আদি কৃতান্ত – প্রকৃত ঈশ্বরকথা

ইচ্ছাধারীর কাছে গিয়ে, পরমাত্ম সেই সমস্ত কথা বললেন, যা কিছু তিনি দেবী অম্বিকার থেকে শুনেছিলেন। সেই সমস্ত কথা শুনে ইচ্ছাধারী ক্রোধে ফেটে পরে বললেন, “ এর অর্থ, আপনি আমাকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিলেন!”

পরমাত্ম হুংকার ছেড়ে বললেন, “আমি কি জেনে বুঝে এই কাজ করেছি নাকি? আমি কি করে ভাববো যে, অম্বিকা ক্রুদ্ধ ও অসন্তুলন অবস্থাতেও এতটা অধিক ভাবে সন্তুলিত! কি করে ভাববো যে, এই ক্রুদ্ধ আবেশ ধারণ করা তার একটা লীলা! … সমস্ত কিছু ক্রোধিত অবস্থায় অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। কয়লা তাঁকে সেই নিয়ন্ত্রিনহীন অবস্থায় নিয়ে যাবার জন্য সক্রিয় ছিলো, তাই আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম, এই অনিয়ন্ত্রিত অবস্থার ফায়দা নিতে”।

“যখন তুমি আর সংহার বরদান পেয়ে গেলে, আমি তো নিশ্চিন্ত হয়ে গেছিলাম যে, তোমাদের বিনাশ আর সম্ভবই নয় জেনে। কিন্তু এই সমস্ত কিছু অম্বিকারই লীলা ছিলো, তা আমি ঘনাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। সে যে স্থূল দেহে নবোদিত হবার যোজনা করে রেখেছে, তার টের আমি পাইনি, মৃষু ছাড়া অন্য কেউ পেয়েছিল কিনা তাও আমি জানিনা। এক মৃষুই তার মাকে পূর্ণ ভাবে চেনে। প্রতিটি চালের অর্থ বোঝে সে। কিন্তু সে তো ঘোর শত্রু আমাদের। তাই সে কি উপলব্ধি করে রয়েছে, তা জানা তো আমাদের পক্ষে সম্ভবই নয়”।

ইচ্ছাধারী মাথা নেড়ে বললেন, “এর অর্থ, আপনাকে আপনারই জালে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন দেবী অম্বিকা। … তিনি জানতেন যে, যদি তিনি উগ্র হন, তাহলে আপনি আমাদেরকে বরদান গ্রহণ করে তাঁর থেকে সুরক্ষিত হবার প্রেরণা দেবেনই। তিনি হলেন পরাচেতনা। সকলের অন্তরে চেতনার বিস্তার তিনিই করেন। কয়লার অন্তরেও এর অর্থ, তিনিই চেতনা প্রদান করেছিলেন তাঁকে উগ্র করে তোলার। আর যেই তিনি উগ্র হলেন, তাই আমরা বরদান নিয়ে ভাবলাম সুরক্ষিত হয়ে গেছি। কিন্তু আমাদের সুরক্ষার কবচকে ভেঙে দেবার জন্যই তো তাঁর এই লীলা!”

“তিনি আমাদের যখন বরদান দিলেন যে আমরা অবিবাহিত কন্যাদের হাতে মৃত্যু লাভ করবো, তাও আমাদের বলের থেকে অধিক বল যার তার হাতেই, এর অর্থ নিশ্চিত যে তিনি ছাড়া আমাদেরকে কেউ হত্যা করতে পারবেন না, আর তিনি তো বিবাহিতা। তাই তিনিও আমাদেরকে হত্যা করতে পারবেন না। আসলে এটিই তাঁর যোজনা ছিল যে, আমাদেরকে এই বরদান প্রদান করে, তারপর তিনি স্থূল দেহ ধারণ করে নবজন্ম নিয়ে কিশোরী হয়ে বিরাজ করবেন”।

“ফেঁসে গেছি আমরা। আর শুধু আমরা নই, আপনিও। কি ভাবে আপনি ফেঁসেছেন, সঠিক ভাবে বলতে পারবো না। তবে আমার মনে হচ্ছে যেন এই সমস্ত কিছু আপনাকে ফাঁসানোর জন্যই করেছেন উনি। আমরা তো কেবলই মাধ্যম মাত্র। তা নাহলে, আপনাকে ভক্ষণ করে নিয়ে, আপনাকে আর ত্রিগুণবিস্তার করা থেকে আটকাতেন না। মধ্যা কথা, আপনাকে আর একাধিক রূপে বিস্তৃত হওয়া থেকে আটকে দিলেন তিনি। কিছু বড় চিন্তা আছে উনার, যার ইয়ত্তাও আমরা করতে পারছিনা”।

পরমাত্ম মাথা নেড়ে বললেন, “কি তাঁর যোজনা সেটা আমাদের পক্ষে যে জানা সম্ভব নয়, সেটা তো আমরা এতক্ষণে বুঝেই গেছি। তাই সেই নিয়ে ভেবে লাভ নেই। আমাদের এখন উচিত আমাদের যোজনার বিস্তার করা। অম্বা আক্রমণাত্মক হয়েছে। এই প্রথমবার সে আক্রমণাত্মক হয়েছে। তাই আমরা রক্ষণাত্মক হতে পারিনা। রক্ষণাত্মক হয়ে তার থেকে আমরা বাঁচতে পারবো না। আমাদেরকেও আক্রমণাত্মক হবার যোজনা করতে হবে”।

ইচ্ছাধারী বললেন, “এখন তো তিনি গর্ভে বা জন্ম নেবেন সবে। স্থূল দেহে আসলে, সকলেই ভ্রমের মধ্যে থাকে। তা এমন করা যায়না যাতে এই ভ্রমিত অবস্থাতেই তাঁকে রেখে দেওয়া যায়!”

পরমাত্ম মাথা নেড়ে বললেন, “মৃষুকে আমি বরাবর হালকা ভাবে নিয়েছি, আর এটাই ছিলো আমার সব থেকে বড় ভুল। সাতখণ্ডে যখন তাকে চূর্ণ করে দিলো সাধপাল, তখন আমি ভেবে নিলাম যে মৃষুর নাশ হয়ে গেছে। কিন্তু সে যে ব্রহ্মময়ীর সন্তান, সেটা আমি ভুলে গেলাম। তাঁকে মৃত্যু দেওয়া তো একপ্রকার অসম্ভবই। … সে একে একে নিজের সাতকলাকে একত্রিত করে পূর্ণভাবে মৃষু হয়ে ফিরে এলো”।

“সেই প্রত্যাবর্তনের পথে আমি তাঁর সম্মুখীন অনেকবার করেছি। সে যখন আসন বেশে ছিলো, যখন অনন্য বেশে ছিলো, তখন তার সাথে আমি সম্যক যুদ্ধও করেছি। কিন্তু একটিবারও আমি তাঁকে পরাজিত করতে পারিনি। তারপরেও আমি তাকে যথার্থ গুরুত্ব দিইনি। … পরিণাম শুধু সাধপালের বিনাশই নয়, পরিনাম এই যে, সে আজ একটা ভিন্ন ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ করে নিয়েছে, যাতে আমার বা আমার কনো উর্জ্জার বিধাতা বেশে প্রবেশ সম্ভবই নয়। আর মৃষু সেখানেই অম্বাকে বড় করে তুলবে। … তাই অম্বার উপর আমরা কনো বলতে কনো প্রভাব বিস্তার করতে পারবো না”।

ইচ্ছাধারী মাথা নেড়ে বললেন, “হুম, সমস্যা অত্যন্ত জটিল। শত্রুপক্ষ কোমর বেঁধে নেমেছে। আর তার থেকেও বড় কথা এই যে, শত্রুপক্ষ বরাবরই আমাদের থেকে অধিক শক্তিশালী ছিলো। শুধুই নিজের শক্তিকে একত্রিত করতে পারেনি বলে, আমাদেরকে আক্রমণ করেনি। শুধুই আমাদের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করে গেছে। এখন তারা সম্পূর্ণ শক্তি সঞ্চয় করে ফেলেছে, আর তাই এবার আর রক্ষণের নয়, আক্রমণের চিন্তা করছে। … আমার তো মনে হয়, দেবী অম্বার কেবল বেড়ে ওঠার অপেক্ষা। তারপরেও, আমাদের পরিস্থিতি সমানে জটিল হতে থাকবে”।

পরমাত্ম মাথা নেড়ে বললেন, “এই ভাবে হাতের উপর হাত রেখে আমরা বসে থাকতে পারিনা। কনো উপায় বার করতে হবে। … আচ্ছা ইচ্ছাধারী, তোমাকে তো জ্বরার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিয়েছেন না দেবী? … তা ওকে ডাকো। যদি ওকে দিয়ে কিছু করা যায়”।

ইচ্ছাধারী জ্বরাসুরের আবাহন করলে, জ্বরাসুর সেখানে উপস্থিত হয়ে ইচ্ছাধারী ও পরমাত্মকে প্রণাম করলে, পরমাত্ম বললেন, “জ্বরা তুমি বারুদাবনে প্রবেশ করতে পারবেনা। আমরা কেউই পারবো না। কিন্তু অম্বাকে সেখান থেকে বার করতে একমাত্র তুমিই পারো”।

জ্বরা ও ইচ্ছাধারী একত্রে প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু কি করে?”

পরমাত্ম বললেন, “জগন্মাতা তিনি। মনুষ্য তাঁর প্রিয় সন্তান। মনুষ্য যদি জ্বরাতে আক্রান্ত হন, তবে তিনি আর বারুদাবনে সীমাবদ্ধ থাকতে পারবেন না”।

জ্বরাসুর একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন, “যেমন করতে বললেন আপনি, তেমন আমি অবশ্যই করবো। আর তেমন করতে আমার খুব একটা পরিশ্রমও করতে হবেনা। কিছু বছর আগে, আপনার প্ররোচনাতে একটি ব্যধির নামে মিথ্যাচার করা হয়েছিল মনুষ্যদের মধ্যে। এই মিথ্যাচারের উদ্দেশ্য আপনি ভালো করেই জানেন, কারণ যোজনা আপনারই ছিলো। একটি বিশেষ ধরনের বিষ মানুষের দেহে প্রবেশ করানোর জন্যই আপনি এই মিথ্যাচার, অর্থাৎ সেই ব্যাধির রটনা করিয়েছিলেন। আর সেই রটনা করা ব্যাধির নিরাময়ের নাম করে, আপনি বিস্তর মনুষ্যদের দেহে সেই বিষ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন”।

“যারা যারা সেই বিষ গ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে আর কনো জীবাণুনাশকের জন্ম হবেনা। তাই তাদেরকে শুধু আক্রান্তই নয়, দুর্দান্ত মৃত্যু দেওয়াও কনো কঠিন কাজ নয়। কিন্তু প্রভু, আমার একটা দ্বন্ধ আছে। আর দ্বন্ধ এই যে, মাতা সত্যিই বাঁচাতে আসবেন তো মানুষদের?”

পরমাত্ম ভ্রুকুঞ্চিত করে উঠে বললেন, “এ কি বলছো জ্বরা? তিনি জগন্মাতা। আর তার থেকেও বড় কথা এই যে, মানুষ তাঁর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি যোনি। এই যোনির মাধ্যমে সে অনেক মেধাকে চেতনায় পরিণত করেছে অতীতে আর মুক্তও করেছে তাদেরকে। তাদের বাঁচাতে আসবেনা?”

জ্বরা বললেন, “প্রভু, আপনি হয়তো জানেন না, মাতা ধরিত্রীর তুষার মণ্ডিত স্থানে, আজ থেকে প্রায় এক শত বর্ষ পূর্বে, যখন ধরিত্রীর বুকে প্রথমবার রমনাস্ত্র ব্যবহার হয়, তখনই একটি বিশেষ ধরেনের জীবাণু নির্মাণ করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিলো মনুষ্যযোনির নাশ। … তুষারের মধ্যেই তিনি সেই জীবাণুকে সুরক্ষিত রেখে দিয়েছিলেন নিষ্ক্রিয় করে রেখে। মাতা এই কিছু দিন আগেই উগ্র রূপ ধারণ করেছিলেন, সেটা তো আপনি জানেন। কিন্তু সেই উগ্র রূপ ধারণ করার মূল কারণ কি ছিলো আমরা সকলে জানি, তবে তার একটি কারণ অবশ্যই ছিলো সেই জীবাণুদের সক্রিয় করে তোলা”।

“মাতা যখন আপনাকে বমন করে নির্গত করলেন নিজের থেকে, তখন সেই সক্রিয় জীবাণুদের কাছে যান, এবং তাঁদেরকে সক্রিয় অবস্থাতেই এক অতিগুপ্ত স্থানে গচ্ছিত করে দেন। সেই গুপ্ত স্থান কোথায়, সেই ব্যাপারে আমার কনো ধারণা নেই। কিন্তু আমি জ্বরাসুর। সমস্ত জীবাণুর রাজা আমি। তাই এটা আমি স্পষ্ট ভাবে জানি যে, সেই জীবাণু মনুষ্যযোনির বিনাশের জন্যই নির্মিত, আর তাকে যদি জগতে মুক্ত করা হয়, মাত্র একটি বৎসরের মধ্যে মনুষ্য এই জগত থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে”।

“তাই প্রভু, আমার সন্দেহ আছে যে, মনুষ্যকে রক্ষা করতে মাতা আসবেন তো? কারণ মাতা নিজেই মনুষ্যকুলকে বিনষ্ট করার বীজ নির্মাণ করে, তাকে সক্রিয় করে দিয়েছেন”।

পরমাত্ম এই সমস্ত কথা শুনে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে উঠলেন। ভয়ে, সন্দেহে, কুণ্ঠায় তিনি অস্থির হয়ে গিয়ে বললেন, “বড় কিছু হতে চলেছে। অত্যন্তই বড় কিছু। এখন তো মনে হচ্ছে, এই যোজনার নির্মাতা অম্বা নয়ই, কারণ অম্বা এতটা জটিল ভাবে … তবে কি মৃষু? … সেই কারণেই কি মৃষু একটি ভিন্ন ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ করে নিয়েছে, যাতে আমার নির্মিত ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু হয়ে যাক, তার প্রভাবই পড়বেনা সেই ব্রহ্মাণ্ডে! … কি হতে চলেছে? কি চলছে ওদের মধ্যে?”

ইচ্ছাধারী বললেন, “প্রভু, আপনি যদি বলেন তবে জ্বরা মানুষকে আক্রান্ত না করে, অন্য সমস্ত যোনিকে আক্রান্ত করুক? হতে পারে যে, রমনাস্ত্র ব্যবহারের কারণে অন্য সমস্ত যোনির জীবনকে নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়ার সূত্রপাত করার জন্য মনুষ্য যোনিকে মাতা অবলুপ্ত করতে চাইছেন। এমন অবস্থায় যদি অন্য সমস্ত যোনিকেই জ্বরা আক্রান্ত করে দেয়!”

জ্বরাসুর বললেন, “সম্ভব নয় তা। মাতা এবারে যখন উগ্র হয়েছিলেন, তখন নিজের অঙ্গ থেকে এক বিশেষ প্রকার ধূম্র প্রকাশ করেছিলেন। মনুষ্য তো প্রকৃতির থেকে কিছুই নেয় না, সর্বক্ষণ কৃত্তিম আবহাওয়াতেই থাকে তারা। কিন্তু সমস্ত অন্যযোনি সেই ধূম্রমিশ্রিত বায়ু সেবন করেছে। আর তা করার ফলে, এমন হয়ে গেছে তারা যে কনো জীবাণু তাদের কিচ্ছু করতে পারবেনা। জীবাণু, তা যেই প্রকারেরই জীবাণু হোক, তাদেরকে আক্রান্ত করার মুহূর্তের মধ্যে তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিশোধক নির্মাণ করে নেবে। … খেয়াল করে দেখুন মহারাজ ইচ্ছাধারী, শেষ কিছু সময় ধরে জঙ্গলে যেই মনুষ্যরা কাজ করতেন, তারা যেই নিদ্রার ওষুধ দিতেন সকল পশুদের, তাও ক্রিয়া করছে না”।

পরমাত্ম বললেন, “বুঝতে পারছি, শত্রুবেশে অম্বা আর মৃষু অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। পূর্ণ ভাবে রণকৌশল নির্মাণ করেই তারা যুদ্ধে নেমেছে। … আমাদের সমস্ত সম্ভাব্য পদক্ষেপের স্থানে তারা প্রতিবন্ধকতা লাগিয়ে দিয়েছে। … বেশ জ্বরা, তুমি কিছুদিন করে দেখো অন্তত, অম্বা মানুষের জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় কনো প্রতিক্রিয়া দেখায় কিনা। যদি না দেখায়, বন্ধ করে দিও মনুষ্যদের যাতনা দেওয়া”।

জ্বরাসুর চলে গেলে, পরমাত্ম ইচ্ছাধারীর উদ্দেশ্যে বললেন, “আমরা এখন কেবলই কঠিন করে তুলতে পারি মৃষু আর অম্বার জয়যাত্রাকে। … তোমার কাছে কে কে এমন আছে, যে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে যুদ্ধে?… স্মরণ রেখো, সমস্ত নিসাধ এই যুদ্ধে অংশ নেবে, আর হতে পারে যক্ষরাও। কিন্তু সর্বোত্তম আঘাত পাবে তোমরা মৃষুর থেকে”।

ইচ্ছাধারী মাথা নেড়ে বললেন, “না প্রভু, এই যুদ্ধে নিসাধরা এগিয়ে এসে দেবী অম্বার কাছে নিজেদের সমর্পণের প্রমাণ দেবার প্রয়াস করতেও পারে, কিন্তু যক্ষ বা মৃষু, এই যুদ্ধে ভাগও নেবেনা। … আপনি ঠিকই বলেছেন, যুদ্ধের যোজনা দেবী অম্বার নির্মিত নয়। দেবী অম্বা যোজনা নির্মাণে পারদর্শী নন। যোজনা মৃষুর। আর মৃষু খুব ভালো করে জানে যে, যদি দেবী অম্বা একবার যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে যান, তাহলে তাঁকে পরাজিত করার সামর্থ্য কারুর নেই। কনো বরদান, কনো কিছু তাঁর সামনে কবচ রূপে দাঁড়াতে পারেনা। … তাই মৃষু, সঠিক সময়ে তার মাকে যুদ্ধে অবতরণ করানোরই কেবল যোজনা করবে”।

পরমাত্ম বললেন, “আমার মনে হয় সঠিক বলছো তুমি। … কিন্তু সেই ক্ষেত্রে আমরা কি করতে পারি?”

ইচ্ছাধারী বললেন, “যুদ্ধক্ষেত্রে মৃষু থাকবেনা। অর্থাৎ যদি যুদ্ধক্ষেত্রে এমন কিছু হয়, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, সেই ক্ষেত্রে দেবীকে বুদ্ধি দেবার মত কেউ থাকবেনা। অর্থাৎ দেবী বিচলিত হয়ে যাবেন। আর যতই দেবী বিচলিত হয়ে উঠবেন, ততই দেবী উগ্র হয়ে উঠবেন। … প্রভু, দেবী স্থূলরূপে থাকবেন। তাই উগ্রতা সহন করার একটি সীমা থাকবেই। তার উর্ধ্বে যদি তাঁর উগ্রতা চলে যায়, তাহলে তিনি আর দেহ ধরে রাখতে পারবেন না। … আর যদি তাঁকে স্থূলদেহ ত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারি, তাহলেই আমরা যুদ্ধে বিজয়ী”।

“তখন হয় মৃষুকে রণক্ষেত্রে উপস্থিত হতে হবে, নয় পলায়ন করতে হবে। আর মৃষু যদি রণক্ষেত্রে উপস্থিত হয়, তার মৃত্যু হবেই, কারণ আমরা সকলে এই বরদানে ভূষিত যে কনো অবিবাহিত কন্যাই আমাদের হত্যা করতে সক্ষম। … আর একবার মৃষুকে বিনষ্ট করতে পারলে, দেবী অনন্ত শোকে চলে যাবেন। আর আমরা বিজেতা হয়ে রাজ করবো ব্রহ্মাণ্ডে”।

পরমাত্ম এতক্ষণ পরে সামান্য হাসলেন। হেসে বললেন, “অতি উত্তম, অতি উত্তম। … কিন্তু তেমন সেনাও তো তোমার প্রয়োজন, যারা দেবীকে বিব্রত করতে সক্ষম। আছে এমন কেউ?”

ইচ্ছাধারী ক্রুর হাসি হেসে বললেন, “এক নয়, একাধিক আছে প্রভু। হাজতের পিতা মুমু রয়েছে, যার মেরুদণ্ডকে যদি কেউ এককোপে চিড়তে না পারে, তাহলে তার মৃত্যু অসম্ভব। আর যতক্ষণ তার মৃত্যু সম্ভব নয়, তার শক্তিশালী ভুজা একাকীই সমস্ত নিসাধকে সমাপ্ত করে দেবার সামর্থ্য রাখে। দণ্ডশুণ্ড আছে যারা ইতিমধ্যেই নিসাধদের ত্রাসের কারণ, তাদের ক্ষিপ্রতা, উগ্রতা আর তার সাথে রয়েছে প্রকাণ্ড গতি। তারা তাদের গতির কারণে যেকোনো যোদ্ধাকে ভিম্রি খাইয়ে দেয়, আর তারপরে তাদের অতি নির্মম ভাবে হত্যা করে। মদমন্ত আছে। সে তো স্বয়ং মনেন্দ্রিয়। মানস তার ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপে। দ্বন্ধরূপ ধূম্র বিস্তার করা, আর সেই ধূম্র দ্বারা যেকোনো কারুকে বশ করে নিয়ে, তার বিনাশ করা তার অতি প্রিয় কাজ”।

“এঁদের সাথে সাথে আমার এক লক্ষ সেনা আছে। এরা দেবীকে পরাস্ত তো করতে পারবেনা, কিন্তু এঁদের বিপুল সংখ্যা দেবীকে বিব্রত অবশ্যই করবে। … আর এঁদের সকলের অন্তে রয়েছে মহাবলি অনন্তবীর্য। তাঁকে তো স্বয়ং আপনিই বরদান দিয়েছেন যে, তাঁর প্রতিটি রক্তবিন্দুতে আপনি নিবাস করবেন আর তাই তার প্রতিটি রক্তবিন্দু ভূমি স্পর্শ করার সাথে সাথে আবারও একটি অনন্তবীর্য জন্ম নেবে”।

পরমাত্ম হেসে বললেন, “অসাধারণ। এঁদের সকলকে তুমি তোমার সেনাতে স্থাপন করলে, আরো একটি কবচ যুক্ত হয়ে যাবে এঁদের সাথে। একমাত্র কনো কুমারী স্ত্রীই এঁদের হত্যা করতে পারবে, অন্য কেউ নয়। … বেশ বেশ, তুমি সজ্জ করো তোমার সেনাকে। আমি সংহারের কাছে যাবো এবার। তাকেও একই ভাবে সুসজ্জিত করতে হবে”।

ইচ্ছাধারী মৃদু হেসে বললেন, “সংহার আপনার জন্য একটি তুরুপের তাস হতে পারে প্রভু। সংহারের প্রপিতা মৃষুর এক অবতারজন্মে বহুতর সাহায্য করেছিল। তাই মৃষু তাকে অভয়দান দিয়ে রেখেছে যে, তার কুলের যদি কখনো বিপদ আসে, তবে মৃষু তার কুলের শত্রুর সম্মুখীন হবে। তবে এখানে একটি শর্ত আছে যে, একটি কুলপুরুষকে একটিই বার সাহায্য করবে মৃষু। … প্রভু, সংহারকে সরাসরি শত্রুতা করতে বলতে পারেন দেবীর সাথে। যখন দেবী সম্মুখে আসবে আক্রমণ করতে, তখন মৃষুকে আবাহন করলে, দেবী বাধ্য হবেন মৃষুর উপর আক্রমণ করতে। অর্থাৎ!”

পরমাত্ম ও ইচ্ছাধারী উভয়েরই অট্টহাস্য। হাস্যের শেষে পরমাত্ম বললেন, “এই গুপ্ত কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আসি তাহলে সংহারকে। মৃষুর পুরো যোজনাতে জল ঢেলে দিয়ে আসি”।

এতোবলে পরমাত্ম সংহারের কাছে চলে গেলেন। আর অন্যদিকে দেবী ধরিত্রীর প্রসববেদনা উঠলে, সকল যক্ষরা একত্রিত হয়ে, তাঁর যন্ত্রণাকে লাঘব করে দিয়ে, তাঁর গর্ভ থেকে জগজ্জননীর স্থূল দেহকে লাভ করলেন। আনন্দে উৎফুল্ল মৃষু, নিজের কন্যার চরণকে নিজের মস্তকে স্থাপন করলেন। আর প্রস্তুত হতে শুরু করলেন যাতে তাঁকে তাঁর স্বরূপ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া যায়।

দেবী হর্ষিতা প্রশ্ন করলেন তাঁকে, “মৃষু, ঈশ্বরকে ঈশ্বরত্ব স্মরণ করানোর উপায় কি? আমি তো কিছু ভেবেই পাচ্ছিনা!”

মৃষু হেসে বললেন, “ঈশ্বর! মাকে ঈশ্বর হবার স্মৃতি ফিরিয়ে দিতে চাইলে, মা তো এমনিই সেই স্মৃতি গ্রহণ করবেন না! … যিনি ঈশ্বর হয়ে থাকতেই পছন্দ করেননা, তাকে ঈশ্বরত্ব গ্রহণ করতে বললে, সে তো বিপরীতগামী হয়ে উঠবে”।

দেবী হর্ষিতা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “তাহলে উপায়?”

মৃষু হেসে বললেন, “মাতৃত্ব। এই মাতৃত্বই তাঁর প্রিয়। … পরাপ্রকৃতি তিনি। তাই প্রকৃতিজ্ঞানই তাঁর আত্মজ্ঞান। … আর সেই আত্মজ্ঞান থেকে তিনি স্নেহময়ী হয়ে উঠবেন এই প্রকৃতির প্রতি। আর যতই তাঁর অন্তরের মা বিকশিত হবে, ততই তিনি স্বরূপের দিকে অগ্রসর হবেন। … হর্ষিতা, তুমি তথা সুগন্ধা তথা সকলে মিলে, আমাদের সর্ব্বার মধ্যে অসংখ্য প্রশ্নের উদয় করাও। সে সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করতে আমার কাছে আসবে। আর আমি তাঁকে প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে, অধিক ভাবে প্রশ্নে জর্জরিত করবো। সেই অসংখ্য প্রশ্ন করতেও সে বিচলিত হবে, কারণ তাঁর মাতৃত্ব তাঁকে এই বোধ করাবে যে, যদি এতো প্রশ্ন করেন তিনি, তাহলে সম্মুখের ব্যক্তি ক্লান্ত হয়ে যাবেন। … অর্থাৎ সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তিনি স্বয়ংই সন্ধান করবেন। আর স্বয়ং সেই প্রশ্নের উত্তর লাভ করতে করতে, নিজের স্বরূপে পৌঁছে যাবেন”।

হর্ষিতা হৃদয়ে হর্ষ ধারণ করে, যেমন মৃষু বলল, তেমনই করার সংকল্প নিজেও নিলেন আর সকল যক্ষস্ত্রীদের নেওয়ালেন। সর্বাম্বা জন্ম নিলেন। ক্রমশ বড় হয়ে উঠতে শুরু করলেন। যক্ষস্ত্রীরাও অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তাঁরাও বিচিত্র জীবের জন্ম দিয়েছেন, যারা মানুষের মত দেখতে হলেও মানুষ নয়। তাদের ত্বক অত্যন্ত মসৃণ, মানুষের ন্যায় নয়। তাদের ত্বকে লোমাবলির কনো আস্তরণই নেই, যাও মানুষের মত নয়। আর তাঁদের মাথা ভর্তি অর্ধকুঞ্চিত কেশ। নেত্রের রং বাদামি, অঙ্গের বর্ণ শুভ্র ও হরিদ্রা মিশ্রিত। মৃষু হেসে সেই সমস্ত পুত্র ও কন্যা সন্তানদের বললেন, “নির্বাণ” …

নূতন যোনির জন্ম হলো, তাও সকলের দৃষ্টির অগোচরে, আর নামকরণ মৃষু তাদের এমন করলেন নির্বাণ যার অর্থ সন্ধান করতে গেলেই, তারা জীবনের লক্ষ্যের সন্ধান পেয়ে যাবে। পাশাপাশি তাদের সাথে বেড়ে উঠলেন সর্বাম্বা। সর্বাম্বা এক বিশেষ কন্যা, যার গাত্রবর্ণ সকলের থেকে সামান্য ভিন্ন। একটি অদ্ভুত লাল আভা তাঁর মধ্যে বিদ্যমান, কিন্তু তাঁর গাত্রবর্ণ প্রকৃতপক্ষে যেন শুভ্র। এই শুভ্রতা আর লালিমা মিশে যেন তাঁর অঙ্গকে গোলাপি করে তুলেছে। সকলে অবাক হয়ে গেল এই দেখে যে, যেই সাকার মূর্তিরূপ স্থাপন করে মৃষু তাঁকে নিজের নিরাকারা মায়ের প্রতিবিম্ব রূপে স্থাপণ করে রাখতো, সর্বাম্বাকে দেখতে অবিকল একধারার। তাঁর অঙ্গ থেকে এক অতীব সুবাস ভেসে আসে, যা স্বেদত্যাগের সময়ে তীব্রতা লাভ করে।

আর সেই তীব্রতা এতটাই অধিক হয়ে যায় সেই সময়ে যে শুধুই ভ্রমর তাঁর দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু মজার কথা এই যে, একটিও ভ্রমর তাঁর অঙ্গকে স্পর্শ করেনা। আরো অদ্ভুত বিষয় এই যে, সর্বাম্বার হৃদয়ে যা কিছু চলে, তার প্রকাশক যেন স্বয়ং প্রকৃতি। সে আনন্দে থাকলে সুন্দর মলয় বাতাস অতীব শীতের মরশুমেও বয়; সে বেদনাগ্রস্ত হলে বসন্তের আবহাওয়াতেও উত্তুরে রুক্ষ হাওয়া বইতে শুরু করে দেয়।

তবে এই সমস্তকিছুতেই সব কিছু থেমে থাকেনা। সে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলে কনো সংকেত ছাড়াই নদীর, সমুদ্রের লহর দৈত্যাকায় হয়ে উঠে আশেপাশের সমস্ত কিছুকে তছনছ করে দেয়; পাহাড়ে অকস্মাৎ ধ্বস নেমে আসে, আর হড়পা বাণ আশেপাশের সমস্ত জনজীবনকে গ্রাস করে নেয়। আর যদি তাঁর ক্রোধ মাত্রাছাড়া হয়, তাহলে তো কথাই নেই। সরাসরি ঘূর্ণাবর্ত প্রকাণ্ড থেকে প্রকাণ্ডতম আকৃতি ধারণ করে নেয়, তাও মুহূর্তের মধ্যে। মুহুর্মুহু বজ্রপাত হতে থাকে, তাও সেই আকাশে যেই আকাশে এক পলক আগেও একটিও বাদল ছিলো না।

হর্ষিতা এই সমস্ত কিছু এর আগেও দেখেছে। মৃষুর মধ্যে এই সমস্ত কিছু গুণ আছে, যাকে মৃষু অতি সন্তর্পণে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু সর্বাম্বার মধ্যে লুকোচুরির কনো বালাই নেই। আরো একটি ভিন্নতাকে স্বয়ং মৃষুই হর্ষিতাকে দেখিয়ে দিলেন, যখন হর্ষিতা সর্বাম্বার এই গুনাগুণের প্রসঙ্গে কথা পারলেন। মৃষু বললেন, “আমার ক্ষেত্রে সব সময়ে হয়না এই প্রতিক্রিয়া। কিন্তু সর্ব্বার ক্ষেত্রে যেন কনো ত্রুটি নেই। তার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় সর্বক্ষণ। … হবে নাই বা কেন? আমি যেখানে পরাপ্রকৃতির সন্তান, সেখানে সর্ব্বা স্বয়ং পরাপ্রকৃতি”।

তবে যতটা খুশী সর্বাম্বাকে নিয়ে বারুদাবনের অধিবাসীরা ছিলেন, আর জগতের সমস্ত জীবের মধ্যে প্রকট হচ্ছিল, মানুষ বা মনুষ্য যোনির ভাব ঠিক ভিন্ন। তাঁরা প্রকৃতির এমন অদ্ভুত আচরণের কারণে কনো স্থানে স্থায়ী ভাবে বসবাস করতেই পারছিলেন না। প্রকৃতি সময়ে সময়ে তাদের সমস্ত বড় বড় নির্মিত শহরকে ধসিয়ে দিচ্ছিলো। প্রকৃতির বিজ্ঞান যারা জানেন না, সেই মনুষ্যরা তো এমনই মনস্থির করে ফেলেছিলেন যে, প্রকৃতি তাঁদের প্রতি পূর্ণ ভাবে রুষ্ট। অন্য দিকে যারা প্রকৃতির বিজ্ঞান জানেন, তাদের কাছেও প্রকৃতির এই বিরূপ আর ধারণার অতীত ভাবে অনিয়মে চালিত হওয়াকে কনো অছিলায় মেনে নিতে পারছিলেননা।

এই বিষয়ে মৃষুও তৎপর ছিলো। সে সর্বাম্বার সামান্য বেড়ে ওঠার অপেক্ষা করছিলো। ভাষা ও গণিত শিখিয়েই ভূগোলের ধারণা প্রদান করা শুরু করলো সে সর্বাম্বাকে। সর্বাম্বা স্বয়ং প্রকৃতি, কিন্তু প্রকৃতির বিজ্ঞানকে সর্বাম্বার সূক্ষ্ম চেতনা জানলেও, স্থূল বুদ্ধি জানেনা। আর তাই সর্বাম্বা নিজের উপর সামান্যও নিয়ন্ত্রণ রাখছেনা। সর্বাম্বাকে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে হবে। তবেই যখন যেই স্থানে দরকার, সেই স্থানের প্রকৃতিকে সুব্যবস্থিত বা বন্ধুর করে তুলতে পারবে সে। তাই সর্বাম্বা বড় হয়ে উঠতেই, গল্পের ছলে ধরিত্রীর অবতারণার কাহিনী শোনালেন মৃষু।

উপস্থাপনা করলেন পরমাত্ম ও ব্রহ্মময়ীর বৈরীর কথা। জানালেন মেধার জন্মকথা, আর জানালেন পরমাত্মের ভ্রূণরূপ মেধার উপর আক্রমণের কথা। জানালেন জগন্মাতার প্রেমের ও মমতার কথা, আর বললেন কেমন ভাবে নিজের সন্তানের ভ্রূণ অর্থাৎ মেধাকে সুরক্ষিত করতে বাকি চারভূতের রচনা করেন জগন্মাতা। আর এও বলেন যে পরমাত্মের আক্রমণ থেকে মেধাকে রক্ষা করতে কেমন ভাবে মৃত্তিকা সমস্ত ভূতের সাথে ধরিত্রীর রচনা করেন।

সর্বাম্বা একাধারে জগন্মাতাকে অনুভব করা শুরু করলো। সাথে সাথে ব্রহ্মময়ীর মাতৃত্বের স্মরণ করে করে তাঁর নেত্র অশ্রুপূর্ণ হতে শুরু করলো। প্রশ্ন জাগলোও মনে যে কিভাবে এই ধরিত্রী শুরু থেকে আকজকের দিনের অবস্থায় উপস্থিত হলো। মৃষুও এই প্রশ্নেরই অপেক্ষা করছিলো। সে জানতো যে এই প্রশ্ন তাঁর সর্ব্বার মনে উপস্থিত হবেই হবে। আর তা হলেই, সর্বাম্বার সামনে ভূগোলের উপস্থাপনা করবে সে। ভূগোলের পাঠ সর্ব্বাকে ধরিত্রী চালনাপদ্ধতিকে সম্মান করতে শেখাবে, আর এও শেখাবে যে ধরিত্রী যখন যখন শৃঙ্খলা থেকে অপসারিত হয়,তখন তখন তার পীড়া হয়।

যেমন যেমন সর্ব্বা সেই সত্য জেনে যাবে, তেমন তেমন সে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের প্রয়াস করবে। আর যেমন যেমন সে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের প্রয়াস করবে, তেমন তেমন সে নিজের অন্তরের নিয়ন্ত্রণ শক্তির প্রতি আকৃষ্ট হবে। আর যেমন যেমন সে নিজের অন্তরের এই নিয়ন্ত্রণ শক্তির প্রতি আকৃষ্ট হবে, তেমন তেমন সে অন্তর্মুখী হবে সেই শক্তির সাথে আলাপ করতে। আর যতই সে অন্তর্মুখী হবে ততই সে নিজের স্বরূপকে সনাক্ত করতে সক্ষম হবে।

মৃষুর এই পাঠ প্রদান সকলের জন্যই ছিলো, অর্থাৎ সমস্ত নির্বাণ শিশুদের জন্যই। ৬৩টি যক্ষস্ত্রীর গর্ভ থেকে ১২৬টি নির্বাণ শিশুর জন্ম হয়েছিল, যার থেকে নবযোনির নির্মাণ হয়েছিল, আর এই নবযোনি মিলে এক ব্রহ্মাণ্ডে বসবাস করতো, যার উপর পরমাত্মের কনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ নেই। আর মৃষু এই শিক্ষা পদ্ধতি দ্বারা সমস্ত নির্বাণদের মহাজ্ঞানী করে তোলা শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু এই সমস্ত শিষ্যদের মধ্যে বিশেষতম শিষ্য হলেন সর্বাম্বা। সে শুধু পাঠ গ্রহণ করে, তাকে কণ্ঠস্থ করে, মনস্থ করেনা। সে যেন সম্যক পাঠকে প্রত্যক্ষ করে, নিজের অন্তরে উপলব্ধি করে।

আর হর্ষিতা সহ সকলে নিরন্তর দেখতে থাকে এক মহাগুরুকে, যার নাম মৃষু। অদ্ভুত তার শিক্ষা পদ্ধতি। শিক্ষাদানকেই এর পূর্বে অর্থাৎ মনুষ্যযোনি শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করতো। কিন্তু মৃষু শিক্ষার ধারাকেই পালটে দিলো। শিক্ষাদান শিক্ষাপদ্ধতির একটি পদক্ষেপ হয়ে উঠলো মাত্র। মনুষ্যের মত অনুশাসন স্থাপন করলো না মৃষু। শিষ্যদের খোলা ছেড়ে দিলেন। তাঁর বক্তব্য, শিষ্যরা নূতন নূতন পাঠ গ্রহণ করছে। প্রকৃতিকে জানছে। তারা অবাধ্য হবে, কারণ আমাদের অবাধ্য হলে, তবেই তারা প্রকৃতির কাছে এগিয়ে গিয়ে প্রকৃতিকে দেখবে, আর তবেই প্রকৃতির দ্বারা অনুশাসিত হবে তারা। অনুশাসন আবশ্যক, তবে পিতা মাতা বা গুরুর কাছে নয়, অনুশাসন প্রয়োজন প্রকৃতির কাছে।

এক প্রকৃতিই গুরু, বাকি যারা গুরু সেজে উপস্থিত থাকেন, তারা তো কেবল এটি বলার জন্যই গুরু যে, প্রকৃতিকে নিরীক্ষণ করে করে, তাঁর সাথে একাত্ম হয়ে তাঁর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো। তাই গুরু আসলে প্রকৃতি, আর তাই অনুশাসনও প্রকৃতির দ্বারাই হওয়া আবশ্যক।

হর্ষিতা এই ভাবকে দেখে নিরন্তর মৃষুর প্রতি নিজের সম্মানকে বৃদ্ধি করে চলতেন। তাঁর বক্তব্য এই যে, কি ভাবে একজন নিজে কঠোর পরিশ্রম করার পরেও, সমানে এই চেয়ে যান যে সম্মান তাঁকে নয়, প্রকৃতিকে করা হোক! কি করে একজন নিজের গুরুত্বকে নিজেই খণ্ডন করে দিতে পারে!

প্রতিক্রিয়া কিন্তু ভিন্ন। শিষ্যরা প্রকৃতির সাথে একাত্ম হতে শুরু করলেন। ভূমিগঠনের পাঠ পরলেন, পর্বত গঠনের পাঠ পরলেন, অগ্নিসরের গতিবিধিকে জানলেন, পাথরের গঠন প্রক্রিয়া, নদী, জলবায়ু, সময় গঠনের প্রক্রিয়া সমস্ত কিছু জানলেন শিষ্যারা, আর প্রকৃতির সাথে মিশে মিশে সেই সমস্ত পাঠকে যেন প্রত্যক্ষ করা শুরু করলেন। আর এই সমস্ত কিছুর পর তাদের হৃদয়ে যেন তাঁদের গুরু অর্থাৎ মৃষুর প্রতি অশেষ সম্মান জন্ম নিতে শুরু করলো। আর মৃষু তাঁদের কাছে গুরু নয়, প্রাণপ্রিয় ব্যক্তি হয়ে উঠলো।

হর্ষিতা সহ সকলে প্রত্যক্ষ করলেন, কি ভাবে কেউ নিজেকে সম্মান করা কথা না বলেও, অশেষ সম্মান লাভ করতে পারে। সকলে মৃষুর থেকে এই শিক্ষা গ্রহণ করলেন যে, আমাকে সম্মান করো বলে সম্মান লাভ করা যায়না। সঠিক পথে চালিত করতে পারলে, স্বতঃই সকলে তোমাকে সম্মান করে। তুমি সম্মান না চাইলেও তোমাকে সম্মান করে, আর সেই সম্মানে সম্মান বা সম্ভ্রম কম থাকে, যা থাকে, তা হলো আপনজন জ্ঞান।

সর্বাম্বার কাছে তার পিতা ছিলো তার গর্ব। আর বাকি সকল শিষ্যের কাছে তাদের গুরু হয়ে উঠলো তাদের গর্ব। সর্বাম্বা ধরিত্রীকে জানতে থাকলে উপলব্ধি করা শুরু করলো যে প্রকৃতির হিন্দোল যাকে সর্বাধিক পীড়া দেয়, তা হলো ধরিত্রী। আর তাই নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করা শুরু করলেন নিজের অন্তরে।

যতই নিজের আবেগ সমূহকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করলো সর্বাম্বা, ততই নিজের অন্তরে এক অনন্য যোদ্ধাকে জন্ম দেওয়া শুরু করলো। আর ঠিক এই সময়ে, মৃষু প্রদান করা শুরু করলো ইতিহাসের পাঠ। মানব তো তারা নয়, নির্বাণ তারা। তাই মানব ইতিহাসের কথা বলার কনো প্রয়োজনই নেই। তাই মৃষু পাঠ প্রদান করলেন ধরিত্রীর ইতিহাসের।

পরমাত্ম ও ব্রহ্মময়ীর সংগ্রামের ইতিহাস বর্ণন করা শুরু করলেন তিনি। বললেন কেমন ভাবে, মেধাদের সকলকে ধরিত্রীর বুকে আশ্রয় গ্রহণ করালেন স্বয়ং সমস্ত ভূত অর্থাৎ নিসাধগণ। আর সেই আশ্রয়দানকে মাধ্যম করে কেমন ভাবে মেধাদের নিজের নিয়ন্ত্রণে স্থাপন করার জন্য পরমাত্ম ত্রিগুণ ধারণ করে বিস্তার শুরু করলেন, আর যোনি নির্মাণ হতে থাকলো।

বলতে থাকলেন, সেই যোনিবিস্তারকে মাধ্যম করে কেমন করে পরাচেতনা প্রকৃতির বিস্তার করলেন সমস্ত যোনিদের অন্তরের মেধাকে ব্যবহার করে, আর বললেন কেমন ভাবে সেই কর্ম করার কালে পরাপ্রকৃতি নিজের বিস্তার করলেন সমস্ত যোনির অন্তরে থাকা মেধাকে মার্গদর্শন করার জন্য।

সাথে সাথে এও বললেন মৃষু যে, সেই পথেও পরমাত্ম বাঁধা দিলে, ব্রহ্মময়ী এবার এক পুত্রের জন্ম দিলেন, পরমাত্মের উর্জ্জাকে নিজের শূন্যতার অসীমত্বের সাথে মিলিত করে, আর সেই সন্তানের নাম হলো মৃষু। এরপর মৃষু সেই সমস্ত কথার অবতরণ করলেন যা মৃষুর সাথে ঘটেছে। মৃষুর সপ্তখণ্ডে বিভাজন, ব্রহ্মময়ীর পঞ্চরূপে বিভাজন, একটি একটি করে মৃষুর সমস্ত সাত কলার প্রকাশ, পরমাত্মের ত্রিগুণের বিরোধ, ব্রহ্মময়ীর মাতৃত্ব, সমস্ত কিছু বললেন।

বললেন মৃষুকে জন্ম দেবার উদ্দেশ্যের কথাও। সমস্ত মেধাদের সত্যের বাণী প্রদান করার উদ্দেশ্যে জগজ্জননীর যেই শব্দ উচ্চারণকারী মুখের প্রয়োজন ছিলো, সেই মুখই হলো মৃষু। আর যত বলতে থাকলেন ইতিহাস, ততই নির্বাণদের রচনা আর পরাদিশক্তির নির্বাণদের মধ্যে জন্ম নেওয়ার কথাও বললেন।

এই সমস্ত কথা অত্যন্ত গভীর ভাবে প্রভাবিত করলেন সমস্ত শিষ্যদের আর বিশেষ করে সর্বাম্বাকে। সর্বাম্বা দিবারাত্র একাকী থেকে ধ্যনস্থ থাকা শুরু করলেন। দেবী ধরিত্রী উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় সর্ব্বার এইরূপ ধ্যনস্থ হয়ে থাকা নিয়ে। তাই মৃষু তাঁকে বোঝালেন, “দেবী, আমাদের সর্ব্বা সামান্য কেউ নয়। স্বয়ং জগন্মাতা সে। তাঁকে তাঁর স্বরূপ ধারণ করতেই হবে। এতেই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের, সমস্ত সৃষ্টির আর সমস্ত নির্বাণদের হিত। তাই তাঁর পথে বাঁধা সৃষ্টি করবেন না”।

মায়ের মন উচাটন থাকেই। তবে মৃষুর কথা শুনবেন না ধরিত্রী, তা তো হতেই পারেনা। তাই নিজের উপর সংযম স্থাপন করে সর্বাম্বার সঙ্গ দিলেন তিনি। সর্বাম্বা ক্রমশ বিস্তৃত হতে শুরু করলেন। ধ্যান, তন্মাত্র ত্যাগ করে সমাধির পথে যাত্রা করা শুরু করলেন। অন্যদিকে উদ্বিগ্ন পরমাত্ম সর্বাম্বার কনো কিছু জানতে না পারার জন্য সংহারের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, “সংহার, তোমার কাছে অভয়দান আছে যে মৃষু তোমার হয়ে যুদ্ধ করবে, অন্তত একটিবার। সেই অভয়দানকে কাজে লাগিয়ে সর্বাম্বাকে সম্মুখে আনো”।

সংহার বললেন, “কিন্তু কি ভাবে প্রভু? আমি কুমারী কন্যা আমাকে হত্যা করবে বলে সমস্ত কুমারী মানব শিশুর হত্যা করেছি। কিন্তু তারপরেও কনো কিছু প্রভাব পরে নি!”

পরমাত্ম সেই কথাতে গম্ভীর হয়ে উঠে বললেন, “আমার বিশ্বাস, জ্বরাসুর ঠিকই বলেছিল। … সংহার তুমি একটা কাজ করো। তুমি মানব শিশু ছেড়ে, অন্য সমস্ত যোনির কুমারী কন্যাদের হত্যা করা শুরু করো। … জ্বরাসুরের কথা যদি সত্য হয়, এর অর্থ মানব রমনাস্ত্র ব্যবহার করার কারণে বাকি সমস্ত যোনির যেই ক্ষতি সাধন হয়েছে, তার থেকে রক্ষা করাই অম্বার উদ্দেশ্য। তাই যদি অন্য যোনির হত্যা লীলা করা হয়, তাহলে অম্বা অবশ্যই আসবে। আর অম্বা আসলেই, মৃষুর আবাহন করো, আর মাতাপুত্রকে যুদ্ধে বিরোধী করে দাও। পুত্রের নাশ হবে, তো মাতা শোকে বিহ্বল হয়ে গিয়ে লীলার সমাপ্তি করে দেবে”।

সংহার বললেন, “কিন্তু প্রভু, প্রায় ১২ বছর হতে চলেছে। দেবী অম্বা কি বেশে অবতরণ করেছেন, পুরুষ না স্ত্রী, তাও তো জানিনা আমরা! দেবী তো লিঙ্গহীনা, তিনি যেকোনো বেশেই অবতরণ করতে পারেন!”

পরমাত্ম মাথা নেড়ে বললেন, “মূর্খের মত কথা বলো না। তোমাকে যখন অভয়দান দিয়েছেন দেবী, তখন তিনি সূক্ষ্ম পরাপ্রকৃতি অবস্থাতে ছিলেন। সংহার, স্থূল দেহ পুরুষের হোক বা স্ত্রীর, চেতনা সর্বদা স্ত্রীই হন। তাই তোমাকে কেবল স্থূল দেহী স্ত্রীর থেকে নয়, সমস্ত স্থুল দেহীর থেকেই চিন্তিত থাকতে হবে, কারণ পুরুষ বা স্ত্রী সকল স্থূলের অন্তরেই দেবী বিরাজমান। … মাতৃত্ব ধারণ করেন তিনি, তাই চেতনা সর্বদাই স্ত্রী। … স্থূল দেহ পুরুষ বা স্ত্রী, যেকারুর হতে পারে। তাই সংহার, যেকোনো একটি যোনিকে ধরে নাও, আর সেই যোনির সমস্ত সদ্যজন্মাদের হত্যা করো”।

“অম্বা নিশ্চয়ই আসবে তোমার সম্মুখে, তোমার বিরোধ করতে।  ঠিক সেই সময়ে, মৃষুর আবাহন করো। … মা আর পুত্রকে একে অপরের সম্মুখে স্থিত করে দাও। সূক্ষ্ম আবেশে হবে সমস্ত কিছু। আমি তোমাকে সূক্ষ্ম কীর্তি দেখার সামর্থ্য দিয়ে যাচ্ছি। … তুমিও দেখতে পাবে তাহলে, কেমন ভাবে মা আর পুত্রের যুদ্ধ হচ্ছে”।

সংহার চিন্তিত হয়েই বললেন, “কিন্তু প্রভু, আমাকে হত্যা করতে আসবেন দেবী, আর রক্ষা করতে আসবেন মৃষু। দেবীর সাথে যুদ্ধে মৃষু যে কিছুতেই জয়লাভ করবেনা। অর্থাৎ আমার মৃত্যু তো তাতেও হবে। হ্যাঁ, দেবী বিহ্বল হয়ে পরবেন অবশ্যই। কিন্তু যার কারণে তাঁকে নিজের পুত্রের হত্যা করতে হবে, নিজের প্রিয় পুত্রের হত্যা করতে হবে, তাঁকে তিনি কিছুতেই জীবিত রাখবেন না। অর্থাৎ আমার মৃত্যু তো নিশ্চিত! … কিছু করুন প্রভু। কনো না কনো ভাবে তই আমার মৃত্যুকে আপনি আটকান! … আপনাকে এই কাজ করতেই হবে, কারণ আপনার প্রেরণাতেই আমি দেবীর থেকে বরদান কামনা করেছিলাম এবং অর্জন করেছিলাম”।

পরমাত্ম এই কথাতে ঈষৎ গম্ভীর হয়ে উঠে বললেন, “হুম, উপায় হলো অম্বাকে আত্মভাবে বিচলিত করে দেওয়া। একবার যদি তা করা সম্ভব হয়, তাহলে সে মৃষুর সাথে কেন, কনো যুদ্ধই করতে পারবেনা। … আর যেহেতু সে স্থূল শরীরে রয়েছে, সেহেতু এখনই সঠিক সময়ে তাঁকে বশ করার”।

সংহার ভ্রু কুঁচকে বললেন, “কিন্তু কি ভাবে প্রভু?”

পরমাত্ম বিকৃত ওষ্ঠে হাস্য হেসে বললেন, “আমি ছদ্মবেশে বারুদাতে যাত্রা করবো, অতিথি হয়ে”।

সংহার উত্তরে বললেন, “কিন্তু প্রভু, আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের কনো নিয়ম যে সেখানে খাটেই না। সেই দেশে যে অতিথিকে ভগবান মনে করা হয়না! … আপনাকে সেখানে অতিথি বেশে স্বীকার কি করে করা হবে?”

পরমাত্ম সেই কথাতে চিন্তিত হয়ে উঠে বললেন, “কিন্তু আর কোন উপায়ে আমি অম্বাকে বশ করতে পারি? অম্বা যে সেই দেশ থেকে বাইরে নির্গতই হচ্ছে না!”

সংহার মাথা নেড়ে বললেন, “ওই যে উপায় বললেন আপনি, সেটিই হবে আমাদের উপায়। আমি বুঝে গেছি দেবীর কথার অর্থ কি। … তিনি কুমারী কন্যা বলতে এটিই বুঝিয়েছেন যে, কন্যা লগ্নে জন্মগ্রহণকারী সকল অবিবাহিতদের। তাই এবার আমি কন্যারাশির সকল অবিবাহিতদের হত্যা করবো। সকল যোনির সমস্ত কন্যালগ্নের জাতক, যারা অবিবাহিত, তাদের হত্যা করবো আমি। দেবীকে বাইরে আসতেই হবে, নাহলে কনো যোনির কন্যালগ্নের কেউ জীবিত থাকবেনা”।

পরমাত্ম এই কথা শ্রবণ করে, সেই ক্ষণ থেকে সংহারের রাজ্যেই থাকতে শুরু করলেন। তাঁদের উভয়েরই দৃঢ় বিশ্বাস, অম্বা সংহারের সংহার করতে বাইরে আসবেই। আর যেই ক্ষণে তিনি বাইরে নির্গত হবেন, তিনি পরমাত্মের স্বীকার হবেন।

আর এমন জল্পনা করে, সংহার শুরু করলেন কন্যালগ্নের সমস্ত জীবের হত্যা করা। সহস্র হস্ত তার, তাই পাঁচ শত কর্ম তিনি একত্রে করতে সক্ষম। আর তাই ব্যাপক হারে হত্যা লীলা শুরু করলে, বারুদাতে দেবী সর্বাম্বার ধ্যান অভ্যাস উগ্র হতে শুরু করে। ক্রমশ অধিক রক্তিম হয়ে উঠতে শুরু করলেন দেবী সর্বাম্বা, যেন তিনি একটি লৌহমূর্তি, আর সেই লৌহ মূর্তি সমানে যেন অগ্নির তাপে রক্তিম হয়ে উঠছে।

এই দৃশ্য দেখে, দেবী ধরিত্রী বিরোধিতা করা শুরু করলেন সর্বাম্বার ধ্যান অভ্যাসের। অন্যদিকে সর্বাম্বার এমন উত্তাপের কারণে প্রকৃতিও উত্তপ্ত হয়ে ওঠা শুরু করলেন। ধরিত্রীর দুশ্চিন্তার লহর সমস্ত ধরণীকে অসহজ করে তুলতে থাকলো, আর সঙ্গে সঙ্গে সর্বাম্বার উত্তাপ ধরণীতলের অগ্নিবলয়কে প্রকাণ্ড করা তোলা শুরু করলে, এক ভয়নাক বিস্ফোটে পীতপ্রস্তরের মুখ থেকে প্রকাণ্ড জ্বালামুখী উৎপন্ন হলে তার থেকে সেই দেশের প্রায় সমস্ত আগ্নেয়গিরি উগ্র অগ্নিবমন করা শুরু করে, জনবহুল গরুড়দেশের চারিধারে অগ্নির নদীধারা প্রবল বেগে প্রবাহিত হওয়া শুরু করে, আর তাতে গরুড়দেশ ফুটন্ত আংরার মত করে জ্বলতে শুরু করে। এমন কিছুদিনের পর, সেখানে এমন ধারার ভস্মপ্রবাহ হওয়া শুরু হলো যে সমস্ত গরুড়দেশে শীতপ্রবাহ শুরু হয়ে যায়। আর তার কারণে সেই দেশের সমস্ত জল যা তখনো বিষিয়ে যায়নি, তা শুধু বিষিয়েই যায়না, সঙ্গে সঙ্গে তা তুষারন্যায় হয়ে জমে যায়।

এমন হবার কারণে গরুড়দেশ প্রায় জনমানব শূন্য হয়ে গেলে, পরমাত্ম অত্যন্ত বিচলিত হয়ে উঠলেন, কারণ সেই দেশ তাঁর বড়ই প্রিয় ছিল। মানবযোনির থেকে তাঁর সভায় উপস্থিত মন্ত্রীদের মধ্যে অধিকাংশ মন্ত্রীগণ সেই দেশ থেকেই অবস্থান করতেন। তাঁদের সকলের বিনাশ হয়ে গেলে, পরমাত্ম দিশাহীন ভাবে দেবী অম্বার সাথে যুদ্ধে রত হতে অগ্রসর হলে, সংহার তাঁর চরণ ধারণ করে বললেন, “শান্ত হন প্রভু। … আমার হত্যালীলার কারণে দেবী উত্তপ্ত হয়েছে আর তার কারণেই গরুড়দেশ ধ্বংসের মুখে কবলিত। … প্রভু, জানি আপনার বহুপ্রিয় মন্ত্রীর প্রাণ গেছে, আর সহস্র কোটি প্রিয় প্রজার প্রাণ গেছে, কিন্তু প্রভু, আমাদের এই ঘটনার অন্যদিকও দেখা আবশ্যক!”

ক্ষিপ্ত পরমাত্ম ক্রুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন সংহারের দিকে, তো সংহার বললেন, “প্রভু, দেবী আমার করা হত্যার কারণে উত্তেজিত হচ্ছেন, গরুড়দেশের পরিণতি সেই কথাই বলে আমাদেরকে। অর্থাৎ প্রভু, আমরা যদি আরো অধিক হত্যা করা শুরু করি, তাহলে দেবী আর থাকতে পারবেন না বারুদাবনে। তিনি আমার সংহার করতে দ্রুতপদে অগ্রসর হবেন”।

পরমাত্ম সেই কথাতে শান্ত হলেও, দেবী ধরিত্রী নিজের পুত্রীর এমন উত্তাপ আর জ্বলনকে সহ্য করতে পারলেন না। তাঁর মাতৃত্ব, তাঁর মমতা তাঁকে প্রগল করে তুলতে শুরু করলে, মৃষু ধ্যনস্থ হয়ে তাঁর আদরের মাতার এইরূপ উগ্র হয়ে ওঠার কারণ জানার প্রয়াস করলেন, আর সেই প্রয়াসে তিনি নিজের মাতার সাথে সংলাপও করলেন। মাতার দেহের বুদ্ধির এই বোধ নেই যে তিনি কে। দেহের বুদ্ধি এই বোধ করে যে তিনি মৃষুর ও ধরিত্রীর আদরের কন্যা, এবং মৃষু তথা যক্ষস্ত্রী এবং তাঁদের বেছে নেওয়া শ্রেষ্ঠ ৬৩ মানব পুরুষের থেকে জাত নূতন যোনি, নির্বাণের প্রথম সদস্য।

কিন্তু তাঁর অন্তরের চেতনা যে স্বয়ং পরাচেতনা। অপ্রকট হয়ে মাতা যে সর্বাম্বার অন্তরে সূক্ষ্ম ও কারণ স্তরে ধ্যনস্থ হয়ে সদাবিরাজমান। মৃষু তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাঁর সাথে দীর্ঘ আলাপ করে ধ্যনস্থ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে এলে, সকল যক্ষস্ত্রীরা দেখলেন এবং সকল নির্বাণরা দেখলেন, দেবী সর্বাম্বার দেহ থেকে একটি সর্বাম্বার ন্যায় দেখতে অবিকল তাঁর অনুকরণ সূক্ষ্ম ভাবে প্রকট হলেন।

মৃষুর নিকটে তিনি এসে করজোর করে প্রণাম করলে, মৃষু বললেন, “যাও নিজের উদ্দেশ্য পূর্তি করতে অগ্রসর হও। আমাদের শীঘ্রই সাখ্যাত হবে আবার”।

সেই কথা শুনে সেই ছায়ামূর্তি উগ্র বেশ ধারণ করে বারুদা থেকে নির্গত হয়ে গেলেন। সকলে বুঝলেন যে মৃষু আর সর্বাম্বা মিলে এক দিব্যলীলার নির্মাণে মেতেছেন। তাই কেউ একটি কথাও না বলে, সরাসরি দেবী সুগন্ধা সকলের মেধানেত্রে একটি পর্দার স্থাপন করলে, সকলে সেই সূক্ষ্ম কীর্তি দেখা শুরু করলেন।

তাতে সকলে দেখলেন, দেবী সর্বাম্বার থেকে নির্গত সেই অগ্নিকন্যার সূক্ষ্মবেশ প্রবল গতি ধারণ করে দক্ষিণের দিকে ছুটে চলেছেন। দেবী হর্ষিতা সেই দৃশ্য দেখে বললেন, “নিশ্চিত ভাবে মাতা সংহারের সংহার করতে চলেছেন”। … অন্যদিকে দেবী ধরিত্রী কন্যাকে শান্ত হয়ে যেতে থেকে স্বয়ংও শান্ত হয়ে গেলেন। তাই মৃষু তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, “দেবী, যতক্ষণ না সর্ব্বার ধ্যান নিজের থেকে ভাংছে, তাঁর নিকটেও যেন কেউ যেতে না পারে”।

হর্ষিতা মৃষুর উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসা করলেন, “মৃষু, সূক্ষ্ম বেশে কর্ম তো তুমিও করো। কই তোমাকে ধ্যনস্থ অবস্থায় নিজের স্থূল শরীরকে রেখে দিতে হয়না তো! তবে সর্বাম্বার ক্ষেত্রে!”

মৃষু মিষ্ট হেসে বললেন, “হর্ষিতা, সর্ব্বা এখনো জানেনি যে সে কে। যেদিন নিজের স্বরূপকে তাঁর স্থূল বুদ্ধি স্বীকার করে নেবে, সেদিন থেকে সূক্ষ্মে যাত্রা করার জন্য, তাঁর আর কখনো স্থূল শরীরকে ধ্যনস্থ করতে হবেনা”।

মৃষু এতো বলে চলে গেলেন, এবং যেন এক অজানা সংকটের জন্য প্রস্তুত হতে থাকলেন। সুগন্ধা হর্ষিতার কাছে এসে প্রশ্ন করলেন, “কি বললেন উনি! আমি তো কিছু বুঝতেই পারলাম না!”

হর্ষিতা মৃদু হেসে বললেন, “উনি বললেন স্বরূপ উপলব্ধির কথা। স্বরূপকে উপলব্ধি না করলেও, স্বরূপ স্বরূপই থাকে, তা বিরূপ হয়ে যায়না। তবে সেই স্বরূপের উপর কনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ থাকেনা আমাদের। যতক্ষণ সেই নিয়ন্ত্রণ থাকেনা, ততক্ষণ সময়ে, স্বরূপকে স্বতন্ত্র করে দিতে, আমাদের স্থূল শরীরকে ধ্যনস্থ করে দিতে হয়, অর্থাৎ সত্যের সম্মুখে স্থবির করে রাখতে হয়। কিন্তু যখন আমাদের স্বরূপ উপলব্ধি হয়ে যায়, তখন আর আমাদের দেহকে ধ্যনস্থ করার প্রয়োজন পরেনা। আসলে স্থূল, সূক্ষ্ম তথা কারণ সকলেই তখন সেই স্বরূপের সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়। তাই আর স্থূলের বুদ্ধি বাঁধা দেয়না স্বরূপকে নিজের কাজ করতে”।

সুগন্ধা সেই কথা শুনে হতচকিত হয়ে গিয়ে বললেন, “এত গভীর কথা তুই বুঝলি কি করে হর্ষিতা!”

হর্ষিতা মৃদু হেসে বললেন, “সমর্পণ। অনেক দেরি হলো আমার এই সত্য বুঝতে, কিন্তু এটিই সত্য। স্থূল শরীরের বুদ্ধি ব্যবহার করে মৃষু বা সর্ব্বার ন্যায় প্রকাণ্ড ব্যক্তিত্বের ভাব, অভিব্যক্তি বা বিবরণের মর্মার্থের ধারণাও করা যায়না। এমনকি যদি স্থূল শরীরকে উপেক্ষা করে, অন্তরমনকে একাগ্র করে রেখে দেওয়া হয়, তাহলে দার্শনিকের বক্তব্যকে উপলব্ধি করা গেলেও যেতে পারে, কিন্তু মৃষু বা সর্ব্বা অনন্য”।

“তাঁরা কেবল স্থূলে বিরাজমান বলেই জীব বলে বোধ হয়। কিন্তু যখন তাঁরা নিজেদের বক্তব্য রাখেন, তখন তাঁরা কনো ধারাতেই জীব নন। স্বয়ং ঈশ্বর আমাদের সর্ব্বা, আর মৃষু তাঁর প্রতি পূর্ণ ভাবে নিবেদিত প্রাণ। তাই তাঁদের বক্তব্য উপলব্ধি করতে হলে, তাঁদের কাছে পূর্ণ ভাবে সমর্পণ আবশ্যক। এক সেই ভাবেই তাঁদের বক্তব্যের সার, উদ্দেশ্য বা প্রকাশনাকে অনুভব করা সম্ভব”।

সুগন্ধা বুঝলেন, হর্ষিতা মৃষুতে পূর্ণ ভাবে সমর্পিত হয়ে গেছেন। মানতেও অসুবিধা হলো না। মৃষুর মধ্যে স্ত্রীপুরুষের ভেদাভেদের ভাবই নেই। সে স্ত্রীপুরুষ, সাকার-নিরাকার, সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছে। কিন্তু হর্ষিতার মধ্যেও মৃষুর সংসর্গের কারণেই হয়তো, এই স্ত্রীপুরুষের ভেদাভেদ চলে যাচ্ছে আসতে আসতে। সেই কারণেই সে মৃষুর প্রতি এতটা সমর্পিত হয়েও, তাঁর মধ্যে তাঁকে স্বামী, পতি বা তেমন কিছু সমাজসমর্থিত সম্পর্কের মধ্যে স্থিতই নয়। যেন মৃষু ও হর্ষিতার সমর্পকের কনো নাম প্রয়োজনই নেই। যেন তাঁরা দুই দেহ, কিন্তু একটিই স্পন্দনে যুক্ত।

দুজনের দুজনের প্রতি কনো প্রকার কামনা, আসক্তি, বিরক্তি বা দেওয়ানেওয়া নেই। যেন একটিই প্রাণ, দুই দেহে বিভক্ত হয়ে রয়েছে। আর যেহেতু মৃষুর সাথে হর্ষিতার এমন স্বভাব, সেই কারণে সর্বাম্বার সাথেও হর্ষিতা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সর্বাম্বার ঘনিষ্ঠ সকলেই, কিন্তু হর্ষিতা যেন সর্বাম্বার একটি দেহাঙ্গ। আসল কথা এই যে, মৃষু আর সর্বাম্বা যেন অভিন্ন, আর যেহেতু হর্ষিতা মৃষুর সাথে অভিন্ন হয়ে উঠছে, সেহেতু সে সর্ব্বার সাথেও অভিন্নই হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। কিন্তু মজার কথা এই যে, এঁদের সম্পর্ক এতটাই সাবলীল যে, এঁদের এই ঘনিষ্ঠতা বিষয়ে কনো ভাবনাই নেই।

শুধু সুগন্ধার নয়, সমস্ত যক্ষস্ত্রীরই এমন মনে হয় মাঝে মাঝে যেন, এঁরা তিনজন, অর্থাৎ সর্ব্বা, মৃষু আর হর্ষিতার মান-অপমান- অভিমান বোধই থাকেনা, যখন একে অপরের সম্মুখে থাকে। এঁরা একে অপরকে তিক্ত কথা বলতে পারে, কটুকথাও বলতে পারে, কিন্তু তাতে এঁদের কারুর মধ্যে কনো প্রকার দ্বেষ জন্ম নেয় না। এঁরা একে অপরের কটুকথাকে শাসন মানে, যেন অপরিসীম বিশ্বাস একে অপরের প্রতি যে, প্রতিপলকে এঁরা একে অপরের হিত ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারেনা।

সম্পর্কের সহজতা, সরলতা আর শুদ্ধতা যে ঠিক কেমন হয়, তার নিদারুণ উপমা হলো মৃষু, সর্ব্বা ও হর্ষিতার সম্পর্ক। এই সমস্ত কিছু ভাবনার সাথে সাথেই সুগন্ধা যখন চোখ রাখলেন যে সর্ব্বার অন্তর থেকে মুক্ত হওয়া সূক্ষ্মরূপ ঠিক কি করছেন, তখন দেখলেন, সেই সূক্ষ্মরূপ সমানে সংহারের রাজ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। আর যখন সেই অগ্রগতি তাঁকে সংহারের রাজ্যের কাছে এনে উপস্থিত করে দিয়েছে, তখন দেখলেন, পরমাত্ম তাঁর পথ আটকালেন।

পথ আটকে প্রথম কথাই পরমাত্ম বললেন, “আমি জানতাম, তুমি আসবে অম্বা। … সংহারের সংহার করতে যাচ্ছ না? জানো কি সংহারের কাছে কি বরদান আছে?”

মাতার সেই উর্জ্জা প্রকাশ, যাকে অবিকল অম্বার ন্যায় দেখতে, তা একটি খল হাস্য প্রদান করে বললেন, “মৃষুর সুরক্ষা কবচ ধারণ করে রয়েছে সে। এই তো?… তোমার কি মনে হয় যে মৃষু আমার সামনা করতে পারবে?”

পরমাত্ম সেই কথাতে হুংকার সহ হাস্য প্রদান করে বললেন, “অসম্ভব। কিন্তু যেটা সম্ভব সেটা হলো, মা নিজের হাতে তাঁর প্রিয়পুত্রকে হত্যা করে দেবে। কি সেটা সম্ভব তো?”

অম্বারূপ সেই কথাতে উগ্র হয়ে উঠতে শুরু করলে, পরমাত্ম পুনরায় বললেন, “ভেবে দেখো অম্বা, তোমার সেই পুত্র, যে তোমার প্রাণ, যে তোমার নিরাকার থেকে স্বাকার হয়ে ওঠার কারণ, যে তোমার সূক্ষ্ম থেকে স্থূল হয়ে ওঠার একমাত্র কারণ, তার হত্যা হয়ে গেলে, তুমি কি নিয়ে বাঁচবে? কাকে নিয়ে বাঁচবে? … আমি তো তোমার হিত চেয়েই এই সমস্ত কথা বলছি। বাকি তুমি জানো, কি করবে!”

উত্তেজিত হয়ে গিয়ে অম্বারূপ আক্রমণাত্মক হয়ে পরমাত্মের দিকে ভয়নাওক মূর্তি ধারণ করে এগিয়ে গেলে, পরমাত্ম পুনরায় বললেন, “এ কেমন বিচার তোমার? যে তোমাকে সত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো, তুমি তাকেই হত্যা করতে এগিয়ে আসছো! … অম্বা, আমি তোমার সাথে আর যুদ্ধে যাবো না। একবার গেছিলাম, বুঝে গেছি যে যুদ্ধে তোমার সামনে আমার দাঁড়িয়ে থাকাও সম্ভব নয়। … আমি চললাম, তুমি যা খুশী করো অম্বা”।

পরমাত্ম এতো কথা বলে সেখান থেকে পলায়ন করলে, উগ্র চণ্ডীরূপ অম্বা অগ্রসর হলেন সংহারের নিধনের উদ্দেশ্যে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22