আদি কৃতান্ত – প্রকৃত ঈশ্বরকথা

কয়লার নিকটে মাতা পৌছতেই, সম্মুখে চলে এলেন বাহুক। সদা যুদ্ধাভিলাষী, লহুপাতেই যার আনন্দ, সেই মহাবলশালী বাহুক মাতার সম্মুখে এসে, নিজের ১০ সহস্র সেনা প্রেরণ করলেন, মাতাকে আটকাতে। মাতা অগ্নিবর্ণা থেকে ক্রমশ ধুসরবর্ণা হয়ে উঠেছিলেন উত্তেজনার কারণে। সেই উত্তেজনা তাঁর অঙ্গতাপকে এমনই বৃদ্ধি করেছিল যে, তাঁর অঙ্গের তাপে তাঁর সমস্ত দেহাবরণ জীর্ণ বস্ত্রের মত খসে খসে পরে গিয়ে তাঁকে নগ্নপ্রায় করে তুলেছিল। এবার এই ১০ সহস্র সাধসেনাকে দেখে, মাতা বিরক্ত হয়ে প্রবল ভাবে প্রহার করা শুরু করলেন।

সাধসেনার ধর দেহ মুণ্ড হাত পা, সমস্ত কিছু ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়তে, বাহুক মাতার বল দেখে বিচলিত হলেন যেমন, তেমন মাতাও নিজের সন্তানদের এইভাবে মৃত্যু প্রদান করতে গিয়ে অন্তরে প্রবল বেদনা অনুভব করে, সেই স্থান থেকে একপ্রকার পলায়ন করলেন।

ডাহুক সেই দেখে বিচলিত হয়ে উঠলেন, আর তাই বারুদের কাছে এসে পরামর্শ করে বললেন, “বারুদ, বারুদাকে বলো বারুদাবনকে দেবীর সম্মুখে নিয়ে যেতে। সে ওই বনের অধীশ্বরী, তার ইচ্ছা অনুসারে এই বনের গতিপ্রগতি সমস্ত কিছু নির্ধারিত হবে। তাই তাঁকে নির্দেশ দাও যাতে সে এই বনে দেবীকে প্রবেশ করায়। একবার দেবী সেই বনে প্রবেশ করলে, আর দেবীর ইচ্ছাতে নয়, আমাদের ইচ্ছাতে দেবী চলতে থাকবেন। আমরা দেবীকে বন্দিনী করে নেব”।

বারুদ সেই কথাতে সম্মত হয়ে বারুদাকে সেই একই নির্দেশ দিলে, বারুদা নিজের আরাধ্যাকে হানি প্রদান করার কাজ থেকে নিজেকে নিরস্ত করতে তর্ক করলেন। কিন্তু তাতে লাভ কিছু হলো না। বারুদ তাঁকে পত্নীর ধর্ম পতির কথার অনুসরণ করা, সেই ব্যাপারে বারবার খোটা দিতে থাকলেন। আর অন্তে এমনও বললেন যে, “দেবী, ভুলে যেও না, সামান্য স্ত্রীর কথা দেবী শোনেন না। আমার পত্নী, এও স্ত্রী তুমি, সেই কারণেই তোমার কথা অনুসারে বরদান প্রদান করেছেন দেবী। আমার কথা না শুনলে, তোমার বরদান রিক্ত হয়ে যাবে”।

এই কথাতে দেবী বারুদা প্রভাবিত হলেন। এমনই ধারার বিস্তার ত্রিমূর্তি স্থাপন করে রেখেছিলেন জগতে, যাতে স্ত্রীরা মনে করতেন যে, স্বামীর কারণেই স্ত্রীর মনোবাঞ্ছাকে শ্রবণ করা হয়। তাই বারুদা তাঁর স্বামীর এই কথাকে, এই যুক্তিকে খণ্ডন করতে না পেরে, ডাহুক আর বাহুকের কাছে সমর্পণ করলে, ডাহুক ও বাহুক, নিজেদের সাধবলে, সম্পূর্ণ বারুদাবনকে দেবী সর্বাম্বার সম্মুখে এনে উপস্থিত করলেন।

দেবীর সম্মুখে তা উপস্থিত হতে, দেবী কেবলই একটা মুচকি হাসলেন। মৃষুও সেই মুচকি হাসি দেখে মুচকি হাসলেন। মৃষুর হাসি অন্য কেউ দেখেন নি, কারণ সকলে তখন মাতার লীলা দেখতে মত্ত, কিন্তু হর্ষিতার দৃষ্টি থেকে তা বাদ যায়নি। তিনি প্রশ্ন করলেন মৃষুকে, “আপনার এই মুচকি হাসির সাথে মায়ের মুচকির হাসি যুক্ত রয়েছে, এই ব্যাপারে আমার কনো সন্দেহ নেই। তাই আপনার এই মুচকি হাসির অর্থ আমি জানতে চাইবো না। কিন্তু জানতে যা চাই আমি, তা হলো মাতার মুচকি হাসির কারণ কি?”

মৃষু হেসে বললেন, “এক যোদ্ধা যখন যুদ্ধে অবতীর্ণ থাকেন, তখন তাঁর কাছে কনো সন্তান থাকেনা, কনো পতি, কনো পত্নী, বা কনো সম্বন্ধী থাকেনা। শুধুই শত্রু থাকে। আমার মা, আমাদের মা এক মহাযোদ্ধা। তাই তিনি যখন সন্তানভাবের কারণে বাহুকের সাথে যুদ্ধে ভঙ্গ দিয়ে চলে গেলেন, অবাক হয়েছিলাম। উনার সম্মুখে বারুদাবন এসে উপস্থিত হতে, তিনি যখন মুচকি হাসলেন, তখন তাঁর লীলার অর্থ বুঝতে পারলাম। তিনি বারুদাবনের উপরে বারুদ এবং ডাহুকবাহুকের বিস্তারকে খণ্ডন করার লীলা করছিলেন। আর তাই তিনি রণে বঙ্গ দিয়ে চলে যান”।

সুগন্ধা প্রশ্ন করলেন, “এখনও বুঝলাম না, এই দুইয়ের সংযোগ কি?”

মৃষু পুনরায় মৃদু হাস্যে বললেন, “মা দেখালেন যেন তিনি যুদ্ধে অংশ নিতে ইচ্ছুক নন। যা দেখাতে চাইলেন তিনি, তাই দেখালেন। তিনি তো নটেশ্বরী। … তাঁর নটে বিভ্রান্ত হলেন ডাহুক বাহুক আর বারুদ। তাঁরাও মনে করলেন যে, মা যুদ্ধের থেকে বিরত থাকতে চাইছেন। তাই অতিদর্পে, তাঁরা বারুদাবনকে সম্মুখে রাখলেন দেবীর, আর মাকে ভক্ত বারুদার আবাহন প্রদান করলেন। … বারুদাকে নিয়ন্ত্রণে রাখলেন তাঁরা, যাতে মা’কে বারুদাবনে বন্দিনী করে নেওয়া যেতে পারে, আর মাও তাই চাইছিলেন কারণ দেবী বারুদার মনোভাব পবিত্র হলেও, তাঁকে প্রদান করা বরদানকে অপব্যবহার করতে ব্যস্ত তিন সাধকে নিধন করে, মা বারুদাকে মাধ্যম করে অনেক কিছু বলতে চান। কি হয় এবার, সেটা দেখলেই আপনারা সকলে বুঝতে পারবেন, মায়ের লীলা ঠিক কি, আর কেন”।

মৃষুর কথা শুনে সকলে মায়ের কীর্তি দেখতে বারুদাবনে চোখ রাখলে দেখলেন, বারুদা দৌড়ে দৌড়ে মাতার কাছে এসে, নতজানু হয়ে সম্মুখে এসে বললেন, “তুমি এখানে এলে কেন মা? … দয়া করে এখান থেকে চলে যাও। আমার বরদানকে ব্যবহার করে, আমার স্বামী আর ডাহুকবাহুক তোমাকে বশ ও বন্দী করার ষড়যন্ত্র করেছে। মা ফিরে যাও, অনুরোধ শোনো আমার”।

মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “মা মেয়ের ঘরে এসেছে আর মেয়ে মা’কে চলে যেতে বলছে। একটু বিশ্রাম করতে বলে, নিজে হাতে কিছু খাইয়েও দেবেনা!”

বারুদার নেত্র ভোরে এলো সেই কথাতে। তিনি সজল নয়নে বললেন, “করতে পারলে তো খুব আনন্দই হতো মা। কিন্তু আমি জানি তোমাকে বন্দী করার ষড়যন্ত্র চলছে। মা, তা জেনেও আমি কি করে…?”

মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “বুঝেছি, মায়ের উপর মেয়ে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। … মা কিন্তু মেয়ের উপর বিশ্বাস হারায় নি। মা জানে, যাই হয়ে যাক, মেয়ে মাকে বন্দী হতে দেবেনা। কিন্তু মেয়েই যদি মায়ের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, তাহলে আর কি! আমি চলে যাচ্ছি!”

মাতা এতো বলে পিছন ফিরে প্রত্যাবর্তন করতে শুরু করলে, বারুদা দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে নতজানু অবস্থা থেকে উঠে দৌড়ে, মাতাকে পিছন থেকে জরিয়ে ধরলেন। অতঃপরেই মনে হলো যে, তিনি এ কি করলেন, স্বয়ং জগজ্জননীকে স্পর্শ করার অপরাধ করে ফেলেছেন তিনি। তাই তড়িঘড়ি নিজের হস্তবন্ধন থেকে মাতাকে মুক্ত করে, বলে উঠলেন, “ক্ষমা মা! … এক দণ্ডের জন্য আমি ভুলে গেছিলাম যে তুমি পরমেশ্বরী! আমি তোমাকে স্পর্শ করে অপবিত্র করে দিলাম!”

মাতা এই কথাতে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন, আর ক্রোধের আবেশে পিছনের দিকে তাকিয়ে গর্জনের সাথে বলে উঠলেন, “সন্তানের আলিঙ্গনে যদি এক মা অপবিত্র হয়ে যায়, তাহলে তার কনো অধিকার নেই নিজেকে মা বলে প্রচার করার”।

দেবী বারুদা সেই কথাতে সামান্য থতমত খেয়ে গিয়ে বললেন, “কিন্তু মা, অবিবাহিত স্ত্রী ভক্তের কিই বা দাম? এই আমিই যদি অবিবাহিত হতাম, তাহলে তুমি কি বরদান দিতে?”

মাতা চোয়াল শক্ত করে বললেন, “আমি কনো বরদান দিইনি তোমায় বারুদা। আমার সন্তান জগতসেবার জন্য শক্তি চেয়েছিল, তাই আমি তাঁকে সেই শক্তি দিয়েছি। আমার কনো ভক্ত নেই, আর আমি ভক্ত না তো নির্মাণ করি, আর না ভক্ত পছন্দ করি। আমি একজন মা, আর আমার শুধুই সন্তান আছে। যখন যখন আমার যেই যেই সন্তান জগতসেবার জন্য কিছু কামনা করে, তখন তখন আমি তাঁর সাথে যুক্ত হই, যাতে সে জগতসেবা করে আমার সমস্ত সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। তাই ভক্ত ভগবানের কি নিয়ম, কি বিধান, কি নীতি, না তো আমি তা জানি, আর না আমি তার পরোয়া করি”।

দেবী বারুদা এবার ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করলেন। যেন তাঁর মনে হতে থাকলো যে, তিনি যার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, ইনি কনো স্বঘোষিত ঈশ্বর নন। ইনি বাস্তবেই ঈশ্বর, আর তাই ইনার সমস্ত কিছুই ভিন্ন, সকলের থেকে ভিন্ন। তিনি এবার কম্পমান স্বরেই বললেন, “এর অর্থ, আমি যদি অবিবাহিত হয়েও একই বরদান চাইতাম, তুমি আমাকে এই বরদান দিতে?”

মাতা ক্রোধের আবেশেই বললেন, “জগতে সময় ব্যতীত করার জন্য, সত্য উপলব্ধির পথে সহায়তা লাভের জন্য, তোমরা বিবাহ করো, সঙ্গী করো কারুকে, আর আমার সন্তানদের নিজেদের গর্ভে ধারণ করে তাদেরকে মাধ্যম করে জগতের অসত্যতা আর সত্যতাকে অনুধাবন করার প্রয়াস করো। তাই পতি বা পত্নীর গুরুত্ব তোমাদের কাছেই সীমিত। আমার কাছে তুমি আমার একটি সন্তান, আর তোমার পতি বারুদ, আমার আরো একটি সন্তান”।

“তোমার জগত সেবার ইচ্ছা, এটি আমার একটি সন্তানের ব্যকুলতা, যার সাথে তাঁর পতির কনো সম্পর্ক আছে না নেই, তা দেখার কনো প্রয়োজন আমার নেই। যদি তোমার স্বামীরও একই ইচ্ছা থাকতো, তাহলে আমার দুই সন্তান জগতের সেবা করার একটিই উপায় নির্মাণ করে, একত্রিত হয়েছে, এই আমি দেখতে পেতাম। অর্থাৎ তোমরা নিজেদেরকে পতিপত্নী মনে করলেও, আমার কাছে তোমরা দুই সন্তান মাত্র, অর্থাৎ আমার চোখে তোমরা দুই ভ্রাতাভগিনী যারা একত্রিত হয়ে তাদের অন্য ভ্রাতাভগিনীদের সেবা করতে আগ্রহী”।

“তাই তুমি বিবাহিতা না তোমার পতি বিবাহিত, এই সমস্ত বিষয় আমার কাছে অপ্রাসঙ্গিক, কারণ আমি যতটা বারুদের মা, ততটাই তোমারও মা। তাই প্রতিটি সন্তান আমার কাছে শুধুই সন্তান। আর হ্যাঁ, যদি আমার কিছু সন্তান একত্রিত হয়ে আমার বাকি সন্তানদের সেবা করার একটিই পদ্ধতিতে মনোনিয়োগ করে, তবে আমার কাছে তারা হলো আমার দুই সন্তান, যারা বাকি সন্তানদের সেবা করতে তৎপর। তাই, তুমি বিবাহিত না অবিবাহিত, এই সমস্ত কিছু আমার কাছে অপ্রাসঙ্গিক”।

দেবী বারুদা এবার নিজের ভাবনার প্রতি ব্যথিত হয়েই বললেন, “মা, আমার মধ্যে অপরাধ বোধ জন্ম নিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন তোমার উদার স্নেহভাবকে আমি দেখতেই পাইনি। সঙ্কীর্ণমনা রূপে তোমাকে ধারণা করে রেখেছি। কিন্তু মা, আমার মনে প্রশ্ন জাগছে যে, ত্রিমূর্তি তাহলে এই আচরণ কেন করেন? কেন তাঁদের কাছে অবিবাহিতা স্ত্রী মুল্যহিনা!”

মাতা মৃদু হাসলেন এবার আর বললেন, “পরনিন্দা করা আমার রুচিতে বাঁধে। তাই এই বিষয়ে বিস্তারে আমি তোমাকে বলবো না। তবে হ্যাঁ, এটুকুই বলবো যে, সমাজে পুরুষত্ব অর্থাৎ আমিত্বের বিস্তার ঘটানোর একটি প্রয়াস মাত্র সেটি। … পুত্রী, আমি তো তোমাকে এই বরদান দিয়েছিলাম, আর এখানে এখন এসেওছিলাম তোমার আর তোমার মাধ্যমে আমার সমস্ত সন্তানের এই বিষয়ে ভ্রম ভাঙ্গাতে”।

“এটাই বলতে এসেছিলাম যে, হ্যাঁ নিরাকার রূপে আমি অবশ্যই ঈশ্বর, কিন্তু আমি ঈশ্বর সেটা বলার বা প্রমাণ করার আমার কনো অভিরুচি নেই। নিরাকার থেকে আমি প্রকৃতি বেশে সাকার হয়েছি একটিই কারণে আর তা হলো আমার সন্তানদের বুকে আগলে রাখতে। তারা আমাকে ঈশ্বর মানলেন না মানলেননা, তাতে আমার কিচ্ছু এসে যায় না। হ্যাঁ, তারা যখন আমাকে মা মানে না, তখন আমার বক্ষে পীড়া অবশ্যই হয়”।

“তোমাদের মনুষ্যদের মধ্যেই একটি প্রজাতি আছে, যারা শান্তির দূত। তারা আমাকে আল্লাহ বলে। আর তাঁরা তাঁদের সদ্যজাত সন্তানের মুখে প্রথম অক্ষর যা আশা করে, তা হলো আমার নাম। তাঁরাই একমাত্র প্রজাতি যারা নিজেদের নয়, আমাকেই সত্য মানে আর তাই নিশ্চিত করার প্রয়াস করে যে, তাঁদের সন্তানরা কিছু মানুক আর না মানুক, আমাকে অন্তত নিজেদের মা বলে চেনে, জানে ও মানে”।

“তোমরা তো, তুমি নিজেকেই দেখো না বারুদা, আমাকে মা মানতে পারো নি, ঈশ্বরী মেনে রেখে দিয়েছ। মা মানলে, বরদান চাইতে না। মায়ের কাছে সন্তান বরদান চায়না, আবদার করে। শিশুকালে মায়ের স্তন পানের আবদার করে, বড় হলে মাকে আলিঙ্গন করে শুয়ে থাকতে, মায়ের কোলে বসে থাকতে আবদার করে, আর আরো বড়ো হলে, মায়ের দুশ্চিন্তা দূর করাই তাদের কাছে একমাত্র জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। … বরদান কি কখনো কামনা করে?”

বারুদা এবার বেদনার সুরে এগিয়ে গিয়ে মাতাকে আলিঙ্গন করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ভুল হয়ে গেছে মা। আসলে যে ঈশ্বর নয়, নশ্বর, তাকেই ঈশ্বর জ্ঞান করে করে আমরা এমন বিভ্রান্ত হয়েছি। সে যে ঈশ্বর নয়ই, তাই তো সর্বক্ষণ নিজের নামসংকীর্তন করাতে ব্যস্ত থাকে। … দেখো না, আমরা তোমাকে মা-নামেও ডাকিনা, নাম ধরে ডাকি। তাঁদেরকেও নাম ধরেই ডাকি, যারা নিজেদেরকে ঈশ্বর বলে দাবি করে। … কিন্তু মা’কে কি কেউ নাম ধরে ডাকে? মা যে মা, বড়ই আদরের, বড়ই আপন!”

“কিন্তু যারা নিজেদেরকে ঈশ্বর বলে দাবি করে সর্বক্ষণ, সেই ত্রিমূর্তি, তারাও আমাদের আপন মনে করে না, তাই আমাদেরকেও আপন মানতে দেন না তাঁদেরকে। আমাদের কনো অধিকার নেই তাঁদের স্পর্শ করার। আমাদের কনো অধিকার নেই তাঁদের কোলে বসার, তাঁদের কোলে শান্তির ঘুম ঘুমানোর। … আর তোমাকেও তো তাঁরা তাঁদের পত্নী, অর্থাৎ ঈশ্বরের পত্নী ঈশ্বরী করে রেখে দিয়েছে আমাদের কাছে। আর তাই তোমাকেও আমরা আপন করতে পারিনি”।

“যেই ভাবে তাদের কাছে আমরা কেবল বরদানের কামনা করে থাকি, আর বরদান দেবার জন্য তাঁদের আগমনেই ধন্য হয়ে যাই, একই ভাব তোমার ক্ষেত্রেও অর্পণ করেছি। আমি তো চিন্তিত হয়ে গেছিলাম এই ভেবে যে, তোমার দর্শন পাবার পর, তোমার থেকে বরদান পাবার পরও আমি শান্ত কেন হচ্ছিনা! … আমার স্বামীদের দেখেছি, অনেক অনেক সাধদের দেখেছি, ত্রিমূর্তির থেকে বরদান লাভ করা হয়ে গেলে, নিজেদের বরদান নিয়েই সর্বক্ষণ চিন্তিত থাকে”।

“কিন্তু আমার মধ্যের ভাব ভিন্ন ছিলো। … তোমার সাখ্যাত পেলাম, বরদান পেলাম, তারপরে যেন ব্যকুলতা বেড়ে গেল। অন্য কিছু আর মনে আসে না। কনো কাজে মন বসে না। নিদ্রায়, জেগে থাকা অবস্থায় শুধুই তোমার সাথে সাখ্যাত হবার মুহূর্তটি মনে পরে, আর বারবার মনে হয় যেন কি ভালো হতো যদি সেই মুহূর্তটাই আমার জীবনের অন্তিম মুহূর্ত হতো, একমাত্র মুহূর্ত হতো। আর কনো মুহূর্তই ভালো লাগে না জীবনের। আর কনো রংই পছন্দ হয়না জীবনের”।

“কিন্তু ত্রিমূর্তি আমাদের কাছে এই বিধান দিয়ে রেখেছে যে, বরদান দেবার জন্যই, আর দণ্ড দেবার জন্যই ঈশ্বর আসেন। তাই নিজেকে সর্বক্ষণ বুঝিয়ে যেতাম যে, মা আর আসবেন না। বরদান তো তাঁর দেওয়া হয়ে গেছে। … কিন্তু তাঁর সত্যই যে আমি জানতাম না। তিনি যে সেজে থাকা ঈশ্বর নন, তিনি যে প্রকৃত ঈশ্বর। তাই তো তাঁর ঈশ্বরত্ব হারিয়ে ফেলার ভয় নেই, কারণ তিনি যে সত্য সত্যই ঈশ্বর। তাই তো তিনি বিধি বিধানের তোয়াক্কাই করেন না। তিনি আলিঙ্গন দিতে কুণ্ঠা করেন না, আলিঙ্গন পেতে লালায়িত থাকেন। সন্তানের অঙ্গের দুর্গন্ধ, মলিন বস্ত্র, কনো কিছুই তাঁর কাছে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু নয়, কারণ আমরা যে তাঁর কাছে ভক্ত নই, সন্তান”।

“খেলতে গিয়ে সন্তান কাঁদা মেখে আসুক, আর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সন্তান নিজের বস্ত্রেই মলত্যাগ করে দিক, সেই সন্তান যার ভক্ত তার কুণ্ঠা থাকবে তার মলিনতা নিয়ে, কিন্তু মায়ের নয়। মা যে তিনি, সমস্ত অবস্থাতেই যে সে তাঁর সন্তান। যত অধিক কঠিন অবস্থায় পতিত হয় সে, তত অধিক বাহ্যিক মলিনতা, তত অধিক আন্তরিক শুদ্ধতা। মা যে সন্তানের আন্তরিক শুদ্ধতাই দেখতে পায়, বাহ্যিক মলিনতা যে তাঁর দৃষ্টিতেও আসে না। … মা কি বলবো বুঝতে পারছিনা!”

“ক্ষমা চাইতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু ক্ষমা চাইতে গিয়েও কুণ্ঠা হচ্ছে। মনে হচ্ছে সন্তান মায়ের কাছে ভুল করবে, সেটা তো স্বাভাবিক। মা তার ভুলের জন্য তাকে বকবেন, শাসন করবেন, অবাধ্য হলে দুই ঘা দিয়ে দেবেন, এটাই তো মায়ের স্নেহ। … তাই তুমি যে আমাকে এখন ক্রোধ দেখালে, এটাকে তোমার প্রেমপূর্ণ শাসন মনে হচ্ছে। তাই ক্ষমা চাইতেও কুণ্ঠা হচ্ছে। আবার মনে হচ্ছে যেন, তোমাকে অন্তরমন থেকে মা মেনেও, বাহ্যিক ভাবে ভগবানেতেই আটকে রেখেছিলাম, মা মানতে পারিনি, আর তাই তোমার মনে অত্যন্ত বিকট প্রহারের মত পীড়া দিয়েছি। তাই তোমার চোখে চোখ মেলাতেও পারছিনা!”

মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “জানি তো মা! তোর মনে যে মা আছে, কিন্তু বিধি বিধান ইত্যাদির কারণে মনের সেই কথা মুখে আসতে পারছেনা। সেটা জানি বলেই তো এসেছি এখানে। … তোর অন্তরের ভ্রমকে নষ্ট করতে এসেছি। আর যাদেরকে মাধ্যম করে তোর মনকে ভ্রমিত করে রাখা হয়েছে, তাদের বিনাশ করতে এসেছি। অনুমতি দিবি তা করার?”

দেবী বারুদা কুণ্ঠিত ভাবে বললেন, “কি বলছো মা? তুমি আমার থেকে কেন অনুমতি নেবে? … তোমার যেটা সঠিক মনে হয়, সেটাই করবে। যেই সন্তানকে নিতে তাঁতে ইচ্ছা হবে, তাকে বুকে টানবে; যেই সন্তানকে দণ্ড দিতে ইচ্ছা হবে, তাকে দণ্ড দেবে। … আমাকে কেন?”

মাতা হেসে বললেন, “বারুদা, মা তাঁর একটি সন্তানকে কিছু দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু দায়িত্ব তিনি দিয়েছেন বলে কি যখন তখন সেই দায়িত্ব অতিক্রম করার অধিকার পেয়ে গেলেন তিনি! … না তো! … এই বনের অধীশ্বরী তোকে করেছি বারুদা। যদি তুই অনুমতি না দিস, তাহলে আমি কি করে তোকে দেওয়া দায়িত্বের উপেক্ষা করি মা?”

বারুদা বললেন, “এক মূর্খ সন্তানকে এতটা গুরুত্বপ্রদানের কিই বা মানে মা? … আমার স্বামী তোমার সন্তান, আর তুমি তোমার সন্তানকে দণ্ড দিয়ে, তাকে মাধ্যম করে যারা বিধি বিধান ছড়িয়ে তোমার সন্তানদের তোমার থেকে দূরে রেখে দিয়েছে, তাদেরকে সতর্ক করতে চাও। … মা, আমি আর তাঁকে স্বামী দেখছি না, শুধুই এক অবাধ্য সন্তানরূপে দেখছি। … তাই আমি প্রস্তুত নিজের মাথা থেকে সিঁদুর মুছে ফেলতে। … তুমি কথা দিয়েছিলে, তোমার আদরের মৃষু সমস্ত যক্ষস্ত্রীদের নিয়ে আমার এই বনে আশ্রয় গ্রহণ করে নবযোনির নির্মাণ করাবেন। … তাঁর মা তো তুমিই, কিন্তু আমি তাঁর বড় দিদি হয়ে ছোটো ভাইয়ের সংসারকে রক্ষা করবো। এই আমার ভূমিকা হবে”।

মাতা সর্বাম্বা স্নেহের সাথে বারুদার মুখে নিজের কোমল হস্ত রেখে হেসে বললেন, “পুত্রী, তুই, মৃষু, হর্ষিতা, এঁরা এই মায়ের গর্ব। … জগতসেবা করার জন্য তোরা সর্বস্ব ত্যাগ করতেও কুণ্ঠা করিস না। আমার মৃষু তো সর্বসুখ ত্যাগ করে বসে রয়েছে। হর্ষিতা নিজের দেহসুখলাভের চিন্তাই ত্যাগ করে আমার মৃষুকে প্রাণসখা করে নিয়েছে। আর তুই? সমস্ত সামাজিক সুখ ত্যাগ করে, তুই আমার সন্তানদের ভাইবোন করে বুকে আগলে রাখতে আগ্রহী। … আমার কনো সন্তানকে তোদের ভুলতে দেবনা মা। তোরা যে তাদের সকলের কাছে একাকজন নিদর্শন। প্রেমের নিদর্শন, পবিত্রতার নিদর্শন”।

মৃষু চোখ রেখেছিলেন তখন ত্রিমূর্তি কি করছেন, তার দিকে। তাই মায়ের এই কথা তিনি শুনতে পেলেন না। কিন্তু দেবী হর্ষিতা সেই কথা শুনে থতমত খেয়ে গেলেন। মনের কথা আর মনে রাখতে পারলেন না তিনি। মুখেই বলে উঠলেন, “মায়ের কাছে কি কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু গোপন নেই? … সমস্ত দিকে তাঁর নজর। তাঁর সামনেও নেই আমি। কখনো তাঁর সামনে যাইও নি। তবুও তিনি আমার প্রতিটি ভাবের সাক্ষী! … সত্যই তিনি ঈশ্বর ননই। তিনি শুধুই মা। মৃষু ঠিক বলে, ঈশ্বর বললে মা’কে ছোটো করে দেওয়া হয়। মা যে ঈশ্বরের থেকেও অনেক অনেক বড়!”

অন্যদিকে মা’কে আর এগিয়ে যেতে হলো না। ডাহুক বাহুক আর বারুদ মাতার কাছে স্বয়ংই এগিয়ে এসে বারুদাকে হুংকার মারলেন বারুদ, “দেবী বারুদা, মাতাকে আর এখান থেকে মুক্ত হতে দেবেন না। এই বন আপনার। আপনিই এর ঈশ্বরী। … আপনি না নির্গত হতে দিলে, আজ দেবী আমাদের হাতে নিশ্চিত ভাবে মরবে। … এই বনে আমরা অপরাজেয়”।

মাতা সর্বাম্বা শান্ত হয়ে প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু কি করে? এই বনে আমার বারুদা অপরাজেয়, সেই আশীর্বাদ আমিই তাঁকে দিয়েছি। কিন্তু তোমরা কি করে অপরাজেয় হলে বারুদ?”

ডাহুক আর বাহুক উত্তেজিত হয়ে ক্ষিপ্র বেগে দেবীর সম্মুখে এসে বিকট ভাবে ভীতি সঞ্চার করে বললেন, “বারুদা বারুদের পত্নী। পত্নীর কর্মের ফল পতি ভোগ করে। এই সামান্য সত্য জানেন না আপনি? আপনি নাকি জগদম্বা!”

মাতা এবার এক প্রকাণ্ড হাস্য প্রদান করে, নিজের দুই হাত দিয়ে ডাহুক আর বাহুকের গণ্ডদেশকে আকর্ষণ করে, তাদের দেহকে শূন্যে তুলে ধরলেন, আর সমানে নিজের হাতের দৈর্ঘ্য বিস্তারিত করতে থাকলেন। যখন ডাহুক আর বাহুকের দেহ বারুদা বন থেকে প্রায় হাত দেড়েক ঊর্ধ্বে উঠে গেল, তখন পুনরায় এক অট্টহাস্য প্রদান করে মাতা সর্বাম্বা বললেন, “মূর্খ, ত্রিমূর্তির কথিত কথাকে তোরা সত্য মনে করিস!” … পুনরায় অট্টহাস্য। … আবার বললেন, “কেউ কারুর কর্মফল ভোগ করেনা মূর্খ। … বারুদা বারুদার কর্মের ফল ভোগ করছে, আর তোরা তোদের”।

ডাহুক আর বাহুকের শ্বাস আটকে আসতে শুরু করলো। … বারবার তাদের চোখের সামনে সমস্ত জগত অন্ধকার হয়ে আসতে শুরু করলো। বারুদ সেই দেখে দেবীকে আক্রমণ করার প্রয়াস করলে, দেবীর হৃদদেশ থেকে আরো একটি হস্ত প্রসারিত হয়ে এগিয়ে গেল বারুদের দিকে। বারুদ একটি ধারালো প্রকাণ্ড তরবারি নিয়ে সেই হাতকে ছিন্ন করতে গেলে, দেবীর সেই বক্ষ থেকে নির্গত হস্তও একটি কালখড়গ ধারণ করে। আর দেবী উত্তপ্ত হয়ে উঠে পুনরায় নগ্ন হওয়া শুরু করলেন।

ধুসর থেকে গহন শ্যামা রূপ ধারণ করে ফেললেন দেবী। যতই দেবী শ্যামা হতে থাকলেন, ততই দেবীর দেহতাপ ডাহুক বাহুকের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠতে থাকে। আর এমন চলতে চলতে একসময়ে ডাহুক আর বাহুকের অঙ্গে অগ্নিসংযোগ হয়ে যায়। … জ্যান্ত ও জীবন্ত দহন হতে থাকে ডাহুক বাহুকের। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে তারা। প্রকাণ্ড আর্তনাদ করতে শুরু করে তারা। আর তাদের আর্তনাদের কারণে দেবী বারুদা সহ অনেকেই কানে চাপা দিলেন। আর সমস্ত সাধ, নিসাধ, সমস্ত যোনি, তথা মৃষু ও ত্রিমূর্তি দেবীর সেই দুই হস্তের দিকে দৃষ্টি রাখলেন।

ডাহুক ও বাহুকের সম্পূর্ণ দেহ জ্বলমান অবস্থা থেকে ভস্ম হতে থাকলো। বারে বারে তারা বেদনার জন্য মূর্ছা যায় দেবীর হস্তদ্বয়ের মধ্যেই। পুনরায় তাদের মূর্ছা ত্যাগ হয়, আর অনুভব করতে থাকে যে তাদের পাদুকা জ্বলে ভস্ম হয়ে গেছে, কটিদেশ পর্যন্ত জ্বলে ভস্ম হয়ে গেছে, বক্ষদেশ পর্যন্ত জ্বলে ভস্ম হয়ে গেছে। আর সেই ভীতি আর তার সাথে অসম্ভব পীড়াতে তাঁরা আর্তনাদ করতে থাকে।

অন্যদিকে বারুদ যুদ্ধ করতে গেলেও, ডাহুক ও বাহুকের আর্তনাদ তাকে যুদ্ধে মনোনিয়োগ করতেও দেয়না। তাই দেবীর বক্ষ থেকে নির্গত হাত একসময়ে বারুদেরও মস্তকের কেশ আকর্ষণ করে নেয়। এবং তা করে, বারুদের দেহকে সমানে শূন্যে বাম থেকে ডানে, আর ডান থেকে বামে আন্দোলিত করতে থাকলে, একসময়ে বারুদের কেশ ও মুণ্ডই মাতার হাতে অবশিষ্ট থাকে, বারুদের বাকি দেহ ভূমিতে লুটিয়ে পরে যায়।

ক্রুদ্ধ আবেশেও মাতা যেন করুণাময়ী। বারুদার দিকে তিনি তাকালে, মাতার ইঙ্গিত বুঝে, বারুদের দেহকে চিতায় সজ্জ করে, দহন করলেন বারুদা। যেন বারুদার প্রতি করুণার কারণেই, তাঁর স্বামীকে মাতা সহজ মৃত্যু প্রদান করলেন, এবং বারুদাকে তাঁর স্বামীর দেহ দহন করার সুযোগ দিলেন। সেই দেখে দেবী হর্ষিতা বলে উঠলেন, “পত্নীর কর্মের ফলেই পতি ভয়ঙ্কর পীড়া থেকে মুক্ত হলেন”।

মৃষু হেসে বললেন, “না হর্ষিতা। বারুদ ডাহুক বাহুকের প্রভাবে এসে সাধমানসিকতার হয়ে গেলেও, ত্রিমূর্তির বিধানে বিশ্বাস অর্পণ করলেও, অন্তর থেকে সে তাঁর স্ত্রীকে সম্মানও করতো। স্ত্রীর পবিত্রতাকে সে সর্বদাই সম্মান করেছে। ভ্রম পথে যাবার জন্য দণ্ড স্বরূপ তার হত্যা তো হলো, কিন্তু নিজেরই সুআচারের কারণে সহজ মৃত্যু লাভ করলো সে। কেউ কারুর কর্মফল ভোগ করেনা। সকলেই নিজেরই কৃতকর্মকে কর্মফল রূপে লাভ করে। কিন্তু নিজের কৃতকর্মের বোধ থাকেনা, তাই এমন মনে করে যে অন্যের কর্মের ফল ভোগ করলো সে”।

হর্ষিতা আবেগপ্রবণ ভাবে প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা মৃষু, তোমার কথা শুনলেই কেন মনে হয়, আমরা মায়ের অযোগ্য সন্তান!”

মৃষু হেসে বললেন, “কারণ মা আমাকে আলাদা করে নির্মাণ করেছেন, তাঁর সমস্ত সন্তানদের যোগ্য করে তোলার জন্য। আমার এই যোগ্যতা আমার আমার কর্মফল নয়, কারণ এর অন্তরালে থাকা কর্মও আমার নয়, আমার মায়ের। তাঁরই আমার উপর করা কর্ম, আর তাই তাঁরই কর্মের ফল স্বরূপ তাঁর সন্তানরূপে স্থিত এই মৃষু, যে অন্য কিছুই নয়, মায়ের বাকি সমস্ত সন্তানের মৃষুদাদা, অর্থাৎ মায়ের যোগ্য সন্তান হয়ে ওঠার একটি প্রেরণার নাম মাত্র”।

বারুদের মৃত্যুর পর মাতার বক্ষের থেকে নির্গত হাত পুনরায় বক্ষে মিলিয়ে গেল, আর এবার ডাহুক আর বাহুকের কেবলই অবশিষ্ট মুণ্ডের তাপ মাতার হস্তকরকে স্পর্শ করলে, মাতা সেই দুই মুণ্ডকে ধরে রাখা করকমলকে হালকা করলে, তা ভূমিতে পতিত হয়, আর তা ভূমিতে পতিত হতেই পূর্ণ ভাবে ভস্মীভূত হয়ে গেলেন ডাহুকবাহুক, আর এমন ভাবেই তাদের নাশ হলো যেন, তাদের কনো অস্তিত্বও কনো কালে ছিলো না।

না তাদের আত্মভাব আর জীবিত থেকে পিশাচপ্রাপ্ত হলো, আর না তাদের দেহের ভস্মের কনো কিছু পঞ্চভূতের থেকে পৃথক ভাবে অবস্থান করলো। আর ডাহুক বাহুকের নাশের সাথে সাথে, সকল প্রকার স্ত্রীবিদ্বেষ যেন থমকে গেল। যারা কেবলই স্ত্রীবিদ্বেষকে মূলধন করে জীবিত ছিলেন, তারা যেন স্থবির পদার্থবৎ হয়ে গেলেন এর কারনে।

আর তাই তাদেরকে অধিক ভাবে যান্ত্রিক করে তুলতে এবার সাধপাল যন্ত্রলোকে গমন করলেন। সেখানে গমন করে মৃষুর আগমনের বার্তা যেমন লাভ করেন তিনি, তেমনই ত্রিমূর্তিকে বন্দী করার কথাও জানেন, আর তাঁদেরকে মুক্ত করা হয়েছে কয়লাকে আটকানোর জন্য, তাও জানেন। ক্ষিপ্ত সাধপাল এবার মৃষুর বিনাশের জন্য তৎপর হয়ে মন্ত্রলোকে পদার্পণ করার উদ্দেশ্যে ঘুরলে, সম্মুখে দেখলেন মৃষু স্বয়ং দণ্ডায়মান।

সাধপাল কিছু বোঝার আগেই, মৃষু সরাসরি একটি পদাঘাত দ্বারা সাধপালকে ভুশায়িত করলেন। সেই দেখে সাধপাল একমুহূর্তের জন্য খেয়াল করলেন যে, যার হাতে তাঁর মৃত্যু, সে তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে। তাই অছিলা করার প্রয়াস করে বললেন, “আমার কথা তো শুনে নাও মৃষু!”

মৃষু হাস্যমুখে বললেন, “আমি যুদ্ধবিদ্যা আমার মায়ের থেকে শিখেছি। আর আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন যে, যত দয়া, যত মমতা, সমস্ত ততক্ষণ যতক্ষণ না শত্রু তোমার সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়েছে। একবার শত্রু সম্মুখে এসে উপস্থিত হলে, আর কথা নয়, মমতা দয়া ক্ষমা শব্দকে ভুলে যাও। শত্রু যদি ক্ষমা চায়, শত্রুর নিধনের পর তাঁর প্রতি বিদ্বেষকে ত্যাগ করো, এটিই তাঁর প্রতি প্রদান করা ক্ষমা। জীবনদান কখনোই ক্ষমা নয়”।

এই কথা বলে মৃষু একপ্রকার শূন্যে নিজের দেহকে উন্নীত করে, সরাসরি সাধপালের বক্ষে নিজের একটি জানু স্থাপন করলে, প্রবল হুংকারের সাথে সাধপাল আর্তনাদ করে উঠলে, রমনাথ যিনি কয়লাকে বোঝাতে এসেছিলেন আর কয়লা যেই পথে চলছে, সেটার থেকে বিরত করতে এসেছিলেন, তিনি বিব্রত হয়ে গেলেন। আর যেই ক্ষণে রমনাথ বিব্রত হয়ে গিয়ে পিছন পানে ঘুরলেন, সঙ্গে সঙ্গে কয়লা পীতাম্বর ও শ্বেতাম্বরকে বন্দী করে ফেললেন।

রমনাথ পীতাম্বর ও শ্বেতাম্বরের হুংকার শুনে পিছন ঘুরলে, কয়লা বিদ্রূপের হাসি হেসে বললেন, “মাতার খড়গের প্রহার! আহ! … সেই ক্ষত স্থানের রক্তেও মাতার খড়গের শক্তি লাভ হয়। … সেই শক্তি আমি লাভ করেছি। আর যতটা বল লাভ করেছি, তাতে পীতাম্বর আর শ্বেতাম্বরকে আমি বন্দী করে নিতে সক্ষম। … এবার কি করবে রমনাথ? আমাকে জন্ম তো তুমিই দিয়েছ। তারপরও যখন ডাহুকবাহুক তোমার কাছে আমাকে ভার অর্পণের জন্য বললো, তখন তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে? আমাকে প্রত্যাখ্যান করে হাজতকে দায়িত্ব দিলে! … এবার কি করবে? পীতাম্বর আর শ্বেতাম্বর আমার বন্দী। তাদেরকে কি ভাবে উদ্ধার করবে?”

রমনাথ ক্রুদ্ধ আবেশে হুংকার প্রদান করে বললেন, “রমনাথ থাকতে, পীতাম্বর আর শ্বেতাম্বরকে কেউ কি করে বন্দী করতে পারে? এঁরা তো আমারই অঙ্গজাত, আমিই এঁদের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত!” এই বলে, একটি প্রকাণ্ড শ্বাস গ্রহণ করলে, কয়লার বন্দী অবস্থা থেকে পীতাম্বর আর শ্বেতাম্বরকে আহারের ন্যায় গ্রহণ করে নিলেন রমনাথ।

সেই দেখে কয়লা হেসে উঠে বললেন, “বেশ, মুক্ত তো করে নিলে, আবার মুক্ত করবে তো তাদেরকে। আমি আবার তাদের বন্দী করবো”।

রমনাথ ক্রুদ্ধ আবেশ ধারণ করে বললেন, “না, আর মুক্ত করবোই না। এবার আমি তাদের মুক্ত তখনই করবো, যখন তারা সুরক্ষিত হবে। আর তাদেরকে সুরক্ষিত করার জন্য, এবার কয়লা তোর নিধন করবো আমি”।

কয়লা অট্টহাস্য হেসে বললেন, “আমাকে হত্যা! … তুমি না করলেও, মাতা করে দেবে আমার হত্যা। কিন্তু মৃষু! … মৃষু যে সাধপালের হত্যা করে দেবে। … তোমার প্রিয়তম সন্তান, সাধপাল। তাকে বাঁচাবে না রমনাথ? ও না না, আর তো তুমি রমনাথ নওই। তুমি তো এখন পরমাত্ম, ত্রিগুণকে একাকী ধারণ করে তুমি তো এখন পরমাত্ম। … কি হলো পরমাত্ম তাঁর প্রিয় পাত্র সাধপাল জিতেশকে বাঁচাবে না!”

রমনাথ ত্রিমূর্তিকে একত্রে ধারণ করে পরমাত্ম হয়ে বিশালাকায় ধারণ করেছিলেন ততক্ষণে। আর সেই বিশাল আকার তখন বিচলিত হয়ে এমন হয়ে উঠেছেন যেন এক সহস্র মত্ত হাতি একত্রে দণ্ডায়মান। আর ঠিক সেই বিচলিত ভাবের সুযোগ নিয়েই, কয়লা এবার হীরাকে নিজের বাহুপাশে রেখে হুংকার ছেড়ে বললেন, “আর তো তুমি আমার কিছু করতেও পারবেনা পরমাত্ম। এই দেখো, আমার বাহুপাশে কে বন্দী!”

পরমাত্ম এবার দেখলেন কয়লা হীরাকে বাহুবপাশে বন্দী করে রেখে হীরার গণ্ডে নিজের খড়গ স্থাপন করে রেখেছে। এই দ্বিচারিতা দেখে পরমাত্ম এবার ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলেন। যিনি সর্বক্ষণ সমস্ত জীবের চেতনার সাথে দ্বিচারিতা করে ফেরেন, যিনি সকল আত্মের কামনাপূর্তি করার প্রলোভন দেখিয়ে দেখিয়ে নিজের আরাধনা করান, আর নিজেকে ভগবান রূপে স্থাপন করেন, আজ তাঁরই পুত্র তাঁরই সাথে দ্বিচারিতা করছেন। তাই সেই দ্বিচারিতা অসহনীয় লাগে পরমাত্মের কাছে।

আর তাই হুংকার ছেড়ে বললেন তিনি, “কয়লা, ভুলে গেছিস, হীরা আমার কিচ্ছু লাগেনা। যদি তোকে হত্যা করতে হীরারও হত্যা করতে হয়, তবে আমি সেই কাজ করতে দ্বিতীয়বার ভাববো না!”

যেই মুহূর্তে পরমাত্ম এই কথার উচ্চারণ করেন, সেই মুহূর্তে তাঁর পিছন থেকে মায়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সেই কণ্ঠস্বর অত্যন্ত ভয়াবহ। তাঁর হুংকারে কেবল পরমাত্ম পিছন ঘুরে দেখতেই বাধ্য হলেন না, বরং সেই কণ্ঠস্বরের প্রভাবে পরমাত্ম সহ হীরা ও কয়লা আর তার সাথে সকল কয়লার তন্ত্রসেনাও ভূপতিত হয়ে গেল। তাই পরমাত্ম পিছন ফিরে দেখতে বাধ্য হলে সকলে দেখলেন, বিশালাকায় প্রায়নগ্না অত্যন্ত ধুসর রূপে মাতা সর্বাম্বা বিরাজমান।

তাঁর হস্তে কালখড়গ, যা সূর্যের কিরণের সাথে সাথে প্রবল আলোক বিচ্ছুরিত করতে থাকে। দেবীর পড়নে গোচর্ম নির্মিত বস্ত্র বিরাজমান। তাঁর কণ্ঠে এক বিশাল মুণ্ডমালা, যাতে সর্পের মুণ্ডের সাথে সাথে উপস্থিত ছাগলের মুণ্ড, সারমেয় মুণ্ড, এবং এক্কেবারে তলে রয়েছে একটি গোমুণ্ড আর একটি নরমুণ্ডের কঙ্কাল মস্তক। সেই মালা তাঁর সুঢাম স্তনদেশকে ঢেকে রাখলেও, তাঁর দেহের আনাচকানাচ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল রক্তিম আভা।

এলোকেশী তিনি, রক্তিম তাঁর আঁখি, কালরূপীনি তিনি। আর তাঁর অঙ্গ থেকে নির্গত হতে থাকছিলো হাল্কা হাল্কা জ্বালামুখীর অগ্নিপিণ্ড, আর সেই অগ্নিপিণ্ড থেকে ধূম্র নির্গত হয়ে, তাঁর আকৃতিকে আরো বিশাল করে দিয়েছিল চারীদিকের সেই অগ্নি ও ধূম্রবলয়।

তাঁর সেই রূপ দেখে সকলেই ভয়ার্ত হলেও, কয়লা বললেন, “দেখুন না মা, আপনার পতি আমাকে হত্যা করার জন্য, হীরাকেও মৃত্যু দিতে চাইছে। আমি বলতে, আমাকে তিনি বললেন, উনার কিছু এসে যায়না যদি হীরাকে মৃত্যু দিতে হয়। … আর হীরাকে দেখুন। কেমন ভয় পেয়ে আছে?”

খল নাট্যপূর্ণ ভাবে কয়লা হীরার উদ্দেশ্যে বললেন, “মরবি হীরা! … ভেবে দ্যাখ হীরা। মরবি?”

হীরা হাতজোর করে বললেন, “মা, আমি তোমার কাছে থাকতে চাই। চিরকাল তাই চেয়ে এসেছি, আর আজ যখন সেই সুযোগ আমার কাছে এসেছে, তখন আমাকে মরতে হবে?”

মাতা গম্ভীর ভাবে বললেন, “না পুত্র, তুমি যখন দেহত্যাগ করতে চাও না, তখন তোমার দেহ অখণ্ডই থাকবে। নিশ্চিন্তে থাকো”।

পরমাত্ম সেই কথাতে ভ্রুকুটি কুঞ্চিত করলে, ঠিক সেই সময়েই পুনরায় আর্তনাদের শব্দ ভেসে এলো, সাধপালের আর্তনাদ। মৃষু এই নিয়ে তিন তিনবার সাধপালের বক্ষে পদাঘাত করেছেন। সাধপালের সমস্ত অঙ্গের সমস্ত শিরা ফেটে লহু বমন করছে। সঠিক ভাবে দাঁড়াতেও পারছেন না তিনি। রক্তাক্ত ভাবে তিনি বললেন, “কি বল! … আদিশক্তির সন্তান। আলাদা করে বলে দেবার কনো প্রয়োজন নেই। একটি একটি পদাঘাত যেন কালের সাথে আলাপ করিয়ে দিচ্ছে আমাকে!”

সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছেন না তিনি। দুই জানুতে হাতে ভর দিয়ে সমস্ত দেহ থেকে রক্তবমন করতে করতে তিনি বললেন, “মৃষু, ক্ষমা তো তুমি করবে না। আর ক্ষমা পাবার মত আমি কিছু করিও নি। জানি তুমি তোমার মায়ের মত। মুখে কে ক্ষমা চাইলো, তাতে তোমার কিছু এসে যায়না। তোমার মাও তেমনই, আর তাঁর ছাও তেমনই হয়েছে। মনের মধ্যে যদি ক্ষমাভাব না থাকে, আর যদি সঙ্গে ক্ষমালাভের মত সুকর্ম না থাকে, তাহলে মুখে যতই ক্ষমা প্রার্থনা করো, তোমরা শোনো না”।

“তাই ক্ষমা চেয়ে আর বিব্রত করবো না। … কিন্তু মৃষু আমি মরছিনা কেন? তিন তিনটে পদাঘাত করেছ তুমি। একটি একটি পদাঘাত আমাকে মৃত্যুর সাথে সাখ্যাত করিয়ে দিয়েছে। ওফ কি ঘাতক প্রহার! … তা হবে না! পূর্ণ রূপে না এসেই রমনাথ, পীতাম্বর, আর শ্বেতাম্বরকে অনন্য আর আসন যেই ভাবে ধুলা চাটিয়েছিলো, আমি তো তাঁদের কাছে অত্যন্ত সামান্য। বরদানের বলেই যা বলিয়ান। … আর কতো ঘা খেতে হবে মৃষু। প্রতিটি পদাঘাতে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করছি। আর পারছিনা। এবার তো প্রাণ নিয়ে নাও আমার! … এটুকু অন্তত করুণা করো! করুণাময়ীর সন্তান তুমি। এটুকু আবদার তো শোনো!”

মৃষু সম্মুখে এলেন আর এবার দুই বাহুকে দুই পাশ থেকে প্রবাল বেগে এগিয়ে নিয়ে এসে দুই তালব্য দ্বারা সাধপালের গণ্ডদেশকে আঘাত করলে, সাধপালের মুণ্ড তাঁর গর্দান থেকে ঝুলে পড়লো, আর তার নিথর দেহ ভূমিতে মৃষুর সামনে লুটিয়ে পরলে, মৃষু তাঁর দেহকে ভূমি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে, সাধপালের প্রজাদের দিয়ে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করালেন। এবং ভূত, যন্ত্রবিদদের মুক্তি প্রদান করে, যক্ষস্ত্রীদের বারুদার বনে নিয়ে এসে সেখানে থাকার অনুমতি কামনা করলেন দেবী বারুদার থেকে।

দেবী বারুদা দেহধারণ করে সম্মুখে এসে নতমস্তক হয়ে মৃষুর চরণবন্দনা করতে গেলে, মৃষু তাঁর স্কন্ধ ধারণ করে বললেন, “এ কি করছো দিদি? মা তোমাকে বিশ্বাস করে। তোমাকে স্নেহ করে। তুমি তো আমার বড় দিদি! … আর তুমি তো আমাকে ছোটো ভাইয়ের মত আগলে রাখবে, এই অঙ্গিকারও করেছ মায়ের কাছে। তারপরে তোমার ছোটো ভাইয়ের চরণ বন্দনা করবে?”

বারুদা হাসিমুখে বললেন, “কিন্তু আমি এক সাধকন্যা মৃষু!”

মৃষু হেসে বললেন, “এই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি কণা আমার মায়ের চেতনাকে ধারণ করে রাখে। তাই সকলেই আমার মায়ের সন্তান, নিজের সন্তান। হ্যাঁ কেউ এই ভাবে মজে আছে যে সে সাধ, আবার কেউ এই ভাবে মজে রয়েছে যে সে সাধু, আবার অন্যেরা ভাবছেন সে নিসাধ। কিন্তু দিদি, প্রকৃত অর্থে আমাদের একটিই পরিচয়, আর তা এই যে আমরা হলাম মায়ের সন্তান, অর্থাৎ ভ্রাতা ও ভগিনী”।

“হ্যাঁ, যিনি আমাদের মা’কে চেনেন নি, তিনি যে আমাদের দেহদাত্রী নয়, প্রাণদাত্রী সত্য অর্থে মা, সেই সত্য জানে নি, তাদের মধ্যে আমি সাধ, আমি সাধু, আমি নিসাধ, এই ভাব থাকতে পারে। কিন্তু যিনি নিজেকে মায়ের সন্তান বলে জেনে নিয়েছেন, না তো তিনি সাধ রইলেন, না সাধু আর না নিসাধ। তিনি যে শুধুই মায়ের সন্তান আর মৃষুর ভ্রাতা বা ভগিনী। … তা দিদি, আমাদের থাকার অনুমতি দেবে তোমার বনে?”

বারুদা বললেন, “আমাকে দেহ ধরে তোমার জ্যেষ্ঠা হয়ে থাকতে দেবে? তোমাকে স্নেহ দিতে পারবো আর মায়ের স্নেহ … আসলে”।

মৃষু হেসে বললেন, “একবার তাঁর ছোঁয়া অনুভব করে ফেললেই, সে মায়ের স্নেহ লাভের জন্য লোভী হয়ে ওঠে। আর হবেনাই বা কেন? সন্তান আমরা, মায়ের কোল পাবার লোভ করার পুরো অধিকার আছে আমাদের সকলের। তাই না? অবশ্যই থাকবে দিদি। আমার বড় দিদি হয়ে থাকবে তুমি। আর ভালোই হবে, এঁরা সকলে তো এবার নিজেদের চোখে লাগা সর্বাধিক পবিত্র পুরুষকে বিবাহ করে নিয়ে আসতে যাবে। … তাই, মা ফেরা পর্যন্ত আমি তো নিঃসঙ্গই রয়ে যাবো!”

হর্ষিতা বললেন, “মৃষু, আমি তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছিনা। আমার চোখে দেখা কেবল পবিত্রতম পুরুষ নয়, পবিত্রতম মানুষই তুমি। তোমাকে দেখে নিয়েছি, আর অন্য কারুকে চোখে লাগবে না। আমি বরং তোমার পত্নীকে এখানে নিয়ে আসি। মায়ের সান্নিধ্য সুখ তারও পাবার অধিকার আছে। তাই না?”

মৃষু হেসে বললেন, “আমি কনো রাজা নই হর্ষিতা যে আমি কারুকে প্রেরণ করবো আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসার জন্য। … এটা আমার কর্তব্য যে আমি তাঁকে নিজে নিয়ে আসবো এখানে। তুমি দিদির সাথে এখানেই অপেক্ষা করো। আমি তাঁকে নিয়ে আসছি এখানে”।

এতো বলে মৃষু সেখান থেকে চলে গেলে, প্রিয়পুত্র সাধপালের মৃত্যুর জন্য মৃষুকে দায়ী করে, মৃষুর প্রতি আস্ফালন ধারণ করে, পরমাত্ম মহাক্রোধে উঠে গিয়ে হীরা ও কয়লার উপর সেই ক্রোধ প্রয়োগ করতে গেলে, কি হলো ঠিক বুঝতেও পারলেন না তিনি। একটি বিশাল আঘাত যেন তাঁকে প্রায় শূন্যে ঠেলে ফেলে দিলো, আর প্রকাণ্ড শব্দ করে, বিশাল স্থল ও জল ভুমিকম্পন করে, পরমাত্ম ভুতপতিত হলেন। সম্মুখে তাকিয়ে দেখলেন, মাতা সর্বাম্বার সেই বিশাল রূপ হীরা ও কয়লার ঢাল হয়ে দণ্ডায়মান।

উগ্র হয়ে গেছেন তিনি পরমাত্মের আচরণে, আর তাই দেহের আগ্নেয়গিরির ন্যায় উষ্মা ও ধূম্র আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। পরমাত্ম বুঝলেন বলের মাধ্যমে তিনি সামনাসামনিও হতে পারবেন না দেবীর। হতে পারে তিনি মাতৃত্বকে ঈশ্বরত্বের থেকে অধিক প্রাধান্য দেন আর তাই ঈশ্বরত্ব ভুলে গিয়ে মা হয়েই বিরাজমান থাকেন। কিন্তু তিনি ভুলে থাকুন আর না থাকুন, তিনিই যে প্রকৃত ব্রহ্ম, যাকে আরবিরা মাইবাপ অর্থাৎ আল্লাহ বলে থাকে।

তিনি যে প্রকৃত অর্থে শক্তি, আর তাঁর শক্তি ধারণ করেই কেউ শক্তিমান তো কেউ সর্বশক্তিমান। কিন্তু ইনি যে না শক্তিমান আর না সর্বশক্তিমান। ইনি যে শক্তি! … সমস্ত শক্তির উৎস তাঁর থেকে। শক্তিমান যত শক্তিশালীই হোক না কেন শক্তির থেকে শক্তিমান কখনোই শ্রেয় হতে পারেনা। তাই যেইকালে স্বয়ং শক্তি পথ আটকে রেখেছেন, সেই কালে হীরাকয়লার কাছে পৌঁছানো অসম্ভব। তাই তিনি এবার ভিন্ন কৌশল ধারণ করলেন। তিনি এবার পরাশক্তিকে অপমান করার প্রয়াস করলেন।

বললেন, “বিক্রাল রূপ ধারণ করলেই কি জননী হয়ে যাওয়া যায়! … কি অর্থ এই পোশাকের? গরুড় চর্ম থেকে নির্মিত পোশাক কি বলে? এই মুণ্ডমালারই বা কি অর্থ? সাপ, ছাগ, বানর, গরু আর মানবের মুণ্ড? জননী হতে চলে এসেছে! যতসব!”

হীরার এই কথা অসহনীয় লাগে। সে সমুখে এসে গর্জন করে বলল, “এক সন্তান সমস্ত কিছু সহ্য করে নিতে পারে, মায়ের অপমান নয়। আমাকে হত্যা করতে হয়, হত্যা করো পরমাত্ম। এই তো করে এসেছ সর্বকাল। তোমার বিরোধিতা যে যে যখন যখন করেছে, যে যে তোমাকে পরমেশ্বর না মেনে সয়তান বলে গণ্য করেছে, তার হত্যা করে এসেছো। তোমাকে সয়তান গণ্য করেছে বলেই তো সারা বিশ্বের মাননবসমাজে ইসলামদের এই পীড়াদানের প্রয়াস করো তুমি। … বেশ, আমার সাথেও তো তাই করবে। করো, কিন্তু তা বলে আমার মায়ের অপমান নয়”।

“আমার সামর্থ্য নেই তোমাকে বল দিয়ে উত্তর দেবার। এখানে মৃষু থাকলে, সেই উত্তরও পেয়ে যেতে তুমি। … কিন্তু সে এখানে নেই, সে অন্য কাজে ব্যস্ত। কিন্তু আমার মায়ের একটিই সন্তান নয়। আমিও তাঁর একটি সন্তান। … দেহবল না থাকতে পারে সেইরূপ, কিন্তু মাকে হৃদয়ে ধারণ করলেই জ্ঞান লাভ হয়ে যায়। স্বতঃই। তাই আমি তোমার ব্যঙ্গাত্মক প্রশ্নের উত্তর দেব”।

“গরু হলো আমিত্বের প্রচার করার একটি প্রতীক। তার ডাকের মাত্রা হলো হাম্বা, অর্থাৎ আমি। আর তার আমিত্বের নাশ হয় যখন শেষ কালে তার চামরা থেকে তন্তু নির্মাণ হয়। তার আগে পর্যন্ত তার চর্মাদি সমস্ত বস্তু থেকে যা কিছু নির্মিত হয়, তার থেকে ‘হাম’ই অর্থাৎ আমিত্বেরই বিভিন্ন ধ্বনি নির্মিত হতে থাকে। কিন্তু যখন তার চর্ম থেকে তন্তু প্রস্তুত করা হয়, তার থেকে তুং অর্থাৎ আমি নয় তুমি’র ধ্বনি নির্মিত হয়। তাই আমাদের মা সেই তন্তু ধারণ করে থাকেন, কারণ তিনি আত্ম বা পরমাত্ম বা আমিত্ব থেকে মুক্ত আর তিনি আমিত্ব থেকে মুক্তই করতে চান তাঁর সন্তানদের”।

“কারণ? কারণ আমিত্বের কারণেই যত রাজ্যের ঝঞ্ঝাট। আমিত্বের কারণেই এই ব্রহ্মাণ্ড, এই জন্ম, এই মৃত্যু, এই কামনা, এই মদ, এই লোভ, ইত্যাদি ইত্যাদি সমস্ত কিছু। আমিত্ব নেই তো না প্রয়োজন জন্মের আর তাই না প্রশ্ন ওঠে মৃত্যুর; না প্রশ্ন ওঠে সাকারের, আর তাই না প্রশ্ন ওঠে বিনাশের, বেদনার, ব্যাথার। আমি যতকাল, ততকাল সাকার সত্য, আর ততদিন বেদনা, ব্যাথা আর এই বেদনা আর ব্যাথা থেকে মুক্ত হবার কামনার আবশ্যকতা”।

“এই আমিত্বের সূচক একা গরু নয়, গরুড় সাথে সাথে ছাগ, বানর, সাপ ও অবশ্যই মানুষ। আর তাই এঁদের আমিত্ব যেই মস্তকে পরিপূর্ণ থাকে, সেই মস্তকদেরকেই তিনি মুণ্ডমালা রূপে ধারণ করে থাকেন। … আমিত্ব থেকে তিনি পূর্ণ ভাবে মুক্ত, আর তাঁর সেই সন্তানরাই তাঁর সাখ্যাত লাভ করতে সক্ষম হন যারা আমিত্ব থেকে মুক্ত। যতক্ষণ কারুর মধ্যে আমিত্ব বিরাজ করে, সে মা’কে প্রত্যক্ষই করতে পারেনা, যতই মা সর্বক্ষণ তাঁর সামনে উপস্থিত থাকুক না কেন”।

“আর তুমি তো এঁর ব্যঙ্গ করবেই, কারণ তুমি তো সেই গরুকে নিরীহ জীব বলে থাকো, যেই গরু নিত্য লক্ষাধিক প্রাণকে বিনষ্ট করে নিজের উদরপূর্তি করে। স্বাভাবিক, প্রাণ তো তুমি দাওই না, দিতেও পারো না। প্রাণ যে চেতনা থেকে প্রবাহিত হয়, আর আমাদের মা যে পরাচেতনা। তাই প্রাণের মূল্য তুমি কি বুঝবে? … তুমি তো শুধুই আবেগ প্রদান করো, আমিত্ব প্রদান করো, আর আমিত্ব নিয়ে বড়াইএর ইচ্ছা প্রকট করাও, আমিত্ব প্রসারে বিঘ্ন আসা নিয়ে চিন্তা প্রকট করাও, আর আমিত্বকে বিস্তৃত করে জগতে পূজনীয় হবার কল্পনা প্রদান করাও। তাই তোমার কাছে তো যেই প্রাণীর আবেগকে অন্য প্রাণীরা বুঝতে পারে, তাদের পুজো করাই ধর্ম। কারণ তবেই তো আমিত্বের বিস্তার সম্ভব। তোমার বিস্তার সম্ভব। তার জন্য প্রকৃতির বিরোধ করতে হলেও, তোমার তাতে কিছু এসে যায়না”।

এক সামান্য ভক্তের এইরূপ জ্ঞান দেখে পরমাত্ম পুনরায় বিচলিত হয়ে যায়। তাই দেখে হীরা পুনরায় বললেন, “আমি জানি, আমার উপর তোমার ভারী ক্রোধ জন্মাচ্ছে। মা সামনে না থাকলে, হয়তো তোমার ক্রোধে ভয়ও পেতাম। কিন্তু যেখানে সামনে মা দাঁড়িয়ে, সেখানে সন্তান যে কারুকে ডরায় না, সেই কথা তুমি জানো না, জানতে পারবেও না, কারণ তুমি তো তোমার মা থাকতেও, তাকে মা বলে মানো না, সর্বক্ষণ দাসী করে রাখতে চাও তাকে”।

ক্রোধের আবেশে এবার পরমাত্ম ঘাতক ভাবে আক্রমণ সাধলেন হীরার উদ্দেশ্যে। কিন্তু পুনরায় হীরার সম্মুখে পৌঁছে আক্রমণ করতে গেলে, পুনরায় একটি পদাঘাত এসে লাগে তাঁর উদরে, আর যেই স্থানে দাঁড়িয়ে আক্রমণ করা শুরু করেছিলেন তিনি, পুনরায় সেই স্থানেই প্রত্যাবর্তন করলেন। এবার সেই কৃত্য দেখে উত্তপ্ত হয়ে উঠে পরমাত্ম হুংকার ছাড়লেন, “অম্বা তুমি মহাভুল করছো। হীরাকে বাঁচানোর প্রয়াসে, তুমি কয়লার মতো ঘোর পাপীকে সুরক্ষা দিচ্ছ”।

মাতা সর্বাম্বা সেই কথাতে অতটহাস্য হেসে উঠে বললেন, “কয়লা আমার খড়গের আঘাত করা ক্ষত স্থানের লহু পান করে করে আমার থেকে বল সংগ্রহ করছে। আর তা করে করে বলবান হচ্ছে। … আত্ম, সাগরের তার ঢেউদের থেকে কনো ভয় থাকেনা। সাগর জানে, যা কিছু নিচ্ছে সেই ঢেউ, এখান থেকেই নিচ্ছে, আর এখানেই দেবে। ঢেউকে ভয় করে সাগর সংলগ্ন জমি। জমির ভয় হয় যে ঢেউ শক্তিশালী হয়ে গিয়ে তাকেই না আক্রমণ করে দেয়”।

“শক্তির শক্তিমানের থেকে কনো ভয় নেই। শক্তিমান অন্য শক্তি অর্জনকারীকে ভয় করে। তাই তোমার ভয় থাকে কয়লার শক্তিসঞ্চয়ের থেকে, তুমি আঘাত করো তাঁকে। কে আটকেছে তোমাকে? তোমার আক্রমণে যদি হীরার কনো ক্ষতি না হয়, আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমার আক্রমণে কনো প্রকার বাঁধা দেবনা। কিন্তু হীরা আমার থেকে শক্তি চায়নি, চায়ও না। সে আমাকে চায়, সে তার মাকে চায়, আর মাকে লাভ করার জন্য সে তিলতিল করে প্রস্তুত হয়েছে আর এখন অন্তিম পর্যায় রয়েছে তার প্রস্তুতি। তার কিছু হতে আমি দেবো না। না তোমাকে আর না কয়লাকে”।

“তাকে যেই আক্রমণ করুক, তুমি বা কয়লা, সম্মুখে আমাকে পাবে। হীরার মাকে পাবে। তাই হীরার দিকে চোখ রাঙানোর ভুলটা ভুলেও করো না”।

পরমাত্ম বিরক্তি আর ক্রোধ একত্রিত করে হুংকার ছাড়লেন, “কিন্তু কয়লা হীরাকে নিজের সাথে যুক্ত করে রেখে দিয়েছে। … কয়লার দমন আমি করবোই। কয়লার প্রাণের রক্ষা যে করবে, তাকেও আমার হাতে মরতে হবে”।

মাতা সেই কথাতে ক্রোধ ধারণ করে বললেন, “যতক্ষণ না হীরা তোমার আঘাতের মুখে পড়বে, আমি কনো বাঁধা দেবনা। কিন্তু হীরার উপর আঘাত এলে, আমার থেকে তুমি পার পাবেনা”।

পরমাত্ম ক্রোধ আর বিদ্বেষ ধারণ করে বললেন, “এর আগেও আমি, তোমার থেকে তোমার সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়েছি। ভুলে যাচ্ছ অম্বা। মনে পরছে সেই কথা? মেধা তার নাম। তাকে রক্ষা করার জন্যই মানস, ধরিত্রী, জল ও বায়ু ক্রিয়াশীল হয়, আর তুমিও প্রকৃতি বেশে সাকার হয়ে বিরাজ করো। তোমার সেই সন্তানকে আমি টুকরো টুকরো করে দিয়েছি। আর সেই সন্তানদের নিজের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে তুমি আজও প্রকৃতি বেশে বিরাজ করছো, আর এখনও আশা ছাড়ো নি, তাই বিরাজ করবে”।

মাতা হেসে বললেন, “ভুল করছো পরমাত্ম। মেধা সন্তান হতে পারেনি, যখন তুমি তাকে ছিনিয়ে নিয়েছিলে, যখন তাকে টুকরো টুকরো করেছিলে। সে তখন ভ্রূণ ছিলো। আর তাই আমি প্রকৃতি বেশে বিরাজ করে, সেই ভ্রূণকে প্রাণে পরিণত করতে প্রয়াসশীল ছিলাম। মা আমি, তাই সন্তানদের আরো ক্ষতি সাধন করবে বলে, আমি মুখ বুঝে অনেক কিছু সহ্য করে গেছি। মানবকে প্রকট করেছি, আর তাদের মধ্যে দিয়ে আমার ভ্রূণদের মুক্ত করেছি”।

“তুমি তখনও আঘাত করেছিলে আমার সন্তানদের। আর মানবের মধ্যে যাতে মেধার বিস্তার না হয়, তার জন্য সহস্র প্রকার ষড়যন্ত্র করেছিলে। আমি নিরাকার, আমি চেতনা। তাই আমার ভাষাকে আমার ভ্রূণরা উদ্ধার করতে পারতো না, আর তুমি নিজেকে তাদের মধ্যে প্রকট করে করে, তাদেরকে আমিত্বের পাঠ পরিয়ে পরিয়ে আত্মসর্বস্ব করে তুলেছিলে। … তাই আমার একটি কথা বলার মুখের দরকার ছিলো। আর সেই মুখ হলো মৃষু। … ষড়যন্ত্রপ্রেমী তুমি। তাই সেই কথা তুমিও বুঝে গেছিলে, আর তাই মৃষু জন্মলাভ করতে পারার আগে থেকেই, তার মৃত্যুর জন্য ষড়যন্ত্র করে গেছ”।

“তোমার সাধের বাধ্য ছেলে সাধপাল জিতেশকে দিয়ে তুমি তাকে সাতটুকরো করে দিয়েছিলে। তার সাতটুকরোকে সামলাবার জন্য আমি পাঁচটুকরো হই, আর তাও তোমার সাধের সাধপালকে দিয়েই করাই আমি। … তারপরেও যেই পরিণতি তুমি মেধার করেছিলে, সেই পরিণতি মৃষুর না হয়, সেই কারণে যুগের পর যুগ আমি মৃষুর কাছে প্রত্যক্ষ হইনি, আর এই ভাবে মৃষুর অস্তিত্ব তোমার থেকে লুকিয়ে গেছি”।

“তার বল দেখে যখন তুমি একসময়ে তাকে চিহ্নিত করেই ফেললে, তখনও আমি আমার পুত্রের থেকে দূরে থেকে গেছি, আর আমার থেকে আমার পুত্রকে আলাদা করে রেখেছি, যাতে তুমি মনে করতে থাকো যে, তাকে হত্যা করার প্রয়োজন নেই, তাকে বশ করলেই হয়ে যাবে। আমি জানতাম, যদি আমি সম্মুখে চলে আসতাম, তাহলে তুমি তাকে বশ করার নয়, হত্যা করার ষড়যন্ত্র করতে। তাই অশেষ পীড়া আমার পুত্রও ভোগ করেছে তার মায়ের থেকে দূরে থেকে, আর আমিও ভোগ করেছি পুত্রকে আলিঙ্গন করতে না পেরে”।

“কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন আত্ম। আজ মৃষু পূর্ণ হয়ে গেছে। আর তাকে তুমি বশও করতে পারবে না, আর তাকে হত্যা করার মত বল যে তোমার নেই, তা তো তুমি তার আসন আর অনন্য অবস্থাতেই জেনে গেছিলে। আর যেহেতু সে প্রস্তুত হয়ে গেছে, তাই তোমার সমস্ত ষড়যন্ত্রের পর্দা সে এমনিই উন্মোচন করতে সক্ষম। … তাই এই মা আজ নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে। তাঁর বাকি সন্তানদের কাছে তাঁর বার্তা পৌঁছে দেবার সন্তান আজ পূর্ণ ভাবে প্রস্তুতও হয়ে গেছে, আর সক্ষমও হয়ে গেছে”।

“আর শুধু তাই নয়, আমার পুত্র আজ এমন এক গোত্রের নির্মাণ করতে সক্রিয় হয়ে গেছে যে গোত্র তার কথাকে শ্রবণ করবে, আর শ্রবণ করার জন্য উদগ্রীব থাকবে। অর্থাৎ আমার মেধাকে মুক্ত করার পথও সে খুঁজে পেয়ে গেছে। অর্থাৎ তোমার থেকে আর কনো ভয় নেই এই মায়ের। … তাই ভুল করেও এই মায়ের সন্তানের গায়ে হাত দেবার প্রয়াসও করো না আত্ম। আজ এই মা সেদিনের মায়ের মত লাচার নেই। আজ সে নিশ্চিন্ত তাঁর সন্তানদের নিয়ে। আর তাই সে কনো প্রকার রেয়াত করবেনা”।

পরমাত্ম সেই কথা শুনে নিজের চারিপাশে দেখলেন। আর তা দেখে তার মনে হলো এই যে, কাল পর্যন্ত যেই সকল গণ তাঁকে ভয় পেতেন, তারা আজ তাকে যেন বিদ্রূপের নজরে দেখছেন। তাই আগ্রাসন ধারণ করে, পুনরায় সেই প্রকার খল ও হিংস্র হয়ে উঠলেন যেমনটা হিংস্র তিনি তখন হয়েছিলেন যখন মেধাকে টুকরো টুকরো করেছিলেন। বিশালাকায় রূপ ধারণ করে নিজের সর্বস্তর বিস্তার করলেন।

কিন্তু পরিবর্তে দেখলেন, মাতা এবার বিশালাকায় হতে আরম্ভ করেছেন। আর তাঁর বিশালাকায় রূপের যেন আদি অন্তই নেই। সমস্ত লোক ভেদ করে গেলেন তিনি, ঊর্ধ্বেও আর নিম্নেও। পরমাত্ম তাও সাহস করে আক্রমণ করতে গেলেন সরাসরি হীরাকে। তো মাতা, কনো কথা না বলে, সরাসরি নিজের দক্ষিণ করদ্বারা পরমাত্মকে ধারণ করে শূন্যে তুলে নিলেন, আর সরাসরি নিজের মুখগহ্বরে রেখে দিলেন পরমাত্মকে।

পরমাত্ম প্রাণের আকুতিতে ছটফট করতে থাকলেন। তাই মাতা নিজের মুখ বন্ধ করে নিলেন, আর দেবী পাবনি এসে মাতার মুখের গহ্বরের সম্মুখে উপস্থিত হলে, তাঁকেও ধারণ করে নিলেন মা, যাতে পরমাত্মকে উদর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারেন। এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে, সমস্ত সাধ, সমস্ত নিসাধ সকলে ভয়ার্ত হয়ে নিঃশব্দ হয়ে গেলেন। কয়লা নিজের বস্ত্রে প্রস্রাব করে ফেললেন।

কিন্তু তখনও হীরা বর্তমান। তাই কয়লা তখনও নিশ্চিন্ত। হীরাকে ঢাল করে সে ঠিকই বেঁচে যাবে। এখন তো পরমাত্মও নেই, তাই তার শ্রেষ্ঠত্বকে আর কেউ খণ্ডন করতে পারবেনা।

হীরাকে কয়লা হুংকার দিয়ে বললেন, “ভ্রাতা হীরা, আমার ঢাল হও। এবার মাতা আমাকে হত্যা করে দেবেন। তুমিই আমাকে বাঁচাতে পারো একমাত্র”।

মাতা সমানে নিজের আকৃতি ছোটো করতে থাকলেন এবার। অন্যদিকে হীরা কয়লার উদ্দেশ্যে বলতে থাকলেন, “ভ্রাতা, শ্রেষ্ঠত্বের ভ্রম থেকে মুক্ত হও এবার। … পরমাত্মের অভাবে কি হবে ভেবে দেখেছ? কিচ্ছু থাকবে না! কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু নয়। আমিও থাকবো না, তুমিও থাকবে না। একমাত্র সত্য হলো মাতা অর্থাৎ চেতনা। আর সমস্ত ভ্রমের বীজ ছিলেন আত্ম অর্থাৎ যাকে মাতা ভক্ষণ করে নিয়েছেন। পরমাত্ম না থাকলে, সমস্ত মেধা আবার ভ্রূণ অবস্থায় ফিরে যাবে। আর কনো ব্রহ্মাণ্ড থাকবেনা, কারণ আর কনো ভ্রম থাকবেনা”।

“আমিও থাকবো না আর তুমিও থাকবেনা, কারণ আমাদের অন্তরে মাতার ভ্রূণ অর্থাৎ মেধা তো থেকে যাবে, কিন্তু আমিত্ব অর্থাৎ আত্ম থাকবেনা, অর্থাৎ ভ্রমের আর কনো অস্তিত্বই থাকবেনা। তাই আমার এই আকৃতি কি করে থাকবে? জীবনমৃত্যু যে চেতনা আর আত্মের সংগ্রামের জন্য উপস্থিত,  যেখানে চেতনা সংগ্রাম করেন তাঁর ভ্রূণ মেধাকে চেতনাস্তরে প্রত্যাবর্তন করিয়ে জন্মমৃত্যুর এই ভ্রমচক্র থেকে চিরতরে মুক্ত করে দিতে, আর আত্ম সংগ্রাম করে, মেধাকে নিজের দাস করে রেখে চেতনার উপর নিজের অধিকার স্থাপন করতে”।

“তাই যখন আত্মই থাকবেনা, তখন এই সংগ্রামও থাকবে না, আর তখন আমি, তুমি কিছুই থাকবে না। কার উপর শ্রেষ্ঠ হবে তুমি তখন? … তাই এবার তো শ্রেষ্ঠত্বের বিচার ত্যাগ করো ভ্রাতা”।

কয়লা এবার ক্রুদ্ধ হয়ে হীরাকে হত্যা করতে এগিয়ে এসে বললেন, “যখন তুমি আমার ঢালই হবেনা, তখন তোমার অস্তিত্বের কনো প্রয়োজনই নেই!”

এই কথা বলে হীরাকে খড়গ দ্বারা আক্রমণ করতে এলে, এবার যেই আঘাত পরমাত্ম সহন করেছিলেন, সেই আঘাত কয়লার অঙ্গে এসে লাগলো। তবে মাতা পদাঘাত করেন নি। কেবলই একটিবার নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। আর তাতেই কয়লা ১০ যোজন দূরে ছিটকে পরে গেল।

তবে এবার হীরার ভাব ভিন্ন। সে এবার করজোড়ে নতজানু হয়ে বসে পড়লো আর বলল, “ভুল হয়ে গেছে মা। আর তোমার করুণাও অপার। তুমি জানো আমি ভুল করছি, আমি আমার প্রাণের মোহ করছি, আমার এই মিথ্যা দেহে থাকার কামনা করছি, এই দেহের প্রতি আসক্তি হয়ে রয়েছি। তারপরেও তুমি আমাকে একটিবারও শাসন করলে না, বরং আমাকে আমার ভ্রম আমার ভুলকে ধরিয়ে দিতে লীলা করলে!”

“বুঝে গেছি মা, পরমাত্মকে যে তুমি ভক্ষণ করে নিলে, এ তোমার লীলা, আমাকে শিক্ষা দেবার জন্য করা তোমার লীলা। আমার ভ্রম ভাঙানোর জন্য তোমার করা লীলা। … আমি বুঝে গেছি মা, দেহে থাকতে মুক্ত আমি তখনই হতাম যদি আমি মৃষু হতাম, কারণ মৃষুকে তুমি নির্মাণই করেছ সেই কারণে। তোমার মুখ হয়ে সে বিরাজ করবে, আর তোমার কথা সে বলবে সকল মেধাকে। মা, তোমার কথা বলার জন্য তার মুক্ত হওয়া আবশ্যক। আর তোমার সকল মেধাকে সেই মুক্তভাবই তো মুক্ত হবার কথা বলবে”।

“বাকি আমরা! মা, যতই মুক্তির ভাব ধারণ করে রাখি, যতক্ষণ না এই দেহ ত্যাগ করে তোমার মধ্যে চিরতরে নিজের আমিত্বকে নাশ করে লীন হবো, ততদিন মুক্তি নেই। … তাই মা, আমি আর আমার দেহের প্রতি আসক্ত নই। আমাকে মুক্ত করো। … আর মা, পরমাত্মকেও মুক্ত করো”।

মাতা হেসে বললেন, “পরমাত্মকে মুক্ত করতে কেন বলছো পুত্র, সেটাতো বলো আমাকে”।

হীরা বললেন, “মা, পরমাত্ম থাকলে তবেই তোমার আর আত্মের সংগ্রাম সচল থাকবে, আর সেই সংগ্রামই তো মেধাদের চেতনাস্বরূপে প্রত্যাবর্তন করানোর একমাত্র পুষ্টি। তাই মা, যদি আত্ম আর তোমার সংগ্রামই না হয়, তবে আমার বাকি ভ্রাতাভগিনীরা কি ভাবে তোমার সত্যতা জানবে? আত্মের সত্যতা জানবে? তোমাদের না জানলে যে, তারা নিজেদেরকে কখনোই চিনতে পারবেনা। না চিনতে পারলে, নিজেদের অন্তরের আমিত্বকে কখনোই ত্যাগ করতে পারবেনা! আর তোমাদেরকে যে জানার উপায়ই হলো তোমাদের সংগ্রামকে প্রত্যক্ষ করা। তাই মা, সেই সংগ্রামকে ফিরিয়ে আনতে, পরমাত্মকে মুক্ত করতেই হবে তোমায়”।

“করুণা করো মা, আমার বহু বহু ভ্রাতা ভগিনী এখনো ভ্রূণ অবস্থাতেই রয়েছেন। এই তো সবে মৃষু পূর্ণ হয়েছে, সে তোমার মুখ হবার উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। এই তো সবে মেধাদের তোমার কথা বলার সময় হয়েছে। যদি এই শুরুর কালেই সমস্ত কিছু শেষ হয়ে যায়, তবে এতকাল তোমরা মা-ছেলে যে অসীম বেদনা ধারণ করে সংগ্রাম করলে, সেই সংগ্রামই যে ব্যর্থ হয়ে যাবে!”

মাতা হেসে বললেন, “তুমি নামেও হীরা, কর্মেও হীরা পুত্র। গর্ব তুমি এই মায়ের। গর্ব তুমি তোমার ভ্রাতা মৃষুর। বীরকণ্ঠে সে বলে, হীরা মায়ের সাথে কনো অন্যায় হতে দেবেনা”।

হীরা হেসে বললেন, “মা, তিনি তো এও বলেন যে, যা কিছু তিনি তার কারণ তার মা। … সেই কথা যে বললে না! … এই কয়লা যে হীরা হয়েছে, তার কারণ যে তার মা”।

যখন হীরা এই সমস্ত কথা বলছিলেন, তখন কয়লা পুনরায় ফিরে এসে নিজের খড়গ দ্বারা হীরাকে প্রবল বেগে আঘাত করলে, হীরার প্রাণ তার মুখের দ্বারে চলে আসে। মাতা সেই দৃশ্য দেখে, প্রবল বেগে হীরাকে নিজের বামহস্ত দ্বারা তুলে নিয়ে এসে নিজের বক্ষ মাঝে এমন ভাবে রাখলেন যাতে তার প্রাণ নির্গত হতে না পারে। আর ক্রোধে বিস্ফোরণ সৃষ্টি করে, নিজের অঙ্গ থেকে প্রকাণ্ড অগ্নুৎপাত করে, ধূম্র নির্গত করে, একটি প্রকাণ্ড চিৎকার করলেন, আর সেই চিৎকারের তরঙ্গে কয়লার সমস্ত দেহের সমস্ত মাস, সমস্ত শিরা, সমস্ত হাড় ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে সে তৎক্ষণাৎ পিশাচে পরিণত হয়ে যায়।

মাতা হন্তদন্ত হয়ে হীরার দিকে তাকালেন। হীরা অন্তিম শ্বাস ধরে রেখে বললেন, “এর থেকে আর অধিক আনন্দের কি হতে পারে মা? মায়ের কোলে বসে, মায়ের বুকে মাথা রেখে, মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রাণ ত্যাগ করছি। এর থেকে আর অধিক আনন্দের কি হতে পারে, মৃত্যুর অন্তিম মুহূর্তে আমার মায়ের মুখে প্রবল প্রেম দেখছি। আর কনো ইচ্ছা নেই মা নিজেকে হীরা বলার। আর আমার আমিত্বের কনো প্রয়োজন নেই। … অস্বস্তি লাগছে এবার আমার আমি’র থেকে। আমি মানেই আবার এই কোল থেকে নেমে যেতে হবে, আবার তোমার মুখ ছাড়া চরণে দৃষ্টি রাখতে হবে, আবার তোমার নিশ্বাসের সুগন্ধ ছাড়া অন্য সুগন্ধকে গ্রহণ করতে হবে, আবার তোমার বক্ষের উষ্মা ছাড়া অন্য স্থানে উষ্মার সন্ধান করতে হবে। আর না মা, আর আমার আমিকে আমার মধ্যে প্রবেশ করতে দিও না। মুক্তি দাও মা আমায়। লীন করে নাও মা আমাকে তোমার মধ্যে”।

মাতা হীরার মস্তককে নিজের বক্ষে স্থাপন করে তাঁর মস্তকে হাতবুলিয়ে স্নেহ দিতে থাকলেন। হীরা নিজের আমিত্ব পূর্ণ ভাবে ত্যাগ করে, মাতার মধ্যে লীন হয়ে গেলেন চিরতরে। মৃষু সেই দেখে নিজের আঁখির জল মুছলেন। সবে তিনি নিজের স্ত্রীকে এনে বারুদার বনে রেখে হাতমুখ ধুয়েছিলেন। হর্ষিতা মৃষুর নেত্রে অশ্রু দেখে ব্যকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন, “কি হয়েছে সখা?”

মৃষু মৃদু হাস্যে বললেন, “হীরা মুক্ত হয়ে মায়ের মধ্যে লীন হয়ে গেল। বিদেশ ছেড়ে সে নিজের গৃহে ফিরে এলো। গর্ব হচ্ছে তার জন্য। বেদনা হচ্ছে যে তার মুখ থেকে আর মায়ের নাম শুনতে পাবো না বলে”।

হর্ষিতা একটি কথাও বলতে পারলেন না। শুধুই মৃষুর দিকে তাকিয়ে রইলেন আর মনে মনে বললেন, “কতটা ভালো বাসে মা’কে এঁরা! অন্য কেউ মায়ের নাম পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে নিলেও এঁরা আনন্দ পায়! … শুদ্ধতা বোধহয় একেই বলে”।

হীরার মুক্তির পর। মাতা এবার বমন করলেন আর তাঁর বমন থেকে পরমাত্ম মুক্ত হলে, মাতা স্পষ্ট ভাবে বললেন, “সতর্ক হয়ে যাও আত্ম। হীরার শেষ ইচ্ছার জন্য তোমাকে মুক্ত করেছি। … সতর্ক না হলে, এবার তোমার সমূল বিনাশ অপেক্ষা করছে আমার হাতে”।

কিন্তু মাতার সেই কথা যেন পরমাত্ম শুনতেই পেলো না। তার মন যে মৃষুর উপর প্রতিকার নেবার জন্য উৎসুক। সাধপাল থাকলে এই সমস্ত কিছু হতই না। এমন ভাবে অপমানিতও হতে হতো না তাকে। মৃষু সেই সাধপালের বিনাশ করেছে। তাই এর দণ্ড মৃষুকে দিতেই হবে। নিজের ধামে প্রত্যাবর্তন করে হুংকার ছেড়ে সে বলে উঠলো, “আমি এখনও ব্রহ্মাণ্ডের বিধাতা। আমিই বিধানদাতা। বিধাতার প্রিয়পুত্রকে হত্যা করার অপরাধের শাস্তি তো মৃষুকে পেতেই হবে”।

এই বিচার করে, পরমাত্ম উপস্থিত হলেন বারুদার বনে। কিন্তু সেখানে প্রবেশ করতে পারলেন না তিনি। হুংকার ছেড়ে বারুদার উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, “এ কেমন অভদ্রতা বারুদা? তুমি স্বয়ং ভগবানকে তোমার বনে প্রবেশ করতে দিচ্ছ না!”

বারুদা সেই হুংকারের কারণে নিজের বনের ছেত্রের সীমান্তে উপস্থিত হয়ে শান্ত ভাবে বললেন, “স্বঘোষিত ভগবান শয়তানের সমান হয়, আশা করি এই তথ্য আপনিও জানেন পরমাত্ম। তাই আপনি যে শয়তান, তার প্রমাণ দয়া করে দেবার প্রয়োজন মনে করবেন না”।

পরমাত্ম সেই কথাতে উত্তেজিত হয়ে গিয়ে নিজের বলকে অগ্নিগলার ন্যায় প্রেরণ করলেন বারুদার বনে। কিন্তু সেই অগ্নি বারুদার বনের উপরিতলের বায়ুতেই বিলীন হয়ে গেলে, বারুদা পুনরায় বললেন, “দেখে নিলেন তো পরমাত্ম, আপনি কেমন ভগবান! আপনি যদি সত্য অর্থে ভগবান হতেন, তাহলে কনো বরদান, কনো অভিশাপই আপনাকে আটকাতে পারতো না, যদি না আপনি স্বেচ্ছায় সেই বরদান বা অভিশাপের রক্ষা করতে চাইতেন। কিন্তু দেখুন, আপনার বল মাতার প্রদান করা বরদানের কবচকে ভেদ করতেই পারলো না। আরো কি প্রমাণ লাগবে আপনার, এই মানতে যে আপনি শয়তান হন বা না হন, ভগবান কিছুতেই নন?”

উত্তেজিত পরমাত্ম বারুদার সেই কথাতে বিচলিত হয়ে, বারংবার আঘাত করতে থাকলেন বারুদাবনকে। কিন্তু প্রতিবারই সেই আঘাত নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কিন্তু নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলেও, বারুদাবনকে তা কনো ভাবেই আঘাত করতে না পারলেও, কনো ভাবেই প্রভাবিত করতে না পারলেও, তার পারিপার্শ্বিক প্রকৃতিকে উত্তপ্ত করতে থাকলো পরমাত্মের নিক্ষেপ করা অস্ত্রসমূহ।

সেই দেখে মৃষু এবার বারুদাবনের বাইরে বেড়িয়ে এলেন। এসে কটুভাবে বললেন, “আপনার সমস্যা তো আমাকে নিয়ে। তাই না? নিন, আমি আপনার সম্মুখে উপস্থিত। বারুদা বনের সীমারেখার বাইরে আমি স্থিত। কি করতে চান এবার করুন”।

পরমাত্ম হুংকার ছেড়ে বললেন, “মৃষু, বাচাল জীব তুমি। আমাকে বন্দী করার সাহস দেখিয়েছিলে তুমি। স্বয়ং বিধাতাকে বন্দী করার সাহস দেখিয়েছিলে। … আর তো আর, আমার প্রিয়পুত্র সাধপালকে মৃত্যু দিয়েছ তুমি। স্বয়ং বিধাতার প্রিয়পুত্রকে হত্যা করার সাহস দেখিয়ছো তুমি। কি ভেবেছ, এই সমস্ত কিছু করেও তুমি পার পেয়ে যাবে?”

মৃষু একটি ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হেসে বললেন, “বিধাতা! সন্তান হত্যা! … আপনার মত পাতকের মুখে এই সমস্ত কথা শুনে আপনার নিজের অবাক লাগছে না! … বিধানদাতা স্বয়ং ব্রহ্মময়ীর সন্তানকে আঘাত করেছিলেন, আর সেই আঘাত দ্বারা সন্তানও নয়, ভ্রূণের হত্যা করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন, যার ফলে আজ এতো এতো মেধা, অর্থাৎ মায়ের ভ্রূণের অংশদের নিয়ে ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ করেছেন আপনি। … লজ্জা সরম সমস্ত কিছুর জলাঞ্জলি দিয়েছেন?”

“যেই ভ্রূণদের উপর নিজের অধিকার স্থাপনের ব্যর্থ প্রয়াসকে আপনি ব্রহ্মাণ্ড বলেন, সেই ব্রহ্মাণ্ডের, সেই ব্যর্থ প্রয়াসের বিধাতা বলেন নিজেকে! … তা মহাশয় বিধাতা? আপনিই তো আপনার সাধের পুত্র, সাধপাল জিতেশকে বরদান দিয়েছিলেন যে, আপনার ও ব্রহ্মময়ীর সন্তানের হাতে তার নিধন হবে। … তা সেই বিধানদাতার বিধানের বিরোধিতা স্বয়ং বিধাতা কি করে করলেন, সাধপালকে মৃষুর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য তাঁকে আক্রমণ করে?”

“সেই বিধানদাতার বিধান অনুসারেই তো সাধপালের দমন হয়েছে পরমাত্ম আর ব্রহ্মময়ীর সন্তান মৃষুর হাতে। তা বিধানদাতার বিধানের পালনের পরেও বিধাতা কি করে সেই কাজে আপত্তি জানায়? … যা করতে এসেছেন, নিজের অধিকার ফলাতে এসেছেন, ফলিয়ে নিন। অর্বাচীন আপনি চিরকালই ছিলেন, আর থাকবেনও। শয়তান আপনি চিরকাল ছিলেন, আর থাকবেনও। মিথ্যাচারী আপনি চিরকাল ছিলেন, আর থাকবেনও। … অহংকারী তো আপনি বটেই, কারণ সমস্ত আত্মভাবের সঞ্চারই তো আপনার থেকে হয়”।

“কিন্তু স্মরণ রাখবেন, যার দয়ায় আপনি বিধাতা সেজে রয়েছেন, তিনি আপনার একটি এমন মিথ্যাচারের অপেক্ষাই করছেন, যেখানে আপনার দেওয়া বিধানের বিরোধিতা আপনি স্বয়ং করবেন। তাই যা করতে এসেছেন, তা করুন, কিন্তু স্মরণ রাখবেন আমার কথা। আপনার বিধাতা হবার অন্তিম ক্ষণের সূচনা আপনি সেই মুহূর্তে করে দেবেন, যেই মুহূর্তে আপনি যা করতে এসেছেন, তা করবেন। … এটা জেনে, সম্পূর্ণ ভাবে সচেতন ভাবে নিজের বিধানের বিরোধিতা নিজেই করুন”।

পরমাত্ম সেই কথাতে অতিশয় ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে হুংকার ছেড়ে বললেন, “বাচাল ছেলে, বাপের মুখের উপর কথা বলতে দুইবার ভাবনা আসেনা তোর?”

মৃষু ব্যঙ্গাত্মক হেসে বললেন, “বাপ! …” অট্টহাসি হেসে বললেন, “হ্যাঁ, খাতায় কলমে, মানে সাধপালকে হত্যা করার জন্য আপনি তো আমার বাপই ছিলেন। সেই বাপ আপনি যে, কামনায় অস্থির হয়ে নিজের বীর্যকে মলের মত ত্যাগ করে আমার বাপ। সেই বাপ আপনি যে সন্তান যাতে জন্ম না নিতে পারে, তার কারণে সাধপালকে দিয়ে ষড়যন্ত্র করা তার পিতৃব্যভাব। সেই বাপ আপনি যে তার সন্তানকে সাধপালকে দিয়ে সাতটুকরে খণ্ডন করিয়ে হত্যা করতে চায়। আপনি তো সেই জগতখ্যাত বাপ যে, তার সাত টুকরে বিভাজিত সন্তান পুনরায় জীবন্ত হয়ে উঠছে জেনে, তার আসন নামক একটি কলাকে নাশ করতে প্রগল ছিলো। সেই বাপ আপনি, সেই মহানতম বাপ যে অনন্যরূপে তাঁর সাতটুকরে বিভাজিত সন্তানের বিনাশ নিজে হাতে করতে, স্বয়ং করি, করিজ আর ধার হয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই বাপ আপনি যে, সাধের পুত্র সাধপালকে যার হাতে মৃত্যুর বিধান দিয়েছেন, তাকে আটকে নিজের দেওয়া বিধানের খণ্ডন করে তার সাথে যুদ্ধে রত হয়েছিলেন। সত্যিই ভাগ্য করে এমন বাপ পেতে হয় কারুকে”।

পরমাত্ম ক্রোধে ফেটে পরে বললেন, “আজ যখন তোমার বিনাশ সম্মুখে উপস্থিত, তখন ভীত হয়ে এই সমস্ত বাচালের মত প্রলাপ করছো মূর্খ বালক মৃষু?”

মৃষু পুনরায় ব্যঙ্গাত্মক ভাবে হেসে বললেন, “একটু ভালো করে দেখুন হে পরম শয়তান, এই যে বারুদা বন, এটি আপনার ব্রহ্মাণ্ডের থেকে মুক্ত। এই ব্রহ্মাণ্ডের আর এই ব্রহ্মাণ্ডের একটি কণাতেও আপনি বিধাতা নন। এই ব্রহ্মাণ্ডের বিধাতা আপনি ননও, আর তাই এই ব্রহ্মাণ্ডের একটি অধিবাসীর উপরেও আপনার কনো অধিকার নেই। … তাই যাতে আপনি আপনার কালকে নিমন্ত্রণ দিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে আমি আপনার অধিকার ছেত্রের বাইরে যেই ব্রহ্মাণ্ড স্থিত, তার থেকে বেড়িয়ে এসে আপনার সামনে উপস্থিত”।

“দুর্ভাগ্য হলেও, এটিই সত্য যে আমি আপনার বীর্যজাত পুত্র। আর তাই আপনার আমার উপর কনো অধিকার না থাকলেও, একটি অধিকার থেকেই যায়। আর আমি সেই কারণেই আপনার সামনে আজ উপস্থিত। এই অন্তিমবার আপনি আমার উপর অধিকার প্রয়োগ করবেন। কারণ আজ আমার উদ্দেশ্যে যেই ঘাত আপনি করবেন, আমি তার কনো বিরোধ করবো না। এই কারণে করবো না, কারণ আপনার এই প্রয়াসই হবে আপনার বিধাতা রূপের অন্তিম প্রহার। আপনার প্রহার আমার উপর ক্রিয়া করলেও তা হবে আমার কাছে আপনার বিধাতা বেশের অন্ত, আর না করলেও একই ভাবে আপনার বিধাতা বেশের অন্ত হবে। কারণ আপনার এই আঘাতের প্রয়াসের পর, আপনার আমার উপর আর কনো অধিকার অবশিষ্ট থাকবেনা”।

“আজ এই মুহূর্তে আপনি যেই প্রহার করবেন আমার উপর, তারপর থেকে আমি সম্পূর্ণ ভাবে মুক্ত আপনার থেকে। এই মুহূর্তের পর থেকে, আপনার আর আমার একটিই সম্পর্ক। আমরা চিরশত্রু। … অর্থাৎ, আজকের পর আর আপনাকে বন্দী করবো না, আপনার জীবনকে মৃত্যুতে পরিবর্তন করে দেব। … কিন্তু এখন তা করতে পারিনা, কারণ আপনি আমার যেই ভাবেই হোক বাপ। আর বাপ হয়ে আমার সাথে ষড়যন্ত্র করলেও, সরাসরি সর্ব সমক্ষে আপনি আমাকে শত্রু বলে গণ্য করেন নি। তাই আমি আপনাকে সর্বসমক্ষে শত্রু বলে চিহ্নিত করতে পারিনা। এই শিক্ষা আমার মা আমাকে দেন নি”।

“আর যাতে তা দিতে পারি, যাতে সর্বসমক্ষে আপনাকে আমার চিরশত্রু বলে ঘোষণা করতে পারি, তার জন্যই আজ আপনার যেই ব্রহ্মাণ্ডের উপর কনো অধিকার নেই, তার থেকে বেড়িয়ে এসে আপনার ঘাত সহন করতে আপনার সম্মুখে উপস্থিত। করুন প্রহার, আর আমার সামনে যেই প্রতিবন্ধিকতা রয়েছে আপনাকে চিরশত্রু বলে গণ্য করার, তার নাশ করুন”।

এই কথা শুনে পরমাত্ম অট্টহাস্য হেসে উঠে বললেন, “ভালোই করলি, আমাকে এই সমস্ত কথা বলে দিলি তুই। আসলে তুই একটা মূর্খ। শত্রু, চিরশত্রু বলে যাকে গণ্য করিস, তাকে কখনো সমস্ত গুপ্ত কথা বলতে নেই। এই শিক্ষা তোর মা তোকে দেয় নি! … যাক, যা তোর মা দেয়নি, সেই দায় নিশ্চয়ই তুই আমার উপর চাপাবিনা। … আমি তোকে এবার এমন আঘাত করবো, যাতে তুই আমার সাথে আর কনোদিন শত্রুতা করতেই না পারিস। … আমার এই আঘাত সহন করবি, তাই তো? এই তো তোর অঙ্গিকার?”

“বেশ, আমার এই আঘাতের ফল কি হবে তা আগেই বলে দিচ্ছি। … নিজের বিনাশকে নিজে জেনে নে আগে থেকে। আমার এই আঘাতের ফলে তোর পূর্ণ ভাবে পুনর্জন্ম হবে। পূর্ণ ভাবে পুনর্জন্ম বুঝিস? কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু স্মরণ থাকবে না তোর। না তোর বল স্মরণ থাকবে, না তোর অস্তিত্ব স্মরণ থাকবে। আর না কিচ্ছু। সামান্য মানুষ হয়ে যাবি তুই। অতি সামান্য মানুষ”।

মৃষু হেসে বললেন, “মূর্খ। … নিজেকে কর্তা জ্ঞান করেন আপনি? এখনো নিজের মূর্খতা ত্যাগ করতে পারলেন না! পূর্ণ পুনর্জন্ম। সমস্ত কিছু ভুলে যাবো। … আমার মা আমাকে পূর্বেও সেই অবস্থা থেকে এই অবস্থাতে নিয়ে এসেছেন, আর আবারও আসবেন। … যা আমি বলেছি, তাও আমার মায়েরই বচন, আমি মাত্রই তাঁর কথার মুখ। আর আপনিও যা বললেন এক্ষণে, তাও তাঁরই কথা, আপনি কেবলই তাঁর কথার মুখ”।

পরমাত্ম হেসে উঠে বললেন, “আর সেই কাজ তোর মা’কে করতে ১৫ হাজার জাগতিক বছর লেগেছে। তাই আবার করে তাঁকে ১৫ হাজার বছর তোর পিছনে দিতে হবে”। অট্টহাস্য প্রদান করে আবার বললেন পরমাত্ম, “প্রস্তুত হয়ে যা, আমার এই মহা আঘাত সহ্য করার জন্য”।

এতো বলে, এক বিকট রশ্মি ক্ষেপণ করলেন পরমাত্ম মৃষুর দিকে। সেই রশ্মি ক্ষেপণ করে উগ্র হাস্য হেসে পরমাত্ম গর্জন করে উঠলেন, “যা, তোর মায়ের এতদিনের সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থ করে দিলাম। তোর এতো পরিশ্রমকে এক নিমেষে ব্যর্থ করে দিলাম। তোর এই জন্ম সমেত সমস্ত সমস্ত জন্মকে ব্যর্থ করে দিলাম, এক মুহূর্তে নষ্ট করে দিলাম”।

দেবী ধরিত্রী, দেবী মৃত্তিকা, দেবী বারুদা, হর্ষিতা, সুগন্ধা সহ, সমস্ত যক্ষস্ত্রী ও তাঁদের নির্বাচিত একটি একটি করে পুরুষ যারা তাঁদের স্বামী হবার জন্য প্রস্তুত, সকলে আর্তনাদ করে উঠলেন, “এ কি হয়ে গেল? মাতা? মাতা কিছু করুন। কৃপা করুন মৃষুর উপর!”

পরমাত্ম সেই আর্তনাদে অধিক অধিক বিকট ভাবে অট্টহাস্য প্রদান করলে, যখন সেই রশ্মি মৃষুর হৃদয়কে সবে মাত্র ভেদ করবে, সেই অবস্থায় পরমাত্ম সহ সকলে দেখলেন, মৃষুর সম্মুখে এসে উপস্থিত হলেন দেবী অম্বিকা, এবং সেই রশ্মি গ্রহণ করে নিলেন।

এই ঘটনাতে সকলে হতচকিত হয়ে গেলে, দেবী অম্বিকা মিষ্ট তথা মৃদু হাস্য হেসে বললেন, “আমার পুত্র আগেই ঘোষণা করে দিয়েছিল যে, আপনার অস্ত্র তাঁকে আঘাত করলেও, আর না করলেও, আপনার সমস্ত দায় তার উপর থেকে চিরকালের জন্য সরে যাবে। তাই আপনি যেই মুহূর্তে আপনার অস্ত্রকে আপনার হাত থেকে মুক্ত করেছেন, সেই মুহূর্তেই আমার পুত্রের সাথে আপনার সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ হয়ে গেছিল”।

“কিন্তু সম্পর্ক শেষ হয়েও হতো না, কারণ তার মা যে আপনার বিবাহিত পত্নী হয়েই থেকে যেত। তাই পূর্ণ ভাবে আপনার সাথে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করা আবশ্যক ছিল, আর তা তখনই সম্ভব হতো যখন আমি আমার এই রূপ ত্যাগ করে, মনুষ্য হয়ে জন্ম নেব। … তাই আপনার এই অস্ত্র আমি গ্রহণ করলাম। মানবরূপে মৃষু নয়, আমি জন্ম গ্রহণ করবো। আমি এতকাল শুধুই কারণ ও সূক্ষ্ম রূপে বিরাজ করতে পারতাম, স্থূল রূপে বিরাজ করতে পারতাম না। তাই আমি সরাসরি আমার সন্তানদের সাথে কথা বলতে পারতাম না”।

“কিন্তু এবার মানবরূপে জন্ম নিয়ে, আমি স্থূলরূপে থাকবো। আমার পুত্র মৃষু যে সর্বজ্ঞাতা। মহগণপতি সে। তাই সে তো আমাকে অনায়সে প্রজ্ঞা প্রদান করে, আমাকে যথাযথ মার্গদর্শন প্রদান করে আমাকে আমার স্বরূপে ঠিকই পৌঁছে দেবে। সে তো আমার মত কেবল কারণ আর সূক্ষ্মেই বিরাজমান নয়। সে তো স্থূলবেশেও স্থিত। তাই যদি এই রশ্মি তাকে আঘাত করতো, ঠিকই বলেছিলে পরমাত্ম, আমাকে আর মৃষুকে পুনরায় ১৫ হাজার সাল ধরে প্রয়াস করতে হতো”।

“কিন্তু আমি আসবো স্থূল বেশে, আর আমার পুত্র যে আমার সেই রূপের পিতা হবে, সে ইতিমধ্যেই স্থূল বেশে বিরাজমান। তাই অনায়সেই সে আমাকে আমার স্বরূপে নিয়ে চলে আসবে। আর তারপরটা তো মৃষু তোমাকে ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছে। মাতা ও পুত্রের এবার তোমাকে বিধাতার আসন থেকে টেনে নামিয়ে আনবে। তোমার দিন শেষ। নিজের অন্তিম প্রহর গণনা করা শুরু করে দাও। বিধাতা হয়েই বিধাতার বিধানকে খণ্ডন করার অপরাধ তোমাকে এবার ভোগ করতেই হবে। প্রস্তুত হয়ে যাও”।

“আর তোমার কাছে নতুন করে কনো ষড়যন্ত্র করার উপায় নেই। তোমার ত্রিগুণের একত্রিত রূপকে চিরতরে জমাট করে দেবার জন্য, আমি তোমাকে আগেই ভক্ষণ করেছিলাম। তাই তুমি আর তোমার ত্রিগুণকে নিজের থেকে পৃথক করতে পারবেনা। অর্থাৎ তুমি আর নূতন করে কারুর জন্ম দিতে পারবেনা। … সংহার আর ইচ্ছাধারীকে দিয়ে যা ষড়যন্ত্র করার করে নিয়েছ তুমি। … স্মরণ করে নাও, তাদের কি বরদান দিয়েছি আমি? একজনকে কুমারী কন্যা বেশে নাশ করবো, আর অন্যজনকে কুমারী স্ত্রী বেশে। … আর আমি তোমার বিবাহিতা স্ত্রীবেশ থেকে মুক্ত হয়ে যাচ্ছি”।

মৃষু হেসে বললেন, “ভুলে গেছেন পরমাত্ম, অহংকারে চূড় হয়ে সমস্ত কিছু ভুলে গেছেন। ভুলে গেছেন যে, আপনি কেবলই আপনার নির্মাণ করা ভ্রমব্রহ্মাণ্ডের বিধাতা, ঈশ্বর নন আপনি। … আর ইনি, আমার মা? স্বয়ং পরমেশ্বরী, নিরাকারা ব্রহ্মময়ী আল্লাহ তিনি। সমস্ত প্রকৃতি তিনি, পরাপ্রকৃতি তিনি। তিনি স্বয়ং চেতনা, সমস্ত রুহ তিনি, পরাচেতনা তিনি”।

“আপনি কি ভেবেছিলেন? সংহার আর ইচ্ছাধারীর কুল অমর হয়ে গেল, কারণ তাঁরা কুমারীর হাতে মৃত্যুর বরদান পেয়েছে? আপনি কি ভেবেছিলেন? তিনি উগ্র হয়ে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন!” অট্টহাস্য হেসে মৃষু বললেন, “পরব্রহ্ম তিনি। সমস্ত অবস্থাতেই তিনি নিরাকারা, পরাশূন্য। ভুল করেও তিনি ভুল করতে পারেন না। … কি করে বাঁচাবেন এবার আপনার সাধকুলকে? কি করে বাঁচাবেন এবার আপনি নিজেকে? বিনাশের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান”।

মাতা অম্বিকা এবার ক্রমশ সূক্ষ্ম হতে থাকলেন, আরো সূক্ষ্ম হলে তিনি কারণ রূপে পরিণত হয়ে গেলেন, আর শেষে মৃষুর উদ্দেশ্যে বললেন, “আমাকে আলিঙ্গন দাও পুত্র। তোমার স্নেহ আলিঙ্গন গ্রহণ করে আমি তোমার পত্নীর গর্ভে প্রবেশ করবো। তোমার সন্তান হয়ে, তোমার কোলেপীঠে আমি বড় হবো। আর আমি তোমার মা নই, তুমি আমার পিতা”।

মৃষু আলিঙ্গন প্রদান করে বললেন, “তুমি সমস্ত বেশেই আমার মা। তোমারই অংশরূপ আমার স্ত্রী, সেও আমার এক স্নেহময়ী মা; তোমারই এক অংশরূপ আমার দিদি, দেবী বারুদা, আর তাই তিনিও আমার মা; তোমারই এক অংশরূপ দেবী হর্ষিতা হয়ে আমার সখী, আর তাই সেও আমার মা। আর তুমি স্বয়ং আমার কন্যা হয়ে আমার মা। … জননী কি শুধু তিনি, যিনি দেহ দেন? যারা যারা স্নেহদেন, তারা সকলেই তো জননী। যারা যারা স্নেহের মধ্যে দিয়ে সুরক্ষা, শাসন, সুশিক্ষা প্রদান করেন, তারা সকলেই তো তোমার রূপ। তাই মা, স্ত্রী, সখী, দিদি, কন্যা, সকলেই তো আসলে জননী। শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, সকলের ক্ষেত্রেই তা সত্যি। … তাই মা, তুমি আমার কন্যা বেশে জননীই হয়ে থাকবে। সকলের মা, সর্বাম্বা হবে তোমার নাম”।

“কন্যাকে মা বললে শাসন করতে পারবো না। তবে মা’কে মা না বলে থাকতেও পারবো না। তাই তোমাকে আমি সর্বাম্বা, অর্থাৎ সবার, সকলের মা বলেই ডাকবো”।

মাতা ক্রমশ কারণ থেকে পরাশূন্য হয়ে গেলে, মাকে ধারণ করে মৃষু সমাধিস্থ হয়ে গেলেন। আর তারপর ক্রমশ তাঁর সমাধি থেকে প্রত্যাবর্তন হতে থাকলো, আর মাতা সমানে কারণ দেহে ফিরে এলেন, এবং দেবী ধরিত্রীর গর্ভে স্থান গ্রহণ করে নিলেন। পরমাত্ম সমস্ত কিছু দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। সময় নষ্ট না করে, এবার তিনি সরাসরি ইচ্ছাধারীর কাছে চলে গেলেন। ইচ্ছাধারীর কাছে বরদান আছে, শুধু সে নয়, তার সেনার সকলেই তারই বরদানের অধিকারী হবে। তাই যা করার সেখানেই করতে হবে। অন্যদিকে মৃষু সহ সকলে বারুদাবনে নিবাস করতে থাকলে, অন্তে সেই দিন এসে গেল যখন মাতা জন্ম গ্রহণ করবেন দেবী ধরিত্রীর গর্ভ থেকে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22