আদি কৃতান্ত – প্রকৃত ঈশ্বরকথা

মাতা ক্রুদ্ধ হয়ে যখন প্রচণ্ড গতিতে হীরার দিকে এগিয়ে যেতে থাকলেন, তখন সমস্ত ধরিত্রী মুহুর্মুহু কম্পমান হওয়া শুরু করলো। মুহুর্মুহু ত্রিভুবন কম্পনে আক্রান্ত হতে শুরু করলো। সাগর উত্তাল হয়ে উঠে, মুহুর্মুহু গহন ঘূর্ণির রচনা করে করে ভূমিতে আছরে পরা শুরু করতে থাকলো। দিকে দিকে মানব ভাবা শুরু করে দিলো যে, ধরিত্রীর অন্তিম দিন বোধ হয় এসে গেছে। কিন্তু আত্মের প্রভাবে মূর্খে পরিণত মনুষ্য যোনি ভুলে গেছিল সেইদিন যে, ৮৪ লক্ষ যোনির মধ্যে তারা মাত্রই একটি যোনি।

তাদের মূর্খতার দায়ভার সমস্ত যোনি বা ধরিত্রী কেউই গ্রহণ করবেনা। যদি আত্মের প্রভাবে মূর্খ না হয়ে থাকতো মনুষ্য, তাহলে নিশ্চিত ভাবে সেদিন বুঝে যেত যে, বিনাশকাল অবশ্যই ঘনিয়ে আসছে, তবে সেটা ধরিত্রীর নয়, ধরিত্রীর বুকে বিরাজমান সমস্ত ৮৪ লক্ষ যোনির নয়, কেবলই তাদের। মনুষ্য যোনি তাহলে সেদিন নিশ্চিতই বুঝতে পারতো যে, তাদের মূর্খতার কারণে, তাদেরর আত্মপ্রেমের কারণে, তাদের আত্মতুষ্টির প্রতি নিষ্ঠার কারণে, তারা যে তন্ত্র, মন্ত্র ও যন্ত্র ধারণ করে মুদ্রাসর্বস্বতা ধারণ করে রেখে, পারমানবিক অস্ত্রের বড়াই করে চলেছে, যন্ত্রের জাঁতাকলের বড়াই করে চলেছে, আর তাই দিয়ে ধরিত্রী সহ ধরিত্রীর বুকে বিরাজমান সমস্ত ৮৪ লক্ষ যোনির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারময় করে রেখে দিয়েছে, তারই কারণে তাদের বিনাশ কাল ঘনিয়ে আসছে।

যদি সেদিনও এই সত্য মনুষ্যযোনি বুঝতো, তাহলে নিশ্চিত ভাবে তাদের কন্দমদের মত, এই ভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হতো না। বোঝেনি তারা। আত্ম-আরাধনায় মশগুল মনুষ্য যোনি বোঝেনি। আর তাই শীঘ্রই সেই সঞ্চিত জীবাণু মনুষ্য যোনির বুকে আছড়ে পড়লো, যাকে স্বয়ং পরাপ্রকৃতিই নির্মাণ করে রেখেছিলেন, মনুষ্য যোনির বিনাশের জন্য।

হ্যাঁ, সেইদিনই, সেই মুহূর্তেই নির্মাণ করেছিলেন পরাপ্রকৃতি এই ভয়ঙ্কর জীবাণুকে, যেদিন মানুষ প্রথম এই পরমানবিক অস্ত্র, অর্থাৎ রমনাস্ত্র প্রয়োগ করেছিল যুদ্ধে। আর তা নির্মাণ করেছিলেন প্রকৃতি পরমানবিক বোমার অর্থাৎ রমনাস্ত্রের থেকে উদ্ভূত বিষাক্ত ধুয়ার থেকেই। তবে, যেমন প্রতিটি যোনি তাঁর সন্তান, তেমন মনুষ্যও। তাই তিনি সময় দিয়েছিলেন মনুষ্য যোনিকে যাতে তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে আর আত্মপ্রেম থেকে সরে এসে প্রকৃতি তথা সমস্ত যোনির বিনাশী এই রমনাস্ত্রকে চিরবিদায় দেয়।

কিন্তু যখন তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে পরমাত্মের প্রেমে মোহিত হয়ে রয়েছে মনুষ্য, আর মোহিত হয়ে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গিয়ে, শুধুই যন্ত্র, মন্ত্র আর তন্ত্রের উপাসনা করে করে, এই ভ্রমজগতেই আবদ্ধ করে রেখে সাধকুলসম করে নিয়েছে নিজেদেরকে, তখন তাঁর এই বীভৎস রূপ ক্রমশ আরো বীভৎস হতে থাকলো। আর তাই সেই রূপের কারণে, ধরিত্রীতে যেই স্পন্দন অনুঘটিত হতে থাকলো, তা সেই অঞ্চলের সেই তুষার, যার দ্বারা মানবযোনিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জীবাণুকে তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন, তাও গলতে শুরু করে দেয়।

তবে না মনুষ্য যোনির সেই সম্বন্ধে কনো ধারণা ছিলো, আর না স্বয়ং পরমাত্মের। পরমাত্মের তিন গুণ, রমনাথ, পীতাম্বর ও শ্বেতাম্বর তো এই ভেবে গেলেন কেবল যে হীরার কারণে দেবী সর্বাম্বা যিনি স্বয়ং ব্রহ্মময়ী তিনি কুপিত হচ্ছেন। কিন্তু বারবার মৃষু যেই কথা বলতো, মাতা ভুল করেও ভুল করেন না, তাঁর লীলা বোঝা অসম্ভব, সেই কথাকে আত্মসর্বস্বতার কারণেই তাঁরা বুঝতেও পারলেন না, ঠিক যেমন তাঁদের অনুগামী হয়ে থাকা পরিবর্তিত মনুষ্যযোনিও বুঝতে পারলেন না।

মাতার কোপ অবশ্যই হীরার কারণে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ক্রমশ তিনি গোলাপপুষ্প বর্ণ থেকে রক্তিম ও কালিকা হতে থাকলেন। কিন্তু সেই সমস্ত কিছুর পশ্চাতে যে সেই তুষার গলানোও ছিলো! সেই সমস্ত কিছুর পিছনে যে সেই জীবাণু যার নির্মাণই করা হয়েছিল মনুষ্যযোনিকে অবলুপ্ত করে দেওয়ার জন্য, তাকে পুনরায় জাগ্রত করে দেবার জন্য। তবে সেই কথা কেউ জানতেও পারলেন না। … সত্যই মাতা ভুল করেও ভুল করেন না।

কিন্তু সেই ক্ষণে সংহার, আর বারুদাকে বরদান দেবার কথা বিচার করে, ত্রিমূর্তিসহ সমস্ত সাধকুল এটাই ভেবে চলেছিলেন যে, মাতা ভয়ঙ্কর ভুল করছেন। সকলে তো নিজেদের মহলে হসাহাসিও শুরু করে দিয়েছিলেন এই বিচার করে যে, সংহার তো অমর। তার শক্তি তাঁর যা হয়ে গেছে সহস্র হস্তের বলে, যদি কনো স্ত্রী তাঁর দমন করতে পারে, তা একমাত্র মাতা স্বয়ং। কিন্তু মাতা তো বিবাহিতা! তাহলে! সংহার যে অমর হয়ে গেল! সাধকুল অমর হয়ে গেল। ত্রিমূর্তি অজেয় হয়ে গেল।

কিন্তু এই সমস্ত কিছু যে ভাবিকালের লীলার সূচনা, তার ধারণা সেই সময়ে কারুরই ছিল না। না সাধকুলের ছিলো, না নিসাধকুলের, না কনো যোনির, না ত্রিমূর্তির, আর না স্বয়ং মৃষুরও সেই ধারণা ছিলো। … সেই কারণেই তো মৃষু, মাতার থেকে শক্তি লাভ করে যেই দুই শুভ্র হস্তী লাভ করেছিলেন, তাঁদেরকে দিয়ে মাতাকে শান্ত করতে প্রয়াস করলেন। আর ঠিক একই সময়ে ইচ্ছাধারীও মাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন, বরদানের কামনায়।

উগ্র মাতা ততক্ষণে ধুসর হয়ে গেছেন। শূন্যপ্রায় হতে চলেছেন। সেই দেখে ইচ্ছাধারি সম্মুখে তো এলেন বরদানের কামনায়, কিন্তু তাও নিকটে আসতে ভয় পেলেন। সেই সময়েই মৃষুর দুই শুভ্র হস্তী মাতার দিকে সুরপূর্ণ শীতল জলধারা নিয়ে এগিয়ে এসে, মাতার অঙ্গে সেই শীতল জল ক্ষেপণ করলে, মাতার থেকে চারীদিশায় ধুয়া ধুয়া হয়ে গেল। সমস্ত জগত ধুয়াতে ভরে গেল। ইচ্ছাধারি যেন কিছু দেখতেই পেলো না। তাঁর চোখ যেন শুধুই ধুয়া দেখতে থাকলো।

মাতার পদচাপে যদি সেই তুষার, যা মানবের বিনাশের জীবাণুকে সঞ্চিত রেখেছিল, তাদেরকে আচ্ছাদন মুক্ত করে থাকে, মাতার থেকে নির্গত হওয়া সেই সুগন্ধি পবিত্র ধূম্র সেই জীবাণুদের অন্তরে যেন নূতন করে প্রাণ ফুকে দিলো। ক্রমশ সেই সমস্ত ধূম্র সেই নরান্তক জীবাণুরা ধারণ করলে, বাতাসের থেকে সেই ধূম্র নিশ্চিহ্ন হতে শুরু করে, আর ইচ্ছাধারীসহ সকলে দেখলেন দুই শুভ্র হস্তী মাতার উপর জলবর্ষণ করছে, আর মাতা একটি শুভ্র বস্ত্র ধারণ করে মৃদুহাস্য ধারণ করে সেই জলরাশি যেই পুষ্করিণীর সৃষ্টি করেছিল, তারই মধ্যে একটি বিশাল পদ্মের মধ্যে উপবেশন করছেন।

একনজরে মায়ের সেই রূপ দেখে, মৃষু উত্তেজনার সাথে আনন্দস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো, মাতা শ্রী! চণ্ডালিনীরাও মাতার সেই রূপ দেখলেন আর দেখে আনন্দের সাথে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলেন, “আমাদের কাছে মা শ্বেতার রূপ নিয়ে এসেছিলেন, আর আজকের শ্রীর রূপে এলেন। মাতা প্রমাণ করে দিলেন যে, তিনি স্বয়ংই সকল রূপ!”

সেই কথা শুনে, যক্ষস্ত্রীরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে উঠে মৃষুর উদ্দেশ্যে বললেন, “কিন্তু একাকী তিনিই সমস্ত কিছু হন কি করে?”

মৃষু উত্তরে হেসে বললেন, “তোমরা এখনো তাঁকে কেবল দেবীই ভেবে যাচ্ছ, আর তাই মনে করতে থাকছো যে, দেবীর তো একটিই রূপ হয়। যেদিন তাঁকে মা বলে চিহ্নিত করতে পারবে, সেদিন অত্যন্ত সহজ হয়ে যাবে এই মানা নামানা”।

দেবী হর্ষিতা ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “এর অর্থ কি?”  

মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “রান্না করা অবস্থাতে মা, বস্ত্র ধৌত করা অবস্থায় মা, পাঠ গ্রহণের সময়ে সামনে বসা মা, দুষ্টুমি করার পর বকুনি দেওয়া মা, এই সমস্ত মায়েরা কি আলাদা আলাদা দেবী?”

হর্ষিতা বললেন, “না, একই। কাজের বিভিন্নতার কারণে মায়ের রূপ পালটে যায়। বস্ত্র ধৌত করার সময়ে তিনি জলে স্নাত, তো রন্ধনের সময়ে তিনি স্বেদে স্নাত, আবার শাসন করার কালে তিনি উগ্র তো শিক্ষাদানের সময়ে তিনি অত্যন্ত স্নেহশিলা”।

মৃষু পুনরায় হেসে বললেন, “যাকে দেখছেন, তিনিও যে সেই মা, সকলের মা, সর্বাম্বা। শাসনের কালে তিনি উগ্র, শিক্ষাদানে তিনি শ্বেতা, পবিত্র স্নেহদানে তিনি শ্রী, অন্নদানে তিনি অন্নপূর্ণা, ভ্রাতৃত্বের বোধ প্রদানের কালে তিনি পাবনি, উগ্রকামনা পূর্ণ করার কালে তিনি নিজের মস্তক ছিন্ন করা স্কন্ধস্থিতা। … তাঁর সন্তানদের পালন করার ভূমিকা অজস্র, তাই তাঁর রূপ অজস্র। … দেবী রূপে তাঁকে দেখবেন, তো তাঁর এই সমস্ত রূপের মধ্যে থাকা মহাসমন্বয়ের মহালীলাকে কনোদিনও জেনে উঠতে পারবেননা। কিন্তু যেদিন তাঁকে দেবীর আসন থেকে নামিয়ে এনে, নিজের মা রূপে দেখতে পারবেন, সেদিন তাঁর এই রূপভিন্নতার রহস্য আর রহস্য থাকবেনা, মাতৃত্বের বাৎসল্যপ্রেম হয়ে যাবে”।

সুগন্ধা জিজ্ঞাসু হয়ে প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মৃষু, তিনি যে ব্রহ্ম স্বয়ং, সক্রিয় বেশে তিনি ব্রহ্মময়ী । এই পরমসত্য জেনে নেওয়ার পরও, মা-কে ঈশ্বরের ঊর্ধ্বে কি করে স্থান দিতে পারি? তুমিও তো দুইই জানো। এও জানো যে তিনি ঈশ্বর, আর সঙ্গে সঙ্গে এও জানো যে তুমি মা। তুমি মা’কে ঈশ্বরের থেকে অধিক গুরুত্ব দাও কি করে?”

মৃষু হেসে বললেন, “অতি সহজ ব্যাপার দেবী। ঈশ্বর বললেই যা আমাদের মধ্যে ভেসে আসে, তা হলো একরাশি বাখান, একগুচ্ছ ধন্যবাদ আর সঙ্গে থাকা কিছু কামনা। … তুমি ঈশ্বর যার মৃত্যু নেই, তুমি অনন্ত যার অন্ত নেই, তুমি নিরাকার যার সীমা নেই, এই হলো বাখান। তোমার কারণে জীবন, প্রাণ, দেহ, এই হলো ধন্যবাদ। আর এই সমস্ত কিছুর সাথে সাথে, তুমিই আমার অন্তিম আশা। আমাকে সুখ দাও, শান্তি দাও, আর সুখ শান্তি পাবার জন্য যা যা লাগে তা দাও, এই কামনা”।

“অর্থাৎ, যেই মুহূর্তে ঈশ্বর শব্দ হৃদয়ে গুঞ্জন করে, সেই মুহূর্তেই এক অনাহুত চাওয়াপাওয়ার অঙ্কও আমাদের মস্তিষ্কে ভেসে আসে। কিন্তু মা? (মৃদু হেসে) মা বললেই হৃদয়ে কি ভেসে আসে? ভেসে আসে, এই কথা যে, যার থেকে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু চাইতে হয়না, যখন যা প্রয়োজন, তা বোধ হবার আগেই তিনি প্রদান করে দেন, এই না? … যার সান্নিধ্য মানেই শান্তি আর সুখ, যার থেকে আলাদা করে সুখ শান্তি চাওয়ার অর্থই মুর্খামি, তাই না?”

“যিনি কনোদিনও কিছু মুখফুটে চাননা, শুধুই নিরন্তর দিয়ে যান, পরিবর্তে যা চান তা হলো গালভর্তি হাসি মাত্র, তিনিই তো মা, তাই না? আর এই উপলব্ধি সবসময়ে আমাদের হৃদয়কে ব্যস্ত করে রেখে দেয় এই ভাবে যে, মা সমস্ত জীবন আমার জন্য করে গেলেন, আমি কি কিচ্ছু করতে পারবো না তাঁর জন্য! এই ভাব না? … অর্থাৎ দেখো, চাওয়াপাওয়ার অঙ্ক কেমন দেবার, প্রদান করার, পরিশ্রম করার বাসনায় পরিবর্তিত হয়ে গেল!”

“কেমন ভাবে, চাইবার ইচ্ছাই চলে গেল, চাওয়ার ইচ্ছা মুর্খামি মনে হলো, আর কিছু দিতে পারলে আনন্দ অনুভব হবে, এই বোধ চলে এলো? কেমন স্বার্থ চলে গেল, আর নিঃস্বার্থতা হৃদয়ে উঠে এলো? … এই হলো মা নামের চমৎকার। জগতের সর্বাধিক চমৎকারী শব্দ হলো এই মা শব্দ। মা মানেই আপন, মা মানেই আনন্দ, মা মানেই সুখ, মা মানেই শান্তি। মা মানেই বাঁধ ভেঙে দিয়ে, নগ্ন হয়ে, নির্লজ্জ হয়ে, নির্ভয় হয়ে, আমিত্ব ত্যাগ হয়ে গিয়ে, চিন্তা, ইচ্ছা, কল্পনা স্বতঃই মুক্ত হয়ে গিয়ে, শিশুর মত, উদ্ভ্রান্তের মত দুই বাহু তুলে এগিয়ে যাওয়া”।

“মা মানেই যে, কনো কিছু পাই বা না পাই, কিছু চাই বা না চাই, মায়ের কোল, মায়ের আঁচল চিরতরে আপন জেনে তাতে আত্মসমর্পণ করা। কুণ্ঠা নেই সেই আঁচলে নিজের নোংরা পুছে দিতে, কুণ্ঠা নেই সেই ক্রোড়ে মল ত্যাগ করতেও, কুণ্ঠা নেই সেই কোলে পরে থাকা প্রতিটি বস্তুকে খাদ্য মনে করে মুখে তুলে নিতে। কনো কুণ্ঠা নেই, কনো অপরাধ বোধ নেই, কনো অহংকার নেই। একটিই অহংকার, ইনি আমার মা। নিজের অহংকার নেই, তিনি যে আমার মা, এটিই আমার গর্ব, অর্থাৎ মায়ের অহংকার। অর্থাৎ আমিত্ব থেকে না চাইতেও মুক্তি”

পুনরায় মৃদু হেসে, “কেন মনে হয়, ইনি স্বয়ং ঈশ্বর হয়েও, ঈশ্বর বলে অন্য কেউ নিজেকে দাবি করে যাচ্ছেন দেখেও, তিনি ঈশ্বর রূপে আত্মপরিচয় দিতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছা রাখেন না! … দেবী, মায়ের থেকে অধিক সুরক্ষিত কেউ নন। মা জানেন, সন্তান সমস্ত কিছুর পরেও তাঁরই আপন, সে-ই সন্তানের আপন। তাই তো অনায়াসে, ইনি তোমার পিতা হন, ইনি তোমার ভ্রাতা হন, ভগিনী হন, ইত্যাদি ইত্যাদির সাথে নিজেই পরিচয় করিয়ে দেন মা”।

“তাঁর কনো ভীতি নেই যে, অনেকের সাথে আলাপ হবার পর, সন্তান তাঁর কাছে আর আসবেই না। কেন? তিনি যে মা। তিনি যে সুরক্ষিত। সন্তান যেদিকেই যাক, যতদূরেই যাক, দিনের শেষে মা-কে স্মরণ করবেনা, এটা তো হতেই পারেনা। … এই হলো মাতৃত্বের শক্তি, আর তা ঈশ্বরত্বের থেকেও অধিক শক্তিশালী, কারণ এই মাতৃত্বই যে সমস্ত শক্তির জননী”।

“আপনি পিতার দুলালী। একবার সেই দুলালী হয়েও, দুলাল হয়েও অপকথা বলুন মুখের উপর পিতাকে। বিরোধ সঙ্গে সঙ্গে এসে যাবে। পিতার সাথে এই ভাবে কথা বলো? এই তোমার শিক্ষা? … প্রথমে কোমল ভাবে আসবে, পরে তীব্র অপমান সহ সেই শব্দ ছুটে আসবে তোমার দিকে। … কিন্তু সন্তান যতই বড় হয়, দিনরাত মা’কে নরম মাটি পেয়ে যাখুশী বলতে থাকে। মুখের উপর বলে। মা কনো প্রতিবাদ করে? কষ্ট হলে, আড়ালে চোখের জল মোছে”।

“মা তিনি, সন্তানের মনের জ্বালা বোঝেন। জানেন কতটা সমাজ থেকে, সংসার থেকে, সর্বত্র থেকে সন্তান পীড়া লাভ করে তবেই বিষমাখানো কথাগুলি মা’র উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করছে। আর তাই নিঃশব্দে তা সহন করে নেন। মা যে! সন্তানের সুখশান্তির চিন্তাই তাঁর জীবনের একমাত্র তপস্যা। … সন্তানই যে তাঁর একমাত্র প্রেম। … হ্যাঁ, সন্তান সমস্ত জগত থেকে যত বেদনা, পীড়া লাভ করে সমস্ত মাতার উপর এসে উগ্রে দেয়। কিন্তু যদি অন্য কেউ তার মা’কে কিছু বলে, সে নিজের ক্রোধের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে”।

“দুর্বল থেকে ভয়ানক বলশালী হয়ে ওঠে সে। নিজের কি হবে, আইন তাকে এই ক্রোধ প্রকাশের জন্য ক্ষমা দেবেনা, সাজা দেবে, সমস্ত কিছু ভুলে যায়। স্বার্থ ভাব আসতেই পারেনা মনে, আত্মভাব মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, আর সে নিঃস্বার্থ হয়ে যায়”।

“দেবী, আমাদের মা’এরও যে এই একটিই উদ্দেশ্য, আত্মভাব থেকে মুক্ত করে তুলে আমাদেরকে মিথ্যা এই জগত থেকে নিজেদের আপন গৃহে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। আর তিনি খুব ভালো করে জানেন যে, ঈশ্বর ভাব দিয়ে সেই কাজ সম্ভব নয়। ঈশ্বর শব্দের মধ্যেও যেমন আত্মভাব রয়েছে, তেমনই ঈশ্বর শব্দের উচ্চারণের সাথে সাথেই নশ্বর শব্দ আসে, আর তাতে রয়েছে লাচার রূপে নিজেকে পরিচয় দিয়ে বিপরীত আত্মভাব”।

“তাই তো তিনি ঈশ্বর পদের অভিলাষী কিছু লোভীদের সেই পদ ভোগ করতে দিয়ে সরে চলে এসেছেন সেই থেকে। আর সরে এসে মা-সন্তানের সম্পর্কে মেতে রয়েছেন। তিনি জানেন, এক মা সদা নিঃস্বার্থ, আর মায়ের সংস্পর্শে সন্তান এলে, সন্তানও মায়ের মতই নিঃস্বার্থ হয়ে যায়। … অর্থাৎ, সন্তান নিজেকে ভুলে, নিজের আত্মকে ভুলে, এই ভ্রমজগত থেকে মুক্ত হয়ে, সত্যে গমন করবেন”।

সুগন্ধা বললেন, “এর অর্থ, আমিত্ব ত্যাগ করতে হবে। তবেই তাঁকে ঈশ্বর থেকে মা মানতে পারবো? ঈশ্বর মানলে তিনি মস্তকেই থেকে যাবেন, হৃদয়ে কখনো আসতে পারবেন না, কারণ আমরা কখনোই ঈশ্বরকে হৃদয়ে স্থান দিই না। সত্য বলতে দিতে পারিই না, কারণ ঈশ্বরকে হৃদয়ে স্থান দিতে গেলেই আমাদের মনে পরে যায় যে আমরা নশ্বর। আর আমাদের নশ্বরত্ব স্মরণ এসে যেতেই, স্মরণ এসে যায় নিজেদের দুরবস্থার কথা, আর সঙ্গে সঙ্গে সম্মুখে এসে যায় হাজারো কামনা। তাই মা করে স্থান দেওয়া, কারণ মায়ের স্থান মস্তিষ্কে নয়, হৃদয়ে। পর নয়তো মা, আপন তো! … তিনি মা আর আমি সন্তান। একই গোত্রের। ঈশ্বর নশ্বরের মত ভিন্ন গোত্রের নই তো”।

মৃষু সেই কথাতে ঈষৎ হেসে বললেন, “আমি ঘোচাতে চাইলেই ঘোচে নাকি? আরো বেশি করে চেপে ধরে। আমি অমুক, আমি তমুক, এর থেকে বেড়তে চেষ্টা করলেই, এসে যায় – ইস, আমি যে কিছুই নই, কিছু যদি হতুম!… অর্থাৎ আমির প্রতি আসক্তি ত্যাগ করতে গেলে, আমির প্রতি বিরক্তি এসে যায়। আর আসক্তি বিরক্তি যে একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। তাহলে সেই আমি তো রয়েই গেল, সব অবস্থাতেই রয়ে গেল”।

এক অন্য যক্ষস্ত্রী বললেন, “তাহলে উপায় কি? আমি না ছাড়লে ঈশ্বর মা হবেন না, আর আমি ছাড়া যায়না। তাহলে উপায় কি?”

মৃষু হেসে বললেন, “সন্তান। … সুযোগ্য সন্তান হতে হয়। দিন রাত মাকে বিরক্ত করা সন্তান থেকে, মায়ের নিরলস পরিশ্রম দেখে লুকিয়ে বেদনা পাওয়া সন্তান হয়ে উঠতে হয়। দিনরাত মায়ের থেকে এটা দাও, এটা করে দাও, সেটা করে দাও, এই ভাবে নিজের বোধবুদ্ধিকে মায়ের বোধবুদ্ধির থেকে শ্রেয় মানা সন্তান থেকে, আমাদের সেই সন্তান হয়ে উঠতে হয়, যে প্রকৃত অর্থে মাতৃপ্রেমী। অর্থাৎ আমাদের সেই শিশুসন্তান হয়ে উঠতে হয় যে জানে যে তার মা বলেছে মানে সেটিই সঠিক। মা ভুল করতেই পারেনা”।

সেই যক্ষস্ত্রী অনন্যা বললেন, “অর্থাৎ আমাদেরকে শুধু সন্তান নয়, মায়ের সুপুত্র শিশু সন্তান হয়ে উঠতে হয়, যার কাছে মা তার সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড। … হ্যাঁ ঠিকই তো! শিশুর আমিত্বে কনো আঁট থাকেনা। মা এতো বকে, তাও জরিয়ে জরিয়ে আদর করে মা’কে। মা মাঝে মাঝে নাটক করে কাঁদে। শিশু সন্তান নিজের প্রিয় খেলা ফেলে রেখে এসে মাকে জাপটে ধরে। নিজে নয়, নিজের মা অধিক প্রিয় হয় তার কাছে, যেন মায়ের অস্তিত্বই তার কাছে সর্বাধিক আনন্দের, সর্বাধিক শান্তির। … তারপর আসতে আসতে রাগ করতে শেখে শিশু আর ক্রমশ জটিল হতে থাকে”।

মৃষু হেসে বললেন, “যখন সেই শিশুসন্তান হয়ে উঠবো আমরা, যার কাছে তার মা’ই ব্রহ্মাণ্ড। যার কাছে মা বকেছে মানে আমি কিছু অন্যায় করেছি। মা কাঁদছে মানে আমার ব্রহ্মাণ্ড কাঁপছে। তখন আর আমিত্বের আঁট কমতে থাকে। আর তখনই আমরা মায়ের সাথে একাত্ম হতে শুরু করি, এই কাল্পনিক ব্রহ্মাণ্ড থেকে নিজেদেরকে নিজেদের অজান্তেই বার করে আনা শুরু হয়ে যায়, আর সত্যের সম্মুখে নিজেদেরকে স্থাপন করতে থাকি”।

“অর্থাৎ, আমিত্বের নাশ সম্ভব নয়। আসক্তি থেকে বিরক্তি, আর বিরক্তি থেকে আসক্তি, এর মধ্যে ঘোরাফেরা করা হয় কেবল আমিত্ব থেকে মুক্ত হবার প্রয়াসে। আর এই সত্য আমাদের মা, আমাদের পরমেশ্বরী খুব ভালো করেই জানেন। আর তাই তো তিনি ঈশ্বর উপাধিতে আটকেই থাকেন না। সরাসরি মা হয়ে ওঠেন, আর আমাদের সেই মা-সর্বস্ব সন্তান হবার আহ্বান দিয়ে ফেরেন। কারণ একমাত্র তার কারণেই যে আমরা আমাদের এই মিথ্যা আমিত্ব, মিথ্যা আত্ম-ভাব থেকে মুক্ত হতে পারি, অতি সহজে এবং অতি স্বাভাবিক ভাবেই তা করতে পারি”।

সুগন্ধা বললেন, “কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ্যে জ্ঞানের প্রয়োজন ঠিক কোথায়?”

মৃষু হেসে বললেন, “সদ্যদেহধারণ করা শিশুর আত্মভাব জন্ম নিতে পারেনা, কারণ তার পঞ্চভূতের উপর আত্মভাবের জোর তখনও পূর্ণ ভাবে স্থাপিত হয়না। কিন্তু এক পূর্ণ বয়সের পুরুষ বা স্ত্রীর মধ্যে আত্মভাব হৃষ্টপুষ্ট হয়ে গেছে। মাতৃত্বের প্রসঙ্গ শুনলেও, সে সেই সন্তান হতে পারে, যে সর্বক্ষণ মা-কে বিরক্ত করতে থাকে, যে মায়ের প্রতিটি বকাঝকার মধ্যে রাগ অভিমান খুঁজতে থাকে। জ্ঞান আমাদের সেই জমাট হয়ে থাকা আত্মভাব নষ্ট করে দিয়ে আমাদেরকে সেই সন্তান করে তোলে, যার কাছে তাঁর মা’ই ব্রহ্মাণ্ড হয়ে থাকে”।

হর্ষিতা আক্রমণাত্মক ভাবেই বললেন, “আচ্ছা মৃষু, তুমি বারবার এই আত্মকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখো কেন? আমি অনেক বার শুনেছি। তোমার বিভিন্ন কলারূপেও তুমি একই কথা বলেছ। আজ আমি এর পূর্ণ উত্তর কামনা করছি। যেন আমি কথাগুলো শুনেও মানতে পারছিনা। হয়তো আমার ভিতরে আত্মভাব প্রত্যক্ষ থাকার কারণেই পারছিনা। বারবার মনে হচ্ছে যে, আমার মধ্যে তো সেই আত্মভাব রয়েছে, অর্থাৎ আমি অযোগ্য। আর আমার আত্মভাবই আমাকে অযোগ্য মানতে দিচ্ছেনা। তাই, আজ আমি আমার এই অজ্ঞানতা ঘোচাতে চাই। তাই আমার এই আত্ম সম্বন্ধে স্পষ্ট উত্তর চাই”।

মৃষু উত্তরে কিছু বলতে গেলে, হর্ষিতা আবার বললেন, “না না, আমি পরমাত্মের রচনার কথা, কাহিনী ইত্যাদি জানতে আগ্রহী নই। সেই সমস্ত কিছু আগেই শুনেছি। আমি এই আমিত্বের, এই আত্মের প্রভাব জানতে চাই। জানতে চাই যে, কি ভাবে সে আমাদেরকে এই কাল্পনিক জগতে দিনের পর দিন আটকে রেখে দিতে সক্ষম হয়। আর মাতা কেন আমাদেরকে এখান থেকে মুক্ত করতে চেয়েও পারেন না”।

মৃষু হেসে উত্তর দিলেন, “জানেন কি দেবী, সত্যের প্রকৃত রূপ কি?”

দেবী হর্ষিতা বললেন, “গহন অন্ধকার। পূর্ণ ভাবে নিরাকার। অনন্ত, অসীম, নিরাকার, নির্বিকার মহাশূন্যস্বরূপ অন্ধকার”।

মৃষু পুনরায় হেসে বললেন, “অতি উত্তম। এবার বলুন তো, এই অনন্ত শূন্য, যা হলো অকাট্য সত্য, তার মধ্যেই আপনি স্থিত। কিন্তু তারপরেও, সেই অনন্ত শূন্যকে অনুভব করতে ব্যর্থ কেন আপনি?”

দেবী হর্ষিতা উত্তর প্রদান করতে পারলেন না। খানিক ভেবে কিছুটা উগ্র ভাবেই বললেন, “প্রথম যেই উত্তর প্রদান করেছিলাম, তাও আমার উপলব্ধি থেকে বলিনি। শোনা কথা মাত্র। উপলব্ধি তো কনোদিনও করতেই পারিনি সেই অনন্ত শূন্যকে। কিন্তু কেন পারিনি, তা জানিনা আমি। জানলে তো সেই অবগুণ্ঠন সরিয়ে, কবেই তাঁর দর্শন লাভ করতাম!”

মৃষু মুচকি হেসে বললেন, “অবগুণ্ঠন। যথার্থ শব্দ প্রয়োগ করেছেন। আর এই অবগুণ্ঠনের নাম হলো আমিত্ব বা আত্ম। অর্থাৎ ‘আমি’। কি ভাবে? যতক্ষণ আমার কাছে এই ‘আমি’ সূচক বোধ রয়েছে, ততক্ষণ যদি আমি আর সেই শূন্য, আর কিচ্ছু না থাকে, তাও আমার মন কিসে যাবে? আমার মন যাবে এই ভাবনায় যে, এই অনন্ত শূন্যে আমি একা! আমি একা বলে আনন্দ পাবো, নাকি আমি একা বলে ভয় পাবো?”

“আর যেই ক্ষণে এই ‘আমি’ নিয়ে ভাবনা এসে গেল আমাদের মধ্যে, সেই ক্ষণে আমরা শূন্যকে প্রত্যক্ষ করতেও পারিনা। শুধুই আমরা আমাদের ‘আমি’কে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠি। আমার সুখ লাভের কারণ, আমার সুখ লাভের সম্ভাবনা, আমার বেদনার কারণ, আমার বেদনার সম্ভাবনা। আর এই সুখ লাভের সমস্ত সূচক, আর বেদনালাভের সমস্ত সূচককে নিয়ে আমরা সদাব্যস্ত থাকে। আর সেই ব্যস্ততাই আমাদের ভ্রমের কারণ, আমাদেরকে সত্য ভুলিয়ে দেবার কারণ, আমাদের সত্যের থেকে অবগুণ্ঠিত থাকার কারণ। আমাদের আর সত্যের মাঝে আচ্ছাদন এই ‘আমি’। … এই ‘আমি’ ভুলে গেলে, যে যেই স্থানে যেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, বসে রয়েছেন, শুয়ে রয়েছেন, বা যে যেই অবস্থাতেই রয়েছেন, তৎক্ষণাৎ সমস্ত ভ্রমের নাশ”।

“কারণ এই ‘আমি’ই সমস্ত ভ্রমের উৎপত্তিস্থল। এই ‘আত্ম’ই সমস্ত ভ্রমের জন্মদাতা। এই ‘আত্ম’ই এই ভ্রমজগত যাকে আমরা বলি ব্রহ্মাণ্ড, তার জন্মদাতা। কিন্তু বাস্তবে কি আছে? কিচ্ছু নেই, না ব্রহ্মাণ্ড আছে, না জগত আছে, না তুমি আছো, আর না আমি আছি। কিচ্ছু নেই। আর এই কিচ্ছু না থাকার অর্থই হলো মহাশূন্য বিরাজমান, অর্থাৎ মহাসত্য”।

“তাই যতক্ষণ এই আমি বিরাজমান, ততক্ষণ আমাদের চারিপাশে কেবলই মিথ্যা আর মিথ্যা, ভ্রম আর ভ্রম, অসত্য আর অসত্য। উন্নতও যতটা অসত্য, অনুন্নতও ততটাই অসত্য; সভ্য যতটা অসত্য, অসভ্যও ততটাই অসত্য; অসত্য কথাও যতটা অসত্য, সত্য কথাও ততটাই অসত্য। কেন? কারণ এই সমস্ত কিছু, অর্থাৎ উন্নতি, সভ্য, সত্যকথা, দেহ, মন, বুদ্ধি, সমস্ত প্রকার যন্ত্র, সমস্ত প্রকার তন্ত্র, সমস্ত প্রকার মন্ত্র, এদের রচনা কার থেকে? কার কারণে? কিসের কারণে?”

“আমি অর্থাৎ আত্মের থেকেই এঁদের সমস্ত কিছুর রচনা। আমাদের এই আত্মকে অপমান থেকে সুরক্ষিত করতে, সম্মানে ভূষিত করতে, সুখে রাখতে, শান্তিতে রাখতে, অশান্তি থেকে দূরে রাখতে, বেদনা থেকে দূরে রাখতেই, এই সমূহ কিছুর রচনা। আর এই আমিত্ব কি? এই আত্ম কি? সত্যের থেকে আমাদের যা কিছু আচ্ছাদিত করে রাখে তাই হলো আত্ম”।

“আত্মভাব অর্থাৎ আমিত্ব আমাদেরকে সর্বদা বহুতে বিশ্বাস করিয়ে রাখে। আর বহুতে বিশ্বাস করিয়ে রেখে, আমার ‘আমি’ অন্যের ‘আমি’র থেকে শ্রেয়, অন্যের থেকে সুখী, অন্যের থেকে ধনী, অন্যের থেকে উন্নত, অন্যের থেকে ভাগ্যবাণ এই ভেবে ভেবে মদের জন্ম দিয়ে, সদা সর্বদা সত্যের থেকে আমাদের বিস্মৃত করে রেখে দেয়। আবার অন্যদিকে, অন্যের ‘আমি’ আমার থেকে অধিক সুখী, অধিক উন্নত, অধিক সুযোগপ্রাপ্ত, অধিক ধনী, অধিক ভাগ্যবাণ, এই বিপরীতমুখি ভাবনারও অবতারণা করিয়ে, আমাদের হয় বিষাদগ্রস্ত করে রাখে, নয় লোভী হবার, হিংসা করার, ঈর্ষা করার, ক্রোধ করার অছিলা নির্মাণ করে, পুনরায় আমিত্বের ভাবনাতেই আবদ্ধ করে রেখে দিয়ে, সত্যের থেকে বিচ্ছিন করে রেখে দেয়”।

হর্ষিতার ভাব বড়ই ভিন্ন সকলের থেকে। সে উগ্র, তবে সে স্পষ্টবক্তা। তিনি বললেন, “কিন্তু মৃষু, তুমিই তো অন্য অন্য বার এসে, যেমন অনন্যের বেশে এসে বলে গেছিলে যে আত্মের মৃত্যু নেই। … আত্মের যদি মৃত্যু না থাকে, তবে তার থেকে মুক্তি কি সম্ভব আদপে?”

মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “যার জন্ম আছে, তার মৃত্যু অবশ্যই আছে। আত্মের তো জন্মই নেই! আত্ম কি? আত্ম তো একটি ভ্রম পর্দা মাত্র। ভ্রমের জন্ম হয়না। হয় কি? দেবী, ধরিত্রীর তাপকে প্রতিফলন করা বিশালাকায় বালুর দর্পণের নাম সূর্য। সেই সূর্যের দিকে ধরিত্রীর যখন যেই মুখ তাকিয়ে থাকে, সেখানেই ভ্রমের শুরু হয়, দিনের বিস্তার হয়। আর যেই মুহূর্তে সেই দর্পণের থেকে মুখ সরিয়ে নেওয়া, সেই মুহূর্তেই পুনরায় সত্য অর্থাৎ রাত্রি। আর সেই রাত্রির সত্যতা থেকে দূরে থাকার প্রেরণা প্রদান করায় আত্ম। আর তার কারণেই আমাদেরকে যন্ত্র নির্মাণ করিয়ে, তা দিয়ে রাত্রিকেও দিনের মত ভ্রমময় করে তোলার অনন্ত প্রয়াস। ঠিক তেমনই, জ্ঞান বিমুখ হয়ে গেলে, ভ্রম প্রকাশ্যে আসে, আর জ্ঞান পুনরায় অর্জন হয়ে গেলে, ভ্রম দূর হয়ে যায়। আর এই জ্ঞান অর্জন করতে যদি দেহের পর দেহ চলে যায়, তাহলে এই আত্মরূপ ভ্রমও দেহের পর দেহ ধরে প্রবাহিত হতে থাকে। অবিনাশীর মত ব্যবহার করতে থাকে”।

“আমি বলে কিছু নেই, আমি’র অস্তিত্বই সম্ভব নয়। এক ও একমাত্র শূন্য রয়েছে, আর বাকি কনো কিছুর অস্তিত্বই সম্ভব নয়। এই তো সত্য, আর এই সত্যকে জানাই জ্ঞান। যেইক্ষণে সত্য থেকে আমরা ভ্রমিত হয়ে গেলাম, অমনি আমরা অজ্ঞানী। আর আমরা অজ্ঞানী হচ্ছি কি ভাবে? আমিত্বকে স্বীকার করে। আমিত্বকে গুরুত্ব প্রদান করে। আর যেইদিন থেকে আমরা এই আমাদের ‘আমি’কে গুরুত্ব প্রদান করেছি, সেদিন থেকে আমরা অজ্ঞানী হয়ে উঠে, কেবলই সুখ লাভের, সম্মান লাভের, আর অন্যের ‘আমি’র থেকে শ্রেষ্ঠত্ব ধারণ করাতে রুচিশীল হয়ে উঠেছি”।

“দেহের পর দেহ ধারণ করে থাকি আমরা। বারবার পঞ্চভূতের গঠনকে নির্মাণ করি একটি দেহগ্রহণের সাথে সাথে, বারবার তা ত্যাগ করি। দেহ ধারণ করে সমানে আমরা অধিক থেকে অধিক ভাবে প্রয়াস করতে থাকি, যাতে করে আমরা পুনরায় জ্ঞান অর্জন করে, সত্যে প্রত্যাবর্তন করে সদানন্দময়ী আমাদের মায়ের কোলে ফিরে যাই, যিনি ততক্ষণই প্রকৃতি বেশে সাকার যতক্ষণ না, আমরা তার মধ্যে লীন হচ্ছি। যেই মুহূর্তে আমরা তাঁর ক্রোড়ে উঠে যাই, অমনি তিনি নিরাকার, নির্বিকার, অসীম, অনন্ত, অচিন্ত্য পরব্রহ্ম”।

“সেই দেহে আমরা অনেক কিছু জানি, অনেক অনুভব অর্জন করি। কিন্তু যাই করি আর তাই করি, আমরা সমানে আমাদের ‘আমি’কেই তোষামোদ করে চলি। আমি উন্নত হলাম, আমি যন্ত্র চালনায় পারদর্শী হলাম, আমি ভালো বক্তা হলাম, আমি ভালো শিল্পী হলাম, আমি সেরা নেতা হলাম, আমি সম্মান পেলাম, আমি ধনী হলাম, আমি পুরস্কার পেলাম, আমি খ্যাতি পেলাম, আমি ভক্ত হলাম। বা ঠিক বিপরীত, অর্থাৎ খ্যাতি পেলাম না, সম্মান পেলাম না, ধনী হতে পারলাম না, পুরস্কৃত হলাম না, শিল্পী হলাম কিন্তু সম্মান পেলাম না, এই সমস্ত কিছু। একবার বিচার করে দেখুন দেবী! আমরা ভক্তি কার করি? ঈশ্বরের। তাই তো? কিন্তু কার থেকে সেই ভক্ত হবার স্বীকৃতি আশা করি? অন্য আত্মগ্রস্ত জীবের থেকে। বুঝতে পারছেন, কতটা ভয়ঙ্কর ভাবে আমরা আমিত্বের পাঁকে পরে রয়েছি!”

“অর্থাৎ, সমস্ত অনুভব, সমস্ত অভিজ্ঞতা আমাকে এই বোধ করাতে পারলো না যে, আমার এই ‘আমি’ই সমস্ত জ্বালার মূল কারণ। তাই সেই ‘আমি’ কার সংস্পর্শ পেলো, কার নামসঙ্কীর্তন করলো, কার নাম জপ করলো, কি কি মন্ত্র পড়লো, কত কত যন্ত্র চালালো, কি কি তন্ত্রের জ্ঞাতা হয়ে উঠলো, তাতে কিই বা এসে গেল। হ্যাঁ এসে যেত, অবশ্যই এসে যেত, যদি এই উপলব্ধি বা, মন্ত্র, বা যন্ত্র, বা তন্ত্র, বা নামসঙ্কীর্তন, বা অভিজ্ঞতার একটিও একটিবারও আমাদেরকে বলতো যে, যত নষ্টের মূলে এই ‘আমি’, তাহলেই হয়ে যেত”

“কিন্তু যতক্ষণ না তা হলো, ততক্ষণ তো কনো ভাবে, কনো শর্তে, কনো কর্মে মুক্তি নেই। এই আমি অবিনশ্বর হয়েই থেকে যাবে ততদিন, যতদিন না এই ‘আমি’কেই সর্বকাজের কাঁঠালিকলা বলে চিহ্নিত করা যায়। আর ততদিন কনো কিছু, কনো ব্যক্তি, কনো অবতারের স্পর্শও আমাদের মুক্ত করতে পারেনা। এমনকি স্বয়ং আমাদের মা-ও ততদিন আমাদের সম্মুখে এসে নিজের স্বরূপ প্রদান করেন না, কেবলই প্রকৃতি বেশেই থেকে যান। … আর আমরা, আবার একটি দেহ ছেড়ে, যতটা আত্মবোধকে আমরা পূর্বের দেহে সঞ্চিত রেখেছিলাম, ততটা আত্মবোধকে নিয়েই ফিরে আসি”।

“কিন্তু অন্তে কি হয়? যেইক্ষণে আমরা কনো একটি দেহে এসে উপলব্ধি করি যে, যত নষ্টের মূলে এই ‘আমি’; এই ‘আমি’ আছে বলেই যত ভালো লাগা, খারাপ লাগা, আসক্তি বিরক্তি, আবেগ, রিপু, পাশ, মান সম্মান, সত্যকথা মিথ্যা কথা; আর এই ‘আমি’ই আমাদেরকে পরমসত্য, সেই মহাশূন্যের দিকে তাকাতেও দেয়না ঠিক করে, হারিয়ে যেতেও দেয়না আমাদের মায়ের কোলে, সেদিনই মুক্তি। সেদিনই, সেই উপলব্ধির মুহূর্তেই আমরা সমস্ত পর্দা সরিয়ে ফেলি”।

“আসলে বহু সংখ্যক পর্দা বা বন্ধন তো কনো কালেই ছিলো না। একটিই পর্দা আর সেই পর্দার নাম হলো ‘আত্ম’ বা ‘আমি’। এই একটিই পর্দা সমানে সহস্র গুণ ধারণ করে, সহস্র প্রকার সম্পদ ধারণ করে, সহস্র ভাবনা, আবেগ, বরদান, অভিশাপ, সম্পর্কের বোঝা ধারণ করে করে ব্রহ্মাণ্ডের মতন ভারী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ঠিক যেমন কক্ষ যতই অন্ধকার হোক, একচিলতে আলোর কারণেও সেই অন্ধকার মুহূর্তের মধ্যে চলে যায়, তেমনই শুধু মাত্র এই ‘আমি’ সমস্ত অজ্ঞানতার কারণ, এটি উপলভদি করা মাত্রই, সেই ব্রহ্মাণ্ডের মতন ভারী পর্দা অপসারিত হয়ে যায়, আর আমরা শূন্যে লীন হতে থাকি”।

“তখনও ‘আমি’ পুরো তরে চলে যায়নি, তাই ধ্যান হয়, আর আমার ‘আমি’ বিশ্বচেতনার থেকে পৃথক হয়ে অসহায় সারমেয়র মত কাকুতিমিনতি করতে থাকে যে তাকে পুনরায় উঠিয়ে নেওয়া হোক। অনেক অনেক সাধু এইখানে এসে আত্মের সেই কাঁদুনিতে আবেগপ্রবণ হয়ে যান, আর তাঁদের সাধনার সেখানেই ইতি হয়ে যায়। কিন্তু যিনি প্রকৃত সাধু, তিনি যে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা”।

“যেই ‘আত্মের’ আবাহনকে রাজার শ্রেষ্ঠ সেনা, বা সেনাপতি, বা স্বয়ং রাজাও অতিক্রম করতে পারেননা, মন্দিরের, গির্জার, মসজিদের, মঠের পালও অতিক্রম করতে পারেনা, সাধু তা অনায়সে অতিক্রম করে দেন, নিজের যুদ্ধকৌশলের বলে, নিজের ভ্রমজগতের প্রতি উপেক্ষার বলে, ভ্রমব্রহ্মাণ্ডের মায়ার প্রতি অবলীলায় প্রদর্শন করা মমতাহীনতার বলে, কঠিন হস্তে তিনি সেই সারমেয়ের কাঁদুনিতুল্য আত্মের সেই কাকুতিকে প্রত্যাখ্যান করে দেন”।

“আর তা উপেক্ষা করা মাত্রই, আমরা আমাদের মায়ের কোলে লম্ফ মারি ঠিক পরবর্তী মুহূর্তে। এক মুহূর্তের মধ্যে আমরা সমস্ত সাকার বকার ত্যাগ করে, সমস্ত বিকার গুন প্রতিভা ত্যাগ করে, সমস্ত শ্রেষ্ঠত্বের সম্পদকে ভুলে গিয়ে, সমস্ত ‘আমি’র ভূষণকে উপেক্ষা করে, অনন্ত, অসীম, নির্বিকার, অচিন্ত্য ব্রহ্মময়ীর মহাশূন্যময় কোলে ঝাঁপিয়ে পরি, আর তখন আমাদের পরিণতিকে বলা হয় কি? সমাধি, নির্বাণ, কায়ামত, অর্থাৎ জীবনমৃত্যুর এই চক্র থেকে চিরতরে মুক্তি”।

“অর্থাৎ মায়ের কোলে ফিরে গিয়ে, নিজেদের অসীম স্বরূপে প্রত্যাবর্তন করে গিয়ে, আমরা তখন যাকে তোমরা বলো জান্নত, সেই জান্নতের চিরঅধিবাসী হয়ে যাই, এই ভ্রমজগত অর্থাৎ জাহান্নম ত্যাগ করে। … (মৃদু হেসে) মধ্যা কথা এই যে, যতক্ষণ এই ‘আমি’কে অর্থাৎ ‘আত্ম’কে ধারণ করে থাকবে, ততক্ষণ যাই করো আর তাই করো, যাকে খুশী ছুঁয়ে নাও, আর যার খুশী মহিমা কীর্তন করে নাও, যারই নাম গ্রহণ করে নাও, আর যা খুশী যজ্ঞ করে নাও, জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি অসম্ভব। কেন?”

“এই জীবনমৃত্যুর চক্রের চালকই যে সেই ‘আমি’, যেখানে এই ‘আমি’ বা আত্ম সমানে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে উঠে পরে লেগে থাকে। আর তুমি বলবে যে, আমাদের মা এই ‘আমি’র এই চক্রকে বাঁধা দেয়না কেন, তাই তো? কারণ ‘আমি’ নিজেকে কর্তা জ্ঞান করে, নিজের শ্রেষ্ঠত্ব স্থাপনে উলমালা হলেও, আসলে এই যাত্রা আমাদের অজ্ঞানতা থেকে পুনরায় জ্ঞানে প্রত্যাবর্তনের। তাই যেই যাত্রাকে ‘আত্ম’ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের যাত্রা বলে অবিহিত করে, সেই একই যাত্রা আমাদের মায়ের কাছে তাঁর সন্তানদের তাঁর কোলে প্রত্যাবর্তনের যাত্রা হয়”।

“সসীম থেকে অসীমে প্রত্যাবর্তনের যাত্রা; বিকার থেকে নির্বিকারে যাত্রা; মিথ্যা থেকে সত্যে যাত্রা; নশ্বর থেকে ঈশ্বরের যাত্রা; ভ্রম থেকে পরমার্থে যাত্রা। এই যাত্রার প্রথমে আমরা থাকি মিথ্যা, আত্মের দাস, পরমাত্মের পূজারি, স্বয়ং নশ্বর, কামনার দাস, আর যাত্রার অন্তে, সেই পরমাত্ম স্বয়ং আমাদের দাশ হয়ে যায়। যেই পরমাত্ম আমাদেরকে বারবার নিজের নামগুণ করার জন্য প্রেরণা প্রদান করে এসেছে এতকাল, আর বলে এসেছে যে তার গুণ গাইলেই আমরা সুখী হবো, যাত্রার শেষে সেই পরমাত্মার কেবল কথা নয়, স্বয়ং পরমাত্মাই ডাহা মিথ্যা হয়ে যায়”।

“তার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত আমরা মনে করতে থাকি যে পরমাত্ম বা পরমাত্মের ত্রিগুণের কেউ অমরত্ব প্রদান করে না, কারণ তা সৃষ্টির ভারসম্য নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু যাত্রার শেষে আমরা স্পষ্ট জেনে যাই যে, অমরত্বের বরদান দেবার জন্য, যে বরদান প্রদান করছে, তাকেও তো অমর হতে হয়। কিন্তু পরমাত্ম স্বয়ংই তো অমর নয়। সে কেবলই আমাদের ভ্রমের কারণে অমর। যেদিন ভ্রম মিটে গিয়ে, আমরা সমাধিস্থ, নির্বাণ প্রাপ্ত, কায়ামত প্রাপ্ত, সেদিন যে পরমাত্মের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়না, দূরদূর পর্যন্ত দেখলেও খুঁজে পাওয়া যায়না। আর এমন ভাবেই সেই অস্তিত্ব মুছে যায় যেন কনো কালেই তার অস্তিত্ব ছিলো না”।

“এই হলও পরম সত্য, আর এই হলো আত্মের সত্য দেবী। … কনো মন্ত্র, কনো যন্ত্র, কনো স্পর্শ, কনো কিছু তোমাকে মুক্ত করতে পারবেনা, কারুকে মুক্ত করতে পারবেনা। নিজের আমিত্ব থেকে মুক্ত হও। যেই আমি সামান্য নিদ্রার কালেই হারিয়ে যায়, সামান্য সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেই অবিশ্বাস্য হয়ে যায়, তার উপর বিশ্বাস করছো দেবী? আমি কেউ নই, আমি কনো কালে ছিলাম না। আর যখন আমিই নেই, তখন কিসের সুখ, কিসের দুঃখ? কিসের চাওয়া পাওয়া, কিসের দেনাপাওনা? কিসের প্রয়োজন অপ্রয়োজন? কনো বন্ধন নেই দেবী। আমাদের মা’কে ঈশ্বর জ্ঞান করা বন্ধ করে, নিজের সেই মা, যার কাছে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাপারে কিছু ভাবার প্রয়াসও অহেতুক বোধ হয়, তা বোধ করুন, তাঁর আত্মীয়তা, তাঁর অকাট্য প্রেম, তাঁর নিষ্কাম শাসন, আপনার ‘আমি’কে কখন যে আপনার অঙ্গের থেকে সাপের খোলের মত খসিয়ে দেবে, আপনি তা জানতেও পারবেন না”।

“দেবী, ভ্রমজাল থেকে মুক্ত হবার এর থেকে শ্রেষ্ঠ ও সহজ উপায় আর হয়ই না, সম্ভবই নয়। … সেই কারণেই দেবী, মা আমাদের ঈশ্বর বা ঈশ্বরত্ব সমস্ত কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে কেবল মাত্র মা হয়ে আমাদের কাছে আসেন, থাকেন, আর থাকতে চান। কারণ তিনি যে সন্তানের জন্যই নিরকার ত্যাগ করে সাকার, নিজের ইচ্ছাপূর্তির জন্য নয়। তাই তো তিনি জানেন, সন্তানের পীড়া। তিনি জানেন যে সন্তান হাজার প্রয়াস করেও আমিত্ব থেকে মুক্তি পাবেনা। তাই তিনি মা হয়ে বিরাজমান থাকেন যাতে করে, অতি সহজে তাঁর সন্তানরা ‘আমিত্ব’ থেকে, ‘আত্ম’ থেকে, মিথ্যা থেকে, ভ্রম থেকে মুক্ত হয়ে গিয়ে সত্যে সনাতনে, নিরাকারে, ব্রহ্মে লীন হয়ে যেতে পারে পুনরায়। যাতে তাঁর সন্তানরা পুনরায় তাঁদের নিজের গৃহে প্রত্যাবর্তন করতে পারে অনায়সে”।

একদিকে যখন মৃষু এই সমস্ত কথা বলছিলেন, তখন মা এমনই ভাবে মমতামাখানো স্নেহ হাস্য প্রদান করলেন যে, দেবী সুগন্ধা বুঝতে পারলেন না যে, মাতা পুত্রের মুখ থেকে এমন অমৃত কথা শ্রবণ করে হাসলেন, নাকি পুত্রের প্রেরণ করা সাদা হস্তির কীর্তির জন্য হাসলেন। কিন্তু শুভ্রবস্ত্রা, শুভ্রহস্তীশোভিতা দেখে এবার ইচ্ছাধারীর অন্তরে সাহসের সঞ্চার হয়েছে। আর তাই তিনি এবার মাতার দিকে এগিয়ে গেলেন।

মাতার কাছে এগিয়ে গিয়ে ইচ্ছাধারী হাতজোর করে বললেন, “মাতা, আমাকে অভয়দান করুন। আমি অত্যন্ত ভীত”।

মাতা মৃদু হেসে বললেন, “কার থেকে ভয় তোর? স্বয়ং রমনাথের অংশ তুই। তাহলে আর ভয় কার থেকে?”

ইচ্ছাধারী বললেন, “ভয় তো আমার বিবাহিতা স্ত্রীদেরকে। সন্তানের রক্ষা করতে, তারা এতটাই ভয়ঙ্কর যে, তাদের সামনে তো স্বয়ং ত্রিমূর্তি যেতেও ভয় পায়! … মা, আমাকে অভয়দান দাও যে, কনো যোনির কনো পুরুষ আর কনো বিবাহিতা স্ত্রী আমার হত্যা করতে পারবেনা। না কনো মানুষ, না কনো রক্ষ, না কনো সাধ, না কনো নিসাধ, এমনকি কনো জ্বরাও আমাকে ছুটে পারবেনা”।

মাতা মৃদু হেসে বললেন, “বেশ তাই হবে। তোর মৃত্যু কনো বিবাহসম্ভাবা স্ত্রীর কাছেই হবে, তবে অবশ্যই তার বল তোর বলের অধিক হবে, তবেই সেই স্ত্রী সেই কাজে সফল হবে। আর রইলো কথা জ্বরার প্রসঙ্গ। শুধু জ্বরা নয়, সমস্ত সাধ, যারা তোর নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তাদের সেই ভাগ্যই হবে, যা তোর ভাগ্য হবে”।

ইচ্ছাধারিকে দেওয়া বরদানের ভান ডাহুক বাহুকেরও যেমন রইল, তেমনই ত্রিমূর্তিরও রইলো আর সকলেই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করা শুরু করলো যে, ইচ্ছাধারিও তো সংহারের মতই অপরাজেয় অমর হয়ে গেল। একই মতামত যক্ষস্ত্রীদেরও ছিলো, তবে মৃষু যেন তা মেনেও মানতে পারলেন না। মৃষুর কথা অনুসারে, মাতা কনো ভুল করতেই পারেনা।

সুগন্ধা ও হর্ষিতা বারবার প্রশ্ন করতে মৃষু একপ্রকার বিরক্তি নিয়েই বলে উঠলেন, “আমি ভাবিকালে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির গন্ধ পাচ্ছি। আর যেন মনে হচ্ছে, মা সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এই বরদান সমূহ দ্বারা”।

হর্ষিতা বললেন, “তুমি মা’এর ভুলকে মান্যতা দিতে পারছো না, তাই এমন প্রলপ করছো মৃষু!”

উত্তরে মৃষু বললেন, “সত্যি বলতে মা যে কি করছেন, তার অর্থ আমি বুঝতে পারছিনা। তবে আমি একটি জিনিস বুঝতে পারছি, সমস্ত সাধ, যাদেরকে ত্রিমূর্তি সকলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখেছিলেন, তাদেরকে মা বারুদা, সংহার আর ইচ্ছাধারীকে দেওয়া বরদানের মাধ্যমে নিজের এক্তিয়ারের মধ্যে নিয়ে চলে এলেন”।

হর্ষিতা পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “কি ভাবে? … মাতা তো বিবাহিতা। তুমি তাঁর নিজের অঙ্গজাত সন্তান। তারপরে মাতার নিয়ন্ত্রণে সংহার বা ইচ্ছাধারী কি করে থাকে? তাঁদের মৃত্যু তো কনো কুমারী কন্যা ও অবিবাহিতা স্ত্রীর হাতেই হবে!”

মৃষু মাথা নেড়ে বললেন, “মা’কে মা বলে চেনা তো সম্ভব, তবে তাঁকে জানা সম্ভবই নয়। তবে আমি নিশ্চিত যে, মা কনো এক লীলার বিস্তার করছেন। যেন তিনি অপেক্ষা করছিলেন, আমার পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার জন্য। আমি পরিপূর্ণ হয়ে গিয়ে নিজের স্বরূপ জেনে ফেলেছি, সম্পূর্ণ ভাবে সত্য ও অসত্যের ধারণা করে ফেলেছি। আর মা যেন ঝাড়াহাতপা হয়ে গেছেন। আর যেন তিনি কারুকে পরোয়া করছেন না। ঠিক যেন সেই অগ্নি হয়ে উঠছেন তিনি, যেই অগ্নি নিজের দিকে সমস্ত কীটপতঙ্গকে আকৃষ্ট করে তাদের দহন করে দেয়”।

“বুঝতে পারছি, তোমরা ভাবিকালের যোজনাকে দেখতে পারছো না। দেখতে আমিও পারছিনা সেই ভাবিকালকে। কিন্তু যা দেখতে পাচ্ছি, তা হলো একটা যোজনা।… মাকে আমি কখনো একাধিক যোজনা একসঙ্গে নিতে দেখিনি, এর পূর্বে। তিনি একটি একটি যোজনা নিয়েছেন, আর তার উপর ক্রিয়া করেছেন। যোজনা করে আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন, যোজনা করে পঞ্চখণ্ডে বিভাজিত করে, কৃত্তিকা, পাবনি, শ্রী, স্বেতা ও অম্বা হয়েছিলেন”।

“কিন্তু এখন যেন মা, একাধিক যোজনা ধারণ করে রয়েছেন। মা’কে আমি যতটা জানি, তিনি বরদান দেন না। প্রয়োজনও নেই তাঁর বরদান প্রদানের। তিনি স্বয়ং কারুর সাথে এসে যুক্ত থাকলে, সেটিই তাঁর সেই সন্তানের জন্য সহস্র বরদানের সমান। তাঁর প্রেম, তাঁর মমতা, তাঁর স্নেহ, সহস্র বরদানের থেকেও অধিক শক্তিশালী। কিন্তু তিনি যেন বরদান দিতে চাইছেন। যেন তিনি বরদান দেবার জন্য উৎসাহী। কেন? কি কারণে?”

“এই প্রতিটি বরদানকে, তোমাদের মনে হচ্ছে যেন উনার ভুল, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যেন তা একটি একটি যোজনা। যেন তিনি নিজে একটি যোজনার মালা নির্মাণের রজ্জু হাতে নিয়ে, সংহার, বারুদ, ইচ্ছাধারী আর তার সাথে যুক্ত সমস্ত সেনাকে সেই মালার একটি একটি করে পুষ্প রূপে বেছে নিচ্ছেন। আর আমি যা দেখতে পাচ্ছি, জানিনা তোমরাও দেখতে পাচ্ছ কিনা! মা যে জ্বরাকেও সকলের থেকে সুরক্ষিত করে নিলেন! সেটা কি নিরীক্ষণ করেছ তোমরা?”

হর্ষিতা ভ্রুকুঁচকে বললেন, “কি ভাবে? ইচ্ছাধারীর কাছে তো জ্বরাকে গচ্ছিত করে দিলেন মাতা!”

মৃষু উত্তরে গহন চিন্তার থেকে বললেন, “সেটাই তো দেখার ছিলো। … যাতে জ্বরার উপর অন্যকেউ হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সেই কারণে যেন মা তাঁর কাছে জ্বরাকে গচ্ছিত করে রাখলেন, যার নিধন একমাত্র তাঁর পক্ষেই করা সম্ভব। অর্থাৎ ইচ্ছাধারীর নাশ হলে, জ্বরা অন্য কারুর হাতে না গিয়ে, সরাসরি মাতার হাতে আসবে। … বুঝতে পারছো তোমরা এই যোজনার ভাগকে? … জ্বরাকে প্রথম মা জাগালেন, মানবের বিনাশ যেই জ্বরাগুণে সম্ভব, তাকে জাগিয়ে দিলেন। অতঃপরে জ্বরাকে ত্রিমূর্তির নাগালের থেকে সরিয়ে দিলেন”।

হর্ষিতা এই কথাতে অত্যন্ত প্রভাবিত হলেন। তিনি বললেন, “হ্যাঁ, এটাতো ভেবে দেখিনি। … মনে হচ্ছে মৃষু, তুমি ঠিকই বলছো। মাতা কিছু একটা বড় যোজনা করে রেখেছেন, আর সেই যোজনার মালাতে ফুল গেঁথে চলেছেন। আমরা তাঁর এই বিশাল কীর্তির কথা ইয়ত্তাও করতে পারছিনা। তাই মনে হচ্ছে যেন তিনি ভুল করে চলেছেন। … আমাদের মেধাশক্তির এতটা সামর্থ্যই নেই যে উনার যোজনাকে ধারণা করি, আর তাই আমরা তাঁর যোজনার ধারণাও করতে পারছি না”।

মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “মেধার এতো সামর্থ্য হবেই বা কি করে? মা তাঁর জননী, তাঁর কন্যা নয়”।

সুগন্ধা বললেন, “হীরার উপর কয়লা অকথ্য অত্যাচার করছে। দেখো তোমরা। এটা ওর একটা পদ্ধতি, মাতাকে উত্তেজিত করে দেওয়ার জন্য। … মাতা উত্তেজিত হলে, ওর কি সাধ পূর্ণ হবে?”

মৃষু খানিক চিন্তা করে বললেন, “প্রভুত্ব। … হুম, কয়লা জানে যে ত্রিমূর্তি এখনও সম্পূর্ণ ঘটনার মধ্যে প্রত্যক্ষে আসেন নি, এর অর্থ এই যে তাঁরা বন্দী। আর সেই বন্দী অবস্থার সুযোগ নিতে চাইছে সে। উত্তেজিত মায়ের দ্বারা বহু সাধের বলি চরিয়েছে কয়লা, আর সেই সমস্ত সংহারপ্রাপ্ত সাধের লহুপান করে করে, সে মায়ের বলের অবশেষ সংগ্রহ করছে। … ত্রিমূর্তি উপস্থিত থাকলে, রীতি রেওয়াজ দ্বারা এই কাজ তাঁকে করতে দিতেন না। … হুম, ত্রিমূর্তিকে মুক্ত করে আসি তাহলে”।

সুগন্ধা বললেন, “কিন্তু কেন? তাঁরা মুক্ত হলে, তারা প্রথম প্রহার তোমার উপরেই করবে। আর তাছাড়াও, তারা মুক্ত হয়ে গেলে, সাধপালকে তোমার উপস্থিতির সংবাদ প্রদান করে দেবে!”

মৃষু মাথা নেড়ে, মুচকি হেসে বললেন, “হ্যাঁ, সেটাই এবার আবশ্যক হয়ে গেছে। কয়লার মনোভাবের প্রতি ত্রিমূর্তির কখনোই আস্থা ছিলো না। সেই কারণেই হাজতকে তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন। তাই তাঁদেরকে কয়লার কীর্তির কথা বলে মুক্ত করে দিলে, তাঁরা সরাসরি কয়লাকে আটকাতে চলে যাবেন। আর সাধপালকেও তাঁরা আমার কথা বললে, সাধপালের সাথে আমার অন্তিম সংঘাত অনুষ্ঠিত হবে”।

“দেখুন দেবী সুগন্ধা, ডাহুক ও বাহুক মাতার সাথে সংগ্রামে লিপ্ত হতে সাহস জুগিয়েছে। অর্থাৎ, সাধপাল এইক্ষণে আর কারুর সাহায্য লাভ করবেনা। ইচ্ছাধারী আর সংহার তো অপেক্ষা করছে কবে সাধপাল আর ডাহুক বাহুকের নাশ হবে আর সে রাজত্ব বিস্তার করে উপনিবেশ স্থাপন করবে। তাই তারাও এই যুদ্ধে অংশ নেবেনা। কয়লার কারণে ত্রিমূর্তিও সেইদিকে চলে যাবে। অর্থাৎ সাধপাল সম্পূর্ণ একা হয়ে যাবে। তার আর আমার নির্ণায়ক যুদ্ধ ঘটে গেলে, সমস্ত প্রেতকে আর আপনাদেরকে মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব হয়ে যাবে। অর্থাৎ, নবযোনি নির্মাণের ভিত্তিকে সাজিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়ে যাবে। তাই এই সঠিক সময়, ত্রিমূর্তিকে মুক্ত করার জন্য, আর মায়ের সমস্ত সন্তানদেরকে সাধপালের প্রভুত্ব থেকে মুক্তি প্রদান করার”।

হর্ষিতার যে মৃষুর প্রতি স্নেহ উপস্থিত, তা নিয়ে এতক্ষণ সকলের মধ্যে দ্বন্ধ উপস্থিত ছিলো। এবার সেই দ্বন্ধের বাদল কেটে গেল। সে উৎকণ্ঠার সাথে বলে উঠলো, “কিন্তু মৃষু, ত্রিমূর্তি তাঁদের কাজে হস্তক্ষেপ করার জন্য, তোমাকে এর পূর্বেও অভিশাপ দিয়েছিলেন। সাধপাল ত্রিমূর্তির পছন্দের ঘোড়া। তাঁর হত্যা করার জন্য, তাঁরা আবার সকলে মিলে আপনাকে অভিশাপ দেবেন না তো?”

মৃষু হেসে বললেন, “সকলে নিজেকে কর্তা ভাবেন। কিন্তু কর্তা তো আমার মা’ই। ত্রিমূর্তি ভাবছেন, শ্রাপ তাঁরা দিয়েছেন আমাকে। কিন্তু আসলে তো তাঁরা সেই শ্রাপ দেবার শক্তিই লাভ করেছে আমার মায়ের কারণে। অর্থাৎ আমার মা আমাকে সেই শ্রাপে ভূষিত হতে দিয়েছিলেন। … আমি আমার সত্যের, আমার জন্মের কারণের উপলব্ধি করার অন্তিম ক্ষণে এসে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পরেছিলাম। ক্রমশ মাতার প্রতি আমি আসক্ত হয়ে উঠছিলাম। সেই কারণেই তো মা আমাকে এই শ্রাপ ভোগ করতে দিলেন। আমার সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাস, আমার নিজের ইতিহাস সমস্ত কিছুকে একত্রিত করে নেওয়ার প্রয়োজন পরেছিল, সম্যক ভাবে মৃষু হয়ে ওঠার জন্য। কিন্তু মায়ের প্রতি আসক্তি এসে যাবার কারণে, আমি আমার কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছিলাম। তাই মা ত্রিমূর্তির মাধ্যমে শ্রাপ প্রদান করিয়ে, আমাকে আমার কর্তব্যের দিকে ঠেলেও দিলেন আর আমার প্রকৃত শত্রুর স্মৃতিও ফিরিয়ে দিলেন”।

“তিনি তো কখনোই চান নি যে আমি তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে গিয়ে, প্রেমের পরিবর্তে তাঁর প্রতি মোহের জন্ম দিই, আর সেই মোহের ফাঁদে পরে আমার জন্মের উদ্দেশ্যই আমি ভুলে যাই। তাই নিশ্চিন্তে থাকুন দেবী। যদি আমার আরো কিছু উপলব্ধি বাকি থাকে, মা আবারও আমাকে শ্রাপিত হতে দেবেন, নাহলে তিনি আমাকে শ্রাপিত হতেই দেবেন না। আর তিনি যদি শ্রাপিত হতে না দেন কারুকে, তাহলে কার সাধ্যি কেউ কারুকে শ্রাপ বা বরদান দেন!”

এতো বলে মৃষু চলে গেলে, হর্ষিতা মৃষুর পদাঙ্ককে অত্যন্ত স্নেহের দৃষ্টি দ্বারা দেখতে থাকলেন। সেই দেখে বাকি যক্ষস্ত্রীর সাথে সাথে, দেবী সুগন্ধাও হাসির ছলে বলে উঠলেন, “হর্ষিতার মনে হয় প্রথমবার কনো পুরুষে মন লেগেছে!”

হর্ষিতা সেই কথাতে প্রথমে সলাজ হয়ে মাথা নামিয়ে নিলেন। অতঃপরে বিরোধ করে বললেন, “পুরুষ বলতে যা বুঝি, যা জেনেছি এতকাল ধরে, তার লেশমাত্রও নেই মৃষুর মধ্যে। তাঁর মধ্যে আছে আমাদের সকলের মা, জগজ্জননীর প্রতি অকাট্য বিশ্বাস, আর সেই বিশ্বাসের উৎস হলো অপার প্রেম। উনার হৃদয় যেন জগন্মাতার মতই বিশাল, যেন সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড সেই হৃদয়ে স্থান পেতে পারে। … আর দেখো না, অন্য পুরুষদের মত নিজের চোখদিয়ে জগত দেখেনই না ইনি। ইনি তো জগত দেখেনই জগন্মাতার চোখ দিয়ে। নিজের চোখের উপর ভরসাই নেই ইনার। পূর্ণ পবিত্র। … যেন পুরুষ নন, কনো ঈশ্বরীয় রূপ ইনি”।

দেবী সুগন্ধা হেসে বললেন, “মাতার কাছে কি আবদার করবো, মৃষুর সাথে হর্ষিতার বিবাহ স্থির করার!”

হর্ষিতা একদৃষ্টে মৃষুর দিকে দেখতেই থাকলেন, আর মাথা নেড়ে বললেন, “মাতাকে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু বলার প্রয়োজন হয়না। মৃষুর থেকে এটুকুই শিখতে পেয়েছি আমি। আমার ভালো কিসে, তা আমার থেকে অনেক অনেক ভালো জানেন মাতা স্বয়ং। … তাই মাতাকে কিচ্ছু বলার প্রয়োজনই নেই। … আর মৃষুর পত্নী তো স্বয়ং ধরিত্রী!”

দেবী সুগন্ধা সেই কথার বিরোধ করে বললেন, “কিন্তু একাধিক পত্নী তো তাঁর পূর্বেও ছিলো!”

হর্ষিতা মিষ্ট হেসে বললেন, “সুগন্ধা, মাতার এই পুত্রের পত্নী হবার অর্থ জানো? … দায়িত্বপালন। … ইনি অনন্ত যোদ্ধা। পরমাত্মের সাথে সংগ্রামে যুক্ত ইনি আদিকাল থেকে, জন্মের মুহূর্ত থেকে। আর সেই যুদ্ধ তিনি করছেন, তাঁর মায়ের প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার রূপে, তাঁর প্রতিটি ভ্রাতা ও ভগিনীর সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার রূপে। ইনার সাথে স্ত্রী কেন, যেই ভাবেই যুক্ত থাকা যায়, তার সাথে যে একটা অনন্ত দায়িত্ব থেকেই যায়। শিশুর মত সরল তাঁর হৃদয়ের সরলতাকে অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্ব”।

“সর্বক্ষণ তিনি যুদ্ধ করছেন। মায়ের প্রতিটি সন্তানকে মুক্ত করার পথ খুঁজে চলেছেন অনুক্ষণ। এক মায়ের যদি কনো একটি সন্তান থাকে যে সর্বক্ষণ তাঁর বাকি সন্তানের চিন্তা করতে থাকে, সে যে মায়ের সর্বাধিক প্রিয় সন্তান হয়। তাই জগন্মাতার প্রিয়তম সন্তান তিনি। আর তাই জগন্মাতার প্রেম স্বরূপ সমস্ত উষ্মা তাঁর কাছে সর্বক্ষণ এসে পৌঁছচ্ছে। কিন্তু মানবদেহের সেই সামর্থ্য কোথায় যে জগন্মাতার অনন্তপ্রেমকে সহন করবে?”

“জগন্মাতার প্রেম যে মানবের দেহের কাছে উপস্থিত হওয়া চরমতম অত্যাচারই হয়, কারণ তাঁর প্রেম যে সহন করার শক্তি দেহের থাকেনা। … কিন্তু সেই প্রেমের অনুভতি সন্তানকে এতটাই মশগুল করে রাখে যে, হাসির ছলে সেই সমস্ত নিপীড়নকে সেই সন্তান আনন্দের সাথে গ্রহণ করে নেয়। তাই মৃষুর সাথে যে যেই ভাবেই যুক্ত থাকবে, তাঁর যে দায়িত্ব হয়ে ওঠে যে, মাতার প্রেমের কারণে তাঁর দেহে যেই নিপীড়ন রেখা প্রকট হবে, তার নিরাময় করা। শিশু তিনি, তাই তাঁকে শিশুর ন্যায়ই ধরেবেঁধে, শাসন করে সেবা করতে হয়”।

সুগন্ধা আবার কিছু বলতে গেলে, “স্ত্রী হবার যোগ্যতা নেই আমার সুগন্ধা। জগন্মাতার প্রিয় সন্তানের স্ত্রী হবার যোগ্যতা আমার নেই। অন্নপূর্ণার সন্তানকে রন্ধন করে আহার দ্বারা তুষ্ট করার সামর্থ্য আমার নেই। আমার তাঁর প্রতি পতিভাব আসছেও না। আসছে সখা ভাব। হৃদয়ের খুব নিকটের মনে হচ্ছে তাঁকে। যেন তাঁকে সমস্ত কথা বলতে পারি, যেন তাঁর কথা অনন্তকাল শুনতে পারি। … স্ত্রী হবার দাবি করতে গেলে, নিজের প্রতি হীন ভাব আসছে সুগন্ধা”।

“মনে হচ্ছে, কিছু দেবার সামর্থ্য নেই, প্রেমলাভের লোভ জেগেছে মনে। … এই নিঃস্বার্থ যোদ্ধার নিঃস্বার্থ ও নিঃশর্ত সঙ্গী হবার ইচ্ছা জাগছে। তাঁর সান্নিধ্যলাভেই ধন্য হয়ে যাবো। সে তো কেবল আমি নই, সকলেরই একই দশা। কিন্তু কনো সম্পর্কের নাম না নিয়ে, কনো চাওয়াপাওয়ার গণ্ডিতে প্রবেশ না করে, তাঁকে নিজের সমস্ত স্নেহের উষ্মা প্রদান করতে ইচ্ছা হচ্ছে। দিতে ইচ্ছা হচ্ছে। প্রবল ভাবে সমস্ত কিছু দিতে ইচ্ছা হচ্ছে”।

সুগন্ধা বললেন, “কিন্তু হর্ষিতা! সমস্তকাল আমরা সকলে বিভিন্ন পুরুষের সংসর্গে এসেছি, কিন্তু আমাদের মধ্যে সর্বাধিকই সুন্দরী হয়েও তুই পুরুষ সঙ্গ থেকে সবসময়ে দূরে থাকতিস। পূর্ণ পবিত্র তুই। সর্বাধিক সুন্দরী তুই। কিন্তু এই ভাবে কেন?”

হর্ষিতা হেসে বললেন, “সুগন্ধা, মৃষুর কাছে দেহরূপ, তার সাথে দেহের সৌরভ আর লাবণ্য কি জানো? তাঁর মায়ের নির্বাচিত সন্তান, যার মধ্যে সে দেখতে পায় তাঁর মায়ের প্রদান করা দায়িত্ব যত্ন করার। … মৃষুর মধ্যে ভোগবাসনার লেশমাত্রও নেই। পূর্ণ ভাবে পবিত্র সে। কামভাব থেকে ঠিক ততটাই মুক্ত, যতটা তাঁর ও আমাদের সকলের মাতা। তিনি কেবল দেহেই পুরুষ। পুরুষদের লেশমাত্র গুণও নেই তাঁর মধ্যে। আর সত্যি বলতে, মা যে আমাকে এই পবিত্র রেখেছেন এতকাল, সমস্ত পুরুষসঙ্গ থেকে মুক্ত রেখেছেন এতকাল, আজ যেন মনে হচ্ছে তাঁর এই প্রিয়পুত্রের সখী করার জন্যই করেছিলেন”।

“তিনি তাঁর পুত্রকে জানেন। কামনাবাসনার লেশ মাত্রও নেই তাঁর মধ্যে। সংসর্গ কেবল আনন্দ করার জন্যই হয় তাঁর কাছে, ভোগের কথা শুনলেও তাঁর মধ্যে জ্বরার আবেশ জেগে ওঠে। স্নিগ্ধ, অদৈহিক স্নেহদান ও স্নেহলাভই তাঁর কাছে প্রিয়। আর তাই তো তিনি আমাকে এই পবিত্রতা দান করেছেন। যাতে তাঁর পুত্র প্রাণের সখীর কাছে থাকার নিশ্চিন্ততা অনুভব করে, যেখানে না সম্মুখের ব্যক্তি ভোগ করার চিন্তা করছেন, আর না তাঁকে সম্মুখের ব্যক্তিকে ভোগ করার চিন্তা করতে হবে”।

সুগন্ধা আর একটি কথাও বলতে পারলেন না। যেন তাঁর বলতে ইচ্ছা করলো যে, মৃষুর সান্নিধ্যে এসে তাঁদের সকলের মধ্যেই এক সাধ্যিভাবের সঞ্চার হয়েছে। কিন্তু হর্ষিতা যেন পূর্ণ ভাবে সাধ্যি হয়ে গেছেন। বলতে ইচ্ছা হলো যেন, সাধ্যি যেমন দেহসম্বন্ধকে ঘৃণ্য অনুভব করে, আর অদৈহিক সম্পর্কই তাঁর কাছে একমাত্র সম্পর্ক, কারণ সেই সম্পর্কে দেহের আঁশটে গন্ধ থাকেনা, হর্ষিতার মধ্যে সেই ভাব সম্পূর্ণ ভাবে প্রকট হয়ে গেছে। কিন্তু তাও তিনি বলতে পারলেন না কথাগুলো। আর না বলতে পেরে তাঁর মৃষুর কথাই মনে পড়লো। মৃষু বলে, ভাবতে আমরা যা কিছু পারি, কিন্তু ভাবনাকে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে যেই শক্তির প্রয়োজন, তা স্বয়ং আমাদের মা। তাই যেই শব্দকে তিনি উচ্চারিত হতে দিতে চাননা, সেই কথা উচ্চারণের শক্তিও তিনি প্রদান করেন না। সত্যই তাই। কিন্তু কেন চান না মা এই কথা বলতে হর্ষিতাকে? তিনি কি ভয় পান যে, এই সমস্ত কথা শুনে হর্ষিতার মধ্যে অহমভাবের জন্ম নিয়ে নিতে পারে আর তা হর্ষিতার পবিত্রতাকে খণ্ডন করে দিতে পারে!

মৃষু চলে গেলেন ত্রিমূর্তির কাছে। তাঁদের সামনে গিয়ে বললেন, “কি করছে কয়লা দেখেছেন প্রভুরা? সে তো মায়ের দমন করা সাধদের রক্ত পান করে করে, মায়ের বল সংগ্রহ করে আপনাদের ত্রিমূর্তির থেকেও অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠতে চাইছে! … আটকাবেন না তাঁকে?”

রমনাথ বললেন, “ডাহুকবাহুক আছে। তারা এমন কিছু হতে দেবে না”।

পীতাম্বর বললেন, “আমাদের তো তুমি বন্দী করে রেখেছ। কি করে যাবো আমরা? কি করে আটকাবো কয়লাকে?”

মৃষু মৃদু হাস্যে বললেন, “সেই কারণেই তো মুক্ত করতে এসেছি আপনাদেরকে। এতক্ষণে তো কয়লার কাছে এমন বল এসে গেছে যে, আপনারা একাকী তাঁর কিচ্ছু করতে পারবেন না। আপনাদের ত্রিমূর্তিকে একমূর্তি হয়েই কিছু করতে হবে। … তবে কথা রইল ডাহুকবাহুকের! ডাহুকবাহুক তো কয়লাকে এই কাজে মদত দিচ্ছে, কারণ তারা তো মনে করছে যে একমাত্র কয়লা এমন বল সংগ্রহ করেই তাদেরকে মাতার প্রকোপ থেকে বাঁচাতে পারবে”।

শ্বেতাম্বর বললেন, “মুক্ত করো আমাদেরকে। কয়লাকে এইমুহূর্তে আটকাতে হবে, নাহলে সে ত্রিমূর্তির ব্রহ্মাণ্ডকে অধিকার করে নিয়ে, তাতে যা খুশী করতে থাকবে”।

মৃষু মাথা নেড়ে বললেন, “হুম, সঠিক কথা। আমারও তাই মনে হয়েছে। আর সেই কারণেই তো আপনাদের মুক্ত করতে এসেছি”।

এতবলে মৃষুর নিজের নির্মাণ করা বন্ধন থেকে মুক্ত করে দিলেন ত্রিমূর্তিকে। ত্রিমূর্তি মুক্ত হয়ে মৃষুর দিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকালেন, যেন এইমুহূর্তে মৃষুকে তার কৃতকর্মের জন্য দণ্ড প্রদান করতে উৎসুক তাঁরা। কিন্তু পরমুহূর্তে একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে বলাবলি করলেন, “মৃষুকে তো পরে দেখে নিচ্ছি আমরা। আগে কয়লাকে সামলাতে হবে”। আর সেই কথা বলে তাঁরা ত্রিছেত্র ত্যাগ করে, সরাসরি কয়লার দিকে অগ্রসর হলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22