৫.৩। রূপবিস্তার পর্ব
মৃষু তাঁর সমস্ত দলের সাথে ও যক্ষস্ত্রীদের সাথে একনিষ্ঠ হয়ে মাতার কীর্তিকে দেখতে থাকলেন। প্রথমেই যেই দৃশ্য দেখলেন, সেটি মাতার নয়, সেটি কয়লার। কয়লার সাথে সাখ্যাত করতে গেলেন স্বয়ং ডাহুক বাহুক। ডাহুক বাহুক কয়লার সাথে দেখা করে বললেন, “কয়লা, সাধপালের জীবন সঙ্কটে, কারণ মৃষু তার কাছে গেছে। সাধপালের কাছে সেই বার্তাও নেই যে মৃষু তার উদ্দেশ্যে গেছে। স্বয়ং রমনাথ তাঁকে সেই বার্তা দিতে গেছিলেন, কিন্তু সাধপালের তেপুরমে আমরাও প্রবেশ করতে পারিনা। তাই কি যে হয়েছে সেখানে, আমরা কেউ জানিনা। তবে এটুকু জানি যে রমনাথ সেখান থেকে এখনো ফেরেন নি”।
“কয়লা, এমন পরিস্থিতিতে, সব কিছু নির্ভর করছে তোমার হাতে। দেবী অম্বিকাকে আটকানোর সামর্থ্য কারুর নেই। রমনাথ যাই বলুক, আর পিতা পীতাম্বর বা পিতৃতুল্য শ্বেতাম্বর যতই হম্বিতম্বি করুক। একমাত্র উপায় হলো তাঁকে বন্দী করে রাখা। আর সেই কাজ একমাত্র করতে পারে হীরা। হীরার আহ্বানেই দেবী তোমাদের দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। উগ্র করতে থাকো তাঁকে কয়লা”।
“উগ্রতা বিবেক হনন করে দেয়, আর একমাত্র বিবেক হনন হলেই হীরার কাছে তিনি আসলে, তুমি তাঁকে পাশে আবদ্ধ করে দেবে, তা তিনি দেখতে পাবেন না”।
কয়লা হেসে বললেন, “উনাকে বন্দী করার ব্যাপারে হীরা কি বলেন জানেন সাধরাজ ডাহুক? হীরা বলে, মাতাকে বন্দী করার সাধ্য কারুর নেই, না সজ্ঞানে আছে, আর না অজ্ঞানে। যে তাকে বন্দী করতে যাবে, তারই নাশ হয়ে যাবে”।
বাহুক বললেন, “কিন্তু তোমার কাছে পীতাম্বরের দেওয়া কবচ আছে, রমনাথের দেওয়া বরদান আছে যে তুমি যেকোনো কারুকে বন্দী করে, তার সম্পূর্ণ শক্তি আত্মসাৎ করতে পারো!”
কয়লা পুনরায় এক বিটকেল হাস্য হেসে বললেন, “হীরা বলে, যেই পীতাম্বর, যেই রমনাথ নিজেই সুরক্ষিত নয় মাতার থেকে, তাদের কবচ মাতার সামনে কি করে টিকতে পারে! … আরো বলে সে আমাকে যে, ভ্রাতা শক্তিমানের থেকে শক্তি হনন করা সম্ভব, শক্তির থেকে শক্তি হনন সম্ভবই নয়। প্রশ্নের উত্তরে বলে, মাতা শক্তিমান নন, স্বয়ং শক্তি। শক্তির শক্তি কি ভাবে হনন করবে!”
ডাহুক চিন্তিত হয়ে বললেন, “তাহলে উপায় কি?”
কয়লা মৃদু খল হাসি হেসে বললেন, “খেলা খেলতে হবে সাধরাজ। একসাথে সকলের সাথে খেলা খেলতে হবে। মৃষু, দেবী, আর ত্রিমূর্তিও”।
বাহুক বললেন, “এখানে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, আর তুমি ক্রীড়ার কথা বলছো? তোমার মস্তিষ্ক তো ঠিক ঠিকানায় আছে?”
কয়লা পুনরায় একটা হাসি প্রদান করে বললেন, “সাধপালের ডেরায় রমনাথ আগেও গেছিলেন, জানেন কি এই ব্যাপারে কিছু?”
ডাহুক বললেন, “গেছিলেন জানি, এর থেকে অধিক কিছু জানি না”।
কয়লা বিদ্রূপের হাস্য হেসে বললেন, “প্রবেশ করতে পারেন নি। … হ্যাঁ, ঠিক শুনছেন, প্রবেশও করতে পারেন নি সাধপালের দরবারে”।
বাহুক উত্তেজিত হয়ে বললেন, “যা বলার স্পষ্ট বলো কয়লা। তোমার হেঁয়ালি বোঝার সময় দেবার মত সময় আমাদের হাতে নেই”।
কয়লা একটি গভীর নিশ্বাস নিয়ে বললেন, “আমার কথার তাৎপর্য এই যে, সাধপালের তেপুরমে একমাত্র সাধপালই সুরক্ষিত, অন্য কেউ নয়। আর সেই সুরক্ষাকবচই যার কাছে ধরাশায়ী হবার জন্য প্রস্তুত, তা হলো মৃষুর। অর্থাৎ রমনাথ উত্তেজনা বসে, তেপুরমে গিয়ে খুব বড় ভুল করে ফেলেছেন। আর তার থেকেও বড় ভুল, আমি নিশ্চিত এই ব্যাপারে যে, যা স্বয়ং মৃষু করেছে”।
“জন্মশত্রু রমনাথকে বাগে পেয়ে, নিশ্চিত ভাবে মৃষু তাঁকে বন্দী করে দিয়েছে তেপুরমেই। আর সেই কারণেই রমনাথ সেখান থেকে আর প্রত্যাবর্তন করেননি”।
ডাহুক বললেন, “যোজনা কি তোমার?”
কয়লা উত্তরে বিদ্রূপের হাস্য হেসে বললেন, “অপেক্ষা করানোর। ত্রিমূর্তিকে বন্দীদশায় অধিক ক্ষণ আটকে রাখাই আমার যোজনা। আর তারা ততক্ষণই সেখানে আটকে থাকবেন, যতক্ষণ দেবী অম্বিকা হীরা পর্যন্ত যাত্রা করবেন। আমি জানি, এই সমস্ত কিছুতে আমার পরিণতি হলো মৃত্যু, কনো সন্দেহ নেই এই ব্যাপারে। কিন্তু আমি যতই দেরি করাবো আমার মৃত্যুকে, ততই অধিকক্ষণ ত্রিমূর্তি বন্দী থাকবেন তেপুরমে”।
বাহুক বিরক্ত হয়ে উঠে বললেন, “তাতে আমাদের কি?”
কয়লা আবারও হেসে বললেন, “যত অধিক ক্ষণ ত্রিমূর্তি বন্দী থাকবেন, তত অধিক উগ্র হয়ে উঠবেন তাঁরা। আর যত অধিক উগ্র হয়ে উঠবে তারা, ততই বৃহত্তর অভিশাপ আসতে চলেছে মৃষুর উপর। বন্দী হবার পর, ত্রিমূর্তি মৃষুর সাথে সম্যক যুদ্ধে যাবার সাহস তো দেখাবেন না, কারণ এতক্ষণে তো তাঁরা জেনে গেছেন যে মৃষুর সাথে সম্যক যুদ্ধে সম্মুখীন হবার সামর্থ্য তাঁদের না একার আছে, আর তিনজনের মিলিয়ে আছে। তাই নিজেদের বন্দীদশার প্রতিকার নেবেন তাঁরা অভিশাপ দিয়ে, বিধাতা হবার অধিকার খাটিয়ে রমনাথ এরপূর্বেও মৃষুকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। তবে এবার আরো অধিক মাত্রার অভিশাপ আসতে চলেছে”।
ডাহুক এবার উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “আর মৃষু অভিশপ্ত হলে, দেবী অম্বিকা ভেঙে পরবেন, আর অনন্ত কালের জন্য আমরা অমর হয়ে থেকে যাবো। … অসম্ভব সুন্দর যোজনা তোমার কয়লা। আর হ্যাঁ, অফুরন্ত ধন্যবাদ তোমাকে। অদ্ভুত তোমার রাজভক্তি। রাজার সুরক্ষার জন্য, তুমি নিজের প্রাণকে পণ করে রেখে দিয়েছ। নিশ্চিন্ত হলাম কয়লা। রমনাথ তোমাকে সবসময়েই পিছনের সারিতে রাখেন। কিন্তু আমি তোমার উপর বরাবর বিশ্বাস করে এসেছি, কারণ তুমি অত্যন্ত বাস্তববুদ্ধি সম্পন্ন। জেদ বা কল্পনার ভিত্তিতে তুমি কনো ক্রিয়া করো না”।
কয়লা হেসে বললেন, “রমনাথ এই কারণে আমাকে অপছন্দ করেন না যে, আমি অক্ষম বা আমি দুর্বল। বরং এই কারণে আমাকে অপছন্দ করেন কারণ, আমি আমার যোজনার মধ্যে তাঁদেরকে অর্থাৎ ত্রিমূর্তিকেও সামান্য সেনার মত ব্যবহার করি। আমি জানিনা যে আমার কীর্তির কারণে সাধকুল শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাবে কিনা, কারণ যার সাথে সংগ্রামে নেমেছে সাধকুল, তিনি হলেন স্বয়ং পরাপ্রকৃতি। … তবে হ্যাঁ, এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত যে, সাধকুল যদি শেষপর্যন্ত রক্ষা নাও পায়, নিজেদের কীর্তির কারণে এই কুল ইতিহাসের পাতায় খলনায়ক হয়ে হলেও থেকে নিশ্চয়ই যাবে”।
সমস্ত কিছু দেখে মৃষু মাথা নেড়ে বললেন, “সবাই নিজের নিজের আত্মকে প্রতিষ্ঠিত করতে আকাঙ্ক্ষী। ইতিহাসের পাতায়, তাঁর আত্মের নাম লেখা থাকবে। তাঁর আত্ম জীবিত থাকবে!”
হর্ষিতা বললেন, “ক্ষমা করবেন মৃষু, আপনিও তো একই কীর্তি করছেন!”
মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “যদি তাই হতো, তবে অনন্যের বেশে, আমি গুণকে দিয়ে যুদ্ধ করিয়ে, নিজে নিরস্ত্র থাকতাম না। বিচার করে দেখুন ভালো করে দেবী। কোথাও আপনার ভুল হচ্ছে। আমি আত্মস্থাপনার যুদ্ধে ভাগ নিই নি। আমি প্রতিকারের সংগ্রামে ভাগ নিয়েছি। … আমার জন্মের আগে থেকে আমার পিতা, আপনাদের আরাধ্য, রমনাথ আমার প্রাণ নেবার প্রয়াস করেছে। তা জেনেও, আমার মধ্যে কনো প্রকার প্রতিক্রিয়া জাগেনি। আর না সেই অনাচার নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র চিন্তিত ছিলাম”।
“বিচার করে দেখুন, আমি যে মা-হারা, মায়ের থেকে দূরে অবস্থান করছি, মায়ের সংসর্গ পাচ্ছিনা, তার কারণেও আমি কখনো স্বেচ্ছা থেকে রমনাথের উপর কনো প্রকার আক্রমণ করিনি। যখন যখন তিনি আমার অস্তিত্বকে হনন করতে এসেছেন, আমি যুদ্ধ করেছি। সমস্ত যুদ্ধে জয়লাভ করার পরেও, কখনোই রমনাথের কাছে গিয়ে তাঁকে আক্রমণ করিনি, বা যেই দেহধারণ করে তিনি আমার সাথে যুদ্ধে রত হয়েছিলেন, তার প্রতিও কনো প্রকার অসম্মানও প্রদর্শন করিনি”।
“তবে যেদিন মায়ের কাছে পৌঁছেছি, সেদিন প্রথম জানলাম যে, আমার পিতার তো আমার সাথে শত্রুতাই নেই। আমি তাঁর শত্রু, কারণ তাঁর শত্রুর প্রেম আমি। তাঁর শত্রু হলেন আমার মা। কিন্তু তাও মা কখনো তাঁকে আক্রমণ করেন নি, শুধুই তাঁর আক্রমণের থেকে নিজেকে নয়, নিজের সন্তানকে সুরক্ষিত করার প্রয়াস করে গেছেন। তাঁর সন্তানরা সহস্র লক্ষ্য টুকরে বিভাজিত হয়ে গেছে, তাই তিনি তাঁদের সুরক্ষার জন্য স্বয়ং প্রকৃতি হয়ে, সকলের রক্ষার্থে নিজকে নিয়জিত রেখেছেন”।
“তাঁর সন্তানরা টুকরো টুকরো ভ্রূণরূপে মেধা হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, তাঁরা প্রকৃতির বার্তা উপলব্ধি করতে অক্ষম হয়ে যায়। তাই মাতা আমার রচনা করেন। উদ্দেশ্যে একটিই, নিজের সন্তানদের একত্রিত করা, তাঁদেরকে মাতার মমতা প্রদান করা, তাঁদেরকে সুরক্ষিত করা। আর এই কর্মের ফাঁকে, একটি বারের জন্যও তিনি নিজেকে ঈশ্বর রূপে পরিচয়টাও দেননি, কেবলই মা হয়ে থেকেছেন, আর মায়ের ধর্ম পালন করেছেন, সন্তানদের অপার প্রেম করে গেছেন”।
“আর তাঁর শত্রু, অর্থাৎ আপনাদের আরাধ্য, পরমাত্ম এবারও তাঁর সন্তানকে আঘাত করতে উঠে পরে লেগে পরেন। সাধপালের কাছে তিনি নিজে বার্তা দিয়েছেন, এই মৃষুর ভ্রূণকে নষ্ট করার জন্য। সেই সাধপাল যাতে মৃষুকে সাতটুকরে বিভাজিত করতে পারে, তাই ত্রিমূর্তি ত্রিমোক্ষম অস্ত্র হয়ে ধরা দিয়েছেন। এমনকি পুত্রের বিভাজনের বেদনার অনুভবকে পূর্ণ ভাবে ধারণ করতে, মাতা নিজেকেও তিনটুকরে বিভাজিত করে নেন”।
“না মৃষু, আর না মৃষুর মাতা, আর না মৃষুর মায়ের একটিও সন্তান, কনো কালে যুদ্ধ করতে আগ্রহী হয়েছিলেন ত্রিমূর্তির সাথে, যতই সমস্ত অত্যাচার তাদের উপরই হয়েছে। … কিন্তু যেই মুহূর্তে আমি জেনেছি যে, যিনি স্বয়ং এক ও একমাত্র ঈশ্বর হয়েও, স্বয়ং আল্লাহ হয়েও, ব্রহ্ম হয়েও, সেই দিকে না তাকিয়ে, নিজের প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত না হয়ে, কেবলই মা হয়ে বিরাজ করে গেছেন, কেবলই প্রেম করে গেছেন, কেবলই নিজের সন্তানদের থেকে দূরত্বে থাকার কারণে বিরহ বেদনা সহন করে গেছেন, সেদিন নিশ্চয় করে নি আমি যে, এবার আমি আক্রমণ করবো”।
“নিজের মায়ের মমতাতে যে বা যারা আঘাত করেছে, তাদের মধ্যে যাদের সূক্ষ্ম থেকে কারণে প্রেরণ করা সম্ভব, আর যাদেরকে অধিপতি থেকে দাস করে দেওয়া সম্ভব, আমি তাই করবো। আমরণ তাই করবো। আমার মায়ের মমতার উপর যে বা যারা আঘাত করেছে, তাদেরকে এবার মায়ের প্রতিকার সহ্য করতে হবে। … আর অন্যদিকে, আমার উপর হওয়া সমানে আঘাত, আমার মাতাকেও আজ উদ্যত করে দিয়েছে। এবার আর নয়, এবার সন্তানের উপর আঘাতের প্রতিকার তিনিও নেবেন। তাই এবার তিনি নিজের যাত্রা শুরু করে দিয়েছেন। তাই না আমি, না আমার মা, আর ভাবিকালেও না আমার মায়ের অন্য কনো সন্তান কখনো নিজের আত্মকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ক্রিয়া করবে। আমরা সকলে পরাপ্রকৃতির সন্তান। আর প্রকৃতির ধারাই হলো দেওয়া। প্রকৃতি কিছু চায় না, শুধুই দেয়”।
সকল যক্ষস্ত্রী এই সমস্ত কথা শুনে লজ্জিত হয়ে গেলেও, দেবী হর্ষিতা তখনও তর্কযুদ্ধ চালিয়ে যেতে আগ্রহী হয়ে রইলেন। আগ্রাসী হয়ে তিনি বললেন, “এতোই যদি সন্তান প্রেম, তাহলে জগন্মাতা তাঁর সন্তান, মৃষুকে নিজের থেকে এতকাল দূরে রাখলেন কেন?”
মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “এখানেই তো পার্থক্য, দেহপ্রদান করা মায়ের আর প্রকৃত মায়ের মধ্যে। দেহপ্রদান করা মা নিজের প্রতিষ্ঠার ভার অর্পণ করেন সন্তানের উপর, আর যিনি প্রকৃত মা, তিনি সন্তানের জন্মের উদ্দেশ্যের দিকে তাঁকে অগ্রসর করেন। একবারও ভাবেন না যে, এই উদ্দেশ্যের দিকে সন্তানকে ঠেলকে দেবার কারণে, সন্তান তাঁর প্রতি চিরকালের জন্য রুষ্টও হয়ে যেতে পারেন। … তিনি তো মা, আর তাই মায়ের মতই সমানে এই কামনা করেন যাতে, সন্তান নিজের জীবনের অস্তিত্ব পূর্ণ করতে পারে”।
“সেই অস্তিতের কারণ পূর্ণ করার জন্য যদি সন্তান মাকে ভুলও বোঝে, তাতেও তাঁর কিছু এসে যায় না। সন্তানদের নিজের থেকে দূরে রাখতে বাধ্য হয়ে তিনি প্রথম দিন থেকে যেই বেদনার শিকার, সেই বেদনা আরো একবার সহন করে নেবেন”।
দেবী হর্ষিতা ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “এর অর্থ কি?”
মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “এর অর্থ এই যে, আমার জন্মের উদ্দেশ্যই হলো, আমার ভ্রাতাভগিনী, অর্থাৎ মায়ের সমস্ত সন্তানের ভ্রূণ বা মেধাদের মেধা থেকে চেতনার পথে চালিত করে, চিরসুরক্ষিত করে দেওয়া। … আর তাঁদেরকে সেই পথে চালিত করতে গেলে, তাঁদের অন্তরে মা’কে অনুভব করতে না পেরে, সেই মায়ের প্রেমকেই সর্বত্র খুঁজে বেরানোর ভাবকে আমাকে অনুভব করতে হতো”।
“দেবী, দেখুন ভালো করে, প্রতি মুহূর্তে মায়ের সমস্ত সন্তান, অর্থাৎ সমস্ত মেধা কাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন? নিজের মা’কেই। সেই মাকে, যেই মাকে আপনাদের আরাধ্য তাঁদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, আক্রমণ করে করে। সেই সন্ধানের কারণেই তারা কখনো দেহদাত্রী মাতাকে সেই মা ভেবে প্রেম করতে যাচ্ছে, তো কখনো দেহদাতা পিতাকে। সেই সন্ধানের কারণেই কখনো স্ত্রীর মধ্যে বা কখনো পুরুষের মধ্যে, বা কখনো সেই দেহধারী যার দেহকে তাঁর ঔরস ভ্রমজগতে সম্মুখে এনেছে, তার মধ্যে খুঁজে যাচ্ছে”।
“মায়ের সান্নিধ্য-সুখের সন্ধানেই প্রতিটি মেধা হাজার হাজার নেশা করছে। কখনো সেটা কেবলই দেহের আর মস্তিষ্কের নেশা যেমন সুরা, ধূম্র বা কনো তরল, তো কখনো সেটা মানসিক নেশা যেমন ধন, সম্পত্তি, বা কামভাব। আর আপনাদের আরাধ্য ভেবে যাচ্ছে যে, এই সমস্ত কিছু করছে মেধারা, কারণ সকলে তাঁর বশ হয়ে আছে। মূর্খ সে, আর এই মূর্খতার কারণ এই যে সে বোঝেই না যে, ঈশ্বরত্বও মাতৃত্বের কাছে নিছক এক ক্রীড়া মাত্র”।
“তাঁর কাছে তো ঈশ্বরত্বই সমস্ত কিছু। নিজেকে ঈশ্বর প্রমাণ করার জন্য কি না করেন নি তিনি। তাই না? জীবিতকে মৃত করেছেন, মৃতকে জীবিত করেছেন। যেই ভূতসমূহ মেধার রক্ষণ করে বেড়ায়, সেই ভূতদের বশ করার জন্য নাগাদের, যক্ষদের উপস্থিত করেছেন, মন্ত্র, যন্ত্র আর তন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। … তাই তিনি কি বুঝবেন, মাতৃত্বের মহিমা কি?”
“তিনি বুঝবেন কি করে মাতৃত্ব কি সুধা, যার কারণে স্বয়ং ঈশ্বর, স্বয়ং আল্লাহ, অর্থাৎ আমার বা আমাদের সকলের মা, ঈশ্বরত্বকে ত্যাগ করে, যিনি ঈশ্বরই নন, যিনি শয়তান আর বার বার দজ্জাল হয়ে উপস্থিত হন, তাঁকে ঈশ্বর সেজে থাকতে দিয়ে, নিজে মাতৃত্ব নিয়েই উলমালা থাকেন। সেই পামরের পক্ষে বাৎসল্যরসের ধারণা করাও অসম্ভব। কিন্তু আপনারা তো স্ত্রীবেশে উপস্থিত। মাতৃত্ব রস আপনাদের মধ্যেও প্রবাহিত। একবার তাকিয়ে দেখুন জগতের দিকে”।
“আপাতদৃষ্টিতে দেখলে, এটাই দেখবেন যে সকলে কামনার দাস, সকলেই কনো না কনো নেশার মধ্যে চূড়। কিন্তু শ্রেষ্ঠ নেশারু কে দেবী? বলুন, কে শ্রেষ্ঠ নেশারু? কে সেই ব্যক্তি যিনি নেশা না করলেও নেশাতেই সর্বক্ষণ বিরাজ করেন?”
দেবী হর্ষিতা বললেন, “এক শিল্পী। শিল্পকলার রচনাই তাঁর নেশা। আর তাঁর থেকে অধিক নেশারু কেউ নেই”।
মৃষু হেসে বললেন, “আর তাঁরা প্রতিটি নির্মিত শিল্পকলার ক্ষেত্রে কি বলে থাকেন? কার ছবি দেখেন তাঁরা নিজেদের নির্মিত কলাশিল্পে?”
দেবীও হর্ষিতা পুনরায় বললেন, “দেবী শ্বেতাকে। তাঁরা বলেন, সমস্ত কলাশিল্পের প্রকাশ সম্ভবই হয় দেবী শ্বেতার কৃপার কারণে। তাঁরা এও বলেন যে, তাঁরা পরিশ্রম করেন, নিয়জিত আর নিষ্ঠাবান থাকেন, কিন্তু যা প্রকাশিত হয় তাঁদের থেকে, তা একমাত্র মাতা শ্বেতার প্রেমদানের কারণেই প্রকাশ্যে আসে। আর তারা এই ধারণা আর অনুভবের কারণে, নিজেদের রচিত কলাশিল্পকে দেখে আনন্দে অশ্রুপাত করেন, যেন নিজেদের হারিয়ে যাওয়া মাকে ফিরে পেয়ে গেছেন তাঁরা”।
মৃষু হেসে বললেন, “দেখলেন দেবী! সেই একই মাতৃত্ব তো আপনার মধ্যেও রয়েছে কারণ আপনিও একজন স্ত্রী। আর তাই অনায়সে কেমন অনুভব করে নিলেন! এই শ্রেষ্ঠ নেশারুদের নেশার উদ্দেশ্য, নেশায় ডুবে থাকার কারণ!”
পুনরায় হেসে বললেন, “অর্থাৎ এই যে, প্রতিটি মেধাধারী দেহই তাঁদের মা’কে খুঁজছে। আর সেই খোঁজের কারণে তাঁরা যে আত্মভাবে বশ হয়ে থাকছে, তার কারণে আপনাদের আরাধ্য বৃথাই উৎসাহিত হয়ে থাকেন যে, সকলে তাঁরই বশ। … বাস্তব এই যে, সকলে নিজেদের মা’কেই খুঁজছেন, আর খুঁজে চলেছেন, কিন্তু মেধা থেকে চেতনা হতে পারছেনা বলে, তাঁরা নিজেদের মা’কে সামনে পেয়েও সনাক্ত করতে পারছেনা”।
“সমস্ত কিছুর চেতনাই যে তাঁদের মায়ের আবেশ; সমস্ত অনুভবই যে তাঁদের মাতার অঙ্গের গন্ধ; সেটা তাঁরা কিছুতেই বুঝতে পারছেনা। আর আত্ম বারবার তাঁদের কাছে তন্ত্র, মন্ত্র আর যন্ত্রের বুলি আওড়ে গেছে বলে, তারা অনুভবের থেকে বিমুখ হয়ে সেই তন্ত্র, মন্ত্র আর যন্ত্রের দিকে অনুধাবন করছে। অর্থাৎ তারা বেপথে যাচ্ছে”।
“কিন্তু তারা বেপথে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সন্ধান নিজেদের মায়েরই করছে। আর সেই বেপথে যাওয়াকে আটকে, সঠিক পথে চালিত করার জন্যই মনুষ্যযোনির আগমন ঘটেছিল। আর আজ তারা এতটাই দূরে চলে গেছে সত্যের থেকে যে, পুনরায় এক নূতন যোনির নির্মাণ করা আবশ্যক হয়ে গেছে। কর্মভাবনা যেটাই হোক, উদ্দেশ্য একটিই, মায়ের সাথে মায়ের সন্তানদের দূরত্ব কমিয়ে আনা”।
“যতদিন মানুষের মধ্যে দিয়ে সেই সম্ভাবনা প্রত্যক্ষ ছিল, ততদিন মা মানুষের উপরই কাজ করেছেন আর তাঁদের মেধাকে চেতনায় বিকশিত করার প্রয়াস করে গেছেন। আর যখন তা সম্ভব নয়, তখন সেই সমস্ত মেধাদেরই অতীতবিহীন এক নূতন যোনিতে স্থাপন করে, নূতন ভাবে তাঁদের মেধাকে চেতনায় উন্নত করতে ক্রিয়াশীল তিনি। আর সেই কাজ করে, তাঁর বাকি সন্তানদের তাঁর দিকে এগিয়ে দেবার জন্যই আমাকে তিনি জন্ম দিয়েছিলেন”।
“এক মা, তাঁর বাকি সমস্ত সন্তানদের ফিরে পেতে, তাঁদের প্রেম দিতে, আরেক সন্তানকে জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সন্তান কি করে বুঝবে মায়ের আর সন্তানের এই দূরত্বের কারণে উভয়ের মধ্যেই কি পরিমাণ যন্ত্রণার সঞ্চার হয়েছে? … দেবী, আমাকে সেই অনুভব করানোর জন্যই আর আমাকে তা অনুভব করিয়ে আমার জীবনের উদ্দেশ্যের দিকে অগ্রসর করার জন্যই, মাতা আমাকে নিজের থেকে ততকাল দূরে রেখেছিলেন, যতকাল না আমি, মা ও ছায়ের বেদনার আভাস না পেয়েছি”।
“হ্যাঁ হতেই পারতো যে, এই দূরত্বের কারণে আমি তাঁর থেকে বিমুখ হয়ে যেতাম। প্রয়াসও করেছিলেন তা করতে আমার সনামধন্য পিতা, যাকে কেউ আরাধ্য মানে আবার কেউ দজ্জালের স্বরূপ মানে। বারবার আমাকে তিনি আঘাত করে দেখাতে চেয়েছিলেন যে, দ্যাখ, তোর মাতা কিন্তু আসেননি। … কিন্তু তিনি আমার মাতার মাতৃত্বকে জানেনই না। প্রতিটি সময়ে তিনি ছিলেন আমার কাছে। আর যাতে বিভিন্ন রূপে থাকতে পারেন তিনি, তার কারনেই তো নিজেকে তিন ভাগে ভেঙে নিয়েছিলেন”।
“তারপরেও নিজের মূলধারাকে নিজের সন্তানের সুরক্ষাতে রেখেই দিয়েছিলেন। কখনো আম্মি বেশে, তো কখনো ভদ্রা বেশে, তিনি সর্বক্ষণ ছিলেন। কিন্তু তিনি তো সত্যি সত্যি মা, প্রচারের কারণে নয়। তাই তাঁর মধ্যে সেই অনিশ্চয়তার ভাব কখনোই জাগে নি, যা আপনাদের আরাধ্যের মধ্যে সর্বক্ষণ বিরাজ করে বলে, নিজেকে ঈশ্বর প্রমাণ করার জন্য কখনো একে বরদান দিচ্ছেন তো কখনো তাকে”।
“কিন্তু আমার মা যে সত্য অর্থেই আমার মা, তাই একটিবারও সামনে এসে বলেন নি আম্মি যে, আমি তোমার মা। একটিবারও ভদ্রা অনন্যের সামনে এসে বলেন নি, আমাকে চিন্তে পারছো? আমি তোমার মা”। মৃদু হেসে, “তাঁর তো নিজের এই ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে তিনি মা। যদি নিজের উপর নিজের সন্দেহ থাকতো, তাহলে অবশ্যই সামনে এসে বলতেন যে আমি তোমার মা। ঠিক যেমন নিজেকে ঈশ্বর বললেও, সন্দেহ থাকে উনার, তাই সকলের সামনে এসে মৃতকে জীবিত করে, মনবাঞ্ছিত বরদান প্রদান করে, আর আমি ব্রহ্মাণ্ডের বিধাতা তাই আমার অবমাননা করা যাবেনা বলে শ্রাপ দিয়ে, তিনি সমানে প্রয়াস করে যান নিজেকে ঈশ্বর প্রমাণ করতে”।
দেবী হর্ষিতা এবার মাথা নিচু করে নিয়ে বললেন, “ক্ষমা, নিজের উপর নিজেরই ঘৃণা হচ্ছে এবার তো! … নিজে স্ত্রী হয়ে, মাতৃত্ব ধারণ করে, সেই সমস্ত মাতৃত্বের উৎস যিনি, তাঁকে সমানে অপমান করা হয়েছে, লাঞ্ছিত করা হয়েছে, তাঁর থেকে তাঁর সন্তানদের ছিনিয়ে নেইয়া হয়েছে, আর যিনি সেই সমস্ত কিছু করেছে, আমরা তাঁকে সমর্থন করে এসেছি। ভেবেও লজ্জা লাগছে মৃষু। আমি তোমার কাছে অপরাধী। আমায় দণ্ড দাও”।
মৃষু এবার স্নেহপূর্ণ হাসি হেসে বললেন, “না দেবী, আমরা সকলে আপনজন। আপনারা সকলে আমার মায়েরই সন্তান, অর্থাৎ আমার প্রাণের থেকেও প্রিয় ভগিনী। এক ভ্রাতা কি করে তাঁর ভগিনীকে দণ্ড দিতে পারে? এক ভ্রাতা তো তাঁর ভগিনীর মধ্যে নিজের মায়ের ছবি দেখে!”
দেবী সুগন্ধা একনয়ন অশ্রু ধারণ করে বললেন, “সাধপালের মৃত্যুর পর আমরা এই যক্ষদেহ ত্যাগ করে দেব। … যতক্ষণ যক্ষ হয়ে বসে থাকবো, কেউ না কেউ এসে আমাদের বলতে থাকবে যে, তোমরা যক্ষ, তোমাদের আরাধ্য হলেন ওই পরমাত্ম। … যক্ষদেহ ত্যাগ করে দিলে তো আর কেউ এই কথা বলবে না!”
মৃষু হেসে বললেন, “জানো তোমরা কি? কি কারণে যক্ষরা মাতার থেকে বিমুখ হয়ে গেলেন? অতি সংক্ষেপে সেই কথা বলছি তোমাদের। জেনে নাও”।
এই বলে মৃষু বলতে শুরু করলেন, “পুরাকালে, একটি স্ত্রী ছিলেন, আর নাম ছিল যক। নিঃসন্তান হবার কারণে তাকে সকলে ত্যাগ দিয়েছিল। অপরিসীম রূপবতী হবার কারণে, বহু পুরুষ তাঁর রূপরস পান করতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু তিনি এই ধারণা রাখেন যে, জগন্মাতা তাঁকে সন্তান দিচ্ছেন না কারণ তিনি তাঁর স্বামীর দেহকামের প্রতি আসক্ত হয়ে গিয়ে নিজের মনে কামনার আধিক্য এনে অপবিত্র হয়ে গেছেন”।
“তাই তিনি কনো পুরুষকে কাছে ঘেঁসতে দেন না। তাঁর রূপের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন রমনাথও। আর তাই তিনি একটি অতি সুদর্শন পুরুষের বেশ ধরে এক ঋষির বেশে একটি বৃক্ষতলে অবস্থান করেন। ত্রিকালদর্শী, তাই তিনি জানেন যে দেবী যকের মধ্যে মাতার প্রতি নিষ্ঠা আছে। তাই তিনি ঋষিবেশে থেকে, মাতারই নাম জপ করা শুরু করতে থাকলেন। তবে তাঁর মুখে মাতা শব্দ উচ্চারিতও হতে পারেনা। তাই তিনি ‘তামা তামা’ এমন জপ করতে থাকলেন”।
“দেবী যক, সেই সাধুকে দেখে, আর তামা তামা সমানে বলার জন্য ‘মাতা মাতা’ই শোনার কারণে, তিনি মাতার কনো দূত ভেবে তাঁকে সেবা করতে থাকেন। জানতেনও না দেবী যক যে অক্ষয় নামক সেই ঋষি পুরুষ আসলে রমনাথ স্বয়ং, যিনি তাঁর রূপরস ভক্ষণ করতেই এমন ছদ্মবেশ ধারণ করেছেন”।
“সেবা করতে থাকলে, একসময়ে সেই সাধু এমন বলেন যে, দেবী আমি তোমার সেবাতে তুষ্ট। আমার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হও, তুমি সন্তানপ্রাপ্তি করবে। … দেবী যক অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে যান এই শুনে যে তিনি সন্তানের জননী হতে পারবেন। আর তাই অক্ষয়কে অনুমতি প্রদান করলেন সম্ভোগের। অক্ষয় তাঁকে সম্পূর্ণ একটি ধরিত্রীর বর্ষ ধরে, চার প্রহর রমণ করে সুখভোগ করলেন। আর যখন সুখভোগ করে তৃপ্ত হয়ে গেলেন রমনাথ, তখন অন্তর্ধান হলেন”।
“দেবী যক এই ধারণা রাখলেন যে স্বয়ং মা-ই এসেছিলেন তাঁকে জননী করে দেবার জন্য অক্ষয়ের বেশে। আর এই আশাতে রইলেন যে তিনি এবার জননী হবেন। কিন্তু তিনি তাও গর্ভবতী হলেন না। এবার তিনি বেদনায় ভেঙে পরলেন। কনো কিছু প্রমাণ করার জন্য নয়, কেবলই জীবনের প্রতি উদাসীন হয়ে যাবার কারণে তিনি আহার করাও ত্যাগ করে দিলেন”।
“এমনই বহুকাল চলার পর যখন তিনি শীর্ণকায় হয়ে উঠলেন, তখন তাঁর স্মরণ এলো এই কথা যে, মাতার রূপ যদি হয়ে থাকতেন অক্ষয়, তাহলে এতো গভীর ভাবে সম্ভোগ কি করে করতে পারতেন তিনি? মাতা বা মাতার চেতনা যার মধ্যেই থাকে, তিনি তো কামনা রোহিত হয়ে যান!”
“তাঁর সঙ্গে ছল করা হয়েছে এই কথা অনুধাবন করে, এবার তিনি আত্মহত্যার জন্য অগ্রসর হলে, মাতার কৃপার সম্মুখীন হলেন তিনি। সম্মুখে বেশ কিছু রঙিন পাথর খুঁজে পান তিনি, প্রকৃতির দান স্বরূপ। অত্যন্ত আকৃষ্ট হন সেই পাথরদের প্রতি। তাই সেই পাথরগুলিকে মালা রূপে ধারণ করে নিলেন নিজের গলে”।
“এবং সেই পাথরের প্রভাবে, তিনি এবার গর্ভবতী হয়ে উঠলেন। মাতাকে ধন্যবাদ দেবার জন্য একটি পূজার আয়োজনই করছিলেন সেই সময়ে দেবী যক। কিন্তু তাঁর সম্মুখে অক্ষয় উপস্থিত হন। দেবী যক তাঁর প্রতি রুষ্ট হয়ে তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলে গেলে, অক্ষয় বললেন, আমার দিকে দেখুন দেবী। যেই পাথর আপনি ধারণ করে রয়েছেন, সেই পাথর আমিই আপনাকে দিয়েছিলাম, আর যেই সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে রয়েছে, সেও আমারই ঔরসজাত সন্তান”।
“দেবী যক যখন পিছন ফিরে দেখলেন, তখন তিনি দেখলেন স্বয়ং রমনাথ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দেবী যক ধারণা করে নিলেন যে যখন ইনি রমনাথ, তখন সত্যই বলছেন। আর তাই যেই সন্তানের জন্ম দিলেন, তার নাম করলেন যক্ষ। রমনাথ পুনরায় অক্ষয় বেশে স্থাপিত হয়ে সহবাস করতে গেলেন দেবী যকের সাথে, কিন্তু একটিবারও সম্পূর্ণ ভাবে রমণ করতে পারলেন না। কিন্তু তারপরেও দেবী যক আবারও গর্ভবতী হলেন। সেই দেখে দেবী যকও বুঝে যান যে, পূর্বের সন্তানও অক্ষয় বা রমনাথের জন্য আসে নি তাঁর গর্ভে”।
“কিন্তু যেই মুহূর্তে রমনাথ দেবী যকের মনের কথা জেনে গেলেন, সেই মুহূর্তে তিনি নিশ্চয় করে নেন যে, দেবী যকের বিনাশ করতে হবে। … চতুর্ভুতকে তিনি বশ করলেন, আর সেই শিক্ষা প্রদান করলেন এক জাতিকে, যার নাম দিলেন নাগা। আর সেই নাগাদের দায়িত্ব দিলেন যে, যেই মুহূর্তে দেবী যক সন্তানের জন্ম দিয়ে দেবে, সেই মুহূর্তে তাঁর হত্যা করে দিতে”।
তাই করলেন নাগারা, আর সেই মুহূর্ত থেকে যক্ষ ও নাগাদের শত্রুতার সূচনা হয়ে যায়। এই সদ্যজাত সন্তান ছিলেন একটি কন্যা ও একটি পুত্র, আর তাঁদের নাম অক্ষয়ই রাখে যক্ষ ও যক্ষয়িনী, আর এই দুই যকসন্তানকে বড় করে, তাঁদের কাছে রমনাথকে আরাধ্য বলে পরিচিত করে, অক্ষয়ের দেহ ত্যাগ করেন। যক্ষ ও যক্ষয়িনী বিপুল সংখ্যক নাগাদের প্রতিরোধ করে, কিন্তু বিপুল সংখ্যক নাগার কারণে বারবার ব্যর্থ হয়। তাই সিদ্ধান্ত নেন যে, মাতার মৃত্যুর প্রতিকার নিতে চাইলে তাঁদেরও সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। আর তাই, তাঁরা একে অপরকে বিবাহ করেন, এবং বহু সন্তানের জন্ম দিতে থাকেন। আর সেখান থেকে আরম্ভ হয় যক্ষদের রমনাথের আরাধনা, আর সাথে সাথে নাগাদের সাথে শত্রুতারও”।
দেবী হর্ষিতা এবার আচমকাই বলে উঠলেন, “আমাদের মায়ের সাথে ছল করা হয়েছিল। এই তো অর্থ দাঁড়ায়। তাঁর সমস্ত সন্তানরা আসলে জগন্মাতার আশীর্বাদ থেকে জাত। কিন্তু শুধুই তাঁকে সম্ভোগ করার বাসনায় অক্ষয় রূপে রমনাথ বিরাজ করে, নিজেকে ভগবান বলে আর সকল যক্ষদের কাছে আরাধ্য রূপে স্থাপন করে দেন। আর তো আর, যখন তাঁর এই ভেক সকলে জেনে যাবেন, তখন তিনি স্বয়ং নিজের পত্নীরই হত্যা করিয়ে দিলেন! … না মৃষু, আমাদের উপর কৃপা করো। আমরা এবার নীচ যোনিতে যাত্রা করতে চাইনা। … আমরা এই ১০৮ যক্ষস্ত্রী জন্ম নিতে চাই নবযোনিতে, আর এবার আমরা সত্য অর্থে আমাদের সাথে হওয়া অন্যায়ের, আমাদের মাতার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার নেব”।
মৃষু বললেন, “বেশ, মাতার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার যে বা যারা যখন যখন নিতে চাইবে, মৃষুকে সে বা তারা সব সময়ে সঙ্গে পাবে। দেবী আপনারা নতুন যোনিতে নয়, আপনারা মাতার আশীর্বাদে যক্ষমানবী হয়ে জন্মগ্রহণ করবেন। মাতা সঠিক সময়ে আপনাদের ৫৪টি পুরুষের কাছে নিয়ে আসবেন। আর আপনারা সেই ৫৪ পুরুষকে বিবাহ করবেন। প্রতিটি পুরুষের কাছে দুইজন করে থাকবেন আপনারা। আর আপনারা ১০৮ সন্তানের মাতা হবেন। যক্ষমানবী আর উন্নত চেতনার মানুষের সন্তানই হবে সেই নতুন যোনি, যা মনুষ্যযুগের অন্ত করে, নবচেতনার হিল্লোল তুলে, মাতৃযুগের সূচনা করবে। এই বরদান আজ মৃষু আপনাদের প্রদান করলো”।
যক্ষস্ত্রীরা এই বরদান লাভ করে নিজেদের সশক্ত অনুভব করে বললেন, “এতকাল আমাদের ভুল বোঝানো হয়েছিল, আর আমরাও নিজেদের আবেগের কারণে ভুল বুঝে এসেছি, বিনা প্রশ্নে, বিনা সত্য জানার প্রয়াস করে। সত্য অর্থে, আমরা মাতার শক্তিতে শক্তিশালী ছিলাম। তাই যদি সঠিক পথে চলতাম, তাহলে অনেক কিছু প্রদান করতে পারতাম মাতার বাকি সন্তানদের উদেশ্যে”।
“কিন্তু সত্য ভুলে, আমরা আমাদেরকে মাতার দেওয়া শক্তিকে ব্যবহার করে এসেছি শয়তানের আরাধনা করতে। দজ্জালের আদেশ মেনে, আমরা সমানে মন্ত্রশক্তির মাধ্যমে সেই সমস্ত মানুষদের সহায়তা করে গেছি, যারা শয়তানের উপাসক। না, আর নয়। আর একদণ্ডের জন্যও আমরা কনো মন্ত্রে আমাদের শক্তির সঞ্চার করবো না। তাতে যদি সাধপাল আমাদের দণ্ড দিতেও আসে, তাও করবো না। এবার আমরা মাতার কাজ করবো। তাঁর নবযোনি বিস্তার কর্মে অংশ নিয়ে, তাঁর প্রতি আমরা যেই অন্যায় করে এসেছি এতকাল, তার প্রায়শ্চিত্ত করবো”।
দেবী সুগন্ধা বললেন, “কিন্তু মৃষু, আমাকে একটা কথা বলো। আমরা কনো মন্ত্রকে সক্রিয় না করলে, সমস্ত মন্ত্র অকারণ হয়ে যাবে। কনো ক্রিয়া বা কনো ফল দেবেনা সেই সমস্ত মন্ত্র। কিন্তু তাতে করে কি, সেই আণবিক অস্ত্রগুলির নাশ হবে? মন্ত্রের অভাবে সেই অস্ত্রগুলিকে ব্যবহার করা সম্ভব হবেনা, এটা সঠিক। কিন্তু সেই অস্ত্রগুলি তো আর অস্তিত্ব থেকে মুছে যাবে না! আর তার থেকেও বড় কথা, মানবযোনি এতটাই আক্রমণাত্মক হয়ে গেছে, এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে যে নিজেদের থেকে নীচ যোনির অস্তিত্বই রক্ষিত হতে দেয়না। নিজের থেকে উন্নত যোনিকে সে কি করে মেনে নেবে?”
মৃষু হেসে বললেন, “কনো মন্ত্র সক্রিয় হবেনা, এর অর্থ বোঝেন দেবী? … এর অর্থ হলো, রমনাস্ত্র বা কোকিলাস্ত্র বা দুধাস্ত্রও শুধুই একটি শক্তিশালী ধারালো অস্ত্রে পরিণত হয়ে যাবে। এর অর্থ, সমস্ত যন্ত্রও অকেজ হয়ে যাবে। শুধু অস্ত্র নয়, সমস্ত কারখানাও বন্ধ হয়ে যাবে। আবার সকল মানুষকে সরিষার তেল ব্যবহার করতে হবে, নিশিতকালে আলোক জ্বালার জন্য; আবার সমস্ত মানুষকে হাতপাখা চালাতে হবে অত্যন্ত গরম থেকে রক্ষা পেতে। কিন্তু মানুষ তো এমন ভাবে বসবাস করছে এখন যে, তাদের নিবাসে প্রকৃতির বাতাস প্রবেশই করতে পারেনা। অর্থাৎ মৃত্যুর শুরু তো আপনারাই শুরু করে দেবেন”।
দেবী সুগন্ধা বললেন, “এর অর্থ, মনুষ্য যোনির নাশ আর নব যোনির নির্মাণ, এদুটি একই সঙ্গে ঘটবে?”
মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “আর রইল কথা অস্ত্রের। দেবী, মন্ত্র যতক্ষণ না ব্যবহার হচ্ছে, ততক্ষণ তো তা কনো অস্ত্রই নয়। ততক্ষণ তা তো কিছু প্রাকৃতিক উপাদানের সমাহার মাত্র, যার বাইরে অবস্থান করছে প্রকৃতিরই কিছু খনিজ, আর অন্দরে রয়েছে কিছু অতিদ্রুত রাসায়নিক বিক্রিয়া করতে সক্ষম প্রকৃতিরই পদার্থ। … মানব যোনি যতদিন থাকবে, ততদিন হয়তো বিভিন্ন প্রকার তৈল ব্যবহার করে করে, এই যন্ত্রসমূহকে নষ্ট হওয়া থেকে সুরক্ষিত করবেন, কিন্তু তাদের নাশ হবার পর?”
“তাঁদের নাশ হবার পর তো, কনো প্রকার রক্ষণাবেক্ষণ না হবার কারণে, সমানে প্রকৃতির উপাদান প্রকৃতির মধ্যেই লীন হয়ে যাওয়া শুরু করে দেবে। তাই নয় কি?”
দেবী সুগন্ধা এবার মৃদু হেসে বললেন, “এর অর্থ এই যে, যতদিন মানব আছে, ততদিনই প্রকৃতির উপাদান প্রকৃতির মধ্যে মিশতে দেবেনা তারা। মানব গেলে, তবেই তারা পুনরায় প্রকৃতির মধ্যে মিশে গিয়ে, সমস্ত কিছু সামান্য হয়ে যাবে। আর যেহেতু আমরা সহায়ক হবো না, সেহেতু ত্রিমূর্তিও নিজেদের অস্ত্রকে সক্রিয় করতে পারবেনা, আর কারুকে সেই অস্ত্রের শিক্ষা দিলেও, তা নিছকই নিরর্থক শিক্ষা হয়ে থেকে যাবে”।
মৃষু মৃদু হাসলেন কেবল। তাই দেখে দেবী হর্ষিতা হেসে বললেন, “মেধার শক্তি দেখছি আমি মৃষু। সেই মেধাকে আমরা সকলেই ধারণ করে রয়েছি। কিন্তু এই প্রথম তার শক্তি দেখছি। কি অদ্ভুত ভাবে, তুমি প্রত্যক্ষ ভাবে কনো কিছুরই নাশ না করে, যাদেরকে নিয়ে নাশের লীলা করা হচ্ছিল, তাদেরকেই সেই বিনাশের লীলা থেকে সরিয়ে দিলে”।
“প্রেতদের মুক্ত করে দিলে আসক্তি থেকে। যখন প্রেতই নেই, আসক্তিই নেই নিজের দেহের প্রতি, তখন নাগা বা সাধপাল বা ত্রিমূর্তি তাঁদেরকে কিভাবে সকল মানুষকে ভয় দেখাবে! যাদেরকে মাধ্যম করে, তাঁরা ভয় দেখাতো সকলকে, সেই মাধ্যমকেই মুক্ত করে দিলে। আর এখনও তাই করলে। যেই যন্ত্র আর মন্ত্র মানুষকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল আর ভ্রমিত করতে থাকছিল, তাদের অস্তিত্বই নাশ করে দিলে, তাও আবার কনো যুদ্ধ না করে, কারুকে কিচ্ছু জানতেও না দিয়ে”।
সুগন্ধা বললেন, “আচ্ছা মৃষু, মানব তো আর বিনাশলীলা করতে পারবেনা। চাইলেও পারবেনা। না আছে তাদের কাছে পঞ্চভূতধারকদের আসক্তি, যার বলে তারা তন্ত্র করতো, না থাকবে এঁদের কাছে যন্ত্র বা মন্ত্র, যার সাহায্যে এরা বিনাশলীলা করতো। এরপরেও কি মানুষকে নষ্ট করার প্রয়োজন আছে?”
মৃষু হেসে বললেন, “যে সমাপ্ত হতে চায়, প্রকৃতি কেবল তাকেই বিনষ্ট করে দেবী। যন্ত্র আর মন্ত্রের অভাবে, মানুষ আহারলাভ করা থেকে বিরত হয়ে যাবে। আর তখন তারা হিংস্র হয়ে উঠে একে অপরকে নাশ করা শুরু করবে। যখন তারা নিজেদের বক্তব্য স্পষ্ট করে দেবে যে, তারা একে অপরের বিনাশ করেই দেবে, তখন মাতা তাদেরকে তাদের মনবাঞ্ছিত বরদান অর্থাৎ বিনাশ প্রদান করে দেবেন। এই যা”।
সমস্ত যক্ষস্ত্রীরা নিজেদের অবস্থান ও করনীয় সম্বন্ধে পূর্ণ ভাবে পরিষ্কার হয়ে গেলে, এবার সকলে মাতার লীলার দিকে নজর দিলেন। উগ্র মাতা হাজতের হারপাঁজরকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে উগ্র ভাবে সম্মুখে চলা শুরু করলেন হীরার সাথে সাখ্যাত করার জন্য।
সেই দেখে দেবী সুগন্ধা উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলেন, “মাতা এমন উগ্র হয়ে উঠছেন কেন? তাঁর শ্বাস যেন ফুলছে! যেন অগ্নির সঞ্চার হচ্ছে তাঁর অন্তরে! যেন আগ্নেয়গিরির লাভা বিস্ফোটের পূর্বে দগদগে অবস্থায় যাওয়া শুরু করছে! এমন হবার কারণ কি মৃষু!”
মৃষু মৃদু হেসে বললেন, “আপাতদৃষ্টিতে দেখলে, মা’কে কয়লা মন্ত্রপুত আহার প্রদান করেছে, যার কারণে মাতার শ্বাস সমানে অধিক অধিক ভাবে ফুলছে আর মা উগ্র হতে থাকছে। আর সত্য অর্থে দেখলে, মাতার শ্বাস তখনই ফুলতে শুরু করে, যখন তাঁর সন্তানের সাথে অন্যায় করা হয়। অর্থাৎ কোথাও না কোথাও, কেউ না কেউ, মাতার কনো না কনো সন্তান, বা কনো গোষ্ঠীর সন্তান বা কনো যোনির সাথে বিশেষ ধরনের অন্যায় করতে চলেছে। আর সেই কারণেই মায়ের শ্বাস ফোলা শুরু করেছে”।
সুগন্ধা সকল যক্ষস্ত্রীদের হয়ে প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মাতার এই উগ্রতার শেষ কোথায়? শেষ কি ভাবে সম্ভব?”
মৃষু গম্ভীর ভাবে বললেন, “মায়ের উগ্রতার সমাপ্তি শূন্যতায়, অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডের নাশে। অর্থাৎ একবার যখন মা উগ্র হতে শুরু করেছে, তখন যদি তেমন কনো কিছু না ঘটে যার কারণে মায়ের উগ্রতা শান্ত না হয়, তাহলে ততক্ষণ তিনি উগ্র হতেই থাকবেন, যতক্ষণ ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকবে। ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব নাশ হবার সাথে সাথেই মা ব্রহ্মময়ী থেকে ব্রহ্ম হয়ে যাবেন ও চিরশান্ত হয়ে বিরাজ করবেন”।
দেবী হর্ষিতা এবার উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলেন, “আর তাঁর উগ্রতাকে ব্রহ্মাণ্ড নাশের আগে শান্ত করা কি করে যেতে পারে?”
মৃষু গম্ভীর ভাবেই উত্তর দিলো, “তাঁর সেই সন্তানকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করে। … হ্যাঁ, একমাত্র তখনই তাঁর উগ্রতা শান্ত হবে। তবে সেই উগ্রতা শান্ত হবার কালে যদি তাঁর সন্তানের সাথে অন্যায় করা ব্যক্তিত্ব দণ্ড না পায়, তাহলে আবার এক নূতন উগ্রতার জন্ম হবে। সেই অপরাধীকে দণ্ড দেবার জন্য উগ্রতা। তবে সেই উগ্রতা এই উগ্রতার থেকেও অধিক ভয়ানক হবে”।
সুগন্ধার প্রশ্ন এলো, “কিন্তু কেন? সন্তানকে তো তিনি সুরক্ষিত অবস্থায় লাভ করে ফেলেছেন, তাই না!”
মৃষু মুচকি হেসে বলল, “এক মা সর্বাধিক লাচার থাকেন যখন তিনি নিজের সন্তানকে সুরক্ষিত করতে পারেন না। হ্যাঁ উগ্র হন তিনি তখনও; উগ্র হয়ে আশেপাশের সমস্ত কিছুর নাশ করতে থাকেন। কিন্তু সেই উগ্রতার মধ্যে থাকে ব্যর্থতার ভাব। আর তাই সেই উগ্রতার কারণ হয় অসহায় হওয়ার ভাব। কিন্তু যখন তিনি নিজের সন্তানের সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার নিতে আগ্রহী হন, তখন একটি মায়ের সামর্থ্য নিজের চরম অবস্থায় উন্নীত হয়ে যায়। তখন তিনি সর্বস্ব কিছু করতে পারেন। তখন তিনি শ্রেষ্ঠ খল, শ্রেষ্ঠ বল, শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, শ্রেষ্ঠ কূট, এবং শ্রেষ্ঠ উগ্র”।
“সন্তানের প্রতি আসা সংকটের প্রতিমুহূর্তের ভাব তাঁর মধ্যে তখন সর্বক্ষণ চলে, আর তা তাঁকে অসম্ভব উগ্র করে তোলে। কিন্তু সেই উগ্রতা অনিয়ন্ত্রিত হয়না, বরং পূর্ণ ভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকা উগ্রতা হয় তা। আর উগ্রতা যখন নিয়ন্ত্রিত, তখন তা অতিকায় হয়ে যায়”।
দেবী হর্ষিতা উদ্বিগ্ন হয়েই বললেন, “উগ্রতা বিবেকের হনন করে নেয়। আর যিনি উগ্র হচ্ছেন তিনি তো স্বয়ং ঈশ্বর। এমন হবেনা তো যে, তিনি উগ্র হয়ে উঠুন, বিবেক হারিয়ে ফেলুন, সেটা কিছু সাধ চান! … সেই সুযোগে তারা ঈশ্বরের থেকে এমন কিছু বরদানের কবচ চেয়ে নেবে, যার কারণে স্বয়ং ঈশ্বরই লাচার হয়ে যাবেন, বন্দী হয়ে যাবেন!”
মৃষু হেসে বললেন, “দেবী, এক মা নিজের কনো একটি সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে গিয়ে উগ্র হয়ে উঠলে, তিনি অন্য সন্তানদের মা থাকেন না, বা সেই অন্যসন্তানদের মা হবার বোধ তাঁর থেকে চলে যায়, এমন কি? … না দেবী! তিনি সমস্ত অবস্থাতেই সকলের মা। যার কারণে উগ্র হয়েছেন, তারও মা, আর যার কারণে উগ্র হননি, তারও মা। তাই তিনি যতই উগ্র হন, তিনি নিজের উপর সত্য অর্থে নিয়ন্ত্রণ কখনোই হারান না। তিনি জগন্মাতা, তাই কনো কারণে তিনি কনো একটি সন্তানের প্রতি পক্ষপাত করতে পারেন না”।
“তাই যেই কথা আপনি বললেন দেবী, হতে পারে যে সেটাই কনো সাধের আকাঙ্ক্ষা। আবার হতে পারে যে তা ত্রিমূর্তিরই পরামর্শ যে, দেবীকে উগ্র করো, আর তাঁর থেকে কবচ গ্রহণ করো। বা হয়তো, আরো বড় ষড়যন্ত্র আছে যে, দেবীকে উগ্র করে দিয়ে, তার থেকে নিজেদেরকেই দণ্ডের ভাগীদার করে জগতকে দেখাবেন যে, তাঁরা ঈশ্বর, আর তাই এক উগ্র মায়ের উগ্রতার হ্রাস করতে, তাঁরা দেবীর কাছে সাময়িক ভাবে পরাজয় গ্রহণ করছেন”।
“যেটাই কারণ হয়ে থাকুক দেবী, নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন মা’কে নিয়ে। তাঁরা যারা নিজেদেরকে ভগবান বলে দাবি করে থাকেন, তারা সেই ভগবান বলে নিজেদেরকে মানার কারণে অন্ধ হয়ে যেতে পারেন, আর তাই সত্য থেকে বিমুখ হয়ে গেছেন, কিন্তু সত্য এই যে, মাতা কনো অবস্থাতেই কনো ভুল করতে পারেন না, কারণ তিনিই হলেন প্রকৃত ঈশ্বর। ভুল করা ঈশ্বরের ধর্ম নয়, আর ধর্মচ্যুত হওয়া ঈশ্বরের স্বভাব নয়”।
“কিন্তু হ্যাঁ, এমন কিছু আপনারা এবং আমি এক্ষণে দেখতে পারি যার কারণে মনে হতেই পারে যে, মা এ কি করে দিলেন! … কিন্তু অপেক্ষা করুন, ধৈর্য ধরুন। সঠিক সময়ে এটাও জেনে যাবেন যে, মাতা কেন সেই কাজ করেছিলেন”।
মৃষুর কথাতে পূর্ণ আস্থা না রাখতে পারলেও, আস্থা রাখার মনোভাব রেখে, সকলে মাতার দিকে পুনরায় নজর দিলে দেখলেন যে, মাতাকে অতিশয় উগ্র করে দিতে তাঁর দুই সখী, জয়া ও বিজয়াকেও উত্তেজিত করেছেন কয়লা, একই ভাবে যেই ভাবে সে মনে করে যে মাতাকে উগ্র করেছে, অর্থাৎ তন্ত্রমন্ত্র করা আহার করিয়ে। তাই জয়া আর বিজয়া পূর্ণ আগ্রাসী হয়ে, মাতার কাছে যাত্রা করছেন, রক্তপান করার কামনা নিয়ে।
যখন তাঁরা মাতার নিকটে এসে গেলেন, তখন তাঁরা মাতার কাছে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গিয়ে গড় হয়ে মাতাকে প্রণাম করে বললেন, “অম্বা, আমাদের রক্ষা করো। আমাদের মধ্যে জানিনা কেন, অসম্ভব কামনার জন্ম নিচ্ছে আর সেই কামনার জেরে, আমাদের অন্তরে রমণসম্ভোগের বাসনা জন্ম নিচ্ছে। আর শুধু তাই নয়, আমাদের মধ্যে রক্তপানের তীব্র বাসনা জন্ম নিচ্ছে। এ আমাদের সাথে কি হচ্ছে অম্বা!”
“তোমার কাছে আসার পথে আমরা প্রায় ৫৪টি পুরুষের রক্তপান করেছি, আর সকলের রক্তপান করার পূর্বে, আমি তাঁদেরকে রমণের জন্য আহ্বান করেছি। রমণ উপরান্তে আমরা তাঁদের হত্যা করে রক্তপান করেছি। … তুমি আমাদের চেনো অম্বা। আমাদের কি এই প্রবৃত্তি!”
মাতা গম্ভীর উগ্রতা ধারণ করেই বললেন, “কনো কিছুই অকারণ হয়না জয়াবিজয়া। জয়া, তুমি কেবলই প্রবৃত্তির কারণে ২৭ জন পুরুষের রক্তপান করেছ। হ্যাঁ, রক্তের পিপাসার কারণে তুমি তাদের সাথে রমণ করে বশ করে, তাঁদের রক্তপান করেছ। কিন্তু বিজয়া, তুমিও একই কীর্তি করেছ। কিন্তু গরম রক্ত পানের কামনা তো তোমাদের মধ্যে জাগেনি। তাহলে তুমি ২৭টি পুরুষকে দৌড় করিয়ে পালাতে দিয়ে, তাদের রক্ত গরম করে তাদের হত্যা করেছ কেন?”
বিজয়া এই কথার উত্তরে মাথা নত করে থাকলে, মাতা পুনরায় বললেন, “তোমাদের রক্তের পিপাসা আমি শান্ত করবো। অবশ্যই করবো। আর তা আমি আমার নিজের রক্ত পান করিয়েই করবো। আমার রক্তের বীজ তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করলে, তোমরা যেই ৫৪টি পুরুষের ধারণ করেছ, তা সমস্তই পুনরায় জাগ্রত হয়ে যাবে। আর তার থেকে তোমরা দুজনেই ২৭টি করে অণ্ড ধারণ করবে। সেই ৫৪টি অণ্ডকে তোমাদের ৫৪টি স্ত্রীর গর্ভে স্থাপন করতে হবে। আর এই ৫৪টি অণ্ড থেকে ৫৪টি পুরুষ শিশু জন্মলাভ করবে, যারা মৃষু যেই যক্ষিণীদের বরদান দিয়েছে, তাঁদের স্বামী হবে”।
সেই কথা শুনে সকল যক্ষিণী হতবাক হয়ে একবার মাতার দিকে দেখলেন আর অতঃপরে মৃষুর দিকে দেখলেন। তাঁদের কেউ মনে করলেন, “মা আর পুত্র কি যৌথ ভাবে পরিকল্পনা করে সমস্ত কাজ করেছে! নাহলে এমন ভাবে একে অপরের কীর্তি আর কাণ্ডকারখানাকে না দেখে, না পরামর্শ করেও সমর্থন কি ভাবে করছেন?”
তো অন্য যক্ষিণীরা মনে করলেন যে, “কি অদ্ভুত মাতৃত্ব জগন্মাতার! সন্তান অন্যত্র কারুকে কিছু অভয়দান করছেন, আর মাতা অন্যত্র স্থিত হয়ে কিছু লীলা করে, সন্তানের দেওয়া সেই অভয়দানকে বাস্তবে পরিণত করার মার্গ প্রদান করছেন!”
অন্যদিকে, এতো বলে, মাতা নিজের গণ্ডদেশে নিজের দুই হাত স্থাপন করে, সজোরে মোচর দিলে, মৃষু উৎকণ্ঠার সাথে, ক্রন্দনের সাথে চেঁচিয়ে উঠলো, “মা!”
সকল যক্ষিণীই নিজেদের ভাবনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, তাই তাঁরা স্বচক্ষে মাতার এই অসামান্য বেদনাদায়ক পীড়াগ্রহণকে দেখতে পারলেন না। কিন্তু মৃষুর চিৎকার শুনে সকলে পুনরায় মায়ের দিকে তাকালে, সকলে ভয়ার্ত হয়ে গেলেন।
ভয় সকল যক্ষস্ত্রীই পেয়েছিলেন সেই দৃশ্য দেখে, কিন্তু মৃষুর উৎকণ্ঠাতে ভয় নয়, বেদনা ছিলো কেবল। সে জানে যে তাঁর মাতা অনন্ত, তাঁর মাতার নাশ নেই। তাই ভয় পাবার কনো কারণই ছিলো না, কিন্তু মা যেই বেদনাকে গ্রহণ করলেন জয়াবিজয়ার থেকে, সেই বেদনার ব্যাথা যেন সরাসরি মৃষুর হৃদয়ে এসে আঘাত করলো! যক্ষিণীরা অনুভব করলেন যে, এর পূর্বে তারা শুনেছে, সন্তানের বেদনা মাতা গ্রহণ করে, কিন্তু এই প্রথমবার দেখলো তারা, সন্তান মাতার বেদনা গ্রহণ করছে! প্রেমের কি এতটাই শক্তি যে স্বয়ং ঈশ্বরের বেদনাও গ্রহণ করে নেওয়া যায়!
বেদনাগ্রস্ত যে মৃষু হয়েছে, সে সম্বন্ধে নিশ্চিত ছিলেন তারা, কিন্তু মৃষু যে বেদনার হনন করেছে সেই ব্যাপারে তারা নিশ্চিত কিছুতেই হতে পারেনি। সাখ্যাত ব্রহ্মময়ীর বেদনাকে কেউ কি করে হনন করতে পারে! কিন্তু সেই কথার প্রমাণ পেলো যখন মাতা নিজমুখে সেই কথা বললেন।
নিজের মুণ্ডকে ছেদ করে, নিজের রক্তদ্বারা জয়াবিজয়ার রক্তপিপাসাকে শান্ত করতে থাকলে, মাতা প্রবাল বেগে নিজের রক্ত প্রবাহিত করতে থাকলেন। তাই জয়াবিজয়া নিজেদের হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে গতি কম করার জন্য বারবার আকারইঙ্গিতে বলতে থাকলেন, কিন্তু মাতা সমানে গতি বাড়িয়েই চললেন।
আর সেই গতি একসময়ে জয়া ও বিজয়াকে ভূপতিত করে দেয়। পিপাসা মিটতে, দেবী জয়া ও বিজয়া ব্যকুল ভাবে বললেন, “এতো গতি কেন উমা?”
দেবী সর্বাম্বা নিজের উগ্রমুণ্ডকে পুনরায় নিজের দেহে স্থাপন করে বললেন, “আমার পুত্র আমার এই মুণ্ডচ্ছেদের বেদনা আমার থেকে হনন করে নিয়েছিল। আর সেই কারণে আমার তোমাদের পিপাসা মেটানোর গতি বৃদ্ধি হয়েছিল, যাতে তাঁর বেদনা গ্রহণের পীড়া হ্রাস পায়। আর গতি আবশ্যকও ছিলো, কারণ ক্ষুধা পিপাসা জাতীয় কামনা আহারমাত্রেই মেটে না, তা মেটে প্রচুর পরিমাণ আহারে ও সুস্বাদু আহারে। আর সেই কারণেই হয়তো আমার পুত্র আমার বেদনা হনন করে নিয়েছিল, যাতে আমি গতিশীল ভাবে তোমাদের পিপাসা মেটাতে পারি”।
জয়া উচাটন হয়ে বললেন, “স্বয়ং জগন্মাতার বেদনা হনন! এও কি সম্ভব! … আর সে তোমার সন্তান, ঈশ্বর তো নয়। তাহলে ঈশ্বরের বেদনার হনন কি করে করা সম্ভব? কর্তা হয়ে ওঠা কি করে সম্ভব!”
মাতা হেসে বললেন, “জয়া, প্রেম এমনই ভাব যার কারণে ঈশ্বরও নশ্বরতুল্য হয়ে যায়, আর অকর্তাও কর্তা হয়ে যায়। আমার পুত্র আমাকে প্রেম করে। প্রেমের অর্থ বোঝো তো? অনন্ত বেদনা। প্রেম মানে হলো ভিন্ন অস্তিত্বে থাকার কারণে ভোগ করা অনন্ত বেদনা। সেই অনন্ত বেদনার ভোগ করার কারণে, সে কর্তা হতেও চায়না, কিন্তু তাও কর্তা হয়ে যায়। বাস্তবে কর্তা হয়, কর্তার অনুভূতি তার থাকেনা। তার একটি বারও এমন ধারণা বা ইচ্ছা দুইই থাকেন যে ‘আমি করবো’, কিন্তু তার প্রেমের সাথে তার পূর্ণযুক্ততা, প্রেমের প্রতি পূর্ণ সমর্পণ তাকে তাঁর প্রেমের সাথে অভিন্ন করে দেয়। আর তাই, আমার সমস্ত বেদনা সে গ্রহণ করে নেয়”।
জয়া বিজয়া উভয়েই বললেন, “মা, আমরা কি তোমার এই অদ্ভুত পুত্রের সাখ্যাত কনোদিনও পাবো?”
মাতা হেসে বললেন, “আমি তো তোমাদের বলেইছি, তোমাদের ৫৪ টি সন্তানকে যক্ষিণীরা নিজেদের পতি করে গ্রহণ করে মৃশুর কাছেই প্রত্যাবর্তন করবে। তোমরা তাঁদের অনুসরণ করো। আমার পুত্রের সাথে তোমরা সাখ্যাত করতে পারবে।”
বিজয়া বললেন, “অর্থাৎ তোমার সেই পুত্র হলো মৃষু!”
মাতা হেসে বললেন, “হ্যাঁ!”
কয়লা এই সমস্ত কিছুতে অত্যন্ত ব্যকুল হয়ে গেলেন। তার জয়াবিজয়াকে উত্তেজিত করার উদ্দেশ্য ছিল, মাতাকে অধিক ভাবে উত্তেজিত করা। কিন্তু এতে তো হিতে বিপরীত হলো ! মাতা যতটা উগ্র ছিলেন, মুণ্ডচ্ছেদ করে শান্ত হয়ে গেলেন।
সেই দেখে অস্বস্তিতে স্থাপিত হয়ে উঠলেন কয়লা। অন্যদিকে হীরাও ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। মাতা তাঁর উদ্দেশ্যে তাঁর দিকেই আসছেন। তা জেনে, হীরাও মাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে চাইলে, কয়লা আগ্রাসী হয়ে উঠে হীরাকে বন্দী করে রাখার প্রয়াস করলে, নিজের রক্তদ্বারা মাতার উষ্মাঅগ্নিকে জালিয়ে রাখা অগ্নি তীব্র হতে থাকলো। সেই দেখে কয়লা একটি মিষ্ট হাসি দিলেন, আর মনে মনে বললেন, “অর্থাৎ, সন্তানদের কিছু হলে মাতা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন”।
এই বিচার করে এবার হীরাকে বন্দীই করে দিলেন কয়লা, যাতে মাতার উত্তেজনা চরমে উন্নীত হওয়া শুরু করে। হলোও তাই। মাতা পুনরায় ভয়ানক উত্তেজিত হওয়া শুরু করে দিলেন। অন্যদিকে ডাহুক বাহুক মাতার এই উত্তেজনা সম্বন্ধে না জানার কারণে, নাদেন্দ্রকে প্রেরণ করলেন মাতার উদ্দেশ্যে। নাদেন্দ্র একটি সাধ, যার কাছে বলই হলো তাঁর নাদ। তাঁর শব্দ তরঙ্গের সম্মুখে যে বা যা কিছু আসে, তা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়।
সেই নাদেন্দ্র সম্মুখে এসে সমস্ত কিছু নষ্ট ভ্রষ্ট করতে শুরু করলে, মাতা এবার এক সম্মহিনি রূপ ধারণ করলেন সেই নাদেন্দ্রকে মোহিত করে দিতে। হরিদ্রাবর্ণের দেবী পরমা সুন্দরী ও পরম সৌরভ বিকাশ করতে থাকলেন। আলোর ছটা তাঁর চারিপাশ থেকে বিচ্ছুরিত হয়ে সমস্ত কিছুকে যে যা অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থাতেই স্থগিত করে দিলেন। উপরন্তে একটি বজ্রদৃষ্টি স্থাপন করতে, তার প্রভাবে নাদেন্দ্রের জিহ্বা চূর্ণ হয়ে তাঁর মুখকে রক্তাক্ত করে দিলো।
বাণী সংযমের এই অসম্ভব সামর্থ্য দেখে সমস্ত নাদ ও স্বয়ং পরমাত্মও চিন্তিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু এই সমস্ত কিছুও দেবীকে শান্ত করতে পারলো না। দেবীর উত্তেজনা যেন অধিক হয়ে গেল। উগ্র দেবীর সমস্ত ধারণ করা উর্জা সমস্ত স্থানে ছড়িয়ে যেতে, তাকে মৃষু একত্রিত করে যক্ষস্ত্রীদের কাছে পৌঁছে দিতে সচেষ্ট হলে, তা ৬৪ দেবীকে উজ্জীবিত করে, কিন্তু বাকি দেবীদের কাছে পৌঁছানর স্থানে তা মৃষুর অঙ্গে স্থাপিত হয়ে গেল।
মৃষু এই দিব্য সৌরভকে ধারণ করে, তা দিয়ে এবার দুটি হস্তির নির্মাণ করলেন, যারা শান্ত নির্মল ও শুভ্র। মাতা অন্যদিকে যতই অধিক উগ্র হতে শুরু করলেন, ততই ঘনবর্ণের হতে থাকলেন। আর পরাপ্রকৃতি হবার কারণে, যতই মাতার অঙ্গের বর্ণ পরিবর্তিত হতে থাকলো, ততই প্রকৃতির আবহাওয়ার বর্ণও অনুরূপ ভাবে পরিবর্তিত হতে থাকলো। আর এর কারণে ক্রমশ যেন মাতাকে দেখা যাওয়াই দুষ্কর হয়ে উঠলো। যেন তিনি নিজের স্বরূপ অর্থাৎ শূন্যতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছেন।
ঠিক এই সময়েই উগ্রমাতার নিকটে এলেন সংহার, আর উদ্যম মৃদঙ্গ পরিবেশন করা শুরু করলেন। মাতার গতি যেন ক্রমশ ভয়ঙ্কর হতে থাকলো। তাঁর চরণের স্পর্শ মাত্রই ধরিত্রী কম্পিত হতে থাকলো, আর প্রতি পদক্ষেপে যেন জ্বালামুখী উজাগর হলো। আর সংহারের মৃদঙ্গের ধ্বনি যেন সেই আগ্রাসী মাতার পদচারণের ছন্দকে ধারণ করা শুরু করতে থাকলো।
দুই হস্তেই তিনি মৃদঙ্গ বাজাচ্ছিলেন, কিন্তু শুনে মনে হতে থাকলো সকলের যেন তিনি সহস্র হস্তে সেই মৃদঙ্গ বাজিয়ে চলেছেন। বিস্মিত হতে থাকলেন সকলে এই ভেবে যে, সহস্র হাত না থাকলে, সে মাতার এমন দ্রুত পদধ্বনিকে অনুসরণ করছে কি করে নিজের মৃদঙ্গের বোল দ্বারা!
কিন্তু একসময়ে এই মৃদঙ্গধ্বনিও থেমে গেল, যখন বারুদা মাতার চরণে এসে পতিতা হলেন। ক্রন্দনের সুরে বারুদা বলে উঠলেন, “শান্ত হও মা! শান্ত হও। … এ কেমন নিষ্ঠুরতা মা! নিজের উপর নিজে কেন নিষ্ঠুর হচ্ছ! … এই প্রকৃতিও যে স্বয়ং তুমিই। আর তোমার এই উগ্রতা যে সেই প্রকৃতিকেই নাশ করছে মা”।
মাতা শান্ত হলেন। গগন পরিষ্কার হওয়া শুরু করলো। বারুদাকে সকলে প্রত্যক্ষ করতে পারলেন, আর সংহারকেও। মাতা গম্ভীর কণ্ঠে বিললেন, “কি কামনা রাখো বারুদা!”
বারুদা বললেন, “মাতা, আমি সদা তোমার কাছেই নিবেদিত ছিলাম। তাই আমার মনে যখন কনো শব্দ এসেছে, আমার বিশ্বাস যে, সেই শব্দ তোমারই প্রদান করা। কিন্তু মা, আমি সাধকুলের স্ত্রী। সর্বদা সাধ দ্বারা বেষ্টিত থাকি। তাই ভয় হয় যে, যদি আমি তোমার থেকে বরদান রূপে তা কামনা করি, সাধরা তার বিরূপ ভাবে প্রয়োগ করে!”
মাতা মিষ্ট হেসে বললেন, “নিশ্চিন্তে বল বারুদা। কি কামনা তোমার। যদি এই বিশ্বাস থাকে আমার উপর যে, আমার ইচ্ছা ব্যতীত কনো কিছু হয়না, তাহলে তোমার কাঙ্ক্ষিত বরদান আমার সামনে উপস্থিত করো”।
অভয়দান লাভ করে দেবী বারুদা বললেন, “মা, জম্বুর এই অঞ্চলের দেখভাল আমিই করি দীর্ঘকাল ধরে। এখানের প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি তরু আমার প্রিয়। আমি তাঁদের কাছে, আর তারা আমার কাছে, উভয়ই উভয়ের অত্যত প্রিয়। এখানের প্রতিটি জীব আমার প্রিয়, আর আমি সেই জীবদের অত্যন্ত প্রিয়। কিন্তু মা, আত্মবিস্তারের ফলে মানুষ এতটাই বলবান হয়ে গেছে যন্ত্র, মন্ত্র ও তন্ত্রকে ধারণ করে যে, সাধরা তাঁদের মধ্যে বিস্তার করে করে, মানুষ যেন সাখ্যাত সাধ হয়ে গেছে একাকটি”।
“মা, তাদের থেকে আমি আমার প্রিয় বৃক্ষদের, তরুদের, গরু, বলদ, সারমেয়, মার্জার, পক্ষীকুল, মৎস্যকুল, কারুকেই রক্ষা করতে পারছিনা। মানুষের চলার জন্য এই ভূমি নিজের থেকে বিস্তীর্ণ স্থানকে মাটি দিয়ে প্রস্তুর করে রেখেছে। কিন্তু তাতেও এঁদের হয়না। বড় বড় যন্ত্র এনে, সেই অবস্থান করা সড়কের উপর বিষাক্ত জ্বালানিযুক্ত রসায়নিক পদার্থ ফেলে ফেলে, সম্পূর্ণ ভূমি ও বাতাবরণকেই বিষাক্ত করে তুলছে। সঙ্গে রয়েছে অট্টালিকা নির্মাণের হিড়িক। তার কারণে সমস্ত জীব, সমস্ত পক্ষী, সমস্ত উদ্ভিদের নাশ করতে এরা দ্বিতীয়বারও ভাবে না। মা, আমি এটুকুই চাই যে, এই ভূমিকে উর্বর করে দাও, আর এর রক্ষা করার সামর্থ্য আমাকে দাও”।
মাতা মিষ্ট হেসে বললেন, “এই স্থানকে তোমার নামেই সকলে চেনে বারুদা। তাই তো একে বারুভুঁইয়া নামে অবিহিত করা হয়। … বেশ আজ থেকে এই স্থানের অধীশ্বরী হলে তুমি। তোমার অনিচ্ছাতে কনো মানুষ কেন, সামান্য একটি জীবাণুও প্রবেশ করতে পারবেনা। … কিন্তু পুত্রী, মা হয়ে সন্তানের উদার ইচ্ছার মান তো আমি রাখলাম, আর সন্তান হয়ে মাকে কি দেবে তুমি?”
বারুদা বললেন, “কি দেব? একটা শর্ত রাখতে চাই আমার এই বরদানের মধ্যে। এক ও একমাত্র তোমার ইচ্ছাতে যা কিছু হবে এই স্থানে, তাকে প্রতিরোধ করার সামর্থ্য আমার থাকবেনা। অর্থাৎ, যদি আমি দেখি যে, এখানে কনো কিছু হচ্ছে, আর তার উপর আমার নিয়ন্ত্রণ নেই, বুঝে যাবো যে, তা এক ও একমাত্র তোমার ইচ্ছাতেই হচ্ছে”।
মাতা মিষ্ট হেসে বললেন, “বেশ, তাই হবে পুত্রী। … হ্যাঁ, তোমার যা সন্দেহ ছিল যে, সাধরা এই বরদানের লাভ তোলার প্রয়াস করবে, তা হবে, আর তার কারণে তোমাকে নিঃসঙ্গ হতেও হতে পারে। কিন্তু, সেই আক্রমনে আমি তোমাকে একটি বরদান দিচ্ছি যে, ভাবিকালে, আমার হাত ধরে, এই স্থান হয়ে উঠবে নবযোনির বিস্তারক্ষেত্র, আর তুমি হবে এই বারুভুঁইয়ার দ্বারপাল”।
দারুকা হেসে বললেন, “মা, তোমার অন্ত সম্ভব নয়, আর তুমি থাকতে আমি নিঃসঙ্গ কখনো হতে পারিনা। … হ্যাঁ, তোমার ইঙ্গিত আমি বুঝে গেছি, কারণ আমি তার প্রবৃত্তি সম্বন্ধে ভালোমতই পরিচিত। আর মা, আমি তার জন্য প্রস্তুত থাকবো। জানবো যে, যেদিন সেটি হয়ে যাবে, সেদিন তোমার সান্নিধ্য পাবার সময়ও হয়ে এসেছে আমার”।
এতো বলে বারুদা সেখান থেকে চলে গেলে, বারুদ তাঁর পত্নীর এই বরদানের জন্য অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে গেলেন। প্রভু রমনাথের পরিকল্পনার একটি অংশই ছিল তা, এমন বারুদের ধারণা। কারণও স্পষ্ট। রমনাথ নিজে এসে তাঁকে বলেছিলেন যে, তাঁর পত্নীকে দিয়ে এই বরদান কামনা করতে হবে। কিন্তু বারুদের কনো ধারণা ছিলোনা যে, তাঁর পত্নীর ভক্তির মধ্যে কনো প্রকার ছল, না তো পূর্বে ছিলো, আর না এই বরদান কামনা করার সময়ে ছিল। সত্য তো এই যে, এই বরদান দেবী বারুদা কামনা করার ইচ্ছা বহুদিন রেখে দিয়েছিলেন নিজের হৃদয়ে। তাই বারুদ নিজের মত ভাবতে থাকলেন যে তাঁর কামনা পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু নিয়তির গর্ভে তো কিছু অন্য কথাই লুকিয়ে ছিল।
অন্যদিকে, এবার মাতা এগিয়ে গেলেন সংহারের দিকে। সংহারের কাছে এগিয়ে এসে মাতা বললেন, “এই অদ্ভুত মৃদঙ্গতাল ধারণ করলে কি করে সংহার? … আমি অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছি তোমার এই মৃদঙ্গের বোলে। আর তাই তোমাকে এই বরদান দিচ্ছি যে, তোমার দুই হস্ত দ্বারা যেমন করে তুমি সহস্র হস্তের ভান করে মৃদঙ্গে লহর তুলেছিলে, ঠিক তেমন ভাবেই আজ থেকে, তোমার সহস্র হস্ত থাকবে। আর সেই সহস্র হস্তের প্রতিটি হস্তে থাকবে একাকটি হস্তির বল”।
সংহার হেসে বললেন, “ধন্যবাদ মাতা। কিন্তু ক্ষমা করবেন। আমি যে এই বরদানের কামনাই করিনি। আপনি আমাকে বরদান দিয়ে দিলেন। এর অর্থ কি এই যে, আমার হৃদয়ে যেই বরদানের কামনা ছিলো, তা অপূর্ণই থেকে যাবে?”
মাতা সেই কথাতে ঈষৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। ভক্তের ভানের মধ্যে লুকানো অভক্ত ভাব সম্মুখে বেড়িয়েই এলো সংহারের মধ্য থেকে। মাতা তাও মিষ্ট হেসে বললেন, “তৃপ্ত যখন হয়েছি পুত্র তোমার কারণে, তখন তোমার মনচাওয়া বরদান তো আমাকে দিতেই হবে, না হলে যে আমার এই তৃপ্তির অপমান করা হবে। বলো কি চাও”।
সংহার মৃদু হেসে বললেন, “বেশি কিছু না মা। আমি আমার মৃত্যুই নিশ্চয় করতে চাই। … শুধু কি ভাবে মৃত্যু লাভ করবো, সেটা নির্ধারণ করে নিতে চাই নিজের থেকে”।
মাতা গম্ভীর দৃষ্টির মধ্যেই একটি মিষ্ট হাসি দিয়ে যেন বুঝিয়ে দিতে চাইলেন যে, যতই কর্তা সাজো, কর্তা এক আমিই; আমি বিনা দ্বিতীয় কর্তার অস্তিত্বই নেই সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডে। কিন্তু সেই ভাবকে অদেখা করেই সংহার বললেন, “মাতা আমি কিশোরী কন্যার হাতেই মরতে চাই। কনো বিবাহিত কন্যা আমাকে হত্যা করতে পারবে না”।
মৃষু এই কথা শুনে নিজের আসন থেকে উন্নত হয়ে দাঁড়িয়ে পরলেন। গর্জন করে উঠলেন, “একি চাইলো সংহার। মাতা যে বিবাহিতা। এর অর্থ! …”
মাতা অন্যদিকে মৃদু হেসে বললেন, “তথাস্তু। তাই হবে। তোমার মৃত্যু কনো কিশোরী অবিবাহিতা কন্যার হাতেই হবে। আর অবশ্যই তোমার বলকে অতিক্রম করতে পারে, এমনই কন্যা হবে সে”।
সংহার চলে গেলে, মাতা অতিশয় ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন, কারণ অন্যদিকে কয়লা হীরার উপর এবার অত্যাচার করা শুরু করলেন, মাতাকে উত্তেজিত করতে।
