হবে আপনাদেরকে। যা তিনি জানতে চাইছেন না, জানবেন সেটি সম্বন্ধে আপনারা না বলেন, এমনটাই তাঁর আদেশ”।

দেবী গগনি বললেন, “নাথ, আমরা তাঁর শিক্ষিকা হতে যাচ্ছিনা। তাঁকে সঙ্গ দিতে যাচ্ছি। … তিনি স্বয়ং জগন্মাতা। তাঁকে কিই বা শেখাবো আমরা! যদি কেউ উনার মার্গ দর্শন করেনও, তাঁকে তো তিনি স্বয়ং শেখাবেন সেই মার্গ দর্শন করানোর জন্য। … কিন্তু কথা এই প্রভু যে, তিনি হলেন জগজ্জননী। তাই তাঁর ভাবনা চিন্তা, কথাবার্তা, দৃষ্টিভঙ্গি সকলের থেকে সম্পূর্ণ ভাবে আলাদা হবে। না, আমরাও তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গি, সেই ভাবনা চিন্তা, সেই কথাবার্তা ধারণ করার উপযুক্ত পাত্রী নই, তবে অনেকের থেকে আমরা শ্রেষ্ঠ সেই সমস্ত কিছুকে ধারণ করার”।

দেবী পাবকি বললেন, “নাথ, হয়তো ধারণ আমরা কিছুই করতে পারবো না, কিন্তু মাতাকে কখনো একাকী আর নিঃসঙ্গ অনুভব করতে দেবো না। তাই তাঁর সখী হয়ে তাঁর সাথে যুক্ত থাকবো। হয়তো, তিনি জগন্মাতা বলে তাঁর সাথে অনেক সাধ শত্রুতাও করে নেবেন, আর তাঁকে কিছু করতে না পেরে, আমাদের অহিত করার প্রয়াস করবে, আর সেই কারণে আমাদের রক্ষা করতে গিয়ে মাতার দায়িত্ব একটু বেড়ে যাবে। কিন্তু, আমরা থাকতেও যদি মাতা নিঃসঙ্গ হয়ে একাকী বিচরণ করেন মনের বেদনায়, আমরা নিজেদের কি ভাবে তখন ক্ষমা করবো!”

নিসাধরাজ নভ হেসে বললেন, “এত কথা না বলে বললেই তো হয়, মাতার লীলায় অংশ নিতে যেতে চাইছেন আপনারা!”

দেবী অনিলা বললেন, “বলতে পারেন নাথ। সত্যই তাই। তাঁর স্পর্শ লাভ করার আনন্দ। তাঁর কীর্তিসমূহের সাক্ষী হয়ে থাকার আনন্দই আলাদা। তাঁর প্রতি স্পর্শে রোমাঞ্চ অনুভব করার কথা ভাবলেও অন্তরে বাহিরে পুলক জাগে। তাই আমরা তাঁর সঙ্গে থেকে সেই পুলক অনুভব করতে যেতে চাইছি। তবে আমরা এই ব্যাপারেও নিশ্চিত যে, যখন আমরা সঙ্গে থাকবো, তখন মাতা কিছু না কিছু ভাবে আমাদেরকে তাঁর লীলার কাজে লাগিয়েই দেবেন”।

এতবলে, দেবী গগনি, পাবকি, অনিলা ও দেবী মীন গিরিরাজের রাজ্যে গেলেন, এবং বিভিন্ন ক্রীড়ার মাধ্যমে সখী হয়ে উঠলেন দেবী অম্বিকার। আর অন্যদিকে ত্রিমূর্তিও দেবী অম্বিকার বিষয়ে বার্তালাপ করলে, রমনাথ সহমত হলেন যে, দেবী অম্বিকা নিজের স্বরূপ, বা পূর্বজন্মের কথা স্মরণ করার পূর্বেই, তাঁকে বিবাহ করে নিয়ে এসে, সন্তানপ্রাপ্তির দিকে প্রেরণ করে, রমনাথের সাথে কামনার বন্ধনে আবদ্ধ করবেন।

এমন বিচার করে, ত্রিমূর্তি একত্রে গিরিরাজের সভায় গমন করলে, সকলে নতমস্তক হয়ে সেখানে স্থিত থাকলেন। কিন্তু ত্রিমূর্তি আশেপাশে দেখলে, পরমগুরু দুধেশ্বর মিষ্ট হেসে বললেন, “আপনার কন্যা দেবী অম্বিকাকে দেখতে পাচ্ছিনা তো!”

গিরিরাজ গিরিশ ও তাঁর পত্নী হিমানী করজোড়ে তাঁদের সামনে উপস্থিত হয়ে গদগদ হয়ে বললেন, “সখীদের সাথে ক্রীড়া করছে মনে হয়। আমরা এখনি খবর পাঠাচ্ছি, বলছি তাঁকে যে স্বয়ং ত্রিমূর্তি এসে তাঁকে দেখতে চাইছেন”।

দুধেশ্বর মিষ্ট হেসে বললেন, “প্রয়োজন তাঁর সাথে নয়, আপনাদের সাথেই। … দেবী হিমানী, মহারাজ গিরিশ, সময় হয়ে গেছে জিতেশ সাধের থেকে ব্রহ্মাণ্ডকে মুক্ত করা যেতে পারে। তাঁর কারণে নিসাধ, কলাসাধক, শ্রীসাধক, এবং সকল যোনির সকল জীব অত্যন্ত পীড়ার মধ্যে রয়েছে। সমস্ত জগতকে সে তন্ত্র, মন্ত্র আর যন্ত্রের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখে দিয়েছে। আর জানেনই তো, আমরা ত্রিমূর্তি মিলেও তাঁর কনো অহিত করতে পারবো না”।

দেবী হিমানী বললেন, “হে প্রভু, তাঁকে ও তাঁর মত সাধদের তো আপনারাই বরদান প্রদান করেন। যখন জানেন সাধদের এমনই স্বভাব, শক্তির বরদানের অপব্যবহার করাই যাদের ধর্ম, তাদেরকে আপনারা বরদান প্রদান করেন কেন?”

রমনাথ সম্মুখে এসে বললেন, “পুত্রমোহ দেবী। হ্যাঁ, এটিই বোধকরি শ্রেষ্ঠ উত্তর আপনার প্রশ্নের। তাঁরা আমাদেরই সন্তান। সকলেই আমাদের সন্তান। আর তাই যে যা কামনা করে, তা পুড়ন না করতে পারলে আমাদের মনে হতে থাকে যেন আমরা পিতা বেশে এমন অক্ষম যে নিজের পুত্রের ইচ্ছাও পুড়ন করতে পারিনা”।

দেবী হিমানী প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু আমরা জীবরা তো এমন বরদান কামনা করিনা! অমরত্বের জন্য হাপিত্যেস করে বসে থাকিনা!”

পরমপিতা কোকিলা সম্মুখে এসে এবার মিষ্ট হেসে বললেন, “দেবী, যে নিজেকে যেই অবস্থায় স্থিত থাকতে দেখেন, তিনি নিজেকে সেই অবস্থা থেকে উন্নত করার কামনা করেন। জগতের, ব্রহ্মাণ্ডের বা কামনার, এই ধারা। জীব এমনিই এতো এতো ধারার সমস্যার মধ্যে আবদ্ধ থাকে যে বরদান স্বরূপ তারা সেই অবস্থা থেকেই উন্নত হতে চায়। আহারের চিন্তা করে তারা, নিবাসের চিন্তা করে তারা, আর সম্মানের চিন্তা করে তারা। কিন্তু সাধ বা নিসাধ আহার নিয়ে চিন্তিত নয়। আহার তো সাধদের জীবের লহু, আর দেহবল অধিক হবার কারণে অনায়সেই তা লাভ করে নেয়। একই ব্যাপার নিবাসের। সমস্ত জীবের লহুপান করে তারা, তাই সমস্ত জীব তাঁদের থেকে ভয়ে সিটকে থাকে। আর তাই তাদের মত সুরক্ষিত তো আর কেউ নেই”।

“পরে থাকলো কেবল সম্মান। আর এঁরা সম্মান লাভের জন্য বিশাল আয়ু আর অপরাজিয়তাকেই বেঁচে নিয়েছে, কারণ এঁরা জীবের থেকে উন্নত, আর তাই এঁরা স্পষ্ট ভাবে তাই জানে ও মানে যা জীবরা জেনেও জানেনা, আর মানে তো কখনোই না। জীব জীবনে বহু যুদ্ধ করে কিন্তু জীবনকে যুদ্ধ মানতে পারেনা। কিন্তু না সাধ আর না নিসাধ জীবের মত ভ্রমিত। এঁরা জীবনকে যুদ্ধ বলেই জানে। নিসাধও জানে, কিন্তু নিসাধের থেকেও অধিক মানে সাধরা। তাই তো তারা সর্বত্র, সর্বক্ষণ, সর্বজনের সাথে যুদ্ধ করে। এঁদের কাছে আপন বলে কেউ নেই, আছে কেবল শত্রুপক্ষ আর মিত্রপক্ষ। তাই এঁরা এই অমরত্বেরই বরদান কামনা করে যাতে শত্রুপক্ষের থেকে সর্বদা সুরক্ষিত থাকতে পারে”।

দেবী হিমানী গদগদ হয়েই বললেন, “আমার কন্যা অম্বিকাও একই কথা বলে, জীবন মানে যুদ্ধ। তবে সে এই তিন পক্ষেরই কথা বলে, দুইপক্ষের নয়। আত্মপক্ষ, মিত্রপক্ষ এবং শত্রুপক্ষ। তাঁর কথা অনুসারে মিত্রপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে আত্মপক্ষকে সুরক্ষিত করার জন্য শত্রুপক্ষের সাথে যুদ্ধ করারই অপর নাম জীবন। … আমার মেয়েটা একটা পাগল। অপার সৌন্দর্য লাভ করেছে পরাপ্রকৃতির কৃপায়, কিন্তু মন তার এই আত্মপক্ষের সন্ধানেই পরে থাকে সর্বক্ষণ”।

দুধেশ্বর হেসে বললেন, “পাগল নয় দেবী, আপনার কন্যা স্বয়ং প্রকৃতি। দেবী অম্বার পরবর্তী জন্ম। অম্বাবেশে যেই অসম্পূর্ণ কাজ রেখে গেছিলেন তিনি, তাকে পুড়ন করতে এসেছেন। … জিতেশ সাধের বরদানও তেমনই ছিল, প্রভু পরমেশ্বরের ও প্রকৃতির সন্তানই যে তাঁর নাশ করতে সক্ষম। আপনার কন্যা স্বয়ং প্রকৃতি, আর তাঁর বিবাহের বয়স হয়েছে। সেই কারণেই তো আপনাদের কাছে এসেছি, জিতেশের বিনাশের চিতা সাজাতে। হে দেবী হিমানী, হে মহারাজ গিরিশ, আপনার কন্যার হাত পরমেশ্বর রমদেবের জন্য প্রার্থনা করতেই আমাদের এখানে আগমন”।

মহারাজ গিরিশ বললেন, “কি সৌভাগ্য আমাদের। আরে কে কোথায় আছিস, আমাদের গৌরিমাকে খবর দে গিয়ে, স্বয়ং পরমেশ্বর তাঁকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। … আপনারা আসুন প্রভু। আসন গ্রহণ করুন। আপনাদের আতিথেয়তা করার সুযোগ প্রদান করুন আমাদেরকে”।

দুধেশ্বর বললেন, “ক্ষমা করবেন মহারাজ। আপনারা পরমপিতা ও পরমেশের আতিথেয়তা করুন। আমি তো দেবী অম্বিকার ভ্রাতা। আমি কি করে আপনাদের অতিথি হতে পারি!… আমি বরং আমার ভগিনীর সাথে সাখ্যাত করে আসি”।

দুধেশ্বর এরপর দেবী অম্বিকার সাথে সাখ্যাত করতে নির্গত হলে, একটি জলাশয়ে দেবী গগনি, অনিলা, পাবকি এবং মীনের সাথে জলক্রীড়া করতে দেখলেন দেবী অম্বিকাকে। দুধেশ্বরকে দেখে সকল নিসাধপত্নীরা নিজেদের অঙ্গকে বস্ত্রে দ্বারা আবৃত করে আড়ালে চলে গেলে, তাঁরা দেখেন যে তাঁদের সখী অম্বিকা স্বল্প বস্ত্রে জলপূর্ণ অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন দুধেশ্বরের সম্মুখে। দেবী মীন সেই দেখে এগিয়ে যেতে গেলে, দেবী গগনি তাঁর হাত ধরে টেনে নেন নিজের কাছে।

অন্যদিকে দেবী অম্বিকা সম্পূর্ণ বোকা হয়ে যাবার মত করে দুধেশ্বরের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকলে, মগরধারী আপাদমস্তক দেবী অম্বিকাকে বেশ কিছুবার দেখেন, কিন্তু যেন তাঁকে দেখেও কিছু বুঝতে পারেন না। দেহের কোন অঙ্গের জন্য দেবী এতটা সুন্দরী এবং এতটা আকর্ষণীয়, এই প্রশ্নেরই উত্তর সন্ধান করছিলেন তিনি। কিন্তু কনো অঙ্গকেই পৃথক ভাবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করতে পারছিলেন না তিনি। এমনই অবস্থায় তিনি মিষ্ট হেসে দেবী অম্বিকার উদ্দেশ্যে বললেন, “ভগিনী অম্বিকা, তোমার তো বিবাহ স্থির হয়ে গেছে। জানো কি তুমি সেই কথা?”

দেবী অম্বিকা সামান্য ভাবেই মাথা নেড়ে বললেন “কই না তো! কবে হলো? কার সাথে হলো?”

নরেশ মিষ্ট হেসে বললেন, “পরমেশ্বর রমনাথের সাথে”।

দেবী অম্বিকা বললেন, “পরমেশ্বরের সাথে বিবাহ! সে তো অনেক উত্তরদায়িত্ব! শুনেছি তাঁর বিশাল বড় পরিবার!”

নরেশ উত্তরে আবার হেসে বললেন, “শুনেছ তো তুমি সঠিক। ষণ্ড, গোচরণ, গোপাল, গোলক, আরো কত গোষণ্ড রয়েছে তাঁর পরিবারে।  তাঁর পরিবারে তো সাধ, নিসাধ, কলাবিদ, শ্রীবিদ, সমস্ত যোনীরাও রয়েছে। … সকলের সাথে আলাপ এখন থেকে করা শুরু না করলে যে, বিবাহের পূর্বে আলাপই শেষ হবে না। তাই তো তোমার ভ্রাতা এসে উপস্থিত হয়েছে, তাঁর ভগিনীকে সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন বলে”।

এত কথা বলে চলে গেলেন সেই দিনের জন্য, কিন্তু পরবর্তী প্রায় ৩০ দিন সমানে সাখ্যাত করলেন দুধেশ্বর দেবী অম্বিকার সাথে এবং রমনাথের সম্বন্ধে অনেক অনেক কথা বললেন, তাঁর পরিবারের ব্যাপারেও অনেক কথা বললেন। আরো ৭ দিন পরে বিবাহ। কিন্তু দেবী অম্বিকার যেন এই বিবাহে কনো মন নেই। দেবী গগনিদের কাছে এসে বসে তিনি বললেন, “আমার এই বিবাহে কনো ইচ্ছা নেই। দ্বিজ বর আমার। আগে তো বিবাহ হয়েছে রমনাথের। এই পুরুষদের স্বভাবই এমন। এক স্ত্রীতে তাঁদের মন কখনো ভরে না। আগের স্ত্রীকে ভোগ করা হয়ে গেল, তারপর সে আগুনে পুরে প্রাণ দিয়ে দিলো, কিচ্ছু আসেমযায় না এই পুরুষদের। ভোগ করা তো হয়ে গেছে! … আবার নতুন স্ত্রী, আবার করে ভোগ!”

দেবী অনিলা বললেন, “তাহলে গিয়ে বলে দে সরাসরি। তোর পিতামাতা তো তোর উপর কখনো জোর খাটায় নি!”

দেবী অম্বিকা মাথা নাড়িয়ে বললেন, “এখানে তাঁদেরকে কিছু বলা আর না বলা সমান হবে। পরমেশ্বর নিজেই এই বিয়ে করতে চেয়েছেন। তাঁকে না বললে, সমস্ত গোষণ্ড আর সাধরা এঁদের জীবনকেই অতিষ্ঠ করে দেবে”।

এমনই সময়ে সেখানে ষণ্ড এসে উপস্থিত হলো। তাঁর সঙ্গে বেশ কিছু চর। তাঁদের মধ্যে গোপাল, গোলক আর গোচরণও উপস্থিত হলেন। অপলক ভাবে দেবী অম্বিকাকে তাঁরা দেখতে থাকলে, দেবী মীন মনে করেন, দেবী অম্বিকা তো এঁদেরকে চেনেন না। তিনি এমন মনে করতে পারেন যে পরপুরুষ তাঁর দিকে নজর দিচ্ছে। … এই মনে করে তিনি বলতে গেলেন এঁদের আসল পরিচয়, কিন্তু তার মধ্যেই দেবী অম্বিকা সেই স্থান থেকে উঠে ষণ্ডদের কাছে চলে গেছেন।

দেবী তাঁদের কাছে যেতে, গোষণ্ডরা দেবী অম্বিকার চরণস্পর্শ করতে থাকলেন। দেবী অম্বিকার উদ্দেশ্যে ষণ্ড অশ্রুপূর্ণ হয়ে বললেন, “কোথায় চলে গেছিলে মা! তোমায় ছাড়া আমরা তো অনাথ হয়ে গেছিলাম!”

দেবী অম্বিকা বললেন, “তোমরা কি গোষণ্ড? … ভুল হচ্ছে তোমাদের কোথাও পুত্ররা, আমি দেবী অম্বা নই, আমি অম্বিকা”।

গোপাল সম্মুখে এসে বললেন, “আমরা তো মূর্খ গো আর ষণ্ড, অতো ভেদভাব কি আমরা বুঝি মা! … আমাদের কাছে যিনিই অম্বা, তিনিই অম্বিকা। মা যেই নামেই থাকুন না কেন, সব অবস্থাতেই যে তিনি মা!”

দেবী অম্বিকা আর একটি কথাও বললেন না। পরের কিছুদিন গোষণ্ডরা নিয়মিত দেবী অম্বিকার কাছে আসতে থাকলেন আর কে দেবী অম্বিকার ক্রোড় গ্রহণ করবে সেই নিয়ে বিতণ্ডা করে, অবশেষে যিনি বিজেতা তিনি দেবী অম্বিকার ক্রোড়ে মাথা রেখে তাঁর স্নেহ লাভ করতে থাকলেন।

দেবী গগনি বিবাহের আগের দিন এসে আবারও বললেন, “হে রে অম্বিকা, বিবাহে তোর মত হয়েছে এবার তাহলে!”

দেবী অম্বিকা হেসে বললেন, “উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছি এই বিবাহের মধ্যে সখী। … আমার সন্তানরা যে আমার পথ চেয়ে বসে রয়েছে। এর থেকে বড় কারণ আর কিই বা হতে পারে!”

দেবী মীন হেসে উঠে বলে ফেললেন, “আমাদের সখী সেই একই আছে। সন্তান ছাড়া তখনও কিছু বুঝতো না, আজও কিছু বোঝেনা”।

দেবী অম্বিকা জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “তখন বলতে কবে!”

দেবী গগনি হেসে বললেন, “ও কিছু নয়। অনেকদিন স্বামীসুখ পায়নি তো, তাই মতিভ্রম হচ্ছে মীনের”।

এই ভাবে অনেকবারই কথা পরিবর্তিত করে দেওয়া হলে, অবশেষে বিবাহের দিন উপস্থিত হলে, ধুমধাম করে বিবাহ অনুষ্ঠিত হলো। বিবাহে সকলে নিমন্ত্রিত, সাধ ও নিসাধ সকলেই। জিতেশও সেখানে এলেন। আর দেবী অম্বিকার কাছে এগিয়ে গিয়ে তিনি চাপা স্বরে বললেন, “জিতেশের সাথে ধোঁকা! যাকে তাকে বিবাহ করে নিয়ে, তাঁর থেকে সন্তান পেলেই কি সে জিতেশের নাশ করতে পারবে! … শুধু পরমা সুন্দরী হলেই প্রকৃতি হওয়া যায়না। প্রকৃতি মানে বোঝেন দেবী!”

এ এক সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। এই কথার ব্যাপারে তো কেউ বলেন নি কখনো! না পিতা, না মাতা, না ভ্রাতা দুধেশ্বর, না পরমপিতা, আর না সখীরা! … দেবী অম্বিকা নিজের আসন ত্যাগ করে সকলের সাথে সাখ্যাত করার প্রয়াস করে, সকলের মধ্যে চলতে থাকা কথা শোনার প্রয়াস করলেন। শুনলেন অনেকেই এই বিষয়ে কথা বলছেন। কেউ বলছেন, “এবার জিতেশ সাধের থেকে মুক্তি পাবো আমরা”। আবার কেউ বলছেন, “যন্ত্র, মন্ত্র আর তন্ত্র দিয়ে আমাদের যেন গলা টিপে ধরে ছিল এতকাল জিতেশ। এবার তার থেকে মুক্তি পাবো”।

কারুকে প্রশ্ন করতে না পেরে, শেষে সখীদের প্রশ্ন করতে, দেবী পাবকি বললেন, “ও কিছু না সখী। বিবাহের পর, স্বামীর সাথে মিলন হলে সন্তান লাভ হয়না, সেই কথাই সকলে বলছে”।

দেবী অম্বিকা বুঝলেন, এই কথা বলছেন না কেউই। বা যেই কথা বলছেন সকলে, তা এই কথা নয়। সকলের এই কথা বলার সময়ে মনের মধ্যে এক প্রকাণ্ড ভয় আর ভয় থেকে মুক্তির আশা কাজ করছে। … এই সামান্য কথাতে ভয়ই বা কোথায়, আর সেই ভয় থেকে মুক্তি পাবার আশারই বা কি আছে! … এই বিচার করে তিনি এবার দুধেশ্বরের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, “ভ্রাতা, সকলে একটিই কথা বলছে যে এবার জিতেশের থেকে মুক্তি লাভ হবে। কৃপা করে আমাকে বলো যে, আমার বিবাহের সাথে কি জিতেশের থেকে মুক্তিলাভের কনো সম্বন্ধ আছে!”

দুধেশ্বর হেসে বললেন, “তেমন কিছু নয় ভগিনী। বেশ কিছু সাধ বরদান রূপে নিজেদের অমরত্ব স্থাপিত রাখতে চেয়ে, এমন এমন বরদান চেয়েছেন যে স্বয়ং প্রকৃতিই একমাত্র তাঁদের বিনাশ করতে সক্ষম হন। … আর প্রকৃতির অভাবে নিজেরা অমর জ্ঞান করে, এঁরা বাড়াবাড়ি করে চলেছে। তাই তোমাকে বিবাহ করলেন রমনাথ। যাতে এঁরা মানে যে এঁদের বিনাশ যার কারণে, তাঁর আবির্ভাব হয়ে গেছে আর এই ভেবে শান্ত হয়ে যায়”।

এই কথা শুনে ডাহুক বাহুক জিতেশকে বললেন, “আমাদের সাথে কনো ছল হচ্ছে মনে হচ্ছে জিতেশ”।

জিতেশ উত্তরে বললেন, “না না, আমাদের সাথে নয়, নিসাধদের সাথে হচ্ছে এই ছল। … দেবী অম্বিকা তো সামান্য এক নারী। প্রকৃতি থোরাই”।

এই কথা শুনে ডাহুক বললেন, “যদি তোমার কথাই সত্য হয়, তাহলে দেবী অম্বিকা তো জননী হতে কিছুতেই পারবেন না, কারণ পরমেশ্বরের বীর্য ধারণ করা যার তার কম্ম নয়। যদি সন্তানও এসে যায়, তখন তো মানবে যে আমাদের সাথে ছল হয়েছে”।

জিতেশ দন্তপাটি চেপে বললেন, “সন্তান আমি ভূমিষ্ঠ হতে দেব না। কিছুতেই দেবনা। নিশ্চিন্তে থাকো। … আর যতক্ষণ না তোমরা নিশ্চিত হচ্ছ যে এই দেবী অম্বিকা সামান্য কন্যা, ততক্ষণ তোমরা আমার অন্তরালে থাকো। যদি ইনি স্বয়ং প্রকৃতি হন, তবে তোমাদের এঁর থেকে সতর্ক থাকতে হবে, কিন্তু আমাকে নয়। তাই আমি তো সম্মুখেই থাকবো। তোমরা আমার পশ্চাতে লুক্কায়িত থাকো”।

বিবাহ সম্পন্ন হলো। কামশয্যার কক্ষে রমনাথ উপস্থিত হলেন, যেখানে দেবী অম্বিকা অবস্থান করছিলেন। কিন্তু স্বর্ণকপাট বন্ধ করার পর, আর এক কদমও আগে যেতে পারলেন না রমনাথ। রমনাথের নিশ্বাস প্রশ্বাস তীব্র হয়ে উঠলো। সমস্ত দেহ থেকে স্বেদ অনর্গল প্রবাহিত হতে থাকলো। আর এক সময়ে সেই সমস্ত স্বেদ, প্রশ্বাসের বায়ু সমস্ত একত্রিত হয়ে ঘূর্ণাবর্তের ন্যায় তাঁরই চারপাশে ঘূর্ণন করা শুরু করলো। আর সেই ঘূর্ণন একসময়ে একটি গতি লাভ করে, সরাসরি ছুটে গেল দেবী অম্বিকার দিকে, আর তা দেবী অম্বিকাকে সম্পূর্ণ ভাবে মলিন করে দিলো। এই প্রক্রিয়া সমাপ্ত হলে, একপ্রকার ভয়ার্ত হয়েই শবেশ সেই কক্ষ থেকে বাইরে বেড়িয়ে এলেন। এবং সকল উপস্থিত গোষণ্ড, নিসাধদের দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি রমবনের দক্ষিণপ্রান্তে এসে নিজের অস্থিরতাকে শান্ত করা শুরু করলেন।

যেই তীব্র কামনার সঞ্চার হয়েছিল তাঁর মধ্যে, সেই সমস্ত কিছু তাঁর প্রতিটি লোমকুপ থেকে বীর্যের আকারে প্রবাহিত হওয়া শুরু করলো, আর সেই সমস্ত বীর্য রমবনের দক্ষিণপ্রান্তে একটি স্তূপের আকারে পরিত্যক্ত করে রেখে শান্ত হয়ে, রমনাথ প্রত্যাবর্তন করলেন নিজের আসনে।

বড়ই বিপাকে পরে রইলেন রমনাথ এই ঘটনার জেরে। না তিনি কিছু বলতে পারলেন কারুকে এঁর ব্যাপারে, আর না কিছু করতে পারলেন এর থেকে মুক্ত হবার উদ্দেশ্যে। ঘটনা কি হয়েছে, তা না জানলেও, কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে যা রমনাথকে অস্থির করে রেখেছে, তার অনুমান করে দুধেশ্বর এসে রমনাথকে প্রশ্ন করলেন, “প্রভু, আপনাকে কিছুদিন যাবতই বেশ অস্থির দেখাচ্ছে। কিছু কি ঘটেছে! কিছু ঘটলে, তা লুকাবেন না আমার কাছে। আমাদের দুর্গ নির্মাণের কাজে হয়তো তা কাজে লাগলেও লাগতে পারে”।

রমনাথ কিছু না বললে, মগরধারী পুনরায় বললেন, “আচ্ছা নিসাধপত্নীরা তো দেবী অম্বিকার সখী। তাঁদেরকে বেশ কিছুদিনযাবত রমবনে দেখতে পাচ্ছিনা! কিছু কি হয়েছে! তাঁদের অভাবে দেবী অম্বিকাকেও বেশ মনমরা লাগছে দেখলাম। কিছু কি হয়েছে?”

রমনাথ অন্য বিষয়ে কথা বলে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, “তাঁরা একত্রে চারজনই অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। তাই তাঁরা অনুপস্থিত। … শুনেছি আপনার পত্নী দেবী জটিলাও অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন! তিনি কেমন আছেন?”

দুধেশ্বর বললেন, “আমাকে একটা কথা বলুন তো নাথ! দেবী অম্বিকা কি অন্তঃসত্ত্বা হবেন কনোদিনও! নাকি জিতেশ এমন ভাবেই বিনাভয়ে, বিনাচিন্তায় নিজের শাসনের বিস্তার করতে থাকবে! … এমন ভাবে চললে কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বহুল বিপদ এসে যাবে। … কেন বলছি এমন কথা! কারণ ডাহুক বাহুক আমাদের ত্রিমূর্তির উপর সন্দেহ করছে। যদি সেই সন্দেহ সে জিতেশের মধ্যেও প্রবেশ করিয়ে দেয়, তাহলে সে কিন্তু রমবন, দুধসাগর আর সপ্তধনুশও আক্রমণ করে জয় করে নেবার সামর্থ্য রাখে”।

রমনাথ মাথা নামিয়ে নিয়ে বললেন, “আমি অনিশ্চিত হে দুধেশ্বর। দেবী অম্বিকা অন্তঃসত্ত্বা হতে পারবেন কিনা, বা আদপে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হতে চান কিনা, সেই বিষয়ে আমি অত্যন্ত অধিক ভাবে অনিশ্চিত। আমি তো তাঁর কাছেও যেতে পারছিনা। সম্পূর্ণ ভাবে কামবিমুখ দেবী অম্বিকার কামনাশূন্যতা আমাকে তাঁর কাছেও এগোতে দিচ্ছেনা, আর তাঁর প্রতি কামবর্ষণও করতে দিচ্ছেনা। পরিবর্তে আমার সমস্ত কামনা …”

দুধেশ্বর দুঃখের সঙ্গে বললেন, “ভেবেছিলাম দেবীর পুত্রসন্তান হলে, আমার কন্যাসন্তানের সাথে তাঁর বিবাহ দেব। কিন্তু, মনে হয় সেই সৌভাগ্য আমার হবেনা যে আমার কন্যা রমানাথ কুলের স্ত্রী হবে। … যাই হোক, আমি ভগিনী অম্বিকার সাথে সাখ্যাত করে আসছি। ষণ্ড, গোপাল কারুকে দেখতে পাচ্ছিনা তো!”

রমনাথ বিরক্তির সুরেই বললেন, “সমস্ত কিছু পূর্বের বারের মতই হচ্ছে। দেবী অম্বিকার এখানে আগমনের সাথে সাথেই ষণ্ড, গোপাল, গোচরণ, গোলকের মাতৃপ্রীতি জেগে উঠেছে, আর সর্বক্ষণ তাঁরা দেবী অম্বিকার সাথেই থাকে। … তাঁদের প্রভুকে তো তাঁরা ভুলেই গেছে। … কেউ নেই এখন এখানে। দেবী অম্বিকা সখীদের দেখতে অম্বাপূরে গেছেন, আর তাঁর সঙ্গে ষণ্ড, গোপাল, গোলক, গোচরণ সকলে গেছে”।

এই কথা বলার কালেই, দেবী অম্বিকা সকল গোষণ্ডদের নিয়ে রমবনে প্রবেশ করে, রমনাথের কাছে এসে হাসিমুখে বললেন, “জানেন নাথ, সকল সখীদের গর্ভে একটি করে কন্যার অংশ রয়েছে। আর জানেন তাঁরা যে পূর্ণ কন্যা নন, আর তাঁরা যে কন্যারই অংশ, আমি তাঁদের উদরদেশকে স্পর্শ করেই অনুভব করে ফেলেছি। এই সমস্ত দিব্যগুণ তো আমার কনো কালেই ছিলনা। আপনার ঘরণী হবার ফলস্বরূপ এই সমস্ত গুণ লাভ করেছি”।

এতোবলে আনন্দের সাথে নিজের শয়ন কক্ষে চলে গেলেন দেবী অম্বিকা। রমনাথ দেবী অম্বিকার রূপে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। কামনায় অস্থির হয়ে উঠলেন পুনরায়। অন্যদিকে দুধেশ্বর ভ্রুকুঞ্চিত করে হেসে বললেন, “স্বয়ং প্রকৃতি তিনি, তাই সমস্ত কিছুই অনুভব করে ফেলছেন। কিন্তু মনে করছেন যে আপনার কারণে এমন দিব্যতা লাভ করেছেন উনি। সঙ্গমও হয়নি আপনার সাথে। কি ভাবে দিব্যতা লাভ করবে আপনার থেকে! … কিন্তু প্রশ্ন এটা যে, তিনি কি এমনই ভোলা, নাকি ভোলা হবার অভিনয় করছেন!”

রমনাথ চুপ করে দেবী অম্বিকার কক্ষের দিকে একনজরে দৃষ্টি রেখে বসে থাকলে, দুধেশ্বর তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রভু!”

উত্তরে রমনাথ বললেন, “আপনি আপনার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর কাছে যান মগরধারী। আমি দেবী অম্বিকার কাছে নিজের কামনা স্থাপন করতে যাবো”।

দুধেশ্বর সেখান থেকে বিদায় নিলে, রমনাথ দেবী অম্বিকার কক্ষে প্রবেশ করে, স্বর্ণকপাট বন্ধ করে দিলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22