৭। নির্বাণকবচ কাণ্ড
সংহারের রাজ্যে প্রবেশ করতে গেলে, সংহারের সেনারা এবং দ্বাররক্ষকরা পথ আটকে দাঁড়িয়ে রইলে, অম্বারূপ হুংকার ছাড়লেন, “যদি নিজেদের ভালো চাও, পথ ছেড়ে দাও। পথ ছেড়ে দিলে, আমি তোমাদের দিকে ফিরেও তাকাবো না। কিন্তু যদি না ছাড়ো, আমি কারুকে জীবিত থাকতে দেবনা”।
দ্বারপালরা সম্মুখে এসে বললেন, “জানি দেবী, আপনার সামনে আমরা খরকুটোও নই। মুহূর্তের মধ্যে আমাদেরকে বিনষ্ট করে দেবেন আপনি। কিন্তু আমরা আমাদের স্বামীর রক্ষক। তাঁর রক্ষা করতে মৃত্যু লাভ করাও আমাদের ধর্ম। দেবী, জীবনযুদ্ধের, জীবনসংগ্রামের শিক্ষা আমরা সকলে মৃষুর থেকেই পেয়েছি। তাঁর কথানুসারেই, জীবনযুদ্ধে সদা অংশগ্রহণ করতে হয়। প্রতিকুল অবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করাই জীবনের ধর্ম। সত্যের পক্ষে স্থিত হয়ে যুদ্ধ করে মৃত্যু লাভ করলে, সাধুর জীবন লাভ হয় এবং পুনরায় সত্যের পক্ষ হতে যুদ্ধ করার সুযোগ লাভ হয়। অসত্যের পক্ষ থেকে যুদ্ধ করলেও পুনরায় জীবন লাভ হয় তবে তা হয় অসাধুর পক্ষে, আর প্রতিকুল অবস্থা থেকে সত্যকামী হয়ে ওঠার পুনরায় সুযোগ লাভ হয়। কিন্তু জীবনযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলে, পিশাচ হয়ে ভটকে যেতে হয়, দেহলাভ হয়না, জীবন লাভ হয়না”।
“আর মৃষু এও বলেন যে, অসত্যের পক্ষে স্থিত হয়ে যুদ্ধে বিজয় লাভ অসম্ভব, কারণ এই পক্ষের হয়ে যুদ্ধে জয়লাভ মানেও পরাধীনতাই স্বীকার করা, আর যতক্ষণ না যুদ্ধের শেষে স্বতন্ত্রতা লাভ হয়, ততক্ষণ বিজয়লাভ অসম্ভব। বিজয় লাভ একমাত্র সত্যের পক্ষ থেকেই সম্ভব, আর যদি মৃত্যু লাভ না করে বিজয় লাভ করা যায়, তাহলেই পূর্ণ স্বতন্ত্রতা, অর্থাৎ মোক্ষ বা নির্বাণলাভ”।
“দেবী, আমরা সত্যের পক্ষ থেকে যুদ্ধ তো করছিনা। তাই বিজয়লাভ তো সম্ভবই নয়। কিন্তু বিজয়লাভ সম্ভব নয় জেনে যদি আমরা যুদ্ধ করা থেকেই বিরত থাকি, এর অর্থ আমরা পিশাচযোনি লাভ করে, জীবন থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যাবো। তা আমাদের স্বীকার্য নয়, কখনো নয়”।
“দেবী, মৃষু বলেন, জীবন মানে আলোক, আর মৃত্যু মানে সেই আলোককে দেখতে সক্ষম হলেও অন্ধকারে বিরাজ করা। পিশাচের অর্থ হলো মৃত্যু উপরান্ত অবস্থাতে সহস্র সহস্র বৎসর বিরাজ করা এবং জীবনে অর্থাৎ আলোকে বা দেহে প্রত্যাবর্তন না করতে পারা। অর্থাৎ, পিশাচ হয়ে থাকার অর্থ, জীবনরূপ আলোককে দেখতে পাবো কিন্তু ছুঁতে পারবো না, আর ছুঁতে না পেরে আলোককে দেখেও অন্ধকারেই বিরাজ করতে হবে আমাদেরকে”।
“হ্যাঁ তিনি, এও বলেন যে, না তো সেই আলোক সত্য, আর না তো সেই অন্ধকার যেখানে থেকে আলোককে দেখা যায় তা সত্য। সত্য তো সেই অন্ধকার, যেখানে দাঁড়িয়ে আলোক বা অন্ধকার কনো কিছুরই কনো বোধ থাকেনা, অর্থাৎ পূর্ণ ভাবে নিরাকারত্বই সত্য, পূর্ণ ভাবে মুক্ততাই সত্য, পূর্ণ ভাবে অসীমত্বই সত্য। কিন্তু সেই সত্যে তো পৌছতে হলে সত্যের পক্ষ থেকে যুদ্ধ করতে হবে আমাদের। কিন্তু আমরা সেই কর্ম করিনি, যার কর্মফলস্বরূপ আমরা সত্যের হয়ে যুদ্ধে অবতরণ করতে সক্ষম”।
“কিন্তু দেবী, তা বলে আমরা সেই বিভীষিকাপূর্ণ অবস্থায় পতিত হতে রাজি নই, যেখানে আলোককে দেখতে পাবো, কিন্তু ছুঁতে পারবো না। … যদি আলোকে থাকতে পারি, অর্থাৎ জীবনে প্রত্যাবর্তন করতে পারি, হ্যাঁ হতেই পারে যে পুনরায় আমরা অসত্যের পক্ষেই দাঁড়িয়ে থাকবো। কিন্তু এক না একদিন ঠিকই আমরা সত্যের পক্ষে স্থান পাবো। হ্যাঁ হাজারো বার সত্যের পক্ষে থেকে যুদ্ধ করেও পরাজিত হবো, কিন্তু সম্ভাবনা থেকেই যাবে বিজয়ের, পূর্ণ স্বতন্ত্রতার, পূর্ণমুক্তির, কেয়ামতের। কিন্তু যদি যুদ্ধ না করি আমরা, তাহলে যে সেই অন্ধকারে পতিত হবো, যেখানে স্থিত হয়ে স্বতন্ত্রতাও পরাধীনতার দ্বিতীয় নাম হয়ে থেকে যায়। তাই আমরা যুদ্ধ করবো। আপনার হাতে নিহত হবো জেনেও যুদ্ধ করবো”।
৭.১। সংহার পর্ব
দেবী অম্বারূপ সেই কথা শুনে তৃপ্ত অবশ্যই হলেন, কিন্তু শান্ত হলেন না। ক্রোধের প্রভাবে প্রভাবিত তিনি। তাই ধুন্ধুমার করা শুরু করলেন এবং সংহারের প্রায় সমস্ত সেনার বিনাশ করা শুরু করলেন। সেই কীর্তি দেখে সংহার ভয়ার্ত হয়ে উঠলে, পরমাত্ম তাঁর সম্মুখে উদিত হলেন এবং বললেন, “সংহার চিন্তা কেন করো? অম্বা আমার বশে। সে মৃষুকে পরাস্ত করতে পারবে না”।
সংহার চিন্তিত ভাবে বললেন, “কি বলছেন প্রভু? দেবী আপনার বশে? যাকে এতো কোটি কোটি বর্ষ নিজের বশে করতে পারলেন না, তাঁকে এতো সহজে নিজের বশে করলেন কি করে?”
পরমাত্ম খল হাস্য প্রদান করে বললেন, “স্থূলে অবস্থান করলে, কবে আমি তাঁকে আমার বশে করে নিতাম! … সূক্ষ্ম পর্যন্তই সে অধিষ্ঠান করছিলো, তাই এতকাল তাঁকে বশ করতে পারিনি”।
সংহার প্রশ্ন করলেন পূর্ণ ভাবে জিজ্ঞাসু হয়ে, “কিন্তু প্রভু, দেবী তো এখনও সূক্ষ্ম রূপেই বিরাজমান। তাহলে?”
পরমাত্ম পুনরায় খল ভাবে হাস্য হেসে বললেন, “এই তো সেই সঠিক সময় বশ করার সংহার। যতক্ষণ না স্থূলে থেকে মেধা নিজের স্বরূপকে সনাক্ত করতে পারছে, ততক্ষণই সময় তাকে বশ করে নেবার। একবার যখন স্থূলে থেকেও, নিজের স্বরূপকে সনাক্ত করে নিতে সক্ষম হয় মেধা, তখন স্থূলের, সূক্ষ্মের ও কারণের মেধা একাকার হয়ে স্বরূপে অর্থাৎ চেতনাতে পরিবর্তিত হয়ে যায়, আর তখন আমার আর কিছু করার থাকেনা। … আর অম্বা! অম্বা তো চেতনাও নয়, সে তো পরাচেতনা। সে বশ হয়ে গেছে মানে এবার সমস্ত চেতনা আমার বশ হয়ে যাবে। পথে বাঁধা কেবল মৃষু আর মৃষুর নির্মিত বারুদা ব্রহ্মাণ্ড”।
“মৃষুকে আবাহন করো, আর তোমার পক্ষ থেকে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করাও। কেননা মৃষু আমার বশে নেই, আর অম্বা আমার বশে অবস্থান করছে আমার প্রদান করা ক্রোধ অস্ত্রে আহত হয়ে, তাই মৃষু অবশ্যই এই যুদ্ধ জিতবে। কিন্তু সে নিজের মায়ের নিধন কিছুতেই করবেনা। অর্থাৎ আমরা বিজেতা হয়েও বিজয় উৎসব করতে পারবো না। তাই একটা কাজ করতে হবে তোমাকে সংহার”।
“মৃষুকে আবাহন করে, তাঁর মধ্যে একটি প্রশ্ন চিহ্ন স্থাপন করে দাও। … সে যে ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ করে, আমার অধিকার থেকে সেই ব্রহ্মাণ্ডকে অপসারিত করেছে, তা কেন করেছে, সেই সন্দেহের বীজ তাঁর মধ্যে স্থাপন করে দাও। যদি সেই বীজ আজ স্থাপন করে দিতে পারো, তাহলে মৃষু সেই বীজের কারণে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজের মা’রই হত্যা করে দেবে। আর সাথে সাথে সেও নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে শীঘ্র, আর তখন আমি তাঁকে আমার বশে করে নিয়ে, তার নির্মিত ব্রহ্মাণ্ডের নাশ করে স্বয়ং মৃষুর নাশ করে, এই সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র ঈশ্বর হয়ে উঠবো”।
সংহার প্রশ্ন করলেন, “কি বলতে হবে আমাকে প্রভু? আমি মৃষুকে ঠিক কি বলবো, আমাকে বলে দিন। বাকজালে দেবীকে তাও পরাস্ত করা যায়, কিন্তু মৃষুকে বাকযুদ্ধে পরাস্ত করা প্রায় অসম্ভব মনে হয় আমার। তাই আমার মার্গ দর্শন করুন প্রভু”।
পরমাত্ম মৃদু হেসে বললেন, “তেমন কিছু নয়, শুধু তাঁর মনে প্রশ্ন চিহ্ন তুলে দেবে যে, সে অহেতুকই, আর আবেগের বশে একটি ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ করেছে, আর এমন করে সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের বাস্তবতার উপর প্রশ্ন চিহ্ন স্থাপন করে দিয়েছে। … বাকি সমস্ত কিছু সেই প্রশ্নই, আর সেই সন্দেহই করে দেবে তার মধ্যে। সেই প্রশ্নই তাঁকে অস্থির করে দেবে, আর তাঁর নিজের উপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হনন করে নেবে”।
সংহার সেই কথা শুনে তৃপ্তির হাসি হেসে মৃষুকে আবাহন করলেন। মৃষুও প্রস্তুত ছিলেন এই আবাহনের জন্য। তাই মৃদু হেসে, নিজের সূক্ষ্মরূপকে সংহারের সম্মুখে স্থাপন করে সংহারের উদ্দেশ্যে বললেন, “এমনিতে তোমার আবাহনে আমি কখনোই সারা দিতাম না। কিন্তু আমার এক বেশে আমি তোমার প্রপিতাকে বচন দিয়েছিলাম যে, তাঁর সুকর্মের কারণে তাঁর প্রজন্মের যেকেউ আমাকে যখন আবাহন করবে, অন্তত একটি বারের জন্য তার সহায়তা আমি করবো”।
“যদিও জেনে রেখো সংহার, আমার এই বচনের একটি শর্তও ছিলো। আর তা এই ছিলো যে, যদি আমাকে আবাহন করে, সত্যের উদ্দেশ্যে চালিত হয় তার প্রজন্ম, তবেই আমি তার দ্বিতীয় আবাহনে সারা দেব, নচেৎ দ্বিতীয়বার আর সারা দেবনা। আর যদি সারা না দিই, তাহলে আমার তাকে দেওয়া বচনের খণ্ডন হয়ে যাবে। অর্থাৎ তার পরবর্তী কনো প্রজন্মই আমাকে আবাহন করে সারা পাবে না। এই সম্পূর্ণ কথা জেনে রেখে, তোমার আমাকে আবাহন করার কারণ ব্যক্ত করো”।
সংহার মাথা নত করে বললেন, “এই কথা আমি জানি প্রভু। তা জেনেই আপনার আবাহন করেছি। বড়ই বিপদের মধ্যে স্থাপিত আমি। আর সেই বিপদের সাথে কনো না কনো ভাবে যুক্ত যা, তা হলো আপনার নির্মাণ করা নবব্রহ্মাণ্ড। কেন সেই নবব্রহ্মাণ্ড আপনি স্থাপন করলেন প্রভু? না আপনি সেই নবব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ করতেন, আর না ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যেই এই শত্রুতার বীজ স্থাপিত হতো! দেখুন না, আপনার নির্মাণ করা ব্রহ্মাণ্ডের কারণে, এই বৃহত্তর ব্রহ্মাণ্ডকে স্বীকার করা বা না করার দ্বিমত এসে উপস্থিত হয়ে গেছে। আর সেই দ্বিমতের কারণেই স্বয়ং মাতা এই বৃহত্তর ব্রহ্মাণ্ডকে নষ্ট করতে এখানে উপস্থিত হয়ে গেছেন”।
মৃষু এই কথা শুনে, ঈষৎ হাস্য প্রদান করে বললেন, “সংহার, যার শব্দ তোমার মুখ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে, ভুলে যাচ্ছ যে, তিনি আমার জন্মদাতা পিতা, আর তাঁর সাথে আমার সুদীর্ঘ ১০ সহস্র সালের অখণ্ড যুদ্ধ হয়ে এসেছে। … (মিষ্ট হেসে) সংহার, মৃষু নিজের মিত্রের সম্বন্ধে অত্যন্তই কম জানে কারণ মিত্রকে সে বিশ্বাস করে। কিন্তু শত্রু! শত্রুকে শত্রুর থেকেও ভালো জানে মৃষু। আর তার প্রমাণ এই যে, এই বৃহত্তর ব্রহ্মাণ্ড যার নির্মিত, সেই নির্মাতার বিরোধিতা সহস্র বৎসর করার পরেও মৃষু আজ জীবিত”।
“তাই সংহার, (পুনরায় মিষ্ট হেসে) প্রথম কথা এই যে, না বৃহত্তর ব্রহ্মাণ্ড, আর না আমার নির্মিত ব্রহ্মাণ্ড, স্বীকার তো দুটিকেই করা উচিত নয়। এক কথায় বলতে হলে, যেই ব্রহ্মের দুই সম্ভবই নয়, সেই ব্রহ্মের অণ্ড হওয়া যে সম্ভব, এটিকেই নস্যাৎ করা প্রথম প্রয়োজন। এই ব্রহ্মাণ্ড, অর্থাৎ তোমার মতে যা বৃহত্তর ব্রহ্মাণ্ড, বা তোমার আরাধ্যের নির্মিত ব্রহ্মাণ্ড, তাঁর নির্মিত ব্রহ্মাণ্ডে এই মহা অসত্যকে সত্য বলে স্থাপন করে রেখেছেন যে, অনন্ত, অসীম, অখণ্ড ব্রহ্মের অণ্ড অর্থাৎ দ্বিতীয় কনো অংশও সম্বব”।
“সেই মহা অসত্য তোমার ভাষায় এই বৃহত্তর ব্রহ্মাণ্ডকে সম্পূর্ণ ভাবে ভ্রমজালে আবদ্ধ করে রেখেছে, যার থেকে মুক্তি লাভ অসম্ভব হয়ে গেছিল। আর সেটিই প্রথম কারণ এই নব ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের, যার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো এই সত্যকে স্থাপন করা যে ব্রহ্মাণ্ড সত্য নয়, অসত্যে স্থাপিত থেকে সত্যে যাত্রার মাধ্যম মাত্র। … তবে তুমি এখানে বলবে যে, এই অসত্য তো বহুকাল ব্যাপী স্থাপিত, তাহলে এই নবব্রহ্মাণ্ডের প্রয়োজন এখনই কেন হলো! এই তো?”
“সংহার, নিশ্চিত ভাবে তুমি জানো না, কারণ জানলে তুমি আমাকে এই প্রশ্ন করতেই পারতে না। তাই তোমাকে স্পষ্ট করে বলে দিই একটি কথা। তোমার ভাষায় এই বৃহত্তর ব্রহ্মাণ্ডের বুকে দাঁড়িয়ে প্রথম মুক্তির আশা জন্মেছিল যেদিন ধরিত্রী দেবী সেই মুক্তিদানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, এবং সেই কাজে নিজেকে সমর্পিত করেছিলেন। তোমার আরাধ্য তাঁকে সমস্ত প্রকার বাঁধা প্রদান করলেও, সে ভুলে গেছিল যে, যেই মেধার বলে সে ধরিত্রীকে অপদস্থ করার প্রয়াস করছে, সেই মেধার জননী আমার মা, স্বয়ং ব্রহ্মময়ী পরানিয়তি”।
“তাই তোমার আরাধ্য আমার মাতার কূটনৈতিক চালের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে, এই দ্বন্ধে পরে যান যে, এই ধরিত্রী যা মুক্তির কাণ্ডারি হতে সচেষ্ট, তাকে রাখা উচিত নাকি নষ্ট করা উচিত? কেন এই দ্বন্ধ? কারণ মা এই ধরিত্রীতে সমস্ত মেধা অর্থাৎ তাঁরই ভ্রূণঅংশকে পরমাত্মের আবেশে স্থূলরূপ প্রদান করা শুরু করেছিলেন। পরমাত্ম দেখলেন, এই তাঁর কাছে সুযোগ। স্থূল রূপ মানে, সূক্ষ্মজগতের ঘটমান সত্যের থেকে বিস্মৃতি, অর্থাৎ সমস্ত মেধাকে বশ করে রেখে, তাদের কাছে নিজেকে পরমেশ্বর রূপে স্থাপন করে, সকলের আরাধ্য হয়ে যাওয়া সম্ভব”।
“এই দ্বৈরথের কারণে, ধরিত্রী মুক্তির প্রণেতা জেনেও, তোমার আরাধ্য পূজা লাভের লোভে নিজের জালে নিজেই বশীকরণ স্বীকার করে নিলেন। আমার মা, অতি কৌশলে, বহু সময় নিয়ে, একটি একটি করে উন্নত যোনির নির্মাণ করা শুরু করলেন। এতটাই সময় নিয়ে সেই কাজ করছিলেন আমার মা যে, পরমাত্ম ভুলেই গেছিলেন যে ধরিত্রীর প্রধান উদ্দেশ্যই মুক্তির পথ নির্মাণ করা। তাঁর দৃষ্টি শুধু একটি ব্যাপারকেই সত্য মেনে চলেছিল, আর তাই এই যে যত উন্নত যোনি, তত উন্নত ভাবে মেধার প্রকাশ হবে, আর যত উন্নত ভাবে মেধার প্রকাশ হবে, ততই অধিক সুযোগ থাকবে তার কাছে নিজেকে ঈশ্বর রূপে প্রচার করার”।
“মা তাঁর এই ভ্রমে আবদ্ধ থাকার অন্তরালে মনুষ্য যোনির নির্মাণ করে ফেলেন, কিন্তু পরমাত্মের তখনো বোধ জন্মায় নি যে ঘটনাসমূহ কোন দিশাতে যাচ্ছে। সেই বোধ ফিরে এলো তাঁর কাছে যখন বৌদ্ধ ও ইসলাম দর্শন একত্রে মানবের মধ্যে বিস্তার লাভ করলো। … মুক্তির হিল্লোল জেগে উঠলো, যাকে বৌদ্ধরা বললেন নির্বাণ, আর ইসলাম বললেন কেয়ামত। … পরমাত্মের সমস্ত স্মৃতি ফিরে আসে, এই কেয়ামত আর নির্বাণ শব্দের কারণে”।
“স্মরণ এসে যায় তার যে, ধরিত্রী তো মেধাসমূহকে মুক্তি প্রদান করার দায়িত্ব নিয়েই অস্তিত্বে এসেছিলেন! উপলব্ধি জাগে তাঁর যে, বৃক্ষ, কীট, মৎস্য, ভুজঙ্গ থেকে শুরু করে তৃণভোজী, মাংসাশী তথা উভোভোজী যোনিসমূহ ধরে ধরেই যে মনুষ্য নামক যোনির অবতারণা করা হয়েছে, আর এই মনুষ্যযোনি যে মেধাকে চেতনারূপে প্রকাশ করে নির্বাণ বা কেয়ামত ধারণ করে তাঁর বশ্যতাকে চিরবিদায় জানিয়ে ব্রহ্মে লীন হতে সক্ষম!”
“যেই পরমাত্ম এতদিন হাতে হাত রেখে শুধুই নিজেকে ঈশ্বর বলে স্থাপন করার মোহে আটকে ছিলেন, তিনি আবার চনমনে হয়ে উঠলেন। সমস্ত কিছু বহুদূর প্রসারিত হয়ে গেছে, এই বোধ জাগতে, তিনি এবার একটি প্রজাতির নির্মাণ করলেন, যার দ্বারা বৌদ্ধ এবং ইসলামদের বিরোধ করতে পারবেন। আবশ্যক হয়ে গেছে এই বিরোধ কারণ যদি এই বিরোধ না হয়, তাহলে সমস্ত মনুষ্যযোনির মধ্যে বিরাজ করা মেধাসমূহ তাঁর বশ্যতাকে অস্বীকার করে এগিয়ে যাবে মুক্তির দ্বারে”।
“এই জাতির নাম হলো ইহুদি। বৌদ্ধ শান্ত প্রকৃতির। ইহুদিদের থেকে মানবের, মেধাসমূহের তথা ধরিত্রীর বিপদ জেনেও, তাঁরা ইহুদিদের সাথে সংঘাতে জরালেন না। কিন্তু ইসলাম শান্ত হলেও, শত্রুবিনাশে উগ্র হতে তারা ভীতও নয়, দ্বৈরথেও স্থিত নয়। তাই ইহুদির বিনাশ কর্মে ইসলাম উদ্যত হলেন। তাই ইহুদিদের তোমার আরাধ্য বুদ্ধি দিলেন, বিভিন্ন ভাগে ভেঙে যেতে, যাতে তাদের কনো না কনো এক প্রজাতি জীবিত থেকে যায় আর তার পরিকল্পনাকে বাস্তব করে তুলতে পারে”।
“যেই যেই চার ভাগে তারা ভেঙে গেছিলেন, তারা চারটি সভ্যতা নির্মাণ করে। একটি হলো ব্যাবিলনিয়ান সভ্যতা, একটি হলো মিশরিয় সভ্যতা, একটি সিন্ধু সভ্যতা আর অন্যটি ইহুদি স্বয়ং, যারা গুহাবাসী হয়ে লুকিয়ে থাকতেন। … ইসলাম হানার সাথে সাথে প্রকৃতিও এই চার অংশকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার পথেই চলছিলেন তাদেরকে, যারা মানবতার বিরোধী, যারা সত্যের বিরোধী আর যারা এই কাল্পনিক ব্রহ্মাণ্ডকেই সত্য জ্ঞান করেন। … তাই সময়ের সাথে সাথে, মিশরিয় সভ্যতা, যা ইউফ্রেটিস নদীর তীরে অবস্থিত ছিলো, তার বিনাশ হয়, ব্যাবিলনিয়ান সভ্যতা যা মিসিসিপি নদীর তীরে অবস্থিত ছিলো, তার বিনাশ হয়, এবং সিন্ধু সভ্যতা, যা সিন্ধু নদের উপকুলে স্থিত ছিল, তারও বিনাশ হয়”।
“কিন্তু এঁদের সভ্যতার বিনাশ হলেও, এঁদের বিনাশ হয়না। মিশরিয়রা অতিপশ্চিমে পলায়ন করে মায়ান সভ্যতার নির্মাণ করে, নিয়মিত অধ্যাবসা করা শুরু করে প্রকৃতিকে জানার, সেই প্রকৃতিকে জানার যার সামনা সামনি হবার সামর্থ্য তাদের ছিলো না। সেখানেও বিনাশ লীলা হলে, তারা দক্ষিণ আমেরিকাতে চলে যায়, আর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে গিয়ে, নিজেদের প্রাণরক্ষা করে”।
“ব্যাবিলনিয়ানরা আরো পশ্চিমে চলে এসে, গ্রিক অর্থাৎ যবন বেশে অবস্থান করা শুরু করে, আর স্থাপত্যসর্বস্ব জীবনধারার অবতারণা করা শুরু করে। … আর সিন্ধুসভ্যতার ব্যক্তিগণ জম্বুর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে, এবং নিজেদেরকে আর্য বলে দাবি করে, অর্থাৎ সকলের শিক্ষক বেশে নিজেদের স্থাপনের প্রয়াস করে। এই স্থানগুলিতে ইসলাম বিস্তার না থাকার কারণে নিজেদের সুরক্ষিত মনে করে তারা। কিন্তু জম্বুদেশে বৌদ্ধ আর বৌদ্ধ তথা সাংখ্যের পথানুগামী জৈনদের সম্মুখীন হয় তারা”।
“প্রকৃতিকে সম্যক ভাবে জানা, পরমাত্মকে বিস্তারিত ভাবে জানা সেই জাতিদ্বয়ের সম্মুখে এসে নতুন ধারার বাঁধার সম্মুখীন হয় আর্যরা। ইসলামের জ্ঞানের প্রহারের থেকেও তাদের স্থূল দেহের আঘাত অধিক ঘাতক ছিলো, কিন্তু বৌদ্ধ আর জৈনদের আঘাত ছিলো পূর্ণ ভাবে সূক্ষ্মদেহে। আঘাতে জেরবার হয়ে গেলে, পরমাত্মের প্রেরণাতে এঁরা বৌদ্ধদের থেকে প্রকৃতি শিক্ষা গ্রহণ করে, তাকে বিকৃত ভাবে স্থাপন করে করে, পরমাত্মকেই কামনাপূর্তির ওষধিপ্রদান করা ঈশ্বর রূপে স্থাপন করা শুরু করে দেয়”।
“কামনার বীজ বপন করে সমস্ত প্রকার আবেগকে অর্পণ করলে, সমানে জম্বুদেশের অধিবাসীরা আত্মসর্বস্ব হওয়া শুরু করে, এবং অপবিত্র হওয়া শুরু করে দেয়। … কিন্তু এই সমস্ত কিছুর অন্তরালে আরো একটি খেলা চলছিলো, যার ধারণা ইহুদি বা তাদের কনো প্রজাতির মধ্যেই ছিলোনা, আর তা হলো এই মৃষুর নির্মাণ। সমস্ত মেধার সাথে সংলাপে বাঁধাপ্রাপ্ত হওয়া পরাচেতনা স্বয়ং একটি সন্তানের নির্মাণ করেন, যিনি তাঁর মায়ের মুখ হয়ে সকল মেধাদেরকে সত্যের কথন শ্রবণ করাবে”।
“এই কথা ইহুদিরা না জানলেও, পরমাত্ম জানতেন। আর জানবেন নাই বা কেন? স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ, এই তিনে একত্রে বিরাজমান করতে হতো মৃষুকে, আর তাই পরানিয়তি যে তাঁর সেই সন্তানের বীজকে ধারণ করেছিলেন পরমাত্মের থেকেই, কারণ পরমাত্মের কল্পনার মধ্যেই এই স্থূল ব্রহ্মাণ্ড বিরাজ করে, অন্যত্র এই ব্রহ্মাণ্ডের তো কনো অস্তিত্ব কনো কালেই নেই”।
“কিন্তু পরমাত্ম এই প্রকাণ্ড যুদ্ধে ইহুদিদের যুক্ত করতে চাননি, কারণ তিনি জানেন যে ইহুদিরা মৃষুর সাথে যুদ্ধে পেরে উঠবে না। মৃষু প্রকৃতির পুত্র, আর তাই মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত প্রকৃতিকেই নিয়ন্ত্রণ করে নিয়ে যেকোনো জাতি, প্রজাতিকে মুহূর্তের মধ্যেই অবলুপ্ত করে দিতে পারে। অর্থাৎ যদি কনো জাতি বা প্রজাতি মৃষুর সাথে সংঘাতে যায়, সেই জাতির অবলুপ্তি কেবলই একটিবার মৃষুর আগ্রাসনের অপেক্ষা। তাই মৃষুর সাথে যুদ্ধ তিনি স্বয়ং লড়তে থাকলেন, আর বৌদ্ধ, ইসলামের সাথে যুদ্ধে ইহুদি ও তাদের সমস্ত প্রজাতি-উপজাতিকে সংলগ্ন রাখলেন”।
“কিন্তু মৃষু যে প্রকৃতির কাছে সমর্পিত। স্বয়ং প্রকৃতি তাঁকে চালনা করে। তাই যেই মৃষু এতাবৎ কেবলই জৈন, বৌদ্ধ ও ইসলামদের নবী, তীর্থঙ্কর ও বুদ্ধ হয়ে মার্গদর্শন করছিলেন, তাকে প্রকৃতি নিজের চরমে উন্নীত করার জন্য, সেই জাতিতে স্থাপিত করলেন, যেই জাতি স্বয়ং পরমাত্মের দাস, অর্থাৎ আর্য জাতি। পরমাত্মও বুঝে গেলেন, শ্রেষ্ঠ বিপরীতমুখি শক্তির সামনাসামনি করিয়ে, মৃষুকে তার চরমে উন্নীত করার প্রয়াস হচ্ছে, আর যদি মৃষু নিজের চরমে চলে যায়, তাহলে তার আধিপত্যের দিন শেষ”।
“তাই পরমাত্ম এবার মৃষুর সাথে সরাসরি সংগ্রামে অবতীর্ণ হলেন, এবং সময়ে সময়ে মৃষুর বিভিন্ন কলাপ্রকাশকে বশ করার জন্য তার সাথে যুদ্ধেও রত হলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু লাভ হচ্ছিল না। মৃষুকে কিছুতেই সে পরাস্ত করতে পারছিলো না। তাই এবার পরমাত্ম সাধকুলকে অধিক শক্তিশালী করে তুলে মৃষুর বিরুদ্ধে চালনা করা শুরু করলেন। সাধদের এই বরদান প্রদান করে করে শক্তিশালী করা শুরু করলেন যাতে, এক আমার মা ছাড়া, তাদের কেউ হত্যা করতে পারবেনা”।
“আমার মা কারণ আর সূক্ষ্মতেই অবস্থান করেন কেবল। আর স্থূলে না অবস্থান করলে, সূক্ষ্ম ও কারণকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়না। আর সূক্ষ্ম কারণকে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে, অন্য সমূহ সূক্ষ্ম-কারণকে প্রতিহত তো করা যাবে, কিন্তু নিহত করা যাবেনা। তাই আমার মায়ের থেকে কনো সংকট নেই, এই জ্ঞান করে, কেবল মৃষুরই হত্যা করার জন্য শক্তিসঞ্চয় করাতে থাকলেন সাধদেরকে”।
“কিন্তু এরপরেও মা তেমন খুব একাটা উচাটনতা দেখান নি, কারণ তিনি জানেন যে বরদানের কবচ নিয়ে সাধরা যদি মৃষুর থেকে প্রাণরক্ষা করেও নেয়, মৃষুর প্রাণকে তারা ক্ষতিগ্রস্ত করার সামর্থ্য ধরে না। … কিন্তু এরই মধ্যে, পরমাত্ম একে একে বেশ কিছু ক্রিয়া করে, যার জন্য মা একটি বিক্রাল সংকল্প গ্রহণ করতে বাধ্য হন যে, মনুষ্যযোনির নাশ করতে হবে, এবং এই ব্রহ্মাণ্ডের সকল নিয়মের থেকে মুক্ত একটি অন্য ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ করতে হবে”।
“সেই ক্রিয়াদের প্রথম হলো মনুষ্যদের মধ্যে রমনাস্ত্রের প্রয়োগ এবং বিস্তারলাভ, যাকে তোমরা বলো পরমাণু অস্ত্র। পরমাত্ম যখন কিছুতেই মৃষুকে আটকাতে পারছিলেন না, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন যে এই ধরিত্রী, যাকে কেন্দ্র করে তিনি ঈশ্বর হবার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই ধরিত্রীকেই আর রাখবেন না। আর সেই ধরিত্রীর নাশ করাবেন সেই মনুষ্যদের দিয়েই, যাদের মধ্যে বৌদ্ধ, জৈনয় ও ইসলাম স্থাপিত হবার কারণে জগন্মাতার হৃদয়ে নিজের সমস্ত ভ্রূণস্তব্ধ সন্তানদের নিজের বক্ষে ফিরে পাবার সম্ভাবনা জন্ম নিয়েছিল”।
“আর সেই কারণেই মনুষ্যের হাতে রমনাস্ত্র বা পরমাণু অস্ত্র তুলে দেয়। … মা নিজের সমস্ত সন্তানদের রক্ষা করবেন না, এটা তো হতেই পারেনা। তাই সমস্ত সন্তানদের রক্ষা করতে যদি মনুষ্য নামক যোনির নাশ করতে হয়, তিনি বিন্দুমাত্র সেই বিষয়ে দ্বিধা করবেন না। কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য তাঁর সন্তানদের ফিরে পাওয়া। … মনুষ্য সেই কর্মে রত হয়েছিলেন। তাই ধরিত্রীর মুক্তিযুদ্ধের অন্ত হয়ে যাবে যদি মনুষ্য যোনির নাশ হয়ে যায়। কিন্তু পরমাণু অস্ত্রের অধকারি যোনিকে অস্তিত্বে রাখার অর্থ সমস্ত ধরিত্রীকেই বিনাশের দিকে ঠেলে দেওয়া। তাই সেই যোনির নাশ আবশ্যক”।
“সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্যযোনি যে পরমাত্মের প্ররোচনাতে পদাচরন করলেন, তার একটিই কারণ, এই ব্রহ্মাণ্ডের নিয়ম। তাই আবশ্যক হয়ে গেল নূতন ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের। এই গেল একটি বিশেষ কারণ নবব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের। তবে আরো একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, কেন এই সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এই নবব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ করা হলো?”
“এর উত্তর পেতে গেলে, যোনির সত্যের তরে বিকাশের মার্গকে অনুধাবন করতে হবে। কোন মার্গে চললে, একটি যোনির সত্যের তরে বিকাশ হয়? জানো তুমি সেই কথা সংহার?”
সংহার মৃষুর জ্ঞানের পরিধি দেখে বিস্মৃত হয়ে গিয়ে বললেন, “না প্রভু, কনো ধারণা নেই। এতো অপার জ্ঞান থাকলে যে আমি আমার প্রপিতার মতই পূর্ণ ভাবে আপনার অনুগামী হয়ে যেতাম। … তা যে হতে পারিনি, এটিই প্রমাণ করে যে অজ্ঞানতা আমাকে বশ করে রেখে দিয়েছে। কৃপা করে আমাকে এই জ্ঞান প্রদান করুন”।
মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “সংহার, কলাবিদ্যাই হলো একটি যোনির বিকাশের মূল স্রোত। কলাবিদ্যা একটি যোনির স্থূল দেহকে সূক্ষ্ম মেধার সাথে সংযুক্ত করে দেয়, এবং মেধার চেতনার উদ্দেশ্যে বিস্তার হওয়াকে সুগম করে দেয়। এই কলাবিদ্যার উপরেই বিজ্ঞান, বাণিজ্য, ইত্যাদি সমস্ত কিছু দাঁড়িয়ে থাকে। বিজ্ঞান, বাণিজ্য, জীবনধারণা, পদার্থধারণা, ভৌতধারণা, সমস্ত কিছুর জননী হলো কলাবিদ্যা। যখন একটি সমাজে কলাবিদ্যাকে বশ করে রেখে দেওয়া হয়, তখন সেই সমাজে যোনির বিকাশ অসম্ভব হয়ে যায়”।
“মানুষের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এই যোনি ধন নামক ব্যবস্থার নির্মাণ করেছিলো যাতে করে সমস্ত উন্নতির সার সকল মনুষ্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, আর সাথে সাথে যারা সেই উন্নতির কাণ্ডারি তাদেরকেও উন্নতির পথ নির্মাণে সচল রাখা যায়। কিন্তু সেই ধনকে মানুষ শীঘ্রই মনবিকৃতি করে দেয়, আর তাই ক্রমশ সমস্ত মনুষ্য এই ধনের কাছে দাসত্ব স্বীকার করে নেয়। আর তো আর, যেই কলাবিদদের মার্গদর্শনে এই যোনির উত্থান সম্ভব ছিলো, সেই কলাবিদদেরও ধনবিলাসীরা অধিগ্রহণ করে নিয়ে, নিজেদের ইচ্ছামত চালনা করা শুরু করে দেয়”।
“সঙ্গীত, কাব্য, সাহিত্য, চিত্র, চলচ্চিত্র সমস্ত কিছুই ধনবিলাসীদের মূর্খদৃষ্টিকোনকে তোষামোদ করার উদ্দেশ্যে রচিত করা শুরু হয়ে যায় মনুষ্য সমাজে, আর তাই মনুষ্যের উত্থান সম্পূর্ণ ভাবে স্থগিত হয়ে যায়। যার উত্থান হয় তা হলো যান্ত্রিকতার, শত শত প্রকার ভেদাভেদ সৃষ্টি করা মন্ত্রের ও তন্ত্রের। মনুষ্যের জ্ঞানের স্ফীতি সেদিনই আটকে যায়, সীমিত হয়ে যায়, এবং স্থগিত হয়ে যায়, যেদিন থেকে ধনমুখি ব্যক্তিগণ কলাচর্চাকে ধনের অধীনে স্থিত করে দেয়। আর তাই, এই যোনি আজ একটি মৃত যোনি। যেই যোনির মধ্যে জ্ঞানের সঞ্চার হওয়া অসম্ভব হয়ে যায়, তাকেই মৃত যোনি বলে। মনুষ্যের অপেক্ষা আজকে সমস্ত অন্যযোনি অধিক জ্ঞানী। হ্যাঁ, তাঁরা বিচার করতে পারেন না মনুষ্যের মত, কিন্তু তাঁরা প্রকৃতিকে জানে, যা মনুষ্য সামান্যও জানেনা, এই বর্তমান মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। … তাই যেখানে ধনের আধিক্য কিছুতেই মাত্রাতিরিক্ত হতে না পারে, আর মনুষ্য যোনির বিনাশের পরও যাতে ধরিত্রীর মুক্তিযুদ্ধ স্থগিত না হয়ে যায়, সেই উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয় নবব্রহ্মাণ্ড”।
“সংহার, তোমার প্রভু, অর্থাৎ আমার পিতা আমার সাথে আমার জন্মের পূর্ব থেকেই শত্রুতা ধারণ করে উপস্থিত ছিলেন। তাই যখন আমি আমার মায়ের গর্ভে, স্বয়ং জগন্মাতার চেতনায় স্নান করছিলাম, তখন থেকেই আমি তাঁর সাথে যুদ্ধে রত। তাই তাঁর সমস্ত যুদ্ধকৌশল সম্বন্ধে আমার ধারণা আছে। … আমি জানি, তুমি যেই প্রশ্ন করলে আমাকে, সেই প্রশ্ন তোমার হলেও, সেই প্রশ্ন করার প্রেরণা তাঁর। তাঁর কৌশলই এইরূপ”।
“তাঁর অস্ত্রই হলো আবেগ সমূহ। সকল জীবের অন্তরে তিনি ‘আমি’ বা ‘আত্ম’ বেশে বিরাজমান। আর সেই বিরাজমান আমিত্বকে তিনি তাঁর অস্ত্রসমূহ অর্থাৎ আবেগ দ্বারা উত্তপ্ত করে দেন। একবার আবেগ তাতে ধরে গেলে, অন্তরে বিরাজ করা আত্ম জেগে ওঠে, আর সে জেগে উঠলেই, সমস্ত ভাবে সেই জীবকে নিজের বশে করে নেয় তোমার আরাধ্য। … তোমার আরাধ্যা জানেন যে, তাঁর এই কুপুত্রকে অন্য কনো আবেগ দ্বারা উত্তপ্ত করা যাবে না। তাই তাঁকে দ্বন্ধের মধ্যে স্থাপিত করতে, তোমাকে এই প্রশ্ন করতে বলেছিলেন”।
মিষ্ট বিকৃত হাস্য হেসে, “সংহার, তুমি যেই কারণে আমাকে আবাহন করেছ, আমি সেই কাজ অবশ্যই করবো। তবে তার আগে একটিই কথা তোমাকে বলে রাখবো। যার পুত্র হবার দরুন আমি পরমাত্ম ও তাঁর আক্রমণ করার সমস্ত কৌশল জেনেছি, তিনি সেই সমস্ত কিছু জানেন না, এটা মুর্খামি ছাড়া আর কিছুই নয়। জানি আমার আর তোমার সমস্ত সংলাপ আমার পিতা অর্থাৎ তোমার আরাধ্য শুনছেন। তাই, এই কথা যতটা না তোমাকে বললাম, তার থেকে অধিক তাঁকে বললাম”।
এতো বলে, মৃষু রণক্ষেত্রে উপস্থিত হলে, তাঁর সম্মুখে স্থিত দেখলেন দেবী অম্বারূপাকে। মৃষু দেবীকে করজোড়ে প্রণাম করে বললেন, “মাতা, আমাকে যুদ্ধ করার অনুমতি প্রদান করুন। আমাকে আবাহনই করা হয়েছে, আপনার সাথে যুদ্ধ করতে”।
দেবী অম্বারূপা তখন পূর্ণ ভাবে ক্রোধের বশে স্থিতা। তাই ক্রোধের সাথেই তিনি বললেন, “আমার সাথে যুদ্ধ! এর অর্থ জানো তুমি মৃষু!”
মৃষু হেসে বললেন, “মাতার সমস্ত রূপবিন্যাসই সন্তানের কাছে মাতা হন। তাই আপনি আমার কাছে মাতা ব্যতীত অন্য কিছুই নন। … হ্যাঁ, সন্তান মাতার সাথে যুদ্ধ করতে কখনোই সক্ষম নন। কিন্তু কি জানেন তো! মায়ে-পোয়ে মিলে এমন বহু লীলা করে, যার অর্থ জগতের কাছে এক দ্বন্ধ ব্যতীত কিছুই নয়। … এই যেমন ধরুন না, এক অনাবশ্যক ব্যক্তি বারে বারে এসে বিরক্ত করে। তাই মায়ে-পোয়ে কি স্থির করে? ছেলে সেই ব্যক্তিকে চূড়ান্ত অপমান করবেন, আর মা ছেলেকে তীব্র শাসন করবেন”।
“শাসন তো মা করলেন, কিন্তু যাকে অপমান করার, তাকে অপমান করা হয়েই গেল। … ঠিক একই ভাবে, যদি সেই অনাবশ্যক ব্যক্তি সন্তানের দিক থেকে সম্পর্কে কেউ হন, তখন অপমানটা মা করেন, আর শাসনটা ছেলে করে। … কিন্তু মজার কথা কি জানেন তো! কনো ক্ষেত্রেই মা আর ছেলেকে পূর্ব থেকে কনো পরামর্শ করতে হয়না। মাতা, পরামর্শ তো তাঁরা করেন যারা ভেদ্য। মা আর তাঁর সন্তান যে অভেদ্য। সন্তানের হৃদয়ে যা চলে, তার প্রতিটি পদাঙ্ক মায়ের কাছে জ্ঞাত, আর মায়ের হৃদয়ে যা চলে তাও সন্তানের কাছে পূর্ণ ভাবে জ্ঞাত”।
“হ্যাঁ, এতোকিছুর পরেও, মা আর সন্তান কখনো এক হতে পারেনা, ঠিক যেমন আরাধ্যা আর তাঁর আরাধনাকারী এক হয়েও এক নন। তাই সন্তানের হৃদয়ের কথা মা অনুভব করে নেন, সন্তান নিজে অনুভব করার বহু পূর্বেই। কিন্তু মায়ের হৃদয়ের কথা সন্তানকে উদ্ধার করতে একটু সময় লাগে। আসলে সাগর যত বড়ই হোক, গগনের কাছে সে শাবকই থাকে। তেমনই সন্তান যত বড়ই হয়ে যাক না কেন, মায়ের কাছে সে শিশুই থাকে”।
“মাতা, আপনি পরমাত্মপ্রদত্ত ক্রোধের আগুনে স্নান করে ফেলেছেন, তাই হয়তো এক্ষণে আমার কথাকে ধারণা করতে পারবেন না। তবে আপনার স্বরূপ আমার কথাসমূহকে, আমি ব্যক্ত করার পূর্ব থেকেই ধারণা করে বসে আছেন। বা বলতে পারেন, তাঁর ধারণার কারণেই আমি এই সমূহ কথা আপনাকে বলতে সক্ষম হচ্ছি। … তাই মাতা, যুদ্ধ করুন। এই যুদ্ধ হোক, এটিই আমার মায়ের ইচ্ছা, আপনার স্বরূপের নির্দেশনা, স্বয়ং নিয়তির মার্গদর্শন। তাই যুদ্ধ করুন”।
দেবী অম্বারূপা ভয়ঙ্কর ক্রোধাগ্নি ধারণ করে এক প্রকাণ্ড প্রহার করলেন মৃষুকে। মৃষু সেই আঘাতের জেরে ছিটকে পরে গেলেন অদূরে। বিস্মিত হয়ে দেখলেন সংহার সেই প্রহারকে। পরমাত্মও নিজের শত্রুর সম্যক বিনাশে অত্যন্ত তৃপ্ত হয়ে দেখলেন। কিন্তু সংহার যা দেখে প্রভাবিত হলেন, তা হলো মৃষুর আচরণ। মৃষু সেই প্রহারে ভালো মত আহত হলেও, হাস্যমুখে উঠে দাঁড়ালেন।
মৃষুর হাস্যমুখ দেখে, ক্রোধে আগুন হয়ে গিয়ে দেবী অম্বারূপা পুনরায় আঘাত করলেন মৃষুকে। সেই আঘাতে মৃষুর সূক্ষ্মদেহের বিভিন্ন স্থানে গহন ক্ষত সৃষ্টি হয়ে গেল। কিন্তু মৃষু তারপরেও হাস্য মুখে উঠে দাঁড়ালেন। সেই দেখে ক্রোধে বিস্ফোট করে, দেবী অম্বারূপা বললেন, “কি হলো প্রহার করো! … যুদ্ধ করতে এসেছ, কিন্তু যুদ্ধ কোথায় করছো!”
মৃষু হেসে বললেন, “মায়ের স্পর্শই সন্তানের কাছে রোমহর্ষক হয়। মাতা, আপনি তো প্রহার করছেন, কিন্তু আমি তো আপনার স্পর্শসুখ উপভোগ করছি। একটি একটি বার স্পর্শ করছেন আপনি, আর আমার মনে হচ্ছে যেন আমি অমৃত পান করছি!”
দেবী অম্বারূপা এই কথাতে অধিক ক্রোধিত হয়ে গিয়ে, নিজের হাত থেকে খঞ্জর ভূমিতে ফেলে দিয়ে, মৃষুর কেশ আকর্ষণ করে, নিজের বক্ষে মৃষুকে স্থাপন করে, নিজের বাহু দ্বারা মৃষুর গণ্ডদেশকে আবদ্ধ করতে থাকলেন। শ্বাসরোধ করে মৃষুকে হত্যা করার প্রয়াস করতে থাকলেন দেবী, আর মৃষু অন্যদিকে নিজের জননীর অঙ্গের সাথে লেপটে থাকতে পেরে যেন পরমানন্দে সমাধিস্থ হয়ে গেলেন।
সমাধিস্থ মৃষুকে সমস্ত বেষ্টন থেকে মুক্ত করে দিলেন দেবী, আর মৃষুর দেহ ভূমিতে লুটিয়ে পড়লো। এই দৃশ্য দেখে সংহার ভয়ে কাঁটা হয়ে গেলেন। এবার যে তাঁর মৃত্যুর পালা! … কিন্তু দেবী অম্বারূপার প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। মৃষুকে স্তব্ধ অবস্থায় ভূমিতে পরে থাকতে দেখে, থতমত খেয়ে গেলেন তিনি। খানিকক্ষণ থেমে থেকে প্রবল ভাবে ক্রন্দন করে উঠলেন, আর মৃষুর বক্ষে আছরে পরে নিজের মস্তককে মৃষুর বক্ষে রেখে ভয়ানক ভাবে ক্রন্দন করে উঠলেন।
তাঁর ক্রন্দনের জেরে, ধরিত্রীর চারিদিকে প্লাবন হওয়া শুরু করলো। সাগরের লহর বিশালাকায় হস্তির রূপ ধারণ করে করে ভূমিতে আছরে পরে, বহু শহরকে ভক্ষণ করে নিলো। দেবীর আর্তনাদের ফলে বিভিন্ন স্থানের ভূমি সমানে কম্পমান হয়ে উঠলে, বেশ কিছু সহস্র বছর ব্যাপী শান্ত আগ্নেয়স্ফুটন কেন্দ্রগুলি পুনরায় জেগে উঠে, মানবনির্মিত সহস্র শহরকে অগ্নিদগ্ধ করে ভস্মীভূত করে দিলো।
আর ঠিক সেই সময়ে, মৃষু নিজের একটি বাহু দেবী অম্বারূপার গর্দানে স্থাপন করে দিলেন। দেবী অম্বারূপা সেই বলশালী বাহুর বেষ্টনে আবদ্ধ হয়ে হাঁসফাঁস করতে থাকলেন। শব্দ উচ্চারণের প্রয়াস করেও, একটি শব্দ উচ্চারণ করতে পারলেন। মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “দেবী, রণক্ষেত্রে আবেগের কনো স্থান নেই। আমি তো আমার মায়ের হাতের, মায়ের দেহের স্পর্শসুখ ভোগ করে সমাধিস্থ হয়ে গেছিলাম মাত্র। কিন্তু আপনি? আপনি তো পূর্ব থেকেই পরমাত্মের প্রদান করা ক্রোধবাণে আবদ্ধ ছিলেন!”
“আবেগ বড়ই অদ্ভুত দেবী! … একটি আবেগে বিদ্ধ কোলে, সমস্ত আবেগের কাছেই পরাজয় স্বীকার করতে হয়। তাই আপনি আপনার পুত্রের সমাধিকে অনুভব না করে, এই ভেবে নিলেন যে আপনার পুত্রকে আপনি হত্যা করে ফেলেছেন। আর তাই পুত্রশোকে আবদ্ধ হয়ে গেলেন। দেবী, আমি একজন যোদ্ধা, আর যোদ্ধাকে আবেগ স্পর্শ করতে পারেনা। আপনি এখন আমার পাশে আবদ্ধ, আর এই পাশ থেকে আপনি মুক্ত হবার জন্য সর্বগুণসম্পন্না হয়েও সক্ষম নেন। কেন জানেন? কারণ আপনার আত্মবোধ জাগ্রত, আর আমার চেতনা। চেতনার কাছে আত্মবোধ দুর্বলই নয় কেবল, অতীব দুর্বল”।
পরমাত্ম এই বিরল দৃশ্য দেখে হতচকিত হয়ে গেলেন। তিনি সমস্ত কথাই জানতেন, কিন্তু কনো ভাবে এই ধারণা করেন নি যে, মৃষু তাঁর জীবন যাতে বসে, সেই মাতার হত্যা করে দেবে। আর অন্যদিকে সংহার অত্যন্ত তৃপ্ত। তিনি অমর হতে চলেছেন। জগজ্জননীর থেকে মুক্ত হয়ে যেতে চলেছেন তিনি। মৃষু তাঁর রক্ষা করে দিলেন।
দেবী অম্বারূপার সূক্ষ্ম দেহ সমানে নিস্তেজ হয়ে যেতে শুরু করলো, আর একটি সময়ের পরে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন। যুদ্ধ জয় করে মৃষু সংহারের সম্মুখে এসে দাঁড়ালে, সংহার করজোড়ে প্রণাম করতে গেলেন মৃষুকে। মৃষু বক্রওষ্ঠে হাস্য হেসে বললেন, “তোমার পিতাকে দেওয়া শর্ত অনুসারে আমি তোমার আবাহনে সারা দিয়ে এসেছিলাম আর তোমার রক্ষাও করলাম সংহার। কিন্তু তোমার পিতার দেওয়া প্রতিশ্রুতি তুমি খণ্ডন করলে। তুমি অসত্যের উদ্দেশ্যে আমাকে আবাহন করলে, আর এক পুত্রকে তাঁর প্রাণপ্রিয় মাতার বিরোধ করালে। তাই তোমার আর কনো আবাহনে, বা তোমার পরবর্তী প্রজন্মেরও আর কনো আবাহনে মৃষু উপস্থিত হবেনা”।
এতো বলে, মৃষু সেখান থেকে বিলুপ্ত হলে, পরমাত্ম এবার সম্মুখে এলেন সংহারের। আর উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “আর প্রয়োজনও নেই মৃষুকে আবাহন করার, কারণ অন্ত হয়ে গেছে তাঁর যার কারণে এই পরমাত্ম পরমেশ্বর হয়ে উঠতে পারছিলো না”। … এই বলে সংহার আর পরমাত্মের তীব্র অট্টহাস্য বহুক্ষণ ব্যপ্ত হলো। ততক্ষণ ব্যপ্ত হলো সেই হাস্য যতক্ষণ না এক তীব্র ভূমিকম্পে পূর্ণ ভাবে অপ্রাচীন জম্বুর, অর্থাৎ বর্তমান ভারতীয় পশ্চিম উপকুল কম্পিত হয়ে উঠলো। …
সাগর সেখানে উত্তাল! সাতটি হস্তীকে একত্রে মাথার উপর মাথায় চাপিয়ে দিলে যেমন উচ্চতা হয়, তেমনই সাতটি সাগরের লহর আছরে পড়লো প্রভাস থেকে সংহারের রাজধানী, কাঞ্চি পর্যন্ত। প্রায় সমস্ত পশ্চিম উপকুলই ছিলো সংহারের রাজ্য, আর এই সাতটি লহর তার রাজ্যের তিন ভাগের এক ভাগ খেয়ে চলে গেলেন। সেই দেখে ভয়ার্ত ও বিস্মিত সংহার তাঁর আরাধ্য পরমাত্মের দিকে তাকালে।
পরমাত্ম ক্রুদ্ধ ভাবে সাগরের দিকে এগিয়ে গিয়ে সাগরকে সেই জমি ফিরিয়ে দেবার নির্দেশ দিতে গেলেন, আর সংহারকে বলে গেলেন, “চিন্তা করো না, আমি তোমার সাথে থাকতে, তোমার বা তোমার রাজ্যের কেউ কনো ক্ষতি করতে পারবেনা। … আমার বিশ্বাস, নিজের জননীর বিনাশ করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে মৃষু। আর তাই এমন কীর্তি করছে সে। আবেগে আক্রান্ত মৃষুর বিনাশ করে আমি শীঘ্রই তোমার হারানো জমি নিয়ে ফিরছি। উৎসবের আয়োজন করো তুমি সংহার”।
এতো বলে, পরমাত্ম সাগরতটে উপস্থিত হয়ে, হুংকারের সাথে বললেন, “সাগর! … আমি তোমার পরমেশ্বর পরমাত্ম বলছি। তোমার স্পর্ধা দেখে আমি স্তম্ভিত। উঠে এসো। আমি তোমাকে দণ্ড প্রদান করবো, স্বয়ং পরমেশ্বরের বিরোধ করার জন্য। উঠে এসো সাগর!”
পরমাত্মের কথাতে সাগরের জল শান্ত হলো। আর তার মাঝ থেকে উঠে এলো এক মূর্তি। যতই সম্মুখে আসা শুরু করলো সেই অতিসূক্ষ্ম মূর্তি, ততই পরমাত্ম অনুভব করলেন যে, সেই মূর্তি কনো দেবীর। আর যতই কাছে আসা শুরু করলেন সেই নারীমূর্তি, ততই পরমাত্মের নয়ন বিস্ফারিত হয়ে গেলো। প্রগলের মত করে তিনি প্রত্যাবর্তন করলেন সংহারের কাছে।
সংহার তখন উৎসবের ব্যবস্থাপনাতে ব্যস্ত ছিলেন। পরমাত্মকে হন্তদন্ত হয়ে তাঁর দিকে আসতে দেখে, আবেগপ্রবন হয়ে নিজের আরাধ্যের দিকে এগিয়ে গিয়ে উচ্ছ্বসিত ভাবে বললেন, “প্রভু, সাগর শান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু সে কি আত্মসাৎ করা জমি ফিরিয়ে দিয়েছে!”
পরমাত্ম উৎকণ্ঠার সাথে বললেন, “সংহার, তোমার আমার উভয়ের সাথেই ছল হয়েছে। মহাছল হয়েছে। … যার নিধন হলো, সে অম্বা নয়। সে অম্বার একটি শিখা মাত্র। অম্বা কুমারী বেশে তোমার নিধন করতে এগিয়ে আসছে। সাগরকে আমি যখন আবাহন করেছিলাম, তখন সাগর থেকে তিনি উঠে আসলেন, আর এখন তোমার দিকে তিনি এগিয়ে আসছেন”।
খানিক থেমে পরমাত্ম বললেন, “আমি কিছু করছি। … তুমি চিন্তা করো না”।
সংহার উত্তরে বললেন, “না প্রভু, এবার আপনি নয়, আমিই কিছু করবো। আপনি নেপথ্যে থাকুন কেবল। যদি আমি দেবীকে দ্বন্ধে স্থাপিত করতে পারি আমার প্রশ্নবাণ দিয়ে, তাহলে আপনি তাঁকে বশ করে নেবেন। তারপর আপনাকে যা করার করতে হবে। আপনার চিরশত্রুর নিধন আপনাকেই করতে হবে। আমাকে অনুমতি প্রদান করুন”।
এই কথা বলে সংহার সম্মুখে এগিয়ে গেলে, তাঁর রাজদরবারের দ্বারেই দেবী সর্বাম্বা অপেক্ষা করছিলেন। সেই দেখে ক্রোধ ধারণ করে সংহার উত্তপ্ত কণ্ঠস্বরে বললেন, “আপনি স্বয়ং ঈশ্বর হয়ে ছল করলেন! … এ কেমন ধারার সঞ্চার করলেন জগতে! আপনার এই ঘৃণ্য তরঙ্গের সঞ্চার করতে লজ্জা করলো না!”
কুমারী সর্বাম্বা সেই কথা শুনে উচ্চস্বরে হেসে উঠে বললেন, “মৃত্যুর কালেও যোজনা! … বেশ তোর প্রশ্নের উত্তর আমি অবশ্যই দেব। মরণকালে শত্রুরও শেষ প্রশ্নের উত্তর আমি প্রদান করি। … প্রথম কথা এই যে, আমি তোর আরাধ্যের নিয়মে বন্দী নই। সে নিজের ক্রিয়াধারাকে ছল না বলে লীলা বলবে, আর অন্যসমূহ কিছুকে ছল বলে তাকে প্রতিহত করে দণ্ডের পাত্র করবে, এই নিয়ম সে সকলের উপর স্থাপন করতে পারে, আমার উপড়ও নয়, আর আমার স্থুল দেহের পিতা, এবং বাস্তবে পুত্র, মৃষুর উপরও নয়”।
“যখন তোরা মৃষুকে নিজের মায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বাধ্য করার মত ছল করতে পারিস, তখন সেই ছলের উত্তর ছলই হবে। এটিই আমার বিধান। প্রেমের উত্তর প্রেম, সমর্পণের উত্তর সমর্পণ, সরলতার উত্তর সরলতা, ধূর্তামির উত্তর ধূর্তামি, ছলের উত্তর ছল। … হ্যাঁ, এটিই আমার বিধান, এটিই নিয়তির ধারা। আর এই কারণেই নিয়তির সাথে কেউ কখনো যুদ্ধে রত হয়না”।
“সকলেই জানে আমার এই বিধানকে। আর যারা জানে, তারা নিশ্চিত ভাবে জানে যে, যদি সে ছল করে, তাহলে নিয়তিও তার সাথে ছলই করবে। যদি সে স্বৈরাচার করে, নিয়তিও তার সাথে স্বৈরাচারই করবে। যদি সে প্রতারণা করে, তাহলে নিয়তিও তার সাথে প্রতারণাই করবে। যদি সে দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে নিয়তিও তার প্রতি দায়িত্বহীনতাই দেখাবে। যদি সে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে আর কেউ তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতার সাহস দেখাক বা না দেখাক, নিয়তি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবেই করবে”।
“আর তুই! … তুই তো মহামূর্খ। যেই নিয়তির থেকে স্বয়ং পরমাত্মও ভয়ার্ত থাকে, সেই পরানিয়তির থেকে এই বরদান চেয়ে নিলি যে, স্বয়ং তাঁর হাতেই তোর হত্যা সম্ভব হবে। তাই নে! তোর আর তোর আরাধ্যের করা ছলের উত্তর আমি আর আমার পুত্র ছলের দ্বারাই প্রদান করলাম। আর তুই মৃষুকে আবাহন করলেও আসবেনা সে, আর যাতে সেই আবাহনে তাকে আর না আসতে হয়, তা বাস্তবায়িত করার জন্য, আমি অম্বারূপা রূপ ধারণ করে তার কাছে পরাজয় স্বীকার করে ফিরে গেছি। … আর এবার তোর সামনে তোর মৃত্যু, তোর ইচ্ছা অনুসারে তোর থেকেও অধিক শক্তিশালী, স্বয়ং শক্তি কুমারী বেশে স্থিতা”।
“তুই অসংখ্য নির্দোষ প্রাণের হত্যা করেছিস, নিজেকে অমর করার জন্য, আমাকে আবাহন করে, মৃষুর দ্বারা আমাকে বাধিত করার জন্য। … এতোকিছুর পরেও মৃষু তোকে সতর্ক করে বলেছিল যে, যেই পরামত্মকে মৃষু পূর্ণ ভাবে চেনে, তাকে তার মা রন্ধে রন্ধে চেনে। তারপরেও তুই ভাবতে পারলিনা যে, যিনি পরমাত্মের নিক্ষেপ করা আবেগে আবদ্ধ হয়ে রয়েছেন, তিনি মৃষুর জননী নন”।
“মৃষু এর পরেও দেবী অম্বারূপার উদ্দেশ্যে বললো যে, যা সে করছে তা কেবলই মায়ের আর পোয়ের লীলা। কিন্তু আত্মবিশ্বাস! এই আত্মবিশ্বাসের কারণে, না তুই আর না তোর আরাধ্য, মৃষুর ইঙ্গিতকে উপলব্ধি করতে পারলি। … মৃষুও জানতো, তোদের মেধা তো নেয়ই; মেধাকে তো তোরা শত্রু জ্ঞান করিস। তাই তোরা তার কনো কথাই উপলব্ধি করতে পারবি না। হয়তো সেই কারণেই সে সমস্ত কথা স্পষ্ট ভাবেই বলেছিল, (হেসে) জানেই তো মূর্খ তুই আর মূর্খশ্রেষ্ঠ তোর আরাধ্য তো কিছুই বুঝতে পারবে না!”
সংহার এবার তীব্র হাস্য হেসে বললেন, “বেশ দেবী, যুদ্ধ চান তো আপনি আমার সাথে? আপনার দেওয়া বরদানে আমার সহস্র হস্ত। এবার সামলান আপনার দেওয়া বরদানকে। পরাস্ত করুন আমাকে আমার সহস্র হস্ত সহ! (অট্টহাস্য)”
সংহারের অট্টহাস্য মাঝপথেই থেমে গেল, কারণ কুমারী সর্বাম্বার অট্টহাস্য তাঁর হাস্যকে ছাপিয়ে চলে গেল। ক্রমশ সংহার নিজের কানে নিজের সহস্র হস্তকে স্থাপন করে, মস্তকে যাওয়া শব্দকে আটকানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে গিয়ে উর্ধ্বে মুখ রেখে দেখলেন, লক্ষাধিক দেবী সর্বাম্বার মুখ যেন সহস্র বাদল বেশে সম্পূর্ণ গগনকে ঢেকে ফেলেছে। আর সেই প্রতিটি মুখ থেকে সহস্র হস্ত নেমে এলো সংহারের দিকে।
লক্ষাধিক হস্তকে একত্রে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে, সংহার এবার ভয়ার্ত হয়ে উঠলে, সেই লক্ষাধিক হস্ত যেন তাকে নেহাতই এক ক্ষীরের পুতুল জ্ঞান করে, সংহারের প্রতিটি হাতকে ধারণ করে সামান্য হ্যাঁচকা দিয়ে সংহারের শরীর থেকে সমস্ত হস্ত টেনে ছিঁড়ে দিলে, রক্তাক্ত দেহ নিয়ে, উচ্চৈঃস্বরে পীড়াযুক্ত ক্রন্দন সহ সংহার ভূমিতে লুটিয়ে পরে যন্ত্রণায় ছটফট করে কাতরাতে থাকলে, কুমারী সর্বাম্বা এবার নিজের চরণের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠকে কেবল সংহারের বক্ষে স্থাপন করলে, সংহার জল থেকে উঠিয়ে নেওয়া মৎস্যের মতন খাবি খেতে থাকলেন।
সংহার ক্রন্দনের সুরে বলে উঠলেন, “মা, ক্ষমা। আমার সমস্ত করা ছলনার জন্য ক্ষমা। তোমাকে চিনতে না পাড়ার জন্য ক্ষমা। মা, তোমার চরণের একটি আঙুলের স্পর্শ মাত্রই আমার সহস্র হস্ত ছেদনের পীড়া শান্ত হয়ে গেল। বুঝে গেছি মা, তোমার স্পর্শ মাত্রই শান্তি। তোমার ছোঁয়া মাত্রেই ব্রহ্মলাভ। … মা, তোমার চরণের চাপের অর্থ সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের দশগুণ ভার বক্ষে স্থাপিত হয়ে যাওয়া। মা, সেই ভার সহন করার সামর্থ্য তো স্বয়ং পরমাত্মেরও নেই। … তাই মা, আমার অনুরোধ যে, আমার বক্ষে তোমার চরণের ভার প্রদান করো। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত বেদনা ভুলে, তোমার স্পর্শসুখ লাভ করে, তোমার প্রকাণ্ড ভারে পিষ্ট হয়ে আমি চিরতরে ধরিত্রীর মধ্যে সমাহিত হয়ে যেতে চাই। কৃপা করো মা!”
কুমারী সর্বাম্বা সেই কথাতে মিষ্ট হেসে, নিজের বাম চরণকে সংহারের বক্ষে স্থাপিত করলে, মুহূর্তের মধ্যে সংহারের সমস্ত সূক্ষ্মদেহ, ভূমিতে জল দিলে যেমন সঙ্কুচিত হয়ে যায়, তেমন ভাবে সংহারের দেহ সঙ্কুচিত হয়ে গেল। ক্রমশ তা দলা পাকিয়ে একটি ক্ষুদ্র প্রস্তর টুকরোর মত হয়ে গেলে, মাতা সর্বাম্বার পদচাপে তা ধরিত্রীর ভূমি ফুরে নিম্নে চলে গেলে, প্রত্যক্ষ হলো এক প্রকাণ্ড ভূমিকম্পন, যা সম্পূর্ণ ভারতমহাদেশের পশ্চিমউপকুলকে ধ্বংস করে, প্রায় জনমানস শূন্য করে দিলো।
পরমাত্ম নিজের শেষ দুইয়ের মধ্যে দুর্বলতর সঙ্গী সংহারকে হারালেন। পরে রইলো তাঁর কাছে কেবল মাত্র ইচ্ছাধারী। তাই তাঁর সংরক্ষণের প্রয়াস করতে যোজনা করা শুরু করলেন তিনি।
