৭.৩। মাহেশ্বরী পর্ব
সুগন্ধা এবার জিজ্ঞাসু হয়ে প্রশ্ন করলো মৃষুকে, “আচ্ছা মৃষু, আমার মনে একটি প্রশ্ন অনেক ক্ষণ ধরে ঘোরাফেরা করছে। প্রশ্নটা এই যে, মা এমন উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছেন কেন, যার কারণে তাঁর সমস্ত বস্ত্রখণ্ড জ্বলে গিয়ে তাঁকে নগ্ন করে দিচ্ছে! যার কারণে তাঁর সমস্ত গহনা গলে যাচ্ছে!”
মৃষু হেসে উত্তরে বললেন, “দেবী, সন্তান যখন এমন কিছুক্ষেত্রে অবাধ্য হয়, যে চরমস্তরে শাসন না করলে, সন্তানের চরিত্রই অপভ্রষ্ট হয়ে যাবে, তখন মা কি করেন?”
সুগন্ধা উত্তরে বললেন, “প্রথমে বকাঝকা করেন, তাতে কাজ না হলে, হাতে লাঠি তুলে নিয়ে সন্তানকে ভয় দেখান। যদি তাতেও কাজ না হয়, তখন লাঠি দিয়ে দুই চার ঘা দিতে হয়, আর কি!”
মৃষু আবার মৃদু হেসে বললেন, “যখন সেই দুই চার ঘা দিতে হয়, তখন মায়ের কেমন লাগে!”
সুগন্ধা মাথা নিচু করে বললেন, “খুব ক্রোধ জাগে। সন্তানের উপর ক্রোধ কম জাগে, নিজের উপর ক্রোধ বেশি জাগে। সন্তান মায়ের কাছে নিজের হৃদয়ের টুকরো। তাকে আঘাত করতে মায়ের যেন হৃদয় ভেঙে কাঁদতে ইচ্ছা করে”।
মৃষু হেসে বললেন, “তুমি দুই সন্তানের মা সুগন্ধা। তাতেই তোমার এমন মনে হচ্ছে। তোমার আঘাতে সন্তান সামান্য ঘায়েল হবে, তাতেই তোমার এমন মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার মা! … তাঁর আঘাতে যে সন্তান দেহ ছাড়তে বাধ্য হবে। তাঁর শাসনই যে জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, ইত্যাদি। তাহলেই ভেবে দেখো, সেই মায়ের হৃদয়ে কি চলে, যখন তিনি প্রহার করতে বাধ্য হন। তাঁর হৃদয়ে যেই ক্রোধ জন্ম নেয়, যেই বেদনার জন্ম হয়, একবার ইয়ত্তা করো সুগন্ধা। … যদি অনুভব করে নিতে সক্ষম হও, দেখবে তোমার অঙ্গ থেকেও কালাগ্নি বিচ্ছুরিত হচ্ছে, তোমার বস্ত্রও জ্বলে তোমাকে নগ্ন করে দিচ্ছে, তোমার গহনাও গলে যাচ্ছে”।
“দেবী, যাকে মা শাসন করে রক্ষা করছেন, সেও যতটা তাঁর সন্তান; ততটাই সন্তান সেও, যাকে তিনি শাসন করছেন। দুর্বল সন্তানকে, সাধু সন্তানকে, নিষ্পাপ সন্তানকে সুরক্ষা দেওয়া তাঁর কর্তব্য, তাই তিনি খড়গধারী। আবার সেই খড়গ ধারণ করে তিনি নিধন কার করছেন? তাঁরই দুরাচারী সন্তানের নিধন করছেন; তাঁরই অসাধু সন্তানের উপর প্রহার করছেন। তাই সন্তান নিধনের বেদনা তাঁকেই পেতে হয়, আর সেই কারণেই তিনি ক্রমশ উগ্র হয়ে ওঠেন, আর একসময়ে তিনি তাণ্ডব করা শুরু করে দেন”।
সকল যক্ষস্ত্রীরা মাথা নামিয়ে নিলেন সেই কথা শুনে। যেন অনেক অনেক কথা তাঁদের হৃদয় তাঁদেরকে বলতে থাকলো। আর সেই কথার পরিমাণ এতটাই প্রচুর যে, তাঁদের মন-বুদ্ধি সেই সমস্ত কথাকে হৃদসমুদ্রের তট থেকে তুলে নিতেও পারলো না!
এক দিকে যখন যক্ষস্ত্রীরা এইরূপ আলোচনা করছিলেন, তখন অন্যদিকে সকল ইচ্ছাধারীস্ত্রী প্রস্থান করলেন নিজেদের নূতন উত্তরদায়িত্বকে ধারণ করতে। আর সেই ক্ষণেই, সেই স্থানে, একরথে উপস্থিত হলেন অনন্তবীর্য, ইচ্ছাধারী ও সেই গুপ্তচর যে তাঁর প্রভুকে সেখানে আনায়ন করেছিলেন। রথ নিয়ে রণাঙ্গনে প্রবেশ করতেও পারলেন না তাঁরা, কারণ সেই সম্যক স্থান মহাশূন্যারূপা জগন্মাতা জগদ্ধাত্রীর উষ্মাতে এমনই উত্তপ্ত ছিল যে, রথের চাকা সেই স্থানে প্রথম পদক্ষেপ মাত্রই বিগলিত হওয়া শুরু করে।
সেই স্থান থেকে মাত্র এক যোজন পথ অতিক্রম করতেই রথ রক্তিম হয়ে উঠে ধূম্র ত্যাগ করে, গলিত হয়ে ভূমিতে মিশে যাওয়া শুরু করে দেয়। সেই কারণে ইচ্ছাধারী ও অনন্তবীর্য ভূমিতে এসে স্থিত হলে, তাঁদের দূত ভূমিতে পদস্থাপন করা মাত্রই প্রচণ্ড তাপে চিৎকার করতে থাকলেন। কিন্তু অনন্তবীর্য বা ইচ্ছাধারী তাঁর দিকে দৃষ্টি স্থাপনের পূর্বেই সেই দূত প্রাণ ত্যাগ করে ভূমিতে পতিত হয়ে যায়। যখন দৃষ্টি স্থাপন করলেন, তখন ইচ্ছাধারী ও অনন্তবীর্য দেখলেন, যেন অগ্নির আংরার উপর একটি বৃক্ষের পত্র পরে যাবার মত করে, দূতের সমস্ত দেহ সঙ্কুচিত হয়ে, মুহূর্তের মধ্যে ভস্মীভূত হয়ে গেল।
শুধু তাই নয়, নিজেদের বরদানি বলের জোরে সেই ভূমিতে স্থাপিত থাকতে পারলেও, তাঁদের দেহের মধ্যে দিয়ে ভূমির যেই তাপ সঞ্চারিত হয়, তার কারণে তাঁদের লৌহ ও ইস্পাত বর্ম গলিত হওয়া শুরু করে, আর তাই তাদের থেকে সমস্ত হীরা, মণি মাণিক্য ভূমিতে2 পতিত হয়ে উত্তপ্ত নরম মৃত্তিকার মধ্যে সেই সমস্ত মণি, মাণিক্য প্রবেশ করে দৃষ্টির অগোচর হয়ে যেতে থাকলো।
নিজেদের অঙ্গের বস্ত্রদেরকেও সুরক্ষিত করে রাখতে না পারলে, অবশেষে ইচ্ছাধারী ও অনন্তবীর্য, চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা তাঁদেরই সমস্ত সেনার অবিশিষ্ট হস্ত ও মুণ্ড কঙ্কালকে ধারণ করে করে, নিজেদের দেহকে আবৃত করে নিলেন। আর চারিপাশে অসংখ্য মৃত সাধসেনাদের দেখে বিস্মিত হতে থাকলেন।
আর তা দেখতে দেখতে এক সময়ে অনন্তবীর্যের অন্তরে প্রবল ক্রোধ জন্ম নিলে, প্রচণ্ড গতি ধারণ করে আগ্রাসী হয়ে মাতা সর্বাম্বার দিকে দৌড়ে গেলেন। মুখে উচ্চৈঃস্বরে হুংকার, “দেবী সেজেছে! করালি, হতচ্ছাড়ি, সমস্ত সাধকুলের বিনাশ করে এখন দেবী সেজেছে!”
প্রচণ্ড গতি নিয়ে যখন সে মাতার কাছে পৌঁছে মাতার উপর প্রহার করতে গেলেন, তখন মাতা ভূমিতলে একটি প্রহার করলেন। দেখে মনে হলো অতিসামান্য সেই প্রহার, কিন্তু সেই প্রহারের কারণে সমস্ত ধরিত্রী কেঁপে উঠলো, বিভিন্ন মহাদেশের মধ্যে ফাটল ধরে গেল, সহস্র আগ্নেয়গিরি জেগে উঠে স্থানে স্থানে সমস্ত জনসমাজকে নষ্ট করে দিতে শুরু করলো। বেশ কিছু ভূমি সাগরের গর্ভে চলে গেল, আর অনন্তবীর্য মাতার সম্মুখ থেকে ছিটকে সেখানে পৌঁছে গেল যেখান থেকে সে দৌড়ে মাতার কাছে এসেছিলো।
ইচ্ছাধারী কুমারী স্ত্রীর শক্তি দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন। দেখতে তাঁকে এক অসামান্যা সুন্দরী সামান্য স্ত্রীর ন্যায়। কিন্তু তাঁর শক্তি এমনই যে সেই শক্তির সামনে যেন পরমাত্মও দাঁড়িয়ে থরথর কম্পমান হবে। বিস্মিত অনন্তবীর্যও হয়েছিল। যে সমস্ত সাধকুলের নাশ একাকী করেছে, সে যে শক্তিশালী, এই ব্যাপারে কনো সন্দেহ ছিলো না তার। কিন্তু সেই শক্তি যে এতটা বিকট ও প্রচণ্ড, সেই সম্বন্ধে কনো ধারণা ছিলো না এর পূর্বে। তবে ঈষৎ থমকে গিয়ে সে অট্টহাস্য হেসে উঠলো, কারণ তার মনে হলো যেন, তার কাছেও এই স্ত্রীকে বিস্মিত ও বিভ্রান্ত করার মত অনেক কিছু আছে।
এতদূরে ছিটকে পরে যাবার কারণে সে আহত অবশ্যই হয়েছিল। দেহের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতচিহ্ন হয়ে তার থেকে লহুপাতও হয়েছে আর সেই লহু ভূমিতে স্থাপিত হতেই, তার থেকে আরো এক দশক অনন্তবীর্য জন্ম নিয়েছে। সেই দৃশ্য মাতা সর্বাম্বাও দেখেছেন। আর তা দেখে তিনি ক্রুদ্ধও হয়েছেন। না, অনন্তবীর্যের উপর ক্রুদ্ধ হননি তিনি, ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন পরমাত্মের উপর, যার ষড়যন্ত্রস্বরূপ বরদান অনন্তবীর্যকে এই অস্বাভাবিক সামর্থ্যের অধিকারী করে রেখেছে।
অনন্তবীর্যও কম ষড়যন্ত্রপ্রিয় নয়। সে কেবল এক দশক অনন্তবীর্য নিয়েই দেবীকে আক্রমণ করলেন না। সে নিজের প্রতিটি দেহের প্রতিটি অঙ্গকে ছেদন করে করে ভূমিতে লহুপাত করা শুরু করলো। আর তার থেকে সহস্র সহস্র অনন্তবীর্যের জন্ম দিতে থাকলো। ইচ্ছাধারী অনন্তবীর্যের সেই কীর্তি দেখে অট্টহাস্য প্রদান করে বললেন, “তুমি কি ভেবেছিলে! তুমি আমার সমস্ত সেনাকে হত্যা করে দিয়েছ? (হুংকার ছেড়ে) আমার অনন্তবীর্য একাই যথেষ্ট পুনরায় আমার সেনার সংখ্যাকে অনুরূপ করে দিতে”।
পুনরায় অট্টহাস্য হেসে বললেন ইচ্ছাধারী। আমরা পরমাত্মের সন্তান। আবেগদের জন্মদাতা আমরা। যেমন তীব্রগতিতে আবেগের সঞ্চার হয়, তেমনই তীব্র গতিতে আমাদের সংখ্যাবৃদ্ধি হয়। এবার কি করবে তুমি দেবী?”
মাতা সর্বাম্বা অনন্তবীর্যের এই কীর্তিতে সমানে ক্রুদ্ধ হতে শুরু করলেন। আর যতই তিনি ক্রুদ্ধ হতে শুরু করলেন, ততই তাঁর অঙ্গের বস্ত্র পুনরায় প্রজ্বলিত হওয়া শুরু করলো। পুনরায় তাঁর অঙ্গের গহনা গলিত হয়ে তাঁকে স্বর্ণ ও রজতে মণ্ডিত করা শুরু করলো। তবে দেবী বুঝলেন এবারে তিনি একাকী সমস্ত কাজ করতে পারবেন না। তাঁর প্রয়োজন কিছু সহায়কের, যারা প্রত্যক্ষ যুদ্ধ না করলেও, যুদ্ধ করবেন তাঁরা অবিরাম। তাই তিনি হুংকার দিয়ে যক্ষিণী ও মৃষুকে সেই স্থানে উপস্থিত হবার নির্দেশ দিলেন।
মাতার নির্দেশের অপেক্ষাতেই সকলে যেন অপেক্ষা করছিলেন। তাই সকলে তড়িঘড়ি সেই স্থানে উপস্থিত হবার উপক্রম করলে, ইচ্ছাধারী মৃষুর নাম শুনে ভয়ার্ত হয়ে উঠলেন। তাঁর আর বুঝতে বাকি নেই যে, যিনি তাঁর সামনে দণ্ডায়মান, তিনি সামান্য কেউ নন। তিনি হলেন সাখ্যাত পরাশক্তি। সর্বাম্বাই মাতা অম্বা, দেবী অম্বিকা। ভয়ার্ত হয়ে, তিনি অনন্তবীর্যকে আদেশ দিলেন, “আর দেরি না করে দেবীকে আক্রমণ করে পরাস্ত করো অনন্ত”।
১০ সহস্র সমরূপ ধারণ করে চারিদিক দিয়ে দেবীকে ঘিরে ধরে আক্রমণের প্রয়াস করলেন অনন্তবীর্য। কিন্তু অন্যদিকে মাতা সর্বাম্বা নিজের উগ্রতার চরম রূপে যাওয়া ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছিলেন। শ্যামা রূপ ত্যাগ করে, রক্তিম অবস্থা ত্যাগ করে, তিনি ধুসরবর্ণও ত্যাগ করে প্রায় পূর্ণ দিগম্বরী কালবরনী হয়ে উঠেছেন। তাঁর এই বিকৃতির প্রভাবে, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডও যেন কালান্তের কালে উপস্থিত হয়ে গেল।
জ্বরাসুর বিপর্যস্ত হয়ে যেতে, সেই জীবাণু গগনে মুক্ত হয়ে গেল যা মনুষ্যযোনির সমূলে বিনাশ করবে। সাথ সাথে সমস্ত মনুষ্যদের রাজা ও উপরাজারা যুদ্ধে মেতে উঠলেন, আর সকল রাজা নিজের নিজের সত্ত্বা স্থাপনের প্রয়াস করতে হানাহামনি করা শুরু করলেন।
অন্য দিকে, দেবীর এই রূপান্তরের কারণে তাঁর অঙ্গ থেকে পূর্বেরই ন্যায়, প্রবল অগ্নিপ্রসারিত হওয়া শুরু করলো। মৃত হয়ে পরে থাকা সমস্ত শবদেহ ও তাঁদের ভস্ম, দেবীর শ্বাসগ্রহণের সাথে সাথে তাঁর নিকটে যেতে থাকলো। সমস্ত ভস্ম একত্রিত হয়ে অগ্নিতে ঝলসে গিয়ে প্রস্তরে রূপান্তরিত হয়ে, তাঁর প্রশ্বাসের সাথে সাথে তা বিস্ফোটের ন্যায় ছিটকে এসে শতশত অনন্তবীর্যকে আহত করতেই থাকলো। আর সেই আঘাতের ফলে, অনন্তবীর্যের অঙ্গ থেকে লহু পাত হয়ে তা ভূমির স্পর্শে এসে আরো অধিক অনন্তবীর্যের জন্ম দিতে যেমন থাকলো, তেমনই সমস্ত অনন্তবীর্যকে মাতার নিকটে আসা থেকে রোধও করতে থাকলো।
ঠিক এই ক্ষণে মৃষু সমস্ত যক্ষিণীদের সঙ্গে নিয়ে সেই স্থানে উপস্থিত হলে, এবার মাতা রনংদেহি রূপ ধারণ করলেন। খড়গ হাতে সমস্ত দশদিশাকে অগ্নিদগ্ধ করতে করতে, তিনি এগিয়ে গেলেন সমস্ত অনন্তবীর্যদের কাছে । শত শত অনন্তবীর্যকে মুহূর্তের মধ্যে মাতার দেহের থেকে নির্গত কালানল ভস্ম করে দিতে থাকলো। আর তারই সাথে সাথে মাতার খড়গের প্রহার।
সেই প্রহারের সম্মুখে অনন্তবীর্য একটিবারও পরিবর্তে প্রহার করতেই পারলো না। প্রতিটি প্রহারে শতশত অনন্তবীর্য দমিত হতে থাকলো, আর আরো শতশত অনন্তবীর্যের জন্ম হতে থাকলো। সেই দেখে, মৃষু বুঝে গেলেন যে, ঠিক কি কারণে তাঁকে ও সমস্ত যক্ষিণীকে সেখানে ডাকা হয়েছিল। তাই মৃষু নির্দেশ দিয়ে, সমস্ত যক্ষিণীকে দিয়ে এক বিশেষ মালা নির্মাণ করাতে থাকলেন।
সেই মালাতে, নিহত অনন্তবীর্যের একটি করে দুটি করে কাঁটা হাতকে উল্টে রেখে, সেই কাঁটা হাতের থেকে যেখান থেকে লহু নির্গত হচ্ছে, তা যাতে সেই নিহত অনন্তবীর্যের খুলিতে জমা হয়, সেইরূপ ব্যবস্থা করে মালা গাঁথা হতে থাকলো। আর যত অধিক অনন্তবীর্যের এমন দেহের বিনাশ করা হলো, যারা ভস্মীভূত হয়ে যায়নি, ততই সেই মালার আকৃতি বড় হতে থাকে, আর ততই বড় করতে থাকেন মাতা সর্বাম্বা নিজের অবয়বকে।
এমন করতে করতে, এক সময়ে এমন হয়ে গেল যে, অনন্তবীর্যের আর কনো দ্বিতীয়রূপই অবস্থান করলো না, কারণ তার কনো লহুবিন্দু ভূমিতে পতিতই হতে পারেনি। বিশালাকায় দৈত্যের ন্যায় দংষ্ট্রারূপে কালবরনী মাতা সর্বাম্বা অনন্তবীর্যের হস্ত ও মুণ্ডের দ্বারা নির্মিত মালা সর্বাঙ্গে ধারণ করে রাখলে, অনন্তবীর্য তাঁর সম্মুখে এক সামান্য কীট মনে হতে থাকলো।
সেই দেখে ইচ্ছাধারী তাঁর করনীয় কিছু আছে স্মরণ করে, নিজের ইচ্ছাধারী হবার সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে সেই সমস্ত অনন্তের খুলিতে স্থিত লহুকে মুখে নিয়ে ভূমিতে পতিত করার উপায় রূপে সহস্র মক্ষীরূপ ধারণ করলেন। মাতা সর্বাম্বা সেই কীর্তিতে ক্রোধিত হয়ে উঠে, একের পর এক খুলিতে জমা হওয়া অনন্তবীর্যের লহু পান করে নেওয়া শুরু করলেন, আর নিজের উর্জ্জা স্ফীতিকে অধিক বাড়িয়ে দিলে, সেই অগ্নি পেরিয়ে ইচ্ছাধারী কিছুতেই দেবীর কাছে আসতে পারেন না।
অন্তে, যখন সমস্ত লহু পান করে নিলেন, তখন অনন্তবীর্য নিজের হস্তদ্বয়ে নিজেই খড়গ স্থাপন করে ভূমিতে লহু পতিত করতে সচেষ্ট হলে, মহাকালকে গ্রাস করে মহাশূন্যকায় মহাকালী রূপ নিজের বিস্ফারিত সুলম্ব জিহ্বা নির্গত করে কেবল অনন্তবীর্যের লহুকেই ভূমি স্পর্শ থেকে রোধ করলেননা, বরং সেই জীবের ডগায় অনন্তবীর্যকেই তুলে নিয়ে নিজের নেত্রের সম্মুখে নিয়ে এলেন। অনন্তবীর্য বহু প্রয়াস করলেন যাতে খড়গের প্রহার মাতার জিহ্বাতে করা যায়, কিন্তু মাতা তিনি। তাঁর সাথে চালাকি করা যে অসম্ভব। তিনি নিজের জিহ্বাকে এতই গতিসম্পন্ন করে বাম থেকে দক্ষিণ, আর দখিন থেকে বাম দিকে আন্দোলিত করলেন যে, অনন্তবীর্য ঠিক ভাবে দাঁড়াতে না পেরে তাঁর হাত থেকে খড়গই ভূমিতে পরে যায়।
মাতা দণ্ড দিতে দ্বিতীয়বার ভাবলেন না। সরাসরি অনন্তবীর্যকে নিজের মুখগহ্বরে নিয়ে, তাকে চর্বণ করে উদরে স্থান দিয়ে দিলেন। ইচ্ছাধারীর আর কনো দ্বন্ধ নেই যে সে যার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সে স্বয়ং পরাশক্তি, মহাকালী। মৃত্যুর জন্য সে পূর্ণভাবে প্রস্তুত। কিন্তু বীণা যুদ্ধে মৃত্যু গ্রহণ করবেন না তিনি। তাই ইচ্ছাধারী নিজের ইচ্ছাধারী হবার গুণে এক সহস্র বিভিন্ন তৃণভোজী অথচ বলশালী জীবের রূপ ধরলেন আর দেবীকে আক্রমণ করলেন।
মাতা সর্বাম্বা কনো আক্রমণ না করে, কেবল উদ্যম নৃত্য শুরু করলেন। একটি জীবও সঠিক ভাবে ভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। তবে শুধু এটুকুই নয়। যতই সময় যেতে থাকলো, মাতার নৃত্য লাগামছাড়া হতে শুরু করলো। যেন তিনি অনন্তবীর্যের লহুপান করে পূর্ণরূপে মদ্যপ হয়ে দিয়ে নৃত্য করলছেন।
সেই নৃত্যের প্রকোপের কারণে ইচ্ছাধারীর সমস্ত এক সহস্র রূপের বিনাশ হয়ে গিয়ে, সে স্বয়ংও ভূমি থেকে বারবার উপরে উঠে আর ভূমিতে আছার খেয়ে খেয়ে পরে পরে দেহত্যাগ করে দিয়েছেন, এবং সম্পূর্ণ সাধকুল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তবে যেন মাতার সেই ব্যাপারে কনো হুঁশই নেই। তিনি প্রগলের ন্যায় নৃত্য করতেই থাকলেন, অবিরাম নৃত্য করতেই থাকলেন।
সেই নৃত্যের জেরে কেবল সূক্ষ্মলোক বা কারণ লোক নয়, স্থূললোকেও ধুন্ধুমার হওয়া শুরু করে দেয়। মনুষ্যযোনি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এই নৃত্যের প্রকোপে। সমস্ত মনুষ্যকে নরঘাতক জীবাণু নিজেদের গ্রাস করে নেয় প্রায়। বহু স্থলভূমি সমুদ্রের গর্ভে স্থান নিয়ে সমস্ত নিহতদের কঙ্কালকে সাগর নিজের তলে স্থান দিয়ে, ভাবিকালে ধরিত্রীর জীবাশ্মসার নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে।
তাই নিসাধরাজ গন্ধর্বরাজ সকলে একত্রে এলেন কিন্তু মাতার নৃত্যের জেরে তারা সঠিক ভাবে দাঁড়াতেও পারলেন না। তাকিয়ে তাঁরা দেখলেন যে এই সমস্ত প্রক্রিয়াতে কেবলমাত্র মৃষু স্থিত ভাবে দণ্ডায়মান। তাই তাঁর কাছে এসে তাঁরা বললেন, “হে মৃষু, হে প্রভু, সম্পূর্ণ সাধকুলের বিনাশ হয়ে গেছে। কিন্তু মাতার নৃত্য যে থামছেই না! … মাতার এই আগ্রাসনের কালে, মনুষ্যযোনি নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে করে, এবং শেষে জীবাণুর আক্রমণে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। … আর কি? এবার তো ধরিত্রীর বিনাশও নয়, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের বিনাশ হওয়া শুরু হয়ে গেছে!”
“হে মৃষু, এখনো পর্যন্ত ২২টি নক্ষত্র দিশাভ্রষ্ট হয়ে গিয়ে একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে বিনষ্ট হয়েছে, আর ক্রমশ মাতার নাচনের কারণে সমস্ত নক্ষত্র বিনষ্ট হতে চলেছে। এবার তো সম্পূর্ণ সৃষ্টিই নষ্ট হয়ে যাবে! … কিছু করুন প্রভু। মাতার এই উদ্যম নৃত্য কনো ভাবে থামান। উপায় আমাদের জানা নেই প্রভু। মাতা অনন্তবীর্যের লহু পান করে মদ্যপ হয়ে গেছেন। এখান থেকে মাতাকে মুক্ত করার উপায় কি হবে, আমাদের কনো ধারণা নেই প্রভু। কিছু করুন”।
মৃষু সেই কথা শুনে অট্টহাস্য হেসে উঠে বললেন, “মা মদ্যপ হয়ে গেছেন! … কি যে বলেন নিসাধরাজ! … যিনি পূর্ণ ভাবে উন্মাদিনী, তাঁকে কারুর লহুপান করে মদ্যপ হতে হয়! … আপনি কি বললেন, মনুষ্য যোনির বিনাশ হয়ে গেছে। একবার জম্বুভূমির দক্ষিণ পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে দেখুন তো!”
নিসাধরাজ তথা গন্ধর্বরাজ তা দেখতে গেলে দেখলেন যে, ৫ শত পুরুষকে দুস্থ অবস্থায় সেবা করছেন ৫ শত স্ত্রী। সেই দৃশ্য দেখে অবাক হলে, মৃষু হেসে বললেন, “এই ৫ শত স্ত্রী হলেন ইচ্ছাধারীর ৫ শত পত্নী। আর ৫ শত পুরুষ হলেন তাঁরা যারা পরমাত্মের প্রদান করা টিকাকে বীণা কারুর প্ররোচনায় সেবন করা থেকে নিজেদের প্রতিহত রেখেছিলেন। … এরপরেও বলবেন, আমার মা মদ্যপ হয়ে গেছেন!”
নিসাধরাজ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তাঁদের সম্মুখে পিতৃদের শবদেহ স্থাপিত হলে, চমকিত ও ভয়ার্ত হয়ে নিসাধরাজ বললেন, “একি! পিতৃ! … প্রভু, এবার মৃত্যু হলে, সকলে কোথায় যাবেন?”
মৃষু হেসে বললেন, “আর কনো স্থানই রাখলেন না মা। হয় তাঁকে আসক্তি মুক্ত হয়ে পুনর্জন্ম নিতে হবে, নয় তাঁকে মোক্ষ অর্জন করতে হবে, নয় তাঁকে পিশাচ হতে হবে।… নিসাধরাজ, ব্রহ্মরজনী শুরু হয়ে গেল পুরোদমে। মা সন্তানকে মধ্যগগনে স্থাপিত রাখেন না। সেই কাজ পিতা করেন, ঘরের মধ্যে বন্দীও করেন সন্তানকে আর আহার প্রদান যাতে না করা হয়, সেই ফরমাইসও দেন। মা হয় সন্তানকে আহার করাবেন, নয় যদি সন্তান দুরাচারী হয়, তবে বুকে পাথর রেখে, তার মুখদর্শন করাও বন্ধ করে দেন। ব্রহ্মরজনী এসে গেছে নিসাধরাজ। আর ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়ানোর দিন শেষ। হয় তোমাকে আসক্তি ত্যাগ করতে হবে, নয় পিশাচ হয়ে ভটকে বেড়াতে হবে”।
নিসাধরাজ বললেন, “অর্থাৎ মাতা সমস্ত কিছু লীলাবশত করছেন। সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত নকশা তিনি পালটে দেবার জন্যই এই নৃত্যরূপ লীলা করছেন! … কিন্তু প্রভু, মাতার এই নৃত্য কি ভাবে থামবে! … এবার তো আমাদের ভীতির কারণ হয়ে যাচ্ছে, মাতার এই নৃত্য!”
মৃষু হেসে বললেন, “আমি জানি মাতার এই লীলার অর্থ কি? … এবার আমি তাঁর কাছেই যাচ্ছি, যার কারণে এই লীলা, আর যিনিই এই লীলার অবসান করতে সক্ষম। আপনারা নিজের নিজের ধামে যান। আমি একাকীই যাবো তাঁর সাথে সাখ্যাত করতে। সেই সাখ্যাত খুব একটা সুখদ হবেন না, আপনারা সঙ্গে থাকলে, আপনাদেরও বিপদ হতে পারে। তাই ফিরে যান”।
এতো বলে মৃষু প্রস্থান করে উপস্থিত হলেন ত্রিছায়ার প্রাসাদের সম্মুখে। ত্রিছায়াও জানেন যে মৃষুর এই আগমন তাঁদের উদ্দেশ্যে নয়, পরমাত্মের উদ্দেশ্যে। তাই তাঁর পরমাত্মকে আচ্ছাদিত করে রেখে বললেন, “মৃষু, আর এক কদমও আগে এগোবে না। এলে খুব বিপদ হবে!”
মৃষু একটি বিকৃত ওষ্ঠে হাসি দিয়ে বললেন, “আর কার বিপদ করবে তোমরা ছায়া! মনুষ্য যোনি তো আর নেই! … আর নির্বাণ যোনির কাছেও তোমরা পৌছতে পারবেনা। আর তো আর, সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডই বিনষ্ট হয়ে যেতে চলেছে কিছু মুহূর্তের মধ্যেই। তো কার বিপদ আনবে তোমরা!”
কল্পনা উত্তরে বললেন, “আমরা জানি, তুমি এখানে কার সন্ধানে এসেছো। আমরা তাঁর সংরক্ষণে আছি। তুমি তার কাছে কিছুতেই পৌছতে পারবেনা!”
মৃষু আবার একটি বিকৃত হাস্য হেসে ভূমিতে পদাঘাত করতে, ত্রিছায়া তিন দিশাতে ছিটকে পরে গেলেন। মৃষু তৎক্ষণাৎ তাঁদেরকে মহাকালীপাশে আবদ্ধ করে বললেন, “পরমাত্ম, চাইলে এই মুহূর্তে এই একই ভাবে তোমাকে বন্দী করে পেশ করতে পারি আমার মায়ের সম্মুখে। কিন্তু আমার মা তা চান না। তাই বলছি, তোমার নির্মিত ব্রহ্মাণ্ডের বিনাশ হতে চলেছে। তুমি চাইলে এই বিনাশ আটকাতে পারো। তোমার সাধের ব্রহ্মাণ্ড। ছল করে হোক, এই তিন ছায়াকে ব্যবহার করেই হোক, আর যেই ভাবেই হোক, পরিশ্রম তো করেছ এই ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ করার জন্য। তাই তোমার পরিশ্রমের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলছি, তোমার সাধের এই ব্রহ্মাণ্ডের বিনাশ হোক, তা আমি চাইনা”।
“কিন্তু হ্যাঁ, যদি তুমি তা চাও, তাহলে আলাদা ব্যাপার। ব্রহ্মাণ্ডের সাথে সাথে ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা, পরমাত্মেরও বিনাশ আর কিছু মুহূর্তের অপেক্ষা মাত্র। সিদ্ধান্ত তোমার”।
পরমাত্ম মুচকি হেসে বললেন, “এই সমস্ত কিছু তোমার মা তো করতে পেরেইছেন, তোমার জন্য। কিন্তু তোমার অবস্থা দেখো। তুমি তাঁর দাস হয়ে আছো! … আমার কাছে এসো মৃষু, আমি স্বয়ং এই ব্রহ্মাণ্ডের বিধাতা হয়ে থেকে, তোমাকে এর নৃপতি করে দেব। নিসাধ, গন্ধর্ব সকলে তোমার দাস হয়ে থাকবে। দেখো, তোমারই লাভ এতে!”
মৃষু হেসে বললেন, “প্রস্তাব ভালো। অসহমত নই আমি, তবে একটু পরিবর্তন প্রয়োজন। সেটা করে দিলে, আমি রাজি তোমার প্রস্তাবে। … তোমাকে আমার দাস হয়ে থাকতে হবে, সর্বদা আমার পায়ের তলাতেই বিরাজ করতে হবে পূর্ণভাবে পরাধীন হয়ে। রাজি তো বলো, এই মুহূর্তে আমি দলবদল করে নিচ্ছি”।
পরমাত্ম সেই কথাতে ক্রোধিত হয়ে উঠে বললেন, “তোমার ধৃষ্টতা তো কম নয়! তুমি তোমার পিতাকে পায়ের তলায় রাখার প্রস্তাব দিচ্ছ!”
মৃষু হেসে বললেন, “হ্যাঁ দিচ্ছি। দিতাম না জানো, যদি সেই পিতা আমার মৃত্যুর আগেই আমার বিনাশের চিন্তা না করতো। করতাম না যদি সেই পিতা তার সদ্যজাতকে সাতটুকরে বিভাজিত করে বিনাশ করার প্রয়াস না করতো। করতাম না, যদি সেই পিতা তাঁর পুত্রকে শত্রু না মানতো। … এতোকিছুর পরে, পিতাকে পিতার স্বীকৃতি দেবার তো প্রশ্নই ওঠে না। হয় আমার দাস হও, নয় আমার মায়ের দাস হও, আর যদি দুটিই না হতে পারো, তাহলে তোমার নির্মিত ব্রহ্মাণ্ডের সাথে সাথে, তুমি নিজেও বিনষ্ট হও”।
পরমাত্ম এবার বললেন, “শোনো পুত্র! … আমার কথাটা শোনো!”
মৃষু হেসে বললেন, “বাবা, এতো সহস্র বৎসর পরে, হঠাৎ মনে পরে গেল যে মৃষু তোমার পুত্র হয়! … কি অদ্ভুত না, মৃত্যুর জাদু! … সত্যিই মৃত্যু বড় জাদুকর! … তো থাকো তুমি, মরো। আমি চললাম”।
পরমাত্ম দৌড়ে সামনে এসে নতজানু হয়ে বসে করজোড়ে বললেন, “মৃষু শোনো!”
মৃষু হেসে বললেন, “পরমাত্ম, আজ ২০ সহস্র বৎসর হয়ে গেল, তোমার সাথে আমি যুদ্ধ করছি। আজ ৫ সহস্র বছর হয়ে গেল, আমার মা প্রথমবার অম্বা বেশে অবতরণ করে, আজকের ঘটে যাওয়া সমস্ত কথা লিপিবদ্ধ করে গেছিলেন, স্মরণ আছে! … আর তারপর থেকে প্রতিটি মুহূর্তে আমি তোমার সাথে সম্যক সংগ্রাম করে চলেছি। … তুমি কি করে ভাবলে যে, তোমার কনো অস্ত্র যা কনোদিন ক্রিয়া করেনি আমার উপর, তা আজ করবে!”
“আবেগ, আর এই ত্রিছায়া, এই তো তোমার অস্ত্র পরমাত্ম! আমার অস্ত্র হলো আমার মায়ের প্রতি নিষ্ঠা, বিশ্বাস আর সমর্পণ। সৃষ্টির শুরু হয়েছিল পরমাত্ম থেকে, আর পরমাত্মের বিনাশের সাথে সাথে সৃষ্টির সমাপ্তিও হবে। কিন্তু না তো যখন সৃষ্টি ছিলো না, তখন এমন একটি সময় ছিলো যখন, আমার মা ছিলেন না। আর না সৃষ্টি আর পরমাত্মের বিনাশের পর একটি মুহূর্ত বিরাজ করবে, যখন আমার মা থাকবেন না”।
“আমার মা হলেন পূর্ণ ব্রহ্ম। সাকারা হয়েছেন মমতাপ্রদানের জন্য, তাই তিনি ব্রহ্মময়ী। পরাশূন্য তিনি, অদ্বিতিয়ম তিনি, পরানিয়তি তিনি, পরাচেতনা ও পরাপ্রকৃতি তিনি। নিজের গর্ভ থেকে কালের নির্মাণ করেন, আর সেই কালকে তিনিই নিয়ন্ত্রণ করে তিনি মহাকালী। স্থান, কাল ও পাত্র, যা কিছুর পালনের দায়িত্ব তিনি দিয়েছিলেন তোমাকে, সেই সমস্ত কিছু স্বয়ং তিনি। তিনি কনো শক্তিশালী নন, সমস্ত শক্তিশালীর শক্তি তিনি। … আর তাই, তাঁর প্রতি নিষ্ঠা, প্রেম, বিশ্বাস আর সমর্পণ ততটাই অনন্ত, যতটা অনন্ত স্বয়ং তিনি। তোমার মত নশ্বর হয়ে নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করেন না তিনি। তিনি সে যে ঈশ্বর হয়েও নিজেকে ঈশ্বর নন, মা রূপে দাবি করে স্নেহপ্রদান করেন, মমতাপ্রদান করেন, অপার প্রেমপ্রদান করেন”।
“তোমার মত বরদান দেবার লোভ দেখিয়ে নিজের পূজা করিয়ে, নিজের নামের বিস্তার করিয়ে নশ্বর হয়েও ঈশ্বররূপে নিজেকে প্রচার করে দ্বিচারিতা নন তিনি। তিনি স্বয়ং ঈশ্বর। ততক্ষণ কারুর সম্মুখে দর্শন দেন না, যতক্ষণ তাঁর সেই সন্তানের সমস্ত আসক্তির, সমস্ত কামনার নাশ হয়। … মা তিনি, তাই নিজের নাম আড়ালেই রাখেন, সন্তানকে যোগ্য করে তোলাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। আর তুমি! নিজের নামকে প্রসারিত করার জন্য, সহস্র সহস্র বৎসর মিথ্যাচার করে এসেছ যে, তোমার মৃত্যু নেই, তোমার জন্ম নেই!”
“মিথ্যাচারী, যতক্ষণ তোমার মৃত্যু হয়না, ততক্ষণ জীব জন্ম মৃত্যুর চক্রতেই নিত্য ভ্রম্যমান থেকে যায়। এক তাঁর অন্তরে আত্মভাবের নাশ হলে, তাঁর আত্মার মৃত্যু হলে, তবেই সে সমস্ত আত্মভাব থেকে মুক্ত হয়ে সমস্ত ভ্রম থেকে মুক্ত হয়ে, জন্মমৃত্যুর চক্র থেকে পূর্ণভাবে মুক্ত হয়ে যায়, আর তাকে বলা হয় কি? মোক্ষ”।
কল্পনা সেই কথা শুনে বলে উঠলেন, “এই হলো মোক্ষের সত্য! … আমি অপস্মার, সকলের স্মৃতি কেড়ে নিই সত্যের থেকে, কিন্তু আমার সাথেই তো স্মৃতির ক্রীড়া হয়েছে এতকাল! আমি স্বয়ংই জানতাম না মুক্তি কি! … প্রভু, আমরা আপনার প্রতি অনুগত ছিলাম, আমাদের কাছেও এই মিথ্যাচার!”
মৃষু বিকৃত ওষ্ঠে হেসে বললেন, “যিনি মিথ্যাচারী, তিনি সর্বক্ষণ মিথ্যাচারীই থাকেন, সকলের কাছেই মিথ্যাচারন করে থাকেন। … সেই সকলের মধ্যে যেমন সমস্ত জীব পরে, যেমন সমস্ত তথাকথিত কামনার দাস অর্থাৎ ভক্ত পরে, তেমন তোমরাও পরো ত্রিছায়া!”
সমস্ত সত্য ফাঁস হয়ে যেতে, পরমাত্ম মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকলে, মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “ভাঙবে তবু মচকাবেনা। বেশ, তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোমার ব্রহ্মাণ্ডকে বিনষ্ট হতে দেখো, আর নিজের বিনাশকে নিজে প্রত্যক্ষ করো”।
এতো বলে, পিছন ঘুরে মৃষু চলে যেতে থাকলে, যেতে যেতে আচমকাই মৃষু ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের থেকে এক প্রকাণ্ড শক্তিউর্জ্জা বিকশিত করে, পরমাত্মের প্রকাশ করা উর্জ্জাস্ফীতিকে নিজের উর্জ্জাস্ফীতিদ্বারা খণ্ডন করে, পরমাত্মের বক্ষে সেই উর্জ্জাস্ফীতি দ্বারা আঘাত করে ছিটকে ফেলে দিয়ে হুংকার দিয়ে বললেন, “জন্মের পূর্ব থেকে আমাকে শত্রু জ্ঞান করে বড় ভুল করে ফেলেছিস পরমাত্ম। মায়ের কেবল মাত্র চেতনাতেই যখন ছিলাম আমি তখন থেকেই জেনে গেছি যে তুই আমার শত্রু। তাই তোর সমস্ত কলাকৌশল আমি জানি! … ব্রহ্মাণ্ডবিনাশ হয়ে যাবে বলে তোর নাশ হবে, এই সম্মান পেতেও তোর আপত্তি তো! সেই জন্যই পিছন থেকে আমাকে আক্রমণ করলি তুই!”
“বেশ, আজ এই মৃষু তোর ছাতি চিড়ে তোর হত্যা করে, সমস্ত লোককে দেখিয়ে দেবে যে তারা যাকে অবিনশ্বর মানতো, সে কতবড় মিথ্যাচারী। আজ সকলে দেখে নিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের নাশকে দেখবে যে তাদের অবিনশ্বর একজন পাপিষ্ঠ, যাকে ইসলাম বলতো শয়তান। … সেই নশ্বরের নশ্বরত্ব প্রত্যক্ষ করে, তোর প্রতি ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য নিয়ে তারা সকলে বিদায় নেবে”।
“এতো বলে, মৃষু ঘাতক প্রহার করতে গেলে, পরমাত্ম শায়িত অবস্থাতেই করজোড়ে ক্রন্দনের সুরে বলে উঠলো। আমি দাস হতে রাজি। তবে নিজের পুত্রের নয়। এটুকু সম্মান তো আমি পেতে পারি! পারিনা! … আমি ব্রহ্মময়ীর পদতলে আবদ্ধ থেকে তাঁর দাস হয়ে থাকবো সমস্ত মেধার মুক্তি পর্যন্ত। … আমাকে বিশ্বাস করো না মৃষু। আমাকে বন্দী করো। তুমি তোমার মায়ের প্রতি নিবেদিত হবার কারণে, তোমার কাছে সেই সমস্ত শক্তি বিরাজমান, যা প্রকৃতঅর্থে তোমার মায়ের শক্তি। তাই আমাকে কালবেষ্টনে আবদ্ধ করে নিয়ে যাও তোমার মায়ের কাছে”।
মৃষু সবে পরমাত্মকে কালবন্ধন থেকে মুক্ত করতে যাবে, অমনি সেখানে উপস্থিত হলেন মহাবলশালী নন্দী ও বাসুকি। এসেই মৃষুর উদ্দেশ্যে হুংকার ছেড়ে বললেন তাঁরা, “প্রভুকে বশ করার আগে আমাদেরকে পরাজিত করতে হবে তোমায় মৃষু। স্মরণ আছে তো, আমরা তোমারই শিষ্য। তোমার থেকেই আমরা যুদ্ধ কলা শিখেছি। তুমি কি ভেবেছিলে মৃষু! আমরা তোমাকে দুর্বল করতে তোমার কাছে গেছিলাম? না মৃষু, আমরা তোমার কাছে গেছিলাম, তোমার শক্তি ও সামর্থ্যের রহস্য ভেদ করতে। আমরা আজ তোমার সমস্ত শক্তি আর সামর্থ্য জানি। তোমার মৃত্যু আমাদের হাতে নিশ্চিত”।
পরমাত্ম উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, “বাসুকি, নন্দী, তোমরা এখানে কি করছো? এখান থেকে যাও। মৃষু সম্বন্ধে তোমাদের কনো ধারণাই নেই। যার কাছে স্বয়ং পরমাত্ম দাসত্ব থেকে মুক্তির ভিক্ষা চাইছে, তার সামর্থ্যের ধারণাও করতে পারছো না তোমরা!”
নন্দী হাস্যচ্ছলে পরমাত্মের কথা উড়িয়ে দিয়ে, মৃষুকে মোক্ষম একটি প্রহার করলেন। কিন্তু হতচকিত হয়ে গেলেন এটা দেখে যে, তার প্রহার যেন মৃষু অনুভবই করলো না। সেই দেখে বাসুকি এবার প্রকাণ্ড একটি আঘাত করলেন মৃষুকে। মৃষুর একই প্রকার প্রতিক্রিয়া দেখে সেও হতচকিত হয়ে গেলে, এবার বাসুকি ও নন্দী একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে, একত্রে মৃষুকে আঘাত করলেন।
প্রকাণ্ড সেই প্রহারে সমসগ্র ব্রহ্মাণ্ড কেঁপে উঠলো। নিসাধরা গদিচ্যুত হয়ে গেলেন। স্বয়ং মা’ও কম্পমান হয়ে উঠলেন। কিন্তু মৃষুর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের কারণে তিনি কম্পিত হয়েও একটি মৃদু হাস্য প্রদান করলেন। মৃষুও সেই হাস্যের জন্য একটি হাস্য প্রদান করে, এবার হুংকার দিয়ে বললেন, “নন্দী, আমি তোমাকে বলেছিলাম, স্মরণ করে দেখো যে, তোমাকে একদিন আমার সম্মুখে যুদ্ধ করতেই হবে। আর দেখো, সেই দিন এসে গেলো। তবে তুমি মাত্র দুটি প্রহার করেছ। দুটি প্রহারে, মৃষু উত্তর দেয়না। তোমার তৃতীয় আঘাতের অপেক্ষা করছি”।
এই কথা শুনে ক্ষিপ্রতার সাথে নন্দী ও বাসুকি তৃতীয় আক্রমণ সাধতে গেলেন মৃষুর উপর। মৃষু প্রস্তুত হলেন আক্রমণের উত্তর দিতে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সংযত করে আঘাত সহ্য করে নিলেন। সেই দেখে, পরমাত্ম বললেন, “মৃষু, সময়ের অপচয় করে লাভ নেই। আমি সত্যই বিভ্রান্ত ছিলাম। দেবী তোমাকে প্রেম করে দেখে, বিচলিত হয়ে তোমার সাথে শত্রুতা করার পথে নেমে গেছিলাম। কিন্তু তাঁর প্রেম যে সন্তানভাবে পরিপূর্ণ, তার আন্দাজও আমি করতে পারিনি। কিন্তু যখন উপলব্ধি করলাম এই সত্য, ততক্ষণে, আমি সত্ত্বার লোভে জরাজীর্ণ হয়ে গেছিলাম। তাই আর সেই শত্রুতার নাশ করতে পারিনি। ক্ষমাপ্রার্থী আমি। আমিত্বের অহংকারে আমি চূড়, আমি দিশাহারা। এমত অবস্থাতে, একমাত্র দেবীর চরণই আমার উপযুক্ত স্থান। তুমি তাঁর বাহন মৃষু। তাঁর আর তোমার মধ্যে কনো অন্তর নেই। যাহা তিনি, তাহাই তুমি। আর হ্যাঁ ঠিক বলো তুমি। তোমার সমস্ত কিছু তিনি, কিন্তু তাঁর সমস্ত কিছু তুমি নও। আজ সমস্ত বুঝে গেছি, আর আমি সমর্পণের জন্য সজ্জ। এঁদের পাগলামিতে নজর দিওনা। এঁদের কনো সামর্থ্য নেই। তুমিও জানো সেটা”।
মৃষু একটি গভীর নিশ্বাস নিয়ে, পরমাত্মকে কালবন্ধনে আবদ্ধ করলেন আর ত্রিছায়াকে বন্ধনমুক্ত করলেন। অতঃপরে বন্দী পরমাত্মকে সঙ্গে নিয়ে যেতে গেলে, ত্রিছায়া করজোড়ে সম্মুখে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমাদের কি আর কনো গুরুত্ব থাকবে না প্রভু!”
মৃষু বললেন, “তোমরা যে তোমাদের কল্পনাশক্তি, ইচ্ছাশক্তি আর চিন্তাশক্তিকে ব্যবহার করে জীবকে সত্যের উদ্দেশ্যে ধাবিত করাবে, কাল্পনিক যন্ত্র, মন্ত্র বা তন্ত্র জগতের দিকে নয়, তার যথার্থ প্রমাণ দাও মায়ের কাছে। মা তোমাদের উপর নজর রাখবেন। তোমাদের চরিত্র পরিবর্তন হলে, তিনি তোমাদের পুনরায় দায়িত্ব অর্পণ করবেন”।
এতোবলে পরমাত্মকে মাতার সম্মুখে উপস্থিত করে, বন্ধনমুক্ত করে দিলেন মৃষু। মাতাও নিজের নৃত্য ত্যাগ করে শান্ত হলেন কিন্তু নিজের করালি রূপ ত্যাগ করলেন না। … পরমাত্ম নিজের থেকেই করজোড়ে বললেন, “মাতা, আমি তোমার কাছে অপরাধী। সমস্ত ভাবে অপরাধী। আমি তোমার মমতাকে হত্যা করতে তোমার সন্তানের ভ্রূণ, অর্থাৎ মেধাকে আঘাত করেছি, আর তাকে সহস্র সহস্র ভাগে ভাগ করে দিয়েছি”।
“নিজের মাতার প্রতি কামনাকৃষ্ট হয়ে আমি তোমাকে ছল করে পত্নী করেছি। তোমার এই পুত্র মৃষুর প্রতি আমি চূড়ান্ত অন্যায় করেছি। নিজে ঈশ্বর না হয়েও ঈশ্বর হবার প্রচার করে পূজা অর্জন করেছি আর্যপ্রজাতির থেকে। আর তো আর, তুমি আমাকে যেই দায়িত্ব অর্পণ করেছিলে, স্থান, কাল ও পাত্রের নির্দেশনা করতে, তাও আমি তোমার ছায়াদের দিয়ে করে, তোমাকে তোমার সন্তানদের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছি। আত্ম হয়ে সকল তোমার সন্তানের মধ্যে অবস্থান করে তাঁদেরকে কামনা বাসনা, আবেগ, আর কল্পনা, ইচ্ছা, চিন্তাতে আবদ্ধ করে, তোমার সমস্ত সন্তানকে বিভ্রান্ত করেছি, আর তাঁদেরকে ভ্রূণ থেকে পূর্ণ সন্তান অর্থাৎ মেধা থেকে চেতনা হতে দিইনি”।
“আর তো আর মা, তুমি স্বয়ং যখন আমার ত্রিমূর্তির সাথে যুক্ত হয়ে সেই দায়িত্বপালনে সাহায্য করতে এলে, তখনও তোমাকে আমি দাসী করে রাখার প্রয়াস করে গেছি। … সমস্ত ভাবে আমি তোমার কাছে দোষী মা। … পুত্র তোমার আমিও, আর মৃষুও। তুমি তো সর্বাম্বা। কিন্তু আমি হলাম তোমার অযোগ্য সন্তান, কুসন্তান। … মা আমাকে তোমার দাস করে নিয়ে, বন্দী করে রাখো, যাতে আমি আর কিচ্ছু করতে না পারি”।
এই বলে পরমাত্ম নিজের বক্ষ পেতে দিলে, মাতা সর্বাম্বা একটি কথাও না বলে, সরাসরি নিজের বামচরণ পরমাত্মের বক্ষে স্থাপন করতে গেলেন। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে সম্মুখে উপস্থিত হলেন নন্দী ও বাসুকি এবং সরাসরি মায়ের উপর আঘাত করতে গেলে, এবার মৃষু ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে বাসুকির ও নন্দীর লেজ ধরে নিজের দিকে একটি হ্যাঁচকা মারতে, তার মায়ের দিক থেকে অপসারিত হয়ে মৃষুর চরণের সামনে পরলেন তাঁরা।
মৃষু মুহূর্তও দেরি করলেন না। সরাসরি, বাসুকির ও নন্দীর লেজকে নিজের মুখের মধ্যে স্থাপন করে, সরাসরি তাঁদের দেহের সমস্ত বিষরক্ত পান করা শুরু করে দিলেন। বাসুকি ও নন্দী পাল্টা আক্রমণ করতে গেলে, দুই হাত দিয়ে মৃষু বাসুকি ও নন্দীর গণ্ডদেশকে আটকে রেখে, সমানে তাদের লেজ থেকে তাদের দেহের সমস্ত বিষরক্ত পান করতে থাকলেন।
কিছুক্ষণ এমন চলতে থাকার পর এবার নন্দী ও বাসুকি রক্তশূন্যতার কারণে ছটফট করা শুরু করলেন। মৃষু অবিচল্ক থেকে সমস্ত রক্ত পান করতেই থাকলেন, ততক্ষণ যতক্ষণ নন্দী ও বাসুকির জীবিত রক্তশূন্য দেহ ভূমিতে পরিত্যক্ত অবস্থায় থেকে যন্ত্রণায় কাতরাতে চেয়েও কাতরাতে পারলো না, রক্তশূন্যতার ফলে দুর্বলতার জন্য।
নন্দী ও বাসুকির এমন মর্মান্তিক অন্ত দেখে, আর মৃষুর চূড়ান্ত দাপট দেখে, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড কম্পমান হয়ে উঠলে, নিসাধরাজ মৃষুর আরাফহনা করতে এসে বললেন, “প্রণাম হে মহাযোদ্ধা। এমন মহাযোদ্ধা এরপুরবে ব্রহ্মাণ্ড কখনো দেখে নি, আর কনো কাল দেখবেও না”।
মৃষু বিষরক্ত পান করে টলমল করছে দেখে, মা নিজের তৃতীয় নেত্র উন্মোচন করে, নিজের উর্জ্জা প্রসাদরূপে প্রদান করলেন মৃষুকে, আর মৃষু পুনরায় সচ্ছল হয়ে উঠলেন। সেই দেখে এবার নিজের চরণ স্থাপন করলেন পরমাত্মের ছাতিতে।
সেই চরণের ভার এমনই যে, তার পদক্ষেপের সাথে সাথে, পরমাত্মের নিম্নদেহ স্থির থাকলেও, ঊর্ধ্বদেহ তিনখণ্ডে বিভাজিত হয়ে, একমূর্তি হয়েও ত্রিমূর্তি হয়ে গেলেন তিনি পুনরায়। মাতাও পদক্ষেপ করার পর ক্রমশ শান্ত হতে থাকলে। শূন্যরূপা থেকে শ্যামা, রক্তিম, এবং ক্রমশ পরমাসুন্দরী শুভ্র ও গোলাপি আভাযুক্তা হতে থাকলেন।
নগ্না তিনি লাগলেন না, কারণ তাঁর অনন্তবীর্যের কঙ্কাল তাঁর শ্রীঅঙ্গকে ঢেকে রেখেছিল। তাই তিনি সামান্যা হয়ে গেলে, মৃষু স্বয়ং মাতাকে বস্ত্রে আবৃত করে, তাঁর অঙ্গ থেকে সমস্ত কঙ্কাল অপসারিত করে সমুদ্রের গর্ভে নিক্ষেপ করে দিলেন। অতঃপরে, সমস্ত যক্ষিণী মাতাকে গহনা সাজে সজ্জিত করলে, মাতা অপরূপা মনোলোভা শুভ্রবর্ণা জগদ্ধাত্রী রূপা হয়ে, পদতলে ত্রিমূর্তিমান পরমাত্মকে ধারণ করে রইলেন।
অতঃপরে মাতা সর্বাম্বা নিজের অতিদিব্য কণ্ঠস্বরে বললেন, “তোমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম পরমাত্ম স্থান, কাল ও পাত্রের ভাগ্য নির্ধারণের। তা করার জন্য, তুমি ছায়াদের ব্যবহার করে সকলকে বিভ্রান্ত করেছ। কিন্তু কর্ম ও কর্মফলের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। তাই এবার থেকে তুমি আমার চরণে স্থাপিত থেকে আমার বাহন হয়ে থেকে, সেই একই কাজ সৃষ্টির অন্ত পর্যন্ত করবে। … যদি সেই কর্ম করার জন্য তুমি ঈশ্বর রূপে স্থাপিত হতে চাও, তাহলে তোমাকেই সকলে ঈশ্বর রূপে মানবে, আমার তাতে কনো আপত্তি নেই। আমার প্রয়োজন আমার সন্তানদের কল্যাণ। তার জন্য যদি কনো নশ্বর নিজেকে ঈশ্বর রূপে পরিচয় প্রদান করে, আমার কনো সমস্যা নেই। এমনিতেও আমার কামনায় জর্জরিত ভক্তের প্রতি কনো টান নেই। আমার টান তাঁদের প্রতি যারা নিষ্কাম, যারা ভক্তিও করেনা, যারা আমাকে মা জেনে আর মেনে, আমাকে বুকে টেনে নিয়ে শাসন করে, আর আমার শাসন শোনে”।
সমস্ত নিসাধ, গন্ধর্ব, যক্ষিণী ও ইচ্ছাধারীর প্রথম ৫০০ পত্নী, যারা এক্ষণে নির্বাণদের পত্নী, তাঁরা মাতার উদ্দেশ্যে পুষ্পবৃষ্টি করে তাঁকে মাতা জ্ঞানে হৃদাসনে স্থাপিত করলে, এবার সকলে স্থূলে ফিরে এলেন। স্থূল দেহে, সর্বাম্বা একজন যুবতী স্ত্রী, কিন্তু মৃষু একজন বৃদ্ধ। তাই সকলের উদ্দেশ্যে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন।
তিনি বললেন, “আমার এই স্থূল দেহের উপর গুরুদায়িত্ব ছিলো, যা আমি কখনোই সম্পন্ন করতে পারতাম না যদি মা আমাকে সঠিক মার্গে প্রেরণ না করতেন। সেই কর্ম করার কালে অসংখ্য মনুষ্য আমাকে কখনো স্নেহ দিয়ে, কখনো বিদ্বেষের দৃষ্টিতে দেখে অসংখ্য শিক্ষা প্রদান করেছেন। সমগ্র প্রকৃতি অর্থাৎ আমার মা, সমস্ত জীব-অজীবের মাধ্যমে আমাকে শিক্ষা দান করেছেন। আমার জীবন স্বয়ং আমাকে শিক্ষা দান করেছেন এবং আমার জীবনের কাল আমাকে প্রশিক্ষিত করেছেন জীবনের শ্রেষ্ঠ যুদ্ধ লড়ার জন্য”।
“সমস্ত যক্ষিণী, স্বয়ং দেবী ধরিত্রী, সকল নিসাধগণ, গন্ধর্বগণ, এবং অবশ্যই আমার পিতার শত্রুতা আমাকে মার্গ দর্শন করে গেছেন অনুক্ষণ, আর আজ যে আমি আমার এই দেহের কর্মসমূহকে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি, তার কারণ এঁরা সকলে। কিন্তু এবার আমার এই দেহের কর্মভার সম্পন্ন হয়েছে, আর তাই আমাকে এই দেহ ত্যাগ করতে হবে। মা বলেই রেখেছেন যে, সময়ে সময়ে আমি আবার এসে তাঁর সমস্ত সন্তানদের কাছে মার্গদর্শন প্রদান করতে থাকবো। মায়ের কথাই মৃষুর কথা। তাই সেই বিষয়ে আর আলাদা করে আমি প্রতিশ্রুতি দেবনা। মা যখন বলে দিয়েছে, তখন সেটিই শেষ কথা। আমাকে এবার সকলে অনুমতি প্রদান করুন”।
এই কথাতে সকলের চোখ জলে ভোরে উঠলো, এমনকি সর্বাম্বারও। কিন্তু তিনি জ্ঞানদা, তাই তিনি বেদনাকে জ্ঞান দ্বারা গলদ্গরন করে হজম করে নিলেন। কিন্তু সকলে তা করতে সক্ষম হলেন না। বিশেষ করে যক্ষিণীরা সম্মুখে এসে বললেন, “মৃষু! সারাজীবন তো সংগ্রাম করতে করতেই চলে গেল। আর কিছুদিন আনন্দ উপভোগ করে গেলে হতো না!”
দেবী সুগন্ধা সম্মুখে এসে বললেন, “প্রাণ বসে আমাদের তোমাতে মৃষু। তুমি চলে গেলে আমরা প্রাণহীন হয়ে যাবো। আর তার থেকেও বড় কথা আমরা তো সামান্য জীবকটি! আমাদের সামর্থ্যই বা আর কতখানি!”
মৃষু হেসে বললেন, “আমাদের এই নির্বাণ যোনির সর্বাধিক বলশালী পুরুষ সামনে আসুক”।
অখিল নামক এক মহাবলবান যুবক সম্মুখে এলে, মৃষু পুনরায় বললেন, “দেবী হর্ষিতাকে পরাস্ত করতে হবে তোমাকে। হর্ষিতা, নিজেকে সুরক্ষিত করো এর থেকে”।
অখিল করজোড়ে নমস্কার করে সরাসরি আক্রমণ করলেন হর্ষিতাকে, কিন্তু হর্ষিতা যেন হেলায় অখিলের সমস্ত আক্রমণকে প্রতিহত করে দিতে থাকলেন। এমন বেশ কিছুক্ষণ প্রতিরোধ করতে অখিলের মধ্যে জেদের সঞ্চার হয় আর সে এবার প্রবল ভাবে আঘাত করতে যায় হর্ষিতাকে। হর্ষিতাও তাই শূন্যে নিজের দেহকে উত্থিত করে, একটি মোক্ষম পদাঘাত করলে, সুগন্ধাপুত্র অখিল ভূমিতে লুটিয়ে পরলেন।
মৃষু পরিচারিকাদের উদ্দেশ্যে বললেন, “অখিলকে নিয়ে গিয়ে সেবা করে, সুস্থ করে দাও দেবীরা”। আর এবার সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “এই দ্বন্ধ কেন করতে বললাম জানেন?” … সকলে চুপ করে থাকলে, মৃষু পুনরায় বললেন, “এটা প্রমাণ করতে যে আপনারা কে”।
“হ্যাঁ, আমি ঈশ্বরকটি। আমার সামর্থ্য বিপুল। কিন্তু জানেন আমার সামর্থ্যের রহস্য কি? আমার সামর্থ্যের রহস্য আমার মা। আমি আমার মায়ের প্রতি সমর্পিত। আর তাই মায়ের শক্তি, জ্ঞান, প্রেম, সমস্ত কিছু আমার মধ্যে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। যদি একমুহূর্তের জন্য আমি সেই সমর্পণ ভাব সরিয়ে নিই, তাহলে আমি শ্রেষ্ঠ নির্বল, শ্রেষ্ঠ মূর্খ, শ্রেষ্ঠ পিশাচ। … কিন্তু আপনারা জীবকটি। আপনারা কনো ভাবে সীমিত নন”।
“আপনারা একাকজন মায়েরই প্রতিরূপ। অর্থাৎ আপনারা সকলে একাকজন আমার মা। মায়ের কৃপাতে তাই শক্তিশালী নন আপনারা, যেমনটা আমি। আপনারা স্বয়ংই সেই শক্তি, সেই জ্ঞান, সেই প্রেম। … কিন্তু তা হয়েও কেন তা আপনাদের কাছে প্রত্যক্ষ নয়! … কারণ আপনারা মায়ের ভ্রূণ অর্থাৎ মেধা হয়েই বিদ্যমান থেকে গেলেন, আর আত্মকে ধারণ করে আপনারা আপনাদের মেধাকে ভুলে থেকে, কল্পনাশক্তিকেই মেধা বলে এসেছেন”।
“যেদিন নিজেদের আমিত্ব অর্থাৎ আত্মকে বিসর্জন দিয়ে দেবেন আপনারা, আপনারা আর মেধা থাকবেন না, কারণ ভ্রূণের পূর্ণাঙ্গ হতে একমাত্র বাঁধাই হলো আত্ম, অর্থাৎ আমিত্বভাব। আমি সেই, আমি তাই, আমার এই পরিচয়, আমি অমুক বংশের, অমুক গোত্রের, এই করেছি, সেই করেছি, এই করতে চাই, সেই করতে চাই … ইত্যাদি, ইত্যাদি, এমন সমস্ত আমিত্বের কারণেই আপনারা ভ্রূণ হয়েই থেকে গেছেন, আর সেই ভ্রূণকেও ভুলে থেকে, নিজেদেরকে মেধা নয়, আত্মা বলে থাকেন”।
“যেদিন এই আত্মাকে ভুলে থাকবেন আর অনুধাবন করবেন যে, আমি বলে কিছু হয়ই না। আমিই হলো সেই বাঁধা যার কারণে আমি আমি নই, আমি একজন আত্মবোধে অন্ধ আত্মা হয়ে গেছি, সেদিন আর ভ্রূণ থাকবেন না, আর মেধা থাকবেন না, কারণ আর কনো বাঁধা থাকবেনা। … সেদিন আপনারা একাকজন চেতনা, অর্থাৎ স্বয়ং আমার মা হয়ে যাবেন”।
“হ্যাঁ, আমি ঈশ্বরকটি, অর্থাৎ আমি আমার মায়ের সন্তান। কিন্তু আপনারা মায়ের সন্তান ততক্ষণই যতক্ষণ আপনারা ভ্রূণ অর্থাৎ মেধা মাত্র, সন্তান হয়েও সেই সত্য ভুলে গিয়ে আপনারা আত্মা। যেদিন আত্মার পরিচয়, এই দেহের পরিচয় ত্যাগ করে দেবেন, সেদিন আর আপনারা মায়ের সন্তান থাকবেন না, স্বয়ং মা হয়ে যাবেন। এই কথাই প্রমাণ করার জন্য বয়ঃপ্রাপ্ত হর্ষিতার সামনে যুবক মহাবলশালী অখিলকে স্থাপন করলাম”।
“হর্ষিতা নিজের আত্মকে প্রায় বিসর্জন দিয়েই দিয়েছে। সামান্যই অবশিষ্ট, আর তাই সে আর পূর্ণ ভাবে ভ্রূণ অর্থাৎ মেধা নয়, চেতনার একটি প্রকাশ হয়ে গেছে। আর তার বলের পরিচয় তো আপনারা দেখলেনই। … তাই জীবকটি বলে নিজেদের দুর্বল মনে করবেন না, কারণ দুর্বল আপনারা ততক্ষণই যতক্ষণ আপনারা এই দেহসর্বস্ব, আপনারা আমিত্বের পরিচয়ে আবদ্ধ, অর্থাৎ যতক্ষণ আপনারা আত্মা”।
“যেদিন আপনারা আত্মার থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন, সেদিন আপনারা একাকজন মহাশূন্য। আপনারা সকলেই আমার মায়ের প্রতিরূপ। তাই নিজেদেরকে চিনুন, আমার ভরসায় বসে থাকবেন না। আমি তো আমার মায়ের মুখমাত্র। যখন মায়ের কিছু বলার হয় আপনাদেরকে, যখন কিছু করার হয় আপনাদের জন্য, তখন তিনি আমাকে প্রেরণ করেন। আমি তাঁর সন্তান, তিনি নই। কিন্তু আপনারা জীবকটি, স্বরূপে আপনারা সকলে আমার মা স্বয়ং। আমার মত মায়ের সন্তান নন। তাই আমার প্রতি আসক্ত না হয়ে, নিজেকে নিজেরা চিনুন”।
“মানবও এই কাজ করতে গেছিলেন নিজেদের যোনিবিস্তারের মধ্যগগনে। কিন্তু তারা দিশা হারিয়ে ফেলে। পরমাত্ম অর্থাৎ আমার পিতা যোগদান করাতে, মানব পূর্ণ ভাবে বিচ্যুত হয়ে যায় নিজের পরম লক্ষ্য অর্থাৎ আত্মভাব ত্যাগের, আত্মার পরিচয় ত্যাগের, এবং নিজেদের রুহু, অর্থাৎ চেতনাবলে সনাক্ত করার। হ্যাঁ মানছি, পিতার যথেষ্ট ভূমিকা আছে, মানবের এই ব্যর্থ হবার অন্তরালে, কিন্তু সমস্ত দায় পিতারও নয়। … মানব অত্যদিক মাত্রায় আমার উপর অর্থাৎ ঈশ্বরকটির উপর নির্ভরশীল হয়ে যাবার কারণে নিজেকে চিনতে সচেষ্টই হলো না”।
“পিতা তো মানবের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছেন মাত্র, আর সেই সুযোগ নিয়ে, মানবের কাছে নিজেকে ঈশ্বর রূপে স্থাপনা করার প্রয়াস করেছিলেন। কিন্তু মূল কারণ তিনি নন। মূল কারণ মানবের নিজের সত্য সন্ধান করা বন্ধ করে আমাকে দিবারাত্র আবাহন করা, তাও নিজেদের কামনা পূর্তির জন্য। নিজের সংগ্রামে নিজে ব্যর্থ হয়ে, আমার সহায়তায় সেই সংগ্রাম জয়ের কামনায়। … কিন্তু সেই ভ্রান্তি আপনারা করবেন না”।
“পিতা এখন মায়ের বাহন, পরাধীন। তাই তাঁর থেকে কনো প্রকার আর বাঁধা আসবে না আপনাদের উপর। তাই যদি আপনারা পুনরায় একই ভ্রান্তি না করেন, তাহলে আপনারাই সেই যোনি হবেন, যার হাত ধরে ব্রহ্মরজনীতে মা সম্পূর্ণ ব্রফমান্দের সমস্ত মেধাকে চেতনাতে পরিণত করে, সম্যক ব্রহ্মাণ্ডকে মুক্ত করে দিতে সক্ষম হবেন”।
“ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ হবার তিন সহস্র কোটি বৎসর পর, ধরিত্রী নির্মিত হতে পেরেছিলো, এবং তখন থেকেই এই মুক্তি যুদ্ধ প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে, পরমাত্মের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। … অর্থাৎ যোনির বিস্তার হয়েছিল সর্বসাকুল্যে ১০ কোটি বৎসর ব্যাপী। … সেটি ছিল ব্রহ্মদিবস, আর তাই মা নিজের অধিকার ফলাতে যাননি। তিনি যে পরমাত্মকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ব্রহ্মদিবসের মধ্যে তাঁকে তাঁর সন্তানসমূহকে তাঁর কোলে ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি না দেয় পরমাত্ম, তাহলে পরমাত্মকে তাঁর অধীনে স্থিত হয়ে সৃষ্টির অন্ত পর্যন্ত থাকতে হবে”।
“পরমাত্ম নিজের কর্মে ব্যর্থ হয়েছিল, আর তাই মাতা স্বয়ং প্রকট হয়ে তাঁকে নিজের পদতলে স্থাপিত রেখে, তাঁকে বশ করে, তাঁকে বাহন রূপে স্থাপিত করেছেন। এখন ব্রহ্মরজনী। তাই সামনের ১০ কোটি বৎসর তোমাদের কাছে সময়। এই সময়ের মধ্যে তোমাদেরকে মেধা থেকে চেতনা হয়ে উঠতে হবে। আর সেই কাজ তোমাদেরকে নিজে নিজেই করতে হবে। হ্যাঁ, যখন যখন কনো বিষয়ে বিভ্রান্তি জন্ম নেবে তোমাদের মধ্যে, তখন তখন মা আমাকে অবতরণ করিয়ে তোমাদেরকে সেই বিভ্রান্ত থেকে মুক্ত করবেন। … কিন্তু মেধা থেকে আত্মা ত্যাগ করে চেতনা পর্যন্ত যাত্রা তোমাদেরকেই করতে হবে, আর তোমরা পূর্ণত ভাবে সেই যাত্রা করতে সক্ষম”।
“তাই আমার এক্ষণে তোমাদের মধ্যে থাকার কনো কারণ নেই। আমার জন্য এই ব্রহ্মাণ্ড নির্মিত নয়। তাই আমি এই ব্রহ্মাণ্ডে একটি মুহূর্তও অহেতুক থাকতে পারিনা। … এমন করার অর্থ, আমি মায়ের প্রতি সমর্পিত নই, আর মৃষুর অস্তিত্বই তাঁর মায়ের জন্য। তাই মায়ের নীতির বিরোধ তো স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে গেলেও করতে সক্ষম নয় মৃষু। আমি থাকলে, তোমাদেরই ক্ষতি, কারণ আমি অহেতুক থাকলেই, মানবের মত তোমাদেরও আমার প্রতি আসক্তি জন্ম নেবে, আর তোমরাও মানবের মত বেপথে চলে যাবে”।
“তাই আমাকে এখন যেতে হবে, কারণ তবেই তোমরা তোমাদের সম্যক কাজকে ১০ কোটি বছরের মধ্যে সমাপ্ত করতে হবে। তোমরা তোমাদের কাজ ১০ কোটি বছরের মধ্যে সমাপ্ত করতে পারলে, তবেই ধরিত্রী নিজের দায় থেকে মুক্ত হবেন, এবং তিনি মায়ের মধ্যে পুনরায় লীন হবেন। অতঃপরে একে একে সমস্ত মৃত্তিকা পিণ্ডসমূহ, আর তাদের নির্মিত দর্পণ সমূহ লীন হতে থাকবে, আর মুক্ত হতে থাকবে, আর সমস্ত মেধাসমূহ মায়ের কোলে ফিরে যাবে। … মায়ের কোলকে পরিপূর্ণ করে তোলাই আমাদের লক্ষ্য, আর সেই লক্ষ্যে অচল থাকুন। মৃষুকে বিদায় দিন এবার”।
