৭.২। ইচ্ছাধারী পর্ব
ইচ্ছাধারীর কাছে পৌঁছাবার জন্য আপ্রাণ প্রয়াস করতে থাকলেন পরমাত্ম। কিন্তু সমস্ত অঙ্ক যেন তাঁর কাছে গুলিয়ে যেতে থাকলো। যেখানে যেখানে ইচ্ছাধারী থাকতে পারে, সেই সমস্ত জায়গায় পরমাত্ম গেলেন। কিন্তু প্রতিটি স্থানে পৌঁছে যেন তাঁর মনে হতে থাকলো যে, সেই স্থানই পালটে গেছে! … তাঁর সাথে এমন হতে থাকলে ভয়ার্ত হয়ে উঠলেন এক সময়ে পরমাত্ম।
স্থানের হিসাব কি তাঁর সমস্ত গুলিয়ে গেছে? অম্বার বয়স ঠিক কত এখন! … ১২ বছর বয়সে সে সংহারের নিধন করেছিল। তারপর কিছু সময় চলে গেছে। কিন্তু কত সময় গেছে! … আচ্ছা, সে কেন বুঝতে পারলো না যে প্রথমে যিনি এসেছিলেন, যাকে মৃষু পরাস্ত করলেন, তিনি বশ করলেন, তিনি যে আসলে অম্বা নন! …
কি হচ্ছে তাঁর সাথে এইসমস্ত কিছু! … স্থান, কাল, পাত্র সমস্ত কিছুর উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। স্বয়ং ব্রহ্মময়ী তাঁদের ত্রিমূর্তিকে এই দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। কিন্তু আজ যেন স্থান, কাল ও পাত্রের উপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ সে হারিয়ে ফেলেছে! … এমন হলে তো কেউই আর তাঁকে মানবে না! … কেন এমন হলো! তাহলে কি নিসাধরা কনো ষড়যন্ত্র করেছে তাঁর সাথে! …
এই ভেবে পরমাত্ম এবার নিসাধদের কাছে যাত্রা করলেন। কিন্তু সেখানেও তিনি তাঁদের লোকে না উপস্থিত হয়ে গন্ধর্বলোকে উপস্থিত হয়ে গেলেন। সেই লোকে গিয়ে অকস্মাৎ নভের সন্ধান করতে, সকলে হতচকিত হয়ে গেলেন। কেউ কিছু বুঝতেই পারলেন না যে, স্বয়ং পরমাত্ম এমন ব্যবহার কেন করছেন।
লজিত হয়ে পরমাত্ম সেখান থেকে চলে এলে, গন্ধর্বদের সেনাপতি রেণুকরভ অনুসরণ করলেন পরমাত্মের আর যখন গন্ধর্বলোক ছাড়িয়ে পরমাত্ম এগিয়ে গেলেন, তখন তিনি পরমাত্মের সম্মুখে এসে করজোর করে বললেন, “প্রভু, আপনি গন্ধর্বলোকে গিয়ে নিসাধরাজের সন্ধান কেন করছিলেন? কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়েছে কি প্রভু? আমি আপনার চলে যাবার পরে নভলোকে গেছিলাম, সেখানে তো নিসাধরাজ স্বমহিমায় বিরাজমান ছিলেন। তা আপনি সেখানে যাচ্ছেন না কেন!”
পরমাত্ম কি বলবেন বুঝতে না পেরে বললেন, “আচ্ছা অম্বার এখন বয়স কত হয়েছে, বলতে পারবে? মানে সে তো এখন স্থূলে রয়েছে। তো তার স্থূল দেহের বয়স!”
রেণু কিছুটা বিস্মিতই হলেন প্রথমে, তারপর নির্ভয় হয়ে বললেন, “প্রভু, উনি এখন ২৫। আর উনি এখন বারুদাবনে স্থিতা হয়েই, এক বিশ্বদর্শনের অভিযানে নেমে, সূক্ষ্মদেহে সবস্থান ঘুরে ফিরছেন। এই ক্ষণে তাঁর সূক্ষ্মরূপ অবস্থান করছে এক দক্ষিণা পাহাড়ের উপরে। আর সেখানের অধিপতিকে আক্রমণ করতে আসা দণ্ডশুণ্ড দেবী সর্বাম্বার অপার সুন্দরী স্ত্রীরূপ দর্শন করে, তারা মহারাজ ইচ্ছাধারীর বিবাহপ্রস্তাব প্রদান করে”।
“উত্তরে দেবী তাঁদেরকে বলেন যে যার বিবাহ প্রস্তাব, সে নিজে এসে সেই প্রস্তাব প্রদান করলে, তিনি ভেবে দেখবেন সেই প্রস্তাব স্বীকার করবেন না করবেন না, সেই বিষয়ে। দণ্ডশুণ্ডের সেই কথা শুনে মনে হয়েছে যে সমস্ত লোকের অধিপতি ইচ্ছাধারীর নাম শুনেও তাঁকে অবজ্ঞা করে, দণ্ডের অধিকারী দেবী। কিন্তু তাঁর অপাররূপকে মহারাজ ইচ্ছাধারী মদিরার ন্যায় পান করতে ইচ্ছুক হতে পারেন। তাই তাঁরা এখন সেই দক্ষিণা পাহাড়ের মাথা থেকে ব্রহ্মাণ্ডপতি ইচ্ছাধারীর দরবারে যাচ্ছেন, এই সমস্ত সূচনা প্রদান করতে”।
পরমাত্ম সেই সমস্ত কথা শুনে খানিক চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “রেণু, তুমি বললে যে নিসাধরাজ নিজের লোকেই, নিজের আসনেই বিরাজমান! অথচ এখন বলছো যে, ইচ্ছাধারীই হলেন ব্রহ্মাণ্ডপতি! এই দুই এক সাথে কি করে হতে পারে!”
রেণু মাথা নত করে বললেন, “প্রভু, আমাদের রাজা চিত্রসেন, আর নভলোকের অধিপতি নিসাধরাজ মাতার কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন তখনই, যখন ইচ্ছাধারী সংহারের দমনের পর সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে অধিকারে আনার আগ্রাসনে মত্ত ছিলেন। মাতা ইনাদেরকে বলেন যে, ইচ্ছাধারীর সত্ত্বাকে মান্যতা প্রদান করতে মন না চাইলে যুদ্ধ করতে, আর যদি দেখে সেই যুদ্ধে ইচ্ছাধারীর বলের সামনে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তাহলে যেন তারা সমর্পণ করে দেয়। মাতা আরো বলেন যে, ইচ্ছাধারী এমন কনো অপকর্ম এখনও করেনি, যার কারণে তাঁর নিধন করতে হবে। তাই তাঁর এখনই নিধন অসম্ভব। প্রথম সে অপকর্ম করুক। সেই অপকর্ম যখন সীমাছাড়া হয়ে যাবে, তখন অবশ্যই তার নিধন করা হবে”।
“প্রভু, আমাদের রাজন চিত্রসেন মাতার সাথে তর্কই করে ফেলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইচ্ছাধারী একজন সাধ, এটিই কি যথেষ্ট নয়, তার নিধন করার জন্য। মাতা সেই কথাতে রুষ্ট হয়ে গিয়ে ক্রুদ্ধ আবেশে বলে ওঠেন, কারুর জন্মের ভিত্তিতে তাঁকে সেই কর্মের ফল দেওয়া যায়না, যেই কর্ম সে করেই নি। সে নিজের কর্মের ভিত্তিতেই জন্মলাভ করেছে। তাই যতক্ষণ না সে এমন কনো কর্ম করে, যার ফলস্বরূপ তাঁর নাশ করা উচিত, ততক্ষণ তাঁর নাশ করার চিন্তা করাও অনোচিত”।
“প্রভু, মাতা কখনো স্থূল দেহে প্রকাশিতা ছিলেন না। তাই তাঁর অভিব্যক্তি, তাঁর ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি সম্বন্ধে আমরা কেউই কিচ্ছু জানতাম না। প্রভু, তিনি ঈশ্বররূপেও সম্মুখে আসতেন না, কারণ তিনি ঈশ্বররূপ পছন্দই করেন না। তাই তাঁর কনো ভক্তও নেই, আর তাই তাঁদের মারফতও আমরা তাঁর সম্বন্ধে কিছু জানতাম না। শুধু এটুকুই জানতাম আমরা যে, একমাত্র তাঁর উপরই নিয়তির কনো নিয়ন্ত্রণ নেই, কারণ তিনি স্বয়ং নিয়তি”।
“সত্য বলছি প্রভু, আমরা কেউই উনার সম্বন্ধে তেমন কিচ্ছু জানতাম না। তাঁকে যারা ঐকান্তিক ভাবে নিজের জননী জ্ঞান করেন, তাঁরাই তাঁর সম্বন্ধে জানতেন। আর সেই সন্তানদের তো আপনি সর্বদা বিরক্ত করতে বলে এসেছেন, তাই আমরা সমস্ত ভাবে তাদেরকে বিরক্তই করে যেতাম। অন্তে আমরাই হতাশ হতাম কারণ, এক তাঁকে যারা জননী রূপে ধারণ করে তাঁর কাছে সমর্পণ করে, তাঁরাই মোক্ষলাভ করে মুক্ত হয়ে যেত। তাই তাঁদের সাথে আমরা আর সংযোগও স্থাপন করতে পারতাম না, আর উনার সম্বন্ধে কিছু জানতেও পারতাম না”।
“আর যারা জানতেন তাঁর সম্বন্ধে, তাঁর প্রিয় সন্তানসমূহ, তাঁদেরকে তো বিরক্ত করাই আমাদের কাজ ছিল, মানে আপনি সেই কাজই আমাদেরকে সঁপেছিলেন। যেমন ধরুন মৃত্তিকা, ধরিত্রী, নিসাধপত্নীরা, তাঁরই অঙ্গসমূহ অর্থাৎ দেবী পাবনি বা দেবী কৃত্তিকা, আর ছিলো মৃষু। … তাই প্রভু, তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে আমাদের কনো ধারণা ছিলো না। আমাদের মহারাজ, রাজা চিত্রসেন তো মাতার থেকে সেই যে ফিরেছিলেন, তারপর থেকে নিজের মুখও দর্পণে দর্শন করেন নি। শুনেছি নিসাধরাজও দর্পণ ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছেন”।
“আমাদের মহারাজ তো কালকোঠরিতে নিজেকে আবদ্ধ করে রেখে দিয়েছেন। আমরা তাঁর সাথে সম্পর্ক করার প্রয়াস করলে, তিনি শুধু এটুকুই আমাদেরকে বলেছিলেন যে, আর তাঁর মুখ নেই। তিনি নিজেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না, এই মাতার বিরোধ করেছিলেন তিনি একসময়ে, এই কথা ভেবেই”।
পরমাত্ম প্রশ্ন করলেন, “কেন? কি এমন দেখেছিলেন তাঁরা অম্বার মধ্যে?”
রেণু বললেন, “অম্বা নয় প্রভু, সর্বাম্বা। সর্বের অম্বা, এই নামই মৃষু তাঁকে প্রদান করেছেন। … আর তাঁর ব্যক্তিত্ব বড়ই বিচিত্র। মহারাজ চিত্রসেনের ভাষায়, তিনি অদ্বিতিয়ম জননী, যিনি প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর সমস্ত সন্তানদের প্রগলের মত স্নেহ করে থাকেন। যেই সন্তান যতই দামাল হোক, যতই অত্যাচারী হোক, যতই তাঁকে অবহেলা করুক, যতক্ষণ না তাঁরা তাঁর প্রিয় সন্তানদের আঘাত করেন, ততক্ষণ তিনি সমানে ক্ষমা করতে থাকেন”।
“রাজা চিত্রসেনের ভাষ্য অনুসারে, তিনি যেন ভুল করেও ভুল করতে পারেন না। মহারাজ বলেন, মাতা স্বয়ং নিয়তি আর তাঁর সেই বোধ পূর্ণ ভাবে আছে, কিন্তু তারপরেও তিনি তাঁর সন্তানদের উপর ভরসা করতেই পছন্দ করেন। তিনি বলেন, মাতা এমন মনে করেন যে, সন্তান ভুল করবে, ভ্রমে ফাঁসবে, কিন্তু তাদেরকে স্বতন্ত্রতা প্রদান করে রাখতে হবে। তাঁরা সকলে আমারই সন্তান। এক না একদিন তারা উপলব্ধি করবেই যে, তাঁরা স্বয়ং সক্ষম মুক্ত হতে, অন্য কারুকে প্রয়োজনই নেই তাদের মুক্ত করে দেবার জন্য”।
“প্রভু, আমাদের রাজন এতটাই প্রভাবিত ছিলেন মাতার সাখ্যাতের পর যে, তিনি আমাদের এসে এই বলেছিলেন যে, তিনি এতোদিনে বুঝলেন যে, কেন মাতা ঈশ্বর হয়েও ঈশ্বরত্ব ত্যাগ করে, মাতৃত্ব বরণ করে নিয়েছেন। ঈশ্বর তো বিশ্বাসের ভিক্ষা করেন সকল ভক্তের থেকে, স্বয়ং ভক্তকেও বিশ্বাস করেন না। কিন্তু ইনি যে মা। ইনি সন্তানের উপর অবিশ্বাস করার কথা ভাবতেই পারেন না। ইনার কারুর থেকে কনো বিশ্বাস লাভের আবশ্যকতাই যেন নেই। ইনি এমন যেন, কেউ আমাকে বিশ্বাস করলেন বা না করলেন তাতে কিছু এসে যায়না, আমি আমার সন্তানদের বিশ্বাস করি”।
“প্রভু, রাজন আমাদের এসে বলেন যে, তিনি সত্যই ঈশ্বর নন। ঈশ্বর হলে তো তিনিও ভক্ত নির্মাণ করতে, ভক্ত করে কারুকে লাভ করতে লালায়িত থাকতেন, কারণ ভক্ত যে ঈশ্বরকে বিশ্বাস ভিক্ষাদান স্বরূপ প্রদান করে থাকে। … কিন্তু ইনি যে বিশ্বাস ভিক্ষা করেনই না। উপরন্তু, ইনি বিশ্বাস প্রদান করেন। ইনি প্রকৃত রাণী, এমনই আমাদের রাজন আমাদের এসে বলেন। কারণরূপে তিনি এই বলেন যে, প্রজা তো বাধ্য হয়ে কর দেয়, কর না দিতে হলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। কিন্তু রাণী! তিনি তো দিতেই থাকেন, কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু ফিরে পাবার ইচ্ছাও রাখেন না। সমানে দিতে থাকেন”।
“রাজনের মতে, ইনি হলেন মহাদাতা। সর্বক্ষণ সমস্ত কিছু দিতেই থাকেন তিনি, কিন্তু এতো দান করেও, তাঁর তিজোরি কখনো রিক্ত হয়না। … রাজা ক্ষোভ প্রকাশ করার কালে ভয়ানক রোদন করে ভেঙে পরে বলেন, স্বয়ং মায়ের প্রতি অবিশ্বাস করে গেছি। তিনি যে শুধু দিতে চান বলে, ঈশ্বর পদ ত্যাগ করে মা হয়ে বিরাজমান হয়ে রয়েছে, আমরা এতই মূর্খ যে তা কনোদিন ভাবতেও পারিনি, বুঝতে তো পারিই নি!”
পরমাত্ম যেন পলায়নের পথ খুঁজতে শুরু করলেন, কারণ অন্য কেউ জানুক আর না জানুক, তিনি স্বয়ং তো জানেন যে, এই অবিশ্বাস, আর এই লোভ কামনা সমস্ত কিছুর জন্মদাতা তিনি স্বয়ং। তাঁর প্রদান করা লোভ আর কামনাকে তিনি তৃপ্ত করে করে, নিজেকে ঈশ্বর বলে প্রচার করে গেছেন তিনি সর্বক্ষণ। আর সেই কাজ করার কালে সমানে এই বলে গেছেন সকলকে যে, দেবী কি করে ঈশ্বর হতে পারেন! তিনি তো তোমাদের ইচ্ছার কথা, কামনার কথা শোনেনও না! …
পরমাত্মের যেন এই মনে হতে থাকলো যে, তাঁর প্রচার করা মিথ্যার পর্দা উন্মোচন করার জন্যই যেন অম্বা দেহধারণ করে সকলের সম্মুখে এসেছেন। নিরাকার থেকে সাকার হয়ে ব্যক্তিত্ব ধারণ করে তাঁর সমস্ত সন্তানদের কাছে বলতে এসেছেন যে তাঁদের মা ঠিক কেমন। …
তাই মনে অনেক অনেক প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও, পরমাত্ম সেখান থেকে পয়ায়নের উপায় করতে থাকলেন। তা বুঝেই রেণু বললেন, “প্রভু, আপনি যদি চান, আমি আপনাকে যেখানে বলবেন সেখানে নিয়ে যেতে পারি। বলুন আপনি কোথায় যাবেন? নিসাধরাজের কাছে নাকি সাধরাজ ইচ্ছাধারীর কাছে?”
পরমাত্ম কিছু না বলে, ইতস্তত ভাবে বার বার বলতে থাকলেন, “না না, কোথাও না! কারুর কাছে না!”
এমন বলে সেখান থেকে চলে এলে, একটি স্থানে চিন্তিত হয়ে বসে পরলেন তিনি আর ভাবতে থাকলেন, “সমস্ত কিছু তো বোঝা গেল, কিন্তু আমার থেকে স্থান, কাল, পাত্রের নিয়ন্ত্রণ চলে গেল কি করে? কে নিলো? সর্বাম্বা না মৃষু!”
বিচলিত হয়ে উঠে, তিনি হুংকার দিয়ে কল্পনাকে ডাকলেন। কল্পনা তাঁর দুই ভগিনী, ইচ্ছা ও চিন্তাকে সঙ্গে নিয়ে সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়ে করোজোরে বললেন, “আদেশ করুন প্রভু!”
ইচ্ছা বিদ্রূপের হাস্য হেসে বললেন, “আদেশ করুন প্রভু! আদেশ করলে কি হবে? উনি যা আদেশ দেবেন, তা পুড়ন করতে পারবে? … সেই সামর্থ্য আছে আর?”
পরমাত্ম জিজ্ঞাসু হয়ে প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু নেই কেন?”
চিন্তা উত্তরে বললেন, “কার উপর আমরা ক্রিয়া করবো? মৃত যোনি, মনুষ্যদের উপর? কল্পনার থেকে এতকাল খালি শুনেই গেছি, মাতার সামর্থ্য তোমরা দেখেছ কোথায়! … আজ দেখে নিলাম সেই সামর্থ্য। কিচ্ছু করেন নি, কেবল বলেছেন কিছু করবেন না। কেবল বলেছেন মনুষ্য উচ্ছন্যে যাক, তাদের দিকে ফিরেও তিনি দেখবেন না। … ব্যাস এটুকুই। আর তার পরিণতি দেখুন। অনাহারে মরছে সমস্ত মানুষ! যাদের কাছে ধন নেই, তারা মরছে অনাহারে, আর যাদের কাছে ধন আছে তারা মরছে ব্যাধিতে! … কেউ ছাড় পাচ্ছেনা। কিন্তু মাতা কারুর উপর কিচ্ছু প্রহার করছেন না। শুধু ফিরেও তাকাচ্ছেন না তাঁদের দিকে”।
পরমাত্ম বললেন, “তা মৃষুর নবনির্মিত যোনি, নির্বাণরা তো এমন লাচার নয়, তাদের উপর তোমাদের বিষদন্ত প্রয়োগ করে, তাদেরকে অহংকারী, কামনায় জর্জরিত আর সত্যভ্রম উৎপন্ন করছো না কেন?”
কল্পনা বিদ্রূপের হাস্য হেসে বললেন, “তাদের কাছে যাবার উপায়ও নেই আমাদের। এক তো মাতা স্বয়ং তাদের মধ্যে রয়েছেন। সঙ্গে যেকোনো দৈত্যের থেকেও ভয়ঙ্কর মৃষু সেখানে রয়েছে। আর তো আর, এই নতুন যোনিকে এমন ভাবে সত্যের প্রতি মননশীল করে তুলেছেন মাতা আর মৃষু যে, কনো রূপ বিকার তাদের উপর ক্রিয়াই করতে পারছেনা!”
পরমাত্ম সেই কথা শুনে হেসে উঠে বললেন, “মৃষুর সম্বন্ধে এমন কেন বললে যে, যেকোনো দৈত্যের থেকেও অধিক ভয়ঙ্কর!”
কল্পনা বললেন, “আর কি বলবো প্রভু! … মাতার সামনে দাঁড়িয়ে তো তাও দুটো কথা বলা যায়, মৃষুর সামনে তো দাঁড়ানোও যায়না। প্রতিটা বিকারের ওষধি আছে তার কাছে। কনো বিকার তার সামনে দাঁড়াতে পারেনা। দুদণ্ড পা মুড়ে বিশ্রামও করেনা যে সেই সময়ে তাকে কোষে বাঁধবো! দয়ামায়া, ক্ষমাঘেন্না, কামনাবাসনা, আসক্তিবিরক্তি, কনো কিচ্ছু নেই। … সমস্ত কিছু মা আর মায়ের সন্তানদের কাছে উজাড় করে রেখে দিয়েছে। নিজের আমিত্বকেও! … এমন ক্ষমতাশালী তো কনো দৈত্য ছেড়ে দিন, স্বয়ং আপনিও নন হে প্রভু!”
পরমাত্ম সেই কথাতে চিন্তিত হয়ে উঠে, এক গভীর নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আচ্ছা কল্পনা, তুমি তো সকলের স্মৃতিভ্রম উৎপন্ন করো। তো আমার স্মৃতিও তুমি গেয়াস করেছো? … যদি না করো, তাহলে আমি তৃতীয়নেত্র দ্বারা কিছু দেখতে পাচ্ছিনা কেন? যেন আমার তৃতীয়নেত্র আমাকে ত্যাগ করে চলে গেছে! … যদি তুমি গ্রাস না করো, যদি তোমরা গ্রাস না করো, তাহলে আমি স্থান কাল আর পাত্রের উপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি কেন? কল্পনা, তোমার সঙ্গতেই আমি কালের উপর নিয়ত্রন ধারণ করে রাখতাম, চিন্তার ভরসাতেই আমি পাত্রদের উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে রাখতাম, আর ইচ্ছার সঙ্গলাভেই আমি স্থানের উপর নিয়ন্ত্রণ ধারণ করে রাখতাম। কিন্তু তোমরা থেকেও আজ আমি তা পারছিনা কেন?”
চিন্তা বললেন, “প্রভু, আপনি কোথাও ভুল করছেন। হ্যাঁ, আপনি আমাদেরকে ব্যবহার করেই স্থান, কাল ও পাত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতেন, এটি সত্য। কিন্তু সেটি আপনার নিজসিদ্ধান্ত ছিলো। স্থানের উপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ তো দেবী শ্রী রাখতেন; পাত্রের উপরেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণও তো দেবী শ্বেতা রাখতেন; আর কালের উপর নিয়ন্ত্রণ দেবী অম্বা স্বয়ং রাখতেন”।
“মৃষু যেই কালে, দেবী শ্রী ও শ্বেতাকে মাতার মধ্যে প্রত্যাবর্তন করিয়ে দিলেন, তখন থেকে পরানিয়তি দেবী অম্বিকা স্বয়ং সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রাখেন। আমরা তো তাঁরই ছায়া, তাঁর তিনরূপ, অর্থাৎ অম্বা, শ্বেতা ও শ্রীর ছায়ামাত্র আমরা। … যেকালে মৃষু ত্রিদেবীকে একাকার করে দিলেন, আমরা যে তিন হয়েও এক হয়ে গেলাম, আর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকতেও আমরা পরাধীন হয়ে গেলাম”।
“প্রভু, আপনি যখন ত্রিমূর্তি রূপে নিজেকে খণ্ডন করে নিয়ে মেধার নাশ করতে গেছিলেন, স্মরণ করে দেখুন, মাতা তখনও আপনাকে ক্ষমা করেছিলেন। আর শুধু ক্ষমাদানই করেন নি, আপনাকে স্থান, কাল ও পাত্রের নিয়ন্ত্রক রূপে স্থাপনও করেছিলেন। আপনি মনে করেছিলেন যে, মাতা আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছেন, তাই আপনি পরাধীন হয়ে থাকবেন। আর সেই কারণে মাতার তিন ছায়াশক্তি, যাদেরকে ব্যবহার করে মাতা মেধাকে সুরক্ষিত করতে চেয়ে, নভের, ধরিত্রীর, অগ্নির ও বায়ুর নির্মাণ করেছিলেন, তাদেরকে আপনি আপনার সঙ্গে নেন, অর্থাৎ চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা মানে আমাদের তিনজনকে”।
“আমি চিন্তা অবিদ্যার বিস্তারক অর্থাৎ আমি বিদ্যার সার গ্রহণ করতে দিইনা, আমার ভগিনী ইচ্ছা শ্রীর ছায়া, অর্থাৎ তিনি কামনার বিস্তার করে পবিত্রতা হনন করেন, ও আমাদের জ্যেষ্ঠা কল্পনা, যিনি সত্যের স্মৃতিকে আচ্ছাদিত করে দিয়ে সত্য শক্তির থেকে ভ্রম উপস্থাপন করেন। আর এই তিন ছায়াশক্তিকে ধারণ করে আপনি স্থান, কাল ও পাত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকলেন। … প্রভু, মৃষুর জন্মের কালে, মাতা নিজেকে ত্রিখণ্ডে বিভাজিত করেছিলেন, তাও আপনার নির্দেশমান্য করা সাধপালকে দিয়ে। কিন্তু মাতার লীলা বড়ই অদ্ভুত প্রভু। তাঁর কৃপাদৃষ্টিও বড়ই অকৃপণ। এতো কিছুর পরেও তিনি সেই তিনরূপের দুইরূপকে আপনার কাছেই দিলেন। শ্বেতা যুক্ত হলেন আপনার শ্বেতাম্বর বা কোকিলার সাথে, আর শ্রী যুক্ত হলেন আপনার পীতাম্বর বা দুধেশ্বরের সাথে”।
“কিন্তু তারপরেও, আপনি আমাদেরকে ব্যবহার করেই স্থান, কাল ও পাত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকলেন। তাই তাঁর লীলার দ্বিতীয়স্তর শুরু হয়ে যায়। আসলে মাতার ক্রিয়াধারাই এমন। তিনি প্রতিটি পদে, কারুকে কিছু দায়িত্ব প্রদান করেন। সেই দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম হলে, মাতা তাঁকে সেই দায়িত্ব পালনের জন্য সহযোগও প্রদান করেন। কিন্তু যখন তাও ব্যর্থ হয়, তখন মাতা এক ভিন্ন লীলা করে, তাঁকে দাওয়া সমস্ত দায়িত্বভার ফিরিয়ে নেন নিজের কাছে”।
“তিনি মৃষুকে দিয়ে প্রথমে শ্বেতা ও শ্রীকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনলেন। অতঃপরে, হীরাকে মাধ্যম করে, কয়লার মধ্যে লালসা উৎপন্ন করে, তাকে এমন শক্তিশালী করে দিলেন যে, আপনি বাধ্য হলেন ত্রিমূর্তি থেকে একমূর্তি হয়ে উঠতে। আর সেই একমূর্তিকে তিনি প্ররোচনা প্রদান করলেন যাতে সে কয়লাকে হত্যা করতে গিয়ে হীরারও নাশ করতে উদ্যোগী হন আপনি। তাই করলেন আপনি, কারণ সত্য বলতে, সমস্ত কিছুই নিয়তির দাস, আপনি স্বয়ংও”।
“কেবল কথা এই যে, তিনি মাতা অধিক, ঈশ্বর কম। তাই তিনি নিয়তি হয়েও দাস নির্মাণ করতে অপছন্দ করেন। কিন্তু প্রয়োজনে তিনি নিয়তিবেশ অবশ্যই ধারণ করেন। আর সর্বাম্বা বেশে স্থাপিত হবার পূর্ব থেকেই তিনি নিয়তি বেশে ক্রিয়া করা শুরু করে দিয়েছিলেন। সত্য বলতে, যেই মুহূর্ত থেকে মৃষু নিজের স্বরূপকে সম্যক ভাবে জেনে নেন, সেই মুহূর্ত থেকে তিনি নিয়তিক্রিয়া শুরু করে দেন। বোধহয় সেই ক্ষণেরই অপেক্ষা করছিলেন মাতা”।
“আর নিয়তি বেশ ধারণ করে, আপনাকে বশ করে, আপনাকে বাধ্য করেন ত্রিমূর্তি থেকে একমূর্তি হতে, আর আরো বাধ্য করেন যাতে আপনি হীরাকে হত্যা করতে যান, আর তিনি আপনাকে ভক্ষণ করে নেন। সেই ভক্ষণও একটি লীলাই ছিলো তাঁর। কারণ সেই ভক্ষণের কারণে, তিনি আপনাকে পুনরায় ত্রিমূর্তিতে পরিবর্তিত হওয়া থেকে পূর্ণ ভাবে রোধ করে দেন। আর তার ফল!”
“প্রভু, যেই স্থান কাল ও পাত্রের নিয়ন্ত্রণ তিনি আপনাকে সঁপেছিলেন, আর সেই দায়িত্বের জন্য আপনাকে তৃতীয় নেত্র প্রদান করেছিলেন, সেই দায়িত্ব তিনি পরমাত্মকে দেন নি, বরং ত্রিমূর্তিকে দিয়েছিলেন। তাই যেকালে ত্রিমূর্তিই রইলনা, সেকালে আর স্থান, কাল ও পাত্রের উপর নিয়ন্ত্রণের বচনও অহেতুক হয়ে গেল, আর যেহেতু তা অকারণ হয়ে গেল, তাই তৃতীয়নেত্রও অহেতুকই হয়ে গেল। আর তাই প্রভু, আজ আপনার কাছে এই দুটিই নেই”।
পরমাত্ম এই কথা শুনে ইতস্তত করতে শুরু করে দিলেন। সেই দেখে দেবী ইচ্ছা বললেন, “প্রভু, আপনি বরাবর আমাদেরকে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। আপনি আমাদের গুরুত্ব প্রদান না করলে যে, আমরা এই চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনাকে কেউ গ্রহণই করতো না। আত্মের কারণেই সকলে তাঁদেরকে গ্রহণ করে, আর যারা আপনাকে পূজা করে, তারা আমাদেরকে অবিদ্যা, অলক্ষ্মী ও অপস্মার নামে অবিহিত করেন”।
“প্রভু, সেদিন যদি আপনি আমাদেরকে গ্রহণ না করতেন, তাহলে আমাদের তো মাতা পরিত্যাগই করেছিলেন, কারণ আমরা মুক্তিবিরোধী ও পরাধীনতা বিস্তার করি। সেদিন যখন আমাদের কাছে কিচ্ছু ছিলো না, তখন আপনি আমাদেরকে রক্ষা করেছিলেন। তাই আজ যখন আপনার কাছে কিচ্ছু নেই, তখন আমাদেরও কর্তব্য যে আপনাকে সংরক্ষণ প্রদান করা। তাই প্রভু, আপনি আমাদের সাথে চলুন। … আমরা থাকতে, আপনার নিকট কেবল মাতা আর মৃষুই পৌছতে পারবে। বাকি কারুর সামর্থ্য নেই যে আমাদেরকে অতিক্রম করে। না কনো সাধের, না কনো নিসাধের আর না কনো ভূতের। তাই আপনি আমাদের কাছে পূর্ণ ভাবে সুরক্ষিত থাকবেন”।
কল্পনা বললেন, “প্রভু, আমাদের কাছে থাকলে, যেহেতু আমাদের কাছে ত্রিভুবনের উপর দৃষ্টি রাখার অধিকার আছে, সেহেতু আপনিও আমাদের নিকটে থেকে সমস্ত ত্রিভুবনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হতে পারবেন। … ইচ্ছাধারীর মৃত্যুর সময় হয়ে এসেছে। তাই সে স্বয়ং নিজের মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে নিরন্তর। আমাদের বা আপনার কনো কিচ্ছু করার নেই এখানে। তাই আমরা ত্রিভুবন দৃশ্যপটের সামনে বসে, চলচ্চিত্র দেখার মত করে, চলুন একত্রে মাতার লীলা দেখি”।
নিরুপায় পরমাত্ম বাধ্য হলেন চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার সাথে তাঁদের ভবনে যেতে। সেই ভব্য ভবনে গমন করলে, পরম রাজকীয়তার সাথে বরণ করে নেন ত্রিছায়া, আর সকলে মিলে দৃশ্যপটের সম্মুখে উপবেশন করে দৃষ্টি রাখলেন মাতা সর্বাম্বার লীলার দিকে।
তবে সেই দিকের কথাতে যখন তাঁরা দেখলেন, দণ্ডশুণ্ড ইচ্ছাধারীর কাছে যাত্রা করছেন, তখন প্রশ্ন করলেন ত্রিব্রহ্মমল অর্থাৎ চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা তাঁদের প্রভু পরমাত্মকে, “আচ্ছা প্রভু, আমাদের মনে একটি প্রশ্ন বহু বহু বৎসর ধরে রয়েছে, কিন্তু আপনাকে এই প্রশ্ন করার অবসর পাইনি, তাই প্রশ্ন করাও হয়নি”।
পরমাত্ম ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “কি প্রশ্ন?”
দেবী কল্পনা বললেন, “প্রভু, অপরাধ মার্জনা করবেন, তবে আমরা একটি জিনিস কিছুতেই বুঝতে পাইনা। যেখানে মৃষু আপনারই পুত্র, সেখানে মৃষুর কাছে গিয়ে আপনি তাঁর পিতা হবার অঙ্গিকার করতেন, তাহলে তো মৃষু আপনার শত্রুই হতো না, আর এই ভয়ানক সংকট কালও রচিত হতো না। তা আপনি মৃষুর কাছে গিয়ে পিতৃত্বের অঙ্গিকার না করে, তাঁর সাথে শত্রুতার সূত্রপাত কেন করলেন?”
পরমাত্ম একটি হুংকার ছেড়ে বললেন, “মৃষু! আমার পুত্র! … সত্য জানো না তোমরা। আর তাই এমন কথা বলছো তোমরা। তোমরা তো মৃষুর সূক্ষ্ম দেহকে জন্ম নিতে দেখেছ, আর তা দেখে ভাবছো যে, সে আমার পুত্র। হ্যাঁ, তার সূক্ষ্ম দেহকে জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে, আমাকে যোগদান দিতে হয়েছে, আর তা আমি অজ্ঞাতেই দিয়েছি। যদি ঘনাক্ষরেও আমি জানতাম যে, আমার সাথে অম্বা বিবাহই করেছে মৃষুকে সূক্ষ্ম দেহ দেবার জন্য, তাহলে আমি তাঁকে কিছুতেই বিবাহ করতাম না”।
দেবী চিন্তা বললেন, “কিন্তু আপনি তো সৃষ্টির রচনার আগে থেকেই, দেবীর প্রতি কামনাকৃষ্ট ছিলেন। সৃষ্টির রচনাও হয়নি, তখন থেকেই আপনি দেবীর সাথে সঙ্গম চিন্তায় অস্থির থাকতেন। আর যতটা আমরা জানি, সেই সুত্রে সত্য এই যে, মেধার উপর আপনি যেই আঘাত এনেছিলেন সৃষ্টির শুরুতে, তা তো দেবী ব্রহ্মময়ীকে নিঃসন্তান করে দেবার জন্যই, কারণ আপনার বিশ্বাস ছিলো যে, দেবী নিঃসন্তান হলে, তবেই আপনকে বিবাহ করবেন, আর তবেই আপনি দেবীর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে তাঁকে সম্ভোগ করতে পারবেন!”
পরমাত্ম গম্ভীর হয়ে বললেন, “আমি একবারও বলছি না যে, তোমরা ভুল কথা বলছো। আমি কেবল এই বলছি যে, তোমরা অর্ধ সত্য জানো, আর তাই অর্ধ সত্যই বলছো। হ্যাঁ, আমি দেবীর সাথে সম্ভোগের জন্য লালায়িত ছিলাম, আর আমার এই লালায়িত ভাবই কারণ আমার কারণ বেশে থেকে সূক্ষ্ম বেশে উপস্থিত হবার। হ্যাঁ এটিও ঠিক যে, আমি দেবীর সন্তান, অর্থাৎ মেধার নাশ করতে সচেষ্ট হয়েছিলাম দেবীকে নিঃসন্তান করে দেবার জন্য, এবং তাঁকে আমার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত করার জন্য। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর অন্তরালে, আরো আরো অনেক কথা আছে, যার ব্যপারে কেউ কখনো বলেনা, কারণ সেই কথা কেউ জানেনা। তোমরাও জানো না, কারণ তোমাদের তখন রচনাও হয়নি”।
দেবী চিন্তা বললেন, “তাহলে আমাদেরকে সেই কথা বলুন। আমরা সত্যই হতবাক হয়ে যাই পিতাপুত্রের এই বৈরী দেখে। আপনি মৃষুর সূক্ষ্ম দেহকে ৭ টুকরে খণ্ড করে দিলেন, আর তার প্রতিকার নিতে মৃষু আপনার চিরশত্রু হয়ে গেল”।
পরমাত্ম বললেন, “ভুল জানো তোমরা। মৃষু নিজের সপ্ত খণ্ডে বিভাজনের প্রতিকার নেবার জন্য আমার সাথে শত্রুতাতে লিপ্ত হয়নি। সে আমার সাথে শত্রুতাতে লিপ্ত হয়েছে, কারণ আমি মৃষুর প্রেমে আঘাত করেছি। আর আমি মৃষুকে বা ব্রহ্মময়ীর গর্ভ বা মেধাকে আঘাত করেছিলাম, অবশ্যই দেবীকে সঙ্গমের জন্য লাভ করার জন্য, কিন্তু তা ছাড়াও আরো অন্য কারণ ছিলো, যেই সম্বন্ধে তোমরা কিচ্ছু জানো না”।
দেবী ইচ্ছা বললেন , “তাহলে আমাদের সেই অজানার কথা বলুন। আমরা সত্যই জানতে চাই, এই সমস্ত কিছুর পিছনের কারণ কি? কি থেকে সমস্ত কিছু কারণ থেকে সূক্ষ্মে উপবেশন করলো। আপনিই বা কেন কারণ থেকে সূক্ষ্ম হলেন, দেবীই বা কেন হলেন। আপনাদের এই কারণ থেকে সূক্ষ্মে অবস্থান করার পিছনে মৃষুর হাত নিশ্চয়ই নেই! আদি তো কেবল আপনি ও দেবীই, মৃষু তো নাবালক আপনাদের কাছে”।
পরমাত্ম হতাশার হাসি হেসে বললেন, “আবার ভুল জানো তোমরা। হ্যাঁ, ভুল জানার কারণ আমিই, কারণ আমিই এই কথা কারুকে বলিনি। মৃষু আমার থেকেও আদি। আর সত্য বলতে, দেবীর বা আমার উভয়েরই কারণ থেকে সূক্ষ্মে স্থিত হবার পিছনে যে কারণ, সে হলো মৃষু”।
ত্রিব্রহ্মমল এবার একত্রে হতচকিত হয়ে গিয়ে বললেন, “কি বলছেন এইসব প্রভু? হয় আপনি বলে দিন যে, আপনি এই সমস্ত কিছু অসত্য বলছেন, নয় আমাদের সম্পূর্ণ সত্য দয়া করে বলুন”।
পরমাত্ম গম্ভীর ভাবে বললেন, “মৃষু কি বলে! ব্রহ্মময়ী কারণ থেকে সূক্ষ্ম রূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন কেন? একাকীত্বের জন্য!” অট্টহাসি দিয়ে আবার বললেন, “মৃষুর প্রেম তাঁকে বাধ্য করে সূক্ষ্ম বেশে আসার জন্য। মৃষুর প্রেমে উন্মত্ত হয়ে ওঠে দেবী। মৃষু! কি বলছিলে, আমার পুত্র সে!” পুনরায় অট্টহাসি দিয়ে বললেন, “বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যের উৎস হলো মৃষু, আর মৃষুর এই তিন অসামান্য সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে যান দেবী”।
দেবী কল্পনা বললেন, “কিন্তু দেবীই যে আদি। তাহলে দেবীর কালে মৃষু এলো কেমন করে?”
পরমাত্ম অতিকায় গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, “বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য ব্রহ্মেরই তিন শ্রেষ্ঠ গুণ। আর সেই গুণ সমূহকে স্বয়ং ব্রহ্মই দর্শন করে, অব্যাক্ততা ত্যাগ করে ব্যক্ত ব্রহ্মময়ী হয়ে ওঠেন তিনি, এবং এই তিনগুণের প্রতি তীব্র প্রেম জন্ম নিলে, তাঁর প্রেমই এই তিনগুণকে একত্রিত করে মৃষুকে প্রকাশ করে। আর এই দুই কারণ আকৃতি স্থাপিত হতে গেলে, ব্রহ্মের মধ্যে আমিত্ব আসা আবশ্যক ছিলো, কারণ একমাত্র আমিত্ব থাকলেই প্রেম অনুভূত হয়। হতবাক হয়ে যাচ্ছ! প্রেম কি?”
“প্রেম হলো এক অনন্ত বিরহ জ্বালা। যার প্রতি এই ভাব জন্ম নেয় যে, কেন তার থেকে আমি আলাদা, কেন আমি তার থেকে পৃথক, তাই হলো প্রেম। আর এই বাক্যের মধ্যেই খেয়াল করো ‘আমি’ রয়েছে। কেন ‘আমি’ পৃথক। আর এই ‘আমি’টাই হলাম এই আমি, অর্থাৎ পরমাত্ম। এর অর্থ এই যে, যাকে দেখে, যার প্রেমে পরে ব্রহ্ম ব্রহ্মময়ী হলেন, আর ব্রহ্মময়ী হলেন বলে আমার অর্থাৎ পরমাত্মের জন্ম হয়, সে হলো মৃষু। তাই বুঝতে পারছো। সত্য ভাবে বলতে গেলে, মৃষু ব্রহ্মময়ীর থেকেও আদি, কারণ মৃষুর প্রতি প্রেম উৎপন্ন হতে, এবং মৃষুর সাথে মিলনের প্রগলতার কারণেই ব্রহ্মময়ী প্রকাশ্যে আসেন”।
“অসামান্য রূপ, অদ্ভুত দিব্যতা, অসম্ভব সৌন্দর্য দেবীর। আর তা দেখা মাত্রই আমি কামনায় অস্থির হয়ে উঠি। প্রবল ভাবে আমার মধ্যে সঙ্গম ব্যকুলতা জন্ম নেয়। আর সেই ব্যাকুলতার কারণেই আমি তাঁর উদ্দেশ্যে যাই। আর যখন উপস্থিত হই তাঁর কাছে, তখন দেখি দেবী অন্তঃসত্ত্বা। আজ আমি বুঝলেও, সেদিন বুঝিনি। সঙ্গম সুখই আমার কাছে সেদিন মিলন ছিলো। আর সঙ্গম থেকেই স্ত্রী গর্ভবতী হন। আমার কাছে সঙ্গমই প্রেম বিরহের অন্ত। আর তাই, আমি ধরে নিই যে, নিশ্চিত ভাবে মৃষুর সাথে দেবীর সঙ্গম হয়েছে, নাহলে দেবী অন্তঃসত্ত্বা হলেন কি করে!”
“সে তো কোটি কোটি বৎসর আগের কথা। আমি তো এই সবে, মৃষু স্থূলে পূর্ণ আকৃতি নেবার পর, তার ও দেবীর মিলন দেখে অনুভব করলাম যে, পবিত্রতম মিলন মা ও সন্তানের হয়। তার আগে পর্যন্ত আমি মানতাম যে সঙ্গমই প্রেম জ্বালার নিষ্পত্তি। মিলন যে সঙ্গমের থেকেও এতো অধিক প্রভাবশালী, এতো অধিক শক্তিশালী, এবং সঙ্গমের থেকেও অধিক নৈকট্য যে সম্ভব, এই বোধ তো সবে মৃষু পূর্ণ ভাবে স্থূলে আসার পরই আমার হলো। সেই কোটি কোটি বর্ষ পূর্বে, সৃষ্টির প্রাক্কালে, আমার যে এই সম্বন্ধে কনো ধারণাই ছিলো না”।
“মৃষুর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছেন দেবী, আর তার কারণে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন তিনি, এই ভ্রম নিয়েই আমি তাঁর গর্ভে আক্রমণ করি, তাঁকে গর্ভপাত করাতে চাই, কারণ একমাত্র তাঁর গর্ভপাত হলে, তবেই আমি তাঁর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে তাঁর অপরিসীম রূপকে সম্ভোগ করার সুযোগ পাবো, এই ছিলো আমার ভাব। … ব্রহ্মময়ী যে স্বয়ং নিজেকে নিজে অন্তঃসত্ত্বা করে তুলতে পারেন, তা আমি ভাবতেও পারিনি। এতো সামর্থ্য যে সম্ভব, সেই ধারণাই তো আমার ছিলো না। যদি সামান্য ভাবেও তা বুঝতে পারতাম, তাহলে কি আমি দেবীর পাতা ফাঁদে পা দিতাম!”
দেবী ইচ্ছা ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “পাতা ফাঁদ! দেবী ফাঁদ পেতেছিলেন! কেন? কার জন্য?”
পরমাত্ম বিকৃত একটি হাস্য প্রদান করে বললেন, “আমার জন্য, বা আরো স্পষ্ট করে বলতে হলে, মৃষুর জন্য”।
দেবী চিন্তা হতচকিত ভাবে জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “মৃষুর জন্য! কিন্তু কেন?”
পরমাত্ম বিকৃত ওষ্ঠে মাথা নেড়ে একটি জোরে শ্বাস ত্যাগ করে বললেন, “নিজের প্রেমকে লাভ করার ফাঁদ। মৃষুকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য আমাকে ব্যবহার করে গেছেন ব্রহ্মময়ী সর্বদা। সে জানে আমার স্বভাব কেমন। সে জানে আমি সঙ্গমের অভিলাষী, আর সঙ্গমের অভিলাষে আমি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। আর আমার স্বভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের উপর অত্যাচার করিয়ে গেছেন। আর তিনি যত অধিক নিপীড়িত হয়েছেন, ততই অধিক মৃষু আকৃষ্ট হয়ে গেছে তাঁর প্রতি। আর একবার যখন মৃষু তাঁর প্রতি প্রেমাক্রান্ত হয়ে মিলনে আবদ্ধ হয়ে তাঁর গর্ভে স্থান নেবার সংকল্প করে ফেলে, তখন থেকে ব্রহ্মময়ী এমন মমতার বিস্তার করে মৃষুর উপর যে, মৃষু তাঁর প্রেমে মুগ্ধ হয়ে গিয়ে আমার সাথে শত্রুতার সংকল্প নিয়ে নেয়”।
দেবী কল্পনা বললেন, “বুঝতে পারছি, আপনার ব্যর্থতার কথা। তাই অতি সংক্ষেপে বলে যেতে চাইছেন। কিন্তু এই সংক্ষিপ্তসারের অর্থ বুঝে পাচ্ছিনা প্রভু। তাই কৃপা করে বিস্তারে বলুন আমাদের সমস্ত কথা। কি কি করেছিলেন দেবী? মৃষু কি ভাবে প্রভাবিত হয়ে যায়? মৃষু প্রভাবিত হয়ে আপনার সাথে শত্রুতার সংকল্প কেন নেয়?”
পরমাত্ম একটু গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, “বেশ শোনো তাহলে। দেবী মৃষুর আকর্ষণ পাবার জন্য আমাকে কি ভাবে ব্যবহার করেছেন শোনো। তিনিও জানতেন যে, আমি তাঁর সাথে সঙ্গম অভিলাষী। তিনি ভালো করেই জানতেন যে, আমি তাঁকে দেখা মাত্রই তাঁকে সম্ভোগ করার জন্য ব্যকুল হয়ে উঠেছিলাম। সেই কারণেই তিনি অন্তঃসত্ত্বা রূপে সম্মুখে আসেন আমার। তিনি জানেন যে আমি প্রেম মানেই সঙ্গম আর সম্ভোগ বুঝি। তাই আমার সামনে অন্তঃসত্ত্বা বেশে নিজেকে দেখালে যে আমি মৃষুর সাথে তাঁর সম্ভোগক্রিয়া হয়েছে, এমন ভাববো, সেটা তিনি জেনেই আমার সামনে অন্তঃসত্ত্বা বেশে আসেন”।
“আমি ঠিক সেই ভাবেই প্রভাবিত হই, যেই ভাবে দেবী চেয়েছিলেন যে আমি প্রভাবিত হই। আর তাই তাঁর গর্ভকে আমি আক্রমণ করি। তিনি কিন্তু চাইলেই নিজের গর্ভকে রক্ষা করতে পারতেন। হ্যাঁ, তখন বুঝিনি, কিন্তু আজ তাঁর সামর্থ্য দেখে আমি বুঝে গেছি যে, আমাকে প্রতিরোধ করা তাঁর কাছে কনো ব্যাপারই না। … কিন্তু তিনি নিজের গর্ভের অন্তরে থাকা সুরক্ষিত মেধার সুরক্ষার কবচ ভেঙে তাকে নিজের গর্ভ থেকে মুক্ত করলেন”।
“এমন ভাবে আমাকে তিনি সমস্ত কিছু দেখালেন যেন তিনি আমাকে ভয় পেয়েছেন আর আমার থেকে সুরক্ষিত করতেই নিজের গর্ভ থেকে মেধাকে মুক্ত করছেন। আমিও তেমনই বুঝি আর তাই আক্রমণ করি মেধাকে। দেবী মেধাকে সুরক্ষিত করতে আকাশ বা মন তত্ত্বের বিস্তার করে আমার থেকে মেধাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চান। তারপরেও আমার আক্রমণ অব্যাহত থাকলে, তিনি ধরিত্রী ও শেষে অগ্নি ও বায়ু দ্বারা আমাকে প্রতিরোধ করেন। আমি এই সমস্ত কিছু ভেদ করি তোমাদের মানে ব্রহ্মমলদের সাহায্যে, আর তাতে মেধা সহস্র কোটি খণ্ডে বিভাজিত হয়ে গিয়ে মৃত্তিকার সাথে লেগে থেকে ধরিত্রীর রচনা করে”।
“কিন্তু এই কনো কিছুই সত্য নয়। এই সমস্ত কিছুই আমার মনের ভ্রম। না তো দেবী আমার থেকে মেধাকে সুরক্ষিত করতে আকাশের জন্ম দেন, আর না কনো ভূতের। তিনি তো এই সমস্ত কিছু উপাদান রূপে প্রদান করেন আমাকে যাতে আমি সূক্ষ্ম থেকে স্থূলের নির্মাণ করি। কেন? কারণ যদি আমি স্থুলের নির্মাণ করি, তার মানে আমি নিশ্চিত ভাবেই সমস্ত মেধাদের উপর আধিপত্য স্থাপন করে, নিজেকে ভগবান করে স্থাপিত করতে চেষ্টা করবো। আর এর অর্থ এই হবে যে, দেবীর মাতৃত্বে আঘাত আনার অপরাধী আমি হবো। দেবীকে অসাধারণ বেদনা প্রদান করার কারিগর আমি হবো”।
“আর সেই বেদনা দেখে, মৃষু নিশ্চিতই দেবীর কাছে দেবীর সহায়তায় আসবে, আর একবার নিকটে আসলে দেবী তাঁকে নিজের মমতা দিয়ে নিজের প্রেমিক করে নেবেন। কিন্তু এতো কথা তো আমি তখন বুঝিনি। আমি আমার প্রবৃত্তি অনুসারেই, তোমাদের সাহায্য নিয়ে মেধাদের অধীনে রাখা শুরু করি, আর নিজেকে ভগবান রূপে স্থাপন করার সমস্ত প্রয়াস করি”।
“আজ একটি জিনিস আমি স্পষ্ট বুঝে গেছি। দেবীর অঙ্গুলিহেলন ব্যতীত কারুর এক চুল নড়ার জোর নেই। আমি তাই তাই করে গেছি, যা দেবী নির্দেশনা দিয়ে গেছেন আমাকে। কিন্তু আমি কখনোই তা বুঝতে পারিনি, কারণ দেবীর যেই নির্দেশনা ছিল, তা ছিলো আমার চরিত্রের, আমার প্রবৃত্তির অনুকূলে। তাই আমি সমানে ভেবে গেছি যে, আমি করছি, আমি কর্তা। কিন্তু আসল কর্তা কে? এক দেবী”।
দেবী কল্পনা মাথা নেড়ে বললেন, “এর অর্থ মৃষু একদম সঠিক বলে যে, এক মা’ই কর্তা, বাকি সকলে অকর্তা। তাই অকর্তাকে কর্তা জ্ঞান না করে, কৃতান্ত হওয়া আবশ্যক। কৃতান্ত ধারণ করে কৃতান্তিক হয়ে ওঠাই প্রকৃত অর্থে মুক্তি!”
পরমাত্ম বললেন, “হ্যাঁ, একদমই সঠিক কথা বলে মৃষু। কিন্তু কথা এই যে, মৃষুর পক্ষে এই কথাকে জীবনে রূপান্তর করে নেওয়া অতি সহজ। যেই তিন উপাদান দ্বারা সে নির্মিত, অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য, তা দিয়ে তো অনায়াসেই কৃতান্ত হয়ে ওঠা সম্ভব। উপাদান আমারও তিনটিই। আমিও সত্ত্ব অর্থাৎ অন্ধবিশ্বাস, রজ অর্থাৎ আত্মসুখচিন্তা এবং তম অর্থাৎ আত্মসুখে আসক্তি দিয়েই নির্মিত। কিন্তু তার উপাদান তাকে অকর্তা হয়ে উঠতে সাহায্য করে, আর আমার উপাদান আমাকে কর্তা সাজতেই সাহায্য করে”।
“তাই তো আমি কর্তাই সাজলাম। কিন্তু আমি কি আর জানতাম যে, আমি কেবলই কর্তা সাজছি! আমি তো ভাবতাম আমিই কর্তা। আমি তো জানতামই না, বুঝতামই না যে আসল কর্তা ব্রহ্মময়ী স্বয়ং। কিন্তু যখন তা বুঝলাম, ততক্ষণে যে আমি বহু কীর্তি করে ফেলেছি! … মেধাদের উপর প্রভুত্ব স্থাপন করতে উলোমালা হয়ে উঠে, আমি সর্বদা তাঁদেরকে বিচার থেকে দূরে রাখতাম। বিচার মানেই আমার কাছে মৃষু। আর মৃষু মানেই আমার কাছে যে দেবীর প্রেম, অর্থাৎ আমার সম্ভোগের বাঁধা”।
“বিচার করতে না দেওয়াতে, দেবীকে আমি দেখলাম উৎসাহী হতে স্থুলে আগমনের জন্য। আমিও লালায়িত হলাম, কারণ দেবী স্থূলে আসার অর্থ, আমি প্রকৃত অর্থে সম্ভোগের সুযোগ পেতে চলেছি। চারিপাশ দিয়ে দেবীকে ঘিরে রেখে আমি দেবীকে আমার কাছেই অম্বিকা হয়ে আসতে বাধ্য করলাম। আমি তাঁকে আমার সাথে বিবাহ করতেও বাধ্য করলাম। আর এই সমস্ত কিছু আমাকে ভাবিয়ে তুলল যে, মৃষুকে পরাস্ত করে দিয়েছি আমি, কারণ দেবী এখন আমার বিবাহিত স্ত্রী অর্থাৎ আমার সম্ভোগের পাত্রী”।
“বিবাহ তো করলাম দেবীকে, কিন্তু সম্ভোগ তো দূর, স্পর্শও করতে পারলাম না তাঁকে। বশ করতে চেষ্টা করলাম দেবীকে। আর সেই বশ করার প্রয়াসে জল ঢেলে দিলেন স্বয়ং দেবীই। তিনি নিজের স্থূল দেহ ত্যাগ করে দিলেন। আর নেপথ্যে বলে গেলেন যে, তিনি আবারও ফিরবেন, আর এবার তাঁকে বশ করতে চাওয়ার অপরাধে দণ্ড দিতে ফিরবেন তিনি। বলে গেলেন, তিনি আবারও ফিরবেন, আর এবার তিনি তাঁর সন্তান মেধাকে অসংখ্য খণ্ডে বিভাজন করে দেবার দণ্ড দিতে ফিরবেন”।
“একদিকে সম্ভোগের বাসনা, অন্যদিকে বিবাহ করেও সম্ভোগ না করতে পারার বেদনা, আর তারপরে দেবীর এই সতর্ক বার্তা। সমস্ত কিছু নিয়ে আমি ভীত হয়ে গেলাম। আর ভীত হয়ে আমি তোমাদের সাথে হাত মিলিয়ে, আমার ত্রিগুণ আর তোমাদের সঙ্গম থেকে নির্মাণ করলাম সমস্ত আবেগ। নাম দিলাম তাদের সাধ, কারণ আবেগের কারণেই সাধ জন্ম নেয়, আর আবেগের কারণেই সাধ পুড়ন করার স্বপ্নও জন্ম নেয়। সাধরা নিসাধদের সাথে শত্রুতা করে ফেলল। স্বভাবিকও তা। কারণ নিসাধরা সাধদের স্বভাবের সম্পূর্ণ ভাবে বিপরীত”।
“কিন্তু এতোকালে এতো যোনির দেহ নির্মাণ করতে করতে, চার ভূতই আমার অনুচর হয়ে উঠেছিল, আর আমার অনুচর হয়েই উঠতেই তারা আমার থেকে অহংকার ধারণ করে আকাশ থেকে চন্দ্র হয়ে ওঠে, বায়ু থেকে সর্পরাজ হয়ে ওঠে, অগ্নি থেকে প্রচণ্ড ষণ্ড হয়ে ওঠে আর মৃত্তিকা থেকে হলাহল হয়ে ওঠে, আর সকলে আমার সাথে যুক্ত হয়ে যায়। তাই আমি নিসাধ আর সাধদের মাঝে এসে দাঁড়াই”।
“কিন্তু এই সমস্ত কিছুকে অন্তরাল থেকে যে দেখছিল, সে হলো মৃষু। সে সমানে আমার উপর নজর রেখে যাচ্ছিল। আমার হাতে মেধার খণ্ডন হলো, আর দেবী সন্তান হারিয়ে বেদনাগ্রস্ত হলেন, সেটাও যেমন সে দেখে, তেমনই দেবীর প্রতি সম্ভোগ ইচ্ছা রেখে, আমি যে তাঁকে বিবাহ করলাম, আর সম্ভোগ করতে না পারায়, তাঁকে বশ করতে না পারায়, দেবী যে সম্ভোগের থেকে বাঁচতে, বশ হওয়া থেকে বাঁচতে দেহত্যাগ করলেন, সমস্তই সে দেখেছে। আর সাথে সাথে এও দেখেছে সে যে, দেবীর পুনরায় আবির্ভাবে, আমি তাঁকে বশ করতে না পারলেও, তাঁর বশ হওয়া থেকে বাঁচার জন্য সাধদের নির্মাণ করেছি”।
“আর এতো কিছু দেখে দেখে, দেবীর বেদনায় সে বিগলিত হয়ে গিয়ে, দেবীর প্রেমে সারা দিয়ে দেয় মৃষু। কিন্তু মিলন কি, সেই সম্বন্ধে তো আমি সম্পূর্ণ সন্দিহান ছিলাম! … তাই দেবী অম্বিকা দেহ ত্যাগ করে সূক্ষ্ম বেশে যখন অম্বা হলেন, মৃষুর সাথে তাঁর যাতে সঙ্গম না হয়, সেই উদ্দেশ্যে আমি আবারও বিবাহ করি দেবীকে, পূর্বের সমস্ত ভয় ও আশঙ্কা ত্যাগ করে। … কিন্তু দেবীর কাছে, মৃষুর কাছে প্রেম আর মিলন মানে যে মা-সন্তানের গহন সম্পর্ক, তা আমি ভাবতেও পারিনি। আমার ধারণার অতীত ছিল তাঁদের এই প্রেম”।
“মৃষু দেবীর প্রেমে এবার গদগদ হয়ে গেলে, দেবীর গর্ভে আসার নিশ্চয় করে নেয়। কিন্তু দেবীর সংকল্প যে আরো ভিন্ন ছিলো। কেবলই যে মৃষু দেবীর প্রেমে সারা দিয়েছেন, তাতে তাঁর শান্তি ছিলো না। তিনি তো চাইছিলেন যে তিনি যেমন মৃষুকে প্রেম করেন, মৃষুও যেন ততটাই প্রেম করেন তাঁকে। আর তাই, তিনি মৃষুকে আমার সাথে জুরে দিলেন। সঙ্গম আমি অম্বাকেও করতে পারলাম না। কিন্তু সম্ভোগ করতে না পারলেও, অতিকায় সম্ভোগের বাসনা আমাকে বারবার ছয়বার কামান্ধ করে দেয়, আর সেই প্রতি ছয়বার থেকে আমার ঔরসকে সংগ্রহ করে, মৃষুকে দেবী স্থূল শরীর প্রদান করে”।
“মৃষুকে সন্তান বেশে দেখে, আমার নিজের উপর আর কনো নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। আমি মৃষুকে হত্যা করা ছাড়া আর কনো কিছুই ভাবতে পারিনা। কিন্তু আমি যে তেমন ভাববো, তা যেন দেবী আগে থেকেই জানতেন। আর তাই দেবী আগে থেকেই নিজের থেকে কৃত্তিকা আর পাবনির নির্মাণ করে রেখেছিলেন, আর সেই অস্ত্রেই তিনি আরো তিন খণ্ডে বিভাজিত হন, যেই অস্ত্র দ্বারা আমি মৃষুকে সাত খণ্ডে বিভাজিত করি সাধপাল দ্বারা”।
“মৃষু তখনও আমার সাথে যুদ্ধ করতে চাইনি, আমাকে দেবীর প্রতি সম্ভোগদৃষ্টি রাখার দণ্ড দিতে চায়নি, আমাকে মেধার খণ্ডন করার জন্য দণ্ড দিতে চায়নি। আর আমি তো নিশ্চিত ছিলাম যে সাত খণ্ডে মৃষু খণ্ডিত হয়ে গেছে মানে, মৃষুর নাশ হয়ে গেছে। কিন্তু দেবীর সমস্ত পাঁচখণ্ড মিলে মৃষুর সাত টুকরোকে তিলে তিলে গড়ে তুলতে থাকে আর মৃষুকে নিজের অপার প্রেম সম্ভার উপহার দিতে থাকেন। যখন আমি আবিষ্কার করি যে, মৃষুর বিনাশ হয়নি, তখন আমি ভীত হয়ে যাই”।
“প্রথম, মৃষুর বিনাশ হয়নি বলে আমি ভীত হই, আর অতঃপরে এই কারণে ভীত হই যে, মৃষু তার মায়ের প্রেমে এতটাই মশগুল হয়ে গেছে যে, যদি সে একবার জানতে পারে যে, আমি তার মাকেও ৩ খণ্ডে বিভাজিত করে দিয়েছি, তাহলে সে আমার সাথে যুদ্ধে জরাবেই। এই ব্যাপারে নিশ্চিত থেকে, আমি সার্বিক ভাবে প্রয়াস করি যাতে মৃষুর একটি কলাও পূর্ণ না হতে পারে। আর কি করবো বুঝতেও পারিনি। দেবীকে যে আমি তিন খণ্ডে বিভাজিত করতে চাইনি। কিন্তু দেবী স্বয়ং চেয়েছিলেন তা। তিনি এই অন্তিমসম্ভাব্য বেদনাকে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, যা মৃষুকে তাঁর প্রেমের প্রতি বিভোর করে দেবে”।
“তাঁর সন্তানের খণ্ডন হয়েছে, তাঁর প্রতি সম্ভোগের দৃষ্টি রাখা হয়েছে, তাঁর আরেক সন্তানকেও সাত টুকরে বিভাজিত করা হয়েছে, যদি এতেও মৃষু বিভোর না হয় দেবীর প্রেমে, স্বয়ং দেবীকেই তিন খণ্ডে বিভাজিত করা হয়েছে, এটা জেনে তো নিশ্চিত ভাবেই মৃষু মায়ের প্রেমে বিভোর হয়ে, আমার সাথে সংঘাতে জরাবে। এই ভেবে, স্বয়ং আমি ত্রিগুণ বেশে, আর চারভূতকে, অর্থাৎ চন্দ্র, নাগরাজ, ষণ্ড এবং হলাহলকে নিয়ে আমরা প্রতিবার মৃষুর কলা বিস্তারকে আটকাতে যাই”।
“বিপত্তি আরম্ভ হলো মৃষুর তৃতীয় কলা প্রকাশের সময় থেকে। আমার চার ভূত মৃষুর পক্ষে থেকে, মৃষুকে বিভ্রান্ত করে দেবে, এমন স্থির করে। কিন্তু মৃষুর চরিত্রের প্রতি তারা অত্যন্ত কাতর হয়ে যায়, আর তারা মৃষুর নিজের নিজের দেখা চরিত্রকে নিজেদের অন্তরে রেখে, সেই দেহে, আমার সাথেই যুদ্ধ করে। আর তো আর, সেই হৃদয়ে অঙ্কিত চরিত্রই সপ্তম কলা প্রসারের কালে মৃষুর পুরানো সমস্ত স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়। আর যখন থেকে তা হয়, তখন থেকে মৃষু এই সমস্ত ভূতের অঙ্গ থেকে দেবীর অঙ্গের গন্ধ পাওয়া শুরু করে দেয়। পাওয়াটাও স্বাভাবিক কারণ দেবীর থেকেই তাঁদের জন্ম”।
“আর সেই ঘ্রাণ পাওয়া মাত্রেই, মৃষু দেবীর সন্ধান করতে গিয়ে, সম্যক সৃষ্টির তত্ত্বকে স্মৃতি রূপে স্থুল দেহে পেতে শুরু করে দেয়। আর যেমন যেমন তা পেতে থাকে, তেমন তেমন পথ অনুসরণ করে সে তার মায়ের খণ্ড হয়ে যাওয়াকে প্রত্যক্ষ করে নেয়। মেধার খণ্ডন সে মেনে নিয়েছিল, নিজের খণ্ডনও সে মেনে নিয়েছিল, বশীকরণও মেনে নিয়েছিল, তার মায়ের প্রতি সম্ভোগ দৃষ্টিও মেনে নিয়েছিল। কিন্তু তার মায়ের উপর আঘাতকে একবার মৃষু প্রত্যক্ষ করে নিতে, সে নিশ্চয় করে নেয় যে এবার সে আমার সাথে সংঘাতে উত্তীর্ণ হবে”।
“আমি ভীত হই, বিভিন্ন ভাবে মৃষুকে ভ্রমিত করার প্রয়াস করি, কিন্তু দেবী যে ত্রিখণ্ড হয়েই ছিলেন যাতে, মৃষুর কাছে নিজেকে নিপীড়িত দেখিয়ে মৃষুর হৃদয়ে যাতে স্থান করে নিতে পারেন। আর তাই করলেন। মৃষু অনন্তকাল ব্যাপী আমার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সংকল্প নিয়ে নেয়। অনন্তকাল ব্যাপী, সে দেবীর প্রতি পূর্ণ সমর্পিত হয়ে যায়। আগে যা দেখেছে দেখেছে, সপ্ত খণ্ড হবার পর থেকে, দেবী তার জন্য কি কি করেছে, কি ভাবে তাকে মমতার স্নিগ্ধতা দিয়েছেন, আর সমস্ত সময়ে মেধাংশদের কি ভাবে একই ভাবে মমতা প্রদান করতে থাকেন, তা তো তোমরাও জানো”।
“দেবীর এই অনন্ত মমতা বিলিয়ে বেড়ানো, সর্বক্ষণ সন্তানদের বুকে আগলে বসে থাকা, সর্বক্ষণ মাটিকামড়ে পরে থেকে নিজের সন্তানদের ফিরে পাবার আর্তনাদ করা, এই সমস্ত কিছু তো তোমরাও জানো, তোমরাও দেখেছো। … মৃষু এই সমস্ত কিছু শুধু দেখেই নি, সে তো দেবীর প্রেম। মেধাংশদেরকেও দেবী প্রেম করেন, কিন্তু সেই প্রেমকে তারা অদেখা করলে, দেবীর বেদনা হলেও, দেবী তাতে কনোরূপ প্রতিক্রিয়া দেন না। কিন্তু মৃষু দেবীর প্রেম। তিনি পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছিলেন যাতে তিনি তাঁর প্রেমকে, তাঁর মমতাকে, তাঁর মাতৃত্বকে, তাঁর স্নেহকে, তাঁর সমর্পণকে, আর তাঁর বেদনাকে মৃষু দেখতে পায়”।
দেবী কল্পনা বললেন, “এর অর্থ, এই যে দেবী এতাবৎকাল যা কিছু করেছেন, সমস্ত কিছুই মৃষুকে কাছে পাবার জন্য! সমস্ত কিছুই মৃষুর প্রেম পাবার জন্য!”
পরমাত্ম ক্রুদ্ধ আবেশ ধারণ করে বললেন, “তা নয়তো কি? দেবীর সামর্থ্যের পরিচয় এর আগে পেয়ছিলে তোমরা? আমার কাছে সূক্ষ্ম বেশে যখন দেবী অম্বিকা, তখন স্থূল বেশে তিনি মার্কণ্ড। তখন স্থিত হয়েই তিনি মার্কণ্ড পুরাণ রচনা করে দেবীর সেই রূপের কথা বলে গেছিলেন, যা তিনি আজ এই পাঁচ সহস্র বৎসর পরে ধারণ করছেন। কিন্তু কখনো ভেবেছিলে যে, মার্কণ্ড এই সমস্ত রূপ, আজকের এই দিনে দেবী ধারণ করবেন বলে লিখে গেছিলেন! … এর কি অর্থ?”
“এর অর্থ তো এই দাঁড়ায় যে, দেবী চাইলে সেই মুহূর্তেই প্রতিকার নিতে পারতেন যেই মুহূর্তে মেধাদের আমি খণ্ডিত করেছিলাম! এর অর্থ তো এই দাঁড়ায় যে, দেবী সেই মুহূর্তেই প্রতিকার নিতে পারতেন যখন আমি তাঁকে বশ করতে চেয়ছিলাম তাঁর অম্বিকা রূপে থাকা অবস্থায়! এর অর্থ তো এই দাঁড়ায় যে, দেবী সেই মুহূর্তেই আমার বিনাশ করতে পারতেন যেই ক্ষণে মৃষুকে সাত খণ্ডে বিভাজিত করা হয়!”
“কিন্তু দেবী করেন নি তা। কেন? এর তো একটিই কারণ পরে থাকে! মৃষুর কাছে নিজের প্রতি হওয়া নিপীড়ন, নিজের বেদনা, নিজের ক্ষতি, নিজের সন্তান হারানো, এমনকি নিজের তিন খণ্ডে বিভাজিত হয়ে যাওয়া দেখিয়ে তাঁর প্রেম লাভ করতে চেয়েছিলেন তিনি”।
দেবী চিন্তা বললেন, “বেশ বুঝলাম প্রভু। আসলে আমাদের রচনা হবার পূর্ব থেকেই যে দেবী মৃষুর প্রতি আকৃষ্ট, মৃষুর প্রেমে মশগুল, এই কথা আমরা কেউ জানতাম না। যদি সেই কথা জানতাম, তাহলে হয়তো বুঝে যেতে পারতাম এই সমস্ত কিছু, যা এখন আপনি আমাদের বললেন। তাহলে হয়তো আপনাকে আর কষ্ট করে এই সমস্ত কথা আমাদের বলতে হতো না। ব্যর্থ প্রেমের কথা কার আর বলতে ভালো লাগে!”
পরমাত্ম বললেন, “না, তাও বুঝতে পারতে না। ঠিক যেমন আমি সমস্ত কিছু জেনেও বুঝতে পারিনি।… কি করে বুঝতাম! আমার কাছে প্রেম মানে যে সম্ভোগ! আমার কাছে প্রেম মানে অধিকার লাভ করা। আমার কাছে প্রেম মানে তো সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে সুখ ভোগ করা। কিন্তু না দেবীর কাছে প্রেমের অর্থ তা, আর না মৃষুর কাছে প্রেমের অর্থ তা। এঁদের দুইজনের কাছেই প্রেমের অর্থ মিলন, আর মিলন বলতে মাতৃত্ব আর সন্তানভাবই এঁদের কাছে সমস্ত কিছু। দেখো না, এক কাল পর্যন্ত দেবী মৃষুকে সন্তানস্নেহে বুকে আগলে রেখে মৃষুকে নিজের অঙ্গের সেই সুবাস দিয়ে গেছেন, যা লাভ করার জন্য সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকাল জুরে আমি লালায়িত ছিলাম। আর আজ, মৃষু দেবীকে সন্তানপ্রেমে আগলে রেখেছে নিজের বক্ষে”।
“প্রেম যে এমন, এই ভাব যে প্রেম, তা তো আমি আজও, এই মুহূর্তেও মানতে পারছিনা! … শুধুই আদিকালের প্রেমিক ও প্রেমিকা, মৃষু ও দেবীকে এই সন্তানপ্রেমে প্রগলের মত তৃপ্ত থাকতে দেখে আমি অনুমান করেছি মাত্র যে, এঁদের কাছে প্রেম মানে এই সন্তানপ্রেম। … আমার কাছে তো আজও প্রেম মানে বশ করে রাখা! আজও আমার কাছে প্রেম মানে সুখভোগ করা, সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া, এবং প্রেমিকাকে আদ্যপ্রান্ত সম্ভোগ করা! … আর আমি জানি, তোমরা সকলে আমার থেকেই জ্ঞান অর্জন করেছ। আমি যা জানি, মানি, আর বুঝি, তাকেই তোমরা জ্ঞান বলো। তাই আমি নিশ্চিত, তোমরা যদি মৃষু ও দেবীর সম্পর্ককে প্রথম থেকে জানতে, তাও কিচ্ছু বুঝতে পারতে না”।
দেবী চিন্তা বললেন, “বেশ প্রভু। সমস্ত কিছু মেনে নিলাম। কিন্তু তাও আমার কাছে একটি সংশয় রয়ে গেল। মৃষুর সামর্থ্যও তো অপার। তার সাত কলা বিস্তারের কালে, যতবার আপনি তার সম্মুখে এসেছেন এবং যুদ্ধ করেছেন, প্রতিবার সে আপনাকে পরাজিত করেছে। রীতিমত আপনাকে পর্যুদস্ত করেছে, আর তাও প্রতিবার। … তাহলে সে এবারই বা দেবীকে আবাহন করলো কেন? আমরা তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে দেখেছি। দেখেছি কি ভাবে সে দেবীর অপেক্ষা করেছিলো, এবং দেবীকে আবাহন করে গেছে। কেন? এই আবাহন কেন?”
দেবী ইচ্ছা বললেন, “হ্যাঁ প্রভু, এই প্রশ্ন আমারও। মৃষু যে দেবীকে আবাহন করলেন, তা কি শুধু এই জন্য যে, নিপীড়ন তাঁর উপর হয়েছে, তাই প্রতিকারও তাঁর মাধ্যমেই নেওয়াতে চায় মৃষু? নাকি উদ্দেশ্য আরো ভিন্ন কিছু?”
পরমাত্ম বিরক্তি ধারণ করে বললেন, “এঁদের প্রেমলীলার মাথামুণ্ডু কিচ্ছু বুঝতে পারবেনা। আমিই বুঝতে পারিনা এঁদের প্রেমলীলাকে। মৃষু চাইলে অনায়সেই, আমার দমন করে, নিজেকে ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি রূপে ঘোষণা করতে পারতো। সেই সামর্থ্যও তার আছে, সেই প্রতিভাও তার আছে। আর আদি রূপ ধরতে গেলে, সে ব্রহ্মময়ীর থেকে কনো অংশে কম নয়। কিন্তু না! এঁদের প্রেমলীলাই এমন!”
“মৃষু সপ্ত খণ্ডে যতদিন বিভাজিত ছিল, এক রকম ছিলো। কিন্তু আজ যখন সে পূর্ণ হয়ে গেছে আবার, সে অতিকায় হয়ে গেছে। সে তার মায়ের মতই লীলাধর হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের ঘোষণা তো সে করলো, কিন্তু সেই ঘোষণা স্বয়ং সে প্রকাশ করলো না। সেই ঘোষণা প্রকাশ করার জন্য দেবীকে আবাহন করলো সে। আর এই আবাহন করে, সে নিশ্চয় করতে চাইছে যে, ব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বরী এক দেবীই থাকবেন। আর সে দেবীর প্রেম, দেবীর সন্তান হয়ে তাঁর ছায়ার মত থাকবে”।
“অন্যদিকে দেবীও মৃষুর ভাব বোঝেন। তাই তিনি কিছুতেই মা বেশে এলেন না, যতই মৃষু তাঁকে মা ছাড়া অন্য কিছু জ্ঞান না করুক। তিনি মৃষুর কন্যা হয়েই এলেন। অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বরী হবার জন্য মৃষুর আবাহন তিনি স্বীকার তো করলেন, কিন্তু নিশ্চয় করলেন মৃষুর কাছে যে, তিনি ব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর তখনই হবেন, যখন তাঁর প্রেম, অর্থাৎ মৃষু তাঁর সাথে অনন্তকাল একাত্ম হয়ে থাকবে। … অদ্ভুত এঁদের প্রেমলীলা! আমি বুঝিনা, এ কেমন প্রেম! কেউ নিজেকে অধিপতি করতেও সংযত হয়ে যায়! কেউ নিজেকে অধীশ্বরী বলতেই কি করে এমন কুণ্ঠিত হয়ে যায়! কিন্তু বাস্তব এটিই। মৃষু নিজের প্রেমের শর্তই এই রাখে যে, সে এই যুদ্ধে অনন্তকাল ভাগ নেবে, কিন্তু কখনোই এই যুদ্ধের রাজা হবেনা। সর্বদা সেনাপতি হয়েই থাকবে। আর দেবীও অঙ্গিকার করে রয়েছেন যে, তিনি এই যুদ্ধের রাজা হবেন, তবে তখনই রাজা হবেন, যখন মৃষু তাঁর সেনাপতি হয়ে থাকবে”।
পরমাত্মের থেকে এই গহন সৃষ্টির গোপন কথা জেনে, বেশ কিছুক্ষণ হতচকিত হয়েই রইলেন, অতঃপরে, সকলে দেখলেন, দণ্ডশুণ্ড ইচ্ছাধারীর কাছে গিয়ে বললেন, “হে ব্রহ্মপতি, আমরা একজনকে এই মাত্র দেখে বিস্মিত হয়ে আপনাকে সেই সংবাদ প্রদান করতে এসেছি। প্রভু, অত্যন্ত রূপবতী সেই স্ত্রী। না দেখলে বিশ্বাসই হবেনা তাঁর রূপের বাহার। হ্যাঁ, অত্যন্ত রূপবতী, তাই অহংকারীও সে। কিন্তু রূপ, আহা! গোলাপি অঙ্গের আভা, শুভ্রবর্ণা। মুখবদন যেন একটি গোলাপের পাপড়ির ন্যায়, আর ওষ্ঠ বর্ণ যেন রক্তজবার ন্যায়। নেত্র যেন বিস্ফারিত কদম্ব পুষ্পের পাপড়ির ন্যায়, আর তার থেকে পারিজাতের আভা বিকশিত হচ্ছে। নাসিকা যেন হেমশৃঙ্গ, আর কপোল যেন দুটি আম্রপত্র। ঠিক তেমনই মসৃণ, আর ঠিক তেমনই উজ্জ্বল”।
“দেহের গড়ন, হে জগৎপতি, বড়ই বিচিত্র। নারীত্বের সমস্ত লক্ষ্মণ এমনই স্পষ্ট যেন, তাঁকে দেখার পর মনে হবে যে আর কেউ দ্বিতীয় নারীই উপস্থিত নেই। নিতম্বু থেকে স্তনাকৃতি, নিদারুণ ও নিঃসঙ্কোচ। কটিদেশ ও উরুভাঁজ, মহারাজ, কি যে বলবো! জন্ম জন্মের সন্ন্যাসীকেও একদেখায় কাম-উন্মত্ত করে দিতে সক্ষম। কিন্তু বিচিত্র সেই দীর্ঘাঙ্গীর দেহগঠন, কারণ এতো কিছুর পরেও তাঁকে দেখে যেন মনে হবে, তিনি এক অপরিসীম সাহসী যোদ্ধা। গ্রীবা থেকে স্কন্ধ, বাহু থেকে করদ্বয়, মহারাজ যেমনি মনোরম ও কোমল, তেমনই শক্তিশালী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ”।
“মহারাজ, সেই দেবীর রূপ দর্শন করে, যার রূপের সম্মুখে সমস্ত নিসাধস্ত্রী ও গন্ধর্বনর্তকীও কুৎসিতরূপা মনে হবে, আমরা আর স্থির থাকতে পারিনি। আমাদের মনে হয়েছে, ইনি একটি স্থানেই বিরাজ করার যোগ্য, আর তা হলো আমাদের মহারাজের শয়নকক্ষে। তাই আমরা তাঁকে আপনার হয়ে বিবাহ প্রস্তাব প্রদান করেছি। … কিন্তু অহংকারী সেই রূপসী। সে বলে কি যে, যার প্রস্তাব আমরা তাঁকে দিচ্ছি, সে যেন স্বয়ং এসে তাঁকে এই প্রস্তাব দেন। তিনি স্বয়ং সেই প্রস্তাব দিলে, তবে তিনি বিচার করে দেখবেন, বিবাহ করবেন কিনা!”
“মহারাজ আমরা সেই অহংকারীর এই কথার উত্তর প্রদান করে আসতেই পারতাম। কিন্তু বিচার করে দেখলাম, তিনি আজ বাদে কাল আমাদের মহারানী হবেন। তাই, কিছু করার পূর্বে, মনে হলো, আপনার সাথে পরামর্শ করে নেওয়া অধিক আবশ্যক। তাই সেই স্ত্রীর বার্তা আর সংবাদ নিয়ে আপনার কাছে উপস্থিত হয়েছি”।
সেনাপতি মদমন্ত হুংকার ছেড়ে বললেন, “তোমরা বলেছিলে, তামদের মহারাজ কে?”
দণ্ড বললেন, “হে সেনাপতি, অবশ্যই বলেছি। তারপরেও এমন অহংকার প্রদর্শন করাতে আমরা বিস্মিত হয়ে গেছিলাম”।
মহাযোদ্ধা সুগ্রীব একটি খল হাস্য হেসে বললেন, “মহারাজ, এতো শুভসূচনা তাহলে। জগৎপতির স্ত্রী হবেন, তো জগৎপতির দুই সেনার কাছে মাথানত করবেন কেন? … আমার মতে, মহারাজ, আমাদের আপনার তরফ থেকে যথার্থ ভেট নিয়ে তাঁর সামেন উপস্থিত হয়ে, আপনার লিখিত পত্র পরিবেশন করা উচিত। স্বাভাবিক কথা না! জগৎপতির হবুপত্নী অন্যকারুকে সম্মান করবেনই বা কেন?”
মদমন্ত মাথা নেড়ে বললেন, “বেশ, সুগ্রীব যাক তাহলে মহারাজ। যদি দেবী ওর কথাতে রাজি হয়ে যায়, তো মিটেই গেল। কিন্তু যদি পুনরায় অহংকার প্রদর্শন করেন তিনি, তখন তাঁর কেশ আকর্ষণ করে টানতে টানতে আপনার সম্মুখে উপস্থিত করবো মহারাজ”।
ইচ্ছাধারী নিজের সেনা ও সেনাপতির তাঁর প্রতি বিশ্বাস আর নিষ্ঠা দেখে খুশিই হলেন। আর অন্যদিকে বহু ভেট সঙ্গে করে নিয়ে মহামন্ত্রী সুগ্রীব দেবীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। দক্ষিণা পাহাড়ের উপরি তলে যখন সুগ্রীব উপস্থিত হলেন সমস্ত ভেট নিয়ে, তখন দেবী বাশুরির ধুনে গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। ইচ্ছাধারীর পরিচারিকাদের পদশব্দে তাঁর ধ্যান ভঙ্গ হতে, তিনি সুগ্রীবের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। তারপর বললেন, “কি এই সব!”
সুগ্রীব বললেন, “আপনার বিবাহের উদ্দেশ্যে মহারাজের প্রদান করা কিছু ভেট। স্বীকার করুন দেবী এই সমস্ত কিছু। সমস্ত জগতের শ্রেষ্ঠ ধনরত্ন রয়েছে এতে। রয়েছে শ্রেষ্ঠ বস্ত্র, আর শ্রেষ্ঠ সাজসজ্জার সামগ্রী”।
দেবী বললেন, “ও, তো ওই দুই রোগাপটকা যেই রাজার কথা বলছিলো, জগৎপতি নাকি সে, তুমিই সে?”
সুগ্রীব সেই কথাতে লম্বা জিভ কেটে বললেন, “এ মা, না না, না না। আমি তো তাঁর মন্ত্রী মাত্র। মহারাজকে দেখলে তো আপনি কামনায় জর্জরিত হয়ে যেতেন। বিশাল বাহু তাঁর, বিশাল বপু, প্রকাণ্ড শক্তিশালী মুখে শোভা পায়, শক্তির প্রতীক গোঁফ। রাজকীয় পোশাক তাঁর, রাজকীয় রথ তাঁর। সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠ সমূহ পাথর তাঁর রথে শোভা পায়, তাঁর অঙ্গপোষাকে শোভা পায়। রাজবেশে তো তাঁর দিকে তাকানোও দায়। তাঁর সমস্ত দেহ থেকে সমস্ত ধনরত্নের এমনই চমক আসে যে, চোখই ধাধিয়ে যায়!”
দেবী বিরক্তিসুলভ মুখ করে, মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে একটি গভীর নিশ্বাস নিয়ে বললেন, “তাহলে কেন এসেছ এখানে? আমি তো ওই দুই রোগাপটকাকে বলেই দিয়েছিলাম, যে বিবাহ করতে চাইছে, সে স্বয়ং আসলে, আমি বিবাহ প্রস্তাব নিয়ে ভেবে দেখবো। … জগৎপতি হবার অহংকার হয়ে গেছে তাঁর! … তাই জন্যই কি মন্ত্রীকে পাঠিয়েছে! … ফিরে যাও আর বলে দাও তাঁকে, আমি তাঁর মন্ত্রী মণ্ডলে বেতনভুক্ত মন্ত্রীরূপ শ্রমিক হতে বিন্দুমাত্র প্রস্তুত নই। তাই তাঁর কি বৈভব আছে, সেই নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই। যদি সে নিজে এসে, নিজের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ করে, তাহলে ভেবে দেখবো”।
সুগ্রীব সেই কথার উত্তরে বলতে গেলেন, “দেবী, মহারাজ স্বয়ং কি করে আসবেন!”
কিন্তু দেবী সর্বাম্বা একটি কথাও শুনলেন না। তীব্র কণ্ঠস্বরে বললেন, “যদি না আসতে পারেন, তাহলে তো ভেবে দেখারও প্রশ্ন ওঠেনা। এই বিবাহ সম্ভবই নয় সেই ক্ষেত্রে”।
সুগ্রীব বুঝলেন, এই স্ত্রীর অহংকার অত্যন্ত অধিক। তবে এও মনে করলেন যে, এমন রূপবতীর ক্ষেত্রে অহংকার তাঁর অঙ্গভূষণ রূপে বেশ শোভা পাচ্ছে। জগৎপতির স্ত্রীরই তো এই অহংকার মানায়। … এমন বিচার করে প্রত্যাবর্তন করলেন, এবং মহারাজকে গিয়ে সমস্ত কিছু বললে, সেনাপতি মদমন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে বললেন, “এত দুঃসাহস! আমাদের রাজাকে অপমান করে! … আমি তাঁর কেশ আকর্ষণ করে তাঁকে এখানে নিয়ে এসে সমস্ত জগতকে দেখাতে চলেছি, স্ত্রীর স্থান পুরুষের শয়নকক্ষে। তার অধিক সে নিজের অধিকার দেখাতে চাইলে, তার কি হাল হয়”।
সুগ্রীব বললেন, “ক্রোধকে সম্বরণ করো সেনাপতি মদমন্ত। ভুলে যেও না যে, সমস্ত কিছু সঠিক সঠিক হলে, তিনি আমাদের মহারানী হবেন। আর যদি মহারানীর সাথে আমরা বিরূপ আচরণ করে থাকি, তাহলে আমরা কিন্তু দণ্ডের প্রার্থী হয়ে থেকে যাবো”।
মদমন্ত হুংকার ছেড়ে বললেন, “এখানে প্রশ্ন রানী হওয়া বা না হওয়াতে আর সীমিত নেই মহামন্ত্রী সুগ্রীব। এক স্ত্রী হয়ে প্রচণ্ড বলশালী পুরুষের বলের কথা জেনেও এইরূপ অহংকার দেখানোর অর্থ এই যে, সেই স্ত্রী পুরুষের বলকে অপমান করছে। তাই, প্রচণ্ড পুরুষকে নিজের বল প্রদর্শন করতেই হবে। … দেখিয়ে দিতে হবে যে, বলপ্রদর্শন স্ত্রীর জন্য শোভা পায়না। স্ত্রীর জন্য যা শোভা পায়, তা হলো মুখ বন্ধ করে বলশালী পুরুষের আদেশ মান্য করা”।
মদমন্ত এবার সাধরাজ ইচ্ছাধারীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আদেশ করুন মহারাজ”।
ইচ্ছাধারী ঈষৎ হাস্য প্রদান করে বললেন, “শোনো সেনাপতি মদমন্ত, মহামন্ত্রী সুগ্রীব আমার জগৎপতি হবার প্রমাণসূচক বৈভবের প্রদর্শন করেছে সেই স্ত্রীর সামনে। সেনাপতি রূপে, তোমার কর্তব্য তাঁকে আমার বল প্রদর্শন করা। তাই ৬০ হাজার সেনা নিয়ে তাঁর কাছে যাও ও বল প্রদর্শন করে এসো। আর দণ্ডশুণ্ড তোমরা মুমুকে নিয়ে সেখানে সেনাপতির পিছনে পিছনে যাও। সুগ্রীব, তুমিও যাও আমার সমস্ত এক সহস্র সুন্দরী পত্নীদের নিয়ে। হতে পারে সেই স্ত্রী মনে করছে যে, সে একাকী জগৎপতির স্ত্রী হতে চলেছে, তাই অহংকার প্রদর্শন করছে”।
“সমস্ত জগতের শ্রেষ্ঠ এক সহস্র সুন্দরী আমার পত্নী। তাঁদের সকলকে নিয়ে যাও তুমি। যদি সে মদমন্তের প্রকাণ্ড ধূম্রকেও অস্বীকার করে, তাহলে তুমি আমার সমস্ত স্ত্রীদের দেখিয়ে তাঁকে বুঝিয়ে দেবে যে, সে বৃথাই অহংকার করছে আমার পত্নী হবার জন্য। তাঁর মত আরো এক সহস্র সুন্দরী আমার ইতিমধ্যেই পত্নী। তিনি আরো একটি সুন্দর পালক, যে আমার মস্তকে স্থান পেতে চলেছে মাত্র। যদি সেই কথাতেও কাজ না হয়, তাহলে সকলে মিলে সেই স্ত্রীকে সমস্ত জগত কাপিয়ে টানতে টানতে নিয়ে আসবে, আর স্ত্রীকে স্ত্রীর স্থান দেখিয়ে দেবে, যাতে এরপর কনো স্ত্রী এক বলশালী পুরুষের সামনে এমন অহংকার প্রদর্শন করতে সাহস না পায়”।
মহারাজ ইচ্ছাধারীর কথা অনুসারে, মনেন্দ্রিয়স্বরূপ ধূম্ররাজ মদমন্ত আগে আগে ৬০ হাজার সেনাকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। আর তাঁর পিছনে পিছিনে দণ্ডশুণ্ড আর মুমু যেমন রইলেন, তেমনই রইলেন এক সহস্র ইচ্ছাধারীর পত্নী সহ মহামন্ত্রী সুগ্রীব, আর তাদেরকে সুরক্ষা প্রদান করা বাকি ৪০ হাজার সেনা।
লক্ষাধিক চরণের শব্দে সমস্ত দক্ষিণা পর্বত কম্পমান হতে থাকলে, দেবী সর্বাম্বা অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। আর সেই বিরক্তির কালে ধূম্রধারক মদমন্ত উপস্থিত হলেন ৬০ হাজার সেনাকে নিয়ে, যাদের একাকজনই সক্ষম নিসাধরাজকে পরাস্ত করতে। দেবী সর্বাম্বা বিরক্ত হয়ে উঠে বললেন, “তুমিও কি সেই একই জগৎপতির দূত হয়ে এসেছ, নাকি অন্য কনো মতলব আছে তোমার আবার!”
মদমন্ত উগ্রস্বরে উত্তর দিলেন, “দেবী, সৌন্দর্য তোমার ঠিক সেইরূপ, যেমন দণ্ডশুণ্ড বলেছিল। তোমার সৌন্দর্য যথার্থ আমাদের মহারানী হবার জন্য। … কিন্তু এক স্ত্রীর এতো অহংকার প্রদর্শনের কনো কারণ নেই, যেখানে সে জানে যে যার সাথে কথা বলছে, তারা জগৎপতির সেনা, মহামন্ত্রী বা এই সেনাপতি, মদমন্ত। স্ত্রীর কাছে বলশালী, বৈভবসম্পন্ন পুরুষ হলো বরদান। তার সাথে এমন আচরণ! সত্যই বলা হয় যে, সৌন্দর্য আর বুদ্ধি একসাথে বিরাজ করেনা। তা না হলে, এমন বৈভবশালী আর বলশালী পুরুষকে নিজের পতি করে পাবার সুযোগ কেউ এই ভাবে অবহেলা করে!”
“মহারাজের মতে আপনি মহারাজের বৈভব দেখে প্রভাবিত হননি, বা হয়তো বৈভবের সাথে সাথে, সেই বৈভবকে রক্ষা করার মত বল আছে কিনা, তা দেখতে চেয়েছেন। তাই স্বয়ং আমি, তাঁর সেনপতি তাঁর শ্রেষ্ঠ ৬০ হাজার সেনা নিয়ে উপস্থিত হয়েছি। এই সেনাবাহিনীর প্রতিটি সেনা একাকী সক্ষম নিসাধরাজকে নিজেদের পদতলে পিষ্ট করার জন্য। তাই সমস্ত কিছু দেখে নিলেন আজ। হয় এবার আমাদের সাথে স্বসম্মানে চলুন জগৎপতির স্ত্রী হবার জন্য, আর যদি রাজি না হন, তাহলে আপনার কেশ আকর্ষণ করে ঘসটাতে ঘসটাতে নিয়ে যাবো, আর সমস্ত জগতকে দেখাবো যে, বলশালী পুরুষের সামনে স্ত্রীর অহংকার প্রদর্শন কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে”।
দেবী সর্বাম্বা এই কথা শুনে নিজের চোয়াল শক্ত করে নিয়ে বললেন, “যা বলে দিলে, সেটা আমিও ভুলে যাচ্ছি, আর তুমিও ভুলে যাও মদমন্ত। যদি আমার প্রাণ এই কথা শুনে নেয়, তাহলে এই ক্ষণে তোমাকে তোমার এই সমস্ত ৬০ হাজার সেনার সাথে ধুলিস্যাত করে দেবে। … আর সেই কথা ভুলে এখান থেকে চলে যাও। আর আমি বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক নই, তোমাদের স্বামীর সাথে বিবাহ করতে। আর তাই এখানে আসার সাহস দেখিও না”।
মদমন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে হুংকার ছেড়ে বললেন, “যত বড় মুখ না তত বড় কথা! … স্বয়ং মদমন্তকে সাহস দেখাচ্ছে! … এবার তোমার সাহস দেখবো মূর্খ স্ত্রী। অনেক সহ্য করা হয়ে গেছে। এবার শুধু মহারাজের নয়, তাঁর সমস্ত প্রজার একত্রে শয়নসঙ্গিনী হবে তুমি। এই তোমার অহংকারের সঠিক প্রত্যুত্তর হবে। … সেনা, এই মূর্খ স্ত্রীকে বন্দী করো। এঁর দেহরস প্রথম আমিই পান করবো”।
দেবী সর্বাম্বা এবার ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেও, ক্রোধকে অন্তরে লুকিয়ে রেখে শেষ বারের মত বললেন, “ধূম্রসার, সাবধান হয়ে যাও। ধূম্র, ধূম্রের সীমায় থাকো। ধূম্র হয়ে বাতাসকে স্পর্ধা দেখানোর ভুল করো না। প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগও পাবেনা”।
দেবীর মুখের এই কথা শুনে, যখন সকল সেনা হাসাহাসি করে, দেবীকে বন্দী করার প্রয়াসে, তাঁর দিকে এগিয়ে চলেছিলেন, আর দেবী একপদ একপদ করে পিছনে হাটছিলেন, তখনই শুণ্ডদণ্ড, মুমু তথা ৪০ হাজার সেনা সহ ও এক সহস্র ইচ্ছাধারীর পত্নী সহ সুগ্রীব দক্ষিণা পাহাড়ের মাথায় উঠলেন দক্ষিণ দিক থেকে।
ঠিক করে তাঁরা বুঝতেও পারেন নি তখনও, পশ্চিম দিক থেকে আসা মদমন্ত ও ৬০ হাজার সেনার সাথে কি কথা হয়েছে দেবীর। … ঠিক সেই ক্ষণে, মদমন্ত উগ্র হাস্য হেসে উঠে বললেন, “কি হলো মূর্খ স্ত্রী! সেনার আগ্রাসন দেখে, সমস্ত সাহসের সমাপ্তি হয়ে গেল! … কোথায় গেল তোমার সাহস!”
দেবী সর্বাম্বা ভ্রুকুটি কুঞ্চিত করে, ক্রন্দন প্রায় মুখবদন করে বললেন, “মদমন্ত, অন্তিমবারের জন্য বলছি, এখান থেকে চলে যাও। এরপরে যা কিছু হবে, তার জন্য আমার কনো দায় থাকবে না”।
মদমন্ত হুংকার সহ হাস্য প্রদান করলে, সেনা প্রায় দেবীকে স্পর্শ করতে যাবেন, এমন সময়ে, দেবী সর্বাম্বা নিজের নেত্র বন্ধ করে, এক প্রকাণ্ড হুংকার ছাড়লেন। সেনা এমনকি মদমন্তও কিছু বুঝতে পেলেন না। বুঝতে পাবার আগেই, সেই হুংকারে তারা বাতাসে মিশে গেলেন চিরতরে। কিন্তু যারা সেই দৃশ্যকে সম্মুখ থেকে দেখলেন, ইচ্ছাধারীর পত্নীরা, ইচ্ছাধারীর বাকি ৪০ হাজার সেনা, আর মহামন্ত্রী সহ শ্রেষ্ঠ সেনানায়ক গণ, তাঁরা কিছু সময়ের জন্য অন্তত স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। আর স্তম্ভিত হলেন স্বয়ং পরমাত্ম ও ত্রিছায়া।
স্বয়ং নিয়তি তিনি, স্বয়ং শক্তি তিনি। তাঁর থেকে শক্তি ধারণ করেই যে যার মত শক্তিশালী, কিন্তু স্বয়ং শক্তি এর পূর্বে নিজের শক্তির কনোকালে এমন প্রদর্শন করেন নি। তাই তাঁর শক্তির প্রচণ্ডতা দেখে, যেন সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড কিছু পলকের জন্যে স্থগীত হয়ে গেল। সুগ্রীব একটি সেনার উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, “আমাদের এক্ষণে এখানে কি পরিণতি হতে চলেছে, তার কনো ধারণা নেই। … তুমি মহারাজকে গিয়ে এখানে যা কিছু দেখলে, তার সূচনা প্রদান করো গিয়ে”।
হুংকার নিঃসৃত করার পরপরে দেবী শান্ত হতে পারলেন না। একবার অগ্নির স্ফুলিঙ্গ গগন ছুঁয়ে নিলে, আর সে কি শান্ত হয়! … ক্রমশ দেবী নিজের শুভ্রবর্ণ ত্যাগ করে রক্তিম হওয়া শুরু করলেন। ধীরে ধীরে, তাঁর অঙ্গের সমস্ত গহনা গলতে শুরু করে দিয়েছিল, সমস্ত বস্ত্র জ্বলতে শুরু করে দিয়েছিলো।
অন্যদিকে এমন দৃশ্য দেখে দণ্ডশুণ্ড ও মুমুও চুপ করে থাকতে পারলেন না। এই রূপ পরাস্ত হওয়ার কথা তো তাঁরা কনোদিন শ্রবণও করেনি। … প্রতিহিংসার স্পৃহা, প্রতিস্পর্ধার বাসনা তাঁদের মস্তকে চেপে বসলে, আগ্রাসী হয়ে তারা আক্রমণ করতে চলে গেলেন দেবীকে। … সুগ্রীব তাঁদেরকে শান্ত হবার কথা বলতেই যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁর কথা শোনার অপেক্ষাও করলেন না কেউ। সমস্ত ৪০ হাজার সেনা সহ শুণ্ডদণ্ড ও মুমু আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন। আর সেই দেখাদেখি, নিজের ভাবমূর্তির কথা স্মরণ রেখে সুগ্রীবও যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন।
অন্যদিকে দেবী সর্বাম্বা ক্রমশ প্রকাণ্ড হতে শুরু করে দিলেন। তাঁর বস্ত্র সম্পূর্ণ ভাবে জ্বলে গিয়ে তাঁকে নগ্নপ্রায় করে দিতে লাগলো। তাঁর অঙ্গের বর্ণকে এই ক্ষণে দেখে কেউ মানবে না যে কিছু মুহূর্ত আগে পর্যন্ত তিনি শুভ্র ছিলেন, কারণ তিনি এখন টকটকে লাল হয়ে উঠেছেন। যেন নগ্ন সূর্যোদয়ের কালের সূর্য তিনি। তাঁর এই রক্তিম আভাকে সঠিক শোভা প্রদানের জন্য গগনও সন্ধ্যার ন্যায় হয়ে উঠতে শুরু করলো। আর দেবী শুরু করলেন সংহার।
এক হাতে তাঁর খড়গ, দ্বিতীয় হস্ত মুক্ত। বাম হস্তের একটি করাঘাত মাত্রেই দশক দশক সাধ সেনা যেন উড়ন্ত মক্ষিকার ন্যায় উড়ে গিয়ে ভূমিতে পতিত হচ্ছিল। আর দক্ষিণ হস্তে খড়গ মুহূর্তের মধ্যে রক্তিম হয়ে উঠলো। ইচ্ছাধারীর পত্নীরা সেই রক্তিম খড়গ দেখে বুঝতেই পারলো না যে সেই খড়গ রক্তে রঞ্জিত হয়ে রক্তিম রং ধারণ করেছেন নাকি দেবীর অঙ্গের তাপ ধারণ করে তা রক্তিম রং ধারণ করেছে।
কিন্তু রক্তিমতার কারণ যাই হোক না কেন, এক মুহূর্তে, ৫ সহস্র সেনার শবদেহ ভূমিতে লুটিয়ে পড়লো। ক্রমশ যেন দেবীর ক্ষিপ্রতা বৃদ্ধি পেতেই থাকলো, আর যত সময় গেল ততই যেন তা লাগাম ছাড়া হয়ে উঠলো। সেনার প্রাণ রক্ষা করতে সম্মুখে উপস্থিত হলেন মুমু। দেবী যেন আর কারুকে চিনতে পারছেন না। প্রকাণ্ড হয়ে উঠে একটি লম্ফ দিয়ে, নিজের খড়গকে কখন উত্তোলন করলেন আর কখন স্থাপন করলেন, কেউ দেখতেই পেলেন না। কিন্তু সেই খড়গ মুমুর দেহকে মেরুদণ্ড বরাবর দুই খণ্ডে চিড়ে দিয়ে যখন দেবী ভূমিতে পুনরায় চরণ স্থাপন করলেন, তখন প্রকাণ্ড অগ্নি যেন তাঁর পদচাপে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো।
শুণ্ড ও দণ্ড এবার দেবীর সম্মুখে আসতে গেলেন, কিন্তু দেবী কোথায়? দেবীর কাছে তো আর কেউ যেতেই পারছেন না! দেবীর নিশ্বাস প্রশ্বাসে অগ্নি, আর সেই অগ্নির বলে কেবল সাধসেনা নয়, সমস্ত গাছপালাও ভূমি ত্যাগ করে গগনগামী হয়ে, একবার তাঁর দিকে এগিয়ে এসে তাঁর উর্জ্জাগ্নিতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে যায়, তো পরমুহূর্তে সেই অগ্নিময় বৃক্ষ সমূহ ও সাধসেনার শবদেহ শূন্যেই ভাসমান থেকে দেবীর নিশ্বাসের সাথে দেবীর দিকে এগিয়ে আসে, আর দেবীর প্রশ্বাসের সাথে তা দেবীর থেকে দূরে চলে যেতে শুরু করে।
শুণ্ডমুণ্ড সম্মুখে যাবে কি? দেবীকে চারিপাশ ধরে ঘিরে রয়েছে কেবলই শবদেহ। পূর্ণ এক মুহূর্ত সময় লাগলো সেই সমস্ত দেহকে ভস্মে পরিণীত হতে, তবেই দেবীর সম্মুখে যাবার পথ দেখতে পেলেন সুগ্রীব, শুণ্ড ও দণ্ড। কিন্তু যা পেলেন তাকি সত্যি দেবীর কাছে যাবার পথ, নাকি ভস্মীভূত হবার পথ!… দেবীর কাছে যেতে পারলেন না শুণ্ড, দণ্ড আর সুগ্রীব। দেবী স্বয়ংই এক প্রকাণ্ড নিশ্বাসের সাথে তাঁদেরকে নিজের নিকটে টেনে নিলেন, আর টেনে নেবার সাথে সাথেই তাঁরা ভস্ম হতে শুরু করে দিলেন।
তাঁদের গগনচুম্বী বেদনাময় চিৎকার সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে গুঞ্জিত করে তুললে, সেই স্বর ইচ্ছাধারীর কাছেও পৌঁছে গেল, আর ঠিক সেই সময়তেই সুগ্রীবের প্রেরণ করা সেনা তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বললেন, “মহারাজ, এখন সেখানে কি হচ্ছে জানি না। আমাকে যখন মহামন্ত্রী সুগ্রীব আপনার কাছে প্রেরণ করেছিলেন, তখন সেই স্ত্রীর একটি হুংকারের কারণে ৬০ হাজার সেনা সহ সেনাপতি মদমন্ত এক পলকের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। মহারাজ সেই স্ত্রী সাধারণ কেউ নয়, এই সংবাদই প্রেরণ করতে পাঠিয়েছিলেন মহামন্ত্রী”।
ইচ্ছাধারী এবার ক্রুদ্ধ হয়ে নিজের রথে উঠে, অগ্রসর হতে গেলে, মহাবলশালী অনন্তবীর্য সম্মুখে এসে বললেন, “মহারাজ, এই অনন্তবীর্য থাকতে আপনি কেন কষ্ট করবেন?”
ইচ্ছাধারী গর্জন করে উঠলেন, “না! আমাকে সেখানে যেতেই হবে। কে সে, যার একটি হুংকারে ৬০ হাজার প্রতাপী সেনা সহ মদমন্তের মত বলশালী বীর ধুলিস্যাত হয়ে যায়, তা আমাকে দেখতেই হবে। … এমন শক্তির কথা না তো আমি কভু শুনেছি, না জেনেছি! … সে কে, কি তার শক্তির উৎস, তা আমাকে জানতেই হবে”।
অনন্তবীর্য বললেন, “বেশ তাহলে আপনার রথের সারথি হয়ে আমি নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে সেই স্থানে। আমি থাকতে, আপনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন না মহারাজ। আমার কাছে যেই বরদান আছে, তা অকাট্য। তাকে ব্যবহৃত হতে দিন। আমার শক্তি তো ব্যবহৃত হবার স্থানই পায়নি আজ পর্যন্ত। দেখি আজ যদি তার ব্যবহার হবার অবকাশ আসে আমার কাছে!”
এতবলে ইচ্ছাধারী রথে স্থাপিত থাকলে, অনন্তবীর্য সেই রথের সারথি হয়ে দক্ষিণা পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। অন্যদিকে পূর্ণগহন নিকস সাগরের বুকে আমাবস্যার রজনীর ন্যায় ঘোররূপে বিরাজমান দেবী সর্বাম্বার নিকটে এবার ইচ্ছাধারীর সমস্ত স্ত্রীরা এসে উপস্থিত হয়ে করজোড়ে বললেন, “মা! … এই শক্তি দেখার পর আর কনো ভাবে ভ্রম হওয়া সম্ভবই নয়। … তাই আর কনো দ্বিতীয় নাম খুঁজেও পাচ্ছিনা তোমার মা। … মা, আমরা এক সহস্র পত্নী ইচ্ছাধারীর, যারা কেবলই তাঁর বলের কাছে পরাস্ত হয়ে, তাঁর দাসী। অর্থাৎ মা, আমাদেরকে ইচ্ছাধারীর পত্নী না বলে দাসী বললেই, আমাদের সঠিক পরিচয় প্রদান করা সম্ভব হবে”।
“আমাদের উপর কৃপা করো মা। হয় দণ্ড দাও আমাদেরকে, যেমন এই মুহূর্তে মনুষ্য সমাজ পাচ্ছে, নয় আমাদেরকে কনো দায়িত্ব অর্পণ করো, যা আমাদের পক্ষে করা সম্ভব”।
মাতা সেই কথাতে ক্রমশ শীতল হতে শুরু করলেন। প্রায় শূন্যকায় কালবর্ণা অবস্থা থেকে পুনরায় রক্তিম হয়ে উঠলেন। রক্তিম থেকে পুনরায় শ্যামবর্ণা হয়ে উঠলেন, আর সেই অবস্থা থেকে পুনরায় শুভ্রবর্ণা হয়ে উঠলেন। কিন্তু তাঁর সমস্ত বস্ত্র তো তাঁরই সত্যাগ্নির তাপে ভস্মীভূত হয়ে গেছিল! তাঁর সমস্ত গহনা তো সেই একই অগ্নিতাপে গলিত হয়ে গেছিল। তাই, তিনি অতিসুন্দরী দিগম্বরী স্ত্রী হয়ে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠলেন।
সেই দৃশ্য দেখে ইচ্ছাধারীর সহস্র পত্নী উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠে, যে যার নিজের অঙ্গবস্ত্র থেকে অংশ ছেদন করে, মাতা সর্বাম্বাকে আচ্ছাদিত করতে করতে বলতে থাকলেন, “না মা, এই অবস্থায় তুমি দিগম্বরী হয়ে থাকতে পারো না!… তুমি যখন করালি হয়ে অবস্থান করছিলে, তখন তোমাকে দর্শন করাই প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছিল। শুধুই একটি কালো দংষ্ট্রা রেখার ন্যায় দেখাচ্ছিল তোমাকে, যার থেকে প্রতিনিহিত কালাগ্নি বিচ্ছুরিত হচ্ছিলো। কিন্তু এখন নয়!”
“এখন তুমি অত্যন্ত মনোরমা, প্রকাণ্ড ভাবে শুভ্র গোলাপি তনযুক্তা মায়াবিনী। তোমাকে দর্শন করে তোমার সন্তানদের মধ্যে কামবাসনার জন্ম হতে পারেনা। তুমি তাঁদের মা!”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “আমার ছেলে মৃষু কি বলে জানিস! … সে বলে, শুধু জন্মদাত্রীই কি মা হয়! … সে বলে নারী মূর্তি মানেই মা। জন্মদাত্রী রূপেও, পালনকর্ত্রী জননী বা ভ্রাতাস্ত্রী বা জ্যেষ্ঠা রূপেও, কামনাহন্তা স্ত্রী বা কামিনী রূপেও, আর হৃদয়গলিতা কন্যা বা কনিষ্ঠারূপেও, এমনকি সঙ্গিনী রূপেও”।
ইচ্ছাধারী পত্নীদের মধ্যে জ্যেষ্ঠা, দেবী বাসবদত্তা বললেন, “সকল পুরুষ মৃষু নয় মা। মৃষু তো পুণ্যতার দ্বিতীয় নাম! স্ত্রী মানেই তাঁর অন্তরে মায়ের ছবি ভাসে। আর তার কারণ তাঁর তোমার প্রতি অকৃপণ স্নেহ। … প্রগলের মত স্নেহ করে সে তোমাকে। তাঁর ন্যায় স্নেহ করা যে কারুর পক্ষে সম্ভবই নয়। আমার বিশ্বাস যে, তুমি তাঁর আজ পুত্রী হয়েও তাঁকে সেই স্নেহ করতে পারোনি, যেই স্নেহ সে তোমাকে পুত্র হয়ে করেছে। … তাঁকে দিয়ে তো তোমার সমস্ত সন্তানের হিসাব করা উচিত নয় মা। সে ব্যতিক্রমী। প্রতিটি স্ত্রীর কাছে সে একটি এমন পুরুষ যাকে স্ত্রী যেকোনো অন্য স্ত্রীর থেকেও অধিক বিশ্বাস করতে পারে”।
দেবী স্বপ্নদিশা বললেন, “হ্যাঁ মা, তাঁর সম্মুখে কেবল তুমি কেন? যেকোনো স্ত্রীই নগ্না হতে পারেন, পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে নগ্না হতে পারেন, এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে নগ্না হতে পারেন যে, সমস্ত পরিস্থিতিতে তিনি তাঁকে মা-ই দেখবেন, আর এই বিশ্বাস নিয়ে যে, কনো কারণে, কনো অছিলাতে তাঁদের সেই বিশ্বাস ভগ্ন হবেনা। … কিন্তু দিদি সঠিক বলেছে, তোমার সকল সন্তানের অন্তরে সেই প্রকার চেতনা জন্ম নেয়নি। আমরা স্ত্রী বেশে অবস্থান করছি। আমাদের অন্তরেই তোমার অপরূপ সৌন্দর্যকে নগ্ন রূপে দেখে কামনার সূক্ষ্ম রেখা অশনিপাতের ন্যায় ক্রীড়া করে গেছিল”।
ইচ্ছাধারীর কনিষ্ঠা স্ত্রী, শ্যামারূপা বস্ত্র পরিধান করাতে করাতে বলে উঠলেন, “এই আমাদেরকেই দেখো না। আমরা প্রাণপণে দৌড়ে এসে তোমার নগ্নতা ঘোচাতে এলাম। কেন করলাম এমন? মৃষু হলে কি এমন করতেন? না তিনি এমন কিছুই করতেন না। তাঁর যে দৃঢ় বিশ্বাস, তাঁর মা যাকিছু করেন, তাই তাঁর সমস্ত সন্তানের হিতের জন্য করেন। তাঁর কাছে তো তাঁর মায়ের সমস্ত রূপই মা। তাঁর বস্ত্র পরিধান করা রাজরাজেশ্বরী রূপও, আর তাঁর মায়ের নগ্ন মনোলোভা রূপও। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে তো তেমন হয়নি!”
“আমরা তো স্বয়ং কামনার বাণে অস্থির হয়ে গেছিলাম। আর সেই বাণে আহত হবার পর আমাদের স্মরণে আসে যে, জগতের মায়ের প্রতি যদি স্ত্রীদেরই কামনার দৃষ্টি পতিত হয়, তাহলে পুরুষ তো মধুপূর্ণ পুষ্পরেণুর প্রতি আকৃষ্ট মধুমক্ষীর ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করবে এই অগ্নিকুণ্ডে। তাই আমরা তরীঘড়ি এসে তোমাকে আচ্ছাদিত করা শুরু করেছি। জগতের মা সকলের কাছে স্নেহের বিষয় হবেন, কারুর কাছে কামনার বিষয় হতেই পারেনা!”
এই সমস্ত কথা বলতে বলতে, সকল ইচ্ছাধারী স্ত্রীরা মাতা সর্বাম্বাকে পুনরায় বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করে তুললে, এক সহস্র বিভিন্ন রাজকীয় বস্ত্রের খণ্ডে মাতা সর্বাম্বা যেন বিবাহের পাত্রীর ন্যায় অপরূপা রূপ ধারণ করলেন। তবে ইচ্ছাধারী পত্নীরা তাতেও থামলেন না। তাঁরা নিজেদের অঙ্গের বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর গহনা খুলে দেবীকে তা পরিধান করানো শুরু করলেন।
এই কর্ম করতে থাকলে, মাতা সর্বাম্বা যেন লীলামুখরিত হয়ে বললেন, “বস্ত্র পরিধান করিয়ে নগ্নতা তো ঢেকে দিয়েছো। আবার গহনা কেন?”
দেবী বাসুমতি, ইচ্ছাধারীর এক স্ত্রী গহনা পরিধান করাতে করাতে, ঠিক এক কন্যার মাতা যেমন করে তাঁর কন্যাকে বিবাহের সাজে সাজাতে সাজাতে বলেন, তেমন ভাবেই বললেন, “মা কখনো মেয়ের থেকে কম সুন্দরী দেখাতেই পারেনা। … মা যে মা, কন্যার অহংকার হয় যে তাঁকে তাঁর মায়ের মত দেখতে হয়েছে, সে তাঁর মায়ের রূপ পেয়েছে। সেই মা কি করে মেয়ের থেকে কম রূপবতী দেখাতে পারে!”
সমস্ত বস্ত্র ও গহনা পরিধান করানোর শেষে যেন মাতা সর্বাম্বা পরাসুন্দরী দেখাতে থাকলেন। সকল ইচ্ছাধারী স্ত্রীরা বিগলিত ও মোহিতদৃষ্টিদ্বারা কেবল মাতা সর্বাম্বাকে দেখতেই থাকলেন আর সকলের মুখ থেকে অস্ফুট ধ্বনি নির্গত হতে থাকলো, “আহা, এ আমরা কারে দেখছি! … ইনি যেন সমস্ত জগতের ধাত্রী, মাতা জগদ্ধাত্রী!”
মাতা সর্বাম্বা পুনরায় লীলামুখরিত হয়ে বললেন, “তোমরা আমাকে কি যেন বলছিলে একটা?”
ইচ্ছাধারী পত্নীরা যেন সেই কথা সম্পূর্ণ ভাবে ভুলে গেছিলেন। আর তাঁরা যে সেই কথা ভুলে গেছেন, তার হুঁশ তাঁদেরও ছিলো। তাই তাঁরা একে অপরের মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থেকে স্মরণ করার প্রয়াস করলেন যে, কি বলেছিলেন তাঁরা মাতাকে! কিন্তু একজনেরও তা স্মরণে এলো না। যেন তাঁরা মাতা সর্বাম্বাকে সাজিয়ে তোলার সময়ে পূর্ণ ভাবে নিজেদেরকে নিবেদিত করে তুলেছিলেন। তাই তাঁদের কিচ্ছু স্মরণে নেই আর।
যখনই কিছু স্মরণ করতে যাচ্ছেন তাঁরা, মাতা সর্বাম্বার নগ্না থেকে জগদ্ধাত্রী হয়ে ওঠার প্রতিটি পদক্ষেপই তাঁদের স্মৃতিভাণ্ডারে চমকিত হতে থাকলো। বেশ কিছুলক্ষণের প্রয়াসের পর, বিহ্বল হয়ে তাঁরা মাতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “স্মরণ নেই মা! … হয়তো কনো শঙ্কা ছিলো মনে। আর সেই শঙ্কা, সেই উৎকণ্ঠা থেকেই কিছু কামনা করেছিলাম তোমার থেকে। আসলে কামনা করা তো আমাদের স্বভাব হয়ে গেছিলো এতোদিনে। শঙ্কা করাও স্বভাব হয়ে গেছিল”।
দেবী সিপ্রা বললেন, “হ্যাঁ মা, ভীরুর মত নিজেদের দুর্বল আর অন্যকে সবল মনে করে করে, সবলের অধীনে স্বেচ্ছায় চলে গিয়ে দুর্বলতাকে সুরক্ষিত করে রাখবো, এই যেন আমাদের হৃদবাসনা হয়ে গেছিল। নিজেদের অসুরক্ষিত ভাবতে ভাবতে, আমরা কখন হে অসুর হয়ে গেছিলাম। আজ তোমাকে সাজাতে সাজাতে যেন এক অদ্ভুত লীলা হয়ে গেল আমাদের সাথে। যেন সমস্ত ভীরুতা আমাদেরকে বিদায় দিয়ে চলে গেলো। বড় হলকা লাগছে মা! … কনো কামনা নেই, কনো ভয় নেই। না দুর্বল হবার ভান আছে, আর না সবলের থেকে অসুরক্ষিত থাকার ভান রয়েছে। যেন মনে হচ্ছে রক্ষা লাভের কনো প্রয়োজনই নেই। কাকে রক্ষা করবো? কেন রক্ষা করবো?”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “তোমরা ইচ্ছাধারীর থেকে মুক্ত হতে চাইছিলে। তোমাদের এই কথাতেই আমি শূন্যকায় থেকে পুনরায় স্থূলকায় হয়ে উঠছিলাম। তোমাদের এই প্রয়োজনের কথা শুনেই আমার মনে হয় যে আবার আমাকে নিরাকারা থেকে সাকারা হয়ে উঠতে হবে। তাই আমার এই পরিবর্তন ছিলো”।
ইচ্ছাধারী পত্নীরা সেই কথা শুনে, চুপ করে মাথানত করে থাকলে, মাতা সর্বাম্বা পুনরায় বললেন, “কি হলো, তোমাদের কি সেই কামনা আর নেই, যেই কামপ্না তোমরা আমার সামনে রেখেছিলে?”
দেবী খরস্রোতা মাথা তুলে সকলের প্রতিনিধি হয়ে বললেন, “কামনা আছে মা। তবে আর কিছু চাইবার কামনা নেই। মা, তোমার যদি কাজ থাকে, তা আমাদেরকে দেবে? তোমার কাজ করবো আমরা। … ইচ্ছাধারীর পত্নী হয়ে ওঠা আর তারপর পত্নী হয়ে থাকার সমস্ত সময় আমাদের স্মরণে আসছে। আর যতই তা স্মরণে আসছে, নিজের উপর ঘৃণা জন্ম নিচ্ছে”।
“সুন্দর রূপ তুমি আমাদের দিয়েছিলে। সেই সুন্দর রূপের অর্থ ছিলো আমাদের প্রতি পুরুষ আকৃষ্ট হবেন, আর আমরা পুরুষের নিকটে গিয়ে তাঁদের কামনাতে অঙ্কুশ স্থাপন করে, তাঁদেরকে সত্যের মার্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা করাবো। কিন্তু মা, আমরা কি করেছি তোমার দেওয়া এই সৌন্দর্য নিয়ে! … আমরা কারুকে কামনা থেকে মুক্ত কি করবো? আমরা তো স্বয়ংই কামনায় অস্থির হয়ে অবস্থান করছিলাম! … তোমার দেওয়া সৌন্দর্যকে নিজেদের উপার্জন জ্ঞান করে, আমরা সকল সময়ে অহংকার ধারণ করে, নিজেদেরকে পুষ্পরজ মনে করে গেছি, আর প্রগলের মত মধুমক্ষিকার সন্ধান করে গেছি!”
“ইচ্ছাধারীর থেকে মুক্ত হবার কথা আজ আমরা বলেছি হয়তো। আমাদের স্মরণে আসছে না সেই কথা, কিন্তু যেই কালে তুমি সেই কথা বলছো, সেই কালে অবশ্যই সেই কথা তোমাকে বলেছি আমরা। … কিন্তু আমাদের সেই ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন যে, কোন মুখে আমরা তোমার কাছে সেই দাবি করি? ইচ্ছাধারী আমাদেরকে বলপূর্বক স্ত্রী তো করে নি! … সে তো আমাদের কাছে নিজের শ্রেষ্ঠ মধুমক্ষী হবার প্রমাণ রেখেছিল মাত্র!”
“আমরাই তো সেই অহমিকা পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী ছিলাম যারা সেই মধুমক্ষিকাকে দেখে বিগলিত হয়ে গেছিলাম। আমরা দেখেছিলাম যে এই মধুমক্ষীকার কাছে তো অসম্ভব সমূহ চঞ্চু রয়েছে, যা দিয়ে সে আমাদের থেকে সর্বক্ষণ মধুপান করতেই থাকবে। দেখেছিলাম, এই মক্ষিকার কাছে তো অসম্ভব ধন, বৈভব ও অপার শক্তি রয়েছে, যা দ্বারা সে আমাদের সমস্ত মধুকে পান করে আমাদের অপার সুখ প্রদান করবে”।
“কই আমরা তো একটিবারের জন্যও বিচার করিনি যে, সেই ধন যা এই ইচ্ছাধারী নিজের কাছে সঞ্চিত রাখে ও উপার্জন করে, তা সে কি ভাবে করে! একটিবারও তো আমরা বিচার করিনি যে যেই বৈভব, যেই শক্তি সে ধারণ করে রয়েছে, তার ব্যবহার সে কার হিতের জন্য করছে বা কার অহিতের জন্য করছে। … আমরা তো শুধুই তাঁর চোঁচই দেখেছিলাম। একবারও তো বিচার করে দেখিনি, সেই চোঁচধারী আদপে কনো মধুপানকারী মধুমক্ষিকার নাকি তা আসলে এক সেই মক্ষিকার যে মধুতেও বসে আবার বিষ্ঠাতেও বসে!”
“মা, আমাদের থেকে তো অনেক অনেক অধিক ভাবে পবিত্র যক্ষস্ত্রীরা। তারা তো ততক্ষণ নিজেদের মধুতে কারুকে স্পর্শ করতেও দেয়নি, যতক্ষণ না কনো মধুমক্ষী তাঁদের কাছে এসেছিল। যখন সেই মধুমক্ষী তাঁদের কাছে গেল, তাঁরা তখনই প্রস্তুত হলো নিজেদের মধুকে উজাড় করে দেবার জন্য। কিন্তু তাঁরা দেখলেন, মধুমক্ষী তাঁদের মধুতে মুখ পর্যন্ত দিলো না। আর তখনই তো তাঁরা আবিষ্কার করলো যে, মধু তাঁদের কাছে কনোকালে ছিলই না । তাঁদেরই ভ্রম ছিলো যে তাঁদের কাছে মধু ছিলো”।
“তখনই তাঁরা উপলব্ধি করলেন যে, মধু তো এক ও একমাত্র তোমার কাছে আছে, আর তাই যে প্রকৃত মধুমক্ষিকা, সেই মৃষু কেবল তোমার কাছেই ভনভন করে, শুধু তোমার থেকেই মধুপান করে। উপলব্ধি করে যক্ষস্ত্রীরা যে তাঁদের কাছে তো কেবলই চিনির সড়করা রয়েছে, মধু তো কনোকালে ছিলই না। … লজ্জিত হলেন তাঁরা নিজেদের অহংকারের কারণে। আর মধুমক্ষিকার কাছে করজোড়ে বললেন, তাঁদের এই সড়করাকে উপযুক্ত ঠিকানায় স্থাপিত করে দিতে”।
“কিন্তু আমরা মা? মধু তো যক্ষস্ত্রীদের কাছেও ছিলো না, আমাদের কাছেও নেই। তাঁরা তো নিজেদের চিনির সড়করাকে মধুজ্ঞান করে, সকলের থেকে আড়াল করে রেখে দিতো। অনন্ত কষ্ট ভোগ করেছে সেই রক্ষণের কারণে, অনন্ত পীড়া সহ্য করেছে সেই রক্ষণের প্রয়াসের কারণে। কিন্তু যতক্ষণ না মৃষুরূপী মধুমক্ষিকা তাঁদের কাছে গেছিল, তাঁরা কিছুতেই নিজেদের মধুবনকে উজাড় করে নি কারুর কাছে”।
“সত্য বলতে, তাঁদের এই আচরণের কারণেই তো মশুমক্ষিকা মৃষু তাঁদের কাছে গেছিলেন। তাঁদের এই ভ্রম ভাঙ্গাতে যে তাঁদের কাছে আদপে কনো মধু নেই। মৃষু তাঁদের কাছে না গেলে তো তাঁরা জানতেও পারতেন না যে, তাঁদের কাছে মধু নয় চিনির সড়করা রয়েছে। … তাই তাঁরা তো পবিত্র মা! … কিন্তু আমরা! … আমরা তো পবিত্র নই। নিজেদের চিনির সড়করাকে যক্ষস্ত্রীরাও মধু ভেবেছিল, আর আমরাও ভেবেছিলাম। কিন্তু তাঁরা কি করলেন? তাঁরা নিজেদের মধুকে সেই মধুমক্ষিকার জন্য বাঁচিয়ে রেখে দিলেন। কিন্তু আমরা তো বিষ্ঠায় বসা মক্ষিকাই মধুমক্ষী জ্ঞান করে আমাদের সেই মধুপান করার অনুমতি প্রদান করে দিলাম!”
“না মা, আমাদের ইচ্ছাধারীর থেকে মুক্ত হবার কামনা করার কনো অধিকার নেই। তুমি আমাদের রূপ প্রদান করেছিলে। কিন্তু আমরা কোনদিন উপলব্ধিই করিনি যে, এই রূপদানের সাথে সাথে তুমি আমাদের দায়িত্বও প্রদান করেছিলে যে, তোমার একটি একটি সন্তানের কামনার শোষণ করে, তাঁদের পবিত্র করে তুলতে হবে। … আমরা তো স্বয়ং কামনায় জর্জরিত হয়ে, বৈভব, ধন, আর শক্তির অধিকারীকে দেখে গেছি। সর্বদা খুঁজে গেছি যে কে কামনায় অস্থির, আর কে নিজের কামনাকে বিস্তৃত করতে পারবে আমাদেরকে মাধ্যম করে!”
“আর সেই খোঁজের উপযুক্ত কর্মফলও আমরা সবে লাভ করা শুরু করেছি। বিষ্ঠায় বসা পাপিষ্ঠ ইচ্ছাধারীর পত্নী হয়ে তাঁর বিষ্ঠাপরিপূর্ণ চোঁচকে উপভোগ করেছি আমরা। আর এবার আমাদের সময় এসে গেছে যে, সেই বিষ্ঠাপ্রেমী মক্ষীর অন্ত হবে, আর তাঁর সুন্দরী বিধবা পত্নী হবার কারণে অজস্র মক্ষী আমাদের উপর বলপূর্বক কামনা স্থাপন করে, আমাদের জীবনকে নরক করে দেবে। … এটিই আমাদের জন্য উপযুক্ত কর্মফল হবে মা। তাই যদি কিছু কামনা রেখে থাকি, তা আমাদের যেমন স্মরণে আসছে না, তুমিও স্মরণ করো না আর। আমাদেরকে আমাদের কর্মফল ভোগ করার জন্য তোমার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করো। এটিই আমাদের জন্য উপযুক্ত কর্মফল হবে”।
মাতা সর্বাম্বা মৃদু হেসে বললেন, “যেই দায়িত্ব তোমাদেরকে রূপ দান করার কালে সঁপেছিলাম, সেই দায়িত্ব এতকাল ভুলে ছিলে। এখন তা স্মরণ আসতেও, সেই দায়িত্ব পালন করবেনা!”
দেবী সুভদ্রা বললেন, “কিন্তু কি করে মা? বিষ্ঠাসর্বস্ব সাধপূর্ণ ইচ্ছাধারীর চঞ্চুধারণ করেছি আমরা। তাও স্বেচ্ছায়। তার ধন, বৈভব, শক্তি, আর এই সমস্ত কিছুর প্রতি কামনা দেখে আমরা সেই বিষ্ঠাসর্বস্বকে গ্রহণ করে পূর্ণ ভাবে অপবিত্র হয়েছি। আর তা নিজেদের স্বেচ্ছাতেই হয়েছি। এরপরে, আমরা আর দায়িত্ব পালন করার মত পবিত্রতা কি ধারণ করি?”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “প্রায়শ্চিত্ত কি জানো? … প্রায়শ্চিত্ত কনো কর্ম বা কর্মধারা নয়। প্রায়শ্চিত্ত হলো একটি উপলব্ধি। নিজেদের কৃতকর্মের জন্য জন্ম নেওয়া নিজেদের প্রতি বিক্ষোভের এক ভাবধারা হলো প্রায়শ্চিত্ত। যখন নিজেদের কৃতকর্মের জন্য জন্ম নেওয়া বিক্ষোভ নিজেকে ক্ষমার অযোগ্য বলে প্রতিপন্ন করে এক প্রকাণ্ড অগ্নি নির্মাণ কোরে, তাতে নিজের আত্মকে, নিজের আত্মবিশ্বাসকে, নিজের আত্মস্পর্ধাকে, নিজের আত্মচিন্তাকে সেই অগ্নিতে ক্ষেপণ করা হয়, তখন সেই কর্ম, যা করার জন্য সে অপবিত্র হয়ে উঠেছিল, সেই কর্মের নাশ হয়। আর যখন সেই কর্মেরই নাশ হয় যায়, যার কারণে সে অপবিত্র হচ্ছিল, তখন আর অপবিত্রতা কোথায় থাকে?”
দেবী বাসবদত্তা বললেন, “তুমি মা। ক্ষমা করে দেওয়া মায়ের স্বভাব। কি করে তিনি এমন স্বভাব ধারণ করে রাখেন, তা আমাদের ধারণার অতীত। কিন্তু তিনি সেই কর্মে পারদর্শী। তাই তুমি তো আমাদের ক্ষমা করে দেবে। কিন্তু মা, আমরা নিজেদের ততক্ষণ ক্ষমা করতে পারবো না, যতক্ষণ না আমরা এমন কিছু কর্ম করবো, যার কারণে নিজেদের পুনরায় পবিত্র মানা শুরু করতে পারবো। তাই মা, আমাদেরকে এমন কনো কঠিন কর্ম দাও। সেই কঠিন কর্ম যখন আমাদের অলস হতে দেবেনা, যখন আমাদের আত্মচিন্তন করার অবকাশও দেবে না, তখনই আমাদের অন্তরের এই পাপবোধ দূর হয়ে পবিত্র ভাবের জন্ম নেবে”।
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “বেশ তবে স্থূল দেহ ধারণ করা শুরু করো। … খুব শীঘ্রই নির্বাণ যোনির পুরুষের সংখ্যা ৫ শত হয়ে উঠবে। তাঁদের পত্নী হয়ে তাঁদের কামনাকে সীমিত করে তুলে, নিজেদের দায়িত্ব পালন করো তোমরা। আর বাকি ৫ শত কনিষ্ঠ স্ত্রীগণ, তোমরা ভারতের বর্তমানে যেই দক্ষিণ পশ্চিম উপকুল সাগরের উপরে অবস্থান করছে, সেখানে যাত্রা করো। সেখানে ৫ শত এমন পুরুষ অবস্থান করবে বিচ্ছিন্ন ভাবে, যারা রমনাথের প্রদান করা টিকার স্বেচ্ছায় বিরোধ করার কারণে আগত বিপদকালে অত্যন্ত কঠিন ভাবে সংগ্রাম করে জীবিত থাকবে। তাঁদের জীবন সংগ্রামে তোমাদেরকে ভাগ নিতে হবে, তাঁকে জীবিত রাখতে হবে তোমাদেরকে। আর তা রাখতে পারলে, তাঁদের সকল ৫ শতকে একত্রিত করে রেখে, তাঁদেরকে অবশিষ্ট মানবযোনির সমুদায় রূপে স্থাপিত করে, তাঁদের পত্নী হতে হবে তোমাদেরকে”।
“ইচ্ছাধারীর জ্যেষ্ঠা ৫ শত পত্নী জন্ম দেবে দুই সহস্র নির্বাণ নারীপুরুষের। আর তোমরাও জন্ম দেবে, দুই সহস্র মানব নারীপুরুষের। আর এই চারসহস্র নির্বাণ ও মানবের মিলনই নির্বাণ সমুদায়ের অন্তিম অন্য যোনির সাথে মিলনকাল হবে। এরপরে মানব যোনি পূর্ণ ভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আর অতঃপরে নির্বাণ যোনিই উপস্থিত থাকবে, ভাবি কালে মেধার চেতনাতে রূপান্তরণের ফলে মোক্ষধারণের পদ্ধতিকে অগ্রসর করার জন্য, যেখানে মৃষু বারংবার আমার প্রতিনিধি হয়ে উপস্থিত হয়ে আমার চেতনার বিস্তার করতে থাকবে”।
সমস্ত ইচ্ছাধারী স্ত্রী নতজানু হয়ে মাথানত করে উপস্থিত হলেন মাতা সর্বাম্বার সম্মুখে, আর বললেন, “মৃষু সঠিক বলেন। তুমি ঈশ্বর নও, তুমি শুধুই মা। মা ছাড়া এমন মমতাময়ী আর কেই বা হতে পারে! … আশীর্বাদ করো মা, যাতে এবার আমরা আমাদের দায়িত্ব থেকে ক্ষণিকের জন্যও বিচলিত না হই। অবিচল ভাবে নিজেদের দায়িত্বকেই যাতে নিজেদের জীবনের ব্রত মানতে পারি, তারজন্য তোমার আশীর্বাদ অত্যন্ত আবশ্যক মা। মায়ের আশীর্বাদ ছাড়া কনো শুভ কাজ যে সম্পন্ন হতেই পারেনা!”
মাতা সর্বাম্বা হাস্যমুখে বরহস্ত উন্মুক্ত করে সমস্ত ইচ্ছাধারী পত্নীদের উদ্দেশ্যে উর্জ্জাশক্তি প্রদান করলে, তাঁরা সকলে স্থূলকায়া ধারণ করে নিজেদের দায়িত্বপালনের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলেন।
অন্যদিকে যক্ষস্ত্রীরা মাতার এই বরদানের প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন। তাঁরা মৃষুর কাছে হর্ষিতার নেতৃত্বে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের সুরে বললেন, “এ তো অন্যায় মৃষু! … মাতাও জানেন, মৃষু নিজের মা-কে ছেড়ে এক দণ্ডও থাকতে পারেনা। তারপরেও এমন কেন বললেন তিনি যে, নির্বাণদের মধ্যে তুমি একাকী বারবার আসবে। মা আসবেন না! মা না আসা মানে যে, তোমাকে অনন্ত বেদনা ও পীড়ার সাগরে নিমজ্জিত করে দেওয়া!”
মৃষু মিষ্ট হেসে বললেন, “প্রেম মানে জানো দেবীরা? প্রেম মানেই যে অনন্ত পীড়া! অনন্ত বেদনা! … প্রেম মানে মিলন নয়, প্রেম মানে যে মিলনের অপেক্ষা। প্রেম মানে হরষ নয়, প্রেম মানে যে হরষের জন্য হাপিত্যেশ করে, উন্মত্ত্বের মত দৌড়ে চলা। পৃথক অস্তিত্ব থাকার কারণে যেই মিলনের থেকে দূরত্ব সৃষ্টি হয়, আর সেই দূরত্বের কারণে যেই বেদনার সঞ্চার হয়, তাই হলো প্রেম। আর এই অনন্ত বিরহ, অর্থাৎ অনন্ত প্রেমের উপরান্তে থাকে মিলন, দুই থেকে এক হয়ে যাওয়া। আমার অস্তিত্ব লীন হয়ে যাওয়া মায়ের মধ্যে। এটি প্রেম নয় দেবী। এটি হলো মিলন। জীবকটির ক্ষেত্রে এই মিলনকে বলা হয় মোক্ষ, আর ঈশ্বরকটির ক্ষেত্রে একে বলা হয় সমাধি”।
“দেবীরা, বিচার করে দেখুন একবার। আমাকে যে মা বললেন, বারংবার মৃষু আসবে আর তাঁর মুখ হয়ে তাঁর কথা সকল নির্বাণদের বলে ফিরবে, মৃষুর মনের মধ্যে কি চলবে সেই কালে? মৃষুর মনের মধ্যে চলবে বিরহজ্বালা। নিজের মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার বেদনা তাকে গ্রাস করবে, আর সে হয়ে উঠবে প্রেমে উন্মত্ত। আর সেই উন্মত্ততার শেষে কি থাকবে তার জন্য? মিলন। সমাধি। অর্থাৎ অন্তিম গন্তব্য স্থলে যাত্রা করে উপস্থাপন”।
“দেবীরা, প্রেম হলো যাত্রা, আর সেই যাত্রার উপরান্তে যেই গন্তব্যস্থল থাকে, তার নাম হলো মিলন, সমাধি, আর জীবকটির জন্য সেটিই হলো মোক্ষ, নির্বাণ বা কায়মত। … আর সেটিই সকলের লক্ষ্য, সকল মেধার লক্ষ্য, আর তাই নির্বাণেরও জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। … তাই এবার বিচার করুন, মৃষু কেন আসবে বারবার? শুধুই কি নিজের মুখ দ্বারা মায়ের কথা বলতে? না দেবী, শুধু মুখ দ্বারা মায়ের সম্পূর্ণ কথা কি করে বলা সম্ভব? মৃষুকে যে তাঁর সমস্ত জীবন, জীবনধারা দিয়ে মায়ের কথা বলতে হবে। তাই মৃষুকে যে মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হতেই হবে, তবেই তো সে মায়ের প্রতি অপার প্রেমে মেতে উঠবে, আর তবেই তো অন্তে সে সমাধি লাভ করে, লক্ষ্যপ্রাপ্তির জলজ্যান্ত উদাহরণ হয়ে থেকে, সমস্ত নির্বাণদের লক্ষ্যের স্মরণ করাবে”।
“দেবী, শিক্ষক বা আচার্য কি কেবল মাত্র পাঠ প্রদান করার কালেই আচার্য! না দেবী, এক আচার্যের জীবন ও জীবনধারাই হলো প্রকৃত শিক্ষা। যদি আচার্যের কথিত পাঠ শিক্ষার সার হয়, তবে আচার্যের জীবনধারা এই বলে দেয় ছাত্রছাত্রীদের যে, যদি সেই শিক্ষা অর্জন করতে হয়, যদি তা ধারণ করতে হয়, তবে আচার্যের ন্যায় জীবনধারণও আবশ্যক। ঠিক তেমনই দেবীরা, মা মৃষুকে জগতে আচার্যের পদে নিযুক্ত করলেন। এর অর্থ এই যে, মৃষুকে যতটা মায়ের কথনকে ভাব, কাব্য, গীত, কাহিনী, নীতিবাক্যের মাধ্যমে বলতে হবে জগতের বুকে দাঁড়িয়ে, ততটাই নিজের মায়ের প্রতি বিরহজ্বালা ধারণ করে সেই সমস্ত কথার উপমা ও নিদর্শন দেখাতে হবে”।
দেবী হর্ষিতা নরম ভাবে বললেন, “আমিও আসবো তোমার সাথে সখা। যখন তুমি প্রেম বিরহে কাতর হয়ে যাও, তুমি নিজের দেহকেও ভুলে যাও, নিজের অস্তিত্বকেও ভুলে যাও। কিন্তু যতই ভুলে যাও, স্থূল দেহ তো থাকে তখনও। তাই স্থূল দেহ কখনো নিথর প্রস্তরের ন্যায় আছার খেয়ে পরে যায়, তো কখনো অজান্তেই অনাহারে, অনিদ্রায় থেকে যায়। আমাকে তাই বরদান দাও মৃষু। আমি প্রতিবার তোমার সাথে আসবো, আর তোমার দেখভাল করবো। … না, আমি আবদার করছিনা। আমার এটা অঙ্গিকার। আমাকে আসতে দিতে হবে। আর আরো একটা অনুরোধ, আমার আর তোমার যেন লিঙ্গ এক হয় প্রতিবার। ভিন্ন লিঙ্গ হবার কারণে, তোমাকে স্পর্শ করতে কুণ্ঠা হয়, সর্বক্ষণ মনে হয় যেন আমি ছুলে বোধহয় তোমার পবিত্রতার নাশ হয়ে যাবে। … এই কুণ্ঠা আমি আর রাখতে চাইনা। এই কুণ্ঠার কারণে আমি অনেক অনেক সময়ে, তোমাকে বিহ্বল অবস্থায় ধরতে গিয়েও ধরতে পারিনা। অসহ্য কষ্ট হয় তখন মনে”।
মৃষু হেসে বললেন, “তাই হবে দেবী। তবে যেই পীড়ার কথা বললেন আপনি, সেগুলি কিন্তু মায়েরই লীলা। সাধারণ জীব যেকালে সামান্য পীড়া লাভ করেই কাতর হয়ে যান, মা তাঁর প্রেমীকে সেই অনুরূপ বা তার থেকেও অধিক পীড়া প্রদান করে দেখান আর শেখান যে, পীড়া তাদের এই কারণে অনুভূত হচ্ছেনা কারণ তারা আঘাত পেয়েছে। পীড়ার উৎস আমিত্ব, আত্ম। যতক্ষণ ব্যক্তি আত্মভাবে ভাবাপন্ন, ততক্ষণই পীড়ার অনুভব। যখন ব্যক্তি আত্মভাব ত্যাগ করে প্রেমে নিমজ্জিত, তখন তাঁর আর পীড়ার অনুভবও হয়না। তবুও দেবী, তোমার মনোভাব শুদ্ধ, তোমার মনোভাবের মধ্যে আত্মভহাব নয়, স্নেহভাব বর্তমান। তাই আমি তোমাকে বরদান প্রদান করলাম যে, আমি যখন যখন অবতরণ করবো, তুমি আমার পরমমিত্র হয়ে অবতরণ করবে। তবে দেবী, সমস্ত সময়ে সমান লিঙ্গেরই সঙ্গী হবে, এই বরদান আমি প্রদান করবো না তোমাকে”।
“দেবী, নারীপুরুষের ভেদাভেদ সর্বাধিক ভয়ঙ্কর ও সহজপ্রসারিত ব্যাধি, আর তার কারণ হলো কামনার হস্তান্তর অতি সহজে সম্ভব এই দুই শ্রেণীর মধ্যে দিয়ে। তাই সময়ে সময়ে সমাজ এমনই ধারণা করে ফেলে যে, পুরুষ মানেই নারীর উপভোগ্য, আর স্ত্রী মানেই পুরুষের উপভোগ্য। এই ভাব সমাজকে পূর্ণ ভাবে বিনষ্ট করে দেয়। স্নেহকে কামনা অতিক্রম করে চলে যায় এই ভাবের কারণে। মমতাকে কামনা পরাস্ত করে দিতে সক্ষম হয়ে যায় এই ভাবের কারণে। তাই সময়ে সময়ে আমাদের বিপরীতকামী লিঙ্গে অবতরণ করতে হবে, আর জগতকে দেখাতে হবে যে, স্ত্রী মানে কামনা নয়, স্ত্রী মানে মমতা। পুরুষ মানে কামনা নয়, পুরুষ মানে উদ্যম, সত্যে যাত্রা করার প্রগল উদ্যম। তাই সেই বরদান আমি আপনাকে দেবো না দেবী”।
দেবী সুগন্ধা হেসে বললেন, “জগন্মাতার সন্তান। তাই কনো সময়ে নিজের সুখস্বাচ্ছন্দ দেখতেই পারেনা। বরদান দেবার কালেও, বাকি সন্তানের চিন্তা … মায়ের যোগ্য ছেলে, এমনিই সকলে বলে না তোমায় মৃষু”।
দেবী হর্ষিতা এতো কথার পরেও সামান্যও না হাসলে, দেবী সুগন্ধা বললেন, “হর্ষিতা, তুই এখনও গম্ভীর কেন?”
হর্ষিতা একটি গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন, “মৃষু যা বললো, তার সার এই যে, মা আর তাঁর সন্তান অর্থাৎ মৃষু, নিজের বাকি সন্তান ও বাকি ভাইবোনেদের উদ্ধারের হেতু, সময়ে সময়ে অনন্ত বিরহ সহ্য করবে, আর এটিই তাঁদের উভয়ের নিয়তি। বিরহ বেদনা সহ্য করলে, তবেই বাকি মেধারা প্রেরণা লাভ করবে মোক্ষযাত্রার। তাই মৃষুও যে মায়ের থেকে লেশ মাত্র ক্ষণ দূরে থাকলে বিরহ বেদনায় কাতর হয়, সেই মায়ের থেকে দূরে আসবে, আর মৃষুকে কাছে না পেলে মা যেই পরিমাণ বেদনাগ্রস্ত হন, সেই বেদনাও তিনি ধারণ করবেন। … আমি আরো একটি বরদান চাই, তবে এবার মায়ের থেকে বা মৃষুর থেকে নয়, তোমাদের সকলের থেকে। বলো দেবে সেই বরদান”।
দেবী সুগন্ধা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “আমরা! বরদান! … আমরা কি বরদান দেবো তোকে হর্ষিতা?”
হর্ষিতা উগ্রতার সাথে বললেন যে, “তোমাদের সকলকে মোক্ষ থেকে দূরে থাকতে হবে। আমার আর মৃষুর সাথে বারবার আসতে হবে তোমাদেরকেও। … মনুষ্য জগতে আমরা দেখেছি যে, সামান্য মেধাবী মনুষ্যের বাণীকেও ঐশ্বরিক বাণীর মর্যাদা দিয়ে দেয় মানুষ, আর তার কারণে অনেক সময়েই তাঁরা ভ্রমিত হয়ে যায়, কারণ অবতারের বাণী সেই তীব্রতার সাথে প্রচারিত হয়না, যতটা কামনার অধীনে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে হয়। সোজাসুজি কারণ এর এই যে, অবতার যে কামনার অতীতে স্থিত, আর তাই সে প্রচারের আলোক থেকে দূরে থাকে। তাই তোমাদের সকলকে আসতে হবে। প্রচার করতে হবে মৃষুর সেই অবতারের কথা ও বাণী, যাতে করে মৃষু আর মায়ের এই অসামান্য বিরহবেদনা কখনো বিফল না যেতে পারে”।
সুগন্ধা হর্ষিতার সম্মুখে এসে তাঁর মাথায় হাত রেখে বললেন, “গর্ব হয় যে, আমরা তোর সহচরী। … এতটা আত্মবিমুখ আমরা এখনো হতে পারিনি, যতটা তুই হয়েছিস। .. বেশ, আমরা সকলে প্রস্তুত, বারবার অবতরণ করতে। কথা দিলাম। শুধু মা আমাদের সমর্থন দিলেই, আমরা চলে আসবো, কারণ কর্তা তো এক তিনিই”।
