আদি কৃতান্ত – প্রকৃত ঈশ্বরকথা

মীনাক্ষীর কথামত ভূমি, অরিত্রা, জয়াবিজয়া তথা তন্ত্রসন্তানরা একত্রিত হলেন, আর বাকি সকল কৃতান্তিকদের বলে এলেন যে তাঁরা কিছু কথা শুনছেন আর সেই কথা শোনা হয়ে গেলে, তাঁদের সকলকে সেই কথা বলবেন। সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে, মীনাক্ষী বলা শুরু করলেন, “ঘটনাবলির শুরু হয় তখন থেকে যখন যোনী বিন্যাস শুরু হয়নি। ঘটনা সমূহ অত্যন্ত সূক্ষ্ম, কিন্তু যতই সেই কথা এগিয়ে যাবে ততই তা সূক্ষ্ম থেকে স্থূলতর হয়ে উঠবে। প্রাথমিক কথা সম্পূর্ণ ভাবে সূক্ষ্ম কথা।

যোনীবিন্যাসের কথাই তখন চিন্তা করছিলেন পরমাত্মের ত্রিগুণের সত্ত্বগুণ, যাকে রিতেশ নামে কৃতান্তিকরা চিনবে। এই চিন্তা আসতে, তিনি সেই বিষয় নিয়ে রজগুণ অর্থাৎ নরেশ, এবং তমগুণ অর্থাৎ শবেশের সাথে পরামর্শ করতে, সকলে সহমতি প্রদান করলে, চার মনোভাবের রচনা করলেন তিনি নিজের অন্তরে। কামভাব যা তাঁর অন্তরে ভোগ ও সম্ভোগের বিস্তার করতে থাকে এবং যার থেকেই সমস্ত রচনার শুরু হয়; শ্রমভাব যা তাঁর কামভাবকে প্রসারিত করতে থাকে; বিন্যাস ভাব যা সমস্ত রচনাকে শ্রেণীতে বিভক্ত করতে উদ্যত থাকে; এবং অন্তে থাকে সহন ভাব, যা তাঁকে এই শ্রমভাব ও বিন্যাস ভাবে দৃঢ় রাখে।

এই চার ভাব নিয়েই তিনি কোষ, ধর্ম, খনিজ, চরিত্র, ও বৈচিত্র্য  নামক মানসপুত্রের জন্ম দিলেন তো, কামিনী নামক এক কন্যার জন্ম দিলেন, এবং কোষ তথা কামিনীর বিবাহ প্রদান করলেন, যার থেকে বাসনা নামক এক কন্যার জন্ম হয়। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ্যে, এই সমস্ত কিছুর রচনা করতে পারার কারণে পরমপিতা রিতেশের মধ্যে মদভাবের জন্ম হতে থাকে। মদভাবকে যতই রিতেশ লুকাবার প্রয়াস করে ততই সে অধিক ভারী হতে থাকে, আর অন্তে সে এতটাই ভারী হয়ে যায় যে এই পঞ্চমভাব মদ রিতেশের থেকে স্খলিত হয়ে ষষ্ঠম মানসপুত্র আসক্তি জন্ম নেয়।

আসক্তির জন্ম পরমপিতার কাছে অযাচিত, তাই তাঁকে পরিত্যাগ করতে চাইলে, শবেশ সেই কথা নরেশকে বলেন, আর নরেশ ও শবেশ তাই একত্রে এসে পরমপিতাকে বলেন, “হে পরমপিতা, আপনি একি বিচার রাখছেন? আসক্তিকে আপনি ত্যাগ দিতে চাইছেন কেন? মদই সে, যে আমাদেরকে পূর্ণ আধিপত্য স্থাপন করতে সাহায্য করবে। বিচার করে দেখুন হে পরমপিতা, এই যোনীবিস্তারের চিন্তা আমরা কেন করছি? আমরা এই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা, ভগবান এঁর, কিন্তু আমাদের ভগবান বলে আরাধনা করার কেউ নেই। … এই সমস্ত যোনী আমাদেরকে সেই আরাধনা প্রদান করবে। … আর তা করার জন্য, প্রয়োজন আসক্তির। যদি আসক্তিই না থাকে, তাহলে এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রতি আকৃষ্ট থাকবে কেন কেউ? আর যদি আকর্ষণ না থাকে তাহলে আমাদের কাছে কামনা করবে কেন কেউ কিছু? আর আমাদের কাছে কামনা রাখলে, তবেই তো তা পুড়ন করে আমরা পূজ্য হয়ে উঠবো। … তাই আসক্তিকে ত্যাগ না দিয়ে, কোষ ও কামিনীর পুত্র, বাসনার সাথে বিবাহ দেবার ব্যবস্থা করুন। বিশ্বাস করুন, এঁরা আপনার রচনাকে বহুদূর বিস্তৃত করে দেবে”।

পরমপিতা এবার নরেশের উদ্দেশ্যে বললেন, “হে পরমগুরু, যদি আপনি তাঁদের মার্গদর্শনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবে আমি নিশ্চিন্ত হই”। শবেশের উদ্দেশ্যে বললেন, “হে পরমেশ্বর, আপনি আমাদের তিনজনের মধ্যে আদি। ত্রিগুণের বিস্তার হবার কালে, রজরূপে পরমগুরু আর সত্ত্বরূপে আমি অর্থাৎ পরমপিতা উদ্ভূত হবার পর, অবশিষ্ট পরমাত্মই আপনি, অর্থাৎ সত্য বলতে, আপনার থেকেই আমাদের উদ্ভব। তাই আপনিই আমাদের পরমেশ্বর। আর তাই আপনার কাছে আর্জি যে, আপনি সকলের আরাধ্যা হয়ে বিরাজ করলে, আমি নিশ্চিন্ত হয়ে যাই”।

শবেশ ও নরেশ পরমপিতার কথাতে সহমতি প্রদান করলে, কোষ ও কামিনীকে মানিয়ে আসক্তির সাথে বাসনার বিবাহ দিলেন রিতেশ। আর সেখান থেকে আরম্ভ হয় যোনীবিস্তার। প্রথম স্তরে, অস্থি, পুষ্টি, পল, মেদ ও ধমনীর জন্ম দিলেন আসক্তিপত্নী বাসনা, আর আসক্তি এঁদেরকে বিবাহ দিলেন খনিজের সাথে। তাঁদের থেকে তৃণ, মৎস্য, নভজা ও ভূমিজা জন্ম নিলে, তাঁদেরকে বিবাহ দিলেন বৈচিত্র্যের সাথে, যাদের কারণে বিবিধ যোনির বিস্তার হয়।

অন্যদিকে বাসনা আবারও জন্ম দিলেন নীতি, অনীতি, তৃপ্তি, সম্ভোগ, গ্রহণ, মর্দন, লঙ্ঘন, হনন, এবং ভ্রান্তি এই নয় কন্যার জন্ম দিলে, এঁদেরকে ধর্মের সাথে বিবাহ দিলেন আসক্তি, এবং এই সকল আসক্তি কন্যা একে একে ৩টি করে কন্যার জন্ম দেন, যারা হলেন, উত্তর বিশাখা, মধ্য বিশাখা, দক্ষিণ বিশাখা, পরা জ্যেষ্ঠা, প্রতি জ্যেষ্ঠা, প্রাগ আষাঢ়, গত আষাঢ়, শ্রাব, শ্রাবণী, শ্রাবন্তি, ভদ্রা, ভাদ্রা, অশ্বিনী, সোহিনী, কৃত্তিকা, অগ্রণী, আগ্রিমা, উত্তর পুষ্যা, পুষ্যা, নত পুষ্যা, ফাল্গুনি, দক্ষিণ ফাল্গুনি, মাঘা, মাঘিমা, মঘ্যা, চিত্রা, চিত্রালি, যাদেরকে একত্রে পক্ষ বলা হলো। … আর এই সকল কন্যাকে বিবাহ দিলেন বৈচিত্র্যপুত্র চরিত্রের সাথে।

আর এই ভাবে, সমস্ত যোনির নির্মাণ যেমন করলেন আসক্তি ও বাসনা, তেমন তাঁদেরকে নিয়ন্ত্রণও করলেন, ধর্ম ও পক্ষদের দ্বারা, কিন্তু এতো কিছুর পরেও যেন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এলো না সমস্ত কিছুর মধ্যে। বিস্তর বিচার করে, এক সিদ্ধান্তে এসে, তিনি একাধারে পরমপিতা, পরমগুরু ও পরমেশ্বরের সমক্ষে উপস্থিত হয়ে বললেন, “প্রভু, আমি প্রকৃতির আরাধনা করতে চাই। তাঁকে কন্যা রূপে পেতে চাই। একমাত্র তাঁকে কন্যা করে পেলে, তবেই সমস্ত কিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসবে। যার নিয়ন্ত্রণে প্রকৃতি নেই, তার নিয়ন্ত্রণে কিচ্ছু নেই। সমস্ত ভূত তাঁর অধীনে, সমস্ত যোনির চেতনা তাঁর নিয়ন্ত্রণে এমনকি স্বয়ং কাল অর্থাৎ সময়ও তাঁর নিয়ন্ত্রণে। তাই যদি তিনিই নিয়ন্ত্রণে না থাকেন, তাহলে কি করে সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণে আসবে!”

পরমেশ্বর শবেশ মাথা নেড়ে বললেন, “কথা তো তুমি সঠিক বলছো আসক্তি, প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে না এলে কনো কিছুই নিয়ন্ত্রণে এলো না। সকলের সকল সামর্থ্য তিনি নির্ধারণ করেন চেতনার বিস্তার মাধ্যমে, সকলের সকল উচ্চারিত ধ্বনি শব্দ তিনি নির্ধারণ করেন, সকলের সকল চারিত্রিক ভাবও তিনিই নির্ধারণ করেন। তাই তাঁকে নিয়ন্ত্রণে না আনলে কনো কিছুই নিয়ন্ত্রণে রইল না, কিন্তু তাঁকে কি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব! যদি সম্ভব হয়, কি ভাবে তা সম্ভব হবে? এমন নয় তো যে আমরা সুপ্ত অগ্নিকে উগ্র করে তুলছি!”

পরমগুরু নরেশ বললেন, “পিতা, পতি, ভ্রাতা, প্রপিতা এই চক্রের মাধ্যমে তাঁকে আটকে রেখে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। স্নেহ, মমতার বিস্তারই তাঁর পরমধন। আর এই পিতা, পতি, ভ্রাতা, প্রপিতার মাধ্যমে আমরা তাঁকে এই চক্রের মধ্যে সহজেই আবদ্ধ করে রাখতে পারবো”।

পরমেশ্বর শবেশ বললেন, “আর যদি না পারি!… যদি এই সমস্ত কিছুর মধ্যে আবদ্ধ না হতে চান তিনি! তাঁর উপর তো আমাদের নিয়ন্ত্রণও নেই। তখন আমরা কি করবো!”

পরমগুরু নরেশ বক্র হেসে বললেন, “তাহলে তাঁকে আত্মআহুতি দিতে বাধ্য করবো”।

পরমপিতা রিতেশ বললেন, “কিন্তু তা করে কি ভাবে আমরা তাঁর উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করবো! এমন নয়তো যে, আমরা আগুন নিয়ে খেলা করতে গিয়ে নিজেদেরই হাত জ্বালিয়ে ফেলবো!”

পরমেশ্বর শবেশ বললেন, “হাত তো জ্বলবেই পরমপিতা। প্রথমবার আগুন নিয়ে খেলা করতে গেলে, হাত তো জ্বলবেই। তবে এই হাত না জ্বললে, সেই অগ্নি নিয়ে কি ভাবে খেলতে হয়, তা আমরা যে কনোদিনও জানতে পারবো না! … তাই আমাদের খেলতে হবে অগ্নি নিয়ে। একবার অগ্নি নিয়ে খেললেই বোঝা যাবে, অগ্নির ধারা কিরূপ। পরমগুরু সঠিক বলেছেন, যদি দেখি যে নিয়ন্ত্রণে আসছে না, তাহলে আমাদের পরবর্তী যোজনা নির্মাণ করে তাঁকে বাঁধতে হবে, আর ততক্ষণের জন্য তাঁকে বিদায় দেবার সহজ উপায় হলো তাঁকে আত্মআহুতি দেবার জন্য বাধ্য করা”।

পরমগুরু নরেশ বললেন, “আসক্তি, তোমাকে কিন্তু পরমেশ্বরের সাথে নাট্য করতে হবে। তিনি আর তুমি হবে পরম শত্রু। তোমার কন্যার কাছে আমরা পরমেশ্বরকে এগিয়ে দেব পতি বেশে। আর তুমি ও তিনি একে অপরের শত্রু হলে, তোমার কন্যার সামনে দুটিই পথ খোলা থাকবে, হয় পতির দাসী হওয়া নয় পিতার। যেইদিকেই তিনি ঝুঁকবেন, আমাদের সেইদিকেই লাভ, কারণ উভয় পক্ষ আমরাই”।

এতোশুনে আসক্তি সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে, পরাপ্রকৃতির সাধনা করে, তাঁকে তৃপ্ত করে, তাঁকে কন্যা বেশে চাইলে, মাতা পরাপ্রকৃতির প্রকাণ্ড উর্জ্জা প্রকট হয়ে বললেন, “আসক্তি, আমি তোর ইচ্ছামত তোর কন্যা হয়ে জন্ম নেব। কিন্তু স্মরণ থাকে যেন, নিজের সত্ত্বা আমার উপর কখনো চাপিয়ে দিতে যাবি না। যদি তেমন করিস, তাহলে শুধু তুই নয়, সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড সঙ্কটে এসে যাবে। কেন এমন বললাম? কারণ যদি এমন কিছু কাজ করার প্রয়াসও করিস যার কারণে আমার সন্তানরা আমার থেকে দূরে চলে যাবে, তাহলে আমার সেই রূপকে আবাহন করবী জেনে রাখিস, যেই রূপ আমার কাছে আর আমার সন্তানদের কাছে অত্যন্ত মনোহর আর আমাকে যারা শত্রু জ্ঞান করে তাঁদের কাছে দুঃস্বপ্ন”।

এতো বলে তিনি উর্জ্জা সম্বরণ করলে, দেবী বাসনা পুনরায় গর্ভবতী হয়ে এক অপরূপ কন্যার জন্ম দিলেন, যার নাম তিনিই রাখলেন অম্বা। ক্রমশ অম্বা বড় হয়ে উঠতে থাকলে, আসক্তি তাঁর প্রতি সমানে বিরক্ত হতে থাকে, কারণ তাঁর যেই সন্তানদের উপর এতকাল নিজের অধিকার স্থাপণ করে রেখেছিলেন, সেই সন্তানসমূহের কাছে তাঁর গুরুত্ব কম হতে থাকে আর অম্বার গুরুত্ব দিনপ্রতিদিন বাড়তে থাকে। দেবী বাসনা থেকে শুরু করে তাঁর সমস্ত কন্যা, ধর্ম থেকে শুরু করে সকল ব্রহ্মার মানসপুত্র যেন অম্বাকে ঘিরেই জীবন ব্যতীত করা শুরু করে।

তাই আসক্তি ব্যাকুল হয়ে, উপস্থিত হলেন নরেশের নিকট। নরেশ তখন আরামে নিদ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। তাই আসক্তির আগমনের খবরও তিনি পান না। দুগ্ধ সমতুল্য তরল, মসৃণ ও সফেদ এক বিস্তীর্ণ স্থানের মধ্যে এক দুগ্ধসরের ন্যায় বিছানার উপর শায়িত হয়ে শ্যামবর্ণের পেশিবহুল দীর্ঘদেহধারী পুরুষ নিজের হরিদ্রা চরণতল ও হরিদ্রা করতল প্রদর্শন করে নিদ্রারত ছিলেন। স্কন্ধপর্যন্ত কেশ যুক্ত, চকচকে কুম্ভীরচর্মধারী, মস্তকে কলহপ্রিয় শালিকপক্ষীর পালকবিশিষ্ট স্বর্ণমুকুট ধারণ করে শুইয়ে থাকা পরমগুরুর উদ্দেশ্যে আসক্তি বললেন, “হে পরমগুরু, দুধেশ্বর, আপনার শিষ্যকে বিপদে ফেলে রেখে, এখানে আপনি বিশ্রাম নিচ্ছেন!”

আসক্তির কণ্ঠস্বর শুনে, নিদ্রা ত্যাগ করে নিজঅঙ্গকে এদিকসেদিক হেলাতে হেলাতে তিনি বললেন, “কি ব্যাপার, এমন অসময়ে!”

আসক্তি বললেন, “হে দুধেশ্বর, আমার রক্ষা করুন। এই অম্বা এসে তো আমার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হনন করে নিয়েছে! … সকলে এখন তাঁর কথা শুনছেন, আমার কথা শুনছেই না!… আপনি বলেছিলেন পরমেশ্বর তাঁকে বিবাহ করে নিয়ে চলে আসবেন আমার থেকে, আর তার কারণে পরমেশ্বর শবেশের সাথে শত্রুতার নাট্য করতে। আমি তো তা করেছি। কিন্তু তিনি কেন এখনো যাচ্ছেন না, কেন অম্বাকে বিবাহ করে নিয়ে আসছেন না!”

পরমগুরু বললেন, “ঠিক আছে চলো, আমি তোমাকে নিয়ে পরমেশের কাছে যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে তাঁর সাথে এই বিষয়ে আলাপ করছি। … তুমি এক কাজ করো, পরমপিতার কাছে যাও, আর তাঁকে নিয়ে সদাকিশালয়যুক্ত পরমেশের নিবাসস্থান রমবনে প্রস্থান করো, আমি শুদ্ধ হয়ে, শীঘ্রই দুধসাগর থেকে সরাসরি রমবনে যাচ্ছি”।

এমন বললে, আসক্তি দুধসাগর ত্যাগ করে পরমপিতার নিবাসস্থান সপ্তধনুশে গমন করলেন। সেখানে প্রস্থান করে আসক্তি দেখলেন যে শুভ্রবস্ত্রধারী, রজতমুকুটধারী, মুকুটে কোকিলপালকবিশিষ্ট পরমপিতা একটি শুভ্রবলাহকের উপর স্থিত হয়ে একটি বহুতন্তুযুক্ত কদ্দুখোল নির্মিত এক যন্ত্র নির্মাণ করেছেন পরমপিতা, আর তাঁকে বিভিন্ন ভাবে ঝঙ্কার দিয়ে শব্দ নির্মাণ করছেন, আর সেই অনিয়ন্ত্রিত শব্দের কারণে সপ্তধনুশের সকলে কানে চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আসক্তিরও অস্বস্তি হচ্ছিল সেই কিংভুতকিমাকার ধ্বনির কারণে। সে বেশ কয়েকবার পরমপিতাকে ডাকলেও পরমপিতা শুনতে পেলেন না। অবশেষে এক প্রকাণ্ড হুংকার প্রদান করে তাঁকে ডাকলে, তিনি আসক্তিকে দেখে চমকিত হয়ে বললেন, “কি ব্যাপার এখানে তুম্বি? এখন?”

আসক্তি বললেন, “হে মেঘাসনা, হে পরমপিতা, আমি গেছিলাম দুধসাগরে দুধেশ্বরের নিকটে। তিনিই আপনার কাছে এই সপ্তধনুশে আমাকে পাঠালেন, আর বললেন মেঘাসনাকে নিয়ে রমবনে ষণ্ডনাথের কাছে উপস্থিত হতে। তাই এখানে এসেছি এই সপ্তধনুশে”।

আসক্তির কথা শুনে মেঘাসনা পরমপিতা রিতেশ আসক্তির সাথে যাত্রা করতে উদ্যত হলে, সেখানে উপস্থিত হন ষণ্ডচর্মধারী, মহাপেশিবহুল, সুদীর্ঘদেহধারী, মস্তকে মুক্তমুকুটে কপোতপালকধারী ষণ্ডনাথ শবেশ ও তাঁর সাথে ছিলেন দুধেশ্বর মগরধারী নরেশ। উভয়কে সেখানে উপস্থিত হতে দেখে পরমপিতা বললেন, “হে রমনাথ, হে সরনাথ, আপনারা এখানে? আমরা তো আপনাদের কাছেই যাচ্ছিলাম”।

পরমেশ রমবনের নাথ রমনাথ বললেন, “তার আর প্রয়োজন নেই হে কোকিলা। আসক্তির এক জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে আমরা এখানেই উপস্থিত হয়েছি। আসক্তি, আমাকে তুমি শত্রুর স্থানে রেখেছ। তুমি কি মনে করেছ, প্রকৃতি অম্বাবেশে তোমার কাছে আছে বলে কনো কিছুর জ্ঞান নেই তাঁর! … তোমার এইরূপ অস্থির হয়ে এখানে আসা উচিত হয়নি। … অধৈর্য হয়ো না হে মদ, অম্বাকে যৌবনে পদার্পণ করতে দাও। আমি স্বতঃই তাঁর কাছে যাবো। তাঁকে আমার প্রতি আমি আকর্ষিতও করবো। এখন তাঁর সম্মুখে গেলে, সে আকর্ষিত হবেনা, কারণ যৌবনের আগে রমগুণ ক্রিয়া করেনা, তাই রমণ আকর্ষণ তাঁর মধ্যে ক্রিয়া করবেনা। নিজ ধামে ফিরে যাও আসক্তি, মদপুরে তোমার আর আমার শত্রুতাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যাও, যাতে কারুর এমন না বোধ হয় যে আচমকাই তুমি আমার শত্রু হয়ে উঠলে”।

“আর সঙ্গে সঙ্গে অম্বার থেকে ভূতদের শক্তি ধারণ করেছেন দেবী বাসনা। তাই তাঁর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে ভূতদেরকে পৃথক অস্তিত্ব প্রদানের ব্যবস্থা করো মদ। প্রকৃতির সাথে ভূতরা এই ভাবে যুক্ত থাকলে, যেকোনো সময়ে প্রকৃতি এক ভিন্ন ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ করে নেবেন, আর তা করে নিলে, আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ড এক পরিত্যক্ত স্থবির ক্ষেত্র হয়েই থেকে যাবে। ভূতদেরকে বিচ্ছিন্ন ভাবে প্রকাশ করে, তোমার পুত্রী কৃত্তিকার একমাত্র পুত্রী মৃত্তিকার সাথে বিবাহ দাও, এবং কৃত্তিকাকে একাকী করে দাও। কৃত্তিকা তোমার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই তাঁর কন্যাকে পুত্রবধূ করে নিয়ে এসে, তাঁকে বাধ্য করো যাতে সে বারংবার তোমার কাছে আসে এবং তুমি তাঁকে নিজের নিয়ত্রনে নিয়ে আসতে পারো। নচেৎ কৃত্তিকা তাঁর কন্যাকে দুধেশ্বরের থেকে সুরক্ষিত রাখতে এক এমন লোকের নির্মাণ করেছে, যাকে প্রকৃতি ছাড়া কারুর পক্ষে ভেদ করাই সম্ভব নয়”।

মদ বললেন, “কিন্তু প্রভু, পরমগুরু দুধেশ্বরের তো আমার কন্যা কৃত্তিকার প্রতি নজর ছিল, তাই না! তাহলে কৃত্তিকা নিজের সুরক্ষার চিন্তা না করে, মৃত্তিকার সুরক্ষার চিন্তা কেন করছে?”

মগরধারী বললেন, “আমি কৃত্তিকাকে দেখতে বারংবার তাঁর কাছে যেতাম। আর কৃত্তিকা আমার এই কৃত্যের কারণে এই ভেব বসে যে আমি তাঁর কন্যার প্রতি আকৃষ্ট, আর তাই এমন করে সে”।

মদ বললেন, “কিন্তু প্রভু, সে আপনার সাথে নিজের কন্যাকে বিবাহ দিতে চায় নাই বা কেন? আপনার থেকে উপযুক্ত স্বামী কেই বা হতে পারে তাঁর কন্যার জন্য!”

দুধেশ্বর বললেন, “জানিনা কেন, পূর্বে এমন ছিলওনা। ইদানীং দেবী অম্বার তাঁর কাছে বারংবার যাতায়াতের পর থেকেই এমন হওয়া শুরু করেছে”।

মদ বললেন, “দোষ আমারই। আমিই আপনার কৃত্তিকার প্রতি আকর্ষণকে অদেখা করলাম, আর আমিই অম্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হলাম”।

রমনাথ বললেন, “এটা দোষারোপের সময় নয় মদ। ফিরে যাও আর যেমন বললাম, তেমন করো”।  

আসক্তি সেই কথা শুনে প্রত্যাবর্তন করলেন নিজের রাজ্যে, মদপুরে, এবং যেমন ষণ্ডনাথ বলেছিলেন, তেমনই ভাবে রমনাথের পূজাকে নিজের রাজ্যে স্তব্ধ করে দিলেন আর এই বললেন, “দিবারাত্র যিনি ষণ্ডদের সাথে থাকেন, সেই রমণসর্বস্ব রমনাথের আরাধনা এখানে হবেনা। পূজা হবে তো কেবলই দুধেশ্বরের। তাঁকে দেখো, মগরচর্মধারী শ্যামবর্ণার বলশালী তনুকে দেখো। আরাধনার বিষয় তিনি, অন্য কেউ নন”।

প্রতিবাদ হতে শুরু করে রাজ্যে, তো মদভাবে চূর আসক্তি সকল প্রতিবাদীকে বন্দী করে, তাঁদেরকে বাধ্য করা শুরু করে রমনাথ শবেশের নামজপা বন্ধ করিয়ে দুধেশ্বর মগরধারী পরমগুরুর আরাধনা শুরু করাতে। তো এই দেখে অম্বার মধ্যে কৌতূহল জাগা শুরু করে যে কে এই রমনাথ! কেমন দেখতে এই রমবন! পবিত্র ষণ্ডরা যাকে ঘিরে থাকেন, তিনি কেমন হবেন!

ষণ্ডনাথ যে এই সময়েরই অপেক্ষা করছিলেন। তাই এমন ভাব অম্বার মধ্যে আসতেই, তিনি এক অছিলায়, ধর্মকে এক সভার আয়োজন করতে বললেন, এবং তাঁর শ্বশুর আসক্তিকে তাঁর কন্যা অম্বাকে নিয়ে আগমনের নিমন্ত্রণ দিতে বললেন। মদ তাঁর পুত্রী অম্বাকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন, আর উপস্থিত হলেন দুধেশ্বর, পরমপিতা কোকিলা তথা শবেশ রমনাথ।

প্রথমবার দেখলেন অম্বা তাঁকে। দেখলেন তাঁর পিতাকে চূড়ান্ত ভাবে অপমান করতে রমনাথকে, আর এও দেখলেন যে সেই পরমেশ যিনি অনায়সেই তাঁর পিতাকে বহিষ্কার করে দিতে পারেন, তিনি সাবলীল ভাবে সংযমী থাকলেন। এই স্বভাবের প্রতি আকৃষ্ট হলেন অম্বা। আর শবেশ ধীরে ধীরে বিভিন্ন বার অম্বার সাথে সাখ্যাত করে করে, এই আকর্ষণকে তীব্র করে তুললেন।

অম্বার সম্মুখে যখন যখন যান রমনাথ, তখন তখন তাঁর বিরক্তিভাবকে, ক্ষিপ্রতা, উগ্রতা, কুটিলতা, সমস্ত কিছুকে সুন্দর ভাবে ঢেকে রেখে যান, যাতে অম্বা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু তাঁর প্রিয় ষণ্ডসমূহ, যারা তাঁর অনুচর, তাঁরা সেই কথা বুঝলেন না। তাঁরা মানতে থাকলেন যে নিশ্চিত ভাবে মাতা অম্বারই গুণে এমন হয়, নয়তো তাঁদের প্রভু উগ্রতা ত্যাগ করে, ক্ষিপ্রতা ত্যাগ করে, বিরক্তিভাব ত্যাগ করে, বা কুটিলতা ত্যাগ করে তো কখনোই থাকেন না। তাই তাঁরা দেবী অম্বাকে ক্রমশ নিজেদের পরমযতনের জননী মানা শুরু করে নিলেন, এবং শিশুর ন্যায় সমস্ত গোষণ্ড দেবী অম্বার নিকটে অবস্থান করা পছন্দ করতে থাকলেন।

অন্যদিকে যেমনটা রমনাথ বলেছিলেন, তেমনটাই করতে মদ ও দেবী বাসনার আরো চারটি পুত্র হয়, নভ, অনিল, পাবক ও মীনধ। আর তাঁদেরকে কৃত্তিকার কন্যা মৃত্তিকার সাথে বিবাহ দিলেন। কিন্তু বিবাহ উপরান্তে, যেমনটা রমনাথ চেয়েছিলেন যে কৃত্তিকা নিজের অভেদ্য নিলয়ের নাশ করবেন, তেমনটা হলো না। বরং, এবার কৃত্তিকা সম্যক ভাবে সেই আলয়কে নির্মাণ করা শুরু করলেন, আর তাঁর এই বিচিত্র কর্মকাণ্ড দেখে বিচলিত হয়ে উঠলেন, শবেশ, নরেশ ও রিতেশ তিনজনেই।

এই কক্ষের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করার জন্য, মদের স্থাপিত নিয়মানুসারে ভিক্ষুক বেশে উপস্থিত হয়ে দানরূপেও গ্রহণ করতে সচেষ্ট ছিলেন এই কক্ষকে, কিন্তু কৃত্তিকা যেন আর মদকন্যাই নন। যেন সমস্ত জগত থেকে তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে দিয়েছেন। কি এর কারণ? কেন এমন করছেন তিনি? কি তাঁর অভিসন্ধি? বহু প্রয়াস করেও কিছুতেই জেনে উঠতে পারলেন না, ত্রিমূর্তি।

আর অন্যদিকে প্রকৃতির থেকে লব্ধ চারভূত অত্যন্ত বলশালী। সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত মেধাবী এবং বিচক্ষণ। তাই ক্রমশই তাঁরা সমস্ত নিয়ন্ত্রণ মদের থেকে নিজেদের কাছে নেওয়া শুরু করলেন। কিন্তু কিছুতেই তাঁদের কাছে সমর্পণ করবেন না মদ, আর ত্রিমূর্তিরও তেমনই নির্দেশ। তবে এঁরই মধ্যে, দেবী অম্বার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন এই সকল ভূত ও তাঁর পত্নী মৃত্তিকা, আর তাঁদের সামর্থ্যের দিকে নজর রেখে, দেবী অম্বা তাঁদেরকে বুদ্ধি ও সামর্থ্য প্রদান করলে, তাঁরা নিজেদের এক পৃথক লোক নির্মাণ করে নিলেন, যার নাম রাখা হয় প্রাথমিক ভাবে অম্বাপুর এবং পরবর্তীতে তাঁর নাম হয়  মহাশূন্যনগরী বিশিষ্ট ব্রহ্মপুর, আবার কখনো কখনো তাঁকে ভূতলোকও বলা হতো”।

দেবী মীনাক্ষী নিজের কথা থামিয়ে এবার বললেন, “এই সেই লোক, যার থেকে কৃতান্ত কথা শুরু হয়েছিল, ব্রহ্মপুর বা অম্বাপুর। এর থেকেই সূর্যপুর, চন্দ্রপুর সমস্ত কিছু নির্মাণ হয়েছিল, আর তাই পরিবর্তীতে একত্রিত হয়ে পুনরায় ধরাধাম নাম লাভ করে। আর সেই লোকের অধীশ্বর করে স্থিত করা হয় নভকে।

নভ রাজা হবার পর, এবং তাঁর তিন ভ্রাতা তথা তাঁদের সকলের প্রিয় ভার্যাকে মন্ত্রী করে লাভ করে, দেবী অম্বাকে নিমন্ত্রণ করে এনে মহাশূন্যনগরীর দ্বার উদ্ঘাটন করালেন এবং তাঁর কাছে বিনম্র অনুরোধ করলেন, “মাতা, আমাদেরকে এবার আদেশ প্রদান করুন, তবে তার পূর্বে আমাদের একটি অনুরোধ স্বীকার করুন। … মাতা, আমরা চার ভ্রাতা, আর আমাদের এক পত্নী। … আমরা আমাদের পত্নীকে স্পর্শ করতে ভয় পাই, এই বিচার করে যে, তাঁর কতই না ক্লেশ ও পীড়া লাভ হবে চার পুরুষের সঙ্গ লাভ করে। … তাই এঁর একটি বিধান নিশ্চয় করুন”।

মাতা অম্বা হাস্যমুখে বললেন, “তোমাদের থেকে এমন বিচারই আশা করেছিলাম পুত্র। … আমি মৃত্তিকাকে চার রূপে প্রকাশিত করছি, যাদেরকে তোমরা চার ভ্রাতা পত্নীরূপে স্থাপিত করতে পারবে। তবে এই সমস্ত কিছু এক কল্পলোকের সমান। আর তাই যেমন সমস্ত কল্পনার নাশ হয় আবার পুনর্গঠন হয়, এঁর ক্ষেত্রেও তেমনই হবে জেনে রেখো। তোমাদের এই পাঁচজনের রসায়ন বারংবার পরিবর্তিত হবে। কখনো তাঁরা তোমার ভ্রাতা হবেন তো কখনো পুত্র আবার কখনো পুত্রী। … তাই কনো কিছুর প্রতি আসক্ত থেকো না”।

এতোবলে মাতা অম্বা নিজের অন্তর থেকে এক উর্জ্জা প্রকাশিত করে, দেবী মৃত্তিকাকে চার রূপে বিস্তৃত করে দিলেন। নভের সাথে যুক্ত হলেন গগনি, পাবকের সাথে যুক্ত হলেন পাবকি, অনিলের সাথে যুক্ত হলেন অনিলা এবং মীনধের সাথে যুক্ত হলেন মীন। এরপর দেবী অম্বা তাঁদেরকে বললেন, “তোমরা এখন একটি ভিন্ন রাজ্য। তোমাদের রাজত্বকে বিশ্বাস ও ভরসাযোগ্য করে তলো। অতঃপরে যারা যারা তোমাদের রাজ্যে তোমাদের নেতৃত্বে স্থিত থেকে সুরক্ষিত ও আনন্দিত বোধ করবে, তাঁদেরকে নিজেদের সাথে যুক্ত করো। আর যদি তাঁদের এই সুখ ও সুরক্ষা লাভে কেউ বাঁধা প্রদান করে, তবেই তাঁর সাথে যুদ্ধে রত হয়ে তাঁকে পরাভূত করো”।

দেবী অম্বার থেকে এমন নির্দেশ লাভ করায়, ক্রমশ নিজেদের শাসনকে উন্মুক্ত ও উদার করতে থাকলেন ভূতগণ, আর তাতে আসতে আসতে সকলে আকর্ষিত হওয়া শুরু করলেন। পক্ষরা, চরিত্র ও বৈচিত্র্যরা, তথা সকল যোনীরাও আকর্ষিত হওয়া শুরু করলে, এবার রমনাথ উগ্র হয়ে উঠে এই অম্বাপুরের নাশ করতে উদ্যত হলে, রমবনে উপস্থিত হলেন দুধেশ্বর এবং কোকিলা, এবং পরমগুরু তথা পরমপিতা একত্রে পরমেশের উদ্দেশ্যে বললেন, “কি করছেন প্রভু! … দেবী অম্বা স্বয়ং ভূতদেরকে এই লোক করে দিয়েছেন। আর ভূতরাও কারুর উপর কনো প্রকার বলপ্রয়োগ করে নিজেদের বিস্তার করেনি”।

“এমন অবস্থায় যদি এঁদেরকে আক্রমণ করেন, তবে যে দেবী অম্বার বিরোধিতা করা হবে। আর যদি তা হয় তবে দেবী অম্বার সাথে আপনার বিবাহ কি করে হবে? … শান্ত হন, আমাদেরকে অন্য কিছু উপায় করতে হবে”।

শবেশ বললেন, “অন্য আবার কি উপায়?”

মগরধারী বললেন, “প্রভু, আপনি দেবী অম্বাকে বিবাহ করবেন, তাই আপনার পক্ষে অন্য বিবাহ করা এইক্ষণে সম্ভব নয়। তবে আমাদের উভয়ের পক্ষে তা করা সম্ভব। … ধর্মের তিন পুত্রী, জটিলা, কুটিলা এবং নাগিনী। জটিলা ও কুটিলাকে আমি, এবং নাগিনীকে পরমপিতা কোকিলা বিবাহ করবেন”।

শবেশ ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “কিন্তু এতে কি হবে!”

দুধেশ্বর মুচকি হেসে বললেন, “জটিলা ও কুটিলার গর্ভে স্বয়ং আমি পুত্র সন্তান প্রদান করবো, আর নাগিনীর গর্ভে পরমপিতা। এবং আমার পুত্রদের ও পরমপিতার কন্যাদের বিবাহ হলে, অসংখ্য বলশালী সন্তান জন্ম নেবে। ভূতরা নিজেদেরকে নিসাধ বলে, তো আমাদের গোত্রের নাম হবে সাধ। আর সাধ নিসাধের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই অনন্তকাল চলতে থাকবে। কেউই একাধিকার লাভ করবেনা, আর তাই কেউ অধিপতি হয়ে বিরাজ করতে পারবেনা। অধিপতি আমরা তিনজন কেবল হয়ে থাকবো”।

অদ্ভুত এই কৌশলের সমর্থন সকলেই করলেন, আর তাই দুধেশ্বর বিবাহ করলেন ধর্মকন্যা জটিলা ও কুটিলাকে, এবং পরমপিতা মেঘাসনা বিবাহ করলেন ধর্মকন্যা নাগিনীকে, এবং একাধিক পুত্র তথা পুত্রীর জন্ম ও তাঁদের বিবাহ দিলে, অসম্ভব ক্ষমতাশালী সাধগোষ্ঠীর জন্ম হলে, সর্বদা তাঁরা নিসাধদের উৎপাত করে, আর তাই সাধ ও নিসাধের যুদ্ধ সর্বক্ষণ লেগে থাকে।  

আর এই সমস্ত কিছুর মধ্যে, অম্বাকে বিবাহ করেন শবেশ। সম্ভোগ ও রমণের চূড়ান্ত আসক্তি নিয়ে এই বিবাহ করলেও, দেবী অম্বা সর্বক্ষণ গোষণ্ড নিয়েই উলমালা থাকেন, আর গোষণ্ডরা সর্বক্ষণ মাতাসর্বস্ব হয়েই অবস্থান করতে থাকেন। অর্থাৎ সেই একই সমস্যার সম্মুখীন হলেন শবেশ, যেই সমস্যার সম্মুখীন আসক্তি হয়েছিলেন। আর তাই এবার তিনি আসক্তিকে ও পরমপিতাকে ডেকে দুধসাগরে এক বৈঠক করলেন।

সেই বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আসক্তি এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করবেন, আর তাঁর পরমশত্রু রমনাথকে তাতে নিমন্ত্রণ করবেন না। এতে করে দেবী অম্বা তিরস্কৃত হবেন আর তাতে যদি তাঁর গরিমা কিছু কম হয়। সিদ্ধান্ত এই নেওয়া হয় যে, আসক্তির কাছে যদি নিজের গরিমা সুরক্ষিত করতে এরপরেও অম্বা উপস্থিত হন, তাহলে অম্বাকে চরম ভাবে অপদস্থ করে, তাঁর সমস্ত গরিমার নাশ করে, তাঁকে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য করবেন মদ।

মদ সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়ে প্রত্যাবর্তন করলে, পরমপিতা চিন্তিত হয়ে বললেন, “হে পরমগুরু দুধেশ্বর, আমার বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে। এই সমস্ত কিছুতে মদের কিছু ক্ষতি হয়ে যাবেনা তো!”

দুধেশ্বর চিন্তিত হয়ে বললেন, “আমার আরো বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে এই যে, অম্বা এমন কিছু করবেনা তো যার কারণে আমাদের সংকট নেমে আসে!”

রমনাথ গম্ভীর ভাবে বললেন, “হুম, তেমনই কিছু হবে। হয়তো পরাপ্রকৃতি যেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মদকে, তার ভঙ্গ হবে। … তবে তেমন হলে তিনি অম্বাদেহ ত্যাগ করবেন, কারণ প্রকৃতির নিয়মই হলো এক অন্য ক্রিয়া করার কালে যাত্রাবদল করা। অর্থাৎ তিনি অন্যভাবে প্রত্যাবর্তন করবেন। আর সেটিই হবে আমাদের কাছে সুযোগ। আমরা এই সময়ে সাধদের বরদান দ্বারা সজ্জিত করবো এক মহাদুর্গ রূপে, আর প্রকৃতিকে সেই দুর্গে পতিত করে দেব। … প্রকৃতির অবস্থান করা অত্যন্ত আবশ্যক, এটাই আমি বুঝেছি অম্বার ক্রিয়াধারা থেকে। সে যতক্ষণ ক্রিয়া করবে, ততক্ষণ শক্তির বিস্তার হতে থাকে, আর ততক্ষণ আমরা অনেক কিছু করার শক্তি লাভ করতে পারবো”।

“অর্থাৎ, আমরা শক্তিকে আবারও আসতে দেব, আর এবার সে এলে, আমাদের নির্মিত দুর্গে তাঁকে প্রবেশ করিয়ে দেব। সেই দুর্গে তিনি অনন্তকাল যুদ্ধ করতে থাকবেন, আর তাঁর থেকে যেই শক্তি, শ্রী আর কলার বিস্তার হতে থাকবে, তা আমরা তিনমূর্তি ধারণ করে করে মহাশক্তিশালী হতে থাকবো। হ্যাঁ, আমাদের এই ক্রিয়ার পিছনে, মদকে বলিদান দিতে হবে। কিন্তু আমরা নিরুপায়, এঁর আগে আমরা প্রকৃতির সাথে সম্মুখে গিয়ে কনো ক্রীড়া করিনি, তাই আমাদের কনো ধারণাই ছিলনা, তাঁর প্রভাব কিরূপ হয়, আর তাঁর প্রভাবের কারণে পরিস্থিতি কেমন কেমন হয়ে যায়। … তবে এবার বুঝেগেছি, আর তাই যাত্রাবদলের দিকে তাঁকে প্রেরণ করানো অত্যন্ত আবশ্যক হয়ে গেছে”।

দুধেশ্বর বললেন, “কিন্তু প্রভু, আপনি কি নিশ্চিত যে প্রকৃতি আবারও ফিরবেন, অম্বার দেহত্যাগ করার পরেও!”

রমনাথ উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ মগরধারী, আমি নিশ্চিত। আমি তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি যে, উনি মাতৃত্ব আর বাৎসল্যেই একমাত্র আসক্ত। আর এই জগতে উনি নিসাধদের, কৃত্তিকাদের ন্যায় পক্ষদের, গোষণ্ডদের লাভ করেছেন, নিসাধদের থেকে তিনি কলাবিদ ও ক্রীড়াবিদদের লাভ করেছেন, যারা সকলে তাঁর মধ্যে মাতৃত্বকে জাগ্রত করেছেন, আর তাঁদের মধ্যে তিনি বাৎসল্যকে জাগ্রত করেছেন। তাই এই বাৎসল্য আর মাতৃত্বের টানে তিনি বারবার আসবেন”।

যেমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তেমনই কর্ম করা হলো। আসক্তি এক মহাঅনুষ্ঠান করলেন। সবদিশায় সকলকে নিমন্ত্রণ পাঠালেন কিন্তু রমবনে কনো নিমন্ত্রণ এলো না। ষণ্ড এই অনুষ্ঠানের খবর এনে গোপনে দিলেন রমনাথকে। কিন্তু সেই কথা শুনে রমনাথ কনো উত্তর দিলেন না। ভোজনের সময়ে পুনরায় রমনাথ ষণ্ডকে প্রশ্ন করলেন, “তো হ্যাঁ ষণ্ড, তুমি কি যেন বলছিলে, কি বার্তা এনেছ তুমি মদপুরীতে কি হতে চলেছে?”

দেবী অম্বা সেখানে উপস্থিত থেকে ভোজন পরিবেশন করছিলেন। এই খবর তিনি পেলে, বিশেষ করে এই অনুষ্ঠানে তাঁর নিমন্ত্রণ নেই জানলে, অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে যাবেন তিনি। তাই ষণ্ড ইতস্তত করছিল সেই কথা সকলের সম্মুখে বলতে, কিন্তু যার সুত্রে সেই সংবাদ ষণ্ড পেয়েছিল, সেই গোচরণ এবার মুখ খুললেন। ষণ্ড, গোপতি তাঁকে মুখ বন্ধ রাখার ইঙ্গিত দিতে থাকলেন, কিন্তু গোচরণ উৎসাহিত হয়ে বলতেই থাকলেন কনো দিকে না তাকিয়ে।

দেবী অম্বা ষণ্ড ও গোপতির আচরণ দেখলেন। আর তিনি যে তা দেখলেন, সেটি ষণ্ডও দেখলেন, আর মাথা নামিয়ে নিলেন। গোচরণ বললেন, “আসলে প্রভু, এই খবর আমিই এনে ষণ্ডকে দিয়েছিলাম। মদপুরীতে এক মহা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। দিকে দিকে সকলকে নিমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে। দুধসাগর আর সপ্তধনুশেও নিমন্ত্রণ গেছে আর নিসাধদের কাছে, অর্থাৎ অম্বাপুরেও। কিন্তু (মুখ কাঁচুমাচু করে) আমাদেরকে নিমন্ত্রণ দেওয়া হয়নি। … খুব ভালো ভালো ব্যঞ্জন হচ্ছে অনুষ্ঠানে। প্রভু, আমরা যাবো?”

রমনাথ বললেন, “বিনা নিমন্ত্রণে কি করে যাবে? বিনা নিমন্ত্রণে যাওয়া যায় কোথাও? তাও যদি সেই ঘর তোমাদের পরমাত্মীয়ের হত, তাও ভাবতে, কিন্তু তেমনও তো নয়!”

দেবী অম্বা বললেন, “আমার তো পরমাত্মীয় তিনি, আমি তো যেতেই পারি। তাহলে আমিই যাবো। আর আমার সাথে আমি ষণ্ড, গোচরণ, গোপতি, আর সকল গোষণ্ডকে নিয়ে যাবো। আমার সন্তান তাঁরা। মায়ের পরমাত্মীয় মানে তো সন্তানেরও পরমাত্মীয়”।

ষণ্ড বললেন, “না মাতা, আমরা তো শ্রেষ্ঠ আহার করি। আপনার হাতের রান্নার তুলনা কোন ব্যঞ্জনের সাথে হয়! … এমন প্রেম আর কনো আহারে থাকতেই পারেনা। … কনো প্রয়োজন নেই সেখানে যাবার মাতা। … বিনা নিমন্ত্রণে যাওয়া সঠিক হবেনা”।

দেবী অম্বা হেসে বললেন, “আমি তো যাবোই সেখানে। আমার পিতা এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন, আর তাতে তাঁর কন্যা যাবেনা! তাহলে তো সেই অনুষ্ঠানই সম্পন্ন হবেনা!”

ষণ্ড উত্তরে বললেন, “না মাতা, কনো প্রয়োজন নেই!”

রমনাথ এবার সামান্য গম্ভীর ভাবে বললেন, “তোমার মাতা যখন বলছে, তাঁর মুখের উপর কথা বলছো কেন ষণ্ড!”

ষণ্ড আমতা আমতা করে বললেন, “আসলে প্রভু, আসক্তি চায়ই যে বিনা নিমন্ত্রণে মাতা সেখানে যাবেন আর উনি তাঁকে অপমান করবেন আপনার সাথে শত্রুতার শোধ তুলতে”।

রমনাথ অধিক ক্ষিপ্র হয়ে বললেন, “সেটাকি তোমার থেকে শিখতে হবে তোমার মা’কে!” … শান্ত হয়ে বললেন এবার দেবী অম্বার উদ্দেশ্যে, “আপনার যেটি করা সঠিক মনে হবে, আপনি সেটিই করবেন দেবী। আপনি তো জানেনই, কারুর থেকে আপনাকে স্বতন্ত্রতা লাভ করতে হয়না, আপনি এমনিই স্বতন্ত্র”।

দেবী অম্বা মৃদু হেসে উঠে গেলেন তজ্জরি করে পিতার আলয়ে যাবার জন্য। সেখানে ষণ্ড পুনরায় গিয়ে এবার অশ্রুপূর্ণ নয়নে বললেন, “মাতা, আমার মন অত্যন্ত কু গাইছে। দয়া করে সেখানে যাবেন না মাতা। … আমার মন বলছে, সেখানে একটা অঘটন ঘটে যাবে”।

দেবী অম্বা মিষ্টমুখে ষণ্ডের কপোলে হাত রেখে স্নেহের সুরে বললেন, “কখনো কনো অঘটন ঘটেনা ষণ্ড। বিচার করে দেখো ষণ্ড, এটি কল্পলোক, বাস্তবে তো শূন্য ব্যতীত কনো কিছুর অস্তিত্বই নেই। এখানে যেমন তুমি কল্পনা করবে, সেই কল্পনা অনুসারেই পরিস্থিতির নির্মাণ হয়। যখনই কনো কল্পনা করা হয়, সেই কল্পনার সাথে সাথে তুমি কিছু পরিণামের হিসাব করে রাখো। তোমার কল্পনার ধারণা কতটা স্বচ্ছ ও নিখুদ, তার উপর নির্ভর করে সেই পরিস্থিতি মেলার বা না মেলার। হতে পারে, সম্পূর্ণ ভাবে তা মিলে গেল, হতে পারে যে তা আংসিক ভাবে মিলল আবার হতে পারে যে তা একদমই মিললনা”।

“পুত্র ষণ্ড, যখন আমাদের সেই পরিস্থিতির অনুমান সম্পূর্ণ ভাবে মিলে যায়, তখন আমরা মুচকি হাসি বা কখনো মদাচ্ছন্ন হয়ে বলিও আবার যে, এমন হবে আমি জানতাম বা আমি পূর্বেই বলেছিলাম। যখন আংশিক মেলে, তখন যদি যেই অংশ মিললনা তা আমাদের কাছে প্রীতিকর হয় তখন আমরা হয় গদগদ হয়ে যাই নয় মদাচ্ছন্ন হয়ে যাই, বা লোভীও হয়ে যাই। আবার যদি যেই অংশ মিললনা তা আমাদের কাছে অপ্রীতিকর হয়, তখন আমরা শঙ্কিত হয়ে যাই, বা লজ্জিত হয়ে যাই বা ক্রোধিত হয়ে যাই, আবার কখনো হিংসাও ধারণ করে নিই। আর যদি আমাদের প্রত্যাশার সাথে কনো রকম মিল না থাকে, তখন আমরা তাকেই অঘটন বলি”।

“অর্থাৎ পুত্র, অঘটন বলে কনো কিছুর কনো অস্তিত্ব নেই। … পুত্র, যে বা যারা বা যারা যারা আগত ঘটনার পরিকল্পনা করেছেন, হতে পারে যে তাঁরা অধিকাংশ পরিণামই ধারণা করে নিয়েছেন, কিন্তু তোমার মাতা সম্পূর্ণ পরিণামই জানেন, আর তাই নিশ্চিন্ত হয়ে যাও। সমস্ত পরিণাম তোমার মাতা জেনেই সেখানে যাবে বলে ঠিক করেছেন। … তাই দুশ্চিন্তা একদম করো না”।

ষণ্ড সমস্ত কিছু শুনেও যেন অস্থিরই রইলেন। অস্থির হয়ে বললেন, “মাতা, যদি আমার অস্থিরতা অতিরিক্ত ভাবে বৃদ্ধি পায়, আমি সমস্ত গোষণ্ডদের নিয়ে আপনার কাছে চলে যাবো, আমাদের এই অনুমতি দিন কৃপা করে”।

দেবী অম্বা হেসে বললেন, “আমি কে হই তোমাদের পুত্র?”

ষণ্ড উত্তরে বললেন, “মাতা!”

দেবী অম্বা হেসে বললেন, “তাহলে আমার থেকে অনুমতি কেন চাইছো? সন্তান মাতার কাছে যাবার জন্য আবার  কবে থেকে অনুমতির অপেক্ষা করতে শুরু করলো! … যখন খুশী আসতে পারো তোমরা তোমাদের মাতার কাছে। এই মাতার আঁচল সর্বদা তাঁর সমস্ত সন্তানের জন্য উন্মুক্ত। স্মরণ রেখো ষণ্ড, কাল হয়তো তোমরা তোমাদের মাতার সম্বন্ধে অনেক কথা শুনবে বা জানবে। নিন্দুকও অনেক কথা বলবেন, ভক্তও অনেক কথা বলবেন। … কিন্তু কখনো এটা ভুলো না যে সে তোমাদের মাতা। … সে অন্য কিছু হন বা না হন, সর্বক্ষণ সে তোমাদের মাতাই থাকবেন। তাঁর সমস্ত পরিচয় মিথ্যা হতে পারে, আপেক্ষিক হতে পারে, কিন্তু সে যে তোমাদের মা, এই পরিচয় সর্বদা সত্য”।

দেবী অম্বা এবার বিদায় গ্রহণ করতে থাকলে, গোষণ্ডরা তাঁর পিছু পিছু আসতে থাকলেন রমবনের দ্বারদেশ পর্যন্ত। দ্বারের সম্মুখে এসে পিছন ঘুরে ষণ্ডের কপোলে হাত রেখে পুনরায় দেবী অম্বা বললেন, “বিশ্বাস হারিও না পুত্র। যাই হয়ে যাক, নিশ্চিত থেকো, সন্তানের কাছে মা ঠিক ফিরে আসবেন। মা নিজের প্রত্যাবর্তনের রূপ পালটে ফেলতে পারেন, কিন্তু প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান নয়, কারণ সে যে সমস্ত কিছুর আগে একজন মা”।

দেবী অম্বা চলে গেলেন, ষণ্ডের হৃদপিণ্ড যেন প্রকাণ্ড গতিতে আঘাত করতে থাকলো তাঁকে। বাকি গোষণ্ডরা, গোচরণ, গোপাল, গোপতি সকলেরই একই অবস্থা। তাই কেউ কারুর সাথে চোখে চোখ মেলালেন না। সকলে রমবনে ফিরে গেলেন, কিন্তু কারুর কনো কাজে মন রইলনা।

মদের আসরে দেবী অম্বা পৌঁছালেন। মদ আশা করেন নি আবার করেওছিলেন যে অম্বা সেখানে আসবে। আশা না করা থেকে বিরক্ত হলেন, আর আশা করার কারণে কুকথা শোনানো শুরু করলেন। বিরক্তি আর কুকথা তাই একত্রিত হয়ে গিয়ে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে থাকলো।

আসক্তির ক্রোধ চরমে উন্নীত হতে থাকলো যখন তাঁর কনো কথা অম্বাকে স্পর্শও করছিলো না, এমন মনে হলো তাঁর। আর সেই ক্রোধ থেকে তিনি অন্তিম অবস্থায় যা বললেন, তা এই রূপ, “নির্লজ্জতারও একটা সীমা থাকা দরকার, কিন্তু এই স্ত্রী তো তাও জানেনা। … অসভ্যতামো, অশালীনতা, অধৈর্যতা, আর নিয়ন্ত্রণহীনতার এই মেয়ের থেকে বড় উপমা সম্ভবই নয়। … দূর হয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে!”

দেবী অম্বা এই সমস্ত কথা শুনে হাস্যমুখে সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “কাকে আপনি চোখের সামনে থেকে চলে যেতে বলছেন? আপনার কন্যা অম্বাকে? নাকি যাকে আপনার কন্যা রূপে পেয়েছেন, তাঁকে?”

মদ সেই কথাতে হতচকিত হয়ে গেলে, অম্বা অনুষ্ঠানের স্থলে পদচারণ করতে করতে বলতে থাকলেন, “হুম, নির্লজ্জ তো আমি বটেই। … আশা করি এখানে সমস্ত স্ত্রীই নির্লজ্জ, কারণ যখন তিনি মা হতে উদ্যত, তখন তো তাঁকে বিবস্ত্র হতেই হয় অন্যদের সামনে। সকল মা’ই সন্তানের রক্ষণ করার জন্য অসভ্য, সন্তানের জন্ম দেবার কালে অশালীন, সন্তানের হিতচিন্তায় অধৈর্য। আর নিয়ন্ত্রণহীন! (বিচিত্র হাস্য হেসে) বড়ই ক্ষেদ আমার পিতা কোকিলাপুত্র মদের যে না তো তিনি তাঁর এই কন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন আর না তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন, যাদেরকে এই পুত্রীর জন্মের আগে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন”।

“আমার পতিরও একই ক্ষেদ জানেন! … কি করে এতো মিল হলো বলুন তো দুই শত্রুর! … সত্যই আপনারা শত্রু তো! নাকি সেটাও নাট্য ছিল! … যাই হোক, সকল স্ত্রীই সন্তানের ক্ষেত্রে অশালীন, অসভ্য, নির্লজ্জ। আর আমার ক্ষেত্রে তো এই সমস্ত কিছুই প্রযোজ্য, কারণ আমি তো তাঁদেরও মাতা, যারা অন্য কারুর মাতা। তাই এই কথাতে তো আমার উত্তেজিত হওয়া শোভা পায়না! … পায়কি?”

“কিন্তু মদ, উত্তেজিত না হলেও, তোকে দেওয়া বচনের মান পুরো করার যে সময় হয়ে গেছে! … তুই যে নিজের অধিকার ছেত্র ত্যাগ করে ফেলেছিস মদ। তাই এবার যে আমাকে যেতে হবে, আমারই বচনের মান রাখার জন্য অবশ্যই। … তাই আমি চললাম। আমি আমার শ্রী আর কলারূপকে মুক্ত করে দিয়ে বিদায় নিলাম জগত থেকে। … (মুচকি হেসে মদের নিকটে গিয়ে) খুশী হচ্ছিস না তো! … কিন্তু তোকে যারা মদত দিয়েছে, তারা কিন্তু খুশী হচ্ছে। … ওই রে তারা যাদের পাশার ঘুটি তুই, তারা বেজায় খুশী হচ্ছে”।

“তাই তোর উদ্দেশ্যে আর তাদের উদ্দেশ্যে দুটি কথা বলবো। … একটা … একটা। … মদ, মহাশূন্য যখন শক্তি, শ্রী ও কলার প্রকাশ করেন, সেই রূপ হলাম আমি। এর আগেও আমি এসেছি আর আবারও আসবো। কারুর আবাহনে নয়, আমার সন্তানদের কাছে আমি আসি, তাঁদের কোলে নিতে আমি আসি। … এতদিন পর্যন্ত, আমার সন্তানরা আমাকে ভুলে বসে ছিলেন, তাই আসতাম তাঁদেরকে স্মরণ করাতে যে আমি তাঁদের প্রকৃতি মা। … তবে এবার আমার সন্তানরা আমাকে কি বলল জানিস মদ!”

“বলল, তাঁদের অনেকের স্মরণে আছে তাঁরা আমার সন্তান, আবার অনেকের স্মরণে নেই। কিন্তু যার স্মরণে আছে, আর যার স্মরণে নেই, দুইজনকেই কেউ আমার কাছে আসতে দেয়না। … তাই আমি আবার আসবো তো বটেই। তবে এবার স্মরণ করাবে আমার সন্তান, আর আমি! … অপেক্ষা করবো আমার সন্তানরা আমার কাছে আসার জন্য ব্যকুল হয়ে উঠবে সেই ক্ষণের”।

মহাউগ্র ভাবে সমস্ত জগতকে কম্পিত করে দেবী অম্বা এবার বললেন, “আর যেদিন সেই অপেক্ষার সময় শেষ হবে, সেদিন আমার সন্তানদের আমার কাছে আসতে যারা বাঁধা দিচ্ছিল, তাঁরা বহু হলে, তাঁদেরকে একত্রে একদেহ প্রদান করে আমি তাঁর বিনাশ করবো। … এতো গেল তোকে যারা মদত দিচ্ছে, তাদের জন্য কথা। এবার আসি তোর কথায়”।

“মদ, শক্তি, শ্রী ও কলার মধ্যে শক্তিকে আমি আমার মধ্যে সুপ্ত করে রাখি, যাকে প্রয়োজনে প্রকাশ করি মাত্র। … তাই এখন আমি যে নিজেকে দহন করে দেব, সেই কালে শক্তি তো দাহিত হবেনা। সত্য বলতে তাঁর নাশ করা সম্ভবও নয়। হবেও না নাশ। কিন্তু সে বিনাশ অবশ্যই করবে। আমার দেহের নাশের জন্য তোকেই কাঠগড়াতে ওঠাবে সে, আর তাই তোকে সমেত সম্পূর্ণ মদপুরীর বিনাশ করবে সে। … তাই প্রস্তুত হয়ে যা সেই বিনাশের জন্য”।

এত বলে, নিজের অন্তরের শক্তির সামান্যই বহিঃপ্রকাশ করে, অগ্নিনির্মাণ করে, সেই অগ্নিতে নিজেকে দহন করে দিলেন অম্বা। দহন হতে হতে দেবী অম্বা শ্রাপ দিলেন মদকে, “হে আসক্তি, হে মদ, যেই মাতৃহত্যার কাণ্ডারি হয়ে রইলি তুই, সেই মাতৃহত্যার কর্মফল এবার সম্পূর্ণ জগত ভোগ করবে, কারণ সমস্ত জগত তোর নির্মিত নিয়মের পালন করে। আর তাই সমস্ত জগত এবার আসক্তি আর মদে জরাজীর্ণ হয়ে যাবে, আর এই মদ আর আসক্তিকে যে দমন করতে পারবেনা, তাকে আমার প্রকোপ সহন করে পিশাচ হতে হবে”।

 এতো বলার শেষে দেবী অম্বার নিথর দেহ ভূপতিত হলে, হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি অতিকায় হয়ে উঠলো ষণ্ড তথা সকল গোষণ্ডদের। অস্থির হয়ে উঠে, তাঁরা মদপুরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। একই ভাব সমস্ত নিসাধদেরও, তবে তাঁরা তো মদপুরীর অন্তরেই ছিলেন, তাই মাতৃহারা হবার বেদনায় নিথর হয়ে গেলেন। মদ সমস্ত কিছুর পর্যবেক্ষণ করে, এবং দেবী অম্বার কথা শ্রবণ করে ভীত হয়ে উঠে দুধেশ্বরের কাছে গমন করে বললেন, “হে প্রভু, রক্ষা করুন। আমার অত্যন্ত ভয় করছে। প্রকৃতি রুষ্ট হয়ে গেছেন। এখন না জানি কি না কি হবে! আপনি আমার রক্ষা করুন”।

দুধেশ্বর বললেন, “চিন্তা করো না, তোমার সেনাকে সচেত থাকতে বলো, আর আমি স্বয়ং তোমার দ্বাররক্ষক হয়ে অবস্থান করছি”। এতো বলে দুধেশ্বর দ্বারে গিয়ে অবস্থান করলে, সেখানে এসে উপস্থিত হন ষণ্ড ও তাঁর সাথে সকল গোষণ্ডরা। দুধেশ্বরকে দ্বারে দেখে ষণ্ড প্রশ্ন করলেন, “কি হয়েছে প্রভু! কিছু তো হয়েছে এখানে। আমার তথা সকল গোষণ্ডদের মন অত্যন্ত বিচলিত কেন হবে নাহলে! … মাতা সুরক্ষিত আছেন তো!”

মগরধারী মাথা নত করে গম্ভীর নিশ্বাস নিয়ে বললেন, “ষণ্ড, যা হয়েছে তাই বিধাতার লিখন ছিল। এখানে আমাদের কারুর কিচ্ছুই করনীয় ছিলো না। দেবী অম্বার এখানে আসা উচিত হয়নি। … তবে তার পরিণতি এমন হবে, তা যে কেউ ভাবেনি!”

ষণ্ড প্রশ্ন করলেন, “কি হয়েছে আমাদের বলুন প্রভু! … মাতা সকুশল তো আছেন?”

দুধেশ্বর মহামায়াবী নরেশ বিভিন্ন রকম প্রয়াস করতে থাকলেন ষণ্ড ও সকল গোষণ্ডদের সঠিক উত্তর না দিয়ে ভ্রমিত করতে, কিন্তু কিছুতেই সক্ষম হচ্ছিলেন না। ঠিক তখন এক গম্ভীর কণ্ঠধ্বনি উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন পিছন থেকে, “উনাকে কি জিজ্ঞাসা করছো ষণ্ড! আমি বলছি তোমাদের অন্দরে কি হয়েছে। … দেবী অম্বাকে মদ যাচ্ছেতাই ভাবে অপমান করলে, পিতার প্রতি, পিতার নির্ধারিত নিয়মের প্রতি আর পিতাকে মদতদাতাদের প্রতি বিরক্ত হয়ে অম্বা আত্মদাহ করেছে”।

ষণ্ড নিজের মুখে বিড়বিড় করতে থাকলেন, “না না, এ হতে পারেনা! … আপনি মিথ্যা বলছেন! … কে আপনি! … মিথ্যা বলছেন”। এই বলতে বলতে পিছন ঘুরে যাকে দেখলেন সে যেন দেবী অম্বাই অন্য রূপে। নগ্ন তাঁর অঙ্গ, শূন্য সমান গহন অন্ধকার যেন ফিকে ধুসর হয়ে এসেছে, এমনই তাঁর অস্তিত্ব, কিন্তু আকার আকৃতি যেন সমস্তই মাতা অম্বার মত।

ষণ্ড প্রশ্ন করলেন, “কে আপনি! আপনাকে আমার মাতার মতই দেখতে, কিন্তু আপনি যেন আমার মাতা নন। কই তাঁর ন্যায় উজ্জ্বল বর্ণা তো নন আপনি। তাঁর ওষ্ঠে, নাসিকায়, মস্তকে, আঁচলে, সর্বত্র যে সহস্র সহস্র সূর্য তারা ঝলমল করে! আপনি এমন পূর্ণ ধুসর কেন? কেন আপনার হাত, পা, বপু, চরণ কনো কিছুই আলাদা করা যাচ্ছেনা! … কেন আপনাকে এমন ভাবে দেখে আমার ভয় করছে! … মা’কে দেখে কনো সন্তানের কি ভয় লাগতে পারে!”

দেবী বললেন, “পারে পুত্র, অবশ্যই পারে। যেই মা শান্ত স্নিগ্ধ, যখন তিনি উগ্র, তখন তাঁকে দেখে সন্তানের ভয় লাগাটাই স্বাভাবিক। হ্যাঁ আমিই তোমাদের মা, তবে এ আমার ভূতানি রূপ, যে তোমার মাতার অবয়বকে নিতে এসেছে। তোমার মা স্বয়ং প্রকৃতি, স্বয়ং শক্তি, স্বয়ং শ্রী ও স্বয়ং কলা। তাই তাঁর রূপভেদ বহু। কখনো তিনি সুশীলা, তো কখনো পদ্মা; কখনো তিনি শ্বেত, তো কখনো কমলা; কখনো নীলা তো কখনো শ্যামা; আবার কখনো তিনি দুধেআলতা তো কখনো হরিদ্রা আবার তাঁর বিশেষ রূপে তিনি ধুসর আবার অন্তিমসম্ভব রূপে তিনি স্বয়ং মহাশূন্য ব্রহ্ম, আর তাই শূন্যের ন্যায় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার”।

“পুত্র, শক্তির, শ্রীর বা কলার নিজস্ব কনো রূপ হয়না, ঠিক যেমন প্রভা, প্রতিভা বা পবিত্রতার কনো রূপ হয়না তেমন। প্রয়োজন অনুসারে তাঁর রূপ পরিবর্তিত হতে থাকে। আর বাস্তবে তিনি যে নিরাকারা। তাঁর ব্যখ্যা করা সম্ভবই নয়, কারণ সম্যক ব্রহ্মাণ্ডকে মেলালেও তাঁর রতিমাত্রকে অনুভব হয়না। … তিনি প্রকৃতি অর্থাৎ সমস্ত চেতনার মিলিত প্রকাশ, আবার নিয়তিও অর্থাৎ সমস্ত সম্ভব প্রকৃতির মিলিত প্রকাশ, আবার প্রতিটি ক্ষুদ্র চেতনাও। আর তাই কালের অতীত তিনি”।

“কাল কি পুত্র? তোমার কর্মভাবনা আর সেই ভাবনার পরিণাম লাভের অন্তরায় হলো কাল। আর সেই কাল ব্যপ্ত থাকে ততক্ষণ যতক্ষণ তুমি সাকার, কারণ নিরাকার না তো কনো কর্মভাবনা রাখে আর না কনো পরিণামের অপেক্ষা রাখে। পুত্র ষণ্ড, তোমার মাতার তনু সাকারত্ব ত্যাগ করে নিরাকরত্বে স্থিত হতে উদ্যত। তিনি তাঁর অবয়ব ত্যাগ করেছেন, কিন্তু আমি না উপস্থিত হলে, তিনি নিজের সত্ত্বাকে নিরাকারে কালের অতীতে বিসর্জন দিতে পারছেন না”।

“পুত্র, ঠিক যেমন নদীর পলি থেকেই মূর্তি নির্মাণ হয়, আর সেই মূর্তি বিসর্জন দিলে তবেই পরবর্তীতে সেই মৃত্তিকা লাভ হয়, তেমনই সত্ত্বা হলো কালের সম্মুখীন হবার দরুন, চেতনাকে ধারণ করার দরুন লব্ধ সমস্ত অভিজ্ঞতার সম্ভার। যদি সেই সত্ত্বার আমার মধ্যে বিসর্জন না হয়, তাহলে যে সেই সত্ত্বা আর ফিরে আসতে পারেনা! যদি তোমার মাতার আর দেহধারণের প্রয়োজন না থাকতো, তাহলে আমি নয়, স্বয়ং মহাশূন্য অর্থাৎ ব্রহ্মময়ী কালী আসতেন”।

“পুত্র তিনি নদী নন, তিনি সমুদ্র। সমুদ্রের মধ্যে লীন হবার অর্থ আর কনো ভেদ নেই। সমুদ্রে নিমগ্ন নদীর জলধারাকে আর নদীর জলধারা বলে চিহ্নিত করা যায়না, কারণ তা চিরতরে সাগরে লীন হয়ে গেছে। তেমনই যেই সত্ত্বা ব্রহ্মময়ী মহাকালীতে নিমগ্ন হন, তাঁর আর প্রত্যাবর্তন হয়না। মুক্ত হয়ে যান তিনি চিরতরে। … কিন্তু তোমার মাতা তো আবারও ফিরবেন। তাই মহাকালী নন, আমি এসেছি তাঁর সত্ত্বাকে গ্রহণ করে নিয়ে যেতে”।

ষণ্ডের মধ্যে আর কনো দ্বন্ধ নেই, কারণ সেই কণ্ঠস্বর তাঁর মাতারই। মাতাকে আবার দেখতে পাচ্ছেন, মাতার কণ্ঠস্বর আবারও শুনতে পাচ্ছেন, সেই জন্য আনন্দিত হবেন, নাকি আর মাতাকে কখনো স্পর্শ করতে পারবেন না, আর কখনো মাতার ক্রির লাভ করবেনা, সেই জন্য ব্যথিত হবেন, উভয়সঙ্কট অনুভব করে, ষণ্ড যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানেই বসে পরলেন, আর পাথরের ন্যায় হয়ে গেলেন। একই অবস্থা সকল গোষণ্ডদের, আর মদপুরীর অন্তরে সকল নিসাধদের এবং পক্ষদের।

মাতা ভূতানি এবার এসে শোণদের মাথায় স্পর্শ করে বললেন, “ষণ্ড, পুত্র, তোমার মাতা তোমাকে অন্তিম কথা কি বলেছিলেন, স্মরণ করো!”

ষণ্ড নিথর হয়েই বললেন, “মাতা নিজের রূপকে সন্তানের কাছে প্রত্যাবর্তন নাও করাতে পারেন, কিন্তু সন্তানকে দেওয়া প্রত্যাবর্তনের অঙ্গিকার কিছুতেই ত্যাগ করেন না”।

দেবী ভূতানি এবার ষণ্ডের সম্মুখে উপনীত হয়ে বসে বললেন, “তাহলে এমন মনমরা হয়ে আছো কেন? তিনি তো ফিরবেন। মায়ের কাছে কেউ প্রয়োজনীয় নয়, কেউ জরুরি নয়, তিনি যে ঈশ্বরী এই পরিচয়ও প্রয়োজনীয় নয়, কিন্তু তিনি যে মা, এটিই তাঁর কাছে একমাত্র প্রয়োজনীয় তত্ত্ব ও তথ্য। মাতা ফিরবেন ষণ্ড, নিশ্চয়ই ফিরবেন। অপেক্ষা করো তাঁর। দেখো, তিনি ফিরবেন তো বটেই, আর তোমার কাছেই আসবেন। মা তিনি। তাই যতই জানুন যে তাঁর সন্তানকে ঘিরে তাঁর শত্রুরা তাঁকেই বন্দিনী করে রাখতে চক্রান্ত নির্মাণ করেছে, তবুও তিনি সন্তানের কাছে আসবেন। … এটিই মায়ের ধর্ম, আর সমস্ত ধর্ম ভুলে যেতে পারেন পরাপ্রকৃতি, মায়ের ধর্ম … না কখনোই নয়”।

“এই ধর্ম যে তিনি কর্তব্যের খাতিরে পালন করেন না। কর্তব্যের খাতিরে তিনি ঈশ্বরী, তিনি পরমেশ্বরী, তিনি ব্রহ্মময়ী, কিন্তু মাতৃত্ব! … তা যে তাঁর কাছে অস্তিত্বের আধার, নিরাকার হয়েও সাকারে প্রকাশিত হবার একমাত্র কারণ, একমাত্র প্রেরণা। … তাই নিশ্চিন্ত থাকো ষণ্ড, মাতা ফিরবেন, আর পরিস্থিতি যেমনই হোক, তাঁর সন্তানদের নিশ্চিত ভাবে খুঁজে নিয়ে তাঁদের কাছে চলে আসবেন”।

এতোবলে এবার দেবী ভূতানি মদপুরীতে প্রবেশ করতে গেলে, দুধেশ্বর সেখানে দণ্ডায়মান হয়ে বললেন, “আমি আর মদের প্রকাণ্ড সেনা থাকতে, আপনি সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন না”।

দেবী ভূতানি সেই কথা শুনে অট্টহাস্য হেসে বললেন, “গোষণ্ডরা জানে যে আমি না গেলে, তাঁদের মাতা আর কখনোই ফিরতে পারবেন না। তাই আমি যদি একবার তাঁদেরকে বলি যে, মদের সেনার নাশ করতে তবেই আমি তাঁদের মাতার কাছে পৌঁছাতে পারবো, তাহলে এই মুহূর্তে তাণ্ডব শুরু হয়ে যাবে। এটা জেনে বলছেন তো নরেশ যে আমাকে প্রবেশ করতে দেবেন না!”

দুধেশ্বর একটি খল হাস্য প্রদান করলে, ভূতানি পুনরায় হেসে বললেন, “বুঝে গেছি রজগুণ, ষণ্ডদেরকে যদি এই কাজ করতে বলি, তারপরে তাঁদের আর রমবনে স্থান দেওয়া হবেনা। এই তো! … বেশ তো। আমি তবে এক নতুন গুচ্ছ সেনার নির্মাণ করি”।

এতবলে, নিজের থেকে একে একে ৫০টি প্রকাণ্ড ভূতান নির্মাণ করলেন, আর অন্তে এক মহাপ্রকাণ্ড কালভূতান নির্মাণ করে, নির্দেশ দিলে, মুহূর্তের মধ্যে শত শত মদসেনার নাশ করতে থাকলেন। একটি প্রহরও লাগলো না সমস্ত সেনার নাশ করতে। অতঃপরে দুধেশ্বর বললেন, “আমি এখনো উপস্থিত এখানে, পরাজিত কর আমাকে আর প্রবেশ করো অন্দরে”।

এতো বলে দুধেশ্বর বিকট এক পাশে আবদ্ধ করে দিলেন সমস্ত ৫১ ভূতানকে। সেই দৃশ্য দেখে এক মুচকি হাস্য হেসে দেবী ভূতানি দুধেশ্বরকে একটি পাশে আবদ্ধ করে, সমস্ত ভূতানকে পাশ থেকে মুক্ত করলেন, তো তাঁরা অন্দরে চলে গেলেন, এবং মদের শিরোচ্ছেদ করে, দেবী অম্বার তনুকে বাইরে নিয়ে এলেন। এরপর দুধেশ্বর সহ সকল গোষণ্ড দেখলেন, দেবী ভূতানি দেবী অম্বার সত্ত্বাকে নিজের মধ্যে সমাহিত করে নিলেন, আর অতঃপরে ভূতানদের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমরা দেবীর দিব্যতনুকে ভূমির সাথে মিশিয়ে, তাঁর অঙ্গ উর্জ্জাকে সুরক্ষিত রাখো। যখন পুনরায় দেবীর দেহধারণের সময় হবে, তখন আমি তোমাদের ইঙ্গিত দিলে সকল উর্জ্জাকে মুক্ত করবে। একস্থানে তাঁর তনুকে রাখলে, তাঁর মৃত্যুর জন্য যারা লালায়িত ছিলেন, তাঁরা দেবীর উর্জ্জাকে হনন করে আত্মগরিমা নির্মাণে কাজে লাগাবে”।

এমন কথনের পর সমস্ত ভূতান চলে গেলে, দেবী ভূতানি দুধেশ্বরের নিকটে গিয়ে বললেন, “যতক্ষণ না অম্বার তনুর ৫১ টুকরো ভূমিতে স্থাপিত হচ্ছে, ততক্ষণ তুমি মুক্তও হবেনা এই পাশ থেকে, আর তোমার সঙ্গীদের সেই বার্তা প্রদানও করতে পারবেনা। অতঃপরে তোমার বন্ধন খুলে যাবে। তখন যতখুশী খুঁজো অম্বার উর্জ্জাকে”। এত বলে অবলুপ্ত হলেন সেই স্থান থেকে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22